📄 সুস্থতা ও পবিত্রতার দশ নীতি
হযরত রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি বিষয়কে স্বভাব অর্থাৎ দ্বীনে হানিফের অংশ বলেছেন। এই দশটি নীতির মধ্যে একটি নীতি হাদীসের বর্ণনাকারীর মনে ছিল না। অন্যান্য নয়টি নীতি তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন (১) গোঁফ ছাটা (২) দাঁড়ি লম্বা করা। (৩) মেসওয়াক করা (৪) নাকে পানি দেওয়া (৫) নখ কাটা (৬) আঙ্গুলের জোড়াগুলি ধৌত করা। (৭) বগলের পশম উঠিয়ে ফেলা (৮) নাভীর নীচের পশম পরিষ্কার করা (৯) এস্তেনজা করা। -মুসলিম শরীফ
উপরোক্ত নীতিগুলি আরও একবার পড়ুন এবং এগুলির গুরুত্ব ও উপকারিতার বিষয়ে চিন্তা করুন।
গোঁফ লম্বা হয়ে গেলে পানাহার মাকরূহ হয়ে যায়। যে সকল খাদ্য-বস্তু মোঁচ ছুঁয়ে মুখের ভেতর প্রবেশ করবে সেগুলির পবিত্রতা সংশয় যুক্ত হয়ে পড়বে।
দাঁড়ি পুরুষের জন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক। ইসলামের প্রতীক-চিহ্ন ও হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত।
মেসওয়াকের উপকারিতা কে অস্বীকার করতে পারে? মেসওয়াক সম্পর্কে উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত নিম্নের হাদীসখানি লক্ষ্য করুন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
السواك مطهرة للفم مرضاة للرب
"মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা এবং মহান রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির মাধ্যম।"- নাসায়ী শরীফ
নাকে পানি দেওয়া এবং তা পরিষ্কার রাখা স্বাস্থ্য ও পবিত্রতা উভয় দিক থেকেই অতিশয় জরুরী। নখ কাটা, আঙ্গুলের জোড়া ইত্যাদি ধৌত করা এবং এগুলির খেলাল করা পাক পবিত্রতার জন্য কোন অংশেই কম জরুরী নয়।
বগলের লোম এবং নাভীর নিম্নাংশের লোম পরিষ্কার করা এতো জরুরী যে, যে ব্যক্তি দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এগুলি পরিষ্কার না করবে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে পানাহার করাকে মকরূহ বলেছেন।
এস্তেঞ্জা অর্থাৎ উত্তমরূপে শৌচকার্য করা পবিত্রতা লাভের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এতদ্ব্যতীত না শরীর পবিত্র থাকে, না পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র থাকে।
📄 পবিত্রতা অর্জন বা উত্তমরূপে শৌচকার্য করা
عَنْ أَنَسِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لاَ هُلِ قُبَاءَ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَحْسَنَ الثَّنَاءَ عَلَيْكُمْ فِي الظُّهُورِ فَمَا ذَلِكَ؟ قَالُوا تَجْمَعُ بَيْنَ الْأَحْجَارِ وَالْمَاءِ
“হযরত আনাস (রাযিঃ) রেওয়ায়াত করেন যে, হযরত রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবার লোকদেরকে বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের পবিত্রতার খুবই প্রসংশা করেছেন; এর রহস্য কি? তারা আরয করলেন, আমরা ঢিলা এবং পানি উভয়টির দ্বারাই পবিত্রতা অর্জন করি। -রাযীন
হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতও এটাই যে, প্রস্রাব ও পায়খানার পর প্রথমে ঢিলা ব্যবহার করবে অতঃপর পানির দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করবে। এ ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর দিক-নির্দেশনার সার কথাগুলি আপনিও নোট করে নিন।
(১) এস্তেনজা করার সময় ডান হাত ব্যবহার করবে না এবং কোন বরতন বা পাত্রেও এস্তেনজা করবে না। -আবূ দাউদ, নাসায়ী ও তিরমিযী
(২) এস্তেনজার পর পবিত্রতা লাভের জন্য বাম হাত ব্যবহার করবে। -আবূ দাউদ শরীফ
(৩) পানির দ্বারা পবিত্রতা হাসিলের আগে ঢিলা ব্যবহার করবে। -আবূ দাউদ ও নাসায়ী শরীফ
(৪) হাড্ডি ও গোবর দ্বারা ঢিলা ব্যবহার করবে না। -তিরমিযী শরীফ ও নাসায়ী শরীফ
এ সম্পর্কিত হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণী প্রত্যেক হাদীস গ্রন্থের কিতাবুত তাহারাত অধ্যায়ের এস্তেনজা পরিচ্ছেদে বিশদভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
যে সকল লোক মলত্যাগের পর পানির দ্বারা শৌচকার্য করেনা বা এ জন্য কাগজ ব্যবহার করে তারা প্রায়শঃ দুইটি রোগের শিকার হয়ে থাকে। (১) একটি বিশেষ ধরনের লোমলুক্ত ফোঁড়া যা মলদ্বারের আশেপাশে হয়ে থাকে। একমাত্র অপারেশন করা ব্যতীত এই রোগ থেকে নিষ্কৃতি লাভের আর কোন উপায় ও চিকিৎসা থাকে না। (২) গোর্দার মধ্যে পুঁজ জমা হয় যা প্রস্রাবের পথে বের হয়ে আসে। বিশেষতঃ মহিলাদের পায়খানার জীবাণু প্রসাবের রাস্তা দিয়ে অতি সহজেই প্রবেশ করে মারাত্মক ব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। -ইসলাম আওর তিব্বে নববী
📄 নখ ও চুল
আপনারা নখ ও চুল কাটার হুকুম পড়েছেন। এবার স্বয়ং রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলের বাস্তব নমুনা লক্ষ্য করুন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُ بِتَغْبِيرِ الشَّعْرِ مُخَالَفَةً لَا عَاجِمَ وَكَانَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَنُورُ فِي كُلِّ شَهْرٍ وَيَقْلِمُ أَظْفَارَهُ فِي كُلِّ خَمْسَةٍ عَشَرَ يَوْمًا .
"হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁছড়িয়ে পরিপাটি করে রাখার হুকুম দিতেন। যাতে আজমী লোকদের মুখালিফাত করা হয়। তিনি মাসে একবার বগলের এবং নাভীর নিম্নাংশের চুল পরিষ্কার করতেন এবং প্রত্যেক পনের দিন পর পর নখ কাটতেন।"
অপর এক বর্ণনাকারী বলেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত: শুক্রবার জুমুআর নামাযে যাওয়ার পূর্বে মোঁছ এবং নখ কাটতেন। তিনি কর্তিত নখ এবং চুল মাটিতে দাফন করে রাখার হুকুম দিতেন।
হযরত রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সাহাবায়ে কিরামগণের কি পরিমাণ মহব্বত ও ভালবাসা ছিল এর কিছুটা অনুমান হযরত আনাস (রাযিঃ)-এর বর্ণনা থেকে করতে পারেন। হযরত আনাস (রাযিঃ) বলেন, আমি দেখেছি:
الحلاق يحلقه وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ يُرِيدُونَ أَنْ لَا تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلَّا فِي يَدِ رَجُلٍ
"একজন লোক হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা মুবারকের চুল মুণ্ডাচ্ছিল আর সাহাবাগণ তাঁর চতুর্দিকে বসা ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই চাইতেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি চুলও যেন মাটিতে পড়তে না পারে। তাই চুলগুলি মাটিতে পড়ার আগেই তাঁরা নিজেদের হাতে নিয়ে নিতেন। কারণ তাদের নিকট সত্যের পথ প্রদর্শক প্রিয় হাবীবের একেকটি চুল জীবনের সর্বস্বের চেয়েও অধিক প্রিয় ছিল।
📄 ঘুমানোর আগে আগুন নিভিয়ে দাও
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا تَتْرُكُوا النَّارَ فِي بُيُوتِكُمْ حِينَ تَنَامُونَ
"হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রেখে ঘুমিও না। -বুখারী, মুসলিম, রিয়াযুস সালেহীন
ভেবে দেখুন, রাসূলে উম্মী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীটি কত হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ যে, ঘরে আগুন জ্বালিয়ে রেখে তোমরা ঘুমিও না। কেননা এই আগুন চুলার মধ্যে না থেকে হয়তো বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে। অথবা তুমি হয়তো আগুন ধীমা করে রেখেছো, কিন্তু তা ধীমা অবস্থায় না থেকে বড় হয়ে জ্বলে উঠতে পারে। অথবা নিভু নিভু আগুনের চুলার উপর তুমি কোন পাতিল বা অন্য কোন পাত্র দিয়ে রাখলে আর চুলার আগুন ক্রমে ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে তা জ্বালিয়ে দিল। তোমার কি জানা আছে যে, ক্ষতিকর হবে না মনে করে যে আগুন তুমি ঘুমানোর পূর্বে না নিভিয়ে এমনিতেই রেখে দিয়েছিলে তুমি ঘুমানোর পর প্রচন্ড বাতাসের ছোঁয়া লেগে তা তীব্র হয়ে উঠবে না এবং তোমার বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে না? হয়তো এই তুচ্ছ আগুনই তোমার সহায় সম্পদ সব পুড়ে ভষ্ম করে দেবে এবং জীবন সংহারক হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কিত অপর একটি হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করুন। এই হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন হযরত আবূ মূসা আশআরী (রাযিঃ)। তিনি বলেন, এক রাতে মদীনা শরীফের কোন এক ব্যক্তির বাড়ীতে আগুন লেগে যায়। ঘটনাটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বর্ণনা করা হলে তিনি ইরশাদ করলেনঃ
اِنَّ هَذِهِ النَّارَ عَدُوٌّ لَّكُمْ فَاِذَا نِمْتُمْ فَاَطْفِئُوْهَا
"নিশ্চয় এই আগুন তোমাদের দুশমন। সুতরাং তোমারা ঘুমানোর পূর্বে আগুন নিভিয়ে দিও।"-বুখারী, মুসলিম শরীফ
এই আগুন চুলার অঙ্গার, কেরোসিন তৈল, যে কোন প্রকার গ্যাস, বৈদ্যুতিক হিটার বা অন্য যে কোন ধরনেরই হোক না কেন সর্বাবস্থাতেই একই কথা প্রযোজ্য হবে। বড় ধরনের আগুন তো দূরের কথা বরং অনেক ক্ষেত্রে সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোও জীবন ও সম্পদ ধ্বংস হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।