📄 রোগীর দুআ
অনেক লোক রোগ ব্যাধিকে একটা আযাব মনে করে থাকে। তারা রোগকে আল্লাহ জাল্লা-শানুহুর নারাযী ও অসন্তুষের কারণ মনে করে একটা ভুল ধারণার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ অনেক সময়েই বান্দার পরীক্ষার জন্যে রোগ হয়ে থাকে। আর পরীক্ষায় সফলকাম হওয়ার পর তার নেকী বেড়ে যায় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তাই কোন রোগীর জন্যেই আল্লাহর প্রতি রাগান্বিত হয়ে আল্লাহর ক্রোধে গ্রেফতার হওয়া উচিত নয়। রোগের পরিণতি تو মঙ্গলজনকও হতে পারে। কারণ একজন ধৈর্য্যশীল, শোকরগুজার এবং খোদানির্ভর রোগীর প্রতি আল্লাহর রহমত বাড়তে থাকে, রোগ তার জন্য রহমত স্বরূপ হয়। রোগের কারণে সে আল্লাহর প্রতি আরও অধিক নিবিষ্ট হয়। এভাবে সে দুআ কবুল হওয়ার দর্জা হাসিল করে নেয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا دَخَلْتَ عَلَى الْمَرِيضِ فَمَرَهُ يَدْعُولَكَ فَإِنَّ دَعَاءَهُ كَدُعَاءِ الْمَلَئِكَةِ
"তুমি যখন রোগীর নিকট যাবে তখন তাকে তোমার জন্য দুআ করতে বলবে। নিশ্চয়ই তার (রোগীর) দুআ ফিরিশতাদের দুআর মত। -ইবনে মাজাহ
দুআ সম্পর্কিত এ বিষয়টা কতইনা ব্যাপক যে, মানুষ যদিও নিজের জন্য নিজ প্রয়োজনে দুআ করে তথাপি সে প্রত্যেক নেক দুআর একটা করে সওয়াব পায়। এমনকি কারো নিকট দুআর দরখাস্ত করলেও তা নেকীর মধ্যে শামিল হয়। কারণ এটাও তাকে নেকের প্রতি দাওয়াত দেয়।
কোন রোগীর নিকট বিশেষভাবে কোন দুআ চাওয়া এ কারণেও বরকতের বিষয় হয়ে থাকে যে, সে সর্বদা কষ্টভোগ করতে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি তার মনোযোগ অপেক্ষাকৃত বেশী হয়। সে সদা সর্বদা আল্লাহর করুণার প্রার্থী হয়ে থাকে।
📄 ছুত-ছাত অর্থাৎ সংক্রমণ, স্পর্শ ইত্যাদি
ছুত-ছাত সম্পর্কে আমাদের দেশে দুই বিপরীত মত দেখা যায়। এক দল কোন প্রকার ছুত-ছাত বা সংক্রামক ব্যাধিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের মতে এমন কোন রোগ নাই যা একজন থেকে অন্যের মধ্যে ছড়াতে পারে। তারা ছুত-ছাতকে মনগড়া খেয়াল মনে করে এবং ঈমানের দুর্বলতা অথবা কমপক্ষে খোদা প্রদত্ত তাকদীর থেকে দূরে চলে গেছে বলে অহেতুক মন্তব্য করে থাকে। বাস্তবে কতিপয় সংক্রামক ব্যাধি রয়েছে। যেমন কফ, ইনফ্লুয়েনজা, বসন্তরোগ, কলেরা, তাউন, ইত্যাদি। এগুলি একজন রুগ্ন ব্যক্তি থেকে অপর সুস্থ্য ব্যক্তির উপর এমন প্রভাব ফেলে যেমন আগুন, পানি, ঠান্ডা ও গরম শরীরের উপর স্বীয় বৈশিষ্ট্যগত প্রভাব বিস্তার করে। তবে এগুলি সবই আল্লাহর হুকুমে হয়ে থাকে।
অন্য একদল ছুত-ছাত সম্পর্কে কল্পিতভাবে ভয়ের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা সুন্নত তরীকায়ও রোগীর সাথে মিশে না। এক বর্তনে একত্রে খানা খায় না। শরিকানা গ্লাস ব্যবহার করে না। রুমাল এবং তোয়ালে একে অপরেরটি ব্যবহার করে না। ছুত লাগার চিন্তা তাদের উপর এ পরিমাণ চেপে বসেছে যে প্রতিটি শরীকানা বিষয় তাদের নিকট স্বাস্থ্য রক্ষানীতির পরিপন্থী। এ সকল ব্যক্তি এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বনকে ঈমান ও একীনের উপর প্রধান্য দেয়। এ সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কি, নিম্নোক্ত হাদীসের আলোকে লক্ষ্য করুন।
হযরত ইবনে আতিয়া (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
لَا عَدْوَى وَلَا هَامَ، وَلَا صَفَرَ، وَلَا يَحِلُّ الْمُقْرِضُ عَلَى الْمُصِحِ وَلْيَحْلِلِ الْمُصْحَ حَيْثُ شَاءَ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا ذَلِكَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ إِنَّهُ أَذًى
"ছুত-ছাত, পেঁচা ও মৃত আত্মার শুগন (ভবিষ্যতে ভাল মন্দের লক্ষণ) কোন বিষয় নয়। আর সফর মাসেও অশুভ কোন কিছু নাই। অবশ্য রুগ্ন পশু সুস্থ পশুর কাছে নিয়ে যাবে না। সুস্থ জানোয়ারকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যাও। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসুল। এর কারণ কি? ইরশাদ করলেন, এটা ঘৃণা অথবা কষ্টের বিষয়।" -মুয়াত্তা ইমাম মালেক, কিতাবুল জামে
📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাঁচি দেওয়ার পদ্ধতি
শায়েখ আবূ হাইয়্যান ইসপাহানী (রহঃ) রচিত আখলাকুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমি তিনটি হাদীস বর্ণনা করছি। তিনটি হাদীসেরই রাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ)। তিনি বর্ণনা করেনঃ
١ - كَانَ إِذَا عَطَسَ غَضَّ بِهَا صُوتَهُ وَأَمْسَكَ عَلَى وَجْه .
- كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا عَطَسَ وَضَعَ يَدَهُ أَوْ تُوبَهُ عَلَى فَمِهِ وَخَفَضَ بِهَا صُوتَه .
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا عَطَسَ عَطَى وَجْهَهُ بِنُوبِهِ وَوَضَعَ كَفَّيْهِ عَلَى حَاجِبَيْهِ .
(১) "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাঁচি দেওয়ার সময় নিজ আওয়াজকে নীচু করে নিতেন এবং মুখমন্ডলকে ঢেকে রাখতেন।"
(২) "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাঁচি দিতেন তখন তার হাত অথবা কাপড় মুখের উপর রাখতেন এবং আওয়াজ ছোট করে নিতেন।"
(৩) "নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম হাঁচি এলে স্বীয় চেহারা মোবারককে তাঁর কাপড় দ্বারা ঢেকে নিতেন এবং তাঁর দুই হাত কপাল মোবারকের উপর রাখতেন।" -আল বাইয়্যেনাতঃ করাচী, জিলহজ্ব ১৩৯০ হিঃ
আল্লাহ! আল্লাহ! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাব কতই না পবিত্রতা ও সূক্ষ্মদর্শীতায় ভরপুর ছিল এবং অপরের অসুবিধা ও কষ্টের ব্যাপারে তিনি কতইনা সতর্ক ছিলেন।
📄 হাঁচি এবং অশুভ লক্ষণ
সাধারণভাবে হাঁচি দেওয়াকে মজলিসের আদবের খেলাপ মনে করা হয়। কল্পনা ও সন্দেহ পুঁজক হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য কল্পনা পূজারী জাতিও হাঁচিকে একটা বড় অশুভ লক্ষণ মনে করে থাকে। সম্ভবতঃ এ ধরনের বিজাতীয় সংশ্রবের ফলেই কিছু কিছু মুসলমানও এমন ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে। আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ভেতরেও এ ধরনের কিছু ভ্রান্ত পরিভাষা অনুপ্রবেশ করেছে।
স্মরণ রাখবেন! হাঁচির মধ্যে কোন প্রকার অশুভ লক্ষণ নাই। বেশীর থেকে বেশী এটা একটা রোগ বা রোগের লক্ষণ। আমাদের নবী এবং খোদার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাঁচির জন্য আল্লাহর হামদ, প্রশংসা, শুকরিয়া ও অভিনন্দনকে ওয়াজিব বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, "কোন ব্যক্তির হাঁচি এলে সে আলহামদুলিল্লাহ বলবে। আর হাঁচি শ্রবণকারী يُرْحَمُكَ الله বলবে অর্থাৎ তোমার উপর আল্লাহ রহমত বর্ষন করুন। অতঃপর দোয়ার জবাবে হাঁচি দাতা বলবে- يَهْدِيكُمُ اللهُ وَيُصْلِحُ بَالَكُمْ এবং তোমাদের শান (অবস্থা) ঠিক রাখুন।"-বুখারী, মুসলিম
একটু চিন্তা করে দেখুন, হাঁচি কোন অভিশাপ নয় এবং কোন কুলক্ষণও নয় বরং আল্লাহর রহমত অথবা তাঁর রহমতের অছিলা। এ কারণে হাঁচিদাতার উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব। আর হাঁচিদাতার সঙ্গে একত্রে উপবেশনকারী এবং শ্রবণকারীদের উপর হাঁচিদাতার জন্য দুআ করা সুন্নত। যার শুকরিয়া হিসাবে হাঁচিদাতা পুনরায় তাদের জন্য হেদায়াত, সুস্থতা ও নিরাপত্তার দুআ করে। এভাবে সমস্ত মজলিসটি সওয়াব, মঙ্গল ও বকরতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তবে শর্ত হলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নত মুতাবিক আমল হতে হবে।