📄 ঔষধ এবং ভাগ্য
ঔষধপত্র ও চিকিৎসা সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠে, ঔষধ কি খোদায়ী বিধান পরিবর্তন করতে পারে? রোগ-ব্যাধি যদি ভাগ্যের লিখন খোদায়ী বিধান হয়ে থাকে তবে চিকিৎসা করায় কি ফায়দা? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ প্রশ্নগুলি হয়েছিল। নিম্নে আমি উক্ত প্রশ্নোত্তর বর্ণনা করছি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচতোভাই, নওজোয়ান সাহাবী এবং অতুলনীয় জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাকদীরের মোকাবিলায় ঔষধ কি কোন কাজে আসতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তরে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
الدَّوَاء مِنَ الْقَدَرِ وَهُوَ يَنْفَعُ مَنْ يَشَاءُ بِمَا يَشَاءُ
"ঔষধপত্রও খোদায়ী তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত, তিনি যাকে চান এবং যে ভাবে চান তার উপকার হয়।" -জামে সগীর
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সংক্ষিপ্ত জবাবে কত বড় সমস্যাকে এ কথা বলে মীমাংসা করে দিলেন যে, তোমরা তাকদীরের অর্থই ভুল বুঝেছ। যদি রোগ খোদার বিধান হয়ে থাকে তবে চিকিৎসাও খোদার বিধান। আর যদি কষ্টভোগ ভাগ্যের লিখন হয়ে থাকে তবে রোগ নিরাময়ও ভাগ্য লিপির অংশ হবে, সুতরাং কোন অবস্থায়ই নিরাশ হওয়ার প্রশ্ন উঠে না।
আমাদের এ বিষয়টি স্মরণ রাখা উচিত যে, কোন ব্যক্তিরই তার ভাল হোক কি মন্দ হোক কোন প্রকার তাকদীরের ইলম (জ্ঞান) নাই। এ কারণে চেষ্টা এবং ইচ্ছা ভাল হওয়ারই করা চাই।
📄 চিকিৎসা আল্লাহর হুকুম
সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন:
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ لِكُلِّ دَاء دَوَاء فَإِذَا أَصِيبَ دَوَاء الدَّاء بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ .
"আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রত্যেক রোগের ঔষধ আছে সুতরাং যখন রোগ অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ করা হয় তখন আল্লাহর হুকুমে রোগী আরোগ্য লাভ করে।" যাদুল মাআদঃ খন্ডঃ ২
কোন রোগই দুরারোগ্য নয়। প্রত্যেক রোগেরই ঔষধ রয়েছে। তবে প্রথম শর্ত হল সঠিক রোগ নিরূপণ। অধিকাংশ চিকিৎসকগণ তো প্রথম পরীক্ষায়ই ব্যর্থ হয়ে যায়, কারণ রোগ হয় এক ধরনের আর তারা ব্যবস্থা অন্য কিছু করে বসে থাকে। অনেকে ক্ষেত্রে স্বয়ং রোগীই তার ব্যথার স্থানটি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসা হবে কিরূপে?
সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর দ্বিতীয় ধাপ হল রোগ অনুযায়ী সঠিক ঔষধ নির্বাচন। একই ধরনের রোগে ক্ষেত্র বিশেষে ঔষধ ভিন্ন হয়ে থাকে। মোটকথা ব্যক্তি ভেদে চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। একই ঔষধ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে প্রযোজ্য নয়।
মানবীয় স্বভাব-প্রকৃতির মহা মনস্তত্ত্ববিদ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, প্রত্যেক রোগের ঔষধতো রয়েছে তবে রোগ এবং রোগী অনুযায়ী ঔষধ নির্বাচন আল্লাহ তা'আলার মেহেরবানীতেই কেবল সম্ভব; আর ঔষধ কার্যকারী হওয়াও তাঁর হুকুমের উপর নির্ভরশীল। পরিপূর্ণ আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। এ রহস্য বুঝার জন্যে ইবনে মাজাহ শরীফে বর্ণিত নিম্নের হাদীসটি লক্ষ্য করুন।
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন মাথায় ব্যথা দেখা দিত তখন তিনি মেহদী লাগাতেন এবং বলতেন: এটা আল্লাহ তা'আলার হুকুমে উপকারী হবে।"
📄 কোন রোগই দুরারোগ্য নয়
এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করার জন্য আমি পূর্ববর্তী হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করছি।
হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
لِكُلِّ دَاء دَواءٌ فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءَ الدَّاءَ بَرِئَ بِإِذْنِ اللَّهِ
"প্রতিটি রোগের ঔষধ রয়েছে, যখন রোগ অনুযায়ী ঔষধ মিলে যায় তখন রোগ আল্লাহর ইচ্ছায় ভাল হয়ে যায়।" -মুসলিম শরীফ
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَا أَنزَلَ اللهُ مِنْ دَاءٍ إِلَّا أَنزَلَ لَهُ شِفَاءٌ .
"আল্লাহ তা'আলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেন নাই যার জন্যে তিনি প্রতিষেধক পাঠান নাই।" -বুখারী মুসলিম
উক্ত হাদীসে তিনটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে- (১) রোগ আল্লাহর পক্ষ হতে আসে। তাই এর নিন্দা করা উচিত নয়। রোগ আমাদের পরীক্ষা ও যাচাইয়ের জন্য অথবা উচ্চ মর্যাদাশীল করার জন্য এসে থাকে।
(২) কোন রোগই দূরারোগ্য নয়। একচ্ছত্র শেফাদানকারী মহান আল্লাহ প্রতিটি রোগের সঙ্গে প্রতিষেধক সৃষ্টি করেছেন। তাই কোন অবস্থায়ই চিকিৎসা বা ঔষধ পত্র বর্জন করা উচিত নয় এবং কোন ভাবেই আরোগ্য থেকে নিরাশ হওয়া জায়েয নয়।
(৩) প্রতিটি রোগের ঔষধ নির্দিষ্ট। তাই কোন ঔষধে কাজ না হতে থাকলে মনে করতে হবে রোগের সঠিক ঔষধ ব্যবহার হচ্ছে না। তখন একচ্ছত্র শেফাদানকারী আল্লাহর নিকট সঠিক ঔষধের জন্য তাওফীক চাবে এবং শেফার আশা করবে।
📄 শুধু মাত্র একটি রোগই দুরারোগ্য
হযরত উসামা ইবনে শরীক (রাযি) থেকে হযরত যিয়াদ ইবনে আলাকা (রাযি) বর্ণনা করেন যে, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। তখন কয়েকজন বেদুঈন লোক সেখানে আসে এবং প্রশ্ন করে যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা চিকিৎসা গ্রহণ না করলে কি আমাদের কোন গোনাহ হবে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- (إلى آخره)
نَعَمُ يَا عِبَادَ اللَّهِ تَدَاوَوا
"হে আল্লাহর বান্দাগণ তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা একটা ব্যাধি ব্যতীত এমন কোন ব্যাধি সৃষ্টি করেন নাই যার প্রতিষেধক সৃষ্টি করেন নাই এবং যা দুরারোগ্য। তারা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেটা কোন ব্যাধি? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্হিরম সেটা হল বার্ধক্য। - সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, হাকেম
উক্ত হাদীসে পাকের মাধ্যমে আমাদের সম্মুখে তিনটি রহস্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে -
(১) বার্ধক্য ব্যতীত প্রত্যেক রোগেরই উপযুক্ত চিকিৎসা রয়েছে। কোন রোগের ক্ষেত্রেই নিরাশ হওয়া জায়েয নাই।
(২) ঔষধ-পত্র ব্যবহার ও চিকিৎসা গ্রহণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। আর তা বর্জন করা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নতের সুস্পষ্ট লংঘন।
(৩) বৃদ্ধাবস্থায় যৌবন প্রাপ্তির স্বপ্ন দেখা নিরর্থক। এটা এমন জিনিস নয় যা চাইলেই এসে যাবে। তাই এ সময়ে প্রশান্ত চিত্তে বার্ধক্য গ্রহণ করে নেওয়া উচিত।
گقت پیغمبر که یزدان مجید * از پئی پر درد درمان آفرید
অর্থাৎ "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ পাক প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক সৃষ্টি করেছেন।"