📄 আল্লাহ কেন মানুষ সৃষ্টি করেছেন
দুনিয়াতে মানুষের আগমন ও জীবনের লক্ষ্য হলো, আল্লাহ তাআলার বিধি-বিধানের বাস্তবায়ন তথা তাঁর ইবাদত-বন্দেগী করা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। অর্থাৎ ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সূরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬]
সূরা যারিয়াতের এ আয়াতে উঠে এসেছে মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি? আর ইবাদতই বা কি?
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগী করা। আর ইবাদত হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথে ও মতে জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ ‘ইবাদত’ শব্দটি ‘আবদ’ শব্দ হতে এসেছে। আর ‘আবদ’ অর্থ হলো দাস বা গোলাম। সুতরাং ‘লিয়া’ বুদুন তথা ইবাদত’ মানে হলো, আল্লাহর গোলামি করা বা বন্দেগি করা। আর দুনিয়াতে যে ব্যক্তি আল্লাহর গোলামি করবে, ওই ব্যক্তিই সফলকাম।
ইবাদত সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা! মানুষ মনে করে, কুরআনে নির্দেশ পালনে নামাজ আদায় করা, রোজা ও হজ পালন করা, জাকাত দেয়া, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার, কুরআন তেলাওয়াত করার নামই ইবাদত। না, ইবাদত মানে তা নয়।
ইসলামের সকল বিধিবিধান পালন করা এবং আল্লাহ তাআলার যা নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকার নাম ইবাদত। কিন্তু মিথ্যা কথা বলে, সুদ-ঘুষে জড়িত থেকে লোক দেখানো ইবাদত করে, বেহায়াপনা, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ও মুনাফেকির সঙ্গে লিপ্ত থেকে শুধুমাত্র নামাজ রোজার মতো অন্যান্য আমল করার নাম ইবাদত নয়।
কুরআন-সুন্নাহর নিষেধগুলো পরিত্যাগ করে আদেশ পালন হলো ইবাদত তথা বন্দেগি। কারণ, ইবাদত হলো আল্লাহ তাআলা হুকুম-আহকাম যথাযথভাবে পালন করা। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআনে পাকে নির্দেশ প্রদান করেছেন-
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ .
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। [সুরা হাশর: আয়াত ৭]
টিকাঃ
৭৯ দা রিযাল লাউড
📄 প্রতিপালক হিসাবে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ওই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসুল হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে সন্তুষ্ট।৭৯
আল্লাহকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো তাকদির ও আল্লাহর ব্যবস্থার উপর সন্তুষ্ট থাকা। অর্থাৎ অন্তরে বিশ্বাস রাখা বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা তার জন্য ক্ষতিকর নয় এবং যা তার জন্য ক্ষতিকর, তা তার জন্য নির্ধারিত করা হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে যে সকল বিষয় তার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। বান্দা যখন আল্লাহকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেবে, তখন আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। আর কারো প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হলে তিনি তাকে সন্তুষ্ট করবেন এবং তাকে হেফাজত করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহ তাআলার প্রতি সন্তুষ্ট। [সুরা মায়েদা, আয়াত: ১১৯]
হাসান ইবনে উরওয়াহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলতেন, আমার সঙ্গে আমার রবের আচরণ কতই না চমৎকার। তিনি আমার থেকে একটা অঙ্গ নিয়েছেন বাকি তিনটা অঙ্গ রেখে দিয়েছেন।
ক্যান্সারের কারণে তার হাঁটুর দিক থেকে একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল [কিতাবুজ জুহদ] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন! আমার উম্মতের সকলে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যারা অস্বীকার করে তারা প্রবেশ করবে না। সাহাবিরা বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অস্বীকারকারী কারা? তিনি বলেন, যারা আমার আনুগত্য করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যারা আমার অবাধ্য করবে, তারাই হলো অস্বীকারকারী।৮০
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুগত সম্পর্কে সুরা নিসার ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا .
হে নবি আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা কখনও ঈমানদার হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তারা আপনাকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক না করে এবং আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোনো অনীহা বা দুঃখ না থাকে এবং যে পর্যন্ত তারা আপনার বিচারকে সম্পূর্ণরূপে মনেপ্রাণে না মেনে নেয়।
রাসুল হিসেবে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সন্তুষ্ট থাকার দাবি হলো-তাঁর সকল কথাকে বিশ্বাস করা, তাঁকে ভালোবাসা, তাঁর আদেশসমূহ মেনে চলা, নিষিদ্ধ বিষয়কে বর্জন করা। তাঁর আনীত দ্বীন তথা জীবন-বিধানকে জীবনের পন্থা হিসেবে গ্রহণ করা।
টিকাঃ
*. সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৬, সহিহ মুসলিম ৩৪
৮০ বুখারী ৭২৮০
📄 দুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি?
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْكِنْدِيُّ، حَدَّثَنَا زَيْدُ بْنُ حُبَابٍ، أَخْبَرَنِي الْمَسْعُودِيُّ، حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ مُرَّةَ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ عَلْقَمَةَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ نَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى حَصِيرٍ فَقَامَ وَقَدْ أَثَرَ فِي جَنْبِهِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوِ اتَّخَذْنَا لَكَ وِطَاءً . فَقَالَ " ما لِي وَمَا لِلدُّنْيَا مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا " . قَالَ وَفِي الْبَابِ عَنْ عُمَرَ وَابْنِ عَبَّاسٍ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثُ حَسَنٌ صَحِيحُ .
আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ আলাইহি ওয়া সালাম কোনো একসময় খেজুর পাতার মাদুরে শুয়েছিলেন। তিনি ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে দাঁড়ালে দেখা গেল, তার গায়ে মাদুরের দাগ পড়ে গেছে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা আপনার জন্য যদি একটি নরম বিছানার (তোষক) ব্যবস্থা করতাম। তিনি বললেন, দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি এমন একজন পথচারী মুসাফির ছাড়া তো আর কিছুই নই, যে একটি গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলো, তারপর তা ছেড়ে দিয়ে গন্তব্যের দিকে চলে গেল। ৮২
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُحَمَّدٍ، عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ " . وَفِي الْبَابِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ .
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া (পার্থিব জীবন) মুমিনদের জন্য কারাগারস্বরূপ এবং কাফিরদের জন্য জান্নাত স্বরূপ।৮৩
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আল্লাহ যখন কাউকে ভালোবাসেন, তখন তাকে দুনিয়া থেকে সেভাবে দূরে রাখেন, যেভাবে তোমরা অসুস্থ ব্যক্তিকে পানি থেকে দূরে রাখো।৮৪
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার জন্য যা কল্যাণকর, তা অর্জনের জন্য তুমি প্রলুব্ধ হও আর আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও। কখনই হতাশ হয়ো না। যদি কখনো বিপদে পড়, তবে কখনই এ-কথা বলবে না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম, তাহলে তো আর এটি হতো ন! বরং তুমি বলবে, সবই আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত ব্যাপার; তিনি যা ইচ্ছা তা করেছেন। কেননা 'যদি' (কথাটি) শয়তানের কাজের পথ খুলে দেয়।৮৫
টিকাঃ
৮১ আল-মুদহাশ, ২৭০ পৃষ্ঠা
• জামেআত-তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৭৭
৮৩. জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২৩২৪
৮৪. ইবনু হিব্বان, আস-সহিহ: ২/৪৪৪; আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৪/২১০
৮৫. সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪
📄 নির্ভর গুনাহ
ইবনুল জাওজি রহিমাহুল্লাহ বলেন, গুনাহ থেকে সাবধান! গুনাহ থেকে সাবধান! বিশেষত নির্জনের গুনাহ থেকে। কেননা, আল্লাহর সঙ্গে দ্বন্দ্ব করা বান্দাকে আল্লাহর চোখে মূল্যহীন করে দেয়। তোমার ও আল্লাহর মাঝের নিভৃতের অবস্থাকে সংশোধন কর; তবে তিনি তোমার বাহ্যিক অবস্থাগুলো সংশোধন করে দিবেন।৮৬
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের রব বলেন, হে বনি আদম তুমি আমার ইবাদতের জন্য মনোনিবেশ করো, আমি তোমার অন্তরকে সচ্ছলতায় ভরে দেব, তোমার হাত রিজিক দ্বারা পূর্ণ করে দেব। হে বনি আদম, তুমি আমার থেকে দূরে যেয়ো না। ফলে আমি তোমার অন্তর পূর্ণ করে দেব এবং তোমার দুহাতকে কর্ম ব্যস্ত করে দেব।৮৭
ফুজাইল রহিমাহুল্লাহ বলেন, সুসংবাদ তার জন্য যে মানুষের মাঝে নির্জনতা বোধ করে এবং আল্লাহ ও তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যায়।
টিকাঃ
৮৬. সাইদুল খাত্বের, পৃষ্ঠা-২০৭
৮৭. সহিহ হাদিসে কুদসি, হাদিস নং ২৭