📄 চিকিৎসা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত
হাফেয ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ "যাদুল মাআদ"-এ হযরত বিলাল ইবনে সাইয়্যাফ (রাযিঃ) এর নিম্নোক্ত বানী বর্ণনা করেছেন-
قَالَ دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى مَرِيضٍ يَعُودُهُ فَقَالَ أَرْسِلُوا إِلى طبيب فَقَالَ قَائِلٌ وَأَنتَ تَقُولُ ذَلِكَ ؟ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ نَعَمْ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَ جَلَّ لَمْ يَنْزِلْ دَاءَ إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ دَوَاء .
"তিনি বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম (সাঃ) জনৈক রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখার জন্যে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। তিনি রোগীর নিকট উপস্থিত ব্যক্তিদের বললেন ডাক্তার ডেকে আন। এ কথা শুনে উপস্থিত লোকদের একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও এরূপ বলছেন? হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেন নাই যার ঔষধ পাঠান নাই।"
"মুয়াত্তা ইমাম মালেক" কিতাবখানি হাদীসের প্রাচীনতম সংকলন গ্রন্থ। এই হাদীস গ্রন্থখানা মদীনার ইমাম হযরত ইমাম মালেক (রহঃ) সংকলন করেছেন। এই সংকলনের উক্ত হাদীস দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের নিকট যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর ঔষধ পত্র ব্যবহারের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন। এতে দুটি বিষয় প্রমাণিত হয়। প্রথমতঃ চিকিৎসা করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয় বরং এটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয়তঃ রোগমুক্তি ঔষধের নিজস্ব গুণ বা ক্ষমতা নয় বরং আল্লাহ তা'আলাই এতে রোগ মুক্তির বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে দেওয়াতে রোগ মুক্তি হয়। ঔষধ রোগ মুক্তির কারণ ও অছিলা তখনই হয় যখন আল্লাহ ইচ্ছা করেন। যদি তিনি ইচ্ছা না করেন কোন ঔষধই কার্যকরী হয় না। এমন কি চিকিৎসক সঠিক ঔষধ নির্বাচনই করতে পারে না। যেমন কোন এক বুযুর্গ বলেছেন :
چوں قضا آید طبیب ابله شود
"যখন মানুষের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে তখন অভিজ্ঞ ডাক্তার পর্যন্ত বোকা বনে যায়।"
📄 হাতুড়ে ডাক্তার
তিব্বে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অধ্যায়ে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন হাদীস বর্ণনা করছি যা স্বীয় গুরুত্ব ও বিষয়বস্তু অনুযায়ী বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ طَيِّبَ وَلَمْ يُعْلَمُ مِنْهُ الطَّبَ قَبْلَ ذَلِكَ فَهُوَ ضَامِنٌ.
"যদি এমন কোন ব্যক্তি চিকিৎসা করে যার চিকিৎসা বিষয়ে কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নাই, এমতাবস্থায় (যদি রোগীর কোন ক্ষতি হয়) রোগীর সমস্ত দায় দায়িত্ব উক্ত চিকিৎসকের উপর বর্তাবে।" -আবূ দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, দারেকুতনী, মুসতাদরাক
ঐ সকল চিকিৎসকগণের বিশেষভাবে এ হাদীসের মর্ম কি তা ভেবে দেখা উচিত যারা চিকিৎসা বিষয়ে অনভিজ্ঞ হয়েও মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে খেলা করে। তারা শুধু মাত্র আইনের দৃষ্টিতেই দোষী নয় বরং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষানীতি অনুযায়ীও তাদেরকে মহান আল্লাহর সামনে জবাবদেহী করতে হবে।
সনদবিহীন হাতুড়ে চিকিৎসক ছাড়াও সার্টিফিকেটধারী চিকিৎসকগণেরও (চাই সে হেকিম, কবিরাজ অথবা হোমিওপ্যাথিক বা এলোপ্যাথিক ডাক্তার হোক) এ বাস্তবতাকে ভুলে গেলে চলবে না যে, সর্ব অবস্থায়ই সে একজন মানুষ। আর কোন মানুষই সকল ঔষধ ও প্রত্যেক রোগ সম্পর্কে অভিজ্ঞ একথা দাবী করতে পারে না। সুতরাং যখন সে কোন রোগ নির্ণয়ে অক্ষম অথবা সঠিক ঔষধ নির্বাচন করতে না পারে তখন শুধু অনুমান এবং কিয়াস করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়। আর যদি তার জ্ঞাতসারে ভুল চিকিৎসায় রোগীর কোন সমস্যা দেখা দেয় তবে সে আল্লাহ এবং মানবজাতি উভয়ের সামনে জবাবদিহির জিম্মাদার হবে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদীস জানার পর হাতুড়ে চিকিৎসকদের আল্লাহর নিকট তওবা করে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করার পেশা ত্যাগ করা উচিত।
📄 হারাম জিনিসের মধ্যে রোগ মুক্তি নাই
হযরত আবু দারদা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ الدَّاءَ وَالدَّواءَ وَجَعَلَ لِكُلِّ دَاء دَوَاء فَتَدَاؤُوا وَلَا تَدَاؤُوا بِحَرَامِ .
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা রোগ এবং দাওয়া (ঔষধ) দুটিই পাঠিয়েছেন এবং প্রতিটি রোগেরই ঔষধ প্রেরণ করেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। তবে হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা করো না।" মিশকাত, সুনানে আবূ দাউদ
হারামের অর্থ হল ঐ জিনিস যা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে সকল জিনিস ব্যবহার করতে শরীয়তে নিষেধ করা হয়েছে তা হারাম। বিষয়টি খুবই সুস্পষ্ট যে, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলা কোন জিনিসকে যখন ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন তখন আল্লাহর কোন অনুগত বান্দার জন্য তা ঔষধ হিসাবে এবং চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা কিরূপে বৈধ হতে পারে? যেখানে সর্বোতভাবেই তা ব্যবহার নিষেধ সেক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থায় তা ব্যবহার করা কিরূপে জায়েয হবে?
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি) যিনি নওজোয়ান সাহাবীদের একজন এবং সকল জ্ঞানীগণ যার ইলমী শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন, তাঁর থেকে বর্ণিত:
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ أَنَّ اللَّهَ لَمْ يَجْعَلْ شِفَاءٌ كُمْ فِيمَا حُرِّمَ عَلَيْكُمْ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ঐ জিনিসের মধ্যে তোমাদের আরোগ্য রাখেন নাই যা তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে।" - যাদুল মাআদ, মুসতাদরাক
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোল্লেখিত ইরশাদ দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, হারাম বস্তুর মধ্যে আরোগ্য দানের কোন ক্ষমতা নাই এবং এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, হারাম কোন কিছুকে ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা নিষেধ।
📄 নাপাক ঔষধ ব্যবহার করার নিষিদ্ধতা
নিম্নোক্ত হাদীসের রাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি) এবং হাদীসটি আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং মিশকাতুল মাসাবীহ-এর মত কিতাবে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الدَّوَاءِ الْخَبِيثِ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবীস বা নাপাক ঔষধ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।"
খবীস বা খারাপ কাকে বলে? এর বিশদ বর্ণনা ইমাম রাগিব ইস্পাহানী (রহঃ)-এর কিতাব "মুফরাদাতুল কুরআন" এ দেখুন।
তিনি লিখেছেনঃ "ঐ সকল জিনিস যা বাজে, ক্ষতিকর এবং নষ্ট হওয়ার কারণে খারাপ মনে হয় এবং ঐ সকল জিনিস যা অকেজো, যেমন লোহার ময়লা। মিথ্যা এবং অপছন্দনীয় কার্যকলাপও খবীসের অন্তর্ভুক্ত।"
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
يُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ .
"তাদের উপর অপবিত্র জিনিস হারাম করা হয়েছে।" (৭ পাঃ ১৫৭ পৃঃ)।
পবিত্র কুরআনের সূরা নিসায় "তাইয়্যেব"-এর বিপরীত "খবীস” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।" (৪ পাঃ ২পৃঃ)
মোটকথা খবীসের অর্থ হল, বাজে ক্ষতিকর, নষ্ট, খারাপ, অপছন্দনীয় এবং অপবিত্র। যাকে পবিত্র কালামে হারাম পর্যন্ত বলা হয়েছে। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাপাক কোন কিছু ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। কারণ এটা সূচীবোধ, পবিত্রতা, এবং মানবীয় মর্যাদার পরিপন্থী। তবে অপারগতা বা মজবুরী থাকলে ভিন্ন কথা। কেননা মানুষ যখন একেবারেই নিরূপায় হয়ে যায় এবং তার জন্য অন্য কোন পথই খোলা না থাকে, এমতাবস্থায় জীবন বাঁচাবার জন্য শরীয়ত জীবন রক্ষা পরিমাণ যে কোন খাদ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। নতুবা সকল নাপাক জিনিসই নিষিদ্ধ।