📄 যে কখনও অসুস্থ হয় নাই
রোগ-ব্যাধি মানুষের গোনাহের কাফফারা স্বরূপ হয়ে থাকে। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতিপয় বাণী লক্ষ্য করেছেন। এখন যে কখনও রোগে পড়ে নাই তার বিষয় লক্ষ্য করুন।
হযরত আমের ইবনে রাম (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরামদের মজলিসে বললেন, নিশ্চয়ই কোন মুমিনের যদি রোগ হয় অতঃপর আল্লাহ আরোগ্য দান করেন তবে এটা তার পিছনের গোনাহর কাফফারা হয়ে যায়। (এ কথা শুনে) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশে পাশে যে সকল সাহাবাগণ বসা ছিলেন তাদের একজন বলে উঠলেন-
يَا رَسُولَ اللَّهِ ۚ وَمَا الْأَسْقَامُ ؟ مَا مَرِضْتُ قَطْ
"হে আল্লাহর রাসূল! বিমারের অর্থ কি? আল্লাহর ফযলে আমারতো কখনও অসুখ-বিসুখ হয় নাই।"
قَالَ قُمْ فَلَسْتَ مِنًا
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বললেন, উঠে দাঁড়াও, তুমি আমার (উম্মতের) অন্তর্ভুক্ত নও।” -আবু দাউদ
দেখা গেল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগকে ঈমানের একটা আলামত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। যে ব্যক্তি কখনও রোগে পতিত হয় না তার ঈমান এবং পবিত্রতার মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র ইরশাদ করেনঃ
عَجِبْتُ لِلْمُؤْمِنِ جَزْعَةٌ مِّنَ السَّقَمِ وَلَوْ يَعْلَمُ مَالَهُ فِي السَّقَمِ وَجَبَ أَنْ يَكُونَ سَقِيمًا حَتَّى يَلْقَى اللَّهُ تَعَالَى
"ঐ মুমিনের প্রতি আমি আশ্চর্য হই, যে মুমিন হয়েও রোগের কারণে অধৈর্য্য হয়। যদি সে জানত যে রোগের মধ্যে তার কি উপকার রয়েছে তাহলে সে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত রোগাক্রান্ত থাকতে চাইত।" -বায্যার
📄 রোগকে গাল মন্দ করো না
রোগ সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কি তা জেনেছেন, আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম রোগকে গোনাহের কাফফারা, সওয়াবের অগ্রদূত এবং নেকীর কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। এ কারণে আমাদের বুযুর্গগণ সুস্থ থাকার জন্যও এভাবে দুআ করতেন, "মাওলা করীম! রোগের মত নিয়ামতকে সুস্থতার নিয়ামত দ্বারা বদলিয়ে দিন।" এ কারণে কোন সাচ্চা মুসলমানের পক্ষে রোগকে গালমন্দ করা কখনও ভাল কাজ নয়। এ সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশার একটা ঘটনা দেখুন।
হযরত জাবের (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সায়েব অথবা উম্মে মুসাইয়্যেব (রাযিঃ)-এর নিকট তাশরীফ নিয়ে গেলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি হয়েছে যার কারণে তুমি কাঁপছ? তিনি বললেন
الْحَمَى لَا بَارَكَ اللَّهُ فِيهَا
জ্বরে আক্রান্ত হয়েছি। আল্লাহ এর কল্যাণ না করুন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
ہو دورود لا تَسبّى الْحُمَّى فَإِنَّهَا تَذْهِبُ خَطَايَا بَنِي آدَمَ كَمَا يُذْهِبُ الْخَيْرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ
"জ্বরকে গালি দিও না। কারণ এটা আদম সন্তানের গোনাহ সমূহ এমনভাবে দূর করে দেয় যেমনভাবে কামারের ভাট্টি জং এবং ময়লা পরিষ্কার করে ফেলে।" -মুসলিম শরীফ
এ সম্পর্কে আরো একটি ঘটনা লক্ষ্য করুন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় এক ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করলে জনৈক ব্যক্তি বললেন, তার কতই না সুন্দর মৃত্যু হল, কোন রোগ না ভুগেই মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করল।" লোকটির একথা শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার উপর আফসোস, তুমি জান না, যদি আল্লাহ তাকে কোন রোগে আক্রান্ত করতেন, তাহলে ঐ রোগের কারণে তার গোনাহ সমূহ দূর হয়ে যেত।" -মুয়াত্তা ইমাম মালেক
📄 রোগীর ইবাদত
রোগের আর কোন বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাক বা না যাক কিন্তু সাধারণভাবে রোগের কারণে মানুষের অভ্যাসের মধ্যে অবশ্যই কিছু পরিবর্তন এসে যায়। নিদ্রা ও জাগরণে হোক অথবা ফরজ, সুন্নত ও নফল আদায়ের ব্যাপারে হোক অথবা যিন্দিগির গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ক্ষেত্রে হোক অনেক সময় রোগ একগুলির মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ স্বরূপ জখমী ব্যক্তি অযূ করতে পারে না, দুর্বল ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায আদায়ে অক্ষম হয়। চোখের ব্যথার কারণে আল্লাহর পবিত্র কালাম তেলাওয়াত করতে না পারা এবং সৃষ্টির বা মানবজাতির অগণিত খেদমত থেকে মাহরূম হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
এভাবে রোগের কারণে কিছু নেকী থেকে বঞ্চিত হওয়ায় কুদরতীভাবেই অন্তরে এক ব্যাকুলতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর স্বীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে বলে দিয়েছেনঃ
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلَ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا أَوْ صَحِيحًا
"আল্লাহর কোন বান্দা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে অথবা সফর (ভ্রমণ) রত অবস্থায় থাকে তখন তার আমল নামায় সেই পরিমাণ নেকীই লেখা হয় যে পরিমাণ আমল সে মুকীমাবস্থায় অথবা সুস্থ থাকা কালে করত।"-বুখারী শরীফ
উক্ত হাদীসের উদ্দেশ্য হল এই যে, যদি অসুস্থতার মজবুরী অথবা মাজুর হওয়ার কারণে কিছু নেক আমল বাদ যায় তবে তার সওয়াব সে যথারীতি পেয়েই যাবে। আর রোগের সওয়াব ও অন্যান্য প্রতিদান তো আলাদা থাকবেই।
📄 রোগীর দুআ
অনেক লোক রোগ ব্যাধিকে একটা আযাব মনে করে থাকে। তারা রোগকে আল্লাহ জাল্লা-শানুহুর নারাযী ও অসন্তুষের কারণ মনে করে একটা ভুল ধারণার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ অনেক সময়েই বান্দার পরীক্ষার জন্যে রোগ হয়ে থাকে। আর পরীক্ষায় সফলকাম হওয়ার পর তার নেকী বেড়ে যায় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তাই কোন রোগীর জন্যেই আল্লাহর প্রতি রাগান্বিত হয়ে আল্লাহর ক্রোধে গ্রেফতার হওয়া উচিত নয়। রোগের পরিণতি تو মঙ্গলজনকও হতে পারে। কারণ একজন ধৈর্য্যশীল, শোকরগুজার এবং খোদানির্ভর রোগীর প্রতি আল্লাহর রহমত বাড়তে থাকে, রোগ তার জন্য রহমত স্বরূপ হয়। রোগের কারণে সে আল্লাহর প্রতি আরও অধিক নিবিষ্ট হয়। এভাবে সে দুআ কবুল হওয়ার দর্জা হাসিল করে নেয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا دَخَلْتَ عَلَى الْمَرِيضِ فَمَرَهُ يَدْعُولَكَ فَإِنَّ دَعَاءَهُ كَدُعَاءِ الْمَلَئِكَةِ
"তুমি যখন রোগীর নিকট যাবে তখন তাকে তোমার জন্য দুআ করতে বলবে। নিশ্চয়ই তার (রোগীর) দুআ ফিরিশতাদের দুআর মত। -ইবনে মাজাহ
দুআ সম্পর্কিত এ বিষয়টা কতইনা ব্যাপক যে, মানুষ যদিও নিজের জন্য নিজ প্রয়োজনে দুআ করে তথাপি সে প্রত্যেক নেক দুআর একটা করে সওয়াব পায়। এমনকি কারো নিকট দুআর দরখাস্ত করলেও তা নেকীর মধ্যে শামিল হয়। কারণ এটাও তাকে নেকের প্রতি দাওয়াত দেয়।
কোন রোগীর নিকট বিশেষভাবে কোন দুআ চাওয়া এ কারণেও বরকতের বিষয় হয়ে থাকে যে, সে সর্বদা কষ্টভোগ করতে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি তার মনোযোগ অপেক্ষাকৃত বেশী হয়। সে সদা সর্বদা আল্লাহর করুণার প্রার্থী হয়ে থাকে।