📄 মাছি বাহিত রোগ ও চিকিৎসা
মাছিকে ফারসী ভাষায় "মাগাস” এবং আরবীতে "যুবাব" বলা হয়। মাছি একটা উড্ডয়নশীল তুচ্ছ ও ঘৃণিত প্রাণী। এটা সাধারণতঃ ময়লাযুক্ত স্থানে বসে এবং তথায় বসবাস করে। এ কারণে কেউই এ প্রাণীটিকে পছন্দ করে না। মাছির মল যদি কোন রশি ইত্যাদির উপর লেগে থাকে তা পানিতে ভিজিয়ে কানে প্রবেশ করালে কানের ব্যথা উপশমহয়। কাউকে না জানিয়ে মাছির মল গুড়ের সঙ্গে মিশ্রিত করে ১১দিন খাওয়ালে পান্ডব রোগের অশেষ উপকার হয়।" -কিতাবুল মুফরাদাত, খাওয়াসসুল আদবিয়াঃ পৃঃ ৩৪১
মাছি সম্পর্কিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মূল্যবান বাণী লক্ষ্য করুনঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي اِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَامْقُلُوهُ فَإِنَّ فِي اَحَدٍ جَنَاحَيْهِ دَاءً وَفِي الْآخِرِ شِفَاءً
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কারো পানির পাত্রে মাছি পতিত হলে এটাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে উঠাও। কেননা মাছির এক পাখায় রোগ ও অপর পাখায় রোগের প্রতিষেধক রয়েছে।" -বুখারী ও মুসলিম শরীফ
অন্য এক হাদীসের শেষ বাক্যটি এরূপ "মাছির বিষক্রিয়া সম্পর্কে কারো অজানা নেই। তবে এর এক পাখায় রোগ এবং অন্য পাখায় শেফা রয়েছে।" এ সম্পর্কে কারো যদি দ্বিমত থাকে; তার স্মরণ রাখা উচিত যে, এটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। সুতরাং এতে সন্দেহ পোষণ করার কোন অবকাশই নাই। এটাও বাস্তব বিষয় যে, বল্লা ও বিচ্ছুর ক্ষত স্থানে মাছি মালিশ দিলে আরামবোধ হয়। এ সকল তত্ত্ব দ্বারা সুস্পষ্ট বুঝা যায়, মাছির মধ্যে রোগ নিরাময়ের প্রভাব রয়েছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে যদি মাছি নিমজ্জিত খানা অথবা পানকৃত পানি গ্রহণ করা না করা নিয়ে প্রশ্ন উঠে সেখানে বলা হবে যে, এর সম্পর্ক ইচ্ছার সঙ্গে এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সুতরাং কোন ব্যক্তি এমন আহার্যাদি গ্রহণ করতে না চাইলে এতে জোর করার কিছুই নাই।
📄 ঔষধ হিসাবে লবণ
সাধারণতঃ আমরা লবনকে মসলা হিসাবে ব্যবহার করে থাকি। কোন তরকারী লবণ ব্যতীত খাওয়ার উপযুক্ত হয় না। তাছাড়া লবণ ব্যতীত কোন মসলাই সিদ্ধ হয় না। সুতরাং লবণ খাদ্যের একটা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। লবণ হজম শক্তি বর্ধক, ক্ষুধা দূরকারী ও মন প্রফুল্লকারী। চুকা ঢেকুর এবং পেটের বায়ু পরিশোধিত করা এর বৈশিষ্ট্য। হজম শক্তির দুর্বলতা, রক্ত দোষণ, যকৃৎ ও প্লীহার কমজোরী নিরাময়ে লবণ বিশেষ উপকারী। -সিহাত ও যিন্দিগীঃ পৃঃ ১৩৩
আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষক্রিয়া দূর করার জন্য লবণ ব্যবহার করতেন।
"হযরত আলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ একদা রাত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করছিলেন। সিজদারত অবস্থায় জমীনে হাত রাখলে একটা বিচ্ছু প্রিয় হাবীবকে দংশন করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিচ্ছুটিকে তাঁর জুতা দিয়ে মেরে ফেললেন। অতঃপর নামায থেকে ফারেগ হয়ে বললেন, এ বিচ্ছুটির উপর আল্লাহর অভিশাপ। কারণ এটা নামাযী ও বেনামাযী কাউকেই ছাড়ে না। অথবা তিনি বললেন, এটা নবী এবং সাধারণ মানুষের কাউকেই রেহাই দেয় না।"
ثُمَّ دَعَا بِمِلْحِ وَمَاءٍ فَجَعَلَهُ فِي إِنَاءٍ، ثُمَّ جَعَلَ يَصُبُّهُ، عَلَى إِصْبَعَيْهِ حَيْثُ لدغته ويمسحها ويعوذها بمعوذتين .
"অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লবণ ও পানি চাইলেন এবং তা একটা পাত্রে ঢাললেন। অতঃপর ঐ দ্রবণে আঙ্গুল ডুবিয়ে ক্ষতস্থানে মালিশ করলেন। অবশেষে পবিত্র কুরআনের শেষোক্ত দুটি সূরা তেলাওয়াত করলেন।" -মিশকাতুল মাসাবীহ, বায়হাকী
এখানে এ বিষয়টি বিশেষ ভাবে লক্ষ্যণীয় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ঝাড় ফুঁক ও দূআ কালামই যথেষ্ট মনে করে ঔষধ ত্যাগ করেন নাই। অথবা শুধু ঔষধের উপরও নির্ভর করেন নাই। বরং বিষক্রিয়া নষ্ট করার জন্য আক্রান্ত আঙ্গুলের উপর লবণ পানি ঢাললেন এবং সাথে সাথে আল্লাহর কালাম পাঠ করে (বিতাড়িত শয়তান থেকে) আল্লাহর নিকট আশ্রয়ও প্রার্থনা করলেন। মোটকথা, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ ও দাওয়া দুইটিকেই সমান গুরুত্বের সাথে দেখতেন। কেননা, রোগ আরোগ্যের দুইটি অছিলার একটা হলো বস্তুগত এবং অপরটি হলো রূহানী। সুতরাং কেউ যদি একচ্ছত্র শেফাদানকারী আল্লাহকে ভুলে যেয়ে শুধু মাত্র ঔষধের উপর ভরসা রাখে, তার মত বড় দুর্ভাগা আর কে হতে পারে? অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ রাখে বটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট নিয়ামতকে কাজে না লাগায় সেও ভুলের মধ্যে আছে।
সর্দি, কাশি এবং গলার সমস্যায় লবণ পানি গড়গড়া খুবই উপকারী। শরীরের হাড্ডি ভেঙ্গে গেলে বা মচকে গেলে সামান্য উষ্ণ পানিতে লবন মিশিয়ে আক্রান্ত স্থান ঐ লবণ পানিতে ডুবিয়ে রাখলে অথবা সেখানে পানি ঢাললে বর্ণনাতীত উপকার পাওয়া যায়।
📄 ত্বকাচ্ছাদন প্রদাহ বা চুলকানি রোগে রেশমী কাপড়
ইসলাম অনুগত বান্দাদেরকে আয়েশী বা ভোগ বিলাসী যিন্দিগীর পরিবর্তে অনাড়ম্বর ও সরল জীবন যাপন প্রণালী শিক্ষা দেয়। সুখ অন্বেষণ ও আরাম প্রিয়তার পরিবর্তে কর্মঠ ও পরিশ্রমী করে তোলে। মূলতঃ ইসলামের ইবাদত বন্দেগী এই বাস্তবতার চাক্ষুষ প্রমাণ এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানই এ ব্যাপারে যথার্থ সাক্ষী।
ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের বর্তন ব্যবহারের কোন প্রকার অনুমতি নাই। তবে মহিলাদের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলংকারাদি ব্যবহারের অনুমতি অবশ্যই রয়েছে। তবে এগুলির পরিমাণ একটা নির্দিষ্ট সীমায় অর্থাৎ নেছাব পরিমাণে পৌছালে যাকাত দেয়া ফরয। পুরুষদের জন্য স্বর্ণ, রৌপ্য এবং রেশমী কাপড় ব্যবহারের অনুমতি যদিও নাই তবে অসুস্থতার মজবুরীতে এ নির্দেশেরও ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।
যেমন হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
رَخَّصَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلزُّبَيْرِ وَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا فِي لُبْسِ الْحَرِيرِ لِحِكَّةٍ كَانَتْ بِهِمَا -
"হযরত রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খারেশ বা চুলকানির কারণে হযরত জাবের (রাযিঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযিঃ) কে রেশমের কাপড় পরার অনুমতি দিয়েছিলেন।"-বুখারী, মুসলিম
রেশমী পোষাক কোমল ও ঠান্ডা হয়ে থাকে বিধায় খারেশ রোগীদের জন্য খুবই আরামদায়ক হয়।
📄 অতিরিক্ত রক্তে সিংগা লাগান
সাধারণ প্রচলিত ঔষধ ছাড়াও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য ঔষধেরও পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন তীরের জখম ও কাঁটা বিধলে উত্তপ্ত লোহার দাগ দেওয়া বা অতিরিক্ত রক্ত চাপে সিংগা লাগানো। ফোঁড়া দুম্বল ইত্যাদির অপারেশন। এক বিশেষ ইসতিসকার (এক প্রকার ব্যাধি যাতে রোগী খুব বেশী পানি পান করতে চায়) চিকিৎসায় এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় পেট ছিদ্র করা ইত্যাদি।
এখানে আমরা হযরত নাফে (রাযিঃ)-এর ভাষায় সিংগা লাগানো সম্পর্কে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ বর্ণনা করছিঃ
قَالَ قَالَ ابْنُ عُمَرُ رَض يَا نَافِعُ رَض يَنْبَعَ لِى الدَّمُ فَأْتِنِي بِحَجَّامِ وَاجْعَلْهُ شَابًا وَلَا تَجْعَلُهُ شَيْخًا وَلَا صَبِيًّا وَقَالَ قَالَ ابْنُ عُمَرَ عُمَرَ رَض سَمِعْتُ رَسُولَ الله اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ الْحِجَامَةَ عَلَى الرِّزْقِ أَمْثَلُ وَهِيَ تَزِيدُ فِي الْعَقْلِ وَيَزِيدُ فِي الْحِفْظِ
"হযরত নাফে (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, আমাকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযিঃ) একদা বললেন, হে নাফে, আমার রক্তের মধ্যে বিশেষ চাপ (উত্তেজনা বা স্ফুটন) সৃষ্টি হচ্ছে। এমন একজন হাজ্জাম (সিংগা লাগানেওয়ালা) ডাক - সে যেন যুবক হয়- বৃদ্ধ অথবা অল্প বয়সী না হয়। অতঃপর হযরত ইবনে ওমর (রাযিঃ) বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, খালি পেটে সিংগা লাগান খুবই উত্তম। এতে জ্ঞান বৃদ্ধি হয় এবং স্মৃতি ও মেধাশক্তি প্রখর পায়।