📄 নাপাক ঔষধ ব্যবহার করার নিষিদ্ধতা
নিম্নোক্ত হাদীসের রাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি) এবং হাদীসটি আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং মিশকাতুল মাসাবীহ-এর মত কিতাবে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الدَّوَاءِ الْخَبِيثِ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবীস বা নাপাক ঔষধ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।"
খবীস বা খারাপ কাকে বলে? এর বিশদ বর্ণনা ইমাম রাগিব ইস্পাহানী (রহঃ)-এর কিতাব "মুফরাদাতুল কুরআন" এ দেখুন।
তিনি লিখেছেনঃ "ঐ সকল জিনিস যা বাজে, ক্ষতিকর এবং নষ্ট হওয়ার কারণে খারাপ মনে হয় এবং ঐ সকল জিনিস যা অকেজো, যেমন লোহার ময়লা। মিথ্যা এবং অপছন্দনীয় কার্যকলাপও খবীসের অন্তর্ভুক্ত।"
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
يُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ .
"তাদের উপর অপবিত্র জিনিস হারাম করা হয়েছে।" (৭ পাঃ ১৫৭ পৃঃ)।
পবিত্র কুরআনের সূরা নিসায় "তাইয়্যেব"-এর বিপরীত "খবীস” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।" (৪ পাঃ ২পৃঃ)
মোটকথা খবীসের অর্থ হল, বাজে ক্ষতিকর, নষ্ট, খারাপ, অপছন্দনীয় এবং অপবিত্র। যাকে পবিত্র কালামে হারাম পর্যন্ত বলা হয়েছে। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাপাক কোন কিছু ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এটা সূচীবোধ, পবিত্রতা, এবং মানবীয় মর্যাদার পরিপন্থী। তবে অপারগতা বা মজবুরী থাকলে ভিন্ন কথা। কেননা মানুষ যখন একেবারেই নিরূপায় হয়ে যায় এবং তার জন্য অন্য কোন পথই খোলা না থাকে, এমতাবস্থায় জীবন বাঁচাবার জন্য শরীয়ত জীবন রক্ষা পরিমাণ যে কোন খাদ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। নতুবা সকল নাপাক জিনিসই নিষিদ্ধ।
📄 ঔষধ হিসাবে মদ
ঔষধ হিসাবে শরাব ব্যবহার সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ লক্ষ্যণীয়। সাধারণভাবে আমি প্রতিটি বিষয়বস্তুর উপর এক একটি হাদীস বর্ণনা করে ক্ষান্ত করেছি। কিন্তু এ বিষয়ের উপর আমি কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করছি, যাতে কোন দলীল বাকী না থাকে।
١ - عَنْ أَمْ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ مُسْكِرٍ وَ مُفْتِرٍ .
১. "হযরত উম্মে সালামা (রাযি) থেকে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেশাযুক্ত এবং মস্তিষ্কে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী কোন কিছু ব্যবহার থেকে নিষেধ করেছেন।" -আবূ দাউদ, মিশকাত,
এটা হল সাধারণ ব্যবহার সম্পর্কিত হুকুম। এখন ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করার বিশেষ হুকুম কি তা লক্ষ্য করুন।
হযরত ওয়াইল ইবনে হাযরামী (রাযিঃ) বর্ণনা করেন :
٢ - إِنَّ طَارِقَ بْنَ سُوَيْدٍ رَضِيَ سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْخَمْرِ . فَنَهَاهُ - فَقَالَ إِنَّمَا أَصْنَعُهَا لِلدَّوَاءِ قَالَ إِنَّ ذَلِكَ لَيْسَ بِدَوَاء لَكِنَّهُ دَاءٍ .
২. "তারেক ইবনে সুয়াইদ (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শরাব ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা ব্যবহার করতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, আমিতো এটা ঔষধ হিসাবে তৈরী করেছি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শরাব ঔষদ নয়। বরং এটা নিজেই রোগের কারণ। -মুসলিম, মিশকাতুল মাসাবীহ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ঔষধ হিসাবেই মদ ব্যবহার করতে নিষেধ করেন নাই বরং একথাও বলেছেন:
- وَ يُذْكَرُ عَنْهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّهُ قَالَ مَنْ تَدَاوَى بِالْخَمْرِ فَلَا شِفَاهُ الله
৩. "যে ব্যক্তি শরাবের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করে আল্লাহ তা'আলা তাকে আরোগ্য না করুন।" - ইবনে মাজাহ, যাদুল মাআদ
📄 নেশাযুক্ত পানীয়
1- عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ نَزَلَ تَحْرِيمُ الْخَمْرِ وَهِيَ مِنْ خَمْسَةٍ مِنَ الْعِنَبِ، وَالتَّمْرِ وَالْعَسَلِ وَالْحِنْطَةِ وَالشَّعِيرِ وَالْخَمْرُ مَا خَامَرَ الْعَقَلَ .
১. "হযরত উমর (রাযি) বর্ণনা করেন, শরাব হারাম হওয়ার হুকুম নাযিল হয়। আর এটা পাঁচটি জিনিসের দ্বারা তৈরী হত অর্থাৎ আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম এবং জব থেকে এবং শরাব এমন জিনিস যদ্বারা আকল-বুদ্ধি ও জ্ঞান বিগড়ে যায়।" -বুখারী, মুসলিম
٢ - عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرُ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
২. "হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিটি নেশাযুক্ত জিনিসই শরাব এবং প্রতিটি নেশাযুক্ত জিনিসই হারাম। মুসলিম শরীফ
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا -٣ اسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيْلَهُ حَرَامٌ
৩. হযরত জাবের (রাযি) থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যার অধিক পরিমাণে নেশা আনে তার অল্প পরিমাণও হারাম।
আরবী পরিভাষায় যে কোন পানীয় জিনিসকেই "শরাব" বলা হয়। তবে আমাদের পরিভাষায় "শরাব' শব্দটি নেশাকর বা উত্তেজক পানীয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আরবীতে যাকে "খমর" বলা হয় এর সর্ব প্রকারই হারাম।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত ইরশাদ দ্বারা এ বিষয়টিও প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র "শরাব" ই হারাম নয় বরং সর্বপ্রকার নেশাদার (মাদক) দ্রব্যও হারাম। তা পরিমাণে অধিক হোক অথবা অল্প হোক। মোটকথা, সর্বাবস্থায় মদের সর্বপ্রকার এবং যে কোন পরিমাণ হারাম। এগুলি ব্যবহার করায় শুধু ক্ষতিই ক্ষতি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোল্লিখিত ইরশাদাবলীর ভিত্তিতে মুসলিম চিকিৎসকগণের উপর সর্বপ্রথম যে দায়িত্বটি অর্পিত হয়, তা হল, তারা তাদের রোগীকে এমন কোন ঔষধ ব্যবহার করাবে না-যা হারাম, ক্ষতিকর বা নেশাকর। তবে যদি এ ধরনের ঔষধের বিকল্প কিছু না মিলে অথবা জীবন রক্ষার জন্য আর কোন উপায় না থাকে তবে ভিন্ন কথা।
দ্বিতীয় দায়িত্ব স্বয়ং মুসলমান রোগীর উপর এই বর্তায় যে, তারা এমন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবে না যারা হালাল, হারাম এবং পাক নাপাকীর কোন ধার ধারে না। তাছাড়া নিজ ইচ্ছায় বা পছন্দানুযায়ী কখনও এমন কোন ঔষধ গ্রহণ করবে না যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অবশ্য উপায় না থাকা এবং জীবন বাঁচাবার জন্য এরূপ করার মাসআলা ভিন্ন।
এ হাকীকতটি ভুলে গেলে চলবে না যে, মানুষ তো মানুষ, সাহাবায়ে কেরামগণ রোগাক্রান্ত পশুকে পর্যন্ত শরাব ব্যবহারের অনুমতি দেন নাই। হযরত নাফে (রাযি) বর্ণনা করেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি) এর এক গোলাম তাঁর একটি উটকে ঔষধ হিসাবে শরাব পান করালে হযরত উমর (রাযি) তাকে খুব ধমক দিয়েছিলেন। হাদীসের সংকলক আবদুর রাজ্জাকের মতে শুধু এটা নয় বরং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগন শরাবের তলানীও কোন জানোয়ারের দেহে মালিশ করা সহ্য করেন নাই।
📄 নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মলম ও পট্টি
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুহবত প্রাপ্ত পুরুষরাই নন বরং মহিলাগণও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সফল চিকিৎসা আঞ্জাম দেওয়ার ব্যাপারে পরিপূর্ণ যোগ্যতা রাখতেন। সাহাবায়ে কেরামগণ যুদ্ধক্ষেত্রে যখন বীরত্বের পরিচয় দিতেন তখন মহিলা সাহাবীগণ প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতেন। জিহাদের সময় গাজীদেরকে পানি পান করান ছাড়াও তাঁরা আহতদের ক্ষত স্থানে মলম ও পট্টি লাগাতেন। এ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা লক্ষ্য করুন।
(১) হযরত আনাস (রাযি) বর্ণনা করেন যে, ওহুদের যুদ্ধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে যখন লোকজন সরে গিয়েছিল তখন আমি দেখলাম হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযি) এবং উম্মে সুলাইম উভয়েই পাজামার পা উপরে উঠিয়ে পানির মশক পিঠে বহন করে তৃষ্ণার্তদের পানি পান করাচ্ছেন। পানি শেষ হয়ে গেল ফিরে যেতেন, আবার মশক ভর্তি করে নিয়ে এসে পিপাসিত গাজীদের মুখে ঢেলে দিতেন।
(২) হযরত রবী বিনতে মুআওয়ায (রাযি) বর্ণনা করেন:
كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَسْقِي وَنُدَاوِي الْجَرْحَى وَنَرُدُّ الْقَتْلَى إِلَى المدينة .
"আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণে করে আহতদের পানি পান করাতাম এবং তাদের ক্ষতস্থানে মলম ও পট্টি লাগাতাম আর শহীদদের মদীনায় নিয়ে যেতাম।" -বুখারী শরীফ কিতাবুল জিহাদ
(৩) ওহুদের যুদ্ধে দোজাহানের বাদশাহ রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জখমী হলে হযরত ফাতেমা (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আবূ হাযেম (রহঃ)-এর ভাষায় বিস্তারিত শুনুন:
كَانَتْ فَاطِمَةُ عَلَيْهَا السَّلَامُ بِنْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَغْسِلُهُ وَعَلِيَّ يَسْكُبُ الْمَاءَ بِالْمُجَنِّ فَلَمَّا رَأَتْ فَاطِمَةُ أَنَّ الْمَاءَ لَا يَزِيدُ الدَّمَ إِلَّا كَثَرَةٌ أَخَذَتْ قِطْعَةٌ مِّنْ حَصِيرٍ فَاخْرَقَتْهَا وَ الْصَقَتْهَا فَاسْتَمْسَكَ الدَّمُ .
"আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেটী হযরত ফাতেমা (রাযিঃ) ক্ষত স্থান ধুচ্ছিলেন এবং হযরত আলী (রাযি) পানি ঢালছিলেন। হযরত ফাতিমা (রাযিঃ) যখন দেখলেন যে, পানিতে রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। তখন তিনি খেজুর পাতার তৈরী মাদুরের একটা টুকরা জ্বালিয়ে এর ছাই ক্ষতস্থানে চেপে ধরলেন। এতে রক্ত বন্ধ হয়ে গেল।" -বুখারী শরীফ, কিতাবুল মাগাযী