📄 নেশাযুক্ত পানীয়
1- عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ نَزَلَ تَحْرِيمُ الْخَمْرِ وَهِيَ مِنْ خَمْسَةٍ مِنَ الْعِنَبِ، وَالتَّمْرِ وَالْعَسَلِ وَالْحِنْطَةِ وَالشَّعِيرِ وَالْخَمْرُ مَا خَامَرَ الْعَقَلَ .
১. "হযরত উমর (রাযি) বর্ণনা করেন, শরাব হারাম হওয়ার হুকুম নাযিল হয়। আর এটা পাঁচটি জিনিসের দ্বারা তৈরী হত অর্থাৎ আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম এবং জব থেকে এবং শরাব এমন জিনিস যদ্বারা আকল-বুদ্ধি ও জ্ঞান বিগড়ে যায়।" -বুখারী, মুসলিম
٢ - عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرُ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
২. "হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিটি নেশাযুক্ত জিনিসই শরাব এবং প্রতিটি নেশাযুক্ত জিনিসই হারাম। মুসলিম শরীফ
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا -٣ اسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيْلَهُ حَرَامٌ
৩. হযরত জাবের (রাযি) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যার অধিক পরিমাণে নেশা আনে তার অল্প পরিমাণও হারাম।
আরবী পরিভাষায় যে কোন পানীয় জিনিসকেই "শরাব" বলা হয়। তবে আমাদের পরিভাষায় "শরাব' শব্দটি নেশাকর বা উত্তেজক পানীয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আরবীতে যাকে "খমর" বলা হয় এর সর্ব প্রকারই হারাম।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত ইরশাদ দ্বারা এ বিষয়টিও প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র "শরাব" ই হারাম নয় বরং সর্বপ্রকার নেশাদার (মাদক) দ্রব্যও হারাম। তা পরিমাণে অধিক হোক অথবা অল্প হোক। মোটকথা, সর্বাবস্থায় মদের সর্বপ্রকার এবং যে কোন পরিমাণ হারাম। এগুলি ব্যবহার করায় শুধু ক্ষতিই ক্ষতি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোল্লিখিত ইরশাদাবলীর ভিত্তিতে মুসলিম চিকিৎসকগণের উপর সর্বপ্রথম যে দায়িত্বটি অর্পিত হয়, তা হল, তারা তাদের রোগীকে এমন কোন ঔষধ ব্যবহার করাবে না-যা হারাম, ক্ষতিকর বা নেশাকর। তবে যদি এ ধরনের ঔষধের বিকল্প কিছু না মিলে অথবা জীবন রক্ষার জন্য আর কোন উপায় না থাকে তবে ভিন্ন কথা।
দ্বিতীয় দায়িত্ব স্বয়ং মুসলমান রোগীর উপর এই বর্তায় যে, তারা এমন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবে না যারা হালাল, হারাম এবং পাক নাপাকীর কোন ধার ধারে না। তাছাড়া নিজ ইচ্ছায় বা পছন্দানুযায়ী কখনও এমন কোন ঔষধ গ্রহণ করবে না যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অবশ্য উপায় না থাকা এবং জীবন বাঁচাবার জন্য এরূপ করার মাসআলা ভিন্ন।
এ হাকীকতটি ভুলে গেলে চলবে না যে, মানুষ তো মানুষ, সাহাবায়ে কেরামগণ রোগাক্রান্ত পশুকে পর্যন্ত শরাব ব্যবহারের অনুমতি দেন নাই। হযরত নাফে (রাযি) বর্ণনা করেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) এর এক গোলাম তাঁর একটি উটকে ঔষধ হিসাবে শরাব পান করালে হযরত উমর (রাযি) তাকে খুব ধমক দিয়েছিলেন। হাদীসের সংকলক আবদুর রাজ্জাকের মতে শুধু এটা নয় বরং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগন শরাবের তলানীও কোন জানোয়ারের দেহে মালিশ করা সহ্য করেন নাই।
📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মলম ও পট্টি
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুহবত প্রাপ্ত পুরুষরাই নন বরং মহিলাগণও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সফল চিকিৎসা আঞ্জাম দেওয়ার ব্যাপারে পরিপূর্ণ যোগ্যতা রাখতেন। সাহাবায়ে কেরামগণ যুদ্ধক্ষেত্রে যখন বীরত্বের পরিচয় দিতেন তখন মহিলা সাহাবীগণ প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতেন। জিহাদের সময় গাজীদেরকে পানি পান করান ছাড়াও তাঁরা আহতদের ক্ষত স্থানে মলম ও পট্টি লাগাতেন। এ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা লক্ষ্য করুন।
(১) হযরত আনাস (রাযি) বর্ণনা করেন যে, ওহুদের যুদ্ধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে যখন লোকজন সরে গিয়েছিল তখন আমি দেখলাম হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযি) এবং উম্মে সুলাইম উভয়েই পাজামার পা উপরে উঠিয়ে পানির মশক পিঠে বহন করে তৃষ্ণার্তদের পানি পান করাচ্ছেন। পানি শেষ হয়ে গেল ফিরে যেতেন, আবার মশক ভর্তি করে নিয়ে এসে পিপাসিত গাজীদের মুখে ঢেলে দিতেন।
(২) হযরত রবী বিনতে মুআওয়ায (রাযি) বর্ণনা করেন:
كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَسْقِي وَنُدَاوِي الْجَرْحَى وَنَرُدُّ الْقَتْلَى إِلَى المدينة .
"আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণে করে আহতদের পানি পান করাতাম এবং তাদের ক্ষতস্থানে মলম ও পট্টি লাগাতাম আর শহীদদের মদীনায় নিয়ে যেতাম।" -বুখারী শরীফ কিতাবুল জিহাদ
(৩) ওহুদের যুদ্ধে দোজাহানের বাদশাহ রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জখমী হলে হযরত ফাতেমা (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আবূ হাযেম (রহঃ)-এর ভাষায় বিস্তারিত শুনুন:
كَانَتْ فَاطِمَةُ عَلَيْهَا السَّلَامُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَغْسِلُهُ وَعَلِيَّ يَسْكُبُ الْمَاءَ بِالْمُجَنِّ فَلَمَّا رَأَتْ فَاطِمَةُ أَنَّ الْمَاءَ لَا يَزِيدُ الدَّمَ إِلَّا كَثَرَةٌ أَخَذَتْ قِطْعَةٌ مِّنْ حَصِيرٍ فَاخْرَقَتْهَا وَ الْصَقَتْهَا فَاسْتَمْسَكَ الدَّمُ .
"আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেটী হযরত ফাতেমা (রাযিঃ) ক্ষত স্থান ধুচ্ছিলেন এবং হযরত আলী (রাযি) পানি ঢালছিলেন। হযরত ফাতিমা (রাযিঃ) যখন দেখলেন যে, পানিতে রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। তখন তিনি খেজুর পাতার তৈরী মাদুরের একটা টুকরা জ্বালিয়ে এর ছাই ক্ষতস্থানে চেপে ধরলেন। এতে রক্ত বন্ধ হয়ে গেল।" -বুখারী শরীফ, কিতাবুল মাগাযী
📄 সংযম ও তকদীর
عَنْ أَبِي خَزَامَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَاَيْتَ رَقَى نَسْتَرقِيهَا وَدَوَاء نَتَدَاوَى بِهِ وَتُقَاةٌ نَتَّقِيهَا هَلْ تَرُدُّ مِنْ قَدْرِ الله فَقَالَ هِيَ مِنْ قَدْرِ اللَّهِ
"হযরত আবূ খুযামা (রাযি) বর্ণনা করেন, আমি (একবার) আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যে সব ঝাড়ফুঁক করি এবং যে সকল ঔষধের দ্বারা চিকিৎসা করি এবং যে সকল বিষয়ে আমরা সতর্কতা অবলম্বন করি এগুলো কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদীরকে প্রতিহত করতে পারে? এ বিষয়ে আপনি কি বলেন? হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জওয়াব দিলেন, তোমরা যা কর স্বয়ং এগুলিও আল্লাহর নির্ধারিত তকদীরের অন্তর্ভুক্ত।" -ইবনে মাজাহ, তিরমিযী, হাকেম
হাদীস শরীফের বক্তব্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কোন ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। নেকদিল সাহাবীর এটাই জিজ্ঞাস্য ছিল যে, আমরা যে ঝাড়ফুঁক ও ঔষধ পত্র ব্যবহার করি এবং বিভিন্ন বিষয়ে বাচ-বিচার করে ও সতর্কতা অবলম্বন করে চলি, এগুলি কি আল্লাহর লিখিত তকদীরকে বদলে দিতে পারে? যদি কারো তকদীরে রোগ লেখা থাকে বা রোগের কারণে তার মৃত্যু লেখা থাকে, তাহলে আমাদের অবলম্বন করা পন্থাগুলি কি তা টলাতে পারবে? প্রায়শঃ আমাদের মনেও এ ধরনের বিভিন্ন সন্দেহ ও সংশয় এসে থাকে। চিন্তা করে দেখুন এ প্রসঙ্গে হুযুর (সাঃ) কত হিকমতপূর্ণ জওয়াব দিয়েছেন যে, তোমাদের এই দম-দরূদ, ঝাড়ফুঁক ঔষধ পত্র ও সতর্কতা এগুলির আল্লাহর হুকুমেরই অন্তর্ভুক্ত। কে জানে যে, দয়াময় আল্লাহ তা'আলা এ গুলির মাধ্যমেই কারো আরোগ্য লেখে রেখেছেন।
এমতাবস্থায় আমাদের জন্য একান্ত জরুরী হল, প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার ওসিলা ও সতর্কতা অবলম্বন করা এবং এগুলিকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে না করা। কেননা, এই ওসিলাসমূহ অবলম্বন করাও আল্লাহর নির্দেশ এবং হুযুর পাক (সাঃ)-এর সুন্নত। কোন ক্রমেই এগুলি তাওয়া'স্কুলের বিরোধী নয়।
📄 চোখের অসুখে খেজুর থেকে সাবধানতা
"হযরত উম্মে মুনযির বিনতে কায়েস আনসারিয়্যা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীতে তশরীফ নিয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে হযরত আলী (রাযিঃ) ও ছিলেন। হযরত আলী সবেমাত্র অসুখ থেকে উঠেছিলেন।। আমাদের বাড়ীতে খেজুরের বাধা টানানো ছিল। বর্ণনাকারীণী বলেন, হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে খেজুর খেতে আরম্ভ করেন। অতঃপর হযরত আলীও উঠে আসেন এবং খেজুর খেতে শুরু করেন। তখন হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, আলী! তুমি এখনো দুর্বল। তাই তুমি খেজুর খেয়ো না। একথা শুনে হযরত আলী (রাযিঃ) খেজুর খাওয়া বন্ধ করে দেন।" -মিশকাত, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী শরীফ
এ প্রসঙ্গে হযরত সুহাইব (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়াতও পাঠ করুন।
তিনি বলেন:
قَدِمْتُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبَيْنَ يَدَيْهِ خُبْرٌ وَتَمْرُ فَقَالَ ادْنُ فَكُلُ فَأَخَذْتُ تَمْراً فَأَ كَلْتُ فَقَالَ أَتَأْكُلُ تَمْراً وَبِكَ رَمَدٌ ...... (الى آخر)
“আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হই। তাঁর সম্মুখে তখন রুটি ও খেজুর রাখা ছিল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কাছে এসো, খেতে বস। আমি বসে খেজুর খেতে শুরু করি। অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তোমার চোখে অসুখ আর তুমি এই অবস্থায় খেজুর খাবে? -যাদুল মাআদ
খেজুরের উপকারীতা সম্পর্কে আমরা অন্য এক অধ্যায়ে আলোচনা করেছি যে, খেজুর অত্যন্ত শক্তিশালী ও রক্ত বর্ধক। বিভিন্ন অসুখ বিসুখে ও বিশেষ ঔষধে খেজুর ব্যবহার করা হয়। এতদসত্ত্বেও এর তাছীর ও প্রতিক্রিয়া গরম। তাই অসময়ে এবং অধিক পরিমাণে খেজুর খাওয়া ক্ষতিকর হয়। বিশেষতঃ যখন চোখে ব্যথা ও জ্বালা পোড়া থাকে তখন খেজুর খাওয়া থেকে বেঁচে থাকা খুবই জরুরী।