📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 কিভাবে নিয়মিত শক্তি পাওয়া যায়

📄 কিভাবে নিয়মিত শক্তি পাওয়া যায়


বেসবল লীগের এক গুরুত্বপূর্ণ পিচার একবার একশ ডিগ্রীরও বেশি তাপমাত্রায় বেসবল খেলার সময় পিস করেছিলেন। বিকেল বেলার অতি তাপমাত্রায় খেলার ফলস্বরূপ অযথাই তার বেশ কয়েক ডলার খরচ হয়ে যায়। খেলার এক পর্যায়ে তার শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যায়। ফুরিয়ে যাওয়া শক্তি ফিরে পাবার তার যে পদ্ধতি তা সত্যিই অসাধারণ। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম থেকে সে একটি অংশ শুধু বারবার উচ্চারণ করতঃ “কিন্তু যারা বিধাতার জন্য অপেক্ষায় থাকে, তাদের শক্তি নবায়িত হবে; ঈগল পাখীর মত পাখা বিস্তার করে তারা অনেক উঁচুতে উড়তে সক্ষম হবে। তারা ছুটে বেড়াবে, কিন্তু শ্রান্ত হবে না; তারা হেঁটে বেড়াবে, কিন্তু দূর্বল হবে না। ঐ বেসবল পিচারের নাম ফ্রাঙ্ক হিলার (Frank Hiller) তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আমাকে বলল যে, অমন সঙ্গীন অবস্থায় শাস্ত্রের ঐ পদটি আবৃত্তির মাধ্যমে সে আসলেই নব শক্তি ফিরে পেয়েছিল, যার ফলে খেলাটা শেষ করার মতু শক্তি তার অবশিষ্ট ছিল। কৌশলটি ব্যাখ্যা করে সে বললঃ “শক্তি উৎপাদন করুর শক্তিশালী চিন্তার মধ্য দিয়ে আমার মনকে আমি পরিচালিত করেছি।'

আমরা কি ভাবছি, কেমন করে অনুভব করছি তার নিশ্চিত একটা ফল আছে যে, আসলে দৈহিকভাবে আমরা কেমন অনুভব করছি। যদি আপনার মন আপনাকে বলে যে আপনি ক্লান্ত, তাহলে আপনার শারিরীক যান্ত্রিকতা, স্নায়ু এবং পেশীগুলোও এই বিষয়টিকে সত্যি বলে ধরে নেবে। যদি অনিশ্চিত মন তীব্রভাবে আগ্রহী হয়, তাহলে একটি কাজের পেছনে আপনি হয়ত অনলসভাবে লেগে থাকতে পারেন। ধর্ম আমাদের চিন্তা চেতনার উপর দারুণভাবে কাজ করে থাকে, প্রকৃতপক্ষে এটা হলো একটা সুশৃঙ্খল চিন্তা পদ্ধতি। বিশ্বস্ত মনোবৃত্তি যদি মনকে যোগান দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে তা শক্তি সামর্থ বাড়িয়ে তুলছে। এটা আপনাকে আপনার অতি ভারী কাজগুলো সম্পন্ন করতে সাহায্য করবে, এর জন্য তা আপনাকে ইঙ্গিত দেবে যে, আপনার কৃতকার্য হতে প্রচুর অবলম্বন এবং শক্তির উৎস রয়েছে।

কানেকটি কাটে আমার এক বন্ধু আছে, প্রাণবন্ত এক লোক, জীবনী শক্তি এবং সাহসে ভরপুর, একদিন কথায় কথায় আমাকে বলল যে, নিয়মিত সে গীর্জায় যায় 'তার ব্যাটারী রিচার্জ করার জন্য।' তার এই ধারণাটি খুবই বলিষ্ঠ। বিধাতা সকল শক্তির উৎস আর বিশ্ব ভ্রমান্ডের সমস্ত শক্তি নিচয় যেমন পারমাণবিক শক্তি, বৈদ্যুতিক শক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তি; প্রকৃতপক্ষে সবধরনের শক্তি আসে সৃষ্টিকর্তা থেকে। ধর্মশাস্ত্রে এমন জোরালো বক্তব্য আছেঃ "বিধাতা দুর্বলদের শক্তিদান করেন, এবং যাদের কোন শক্তি নেই তাদের শক্তি বাড়িয়ে দেন।” (ঈশাইয়া ×1.29) বাইবেলের আর একটি বক্তব্যে উদ্যমশীল এবং পূণঃ উদম্যশীল করার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বর্ণিত আছেঃ "...আমরা তার শক্তিতেই বেঁচে থাকি, এবং চলাফেরা করি এবং তার শক্তিতেই আমরা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারি।” (এ্যাক্টস × viii 28)

বিধাতা আমাদের মধ্যে যা প্রতিষ্ঠিত করেছে তার সংস্পর্শে আসতে হবে এবং তাহলো, আমাদের মধ্যে বিরাজমান একই ধরনের শক্তি যা এই দুনিয়াকে নিরবধি পূণর্গঠিত করছে এবং প্রতিবছর আগত বসন্ত কালকে নবায়িত করছে। চিন্তন পদ্ধতিতে আমরা যখন আধ্যাত্মিকভাবে বিধাতার সংস্পর্শে আসি, তখন ঐশ্ব শক্তি আমাদের সৃজনশীল কর্মশক্তিকে নবায়িত করে। ঐশ্ব শক্তির সাথে আমাদের সংস্পর্শ যখন ভেঙ্গে যায় ব্যক্তিত্ব তখন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকে এবং তার প্রকাশ ঘটে শরীরে, মনে, এবং জীবনীশক্তিতে। একটি বিদ্যুৎ চালিত ঘড়ি যদি বাইরের কিছুর সাথে সংযুক্ত থাকে তবে তা ঠিকমত চলবে না এবং সঠিক সময় দিতে অনিশ্চিতি প্রকাশ করবে। প্লাগ বিচ্ছিন্ন করলে দেখা যাবে ঘড়ি থেমে গেছে। কারণটা হলো বিশ্বভ্রম্মান্ডের মধ্য দিয়ে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে ঘড়িটি তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণভাবে এই পদ্ধতিটি মানুষের জীবনেও ফলপ্রদ হতে দেখা যায় যদিও যান্ত্রিকতার পরিমাণটা কম।

বেশ কয়েক বৎসর আগে আমি এক জায়গায় বক্তব্য রাখতে গিয়েছিলাম, সেখানে এক বিরাট শ্রোতা সমাবেশে এক বক্তা জোর গলায় বললেন যে, তিনি বিগত ত্রিশবছর ধরে কোনরকম ক্লান্তিবোধ করেননি। কারণটা ব্যাখ্যা করে তিনি বললেন যে, ত্রিশবছর আগে তার একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হয়, সেক্ষেত্রে তিনি ঐশিশক্তির কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেন। সেই থেকে আজও পর্যন্ত সব কাজে-কর্মে পর্যাপ্ত শক্তির ঘাটতি তার মধ্যে দেখা যায় না এবং ব্যাপারটি ছিল অতি আশ্চর্যজনক। । এমন সুস্পষ্টভাবে তিনি তার শিক্ষার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন যে, ঐ সভায় উপস্থিত সবার মনে তা গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল।

আমার কাছে এটা ছিল কোন সত্য ঘটনার প্রকাশের মত একটি বিষয়, যার মাধ্যমে আমাদের সচেতনতার মধ্য দিয়ে মনের অসীম ভান্ডারকে ভরে ফেলতে পারি এবং এর ফলস্বরূপ আমাদের বলশক্তি ক্ষয়ের, ভোগান্তির মত কোন পথে থাকবে না। বছরের পর বছর এই বিষয়টির উপর আমি ঘাটাঘাটি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি যে এই বক্তা যা বর্ণনা করেছেন এবং আমারও দৃঢ় বিশ্বাস যে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রয়োগ করলে তা বাধাহীন এবং সচেতন শক্তিপ্রবাহ মানুষের শরীরে এবং মনে বিশেষ প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম।

এই গবেষণালব্ধ ফলগুলো এক সুখ্যাত ডাক্তার সমর্থন করেছিলেন এবং তার সাথে আমাদের দুজনেরই পরিচিত এক লোক সম্বন্ধে আলাপ করছিলাম। এই লোকটির দায়-দায়িত্ব ছিল খুবই ভারি, কোনরকম বিরতি ছাড়াই তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতেন, কিন্তু তাকে দেখে মনে হত যে এর পরও নতুন কর্তব্য তিনি অবলীলায় গ্রহণ করতেন। তার কাজ-কর্ম সহজেই এবং দক্ষতার সাথে শেষ করার কর্মশক্তির ঘাটতি তার মধ্যে কখনও দেখা যায়নি।

ডাক্তার সাহেবকে আমি আমার ধারণা জানিয়ে বললাম যে, এই লোকটা এমন কোন বিপজ্জনক পদক্ষেপ কখনও নেয়নি যা সম্ভবত তার ভেঙ্গে পড়ার কারণ হতে পারত। ডাক্তার সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, "না" "তার ডাক্তার হিসেবে আমার মনে হয় না যে, ভেঙ্গে পড়ার মত কোন আশঙ্কা তার আছে, এবং এর পেছনে কারণটা হলো যে তিনি সম্পূর্ণরূপে একজন সুসংগঠিত ব্যক্তি এবং তার এই সংগঠিত অবস্থার শক্তি বেরিয়ে যাবার কোন ছিদ্রপথ নেই। সুনিয়ন্ত্রিত একটি যন্ত্র তিনি চালান। স্বচ্ছন্দশক্তি প্রয়োগে তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন এবং পরিশ্রমজনিত কোন ক্ষয় ক্ষতি স্বীকার না করেই দায়িত্বের ভার তিনি বহন করে যাচ্ছেন। এক আউন্স পরিমাণ শক্তি তিনি কখনও নষ্ট করেননি, কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টা প্রয়োগ করেছেন প্রচুর পরিমাণ বলের মাধ্যমে।”

"তার এই দক্ষতাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন ডাক্তার সাহেব? আপাতদৃষ্টিতে একে তো সীমাহীন শক্তি বলেই মনে হচ্ছে।” ডাক্তার এক মূহুর্ত ভাবলেন। "উত্তরটি হলো যে, তিনি একজন সাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক, আবেগের দিক থেকে সুসংবদ্ধ এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি একজন বলিষ্ঠ ধার্মিক লোক। ধর্ম থেকেই তিনি শিখেছেন, শক্তি নিষ্কাশিত হয়ে যাওয়া কে কিভাবে এড়িয়ে যেতে হয়। তার ধর্মশক্তি সক্রিয় এবং শক্তি যাতে ছিদ্রপথে বের হয়ে যেতে না পারে। ধর্মশক্তি তার প্রতিরোধক কৌশল স্বরূপ। কারও মধ্য থেকে শক্তি বের হয়ে যাওয়া কোন কঠিন কাজ নয়। একে বলা যেতে পারে আওপিত আন্দোলন, কিন্তু এই লোকটা ওসব থেকে মুক্ত এক ব্যক্তিত্ব।”

এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যারা বিশ্বাস করছে যে বলিষ্ঠ ধর্মীয় জীবন যাপন শক্তি ও ব্যক্তিত্বের বল ভোগ করার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, বিস্ময়কর ভাবে অনেক লম্বা সময় ধরে তা প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করতে পারে। যদি কোন ব্যক্তি এই দৃষ্টিকোন থেকে তার শরীরের প্রতি যুক্তিযুক্তভাবে যত্ন নেয় যে সে সঠিক খাবার খাবে, ব্যায়াম করবে, পরিমাণমত ঘুমাবে, শারীরীক অপব্যবহার করবে না, তাহলে সেই শরীর তাকে দেবে অবাক করে দেবার মত শক্তি এবং সুন্দর স্বাস্থ্য তার বজায় থাকবে নিঃসন্দেহে। একইভাবে যদি সে সুসংবদ্ধ আবেগঘন জীবনের প্রতি মনোযোগী হয়, তবে তার মধ্যে শক্তি সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু যদি সে বংশগত কারণে অথবা স্বেচ্ছায় আরোপিত কোন ধ্বংসকারী আবেগের প্রতিক্রিয়া বশবর্তী হয়ে আপন শক্তি হারায় তবে নিঃসন্দেহে তার জীবনরক্ষাকারী শক্তির অভাব দেখা দেবে। কোন ব্যক্তির স্বাভাবিক অবস্থা হল, যখন তার শরীর, মন এবং জীবনীশক্তি সুসমঞ্জসভাবে কাজ করে এবং এই অবস্থায় বুঝা যায় যে, নিয়মিতভাবে তার মধ্যে প্রয়োজনীয় শক্তির পুণঃস্থাপন ঘটছে।

মিসেস থোমাস এ. এডিসন, যার সাথে আমার প্রায়ই আলাপ হত তার বিখ্যাত স্বামীর অভ্যাস এবং বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তার স্বামী ছিলেন বিশ্ববরেণ্য আবিষ্কারক তাঁর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে জানালেন যে, মি. এডিসনের রীতি ছিল ল্যাবরেটোরী থেকে অনেক ঘন্টাব্যাপী পরিশ্রম করার পর বাসায় ফিরে তাঁর পুরানো আরাম কেদারায় শুয়ে পড়া। তিনি আমাকে বললেন যে, ছোট্ট শিশুর মত ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি, একেবারে সত্যিকারের বিশ্রাম, গভীর নীবিড় এবং উদ্বেগহীন প্রশান্ত ঘুমে তলিয়ে যেতেন। তিন ঘন্টা, চার ঘন্টা, এমনকি কোন কোন দিন পাঁচ ঘন্টা পর মূহুর্তমধ্যে জেগে উঠতেন, পুরোপুরি সতেজ তখন তিনি এবং কাজে ফিরে যাবার স্বচ্ছন্দ আগ্রহে ভরপুর।

আমার অনুরোধে মিসেস এডিসন আমাকে তার স্বামীর সাবলীলভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে বিশ্রাম নেবার সফল ধরণাটির কথা বিস্তারিতভাবে জানালেন। তিনি বললেন: “আমার স্বামী প্রকৃতির সন্তান” এর দ্বারা তিনি একথাই বোঝাতে চাইলেন যে, তিনি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতি এবং বিধাতার সাথে সুললিত এক ঐকতানে বাঁধা। তার মধ্যে ছিলনা কোন বদ্ধ সংস্কার; কোন বিশৃংঙ্খলা কোন দ্বন্দ, কোন আত্মাভিমান, কোন আবেগগত চাঞ্চল্য। যে পর্যন্ত না তিনি ঘুমাবার প্রয়োজন অনুভর করতেন সে পর্যন্ত একটানা কাজ করে যেতেন। ঘুমের সময় উপস্থিত হলে গভীর ঘুমে ডুবে যেতেন এবং যথাসময়ে যেগে উঠে কাজে যেতেন। তিনি অনেক বছর বেঁচেছিলেন, এবং সৃজনশীল অনেক বিশেষত্বে বিশিষ্ট ছিলেন আমেরিকা (মহাদেশে আগত অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মত। সমস্ত শক্তি তিনি সঞ্চয় করেছেন তাঁর আবেগসঞ্জাত আধিপত্যের দ্বারা এবং এভাবেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে পুরোপুরি শিথিল মনের ওপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্বব্রহ্মান্ডের সাথে তার বিস্ময়কর সুসমঞ্জস সম্পর্ক তৈরি হবার কারণ হলো প্রকৃতি, আর প্রকৃতিই তাঁর কাছে প্রকাশ করেছে এক দুর্জেয় গোপন রহস্য।

প্রত্যেক মহান ব্যক্তিত্বের বেলায় সব সময়ই আমি জেনেছি এবং এমন অনেককে আমি জেনেছি, যারা বিস্ময়কর কাজের মাঝে তাদের ধারণ ক্ষমতার নিশ্চিত প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই বিধাতার সাথে একই সুরে বাঁধা। এরকম প্রত্যেক ব্যক্তিই মনে হয় প্রকৃতির সাথে সমতানে বাঁধা এবং ঐশ্বরিক শক্তির সাথে সম্পর্কিত। তারা কিন্তু আবশ্যিকভাবে পবিত্র ব্যক্তিত্ব নয়, কিন্তু অপরিবর্তনীয়ভাবে এবং অসাধারণভাবে তাঁরা আবেগের এবং মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই সুসংগঠিত। রাগ বা বিরক্তিবোধ, শৈশবকালে এদের উপর মাতাপিতার কোন ত্রুটিবিচ্যুতির প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব পড়া, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ, এবং বদ্ধসংস্কার যেগুলো তাদের সুন্দরভাবে সমীকৃত ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয় এবং এভাবেই তাদের স্বাভাবিক শক্তির অনুচিত ব্যয়ভার বহনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাতে ভোগান্তি হয় উভয়পক্ষের।

যত দীর্ঘদিন আমি বাঁচবো তত অধিক বিশ্বাস আমার যে, না বয়স না অবস্থা বিশেষ, দুটির একটি ও দৈহিকশক্তি এবং জীবনীশক্তি থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে পারে না, তার কোন প্রয়োজনও নেই। শেষপর্যন্ত ধর্ম এবং শরীর এ দুটোর মধ্যে একটি নীবিড় সম্পর্ক আমাদের জাগিয়ে তুলতেই হচ্ছে। আমরা হৃদয় দিয়ে বুঝতে শুরু করেছি যে, একটি মূল সত্য এ পর্যন্ত উপেক্ষিত হয়েছে, যে আমাদের দৈহিক অবস্থা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় আমাদের আবেগময় অবস্থার উপর নির্ভর করে এবং আমাদের আবেগময় জীবন গভীরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের জীবনের যত চিন্তা শক্তির দ্বারা।

বাইবেল সহ অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রের অনেক জায়াগাতেই জীবনীশক্তি, নৈতিক শক্তি এবং জীবনের কথা বর্ণিত আছে। যেমন বাইবেলে তেমনি অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থগুলোতেও সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে জীবনের উপর; এবং জীবন মানে জীবনীশক্তি, যা শক্তিতে পূর্ণ করতে হবে। যীশুখ্রীষ্টের মত সব ধর্ম নেতৃবৃন্দই একই উদ্দেশ্যে একই কথা বলেছেন তা হলো, "আমি এসেছি যেন মানুষ জীবন ফিরে পায়, এবং প্রচুর পরিমাণেই পায়।” তারমানে এই নয় যে জীবন থেকে ব্যথা-বেদনা, ভোগান্তি বা কষ্টক্লেש এসবকে একেবারে বাদ দেয়া যাবে, কিন্তু এর ভাবার্থ হলো, যদি কোন ব্যক্তি ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত নির্দোষ, নির্মল জীবন লাভের জন্য গঠনমূলক ও পূণর্গঠনমূলক কাজের অনুশীলন করে তবে সে পর্যাপ্ত মানসিক এবং দৈহিক শক্তি নিয়ে বাঁচতে পারে।

উপরে উল্লেখিত মৌলিক সত্যের অনুশীলন যদি করা যায় তবে তা যে কোন ব্যক্তির জীবনে বয়ে আনবে বেঁচে থাকার জন্য সঠিক লয়বন্ধতা। উচ্চগতিশীলতার কারনেই আমাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়, কারণ উচ্চগতিতে ছুটার জন্য আমরা অস্বাভাবিক পদক্ষেপে চলি। শক্তি সম্পদের সংরক্ষণ নির্ভর করে আপনাদের ব্যক্তিত্ব উদ্ভূত গতির উপর এবং সেই গতির মাত্রা বিধাতা প্রদত্ত স্বাভাবিক গতির সমকালীন হওয়া চাই। বিধাতা তো আপনার মধ্যেই আছে। যদি আপনি এক গতি মাত্রায় চলেন এবং বিধাতা অন্য আর এক মাত্রায় চলেন তাহলে আপনি নিঃসন্দেহে দূরে ছিটকে পড়বেন। “যদিও বিধাতার কল কোন কিছু ধীরে ধীরে চূর্ণ করে, কিন্তু এখনও তা অতিক্ষুদ্র আকারে চূর্ণ করে” কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ কলগুলো চূর্ণ করে অতি দ্রুতগতিতে এবং তাই সেগুলো চূর্ণ করে প্রচুর পরিমাণে। যখন আমরা বিধাতার সাথে একই সমন্বিত ছন্দে সুর বাঁধি তখন আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগত লয় উন্নতি হয় এবং শারীরীক শক্তি মুক্ত ছন্দে সামনে ছুটতে থাকে।

এ যুগের উন্মত্ত অভ্যাসগুলোর অনেক ধরনের অমঙ্গলজনক ফল আছে। আমার এক বান্ধবী একবার তার বয়স্ক বাবার দ্বারা পরিচালিত এক সমীক্ষায় প্রাপ্ত রিপোর্ট সম্বন্ধে আমাকে জানান। তিনি বলেন যে, সেই প্রাচীন যুগে যখন একজন যুবক তার অভিপ্রেত প্রণয় প্রার্থনার জন্য সন্ধাবেলায় এসে বৈঠকখানায় বসত, তখনকার দিনে সময় পরিমাণ করা হতো ধীরস্থিরভাবে, গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের বড় ঘড়ি পেন্ডুলামের আঘাত ছিল ভারী, কারণ ঐ ঘড়ির পেন্ডুলাম ছিল খুবই লম্বা। মনে হতো ঘড়ি যেন বলছে: "প্রচুর সময় আছে। প্রচুর সময় আছে। প্রচুর সময় আছে।” কিন্তু আধুনিক সময়ের ঘড়ির পেন্ডুলাম আকারে ছোট এবং তার আঘাতও অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং ঘড়ি যেন বলছে: "এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার। এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার। এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার। এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার।"

সবকিছু অতি গতিশীল হয়ে গেছে, এবং সেই কারণে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত এই সমস্যার সমাধান হলো, সর্বশক্তিমান যে সৃষ্টিকর্তা তার নির্ধারিত সময়ের সাথে সমান গতি মেনে চলা। এই কাজটি করার একটি পথ হচ্ছে কোন এক গরমের দিনে বাইরে গিয়ে মাটির উপর শুয়ে পড়তে হবে এবং মাটির সাথে কান ঠেকিয়ে শুনতে হবে। দেখবেন আপনি সব ধরনের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। বাতাস গাছপালায় যে শব্দ সৃষ্টি করে তা আপনি শুনতে পাবেন, কীট পতঙ্গের একঘেয়ে ডাক আপনি শুনতে পাবেন, এবং আপনি তৎক্ষণাৎ আবিষ্কার করতে পারবেন, এসব শব্দের মধ্যে একটি সুললিত লয় বিদ্যমান। ঐরূপ ছন্দবদ্ধ লয় আপনি কিন্তু শহরের রাস্তায় কর্মরত ট্রাফিকের বাঁশির শব্দের মধ্যে খুঁজে পাবেন না, কারণে ট্রাফিকের বাঁশির শব্দ নানান হৈ চৈ এর মধ্যে বিলীন হয়ে গিয়েছে। আবার খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা গীর্জার ঐশী বাণী এবং স্তোত্রগীতির মধ্যে এই লয়বদ্ধ শব্দ শুনতে পায়। মুসলিম সম্প্রদায়ে সবাই এমন লয়বদ্ধ শব্দ শুনতে পায় আযানের সুরে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা শুনতে পায় শঙ্খ ও ঘণ্টাধ্বনিতে। কারণ সত্য এখানে কম্পিত ছন্দে বিধাতার লয়ের সাথে মিলিত হয়। এমন ছন্দবদ্ধ শব্দ আপনি বিভিন্ন কলকারখানাতেও শুনতে পারেন। যদি আপনার তেমন একটি মন থাকে।

আমার এক বন্ধু, ওহিও রাজ্যে এই শিল্পপতির বিশাল শিল্পকারখানা আছে। একদিন তিনি আমাকে জানালেন যে তার এই শিল্প প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে ভালো শ্রমিকদের একটি লক্ষণীয় গুণ হলো, তাদের কাজের মধ্যে একটি সুসমন্বিত ছন্দবদ্ধতা। তা ঠিক যে যন্ত্রটি তারা চালায় তার মতই। তিনি জোর গলায় বললেন যে, যদি কোন কর্মী বা কর্মচারী তার যন্ত্রটির মতই ছন্দবদ্ধ লয়ে কাজ করে তাহলে দেখা যাবে সারাদিন কাজ করার পরও দিনের শেষে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েনি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন যে, একটি যন্ত্র হলো বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সুসমন্বিত রূপ যা বিধাতার সমন্বিত সুসংবদ্ধ নিয়ম কানুনের মতই। যখন আপনি একটি যন্ত্রকে ভালোবাসেন এবং এর খুটিনাটি সবকিছু জানতে পারেন, তখন আপনি স্বভাবতই যন্ত্রটির ছন্দবদ্ধ চলনের বিষয় সতর্ক হয়ে উঠবেন। এটা যেন ঠিক আমাদের শরীরের স্নায়ুর এবং আত্মার ছন্দবদ্ধতার মতই সুনিয়ন্ত্রিত এবং সুসমন্বিত। আর এটা হলো বিধাতার ছন্দ এবং আপনি এই যন্ত্রটি দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন এবং তাতে ক্লান্ত হয়ে যাবার কথা নয় যদি আপনি এর সাথে সমতান বা সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে চলেন। একইভাবে একটি ষ্টোভের ছন্দ আছে, টাইপরাইটার মেশিনের ছন্দ আছে, অফিসের মধ্যে ছন্দ আছে, মোটর গাড়ীর ছন্দ আছে, আপনার কাজের ও একটি ছন্দ আছে। কাজেই ক্লান্তি এড়াতে হলে, এবং দৈহিক বলশক্তি পেতে হলে আপনার জীবনের প্রতিদিনের চলার পথকে বিধাতার থেকে পাওয়া অত্যাবশ্যক ছন্দে এবং তার উদ্দেশ্যে সকল কাজ সম্পূর্ণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করুন।

এসব কাজ সমাধা করার জন্য, শারীরীকভাবে শিথীলতা বজায় রাখুন। তারপর কল্পনা শক্তির জোরে আপনার মনকেও আপনি শিথীলভাবে রাখুন। মনশ্চক্ষুতে দেখুন যেন আত্মা শান্ত হয়ে যাচ্ছে, এবং মনে মনে এই ধারণাকে অনুসরণ করুন। তারপর এভাবে প্রার্থনা শুরু করুনঃ “প্রিয়তম সৃষ্টিকর্তা, তুমিই সকল শক্তির উৎস। সৌরশক্তির উৎস তুমি, পরমাণুতে বিরাজমান শক্তি তোমা হতেই আসে, দৈহিক মাংসে স্থিত শক্তি তোমার, রক্ত-স্রোতে মনের অদৃশ্য শক্তি সবকিছু তোমা হতেই আসে। এসবের মাধ্যমে আমি তোমা থেকে শক্তি সংগ্রহ করি, তোমার এ শক্তির উৎস অনন্ত অসীম।” তারপর নিরবধি বিশ্বাস করতে থাকুন যে, আপনি বিধাতার কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছেন। সেই অসীমের সাথে সম সুর ও ছন্দ বজায় রাখুন।

অবশ্যই অনেক লোক ইতিমধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, সাধারণভাবে তার কারণ হলো, তারা কোন কিছুতেই আগ্রহী নয়। কোনোকিছুই তাদের গভীরভাবে নাড়া দেয় না। কোন কোন লোকের কাছে কি চলছে এবং কেমনটা চলছে তার মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে দেখার চেষ্টা করে না। তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলোই যেন অন্যদের চেয়ে উৎকৃষ্ট, এমনকি মানুষের ইতিহাসে সংকটকালে সংকটে তাদের এই একগুয়েমি ভাবটাই পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র তাদের খিটখিটে বিরক্তি তাদের আকাঙ্খা, এবং তাদের ঘৃণা ছাড়া কোনোকিছুই তাদের কাছে সত্যিকার পার্থক্য আছে বলে মনে করে না। তারা নিজেরা যে অসংখ্য অসংগত বিষয়ের মাঝে ভীতি এবং উদ্বিগ্ন অবস্থার মধ্যে ছিল তার পরিমাণ করা ভার। কাজেই তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল এমন কি তারা অসুস্থও হয়ে পড়েছিল। ক্লান্ত হয়ে না পড়ার সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হলো, এমন কিছুর মধ্যে আপনাকে ছেড়ে দিন যার মধ্যে আপনার গভীর বিশ্বাস আছে।

এক বিখ্যাত রাজনীতিবিদ একেকদিন সাতটা বক্তৃতা দিতেন, তা সত্যেও তাঁর মধ্যে শারীরিক শক্তির ঘাটতি দেখা যায়নি।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সাতটা বক্তৃতা দেবার পরও আপনি ক্লান্তি বোধ করলেন না, তা কিভাবে সম্ভব হলো?

তিনি বললেন, তার কারণ হলো, ঐ বক্তৃতাগুলিতে আমি যা বলেছি, তা আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি, আমার বিশ্বাসের প্রতি আমি অত্যন্ত আগ্রহী।

এই হলো তার শক্তির গোপন উৎস। কিছু কিছু বিষয়ের জন্য তিনি যেন আগুনে পুড়ছিলেন। এই শক্তি ঢেলে তিনি আগুন থেকে নিজেকে বের করে আনছিলেন। কাজেই আপনিও যদি এই বিষয়টি অনুসরণ করেন তবে আপনিও কখনও দৈহিক বা জীবনী শক্তি হারাবেন না। আপনি তখনই শক্তিহীন হয়ে পড়েন যখন আপনার মনের কাছে জীবনকে একটা বিষাদগ্রস্ত বিষয় বলে মনে হয়। আপনার মন অমন একঘেয়েমির শিকার হয়ে পরে এবং সে ক্ষেত্রে আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়াতে কোন কিছু করার ইচ্ছা থাকে না। ক্লান্তিকে আপনি ফাঁকি দিতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা। কোন একটি বিষয় আপনাকে নির্বাচন করতে হবে এবং তার পিছনে মনের অনুরাগ ঢেলে দিতে হবে। মনের মত কোন কিছুতে পুরোপুরি মুগ্ধ হয়ে পড়ুন। মনকে স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে দিন ঐ বিশেষ অবস্থার মধ্যে। নিজের গন্ডী থেকে বের হয়ে আসুন। কিছু বা কেউ একজন হবার চেষ্টা চালিয়ে যান। তার জন্য কিছু একটা করা শুরু করে দিন। চারিদিকে হয়ত খেদোক্তি করার মত অনেক কিছু আছে কিন্তু তাই নিয়ে অযথা বসে থাকবেন না, খবরের কাগজ পড়েও হয়ত বিরক্তিতে মন ভরে যেতে পারে, এবং আপনার বিরক্তও প্রতিবাদী মন হয়ত সোচ্চার হয়ে উঠে বলতে পারে, কেন ওরা কিছু একটা করছে না? এক্ষেত্রে আপনি নিজের স্বার্থ চিন্তা বাদ দিয়ে বড় কিছুর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন এবং তাতে আপনি দেখবেন বিরক্তিকর ক্লান্তি আপনাকে অচল করে রাখছেন না।

যতক্ষণ আপনি বড় এবং ভালো কোন নিমিত্তের সাথে নিজেকে না জড়াচ্ছেন ততক্ষন আপনি ক্লান্তির শিকার হতেই পারেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এমন অবস্থায় আপনি একজন খন্ডিত ব্যক্তি, আপনি একজন অবনত ব্যক্তি। আপনি মৃতকল্প আঙ্গুর গাছের মত। কিন্তু আপনি যত বড় নন তার চেয়ে বড় কিছুর সাথে যদি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তবে দেখবেন আপনার মধ্যেকার সুপ্ত বেড়ে গেছে বহুগুণ। তখন নিজেকে নিয়ে ভাববার সময় আপনার থাকবে না এবং আবেগময় কঠিনতার মধ্যে আপনি ডুবে যাবেন।

অপরিবর্তনীয় শক্তি নিয়ে বাঁচতে হলে যা আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আবেগগত দোষত্রুটির সংশোধন করা। তা না করা পর্যন্ত কখনও আপনি পরিপূর্ণ শক্তি পাবেন না।

স্বর্গত Knute Rockne (নুট রকনি), আমেরিকার ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়া খ্যাতনামা ফুটবল কোচদের একজন, বলেছেন যে, একজন ফুটবল খেলোয়ারের হয়তো দৈহিক বল যথেষ্ট পরিমাণ নাও থাকতে পারে যদি না তার আবেগ আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণে থাকে। মূলত: একথা বলতে গিয়ে তিনি অনেক দূর চিন্তা করেছেন যে, তাঁর দলে তিনি এমন কোন খেলোয়ারকে অন্তর্ভূক্ত করবেন না যে প্রত্যেক খেলোয়ারের সাথে সত্যিকার বন্ধু ভাবাপন্ন মানসিকতা বজায় রেখে খেলে। "আমাকে একজন খেলোয়ারের মধ্যে সর্বোচ্চ্য শক্তি পেতে হবে, এবং আমি এটা আবিষ্কার করেছি যে তা করা সম্ভব নয়, যদি সে অন্যজনকে ঘৃণা করে। ঘৃণা তার মধ্যে শক্তির আগমনের পথে অন্তরায় এবং সে সম্পূর্ণতা পায় না যদি না সে তার মধ্য থেকে ঘৃণাবোধকে বের করে দিতে না পারে এবং তা বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতিতে পরিণত না হয়।” যেসব লোকের দৈহিক ও মানসিকশক্তির অভাব তারা গভীর ও প্রধান আবেগময়তায় এবং মানসিক দ্বন্দ্বে এক বা একাধিক মাত্রায় অসংগঠিত। কোন কোন সময় এই বিশৃঙ্খলার ফল হয়ে যায় অত্যধিক, কিন্ত এর নিরাময় চিরদিনই সম্ভব।

মধ্য পাশ্চাত্যের কোন এক শহরে এক লোকের সাথে কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছিল আমাকে, যে জনগোষ্ঠী ঐ শহরে বসবাস করত উনি তাদের মধ্যে একজন খুবই কর্মঠ এক ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তাকে জীবনীশক্তির প্রবল ক্ষয় ভোগ করতে হয়েছিল। তার সহযোগীরা ভেবেছিলেন যে তার স্ট্রোক করেছিল। এরকম একটি ধারণা জন্ম নিয়েছিল তার এলোমেলো আচরণ থেকে, তার অস্বাভাবিক নিশ্চেষ্ট মনোভাব থেকে এবং তার কাজ কর্ম থেকে পুরোপুরি ভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা থেকে অথচ আগে তিনি তার কাজে অনেক লম্বা সময় ব্যয় করতেন। হতাশা ক্লান্ত এই লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে বসে কাটিয়ে দিতেন এবং প্রায়ই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। স্নায়ুবিক ধ্বংসের অনেক লক্ষণ তার মধ্যে প্রকাশ পেতো।

একটি সময় নির্ধারণ করে আমার হোটেল কক্ষে তার সাথে সাক্ষাত করার আয়োজন করলাম। আমার দরজা খোলাই ছিল, এবং সেপথে আমি পরিষ্কার এলিভেটরটি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার সুবিধামত সেদিকে তাকিয়ে দেখছিলাম যে, কখন লোকটি এলিভেটরের দরজা খুলে এলোমেলো চলন্ত চত্ত্বরের ভেতরে এসে ঢুকবেন। মনে হচ্ছিল যে কোন মূহুর্তে তিনি হুমড়ি খেয়ে এসে পড়বেন এবং আমার অনুমান সত্য প্রমাণ করে তিনি ভেতরে এসে ঢুকলেন এবং কোন রকমে আমাদের দুজনের মাঝের দূরত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হলেন। আমি তাকে বসতে বললাম, এবং তার সাথে কথাবার্তা জুড়ে দিলাম, কিন্তু সে কথাবার্তা প্রায় নিষ্ফলই বলা যায়, কারণ তা তার মনে খুবই সামান্য আলোকপাত করতে পারলো। কারণ তার কথার মধ্যে তার বর্তমান অবস্থার জন্য অভিযোগে ভর্তি ছিল এবং আমি যে তাকে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলাম তারপ্রতি সুচিন্তিত বিবেচনা করতে তিনি ছিলেন পুরোপুরি অক্ষম। এর জন্য দৃশ্যত: তার প্রচণ্ড করুণ দশাই দায়ী ছিল। যখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম আপনি ভালো এবং সুস্থ হতে চান কি না, সে উত্তেজিত এবং করুণভাবে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতেন। উত্তরদানের মধ্য দিয়ে তার মনের নৈরাশ্যই প্রকাশ পেতো। তিনি বলতেন, যদি তিনি তার শক্তি ফিরে পেতেন, যদি তিনি জীবনের আগ্রহ ফিরে পেতেন, একসময় যে জীবন তিনি উপভোগ করেছিলেন, তাহলে এই দুনিয়াতে তিনি যে কোন কিছু দিতে প্রস্তুত।

তার মধ্য থেকে আমি তার জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাপূর্ণ ঘটনাবলী একটা একটা করে বের করে আনতে থাকলাম। এসব ছিল পরিচিত ধরনের এবং ওসবের অনেক কিছুই তার চেতনার মধ্যে এমন গভীরভাবে বিদ্ধ হয়েছিল যে এটা তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে থেকে ছেটে ফেলা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শৈশবের পাওয়া নানা বদ্ধমূল ধারণা তার মধ্যে কাজ করছিল, এ সময়কার পাওয়া নানা ভীতিকর ধারণা তার মনে রীতিমত ডগা মেলে বসেছিল এবং এর বেশিরভাগই তিনি পেয়েছিলেন তার মায়ের কাছ থেকে। শুধু যে গুটিকতক অপরাধমূলক অবস্থাই তার মধ্যে এসে বাসা বেঁধেছিল তাই নয়। মনে হয় যেন সেসব বছরের পর বছর ধরে স্রোতের তোরে ধাক্কা খাওয়া বালুর মত নদীগর্ভে স্তুপ হয়ে জড়ো হয়ে উঠেছে। এতে ক্রমে ক্রমে জলধারার প্রবাহ শক্তি এতটা কমে গেছে যে, সে পথে খুবই সামান্য পরিমাণ শক্তি প্রবাহিত হতে পারছিল। লোকটির নিরুৎসাহ মন পুরোপুরিভাবে এমন এক পশ্চাৎপদ অবস্থায় এসে পড়েছিল যে, এর কারণ নির্ধারণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা এবং তার মনে কোন রকম আলোকপাত করা মনে হচ্ছিল একেবারেই অসম্ভব।

একটি পথনির্দেশ পাবার জন্য অনুসন্ধান করলাম এবং তা আমি পেয়েও গেলাম এবং আশ্চর্য হয়ে গেলাম যখন তার পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথার উপর আমার একটি হাত আমি রাখলাম। বিধাতার কাছে প্রার্থনা করলাম প্রভূ! লোকটিকে সুস্থ করে তোল। আর ঠিক তখনই হঠাৎ আমি সতর্ক হয়ে উঠলাম কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম যে, হাতটি আমি লোকটির মাথার উপর ন্যস্ত করেছি তার মধ্য দিয়ে অদ্ভূত এক শক্তি চালিত হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি বললাম যে আমার হাতে কোন নিরাময়কারী শক্তি নেই, কিন্তু কোন কোন সময় কেউ একজন হয়ত এমন একটি মাধ্যম হয়ে যায় এবং এক্ষেত্রে স্পষ্টত: তাই ঘটেছিল, কারণ লোকটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অত্যন্ত খুশিতেও শান্তিতে মুখ তুলে তাকালেন এবং স্বাভাবিকভাবে বললেন: "তিনি এখানে ছিলেন, তিনি আমাকে স্পর্শ করেছেন, আমি এখন সম্পূর্ণ স্বস্তিদায়ক অনুভব করছি।"

এই সময় হতে তার অবস্থার অবধারিত উন্নতি পরিলক্ষিত হয় এবং বর্তমান সময়ে তিনি বাস্তবিকভাবে আবার তার আগের অবস্থায় চলে আসেন, কিন্তু বারতি যেটুকু তিনি লাভ করেন তা হলো, তার শান্ত এবং নির্মেঘ আত্মবিশ্বাস যা আগে কখনও তার মধ্যে ছিলনা। স্পষ্টত: তাঁর ব্যক্তিত্বের যে প্রণালী প্রায় আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, যেখান দিয়ে তার শক্তি চলাচল করত, অবরুদ্ধ সেই প্রণালী এখন উন্মুক্ত হয়েছে এবং তা হয়েছে বিশ্বাসের জোরে এবং শক্তির মুক্ত গতি এখন নবায়িত হয়েছে।

এই যে ঘটনাটি ঘটল তার মধ্য থেকে এই আভাসই পাওয়া যায় যে, এমন নিরাময় লাভ ঘটে, ঘটা সম্ভব এবং এও সত্যি যে, ক্রম সঞ্চিত মনস্তাত্বিক কারণগুলো শক্তি প্রবাহকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এ ঘটনার আরো একটা গুরুত্ব আছে, তাহলো এই একই কারণগুলো বিশ্বাসের শক্তির প্রতি বেশ সংবেদনশীল; কারণ এগুলো বিশ্বাসের শক্তিকে খণ্ডিত করে ফেলে এবং এভাবে ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে তার ঐশ্বরিক শক্তির প্রণালীকে নতুন করে খুলে দেয়।

অপরাধ ও দৈহিক শক্তিকে কেন্দ্র করে যে ভীতিজনক অনুভূতির সৃষ্টি হয় এবং এর যে ফলাফলটা ঘটে তা অনেকখানি চিনতে পারা যায় মনের সমস্ত প্রভাবের মধ্য দিয়ে। যা মানব প্রকৃতির সমস্যাগুলোতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। পরিমিত জীবনী শক্তির প্রয়োজন ব্যক্তি বিশেষকে হয় অপরাধ কিম্বা ভীতি থেকে স্বস্তি দেয়া অথবা দুটোকেই তা একসাথে করা, তা হবে একটি বিরাট কাজ কারণ প্রায়ই দেখা যায়, মোট জীবনীশক্তির অংশবিশেষ মাত্র বেঁচে থাকার প্রক্রিয়া নির্বাহ করার জন্য অবশিষ্ট থাকে। শক্তির ক্ষরণ ঘটে ভয় এবং অপরাধ অনুভূতির পীড়ন থেকে এবং তা এমন পরিমাণে ঘটে যে, কোন ব্যক্তির কাজ-কর্ম সম্পাদনের জন্য খুব সামান্য শক্তিই তখন অবশিষ্ট থাকে। এর ফলস্বরূপ যা দাঁড়ায় তা হলো, ঐ ব্যক্তি তখন তার হাতের কাজটি দ্রুত সমাপনের চেষ্টা করে। তার দায়দায়িত্বের পুরোপুরি আবশ্যকতা পূরণ করতে সক্ষম না হয়ে, সে ফিরে যায় এক করুণ, নিরস এবং অলস জীবনে, এমনকি সত্যি সত্যি সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে নিষ্কর্মার মত এক অর্থব অবস্থায় পড়ে থাকতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

এক মনস্তত্ববিদ তার এক ব্যবসায়ী রোগীকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। আমার মনে হলো যে রোগীটির নৈতিক চরিত্রগতভাব সম্পূর্ণ কঠোর এবং সৎ প্রকৃতির কিন্তু এক বিবাহিতা মহিলার সাথে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পরেন। সম্পর্কটি চুকিয়ে দেবার চেষ্টা তিনি করেছিলেন, কিন্তু তার এই ব্যভিচারীনি প্রণয়িনী তার পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যদিও লোকটি মহিলাকে আন্তরিকভাবে এমন কাজ থেকে বিরত হতে আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন এবং আগের সামাজিক জীবনে ফিরে যেতে দিতে বলেছিলেন।

কিন্তু মহিলাটি লোকটিকে এই সম্ভাবনার কথা বলে যে যদি এ সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয় তবে সে তার স্বামীর কাছে তার এই উচ্ছঙ্খলতার কথা ফাঁস করে দেবে। রোগী লোকটি পুরো ঘটনাটি বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি এই ঘটনাটি মহিলা তার স্বামীর কাছে ফাঁস করে দেয় তাহলে সমাজে সে লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে পড়বে। অথচ সমাজে সে একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি এবং সেখানে তাকে দামী লোক হিসাবে মূল্যায়নও করা হয়।

ঘটনাটি ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে এবং তার অপরাধবোধ তার ঘুম আর আরাম হারাম করে ফেলেছিল। এবং তখন থেকে দুতিন মাস পাড় হয়ে গিয়েছিল, শারীরিক শক্তির এতটা পতন হয়েছিল যে লোকটি দক্ষতার সাথে তার কাজকর্মও করার মত অবস্থায় ছিল না। যেহেতু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল তাই তার অবস্থাটাও হয়েছিল খুব গুরুতর। যখন ঐ মনস্তত্ববিদ আমার সাথে অর্থাৎ একজন ধর্মযাজকের সাথে দেখা করতে পাঠালেন, ঘুমাতে না পারার কারণে লোকটি আমার কাছে আসতেও প্রতিবাদ করেছিলেন। আপত্তির কারণ হিসেবে বললেন যে, আমার নিদ্রাহীনতা দূর করার মত কোন পথ ধর্মযাজক বাতলে দিতে পারবেন না। কিন্তু অন্যদিকে আমার মনে হচ্ছে একজন মেডিসিনের ডাক্তার ফলপ্রদ ঔষধ দিয়ে আমার এই জটিল অবস্থার নিরসন করতে পারবেন।

যখন তার মনোভাব তিনি আমার কাছে ব্যক্ত করলেন, আমি শুধু তার কাছে জানতে চাইলাম যে প্রচন্ড বিরক্তিকর অবস্থায় এবং অপ্রীতিকর শয্যাসঙ্গী যার সাথে তিনি ঘুমাবার চেষ্টা করছিলেন তখন কেমন করে তিনি ঘুমাবার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড বিস্ময়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "শয্যাসঙ্গী কিসের শয্যাসঙ্গী?” "আমার কোন শয্যাসঙ্গী নেই।"

“ও আচ্ছা, কিন্তু আছে তো,” “এই পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে ঐ দু'জনকে ছাড়া ঘুমাতে পারে, একেকদিকে একজন করে নিয়ে ঘুমাতে যায়।”

তিনি জানতে চাইলেন, "আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?” আমি বললাম: "প্রতি রাতে আপনি এক পাশে ভয় অন্য পাশে অপরাধকে শয্যাসঙ্গী করে ঘুমাতে চেষ্টা করছেন এবং আপনি একটি অসম্ভব অসাধারণ কাজ করতে চাইছেন। এর সাথে কোন তফাৎ নেই যে কতগুলো ঘুমের বড়ি আপনি গিলছেন এবং আপনি স্বীকার করেছেন আরো কত ঘুমের বড়ি আপনি আগে গিলেছেন, কিন্তু ওসবে নিদ্রাহীনতার উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তার কারণটি হল যে, তা আপনার সমস্যার উপর কর্তৃত্ব করতে পারে না, কারণ ওসব আপনার মনের গভীরতর স্তরে পৌঁছতে পারে না, যেখানে এই নিদ্রাহীনতার উৎস এবং যা আপনার শক্তিকে আপনার মধ্য থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তাই অবশ্যই আপনাকে মন থেকে ভয়ভীতি এবং অপরাধবোধ উৎপাটিত করতে হবে এবং কাজটি করতে হবে ঘুমাতে যাবার আগেই তারপর আপনি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ঘুমাতে পারবেন এবং আপনার শক্তিও ফিরে পাবেন।

আমরা ভয়ভীতি নিয়ে আলাপ করলাম, কারণ এই আলাপটা ছিল একটা সাধারণ কৌশলের বহিঃপ্রকাশ। যাতে লোকটা পরে যা তার সঠিক কিছু করার ফলশ্রুতি হিসাবে এসে উপস্থিত হবে তার জন্য যেন মনে প্রস্তুত থাকতে পারে এবং তা করা হয়েছিল অবশ্যই যাতে তার অযুক্তি বাজে ফলাফলগুলোকে ভেঙ্গে দেয়া যায় তার জন্য। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, যা কিছু তিনি করেছিলেন তা ঠিকই ছিল এবং এথেকেই আসবে নির্ভেজাল সত্যটি। সঠিক কিছু করে কেউ কখনও বলতে পারে না যে, সে ভুল করেছে। আমি তাকে অনুরোধ করে বললাম যে, আপনার এই অবস্থাটি আপনি বিধাতার হাতে ছেড়ে দিন এবং শুধুমাত্র সঠিক কাজটি করুন। ফলাফল কি হবে সে ভার বিধাতার হাতে ন্যস্ত করুন।

লোকটি তা করলেন কিন্তু অকম্পিতচিত্তে নয় কিন্তু মোটামুটি আন্তরিক ভাবেই কাজটি করলেন। আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, মহিলাটিও হয় তার চাতুর্যের মধ্য দিয়ে কিম্বা তার শুভ প্রকৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে অথবা আরো কোন সন্দেহজনক কৌশল প্রয়োগ করে, হয়ত অন্য কোনো খানে, অন্য কারো প্রতি তার কুট প্রেম বা কুট মায়াজাল বিস্তার করে লোকটিকে রাহুমুক্ত করে দিল।

লোকটির অপরাধবোধের হাত থেকে রেহাই পাবার যে সুন্দর সূচনা ঘটলো, তার পিছনে কাজ করলো যে বিষয়টি তা হলো বিধাতার কাছে অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। যখন আন্তরিকভাবেই কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন ক্ষমা দিতে বিধাতা অস্বীকার করে না। এবং আমার রোগীটিও খুঁজে পেলেন অশান্তির নিবৃত্তি এবং পরিত্রান। এটা অবাক হবার মত একটা ব্যাপার ছিল যে, যখন দুটো ভারি ওজন কেমন করে তার মন থেকে তার ব্যক্তিত্ব থেকে তুলে নেয়া হল এবং আবার তিনি স্বাভাবিকভাবে আগের মতই কাজকর্ম শুরু করে দিলেন। আবার তিনি শান্তিতে ঘুমাতে পারছিলেন। আবার তিনি মনে শান্তি খুঁজে পেলেন নব উদ্যম নব শক্তি।

তার শরীরে নবশক্তি ফিরে এল খুব দ্রুতগতিতে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী এবং কৃতজ্ঞচিত্ত লোকে পরিণত হলেন তিনি এবং তার সমস্ত কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে থাকলেন।

জীবনীশক্তি কমে কমে যে অবস্থাটি এসে উপস্থিত হয় তা হলো, বিষাদগ্রস্ততা এবং তা বিরল কোন বিষয় নয়। মানসিক চাপ, একঘেয়েমি, এবং দায়দায়িত্ব পালনের যে ক্রমাগত ধারাবাহিকতা তা মনের সতেজ ভাবটিকে নিস্তেজ করে দেয়, অথচ সতেজ মন নিয়েই একজনকে তার সমস্ত কাজকর্ম সাফল্যের সাথে সমাধা করার জন্য এগিয়ে যেতে হয়। যেমন একজন এ্যাথলিট একসময় জ্বরাজীর্ণ হয়ে যায়, তেমন অন্য আরেকজনও হতে পারে তার পেশা যাই হোক না কেন শুকনো এবং নীরস দিনগুলোতে সে অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো কিছু পাবার জন্য যত্নবান হয়ে উঠে। মনের এমন অবস্থায় দেহ মনের প্রবলতর শক্তি খরচ হয়ে যায়, তখন সে কাজ করে করে অনেক কষ্টে কিন্তু একসময় সে এই কাজ করতে। অপেক্ষাকৃত আরো আরামে। এর ফলস্বরূপ যা ঘটে তা হলো, মানুষের মূল শক্তি যেটুকু একান্তভাবেই প্রয়োজন সেটুকু যোগান দিতে খুবই অসুবিধায় পড়ে যায় এবং সেই ব্যক্তি বিশেষ প্রায় তার মুষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। মনের এই অবস্থা থেকে মুক্তির একটি সেন্সর পথ বাতলে দিয়েছিলেন কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির খ্যাতনামা ব্যবসায়ী নেতা। এক অধ্যাপক সাহেব সভাপতি এবং একাধারে একজন অধ্যাপক একসময় যিনি ছিলেন সুবিদিত এবং অসাধারণ জনপ্রিয় কিন্তু কি কারনেই যেন তিনি শিক্ষক হিসাবে তার সামর্থ হারিয়ে ফেলছিলেন এবং একই সাথে তিনি তার ছাত্রদেরও অনুরাগী করে তোলার শক্তি হারাতে শুরু করেছিলেন। তাতে অসন্তুষ্ট ছাত্র-ছাত্রীরা এবং একই সাথে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরাও তাদের নিজ নিজ মন্তব্য জানিয়ে ঐ অধ্যাপককে দোষী করে বললেন যে, অবশ্যই তাকে তার হারানো দক্ষতা এবং অনুরাগ পুণরুদ্ধার করতে হবে। নয়তো তাকে বরখাস্ত করে অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করার প্রয়োজন হবে। এই শেষোক্ত কৌশলটি দ্বিধান্বিত মনে পোষণ করা হয়েছিল কারণ রিটায়ারমেন্টে যাবার আগে এখনও কয়েকটি বছর তার কাছ থেকে সফল শিক্ষকতা আশা করছিল কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টির ঐ ব্যবসায়ী অধ্যাপক সাহেবকে তার কার্যালয়ে আসতে বললেন এবং তাকে জানানো হলো যে, বোর্ড অব ট্রাস্টি তাকে ছয় মাসের যাবতীয় খরচ এবং বেতনসহ ছুটি দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ছুটির একমাত্র শর্ত হল যে, অধ্যাপক সাহেব কোন বিশেষ বিশ্রাম স্থলে যাবেন এবং পুরোপুরি দৈহিক এবং মানসিক শক্তিকে নবায়িত করবেন। ব্যবসায়ী ব্যক্তিটি অধ্যাপক সাহেবকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বললেন যে, আপনি নির্জন অরণ্যের মত জায়গায় আমার একটি বাড়ি আছে, তারই একটি কক্ষে এই ছুটিটা কাটাবেন। এবং বিশষ কিছু পরামর্শও তিনি তাকে দিলেন। বললেন আপনি সাথে করে অন্য কোন বই না নিয়ে শুধু মাত্র বাইবেলটি নেবেন। আর আপনার প্রতিদিনের করণীয় কাজ হবে হাঁটাহাঁটি করা; লেকে মাছ ধরা বাগানে কিছু হাতের কাজ আপনি করবেন, এবং প্রতিদিন সময় ধরে বাইবেলটি পড়বেন যাতে ছুটির এ ছ'মাস সময়ে বাইবেলটি আপনি অন্তত তিনবার পড়ে ফেলতে পারেন। তিনি আরো পরামর্শ দিয়ে বললেন যে, আপনি আপনার মনকে সম্পূর্ণরূপে পরিপুষ্ট করার জন্য বাইবেল থেকে বাছাই করে করে যতদূর সম্ভব বিশেষ বিশেষ অংশগুলো বিশেষ মূল্যবান কথাগুলো মুখস্ত করে ফেলবেন।

ব্যবসায়ী ব্যক্তিটি বললেন, আমি বিশ্বাস করি যে, যদি আপনি নানান কাজ নিয়ে ছ'মাস বাইরে কাটান, যেমন এ সময়টায় আপনি কাঠ কাটলেন মাটি খোঁড়াখুড়ি করলেন, বাইবেল পড়লেন যার যার ধর্ম মতে, (কুরআন, গীতা ইত্যাদি) এক গভীর হৃদে মাঝ ধরলেন, তাহলে দেখবেন যে আপনি এক নতুন মানুষে পরিণত হয়েছেন।

অদ্ভূত সুন্দর এই প্রস্তাবে অধ্যাপক সাহেব রাজি হয়ে গেলেন জীবনের এই ভিন্ন এবং আমূল পরিবর্তনযোগ্য ধরনের সাথে খাপ খাইয়ে নেব্বর। এটি ছিল একটি সহজতর পথ। যা সে নিজে কিম্বা অন্য কেউ আশাই করতে পারতো না। আসলে তিনি এমনই একটি পথ মনে মনে খুবই পছন্দ করতেন, আর তেমনি একটি পথ একেবারে হাতে নাগালের মধ্যে চলে আসাতে তিনি সেত্যিই বিস্মিত হয়ে গেলেন।

স্বচ্ছন্দভাবে মানিয়ে নিতে পেরে তিনি একটি কাজ সুন্দর বিষয় আবিস্কার করলেন যে, এমন একটি পরিবেশে কাটানোর আবেদনই আলাদা এবং এটাই তিনি প্রচুর পরিমাণে উপলব্ধি করলেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি হয়ত তার সুবিজ্ঞ বন্ধু-বান্ধবদের সাহচর্য থেকে এবং পড়াশুনা থেকে দূরে থাকলেন, কিন্তু প্রবলশক্তিতে তার মনকে আকর্ষিত করল বাইবেল, (প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের এমন শক্তি আছে) পড়ে দেখুন। তার সাথে থাকা একমাত্র বই, একেবারে নিমজ্জিত হয়ে গেলেন বইটির মধ্যে তার মনে হলো, এর মধ্যে যেন বিরাট এক লাইব্রেরী বিদ্যমান। বইটির পাতায় পাতায় তিনি খুঁজে পেলেন বিশ্বাস শান্তি আর শক্তির বাণী আর এভাবেই মাত্র ছ'মাসে তিনি এক নতুন মানুষে পরিণত হলেন।

ব্যবসায়ী লোকটি এখন আমাকে বলছেন যে, এই অধ্যাপক সাহেব এখন এক বর্ধিত শক্তির ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। বিষাদ ভাবটি একদম উবে গেছে, হারানো দিনের হারানো শক্তি আবার ফিরে পেয়েছেন, তার ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে মনের শক্তি আবার তরাঙ্গায়িত হচ্ছে। বেঁচে থাকার স্বাদ আবার নতুন রূপে চাঙ্গা করে তুলেছে তাকে।

📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 প্রার্থনার শক্তি পরীক্ষা করে দেখুন

📄 প্রার্থনার শক্তি পরীক্ষা করে দেখুন


শহরের রাজপথে অবস্থিত এক সুউচ্চ বাণিজ্যিক অফিসে দুজন লোক একান্তে বসে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছেন। এদের একজন মারাত্মক ব্যবসায়িক ঝামেলায় এবং আরো কিছু ব্যক্তিগত সংকটে পড়েছেন। প্রচণ্ড মানসিক চাপে বিরামহীনভাবে এপাশওপাশ হাঁটাহাঁটি করছেন। তারপর হয়ত একসময় বিষন্নভাবে বসে পড়লেন। যন্ত্রণা উত্তপ্ত মাথা হাতের উপর ন্যস্ত, যেন হতাশা ক্লান্ত এক ছবি। অপরজন জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ব বলে খ্যাত, ব্যবসয়ী লোকটি তারই কাছে এসেছেন উপদেশ লাভের জন্য। দুজনেই তারা একত্রে সমস্যাটা কি হতে পারে, কেন হতে পারে তা সবদিক থেকে আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছিল তা কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। অধিকন্তু তা শুধু লোকটার কষ্ট আর ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে এবং তাকে আরো ভগ্নোৎসাহি করে তুলেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটি শুধু বললেন, "আমি অনুমান করছি হয়ত দুনিয়াতে এমন কোনো শক্তি নেই যা আমাকে রক্ষা করতে পারে।"

তার এ হতাশাপূর্ণ ক্ষেদোক্তি অন্যজনের মনে মুহূর্তের জন্য প্রতিফলিত হলো, তারপর কিছুটা আস্থাহীনের মতই বললেন, "আমি এ বিষয়টিকে ওভাবে দেখতে চাই না। আপনি যে বলছেন, এমন কোন শক্তি নেই যা আপনাকে রক্ষা করতে পারে, আপনার এ কথাটি আমি বিশ্বাস করি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি দেখেছি যে, সমস্যা যাই হোক না কেন প্রতিটি সমস্যারই কোননা কোন সমাধান অবশ্যই আছে। কোন একটি শক্তি অবশ্যই আছে যা আপনাকে সাহায্য করতে পারে।" তারপর আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন, প্রার্থনার শক্তিকে কেন পরীক্ষা করে দেখেন না?

হতাশাগ্রস্ত লোকটি একথা শুনে কিছুটা বিস্মিত হয়ে গেলেন, এবং বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই, আমি প্রার্থনায় বিশ্বাসী, কিন্তু হয়ত আমি জানি না কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়। আপনার কথায় প্রার্থনার বাস্তব ফলাফলের কিছুটা আভাস পাচ্ছি, এবং তা হয়ত ব্যবসা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানেরও উপযুক্ত। আমি কখনও ওভাবে ভেবে দেখিনি, কিন্তু আপনি যদি আমাকে একটু দেখিয়ে দেন যে, কেমন করে প্রার্থনা করতে হয় তাহলে আমার খুবই ইচ্ছা হয় যে একটু পরীক্ষা করে দেখি, প্রার্থনার শক্তি কেমন?

তিনি প্রার্থনার বাস্তব কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, এবং প্রদত্ত ধারায় প্রার্থনা করে তার জবাবও তিনি পেয়েছিলেন। পরিশেষে তার বিষয়গুলোর সন্তুষ্টজনক পরিবর্তন ঘটে। তবে এটা বলা যাবে না যে তার আর কোন কষ্ট ক্লেশ ছিল না। আসলে তার বরঞ্চ অপেক্ষাকৃত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। কিন্তু অবশেষে তিনি এসব কষ্ট ভোগের একটা সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। এখন তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, সত্যিই প্রার্থনার শক্তি আছে, এবং সম্প্রতি আমি তাকে বলতে শুনছি, সব সমস্যাই সমাধান করা যেতে পারে এবং সঠিকভাবে করা যেতে পারে, যদি আপনি প্রার্থনা করেন।

শারীরিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সমৃদ্ধ ব্যক্তিও প্রায়ই দেখা যায় প্রার্থনাকে রোগের চিকিৎসায় ব্যবস্থাপত্রের সাথে অন্তভূক্ত করে থাকেন। অক্ষমতা, দুঃশ্চিন্তা এবং সমজাতীয় কষ্টগুলোই হয়ত মানুষের আভ্যন্তরীন সামঞ্জস্যহীনতার ফলশ্রুতি হিসেবেই ঘটে থাকে। এটাই আশ্চর্যের বিষয় যে, কিভাবে প্রার্থনা শরীর এবং আত্মার সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকারীতা প্রত্যাপণ করে। আমার স্বাস্থ্য চিকিৎসক বন্ধু এক স্নায়ু রোগীকে একবার এক বার্তা দিয়ে বলছিলেন, "বিধাতা আমার আঙ্গুলের মধ্য দিয়ে কাজ করে। যখন আমি আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগহীন শিথিলতা কামনা করি, কারণ আপনার শরীর আপনার আত্মার মন্দির। যখন আমি আপনার বাইরের অবস্থা নিয়ে কাজ করি তখন আমি চাই, আপনি বিধাতার কাছে আভ্যন্তরীন শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন।” রোগীটির কাছে এ ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি ধারণা। কিন্তু তিনি খুব দ্রুত কিছু পাবার ভাবনায় ব্যপৃত ছিলেন এবং কিছু শান্তিপূর্ণ চিন্তার মধ্যদিয়ে পরিচালিত করার চেষ্টাও করেছেন। তার মানসিক উদ্বেগের শিথিলতার এমন সুন্দর ফল পেয়ে তিনি খুবই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন।

জ্যাক স্মিথ, হেলথক্লাবের পরিচালক, নামী দামী অনেকের পৃষ্ঠপোষকতায় তার এই ক্লাব চলছিল, তারাও প্রার্থনা চিকিৎসায় বিশ্বাস করতেন এবং তা প্রয়োগ করতেন। একসময় লোকটি ছিলেন মল্ল-যোদ্ধা তারপর শরীরডাইভার এবং সবশেষে তিনি এই হেল্থক্লাব খোলেন। তিনি বলেন যে, যখন তিনি তার পৃষ্ঠপোষকদের দৈহিক নমনীয়তা তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করতে তখন তিনি তাদের আধ্যাত্মিক নমনীয়তাও পরীক্ষা করতেন। কারণ তিনি দুষ্টতার সাথে বলেন, “আপনি কোন ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে স্বাস্থ্যবান পাবেন যদি না তাকে আধ্যাত্মিকভাবে স্বাস্থ্যবান পাওয়া যায়।"

একদিন অভিনেতা ওয়াল্টার হাটসন জ্যাক স্মিথের পাশের ডেস্কে বসেছিলেন। দেয়ালের গায়ে বড় বড় হরফে লিখা একটি সংকেত তিনি দেখতে পেলেন; ঐ বর্ণমালাগুলোর অর্থ কি? স্মিথ একটু হেসে বললেন, এর অর্থ হলো নিশ্চয়তা জ্ঞাপক প্রার্থনা থেকে শক্তি নির্গত হয় যার দ্বারা ভালো ফল পাবার বিষয়টিও সম্পাদিত হয়।

বিস্ময়ে হাটসনের চোয়াল নীচে নেমে গেল, বেশ তো, আমি কখনও একটি হেলথ ক্লাব থেকে এমন কিছু শুনতে আশা করিনি।

মি. স্মিথ বললেন, আমি এই প্রক্রিয়াটি প্রয়োগ করে থাকি এবং তা আমি করি সবাইকে কৌতুহলী করার জন্য যাতে সবাই আমার কাছে জানতে চায় ঐ বর্ণ বিন্যাসের অর্থ কি? আর ঐ বিষয়টা আমাকে তাদের এ কথাটিই বলার সুযোগ করে দেয় যে, “যথার্থ প্রার্থনা অবশ্যই একটি ভালো ফল বয়ে আনে।” জ্যাক স্মিথ নামে এক ভদ্রলোক আমাকে শারীরিকভাবে ভালো থাকার ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছেন, লোকটির বিশ্বাসটিও এমন যে, প্রার্থনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদি অধিকগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে না ও হয় তবে ব্যায়াম করুণ এবং ইষদুষ্ণ পানিতে স্নান করুন এবং ভালো করে শরীর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করুন। কারণ মন ও শরীর থেকে শক্তি উৎসারিত হবার পদ্ধতি হিসেবে এটিই প্রধান অংশ হিসেবে কাজ করে।

আজকাল মানুষ আগের তুলনায় অধিক প্রার্থনা করে। কারণ তারা একটি বিষয় বুঝতে পারছে যে, প্রার্থনা তাদের কাজে দক্ষতা বাড়াতে বাড়তি শক্তি যোগান দেয়। প্রার্থনা তাদের শক্তি সংগ্রহ করতে সাহায্য করে থাকে যা অন্য কোনোভাবে সহজলভ্য নয়।

কেন এক বিখ্যাত মনঃস্তত্ববিদ বলেন, প্রার্থনা হল এক মহানতম শক্তি যা ব্যক্তি বিশেষ তার ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে যথাযথভাবে কাজে লাগায়। সত্যিই এর শক্তি আমাকে অবাক করে দেয়।

প্রার্থনা শক্তি হলো মানসিক শক্তির প্রকাশ স্বরূপ। ঠিক যেমন বৈজ্ঞানিক কলাকুশল আণবিক শক্তির প্রকাশ ঘটায়। আবার ঠিক তেমনিভাবে বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালীও আধ্যাত্মিক শক্তি নির্গত করে থাকে এবং তা হয় প্রার্থনার মধ্য দিয়ে উদ্যমশীল শক্তির উদ্দীপনাময় উপস্থাপনই এর সুস্পষ্ট প্রমাণ।

প্রার্থনা শক্তি মনে হয় বুড়িয়ে যাবার বিষয়টিকেও সাভাবিক একটি অবস্থায় ধরে রাখতে পারে। কিংবা নিবারন করতে পারে অথবা শারীরিক দৃঢ়তার অভাবকে এবং শরীরের আরো অবনতি ঘটতে একটি সীমিত অবস্থায় রাখতে পারে। বিগত বছরগুলোতে সংগৃহীত আপনার মূল দৈহিক জীবনী শক্তিকে কোনটিই হারাবার প্রয়োজন নেই বা দুর্বল হয়ে জীবনী শক্তি এসবের প্রতি উদাসীন হবারও কোন প্রয়োজন নেই। আপনার জীবনী শক্তিকে অবসন্ন বিস্বাদ করা অথবা জ্বরাজীর্ণ হতে দেবার কোন আবশ্যকতা নেই। প্রতিদিনের সন্ধ্যা প্রার্থনা আপনাকে সতেজ করে তুলতে পারে, এবং প্রতিদিন সকালেও আপনি নবায়তি মন নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন। আপনার যে কোন সমস্যায় আপনি সঠিক দিক নির্দেশনা পেতে পারেন যদি প্রার্থনাকে খুব সুক্ষ্মপথে আপনার অবচেতন মনে প্রবেশ করাতে পারেন। যেখানে আপনার সিদ্ধান্তকারী শক্তি বসে আছে, যে আপনাকে বলে দেয় আপনি সঠিক বা ভুল কোন কাজ করছেন কি না। আপনার মনের প্রতিক্রিয়াকে সঠিক রাখার এবং নিখুঁত রাখার মত শক্তি প্রার্থনার আছে। আপনার অবচেতন মনের গভীরে পরিচালিত প্রার্থনা শক্তি আপনাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম। প্রার্থনা শক্তি নির্গত করে এবং এর ধারাকে মুক্তভাবে প্রবাহিত করে।

যদি এই শক্তি সম্বন্ধে আপনার অভিজ্ঞতা না হয়ে থাকে তবে সম্ভবত আপনাকে প্রার্থনা করার নতুন কৌশল রপ্ত করতে হবে। একটি দক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে প্রার্থনা সম্বন্ধে পড়াশুনা করা ভালো। সাধারণত প্রার্থনার প্রতি ঝোঁক সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় ব্যাপার, যদিও দুটো ধারণার মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। বিজ্ঞানসম্মত আধ্যাত্মিক অনুশীলন স্টোরওটাইপ নিয়মাবলীকে বাতিল করে দেয়, এমনকি তা যখন সাধারণ বিজ্ঞানে করানো হয়। এমনকি তা যদি আপনার প্রতি কোন আশীর্বাদ বয়ে আনে এবং নিঃসন্দেহেই তা আনে, সম্ভবত আপনি আরও ফলপ্রসু প্রার্থনা করতে পারেন যদি প্রার্থনার ধারাটি একটু বদলে নিতে পারেন এবং তা আপনি করতে পারেন প্রার্থনার যথাযথ সূত্র প্রয়োগ করে। নতুন অন্তদৃষ্টি লাভ করুন। নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে চর্চা শুরু করুন যাতে বড় ধরনের ফল লাভ করা যায়।

এ বিষয়টি অনুধাবন করা খুবই জরুরী যে আপনি যখন প্রার্থনা করছেন তখন জগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর শক্তি পরিচালনা করছেন। এমন একটি ক্ষেত্রে আপনাকে আলোকিত করার জন্য অবশ্যই আপনি পুরনো ধাচের কোন কেরোসিনের বাতি ব্যবহার করবেন না। আপনি চাইবেন একটি আধুনিক ধাচের বাতি ব্যবহার করতে। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই আজকাল আধ্যাত্মিক প্রতিভার জাগরণ দেখা যাচ্ছে। যারা একাধিক্রমে নতুন নতুন এবং যথার্থ আধ্যাত্মিক কলাকৌশলগুলো আবিস্কার করে যাচ্ছেন। বিষয়টি উপদেশযোগ্য যে, ঐসব আধ্যাত্মিক দ্রষ্টাদের উদ্ভাবিত পথ অবলম্বন করে আপনিও প্রার্থনার শক্তি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখুন যাতে প্রার্থনার শক্তি সবল এবং কার্যকারী প্রমাণিত হয়।

যদি প্রার্থনার এ প্রয়োগিক বিষয়টি নতুন এবং নিশ্চিত বলশুক্তি আপনাকে দিতে পারে এবং তা আশ্চর্যরূপে বৈজ্ঞানিক বলে প্রমাণিত হয় তবে মেনে রাখবেন প্রার্থনার গুপ্ত শক্তি সবচেয়ে ফলপ্রসুভাবে আপনার বিনীত এবং হৃদয়কে বিধাতামুখী করে তুলবে। যে কোন পন্থায়ই হোক না কেন আপনি যদি ঐশ্বিশক্তিকে নাড়া দিতে সক্ষম হন এবং তা আগনার মনে একটি ঐশ্বিশক্তি প্রবাহ দিতে পারে তবে সেই পন্থাই হবে বৈধ এবং ব্যবস্থার যোগ্য একটি পন্থা।

দু'জন বিখ্যাত শিল্পপতি তাদের জীবনে প্রয়োগকৃত ও বিজ্ঞানসম্মত প্রার্থনার একটি উদাহরণ চিত্র তৈরি করেছেন। যাদের নাম বিশেষ অনুমতি নিয়েই আমার পাঠকদের আমি জানাবো। যে দু'জনের কথা আমি বললাম তাদের ব্যবসা এবং কৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে একটি সভা ছিল। একজন হয়ত ভাবতে পারে যে, এই লোক দু'জন হয়ত তাদের এমন কোন সমস্যার কথা নিরেট কৌশলগত ভিত্তিতেই উপস্থাপন করতে পারে এবং আসলে তা তারা করেছেন ও এবং অধিকন্তু এ বিষয়ে তারা প্রার্থনাও করেছেন। কিন্তু তারা এর কোন কার্যকরী ফল লাভ করতে সক্ষম হননি। সেজন্য তাদেরকে মফস্বলের এক ধর্ম প্রচারকের কাছে ডাকা হয়েছিল, এবং ধর্ম প্রচারক ঐ দু'জনের একজনের পুরনো বন্ধু ছিলেন। কারণ তারা ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, বাইবেলের প্রার্থনার মূল বিষয় হলো, যেখানে দুজন বা তিনজন আমার নামে (সৃষ্টিকর্তার নামে) একত্রিত হয়, সেখানে আমি তাদের মধ্যে বিরাজ করি। তারা আরো একটি বিষয়ের দিকে নির্দেশ করে বলেছেন যেমন: "তোমাদের দু'জনও যদি একই উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীর যে কোন বস্তু স্পর্শ করে যে কোন কিছু চাও তবে স্বর্গে যিনি আছেন তার নামে তা পূর্ণ হবে।”

স্কুলে বিজ্ঞান বিষয়ে চর্চা করাতে তারা বিশ্বাস করেন যে, প্রার্থনার দ্বারা কোন কিছু করতে চাওয়া বিস্ময়কর এক ব্যাপার এবং তাদের উচিৎ অতি যত্নের সাথে বাইবেলে বর্ণিত (অন্যান্য ধর্ম শাস্ত্রে তদ্রূপ) বিষয়গুলোকে অনুসরন করা যাকে তারা আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের মূল বই হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিজ্ঞানকে কাজে লাগাবার যথার্থ প্রণালী হলো ঐ বিজ্ঞানের মূল বইয়ে বর্ণিত স্বীকৃত প্রণালীকে কাজে লাগানো। কারণ দর্শিয়ে তারা বলেছেন যদি বাইবেল এটাই নিদের্শ করে যে, দুজনে বা তিনজন একত্র হওয়া উচিৎ, সম্ভবত কারণটি হলো যে, তারা সাফল্য লাভ করতে পারছিলেন না, কাজেই তাদের তৃতীয় আরেকটি পক্ষের দরকার হয়ে পরেছিল।

কাজেই তিনজন একত্রে প্রার্থনা করলেন এবং এভাবেই পরিচালিত রীতিতে যাতে কোন ত্রুটি না থাকে তাই তাকে আগলে রাখলেন। তারা বাইবেলে বর্ণিত অন্যান্য কৌশল সম্বন্ধে ও নানা পরামর্শ দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, যেমন “তোমার বিশ্বাস অনুসারেই তোমার প্রতি তা বাস্তবায়িত হোক। তোমরা যাই বার্ষন করনা কেন, যখন তোমরা প্রার্থনা কর, এবং বিশ্বাস কর যে তা তোমরা পেয়েই যাচ্ছ।"

কয়েকটি পূর্ণঙ্গ প্রার্থনা সভার পর লোক তিনজন একত্রে এটাই নিশ্চিত হলেন যে, তারা তাদের প্রার্থনার উত্তর পেয়েই গেছেন। প্রার্থণার ফলাফল ছিল পুরোপুরি সন্তুষ্টজনক। পরবর্তীতে পাওয়া ফলাফল তাদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে আসলেই তারা স্বর্গীয় পথ-নির্দেশ পেয়েছিলেন।

এই লোকগুলো তেমন যথেষ্ট বড় বৈজ্ঞানিক নয়, যারা আধ্যাত্মিক বিধি বিধানগুলো প্রাকৃতিক বিধানগুলোর চেয়ে বেশি কিছু, তার যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন মনে করেন না, কিন্তু তারা সেসব ঘটনায় খুব সন্তুষ্ট যখন ঐসব বিধিবিধানগুলো সঠিক কৌশলাদি কাজে লাগায়।

তারা বললেন 'যখন আমরা এটা ব্যাখ্যা করতে পারিনা,' ব্যাপারটি তখন এমনি থেকে যায় যে আমরা আমাদের সমস্যার দ্বারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি এবং বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের পদ্ধতি অনুসারে প্রার্থনা করার চেষ্টা করেছি পদ্ধতিটি কাজে লেগেছে এবং আমরা খুব সুন্দর ফল লাভ করেছি।” তারা আরো বললেন যে, বিশ্বাস এবং ঐক্য দুটোই প্রার্থনা পরিচালনা রীতির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এক লোক কয়েক বছর আগে নিউইয়র্ক শহরে ছোট খাটো একটি ব্যবসা শুরু করেছেন। তার প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপানের বৈশিষ্ট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, দেয়ালের গায়ে ছোট্ট একটি গর্ত এ হলো তার প্রথম প্রতিষ্ঠা। তার একজন কর্মচারী ছিল। কয়েক বছরের মধ্যে তারা ওখান থেকে একটি বড় কক্ষে স্থানান্তরিত হল এবং তারপর আরো বড় বাড়িতে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন। শেষ পর্যন্ত তা খুবই সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলো।

লোকটির বর্ণনা অনুসারে তার এই ব্যবসা পদ্ধতি হল, আশাবাদী ও ভাবনা দিয়ে দেয়ালের গায়ে ছোট্ট গর্তটি আগে ভরে ফেল। পরিস্কার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, এই কঠিন কাজটি সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যদি একজনের হ্যাঁ ব্যঞ্জক চিন্তা থাকে, সুন্দর পরিচালনা শক্তি থাকে।

মানুষের সাথে তার ব্যবহার যদি সঠিক হয় এবং সর্বোপরি সে যদি যথার্থ প্রার্থনা করতে পারে। আমি দেখেছি যে লোকটি কেমন সৃজনশীল এবং অসাধারণ এক মনের মানুষ এবং তার নিজস্ব এবং সহজ সরল পদ্ধতি ব্যবহার করে কেমন করে তার সমস্যাগুলোকে তিনি সমাধান করেছেন এবং কিভাবে প্রার্থনাশক্তিকে ব্যবহার করে কঠিন অবস্থাগুলিকে তিনি একটির পর একটি জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি কৌতূহল জাগাবার মত 'সূত্র' কিন্তু আমি তা অভ্যাস করে দেখেছি যে তা কার্যকারী হয়। তাই আমি অনেক কেই এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছি এবং সত্যিই তারা তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে এ সূত্রটি প্রয়োগ করে তার উপকার পেয়েছেন পুরোপুরি। আপনাদের জন্য সূত্রটি সুপারিশ করা হলো।

সূত্রটি হলো : (১) প্রার্থনা অনুশীলন করুন। (২) প্রার্থনার বিষয়কে মনে ছবিতে পরিণত করুন। (৩) এবং কল্পিত ছবিকে বাস্তবায়িত করুন।

মনের আকাঙ্খাকে প্রার্থনায় পরিণত করা র্কে আমার ঐ বন্ধুটি এভাবে আমাকে বুঝিয়েছেন যে, প্রতিদিনের প্রার্থনা সৃজনশীল প্রার্থনা। যখনই তার কোন সমস্যা এসে উপস্থিত হত তখনই খুব সহজ সরলভাবে এবং সরাসরি সৃষ্টিকর্তার সাথে প্রার্থনার মাধ্যমে কথা বলতেন। অধিকন্তু, তার এই প্রার্থনার ভঙ্গিতে সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলার বিষয়টি ছিল অদ্ভূত। তিনি কিন্তু তার প্রার্থনালাপের সময় সৃষ্টিকর্তাকে সুদূর অবস্থিত বিরাট কোন ছায়াকৃত প্রতিবিম্ব কল্পনা করে প্রার্থনালাপ করেননি, কিন্তু তিনি সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে ধারণ করেছেন এমন ভাবে যে তিনি যেন তার অফিসেই বিরাজ করছেন, তার বাড়িতে, তার সাথে চলমান রাস্তায়, তার মটরগাড়িতে বিধাতা যেন সর্বদাই তার কাছাকাছি একজন সঙ্গীর মত, একজন ঘনিষ্ট সহচরের মত।

অবিরত প্রার্থনা কর বাইবেলের এই নির্দেশকে তিনি খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলেন। প্রতিটি সম্প্রদায়ের পাঠক তাদের নিজ নিজ শাস্ত্রবাণী এভাবে অনুশীলন করতে পারেন)। তিনি বিষয়টির এমন অর্থ দাঁড় করতে চেয়েছেন যে আমি মনে করেছি আমার নির্ধারিত এবং প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন বিধাতার সাথে স্বাভাবিক ও সাধারন ভাবে আলোচনা করা উচিৎ আর এভাবে একসময় বিধাতায় উপস্থিতি আমি বুঝতে পারবো এবং তিনি আমার চেতন এবং শেষে অবচেতন মনের চিন্তায় আধিপত্য বিস্তার করবেন। এভাবেই তিনি তার নিত্যদিনগুলোকে প্রার্থনায় ভরে তুলেছেন। তিনি হাটার সময় প্রার্থনা করেছেন। গাড়ি চালানোর সময় প্রার্থনা করেছেন। তার সকল কর্মের মধ্যেই তিনি সুযোগ মত প্রার্থনা করেছেন। তার প্রতিটি দিনকে তিনি প্রার্থনায় প্রার্থনায় ভরে তুলেছেন। তার মনে হলো তিনি প্রার্থনার মাধ্যমেই বেঁচে ছিলেন। প্রচলিত খ্রিস্টান রীতি অনুসারে তার প্রার্থনার ধরনটি ছিল এমন যেমন- সৃষ্টিকর্তাকে তিনি একজন ঘনিষ্ট সাথী হিসাবে বলেছেন, “হে প্রভু এ বিষয়ে আমি কি করব? বা এবিষয়ে আমাকে সুষ্ঠু ও সঠিক অন্তর্দৃষ্টি দাও প্রভু।” তিনি তার মনকে প্রার্থনাযুক্ত করেছেন, সেভাবে তার কাজকর্মও প্রার্থনাযুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ কাজ কর্মগুলো যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তার জন্য প্রার্থনা করা হতো।

তার সৃজনশীল প্রার্থনার উদ্ভাবিত দ্বিতীয় বিষয়টি হলো মনের পর্দায় ছবি অংকিত করা। পদার্থ বিদ্যার মূল কারণটি হলো 'শক্তি'। মনোবিজ্ঞানের মূল কারণটি হলো কোন কিছু বাস্তবায়িত করার মত সফল ইচ্ছাশক্তি। যেমন যে লোকটি কোন বিষয়ে সাফল্য লাভের প্রবল ঝোঁক মনে মনে ধারন করে সে সাফল্য পেয়েই যায়। আবার কেউ যদি সাফল্য না পাবার মত কমজোর ভাবে কোন বিষয় মনে মনে ধারণ করে, তার পক্ষে সাফল্য পাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই সাফল্য লাভ বা অসাফল্য লাভের বিষয়টি সেভাবেই ঘটে যে যেমন ভাবে অর্থাৎ যেমন বলিষ্টভাবে বা দুর্বলভাবে তার মনে মনে ছবিটি অঙ্কন করে।

মূল্যবান কিছু ঘটবে এমন বিষয়ে আশ্বস্ত হতে প্রথমে এ বিষয়ে প্রার্থনা করুন এবং তা যাচাই করে দেখুন যে, বিধাতার দৃষ্টতে অপুরণযোগ্য কিনা তারপর আপনি বিষয়টি আপনার মনের পর্দায় অঙ্কিত করুন কেন তা ঘটে, এবং আপনার সচেতন মনে ছবিটি নিবীড়ভাবে ধরে রাখুন। বিধাতার ইচ্ছার কাছে সেই ছবিটি ক্রমাগত সমর্পণ করতে থাকুন, আমি বলতে চাই বিষয়টি বিধাতার হাতে ছেড়ে দিন। দেখুন তিনি আপনাকে কি দিক নির্দেশনা দেন তা অনুসরণ করুন, বুদ্ধিমানের মত কঠোর পরিশ্রম করুন, এবং এভাবেই আপনার যা করনীয় তা করে সাফল্যকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসুন। বিশ্বাস করার চর্চা চালিয়ে যান এবং বিষয়টি আপনার চিন্তায় ভাবনায় নিবীড়ভাবে ধরে রাখুন। কাজটি করেন এবং আপনি অবাক হয়ে যাবেন যে কি অদ্ভূতভাবে আপনার সযত্ন রক্ষিত মনের ছবিটি বাস্তবে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই মনে মনে ভাবিত ছবি বাস্তব রূপ ধারণ করে। বাস্তবে পরিণত হবার মত যে মূল ইচ্ছা আপনি পোষণ করেছিলেন এবং তার জন্য আপনি প্রার্থনা পরিচালনা করেছেন, মনের ভাবনায় ছবি এঁকেছেন এবং তা বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন, তা কিন্তু সম্ভব হয়েছে বিধাতার শক্তি এর উপর বর্ষিত হবার মধ্য দিয়ে যা আপনি প্রার্থনা করেছিলেন এবং অধিকন্তু যদি আপনি নিজেকে পুরোপুরিভাবে এটা বাস্তবায়িত হবার জন্য সমর্পণ করেন তবে তা না হয়েই যায়না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ত্রিমাত্রিক প্রার্থনা পদ্ধতি অনুশীলন করে দেখেছি যে, এর মধ্যে কত বড় শক্তি নিহিত রয়েছে। ঠিক এ বিষয়টি অন্যদের অনুশীলন করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছিল এবং তারাও ঠিক একইভাবে আমাকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন যে, প্রার্থনার এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে তারা এর মধ্য থেকে সৃজনশীল শক্তি নির্গত হতে দেখেছেন।

উদাহারণ স্বরূপ-এক মহিলার কথা বলছি। তিনি আবিস্কার করলেন যে, তার স্বামী একটু একটু করে তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের বিয়ে হয়েছিল খুবই সুখের ও আনন্দের। কিন্তু মহিলাটি পূর্বে থেকেই নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং তার স্বামী তার ব্যক্তিগত কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তা জানার আগেই তাদের মধ্যেকার যে গাঢ় এবং পুরনো সখ্যতা ছিল তা হারিয়ে গিয়েছিল। একদিন তিনি আবিস্কার করলেন তার স্বামী অন্য এক মহিলার প্রতি আসক্ত। তিনি উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে গেলেন এবং মূর্ছারোগে আক্রান্ত হলেন। তিনি স্থানীয় পুরোহিতের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলেন, তিনি খুব নিপুনভাবে এই আলাপ আলোচনাকে মহিলার নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি অপকটে স্বীকার করলেন যে তিনি ঘরনী হিসেবে যত্মশীল নন এবং তাই তিনি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন, কথায় বার্তায় খুব ধারাল এবং ত্যাক্ত বিরক্ত একজন মনোভাবোপন্ন মহিলা।

তিনি স্বীকার করলেন যে, তিনি কখনই নিজেকে তার স্বামীর সমকক্ষ মনে করেননি। স্বামী সম্পর্কে তার একটি গভীর হীন ধারণা ছিল। তার এমনই একটি অনুভূতি ছিল যে তিনি সামাজিকভাবেও বুদ্ধিগত দিক থেকে তার স্বামীর সাথে সমকক্ষতা বজায় রাখার উপযুক্ত ছিলেন না। তাই তিনি বিরোধী মনোভাব নিয়ে দূরে দূরে থাকতেন এবং তা তীর খিটখিটে মেজাজ এবং সমালোচনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়ত। পুরোহিত দেখলেন যে, মহিলা তখন যতটা প্রকাশ করছিলেন তারচেয়ে অনেক বেশি প্রতিভা সামর্থ এবং মোহিনী শক্তি তার ছিল। তিনি তাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন যাতে তিনি মনে মনে নিজের মধ্যে একজন সামর্থবান এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি বা ছবি এঁকে নেন। অনেকটা খামখেয়ালীভাবেই তিনি মহিলাকে বললেন যে, "বিধাতা একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন” এবং বিশ্বাস করার কৌশলই একজনের মুখশ্রী এবং মোহিনী শক্তি এনে দিতে পারে। এবং আচার আচরণেও একটি সহজ সরলভাব এনে দিতে তিনি তাকে কিছু নির্দেশ দিয়ে জানালেন যে কিভাবে প্রার্থনা করতে হয় এবং কিভাবে আধ্যাত্মিক শক্তি বলে যাচিত বিষয়ের ছবি মনে মনে এঁকে নিতে হয়। তিনি তাকে আরো উপদেশ দিয়ে বললেন যেন তিনি এমন একটি প্রতিবিম্ব মনে ধরে রাখেন যেন তার এবং তার স্বামীর মধ্যেকার হারিয়ে যাওয়া সখ্যতা আবার ফিরে এসেছে, মনশ্চক্ষুতে যেন দেখেন যে তার স্বামীর আগের সেই শুভ্র সুন্দর ভাবটি ফিরে এসেছে এবং মনের পর্দায় এই ছবিটিই ধরে রাখতে বলেছেন যে, তাদের দু'জনের মধ্যে আবার আগের সেই মিল ফিরে এসেছে। তাকে বলা হয়েছিল যেন এই ছবিটি বিশ্বাসের সাথে মনে রাখা হয়। এইভাবে তিনি তাকে খুবই চিত্তাকর্ষক এক ব্যক্তিগত যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রস্তুত করলেন।

ঠিক এই সময়ের কাছাকাছি একটি অবস্থায় তার স্বামী তাকে জানালেন যে, তিনি বিবাহ বিচ্ছেদ চান। রুদ্র রুক্ষ এই অনুরোধ রক্ষার জন্য তিনি নিজেকে এমন ভাবে এবং সেই লক্ষমাত্রা পর্যন্ত জয় করেছিলেন যে তিনি খুব শান্তভাবে তা গ্রহণ করলেন। তিনি স্বভাবিকভাবে জবাব দিলেন যে, যদি তিনি বিবাহ বিচ্ছেদ চান তবে তিনি তাতে রাজি আছেন, কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদ চুড়ান্ত হবার আগে নব্বই দিনের জন্য তা স্থগিত রাখার পরামর্শ দিলেন। বললেন যদি নব্বই দিনের পরেও অনুভব কর যে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া আবশ্যক তাহলে আমি তোমাকে সহযোগিতা করব। খুব শান্ত মেজাজে তিনি কথাগুলো বললেন, তিনি ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন কারণ তিনি একটি বিষ্ফোরন আশা করছিলেন।

রাতের পর রাত তিনি বাইরে চলে গেলেন, অন্যদিকে রাতের পর রাত মহিলা বাড়িতে বসে রইলেন, কিন্তু মনে মনে এমন ছবি আঁকলেন যেন তার স্বামী তার পাশেই পুরনো চেয়ারটিতে বসে আছেন। তিনি চেয়ারে বসেছিলেন এবং তিনি সার। তিনি চেয়ারে বসেছিলেন কিন্তু তিনি এমন একটি প্রতিবিম্ব আপন মনে তৈরি করলেন যেন তার স্বামী সেই সোফার মতই তার পাশে বসে বই পড়ছেন। মনশ্চক্ষুতে তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন যে স্বামী বাড়ির চারপাশে অলসভাবে বিচরন করছেন, রং করছেন এবং এটা সেটা এখানে ওখানে ঠিক ঠাক করছেন আগেরই মতই। এমনকি তিনি এমন ছবিও মনে মনে কল্পনা করলেন যেন তার স্বামী সেই বিবাহের প্রথম দিনগুলোতে যেমন থালাবাসন রোদে শুকাতেন এখনও তেমনটিই করছেন। মনশ্চক্ষুতে যেন দেখতে পাচ্ছেন তিনি আর স্বামী একত্রে গলফ খেলছেন এবং মনের আরও দু'জনে দীর্ঘ ভ্রমণ করছেন। কারণ একদিন সত্যিই তারা প্রমোদ ভ্রমণ করেছিলেন।

এমন সুন্দর একটি ছবি তিনি খুব স্থিরভাবে স্মৃতিতে ধরে রেখেছিলেন এবং একদিন রাতে সত্যিই তার স্বামী সেই পুরনো চেয়ারটিতে বসেছিলেন। পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য তিনি দুবার সেদিকে তাকালেন এবং তার মনে হলো, যে ছবি তিনি কল্পনা করেছিলেন এ যেন তার থেকেও বাস্তব। কিন্তু সম্ভবত এই ছবি অংকিতকরনই একটি বাস্তবতা কারণ যে কোন ভাবেই হোক সত্যিকার লোকটিই সেখানে বসেছিলেন। কখনও কখনও তিনি বাইরে যেতেন কিন্তু অনেক অনেক রাত্রে তিনি তার ঐ চেয়ারে বসতেন। তারপর তিনি তার সামনে পড়তে শুরু করতেন, যেন সেই হারনো দিনগুলোর মতই তারপর এক রৌদ্রজ্জ্বল শনিবারের দুপুর বেলায় জিজ্ঞেস করলেন, গলফ খেলার বিষয় তুমি কি বল?”

দিনগুলো সুখ সাচ্ছন্দেই কেটে গেল যে পর্যন্ত না তিনি বুঝতে পারলেন যে নব্বইতম দিনটি এসে উপস্থিত হয়েছে, তাই সেই সন্ধ্যায় তিনি স্বামীকে আস্তে জানালেন, "বিল, আজ হল নব্বইতম দিন।”

বিব্রত হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'নব্বইতম দিন'? তুমি কি বুঝাতে চাইছ? "কেন তোমার মনে পড়ছে না? বিবাহ বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হবার আগে নব্বই দিন পর্যন্ত আপেক্ষা করতে আমরা রাজি হয়েছিলাম, আর আজ সেই বিশেষ দিন?”

মুহূর্তের জন্য তিনি স্ত্রীর প্রতি তাকালেন, তারপর খবরের কাগজের পাতা উল্টিয়ে নিজের মুখ লুকালেন এবং বললেন, 'বোকার মত কথা বলো না,' আমি সম্ভবত তোমাকে ছাড়া চলতেই পারছিলাম না। তুমি কোথা থেকে এ ধারণা পেলে যে আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছিলাম?

ফরমুলাটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন প্রার্থনার বিষয়টিকে মনে চিত্রিত করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রার্থিত বিষয়টি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। প্রার্থনাশক্তি যেমন তার সমস্যার সমাধান করেছিল তেমনি তার স্বামীর সমস্যারও সমাধান দিয়েছিল।

আমি এমন অনেকের সম্পর্কেই জানি যারা সাফল্যের সাথে এই কৌশলটি প্রয়োগ করেছেন এবং তা যে শুধু তাদের ব্যক্তিগত কাজেই করেছেন তা নয়, ব্যাবসায়িক কাজেও এর সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে। যখন আন্তরিকভাবে এবং বিচক্ষনতার সাথে এমন অবস্থায় বিষয়টি কাজে লাগাই তখন ফল এমনই চমৎকারভাবে পাওয়া যায় যে, একে অবশ্যই তখন একটি ফলদায়ক প্রার্থনা পদ্ধতি হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারি। মানুষ যখন এই পদ্ধতিকে সৃষ্টিকর্তার সাথে এবং সত্যিকারভাবে কাজে লাগান এর ফলাফল দেখে তারা বিস্মিত হয়ে যান।

শিল্পপতি সম্মেলনের এক সান্ধ্য ভোজে স্পিকারের কাছাকাছি টেবিলে আমি বসেছিলাম, ঠিক একজন লোকের পরেই আর যদিও একটু দৃষ্টিকটু দিক সেটা, কিন্তু লোকটি খুব পছন্দসই। কিন্তু আমার মনে হলো একজন প্রচারকের সান্নিধ্যে তিনি একটু আক্ষেপবোধ করছিলেন, যা স্পষ্টতই তাঁর বাঞ্চিত সঙ্গ ছিল না। খাবারের সময় তিনি কিছু ধর্ম সংক্রান্ত শব্দ ব্যবহার করলেন, কিন্তু তা একত্রে ধর্মীয় বিধিমালায় দাঁড় করানো যায় না। প্রতিটি শব্দ বিদারনের পর পরই তিনি ক্ষমাপ্রার্থী হলেন, কিন্তু আমি তাকে উপদেশ দিলাম যে, আমি আগে ওসব শব্দগুলো শুনেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে বাল্য বয়সে তিনি গীর্জার একজন সেবক ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন সেই পুরনো কাহিনী তিনি আমাকে শুনালেন যা আমি সারাজীবনে বহুবার শুনেছি এবং যা এখনও অনেকেই সম্পূর্ণ নতুনভাবে এমন পলায়নের ঘটনা ঘটাবে এবং বলবে যেমন: 'যখন আমি বালক ছিলাম, আমার পিতা আমাকে রবিবারের স্কুলে এবং গীর্জায় যেতে এবং ধর্মীয় পাঠগুলো আকণ্ঠ মুখস্ত করাতে বাধ্য করেছে। কাজেই আমি যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম তখন থেকে আমাকে আর এসব শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়নি এবং সেই থেকে কদাচিৎ আমাকে গীর্জায় যেতে হয়েছে।

তারপর এই লোক পর্যবেক্ষন করে দেখলেন যে, সম্ভবত তার আবার গীর্জায় যাওয়া আসা শুরু করা উচিত। যেহেতু তিনি বুড়া হয়ে যাচ্ছেন এখানে আমি একটু মন্তব্য করলাম যে, গীর্জায় গিয়ে যদি একটি সিট খুঁজে পান তবে আপনি ভাগ্যবান। তাতে তিনি আবাক হয়ে গেলেন, কারণ তিনি কখনও ভেবে দেখেননি যে মানুষ আজকাল আর গীর্জায় যায় কি না। আমি তাকে বললাম অনেক মানুষ এখন প্রতি সপ্তায় গীর্জায় যায় এবং দেশে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ঘনঘনই যায় আমার কথা শুনে তিনি অনেকটা দমে গেলেন।

লোকটি ছিলেন মধ্যম আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং তিনি আমাকে বলেই ফেললেন যে, গতবছর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কত টাকা গ্রহণ করেছে। আমি তাকে বললাম যে, আমি অন্তত গুটি কতক গীর্জার খবর জানি যে তাদের পাওয়া আপনার পাওয়ার থেকে বেশি। কথাটি আসলে তার উদর গহ্বরে দারুণভাবে আঘাত করল এবং গীর্জার প্রতি তার কতটা শ্রদ্ধা ভক্তি তা খুব দ্রুত বুঝতে পারলাম। তাকে বললাম যে, হাজার হাজার ধর্মীয় বই বিক্রি হয়ে গেছে যার সংখ্যা অন্যান্য বইয়ের চেয়ে বেশি। “হয়ত আপনারা অর্থাৎ গীর্জার লোকেরা কোন বল নৃত্যের মতই জমায়েত হয়েছেন ওখানে” বেশ অমার্জিত ভাষায় লোকটা কথাগুলি বললেন

এই মুহূর্তে অন্য একজন লোক আমাদের টেবিলের কাছে আসলেন এবং গভীর আগ্রহের সাথে আমাকে বললেন যে, বিস্ময়কর কিছু একটা তার জীবনে ঘটেছে। তিনি বললেন যে মানসিকভাবে খুবই অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন তিনি কারণ কোন কিছুই তার ঠিকঠাকমত চলছিল না। মনে মনে স্থির করলেন য়ে সপ্তাহ খানেকের কিম্বা কিছু অধিক সময়ের জন্য তিনি বাইরে যাবেন এবং আমার লিখা একটি বই পড়বেন যে বইয়ে বাস্তব সম্মতভাবে রেখাপাত করা হয়েছিল। তিনি জানালেন যে, বইটির বিষয়বস্তু তার মনে এই প্রথম একটি সন্তুষ্টজনক অবস্থা এনে দেয় এবং তিনি শান্তি অনুভব করেন। তার ব্যক্তিগত সম্ভাবনাগুলির জন্য বইটি তাকে উৎসাহিত করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তার কষ্ট কাঠিন্যের সঠিক জবাব পাওয়া যায় ধর্মের বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে।

"সুতরাং” তিনি বললেন, যে "আপনার বইয়ে উপস্থাপিত ধর্মীয় নীতিমালাগুলো আমি চর্চা করতে শুরু করে দিয়েছি আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে, যে উদ্দেশ্যগুলো আমি সম্পন্ন করার জন্য চেষ্টা করছিলাম সেগুলো সম্পন্ন হতে পারে একমাত্র বিধাতার সাহায্য বলে। একটি অদ্ভুত অনুভূতি এলো আমার মধ্যে যে, আমার সবকিছু যথাযথভাবে সম্পন্ন হতে চলেছে এবং তখন থেকে আমার মনে হল যে, কোন কিছুই আর আমাকে বিপর্যস্ত করতে পারবে না। আমি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারলাম যে, সবকিছু ঠিক ঠাক মত হতে যাচ্ছে। কাজেই আমার ভালো ঘুম হতে লাগল এবং ভালো অনুভব করতে লাগলাম। আমি এমনই অনুভব করতে লাগলাম যেন আমি বুঝি কোন বলকারক ঔষধ (Tonic) খেয়েছি। আমার নতুন জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক কৌশলাদির চর্চাই হল সন্ধিকাল। যখন তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন, আমার টেবিলের সঙ্গীটি যিনি এতক্ষণ এসব কথা শুনছিলেন, বললেন, এর আগে জীবনে কখনও এমন কথা শুনিনি। ঐ লোকটি যে ধর্মীয় বিষয়ে কথাগুলি বললেন তা যেমন সুখের এবং তেমনি তা কার্যকরও বটে। আর এমনভাবে কখনই তা আমার সামনে উপস্থিত হয়নি। তিনি এমন ধারণা ব্যক্ত করলেন যে, ধর্ম প্রায় বিজ্ঞানের মতই যা প্রয়োগ করে আপনি আপনার স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারেন এবং আপনার কাজে কর্মেরও উন্নতি ঘটাতে পারেন। আমি ধর্মকে কখনও ওভাবে চিন্তা করিনি।

তারপর আরও বললেন, "কিন্তু আপনি জানেন কি আমাকে কিসে আঘাত করেছিল?” লোকটির মুখের উপর তার অদ্ভুত দৃষ্টি।

এখন দেখুন সেই কৌতুকজনক ঘটনাটি কি, যখন আমার টেবিলের সঙ্গীটি ঐ উক্তিটি করলেন আবার সেই একই দৃষ্টি তার মুখের উপর দেখা গেল। প্রথমবার তিনি ধারণা পাচ্ছিলেন যে, ধর্মীয় বিশ্বাস পবিত্র উপাদান কিছু একটা নয় কিন্তু সাফল্যের সাথে বাঁচার একটি বৈজ্ঞানিক পন্থা মাত্র। সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে সরাসরি লক্ষ্য করছিলেন প্রার্থনার বাস্তব এবং কার্যকরী শক্তি কতখানি

ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি যে, প্রার্থনা এমন একটি ব্যাপার যে, ভাইব্রেশনের মাধ্যমে তা একজন থেকে আরেকজনের কাছে এবং বিধাতার কাছেও পাঠানো সম্ভব। সারা বিশ্বমন্ডল ভাইব্রেশনের আওতাধীন একটি টেবিলের অনুর মধ্যেও ভাইব্রেশন বর্তমান। বায়ুমন্ডল ভাইব্রেশনে ভরপুর। মানুষের মধ্যেকার প্রতিক্রিয়াও ভাইব্রেশনের ফলেই হয়ে থাকে। আপনি অন্য একজনের জন্য প্রার্থনা প্রেরণ করেন, তখন আপনি আপনার আধ্যাত্মিক জগতের সহজাত শক্তিকেই কাজে লাগান। আপনি তখন আপনার নিজের মধ্য থেকে আরেকজনের মধ্যে প্রেম, অসহায়তা সহানুভূতিসম্পন্ন সহযোগীতা শক্তিযুক্ত জ্ঞান এসব পরিবাহিত করেন এবং এই পদ্ধতিতে আপনি আপনার বিশ্বব্রহ্মান্ডীয় ভাইব্রেশনকে জাগিয়ে তুলছেন, যার মধ্য দিয়ে বিধাতা আপনার প্রার্থনার বস্তুগুলো পাঠিয়ে দেন। এই মূলতত্ত্বটি নিয়ে আপনি একটি পরীক্ষা নীরিক্ষা করে দেখুন, দেখবেন কেমন এর বিস্ময়কর ফল।

উদাহরণ স্বরূপ আমার একটি অভ্যাস আছে এবং প্রায়ই আমি তা ব্যবহার করি। অভ্যাসটি হল, যখন কোন লোকজনের পাশ দিয়ে যাই তখন আমি তাদের জন্য প্রার্থনা করি। একবার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার মধ্যদিয়ে ট্রেনে করে যাবার সময় অদ্ভুত একটি চিন্তা আমার মনে এসে উপস্থিত হয়েছিল। স্টেশন প্রাঙ্গণে একজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি আমি, ঠিক তখনই আমাদের ট্রেনটি সামনে এগুতে থাকে এবং লোকটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আমার কাছে মনে হল যে লোকটিকে আমি জীবনে প্রথমবারের মত এবং শেষবারের মত দেখছিলাম। তার এবং আমার জীবনের মধ্যে হালকা একটি স্পর্শ যেন অনুভূত হল মাত্র এক মুহূর্তের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য। সে চলে গেল তার রাস্তায় আর আমি গেলাম আমার রাস্তায়। আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম যে, কীভাবে তার জীবনটা আরও সাজানো গোছানো হবে।

তারপর আমি লোকটির জন্য মঙ্গলজনক প্রার্থনা করলাম যাতে লোকটির জীবন আশীর্বাদে পূর্ণ হতে পারে। ট্রেনটি চলছে, পেছনে ফেলে যাচ্ছি কত লোক, দেখতে দেখতে সবার জন্যই প্রার্থনা করতে থাকলাম। দেখলাম এক কৃষক জমি চাষ করছে, বিধাতার কাছে প্রার্থনা করলাম যেন সে ভালো ফসল ঘরে তুলতে পারে। এরপর দেখলাম এক মাকে, কাপড় শুকাদিচ্ছে, ধোয়া কাপড় ছোপড়ের লম্বা লাইন দেখে বুঝলাম মহিলাটির পরিবার বেশ বড়সড়। ক্ষনিক দৃষ্টিতে তার মুখে প্রভাটুকু দেখলাম এবং যেভাবে তিনি বাচ্চাদের কাপড় চোপড় নাড়াচাড়া করছিলেন তা আমাকে বলে দিল যে, তিনি সত্যিই সুখি জীবন যাপন করছেন। আমি তার জন্য প্রার্থনা করলাম, যেন তিনি সুখি জীবন যাপন করতে পারেন। যেন তার স্বামী তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন এবং তিনিও যেন তার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন। আমি আরো প্রার্থনা করলাম যেন তাদের পরিবারটি হয় একটি ধর্ম অনুরাগী পরিবার এবং যেন বাচ্চাগুলো শক্ত সামর্থবান, সম্মানজনক যুবক-যুবতী হিসেবে বেড়ে ওঠে।

এক স্টেশনে দেখলাম এক লোক অর্ধ ঘুমন্ত অবস্থায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে, এবং আমি প্রার্থনা করলাম যেন লোকটি জেগে ওঠে এবং ঐ অবস্থা থেকে মুক্তি পায় এবং ভালো কোন ফল লাভ করতে পারে।

তারপর আমরা আরেকটি স্টেশনে থামলাম এবং সেখানে দেখতে পেলাম খুব সুন্দর একটি বালক যে পাজামাটি পড়ে আছে তাকে পাজামাটি পা আরেকটি থেকে আলাদা। গলার কাছে সার্টটি খোলা, পড়ে থাকা সোয়েটারটি এত বড় যে বেখাপ্পা লাগছিল, চুল উষ্কখুষ্ক, মুখায়ব নোংরা। একটি ললিপপ চুষছিল সে, এবং তাই নিয়েই খুব ব্যস্ত ছিল। আমি তার জন্য প্রার্থনা করলাম এবং যেই ট্রেনটি যাবার জন্য নড়ে উঠেছে ঠিক তখন সে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল এবং মন কেড়ে নেবার মত সুন্দর হাসিটি উপহার দিল। আমি জানতাম আমার প্রার্থনা তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে, এবং আমি তার দিকে হাত নাড়লাম, সেও হাত নেড়ে জবাব দিল। আমি জানি খুব সম্ভবত জীবনে কোন দিন ছেলেটির আর দেখা পাবনা কিন্তু আমাদের উভয়ের জীবন একে অপরকে ছুঁয়ে গিয়েছিল খনিকের জন্য। যখন এই ছোট্ট ব্যাপারটি ঘটে সেই সময় পর্যন্ত আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন কিন্তু হঠাৎ করেই সূর্য মেঘের ঘোমটা সরিয়ে উঁকি মারল চারিদিক উদ্ভাসিত করে আর আমার মনে হল ছেলেটির হৃদয়ও তদ্রূপ আলোয় উজ্জ্বল হয়েছিল, কারণ ভিতরের আলোকছটা তার মুখের উপর ঠিকরে পড়েছিল। আনন্দে ভরে গিয়েছিল আমার মন। আমি নিশ্চিত যে, ছোট্ট ঘটনাটি ঘটল তার পেছনে ছিল বিধাতার শক্তি, যা চক্রাকারে ঘুরছিল আমার এবং ছেলেটির মধ্যে আবার ফিরে যাচ্ছিল বিধাতার কাছে; এবং আমরা সার্বিকভাবে প্রার্থনা শক্তির মুগ্ধকর বন্ধনে বাঁধা।

প্রার্থনার একটি গুরুত্মপূর্ণ কাজ হল সৃজনশীল ধারণাগুলোর উদ্দীপনা স্বরূপ কাজ করা। মনের মধ্যে যে সম্পদগুলো আমাদের আছে একটি সফল জীবন যাপনের জন্য তার সবই প্রয়োজন। সচেতনতার মধ্যে ঐ ধারণাগুলো উপস্থিত থাকে যেগুলো যখন বের হয়ে আসে এবং যথাযথভাবে কার্যেপরিণত হবার জন্য একত্রে সুযোগ প্রদান করে, তখন সেগুলো যে কোন পরিকল্পনা বা যে কোন কাজের দায়িত্ব ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি সফল কার্য পরিচালনা করে। যখন বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট বলে, "বিধাতার রাজ্য তোমার মধ্যেই,” উক্তিটি আমাদের জানিয়ে দেয় যে, বিধাতা আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের মনে এবং ব্যক্তিত্বে সমস্ত সম্ভাবনাময় শক্তিগুলোকে এবং সামর্থগুলোকে যেগুলো একটি সফল জীবন যাপনের জন্য আমাদের দরকার তা সবই তিনি স্থাপন করে রেখেছেন। সেসব শক্তি সামর্থগুলোকে একটু স্পর্শ করার জন্য এবং উন্নত করার জন্য সেই সম্ভাবনাময় বিধাতা প্রদত্ত শক্তি আমাদের মধ্যে সবসময় থেকেই যাচ্ছে।

উদাহরণ স্বরূপ, আমার চেনা জানা এক লোক ব্যবসার সাথে জড়িত এবং ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চারজন নির্বাহীর তিনি একজন। নিয়মিত বিরতির সময় এই লোকগুলো একটি বিশেষ সভায় মিলিত হতেন এবং এর নাম তারা দিয়েছিলেন ধারণা সভা (Idea session) এবং এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের চারজনের মনে উদিত যে কোন সৃজনশীল ধারনার একে একে উত্থাপন করা। এই সভার জন্য তারা যে কক্ষটি ব্যবহার করতেন সেখানে কোন টেলিফোন থাকত না, কোন বৈদ্যুতিক সংকেত যন্ত্র ছিল না অথবা অন্য কোন সাধারণ অফিসিয়াল সরঞ্জাম ও ছিলনা। সকল জানালা এমনভাবে সাটা ছিল যে রাস্তার শব্দ বেশির ভাগই ভিতরে ঢুকতে পারতো না।'

সভাশুরু হবার আগে চারজনের এই দলটি অন্তত দশ মিনিট নীরবতা পালন করতেন এবং ধ্যানের মধ্যে কাটাতেন এবং এমনভাবে বিধাতাকে মনে মনে কল্পনা করতেন যেন সত্যি সত্যিই তিনি তাদের কল্পনা কার্যকরী করে দিচ্ছেন। প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ভাবমত নীরব প্রার্থনার নিশ্চিত করতেন যেন বিধাতা তাদের ব্যবসায় প্রয়োজনীয় সমস্ত যথার্থ ধারণাগুলো মন থেকে উৎসারিত করেন।

নীরব সময়টুকু পাড় করে সবাই কথা বলতে শুরু করতেন এবং তাদের কার মনে কি ধারণা আসলো তা একে একে প্রকাশ করতেন। ধারণাগুলোর একটি তালিকা কাগজের উপর লিখা হত এবং টেবিলের উপর ফেলা হত। কাউকেই কারো মতের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে দেয়া হত না এমন একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে কারণ যুক্তিতর্ক সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে ব্যাহত করতে পারত। কার্যগুলো একত্র করা হত এবং প্রত্যেককেই পরবর্তী সভার জন্য মূল্যায়ন করা হত। কিন্তু প্রার্থনা শক্তি বলে উদ্দীপিত এটা ছিল তাদের একটি ধারণা উত্থাপন সভা।

যখন অধিক হারে উত্থাপিত যে সমস্ত ধারণাগুলো নিয়ে এই অনুশীলনটি শুরু হয়েছিল, সেগুলো কিন্তু প্রথম দিকে বিশেষ মূল্যবান বলে প্রামাণিত হয়নি, কিন্তু এ ধরনের সভা চলতে চলতে ভালো ভালো ধারণাগুলো আনুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। এখন তাদের অনেক ভালো ভালো মন্ত্রণা যেগুলো পরবর্তিতে তাদের বাস্তব মূল্য নিশ্চিত রূপে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নির্বাহী ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমরা আমাদের অন্তদৃষ্টি নিয়ে এপর্যন্ত এসেছি যা শুরুমাত্রই যে আমাদের স্থিতি-পত্র দেখায় তা নয় কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাসের নতুন অনুভূতিও এ থেকে লাভ করেছি। অধিকন্তু আমাদের চারজনের মধ্যে একটি বন্ধত্বপূর্ণ সখ্যতার গভীর অনুভূতিও এর মধ্যে নিহিত আছে এবং তা ঐ সংস্থার অন্যান্যদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে।

কাজেই বলতে চাই যে, কোথায় সে সেকেলে ব্যবসায়ী যে নাকি বলে বেড়ায় যে, ধর্ম হল একটি তাত্মিক বিষয় মাত্র, ব্যবসা বাণিজ্যে এর কোন স্থান নেই বা মূল্য নেই? আজকের দিনে যে কোন সফল এবং যোগ্য ব্যবসায়ী তার উৎপাদন ক্ষেত্রে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে পরীক্ষিত পদ্ধতিটিই যে কাজে লাগাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয় এই পদ্ধতি তিনি পন্য বিতরণ এবং প্রশাসনেরও কাজে লাগাবেন এবং অনেকেই আজ এটা আবিস্কার করছেন যে, দক্ষতা বাড়ানোর যতরকম পদ্ধতি আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম পদ্ধতি হল প্রার্থনা শক্তির প্রয়োগ।

সতর্ক লোকেরা সবজায়গাতেই প্রার্থনাশক্তি প্রয়োগ করে সেই সাফল্যই খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং তারা বুঝতে পারছেন যে, তাদের ভালো লাগছে, তারা ভালোভাবে কাজ-কর্ম করতে পারছেন, ভালো কিছু করতে পারছেন, ভালো ঘুম হচ্ছে তাদের অর্থাৎ সবকিছুই ভালো যাচ্ছে তাদের। আমার এক বন্ধু গ্রোভ প্যাটারসন-Potterson. টলিভো ব্লেভের, সম্পাদক, অসাধারণ প্রাণশক্তিতে ভরা এক মানুষ। তিনি বলেন যে, প্রার্থনা পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে দৈহিক শক্তি আংশিক হলেও খুব ভালোভাবে সুফল প্রদান করে।

উদাহরণ স্বরূপ তার পছন্দ হল ঘুম না করার মধ্য দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে ঠিক প্রার্থনা করার সময় তার অবচেতনমন সবচেয়ে বেশি শিথিল অবস্থায় থাকে আর অবচেতন অবস্থাতেই আমাদের জীবন বিরাটভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। যদি আপনি অবচেতন মনের সর্বোচ্চ শিথিল অবস্থায় একছিটে প্রার্থনাও করতে পারেন দেখবেন প্রার্থনার মধ্যে কত শক্তিশালী ফল নিহিত রয়েছে।

মি. প্যাটারসন মৃদু হাসতে হাসতে বললেন, “একবার আমি এক বিরত্তিকর অবস্থায় পড়েছিলাম কারণ প্রার্থনা করার সময় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন আসলে আমি বিষয়টি ঐভাবে আগের মতই পেতে চাইছি। তুলনাহীন অনেক প্রার্থনা পদ্ধতির প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে কিন্তু এর মধ্যে যেটি সবচেয়ে ফলপ্রদ তার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে ফ্র্যাঙ্ক লব্যাক তার চমৎকার বইতে বলেছেন, 'প্রার্থনা হল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা। আমি এই বইটিকে প্রার্থনার উপর রচিত সবচেয়ে বাস্তবানুগ বই বলে গণ্য করি, কারণ এ বইটি একেবারে নতুন ধরণের প্রার্থনা কৌশলগুলো বর্ণনা করেছে; যে গুলো সত্যিই কার্যকর।

ডক্টর লব্যাক বিশ্বাস করেন যে প্রার্থনা থেকেই সত্যিকারের ক্ষমতা উৎপন্ন হয়। তার প্রার্থনা পদ্ধতির একটি হল, রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা এবং চলমান মানুষের প্রতি প্রার্থনা ছুঁড়ে দেয়া। এই ধরণের প্রার্থনাকে তিনি 'হঠাৎদীপ্ত প্রার্থনা' নামে আখ্যায়িত করেছেন। পথচারীদের প্রতি এ যেন 'প্রার্থনা বোমা' নিক্ষেপের মত, অদ্ভুত এ বোমার মধ্য দিয়ে তিনি তাদের প্রতি তার শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসাই যেন পাঠিয়ে দিতেন। তিনি বলেন যে, লোকজন তাকে পাশ কেটে যাচ্ছে আর তিনি তাদের প্রতি প্রার্থনা ছুঁড়ে দিচ্ছেন। আর প্রায়ই যা ঘটছে তা হলো, ঐ লোকগুলো চারিদিকে চোখ ফেরাত এবং আমার দিকে তাকিয়ে হাসতো বৈদ্যুতিক শক্তির মতই কিছু নিঃসরিত হচ্ছে এটা তারা উপলব্ধি করত।

একদিন এক বাসে তিনি তার যাত্রীসঙ্গীদের দিকে এমনিভাবে প্রার্থনা ছুঁড়ে দিলেন। আর একদিন তিনি বাসে এক যাত্রীর পেছনে বসেছিলেন, লোকটিকে দেখতে খুব বিষন্ন লাগছিল। লোকটি যখন বাসে ঢুকে তখন তিনি তার মুখের গোমড়া ভাবটি লক্ষ্য করেছিলেন, তিনি লোকটির উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছাজ্ঞাপক এবং বিশ্বাসের প্রার্থনা প্রেরণ করতে থাকলেন। এমন বিশ্বাস নিয়ে তা করতে থাকলেন যেন যেন তোর প্রার্থনা বিষণ্ণ লোকটিকে ঘিরে ফেলছে এবং তা তার মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। হঠাৎ করেই লোকটি তার মাথার পেছনদিকটা মৃদু ঠুকতে থাকলেন এবং যখন তিনি বাস থেকে নেমে গেলেন লক্ষ্য করলাম তার মুখের সেই গোমড়া ভাবটি আর নেই, বরং সেখানে স্থান পেয়েছে সুন্দর মৃদু হাসি। ডক্টর লব্যাক বিশ্বাস করেন যে, তিনি প্রায় লোকজনে ভরা গাড়ি বা বাসের ভেতরের এবং সেখানকার চারিদিকের পরিবেশ ভালোবাসা এবং প্রার্থনার দ্বারা ঘিরে ফেলার প্রয়োগে সম্পূর্ণরূপে বদলে ফেলতেন, এবং পারতেনও।

একবার পুলম্যান ক্লাবের এক গাড়িটায় অর্ধমাতাল এক লোক একেবারে উগ্রচন্ডী এবং নিষ্ঠুর, এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন উনি একজন কেউ কেটা এবং স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে বিরক্তিকর করে তুলেছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম যে গাড়ির কেউ আর তাকে পছন্দ করছিল না। গাড়িটি যখন অর্ধেক পথ পার হয়ে এলো, মনে মনে স্থির করলাম ফ্র্যাঙ্ক লব্যাকের পদ্ধতিটি একটু যাচাই করে দেখব। সুতরাং আমি তার জন্য প্রার্থনা করা শুরু করলাম, ইতিমধ্যে লক্ষ্য করলাম তার মধ্যে একটু ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, এবং তার প্রতি আমি শুভেচ্ছা পাঠাতে থাকলাম। খুব দেরি হয়নি মনে হল যেন সুস্পষ্ট কোন কারণ ছাড়াই লোকটি আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং রাগ বিদ্বেষহীন এক সুন্দর হাসি আমাকে উপহার দিলেন, এবং অভিবাদন করার ভঙ্গিতে হাতটি তুললেন তার মনের ভাব পাল্টে গিয়েছে এবং একেবারেই শান্ত অবস্থায় ফিরে এসেছে। কাজেই একথা বিশ্বাস করার পেছনে প্রতিটি যুক্তিই আমার গ্রহণযোগ্য যে, প্রার্থনা কার্যকরভাবেই তার কাছে পৌঁছেছে।

ঠিক এই কারণে যখন শ্রোতাদের কাছে আমি কোনো বক্তব্য রাখি তার আগে সবাইকে বলি, আপনারা উপস্থিত লোকদের জন্য প্রার্থনা করুন। আর ভালোবাসার মনোভাব ও শুভেচ্ছা তাদের প্রতি বর্ষণ করুন। কখনও কখনও আমি শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক বা দুজন লোক নির্ধারণ করি। যাদের দেখে মনে হয় এরা খুব বিমর্ষ বা এমনকি বিরোধী মনোভাবাপন্ন, আমি বিশেষকরে তাদের প্রতি আমার প্রার্থনা এবং শুভেচ্ছার মনোভাব প্রেরণ করি। সম্প্রতি দক্ষিণ পশ্চিমের এক শহরে চেম্বার অব কমার্সের বাৎসরিক নৈশভোজে যখন বক্তব্য রাখছিলাম তখন শ্রোতামন্ডলীর মাঝে একজনকে আমার দিকে গোমড়া মুখ করে তাকিয়ে থাকতে দেখি। আমি সব মিলিয়ে এটা এমন সম্ভব হতে পারে যে তার মুখের ভাবে এমন কিছু প্রকাশ পায়নি যা কোনোভাবেই আমার সাথে সম্পর্কিত কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে আমার বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন কথা বলতে শুরু করার আগে আমি তার জন্য প্রার্থনা করলাম এবং ধারাবাহিকভাবে কিছু প্রার্থনা ও শুভেচ্ছার মনোভাব তার প্রতি ছুড়ে দিলাম। যখন কথা বলছিলাম ঠিক একইসাথে ঐ প্রার্থনা পদ্ধতিটিও চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

সভা যখন শেষ হয়ে গেল, চারিদিকে সবার সাথে করমর্দন করছি হঠাৎ করেই আমার হাতটি আশ্চার্যজনকভাবে কারো দ্বারা ধৃত হল, আর আমি ঐ লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। খোলামেলাভাবে হাসছিলেন লোকটি। লোকটি বললেন, “আন্তরিকভাবে বলছি, এ সভায় যখন এলাম তখন সত্যিই আমি আপনাকে পছন্দ করতে পারিনি। ধর্ম প্রচারকদের আমার একদম পছন্দ নয় এবং আপনাকে অর্থাৎ একজন পুরোহিতকে আমাদের চেম্বার অব কমার্সের সোশভোজে বক্তা হিসেবে দেখে পছন্দ না করার কোন কারণও দেখিনি। আমি আশা করছিলাম যে, আপনার বক্তব্য কোনরকম সাফল্য পাবে না এখানে হোক, যেহেতু আপনি এমন কিছু বলেছেন মনে হচ্ছে তা আমাকে স্পর্শ করেছে। নতুন এক মানুষের মত মনে হচ্ছে নিজেকে। শান্তির এক অদ্ভূত অনুভূতি হল আমার, আমি নিবীড়ভাবে এটা ধরে রাখব। আমি আপনাকে পছন্দ করি।"

আমার বক্তব্যের মধ্যে এর প্রভাব ছিল তা নয়। এটা ছিল প্রার্থনা শক্তির নিঃস্বরণ। আমাদের মস্তিস্কে প্রায় দু বিলিয়ন (দুশত কোটি) ক্ষুদ্র ব্যাটারির সংগ্রহ রয়েছে। মানুষের মস্তিস্ক প্রার্থনা ও চিন্তাশক্তির দ্বারা সেই শক্তিকে অন্যদের মধ্যে প্রেরণ করতে পারে। মানুষের শরীরের চুম্বক শক্তি বাস্তবিক ভাবে পরীক্ষিত হয়েছে। আমাদের হাজার হাজার প্রেরক কেন্দ্র রয়েছে, যখন প্রার্থনার দ্বারা এগুলো এসে উপস্থিত হয়, তখন একজনের মধ্য দিয়ে বিস্ময়কর ক্ষমতা বা শক্তি বয়ে যাওয়া সম্ভব এবং মানুষ থেকে মানুষে তা সঞ্চালন ও করা যায় প্রার্থনার দ্বারা আমরা ক্ষমতা প্রেরণ করতে পারি যা প্রেরণ এবং ধারণ কেন্দ্র উভয়ভাবেই কাজ করে থাকে।

এ্যালকোহলে আসক্ত এক লোক ছিল, আমি তার সাথে অনেকদিন কাজ করছিলাম। প্রায় ছ'মাস ধরে লোকটি মাদক আখড়ায় কাটাচ্ছিলেন। ব্যবসয়িক যাত্রায় যাচ্ছিলেন লোকটি। ঐসময় এক মঙ্গলবার অপরাহ্নে প্রায় চারটার দিকে আমার মনে খুব জোরালোভাবে একটি বিষয় ছায়াপাত করল, আমার মনে হল লোকটি খুব কষ্টের মধ্যে আছে। লোকটির ঐ বিষয়টি আমার ভাবনার উপর দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। আমি অনুভব করলাম কিছু একটা আমাকে বিষয়টির দিকে টানছে। সবকিছু ছেড়েছুড়ে তার জন্য প্রার্থনা শুরু করলাম আমি। প্রায় আধঘণ্টা প্রার্থনা করলাম, তারপর মনে হল, আমার মনে ছায়াপাত করা ধারণাটি একটু সিথিয়ে পড়েছে এবং তারপর আমি আর প্রার্থনা চালিয়ে গেলাম না ওখানেই থামলাম।

কয়েকদিন পর তিনি আমাকে ফোন করলেন। বললেন, “সারা সপ্তাহ আমি বোস্টনে ছিলাম এবং আমি আপনাকে জানাতে চাই যে আমি এখনও মাদকতায় ভুগছি, কিন্তু সপ্তাহের গোড়ার দিকে আমার সময়টা ছিল খুবই কঠিন।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "সময়টা কি মঙ্গলবার চারটা ছিল? অবাক হয়ে তিনি বললেন, “কেনো, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি জানলেন কিভাবে? আপনাকে কে বলল?

জবাবে বললাম, "আমাকে কেউ বলেনি," "তার মানে কোন মানুষই আমাকে তা বলেনি।” আমি তাকে মঙ্গলবার চারটার সময়কার অনুভূতির কথা বিস্তারিত বললাম এবং তাকে জানালাম যে আমি ঐ সময় তার জন্য আধঘণ্টা প্রার্থনা করেছি।

একথা শুনে খুবই বিস্মিত হলেন তিনি, এবং ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, "আমি হোটেলে ছিলাম এবং বারের সামনে এসে নেমে যাই। আমার মধ্যে তখন এক ভয়ানক যুদ্ধ চলছিল যেন। আপনার কথাও ভেবেছি আমি, কারণ ঐ অত্যন্ত খারাপ মুহূর্তে আপনার সাহায্য আমার একান্ত দরকার ছিল এবং আমি প্রার্থনা করতে শুরু করি।"

প্রার্থনাগুলো শুরু হয়েছিল ঐ লোকটার থেকে এবং তা আমার কাছে এসে পৌঁছেছে, এবং আমি তার জন্য প্রার্থনা করা শুরু করেছি। আমাদের উভয়েই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত হয়েছিলাম এবং আমাদের দুইজনের মধ্যকার প্রদক্ষিণ সমাপ্ত হবার পর তা বিধাতার কাছে পৌঁছেছে এবং নিজের ঐ কঠিন সংকট মোকাবিলায় শক্তি ফিরে পাবার আকারে তার এবং আমার প্রার্থনার উত্তর খুঁজে পেয়েছে এবং তারপর কি করেছিলেন ঐ লোকটি?

তিনি গিয়েছিলেন একটি ঔষধের দোকানে, এবং কিনেছিলেন একবাক্স ক্যান্ডি এবং সবটুকুই তার খেয়ে ফেলেছিলেন একেবারে না থেমে। ঐ যে কাজটি তিনি করলেন তা তাকে এমন সুন্দর এক অবস্থায় নিয়ে এল, যে তিনি রীতিমত ঘোষণা দিয়ে বললেন, এ হল, প্রার্থনা এবং ক্যান্ডি।

বিবাহিতা এক যুবতী নারী আমার কাছে বললেন যে, প্রতিবেশীদের প্রতি এবং বন্ধুদের প্রতি তার মন ঘৃণা, ইর্ষা এবং বিদ্বেষে ভরা। তিনি খুব উদ্বিগ্নও ছিলেন, সবসময় তার বাচ্চাদের নিয়ে একটা বিরক্তিকর অবস্থার মধ্যে তার সময় কাটত, এই ভেবে, হয়ত তারা অসুস্থ হয়ে পড়বে, অথবা কোন দুর্ঘটনা ঘটবে; অথবা স্কুলের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে। তার জীবনটা ছিল নানারকম মিশ্র কারুণ্যে ভরা এবং তা হল অসন্তুষ্টি, ভয়, ঘৃণা এবং নিরানন্দ। আমি জানতে চাইলাম যে, সে কোনোদিন প্রার্থনা টার্থনা করেছে কিনা। জবাবে সে বলল, "শুধু তখনই প্রার্থনা করি যখন আমি এই অবস্থাগুলোর ঘোর বিরোধী হয়ে উঠি অর্থাৎ আমি তখন মরিয়া কিন্তু আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, আমার কাছে প্রার্থনা কোন অর্থ বয়ে আনে না, কাজেই আমি ঘন ঘন প্রার্থনা করি না।”

আমি তাকে পরামর্শ দিয়ে বললাম যে, সত্যিকারের প্রার্থনা অনুশীলনের মাধ্যমে সে তার জীবনকে বদলে ফেলতে পারে এবং তাকে আরো কিছু নির্দেশনা দিলাম যে, কিভাবে ঘৃণ্য চিন্তাভাবনার পরিবর্তে ভালোবাসাপূর্ণ চিন্তা ভাবনা সে সবার প্রতি প্রেরণ করতে পারে, এবং ভীতিপূর্ণ চিন্তা ভাবনার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসপূর্ণ চিন্তা ভাবনা প্রেরণ করতে পারে। আমি তাকে আরো পরামর্শ দিলাম যেন তার বাচ্চারা স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রার্থনা করে এবং প্রার্থনাগুলোকে এমন নিশ্চয়তার সাথে করে যেন বিধাতার রক্ষাত্মক মঙ্গলভাবটির জন্যই যেন সবকিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রথমে সে সন্দিহান হয়ে পড়েছিল তারপর সে একজন অত্যন্ত আগ্রহী পক্ষ সমর্থনকারী হয়ে ওঠে এবং যতদূর জেনেছি যে, সে নিয়মিত প্রার্থনা অনুশীলন করেছে গা ছাড়া ভাবে কিছু বইপত্র এবং পুস্তিকা ইত্যাদি পড়ে এবং প্রতিটি কার্যকারী প্রার্থনাশক্তি কৌশলগুলো অনুশীলন করে। আর ঐ পন্থা অবলম্বন ক তোর জীবনে একটা পরিবর্তন আসে।

নিম্নেবর্ণিত চিঠি থেকে আমি সব জানতে পারি। সম্প্রতি এ চিঠিখানি সে আমাকে লিখেছিল।

আমি অনুভব করি যে আমার স্বামী এবং আমার দু'জনেরই গত কয়েক সপ্তায় অবস্থার অদ্ভূত উন্নতি হয়েছে। আমার এই বিরাট উন্নতির তারিখটি হল যে রাত্রে আপনি আমাকে বলেছিলেন যে, “যদি প্রার্থনা কর তবে প্রতিটি দিনই হবে চমৎকার।” তাই কার্যত আমি আপনার সেই প্রার্থনার নিশ্চয়তাজ্ঞাপক অনুশীলন শুরু করি যে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার মুহূর্ত থেকে আজ দিনটি যাবে চমৎকার এবং যেন নিশ্চিত বলতে পারি যে সেই হতে আমার কোন কাজে বা মন খারাপ করার মত দিন ছিল না। অবাক হবার মত বিষয় হল যে, সেই থেকে আসলেই আমার দিনগুলো পাল্টে যায়। যদিও খুব একটা স্নিগ্ধ যে হয়েছে তা নয়, আবার তুচ্ছ বিরক্তিগুলোও থেকে গেছে যেসব বরাবরই ছিল কিন্তু আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে ওসব এখন আমাকে আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে না। প্রতিরাত্রে যে বিষয়গুলির জন্য আমি কৃতজ্ঞ, যেগুলো আমার সারদিনে ঘটেছে এবং আমার সময়কে সুখপ্রদ করেছে তার একটি তালিকা তৈরি করি এবং তার উপর প্রার্থনা নিবেদন করি। আমি জানি এই অভ্যাসটি ভালো কিছু বাছাই করে নেবার জন্য এবং দুঃখজনক কিছু ভুলে থাকার জন্য আমার মনকে বিশেষ চালিকাশক্তি দান করেছিল। সত্যি কথা হল গত ছয়সপ্তাহের মধ্যে একটি বাজে দিনের দেখাও পাইনি আমি এবং আমার মন বিবেক কারো সাথে হীনমন্যতা দেখাতে আমাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি এবং ব্যাপারটি আমার কাছে বাস্তবিক খুবই বিস্ময়কর লাগছে।

প্রার্থনাশক্তি প্রয়োগ করে সে বিস্ময়কর শক্তি আবিস্কার করেছিল আপনিও তা করতে পারেন প্রার্থনাশক্তি প্রয়োগ করে কার্যকরী ফল পেতে পারেন অনুকরনীয় এমন দশটি নিয়ম এখানে প্রদত্ত হলঃ

১। প্রতিদিন অন্তত কয়েকমিনিট সবকিছু থেকে বিরত থাকুন। কোন কথাই বলবেন না। ঐ সময়টুকু শুধু মহান সৃষ্টিকর্তার কথা ভাবতে অভ্যাস করুন। আপনার মনকে আধ্যাত্মিকভাবে ধারণক্ষম করে তুলবে।
২। সহজ, স্বাভাবিক শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে মৌখিকভাবে প্রার্থনা করুন। মনে যা যা আছে সব বিধাতাকে বলুন। একেবারে অপরিবর্তনীয় পবিত্র শব্দাবলী ব্যবহার করতে হবে তা অবশ্যই ভাববেন না। বিধাতার সাথে আপনার নিজের ভাষায় কথা বলুন। তিনি তো তা বুঝেনই।
৩। প্রতিদিনের নির্ধারিত কাজে যাবার সময় পথে চলার সময়, বাসে চলার সময় অথবা যখন আপনি আপনার ডেস্কে বসে আছেন তখন আপনি প্রার্থনা করুন। চোখ মুদ্রিতকরে জগতসংসার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করুন এবং অল্পকিছুক্ষণের জন্য মনকে বিধাতার উপস্থিতি উপলব্ধির জন্য কেন্দ্রীভূত করে রাখুন এবং এক মিনিটের প্রার্থনাকে কাজে লাগাব প্রতিদিন যত বেশিহারে এ প্রার্থনা আপনি করবেন ততই আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে, বিধাতা আপনার কত কাছাকাছি।
৪। যখন আপনি প্রার্থনা করেন তখন শুধু চাওয়া ঠিক হবে না, কিন্তু তার বদলে আপনি নিশ্চিত হোন যে বিধাতা আপনাকে আশীর্বাদ দিচ্ছেন, এবং প্রার্থনার বেশিরভাগ সময় ব্যয় করুন বিধাতাকে ধন্যবাদ দিয়ে।
৫। এমন বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থনা করুন যে, আন্তরিক প্রার্থনা বিধাতার ভালোবাসা এবং তার সুরক্ষাশক্তি সহকারে আপনার প্রিয়তমদের অর্থাৎ যাদের মঙ্গলার্থে প্রার্থনা করছেন তাদের কাছে তা পৌঁছতে পারে এবং তাদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলতে পারে।
৬। প্রার্থনা করার সময় 'প্রার্থনা' পূর্ণ নাও হতে পারে এমন ভাবনা মনে স্থান দেবেন না। শুধুমাত্র 'প্রার্থনা' পূর্ণ হবে এই ভাবনাই মনে স্থান দেবেন কারণ তা নিশ্চিত ফলদায়ক।
৭। সবসময় বিধাতার ইচ্ছা মেনে নেবার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দান করুন। আপনি যা চান তা তার কাছে চান, কিন্তু বিধাতা যাই আপনাকে দেন স্বেচ্ছায় তা প্রহণ করুন। আপনার চাওয়ার চেয়ে এমন পাওয়াটা অবশ্যই ভালো।

৮। এমন মনোভাব ধরে রাখতে অনুশীলন করুন যে, সবকিছুই বিধাতার হাতে। সবচেয়ে ভালো কিছু করার জন্য বিধাতার কাছে সামর্থ্য প্রার্থনা করুন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে ফলাফলের ভার বিধাতার হাতে ছেড়ে দিন।
৯। যাদের আপনি পছন্দ করেন না তাদের জন্য অথবা যারা আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তাদের জন্য প্রার্থনা করুন। বিদ্বেষ হল আধ্যাত্মিক শক্তির সর্বপ্রধান অন্তরায়।
১০। যাদের জন্য প্রার্থনা করবেন তাদের একটি তালিকা তৈরি করুন। অন্যদের জন্য আপনি যত প্রার্থনা করবেন বিশেষকরে যাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই সেই অধিক প্রার্থনার সুফল আপনার প্রতি ফিরে আসবে।

📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 কিভাবে নিজের সুখ নিজেই তৈরি করতে হয়

📄 কিভাবে নিজের সুখ নিজেই তৈরি করতে হয়


আপনি সুখি হবেন কি সুখি হবেন না সে সিদ্ধান্ত কে নেবে? উত্তরটি হল- আপনি নেবেন।

টেলিভিশনের এক যশস্বী ব্যক্তির এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এক বুড়া লোক উপস্থিত ছিলেন। তিনি আসলে খুব অসাধারণ প্রকৃতির এক বুড়াই ছিলেন। তার মন্তব্যগুলো ছিল পুরোপুরি অচিন্তিতপূর্ব এবং অবশ্যই তা ছিল সম্পূর্ণরূপে মহরাবিহীন। তার মধ্যে থেকে এসব বুদবুদের মত স্বাভাবিক ভাবে উঠে আসত এবং এগুলো ছিল আনন্দব্যঞ্জক এবং সুখকর এবং যখনই তিনি যা কিছু বলেছেন তা ছিল খুবই অকপট, খুবই উপযুক্ত; যেকারণে সমস্ত শ্রোতাবৃন্দ সোল্লাসে হেসে উঠত। তারা তাকে ভালোবাসত। স্বনামধন্য এ লোকটিও অনুপ্রাণিতবোধ করতেন এবং অন্যদের সাথে সেই মজার সময়টুকু উপভোগ করতেন।

অবশেষে তিনি সেই বৃদ্ধলোকটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কেন আপনি এত উল্লসিত ছিলেন। 'নিশ্চয়ই আপনার এই আনন্দ উল্লাসের পেছনে বিস্ময়কর এবং গোপন কোন কারণ আছে।"

'না' সোজাসুজি জবাব দিলেন বুড়া, "বড় ধরণের গোপন রহস্য এর পেছনে নেই আমার।” আপনার মুখের উপর যেমন একটি মার্ক আছে থাকাটা যেমন স্বাভাবিক আমার ব্যাপারটিও তেমনি স্বাভাবিক। সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, একটি ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন তিনি, "আমার দুটো জিনিস পছন্দ আছে, হয় সুখি হব, না হয় অসুখি হব। এবং আপনার কি মনে হয়; আমি কোনটা হব? অবশ্যই আমি সুখি হওয়াকেই পছন্দ করব, এবং আমার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণই আছে।

এই যে ব্যাপারটি; তা মনে হতে পারে অতিমাত্রা সাধারণ এবং এও মনে হতে পারে যে, বুড়া হয়ত ভাসা ভাসা প্রকৃতির এক মানুষ, কিন্তু আমার মনে পড়ে যে আব্রাহাম লিংকনকে নিশ্চয়ই এমন ভাসা ভাসা অর্থাৎ অগভীর প্রকৃতির লোক বলে অভিযুক্ত করবে না, কারণ তিনি ও বলেছিলেন, “জনগণ মনে মনে যতটা সুখি হতে চাইবেন প্রায় ঠিক ততটাই সুখি হতে পারবেন।" যদি আপনি চান তাহলে আপনি সুখি হতেই পারেন। কোনোকিছুকে কোন বিশেষ গুণে বিভূষিত করা এ দুনিয়াতে সচেয়ে সোজা কাজ। অসুখি হবেন ঠিক এমন একটি সিদ্ধান্ত নিন। চারিদিকে যান, একে ওকে বলেন যে, আপনার কিছুই ভালো যাচ্ছে না, কোন কিছুতেই সন্তুষ্টি নেই আপনার এবং এতে আপনার অসুখি হওয়া নিশ্চিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আপনি এমন কথা বলেন, “সবকিছু সুন্দরই যাচ্ছে। জীবনটা বেশ ভালো সুখ আমি পছন্দ করি।” এবং আপনি তাতে আপনার পছন্দ করা চাওয়াটা পাওয়ার জন্য পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে সুখের ব্যাপারে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক যদি তার মধ্য বয়স বা বৃদ্ধা বয়সে একজন কম বয়সের ছেলে বা মেয়ের প্রাণবন্ত ভাবটি গ্রহণ করতে পারে তাহলে তিনি হবেন একজন বিশিষ্ট লোক, কারণ তিনি সত্যিকারের সুখি বা প্রাণবন্ত মন মানসিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন। যার সাথে বিধাতা প্রদত্ত যৌবন সংযুক্ত হয়েছে। যীশুখ্রিস্টের দেয়া সুক্ষ ব্যাখ্যাটি স্মরণীয়, কারণ উনি আমাদের বলছেন যে “পৃথিবীতে তোমরা শিশুর মত হৃদয় ও মন নিয়ে বেঁচে থাক।” আবার অন্যভাবে বলেছেন, কখনও বৃদ্ধ বা নিরুৎসাহ বা শ্রান্ত হবে না। অতিমাত্রায় সংসারাভিজ্ঞ হতে যেয়ো না।"

আমার ছোট্ট মেয়ে এলিজাবেথ, নয় বছর বয়স সুখ সম্বন্ধে তার ধারণাটি কেমন দেখুন। একদিন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, "মিষ্টি মেয়ে বলত তুমি কি সুখি?” জবাবে সে বলল, “অবশ্যই আমি সুখি।”

আবার তাকে জিজ্ঞাস করলাম, “তুমি কি সবসময় সুখি?” “অবশ্যই আমি সবসময়ই সুখি।” দ্বিধাহীন জবাব।

আমি জানতে চাইলাম, কি তোমাকে সুখি করে?

কেন সুখি তা আমি জানিনা, তবে আমি ঠিকই সুখি। আমি জোর দিয়েই বললাম, অবশ্যই কিছু না কিছু আছে যা তোমাকে সুখি করে।

সে বলল, “বেশ আমি তোমাকে বলছি কিভাবে আমি সুখি। আমার খেলার সাথীরা আমাকে সুখি করে। আমি তাদের পছন্দ করি। আমার স্কুল আমাকে সুখি করে। তাই প্রতিদিন স্কুলে যেতে ভালো লাগে আমার "(আমি তাকে কিছুই বলিনি। কিন্তু সে কখনই তা আমার কাছ থেকে শুনত না "আমি আমার শিক্ষকদের পছন্দ করি। গীর্জায় যেতে ভালো লাগে আমার রবিবারের স্কুল এবং সেখানকার শিক্ষকদের ভালো লাগে আমার, আমার বোন মার্গারেটকে ভালোবাসি, আমি এবং ভাই জনকেও আমি ভালোবাসি। আমি আমার বাবা মাকেও ভালোবাসি, তারা আমার যত্ন নেন। অসুস্থ হলে ও আমার যত্ন নেন তারা এবং তারা আমাকে ভালোবাসে এবং তারা আমার খুব প্রিয়।”

এ হলো এলিজাবেথের সুখি হবার মূলসূত্র এবং আমার মনে হয় সে যা যা বলেছে অর্থাৎ তার খেলার সাথীরা, স্কুল, রবিবারের স্কুল তার শিক্ষকরা, গীর্জা ভাই, বোন বাবা মায়ের সেবা যত্ন, ভালোবাসা এসব কিছুই তার সুখি হবার উৎসগুলোর মধ্যেই নিহিত। আপনার জীবনের সর্বোচ্চ সুখকর সময়।

একদল ছেলেমেয়েকে বলা হয়েছিল যে, যে বিষয়গুলো তোমাদের সবচেয়ে সুখি করেছিল তার একটা তালিকা তৈরি করার জন্য। তাদের জবাবগুলো ছিল মনে বেশ দাগ কাটার মত।

ছেলেদের তালিকাটা এখানে তুলে দেয়া হল একটি দোয়েল পাখি উড়ছে তাকিয়ে আছে গভীর স্বচ্ছ পানির নীচে, পানি কেটে চলছে নৌকা ধনুক রেখা এঁকে, দ্রুতগতি রেলগাড়ি ধেয়ে চলছে সম্মুখে; নির্মাণ কাজের ক্রেনটি উত্তোলন করছে ভারি কোন বস্তু, এবং আমার পোষা কুকুরের দুটো চোখ।

এখানে তুলে দেয়া হলো মেয়েরা কেমন করে সুখি হয়েছিল সেই তালিকাঃ নদীর পানিতে রাস্তার বাতির প্রতিফলন; গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে দেখা লাল লাল দালানকোঠার ছাদ চিমনী হতে উর্ধ্বে ওঠে আসা ধোঁয়া। লাল মখমলের কাপড় মেঘেঢাকা চাঁদ, কখনও আড়ালে কখনও আধখোলা মুখে উঁকি মারছে এ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের অসাধারণ সুরভির মধ্যে দারুণ কিছু একটা আছে। যা ওরা এসবের মধ্যে প্রকাশ করেছে, যদিও প্রকাশটা আধো আবরণে ঢাকা তবুও সুন্দর। তাই বলি যদি একজন সুখি মানুষ হতে চান তবে একটি পরিচ্ছন্ন আত্মাকে ধারণ করুন, ধারন করুণ সুন্দর দুটি চোখ। যা সাধারণ জায়গায় দেখতে পায় মনোহর কিছু, দেখতে পায় শিশুর সরলচিত্ত এবং আধ্যাত্মিক সরলতা।

আমাদের অনেকেই নিজেদের সুখ নিজেরাই প্রস্তুত করে। অবশ্য সব সুখই যে নিজেদের তৈরি তা নয়, সামাজিক অবস্থাও আমাদের বেশকিছু দল সুখই ওশি দুঃখ কষ্টের জন্য দায়ী। তবে এখনও এটা সত্যি যে, বহুলাংশে আমাদের চিন্তাশক্তি এবং মনোভাব যা আমরা আমাদের জীবন উপকরণ থেকে একটু একটু করে বের করে আনি তা আমাদের জন্য সুখপ্রদও হতে পারে আবার অসুখপ্রদও হতে পারে।

'পাঁচজন মানুষের মধ্যে চারজন মানুষই খুব একটা সুখী নয় যেমনটা তারা হতে পারে,' এ ধারণাটি ঘোষণা করে একটি বিখ্যাত লেখক এবং তিনি আরো বলেন, “সুখহীনতা হল মনের সবচেয়ে স্বাভাবিক একটি অবস্থা।"

একথা বলতে আমি দ্বিধাবোধ করব যে, মানুষের সুখবোধ এত নীচুস্তর পর্যন্ত আঘাত করতে পারে কিনা কিন্তু আমি অবশ্যই দেখতে পাই যে, আমি যতটুকু হিসাব করতে উদ্বিগ্নবোধ করি তার থেকে বেশিসংখ্যক লোক অসুখি জীবন যাপন করছেন। যেহেতু প্রতিটি মানুষের মৌলিক ইচ্ছা হল সুখের অবস্থায় থাকা কিন্তু তার জন্যতো কিছু করতে হবে। সুখি অবস্থা কার্যে পরিণত করা সম্ভব এবং সুখ পাওয়ার পদ্ধতি জটিল কিছু নয়। যে কেউ যদি সুখ পাবার বা সুখি হবার বাঞ্চা করে এবং যে সঠিক পদ্ধতি শেখে এবং সঠিক সূত্র প্রয়োগ করে সে সুখি হতে পারে।

একবার রেলগাড়ির ভোজনকক্ষে স্বামী স্ত্রী যুগলের বরাবর বসেছি এরা আমার কাছে অপরিচিত। মহিলাটি বহুমূল্যবান পোষাকে সজ্জিত, যেমন সুক্ষ পশুলোম হীরক এসব দ্রব্যে কারুকাজ খচিত পোষাক মহিলা পরেছিলেন কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হল অশান্তিতে সময় কাটছে মহিলার। বেশ জোরে জোরেই মহিলা সোজা সাপটা বলে দিলেন যে, গাড়িটা নোংরা এবং ঠাণ্ডা খাদ্য পরিবেশন একেবারে খারাপ, খাবার দাবারে কোন স্বাদগন্ধ নেই। নানানরকম নালিশ টালিশ করে সবকিছুর জন্য খুব বিরক্তি প্রকাশ করলেন।

কিন্তু অন্যদিকে তার স্বামী লোকটি কিন্তু সহানুভূতি সম্পন্ন অমায়িক এবং শান্তিপ্রিয় লোক। সুস্পষ্টভাবেই এটা বোঝা যায় যে, যা যেমন এসেছে উনি তার সবই সহজে মেনে নিতে পারছেন। আমার মনে হল যে তার স্ত্রীর এমন জটিল মনমানসিকতায় তিনি বিব্রতবোধ করছিলেন এবং কিছুটা হতাশও বোধ করছিলেন। যেহেতু তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন।

আলাপচারিতা পরিবর্তন করার জন্য তিনি জানতে চাইলেন আমি কিসের সাথে জড়িত তারপর নিজের সম্পর্কে বললেন, উনি একজন আইন ব্যবসায়ী। তারপরই বড় একটা ভুল করে ফেললেন তিনি, দেঁ তো হাসি হেসে বললেন, তার স্ত্রী শিল্পসামগ্রী উৎপাদনের ব্যবসার সাথে জড়িত। বিস্মিত হবার মত ব্যাপার ছিল যে তাকে দেখে আমার মনে হয়নি তিনি শিল্পপতি বা সহকারী হবার মত কেউ একজন তাই জানতে চাইলাম: "উনি কি তৈরি করেন।" "অসন্তুষ্টিতে” তিনি জবাব দিলেন। "উনি নিজেই নিজের অসন্তুষ্টি উৎপাদন করেন।"

বরফের মত ঠাণ্ডা হওয়া সত্যে ও অবিবেচনাপ্রসূত এই ব্যাপারটি যেন টেবিলের উপর স্থির হয়ে পড়ল। তার এই বিজ্ঞ মন্তব্যে আমি কতার্থ হয়েছিলাম। কারণ ঐ মন্তব্য এটাই বলে দেয় যে, “অসংখ্য লোক তো তাই করে। তারা নিজেরাই তাদের অসন্তুষ্টি উৎপাদন করে"।

এটা আরো দুঃজনক বিষয় যে, মানুষের মনই অনেক সমস্যার জন্ম দেয় এবং তা আমাদের সুখকর অবস্থাকে এত দুর্বল করে দেয় যে, পরবর্তীতে বোকার মত আমরা নিজেরাই মনে আরো অসন্তুষ্টি জমা দিয়ে দিয়ে থাকি। নিজেদের অজস্র কষ্ট ক্লেশের সাথে কেমন বোকার মত আমরা আমাদের ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি আরো বেশি করে তৈরি করি। যার উপর হয়ত সামান্য বা কোনরকম নিয়ন্ত্রণই নেই আমাদের।

নিজেদের অসন্তুষ্টি বৃদ্ধির যে পথ মানুষ অবলম্বন করে সেদিকে জোর না দিয়ে আসুন আমরা বরং সেই পথ ও পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হই। যার মাধ্যমে আমাদের দুঃখ কষ্ট অবসানের দিকে চিন্তা ভাবনা করেই আমাদের নানাবিধ অসন্তুষ্টি তৈরি করছি। একধরণের বিরূপ মনোভাব পোষণ করা আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেমন আমাদের এমন একটি অনুভূতি আছে যে, সবকিছুই খারাপ দিকে যাচ্ছে অথবা অন্যদের সম্বন্ধে ভাবি যে, ওরা যা পাবার উপযুক্ত নয় তাই ওরা পেয়ে যাচ্ছে এবং আমরা যা পাবার যোগ্য তা আমরা পাচ্ছি না। আমরা আমাদের দুঃখ কষ্টকে একটু একটু করে পরিপূর্ণ করে ফেলছি আমাদের চেতনাকে নানারকম বাজে অনুভূতির দ্বারা। যেমন, বিদ্বেষ, বাজে ইচ্ছা এবং ঘৃণা প্রকাশ দ্বারা অসন্তুষ্টি উৎপাদনকারী পদ্ধতি সবসময় ভয় এবং বিরক্তি উৎপাদনকারী উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার তৈরি করে। এসব বিষয়গুলো এই বইয়ের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে। আমরা শুধুমাত্র বর্তমান সময়কেই নির্দেশ করতে চাই, এবং প্রচণ্ড জোর দিয়ে বলতে চাই যে, মেটিামুটি ভাবে সবার মধ্যে আনুপাতিকভাবে সুখহীনতার যে বিরাট অস্তিত্ব বর্তমান তার সবটাই নিজেদের তৈরি। তাহলে কিভাবে আমরা সুখহীনতার জায়গায় সুখি হবার মত অবস্থা তৈরি করতে পারবো। আমার রেলগাড়িতে ভ্রমণের এক ঘটনা থেকে এর একটি সদুত্তর পাওয়া যেতে পারে। একদিন সকালে একটি সেকেলে ধরনের পুলম্যান করে আমরা প্রায় মোটামুটি আধডজন লোক পুরুষদের বিশ্রাম কক্ষে বসে দাড়ি সেভ করছিলাম। সবসময়ই রেলগাড়ির এমন একটি আটসাট এবং জনার্কীন কক্ষে রাত্রি পার করার পর; এই আগন্তক দলটির একটু উল্লসিত হবার কোন ইচ্ছা ছিল না; এদের মধ্যে সামান্য কথাবার্তা চলছিল এবং বেশির ভাগ বিড় বিড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এরপর এক লোক মুখে বিস্তৃত হাসি নিয়ে এসে কক্ষে প্রবেশ করলেন। উৎফুল্লমনে সুপ্রভাত বলে সবাইকে অভিবাদন জানালেন, কিন্তু সবাই তার প্রতি কোন আগ্রহ না দেখিয়ে বরং কিছুটা ক্রোধান্বিত ভাবই দেখালেন। যখন তিনি সেভ করতে যাচ্ছিলেন সম্ভবত একেবারেই অসতর্কভাবে হালকা ফুড়ফুড়ে মনে গুণ গুণ করে গান গাইছিলেন। এতে কিছু লোকের তন্দ্রীতে যেন একটু ঘা পড়ল। শেষমেশ তো একজন কিছুটা বিদ্রূপের সাথে বলেই ফেলল, "আজকের সকালে আপনাকে খুব খুশি মনে হচ্ছে! এত খুশি হবার কারণটা কী?”

“হ্যাঁ,” লোকটি জবাবে বললেন, “সত্যি কথা কি, আমি খুশি। আমি অবশ্যই উৎফুল্ল বোধ করছি।” তারপর আবার বললেন, "খুশি হবার ব্যাপারটা আমি অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছি।” লোকটি যা বললেন তাতো ছিল এই কিন্তু আমি নিশ্চিত যে বিশ্রামকক্ষের সবকজন লোক মনে মনে ঐ মজার কথা গুলো গেঁথে নিয়েই ট্রেন ছেড়েছেন। 'খুশি হবার ব্যাপারটিকে আমি অভ্যাসে পরিণত করেছি।'

ভাবতে গেলে এ উক্তিটি খুবই গভীর কারণ, সুখি হওয়া বা দুঃখী হওয়াটা নির্ভর করে আমাদের মনের মধ্যে যে অভ্যাসের আবাদ আমরা করি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রার উপর। সারগর্ভ বাণীর যে সংগ্রহশালা, অর্থাৎ বাণী চিরন্তনী আমাদের বলে যে... "যার একটি হৃষ্টচিত্ত আছে তার আছে নিরন্তর আনন্দ।” (Proverbs XV.15) অন্যভাবে বলতে গেলে, হৃষ্ট চিত্ত ধরে রাখার আবাদ বা চর্চা করুন দেখবেন জীবন নিরন্তর আনন্দে ভরে ওঠেছে, তার মানে হল যে, আপনি প্রতিদিনই সুন্দর জীবন উপভোগ করতে পারবেন। সুখি অবস্থার অভ্যাস করনের মধ্যে দিয়েই এসে উপস্থিত হয় সুখি জীবন এবং যেহেতু আমরা অভ্যাসের চর্চা বা আবাদ করতে পারি, কাজেই নিজেদের সুখ নিজেরাই তৈরি করার ক্ষমতাও আমাদের আছে।

সুখি হবার অভ্যাসটি আরো উন্নত হতে পারে শুধুমাত্র সুখচিন্তনের অনুশীলনের মাধ্যমে। প্রথমে সুখচিন্তনের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন এবং প্রতিদিন কয়েকবার তা মনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত করুণ। যদি কোন একটি অসুখপ্রদ চিন্তা আপনার মনের ভেতর ঢুকে পড়ে অনতিবিলম্বে তা থামিয়ে দিন। সচেতনভাবেই তাকে মন থেকে দূর করে দিন এবং সকালে বিছানা ছাড়ার আগে, বেশ আয়েশ করে শুয়ে থাকুন এবং ধীরে ধীরে একটু একটু করে সুখচিন্তা আপনার সচেতন মনে বর্ষণ করতে থাকুন। সারাদিনে পেতে পারেন এমন সব সুখপ্রদ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক ছবি আপনার মনের উপর দিয়ে পরিচালিত করুন। এর আস্বাদন নিন। এধরনের চিন্তাগুলোর এভাবেই সুন্দর কিছু উৎপন্ন করতে বিশেষ সহায়ক হবে। এটা কখনই মনে গেঁথে বসতে দেবেন না, যে আজ আমার দিনটি ভালো যাবে না। কেবলমাত্র একথাটি দৃঢ়চিত্তে বলুন যে, আসলেই আমি সুখি হতে পারি। ছোট বড় সবধরনের হেতু বা কারণের সিন্ধান্ত নিজে নিন, দেখবেন অসুখকর অবস্থার বিষয় তা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। এর ফলস্বরূপ দেখবেন যে, আপনি নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করছেন; “আমার সবকিছুই খারাপ যাচ্ছে কেন? সব ব্যাপারই এমন কেন হচ্ছে?"

আপনার মননে একটি দিন আপনি কিভাবে শুরু করলেন, কার্যকরণ কিন্তু সরাসরি সেই পদাঙ্কই অনুসরণ করবে।

তারচেয়ে আপনি কাল আবার এই পরিকল্পনাটি নিয়ে চেষ্টা চালান। সুখন আপনি ঘুম থেকে ওঠেন তখন জোরে এই বাক্যটি তিনবার বলেন, "আজকের এই দিনটি বিধাতার সৃষ্টি; এই দিনটিতে আমি আনন্দে উল্লাসিত হব।” কেবলই আত্মস্থ হোন এবং বলুন এই দিনটিতে আমি আনন্দে উল্লাসিত হব। জোর দিয়ে পরিস্কার কণ্ঠে এবং নিশ্চয়তার ভাব নিয়ে জোরালোভাবে বার বার এই উক্তিটি অবশ্যই বাইবেলে উল্লিখিত এবং এটি একটি চমৎকার দুঃখনাশক ব্যবস্থা। প্রাত ভোজের আগে আপনি যদি এই উক্তিটি পুনপুন তিনবার বলেন এবং এর যা অর্থ তার উপর ধ্যান করেন, তাহলে ঐ দিনটির ধাত বদলে দিয়ে একটি সুন্দর মনস্তাত্বিক অবস্থা নিয়ে আপনি দিনটি শুরু করতে পারবেন।

কি কাপড় পরার সময়, কি সেভিং এর সময় কি প্রাতঃভোজনের সময়, নিম্নে উল্লেখিত কয়েকটি শব্দ জোরে জোরে বলুন, "আমি বিশ্বাস করি যে, আজকের দিনটি চমৎকার কাটতে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি যে আজকের সমস্ত সমস্যা আমি স্বর্থকরূপে সমাধান করতে পারব। স্বাস্থ্যগতভাবে মানসিকভাবে এবং আবেগের দিক থেকেও আমি আজ ভালো কাটাব। বেঁচে থাকাটা সত্যিই বিস্ময়কর। আমার যা যা ছিল তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ এবং এখন যা যা আছে তার সবকিছুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ এবং আগামীতে যা যা আমি পাব তার জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। কোনকিছুই আমা থেকে সরে যাচ্ছে না। সৃষ্টিকর্তা আমার সাথে সাথেই আছেন এবং তিনি আমাকে সবসময় দেখাশুনা করবেন। সমস্ত ভালোর জন্য তাকে ধন্যবাদ।

একসময় আমি এক অসুখি প্রকৃতির লোককে চিনতাম যে সবসময় প্রাতঃভোজনকালে তার স্ত্রীকে বলতেন, আর একটি কঠিন দিন কাটাতে যাচ্ছি। এটা যে তিনি আসলেই ভাবতেন তা নয়, কিন্তু এটা ছিল তার একটি মানসিক ছলের মতই, যাদ্বারা; যদি তিনি বলতেন যে আর একটি খারাপ দিন কাটাতে যাচ্ছি হয়ত দেখা যেতো যে ঐ দিনটি সুন্দরভাবেই কেটে যেতে পারতো। আসলে কিন্তু দিনটি তার শুরু হয়েছিল বাঝে ভাবেই, তাতে কিন্তু বিস্মিত হবার কিছুই ছিল না। কারণ যদি আপনি মনশ্চক্ষুতে দেখেন এক অসুখপ্রদ একটি ফল সম্বন্ধে নিশ্চিত হন, তবে তা দ্বারা আপনি ঠিক তেমন বাজে অবস্থার দিকেই বেঁকে পড়ছেন। কাজেই এর উল্টোটা করুণ, প্রতিদিনের শুরুতে এটাই ভাবুন যে আজকের দিনের ফলটি হবে সুখপ্রদ, এবং আপনি বিস্মিত হবেন এই দেখে যে সত্যি সত্যি কত ভালো কিছুই ঘটছে এ দিনটিতে।

কিন্তু এটা এমনি এমনি প্রয়োগ করলে হবে না, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও নিশ্চয়তাজ্ঞাপক চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে একে প্রয়োগ করতে হবে যেমনটা আমি আপনাদের পরামর্শ দিয়েছি, নচেৎ সারাদিন ব্যাপী আপনিও আপনর কাজের এবং মনোভাবের উপর সুখি ভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক নীতিগুলোকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করুন।

এমনই একটি অতি সাধারণ এবং মূল নীতি হল মানুষের অকাট্য ভালোবাসা এবং শুভেচ্ছা। আন্তরিক, সহানুভূতি প্রকাশের এবং কোমলতা প্রকাশের মধ্যে কি বিস্ময়কর সুখ রয়েছে তা সত্যি মুগ্ধ হবার মত। আমার বন্ধু ডা. স্যামুয়েল সুমেকার একবার তার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর ভ্রমণ গাঁথা লিখলেন ইয়াং নাম্বে বন্ধুটি নিউইয়র্কের গ্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের রেলস্টেশনে ৪২ নম্বর পোর্টার হিসেবে সুখ্যাত । জীবিকার জন্য যাত্রীদের ব্যাগ বয়ে থাকে কিন্তু তার আসল কাজ ছিল বিশ্বের বৃহত্তম রেলওয়ে স্টেশনগুলোর একটিতে পোর্টার হিসেবে খ্রিস্টীয় মনোভাক নিয়ে বেঁচে থাকা। যখন সে কোন লোকের সুটকেস বহন করত তখন সে তার জ্যাথে খ্রিস্টান সূলভ সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করত। সে খুব সতর্কভাবে একজন খদ্দেরকে লক্ষ করত এটাই নিরীখ করার জন্য যে, যদি তাকে আরো সাহস এবং আশাভরসা দেয়া যায়। আর এ বিষয়ে কিভাবে অগ্রসর হতে হবে সেদিক থেকে সে ছিল খুবই নিপুন।

উদাহরণ স্বরূপ একদিন এক ছোটখাটো বৃদ্ধা মহিলা তাকে ট্রেনে তুলে দিতে অনুরোধ করলেন। বৃদ্ধাটি ছিলেন একটি হুইল চেয়ারে। কাজেই তিনি তাকে এলিভেটরে উঠালেন। যখন সে তাকে হুইল চেয়ারে করে এলিভেটরের ভেতর নিয়ে যায় তখন লক্ষ করল যে বৃদ্ধার চোখে পানি। এলিভেটর যখন নীচে নামলো র‍্যালস্টোন ইয়াং সেখানে দাঁড়ালো, তার চোখ বন্ধ করলো এবং বিধাতার উদ্দেশ্যে বলল, কিভাবে এ বৃদ্ধাকে সে সাহায্য করতে পারে, এবং বিধাতা তাকে একটি পথ দেখালেন। যখন তাকে নিয়ে এলিভেটরে রাখল, তারপর বলল, "ম্যাম যদি কিছু মনে না করেন তা হলে একটি কথা বলি, এবং তা হলো অত্যন্ত সুন্দর একটি টুপি আপনি পরে আছেন। তিনি চোখ ফিরে তাকালেন র‍্যালের দিকে এবং বললেন, তোমাকে ধন্যবাদ।

"এবং আমি বলতে পারি, আপনি যে পোষাকটি পড়ে আছেন তাও অনেক সুন্দর, আপনার এ পোষাকটি আমার খুবই পছন্দ।”

একজন মহিলা হওয়াতে, আমার কথাগুলো খুবই মনে ধরল তার এবং তার ভালো লাগছিল না। তা সত্যেও তিনি খুশি হয়ে উঠলেন এবং জানতে চাইলেন, আমার এসব জিনিস খুব সুন্দর কেন তুমি আমাকে বলছ? তোমার কথাগুলো আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।

“বেশ, তাহলে বলছি, "আমি লক্ষ করলাম যে আপনি বেশ দুঃখিনী, দেখলাম যে আপনি নীরবে কাঁদছেন, এবং আমি বিধাতার কাছে জানতে চাইলাম যে, কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।” বিধাতা বললেন, “তার কাছে তার টুপির কথা বল।" "আর পোষাক সম্বন্ধে যে উল্লেখ করা হল তা নিজস্ব পরিকল্পনা থেকে করা হল।"

র‍্যালস্টোন তখন জিজ্ঞেস করলেন, এখন কি আপনার ভালো লাগছে না?

“না” তিনি জবাব দিলেন। "অনুক্ষণ আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি কখনও এ থেকে রেহাই পাইনি। মাঝে মাঝে আমি ভাবি এর বিরুদ্ধে আমি রুখে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি কোনভাবে বলতে পার যে, সারাক্ষণ মনে কষ্ট থাকলে তার অর্থ কি দাঁড়ায়।

র‍্যালস্টোন এর জবাবে বলল, "হ্যাঁ ম্যাম, আমি পারি, কারণ আমার একটি চোখ আমি হারিয়েছি, এবং তপ্ত লোহার মত আমাকে সারাদিন কষ্ট দেয়।"

"কিন্তু তোমাকে দেখে এখন সুখিই মনে হয়। কিভাবে তা সম্ভব করেছ?

ইতোমধ্যে মহিলা ট্রেনে তার আসন করে নিয়েছেন এবং আমি বললাম শুধুমাত্র প্রার্থনার সাহায্যে, ম্যাম, শুধুমাত্র প্রার্থনার সাহায্যে।

নরম গলায় মহিলা বললেন, শুধুমাত্র প্রার্থনার সাহায্যে তোমার কষ্ট চলে গেল?

“বেশ, জবাব দিল র‍্যালস্টোন, "হয়ত সবসময়ই তা হয় না। আমি বলতে পারি না যে তা হয়-ই কিন্তু তা সবসময় আপনাকে আপনার প্রচণ্ড কষ্টকে জয় করতে শক্তি যোগাবে। আপনি শুধু প্রার্থনারত থাকুন, ম্যাম, এবং আমিও আপনার জন্য প্রার্থনা করব।"

এই সময়টায় তার চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, এবং তিনি সুন্দর হাসি মাখা মুখে র‍্যালস্টোনের দিকে তাকালেন, তার হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলেন এবং বললেন, তুমি আমার জন্যে অনেক ভালো কিছু করলে।” একটি বছর পার হয়ে গেল, এবং একরাতে গ্রান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনে র‍্যালস্টোন ইয়ং ভৃত্যটি ইনফরমেশন বুথে এলো। একজন যুবতি সেখানে অপেক্ষারত ছিলেন এবং বললেন, "আমি এক মৃতের কাছ থেকে একটি সংবাদ তোমার জন্য এনেছি। মৃত্যুর আগে আমার মা তোমাকে খুঁজে বের করতে বলেছেন এবং তোমাকে বলতে বলেছেন যে, গতবছর তুমি যখন তাকে হুইল চেয়ারে করে ট্রেনে তুলে দিয়েছিলে তখন তুমি তাকে কতখানি সাহায্য সহযোগিতা করে ছিলে। এমন কি পরলোক থেকেও তিনি সবসময় তোমাকে স্মরণ করবেন। তিনি তোমাকে এজন্য স্মরন করবেন কারণ তুমি তার প্রতি দয়া ও ভালোবাসা দেখিয়েছিলে এবং তুমি তার কষ্ট বুঝতে পেরেছিলে।” কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটির চোখ থেকে পানি ঝরছিল। এবং দুঃখে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো।

র‍্যালস্টোন শান্তভাবে তাকে লক্ষ্য করছিল। তারপর বলল, "কাঁদবেন না, মিসি, কাঁদবেন না। কান্নাকাটি করা ঠিক নয়, তারচেয়ে বিধাতাকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রার্থনা করুন।"

কিছুটা বিস্মিত হয়ে মেয়েটি বলল, "কেন আমি ধন্যবাদ দিয়ে প্রার্থনা করব?" 'কারণ, অনেক মানুষই আপনার থেকে কম বয়সে মা বাপ হারিয়ে এতিম হয়েছে। আপনি অনেক অনেকদিন আপনার মাকে সাথে পেয়েছেন, তাছাড়া আপনি এখনও তাকে সাথে পাচ্ছেন। আপনি আবার তাকে দেখতে পাবেন। তিনি আপনার কাছাকাছিই আছেন এবং সবসময় আপনার কাছাকাছিই থাকবেন। র‍্যালস্টোন আরো বলল, হয়ত, ঠিক এই মুহূর্তে তিনি আমাদের সাথেই আছেন আমাদের দুজনের সাথেই যখন আমরা কথা বলছি।

ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ থেমে গেল মেয়েটির, শুকিয়ে গেল চোখের পানিও। মায়ের মনে যেমনটি হয়েছিল ঠিক তেমনিভাবে র‍্যালস্টোনের মায়াজর কথা তার মেয়ের উপরও একই প্রভাব ফেলল। এতবড় স্টেশনে হাজারো মানুষের চলাচলের মধ্যে ঐ দুজন একজনের উপস্থিতি উপলব্ধি করছে যিনি আশ্চর্য্য ঐ ভুত্যকে অনুপ্রাণিত করেছেন চারিদিকের মানুষগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ছড়াতে।

টলষ্টয় বলেছেন, "কোথায় ভালোবাসা ঈশ্বর” “ঈশ্বর নিজেই ভালোবাসা” এবং আমরা আরও একটু বাড়িয়ে বলতে পারি, যেখানে ঈশ্বর আছে আর ভালোবাসা আছে, সেখানে আনন্দও বিরাজমান। কাজেই সুখ পাবার প্রধান এবং বাস্তব নিয়ম হল ভালোবাসার চর্চা করা।

আমার এক সত্যিকারের সুখি বন্ধু এইচ, জি, ম্যাটার্ন, উনার স্ত্রীও সমান সুখি মহিলা, স্বামীর কাজের সুবাদে দুজনেই সারাদেশ ঘুরে বেড়ান। মি. ম্যাটার্ন সাথে করে বয়ে বেড়ান তার অসাধারণ বিজনেস কার্ডটি যার উল্টো পিঠে কিছু দার্শনিক তত্ব লিখা আর এ লিখা তার এবং তার স্ত্রীর জীবনে নিয়ে এসেছে অনাবিল আনন্দ, এমন কি আরো শত শত সৌভাগ্যবান মানুষের জীবনেও; যারা এই দুই ব্যক্তিত্বের সাচর্যে এসেছেন এবং একাত্ব অনুভব করেছেন।

কার্ডে লিখা কথাগুলো এরকম, "সুখি হবার পথ” 'ঘৃনাবোধ থেকে এবং উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে আপনার হৃদয়কে মুক্ত রাখুন। সহজ সরল জীবন যাপন করুন। আশা করুন অল্প কিন্তু দান করুন বেশি। ভালোবাসা দিয়ে জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করুণ। হৃদয় থেকে সূর্যের মত জ্যোতি চারিদিকে ছড়িয়ে দিন। নিজের স্বার্থ ভুলে অপরের মঙ্গল চিন্তা করুন। অপরের প্রতি তেমন কিছু করুন যেমনটা নিজের জন্য আশা করেন। সপ্তাহখানেক এমনটি যাচাই করে দেখুন। দেখবেন বিস্মিত হবার মত কিছু ঘটে গেছে।'

একথা গুলো যখন আপনি পড়েন তখন হয়ত বলতে পারেন, 'এর মধ্যে নতুন কিছুই নেই।' প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে নতুন কিছু আছে, যদিনা আপনি কোনদিন পরীক্ষা করে থাকেন তবে কেমন করে তা বুঝবেন।

যখন আপনি বিষয়টি শুরু করবেন দেখবেন এটি একেবারে নতুন তরতাজা, সুখের। সবচেয়ে অবাক করে দেবার মত, এবং সাফল্যজনকভাবে বেঁচে থাকার একটি সুন্দর পদ্ধতি যা আপনি কখনই প্রয়োগ করে দেখেননি।

আর যদি জীবনে তা প্রয়োগই করে না থাকেন তাহলে সারাজীবন এসব মৌলিক নীতিমালা শুধু শুধু জেনে কি লাভ! এমন অদক্ষতা ও অযোগ্যতার সাথে বেঁচে থাকা সত্যিই দুঃখজনক। কারণ একবার এক লোক যে নাকি সারাজীবন গরীবির মাঝে কাটিয়েছে যদি সহসা তার দরজার সিড়ির সামনে স্বর্ণ দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে তার জীবনের এমন শুরুটা বুদ্ধিদীপ্ত নয়। এই সহজ সরল দর্শনই হলো সুখি হবার পথ। মাত্র একটি সপ্তাহ আপনি এই নিয়ম নীতিটা অনুশীলন করুন যেমনটা মি. ম্যাটার্ন পরামর্শ দেন, আর যদি দেখেন যে এতে প্রকৃত সুখ আপনার জীবনে বয়ে আনলো না। তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার অসুখি কারণটা আসলে বহু গভীরে বিদ্যমান।

অবশ্যই সুখি হবার নিয়মাবলীকে শক্তি দেবার জন্য এবং প্রদেয় কাজ করতে দেবার জন্য মনের প্রাণবন্ত গুণাবলীর মাধ্যমে উচিত ওগুলোকে সহযোগিতা দেয়া। আপনি সম্ভবত শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক শক্তি বা আধ্যাত্মিক নীতিমালাকে কার্যকরী ফলাফল নিশ্চিত করতে পারেন না।

যখন কোন ব্যক্তি আভ্যন্তরীনভাবে কার্যকরী আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনার অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন সুখি হবার ধারণাগুলো প্রাপ্তি অসাধারণভাবে তার কাছে সহজ হয়ে যায়। যদি আপনি আধ্যাত্মিক নীতিমালুগালোকে ব্যবহার করতে শুরু করেন কোন প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই, তথাপি আপনি ধীরে ধীরে আভ্যন্তরীনভাবে আধ্যাত্মিক শক্তি উপলব্ধি করতে পারবেন। আমি আপনাকে নিশ্চিত বলতে পারি যে, সুখের প্রচণ্ডতম আকস্মিক অনুভূতি আপনি এথেকে পাবেন, যা কোনদিন আপনি উপলব্ধি করেন নি। আর এই সুখানুভূতি আপনার সাথে সাথেই থাকবে, যতদিন আপনি সৃষ্টিকর্তাকে মনের কেন্দ্রে স্থাপন করে জীবন কাটাবেন।

যখন দেশের এদিক সেদিক ভ্রমণ করছিলাম তখন ক্রমবর্ধণশীল সত্যিকারের সুখি মানুষদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। এ বইতে লিখিত নীতিসমূহ এবং অন্যান্য বইতে যেসব উপস্থাপন করা হয়েছে অন্যান্য লিখায় যেগুলো প্রকাশ করা হয়েছে, কথায় কথায় ও অনেক প্রকাশ করা হয়েছে এবং অন্যান্য লেখক এবং বক্তারাও ঠিক একইভাবে আগ্রহী মানুষের কাজে তা প্রকাশ করেছেন। তাদের বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ এই শিক্ষনীয় বিষয়গুলো অনুশীলন করছেন। অবাক হবার মত বিষয় হল যে অভ্যন্তরীণভাবে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা দ্বারা কিভাবে মানুষ সুখি হবার জন্য মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে সব ধরনের মানুষই সব খানে আজ এই অভিজ্ঞতা লাভ করছে প্রকৃতপক্ষে, এবিষয়টি আমাদের সময়কার একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রিয় বিস্ময়কর ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এবং এটা যদি ক্রমশ উন্নত হতে থাকে এবং এর যদি বিস্তার ঘটে, তাহলে যে ব্যক্তি এধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করবে না, সে সেকেলে হিসেবে বিবেচিত হবে এবং অনেক পেছনে পড়ে থাকবে। বর্তমান সময়ে আধ্যাত্মিকভাবে বেঁচে থাকাটা খুবই বুদ্ধিমানের কাজ।

সুখ তৈরির মত সারবস্তুর রূপান্তর সাধনের কাজে কেউ যদি অজ্ঞতা এবং অনীহা দেখায়, তাহলে বুঝতে হবে সে সেকেলের হয়ে থাকায় অভ্যস্ত। অথচ আকজাল প্রায় সর্বত্র অনেকেই সুখি হবার বিষয়টিকে উপভোগ করছেন।

সম্প্রতি কোন এক শহরে যখন আমার বক্তৃতা দেয়া শেষ হয়েছে, তখন একজন লম্বা চওড়া ও শক্ত সমর্থ লোক আমার কাছে আসেন। তিনি আমার কাঁধের উপর এমন জোরে চাপড় মারেন যে তাতে আমি প্রায় পড়েই গিয়েছিলাম। গম্ভীর গর্জন করে তিনি আমাকে বললেন, ডাক্তার সাহেব একটি দল সম্বন্ধে কিছু প্রকাশ করে দেয়াকে কেমন মনে হয় আপনার? মি. স্মিথের বাড়িতে আমাদের একটি বড় দল অবস্থান করছে, এবং আপনি সেখানে এলে আমাদের খুব ভালো লাগব। আনন্দ ঘন হৈ চৈ হতে যাচ্ছে এখানে এবং আমি মনে করি আপনার এখানে একটু ঢু মেরে দেখা উচিত।

এভাবে লোকটি আমাকে তরতাজা আমন্ত্রণ করলেন। বেশ, তবে স্পষ্টতই কিন্তু প্রচারকদের জন্য এ দলটির থেকে যে শব্দ আসছে তা যথাযথ মনে হয় না, এবং তাই আমি একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম যে, আমিও না আবার ওদের ভঙ্গিতেই খিচতে থাকি। তাই আমি ওজর আপত্তি জানাতে থাকলাম।"

'ওহ্ ছাড়ুন তো এসব।' “কোন চিন্তা নেই এটি আপনার মনের মতই একটি দল। আপনি দেখে অবাক হয়ে যাবেন; জলদি আসুন। আপনি আপনার জীবনকেই হয়ত অপছন্দ করবেন আমাদেরটা দেখে।"

তো আমি রাজী হয়ে গেলাম, এবং প্রফুল্লমনা ও তেজদীপ্ত বন্ধুটির সাথে সাথে গেলাম এবং তিনি অর্থাৎ যখনই আমি যাদের সাক্ষাতকার নিয়েছি তাদের মধ্যেই সবচেয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী একজন ব্যক্তি। শীঘ্রই আমরা একটি বড়সড় বাড়িতে এলাম। গাছ গাছালীর মধ্যে চওড়া বিস্তীর্ণ গাড়ির রাস্তা একবারে সম্মুখের দরজা পর্যন্ত চলে গেছে বাড়িটির। খোলা জানালা পথে ভেতর থেকে যে হৈচৈ এর শব্দ আসছিল। তারমধ্যে থেকে কোন প্রশ্ন কানে এলো না। তাই ধরে নেয়া যায় যে সম্পূর্ণ দলটি বেশ উন্নতি পথে এগুচ্ছিল এবং আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম এ ভেবে যে, আমি কিসের ভেতর ঢুকতে যাচ্ছিলাম। আমার নিমন্ত্রণদাতা লোকটি বেশ সারা শব্দ কারেই আমাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এলেন, এবং আমরা বেশ কিছুক্ষণ করমর্দন করতে করতেই কাটিয়ে দিলাম এবং তিনি আমাকে বিরাট এক আনন্দে উচ্চসিত দলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, এরা ছিলেন আনন্দে উল্লাসিত বিরাট এক জনতা।

মদের দোকান দেখার আশায় চারিদিকে তাকালাম। কিন্তু তার একটিও চোখে পড়ল না। যা যা ওখানে খেতে দেয়া হয়েছিল তা হলো কফি, ফলের রস দ্রাক্ষারস, স্যান্ডুইচ, এবং আইসক্রীম, কিন্তু তার পরিমাণ ছিল অনেক। আমার বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললাম, 'যে এরা এখানে এসে পৌঁছার আগে নিশ্চয়ই কোথাও থেমেছিলেন।'

মনে হলো বন্ধু লোকটি কিছুটা ধাক্কা খেলেন এবং বললেন, কোথাও থেমেছিলেন মানে? কেন আপনি বুঝতে পারছেন না, এই লোকগুলো তাদের সঠিক জীবনীশক্তি পেয়েছে, কিন্তু তেমন জীবনীশক্তি নয় যেমনটা আপনি ভাবছেন। আপনার কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি আপনি কি বুঝতে পারছেন না যে কি কারণে এই লোকগুলো এত খুশি? তারা তাদের আধ্যাত্মিকতা নবায়ন করেছে। তারা একটা কিছু পেয়েছে নিজেদের মধ্যে যে বন্দীত্বদশা তাদের ছিল তা থেকে তারা মুক্ত হয়েছে। সত্যিকারভাবে বাঁচার জন্য তারা যা খুঁজে পেয়েছে সে হলো বিধাতা। তিনি অপরিহার্য এবং সাধুতাই সৎগুণ এই প্রকৃত সত্তার উপলব্ধি “হ্যাঁ, ওরা সঠিক জীবনীশক্তি পেয়েছে। কিন্তু তা সেরকম নয় যেমনটা আপনি একটি বোতল থেকে বের করতে পারেন তারা তাদের হৃদয়ে এ শক্তি ফিরে পেয়েছে।"

তরপর আমি দেখতে পেলাম যে, তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন। এই যে জনতা তাদের চেহারায় কোন দুঃখের ছাপ ছিল না। ছিল না কোনরকম নীরসভাব। এরা সবাই ছিলেন শহরের নেতৃবৃন্দ-কেউ ব্যবসায়ী কেউ আইনজ্ঞ কেউ ডাক্তার কেউ শিক্ষক, সামাজিক লোক এবং আরো অনেকেই ছিলেন সাধারণ গ্রাম্য জনতা, এবং এই আনন্দ সমাগমে তারা অসাধারণ সময় উপভোগ করছিলেন। কথা বলছিলেন বিধাতাকে নিয়ে, এবং এসবই তারা করছিলেন খুবই সাভাবিকভাবে যা কল্পনীয়। একজন আর একজনকে জানাচ্ছিলেন যে, তাদের জীবনে পুনরুজ্জীবিত আধ্যাত্মিক শক্তির মধ্য দিয়ে কেমন পরিবর্তন ঘটেছে।

এরমধ্যে যাদের সরল সোজা ধারণা আছে তাদের প্রতি আপনি হাসতেও পারেন না কিম্বা খুশিও হতে পারেন না। যখন আপনি একজন ধর্মপরায়ন ব্যক্তি হিসাবে অমন একটি আনন্দঘন সমাগমে যান।

এরপর বেশ চাঙ্গা মনে আমি ঐআনন্দ ঘন সমাগম থেকে বের হয়ে এলাম। মনে মনে বাইবেলের একটি বাণী আনাগোনা করছে, তা হলো তারই মাঝে ছিল জীবন এবং সে জীবন ছিল মানুষের জন্য জ্যোতি স্বরূপ (যোহন 1.4)।" এই সেই জ্যোতি যা আমি ঐ সুখি মানুষগুলোর মুখের উপর উদ্ভাসিত হয়ে থাকতে দেখলাম। অন্তরের উজ্জল আলো তাদের মুখের উপর প্রতিফলিত হতে দেখলাম এবং তা এসেছিল তাদের হর্ষোৎফুল্ল আধ্যাত্মিক কিছু একটা থেকে। যা তাদের মধ্যে তারা গ্রহণ করেছিলেন। জীবন অর্থ হলো জীবনীশক্তি, এবং ঐ লোকগুলো তাদের জীবনীশক্তি পাচ্ছিলেন বিধাতার কাছ থেকে। তারা সেই শক্তি খুঁজে পেয়েছেন যা, তা তাদের সুখ তৈরি করে দেয়।

এতো বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে সাহস করছি যে আপনার সম্প্রদায়ে, আপনি যদি ঐ ধরনের মানুষ খুঁজে পেতে চারিদিকে তাকান, তাহলে ঠিক উপরে বর্ণিত লোকগুলোর মত লোক আপনি অনেক দেখতে পাবেন। আপনি আপনার নিজস্ব শহরে যদি অমন লোক খুঁজে না পান তা হলে নিউইয়র্ক শহরের মার্বেল কলেজিয়েট গীর্জায় চলে আসুন এবং সেখানে তাদের অনেককেই আপনি দেখতে পাবেন। কিন্তু এই বইটি পড়লেও ঐ লোকগুলোর মত আপনিও একই রকম জীবনীশক্তি পাবেন যদি আগে সাধারণ এই নিয়মনীতিগুলো অনুশীলন করে নেন।

আপনি যখন পড়েন তখন বিশ্বাস করেন যে আপনি কি পড়ছেন কারণ তা সত্যি। তারপর এ বইটিতে যে বাস্তব পরামর্শ দেয়া হয়েছে তার উপর কাজ শুরু করুন এবং দেখবেন আপনিও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করছেন এবং তা থেকেই এমন গুণসম্পন্ন সুখ উৎসারিত হচ্ছে। আমি জানি তা হবে। কারণ এমন অনেককেই আমি নির্দেশ দিয়েছি, এবং আগামী অধ্যায়গুলোতে আমি আরো নির্দেশ করব। যারা একইভাবে তাদের অত্যাবশ্যক এবং সুন্দর জীবন খুঁজে পেরেছেন। তারপর অন্তরে পরিবর্তিত হয়ে আপনি নিজের মধ্যে সুখ তৈরি করতে থাকিবেন, সুখহীনতা নয়। আর সেই সুখ হবে এমনই সুখ, এমনই গুণসম্পন্ন এবং চিরিত্রের যে তা দেখে আপনি বিস্ময়াভূত হয়ে যাবেন যে আপনি কি সবার সাথে একই জগতে বাস করছেন কিনা। সত্যি বলতে কি, তা কিন্তু একই জগতের অংশ নয় কারণ আপনিও অন্যদের মত একই রকম নন এবং আপনি যা যা নির্ধারণ করবেন যে, যে জগতে আপনি বাস করছেন এবং আপনি যেমনটি পরিবর্তিত হচ্ছেন আপনার জগৎটি ঠিক তেমনি পরিবর্তিত হচ্ছে।

যদি সুখের বিষয়টি আমাদের চিন্তার মাধ্যমে স্থিরকৃত হয় তাহলে যেসব চিন্তা ভাবনা হতাশা এবং উৎসাহহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেসব মন থেকে হটিয়ে দেয়া আবশ্যক। একাজটি প্রথমেই করা সম্ভব, যদি শুধু স্থির করি যে এটা করব। দ্বিতীয়ত সহজ একটি কৌশল কাজে লগিয়েও এটা করা সম্ভব যা আমি একজন ব্যবসায়ী লোককে পরামর্শ দিয়েছিলাম।

একদিন এক মধ্যাহ্নভোজে লোকটির সাথে আমার দেখা হয়েছিল এবং এমন বিষণ্ণতা থেকে তিনি মুক্ত হয়েছিলেন যে, তেমন ঘটনা প্রায় শোনা যায় না। তার কথাবার্তা ছিল অত্যধিক হতাশাব্যঞ্জক এবং তা আমাকে খুবই পীড়া দিয়েছিল। ব্যাপারটাকে তার দুঃখবাদ হিসাবে গণ্য করা যায়। তাকে কথা বলতে শুনলে আপনার মনে হবে তার জীবনের সবকিছুই ছিল ধ্বংসের জন্য। নিঃসন্দেহে লোকটি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার জীবনে জমে উঠা সমস্যাগুলো তার মনকে অভিভূত করে ফেলেছিল। এমন একটি জগৎ থেকে তার মন মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছিল নিজেকে একটি নিরাপদ অবস্থানে আশ্রয় পেতে চেয়েছিলেন। কারণ এই দুঃসহ অবস্থা তার শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছিল। তার এই কষ্টের প্রধানতম কারণ ছিল তার হতাশাজনক চিন্তার ধরণ। তিনি চেয়েছিলেন তার মধ্যে আলো এবং বিশ্বাসের সমন্বিত অনুপ্রবেশ। সুতরাং কিছুটা সাহসের সাথেই আমি বলব, “যদি আপনি ভালো অনুভব করতে চান এবং নিঃস্ব ভাবটির ইতি টানতে চান, তার জন্য আমি আপনাকে এমন কিছু দিতে পারি যাতে আপনার সুন্দর একটি ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে।" একটুই নাসিকা ধ্বনি করে লোকটি বললেন, “কি করতে পারেন আপনি? আপনি কি অলৌকিক কাজ করতে পারেন?"

আমি বললাম, 'না' "কিন্তু আমি আপনাকে অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারে তার সংস্পর্শে রাখতে পারি, যিনি আপনার দুঃখ কষ্টগুলো আপনার মধ্য থেকে নিস্কাশিত করতে পারবেন এবং একটি সহজ সুন্দর ঢালু পথ আপনার জীবনে এনে দিতে পারবেন, আমি এটাই বুঝাতে চাইছি।” এটুকু বলে আমি শেষ করলাম।

দৃশ্যত তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন কারণ, পরবর্তীতে তিনি আমার সংস্পর্শে এসেছেন এবং 'thought conditioners' নামে একটি বই তাকে আমি দিয়েছিলাম। এর মধ্যে চল্লিশটি স্বাস্থ্য এবং সুখ গড়ার মত চিন্তন রয়েছে। যেহেতু এটি একটি পকেট সাইজ পুস্তিকা তাই আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছি যেন তিনি এটা সহজ মন্ত্রণার প্রয়োজনে বহন করেন এবং এ জাতীয় একটি চিন্তন বা ধ্যান যেন তিনি আপন মনে গেঁথে। তাই নিয়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ধ্যান চালিয়ে যান। আমি তাকে আরো পরামর্শ দিলাম যেন তিনি বিষয় মুখস্ত করে ফেলেন, এভাবে তার চেতনার মধ্যে মিলে যাবে, এবং তিনি মনশ্চক্ষুতে দেখতে পাবেন যে এই স্বাস্থ্যহিতকর ধ্যান একটি শান্তিদায়ী এবং আরোগ্যকর প্রভাব তার মনের মধ্যে ফেলছে। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম যে, যদি তিনি এই পরিকল্পনা অনুসরণ করে চলেন তা হলে এসব স্বাস্থ্যপ্রদ ধ্যান তার মনে পুঞ্জিভূত। এসব অসুস্থ চিন্তাগুলো মন থেকে হটিয়ে দেবে যেগুলো তার আনন্দ শক্তি এবং সৃজনশীল সমর্থকে গোপনে গোপনে ধবংস করে দিচ্ছিল।

এসব ধারণা প্রথম প্রথম তাকে কিছুটা অদ্ভূতভাবে অনুপ্রাণিত করছিল এবং এতে তার সন্দেহ ছিল, কিন্তু শেষ অবধি তিনি তা অনুসরণ করেছিলেন। প্রায় তিনি সপ্তাহ পর তিনি আমাকে টেলিফোনে ডাকলেন এবং চিৎকার করে বললেন, “বালক, এটা অবশ্যই কাজ করছে! এটা অদ্ভূত, বিস্ময়কর। আমি এতে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি, এবং আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে এটা সম্ভব!” তিনি পরম উৎসাহে এর অনুশীলন চালিয়ে যান এবং এখন তিনি সত্যিকার অর্থে একজন সুখি মানুষ। এই যে একটি সুখকর ফলাফল তিনি পেলেন। তার কারণ হলো, তার নিজের সুখ নিজে তৈরির ব্যাপারে তিনি তার শক্তি প্রয়োগে খুব দক্ষতা দেখিয়েছেন। পরে তিনি মন্তব্য করে বলেছেন যে, তার প্রথম মানসিক অতিক্রম ছিল সৎভাবে ঘটনাবলীর মুখোমুখি হওয়া; ঠিক যখন দুঃখ কাতরতা তাকে নিঃস্ব পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এখনও যখন তিনি বাসায় থাকতেন, সময়টা কাটত তার আত্মকষ্টে এর আত্মনিগ্রহ মূলক চিন্তায়। উনি জানতেন যে এসব পীড়াদায়ক চিন্তাগুলোই তার কষ্টের কারণ ছিল, কিন্তু যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিবর্তনের প্রয়োজন তার ছিল এবং যা তিনি প্রয়োজন মনে করেছিলেন তা করতে তিনি সংকুচিত হয়ে পড়তেন। কিন্তু যখন নির্দেশ মোতাবেক একটি প্রথাগত আধ্যাত্মিক চিন্তন মনের ভেতর প্রবেশ করালেন তখন প্রথমেই তিনি যা চাইলেন তাহলো একটি নতুন জীবন, তারপর তিনি অনুধাবন করলেন মনোমুগ্ধকর ঘটনা। যা তিনি পেতে পারতেন, তারপর আরো অভিভূতকর ঘটনা। যেগুলো তিনি পাচ্ছিলেন এর ফলাফল দাঁড়ালো এমন যে, তিন সপ্তাহের কিছু অধিক সময়ে আত্মোন্নতির পদ্ধতি প্রয়োগ করে তার জীবনে নতুন সুখস্বাচ্ছন্দ উপচে পড়তে লাগল।

সারা দুনিয়াব্যাপী প্রায় সর্বত্র আজ দলে দলে মানুষ নতুন সুখের সন্ধান পেয়েছেন। যদি প্রতিটি ছোটবড় গ্রামে ও শহরে ঠিক ঐ ধরনের একটি সংঘও থাকে তাহলে আমরাও আমাদের এই দেশটি জীবনের সুন্দর একটি গন্তব্যে আনতে সক্ষম হব এবং তা পারব খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে। কেমন হবে এসংঘ? আসুন আমি এর একটি ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

পশ্চিমের একটি শহরে একবার বক্তব্য দিচ্ছিলাম্ সেখান থেকে হোটেল কক্ষে পৌঁছতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। একটু ঘুমিয়ে নেবার ইচ্ছে ছিল আমার। কারণ হলো প্লেন ধরার জন্য পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাকে ঘুম থেকে উঠতে হবে। যখন বিছানায় যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক তখন টেলিফোনটা বেজে উঠল। অপরপ্রান্ত থেকে এক মহিলা কথা বললেন "আমরা প্রায় পঞ্চাশ জন আমার বাড়িতে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।"

আমি তাকে ব্যাখ্যা দিয়ে বললাম যে, আমি তো আসতে পারব না; কারণ কাল ভোরে আমাকে প্লেন ধরতে হবে।

"ওহ! মহিলা বললেন, দুজন লোক আপনাকে আনবার জন্য এতক্ষণ পথে রওয়ানা হয়েছেন। আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, এবং আমরা সবাই চাই যে এ শহর ছেড়ে যাবার আগে আপনি আমাদের মাঝে আসুন এবং আমাদের সাথে প্রার্থনা করুন!"

আমি খুশি হয়েছিলাম এবং সেখানে গিয়েছিলাম যদিও ঐ রাত্রে আমার খুব কম ঘুম হয়েছিল।

যে লোক দুটো আমার জন্য এসেছিলেন তারা দুজনেই ছিলেন মদ্যপ এবং তারা বিশ্বাসের শক্তিতে সুস্থ হয়েছিল। তারা পরবর্তীতে খুবই সুখি হয়েছিলেন, সবার কাছে এমন প্রীতিভাজন হয়েছিলেন যে, আপনারা তা কল্পনাও করতে পারবেন না।

যে বাড়িতে তারা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সে বাড়িটি সম্পূর্ণ ভরে গিয়েছিল। আগত লোকজন সিড়ি পথে, টেবিলগুলোর উপর এবং মেঝে পর্যন্ত বসেছিলেন। এমন কি একজন লোক বড় পিয়ানোটার উপরে বসেছিলেন, এবং তারা কি করছিলেন? তারা সবাই মিলে একটি প্রার্থনা সভা পরিচালনা করছিলেন। তারা আমাকে বললেন যে, এমন ষাটটি প্রার্থনা সংঘ এই শহরে সারাক্ষণ প্রার্থনা পরিচালনা করে চলেছেন। এমন একটি সভায় থাকার সৌভাগ্য আমার এর আগে কখনও হয়নি। এটা স্থূলবুদ্ধি বিশিষ্ট একটি সংঘ ব্যতীত কিছু ছিল না। তারা ছিলেন মুক্ত, সুখি জনতা এবং সত্যিকারের মানুষ। পরম বিস্ময়ে সারাকক্ষ ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি। ঐ কক্ষটিতে উপস্থিত সবার জীবনীশক্তি ছিল বিস্ময়কর এবং তা ক্রমান্বয়ে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দলটি সশব্দে গান গাইতে শুরু করল, আমি কখনও এমনভাবে গান গাইতে শুনিনি। পুরো কক্ষটি অদ্ভুত প্রাণবন্ত হাসিতে ভরে গিয়েছিল।

তারপর একজন মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। আমি দেখলাম তিনি তার পায়ে ঠেকা দিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “ওরা বলেছিল যে আমি আর কোনদিন হাঁটতে পারব না। আপনি কি দেখতে চান যে আমি হাঁটতে পারি কিনা?" তিনি কক্ষটির একদিক থেকে আরেকদিক হেঁটে দেখালেন কখন করে এটা সম্ভব হল? আমি জানতে চাইলাম দ্বিধাহীন জবাব, 'যীশুখ্রিস্ট'।

তারপর আর একজন সুদর্শনা যুবতী বললেন, "আপনি কখনও ঘুমের ঔষধ সেবনকারী আত্মঘাতউম্মুখ কোন Victim কে দেখেছেনও? আমিই তেমন একজন এবং আমি এখন সুস্থ।” ওখানে বসে ছিল মেয়েটি, সুন্দর একটি মেয়ে, বিনীত স্বভাবা আকর্ষণীয়া এক যুবতী, এবং সেও বলল, "যীশুখ্রিস্ট আমাকে সুস্থ করেছে।"

তারপর এক যুগল সবেগে সামনে এলেন যে, তার আবার পূণর্মিলিত হয়েছে এবং আগের তুলনায় এখন অনেক সুখি। জিজ্ঞেস করলাম এটা কিভাবে ঘটল? জবাবে তারা বলল, যীশুখ্রিস্ট ঘটিয়েছেন।'

আর এক লোক বললেন, যে তিনি এ্যালকোহল Victim, এবং তিনি তার পরিবারকে এমন একজায়গায় টেনে নামিয়েছেন যে তারা শেষ পর্যন্ত দারিদ্রসীমার নীচে এক অতি কষ্টকর জীবন যাপন করছিলেন এবং তিনি একেবারেই ব্যর্থ একজন লোক ছিলেন, এবং এখন আমার সামনে এসে যখন দাঁড়িয়েছেন একেবারে শক্ত সামর্থ স্বাস্থ্যবান এক ব্যক্তি। আমি জানতে চাইলাম কেমন করে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন? মাথা হেট করে বললেন, 'যীশুখ্রিস্ট সাহায্য করেছেন।'

তারপর আবার সজোরে আর একটি গান ধরলেন, তখন একজন বাতিগুলো নিবু নিবু করে দিলেন এবং সবাই হাত ধরাধরি করে চক্রাকারে দাঁড়ালেন তখন আমার এমন অদ্ভুত এক অনুভূতি হল যে মনে হলো যেন আমি কোন বৈদ্যুতিক তার ধরেছিলাম। সারা কক্ষ জুড়ে এক বিশেষ শক্তি অবস্থান করছিল। নিঃসন্দেহে ঐ দলটির মধ্যে আমিই ছিলাম সর্বাপেক্ষা আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি। ঐ মুহূর্তে আমার এটাই মনে হয়েছিল যে, ঐ বাড়িটিতে তখন স্বয়ং যীশুখ্রিস্ট উপস্থিত ছিলেন এবং ঐ লোকগুলো তাকে দেখতে পেয়েছিলেন। তারা খ্রিস্টের শক্তির ছোঁয়া অনুভব করেছিলেন। তিনি তাদেরকে নতুন জীবন দান করেছিলেন। এই জীবন যেন অদম্য আনন্দে উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল।

এটাই হলো সুখি হবার গোপন রহস্য। বাকি সব দ্বিতীয় পর্যায়ের। এই অভিজ্ঞতা লাভ করে দেখুন এবং দেখবেন একেবারে খাঁটি নিখাদ আনন্দ আপনি পেয়ে গেছেন, একেবারে সবার সেরা যা জগতে আশা করা যায়। এটা অবশ্যই ভুল করবেন না, জীবনে যা কিছু করুন না কেন এটাই হলো সুখ্যতম। যার যার ধর্ম মতে এটা অনুকরণ ও অনুশীলন করা যেতে পারে।

📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 আকস্মিক ক্রোধ এবং বিরক্তি থেকে বিরত হোন

📄 আকস্মিক ক্রোধ এবং বিরক্তি থেকে বিরত হোন


অনেকেই তাদের জীবনকে অযথাই ক্ষমতা এবং শক্তির অপব্যবহারের দ্বারা ক্রোধ এবং বিরক্তি প্রকাশের মধ্য দিয়ে কঠিন করে তোলে। আপনি কি কখনও ক্রোধ এবং বিরক্তি প্রকাশ করেন? এখানে একটি ছবি তুলে ধরা হল। তা থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনিও তেমন কিছু করেন কিনা। 'ফিউম শব্দের অর্থ হলো সিদ্ধ' করা বাস্প ছেড়ে দেয়া, বাস্প নিষ্কাশিত করা। উত্তেজিত হওয়া মানসিক কষ্টে উম্মত্ত হওয়া, এবং বিক্ষুদ্ধ হওয়া। 'ফ্রেট' শব্দটির অর্থ ও সমভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

এ হলো রাতের বেলায় পূর্বস্মৃতি স্মরণকারী খিটখিটে ও কিছুটা ক্রন্দনশীল, কিছুটা ঘ্যান ঘ্যানে স্বভাবের সন্তানের মত। সে ক্ষান্ত হয়; কেবলমাত্র আবার নতুন করে শুরু করার জন্য। এদের যা আছে তা হলো অস্বস্তিকর, বিরক্তিকর এবং বিদ্ধকারী ধরনের। কিছু ফ্রেট ছেলেমি স্বভাব ধরনের একটি শব্দ কিন্তু এ শব্দটি অনেক সময় অনেক বড়দের আবেগগত প্রতিক্রিয়াও ব্যাখ্যা করে। বাইবেল আমাদের উপদেশ দেয়, তোমরা বিরক্ত হয়ো না (সাম ....ii) আজকের দিনে। এটা খুবই বলিষ্ঠ পরামর্শ। আমাদের উচিত ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা এবং শক্তির মনোভাব ধরে রাখা। যদি সফল জীবন যাপন করার জন্য আমাদের আগ্রহ থাকে তবে এ শক্তি গুলো আমাদের প্রয়োজন। এবং এসব করতে কিভাবে আমরা প্রবৃত্ত হতে পারি?

প্রথম পদক্ষেপে আপনাকে যা করতে হলো, আপনার গতিবেগ কমাতে হবে অথবা, গতিবেগের হার কিছু কিছু করে কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আমরা সঠিক বুঝতে পারি না যে আমাদের জীবনের গতিশীলতা কতটা বুদ্ধিলাভ করেছে অথবা ঠিক কতটা গতিতে আমরা আমাদের জীবনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছি। অনেকেই এই উর্ধ্বগতির প্রাবল্যে শারীরিক স্বাস্থ্যকে ধবংস করে ফেলছে কিন্তু তার চেয়েও দুঃখজনক হলো যে, এই করতে গিয়ে তারা তাদের মনকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলছে এবং আত্মাকেও ফালি ফালি করে ফেলছে। অথচ একজন মানুষের পক্ষে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ শান্তি বজায় রেখে এবং আবেগ গত দিক থেকে উচ্চ গতিশীলতা বজায় রেখেও চলা সম্ভব। এমনকি সে দৃষ্টিকোণ থেকে একজন সামর্থহীন ব্যক্তির পক্ষে ও উচ্চ গতিশীলতা বজায় রেখে বাঁচা সম্ভব হতে পারে। আমাদের চরিত্রই নির্ধারণ করে যে আমাদের জীবন ও মনের গতিবেগ কেমন হওয়া উচিত। মন যখন একটি সন্তপ্ত মনোভাব থেকে আরেকটি সন্তপ্ত মনোভাবের দিকে বিশৃঙ্খলভাবে ধেয়ে যায়, তখন এই সন্তপ্ত অবস্থার ফলশ্রুতি হিসেবে খিটখিটে মনোভাবের সৃষ্টি হয়। আধুনিক জীবনে যে দ্রুতগতি মানুষের জীবনে অবধারিত হয়ে পড়েছে একে অবশ্যই হ্রাস করা প্রয়োজন। যদি না আমরা এর যে অত্যধিক উত্তেজনাকর অবস্থার কারণ থেকে উদ্ভূত দুর্বলকারী অবস্থার তিক্ততাকে গভীরভাবে ভোগ করতে না চাই। এই অত্যাধিক উত্তেজনা মানুষের শরীরে বিষাক্ততা উৎপাদন করে এবং এ থেকে তৈরি হয় আবেগজনিত পীড়া। আর এমনিভাবে আসে অবসন্নতা এবং নৈরাশ্যকর মনোভাব। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, সেসব বিষয়ে আমরা যদি ক্রোধান্বিত এবং বিরক্তির কাছে আত্ম সমর্পণ করি তাহলে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে নানারকম কষ্ট নেমে আসে এবং তা জাতীয় এবং জাগতিক জীবনেও প্রভাব সৃষ্টি করে। যদি আবেগের এই অসাচ্ছন্দতার প্রভাব শারীরিকভাবে খুবই অবধারিত হয়ে পড়ে, তাহলে যাকে আমরা ব্যক্তির আভ্যন্তরীন সুগন্ধি বলে জানি অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সুরভি হিসেবে জানি তার উপর এটা কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে ভাবুন?

আধ্যাত্মিক শান্তি বজায় রাখা অসম্ভব যদি জীবনের গতিবেগ সন্তপ্ত অবস্থাতেই বাড়িয়ে দেয়া হয়। বিধাতা ঠিক এই গতিকে সমর্থন করবেন না। তিনি আপনার গতির সাথে সমতা রক্ষা করে চলবেন না। বস্তুত: তিনি বলেন, যদি তুমি এমন বাতুলতাপূর্ণ গতিতে সম্মুখে বাড়তে চাও বাড়, কিন্তু যখন তুমি শ্রান্ত হয়ে পড়বে আমি তখন তোমাকে নিরাময় করব। কিন্তু আমি তোমার জীবনকে খুবই সমৃদ্ধ করে তুলব যদি তুমি এখন মৃদুগতি সম্পন্ন হও এবং আমাতে বাঁচ আমাতে বিচরণ কর এবং আমারই মধ্যে তুমি বিদ্যমান থাক। বিধাতা চলেন উত্তেজিত বা ক্ষুব্ধ হয়ে, ধীর লয়ে এবং যথাযথ সংগঠিত অবস্থায়। আর বেঁচে থাকার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ গতির হার হলো বিধাতা প্রদত্ত গতির হার। বিধাতা যা কিছু করে থাকেন তা হয় সঠিকভাবে এবং ওসব তিনি তাড়াহুড়ো করে করেন না। তার না আছে ক্রোধ না আছে উত্তেজনা। তিনি শান্তিপূর্ণ এবং সে কারণেই তিনি দক্ষ। সেই শান্তি আমাদেরকেও দেয়া হয়েছে “তোমাদের কাছে আমি শান্তি রেখে যাচ্ছি আমারই শান্তি তোমাদের দান করছি।” (যোহন Xiv.29)

ভাবতে গেলে একদিক থেকে বর্তমান যুগের লোকেরা এক কারুণ্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে স্নায়ুগত চাপা উত্তেজনার প্রভাব কৃত্রিম উত্তেজনা, এবং নানা গোলমালই এসবের কারণ, কিন্তু এই মানসিক পীড়া শুধু শহরেই নয় প্রত্যন্ত প্রামাঞ্চলেও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। কারণ হল বায়ু তরঙ্গ এই চাপা উত্তেজনাকে সেখানে চালান করে দেয়।

এক বৃদ্ধা মহিলার কাছ থেকে এমন একটি ব্যাপার শুনে আমি তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম, উনি বললেন, “জীবন খুবই নিত্যকার।” এ মন্তব্য নিশ্চিত ভাবেই আমাদের নিত্যদিনের মানসিক চাপ দায়দায়িত্ব এবং চাপা উত্তেজনার পরিমানকেই ইংগিত করে। এটা জেদী, নাছোরবান্দার মত আমাদের উপর উত্তেজনাকর চাপ প্রয়োগ করছে প্রতিদিন।

বিস্মিত হবার মত একটি বিষয় হলো যে, বর্তমান যুগের লোকেরা মানসিক চাপা উত্তেজনার সাথে খুব একটা অভ্যাস্ত কিনা যে কারণে তারা একটা অসুখি এবং আরামহীন জীবন কাটাচ্ছে শান্তির অভাবে।

বন-বনানীর এবং উপত্যকার গভীর প্রশান্তির আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে খুবই সুপরিচিত একটি ব্যাপার ছিল এবং আমাদের এঅবস্থার সাথে তারা অভ্যস্ত ছিল না। তাদের জীবনটা এমনই এক লয়ে বাঁধা ছিল। আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শান্তি এবং বিশ্রামের উৎসের প্রতি মন বসাতে অক্ষমতা প্রকাশ করি অথচ শরীর জগত আমাদের এই দিতে চায়।

গ্রীষ্মের কোন বিকেলে আমার স্ত্রী এবং আমি বনে হাঁটতে যাই লম্বা সময় নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা 'লেক মোহঙ্ক মাউন্টেন হাউসে' এসে থেমে যাই, যেটি আমেরিকার সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক পার্কগুলোর মধ্যে একটি। ভারজিন মাউন্টেনের পামে ৭,৫০০ একর জমি নিয়ে তৈরি এ পার্কটির মাঝখানে একটি হ্রদের অবস্থান যেন বনের ভেতর একটি রত্নের মত উদ্ভাসিত। 'মোহঙ্ক' শব্দটির অর্থ আকাশের বুকে হ্রদ।

যুগ যুগ আগে ভূপৃষ্ঠের উপরের স্তরের কিছু বড় বড় আন্দোলনের কারণে এসব খাড়া পাহাড়ের জন্ম হয়েছে। শৈলান্তরীপে দৃষ্টিনন্দন অরণ্য থেকে আপনি বের হয়ে আসুন এবং পাহাড়িয়া এলাকার বড় বড় উপত্যকার দিকে বাহাড়ের পঞ্জরে পঞ্জরে করুন। এই অরণ্য রাজি পাহাড়, এবং উপত্যকা এমন সুসমন্বিতভাবে সৃষ্টি হয়েছে যে, যে গুলোর দিকে চোখ এবং আমাদের ঐ প্রাচীন সুর্যের দিকে আপনার দৃষ্টি বিত মেলে তাকালে জাগতিক সমস্ত বিশৃঙ্খলা থেকে আপনার মন বিমুখ এবং বিরত হয়ে যাবে। আজকের এই বিকেলে আমরা যখন এখন হাসি হাঁটি করছিলাম, সময়টায় গ্রীষ্মের বৃষ্টি এবং স্নিগ্ধ রোদের এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল। বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়েছিলাম আমরা এবং একারণে কিছুটা বিরক্ত হতে শুরু করেছিলাম কারণ আমাদের কাপড় নিঙড়াতে হয়েছিল। তারপর আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম যে, বৃষ্টির পরিস্কার পানিতে ভিজে যাওয়াতে মানুষের কোনো ক্ষতি হয় না। বৃষ্টির পানিতে আমাদের মুখের উপর ঠাণ্ডা অনুভূত হয়, বেশ সতেজও লাগে, এবং আমরা সবসময় রোদে বসতে পারি এবং নিজেকে শুকিয়ে নিতে পারি। আমরা হেঁটে হেঁটে গাছের নীচে গেলাম এবং কথাবার্তা বলতে বলতে এক সময় শান্ত হয়ে গেলাম।

অরণ্যের নিস্তব্ধতাকে গভীরভাবে শ্রবণ করছিলাম। একটু কঠিন জ্ঞানে যদি ভাবি, তাহলে হয়ত মনে হবে, অরণ্য কখনও নিস্তব্ধ হয় না। এক ধরণের বিস্ময়কর কর্ম প্রক্রিয়া যেন সর্বদাই চলছে অরণ্য মাঝে, কিন্তু প্রকৃতি এমন কোনো রকম শ্রুতিকটু শব্দ করে না, যা এর বিরাট কার্যকলাপের সাথে সম্পর্কিত নয়। প্রকৃতির শব্দাবলি শান্ত, সুসমঞ্জস্য। আজকের এই সুন্দর বিকেলে প্রকৃতি যেন আমাদের উপর এর নিরাময়কারী শান্তির হাত স্থাপন করেছিল এবং আমরা অনুভব করতে পারছিলাম যে, আমাদের মনের চাপা উত্তেজনা একটু একটু করে মন থেকে সরে যাচ্ছে। ঠিক যখন আমরা এমন এক যাদুর মধ্যে পড়তে যাচ্ছিলাম তখন হালকা সুরের মুর্ছনা আমাদের কাছে এসে পৌঁছল। এ ছিল ভীষণ বৈচিত্রময় উচ্চ নিনাদি সুর। যা আমাদের স্নায়ুকে স্পর্শ করছিল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বনের মধ্য দিয়ে তিনজন যুব বয়সী লোক এলো, দুজন যুবতী একজন যুবক এবং পরে আরেকজন একটি বহনযোগ্য রেডিও বয়ে নিয়ে এলো।

ওরা তিনজন ছিল শহুরে লোক অরণ্যে। এসেছিল হাঁটবার জন্য এবং খুবই দুখঃজনক যে তাদের সাথে বয়ে এনেছিল হৈচৈ। অর্থাৎ হৈচৈ করতে করতে আসছিল ওরা। বেশ মার্জিতবোধ সম্পন্ন যুবক যুবতী ওরা আমাদের এখানে থামল এবং তাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তাও হলো। একটু ইতস্তত: করতে করতেই ওদেরকে এই চপলতা ছেড়ে বনানীর সঙ্গীত মুর্ছানার দিকে কান পেতে শুনতে বললাম। কিন্তু তাদের শিক্ষা দেয়াটাই যে আমার কাজ এটা আমি অনুভব করিনি। এবং শেষমেশ তারা তাদের পথে পা বাড়াল।

আমরা মন্তব্য করলাম যে, কেমন ক্ষতিই না ওদের হলো, কারণ চাইলেই ওরা বনানীর শান্তিপূর্ণ পরিবেশটা উপভোগ করতে করতেই এর ভেতর দিয়ে যেতে পারত, কিন্তু ওরা কর্ণপাত করল না, বুঝল না জগত সংসারের মত এ সঙ্গীতও অতি পুরনো সুসমস্বর বিন্যাসে সৌকর্যমণ্ডিত এবং সুমধুর যার। সাথে মানুষের সৃষ্ট সুর কখনও সমতুল্য নয়। বৃক্ষরাজির মধ্যে দিয়ে বহমান সুরের মূর্ছনা পক্ষীকূলের হৃদয় নিড়ানো সুমিষ্ট স্বরলিপিই হলো এখানকার সঙ্গীতের পূর্ণাঙ্গ পটভূমি।

এসব এখনও আমাদের দেশে পরিদৃশ্যমান আমাদের অরণ্যে এবং বিস্তৃত সমভূমি এলাকায়, আমাদের উপত্যকায়, সমুদ্রের পার্ষত্য জাঁকজমকে, যেখানে সমুদ্রের শুভ্র ফেণারাশি নরম সৈকতের বালুতে এসে আছড়ে পড়ে। প্রকৃতির এই নিরাময় কাজের সাথে আমাদের এ সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। যীশুখ্রিস্টের একটি বাণী এখানে স্মরণ যোগ্য: "বিচ্ছিন্ন এক নির্জন জায়গায় আস তোমরা এবং কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নাও (মার্ক ৬.৩১)

এমন কি আমি যখন একথাগুলো লিখি এবং আপনাদের এ সদুপদেশ দিই, তখন সেই উপমা আমি স্মরণ করি যেখানে যার প্রয়োজন আছে এবং এর মধ্য দিয়ে আমি নিজেকেও স্মরণ করি ঐ একই সত্যকে অনুশীলন করার জন্য। যা জোরের সাথে আমাদের বলে যে, আমরা যেন চিরস্থায়ীভাবে আমাদেরকে শান্তির জন্য সুশৃঙ্খল করে তুলি। যদি আমরা আমাদের জীবনে এর লভ্যাংশটুকু আশা করি।

শরৎকালের কোন একদিন মিসেস পিল এবং আমি আমাদের ছেলে জনকে দেখতে ম্যাসাচুসেটয়ে রওনা হলাম, ওখানে সে ডিয়ার ফিল্ড একাডেমীতে পড়াশুনা করে। আমরা তাকে বললাম, যে আমরা সকাল ১১টায় এসে পৌঁছব, এবং সেকেলে ধরনের তৎপরতার জন্য আমরা গর্বও বোধ করলাম। কাজেই সময়সূচী অনুযায়ী কিছুটা পিছনে পড়ে থাকার কারণে কিছুটা বিপদজনকভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলাম আমরা। শরৎকালীন দৃশ্যবলীর মধ্যদিয়ে গাড়ি চলছিল, আমার স্ত্রী বলল, নরম্যান দেখেছ কেমন উজ্জ্বল পাহাড়ীয়া ঢাল?

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "কিশের পাহাড়িয়া ঢাল?” সে ব্যাখ্যা দিয়ে বলল, “ঐটা ঠিক পাহাড়ের অন্য দিকে চলে গেছে। সুন্দর ঐ গাছগুলোর দিকে চেয়ে দেখ।” কি গাছ? আসলে ইতিমধ্যে মাইলখানেক পথ পেছনে ফেলে এসেছি আমরা।

"আমার দেখা দারুণ চমৎকার দিনের মধ্যে ঐ দিনটি ছিল অন্যতম" এ হল আমার স্ত্রীর মন্তব্য। 'নিউ ইংল্যান্ডের পাহাড়িয়া ঢালে এমন মনোমুগ্ধকর বর্ণবিন্যাস আপনি কিভাবেই বা কল্পনা করতে পারতেন?' আসলে সে বলল, 'সুন্দর দৃশ্যাবলী আমার মনকে দারুণভাবে খুশি করেছে।'

তার এই মন্তব্য আমাকে এত প্রভাবিত করল যে, আমি গাড়ি থামিয়ে ফেললাম এবং পোয়া মাইলের মত পিছনে চলে গেলাম, পিছনে উঁচু পাহাড় ঘেরা শারদীয় বর্ণবৈচিত্রে সুশোভিত এক হ্রদের কাছে। সেখানে কিছুক্ষণ বসলাম, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সেই অনিন্দ্য সুন্দরকে এবং ধ্যানস্থ হয়ে গেলাম। বিধাতা তাঁর অসাধারণ মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে বিচিত্র বর্ণে এ চিত্রাবলী রঞ্চিত করেছেন, আর এমন চোখ জুড়ানো বর্ণবিন্যাস ঘটানো কেবল তার একার পক্ষেই সম্ভব। হ্রদের শান্ত পানিতে তাঁর নিজের দীপ্তিই যেন প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ এই পাহাড়িয়া ঢালটুকুর যে অনুপম ছবি আয়না সদৃশ জলাশয়ে প্রতিবিম্বিত হয়েছে তা সত্যিই তুলনাহীন, যা ভোলো যায় না।

বেশ কিছুক্ষণ একেবারে কোন কথা না বলেই বসে থেকে কাটিয়ে দিলাম আমরা যে পর্যন্ত না আমার স্ত্রী একটি মাত্র যথার্থ উক্তির মাধ্যমে নিরবতা ভঙ্গ করল। তিনি আমাকে প্রশান্ত জলরাশির ধারে আসতে পরিচালিত করলেন (সাম xxii.2)। এগারটার সময় আমরা ডিয়ার ফিল্ডে এসে পৌছলাম, কিন্তু আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম না। আসলে আমরা দারুণভাবে সতেজ অনুভব করছিলাম।

মনের চাপা উত্তেজনা কমাবার জন্য যে উত্তেজনা মনে হয় সর্বত্র আমাদের মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করে আপনি স্বয়ং আপনার গতিবেগ কমিয়ে সেই চাপা উত্তেজনা কমানোর কাজ শুরু করতে পারেন। তা করতে আপনাকে যা করতে হবে তা হলো, গতি নিয়ন্ত্রণ করে ধীরে চলুন শান্ত হোন। আকস্মিক ভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে যাবেন না। বিরক্তও হবেন না। শান্তিপূর্ণ ভাব বজায় রাখতে অনুশীলন করুন। অনুশীলন করুন বিধাতা প্রদত্ত শান্তি যা আপনাকে দিয়ে থাকে ধীশক্তি। (ফিলিপিয়্যানস iv.7) তারপর মনোযোগ দেন শান্ত শক্তিবোধের দিকে যা আপনার মধ্যে পারদর্শী হয়ে উঠবে।

আমার এক বন্ধুকে জোর করে বিশ্রাম নিতে বাধ্য করা হয়েছিল আর এই চাপ সৃষ্টির ফল কি দাঁড়িয়েছিল সে সম্বন্ধে আমাকে লিখেছেন, “জোর করে কাজকর্ম থেকে বিরত করে যে বিশ্রাম নিতে আমি বাধ্য হলাম তা থেকে আমি অনেক কিছুই শিখলাম। এখন আমি আগের থেকে বেশ ভালোভাবে বুঝি যে প্রশান্ত অবস্থায় আমরা বিধাতার উপস্থিতি ভালোভাবে জানতে ও বুঝতে পারি। জীবন কর্দমাক্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু লাউৎ-সি বলেন,” দাঁড়িয়ে থাকুন, দেখবেন একসময় কর্দমাক্ততা সরে গিয়ে পানি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।

এক ডাক্তার এক রোগীকে অদ্ভুত কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। রোগী লোকটি আক্রমণপ্রবণ ধরনের এক ব্যবসায়ী। উত্তেজিত হয়ে তিনি ডাক্তারকে বললেন যে, কি অতিরিক্ত পরিমাণ কাজ তাকে করতে হয়েছিল, এবং সমস্ত কাজই তিনি ভালোভাবে দ্রুত ইত্যাদি যেমনটা দরকার তেমনভাবে সম্পন্ন করেছেন।

"প্রতিরাতে আমি যে ব্রীফকেসটি বাসায় নিয়ে আসি তাতে নানা কাজ ঠাসা থাকে,” দুর্বল স্নায়ু লোকের মত কথাগুলো বললেন তিনি।

ডাক্তার শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাতে বাসায় ফেরার সময় এত কাজ কেন সাথে করে নিয়ে আসেন?"

ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি বললেন, "আমাকে এগুলো সম্পন্ন করতেই হয়।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "অন্য কেউ এগুলো করে দিতে পারতী, অথবা আপনাকে সাহায্য করতে পারে না?"

না, রুক্ষস্বরে কথাটি বললেন তিনি। "কেবলমাত্র আমিই একাজ করতে পারি।" 'কাজটি অবশ্যই ঠিকঠিকভাবে করতে হবে, আমি একাই শুধু তা করতে পারি। যেমনভাবে এটা করা দরকার এবং অবশ্যই আবার দ্রুতও করতে হবে। সবকিছুই নির্ভর করে আমার উপর।'

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, "যদি আমি একটি প্রেসক্রিপশন আপনাকে লিখে দিই, আপনি তা অনুসরণ করবেন?"

আপনারা বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, তার প্রেশক্রিপশনটা ছিল এমন, “প্রতিটি কর্ম দিবসে আপনাকে দুঘণ্টার জন্য কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং দীর্ঘ পথ হাঁটাহাঁটি করতে হবে। তারপর সপ্তাহে একদিন আপনাকে আধাবেলার জন্য কাজ থেকে বিরত থেকে ঐ সময়টুকু কবরস্থানে কাটাতে হবে।

অবাক হয়ে রোগী জানতে চাইলেন, আধা বেলা আমি কবরে কাটাব কিসের জন্য?"

জবাবে ডাক্তার বললেন, কারণ আমি চাই সেখানে আপনি ঘুরে বেড়ান এবং যারা ওখানে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত তাদের কবরের সমাধি প্রস্থরগুলোর দিকে আপনি চোখ মেলে তাকান। আমি আরো চাই যেন আপনি ঐ ঘটনার উপর ধ্যানস্ত হোন আপনার মত একই ঘটনা ওখানে শায়িত হয়ত অনেকের জীবনেই ঘটেছিল। এমন কি তারাও হয়ত আপনার মত ভাবতেন যে সারা দুনিয়ার ভার তাদের কাঁধের উপর ন্যস্ত। পবিত্র বিষয় নিয়ে ধ্যান করুন, ভাবুন যে আপনিও একদিন চিরদিনের মত ঠিক একই জায়গায় চলে যাবেন। কারণ এ জগতে সবার জীবনের পরিণতি ঐ একই রকম। কাজেই এ বিষয়টি যেমন আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অন্যদের জন্যও, তারাও আপনার মতই একই কাজ করতে সক্ষম হবে এখন আপনি যা করছেন, আমার পরামর্শ হল যে, আপনি ঐ সমাধি প্রস্তরগুলোর একটার উপর শান্ত হয়ে বসুন, এবং বার বার এই উক্তিটি আওড়ান .... তোমার দৃষ্টিতে হে বিধাতা, এক সহস্র বছর যেন গত হয়ে যাওয়া কালকের একটি দিনের মত এবং রাতের একটি মাত্র প্রহরের মত। (সাম xc. 4)

রোগী লোকটির তাতে একটি ধারণা হল। তার দ্রুতগতিতে ছোটাছুটি কমিয়ে আনলেন। তিনি শিখলেন কিভাবে অন্যের উপর আস্থা রেখে কর্তব্য করতে দেয়া যায়। নিজের গুরুত্ব বুঝার বিষয়টিকে তিনি সাফল্যের সাথে সমাপন করলেন। ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত হওয়া থেকে বিরত হলেন তিনি। তিনি প্রশান্ত হলেন এবং সাথে সাথে এও দেখা গেল তিনি ভালোভাবেই কাজ কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর উন্নতি হতে থাকল এবং তিনি এ ও স্বীকার করেন যে তার ব্যবসা এখন ভালো অবস্থায় আছে।

প্রসিদ্ধ এক পণ্য প্রস্তুতকারক প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন অত্যধিক উত্তেজনা প্রবণ মনের মানুষ ছিলেন যেমনটা তিনি বর্ণনা করেছেন। প্রতিদিন সকালে লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠতেন এবং দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকতেন, তিনি এমন বেগে এবং দ্বিধাগ্রস্থভাবে হাঁটতেন যে, প্রাতঃরাশ সারতেন শুধুমাত্র সিদ্ধ নরম ডিম দিয়ে। কারণ দ্রুত গলা দিয়ে পেটে চলে যেত চিবুতে হত না। এই উত্তেজনা প্রসুত দ্রুততাকে তাকে অবসন্ন করে ফেলত, এবং মধ্যাহ্ন পর্যন্ত এই ধকল তাকে সহ্য করতে হতো। তারপর প্রতিরাতে প্রচণ্ড অবসন্ন শরীরে তাকে ঘুমিয়ে পড়তে হতো।

এটা এমনভাবে ঘটত যেন তার বাড়িটি কোন কুঞ্জ বনে অবস্থিত। ঘুমাতে না পেরে একদিন তিনি খুব ভোরে উঠে পড়লেন এবং জানালার ধারে বসে রইলেন। বেশ আগ্রহী হয়েই বসে রইলেন যাতে তার দৃষ্টিপথে কোন পাখির দেখা পান। এবং দেখলেন সত্যিই একটি পাখি তার পাখার ভেতর মুখ গুঁজে সুন্দর ঘুমাচ্ছে। পালকগুলো তার চারিদিকটা ঢেকে রেখেছে। যখন জেগে উঠল পাখিটি তখন পালকের ভেতর থেকে ঠোঁটটি বের করে নিয়ে এলো ঘুম ভাঙানো চোখে চারিদিকে তাকাল, তারপর একটি পা টান টান করে মেলে দিল যতদূর সম্ভব, এরইমধ্যে পায়ের উপর দিয়ে পাখাটিও মেলতে থাকল। দেখতে যেন একটি পাখার মত মনে হলো। পা ও পাখাটি এখন আবার আগের মত গুটিয়ে আনলো। একইভাবে এবার অন্য পা এবং পাখাটি টান টান করে মেলে ধরলো, যার ফলে সে তার মাথাটিও নীচু করে আবার পালকের ভেতর গুঁজে দিল আরো একটু তৃপ্তিকর দিবা নিদ্রার জন্যে। তরপর আবার মাথাটি বের করে নিয়ে এলো। এইবার পাখিটি চারিদিকে তাকালো একটু আগ্রহের সাথে, মাথাটি পেছন দিকে ছুড়ে দিল পাখাদুটো ও পাদুটো দুবার লম্বা করে টান টান করে মেলে দিল।

তারপর একটি গান তুলে ধরল, রোমাঞ্চকর সুস্বর সমন্বিত সুন্দর এক গান, যেন ঐ দিনটির প্রশংসা করছে গানের সুরে, পায়ে পায়ে লাফিয়ে পাখিটি ঠাণ্ডা পানি পান করে নিল এবং খাবার খুঁজতে থাকলো।

আমার ঐ অতিউত্তেজিত বন্ধুটি নিজেই বললেন, যদি ঐভাবে পাখি ঘুম থেকে উঠতে পারে ধীরে এবং আয়েশে তাহলে একটি দিন শুরু করার জন্য ঐ সুন্দর পন্থাটি আমার ক্ষেত্রেও অনুকরণীয় নয় কেন? তিনিও ঐ পাখির মত একই কাজ করে গেলেন, এমন কি গানও গাইলেন এবং লক্ষ্য করলেন যে গান বিশেষভাবে একটি উপকারী বিষয়, যা মানুষকে স্বস্তি দেবার একটি সুন্দর কৌশল।

একটু হেসে হেসে তিনি বললেন, আমি গান গাইতে পারি না, কিন্তু শান্ত হয়ে চেয়ারে বসতে এবং গাইতে অভ্যস করলাম আমি। যা গাইলাম তার অধিকাংশই ধর্মসংগীত এবং আনন্দদায়ক গান। কল্পনা করুন আমি গান গাইছি, কিন্তু আসলেই আমি গাইলাম। আমার স্ত্রী ভাবলো আমার স্বাভাবিক জ্ঞান গর্ম হারিয়ে গেছে। পাখিটি থেকে একটি মাত্র বিষয় আমার শেখা হয়েছিল তা হলো, ওর মত একটু প্রার্থনাও আমি করলাম তারপর একটু খাবার খেতেও ভালো লাগল অমিার এবং তাই আমি চমৎকার প্রাতরাশ অর্থাৎ লবনমাংস এবং ডিম খেতে চাইলাম। বেশ সময় নিয়ে নাস্তা খেলাম আমি। তারপর ঢিলেঢালা সুন্দর মানসিক অবস্থা নিয়ে কাজে গেলাম। এই যে বিষয়টি পাখির কাছ থেকে শিখলাম তা নিশ্চিতভাবেই আমার আগেকার সেই দিনগুলো চাপা উত্তেজনা থেকে রেহাই দিতে শেফিল, এবং এটা আমাকে সারাদিনের জন্য শান্তিপূর্ণ শিথিল মন নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করল।

দৌড় প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলের এক পূর্বতন সদস্য আমাকে বলেছিল যে, তাদের দলের ধূর্ত প্রশিক্ষক প্রায়ই তাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন যে "এটা অথবা যে কোন দৌড় প্রতিযোগিতায় জয় লাভ করতে হলে, লাইনে দাঁড়াবে ধীরে।” তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে দ্রুত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে গেলে লড়াকু উদ্যম ভেঙ্গে যেতে পারে এবং যখন বিশেষ উদ্যম ভেঙ্গে যায় তখন এই বিরাট ত্রুটি সংশোধন করে জয় লাভের ছন্দে ফিরে আসতে আসতে দলের অন্যান্য প্রতিযোগী বিশৃংখল অবস্থায় থাকা অন্যান্যদের অতিক্রম করে আগে চলে যায়। পকৃতপক্ষেই এটি একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপদেশ যে “দ্রুত দৌড়াও কিন্তু লাইনে দাঁড়াও ধীরে।"

ধীরে লাইনে দাঁড়াতে বা ধীরে কাজ করতে এবং দৃঢ় গতি বজায় রাখতে যার মধ্যে দিয়ে জয় হাতের মুঠোয় চলে আসবে। একজন দ্রুতগুতির শিকার যদি এগুলো অনুসরন করে তাহলে সে ভালো করবে এবং এপথেই তার মনেও আত্মায় আসবে ঐশ্বী শান্তি এবং আরো বলা যেতে পারে যে, তার স্নায়ু এবং পেশী সমূহের মধ্যেও তা আসবে।

আপনি কি কখনও আপনার মাংস পেশীতে আপনার শরীরের সংযোগস্থলে ঐশ্ম শান্তির কথা একটুও ভেবে দেখেছেন? সম্ভবত যদি আপনার শরীরেরে জোড়ায় জোড়ায় যদি ঐশ্বী শান্তি অবস্থান করে তবে সে জায়গাগুলোতে ব্যথা বেদনা অনুভূত হবে না। আপনার পেশীগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে যখন ঐশ্বীশান্তি যা দিয়ে ওগুলো গঠিত তা আপনার কাজকর্ম পরিচালনা করবে প্রতিদিন আপনার পেশীগুলোকে, শরীরের সংযোগস্থলগুলোকে, আপনার স্নায়ুকে একথাগুলো বলুন, তোমরা বিরক্তবোধ করো না। (সাম Xxxvii.1) আরাম কেদারায় অথবা বিছানায় শিথিলভাবে বিশ্রাম নিন, মাথা থেকে পা পর্যন্ত যত পেশি আছে প্রত্যেকটির কথা ভাবুন এবং প্রতিটি পেশীকে বলুন, ঐশ্বী শান্তি তোমাকে স্পর্শ করছে।” তারপর অনুভব করতে থাকুন যে, আপনার সারা শরীরের মধ্য দিয়ে শান্তি প্রবাহিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট এই কার্যধারায় মধ্য দিয়ে আপনার পেশী এবং সংযোগ স্থলগুলো যত্ন পাবে।

ধীরে চলুন, কারণ আপনি সত্যি সত্যিই যা কিছু যেখান থেকে থেকে সেন সেখানে যাবার পর আপনি তা পাবেন, যদি কাজ নিয়ে এদিকে আপনি কোনরকম পীড়ন বা চাপ ছাড়া অগ্রসর হতে পারেন। বিধাতার নির্দেশিত পথে এবং তাৱ প্রদত্ত শান্ত ও সংযত লয়ে যদি অগ্রসর হওয়া যায় তাহলে যা চান তা সেইখানে পাওয়া গেল না। তাহলে হয়ত ধরে নেয়া যায় যে, তা সেখানে ছিলও না যদি এটা ফসকে যায়ও সম্ভবত এটা ঠিক যে এটা ফসকে যাওয়া আপনার জন্য ভালো ছিল। সুতরাং নিশ্চিতভাবে একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক গতিরে অন্বেষন করুন এবং বিকাশ ঘটান। মানসিক শান্তি বজায় রাখার জন্য অনুশীলন করুন স্বায়ুগত সমস্ত উত্তেজনা প্রতিরোধ করার কৌশল রপ্ত করুন। বিরতি দিয়ে দিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলুন; “আমি এখন স্নায়ুগত উত্তেজনা পরিত্যাগ করছি, এটা আমার মধ্য থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।" আমি শান্তিতে আছি। কাজেই আকস্মিক ক্রোধ সম্বরণ করুন বিরক্তি পরিহার করে চলুন, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে অভ্যাস করুন।

বেঁচে থাকার এমন অভিজ্ঞতা লাভের জন্য আমি আপনাদের এই পরামর্শ দিতে চাই যে, আপনারা শান্তিপূর্ণ চিন্তাগুলোর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা করুন। প্রতিদিন আমরা এমন ক্রমন্বিতভাবে কাজ করব যাতে আমাদের শরীরের প্রতি যথার্থ যত্ন বজায় থাকে। আমরাও স্নান করি, দাঁত মাজি, ব্যায়াম করি ঠিক মনকে স্বাস্থ্যসম্মত অবস্থায় টিকিয়ে রাখতে আমাদেরও উচিত এর পেছনে সময় দেয়া এবং সুপরিকল্পিত প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া। এটা করার একটি সুন্দর পথও আছে, তা হলো আপনি শান্ত হয়ে বসুন এবং স্মৃতি পর্দায় পূর্ণ ও ক্রমন্বিত চিন্তা চালিয়ে যেতে থাকুন। যাতে আপনার মনের সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, আপনার চিন্তা স্রোতের মধ্যে দিয়ে এটি সুউচ্চপর্বতের একটি কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকা, একটি রৌদ্রকরোজ্জল মিষ্টিজলাশয় শ্বেত- শুভ্র চন্দ্রালোকিত জলরাশি ইত্যাদি সুন্দর চিন্তাগুলো প্রবাহমান রাখুন।

চব্বিশ ঘণ্টায় অন্তত একবার দিনের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত সময়ের মধ্যে অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট সময়ে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আপনি যাই করুন না কেন অন্তত দশ কি পনের মিনিটের জন্য কাজ থেকে বিরত থাকুন এবং প্রশান্তভাব বজায় রাখতে অভ্যাস করুন।

এমন কিছু সময় আছে যখন তাড়াহুড়া করে চলাফেরা করা খুব দৃঢ়তার সাথে দমন করতে হয়, এবং সেক্ষেত্রে জোরের সাথেই বলা যায় যে, এই অভ্যাস বন্ধ করার একমাত্র পথ হল এ থেকে বিরত হওয়া।

একবার কোন একটি নির্ধারিত তারিখে একবার কোনো এক শহরে বক্তৃতা দিতে গিয়ে রেলগাড়িতে একটি সমিতির সাথে সাক্ষাত হয় আমার। দ্রুতবেগে আমি একটি বইয়ের দোকানে প্রবেশ করলাম, ওখানে আমার স্বাক্ষরদান কর্মসূচী ছিল, ওখান থেকে আরেকটি বইয়ের দোকানে যেতে হলো, ওখানেও আমার স্বাক্ষরদান কাজ অনুষ্ঠিত হল। সেখান থেকে তারা দ্রুত নিয়ে গেলেন দুপুরের খাবার খেতে। দুপুরের খাবার শেষে আমাকে দ্রুত একটি সভায় যোগ দিতে যেতে হলো।, সভা শেষে ছুটে এলাম হোটেলে, সেখানে কাপড় চোপড় পাল্টে আবার সুন্দরীকে আবার অভ্যর্থনা কক্ষে, ওখানে কয়েকশত লোক আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদের সাথে সাক্ষাতের পর তিনগ্লাস ফলের সরবত পান করলাম আমি। তারপর সেখান থেকে দ্রুত ফিরে এলাম হোটেলে এবং বললাম ডিনারের পোষাক পরার জন্য আমার হাতে মাত্র বিশ মিনিট সময় আছে। যখন আমি পোষাক পড়ছিলাম টেলিফোনটা বেজে উঠল এবং একজন বলেই ফেলল, জলদি করুন জলদি করুন জলদি, আমরা এখনই ডিনার খেতে যাব।

উত্তেজিত হয়ে বিরবির করে বললাম হ্যাঁ আমি এখনি নীচে আসছি। খুব দ্রুত ঘর থেকে বের হলাম এবং এত উত্তেজিত ছিলাম যে চাবিটা যে তালায় ঢোকাব সেটাও হচ্ছিল না। খুব দ্রুত আমি অনুভব করলাম আমি যে পুরোপুরিভাবে পোষাকাদি পড়েছি সে ব্যাপারে আমার নিশ্চিত হওয়া দরকার এবং তা হয়ে আমি এলিভেটরের দিকে ছুটলাম। হঠাৎ করেই আমি থামলাম। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম আমি, এসবের অর্থ কি? এমন অবিরাম ছুটাছুটির মানেটা কি দাঁড়ায়? এতো একেবারে হাস্যকর।

এরপর আমি ঘোষণা করলাম আমি স্বাধীন, এবং বললাম যদি ডিনারে যাইও আমি তা পরোয়া করব না কথা বলা না বলাকেও পরোয়া করব না। আমি ডিনারে আমাকে যেতেই হবে এমন কি কথা এবং আমাকে একটি বক্তব্য দিতেই হবে বলে আমি মনে করি না। কাজেই ইচ্ছে করেই এবং ধীর গতিতে আমি আমার কক্ষে ফেরত আসলাম এবং সময় নিয়ে তালাটি খুললাম। নীচে যে লোকটি ছিল তাকে ফোন করে বললাম আপনি যদি খেতে চান তো খেতে থাকুন। যদি চানতো আমার জন্য একটু জায়গা রাখুন আমি একটু পরে নীচে আসছি। কিন্তু আমি আর ছুটাছুটি করতে চাই না।

সুতরাং আমি আমার কোটটি ছাড়লাম, এবং বসে পড়লাম, জুতা খুলে ফেললাম, পা দুটো আরাম করে টেবিলে তুলে নিলাম এবং শান্তভাবে বসে রইলাম। তারপর বাইবেলটি খুলে খুব ধীরে ধীরে ১২১ তম সাম সঙ্গীতটি পড়লাম, "পর্বত সমূহের উপর আমি আমার চক্ষু নিবদ্ধ করব যেখান থেকে আমার সাহায্য আসবে। তারপর বইটি বন্ধ করে নিজে নিজে কিছুক্ষণ কথা বললাম “এখন এসো স্বস্থিপূর্ণ সহজ সিথিল জীবন শুরু কর এবং তারপর আমি নিশ্চিত হলাম; বিধাতা এখানে উপস্থিত এবং তার শান্তি আমাকে স্পর্শ করছে।”

ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমার কিছু খাবার প্রয়োজন নেই। যেমন করেই হোক আমি খুব বেশিই খাই। তাছাড়া রাতের খাবারটি গুণগত দিক থেকে হয়ত তত ভালোও হবে না এবং এখন আমি যদি একটু শান্ত থাকতে পারি তবে আটটার সময় আমি যে বক্তব্য দেব তা খুব চমৎকার হবে।

কাজেই আমি সেখানে বসে বসে বিশ্রাম নিলাম এবং মিনিট পনের প্রার্থনা করলাম, যখন আমি ঘর থেকে বের হলাম, তখন আমার মনে যে শান্তি এবং নিজের উপর যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা আমি করেছিলাম তা কখনও ভুলব না। কিছু কিছু এ একটা জয় করা অর্থাৎ নিজের আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চমৎকার অনুভূতি আমার মনকে ঘিরে রেখেছিল এবং আমি যখন খাবার কক্ষে গিয়ে পৌঁছালাম অন্যেরা তখন তাদের খাবারের প্রথম দফা শেষ করল। আমি যা খেতে পারলাম না তা হলো সুপ, স্বাভাবিকভাবে ধরতে গেলে তা বড় ধরনের কোনো লোকসান নয়।

ঘটনাটি ছিল বিধাতার নিরাময়কারী উপস্থিতির অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। এই যে মূল্যবান একটি অবস্থা আমার নাগালের মধ্যে পেলাম তা হলো, আমি ঐ ছুটাছুটি বাদ দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি পালন করেছিলাম। শান্ত মনে বাইবেল পড়েছিলাম, আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেছিলাম এবং শান্তিপূর্ণ কিছু চিন্তাস্রোত কয়েক মুহূর্তের জন্য মনের মধ্যে সঞ্চারিত হতে দিয়েছিলাম।

ডাক্তারগণ সাধারণত মনে হয় অনুভব করেন যে অনেক শারীরিক কষ্টই এড়ানো যেতে পারে যদি ক্রুদ্ধ হওয়া ও বিরক্ত হওয়াকে এড়ানো বা জয় করা যায় এবং এটা করা সম্ভব যদি এই দর্শন তত্বের অনুশীলন করা যায়।

নিউইয়র্কের একজন প্রসিদ্ধ নাগরিক আমাকে বলেছিলেন যে, তার ডাক্তার তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন যে, আপনি আমাদের গীর্জার ক্লিনিকে আসুন কারণ প্রশান্ত মনে বাঁচার যে দর্শনতত্ব তা আপনার আরো উন্নত করা প্রয়োজন। আপনার শক্তির উৎসগুলো ইতোমধ্যে বেহিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

আমার ডাক্তার বলেন যে, আমি নিজেকে সংযত হবার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তিনি আমাকে বলেন, আমি খুব কঠিনভাবে উত্তেজিত, অত্যাধিক টান টান অবস্থায় আছি আমি, তাই আমি হঠাৎ ক্রুদ্ধ এবং খুবই বিরক্ত হয়ে যাই, এবং শেষে আমার ডাক্তার ঘোষণা করলেন যে, আমার জন্য সবচেয়ে নিশ্চিত নিরাময় হলো বাঁচার জন্য শান্তভাব বজায় রাখার দর্শন তত্বটির অনুশীলন ও বাস্তবায়ন।

আমার দর্শণ পার্থী লোকটি উপরে উঠে আসলেন এবং মেঝের উপর দিয়ে এসে জানতে চাইলেন, কিন্তু এ পৃথিবীতে আমি তা কিভাবে করব? এটাতো বলা খুবই সহজ কিন্তু করা তত সহজ নয়।

তারপরও এই উত্তেজিত ভদ্রলোক বলেই চললেন যে, তার ডাক্তার তাকে বেঁচে থাকার জন্য, প্রশান্ত থাকার দর্শনতত্ত্ব অভ্যাস করার কাজ বা আরো উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন। পরামর্শটি যেমনভাবে বর্ণিত হয়েছে তা খুবই সারগর্ভ কিন্তু তারপর তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, 'ডাক্তার সাহেব পরামর্শ দিয়ে বলেছেন যে, আমি আপনাকে এখানে গীর্জায় দেখতে পাচ্ছি।'

কারণ তিনি অনুভব করেন যে, যদি আমি বাস্তবিকভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করতে শিখি তাহলে তা আমার মনে শান্তি বয়ে আনবে এবং আমার রক্তচাপও কমিয়ে আনবে। তখন আমি শারীরিকভাবে যথেষ্ট ভালো অনুভব করতে থাকব। যখন আমি ডাক্তার সাহেবের ব্যবস্থাপত্রটি যে সংগত এটাও বুঝতে পারি। তিনি অভিযোগ করে বললেন, কিভাবে পঞ্চাশ বছর বয়সের একজন লোক যিনি আমারই মত চড়া ধাতের মানুষ। তার জীবনের অভ্যাসগুলো হঠাৎ করেই বদলে ফেলতে পারে, কিভাবেই বা তথাকথিত প্রশান্ত জীবন যাপনের দর্শনতত্বকেও আরো উন্নত করে তুলতে পারে?

ওতো আসলে মনে হয় এক সমস্যা। কারণ তিনি এমন এক ব্যক্তি যার মধ্যে পূঞ্জীভূত উত্তেজনাকর এবং বিশ্লেষনোম্মুখ প্রবৃত্তির অস্তিত্ব বিদ্যমান। তিনি মেঝের উপর দিয়ে দ্রুত পায়চারী করলেন, টেবিল চাপড়ালেন তার কণ্ঠে ছিল চড়া সুর। তার আচার-আচরণ কথায়বার্তায় এমন এক ছাপ তিনি রাখলেন যে যাতে বুঝা গেল তিনি সম্পূর্ণরূপে বিরক্ত এবং হতবুদ্ধি একজন লোক। তার সবচেয়ে বাজে দিকটা তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে ফেলছিলেন, কিন্তু তিনি পরিস্কার দেখিয়ে দিচ্ছিলেন তার ব্যক্তিত্বের আভ্যন্তরীন দিকটি কেমন, এবং তার এই অন্তরদৃষ্টি এইভাবে প্রকাশ করে ফেলছিলেন কিন্তু তিনি পরিস্কার দেখিয়ে দিচ্ছিন্নে তার ব্যক্তিত্বের আভ্যন্তরীন দিকটি কেমন, এবং তার এই অন্তরদৃষ্টি এভবে বুঝার জন্য আমাদের সুযোগ তৈরি করে দেয়। যখন আমি তার এসব কথা শুনলাম এবং তার মনোভাবটি লক্ষ্য করলাম, আমি আবারও বুঝতে পারলাম কোন যীশুখ্রিষ্ট মানুষের উপর তার স্মরণীয় অভিমতগুলো ব্যক্ত করেছেন। এর কারণ হলো মানুষের এমন সমস্যায় তার সমাধানটি এমন এবং আমি এর সত্যতা যাচাই করে দেখেছি। বাক চারিতার মধ্যে হঠাৎ বাক্য পরিবর্তন করে এর সুফল পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে কোনো রকম ভূমিকা না করেই আমি বাইবেল থেকে প্রাসঙ্গিক কোনো উক্তি তুলে ধরেছি, যেমন, "যারা পরিশ্রান্ত এবং ভারাক্রান্ত, তারা আমার কাছে এসো এবং আমি তোমাদের বিশ্রাম দেবো।” (মথি xi. 28) এবং আরো বললাম, আমার শান্তি তোমাদের সাথে রেখে যাচ্ছি, আমার শান্তি তোমাদের দান করছি, জগৎ তোমাদের যে শান্তি দিতে পারে না, আমি তা তোমাদের প্রদান করছি। তোমাদের হৃদয় কষ্ট না পাক, না তা ভয়ে ভীত হোক (জন xiv.27) এবং আবারো বললাম "তুমি তাকেই সম্পূর্ণ শান্তিতে রাখবে, যার মন তোমাতে স্থিত।” (যিশাইয় xxvi. 3)

এই কথাগুলো ধীরে ধীরে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এবং সুচিন্তিতভাবে বললাম যখন এই কথাগুলো বলছিলাম, লক্ষ্য করলাম যে, আমার সাক্ষাত প্রার্থীর উত্তেজিত হওয়াটা থিতিয়ে পড়ল। তার মধ্যে একটি প্রশান্তভাব নেমে এলো। এবং আমরা দুজনেই নীরব হয়ে বসে থাকলাম। মনে হলো ওভাবে আমার বেশ কয়েক মিনিট বসে কাটালাম। হয়ত সময়টা অত লম্বা ছিল না কিন্তু শেষে তিনি একটি গভীর নিশ্বাস ছাড়লেন।

তিনি বললেন, “কেমন মজার ব্যাপার। আমার অনেক ভালো লাগছে এখন, কেমন অদ্ভূত ব্যাপার তাইনা?” আমার ধারণা এমন ব্যাপারটি ঘটলো এ বাণীগুলোর জন্যই।

আমি বললাম না শুধুমাত্র ঐ কথাগুলোর জন্যই নয়, যদিও মন জয় করবার প্রভাব ফেলার অদ্ভূত শক্তি আছে ঐ বাণীগুলোর কিন্তু ঠিক ঐ মুহূর্তে গভীর কিছু একটাও ঘটেছে। মিনিটখানেক আগে তিনি আপনাকে স্পর্শ করেছেন তিনি সেই উপরওয়ালা ডাক্তার তার নিরাময়কারী স্পর্শেই আপনি অদ্ভুত অনুভূতি লাভ করেছেন। তিনি এই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।

আমার সাক্ষাৎপ্রার্থী এই নিশ্চয়তা ব্যাঞ্জক কথায় কোনরকম বিস্ময় প্রকাশ করলেন না, কিন্তু বেশ আগ্রহের সাথে এবং শোবেগ প্রবনভাবে স্বীকার করলেন, দৃঢ় বিশ্বাসের ভাবটি তার মুখের ছায়ায় ফুটে উঠলো। ঠিক তাই তিনি নিশ্চিত ছিলেন, আমি তাকে অনুভব করেছি, আপনি কি বুঝতে চাইছেন আমি তা বুঝতে পেরেছি। এখন আমি বুঝতে পারছি জীবন ধারণের জন্য প্রশান্তভাব বজায় রাখার যে দর্শন, তত্ত্বের অনুশীলন সে ব্যাপারে যীশুখ্রিস্ট আমাকে সাহায্য করবেন।

এই লোকটি দেখেছিলেন যে কিভাবে হাজার হাজার মানুষ সাধারণ এই বিশ্বাসটি আবিষ্কার করছে এবং এই নীতি অনুশীলন করে বুঝতে পারছে যে সব ধর্মই কিভাবে শান্তি এবং শান্ত ভাব মানুষের জীবনে বয়ে নিয়ে আসে এবং সে কারণেই শরীরে মনে এবং আত্মায় আসে নতুন শক্তি। আকস্মিক ক্রোধ এবং বিরক্তি নিবারণের এটাই হলো একমাত্র প্রতিষেধক।

মানুষের মনে এ পথেই আসে শান্তিপূর্ণভাব এবং এভাবেই উৎসারিত নতুন শক্তির স্পর্শ অনুভব করে। অবশ্যই এ লোকটিকে নতুন ধরনের চিন্তন এবং কর্মের শিক্ষা প্রদান আবশ্যক ছিল। এ কাজটি তার প্রতি করতে হয়েছে অংশত সুদক্ষ আধ্যাত্মিক সাহিত্যিকদের লিখিত পরামর্শের মাধ্যমে। উদাহরণ স্বরূপ আমরা তাকে গীর্জায় যাওয়ার অভ্যাস করতে শিক্ষা দিয়েছিলাম। (সর্ব ধর্মেই এমন ব্যাপার ফলপ্রসু)

আমরা তাকে শিখিয়েছিলাম গীর্জার উপাসনা কিভাবে থেরাপির মত কাজ করে। তাকে শেখানো হয়েছিল প্রার্থনার বিজ্ঞানসম্মত প্রয়োগ এবং শিথিল সহজ ভাব বজায় রাখার কায়দা এবং এই অনুশীলনের ফলশ্রুতি হিসেবে পরবর্তীতে তিনি একজন সুস্বাস্থ্যবান লোকে পরিণত হয়েছিলেন যদি কেউ এই অনুক্রম অনুসরণ করতে ইচ্ছে করে এবং আন্তরিকভাবে এই নীতিমালা দিনের পর দিন অনুশীলন করে, তাহলে আমি বিশ্বাস করি সে তার অভ্যান্তরীন শান্তি ও শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হবে। এমন অনেক কৌশল এ বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিরাময়কারী এই কৌশল অনুশীলন প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন যাদুকরী কিম্বা সহজ কোন পথে আবেগগত নিয়ন্ত্রণ লাভ করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র কোন বই পড়েও আপনি এ বিষয়টির তেমন বিকাশ সাধন করতে পারবেন না, যদি তা প্রায়শ:ই আপনার সাহায্যকারী হিসেবেই কাজ করবে। একে বাস্তায়িত করতে হলে একমাত্র নিশ্চিত পথ হলো নিয়মিত এর উপর কাজ চালিয়ে যাওয়া। কোনরকম বিলম্ব না করে বৈজ্ঞানিক ভাবে এবং সৃজনশীল বিশ্বাসের বিকাশ সাধন করেই তা করতে হবে।

আমার পরমর্শ হলো যে, আপনি প্রাথমিক প্রক্রিয়াস্বরূপ করুন সাধারণভাবে এটা হবে শারীরিকভাবে শান্ত থাকার অনুশীলন, কক্ষের ভেতর ছোটাছুটি করবেন না। হাত পাকাবেন না, আঘাত করা, চিৎকার করা তর্ক বিতর্ক করা অথবা উপর নীচ হাঁটাহাঁটি করা থেকে বিরত থাকুন। উত্তেজনায় কাপতে থাকবেন না। মনে রাখবেন উত্তেজনা মানুষের শারীরিক গতিবিধির উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। কাজেই এসব করতে হলে কোন সাধারণ জায়গার শুধু করুণ এবং তা হবে শারীরিক গতিবিধির বিরাম সহকারে। শান্ত হয়ে দাঁড়ান, বসে পড়ুন, এবং শুয়ে পড়ুন। কন্ঠস্বর অবশ্যই নীচু সুরে বেঁধে রাখবেন।

শান্তভাব নিয়ন্ত্রণের বিকাশ সাধনের জন্য শান্তভাবে চিন্তা করা আবশ্যক কারণ চিন্তার ধরনটি সবসময় সংবেদনশীলভাবে শরীরের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং মনের মধ্যে আনাগোনা করে। আর এও সত্যি যে শরীরকে প্রথমে শান্ত করতে পারলে মনকেও শান্ত করা সম্ভব। বলা যেতে পারে যে, শারীরিক ভাব ভঙ্গি আকঙ্খিত মানসিক ভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

আমার কোন এক বক্তব্যে আমি নীচের ঘটনাটি বর্ণনা করেছিলাম, ঘটনাটি ঘটেছিল আমাদের এক সমিতির সভায়। এক ভদ্রলোক আমার কাছ থেকে ঘটনাটি শুনে খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং আন্তরিকভাবে একে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। যেমন পরামর্শ দেয়া হয়েছিল ঠিক তেমনিভাবে তিনি এ কৌশলটি প্রয়োগ করেন এবং আমাকে জানান যে, ক্রুদ্ধ হওয়া ও বিরক্ত হওয়া নিয়ন্ত্রনের কাজে খুবই ফলপ্রদভাবে কাজ করেছে।

যে সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম ওখানে একটি বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছিল এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা তিক্ত অবস্থায় চলে গিয়েছিল, মেজাজ খারাপ হতে হতে কলহ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল এবং একজন তো একেবারেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। তীক্ষ্ম তীক্ষ্ম সব মন্তব্য ছুড়ে দিতে শুরু করল। হঠাৎ একজন উঠে দাঁড়ালেন এবং ইচ্ছা করেই গা থেকে কোটটি খুলে ফেললেন, খুলে ফেললেন কলারটিও এবং আরাম কেদারায় শুয়ে পড়লেন। এ দেখে তো সবাই অবাক এবং একজন জিজ্ঞেস করলেন, তিনি অসুস্থবোধ করছেন কিনা।

তিনি বললেন, “না, আমার ভালোই লাগছে কিন্তু মনে হচ্ছে আমি পাগল হতে শুরু করেছি এবং আমি জানতে পেরেছি যে শুয়ে শুয়ে পাগল হওয়া কঠিন ব্যাপার।”

তার কথা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম, এবং আমাদের দুঃচিন্তাটা এখানেই ভেঙ্গে গেল। তারপর আমাদের এই খামখেয়ালী বন্ধুটি ব্যাখ্যা করতে থাকলেন যে, তিনি নিজের সাথে ছোট একটি কৌশল খাটাবার চেষ্টা করছেন। তার ছিল ক্ষিপ্ত মেজাজ এবং যখন তার মনে হতো যে তিনি পাগল হতে চলেছেন, তখন তিনি লক্ষ্য করতেন যে, তার মুষ্টি দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং কণ্ঠ চড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তিনি তার আঙ্গুলগুলো প্রসারিত করে রাখতেন যাতে সেগুলো মুষ্টি বদ্ধ হতে না পারে। মানসিক চাপ এবং ক্রোধ বৃদ্ধি পাবার আনুপাতিক হার অনুসারে তার কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনতেন এবং অতি নিম্নস্বরে কথা বলতেন তেঁতো হাসি হেসে বললেন, আপনি তো ফিস ফিস করে কথা বলে যুদ্ধ প্রদর্শন চালিয়ে যেতে পারেন।”

এই মূলনীতিটি আবেগগত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে, অযথা বিরক্তিবোধ মানসিক চাপ ইত্যাদি সবকিছু পরীক্ষা নিরিক্ষা করে আবিস্কৃত হয়েছে, সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কাজেই প্রাথমিক পদক্ষেপ স্বরূপ শান্ত অবস্থা আয়ত্ব করার জন্য আপনার শারীরিক প্রতিক্রিয়া সুশৃঙ্খল করুন, আপনি অবাক হয়ে যাবেন যে, কত দ্রুত আপনার আবেগজনিত উত্তাপকে কমিয়ে আনতে পারে।

এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে এবং যখন আবেগজনিত উত্তাপ বিতারিত হয়ে যায় আকস্মিক ক্রোধ এবং বিরক্তিও তখন থিতিয়ে পড়ে। এর ফলশ্রুতি হিসেবে আপনি কতটা শক্তি এবং ক্ষমতা বাঁচাতে পারবেন তা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাবেন। তখন আপনি অনেক কম ক্লান্তি অনুভব করবেন।

অধিকন্তু এটা এমন এক পদ্ধতি যার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে আপনি ঢিলে ঢালা এমনকি উদাসীনও হতে পারবেন নির্দিষ্ট একটি সীমা পর্যন্ত উদাসীন হওয়া অনুশীলন করা ভালো বৈ খারাপ কিছু নয়। এভাবেই মানুষ আবেগকে অনেকটা রুখে দেবার কৌশল রপ্ত করেছে। খুবই সুসংহত ব্যক্তি যারা তারা চর্চার মাধ্যমে খুব ভালোভাবে মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া অনেক মাত্রায় কমিয়ে আনতে সক্ষম।

স্বাভাবিকভাবে কেউ, অন্তত যিনি খুব সুসংহত ব্যক্তি তিনি তার একান্ত উৎসাহী, অনুভূতিশীল সমবেদনাপূর্ণ বৈশিষ্টকে হারাতে চান না। কারণ এগুলো তার মানবিক সম্পদ। কিন্তু ঢিলা মেজাজে চলার অনুশীলন একজন উত্তেজিত ব্যক্তিকে ভারসাম্যপূর্ণ আবেগঘন অবস্থায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

ছ'টি বিষয় নিয়ে গঠিত একটি সুন্দর কৌশল নীচে যা তুলে দেয়া হলো আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি যে, এর বিরাট উপকারিতা কিভাবে ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হওয়ার মাত্রা কমিয়ে ফেলছে। অগণিত মানুষকে আমি পরামর্শ দিয়েছি এ বিষয়গুলোকে প্রয়োগ করে দেখার জন্য যাতে তারা এর বিরাট মূল্য উপভোগ করতে পারে।

১। আরাম কেদারায় শিথিলভাবে বসুন। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে চেয়ারে সমর্পণ করে দিন। পায়ের আঙ্গুলের ডগা থেকে আরম্ভ করে একেবারে মাথার চুলের ডগা পর্যন্ত শরীরের সমস্ত অংশে শিথিলভাব ধারন করুন। এ কথাগুলো বলে শিথিলভাব নিশ্চিত করুন: আমার আঙ্গুলের ডগা এখন সহজ শিথিল, আমার হাতের আঙ্গুল আমার মুখ বয়বের পেশি সব সবই এখন শিথিল।

২। নিজের মনের কথা এমনভাবে চিন্তা করুন তা যেন ঝড়ের সময়কার হ্রদের পানির উপরিভাগের মত, ঢেউয়ের তোড়ে আন্দোলিত এবং ভীষণ বিক্ষুব্ধ কিন্তু এখন ঢেউগুলো থিতিয়ে পড়েছে এবং হ্রদের উপরিভাগ এখন শান্ত এবং অসংক্ষুব্ধ।

৩। আপনার দেখা সবচেয়ে সুন্দর এবং শান্তিপূর্ণ দূশ্যবলী নিয়ে দু বা তিন মিনিট ভাবুন, উদাহরণস্বরূপ পর্বতের আড়ালে সূর্যাস্তের দৃশ্য, বা নিস্তব্ধতায় পূর্ণ ভোরের গভীর উপত্যকার কথা অথবা মধ্যাহ্নের বনরাজির কথা বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউয়ের উপর ঝলমলে চাঁদের আলোর কথা এসব নিয়ে চিন্তা করুন।

৪। ধীরে ধীরে বার বার শান্তভাবে সৃষ্টিকর্তার সুন্দর সুরের সাথে পরপর কতগুলি বিশেষ শব্দমালা যেগুলো নিস্তব্ধতা প্রান্তি প্রকাশ করে যেমন: (ক) প্রশান্তি এ শব্দটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এবং শান্তিপূর্ণ মন নিয়ে বলতে থাকুন (খ) ধৈর্য (গ) নিস্তব্ধতা এ ধরনের আরো যে সব শব্দ আছে সেগুলোও আপনি বার বার উচ্চারণ করতে থাকুন।

৫। আপনার জীবনের মানসিকভাবে মুক্ত থাকার সময়ের একটি তালিকা তৈরি করুন, যখন বিধাতার সযত্ন সেবা আপনি আপনার বিশেষ চেতনা শক্তির দ্বারা বুঝতে পারেন, এবং স্মরণ করুন কিভাবে আপনি বিরক্তবোধ করেছিলে এবং উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। আর এমন অবস্থায় কেমন করে তিনি আপনার মধ্য থেকে সমস্যাকে বের করে এনে আপনার যত্ন নিয়েছেন। তারপর আপনি জোরে জোরে পুরাতন স্তব গীতির এই লাইনটি উচ্চারণ করুন, দীর্ঘকাল তোমার শক্তি আমাকে রক্ষা করেছে। এও নিশ্চিত যে, সেই শক্তিই এখনও আমাকে পরিচালিত করছে।

৬। নীচে উল্লেখিত কথাগুলো বার বার বলুন, কারণ এই কথাগুলোর এমন বিস্ময়কর শক্তি আছে যা আপনার মনকে সহজ, সিথিল এবং শান্ত করে তুলতে পারে। তাকেই তুমি রাখবে নিশ্চিত শান্তিতে যার মন তোমাতে সুস্থির (যীশাইয় xxvi.3) দিনে কয়েকবার এই কথাগুলো উচ্চারণ করুন, যে মুহূর্তে সুযোগ পান সে মুহূর্তেই এই কথাগুলো স্মরণ করুন। সম্ভব হলে বেশ জোরে জোরেই বলুন, সুতরাং দিনের শেষে দেখা যাবে কথাগুলো আপনি অনেকবার বলে ফেলেছেন। এ কথাগুলোকে এমন বিশ্বাস নিয়ে কল্পনা করুন যেন, এগুলো কার্যকর সুক্ষ্মপথে মনে প্রবেশ করার মত মূল বিষয়বস্তু, চিন্তা শক্তির আনাচে কানাচে পৌঁছবার মত আরোগ্যকর ঔষধের মত। এ হলো মানসিক চাপ থেকে আপনাকে মুক্ত করার সুবিদিত ঔষধ।

যখন আপনি পরামর্শ অনুযায়ী এ অধ্যায়ে প্রদত্ত কৌশলগুলো নিয়ে বাস্তব প্রয়োগের কাজ শুরু করবেন দেখবেন, আপনার ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হবার প্রবনতা ক্রমশ: পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। ক্রমোন্নতির সরাসরি আনুপাতিক হার অনুসারে যে শক্তি আপনার মধ্য থেকে বের করে নেয়া হয়েছিল এই অসুখকর অভ্যাসের দ্বারা, আপনি এখন অনুভব করতে পারবেন যে, জীবনের দায় দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালনের জন্য আপনার সামর্থ কতখানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

৭। সবচেয়ে ভালো কিছু আশা করুন এবং তাই লাভ করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00