📄 কালোজিরা সর্ব রোগের ঔষধ
কালোজিরাকে ফার্সীতে শোনিজ, আরবীতে হাব্বাতুস সাওদা এবং ইংরেজীতে ব্লাক কিউমিন (black cumin) বলা হয়। যার চারাগাছগুলি দেখতে অনেকটা ছোঁঁপ (গুয়ামুরী)-এর চারাগাছ সদৃশ। ডাল-পালা চিকন চিকন, ফলগুলি লম্বাটে কালো এবং শ্বাস সাদা বর্ণ হয়। কালোজিরা সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী অবিস্মরণীয়ঃ
"হযরত আবূ সালামাহ (রাযিঃ) হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন:
عَلَيْكُمْ بِهَذِهِ الْحَبَّةِ السَّوْدَاء فَإِنَّ فِيهَا شِفَاءٌ مِّنْ كُلِّ دَاءٍ إِلَّا السَّامَ وَالسَّامُ الْمَوْتُ .
"তোমরা এই কালোজিরা ব্যবহার করবে, কেননা এতে একমাত্র মৃত্যু রোগ ব্যতীত সর্বরোগের শেফা (আরোগ্য) রয়েছে। হাদীসে উল্লেখিত সাম-এর অর্থ মৃত্যু।" -বুখারী ও মুসলিম
দ্বিতীয় রেওয়ায়াতের ভাষা হলো:
إِنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ فِي الْحَبَّةِ السُّودَاءِ شِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ إِلَّا السَّامَ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ السَّامُ الْمُوتُ.
"তিনি (হযরত আবূ সালামাহ (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন কালোজিরা একমাত্র সাম বা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের মহৌষধ। ইবনে শিহাব (রহঃ) বলেন, এখানে "সাম" দ্বারা মৃত্যুকে বুঝানো হয়েছে।" -মিশকাতুল মাসাবীহ
বিস্ময়াভিভূত ইউনানী মতের অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ নবীয়ে উম্মী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণীর সত্যতার স্বাক্ষ্য এভাবে দিয়েছেন যে, "কালোজিরা ঠান্ডা জাতীয় ব্যাধি-সর্দি, কফ, কাশি ইত্যাদির জন্য অত্যন্ত উপকারী।
পক্ষাঘাত (প্যারালাইসীস) ও কম্পন রোগে কালোজিরার তৈল মালিশ করলে আশ্চর্যজনক ফল পাওয়া যায়। কালোজিরা যৌন ব্যাধি ও স্নায়ুবিক দুর্বলতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য অতি উৎকৃষ্ট ঔষধ। সর্দি, কাশি, বুকের ব্যথা, পাকস্থলীতে বায়ু সঞ্চয় (অম্লপিত্ত) শুলবেদনা ও প্রসূতী রোগে অত্যধিক উপকারী। ব্রুনের জন্যও উত্তম ঔষধ। এবং এতে শ্লেষ্মা, পুরাতন জ্বর, মূত্রথলির পাথর ও পান্ডুরোগ (কামিলা, জন্ডিস) আরোগ্য লাভ করে। তাছাড়া এটা মুদরে হায়েজ, বা অধিক ঋতু স্রাব, মুদরে বাওল মাত্রাতিরিক্ত পেশাব প্রতিরোধক ও ক্রিমিনাশক। -কিতাবুল মুফরাদাত: খাওয়াসসুল আদোবিয়া: ২৭৯
হযরত কাতাদাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে, প্রতিদিন ২১টি কালোজিরার ১টি পুটলি তৈরী করে পানিতে ভিজাবে এবং পুটলির পানির ফোঁটা এ নিয়মে নাশারন্দ্রে ব্যবহার করবে-
প্রথমবার ডান নাশারন্দ্রে ২ ফোঁটা এবং বাম নাশারন্দ্রে ১ ফোঁটা। দ্বিতীয়বার বাম নাশারন্দ্রে ২ফোঁটা এবং ডান নাশারন্দ্রে ১ ফোঁটা। তৃতীয় বার ডান নাশারন্দ্রে ২ ফোঁটা ও বাম নাশারন্দ্রে ১ ফোঁটা। -তিরমিযী, বুখারী, মুসলিম
হযরত আনাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন রোগ-যন্ত্রণা খুব বেশী কষ্টদায়ক হয় তখন এক চিমটি পরিমাণ কালোজিরা নিয়ে খাবে অতঃপর পানি ও মধু সেবন করবে।
📄 গৃহ্ণশী বা সাইটিকায় দুম্বার চাকি
-মুজামুল আওসাতঃ তাবরানী
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ دَوَاءُ عِرْقِ النِّسَاءِ الْيَةُ شَاءَ أَعْرَابِيَةٍ تُذَابُ ثُمَّ تُجْزَا ثَلَاثَةَ أَجْزَاء فَتُشْرَبُ فِي ثَلَاثَةِ أَيام .
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, দুম্বার চাক্কির মধ্যে বেদনা রোগের শেফা রয়েছে। এটাকে দ্রবণ করে (পিশে বা গলিয়ে) তিনভাগ করবে এবং তিন দিন সেবন করবে।"-মুসতাদরাকে হাকেম
এ সম্পর্কে মুসতাদরাকে হাকেম নামক কিতাবে তিনটি রেওয়ায়াতের উল্লেখ আছে। সেখানে এ কথা অতিরিক্ত রয়েছে যে, চাক্কি অতি বড় বা ছোট না হওয়া চাই। এই ঔষধ মুখের লালা সহ সেব্য অর্থাৎ পানি ইত্যাদির সঙ্গে সেবন করবে না। এছাড়া উক্ত হাদীস শরীফে শাতুন ও কাবশুন -এর চাক্কির কথা উল্লেখ আছে। সম্ভবত উক্ত শব্দ দুটি দুম্বাকে বুঝাবার জন্যেই ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা বকরীর চাক্কি হয় না।
গৃদ্ধশী বা সাইটিকা মূলত: একটি অতিশয় জটিল রোগ। তবে এটা যে শুধু মাত্র মহিলাদের রোগ এটা মনে করে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হয়। বরং এটা এক প্রকার কঠিন বেদনার নাম যা পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে সকলেরই হতে পারে। ইংরেজীতে এটাকে সিয়াটিক পেইন (SCIATIC PAIN) বলে। সাধারণতঃ এ বেদনা মেরুদন্ডের হাড্ডি থেকে আরম্ভ করে রগের মধ্য দিয়ে পায়ের গিট পর্যন্ত নিম্নভাগে অসহনীয় উপায়ে সঞ্চারিত হতে থাকে।
দুর্বলতা, বার্ধক্য ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের শুষ্কতা এ রোগের কারণ। আর দুম্বার চাক্কীই যে এ রোগের উৎকৃষ্ট ঔষধ এটা সুস্পষ্ট।
📄 জ্বরের চিকিৎসায় ঠান্ডা পানি
জ্বর একটা প্রসিদ্ধ রোগ। সকল দেশের প্রত্যেক এলাকায় এ রোগের প্রকোপ দেখা যায়। ছোট বড় যুবক বৃদ্ধ, নির্বিশেষে সকলেই এই রোগের শিকার হয়ে থাকে। এ জ্বর যেমন অনেক প্রকার তেমনি এর কারণ বা উপসর্গও অসংখ্য। গ্রীষ্ম প্রধান দেশে জ্বরের প্রকোপ খুব বেশী দেখা যায়। এখানকার মানুষ প্রচন্ড গরম ও সূর্যোত্তাপে খুবই অস্থির হয়ে পড়ে। যার ফলে জ্বরের উত্তাপের সীমা চরমে পৌঁছে। বর্তমানে এ ধরনের রোগীকে বরফের সেল দ্বারা ঠান্ডা করা হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠান্ডা পানিকে জ্বরের একটা উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সাব্যস্ত করেছেন। এ সম্পর্কে একাধিক সাহাবায়ে কিরাম হতে রেওয়ায়াত বর্ণিত রয়েছে।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ - الْحُمَّى مِنْ كَيْرِ جَهَنَّمَ فَلَمْحُوهَا مِنْكُمْ بِالْمَاءِ الْبَارِدِ
"জ্বর জাহান্নামের একটা উত্তপ্ত পাত্র বিশেষ তোমরা ঠান্ডা পানির দ্বারা এটাকে দূর কর।" -সুনানে ইবনে মাজাহ
কোন কোন রেওয়ায়াতে আছে যমযমের পানি দ্বারা ঠান্ডা করবে।
হযরত সামুরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত :
عَنْ سَمُرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ - الحمى قطعة من النار ......
"জ্বর জাহান্নামের উত্তাপের অংশ বিশেষ। তোমরা ঠান্ডা পানি দ্বারা এটা ঠান্ডা কর।"- মুস্তাদরাকে হাকেম, তাবরানী।
হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত :
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ - الحمى من في جهنم ......
"জ্বর জাহান্নামের তাপ। পানি দ্বারা এটাকে ঠান্ডা কর।" - ইবনে মাজাহ, মালেক, আহমদ, নাসায়ী, হাকেম
প্রায় অনুরূপ একটা হাদীস হযরত আনাস (রাযিঃ) থেকেও বর্ণিত রয়েছে। প্রখ্যাত হেকীম জালিনুস স্বীয় "হীলাতুল বার" নামক কিতাবে জ্বরের জন্য পানিকে সর্বোত্তম উপকারী বলে বর্ণনা করেছেন। যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ ইমাম রাযী (রহঃ) তাঁর 'কাবীর' গ্রন্থে জ্বরের জন্যে ঠান্ডা পানি ব্যবহারের বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন।
📄 কুম্বা চক্ষু রোগের ঔষধ
'কুম্মা' কে উর্দুতে কুম্ব বা কুম্বী বলা হয়। এটা দেখতে দুগ্ধবরণ ক্ষুদ্রাকার বলের মত। বর্ষাকালে আপনা থেকেই জন্মে। চাষাবাদ প্রয়োজন হয় না। কুম্বির ক্রিয়া ঠান্ডা। এর তরকারী সুস্বাদু। এটা শুকিয়ে চিবিয়ে খেলে বমি উপশম হয়। এটা প্রধানত তিন প্রকার (১) সাদা (২) লাল ও (৩) কালো। কালচে কুম্বী খুবই বিষাক্ত হয়ে থাকে। এটাকে হিন্দীতে “পদ ভেড়া” বলে। আহার্য এবং ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত কুম্বা আরবীতে 'আল কুম্বা' নামে পরিচিত। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ পাঠ করুন :
أَنَّ نَاسًا مِّنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالُوا لِرَسُولِ اللهِ ص الْكَمَاةُ جَدُرِيُّ الْأَرْضِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْكَفْاةُ مِنَ الْمَنْ وَمَاءُ هَا شِفَاء الْعَيْنِ .
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় সাহাবী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আরয করলেন, কুম্বী তো জমিনের বসন্ত রোগ! তাদের একথা শ্রবণ করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কুম্বী তো মান্না (ঐ খাদ্য যা বনী ঈসরাইলকে মাঠে দান করা হয়েছিল।) থেকে উৎপন্ন। আর এর পানি চক্ষু রোগের প্রতিষেধক। অতঃপর হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) তাঁর নিজের ব্যক্তিগত ঘটনা বর্নণা করেন যে, আমি তিন, চার বা পাঁচটি কুম্বা সংগ্রহ করি এবং এগুলি নিংড়িয়ে একটা ছোট শিশিতে ভরে রাখি। আমার এক বাঁদীর চোখে ব্যথা ছিল, আমি তার চোখে সেই পানি লাগিয়ে দিলাম এবং সে সুস্থ হয়ে গেল।" -তিরমিযী, মিশকাতুল মাসাবীহ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) তাঁর বাঁদীর চোখের যে অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন তা ছিল "আমাশ' অর্থাৎ চক্ষু ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া। এ রোগে চক্ষু থেকে অধিকাংশ সময় পানি ঝরতে থাকে এবং চক্ষু স্থির রেখে দীর্ঘক্ষণ কোন কিছুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা সম্ভব হয় না।
আমাদের দেশের চক্ষু বিশেষজ্ঞগণের উক্ত ঔষধের উপর প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা আবশ্যক এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা অনুযায়ী এতে চক্ষু রোগের কি কি শেফা রয়েছে এবং এটা ব্যবহার বিধিইবা কি তা তলিয়ে দেখা উচিত।