📄 রোগ একটা কষ্টি পাথর
এটা কারো অজানা নয় যে, সর্বপ্রকার উন্নতির জন্যই মানুষকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়; কোন সফলতাই পরীক্ষা ও যাচাই বাছাই ব্যতীত অর্জিত হয় না। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের কতিপয় আয়াত রয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ তোমরা কি এ চিন্তা করছ যে, পরীক্ষা ও যাচাই, বাছাই ছাড়াই তোমাদের অমুক অমুক নিয়ামত ও রহমত হাসিল হয়ে যাবে? এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ২৪৬ নম্বর, সূরা নেসার ১১৭ ও ১৮৫ নম্বর এবং সূরা ফাতিরের ৬, ও ২৬ নং আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
তবে প্রশ্ন হতে পারে পরীক্ষা ও যাচাই কি ভাবে হবে? এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা-
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْاَمْوَالِ وَالْاَنْفُسِ وَالثَّمَرٰتِ
"আর আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিঞ্চিৎ ভয় দ্বারা, আর উপবাস দ্বারা এবং ধনের, প্রাণের ও ফসলের স্বল্পতা দ্বারা" (সূরা বাকারাঃ আয়াতঃ ১৫৬)
এভাবে পরীক্ষার বিভিন্ন প্রকারের মধ্যে প্রাণের ক্ষতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চাই সেটা মৃত্যুর আকারে হোক কি রোগের সুরতে হোক।
এ কারণে আমাদের বুযুর্গ ও সুফীয়ায়ে কেরামগণ রোগকে আল্লাহর রহমতের অছিলা এবং পদোন্নতির একটা সোপান হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আর যে ব্যক্তির রোগ হয় না তাকে দুর্ভাগা মনে করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ তাসাউফ বা সুফীবাদের কিতাবে এমন অনেক ঘটনা দেখা যায় যে, কোন মুরীদ কখনও যদি রোগাগ্রস্ত না হয়েছে, তবে মুর্শিদ তার বুযুর্গীর মধ্যে সন্দেহ পোষণ করেছেন। স্বামী রোগে না পড়লে নেককার স্ত্রী তার নেক কর্মের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত হয়েছে।
ইমাম বুখারী (রহঃ) হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাযিঃ)-এর এই রেওয়ায়াত নকল করেছেন যে, তিনি হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম হতে শুনেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ "আমি দুনিয়ায় যখন আমার কোন বান্দাকে দুটি প্রিয় জিনিস দ্বারা কষ্ট দেই এবং সে ধৈর্য্যের আঁচল হাত থেকে না ছাড়ে, তবে এর বদলায় আমি তাকে জান্নাত দিয়ে থাকি। আর উত্তম ও প্রিয় জিনিস দ্বারা উদ্দেশ্য হল তার দু'চোখ। -বুখারী, মুসলিম
📄 রোগ মঙ্গল ও সফলতার মাধ্যম
ইসলাম বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্ম। ইসলামের সমস্ত নিয়ম কানুন ও মৌলিক বিষয়াবলী সম্পূর্ণ স্বভাবগত। তাই ইসলামী শিক্ষানুযায়ী অসুস্থতা কোন আযাব নয় বরং আল্লাহর রহমতের অছিলা মাত্র। এ রোগ আমাদের জন্য খায়ের-বরকত ও সফলতার অছিলা হয়ে যায়। যেমন হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا تُصَبْ مِنْهُ
অর্থাৎ "আল্লাহ তা'আলা যাকে কল্যাণ দান করতে চান তাকে কষ্টে ফেলেন।"-মুয়াত্তা ইমাম মালেক, কিতাবুল জামেয়
প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করা যায়, রোগ কঠোর প্রকৃতির অবাধ্যদেরকেও শিথিল ও স্বাভাবিক করে ফেলে, কঠিন থেকে কঠিন লোকের মধ্যেও অন্তরজ্বালা ও কোমলতা সৃষ্টি করে। এই রোগের সময় অনেক উঁচু তলার লোকের মুখেও আল্লাহর নাম শোনা যায় এবং তাঁদের দিলে আল্লাহর স্মরণ জাগে। হ্যাঁ, তবে যার পরিণام একান্তই খারাপ তার জন্যে কোন চিকিৎসা নাই। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, কোন ব্যক্তি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন আল্লাহ তা'আলা তার নিকট দু'জন ফিরিশতা পাঠিয়ে বলেন, দেখ হে ফিরিস্তা, সে তার শুশ্রূষাকারীর সঙ্গে কি কথাবার্তা বলছে। যদি সে অসুস্থ হওয়ার কারণে মহান আল্লাহ তা'আলার গুনকীর্তন করতে থাকে তবে সে খবর ফিরিস্তাগণ আল্লাহর নিকট নিয়ে যায়। যদিও আল্লাহ স্বয়ং সব কিছু জানেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেনঃ
إن توفيته ان ادخله الجنة وان انا شفيته أن أبدل له لحما و دما خيرا من دمه وَأَنْ أُكَفِّرَ عَنْهُ سَيَاتِهِ
"আমি যদি তাকে মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করাই তবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাব। আর যদি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দেই তবে তার খারাপ গোশতকে উত্তম গোশত দ্বারা এবং দুষিত রক্তকে উত্তম রক্ত দ্বারা পরিবর্তন করে দিব এবং তার পাপরাশিকেও দূর করে দিব। এ হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন আতা ইবনে ইয়াসার (রাযিঃ) -মুয়াত্তা ইবনে মালেক
📄 রোগে ধৈর্য ধারণ জান্নাত লাভের অছিলা
কিছু মানুষ রোগকে এক ধরনের আযাব ও অভিশাপ মনে করে থাকে। এ সকল লোকের নবী করীম (সাঃ)-এর পবিত্র হাদীস নিয়ে চিন্তা করতঃ স্বীয় ভ্রান্ত ধারণা পরিবর্তন করে ফেলা উচিত। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম রোগকে জান্নাত লাভের অছিলা বলেছেন।
হাদীস বর্ণনাকারী হযরত আতা ইবনে আবী রোবাহ্ (রাযিঃ) বলেন, একবার আমাকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, আমি কি আপনাকে একজন জান্নাতী মহিলা দেখিয়ে দেব না?
আমি বললাম, কেন দেখাবেন না? অবশ্যই দেখান।
তিনি বললেন, "ঐ কালো মহিলাকে দেখুন।" এই মহিলা একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যখন আমার মৃগী রোগের চাপ শুরু হয় তখন কখনও কখনও আমার ছতর খুলে যায়, তাই আল্লাহর দরবারের আমার সুস্থতার জন্য দুআ করুন।" নবী করীম (সাঃ) বললেনঃ
إن شِئْتِ صَبَرْتِ وَلَكِ الْجَنَّةَ وَإِن شِئْتِ دَعَوْتُ اللهَ لَكَ أَنْ يُعَافِيَكِ
"তুমি পারলে ধৈর্য্য ধারণ কর, তুমি জান্নাত পাবে। আর যদি তুমি চাও তবে আমি আল্লাহর নিকট তোমার রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করি। উক্ত মহিলা বলল,
হুযূর, (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমি সবর করব। অতঃপর মহিলা বললঃ
فَادْعُ اللَّهُ أَنْ لَا أَتَكَشَفَ فَدَعَالَهَا
"তবে আপনি আল্লাহর নিকট এই দুআ করুন যেন আমার ছতর খুলে না যায়। সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য ঐ দুআ করলেন।" -বুখারী, মুসলিম
📄 রোগ এবং গোনাহ
দেখা যায় কোন কোন সম্মানিত ব্যক্তি ও রোগকে খারাপ কাজ ও গোনাহের কারণ মনে করে এরূপ ধারণা পোষণ করেন যে, রোগ হল পূর্বের কোন পাপের প্রায়শ্চিত্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, রোগ গোনাহের কারণ নয় বরং গোনাহের ক্ষতিপূরণ ও কাফ্ফারা স্বরূপ। এ সম্পর্কে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহামূল্যবান বাণী থেকে দুটি বাণী পেশ করছি।
إِنَّ اللَّهَ لَيُكَفِّرْ عَنِ الْمُؤْمِنِ خَطَايَاهُ كُلَّهَا بِحُمَّى لَيْلَةٍ
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ "নিশ্চয়ই মুমিনের একরাত্রির জ্বর তার সকল গোনাহ দূর করে দেয়।" -তারগীব তারহীব
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে "জ্বর" সম্পর্কে আলোচনা করা হলে এক ব্যক্তি জ্বরকে গাল-মন্দ দিল। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
لَا تَسُبُّهَا فَإِنَّهَا تُنَقِى الذُّنُوبَ كَمَا تُنَقِى النَّارُ خَبَثَ الْحَدِيدِ
"জ্বরকে গালি দিও না, কেননা এটা گোনাহকে এমন ভাবে মিটিয়ে দেয় যেমন ভাবে আগুন লোহার মরিচা (জং) এবং ময়লা পরিষ্কার করে দেয়।" -ইবনে মাজাহ
"হযরত উম্মুল আ'লা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, আমি অসুস্থ ছিলাম, এ সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এসে বললেন, উম্মুল আলা! তোমার জন্য সুসংবাদ। মুসলমানের রোগ তাঁর গুনাহকে দূর করে দেয়। যেমন ভাবে আগুন স্বর্ণ রূপার ময়লা দূর করে দেয়।" -সুনানে আবূ দাউদ