📄 দুনিয়াটা একটা পরীক্ষার ময়দান
আল্লাহ কাউকে সাধ্যতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَ عَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ *
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা কখনো দেন না। প্রত্যেকেই যা ভালো করেছে তার পুরস্কার পায়, যা খারাপ করেছে তার পরিণাম ভোগ করে। [সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬]
মানুষের জীবনে নানান কষ্ট ভেসে আসে। প্রতিটা কষ্টে মানুষ কিছু না কিছু হারায়।
কেউ কেউ হয়তো ভাবেন, মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা কে এতো মেনে চললাম তাও কষ্ট দিলেন, চাকরিটা কেড়ে নিলেন, ফসল নষ্ট করে দিলেন কিংবা প্রিয়জন কেড়ে নিলেন! স্রষ্টার প্রতি হয়তো বিশাল অভিমান, কী অপরাধে স্রষ্টা এত কষ্ট দিচ্ছেন? অথচ একবারের জন্য হলেও ভাবা উচিত, আমাদের এই জীবনটা পরীক্ষার কেন্দ্র আমাদের থেকে আল্লাহ যা কিছু নেন। তার থেকে অনেক বেশিই তিনি আমাদের দেন যদি আমরা ধৈর্যধারণ করতে পারি।
وَ أَنَّهُ هُوَ أَمَاتَ وَأَحْيَا.
তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষকে হাসান এবং কাঁদান। তিনিই তো মৃত্যু দেন, জীবন দেন। [সুরা নাজম, আয়াত: ৪৩]
সুরা বাকারা, ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ .
নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে পয়গম্বর!) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।
এই পার্থিব জগৎ হলো একটি পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকেই পরীক্ষা করেন। তবে সবার পরীক্ষা একই স্তরের নয়। আল্লাহ যাকে যেমন জ্ঞান, মেধা এবং জীবনোপকরণ দিয়েছেন, তাকে ঠিক তার অনুপাতেই পরীক্ষা করা হবে। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কিংবা জালেমের হাত থেকে মজলুমকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টিও একটি পরীক্ষা। আল্লাহ পাক দেখতে চান মানুষ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে কিনা। এছাড়া আর্থিক অনটন, দারিদ্র, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এসবই পরীক্ষা হিসেবে মানুষের জীবনে আসে। মানুষ এসব বালা-মুসিবতের সময় কী ধরনের আচরণ করে, তাই পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। তবে আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, তিনি মানুষকে চেনেন না, মানুষের প্রকৃতি তাঁর জানা নেই। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ পাক মানুষকে পরীক্ষার মাধ্যমে তার ভেতরে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে চান এবং মানুষকে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার লাভের উপযোগী করতে চান।
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
তারাই 'ধৈর্যশীল যারা বিপদের সময় বলে আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই দিকে ফিরে যাব।
আগের আয়াতে ধৈর্যশীলদের পুরস্কার দেয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে ধৈর্যশীলদের পরিচয় দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তারাই প্রকৃত ধৈর্যশীল যারা সংকট ও বিপদের সময় অধৈর্য ও হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখে। যারা বিশ্বাস করে জীবনের শুরু এবং শেষ আল্লাহরই হাতে তারা সব বিষয়েই আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে পারে। মূলত পৃথিবী স্থায়ী বাসস্থান নয়। পৃথিবী হলো পরীক্ষার ময়দান।
এখানে কষ্ট ও দুঃখ হলো পরীক্ষার উপকরণ। কিন্তু মানুষ সমস্যা ও বিপদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করে। অনেকের ধৈর্য খুব কম। অল্পতেই তারা অধৈর্য হয়ে পড়েন এবং বিপদাপদে কুফরি সুলভ কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করেন। আবার অনেকেই আছেন, বিপদে ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুলে তাঁর সাহায্য কামনা করেন। আবার এমন অনেকেই আছেন, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারণ তাঁরা বিপদ-সংকটকে নিজেদের আত্মাকে শক্তিশালী করার মাধ্যম বলে মনে করেন।
এরপর ১৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-
أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েতপ্রাপ্ত। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫]
এই আয়াতটিতে ধৈর্যশীলদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করবেন। আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহই তাদেরকে সুপথে চলার শক্তি ও সামর্থ্য যোগাবে।
বিপদের সময় বেশি বেশি করে ইস্তেগফার পড়তে হবে। কেননা আমাদের পাপের কারণে আমাদের উপর বিপদ আসে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
أَوَ لَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُوْنَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ.
তারা কি লক্ষ্য করে দেখে না যে, প্রতিবছর তাদের উপর দুই-একবার বিপদ আসছে? এর পরও ওরা তওবা করে না, উপলব্ধি করার চেষ্টা করে না। [সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ১২৬]
আপনি যদি দেখেন বিপদ-মুসিবত আপনাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে বুঝবেন আল্লাহ আপনার কল্যাণ কামনা করছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আল্লাহ যার ভালো চান তাকে দুঃখ কষ্টে ফেলেন। ৬৮
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, যদি কারো উপর কোনো কষ্ট আসে, আল্লাহ তাআলা এর কারণে তার গুনাহসমূহ ঝরিয়ে দেন; যেমনভাবে গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে। ৬৯
মানুষের প্রতিটা কষ্টের সঙ্গে সুখ মিশে আছে। ধৈর্যশীল মানুষ সেই সুখের অপেক্ষা করেন। তারা জানেন, জীবনে যত ঝড় আসুক না কেন, এক সময় তা কেটে যাবে। কষ্টের এ সময়গুলোতে ধৈর্য্যের সঙ্গে অবিচল থাকাই মুমিনের গুণ।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন—
إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْر
নিশ্চয়ই কষ্টের পরেই স্বস্তি রয়েছে। [সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬]
একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে কারা সবচাইতে বেশি বিপদে পড়ে? উত্তরে তিনি বলেন, নবি-রাসুলরা, আর এরপরে আল্লাহ যাকে যত বেশি ভালোবাসেন, তাকে তত বেশি পরীক্ষায় ফেলেন।
مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ
আল্লাহ যাকে বেশি ভালোবাসেন তার তত বেশি পরীক্ষা নেন।
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আপনার ভালোবাসা চাই এবং আপনাকে যে ভালোবাসে তার ভালোবাসা চাই ও সেই আমল চাই, যে আমল আপনার ভালোবাসার পাত্র করে দিবে। হে আল্লাহ, আপনার ভালোবাসা আমার নিকট যেন আমার নিজের জীবন এবং পরিবার এবং শীতল পানি থেকেও প্রিয় হয়ে যায়।
মানুষের প্রতিটি কষ্টই ক্ষণস্থায়ী। আর কষ্টের বিনিময়ে মানুষকে সর্বোত্তম বিনিময় দেওয়া হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
টিকাঃ
৬৭. bn24.islam
৬৮ • বুখারি হাদিস নং: ৫৬৪৫
৬৯ - বুখারি হাদিস নং: ৫৬৮৪
📄 আল্লাহ মানুষকে বিপদ কেন দেন
একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে কারা সবচাইতে বেশি বিপদে পড়ে? উত্তরে তিনি বলেন, নবি-রাসুলরা, আর এরপরে আল্লাহ যাকে যত বেশি ভালোবাসেন, তাকে তত বেশি পরীক্ষায় ফেলেন।
মানুষ ঈমানদার হোক আর কাফের হোক, নেককার হোক আর পাপী হোক, সবার জীবনে বিপদাপদ আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদিও আমরা অপছন্দ করি, তারপরও কেনো আমাদের জীবনে এইরকম বিপদ-আপদ আসে বা আল্লাহ কেন আমাদের পরীক্ষায় ফেলেন?
কুরআন-হাদিস থেকে এর যে কারণগুলো জানা যায়, তার মধ্যে রয়েছে-
১। মানুষকে পরীক্ষা করা : প্রকৃতপক্ষে কে ঈমানদার, কে মুনাফিক, কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী তা জেনে নেওয়া। মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারেরা অনেক সময় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে মনে রাখে, তার প্রতি অনুগত ও সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু যখন কোনো বিপদাপদ আসে তখন আল্লাহকে ভুলে যায়, কুফুরি করে বা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। আবার অনেক সময় এর বিপরীতও হয়। যখন কোনো বিপদে পড়ে, তখন অনেক কাফের মুশরিককেও আল্লাহর কাছে মনে প্রাণে দুআ করতে দেখা যায়। আর যখন আল্লাহ তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, তখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তার নিয়ামতকে অস্বীকার করে অহংকার প্রদর্শন করে, বলে এত আমার প্রাপ্য। আবার কখনো আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে বসে, আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কাউকে বিপদ-মুক্তির কারণ মনে করে।
এই বিষয়গুলো পরীক্ষা করার জন্য অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে কে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে, তা পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। আল্লাহ বলেন-
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ، وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ .
মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি। এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি অবশ্যই তাদের পূর্বে যারা ছিল, তাদেরকে পরীক্ষা করেছি। আর আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী। [সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩]
এছাড়া অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ ، فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرُ اطْمَأَنَّ بِهِ * وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ، ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তাহলে ইবাদতের উপর কায়েম থাকে। আর যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তাহলে সে পূর্বাবস্থায় (কুফুরিতে) ফিরে যায়। সে ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি। [সুরা হজ, আয়াত: ১১]
২। দুনিয়াতেই পাপের সামান্য শাস্তি দেওয়া, যাতে করে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে ও নিজেকে পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। অনেক সময় মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেও ঈমানের দুর্বলতার কারণে বা পার্থিব জীবনের লোভ-লালসার কারণে আল্লাহর অবাধ্য হয়। আল্লাহ তখন বিপদাপদ দিয়ে তাকে অসহায় করে দেন, যাতে করে সে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে আর পরকালের কথা স্মরণ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-কঠিন শাস্তির পূর্বে আমি তাদেরকে হালকা শাস্তি আস্বাদন করাবো, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। [সুরা সাজদাহ, আয়াত: ২১]
এই আয়াতে 'হালকা শাস্তি' দ্বারা পার্থিব জীবনের বিপদাপদ, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, রোগ-শোক ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে। এছাড়া সুনানে নাসায়িতে রয়েছে, হালকা শাস্তির অর্থ হলো দুর্ভিক্ষ।
৩। এছাড়া আল্লাহ তার কিছু প্রিয় বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, যাতে করে পরকালে তার মর্যাদা ও জান্নাতের নেয়ামত বৃদ্ধি করেন। অনেক সময় আল্লাহ তার বান্দাদেরকে যে মর্যাদা দিতে চান, তা ঐ বান্দা তার আমল দ্বারা অর্জন করার মতো হয় না। তখন আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেন, যদি সে এতে ধৈর্যধারণ করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ঐ মর্যাদায় উন্নীত করেন।
সুতরাং বিপদে পড়লে আমাদের এই বিশ্বাস রাখা জরুরি, আমি পাপী হলেও আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। আর এই জন্য আমাকে বিপদে ফেলে আমাকে সংশোধন করতে চাচ্ছেন, যাতে করে পরকালে যা আমাদের আসল ঠিকানা, সেখানে আমাদেরকে অনন্ত সুখের জীবন দান করেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন—যে আল্লাহকে চিনতে পারবে, সে অবশ্যই তাঁকে ভালোবাসবে। আর যে আল্লাহকে ভালোবাসবে, তার উপর থেকে কালো মেঘ সরে যাবে এবং তার হৃদয় থেকে বিদায় নেবে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা।
কাব আল আহবার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে চিনেছে, তার জন্য দুনিয়ার মুসিবত ও দুঃখ (সহ্য করা) সহজ হয়ে গেছে।
টিকাঃ
৭১. ইবনে কাসির
৭২. তারিকুল হিজরাতাইন, পৃ. ৪২০
৭৩. হিলয়াতুল আউলিয়া: ৬/৪৪
📄 বিপদের সময়ে ৩টি হাদিস
বিপদের সময়ের এই হাদিসগুলো স্মরণ করুন দুশ্চিন্তা কেটে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
এক. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যে ব্যক্তির কল্যাণ চান তাকে বিপদে ফেলেন।
দুই. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন দুনিয়াতে তার জন্য তাড়াতাড়ি বিপদাপদ নাজিল করে দেন। আর যখন তিনি তাঁর বান্দার অমঙ্গলের ইচ্ছা করেন, তখন তাকে গোনাহের মধ্যে ছেড়ে দেন। অবশেষে কিয়ামতের দিন তাকে পাকড়াও করবেন।
তিন. নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—বিপদাপদ যত বড় হয়, তার প্রতিদানও তত বড় হয়। আল্লাহ, তাআলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাদের পরীক্ষা নেন। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে তার জন্য হবে আল্লাহ সন্তুষ্টি। আর তাতে যে অসন্তুষ্ট হবে তার জন্য হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—অন্যের নিকট নিজের দুঃখ বলে বেড়ানোর অভ্যাস স্বেচ্ছায় নিজেকে লাঞ্ছিত করার নামান্তর মাত্র।
সুতরাং দুঃখ যদি বলতে হয়, তাহলে যিনি সমাধানের মালিক, যিনি দুঃখ মুছে দেওয়ার মালিক, যিনি আপনার সবকিছু সহজ করে দেওয়ার মালিক, সেই মহান আল্লাহর কাছে আপনার সবকিছু পেশ করুন।
মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার মনের ব্যথা, আকুলতা যেভাবে বুঝবেন এবং সমাধান করবেন, তা দুনিয়ার কোনো মাখলুকাতের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং যা কিছু চাওয়ার আল্লাহর কাছেই চান।
টিকাঃ
৭৪. বুখারি, রিয়াদুস সালিহিন, ৩৯
৭৫. তিরমিজি, রিয়াদুস সালিহিন, ৪৩
৭৬. তিরমিজি, হাদিস নং-২৩৯৫
📄 দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেওয়ার মতো কিছু আয়াত
আমরা সবাই শান্তি খুঁজি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই শান্তি খুঁজি যিনি শান্তির মালিক তার অবাধ্য হয়ে। যিনি শান্তির মালিক তাঁর অবাধ্য হয়ে কি শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়?
মানসিক দুশ্চিন্তা বা ডিপ্রেশনের সময় অনেকেই গান শুনে, মুভি দেখে কষ্ট ভুলবার চেষ্টা করে। আসলেই কি এভাবে দুঃখকষ্ট নিবারণ হয়? মোটেই না। বরং সাময়িক ফ্যান্টাসিতে ভোগা যায়। অথচ পবিত্র কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে, যা সত্যিই একজন মানুষের সব দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে। আসুন দেখি সেরকমই কিছু আয়াত—
سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرِ يُسْرًا
আল্লাহ কষ্টের পর সুখ দিবেন। [সুরা তালাক : ৭]
إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি। [সুরা ইনশিরাহ : ৬]
إِنَّمَا أَشْكُو بَتِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতাগুলো আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি’ [সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬]
أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ
জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য নিকটে। [সুরা বাকারা: ২১৪]
وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না। [সুরা ইউসুফ : ৮৭]
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
আল্লাহ কোনো ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের চাইতে বেশি বোঝা চাপিয়ে দেন না। [সুরা বাকারা: ২৮৬]
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
এবং অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের। [সুরা বাক্বারা : ১৫৫]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা সবর ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন। [সুরা বাকারা : ১৫৩]
وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا
হে আল্লাহ, আমি তো কখনো আপনাকে ডেকে ব্যর্থ হইনি। [সুরা মারইয়াম : ৪]