📄 চিকিৎসা সম্পর্কিত দর্শন
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, একদা হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রশ্ন করলেন-
فَقَالَ يَا رَبِّ مِمَّنِ الدَاءُ
"হে আমার প্রতিপালক! রোগ কার পক্ষ হতে?" মহান রাব্বুল আলামীন বললেন, “আমার পক্ষ হতে। আবার তিনি প্রশ্ন করলেন, مِمَّنِ الدَّواء অর্থাৎ ঔষধ কার পক্ষ হতে? জবাব এল, ঔষধও আমার পক্ষ হতে।
উক্ত প্রশ্ন সমূহের পর হযরত ইবরাহীম (আঃ) আবার জিজ্ঞাসা করলেন, يَا رَبّ فَمَا بَالُ الطَّبِيب চিকিৎসকের প্রয়োজন কি? আল্লাহ তা'আলা উত্তর দিলেন, চিকিৎসকের মাধ্যমে ঔষধ পাঠান হয়।
আলোচিত সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের বর্ণনাকারী হলেন স্বয়ং আকায়ে নামদার হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর প্রশ্নকারী হলেন, মহান রবের সুবিখ্যাত নবী হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) এবং উত্তর দানকারী হলেন বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা। উপরোক্ত তিনটি প্রশ্ন ও জবাবের মধ্যে রোগ, নিরাময়, চিকিৎসা ও ঔষধ পত্র ইত্যাদির পরিপূর্ণ দর্শন এসে গেছে।
রোগ যেমন আল্লাহর পক্ষ হতে আসে তেমনি নিরাময়ের ঔষধও সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক মহান আল্লাহ তা'আলাই সৃষ্টি করেছেন।
বাকী চিকিৎসক!! তাদেরকে তো ঔষধ আল্লাহই চিনিয়ে দেন।
আমাদের বুযুর্গগণ তাদের নিজ নিজ ব্যবস্থা পত্রের উপর هُوَ الشَّافِی )হুয়াশ শাফী) অর্থাৎ আল্লাহই আরোগ্য দানকারী এজন্যে লিখতেন, যাতে করে ডাক্তার এবং রোগী উভয়েরই স্মরণ থাকে যে আল্লাহ তা'আলাই আরোগ্য দানকারী। চিকিৎসক এবং ঔষধ আরোগ্যের অছিলা মাত্র। তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) এবং চিকিৎসা সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) নবুওয়াতী যুগের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করেন। আমি তার বর্ণিত হাদীসের তরজমা নকল করছি।
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুইজন চিকিৎসককে ডেকে পাঠালেন, খুব সম্ভব এরা দীর্ঘকাল মদীনায় অবস্থানরত ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক রোগীকে চিকিৎসা করার জন্য তাদের নির্দেশ দিলে চিকিৎসকদ্বয় বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জাহেলিয়াতের যুগে আমরা চিকিৎসা ও হিলা-বাহনা সবই করতাম, তবে ইসলাম ধর্মে এসে একমাত্র (আল্লাহর উপর) তাওয়াক্কুলই করে চলছি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
عَالِجَاهُ فَإِنَّ الَّذِي أَنزَلَ الدَّاءَ أَنْزَلَ الدَّواءَ ثُمَّ جَعَلَ فِيهِ شِفَاءٌ - فَقَالَ فَعَالَجَاهُ فَبَرَاً
তোমরা তার চিকিৎসা কর। যে মহা প্রভু রোগ পাঠিয়েছেন তিনি ঔষধও প্রেরণ করেছেন এবং তার মধ্যে নিরাময়ও রেখেছেন। হাদীসের রাবী বর্ণনা করেন যে, চিকিৎসকদ্বয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইরশাদ অনুযায়ী চিকিৎসা করায় রোগী আরোগ্য লাভ করে। -যাদুল মাআদ
উক্ত হাদীসের দ্বারা বুঝা যায় চিকিৎসা কখনও তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যখন এক সাহাবী আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি ঔষধ পত্র (চিকিৎসা) গ্রহণ করব? চিকিৎসক কি খোদার বিধান রোগ ফিরাতে পারে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
إِنَّهُ مِنْ قَدْرِ اللَّهِ
"চিকিৎসাও খোদায়ী বিধান।" মুসতাদরাকে হাকেম
📄 ঔষধ এবং ভাগ্য
ঔষধপত্র ও চিকিৎসা সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠে, ঔষধ কি খোদায়ী বিধান পরিবর্তন করতে পারে? রোগ-ব্যাধি যদি ভাগ্যের লিখন খোদায়ী বিধান হয়ে থাকে তবে চিকিৎসা করায় কি ফায়দা? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ প্রশ্নগুলি হয়েছিল। নিম্নে আমি উক্ত প্রশ্নোত্তর বর্ণনা করছি।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচতোভাই, নওজোয়ান সাহাবী এবং অতুলনীয় জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাকদীরের মোকাবিলায় ঔষধ কি কোন কাজে আসতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তরে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
الدَّوَاء مِنَ الْقَدَرِ وَهُوَ يَنْفَعُ مَنْ يَشَاءُ بِمَا يَشَاءُ
"ঔষধপত্রও খোদায়ী তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত, তিনি যাকে চান এবং যে ভাবে চান তার উপকার হয়।" -জামে সগীর
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সংক্ষিপ্ত জবাবে কত বড় সমস্যাকে এ কথা বলে মীমাংসা করে দিলেন যে, তোমরা তাকদীরের অর্থই ভুল বুঝেছ। যদি রোগ খোদার বিধান হয়ে থাকে তবে চিকিৎসাও খোদার বিধান। আর যদি কষ্টভোগ ভাগ্যের লিখন হয়ে থাকে তবে রোগ নিরাময়ও ভাগ্য লিপির অংশ হবে, সুতরাং কোন অবস্থায়ই নিরাশ হওয়ার প্রশ্ন উঠে না।
আমাদের এ বিষয়টি স্মরণ রাখা উচিত যে, কোন ব্যক্তিরই তার ভাল হোক কি মন্দ হোক কোন প্রকার তাকদীরের ইলম (জ্ঞান) নাই। এ কারণে চেষ্টা এবং ইচ্ছা ভাল হওয়ারই করা চাই।
📄 চিকিৎসা আল্লাহর হুকুম
সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন:
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ لِكُلِّ دَاء دَوَاء فَإِذَا أَصِيبَ دَوَاء الدَّاء بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ .
"আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রত্যেক রোগের ঔষধ আছে সুতরাং যখন রোগ অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ করা হয় তখন আল্লাহর হুকুমে রোগী আরোগ্য লাভ করে।" যাদুল মাআদঃ খন্ডঃ ২
কোন রোগই দুরারোগ্য নয়। প্রত্যেক রোগেরই ঔষধ রয়েছে। তবে প্রথম শর্ত হল সঠিক রোগ নিরূপণ। অধিকাংশ চিকিৎসকগণ তো প্রথম পরীক্ষায়ই ব্যর্থ হয়ে যায়, কারণ রোগ হয় এক ধরনের আর তারা ব্যবস্থা অন্য কিছু করে বসে থাকে। অনেকে ক্ষেত্রে স্বয়ং রোগীই তার ব্যথার স্থানটি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসা হবে কিরূপে?
সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর দ্বিতীয় ধাপ হল রোগ অনুযায়ী সঠিক ঔষধ নির্বাচন। একই ধরনের রোগে ক্ষেত্র বিশেষে ঔষধ ভিন্ন হয়ে থাকে। মোটকথা ব্যক্তি ভেদে চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। একই ঔষধ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে প্রযোজ্য নয়।
মানবীয় স্বভাব-প্রকৃতির মহা মনস্তত্ত্ববিদ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, প্রত্যেক রোগের ঔষধতো রয়েছে তবে রোগ এবং রোগী অনুযায়ী ঔষধ নির্বাচন আল্লাহ তা'আলার মেহেরবানীতেই কেবল সম্ভব; আর ঔষধ কার্যকারী হওয়াও তাঁর হুকুমের উপর নির্ভরশীল। পরিপূর্ণ আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। এ রহস্য বুঝার জন্যে ইবনে মাজাহ শরীফে বর্ণিত নিম্নের হাদীসটি লক্ষ্য করুন।
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন মাথায় ব্যথা দেখা দিত তখন তিনি মেহদী লাগাতেন এবং বলতেন: এটা আল্লাহ তা'আলার হুকুমে উপকারী হবে।"
📄 কোন রোগই দুরারোগ্য নয়
এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করার জন্য আমি পূর্ববর্তী হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করছি।
হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
لِكُلِّ دَاء دَواءٌ فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءَ الدَّاءَ بَرِئَ بِإِذْنِ اللَّهِ
"প্রতিটি রোগের ঔষধ রয়েছে, যখন রোগ অনুযায়ী ঔষধ মিলে যায় তখন রোগ আল্লাহর ইচ্ছায় ভাল হয়ে যায়।" -মুসলিম শরীফ
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَا أَنزَلَ اللهُ مِنْ دَاءٍ إِلَّا أَنزَلَ لَهُ شِفَاءٌ .
"আল্লাহ তা'আলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেন নাই যার জন্যে তিনি প্রতিষেধক পাঠান নাই।" -বুখারী মুসলিম
উক্ত হাদীসে তিনটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে- (১) রোগ আল্লাহর পক্ষ হতে আসে। তাই এর নিন্দা করা উচিত নয়। রোগ আমাদের পরীক্ষা ও যাচাইয়ের জন্য অথবা উচ্চ মর্যাদাশীল করার জন্য এসে থাকে।
(২) কোন রোগই দূরারোগ্য নয়। একচ্ছত্র শেফাদানকারী মহান আল্লাহ প্রতিটি রোগের সঙ্গে প্রতিষেধক সৃষ্টি করেছেন। তাই কোন অবস্থায়ই চিকিৎসা বা ঔষধ পত্র বর্জন করা উচিত নয় এবং কোন ভাবেই আরোগ্য থেকে নিরাশ হওয়া জায়েয নয়।
(৩) প্রতিটি রোগের ঔষধ নির্দিষ্ট। তাই কোন ঔষধে কাজ না হতে থাকলে মনে করতে হবে রোগের সঠিক ঔষধ ব্যবহার হচ্ছে না। তখন একচ্ছত্র শেফাদানকারী আল্লাহর নিকট সঠিক ঔষধের জন্য তাওফীক চাবে এবং শেফার আশা করবে।