📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 হৃদ-শূলের ব্যবস্থা পত্র

📄 হৃদ-শূলের ব্যবস্থা পত্র


দয়া করে হৃদ-শুলের একটি ব্যবস্থা পত্র আমাকে দিন।" এই কৌতুহলী এবং কিছুটা দুঃখজনক অনুরোধ আমাকে করেছিলেন এক লোক, তার ডাক্তার তাকে বলেছিলেন যে, তার অক্ষমতার অনুভূতি তার দেহের কারণে হয়নি হয়েছে তার মনের কারণে। তার ভোগান্তির কারণ হলো যে, সে তার দুঃখকে অতিক্রম করতে পারছে না। দুঃখের কারণেই তার ব্যক্তি সত্ত্বায় این ভোগান্তি যেন স্থায়ী আসন পেতে বসেছে।
তার ডাক্তার তাকে আধ্যাত্মিক পরামর্শ এবং চিকিৎসা নিতে বলেছিলেন। কাজেই ঔষধের পরিভাষা হিসেবে সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "আধ্যাত্মিক কোন ব্যবস্থাপত্র আছে কি যা আমার মনের কষ্ট কমিয়ে দেবে? আমি বুঝতে পারি যে সবার জীবনের দুঃখ আসে এবং আমার উচিত অন্য সবার মত আমিও যেন তার সমনা- সামনি দাঁড়াতে সক্ষম হই। আমি সাধ্যমত চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কোন শান্তি পাইনি।" মুখে দুঃখের কালো ছায়া এবং ক্লান্ত হাসি হেসে সে আবার আমাকে বললো, "হৃদ-শুলের একটি ব্যবস্থাপত্র দিন আমাকে।”
আসলে হৃদ-শুলের 'ব্যবস্থাপত্র' আছেও। ব্যবস্থাপত্রের একটি উপাদান হলো শারীরিক ক্রিয়াকলাপ। ভুক্তভোগী অবশ্যই বসে থাক এবং গুম হয়ে চিন্তা করা এড়িয়ে চলবে। একটি সংগত অনুক্রম শারীরিক ক্রিয়াকলাপের প্রতিকল্প হিসেবে কাজ করে এবং নিষ্ফলগুম হয়ে চিন্তা করা থেকে এবং মলের এবং মধ্যের যে এলাকা খিচড়ে থাকে তা কমিয়ে ফেলে। যেখানে আমাদের প্রতিফলদিটা ঘটে। তাই আমরা ভালো-মন্দের বিচার করি এবং মনোকষ্টে ভোগী। পেশীর ক্রিয়াকলাপ হলো মস্তিষ্কের অন্য একটি অংশকে কাজে লাগানো এবং সে কারণেই খিচড়ে ভাবটিকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পরিচালনা করে এবং এভাবেই যন্ত্রণা লাঘব হয়।
একজন গ্রাম্য উকিল খুব বলিষ্ঠ দর্শনজ্ঞান লোকটির, তিনি এক দুঃখিনী মহিলাকে বলেছিলেন যে, ভগ্ন হৃদয়ের সবচেয়ে ভালো ঔষধ হলো, "একটি ঘষার বুরুশ নেন এবং হাটুতে স্থাপন করে আপনার কাজে চলে যান। পুরুষের জন্য সর্বাপেক্ষা ভালো ঔষধ হলো, একটা কুঠার হাতে নিন এবং শারীরিকভাবে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত কাঠ কুপিয়ে টুকরো টুকরো করতে থাকুন।” হৃদ-শুল পুরোপুরি এতেও নিশ্চিত নাও যায়, তবুও আপনার ভোগান্তি এতে উপশম হবে। অর্থাৎ শরীরটাকে পরাজয় মনোভাবাপন্ন অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়ার এ হলো প্রাথমিক পদক্ষেপ যা আপনার আশে পাশে ঘটতে পারে, এমনকি যদিও কাজটি করা কঠিন, এবং জীবনের স্বাভাবিক গতিতে আবার ফিরে আসাও তেমনি কষ্টকর, জীবনের কার্যকলাপের মূল ধারায় ফিরে আসুন। আগে যাদের সাথে মিশতেন তাদের সাথে খোলামেলা মেলামেশা করুন। নতুন সঙ্গ গড়ে তুলুন। হাঁটাহাঁটি ঘোড়া কিম্বা গাড়িতে চড়া, সাঁতার কাটা, খেলাধুলা এসব করে রক্ত চলাচলকে আপনার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন। মূল্যবান কিছু পরিকল্পনার মধ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ফেলুন। দিনগুলো কোন সৃজনশীল কাজে ব্যয় করুন এবং শরীরকে খাটানো যায় এমন কাজে ব্যপৃত হোন। এমন কাজে লাগুন যাতে মনের স্বাস্থ্য অটুট থাকে, কিন্তু এদিকেও লক্ষ্য রাখবেন যে, কাজটি করছেন তা যেন দামের দিক থেকে ছোট না হয় এবং তা গঠনমূলক প্রকৃতির হয়। হালকাভাবে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চললে হয়ত ব্যথা বেদনা ক্ষণস্থায়ীভাবে নিস্তেজ হতে পারে কিন্তু তা সারিয়ে তুলতে পারে না মোটেও। উদাহরণ স্বরূপ, দেখা যায় অনেকেই পার্টিতে যোগ দিচ্ছে, মদ খাচ্ছে ইত্যাদি।
হৃদ-শূল থেকে একটি চমৎকার এবং সাধারণ মুক্তির পথ হলো, দুঃখকে হটিয়ে দেয়া। আজকাল অত্যন্ত বোকামির একটি ব্যাপার দেখা যায় যে, কারো দুঃখিত হওয়াটা বা দুঃখিত ভাবটি দেখানো ঠিক নয়, অর্থাৎ কান্নাকাটি করা ঠিক নয় অথবা একজনের উচিত নয় স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুসারেও চোখের পানি ফেলে ফেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করা। এ তো প্রাকৃতিক বিধানকে অস্বীকার করার নামান্তর। যখন ব্যথা অনুভূত হয় এবং দুঃখ আসে তখন তো কান্না আসবেই। এ শান্তি পাওয়ার একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরই এই পদ্ধতি স্তুত করেছেন এবং এর নির্বিঘ্ন ব্যবহার হওয়া উচিত। ঈশ্বরের বিধানকেই।
আর এই দুঃখকে প্রতিরোধ করা একে করা, একে বোতলে পুড়ে রাখা, দুঃখের চাপ এড়াতে এসব করে, ব্যবহার করার ব্যর্থতা প্রকাশ করা হয়। মানুষের শরীরের অন্যান্য মতই অন্যান্য স্নায়ুর পদ্ধতির মতই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু এর সবকিছুকেই অস্বীকার করা ঠিক হবে না। ভালোভাবে কান্নার মধ্য দিয়ে নারীই কি বা পুরুষই কি সবাই হৃদ-শূল থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। যা হোক, আমি সাবধান করে দিতে চাই যে, এই কৌশলটি অযথা একটি অভ্যাসগত পদ্ধতিতে দাঁড়াতে দেয়া ঠিক হবে না। তেমন কিছু ঘটে গেলে তা অস্বাভাবিক প্রকৃতির দুঃখ বোধে এবং মানসিক বিকারে রূপ নিতে পারে। রীতি বিবর্জিত কোন কিছুকেই অনুমোদন করা ঠিক হবে না।
লোকজনের কাছ থেকে আমি অনেক চিঠিপত্র পাই তাদের প্রতিভাবান কেউ কেউ মারা গেছেন। বারবার একত্রে মিলিত হতো কিম্বা ঐ একই লোকজনের সাথে যাদের সাথে একটি যুগল বা পরিবার হিসেবে মেলামেশা করতেন, সেখানে যাওয়া তাদের পক্ষে কঠিন। কাজেই তাদের সেই পুরনো দিনের জায়গা এবং বন্ধু বান্ধবদের এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল।
আমি একে মারাত্মক ভুল বলে মনে করি। হৃদ-শুল আরোগ্য করার গোপন বিষয়টি হলো, যতটা সম্ভব সাধারণ এবং স্বাভাবিক থাকা। এর ফল স্বরূপ কিন্তু আনুগত্যহীনতা বা উদাসীনতা আসে না। এই কর্মপন্থাটি অস্বাভাবিক দুঃখের অবস্থাকে পাশ কাটাবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক দুঃখ হলো, একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি এবং এর স্বাভাবিকতা ব্যক্তি বিশেষের তার স্বাভাবিক কার্যে ফিরে আসার এবং দায়িত্বশীল হবার এবং সেসব কাজ আগের মতই চালিয়ে যাবার সামর্থের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
হৃদ-শুলের গভীরতা প্রতিকার অবশ্যই হলো সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে, তার প্রেরিত আরোগ্যকর আরামের মধ্যে। অনিবার্যভাবে হৃদ-শুলের মূল ব্যবস্থা-পত্র হলো বিশ্বস্ত মনোভাব নিয়ে শূন্য মনে শূন্য হৃদয়ে বিধাতার দিকে মুখ ফেরানো। অধ্যাবসায়ের সাথে আধ্যাত্মিকভাবে নিজেকে একেবারে মুক্ত করার মধ্য দিয়েই চূড়ান্তভাবে আসবে ভগ্ন হৃদয়ের আরোগ্য সাধন। এই প্রজন্ম পূর্ববতী যুগের মানুষের চেয়ে খুব বেশি ভুগেছে এবং তাদের আবার শেখা উচিত যে, সর্বকালের সেরা লোকগুলো কি শিখেছে, কি জেনেছে? যেমন, ধর্মকর্মাদির অনুকূলে কিছু কিছু করা ব্যতীত মানুষের ব্যথা ভোগান্তি ইত্যাদি আরোগ্য হওয়া দূরূহ।
যুগ শেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গের একজন ছিলেন ব্রাদার লরেঞ্চ, যিনি বলেছেন, "যদি এ জীবনে আমরা স্বর্গের নির্মল প্রশান্তি সম্পর্কে জানতে পারি তবে আমরা অবশ্যই বিধাতার সাথে আন্তরিকভাবে, বিনীতভাবে প্রীতিজনক কথাবার্তা বলতে শিক্ষালাভ করবো।” দুঃখের ভার এবং মানসিক শারীরিক সাহায্য ছাড়াই বহনের চেষ্টা করা উচিৎ এমন পরামর্শ দেব না, রিপ এর ওজন একজন মানুষ যা বইতে পারে তার চেয়ে ভারি। হৃদ-শুল সবচেয়ে সরল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপত্র হলো বিধাতার উপস্থিতি উপলব্ধি করার অনুশীলন করা। তাতে আপনার হৃদ-শুলের উপশম হবে এবং শেষমেশ আপনার ক্ষতও নিরাময় হবে। কী পুরুষ কী মহিলা যারাই প্রচণ্ড দুঃখের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তারা আমাদের বলেছেন যে, এ ব্যবস্থাপত্র ফলপ্রদ।
হৃদ-শুলের ব্যবস্থা পত্রটিতে আরেকটি গভীরভাবে আরোগ্যকর উপাদান হলো, জীবন ও মৃত্যু এবং মৃত্যুহীনতা সম্বন্ধে সন্তুষ্ট জন দর্শন জ্ঞান লাভ করা। কারণ আমার পক্ষ থেকে বলতে চাই যে, যখন আমি একটি অনড় বিশ্বাসে বিশ্বাসী যে মৃত্যু বলতে কিছু নেই, জীবন অখণ্ডনীয়, এখানে এবং লোকান্তরের জীবন একটিই একাল এবং অন্তিমকাল অবিচ্ছেদ্য, অর্থাৎ একটি অবাধ বিশ্বভ্রহ্মান্ড, এবং তারপরই আমি দেখতে পেলাম আমার সমগ্র জীবনের সবচেয়ে সন্তুষ্টজনক এবং বিশ্বাসযোগ্য দর্শন।
এই দৃঢ় বিশ্বাস সমূহ সুসংবদ্ধ ভিতের উপর নির্ভরশীল, যেমন ধর্মগ্রন্থগুলো এক্ষেত্রে সহায়ক। আমি বিশ্বাস করি যে, বাইবেল কুরআনসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো খুব সুক্ষ ব্যাখ্যা দেবে, এবং শেষমেশ বড় বড় সব প্রশ্নের ক্রমন্বিত বৈজ্ঞানিক ও অন্ত 'দৃষ্টি সম্পন্ন সমাধান দিতে পারে বলে প্রমাণিত হবে। একজন মানুষ যখন এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় তার আসলে কি ঘটে? বাইবেল কুরআনসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে খুব বিজ্ঞতার সাথে আমাদের তা জানিয়ে দেয় এবং আমরা আমাদের প্রগাঢ় বিশ্বাস দ্বারা এ সত্যকে জানতে পারি। হেনরি বার্গসন, একজন দার্শনিক, উনি বলেন যে, সত্যে প্রবেশ করার নিশ্চিতম পথ হলো অনুধাবন, অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান দ্বারা তা করা যায়, নিশ্চিত কোনো বিষয়ের উপর হেতু দর্শনের মাধ্যমে তা করা যায়। তারপর মারাত্মক এক লম্ফ দিয়েও করা যায় এবং সত্য লাভের জন্য অনুভূতির দ্বারাও তা করা যায়। আপনার জানা কোনো উজ্জ্বল মুহূর্তে ফিরে আসুন। এ সেই পথ, সেই উপায়, যে ভাবে আমার মধ্যে এসব ঘটে।
আমি সম্পূর্ণরূপে, সর্বান্তকরণে, এ সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত হয়েছি এবং আমি তাই লিখছি এবং এতে আমার কোন সন্দেহ নেই, এমনকি খুব সুক্ষ বিন্দু পরিমাণেও নয়। ধীরে ধীরে আমি এ ইতিবাচক সত্যে উপনীত হয়েছি, এখনই এমনই একটি মুহূর্ত এলো আমি তা জানতে পারলাম।
এ দর্শন কারো দুঃখকে দূরে সরিয়ে রাখবে না, যে দুঃখটি আসে কোন প্রিয়জনের মৃত্যুর এবং স্বাস্থ্যগত কারণে, জাগতিক কোনো বিচ্ছেদ বিরহ থেকে। কিন্তু এ দর্শন তত্ত্ব দুঃখকে আপনার মধ্য থেকে তুলে নেবে এবং অদৃশ্য হয়ে যাবে। আপনার মধ্যেকার অনিবার্য পরিস্থিতির যে গভীর সম্পর্কে একটি পরিষ্কার বোধগম্যতা আপনার মনকে ভরে দেবে। এবং এটা আপনাকে গভীরভাবে আশ্বস্ত করবে যে, মনে হবে আপনার কোন প্রিয়জনের বিয়োগ হয়নি। এই বিশ্বাসে ভর করে বেঁচে থাকুন এবং তাতে আপনি শান্তিতে থাকতে পারবেন এবং ব্যথা বেদনা আপনার হৃদয় থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবে।
পবিত্র বাইবেলের একটি বিস্ময়কর বাণীর কথা মনে প্রাণে স্মরণ করতে বলছি, অনুরোধ করছি-“চক্ষু যাহা দেখে নাই, কর্ণ যাহা শুনে নাই, মানুষের হৃদয়ে যাহা কখনও প্রবেশ করে নাই, ঈশ্বর তাদেরই জন্য তাহা প্রস্তুত করে রেখেছেন যাহারা তাকে ভালোবাসে।” (করিন্থীয়্যান II, 9)
এর অর্থ হলো যে, আপনি যা কোনো দিন দেখেননি, আর আপনি যা দেখেছেন সেতো তেমন কোনো ব্যাপারই নয়, যা হোক বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, আপনি এমন কোনো কিছুই দেখেননি যার সাথে ঈশ্বরকে যারা ভালোবাসে এবং তার উপর বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য তিনি যে বিস্ময়কর কিছু প্রস্তুত করে রেখেছেন তার কোন তুলনা চলে। অধিকন্তু এতে বলা হয়েছে যে, আপনি এমন কিছু শুনেননি যার সাথে তিনি তাদের জন্য যে বিস্ময়কর কিছু সংরক্ষণ করে রেখেছেন। যারা তার শিক্ষা অনুস্বরণ করেন এবং তার পবিত্র শক্তিতে বেঁচে থাকেন তারাই তা শুনতে পাবেন। আপনি যে শুধু কখনও দেখেননি এবং শুনেনি তাই নয়, কিন্তু এমন কি আপনি কখনও তা অস্পষ্টও কল্পনা করেননি উনি আপনার জন্য যা করতে যাচ্ছেন। এই বাক্যটি তাদের জন্য, নিশ্চিত আরাম এবং অমরত্ব এবং পূণর্মিলন এবং সব ভালো কিছুর নিশ্চয়তা দেয় যারা ঈশ্বরের মধ্যে তাদের জীবনকে কেন্দ্রীভূত করেছেন।
অনেক বছর বাইবেল পড়ার পর এবং শত শত মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত হওয়ার জন্য আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চাই যে আমি দেখেছি যে, বাইবেলের এই প্রতীজ্ঞামূলক বাণী সম্পূর্ণরূপে সত্যি। এমনকি আমাদের এই জগৎ সংসারের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। লোক সমাজের যারাই সত্যিকারভাবে খ্রীষ্টের এই বাণীর ওপর নির্ভরতার অনুশীলন করে, তাদের জীবনে সর্বাপেক্ষা অবিশ্বাস্য কিছু ঘটতে দেখেছি আমি। এই অনুচ্ছেদটি যারা পরলোকে রয়েছেন এবং আমাদের সাথে যাদের সম্পর্ক ছিল এবং আছে তার সাথেও সম্পর্কিত আমরা যখন বেঁচে থাকি, যারা আমাদের অগ্রজ এবং আমাদের আগেই যারা সেই বাধা অতিক্রম করেছেন, যাকে আমরা বলি মৃত্যু। আমি 'বাধা' শব্দটি ব্যবহার কুরছি আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য। ইতিমধ্যে আমরা মৃত্যু সম্বন্ধে ভেবে নিয়েছি যে মৃত্যু হলো, বাধা স্বরূপ অর্থাৎ ধারণাটি এমন যে, মৃত্যু হলো জীবন থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেবার মত কিছু।
বৈজ্ঞানিকরা আজকাল অতি মনস্তত্ব এবং অতীন্দ্রিয় বিষয়ের উপলব্ধি এবং পূর্ববর্তী জ্ঞান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এক মন থেকে আরেক মনের ভাবধারা সংযোগ, অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি, (এসব কিছুকেই আগে অলীক বা হেয়ালী মানুষের হেয়ালী বস্তু বলে মনে করা হতো, কিন্তু এখন সেসব খুব বলিষ্ঠ, বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণাগারে ব্যবহৃত হচ্ছে) এসব ক্ষেত্রে কাজ করছেন, তারাই আজ প্রকাশ করছেন যে তারা নিজেরা এ সত্যিটি বিশ্বাস করছে যে, আত্মা স্থান এবং কালের বাধা অতিক্রম করে টিকে আছে। বস্তুত: আমরা ইতিহাসের এমন একদ্বার প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছি যে যখন বৈজ্ঞানিকরা এই মহান সত্য আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন এবং যা গবেষণাগারে আবিষ্কার নির্ভর সত্য হিসাবে প্রমাণিত হবে যে আত্মার অস্তিত্ব অবিনাশী মৃত্যুহীন।
বহুবছর ধরে বহুঘটনাবলী সংগ্রহ করেছি আমি, যে গুলোর যথার্থতা আমি গ্রহণ করছি এবং তা দৃঢ় প্রত্যয়ে সমর্থন করি যে আমরা একটি গতিশীল দুনিয়ায় বসবাস করি, জীবনই যেখানে মূলনীতি, মৃত্যু নয়। আমার সেসব মানুষের উপর দৃঢ় বিশ্বাস আছে যারা তাদের লব্ধ অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন এবং আমি তাতে পূর্ণ আস্থাবান যে, তারা এমন এক দুনিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দুনিয়া আমাদেরকে আঘাত করেছে। অথবা জীবন জালে জড়িয়ে ফেলেছে যাতে মানুষের আত্মা, জীবনের উভয় পাড়ে একটি অখন্ড বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় বিরাজ করছে। আমাদের জানা মতে অপর পাড়ে জীবনের অবস্থা হলো মরণশীলতা, তা কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। যারা জীবনের অপর পাড়ে চলে গিয়েছে তারা আমাদের চেয়ে উচ্চতর এক অবস্থায় বসবাস করছে এবং তাদের বোধজ্ঞান আমাদের বোধজ্ঞান অপেক্ষা অনেকমাত্রায় উপরের স্তরের, এখনও আমাদের যারা প্রিয়জন তাদের অস্তিত্ব বিরাজ করছে এবং ঘটনাবলী সেদিকেই নির্দেশ করছে যে, তারা বেশি দূরে নেই এবং এর সাথে আরেকটি ঘটনার ইঙ্গিত মিলছে, কিন্তু তা একেবারে কম বাস্তব কিছু নয়, যে আমরা আবার তাদের সাথে মিলিত হব। ইত্যবসরে আমরা তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখব যারা আত্মার জগতে বাস করছেন। উইলিয়াম ডোমস, আমেরিকার শ্রেষ্ঠ পন্ডিতদের একজন, সারা জীবন পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বলেছেন, যে তিনি এভেবে আত্মপরিতৃপ্ত যে মানুষের মস্তিষ্ক হলো আত্মার অস্তিত্বের একমাত্র মাধ্যম এবং তাই মন এখন যেমন গঠিত অবস্থায় আছে কিন্তু শেষে তা বদলে যাবে। কারণ মস্তিষ্ক তার ধারককে বোধজ্ঞানের অনাক্রান্ত এলাকায় নিয়ে যাবে। যেহেতু আমাদের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি এখানে এই পৃথিবীতে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং যেহেতু আমরা বয়সে বাড়ি এবং দিন দিন অভিজ্ঞতা লাভ করি তাই এই বিরাট দুনিয়ায় আমাদের চারিদিক সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি এবং যখন আমরা ইহলোক ছেড়ে চলে যাই তখন শুধুমাত্র আমরা এক বিরাটের মাঝে পদার্পণ করি।
ইউরিপাইডিস, প্রাচীনকাল নিয়ে বড় বড় সব চিন্তাবিদদের একজন, তার এমন বিশ্বাস জন্মেছিল যে, আমাদের পরলোকের জীবন হবে এক অসীম বিরাটের মাঝে। সক্রেটিসও একই ধারণার সাথে একমত পোষণ করেছেন। সবচেয়ে সুখপ্রদ এব সারগর্ভ যে বাণী তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে এসেছে তা হলো, "কোন দুষ্টাত্মার পক্ষে কোন সৎ লোকের পতন ঘটানো সম্ভব নয় না এ লোকে, না পরলোকে।"
নাতালিয়া কালমাস, রঙ্গিন চলচ্চিত্রের এক দক্ষ বৈজ্ঞানিক, তার বোনের মৃত্যু সম্পর্কে বলছেন। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই মহিলার সেই বর্ণনা অনুপ্রেরণা দানকারী 'গাইড পোস্ট' ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল।
নাতালিয়া কালমাস তার মরণাপন্ন বোনের কথা এভাবে উল্লেখ করছেন: "নাতালি, আমার কাছে প্রতিজ্ঞা কর যে, তুমি কখনও তাদেরকে আমার উপর ঔষধ প্রয়োগ করতে দেবে না। আমি বুঝতে পারছি তারা আমার ব্যথা উপশম করার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমি প্রত্যেকটি দৈহিক অনুভূতি সম্পর্কে সাবধান থাকতে চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, মৃত্যু হবে খুবই সুন্দর এক অভিজ্ঞতা।”
"আমি প্রতিজ্ঞা করলাম। পরে, একা একা কাঁদলাম, কাঁদলাম তার সাহসের কথা ভেবে। তারপর রাতে যখন বিছানায় শুতে গেলাম, আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি ভেবেছিলাম আমার বোন যে কষ্ট ভোগ করতে যাচ্ছে সেই হবে তার পরম জয়।”
দশদিন পর চরম সময় মৃত্যু একেবারে কাছে এসে পড়ল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার পাশে বসে রইলাম আমি। অনেক কিছু নিয়ে আমাদের আলাপ হলো, এবং সারাটি সময় তার অত্যাশ্চর্য শান্তভাব, শাশ্বত জীবনের প্রতি অকপট আত্মবিশ্বাস দেখে বিস্মিত হলাম। দৈহিক নির্যাতন তাকে একবারের জন্যও তার আধ্যাত্মিক শক্তিকে পরাজিত করতে পারেনি। এতে এমন কিছু ছিল যে, ডাক্তাররা সাধারণভাবে তার কোন হিসাব মেলাতে পারেনি।
শেষের দিনগুলোতে সে বিড় বিড় করে একটি বাক্যই শুধু উচ্চারণ করত “হে প্রিয়তম দয়াময় প্রভু, আমার মন পরিচ্ছন্ন রাখ এবং আমাকে শান্তি দাও।"
এত কথা বলেছি আমরা যে, আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে সে ঘুমের দিকে ঝুকে পড়ছে। নার্সের কাছে রেখে আস্তে উঠে গিয়েছিলাম একটু বিশ্রাম নেবার জন্য। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুনলাম আমার বোন আমাকে ডাকছে। তাড়াতাড়ি তার কক্ষে চলে গেলাম। মুমূর্ষ অবস্থা, মৃত্যু যেন একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়িয়েছে।
“বিছানায় তার পাশে বসলাম এবং তার হাতটি আমার হাতে নিলাম। উত্তপ্ত হাত। তারপর মনে হলো সে বিছানা থেকে একটু উঁচু হয়ে বসে থাকার একটি অবস্থায় স্থির হলো। সে বলল, নাতালি, “ওরা অনেকেই এখানে এসেছে। ঐ যে, ফ্রেড.... আর রুথ...... ও এখানে কি করছে? ও আমি তো জানিই।
"বৈদ্যুতিক ধাক্কায় ঝাকি খেলাম যেন আমি বলেছিল রুথ। রুথ ছিল ওর কাজিন, সপ্তাহখানেক আগে হঠাৎই মারা যায় সে। কিন্তু ইলিয়ানরকে রুথের হঠাৎ মৃত্যুর খবরটি জানানো হয়নি।
"মেরুদন্ড দিয়ে যেন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এক স্রোত নেমে এলো। প্রায় ভীতিকর এক অবস্থার কাছাকাছি একটি অবস্থা অনুভব করেছিলাম আমি। বিড় বিড় করে রুথের নাম উচ্চারণ করেছিল সে।
"বিস্ময়করভাবে তার কণ্ঠস্বর ছিল পরিষ্কার। বিষয়টি খুবই বিভ্রান্তিকর। ওদের অনেকেই ছিল! সে যখন আমাকে আহবান করল, হঠাৎ করেই তার বাহু দুটো খুশিতে যেন বিস্তৃত হলো! চলে যাচ্ছি আমি, বলল সে।
"তারপর তার বাহু দুটো আমার গলার উপর নেমে এলো এবং আমার বাহুপাশে ঢলে পড়ল। তার আত্মার ইচ্ছা শেষপর্যন্ত তার চরম মানসিক ক্লেশকে উল্লাসে পরিণত করল।
"যখন আমি তার মাথাটি বালিশের উপর রাখলাম তখন তার মুখের উপর উষ্ণ শান্তিপূর্ণ হাসি ফুটেছিল। তার সোনালী বাদামী কেশ বালিশের উপর অবিন্যস্ত পড়ে ছিল। ফুলদানি থেকে একটি সাদা ফুল নিয়ে তার চুলের ভেতর গুঁজে দিলাম। তার ঐ সুন্দর গঠন, সুবিন্যাসিত দেহবল্লরী, ঢেউ খেলানো কেশরাশি শ্বেত শুভ্র ফুল, মৃদু হাসি এতসব মনোমুগ্ধী সম্ভার নিয়ে আবার একবার তাকালো এবং শেষবারের মত যেন এক স্কুল পড়ুয়া বালিকার মত।"
মৃত্যু পথযাত্রী এক বালিকার পাশে তার কাজিন রুথের নামের উল্লেখ এবং সুস্পষ্ট ঘটনা যে, সে তাকে পরিষ্কার দেখেছে আর তাই এ ঘটনা খুবই বিস্ময়কর এবং বার বার তা ঘটেছে এবং সে কারণেই এই ঘটনার প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছে। এ বিস্ময়কর ব্যাপারটি খুবই ব্যক্তিগত এবং এই লব্ধ অভিজ্ঞতার বৈশিষ্টগুলো একই ধরণের যেমনটি আরো অনেকেই আমাকে বলেছেন এবং তার সাথে একই মিল প্রমাণিত হয়, কারণ সেসব ক্ষেত্রেও সেই একইভাবে নাম ধরে ডেকেছিল, যাদের মুখাবয় দেখেছিল, এবং আসলেই তারা সেখানে উপস্থিত ছিল।
তারা কোথায়? তারা কোন অবস্থায় আছে? কেমন ধরণের শরীর তাদের? এ প্রশ্নগুলো কঠিন। ধারণাগুলো বিভিন্ন আকৃতির এবং খুবই যুক্তিসঙ্গত, অথবা এমন কিছু ঠিক ঠিক বিশ্বাস করা যেতে পারে যে, তারা অন্য কোন কল্পিত কক্ষপথে বসবাস করে।
একটি বৈদ্যুতিক পাখা যখন স্থির অবস্থায় থাকে তখন ব্লেডের মধ্য দিয়ে কোন কিছু দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু যখন প্রবল বেগে ঘোরে তখন ব্লেডগুলোকে মনে হয় স্বচ্ছ। উচ্চতর কোন পর্যায়ে যে অবস্থায় আমাদের কোন প্রিয়জন বসবাস করে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের নিচ্ছিদ্র গুণাবলী হয়ত কারো স্থির দৃষ্টির কাছে চলমান রহস্যের মত উন্মুক্ত হতে পারে। আমাদের জীবনের গভীর মুহূর্তগুলোতে এটা হলো সম্পূর্ণরূপে সম্ভব যে, সেই উচ্চতর পর্যায়ে প্রবেশ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব।
ইংরেজী সাহিত্যের কয়েকটি সুন্দরতম লাইনের একটিতে রবার্ট ইংগারসল এই মহান সত্য সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, “মৃত্যুর অন্ধকারে, একটি তারা দেখার এবং প্রেমের বাণী শুনার আশা রাখ এবং তাতে তুমি একটি পাখীর ডানার খসখস শব্দ শুনতে পাবে।"
একজন বিখ্যাত স্নায়ুতত্ত্ববিদ একলোক সম্ভন্ধে বলেছেন, লোকটি একেবারে যখন মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে ঠিক তখনকার কথা। মুমূর্ষু সেই লোকটি তার বিছানার পাশে বসা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে কিছু নাম ধরে ডাকতে থাকলেন, ডাক্তার সেই নামগুলো লিখে রেখেছিলেন। যে নামগুলো লিখেছিলেন তার একটি নামও ডাক্তারের পরিচিত ছিল না। পরে ডাক্তার তার মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ "এই লোকগুলো কে? তোমার বাবা এই লোকগুলো নাম ধরে ডেকেছিলেন যেন তিনি তাদের দেখতে পেয়েছিলেন।” মেয়েটি বলল, "ওরা সবাই আমাদের আত্মীয়," "অনেক আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।”
ডাক্তার বললেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন যে তার রোগী ঐ লোকগুলোকে দেখেছিলেন।
আমার দুই বন্ধু মি: এবং মিসেস উইলিয়াম সেজ, নিউ জার্সিতে থাকতেন এবং প্রায়ই আমি তাদের বাড়ি যেতাম। মি: সেজের স্ত্রী তাকে উইল বলে ডাকতেন, তিনিই প্রথম মারা যান। কয়েক বছর পর মিসেস সেজ যখন মৃত্যু সজ্জায় শায়িত, দারুণ বিস্ময়কর দেখতে লাগল তার মুখখানি, আশ্চর্য হাসিতে মুখখানি উজ্জল হয়ে উঠলো এবং তিনি বললেনঃ “কেন, এতো উইল।” যাহোক না কেন তিনি তার মৃত স্বামীকে দেখতে পেয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আর্থার গডফ্রে, বিখ্যাত রেডিও ব্যক্তিত্ব, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যখন একটি ডেস্ট্রয়ারের খাটে শুয়েছিলেন, হঠাৎ তার বাবা এসে তার পাশে দাঁড়ালেন। তিনি তার হাত প্রসারিত করে মৃদু-হাসলেন এবং বললেনঃ “এ পর্যন্তই, বেটা,” এবং গডফ্রে ও জবাবে বলেছিলেন: “এ পর্যন্তই বাবা,”।
পরে তাকে ঘুম থেকে জাগানো হলো এবং তার বাবার মৃত্যু সংবাদ সম্বলিত তার বার্তাটি হাতে তুলে দেয়া হলো। বার্তার মৃত্যুর সময় জানানো হয়েছিল এবং সময়টি ঠিক সেই সময় যখন গডফ্রে ঘুমন্ত অবস্থায় তার বাবাকে দেখেছিল মেরী মার্গারেট ম্যাকব্রাইড, ইনিও ছিলেন প্রখ্যাত রেডিও ব্যক্তিত্ব, তার মায়ের মৃত্যুতে দুঃখে খুবই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যকার ভাবটি ছিল খুবই গভীর। এক রাতে তিনি জেগে উঠলেন এবং বিছানার কিনারে বসলেন। হঠাৎই তার এমন অনুভূতি হলো, তিনি নিজেই বলে উঠলেন "মা আমার সাথে ছিল।” তিনি তার মাকে দেখেওনি, তার কথাও শুনেনি, কিন্তু সেই সময় থেকে তিনি বলতে থাকেন যে, "আমি জানতাম যে আমার মা মারা যায়নি, অর্থাৎ তিনি কাছেই আছেন।”
স্বর্গত রুযপস জোনস, আমাদের সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত আধ্যাত্মিক নেতা, তার ছেলে লোয়েন সম্বন্ধে বলেন, ছেলেটি মারা গিয়েছে যখন তার বয়স মাত্র বার বছর। বাবার চোখে সে ছিল একটি আপেলের মত। ডঃ জোনস যখন সমুদ্র পথে ইউরোপ যাচ্ছেন তখন তার ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। লিভার পুলে পৌঁছাবার আগের রাতে যখন তিনি তার খাটে শুয়েছিলেন, তখন হঠাৎ তার দুঃখের এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়, যার সঠিক বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। তারপর তিনি বললেন যে, তার যেন মনে হচ্ছিল তিনি ঈশ্বরের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ। দারুণ এক শান্তির অনুভূতি এবং এমন একটি গভীর বোধ জন্মালো যেন তার ছেলে তার কাছে চলে এসেছে।
লিভারপুলে অবতরণের পরপরই তাকে জানানো হয়েছিল যে তার ছেলে আর বেঁচে নেই, আর মৃত্যুর সময়টি ঠিক সেই সময় যখন তিনি ঈম্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার ছেলের চিরকালিন নৈকট্য অনুভব করেছিলেন। আমার গীর্জার একজন সদস্যা মিসেস ব্রাইসন কাল্ট, তার এক কাকীর কথা বলেন যে, তার স্বামী এবং তার তিনজন ছেলেমেয়ে তাদের বাড়িটি যখন অগ্নিদগ্ধ হয় তখন তারাও পুড়ে মারা যায়। কাকীর সারা শরীর খুব মারাত্মক ভাবে দগ্ধ হলেও তিনি আরো বছর তিনেক বেঁচেছিলেন। শেষমেশ যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন হঠাৎ একদিন তার মুখখানি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “ সবকিছু কত সুন্দর।” “ওরা আমার সাথে দেখা করতে আসছে। আমার বালিশগুলো তুলা দিয়ে ভরে দাও এবং আমাকে ঘুমাতে যেতে দাও।”
মিঃ এইচ. বি. ক্লার্ক, আমার একজন পুরনো বন্ধু, অনেকবছর তিনি নির্মাণ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন, আর এ ধরণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকার জন্য দুনিয়ার সব জায়গাতেই যাবার সুযোগ হয়েছিল তার। বিজ্ঞানসম্মত মন মানসিকতার লোক ছিলেন তিনি, একজন শান্ত, সংযত, তথ্যপূর্ণ, ভাবাবেগ শূন্যতা ধরণের মানসিকতার এক মানুষ। একদিন রাতে তার ব্যক্তিগত ডাক্তার আমাকে ডেকেছিলেন, তিনি বললেন যে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার বেশি উনি বাঁচবেন বলে আমি আশা করি না। তার হৃদপিন্ডের ক্রিয়া মন্থর হয়ে পড়েছিল এবং রক্তচাপ অতিরিক্ত মাত্রায় কমে গিয়েছিল। মোটেও কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। ডাক্তার কোন আশাই দিলেন না।
আমি তার জন্য প্রার্থনা করতে শুরু করলাম, অন্যরাও প্রার্থনা করতে থাকলো। পরদিন তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং কয়েকদিন পর তিনি তার র্ভুক্তক্তি ফিরে পেলেন। তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া, রক্তচাপ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। তার দৈহিক শক্তি ফিরে পাবার পর তিনি বললেন: “আমার অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকার সময় খুবই অদ্ভুত কিছু ব্যাপার ঘটে যায় আমার মধ্যে। আমি এর কোন ব্যাখ্যা দিতে পারব না। মনে হয়েছিল অনেক দূরে কোথাও চলে গিয়েছি। সবচেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় একটি জায়গায় ছিলাম আমি, জীবনে তেমন জায়গা কখনো দেখিনি। আমার চারিদিকে আলো আর আলো, অনেক মনোরম সে আলো। কিছু মুখ আমি দেখেছি হালকা আলোয়, মায়ামমতা ভরা সেসব মুখ, এবং আমার খুব শান্তি ও সুখ অনুভূত হচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষে জীবনে কখনও তেমন সুখ আমি অনুভব করিনি।
তারপর এক ভাবনা এলো আমার মধ্যে; আমি অবশ্যই মারা যাচ্ছি। তারপর এমনটা ঘটলো আমার, 'সম্ভবত আমি মারা গিয়েছি। তারপর জোরে হেসে উঠলাম আমি, এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, সারা জীবন কেন আমি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছি? একে তো ভয় পাবার কিছু নেই।” আমি জানতে চাইলাম, “কেমন লাগল আপনার মৃত্যুর অনুভূতি?” আবার কি জীবনে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন? আপনি বাঁচতে চেয়েছিলেন, যে কারণে আপনি মারা যাননি, যদিও ডাক্তার অনুভব করেছিলেন যে, আপনি মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। আপনি কি বাঁচতে চেয়েছিলেন?
মৃদু হেসে তিনি বললেন, "এর মধ্যে তিলমাত্র ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। যদি থাকত, আমার মনে হয় আমি সেই সুন্দর জায়গাতেই থেকে যেতে পছন্দ করতাম।" মতিভ্রম স্বপ্ন, কাল্পনিকবস্তু- আমি ওসব বিশ্বাস করি না। আমি অনেক বছর অনেক মানুষের সাথে কথা বলেছি। যারা এমন অবস্থার সান্নিধ্যে এসেছিলেন এবং এমন দর্শন লাভ করেছিলেন তারা সবাই সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকার করেছেন সেই এক রকম সৌন্দর্য্যের কথা, আলোর কথা এবং শান্তির কথা, তাতে আমার মনে কোন সন্দেহ জাগেনি। বাইবেলের নতুন নিয়ম আমাদের খুবই আগ্রহ উদ্দীপকভাবে এবং সাধারণভাবে আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে জীবনের কোন বিনাশ নেই। এতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ক্রুশবিদ্ধ হবার পরও যীশুখ্রীষ্ট আবার বেশ কয়েকবার দর্শন দিয়েছেন, অদৃশ্য হয়েছেন, আবার আবির্ভূত হয়েছেন। কেউ কেউ তাকে নিজের চোখে দেখেছেন এবং তিনি তাদের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়েছেন। আবার অন্যদের সামনে তিনি দর্শন দিয়েছেন, আবার অদৃশ্য হয়েছেন। ব্যাপারটিকে যেন এভাবে বলা যায় 'তোমরা আমাকে দেখতে পাচ্ছ এবং তারপরই তোমরা আমাকে দেখতে পাচ্ছ না।' এতে বোঝা যায় যে, তিনি আমাদের বলতে চেষ্টা করছেন যে যখন আমরা তাকে দেখতে পাই না, তার অর্থ এই নয় যে তিনি সেখানে নেই। দৃষ্টি শক্তির বাইরে চলে গেলেও তার অর্থ এই নয় যে, তিনি জীবন্ত নন। সময় সময় কারো কারো এমন দর্শন লাভের অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে যে, সেগুলো একই সত্যকে নির্দেশ করছে, অর্থাৎ তিনি কাছেই আছেন। তিনি কি বলেননিঃ কারণ আমি জীবিত আছি, তোমরাও জীবিত থাকবে।"
(যোহন xiv 14) অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাদের প্রতিভাজন যারা মারা গেছেন তার বিশ্বাস অনুসারে তারাও আমাদের কাছেই আছেন এবং মাঝে মাঝে আমাদের স্বস্তির জন্য তারা কাছাকাছি আসেন।
এক ছেলে কোরিয়াতে যখন চাকুরিরত, তার মাকে একটি ঘটনার কথা লিখে জানাচ্ছে; “অদ্ভুত এক ব্যাপার ঘটছে আমার। একবার রাতে যখন ব্যাপারটি ঘটে আমি তখন ভয় পেয়ে যাই বললাম, বাবা আমার সাথে।” সেই দশ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। তারপর ছেলেটি তার মাকে সতৃষ্ণভাবে জিজ্ঞেস করল; “মা তুমি কি মনে কর যে বাবা কোরিয়ার এই যুদ্ধক্ষেত্রে আসলেই আমার সাথে এখানে থাকতে পারে?” জবাবটি এমন; কেন নয়? কিভাবে আমরা একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রজন্মের নাগরিক হতে পারি এবং বিশ্বাস না করে পারি যে, এ ঘটনা সত্যি হতে পারে না। বার বার এমনটিই প্রমাণিত হচ্ছে যে, এ বিশ্বভ্রহ্মান্ড চলমান, নানান রহস্য, বৈদ্যুতিক প্রোটন নিউট্রন, আনবিক শক্তি, ইত্যাদিতে ভরপুর এবং এর সবই খুবই আশ্চর্যজনক যে আমরা এখনও তার অনেক কিছুই অনুধাবন করতে পারিনি।
এই বিশ্বভ্রহ্মান্ড এক বিরাট আধ্যাত্মিক সম্ভারে পূর্ণ এক জাকালো ভবন, এ জীবন্ত এবং জীবন রক্ষাকারী।
এলবার্ট ই ক্লিফ, সুপরিচিত একজন কানডিয়্যান লেখক, তার মৃত পিতা সম্পর্কে বলেন। তার মুমূর্ষ পিতা গভীর নিদ্রাচ্ছন্নতায় ডুবে আছেন এবং মনে হয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই। তারপর ক্ষণিকের এক পুনরুত্থানের ঘটনা ঘটে। তার চোখের পাতা কাঁপতে কাঁপতে খুলে গেল। দেয়ালের উপর প্রাচীন কালের সংক্ষিপ্ত নীতিবাক্য ঝুলান তাতে লিখা: আমি জানি যে আমার মুক্তিদাতা প্রভু জীবন্ত। মুমূর্ষ লোকটি তার চোখ খুললেন, এবং সে প্রীতি বাক্যের দিকে তাকালেন এবং বললেন: আমি জানি যে আমার মুক্তিদাতা জীবন্ত কারণ ওরা সবাই এখানে আমার চারিদিকে বিরাজমান-মা, বাবা, ভাইয়েরা, এবং বোনেরা।” অনেক আগে যারা এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছে তারা সবাই এখন এখানে, কিন্তু সুস্পষ্টতই তিনি তাদের দেখেছিলেন। কে তা অস্বীকার করবে?
স্বর্গত মিসেস থোমাস এ. এডিসন আমাকে বলেছেন যে, যখন তার বিখ্যাত স্বামী মরণাপন্ন তিনি তখন তার চিকিৎসকের কাছে ফিস ফিস করে বলেছেন; “জায়গাটি অনেক সুন্দর।" এডিসন ছিলেন জগদ্বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক। সারাজীবন তিনি প্রপঞ্চ নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন তথ্যানুসন্ধানী মন মানসিকতার মানুষ। কোন জিনিসের কার্যকারিতা না দেখে তিনি কোন সময় আগ বাড়িয়ে কোন কথা বলেনি। তিনি কখনও এমন বার্তা দেননি; 'জায়গাটি অনেক সুন্দর যদি তিনি জায়গাটি দেখেই না থাকেন তবে এই বাস্তববাদী লোকটার মুখে এমন কথা বলা অসম্ভব, কাজেই তিনি জানতেন তিনি যা বলছেন তা সত্যি।
অনেক বছর আগে একজন মিশনারী দক্ষিণ দ্বীপগুলোতে নরখাদক উপজাতিদের মধ্যে কাজ করতেন। অনেক মাস চেষ্টার পর গোত্র প্রধানকে তিনি খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে পেরেছিলেন। একদিন বৃদ্ধ গোত্র প্রধান মিশনারী ধর্ম প্রচারককে বলেছিলেন; “আপনি কি মনে করতে পারছেন যে, ঠিক কখন প্রথম আমাদের মধ্যে এসেছেন আপনি?”
মিশনারী জবাবে বললেন, "অবশ্যই পারি।” “যখন বনের ভেতর দিয়ে গেলাম তখন আমার চারিদিকের শত্রুভাবাপন্ন শক্তি সম্পর্কে সতর্ক হয়ে উঠলাম।"
"তারা আসলে আপনাকে ঘিরে ফেলেছে;" গোত্র প্রধান বললেন; "কারণ আমরা আপনাকে হত্যা করার জন্য অনুসরণ করছিলাম, কিন্তু কিছু একটা কাজটা করতে বাধা দিল।"
মিশনারী জিজ্ঞেস করলেন, “কি ছিল সেই 'কিছু একটা'? “এখন তো আমরা বন্ধু, আমাকে বলুন” মিষ্টি সুরে কথা গুলো বলল সে, উজ্জল আলোয় আলোকিত দু'জন ব্যক্তি আপনার দু'পাশে যে হাঁটছিল, ওরা কারা?"
আমার বন্ধু, যোফ্রে ও হারা, বিখ্যাত গান লেখক, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জনপ্রিয় গানের লেখক 'কেটি' (Katy) 'মৃত্যু বলে কিছু নেই, 'আমাকে এমন একজন মানুষ দাও এবং একটি ঘোড়া দাও, যে ঘোড়ায় চড়তে জানে, এসব গানের এবং অন্যান্য আরো গান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই যোদ্ধা কর্ণেল সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছুই বলে, এই কর্ণেলের সৈন্যদল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি জানান যে, যখন তিনি ট্রেঞ্চের ভেতর এক দিক থেকে আরেক দিকে হাঁটাহাঁটি করছিলেন তিনি তাদের হাতগুলো এব তাদের অস্তিত্ব অনুভব করছিলেন।
তিনি জোফ্রে ও' হারাকে বলেছিলেনঃ "আমি আপনাকে বলছি, মৃত্যু বলে কোন কিছু নেই।” মি: ও' হারা 'মৃত্যু বলে কিছু নেই' এই কথাগুলো প্রয়োগ করে একটি মহান গান রচনা করেছিলেন।
যা হোক এসব গভীর এবং ধর্মানুভূতি সম্পন্ন বিষয় নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন সন্দেহ নেই।
যাকে আমরা মৃত্যু বলি তারপরেও জীবন চলমান এ ধারণাকে আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি এই বিস্ময়কর ব্যাপারটির দুটো দিক আছে একটি দিক যেখানে আমরা এখন বসবাস করি আর বিস্ময়কর বিস্ময়টি হলো মৃত্যু, মৃত্যুর অপর যে দিক সেখানেও আমাদের জীবন চলমানই থাকবে। পরলৌকিক অবস্থাটি আমাদের মৃত্যু দিয়ে শুরু হয় না। আমরা এখন অনন্ত কালের মধ্যে আছি। আমরা অনন্ত কালের নাগরিক। আমরা শুধু আমাদের অভিজ্ঞতার পরিবর্তন করি যাকে আমরা বলি জীবন, এবং তা বদলায়, আমি ভালো কিছুর পিছু পিছু ছুটি।
আমার মা ছিলেন এক মহান আত্মার মানুষ, এবং এর প্রভাব সারাজীবন আমার উপর খুব বলিষ্ঠভাবে ক্রিয়া করবে এবং আমার এই অভিজ্ঞতাকে কোন কিছুই ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। তিনি ছিলেন বিস্ময়কর এক অ্যালাপপট মানুষ। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ এবং সতর্ক মনের মানুষ। খ্রীষ্টান মিশনারী কাজের একজন নেত্রী হিসেবে তিনি সারা দুনিয়ার অনেক দেশ চষে বেরিয়েছেন এবং অনেকের সংস্পর্শে এসেছেন। তার জীবন ছিল পূর্ণ এবং সমৃদ্ধ। তার ছিল দারুণ রসবোধ। সঙ্গী হিসেবে তিনি ছিলেন দারুণ একজন, এবং সব সময় তার সাথে থাকতে আমার খুবই ভালো লাগ তো। যারাই তাকে চিনতো তারা সবাই তাকে সুবিবেচনার সাথে আচরণ করত; তিনি অসাধারণ মনোমুগ্ধকর এবং উৎসাহী এক ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন। সাবালকত্ব পর্যায়ে যখন এসেছি তখন যখনই সুযোগ করতে পেরেছি তার সাথে দেখা করতে বাড়িতে গিয়েছি আমি। সব সময় আমার প্রত্যাশা ছিল বাড়িতে পরিবারের কাছে ছুটে যাওয়া, কারণ সকালের নাস্তা খাবার সময় টেবিলে সবার সাথে একত্রে বসা এবং কথা বলার অভিজ্ঞতা ছিল সত্যিই উত্তেজনাকর। কি সুখকর পূর্ণমিলন-সবার সাথে কি চমৎকার সাক্ষাৎ লাভ। তারপর একদিন মৃত্যু তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তারপর দক্ষিণ ওহিত্তর ছোট্ট কবরস্থানে পরম যত্নে আর মমতায় তাকে সমাহিত করলাম, এই সেই ওহিও যেখানে তার বাল্যকাল কেটেছে। যেদিন তাকে শেষবারের মত চিরশয়নে রেখে এলাম, সেদিন আমার খুব খারাপ লেগেছিল এবং ভরাক্রান্ত হৃদয়ে সেখান থেকে ফিরে এলাম্ অন্তিম শয়নে বিশ্রামের জন্য। তার শেষ গৃহে যখন তাকে রাখতে গেলাম সময়টা তখন ছিল পুরোপুরি গ্রীষ্মকাল।
তারপর শরৎ এলো, এবং অনুভব করলাম যে আমি আমার মায়ের সাথে মিলিত হতে চাই। মাকে ছাড়া খুব একা একা লাগছিল, সেজন্য ঠিক করলাম যে আমি লিঞ্চবার্গে যাব। সারাটি রাত ট্রেনে বসে ভাবলাম, মনটা খারাপ হয়ে গেল, ভাবলাম কি-সুখের দিনগুলোই না ছিল আমাদের এখন তা অতীত এবং দিনগুলো সত্যিই কেমন বদলে গিয়েছে, আর কখনও তা আগের অবস্থায় ফিরে আসতে না।
তাই সেই ছোট্ট শহরটিতে আবার এলাম আমি। হাঁটতে হাঁটতে যখন কবরস্থানে এসে পৌঁছলাম তখন আবহাওয়া ছিল ঠাণ্ডা এবং আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। লোহার গেট খুলে ভেতরে ঢুকলাম এবং হাঁটার সময় এবং যেখানে একাকী বসলাম শুকনো পাতা খস খস করছিল। হঠাৎই মেঘ সরে গিয়ে সেখানে ঝলমলে রোদ দেখা দিল। সূর্যের আলো শরতের জাঁকালো আলোক সম্ভারে ঝলমলিয়ে দিলো, বাল্যকালে যে পাহাড়গুলোর কোলে বড় হয়েছিলাম আমি, এখনও সে জায়গাটিকে প্রচন্ড ভালোবাসি আমি, এবং এখানে অনেক আগে মা যখন বালিকা ছিলেন তখনও তিনিও এখানে খেলাধুলা করেছেন।
এসব যখন ভাবছি হঠাৎ করেই মনে হলো যেন মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। এখন কিন্তু আসলেই তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাইনি আমি কিন্তু তেমনটিই মনে হয়েছিল। আমি নিশ্চিত যে, আমি আমার ভেতরের কর্ণে কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে ছিলাম। বার্তাটি ছিল পরিষ্কার এবং সুষ্পষ্ট। তার সেই আগের স্মৃতিভরা কন্ঠে তিনি বললেন; “কেন তুমি মৃতদের মধ্যে জীবিতকে খুঁজ তো? আর্মি তো এখানে নেই। তোমার কি মনে হয় যে আমি এমন অন্ধকার এবং নিরানন্দ একটি জায়গায় থাকব? আমি সব সময় তোমার এবং আমার প্রীতিভাজনদের সাথে সাথেই আছি।” অন্তরলোকের আলোক বিচ্ছুরণে বিস্ময়কর ভাবে খুশি হয়ে উঠলাম আমি। আমি জানতাম আমি যা শুনেছিলাম তা সত্যি ছিল। যে বার্তাটি আমার কাছে এলো তা সত্যিকার শক্তি সহযোগেই এলো। আমি চিৎকার করতে পারতাম, এবং আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং স্মৃতিস্তম্ভের উপর চোখ ফেরালাম তাকিয়ে দেখলাম যে এটা আসলে কি, এটা একমাত্র জায়গা যেখানে মরণশীল অবশিংশট শায়িত থাকে। দেহটি সেখানে ছিল, নিশ্চিত হবার জন্য, কিন্তু এ ছিল শুধুই একটি কোট যা নিষ্কর্মা হয়ে পড়েছিল কারণ কোটটি যে পরিধান করত তার আর এটার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু তিনি, যিনি ছিলেন গৌরবোজ্জলভাবে লাবণ্যময় আত্মায়, তিনি সেখানে ছিলেন না।
হাঁটতে হাঁটতে বের হয়ে এলাম সেখান থেকে এবং কদাচিৎ আমি আবার সেখানে ফিরে গিয়েছি। সেখানে যেতে এবং মায়ের কথা আর সেই পুরনো দিনের কথা ভাবতে আমার ভালোই লাগে, কিন্তু এ জায়গা এখন আর বিমর্ষ হয়ে থাকার জায়গা নয়। এ শুধুই এক প্রতীক, কারণ তিনি সেখানে নেই। তিনি এখন আমাদের সাথে অর্থাৎ তার প্রিয়জনদের সাথে আছেন। “কেন তোমরা মৃতের মাঝে জীবন্তকে খুঁজছ?” (লুক xiv.5)
বাইবেল পড়ুন কুরআন পড়ুন এবং বিশ্বাস করুন কারণ এখানে সৃষ্টিকর্তার মহত্বের কথা এবং আত্মার অমরত্বের কথা বলা হয়েছে। আন্তরিকভাবে এবং বিশ্বাসের সাথে প্রার্থনা করুন। প্রার্থনা এবং বিশ্বাস এদুটো বিষয়কে জীবনের অভ্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করুন। সৃষ্টিকর্তার সাথে এবং যীশুখ্রীষ্টের সাথে সত্যিকার বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন। যখন আপনি তা করবেন তখন দেখতে পাবেন আপনার মনের মধ্যে এই গভীর বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে এসব বিস্ময়কর বিষয় সমূহ ঠিকই সত্য।
“..... যদি তেমন না হতো, আমি আপনাকে বলতাম, (জন ১৪:২) যীশুখ্রীষ্টে বিশ্বাস স্থাপনের উপর আপনি নির্ভর করতে পারেন। পূত পবিত্র প্রকৃতির যা তাঁর উপর বিশ্বাস রাখতে এবং দৃঢ় বিশ্বাস ধারণ করতে তিনি দেবেন না যদি সত্যি হতো।
কাজেই এই বিশ্বাসে, যে বিশ্বাস খুবই বলিষ্ঠ, আ হিসেবে এবং অনন্ত কালের জন্য যা যুক্তিসঙ্গত, সেই আপন ব্যবস্থাপত্র দেয়া আছে। না তা সম্পূর্ণ এবং জীবনের উদ্দেশ্য হৃদ-শুলের জন্য

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00