📄 নখ ও চুল
আপনারা নখ ও চুল কাটার হুকুম পড়েছেন। এবার স্বয়ং রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলের বাস্তব নমুনা লক্ষ্য করুন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُ بِتَغْبِيرِ الشَّعْرِ مُخَالَفَةً لَا عَاجِمَ وَكَانَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَنُورُ فِي كُلِّ شَهْرٍ وَيَقْلِمُ أَظْفَارَهُ فِي كُلِّ خَمْسَةٍ عَشَرَ يَوْمًا .
"হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁছড়িয়ে পরিপাটি করে রাখার হুকুম দিতেন। যাতে আজমী লোকদের মুখালিফাত করা হয়। তিনি মাসে একবার বগলের এবং নাভীর নিম্নাংশের চুল পরিষ্কার করতেন এবং প্রত্যেক পনের দিন পর পর নখ কাটতেন।"
অপর এক বর্ণনাকারী বলেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত: শুক্রবার জুমুআর নামাযে যাওয়ার পূর্বে মোঁছ এবং নখ কাটতেন। তিনি কর্তিত নখ এবং চুল মাটিতে দাফন করে রাখার হুকুম দিতেন।
হযরত রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সাহাবায়ে কিরামগণের কি পরিমাণ মহব্বত ও ভালবাসা ছিল এর কিছুটা অনুমান হযরত আনাস (রাযিঃ)-এর বর্ণনা থেকে করতে পারেন। হযরত আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমি দেখেছি:
الحلاق يحلقه وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ يُرِيدُونَ أَنْ لَا تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلَّا فِي يَدِ رَجُلٍ
"একজন লোক হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা মুবারকের চুল মুণ্ডাচ্ছিল আর সাহাবাগণ তাঁর চতুর্দিকে বসা ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই চাইতেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি চুলও যেন মাটিতে পড়তে না পারে। তাই চুলগুলি মাটিতে পড়ার আগেই তাঁরা নিজেদের হাতে নিয়ে নিতেন। কারণ তাদের নিকট সত্যের পথ প্রদর্শক প্রিয় হাবীবের একেকটি চুল জীবনের সর্বস্বের চেয়েও অধিক প্রিয় ছিল।
📄 ঘুমানোর আগে আগুন নিভিয়ে দাও
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا تَتْرُكُوا النَّارَ فِي بُيُوتِكُمْ حِينَ تَنَامُونَ
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রেখে ঘুমিও না। -বুখারী, মুসলিম, রিয়াযুস সালেহীন
ভেবে দেখুন, রাসূলে উম্মী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীটি কত হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ যে, ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রেখে তোমরা ঘুমিও না। কেননা এই আগুন চুলার মধ্যে না থেকে হয়তো বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে। অথবা তুমি হয়তো আগুন ধীমা করে রেখেছো, কিন্তু তা ধীমা অবস্থায় না থেকে বড় হয়ে জ্বলে উঠতে পারে। অথবা নিভু নিভু আগুনের চুলার উপর তুমি কোন পাতিল বা অন্য কোন পাত্র দিয়ে রাখলে আর চুলার আগুন ক্রমে ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে তা জ্বালিয়ে দিল। তোমার কি জানা আছে যে, ক্ষতিকর হবে না মনে করে যে আগুন তুমি ঘুমানোর পূর্বে না নিভিয়ে এমনিতেই রেখে দিয়েছিলে তুমি ঘুমানোর পর প্রচন্ড বাতাসের ছোঁয়া লেগে তা তীব্র হয়ে উঠবে না এবং তোমার বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে না? হয়তো এই তুচ্ছ আগুনই তোমার সহায় সম্পদ সব পুড়ে ভষ্ম করে দেবে এবং জীবন সংহারক হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কিত অপর একটি হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করুন। এই হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাযিঃ)। তিনি বলেন, এক রাতে মদীনা শরীফের কোন এক ব্যক্তির বাড়ীতে আগুন লেগে যায়। ঘটনাটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বর্ণনা করা হলে তিনি ইরশাদ করলেনঃ
اِنَّ هَذِهِ النَّارَ عَدُوٌّ لَّكُمْ فَاِذَا نِمْتُمْ فَاَطْفِئُوْهَا
"নিশ্চয় এই আগুন তোমাদের দুশমন। সুতরাং তোমারা ঘুমানোর পূর্বে আগুন নিভিয়ে দিও।"-বুখারী, মুসলিম শরীফ
এই আগুন চুলার অঙ্গার, কেরোসিন তৈল, যে কোন প্রকার গ্যাস, বৈদ্যুতিক হিটার বা অন্য যে কোন ধরনেরই হোক না কেন সর্বাবস্থাতেই একই কথা প্রযোজ্য হবে। বড় ধরনের আগুন তো দূরের কথা বরং অনেক ক্ষেত্রে সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোও জীবন ও সম্পদ ধ্বংস হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
📄 চোখ ও দাঁতের হিফাযত
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ عَبْدِ اللَّهِ ابْنِ مُغَفَل رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْخَذْفِ وَقَالَ إِنَّهُ لَا يَقْتُلُ الصَّيْدَ وَلَا يَنْكَأُ الْعَدُوَّ وَإِنَّهُ يَفْقَأُ الْعَيْنَ وَيَكْسِرُ السِّن
"হযরত আবূ সায়ীদ আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাযিঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙ্গুল দিয়ে কংকর নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। (শিশুদেরকে এরূপ খেলা থেকে নিষেধ করতে গিয়ে তিনি বলেন যে,) এরূপ কংকর নিক্ষেপের ফলে না শিকার মারা যায় আর না দুশমন আহত হয়। তবে এর দ্বারা অবশ্যই চোখ ফুটু হয় এবং দাঁত ভেঙ্গে থাকে।"-বুখারী ও মুসলিম
অপর এক রেওয়ায়াতে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, হাদীসের বর্ণনাকারীর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আঙ্গুলের মাথায় পাথর রেখে কাউকে নিক্ষেপ করছিল। এটা দেখে তিনি তাকে এরূপ করতে নিষেধ করে বললেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে পাথর মারতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু সে ব্যক্তি তাঁর নিষেধ গ্রাহ্য না করে আবারো পাথর নিক্ষেপ করল। তখন হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাযিঃ) বললেন, আমি তোকে হাদীস শুনাচ্ছি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। আর তুই তারপরও এমনিভাবে পাথর নিক্ষেপ করছিস? আমি ভবিষ্যতে তোর সঙ্গে আর কখনো কথা বলব না।
ভেবে দেখুন, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগনের মধ্যে ঈমানের গায়রত কি পরিমাণ ছিল? যদি কেউ প্রিয় নবীর কোন একটি পেয়ারা কথাও না মানত তাহলে তার সাথে সালাম-কালাম পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছেন। সে ব্যক্তি যত ঘনিষ্ঠ আর নিকট আত্মীয়ই হোক না কেন। প্রকৃতপক্ষে আঙ্গুলের মাথায় পাথর রেখে নিক্ষেপ করা শিশুদের একটি খেলা। যা করতে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।
📄 মেসওয়াক
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -۱
اكثرت عليكم في السواك
হাদীস-১ হযরত আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, হযরত রাসূলু মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি তোমাদেরকে বেশী বেশী মেসওয়াক করার নির্দেশ দিচ্ছি।"-বুখারী শরীফ
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ الله عنها أن النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ السواك -২
مطهرة للفم مرضاة للرب
হাদীস-২ হযরত আয়েশা (রাযিঃ) হতে বর্ণিতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন মেসওয়াক মুখের পবিত্রতাকারী এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।"-নাসায়ী
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَا مُرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلُوةٍ
হাদীস-৩ হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যদি আমার এরূপ ধারনা না হত যে, এই বিষয়টি আমার উম্মতের উপর (অথবা বলেছেন যে লোকদের উপর) কঠিন হয়ে যাবে তাহলে আমি তোমাদেরকে প্রত্যেক নামাযের জন্য (অযুর সাথে) মেসওয়াক করার হুকুম দিতাম। -বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ
এখানে আপনারা মেসওয়াক সম্পর্কে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিনটি বাণী পাঠ করেছেন। এগুলি হল এতদ্বসম্পর্কিত হুযূরের বহু হাদীসের মধ্যে কয়েকটি নমুনামাত্র। এ ব্যাপারে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার বার এবং অনেক বেশী বেশী তাকীদ করেছেন। যেমন আপনারা একটু আগেই তাঁর ইরশাদ পড়েছেন যে, তোমরা বেশী বেশী মেসওয়াক কর। মেসওয়াক মুখকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে। আর এ কথা কারো অজানা নয় যে, মেসওয়াক দাঁত পরিষ্কার রাখার একটি সর্বোত্তম মাধ্যম। মেসওয়াক না করলে মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসে। দাঁত অপরিষ্কার হয়ে যায়। আর এর প্রভাব সরাসরি পাকস্থলীতে গিয়ে পতিত হয়। এই কারণে শুধুমাত্র পরিপাক শক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না বরং বিভিন্ন প্রকারের ব্যথা ও রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। অতএব, মেসওয়াক মূলতঃ আমাদের নিজেদেরই কল্যাণ বয়ে আনে। আর এর মাধ্যমে মুফতে আমাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জিত হয়ে যায়।