📄 জবের দালিয়া (জবের ছাতু ও গুড় বা চিনি দ্বারা তৈরী এক প্রকার গোল্লা)
জব খাদ্য দ্রব্য সম্পর্কিত একটা অতি পরিচিত নাম। এটাকে যদিও নিম্নশ্রেণী ও গরীব দুঃখীদের খাদ্য মনে করা হয় তথাপি এর ছাতু দ্বারা তৈরী শরবত গ্রীষ্মকালে ব্যাপকভাবে পান করা হয়ে থাকে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগীদের জন্য জবকে একটা উত্তম পথ্য, পেটের পীড়ার একটি উপকারী ঔষধ এবং দুর্বলতায় বিশেষ শক্তি বর্ধক হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রা স্ত্রী হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের কারো জ্বর হলে তার জন্য জবের দালিয়া তৈরী করার নির্দেশ দিতেন এবং সেমতে তা তৈরী করে রোগীদের খাওয়ানা হতো।" -যাদুল মাআদ
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ)-এর অপর এক বর্ণনাঃ
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قِيلَ لَهُ إِنَّ فَلَانَا وَجَعَ لَا يَطْعَمُ الطَّعَامَ قَالَ عَلَيْكُمْ بِالتَّلْبِينَةِ فَحُسُوهُ إِيَّاهَا وَيَقُولُ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا تَغْسِلُ بَطْنَ أَحَدِكُمْ كَمَا تَغْسِلُ إِحْدَاكُنَّ وَجْهَهَا مِنَ الْوَسَخِ .
"কেউ যদি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ সংবাদ নিয়ে আসত যে, অমুক ব্যক্তির পেটে অসুখ, খানা পিনা গ্রহণ করছে না। তাহলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিতেন 'তাকে তালবিনা (জবের দালিয়া) তৈরী করে খাওয়াও।" অতঃপর তিনি বলতেন, আল্লাহর কছম। এটা তোমাদের পটকে এমনভাবে পরিষ্কার করে যেমনভাবে কোন ব্যক্তি স্বীয় চেহারা ময়লা হতে পরিষ্কার করে থাকে।" -যাদুল মাআদ, মুসতাদরাকে হাকেম
বুখারী এবং মুসলিম শরীফের বর্ণনাঃ কোন বাড়িতে কারো আকস্মিক মৃত্যু হলে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) তালবিনার বুন্দিয়া রান্নার জন্য নির্দেশ দিতেন। সেমতে তালবিনা পাকানো হত, আর হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) নিজ হাতে গোস্ত ও রুটির টুকরা এক সাথে মিশিয়ে সরীদ তৈরী করতেন এবং সরীদের মধ্যে তালবINA মিশিয়ে বলতেন, "তোমরা এটা খাও।" কারণ আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তালবINA রোগীদের মনে শান্তি আনে এবং মৃত্যু শোক দূর করে। -যাদুল মাআদঃ ২য় খন্ড, মুসতাদরাকে হাকেম।
আমাদের দেশে মৃত ব্যক্তির জন্য শোক পালনকালে খিচুরী, রুটি ও পিঠা পাকানোর প্রচলন রয়েছে। আর এটা সাধারণতঃ মাইয়্যেতের কোন নিকট আত্মীয় স্বজন নিজেদের পক্ষ হতে নিয়ে আসে। তবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত খাদ্য হলো তালবীনা ও সরীদ। এটা একদিকে যেমন খাদ্য অপর দিকে শোকের প্রতিষেধকও বটে।
📄 ইসতেসকা (সৌথ বা দেহে পানি আসা) রোগের জন্য অপারেশন
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিকিৎসা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ পাঠকালে খুবই আশ্চর্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের সন্ধান মিলে। বিশেষ করে এ সম্পর্কে সুনিশ্চিত হই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু হেকিমী বিষয় এবং চিকিৎসার প্রতি আগ্রহীই ছিলেন না বরং এ শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায়ও অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের উপকারিতায় বিশ্বাসী ছিলেন ঠিকই তবে রোগ এবং এর চিকিৎসা আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত বলেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই শিক্ষার ফলেই মুসলিম জাতি রোগের চিকিৎসা গ্রহণ না করে সবকিছুই ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয় না।
এ সম্পর্কে হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ)-এর বর্ণনা লক্ষ্য করুন:
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ طَبِيبًا أَنْ يَبْطَ بَطَنَ رَجُلٍ أَجْوَى الْبَطَنِ
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসতেস্কা বা সৌথ রোগ গ্রন্থ এক রোগীর চিকিৎসককে হুকুম করলেন, "তার পেটে সেগাফ (অর্থাৎ অপারেশন) কর।"
অতঃপর কেউ আরয করলেন-
يَا رَسُولَ اللهِ! هَلْ يَنْفَعُ الطَّبُ؟ قَالَ الَّذِي أَنْزَلَ الدَّاءَ أَنْزَلَ الشَّفَاءَ فِيمَا شَاءَ .
"ইয়া রাসূলাল্লাহ! চিকিৎসা কি উপকারে আসে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন, যিনি রোগ দিয়েছেন, তিনি প্রতিষেধক দিয়েছেন। তিনি যে কোন জিনিসের মাধ্যমে ইচ্ছা মুক্তি দেন।" -যাদুল মাআদঃ খন্ড: ২
ইসতেস্কার বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে। তন্মধ্যে এক প্রকার হলো ইসতেসকায়ে ঝাকি। এই প্রকার ইসতেসকা বা সৌথ রোগীর চিকিৎসার জন্য অপারেশন করা হয়। উপরোক্ত বর্ণনায় এটাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উল্লেখিত ব্যাধির বিভিন্ন প্রকার সম্পর্কেও ধারণা ছিল। শুধু তাই নয়, রোগের কোন্ পর্যায়ে কি ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন এটাও জানা ছিল।
📄 ফোঁড়ার অপারেশন
আধুনিক যুগে অস্ত্রোপচার বিদ্যার অশেষ উন্নতি সাধিত হয়েছে সত্য, তবে এ কথার অর্থ এই নয় যে, এ শাস্ত্রের উদ্ভবও এ যুগেই হয়েছে অথবা পাশ্চাত্য কোন দেশ এটার উদ্ভাবক। বরং আমদের পূর্বসূরী মনীষীগণও এ শাস্ত্রে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ ছিলেন। বর্তমান সময়ে হার্ট ও মস্তিষ্কের মত জটিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পর্যন্ত অপারেশন হচ্ছে। তবে একথা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, আল্লাহ পাকের ফযল ও করমে আগেকার দিনে মানুষের স্বাস্থ্যের এত দুরাবস্থা ছিল না। এবং এখনকারমত জটিল ব্যাধিও তখন সচরাচর দেখা যেত না। কারন তখন খাদ্য ছিল নির্ভেজাল, স্বভাব চরিত্র ও অভ্যাস ছিল সুন্দর। মেজাজ ছিল উত্তম, আর স্বাস্থ্যও ছিল যথোপযুক্ত। মোটকথা সে যুগের চাহিদানুযায়ী অস্ত্র চিকিৎসা বিজ্ঞান পরিপূর্ণ উন্নত ছিল।
এ ব্যাপারে হযরত আলী (রাযিঃ)-এর বর্ণনা উল্লেখযোগ্য, তিনি বলেন-
دَخَلْتُ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى رَجُلٍ يَعُودُهُ بِظَهْرِهِ وَرَمٌ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ بِهَذِهِ مِدَّةٌ . قَالَ بُطُوهُ عَنْهُ قَالَ عَلِيٌّ فَمَا بِرَحْتُ حَتَّى بَطَطْتُ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَاهِدٌ.
"এক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখার জন্য আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম। সে ব্যক্তির কোমর ফোঁড়ার কারণে ফোলা ছিল। লোকেরা বলতে লাগল এতে পুঁজ হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত ফোঁড়া সেগাফ (অপারেশন) করার নির্দেশ দিলেন। হযরত আলী (রাযিঃ) বলেন, আমি তৎক্ষণাৎ সেগাফ করে ফেললাম এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন।" -যাদুল মাআদঃ খন্ড: ২
"হযরত আলী (রাযিঃ)-এর উক্ত বর্ণনায় বুঝা যায় যে, তিনি সেগাফ করে ছিলেন এবং নিঃসন্দেহে তিনি এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন। অন্যথায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন জটিল কাজ সমাধা করার জন্য তাঁকে নির্দেশ দিতেন না। কারণ অস্ত্রোপচার (Surgery) বাচ্চাদের খেলনা নয় যে, প্রত্যেকে এটা করতে পারবে বা যে কোন লোকের দ্বারা এ কাজটি সম্পন্ন করান যাবে।
📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জখমে চিকিৎসা
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدِ السَّاعِدِي رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ سَأَلَهُ النَّاسُ بِأَيِّ شَيْءٍ دووی جرح رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ مَا بَقِيَ أَحَدٌ أَعْلَمَ بِهِ مِنِّي كَانَ يَجِئُ بِتُرْسِهِ فِيهِ مَاءً وَفَاطِمَهُ تَغْسِلُ عَنْ وَجْهِهِ الدَّمَ وَأُخِذَ حَصِيرٌ فَأُخْرِقَ فَحُشِيَ بِهِ جُرْحُه .
"হযরত সাহল ইবনে সায়াদ সায়ীদী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছেঃ লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জখমের চিকিৎসা কি দিয়ে করা হয়েছিল? তিনি জবাবে বললেন, এ সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক পরিজ্ঞাত কোন ব্যক্তি অবশিষ্ট নাই।” (অতঃপর বলতে লাগলেন) হযরত আলী (রাযিঃ) তাঁর ঢালে পানি নিতেন এবং হযরত ফাতিমা (রাযিঃ) তাঁর চেহারা মোবারক থেকে রক্ত মুছতেন। অতঃপর একটা চাটাই জ্বালান হল এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষতস্থানে চাটায়ের ছাই লাগিয়ে দেওয়া হল।" -বুখারী শরীফ
ইসলামের ইতিহাসে এটা একটা প্রসিদ্ধ ঘটনা যে, ওহুদের যুদ্ধে কাফেরদের প্রস্তরাঘাতে দোজাহানের বাদশাহ হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দন্ত মোবারক শহীদ হয়। কপাল মোবারক জখমী হয়। আহ্! তখন কতইনা হৃদয় বিদারক দৃশ্য ঘটেছিল! বিশ্ববাসীর যিনি রহমত হয়ে এসেছিলেন সেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফেররা আহত করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে।
পরবর্তী সময় এঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে শুধু এ হাদীসের রাবী হযরত সাহল ইবনে সাআদ সায়ীদী (রাযিঃ) জীবিত ছিলেন। তাই প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তিনি স্বীয় জুবানে এ ঘটানাকে এভাবে প্রকাশ করেছেন। হযরত আলী (রাযিঃ) তাঁর ঢালে করে পানি ভরে আনেন। আর হযরত ফাতিমা (রাযিঃ) তাঁর মোবারক হাতে নিজে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করেন। কিন্তু তাঁরা দেখলেন এতে রক্তক্ষরণ বন্ধ • হচ্ছে না। অতঃপর হযরত ফাতিমা (রাযিঃ) চাটাইয়ের একটা টুকরা নিয়ে তাতে আগুন দিলেন। যখন এটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল তখন ছাই ভষ্ম জখমের মুখে ভরে দিলেন। এতে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়।
-বুখারী, মুসলিম, সুনানে আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, আহমদ
পাট এবং চাটাই পোড়া ছাই যখমের ক্ষত ও প্রবাহিত রক্ত বন্ধ করার একটি অতি উত্তম ও সহজ চিকিৎসা। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরীক্ষিত এই ব্যবস্থা আজও পল্লীগ্রামে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।