📄 স্বাস্থ্যের জন্য হুযুর (সাঃ)-এর দুআ
সরওয়ারে কায়েনাত হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় মাওলা পাকের দরবারে স্বাস্থ্য, সুস্থ্যতা, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য যে সকল দুআ করেছেন সেগুলির মধ্যে চিন্তা করে দেখুন। আমরা এখানে তাঁর বহু দু'আর মধ্যে কেবল দুইটি দুআ অর্থসহ উপস্থাপন করছি।
নাসায়ী শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করতেন:
اللهم إني اسألك العافية في الدنيا والآخرة
"ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের সুস্থতা ও কল্যাণ প্রার্থনা করি।"
হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবানে প্রায় সর্বদাই এই দুআ উচ্চারিত হত:
اللهم إني اسألك صحة في إيمان وإيمانا فى حسن خلق ونجاحاً يتبعه فلاحاً ورحمة منك وعافية ومغفرة منك ورضواناً
"হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ঈমানের সাথে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা প্রার্থনা করি এবং উত্তম চরিত্রের সাথে ঈমান প্রার্থনা করি। এবং মুক্তি প্রার্থনা করি যারপর কামিয়াবী ও সফলতা নসীব হবে। আপনার রহমত প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকট স্বাস্থ্য, সুস্থতা, শান্তি, নিরাপত্তা, ক্ষমা ও সন্তুষ্টি প্রার্থনা করি।"
উপরোক্ত দুআ সমূহের দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট রূপে অনুমিত হয় যে, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা আল্লাহ তা'আলার একটি মহান নিয়ামত। এটা এমন এক নিয়ামত যা আখিরী নবী (সাঃ) ও আল্লাহর নিকট বেশী বেশী চাইতেন। তাঁর বিশেষ দুআ সমূহের মধ্যে সর্বদাই তিনি এই দুআগুলিকেও শামিল রাখতেন। অতএব কতইনা উত্তম হয় যদি আপনিও এই দুআগুলি মুখস্থ করে নেন এবং নিজের দুআগুলির মধ্যে এগুলিকেও শামিল করে নেন! কেননা, দুআর দ্বারা একদিকে যেমন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা হয় অপরদিকে এতে বান্দার নিজের ইচ্ছা ও দৃঢ়তারও প্রকাশ ঘটে।
📄 স্বাস্থ্য ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার পাঁচটি মৌল বিধান
হযরত আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত:
قال الفطرة خمس أو خمس من الفطرة الختان والإستحداد وتقليم الأظفار، ونتف الإبط، وقص الشارب
"রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, স্বভাবজাত বিষয় পাঁচটি অথবা বলেছেন পাঁচটি বিষয় স্বভাবের অন্তর্গত-
১. খাতনা করা, ২. নাভীর নীচের পশম পরিষ্কার করা, ৩. নখ কাটা, ৪. বগলের পশম উপড়ে ফেলা এবং ৫. গোঁফ ছাঁটা।"
হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোক্ত বাণীতে পাঁচটি বিষয়কে মানব স্বভাবের সার বলা হয়েছে। এই বিষয় গুলি সুন্নাতে নববীর অন্তর্ভুক্ত। হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলির উপর আমল করার জন্য কঠোর ভাবে তাকীদ করেছেন। এগুলির উপর আমল না করাকে মাকরূহ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। সর্বোপরি তাঁর অপছন্দের কারণ বলেছেন।
চিন্তা করুন! এ পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিচ্ছন্নতা ও পাক-পবিত্রতার কত উপকারিতা ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আর থাকবেই না বা কেন? বস্তুতঃ ইসলাম তো হল স্বভাবগতধর্ম। ইসলামের প্রতি আহবানকারী ও এর প্রবর্তক হলেন স্বভাবের সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান ও সুবিজ্ঞ ব্যক্তি। তাঁর প্রতিটি কথা স্বভাবেরই প্রতিধ্বনি। তাঁর প্রতিটি কথা ও দিক নির্দেশনাই মানবীয় কল্যাণে ভরপুর।
এক. খাতনা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুন্নত। চিকিৎসকগণ এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন যে, খাতনা করার দ্বারা মানুষ প্রস্রাব ও হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ থেকে আপনা থেকেই নিরাপদ হয়ে যায়।
দুই. নাভীর নিম্নাংশের লোম যদিও বাহ্যত দৃষ্টিগোচর হয় না কিন্তু এগুলি পরিষ্কার না করার কারণে শুধু যে স্বভাবের মধ্যে বিষণ্ণতা পয়দা হয় তাই নয় বরং এর দ্বারা মনের মধ্যে মালিন্য ও অপবিত্রতা বৃদ্ধি পায়।
তিন. নখ কাটা শুধু হাতের পরিচ্ছন্নতা এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্যই জরুরী নয়; বরং স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও তা অতিশয় জরুরী। যদি নখ কাটা না হয় তাহলে তা ময়লা ও আবর্জনার ভান্ডার হয়ে যায়।
চার. বগলের লোমগুলি যদি নিয়মিত ভাবে পরিষ্কার করা না হয় তাহলে এতে চরম দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। যা পাশে বসা লোকেরাও অনুভব করে।
পাঁচ. হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোঁফ ছেটে ফেলার জন্যও খুবই তাকীদ করেছেন। কেননা যদি গোঁফ ছেটে রাখা না হয় তাহলে যে কোন পানীয় বস্তু নাপাক হয়েই কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে।
📄 স্বাস্থ্য রক্ষার চার নীতি
হযরত জাবের (রাযিঃ) হতে বর্ণিত:
غَطُّوا الْإِناءَ وَأَكُوا السَّقَاءَ، وَاغْلِقُوا الْأَبْوَابَ وَاطْفُوا السَّرَاجَ
"হযরত রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা বরতন ঢেকে রাখবে, পানির কলসের মুখ বন্ধ করে রাখবে, দরজার অর্গল বন্ধ করে রাখবে এবং (ঘুমানোর পূর্বে) চেরাগ নিভিয়ে দেবে।" - মুসলিম শরীফ
এটা একটা সুদীর্ঘ হাদীস। আমরা এখানে কেবল হাদীসের প্রথম কিছু অংশ উদ্ধৃত করলাম। এতে হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাস্থ্য রক্ষা বিষয়ক চারটি নীতি বর্ণনা করেছেন। হাদীসের পরবর্তী অংশে তিনি এ চারটি নীতির বিভিন্ন কারণ ও দর্শন বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ
প্রথম নীতিঃ غطوا الاناء। বাসন-পত্র ঢেকে রাখা। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যদি বাসনপত্র ঢেকে রাখ তাহলে শয়তানের পক্ষে সেগুলি খোলার সুযোগ হবে না। তিনি বলেছেন, যদি বাসন পত্র ঢেকে রাখার জন্য আর কিছু না পাও তাহলে বাসনপত্রের মুখে অন্তত কোন লাকড়ি বা খড়ির টুকরাই রেখে দিও। কেননা খোলা পাত্রে যে কোন পোকামাকড় ইত্যাদি ক্ষতিকর জিনিস পতিত হওয়ার আশংকা থাকে।
দ্বিতীয় নীতিঃ او كُوا السَّقَاء। কলস বা পানীয় পাত্রের মুখ বন্ধ রাখা। হুযুর (সাঃ) ইরশাদ করেছেন যে, তোমার যদি কলসের মুখ বন্ধ রাখার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর তাহলে শয়তান কলসের মুখ খোলার (এবং পানি নষ্ট করার) সুযোগ পাবে না।
তৃতীয় নীতি : غلقوا الابواب। ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখা। এভাবে তোমরা শয়তানের ঘরের ভেতর প্রবেশ করার সুযোগ নষ্ট করতে পারবে। নতুবা শয়তান তোমাদের গাফলতির সুযোগে ঘরে প্রবেশ করে তোমাদের অনেক অনিষ্ট করে ফেলতে পারে।
চতুর্থ নীতি: واطفوا السراج এবং বাতি নিভিয়ে দেওয়া। এ ব্যাপারে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যে, তোমরা যদি বাতি জ্বালিয়ে রেখেই ঘুমিয়ে পড়, তাহলে তোমাদের ঘুমন্ত অবস্থায় ইঁদুর বাতির আগুন থেকে ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। চিন্তা করে দেখুন, এই চারটি নীতি মানব জীবনের জন্য কত জরুরী!
📄 সুস্থতা ও পবিত্রতার দশ নীতি
হযরত রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি বিষয়কে স্বভাব অর্থাৎ দ্বীনে হানিফের অংশ বলেছেন। এই দশটি নীতির মধ্যে একটি নীতি হাদীসের বর্ণনাকারীর মনে ছিল না। অন্যান্য নয়টি নীতি তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন (১) গোঁফ ছাটা (২) দাঁড়ি লম্বা করা। (৩) মেসওয়াক করা (৪) নাকে পানি দেওয়া (৫) নখ কাটা (৬) আঙ্গুলের জোড়াগুলি ধৌত করা। (৭) বগলের পশম উঠিয়ে ফেলা (৮) নাভীর নীচের পশম পরিষ্কার করা (৯) এস্তেনজা করা। -মুসলিম শরীফ
উপরোক্ত নীতিগুলি আরও একবার পড়ুন এবং এগুলির গুরুত্ব ও উপকারিতার বিষয়ে চিন্তা করুন।
গোঁফ লম্বা হয়ে গেলে পানাহার মাকরূহ হয়ে যায়। যে সকল খাদ্য-বস্তু মোঁচ ছুঁয়ে মুখের ভেতর প্রবেশ করবে সেগুলির পবিত্রতা সংশয় যুক্ত হয়ে পড়বে।
দাঁড়ি পুরুষের জন্য সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক। ইসলামের প্রতীক-চিহ্ন ও হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত।
মেসওয়াকের উপকারিতা কে অস্বীকার করতে পারে? মেসওয়াক সম্পর্কে উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত নিম্নের হাদীসখানি লক্ষ্য করুন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
السواك مطهرة للفم مرضاة للرب
"মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা এবং মহান রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির মাধ্যম।"- নাসায়ী শরীফ
নাকে পানি দেওয়া এবং তা পরিষ্কার রাখা স্বাস্থ্য ও পবিত্রতা উভয় দিক থেকেই অতিশয় জরুরী। নখ কাটা, আঙ্গুলের জোড়া ইত্যাদি ধৌত করা এবং এগুলির খেলাল করা পাক পবিত্রতার জন্য কোন অংশেই কম জরুরী নয়।
বগলের লোম এবং নাভীর নিম্নাংশের লোম পরিষ্কার করা এতো জরুরী যে, যে ব্যক্তি দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এগুলি পরিষ্কার না করবে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে পানাহার করাকে মকরূহ বলেছেন।
এস্তেঞ্জা অর্থাৎ উত্তমরূপে শৌচকার্য করা পবিত্রতা লাভের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এতদ্ব্যতীত না শরীর পবিত্র থাকে, না পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র থাকে।