📄 শিংগা লাগান
আমি বহুক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছি যে, হাতুড়ে এবং অনভিজ্ঞ ডাক্তার অনেক সময় তাঁর রোগীদের এমন ঔষধ দিয়ে থাকে যা কোন একটি রোগকে তো দূর করে দেয় ঠিকই তবে অপর একটি রোগ সৃষ্টিরও কারণ হয়ে যায়। অনুরূপভাবে সস্তা খ্যাতি, নাম যশের আকাংখী ও লোভী চিকিৎসকগণ জেনে বুঝেই এ ধরনের ভুল চিকিৎসা ত্যাগ করে না।
মূলতঃ এ সকল লোক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে বেআইনীভাবে খেল-তামাশা করছে এবং আল্লাহর ভয়ে কম্পিত হচ্ছে না।
عَنْ سَمُرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خَيْرُ مَا تَدَاوَيْتُم بِهِ الْحَجَمُ
"হযরত সামুরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের চিকিৎসা সমূহের মধ্যে সর্বোত্তম চিকিৎসা হল শিংগা লাগান।"-মুসতাদরাক
"হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু নাঈম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি) বর্ণনা করেছেন যে, আমাকে আবুল কাসিম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন যে, জিব্রাঈল (আঃ) তাঁকে এ সংবাদ দিয়েছেন:
إِنَّ الْحَجَمَ أَفْضَلُ مَا تَدَاوَى بِهِ النَّاسُ
"মানুষ যে সকল জিনিস দ্বারা চিকিৎসা করে তন্মধ্যে উত্তম চিকিৎসা হচ্ছে শিংগা লাগান।" -মুসতাদরাক
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিংগা লাগানোর জন্য চন্দ্র মাসের সর্বাপেক্ষা উত্তম তারিখগুলি নির্ধারণ করে বলেছেন, চন্দ্র মাসের ১৭, ১৯ এবং ২১ তারিখে শিংগা লাগাবে। বুধবারকে শিংগা লাগানোর অনোপযোগী বলেছেন।
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাগল, কুষ্ঠ রোগী এবং মৃগী রোগের জন্য শিংগা লাগানোকে চিকিৎসা হিসাবে নির্বাচন করেছেন।
অনুরূপভাবে হযরত ইবনে উমর (রাযি) থেকে বর্ণিত: হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, শিংগা লাগালে জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং স্মৃতি শক্তি প্রখর হয়।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি) থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শিংগা লাগানোর ফলে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং পিঠ হালকা হয়।
আমি এ সকল হাদীস মুসতাদরাকে হাকিমের চিকিৎসা অধ্যায় থেকে বর্ণনা করেছি।
চীন দেশে শিংগা লাগানোর এ পদ্ধতিটি আকুপেংচার নামে পরিচিত। এখনও আমেরিকার হাসপাতালে এ পদ্ধতির চিকিৎসা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। পাকিস্তানে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসার প্রচলন আছে।।
📄 শিংগা লাগানোর স্থান
শিংগা লাগাবার উপকারিতা সম্পর্কে আপনারা পূর্বে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ লক্ষ্য করেছেন। এ চিকিৎসা পদ্ধতিটি কিছু পরিবর্তিত হয়ে এবং চীনা পদ্ধতিতে আকুপেংচার চিকিৎসা নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
এ পর্যায়ে শিংগা লাগাবার স্থান সম্পর্কিত কতিপয় হাদীস লক্ষ্য করুন।
١- عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَحْتَجِمُ فِي الْأَخْدَعَيْنِ وَالْكَاهِلِ -
(১) "হযরত আনাস (রাযি) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় কাঁধ এবং কাঁধের মাঝে (গ্রীবা বা ঘাড়ের উপর) শিংগা লাগিয়েছেন।" -বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ
٢ - كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَحْتَجِمُ ثَلَاثًا وَاحِدَةً عَلَى كَاهِلِهِ وَاثْنَتَيْنِ عَلَى الْأَخْدَعَيْنِ
(২) "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি শিংগা লাগিয়েছেন। একটি উভয় কাঁধের মাঝে (ঘাড়ের উপর) এবং বাকী দুইটি কাঁধের উপর।"
انه احتجم وهو محرم، في راسه
٣- أنه إِحْتَجَمَ فِي رَأْسِهِ لِصُدَاعَ كَانَ بِهِ
(৩) “হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহরাম অবস্থায় স্বীয় ব্যথার কারণে মাথা মুবারকে শিংগা লাগিয়েছেন।" -বুখারী, আবু দাউদ, নাসায়ী
٤ - احْتَجَمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُحْرِمٌ عَلَى ظَهْرِ الْقَدَمِ مِنْ وَجْعِهِ
(৪) "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহরাম বাঁধা অবস্থায় পায়ের পিঠের (গোছার) উপর শিংগা লাগিয়েছেন।" ইবনে খুজাইমা, ইবনে হাববান
- عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ احْتَجَمَ فِي وَرَكِهِ مِنْ وَنَى كَانَ بِهِ
"হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্লান্তি (বা অবসন্নতার) কারণে স্বীয় রান মোবারকে শিংগা লাগিয়েছেন।"-আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ
আমাদের দেশের প্রাচীন অভিজ্ঞ ডাক্তারগণও এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেন। তাদের মতে চিবুকের নীচে শিংগা লাগালে চেহারা, গলা এবং দাঁতের ব্যথা উপশম হয়। মাথা এবং হাতলিতে আরাম বোধ হয়।
পায়ের গোড়ালীতে শিংগা লাগানোর দ্বারা রান এবং পায়ের গোছার ব্যথা নিরাময় হয় এবং খোশ, পাচড়া জাতীয় চর্মরোগ ভাল হয়।
সীনার নীচে শিংগা লাগালে ফোঁড়া, পাচর, খুজলী, দুম্বল, চর্মরোগ, নুকরস, অর্শরোগ ও স্কুল বুদ্ধি দূর হয়।
📄 দাগ দেওয়া একটা অপছন্দনীয় চিকিৎসা
আদি যুগে লোহা গরম করে দাগ দিয়ে অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসা করা হতো। এখনও কোন কোন এলাকায় এ প্রথা প্রচলিত আছে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করাকে একেবারেই অপছন্দ করতেন।
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাযি) বর্ণনা করেনঃ
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْكَيِّ
"হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোহা দ্বারা দাগ লাগাতে নিষেধ করেছেন "-মুসতাদরাক
অপর এক সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ (রাযি) থেকে বর্ণিত আছে, একবার এক আনসারীর মারাত্মক অসুখ হলে তাকে দাগ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে এ ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করলে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পুনরায় অনুমতি চাওয়া হলেও হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ফিরিয়ে নিলেন, এভাবে তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবে পাথর দিয়ে দাগ লাগিয়ে দাও।
এতদ্ব্যতীত এ সম্পর্কে আরও দু'তিনটি রেওয়ায়াত বিদ্যমান রয়েছে যার মাধ্যমে দাগ লাগানো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অপছন্দনীয় ছিল তাই সুস্পষ্ট হয়েছে।
হযরত মুগিরা ইবনে শুবা (রাযি) থেকে বর্ণিত:
مَنْ : اكْتَوَى أَوْ اسْتَرْقَى فَقَدْ بَرِئَ مِنَ التَّوَكَّلِ .
"যে ব্যক্তি দাগ লাগাল অথবা ঝাড়ফুঁক দ্বারা চিকিৎসা করল সে (যেন) আল্লাহর উপর ভরসা করা ছেড়ে দিল।" -তিরমিযী
মূলতঃ গরম লোহার দ্বারা দাগ লাগালে যে কষ্ট ও ব্যথা হয় এটা ছেড়ে দিলেও এর দ্বারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চেহারা ও আকৃতির যে পরিবর্তন হয়, এটাই এই পদ্ধতি ক্ষতিকর প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।