📄 আল্লাহ কাদের ভালোবাসেন না
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা একটি মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের নিন্দা করেন এবং তাদেরকে লানত ও অভিসম্পাত দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطَّعُوا أَرْحَامَكُمْ، أولَيكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَ أَعْمَى أَبْصَارَهُمْ، أَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوْبِ أَقْفَالُهَا.
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ তাআলা এদেরকেই করেন অভিশপ্ত, বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন। [সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২২-২৩]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না। [৬১]
আবু মুসা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
ثَلاثَةُ لا يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَقَاطِعُ الرَّحِمِ وَمُصَدِّقُ بالسحر.
তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। অভ্যস্ত মদ্যপায়ী, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ও যাদুতে বিশ্বাসী।।[৬২]
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীর নেক আমল আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেন না।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّ أَعْمَالَ بَنِي آدَمَ تُعْرَضُ كُلَّ خَمِيْسٍ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ، فَلا يُقْبَلُ عَمَلُ قَاطِع رَحِمٍ .
আদম সন্তানের আমলসমূহ প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে (আল্লাহ তাআলার নিকট) উপস্থাপন করা হয়। তখন আত্মীয়তার বন্ধন বিচ্ছিন্নকারীর আমল গ্রহণ করা হয় না। [৬৩]
আল্লাহ তাআলা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীর শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। উপরন্তু আখিরাতের শাস্তি তো তার জন্য প্রস্তুত আছেই।
আবু বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُعَجِلَ الله لِصَاحِبِهِ الْعُقُوْبَةَ فِي الدُّنْيَا مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْبَغْيِ وَقَطِيْعَةِ الرَّحِمِ .
দুটি গুনাহ ছাড়া এমন কোনো গুনাহ নেই যে গুনাহগারের শাস্তি আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতেই দিবেন এবং তা দেওয়াই উচিত, উপরন্তু তার জন্য আখিরাতের শাস্তি তো আছেই। গুনাহ দুটি হচ্ছে, অত্যাচার ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী। [৬৪]
কেউ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করলে আল্লাহ তাআলাও তার সঙ্গে নিজ সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার এমন কিছু আত্মীয়স্বজন রয়েছে, যাদের সঙ্গে আমি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করি; অথচ তারা আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি; অথচ তারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। আমি তাদের সঙ্গে ধৈর্যের পরিচয় দেই; অথচ তারা আমার সঙ্গে কঠোরতা দেখায়। অতএব, তাদের সঙ্গে এখন আমার করণীয় কী? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ فَكَأَنَّمَا تُسِفُهُمُ الْمَلَّ، وَلَا يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرُ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ .
তুমি যদি সত্যি কথাই বলে থাকো, তা হলে তুমি যেন তাদেরকে উত্তপ্ত ছাই খাইয়ে দিচ্ছো। আর তুমি যতদিন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে থাকবে ততদিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের ওপর তোমার জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত থাকবে।"
টিকাঃ
৬১. সহিহ বুখারি, হাদীস নং ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৫৬; তিরমিজি, হাদিস নং ১৯০৯; আবু দাউদ, হাদিস নং ১৬৯৬; আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ২০২৩৮; বায়হাকি, হাদিস নং ১২৯৯৭।
৬২. আহমদ, হাদিস নং ১৯৫৮৭; হাকিম, হাদিস নং ৭২৩৪; ইবন হিব্বান, হাদিস নং ৫৩৪৬।
৬৩. আহমদ, হাদিস নং ১০২৭৭।
৬৪. আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯০২; তিরমিজি, হাদিস নং ২৫১১; ইবন মাজা, হাদিস নং ৪২৮৬; ইবন হিব্বান, হাদিস নং ৪৫৫, ৪৫৬; বাজ্জার, হাদিস নং ৩৬৯৩; আহমাদ, হাদিস নং ২০৩৯০, ২০৩৯৬, ২০৪১৪।
*. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৫৮
📄 আল্লাহ যা ভালোবাসেন
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫]
وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
আল্লাহ পবিত্রদের ভালোবাসেন। [সুরা তাওবা, আয়াত: ১০৮]
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ المُتَطَهِّرِينَ
আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। সুরা বাকারা: ২২২
فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন। [আলে ইমরান : ৭৬]
وَ اللهُ يُحِبُّ الصَّبِرِينَ
আল্লাহ ধৈর্যশীল ব্যক্তিদের ভালোবাসেন। [আল ইমরান, আয়াত : ১৪৬]
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহ (তাঁর ওপর) নির্ভরকারীদের ভালোবাসেন। [আল ইমরান, আয়াত : ১৫৯]
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ.
আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠদের ভালোবাসেন। [সুরা মায়িদা, আয়াত: ৪২]
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانُ مَّرْصُوصٌ.
আল্লাহ সেই লোকদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে এমনভাবে কাতারবন্দি হয়ে লড়াই করে যেন তারা সিসা গলিয়ে ঢালাই করা এক মজবুত দেয়াল। [সুরা ছফ, আয়াত: ৪]
তাবিয়ি রবি ইবনু আনাস (রাহ) বলেন, মহান আল্লাহকে ভালোবাসার চিহ্ন হলো, বেশি বেশি তাঁর জিকর (স্মরণ) করা; কেননা কোনো কিছুকে বেশি করে স্মরণ করা ব্যতীত তাকে কখনোই তুমি ভালোবাসতে পারবে না।
দ্বীনের আলামত হলো, আল্লাহর জন্য ইখলাস (একনিষ্ঠতা) অবলম্বন করা। ইলমের (জ্ঞানের) পরিচয় হলো, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ভয়। কৃতজ্ঞতা আদায়ের প্রমাণ হলো, আল্লাহর ফয়সালাকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া এবং তাঁর তাকদিরের প্রতি (নিজেকে) সমর্পণ করা। ৬৬
টিকাঃ
৬৬. খুত্তালি, আল-মাহাব্বাতু লিল্লাহ: ৩২
📄 দুনিয়াটা একটা পরীক্ষার ময়দান
আল্লাহ কাউকে সাধ্যতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَ عَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ *
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা কখনো দেন না। প্রত্যেকেই যা ভালো করেছে তার পুরস্কার পায়, যা খারাপ করেছে তার পরিণাম ভোগ করে। [সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬]
মানুষের জীবনে নানান কষ্ট ভেসে আসে। প্রতিটা কষ্টে মানুষ কিছু না কিছু হারায়।
কেউ কেউ হয়তো ভাবেন, মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা কে এতো মেনে চললাম তাও কষ্ট দিলেন, চাকরিটা কেড়ে নিলেন, ফসল নষ্ট করে দিলেন কিংবা প্রিয়জন কেড়ে নিলেন! স্রষ্টার প্রতি হয়তো বিশাল অভিমান, কী অপরাধে স্রষ্টা এত কষ্ট দিচ্ছেন? অথচ একবারের জন্য হলেও ভাবা উচিত, আমাদের এই জীবনটা পরীক্ষার কেন্দ্র আমাদের থেকে আল্লাহ যা কিছু নেন। তার থেকে অনেক বেশিই তিনি আমাদের দেন যদি আমরা ধৈর্যধারণ করতে পারি।
وَ أَنَّهُ هُوَ أَمَاتَ وَأَحْيَا.
তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষকে হাসান এবং কাঁদান। তিনিই তো মৃত্যু দেন, জীবন দেন। [সুরা নাজম, আয়াত: ৪৩]
সুরা বাকারা, ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ .
নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে পয়গম্বর!) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।
এই পার্থিব জগৎ হলো একটি পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকেই পরীক্ষা করেন। তবে সবার পরীক্ষা একই স্তরের নয়। আল্লাহ যাকে যেমন জ্ঞান, মেধা এবং জীবনোপকরণ দিয়েছেন, তাকে ঠিক তার অনুপাতেই পরীক্ষা করা হবে। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কিংবা জালেমের হাত থেকে মজলুমকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টিও একটি পরীক্ষা। আল্লাহ পাক দেখতে চান মানুষ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে কিনা। এছাড়া আর্থিক অনটন, দারিদ্র, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এসবই পরীক্ষা হিসেবে মানুষের জীবনে আসে। মানুষ এসব বালা-মুসিবতের সময় কী ধরনের আচরণ করে, তাই পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। তবে আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, তিনি মানুষকে চেনেন না, মানুষের প্রকৃতি তাঁর জানা নেই। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ পাক মানুষকে পরীক্ষার মাধ্যমে তার ভেতরে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে চান এবং মানুষকে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার লাভের উপযোগী করতে চান।
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
তারাই 'ধৈর্যশীল যারা বিপদের সময় বলে আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই দিকে ফিরে যাব।
আগের আয়াতে ধৈর্যশীলদের পুরস্কার দেয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে ধৈর্যশীলদের পরিচয় দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তারাই প্রকৃত ধৈর্যশীল যারা সংকট ও বিপদের সময় অধৈর্য ও হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখে। যারা বিশ্বাস করে জীবনের শুরু এবং শেষ আল্লাহরই হাতে তারা সব বিষয়েই আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে পারে। মূলত পৃথিবী স্থায়ী বাসস্থান নয়। পৃথিবী হলো পরীক্ষার ময়দান।
এখানে কষ্ট ও দুঃখ হলো পরীক্ষার উপকরণ। কিন্তু মানুষ সমস্যা ও বিপদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করে। অনেকের ধৈর্য খুব কম। অল্পতেই তারা অধৈর্য হয়ে পড়েন এবং বিপদাপদে কুফরি সুলভ কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করেন। আবার অনেকেই আছেন, বিপদে ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুলে তাঁর সাহায্য কামনা করেন। আবার এমন অনেকেই আছেন, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করেন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারণ তাঁরা বিপদ-সংকটকে নিজেদের আত্মাকে শক্তিশালী করার মাধ্যম বলে মনে করেন।
এরপর ১৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-
أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েতপ্রাপ্ত। [সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫]
এই আয়াতটিতে ধৈর্যশীলদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করবেন। আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহই তাদেরকে সুপথে চলার শক্তি ও সামর্থ্য যোগাবে।
বিপদের সময় বেশি বেশি করে ইস্তেগফার পড়তে হবে। কেননা আমাদের পাপের কারণে আমাদের উপর বিপদ আসে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
أَوَ لَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُوْنَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ.
তারা কি লক্ষ্য করে দেখে না যে, প্রতিবছর তাদের উপর দুই-একবার বিপদ আসছে? এর পরও ওরা তওবা করে না, উপলব্ধি করার চেষ্টা করে না। [সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ১২৬]
আপনি যদি দেখেন বিপদ-মুসিবত আপনাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে বুঝবেন আল্লাহ আপনার কল্যাণ কামনা করছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—আল্লাহ যার ভালো চান তাকে দুঃখ কষ্টে ফেলেন। ৬৮
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, যদি কারো উপর কোনো কষ্ট আসে, আল্লাহ তাআলা এর কারণে তার গুনাহসমূহ ঝরিয়ে দেন; যেমনভাবে গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে। ৬৯
মানুষের প্রতিটা কষ্টের সঙ্গে সুখ মিশে আছে। ধৈর্যশীল মানুষ সেই সুখের অপেক্ষা করেন। তারা জানেন, জীবনে যত ঝড় আসুক না কেন, এক সময় তা কেটে যাবে। কষ্টের এ সময়গুলোতে ধৈর্য্যের সঙ্গে অবিচল থাকাই মুমিনের গুণ।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন—
إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْر
নিশ্চয়ই কষ্টের পরেই স্বস্তি রয়েছে। [সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬]
একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে কারা সবচাইতে বেশি বিপদে পড়ে? উত্তরে তিনি বলেন, নবি-রাসুলরা, আর এরপরে আল্লাহ যাকে যত বেশি ভালোবাসেন, তাকে তত বেশি পরীক্ষায় ফেলেন।
مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ
আল্লাহ যাকে বেশি ভালোবাসেন তার তত বেশি পরীক্ষা নেন।
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আপনার ভালোবাসা চাই এবং আপনাকে যে ভালোবাসে তার ভালোবাসা চাই ও সেই আমল চাই, যে আমল আপনার ভালোবাসার পাত্র করে দিবে। হে আল্লাহ, আপনার ভালোবাসা আমার নিকট যেন আমার নিজের জীবন এবং পরিবার এবং শীতল পানি থেকেও প্রিয় হয়ে যায়।
মানুষের প্রতিটি কষ্টই ক্ষণস্থায়ী। আর কষ্টের বিনিময়ে মানুষকে সর্বোত্তম বিনিময় দেওয়া হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
টিকাঃ
৬৭. bn24.islam
৬৮ • বুখারি হাদিস নং: ৫৬৪৫
৬৯ - বুখারি হাদিস নং: ৫৬৮৪
📄 আল্লাহ মানুষকে বিপদ কেন দেন
একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে কারা সবচাইতে বেশি বিপদে পড়ে? উত্তরে তিনি বলেন, নবি-রাসুলরা, আর এরপরে আল্লাহ যাকে যত বেশি ভালোবাসেন, তাকে তত বেশি পরীক্ষায় ফেলেন।
মানুষ ঈমানদার হোক আর কাফের হোক, নেককার হোক আর পাপী হোক, সবার জীবনে বিপদাপদ আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদিও আমরা অপছন্দ করি, তারপরও কেনো আমাদের জীবনে এইরকম বিপদ-আপদ আসে বা আল্লাহ কেন আমাদের পরীক্ষায় ফেলেন?
কুরআন-হাদিস থেকে এর যে কারণগুলো জানা যায়, তার মধ্যে রয়েছে-
১। মানুষকে পরীক্ষা করা : প্রকৃতপক্ষে কে ঈমানদার, কে মুনাফিক, কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী তা জেনে নেওয়া। মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারেরা অনেক সময় সুখস্বাচ্ছন্দ্যের সময় আল্লাহকে মনে রাখে, তার প্রতি অনুগত ও সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু যখন কোনো বিপদাপদ আসে তখন আল্লাহকে ভুলে যায়, কুফুরি করে বা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। আবার অনেক সময় এর বিপরীতও হয়। যখন কোনো বিপদে পড়ে, তখন অনেক কাফের মুশরিককেও আল্লাহর কাছে মনে প্রাণে দুআ করতে দেখা যায়। আর যখন আল্লাহ তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, তখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তার নিয়ামতকে অস্বীকার করে অহংকার প্রদর্শন করে, বলে এত আমার প্রাপ্য। আবার কখনো আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে বসে, আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কাউকে বিপদ-মুক্তির কারণ মনে করে।
এই বিষয়গুলো পরীক্ষা করার জন্য অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে কে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে, তা পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। আল্লাহ বলেন-
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ، وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ .
মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি। এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? আমি অবশ্যই তাদের পূর্বে যারা ছিল, তাদেরকে পরীক্ষা করেছি। আর আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী। [সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩]
এছাড়া অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ ، فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرُ اطْمَأَنَّ بِهِ * وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ، ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তাহলে ইবাদতের উপর কায়েম থাকে। আর যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তাহলে সে পূর্বাবস্থায় (কুফুরিতে) ফিরে যায়। সে ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি। [সুরা হজ, আয়াত: ১১]
২। দুনিয়াতেই পাপের সামান্য শাস্তি দেওয়া, যাতে করে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে ও নিজেকে পরকালের কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। অনেক সময় মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেও ঈমানের দুর্বলতার কারণে বা পার্থিব জীবনের লোভ-লালসার কারণে আল্লাহর অবাধ্য হয়। আল্লাহ তখন বিপদাপদ দিয়ে তাকে অসহায় করে দেন, যাতে করে সে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে আর পরকালের কথা স্মরণ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-কঠিন শাস্তির পূর্বে আমি তাদেরকে হালকা শাস্তি আস্বাদন করাবো, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে। [সুরা সাজদাহ, আয়াত: ২১]
এই আয়াতে 'হালকা শাস্তি' দ্বারা পার্থিব জীবনের বিপদাপদ, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, রোগ-শোক ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে। এছাড়া সুনানে নাসায়িতে রয়েছে, হালকা শাস্তির অর্থ হলো দুর্ভিক্ষ।
৩। এছাড়া আল্লাহ তার কিছু প্রিয় বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, যাতে করে পরকালে তার মর্যাদা ও জান্নাতের নেয়ামত বৃদ্ধি করেন। অনেক সময় আল্লাহ তার বান্দাদেরকে যে মর্যাদা দিতে চান, তা ঐ বান্দা তার আমল দ্বারা অর্জন করার মতো হয় না। তখন আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেন, যদি সে এতে ধৈর্যধারণ করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ঐ মর্যাদায় উন্নীত করেন।
সুতরাং বিপদে পড়লে আমাদের এই বিশ্বাস রাখা জরুরি, আমি পাপী হলেও আল্লাহ আমাকে ভালোবাসেন। আর এই জন্য আমাকে বিপদে ফেলে আমাকে সংশোধন করতে চাচ্ছেন, যাতে করে পরকালে যা আমাদের আসল ঠিকানা, সেখানে আমাদেরকে অনন্ত সুখের জীবন দান করেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন—যে আল্লাহকে চিনতে পারবে, সে অবশ্যই তাঁকে ভালোবাসবে। আর যে আল্লাহকে ভালোবাসবে, তার উপর থেকে কালো মেঘ সরে যাবে এবং তার হৃদয় থেকে বিদায় নেবে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা।
কাব আল আহবার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে চিনেছে, তার জন্য দুনিয়ার মুসিবত ও দুঃখ (সহ্য করা) সহজ হয়ে গেছে।
টিকাঃ
৭১. ইবনে কাসির
৭২. তারিকুল হিজরাতাইন, পৃ. ৪২০
৭৩. হিলয়াতুল আউলিয়া: ৬/৪৪