📄 হাঁচি এবং অশুভ লক্ষণ
সাধারণভাবে হাঁচি দেওয়াকে মজলিসের আদবের খেলাপ মনে করা হয়। কল্পনা ও সন্দেহ পুঁজক হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য কল্পনা পূজারী জাতিও হাঁচিকে একটা বড় অশুভ লক্ষণ মনে করে থাকে। সম্ভবতঃ এ ধরনের বিজাতীয় সংশ্রবের ফলেই কিছু কিছু মুসলমানও এমন ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে। আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ভেতরেও এ ধরনের কিছু ভ্রান্ত পরিভাষা অনুপ্রবেশ করেছে।
স্মরণ রাখবেন! হাঁচির মধ্যে কোন প্রকার অশুভ লক্ষণ নাই। বেশীর থেকে বেশী এটা একটা রোগ বা রোগের লক্ষণ। আমাদের নবী এবং খোদার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাঁচির জন্য আল্লাহর হামদ, প্রশংসা, শুকরিয়া ও অভিনন্দনকে ওয়াজিব বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, "কোন ব্যক্তির হাঁচি এলে সে আলহামদুলিল্লাহ বলবে। আর হাঁচি শ্রবণকারী يُرْحَمُكَ الله বলবে অর্থাৎ তোমার উপর আল্লাহ রহমত বর্ষন করুন। অতঃপর দোয়ার জবাবে হাঁচি দাতা বলবে- يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ এবং তোমাদের শান (অবস্থা) ঠিক রাখুন।"-বুখারী, মুসলিম
একটু চিন্তা করে দেখুন, হাঁচি কোন অভিশাপ নয় এবং কোন কুলক্ষণও নয় বরং আল্লাহর রহমত অথবা তাঁর রহমতের অছিলা। এ কারণে হাঁচিদাতার উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব। আর হাঁচিদাতার সঙ্গে একত্রে উপবেশনকারী এবং শ্রবণকারীদের উপর হাঁচিদাতার জন্য দুআ করা সুন্নত। যার শুকরিয়া হিসাবে হাঁচিদাতা পুনরায় তাদের জন্য হেদায়াত, সুস্থতা ও নিরাপত্তার দুআ করে। এভাবে সমস্ত মজলিসটি সওয়াব, মঙ্গল ও বকরতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তবে শর্ত হলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নত মুতাবিক আমল হতে হবে।
📄 হাই তোলা শয়তানের কাজ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ التَنَا ثَوْبُ مِنَ الشَّيْطَانِ فَإِذَا تَثَائَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَرُدَّهُ مَا اسْتَطَاعَ فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا قَالَ هَا ضَحِكَ الشَّيْطَانُ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, হাই তোলা শয়তান থেকে উৎপত্তি হয়। সুতরাং তোমাদের কারো হাই এলে যথা সম্ভব এটাকে ফিরিয়ে রাখবে। কেননা তোমাদের কেউ যখন (হাই তোলার সময়) "হা" করে তখন শয়তান হেসে দেয়।"-বুখারী শরীফ
হাই সাধারনত: ক্লান্তি এবং খারাপ কল্পনা জল্পনার কারণে এসে থাকে বা যখন ঘুমের প্রভাব বৃদ্ধি পায় তখন বার বার হাই আসতে থাকে। অনুরূপভাবে অনিচ্ছা ও অনাগ্রহও হাই আসার কারণ হয়। উদাহরণ স্বরূপ কোথাও কোন বক্তৃতা ও ওয়াজ চলছে আর কোন শ্রবণকারী ওয়াজ শুনতে শুনতে বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তখন তার হাই আসা শুরু হয়ে যাবে। হাই তোলার দ্বারা মানুষের চেহারার অবস্থা খুবই বিকৃত হয়ে পড়ে, সুশ্রী মানুষেরও আকৃতি বিগড়ে যায়। দেখনে ওয়ালাদের নিকট এ অবস্থাটি খুবই বিশ্রী মনে হয়। ক্লাশ চলাকালীন অবস্থায় ছাত্রদের হাই এবং বক্তৃতা ও ওয়াজ শ্রবণ অবস্থায় শ্রোতাদের হাই শিক্ষক ও ওয়াজকারীর জন্য অত্যন্ত মনো বেদনার কারণ হয়। মেহমান হাই ছাড়তে লাগলে মেজবানের নিকট এটা অসহ্য মনে হয়।
স্বভাবগত মনোচিকিৎসক হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হাই শয়তানের কাজ, যথাসম্ভব এটাকে ফিরিয়ে রাখ। যদি অনিচ্ছাকৃত হাই এসে যায় তবে অন্ততপক্ষে মুখ অতিরিক্ত ফাঁক করা থেকে বিরত থাক এবং হা শব্দটির আওয়ায বের করো না।
📄 যাদু মন্ত্র ও দুআ
ঝাড়-ফুঁক, দরূদ, অযীফাহ এবং দুআ সম্পর্কে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় হাদীস বর্ণনা করছি। তবে (নাউজুবিল্লাহ) এগুলির মধ্যে কোন শিরক বেহুদা বা নিরর্থক কিছু নাই। পক্ষান্তরে যাদু, মন্ত্র ইত্যাদির মধ্যে সব ধরনের খারাবী রয়েছে যা কখনও ইসলাম স্বীকৃতি দেয় নাই। নিম্নে আমি আবূ দাউদ শরীফ থেকে একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাকৃত হাদীসের তরজমা নকল করছি যা মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবেও রয়েছে।
و في عنى خطأ فَقَالَ مَا هَذَا ؟ إِنَّ عَبْدَ اللهِ رَضِى فِي انِ عَبْدِ اللهِ শিفاء لا يغادر سقما শব্দের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। পুরো হাদীসের অর্থ নিম্নরূপঃ
"হযরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) এর স্ত্রী হযরত যয়নব (রাযিঃ) বলেন, আমার স্বামী হযরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) আমার গলায় সামান্য একটু সুতা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি? আমি উত্তরে বললাম এক ব্যক্তি ঝাড়-ফুঁক • দিয়ে আমাকে এটা গলায় বাঁধার জন্যে দিয়েছে। এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) ওটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন- “হে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের গৃহিনী! তোমরা শিরিকের মুখাপেক্ষী হইও না। কেননা আমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি- ঝাড়-ফুঁক, পৈতা এবং যাদু শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
হযরত যয়নব (রাযিঃ) বলেন, আমি আমার স্বামীকে বললাম, আমার চোখে অসুখ হলে অমুক ইহুদীর কাছে গিয়ে ঝাড়-ফুঁক করাতাম এবং তার মাধ্যমেই আমি সুস্থ হয়েছি। এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন? এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বললেন, এটা একটা শয়তানী আমল যা ঐ ব্যক্তি তার নিজের হাতে করত। যখন মন্তরপড়া শেষ হত তখন শয়তান দূর হয়ে যেত। এ ক্ষেত্রে তোমাদের জন্যে ঐ শব্দগুলিই পাঠ করা যথেষ্ট ছিল যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ তাহল-
اذهِب الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ - وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي - لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَؤُكَ - شِفَاءٌ لَّا يُغَادِرُ سَقَمًا .
“হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করে দিন। হে রোগ আরোগ্যকারী! শেফা দান করুন। আপনি ব্যতীত আর কেউ আরোগ্যদানকারী নাই। আপনার শেফা এমন যার পর আর কোন রোগ বাকী থাকে না।"
📄 প্লেগ আক্রান্ত এলাকা
হযরত ওসমান (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ করেছেনঃ
الطَّاعُونُ رِجْزُ أَوْ عَذَابٌ ارْسِلَ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَوْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ فَإِذَا سمعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلَا تَقْدُمُوا عَلَيْهِ وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضِ وَانتُم بِهَا فَلَا تَخْرُجُوا مِنْهَا فَرَارًا مِنْهُ .
"প্লেগ এক প্রকার নিকৃষ্ট কষ্টদায়ক রোগ বা আযাব যা বনী ইসরাইল অথবা তোমাদের পূর্ববর্তী কোন সম্প্রদায়ের উপর পাঠান হয়েছিল। যখন জানতে পারবে যে, ওমুক জায়গায় প্লেগ রোগ ছড়িয়ে গেছে তবে সেখানে যাবে না। আর তোমরা যেখানে আছ সেখানে যদি প্লেগ এসে থাকে তবে ঐ স্থান থেকে পলায়ন করে যাবে না।" -বুখারী ও মুসলিম
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্লেগকে এক প্রকার জঘন্য রোগ বা আযাব বলে ব্যাখ্যা করে সকল প্রকার সন্দেহ নিরসন করে দিয়েছেন। কতইনা জ্ঞানগর্ভ ইরশাদ যে, যেখানে এহেন কষ্টদায়ক রোগটি ছড়িয়ে আছে সেখানে নিজে গিয়ে "আ-বয়েল আমারে খা" প্রবাদ বাক্যটির মত নিজ হাতে রোগকে দাওয়াত দিও না। আর যদি তোমাদের নিজ এলাকায় এ রোগটি ছড়িয়ে পড়ে থাকে তবে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে উক্ত সংক্রামক ব্যাধিকে অন্য এলাকায় নিয়ে যেও না। উদ্দেশ্য এই যে, এ ধরনের ব্যাধি থেকে নিজে দূরে থাক এবং জেনে শুনে নিজেকে নিজে ধ্বংসের মধ্যে ফেল না। তবে যদি নিজে এ ব্যাধি থেকে বাঁচতে না পার তবে কমপক্ষে অপরকে বাঁচাতে চেষ্টা কর। কেননা যেভাবে ব্যাধি থেকে নিজেকে নিজে রক্ষা করা প্রয়োজন তদ্রূপ অন্যকে রক্ষা করাও প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। অতএব, এটা কিভাবে সম্ভব যে, কোন মুসলমান নিজের কারণে অন্যকে বিপদে ফেলবে।