📄 দৃঢ়প্রত্যয় ও আল্লাহর প্রতি ভরসা
ঈমানের রুকন ৬টি। এর মধ্যে একটা তকদিরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ছাড়া একজন মানুষ কখনো মুমিন হতে পারে না। তাকদিরের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তার কোনো ইবাদত গ্রহণ যোগ্য নয়। মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ভরসা রাখলে যেকোনো বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় দীন সম্পর্কে প্রশ্ন করার জন্য মানব আকৃতি ধারণ করে জিবরিল আলাইহিস সালাম আগমন করলেন। তারপর কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। তিনি যেসব প্রশ্ন করেছিলেন, তন্মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল এই: আপনি আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
الْإِيْمَانُ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيُومِ الْآخِرِ وَبِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ، قَالَ جِبْرِيلُ: صَدَقْتَ
ঈমান হলো, আল্লাহ তাআলা, সমস্ত ফেরেশতা, আসমানি কিতাবসমূহ, সকল নবি-রাসুল, কিয়ামত দিবস এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি।
এ হাদিসের শেষ দিকে আছে তোমরা কি জানো প্রশ্নকারী লোকটি কে? সাহাবিগণ বললেন, না, আমরা জানি না, হে আল্লাহর রাসুল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তিনি হলেন জিবরিল। তিনি তোমাদেরকে দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন। ৩৪
এতে বুঝা গেল যে, এই রুকনগুলোসহ আরও যেসব বিষয় এ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে অবগত লাভ করা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত।
তাকদির সংক্রান্ত এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই।
তাকদিদের উপর ঈমান আনার ক্ষেত্রে একথাটিও মনে রাখতে হবে যে, সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহ তাআলার অধীনে এবং এগুলোর ক্ষেত্রে কেবল তার ইচ্ছাই কার্যকরী হয়। সে হিসেবে তাকদিরে বিশ্বাসের অর্থ হবে: যে কোনো বিষয় সংঘটিত হওয়ার পূর্বে আল্লাহর চিরন্তন ইলমে তা রয়েছে, এ কথার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। এ-ও বিশ্বাস করা যে, এ মহাবিশ্বে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যা আল্লাহ তাআলার চিরন্তন ইলমের সীমার বাইরে ঘটছে। আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন ও জেনেছেন, অতঃপর তার চাওয়া ও জানা অনুযায়ী সকল কিছু ঘটছে এবং ঘটবে।
তাকদিরে বিশ্বাস করার মধ্যে একথাও রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকুলের ভাগ্য, আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বেই লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। সহিহ হাদিসে এ রকমই রয়েছে। আল কুরআনেও এ দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে:
إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرُ
নিশ্চয় তা সুরক্ষিত রয়েছে কিতাবে, আর তা আল্লাহর জন্য অতি সহজ [সুরা আল হজ, আয়াত: ৭০]
তাকদিরে বিশ্বাসের মধ্যে এ বিষয়টাও রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা যা চেয়েছেন তা হয়েছে। আর যা চাননি, তা হয়নি। এ পৃথিবীর সমগ্র মানুষ যদি একত্রিত হয়ে, আল্লাহ যা চাননি তা সংঘটিত করতে চায়, তবে তারা তা পারবে না। বরং কেবল তাই সংঘটিত হবে যা আল্লাহ চান, যা তিনি ইচ্ছা করেন। বান্দার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার আওতাধীন। ইরশাদ হয়েছে-
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ، يُدْخِلُ مَنْ يَشَاءُ فِي رَحْمَتِهِ
আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তোমরা অন্য কোনো অভিপ্রায় পোষণ করবে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তিনি যাকে ইচ্ছা তার রহমতে দাখিল করেন [সুরা দাহর, আয়াত: ৩০-৩১]
দুনিয়াতে সুখী মানুষ তারাই, যারা আল্লাহর সকল সিদ্ধান্তে তাকদিরে সন্তুষ্ট থাকে এবং সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর ভরসা করে।
তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা করা) মানে এই নয় যে, কোনো কাজ না করে সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। বরং তাওয়াক্কুল হলো, উপকরণ সংগ্রহ করে সাধ্যানুযায়ী কাজ করে যাওয়া এবং সফলতার জন্য দুআ করা। বান্দার কাজ এটুকুই। বাকি কাজ আল্লাহই করে দেবেন এই আশা রাখা।
বিশ্বাস রাখতে হবে, এই উপায়-উপকরণ বা কাজের মাধ্যমে কোনো সফলতা আসবে না, বরং আল্লাহই সফলতা দেওয়ার একমাত্র মালিক। আল্লাহ, চাইলে কোনো উপকরণ ছাড়াও সাহায্য করতে পারেন আবার উপকরণ দিয়েও সাহায্য করতে পারেন। যেমন: ইবরাহিম আলাইহিমুস সালামকে তিনি কোনো উপকরণ ছাড়াই আগুন থেকে মুক্তি দিয়েছেন আবার মুসা আলাইহিস সালামের নির্দেশে সামান্য লাঠির আঘাতে সমুদ্র/নদীতে রাস্তা তৈরির মাধ্যমে সাহায্য করেছেন। আল্লাহ, দুটোই করতে সক্ষম। তবে, সুন্নাহ বা ইসলামের নিয়ম হলো, বান্দা সাধ্যানুযায়ী উপকরণ সংগ্রহ করবে, অতঃপর আল্লাহর উপর নির্ভর করবে। এটিই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল। অনেকে পাখির হাদিস থেকে ভুল ধারণা নিয়ে বলেন যে, সঠিকভাবে তাওয়াক্কুল করলে উপকরণের প্রয়োজন নেই। অথচ সেই হাদিসেই বলা হয়েছে, পাখি শুধু তাওয়াক্কুল করে তার নীড়ে বসে থাকে না, বরং খাবারের খোঁজে বেড়িয়ে পড়ে।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যদি তোমরা সঠিকভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করতে, তবে তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে পাখির মতো রিযিক দিতেন। ভোরবেলা পাখিরা খালিপেটে (বাসা থেকে) বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যাবেলা ভরা পেটে (বাসায়) ফিরে আসে।"
ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাওয়াক্কুলের রহস্য ও তাৎপর্য হলো, বান্দার অন্তর এক আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া, জাগতিক উপকরণের প্রতি অন্তর মোহশূন্য থাকা, সেগুলোর প্রতি আকৃষ্ট না হওয়া। (এই বিশ্বাস রাখা যে,) এসব উপায়-উপকরণের সরাসরি কোনো ক্ষতি কিংবা উপকার করার ক্ষমতা নেই।
মারইয়াম আলাইহাস সালাম ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। আমরা ভালো করেই জানি যে, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী শারীরিক এবং মানসিকভাবে কতটা দুর্বল থাকেন। আবার আমরা এ-ও জানি, খেজুর গাছের ভিত্তি পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শক্ত ও মজবুত ভিত্তি। যত বড় তুফানই আসুক খেজুর গাছকে সমূলে উপড়াতে পারে না। মারইয়াম আলাইহাস সালাম ছিলেন আল্লাহর খুবই প্রিয় বান্দি। তিনি মসজিদে থাকতেন। তাঁর জন্য জান্নাতের খাবার পাঠানো হতো। এগুলো সব কুরআনেই আছে। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হলো-
وَ هُزَى إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسْقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا
তুমি তোমার দিকে খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দাও। এটি তোমার উপর পাকা খেজুর নিক্ষেপ করবে। [সুরা মারইয়াম, আয়াত: ২৫]
এই ঘটনা থেকে আমাদের অন্যতম শিক্ষা হলো, আল্লাহ, তাআলা ইচ্ছা করলে এমনিতেই খেজুর নিক্ষেপ করতে পারতেন। তবু তিনি মারইয়ামকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্য দিয়ে রিজিক পৌঁছিয়েছেন। অথচ তিনি ছিলেন তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল। উপকরণ খুব তুচ্ছ হতে পারে, তবু সেটি নিয়েই তাওয়াক্কুল করতে হবে। যেমনটি করেছিলেন মুসা আলাইহিস সালাম মারইয়াম আলাইহাস সালাম এবং অন্যরা।
হাদিসে এসেছে, তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর উপর সুধারণা পোষণ করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ না করে।
শায়খ আবু জায়েদ খালিদ আল হুসাইনান (তাকাব্বালাল্লাহু লাহু) বলেন, বান্দা যখন তার রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করে, তখন আল্লাহ তাআলা তার বরকতের দরজাসমূহ এমন ভাবে খুলে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। তাই হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করবে; তাহলে তুমি আল্লাহর কাছ থেকে এমন কিছু দেখতে পাবে, যা তোমাকে আনন্দিত করবে।
হাফিজ ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখনই বান্দা আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা, ভালো আশা এবং যথার্থ ভরসা করে, তখন আল্লাহ, কিছুতেই তার আশা ভঙ্গ করেন না। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোনো আশা পোষণকারীর আশা ব্যর্থ করেন না এবং কোনো আমলকারীর আমল বিনষ্ট করেন না।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عُرِضَتْ عَلَيَّ الْأُمَمُ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ وَمَعَهُ الرُّهَيطُ وَالنَّبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلانِ وَالنَّبِيَّ لَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ إِذْ رُفِعَ لِي سَوَادُ عَظِيمٌ فَظَنَنْتُ أَنَّهُمْ أُمَّتِي فَقِيلَ لِي : هَذَا مُوسَى وَقَوْمُهُ وَلَكِنِ انْظُرْ إِلَى الأُفُقِ فَنَظَرْتُ فَإِذَا سَوَادُ عَظِيمٌ فَقِيلَ لِي : انْظُرْ إِلَى الْأُفُقِ الْآخَرِ فَإِذَا سَوَادُ عَظِيمٌ فَقِيلَ لِي : هَذِهِ أُمَّتُكَ وَمَعَهُمْ سَبْعُونَ أَلفاً يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ولا عَذَابٍ ثُمَّ نَهَضَ فَدَخَلَ مَنْزِلَهُ فَخَاضَ النَّاسُ فِي أُولئكَ الَّذِينَ يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ ولا عَذَابٍ فَقَالَ بَعْضُهُمْ : فَلَعَلَّهُمْ الَّذِينَ صَحِبوا رسولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَالَ بَعْضُهُمْ : فَلَعَلَّهُمْ الَّذِينَ وُلِدُوا فِي الإِسْلَامِ فَلَمْ يُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيئاً - وَذَكَرُوا أَشِيَاءَ فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ رَسُولُ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ مَا الَّذِي تَخُوضُونَ فِيهِ ؟ فَأَخْبَرُوهُ فَقَالَ هُمُ الَّذِينَ لَا يَرْقُونَ وَلَا يَسْتَرقُونَ وَلَا يَتَطَيَّرُونَ وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ فَقَامَ عُكَّاشَةُ ابْنُ مِحْصَنٍ فَقَالَ : ادْعُ الله أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ فَقَالَ أَنْتَ مِنْهُمْ ثُمَّ قَامَ رَجُلٌ آخَرُ فَقَالَ : ادْعُ اللَّهُ أَنْ يَجْعَلَنِي مِنْهُمْ فَقَالَ سَبَقَكَ بِهَا عُكَاشَةُ مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত-
আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমার কাছে সকল উম্মত পেশ করা হলো। আমি দেখলাম, কোনো নবির সঙ্গে কতিপয় (৩ থেকে ৭ জন অনুসারী) লোক রয়েছে। কোনো নবির সঙ্গে এক অথবা দুইজন লোক রয়েছে। কোনো নবিকে দেখলাম তাঁর সঙ্গে কেউ নেই। ইতোমধ্যে বিরাট একটি জামাআত আমার সামনে পেশ করা হলো। আমি মনে করলাম, এটিই আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হলো যে, 'এটি হলো মুসা ও তার উম্মতের জামাআত কিন্তু আপনি অন্য দিগন্তে তাকান।' অতঃপর তাকাতেই আরও একটি বিরাট জামাআত দেখতে পেলাম। আমাকে বলা হলো যে, 'এটি হলো আপনার উম্মত। আর তাদের সঙ্গে রয়েছে এমন ৭০ হাজার লোক, যারা বিনা হিসাব ও আজাবে বেহেশত প্রবেশ করবে।'
এ কথা বলে তিনি উঠে নিজ বাসায় প্রবেশ করলেন। এদিকে লোকেরা ঐ বেহেশতি লোকদের ব্যাপারে বিভিন্ন আলোচনা শুরু করে দিলো, যারা বিনা হিসাব ও আজাবে বেহেশতে প্রবেশ করবে। কেউ কেউ বলল, 'সম্ভবত ঐ লোকেরা হলো তারা, যারা আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবা।' কিছু লোক বলল, 'বরং সম্ভবত ওরা হলো তারা, যারা ইসলামে জন্মগ্রহণ করেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করেনি।' আরও অনেকে অনেক কিছু বলল। কিছু পরে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকট বের হয়ে এসে বললেন, তোমরা কী ব্যাপারে আলোচনা করছ? তারা ব্যাপার খুলে বললে তিনি বললেন, ওরা হলো তারা, যারা ঝাড়ফুঁক করে না, ঝাড়ফুঁক করায় না এবং কোনো জিনিসকে অশুভ লক্ষণ মনে করে না, বরং তারা কেবল আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখে।
এ কথা শুনে উক্কাশাহ ইবনে মিহসান উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, '(হে আল্লাহর রসূল!) আপনি আমার জন্য দুআ করুন, যেন আল্লাহ আমাকে তাদের দলভুক্ত করে দেন!' তিনি বললেন, তুমি তাদের মধ্যে একজন। অতঃপর আর এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনি আমার জন্যও দুআ করুন, যেন আল্লাহ আমাকেও তাদের দলভুক্ত করে দেন।' তিনি বললেন, উক্কাশাহ (এ ব্যাপারে) তোমার অগ্রগমন করেছে।
وَ يَرْزُقُهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَ مَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُه . إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا.
এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দিবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তার উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।[ সুরা তালাক, আয়াত : ৩]
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন তিনি বললেন, হাসবুনাল্লাহু ওয়া-নি'মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক)। আর লোকেরা যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথিদের বলল, (শত্রু বাহিনীর) লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হচ্ছে, তাই তোমরা তাদের ভয় কর, তখন তাদের ঈমান বেড়ে গেল এবং তারা বলল, হাসবুনাল্লাহু ওয়া-নি'মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম অভিভাবক)
টিকাঃ
৩৪. মুসলিম ৮, তিরমিজি ২৬১০, নাসায়ি ৪৯৯০, আবু দাউদ ৪৬৯৫, ইবন মাজাহ ৬৩, আহমদ ১৮৫, ১৯২, ৩৬৯, ৩৭৬, ৫৮২২
**. ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৪১৬৪; হাদিসটি সহিহ
*. বুখারি ৫২৭০, মুসলিম ২২০নং
📄 হাদিসের শিক্ষা ও মাসায়েল
এক. হাসবুনাল্লাহু ওয়া-নি'মাল ওয়াকিল দুআটির ফজিলت প্রমাণিত হলো। এ দুআটি যেমন মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সালাম চরম বিপদের মুহূর্তে পাঠ করেছিলেন, তেমনি সাইয়েদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বিপদের সময় তা পাঠ করেছেন।
দুই. মানুষের পক্ষ থেকে আগত আঘাত, আক্রমণ ও বিপদের সময় এ দুআটি পাঠ করা আল্লাহ তাআলার প্রতি তাওয়াক্কুলের একটি বড় প্রমাণ। তাই তো যখন মানুষেরা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, তখন তিনি এ দুআটি পড়েই আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের প্রমাণ রেখেছিলেন। একইভাবে উহুদ যুদ্ধের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির পর যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম আবার শত্রু বাহিনীর আক্রমণের খবর পেলেন, তখন তারা এ দুআটি পাঠ করে আল্লাহর ওপর নির্ভেজাল তাওয়াক্কুলের প্রমাণ দিয়েছেন।
তিন. এ দুআটি আল্লাহর কাছে এত প্রিয় যে, তিনি তাঁর পবিত্র কালামে এ দুআ পড়ার ঘটনাটি তুলে ধরেছেন। আর যারা এটি পড়েছেন তাদের প্রশংসা করেছেন।
চার. শত্রুর পক্ষ থেকে আগত ভয়াবহ বিপদ বা আক্রমণের মুখে এ দুআটি সে-ই পড়তে পারে, যার ঈমান তখন বেড়ে যায়। যে পাঠ করে তার ঈমান যে বৃদ্ধি পেয়েছে তা-ও বুঝা যায়।
পাঁচ. দুআটি পাঠ করতে হবে অন্তর দিয়ে। অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি করে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এমনভাবে পাঠ করেছিলেন বলেই আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। আর সাইয়েদুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম এমনভাবে পাঠ করতে পেরেছিলেন বলেই তো তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছিল, ফলে শত্রুরা ভয়ে পালিয়ে ছিল। এমন যদি হয় যে, শুধু মুখে বললাম, কিন্তু কি বললাম তা বুঝলাম না। তাহলে এতে কাজ হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়।
ছয়. 'হাসবুনাল্লাহ' আর 'হাসবিআল্লাহ'-এর পার্থক্য হলো, এক বচন ও বহু বচনের। প্রথমটির অর্থ আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর দ্বিতীয়টির অর্থ হলো, আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। এক বচনে হাসবি আল্লাহ.. আর বহু বচনে হাসবুনাল্লাহ... বলতে হয়। ইবারহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন একা। তাই তিনি হাসবি আল্লাহ... বলেছেন।
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর আমার কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে গুহায় ছিলাম, আমি মুশরিকদের পদচারণা প্রত্যক্ষ করছিলাম, আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কেউ যদি পা উঠায় তাহলেই আমাদের দেখে ফেলবে, তিনি বললেন, আমাদের দুজন সম্পকে তোমার কী ধারণা? আমাদের তৃতীয়জন হলেন-আল্লাহ। অর্থাৎ তিনি আমাদের সাহায্যকারী।
إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللهُ إِذْ اَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَ جَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَ كَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.
যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন যখন কাফিররা তাকে বের করে দিল, সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন। যখন তারা উভয়ে পাহাড়ের একটি গুহায় অবস্থান করছিল, সে তার সঙ্গীকে বলল, 'তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন'। অতঃপর আল্লাহ তার উপর তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং তাকে এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা সাহায্য করলেন, যাদেরকে তোমরা দেখোনি এবং তিনি কাফিরদের বাণী অতি নিচু করে দিলেন। আর আল্লাহর বাণীই সুউচ্চ। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। [সুরা তাওবা, আয়াত: ৪০]
📄 হতাশাগ্রস্তদের জন্য সুসংবাদ
আল জাব্বার মহামান্বিত সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দার শরীর ও মনের ভাঙন ঠিক করে দেন। আল্লাহ, বিস্ময়করভাবে বান্দার ভাঙা হৃদয়ে জোড়া লাগিয়ে দেন। আপনার অন্তরটা যদি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে 'আল জাব্বারের' কাছে বলুন। তিনি আপনার ভাঙা হৃদয়ে জোড়া লাগিয়ে দিবেন।
আল্লাহ হচ্ছেন جبار জাব্বার। জাব্বার শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে ভাঙা জিনিসে জোড়া লাগানো।
আপনার ব্যথা যত পীড়াদায়কই হোক না কেন, আপনি যতই দুর্বল হন না কেন, বিপদাপদ আপনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে আল জব্বারের কাছে বলুন, তিনি সেটাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে জোড়া লাগিয়ে দিতে সক্ষম।
আপনি জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে আপনি শত দ্বিধা আর দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ 'আল জব্বার' আপনার অগোছালো জীবনকে এক নিমিষেই গুছিয়ে দিতে পারেন আর অনিয়ন্ত্রিত জীবনকে সুশৃঙ্খল করে দিতে পারেন।
সমস্যার আবর্তে দিশেহারা, যার সামনে কোনো পথই খোলা নেই, পরিস্থিতির উপর যার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এমন মানুষের পাশে যে সত্তা দাঁড়ান, তিনি হচ্ছেন আল জাব্বার। আপনি সেজদায় পড়ে যান, অবনত হয়ে দুআ করতে থাকেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে আল জাব্বারের উপর ভরসা করুন, তিনি আপনার জীবনে সব অসাধ্যকে সাধন করবেন আর অসম্ভবকে করে দিবেন সম্ভব।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আজ-জাওজিয়া বলেন, যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে, তাদের জন্য কষ্টকর সকল কাজ সহজ হয়ে যায়, যখন তারা জানেন যে, আল্লাহ তাদেরকে শুনছেন। ৪১
দুঃচিন্তা করবেন না। আল্লাহর সাহায্য বান্দার জীবনে বিপদ-আপদ আর দুঃখ-কষ্ট আর কঠিন সময়ের অনুপাতে আসে। আপনি যত ব্যথা পাবেন, বিপরীতে ততই আরামের ব্যবস্থা আল্লাহ, আপনার জন্য করে দিবেন। আপনি যত বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন, আল্লাহ আপনাকে তত বেশি প্রতিদান দিবেন। আপনি যতখানি আক্রান্ত হবেন, আল্লাহ তার চাইতে বেশি আপনাকে আরোগ্য আর নিরাপত্তা দিবেন।
আপনি আল্লাহর জন্য যত বড় স্যাক্রিফাইস করবেন, আল্লাহ আপনাকে ততবড় প্রতিদান দিয়ে অন্তর প্রশান্ত করে দিবেন।
হাদিসে এসেছে, তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর উপর সুধারণা পোষণ করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ না করে। ৪২
আপনার চোখ থেকে যত ফোঁটা অশ্রু ঝরবে, বিপরীতে আল্লাহ আপনাকে ততখানি সুখ দিবেন।
সময় যখন অনুকূলে থাকবে না, চারদিক থেকে যখন বিষণ্ণতা চেপে ধরবে, তখন একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাবেন আর বিশ্বাস রাখুন ‘আরশে আজিমে’ একজন আছেন, যিনি আপনার প্রতিটা ঘটনার সাক্ষী। যিনি আপনার চোখ থেকে পড়া প্রতিটা অশ্রুকণার চড়া মূল্য দিবেন।
যিনি আপনাকে কখনোই পরিত্যাগ করেননি আর ভবিষ্যৎও আপনাকে ছেড়ে যাবেন না। এই বিশ্বাস রাখুন, তিনি আপনাকে এমন কোনো পরীক্ষায় ফেলেন না, যা আপনার সাধ্যের বাইরে।
যখন আল্লাহর কাছে মন থেকে কিছু চাইবেন, দুআ করবেন তখন অলৌকিক এ বিশ্বাস রাখুন। পরিবেশ-পরিস্থিতি আর সময়ের কারণে আপনি হয়তো ধরে নিয়েছেন, আল্লাহর কাছে যা চেয়েছেন, তা কখনো পাওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি ভুলে গেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পরিবেশ-পরিস্থিতি আর সময়ের মুখাপেক্ষী নন। বরং আসমান-জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুই আল্লাহর মুখাপেক্ষী।
তাছাড়া দুআ করার সময় এই বিশ্বাস রাখবেন, আপনার দুআ অবশ্যই কবুল হবে। আল্লাহর নিশ্চয়ই আপনার ডাকে সাড়া দিবেন।
কারণ, সহিহ হাদিস এসেছে, অন্যমনস্ক, অমনোযোগী এবং গাফেল অন্তরের দুআ আল্লাহ কবুল করেন না। [তিরমিজি হাদিস : ৩৪৭৯]
টিকাঃ
৪১. আল-ফাওয়াঈদ
৪২. মুসলিম, আস-সহিহ: ২৮৭৭
📄 আপনি কি মাজলুম
যে আপনার সঙ্গে মিথ্যে বলেছে, আপনাকে ঠকিয়েছে, আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে—সবাইকে ক্ষমা করে দিন। এ কাজ আপনাকে সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর উপর ভরসা করতে শেখাবে। আপনাকে শেখাবে কেবল আল্লাহর উপরই ভরসা করতে আর সৃষ্টির কাছ থেকে کم প্রত্যাশা করতে।
এটা আপনাকে শেখাবে দিন শেষে আল্লাহ ছাড়া আপনার আর কোনো যাওয়ার জায়গা নেই আর কোনো শক্তি নেই। মনে রাখবেন, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কর্মের জন্য জবাবদিহি করা লাগবে আর আপনাকেও আপনার কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাই তাদের ক্ষমা করে দিন, আল্লাহর উপর ছেড়ে দিন আর দিনশেষে একটা পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে ঘুমাতে যান।
টিকাঃ
৪৩. দাওয়া পেইজ থেকে সংগৃহীত