📄 আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে, তাদেরকে ভালোবাসেন। [সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২]
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন-
لَوْلَا تَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছ না কেন? খুব সম্ভব (এতে করে) তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে। [সুরা নামল, আয়াত: ৪৬]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ তওবাকারীদের কিছু উপকারিতা আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন-
১. আল্লাহর কাছে সবচাইতে মহৎ এবং প্রিয় ইবাদত হলো তওবা। তিনি তাদের ভালোবাসেন-যারা তওবা করে। কেননা তিনি তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসেন। তিনি তাদের গুনাহের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন, যাতে করে তিনি তাদের ওপর তাঁর রহমত ও ভালোবাসার বৃষ্টি বর্ষণ করতে পারেন।
২. তওবার এমন মর্যাদা আছে, যা অন্য কোনো ইবাদতের মধ্যে নেই। এই কারণেই বান্দা তওবা করলে আল্লাহ সেই পথিকের চাইতে বেশি খুশি হন, যে মরুভূমিতে তার হারানো বাহন খুঁজে পেয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি তওবাকারীর অন্তরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। তাই তওবাকারী তার তওবার মাধ্যমে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান।
৩. তওবা মহান আল্লাহর সামনে বিনয়ী এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি নিয়ে আসে, যা কোনো ইবাদতের মাধ্যমে সহজে পাওয়া যায় না।
৪. আল্লাহ তার বান্দাদের সবচাইতে নিকটবর্তী হয়, যখন তারা ভগ্নহৃদয় থাকে। তাওবাকারী বান্দারা অনেক বেশি ইবাদত করেন। কেননা বিব্রতবোধ এবং শাস্তির ভয়ে তাদের হৃদয় ভরাক্রান্ত থাকে।
মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ আপনি কোথায় থাকেন? আল্লাহ বললেন, আমি প্রত্যেক ভগ্নহৃদয়ের ব্যক্তিদের মাঝে অবস্থান করি।
[কিতাবুল জুহদ] এই কারণে যে তিন শ্রেণির মানুষের দুআ কবুল হয়, তার মধ্যে একটা হলো ভগ্নহৃদয় (মাজলুম)। তওবাকারীদের তিনটি জিনিস মনে রাখা উচিত:
এক. গুনাহের তীব্র অনুশোচনা।
দুই. গুনাহের কারণে ভয়াবহ আজাব।
তিন. এগুলোর বিপরীতে বান্দার অসহায়ত্ব।
যারা রোদের তাপ বা পিঁপড়ার কামড় সহ্য করতে পারে না, তারা কী করে জাহান্নামের আগুন, লোহার হাতুড়ি দিয়ে ফেরেশতাদের আঘাত, উটের মতো সাপের কামড় কিংবা গাধার মতো আকারের বিচ্ছুর দর্শন সহ্য করবে। আমরা আল্লাহর কাছে তার শাস্তি থেকে পানাহ চাই, যারা এই বিষয়গুলো স্মরণে রাখবে এবং তাদের পক্ষ থেকেই কেবল আন্তরিক তাওবা করা সম্ভব।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ .
হে মানুষ, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং, (দুদিনের) পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে প্রতারণা না করে। এবং সেই প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই তোমাদেরকে আল্লাহর (দয়া ও ক্ষমার ব্যাপারে) অহংকারী না করে (এবং ধোঁকা দিতে না পারে) [সুরা ফাতির আয়াত: ৫]।
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি: বরকতময় সত্তা মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এত কোনো পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, তারপরও তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আসো এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবীপূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব।"
📄 ভালোবাসা যুগা করা
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যার মধ্যে তিনটি গুণ বিদ্যমান, সে ঈমানের স্বাদ পাবে- (ক) যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সর্বাধিক ভালোবাসে। (খ) যে শুধু আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসে এবং আল্লাহর জন্যেই কাউকে ঘৃণা করে। (গ) আল্লাহ যাকে কুফরি থেকে মুক্তি দিয়েছেন, সে কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে এমনভাবে অপছন্দ করে, যেভাবে অপছন্দ করে আগুনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।"
ইমাম মুনাউয়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আজকের ভালোলাগা কালকে বিরক্তির কারণ হবে! আর আজকের খারাপ লাগা কালকের প্রশান্তির কারণ হবে! অর্থাৎ এই দুনিয়ার কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
'কোনো মানুষের উচিত নয়-কাউকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা করা। কেননা, হতে পারে-যাকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে, সে তার চেয়ে পবিত্র হৃদয়, পরিশুদ্ধ আমল এবং বিশুদ্ধ নিয়তের অধিকারী।'১৩
টিকাঃ
১২. বুখারি, হাদিস: ৫৮২৭; মুসলিম, হাদিস: ৯৪
১৩. মুনাউয়ি, ফাইদুল কাদির: ৫/৩৮০
📄 পরকালের ক্ষতি
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন-পরকালে যা উপকার করবে না তা পরিত্যাগ করার নাম হলো জুহদ তথা দুনিয়া-বিমুখতা।
আর পরকালে যা ক্ষতি করতে পারে, তা পরিত্যাগ করো।
📄 আল্লাহ তাআলা নিরাশ করেন না
হামিদ আল-লাফাফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক শুক্রবারের ঘটনা জুমআর নামাজের আর বেশি সময় বাকি নেই।
এই মুহূর্তে বাড়ির পোষ্য গাধাটি অজানা-গন্তব্যে উধাও হয়ে গেল। ওদিকে আটার কলে পড়ে আছে তার একমাত্র খাদ্য আটা। সেটি না আনলে আজ চুলায় আগুনই জ্বলবে না। আবার ফসলের জমিটা পানি শূন্যতায় ফেটে চৌচির হয়ে আছে। তাতে পানি সিঞ্চন করাও অবশ্যক হয়ে পড়েছে। ত্রিমুখী কাজের চাপ আর অত্যাসন্ন জুমআর নামাজ তার মস্তিষ্কে মিছিল শুরু করে দিলো।
তিনি নীরবে কিছুক্ষণ ভাবলেন, এর পর জাগতিক কর্মগুলোকে পদাঘাত করে ছুটে গেলেন মসজিদ পানে; প্রভুর সন্তুষ্টি ও আত্মিক প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে। নামাজ শেষ হলো। অফুরন্ত প্রশান্তি নিয়ে তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন। এর পর প্রথমেই তিনি ক্ষেতের কাছে গেলেন, এবং শুষ্ক জমি পানিতে টইটুম্বুর দেখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন।
অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন; পাশের জমির মালিক আপন ক্ষেতে পানির লাইন ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ফলে পানি উপচে পড়ে তার জমিটাও সিঞ্চিত হয়ে গেছে। বাড়িতে এসে দেখেন গাঁধাটি আস্তাবলে সুন্দর করে বাঁধা। আশ্চর্য বটে, ভেতরে প্রবেশ করে দেখন, স্ত্রী রুটি তৈরিতে ব্যস্ত।
আবার অবাক হওয়ার পালা! ব্যস্ত হয়ে তিনি স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন কীভাবে কী হলো?
উত্তরে সে বলল, হঠাৎ আমি গেটে কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। গেট খুলে দিতেই গাধাটি বাড়িতে ঢুকে পড়ল। ওদিকে এক প্রতিবেশীর আটা কলে পড়ে ছিল সে তার আটা আনতে গিয়ে ভুলে আমাদের আটা নিয়ে আসে।
পরে বুঝতে পেরে আমাদের আটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায়। স্ত্রীর বক্তব্য শুনে হামিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করে হৃদয়ের গভীর থেকে মহান প্রভুর কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন, আর বিড়বিড় করে বলল, হে আল্লাহ! আমি আপনার মাত্র একটি কর্ম সমাধা করেছি আর আপনি আমার তিন-তিনটি প্রয়োজন সমাধা করে দিয়েছেন। সত্যি আপনি মহা ক্ষমতাবান ও দয়ালু।১৪
টিকাঃ
১৪ • সূত্র, আল- কাসাসুল আদাবিয়া: পৃ. ২৮০, ২৮১