📄 বদ্ধ পানিতে প্রস্রাবের নিষিদ্ধতা
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، نَهَى أَنْ تَبَالَ فِي الْمَاءِ الرَّاكِدِ
হযরত জাবের (রাযিঃ) হতে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদ্ধ পানিতে প্রশ্রাব করতে নিষেধ করেছেন।" -রিয়াযুস সালেহীন, মুসলিম শরীফ
এ কথা তো সকলেরই জানা আছে যে, প্রবাহিত পানি পাক। তা নদী, সমুদ্র, নহর বা ঝর্ণা যাই হোক- এ গুলোর পানি পাক। এমনিভাবে পুকুর বা বড় হাউজের বদ্ধ পানিও পাক হয়ে থাকে। এই বড়র পরিমাপ, দৈর্ঘ প্রস্ত ও গভীরতায় ন্যূনতম কতটুকু হতে হবে, ফিকাহবিদগণ তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। প্রচলিত ভাষায় যাকে 'দাহ দাদাহ' বলা হয়।
বদ্ধ পানি পাক হওয়ার জন্য শর্ত হল এই যে, পানির রঙ গন্ধ ও স্বাদ পরিবর্তন না হতে হবে। অন্যভাবে কথাটাকে এভাবেও বলা যায় যে, পানির পরিমাণ বেশী হবে এবং মাটি বা অন্য কিছুর সংমিশ্রণের দ্বারা পানির আসল অবস্থায় পরিবর্তন না আসতে হবে।
একথা স্পষ্ট যে, হাউজ বা পুকুরের অধিক পানিতে পেশাব করার দ্বারা না পানির রঙ বদলাবে, না স্বাদ নষ্ট হবে। আর না দুর্গন্ধ সৃষ্টি হবে। এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে এই পানি নাপাকও হবে না। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত রুচিবোধ ও পরিচ্ছন্নতা এটাকে পছন্দ করে নাই যে, কেউ বন্ধ পানিতে প্রস্রাব-পায়খানা করুক আর তা অন্য লোকদের জন্য কষ্ট ও বিরক্তির উদ্রেক হোক। কেননা শুধু আইনের ধারা রক্ষা করে চললেই জীবন সুখময় হয়ে উঠে না এবং হৃদয়ের প্রশান্তি অর্জিত হয় না।
📄 পেশাব আটকিয়ে রাখা
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : قَامَ أَعْرَابِيٌّ فِي الْمَسْجِدِ فَبَالَ فَتَنَاوَلَهُ النَّاسُ فَقَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعُوهُ وَأَهْرِيقُوا عَلَى بُولِهِ سَجُلًا مِّنْ مَاء أَوْ ذَنُوبَاً مِنْ مَاءٍ فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِرِينَ وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِرِينَ
"হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, একজন গ্রাম্য লোক মসজিদে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে আরম্ভ করে। অন্যান্য লোকেরা তাকে বাধা দিতে যায়। এ সময় হযরত রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, লোকটিকে ছেড়ে দাও এবং পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা, তোমাদেরকে সহজ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে কঠোরতা করার জন্য বানানো হয় নাই।"-বুখারী শরীফ
সেই দৃশ্যটি একবার কল্পনা করে দেখুন। আল্লাহর নবীর মসজিদ (মসজিদে নববী)। যেখানে এক রাকাআত নামায অন্য স্থানে পঞ্চাশ হাজার রাকাআত নামাযের মর্যাদা রাখে। সেই পবিত্র মসজিদে একজন অপরিচিত লোক প্রস্রাব করছে। সংগত কারণেই সাহাবায়ে কেরাম উত্তেজিত হয়ে গিয়ে থাকবেন। তাই তাদের চিৎকার করা, তাকে ধরার জন্য দৌড়ানো এবং তাকে পেশাব করতে বাধা দেওয়া একটি কুদরতী ও অতি স্বভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু কুরবান হোন সেই রহমতের নবীর জন্য যিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় ভক্ত সাহাবাগণকে বাধা দিলেন এবং বললেন যে, লোকটিকে পেশাব করতে দাও। পরে জায়গাটি পানি দিয়ে ধুয়ে দেবে। তিনি আরো বললেন, তোমাদেরকে মানুষের সাথে সহজ ও সুন্দর আচরণ করার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। মানুষের সাথে কঠোর ও রূঢ় ব্যবহার এবং তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য তোমাদের পাঠানো হয় নাই। কেননা, পেশাব আটকিয়ে রাখায় অত্যন্ত কষ্ট হয় এবং এতে কষ্টদায়ক বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়।
📄 কুষ্ঠ কাঠিন্যের প্রতিকার
عَنْ سُرَاقَةَ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَمَرَنَا أَنْ نَتَوَكَّاءَ عَلَى الْيُسْرَى وَنَنْصِبَ اليَمَنى
"হযরত সুরাকা ইবনে মালেক (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন যে, আমরা যেন পায়খনার সময় বাম পায়ের উপর চাপ দেই এবং ডান পা খাড়া রাখি।" -তাবরানী
এবার আপনি একটু নিজের দৈহিক মেশিনারী অবস্থার চিত্রটি লক্ষ্য করুন। মানুষ আহার করার পর তার নির্যাস নিংড়িয়ে রক্ত মাংসের সাথে মিশে যায় এবং অবশিষ্ট অতিরিক্ত অংশ সমস্ত নাড়িভুঁড়ি হয়ে বাম দিকের নাড়িতে একত্রিত হয়ে থাকে। আর পায়খানার সময় এখান থেকেই মলের আকৃতিতে তা বের হয়।
চিকিৎসকগণ বলেন যে, যদি বাম পায়ের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত খাদ্যাংশ ধারণকৃত নাড়ির উপর চাপ দেওয়া হয় তাহলে মল বের হওয়ার ব্যাপারে খুবই সহায়ক হয়। সমস্ত মল অতি সহজে বের হয়ে আসে। পাকস্থলী পরিষ্কার হয়। কুষ্ঠ-কাঠিন্য থাকে না। মন প্রফুল্ল হয়। মনের অস্থিরতা ও অশান্তি দূর হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য ও উদ্যম সৃষ্টি হয়।
এখানে চিন্তার বিষয় হল এই যে, হযরত রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী ও রসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছিলেন। ডাক্তার ও চিকিৎসক হিসাবে তিনি আবির্ভূত হন নাই। তিনি কোন দিন এরূপ দাবীও করেন নাই। কিন্তু তাঁর প্রতিটি কথা হিকমত প্রজ্ঞা ও স্বভাবগত মৌল নীতিমালার সাথে শতকরা একশত ভাগই সামঞ্জস্যশীল। হবেই বা না কেন? একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, "প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কোন কথাই প্রজ্ঞাশূন্য হয় না।" সর্বোপরি তিনি তো। ছিলেন অহী প্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা বলেন না।" -সূরা নাজমঃ আয়াত: ৩
📄 প্রস্রাব ও পায়খানার আদব
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব জীবনের প্রতিটি শাখাতেই দিক-নির্দেশনা রেখে গেছেন। জীবনের এমন কোন দিক শাখা ও বিভাগ নাই যা হুযূর পাক (সঃ)-এর হেদায়াত থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। প্রস্রাব পায়খানার কথাই ধরুন। এ বিষয়ে ডজন ডজন আহকাম বিদ্যমান রয়েছেন। এখানে আমরা জরুরী আহকাম সমূহের শুধুমাত্র সারাংশ পেশ করছি।
(১) হুযূর পাক (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ পায়খানার সময় বসে বাম পায়ের উপর অধিক জোর দেওয়া চাই। যেমন হযরত সুরাকা ইবনে মালেক (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে আছে যে, হূযূর (সাঃ)-আমাদেরকে হুকুম করেছেন যে, পায়খানায় বসার সময় আমরা যেন বাম পায়ের উপর জোর দেই এবং ডান পা খাড়া রাখি। -তাবরানী
আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি যে, চিকিৎসা শাস্ত্রের মতে ও এই পদ্ধতি কুষ্ঠ কাঠিন্যের একটি উত্তম প্রতিকার। কেননা, খাদ্যের নির্যাস শোধিত হয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ অন্য সকল নাড়িভুঁড়ি দিয়ে অগ্রসর হয়ে বাম পাশের নাড়িতে জমা হতে থাকে। পায়খানার চাপ সৃষ্টি হলে এখান থেকে তা বের হয়। যদি বাম পায়ের দ্বারা এই নাড়ির উপর জোর দেওয়া হয় তাহলে বর্জাংশ সহজে বের হতে তা সহায়ক হয় এবং কুষ্ঠ কাঠিন্য থেকে মুক্ত থাকা যায়।
(২) পায়খানা করার পর ঢিলা ব্যবহার করার হুকুম রয়েছে। আগে ঢিলার দ্বারা পরিষ্কার করে পরে পানি ব্যবহার করতে হবে।
যারা পায়খানার পর পানি ব্যবহার না করে শুধুমাত্র টয়লেট পেপার দিয়ে পরিচ্ছন্ন হয় তাদের মধ্যে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষতঃ এই সকল লোকদের মলদ্বারে এক প্রকার ফোঁড়া বের হয়ে থাকে। চিকিৎসা শাস্ত্রে এটাকে (PILONIDAL SINUS) বলা হয়। অপারেশন ছাড়া এই রোগের কোন চিকিৎসা নাই।
এতদ্ব্যতীত এই সকল লোকদের পেশাবের রাস্তায় পুঁজ হয়ে যায়। বিশেষ করে মহিলাদের পায়খানার ক্ষতিকর জীবাণু প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে মূত্রাশয় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে মুত্রাশয়ে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হয়। কোন কোন সময় এই রোগ এমন অবস্থায় ধরা পড়ে যখন আর এর কোন চিকিৎসার সুযোগ থাকে না।
(৩) পেশাবের পরও মাটির ঢিলার ব্যবহার করা সুন্নতে নববী। অতঃপর পানির দ্বারা পবিত্রতা হাসিল করা অত্যাবশ্যক। এতদ্ব্যতীত নামায পড়া যায় না। এ কথার অর্থ হল এই যে, পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত নামাযের ন্যায় ইবাদতও কবুল হয় না। এজন্যেই বলা হয়েছে যে, পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।
বর্তমান যুগে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপর খুবই জোর দেওয়া হয়। বস্তুত এটা একটা জরুরী বিষয়। কিন্তু ইসলাম বাহ্যিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সাথে অভ্যন্তরীণ পাক পবিত্রতার প্রতিও তেমনি গুরুত্বারোপ করেছে। যদি মন পবিত্র না হয়ে শুধু তন উজালা হয় তাহলে এটা কি মানুষের কোন বৈশিষ্ট্য হবে? সুতরাং আত্মার পরিশুদ্ধতার জন্য দেহের পবিত্রতাও একান্ত জরুরী।
(৪) হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বৃক্ষের ছায়ায় প্রস্রাব পায়খানা করতে নিষেধ করেছেন। হুযুরের এই নির্দেশর মধ্যে অসংখ্য হিকমত রয়েছে। বিশেষতঃ ছায়াযুক্ত গাছের নীচে মুসাফির ও পথচারীরা বিশ্রাম করে থাকে। এরূপ স্থানে প্রস্রাব পায়খানা করে নোংরা করা কোন ভাবেই শোভনীয় নয়।
(৫) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
لَا يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ
অর্থাৎ "তোমাদের কেউ যেন বন্ধ পানিতে পেশাব না করে।" -বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযী