📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 শান্তিপূর্ণ মন শক্তি উৎপাদন করে

📄 শান্তিপূর্ণ মন শক্তি উৎপাদন করে


একদিন এক হোটেলের খাবার ঘরে বসে প্রাতরাশ করছি আমরা তিনজন, আলাপচারিতায় আমরা তিনজনেই স্বীকার করলাম যে গতরাতে আমাদের কি ভালো ঘুমই না হলো, আলাপটির বিষয়বস্তু ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এক লোক তার বিনিদ্র রাত সম্বন্ধে অভিযোগ করল অর্থাৎ তার রাতে একদম ঘুম হয়নি। সারারাত সে উত্তেজিতভাবে শুধু এপাশ ওপাশ করেছে এবং শয়ণ করা সত্যেও সে অত্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। "অনুমান করুন, শুতে যাবার আগে আমি এমন কি খবর শুনা বন্ধ করে দেয়া ভালো বলে মনে করেছিলাম। যদিও গতরাতে আমি রেডিও শুনতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার শ্রবণেন্দ্রিয় শুধু কষ্টই ভোগ করছিল। শ্রবণেন্দ্রিয়ের কষ্ট এটি একটি phrase সারারাত তার উপদ্রবের মধ্যে কেটেছে, ছোটখাটো হলেও তা অবাক করার মত ব্যাপার। গভীর চিন্তিতভাবে সে বলল, হয়ত শুতে যাবার আগে আমি কফি পান করেছিলাম এটা তার একটা বিক্রিয়াও হতে পারে।

অপরজন বলল: আমার বিষয়টি কিন্তু অন্যরকম, আমি একটি চমৎকার রাত কাটিয়েছি। আমি খবরাখবর পেয়েছি খবরের কাজ থেকে এবং আগে ভাগেই রেডিও থেকেও, তাতে সুবিধা হলো এই যে, ঘুমাতে যাবার আগেই খবরগুলো হজম করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সে আরও বলল, “অবশ্যই এক্ষেত্রে আমার ঘুমাতে যাও পরিকল্পনাটি ব্যবহার করেছি, যা কখনও কাজে লাগতে ব্যর্থ হয়নি।”

তার পরিকল্পনাটির জন্য আমি তাকে খোঁচা মেরে উৎসাহিত করলাম। সে যে ব্যাখ্যাটি দিল তা নিম্নরূপ: আমি যখন একজন বালক ছিলাম, আমার কৃষক বাবাকে দেখতাম, উনি শোবার আগে পরিবারের সবাইকে বৈঠকখানায় জড়ো করতেন এবং আমাদেরকে বাইবেল পড়ে শোনাতেন। (এখানে আমি বলব, যে যার ধর্ম মতে নিজ নিজ ধর্মশাস্ত্র পাঠ করুণ।) আমার মনে হয় আমি এখনও তা শুনতে পাই। প্রকৃতপক্ষে যখনই আমি বাইবেলের বাণী শুনি, মনে হয় আমি আমার বাবার কণ্ঠেই তা শুনতে পাচ্ছি।

প্রার্থনার পর আমি সোজা আমার ঘরে চলে যেতাম এবং দারুণ ঘুম হতো আমার। কিন্তু যখন বাসা ছেড়ে বেরুতام، তখন বাইবেলের বাণী মনে মনে আওড়াতাম এবং প্রার্থনা করতে করতে বেরুতাম।

"আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, বাস্তবে বহু বছরের মধ্যে আমি একবার মাত্র প্রার্থনা করেছিলাম যখন আমি একটি দীর্ঘ জ্যামে পড়েছিলাম। কিন্তু কয়েক মাস আগে বেশকিছু কঠিন সমস্যায় পড়াতে আমি এবং আমার স্ত্রী ঠিক করেছি যে, আমরা আবার প্রার্থনা চালিয়ে যাব। আমরা দেখলাম অভ্যাসটি দারুণ উপকারী তাই এখন ঘুমাতে যাবার আগে আমরা দুজনেই একত্রে বাইবেল (যার যার ধর্মশাস্ত্র পড়ুন) পড়ি এবং সংক্ষিপ্ত প্রার্থনায়ও বসি। আমি জানিনা এর মধ্যে কি আছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি আমার ভালো ঘুম হচ্ছে এবং জীবনের চলার পথে সবকিছুই ভালোভাবে চলছে। প্রকৃতপক্ষে, আমি দেখতে পাচ্ছি বিষয়টি দারুণ কাজের এবং যা বাইরে পথে ঘাটে যে কোনখানে সমানভাবে উপকারী, যেমনটা আমি এখন বুঝতে পারছি, তাই এখনও আমি বাইবেল পড়ি এবং প্রার্থনা করি। (স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থ পড়ুন) গতরাতেও শুতে যাবার আগে সাম সঙ্গীত ২৩ অধ্যায় পড়েছি। বেশ জোরে জোরেই পড়েছি এবং এতে ঐশ্বিকভাবে আমার দারুণ কিছু হয়েছে।"

সে অন্যদের দিকে ফিরে বলল: "আমি শ্রবণেন্দ্রিয়ের যন্ত্রণা নিয়ে বিছনায় যাইনি, কিন্তু মন ভরা শান্তি নিয়ে ঘুমাতে গিয়েছি।”

বেশ, দুটো রহস্যপূর্ণ বা গূঢ়ার্থক phrase আছে-'একটি হল শবণেন্দ্রিয়ের যন্ত্রণা, এবং অন্যটি হল 'শান্তিপূর্ণ মন।'

আপনি কোনটি পছন্দ করবেন?

এর গুপ্ত সুরভি লুকিয়ে আছে আপনার মনোবৃত্তির পরিবর্তনের মধ্যে। একজন অবশ্যই বিভিন্ন চিন্তা চেতনার উপর বেঁচে থাকবে, এবং এমনকি যদিও চিন্তার পরিবর্তন করতে হলে প্রয়োজন চেষ্টা, এটা আপনি যে ধরনের জীবন যাপন চালিয়ে যাচ্ছেন, তার থেকে অনেক সহজ কাজ। চাপের মধ্যে থাকা জীবনত খুবই কঠিন জীবন। আভ্যন্তরিক শান্তির যে জীবন, তা সুসমঞ্জস এবং চাপবিহীন হওয়াতে, তা সবচেয়ে সহজ রকমের এক অস্তিত্ব বা বেঁচে থাকা। মনের শান্তি লাভের জন্য যে প্রধান চেষ্টা বা সংগ্রাম তা হলো, আপনার চিন্তা ভাবনার এক ধরণের পূণ: সংস্কারের ব্যাপার যা আপনার শিথিল মনোভাবের মধ্যে বিধাতা প্রদত্ত শান্তিরূপ দান গ্রহণ করার ইচ্ছা জাগিয়ে তুলেছে। শিথিল মনোভাব গ্রহণের এবং সেহেতুই শান্তি পাওয়ার উদাহারণ স্বরূপ কোন শহরের অভিজ্ঞতার কথা আমি সবসময় ভাবি, যে শহরে কোন এক সন্ধ্যায় আমি বক্তব্য রেখেছিলাম। বক্তৃতামঞ্চে যাবার আগে আমি স্টেজের পিছনে বসেছিলাম, যখন বক্তব্য রাখার জন্য যাচ্ছি তখন এক লোক আমাকে এসে বলল, যে তিনি ব্যক্তিগত একটি সমস্যা নিয়ে আমার সাথে একটু আলাপ করতে চান।

আমি তাকে জানালাম যে, এই মূহুর্তে তা সম্ভব নয়, কারণ সবার মধ্যে পরিচিত হবার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছে, কাজেই আপনি অপেক্ষা করুণ, আমি পরে কথা বলব। যখন বক্তব্য দিচ্ছিলাম, লক্ষ করলাম তিনি মঞ্চের পাশে স্নায়ুরোগীর মত এদিকওদিক হাঁটছেন, কিন্তু পরে তাকে আর কোথাও দেখা গেল না। যাহোক, তিনি আমাকে তার একটি কার্ড দিয়েছিলেন যা থেকে বুঝতে পারা গেল যে তিনি মোটামুটিভাবে শহরে একজন প্রভাবশালী লোক।

হোটেলে ফিরে এলাম, যদিও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ঐ লোকটির জন্য আমি তখনও মনে মনে কষ্ট পাচ্ছিলাম। কাজেই আমি তাকে ফোন করলাম। আমার ফোন কল পেয়ে লোকটি খুব অবাক হয়েছিলেন এবং একটু ভেঙ্গেই বললেন যে, আমাকে আসলেই খুব ব্যস্ত দেখে তিনি আর অপেক্ষা করেননি। তিনি বললেন, "আমি চেয়েছিলাম যে আপনি আমার সাথে প্রার্থনা করুণ।” “আমি ভেবেছিলাম, যদি আপনি আমার সাথে প্রার্থনা করতেন, আমি হয়ত একটু শান্তি পেতে পারতাম।”

আমি তাকে বললাম, এখন যদি আমরা ফোনের মধ্য দিয়ে একত্রে প্রার্থনা করি তাহলে তো এমন কিছু নেই যা আমাদের বাধা দিতে পারে।

কিছুটা অবাক হয়ে তিনি বললেন: 'টেলিফোনে প্রার্থনা' এমন কথা আমি কখনও শুনিনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কেন নয়?” টেলিফোন হল যোগাযোগের একটি ছোট্ট যন্ত্র। আপনি হয়ত কয়েক ব্লক দূরে আছেন কিন্তু টেলিফোনের মাধ্যমে আমরা একত্রে আছি, তাই নয় কি? তাছাড়া, আমি আরও বললাম, ঈশ্বরতো আমাদের সবার সাথেই আছেন। ঈশ্বর এই টেলিফোন লাইনের উভয়প্রান্তেই আছেন, এবং লাইনের মধ্যেও আছেন। তিনি আপনার সাথেও আছেন, আমার সাথেও আছেন। “ঠিক আছে,” তিনি আমার কথাগুলো সত্যি বলে স্বীকার করলেন। "আমার জন্য প্রার্থনা করলে আমি খুব খুশি হব।”

সুতরাং আমি চোখ বন্ধ করলাম, এবং টেলিফোনে লোকটির জন্য প্রার্থনা করলাম এবং এমনভাবে প্রার্থনা করলাম যেন মনে হল, আমরা দুজন একই ঘরে অবস্থান করছিলাম। তিনিও প্রার্থনা শুনলেন এবং ঈশ্বরও শুনলেন। যখন আমি প্রার্থনা শেষ করলাম তখন তাকে পরামর্শ দিয়ে বললাম: "আপনি প্রার্থনা করবেন না?" এর কোন উত্তর পাওয়া গেল না। তারপর ফোনের অন্যপ্রান্তে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম এবং শেষে বললেন, "আমি কথা বলতে পারছি না।”

"আমি তাকে পরামর্শ দিয়ে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, চলতে থাক, আরও দু'একমিনিট কেঁদে নিয়ে আপনি প্রার্থনা করুণ।” ঠিক যা যা আপনার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা সরলভাবে বিধাতাকে জানান। আমি ধারণা করছি এটি একটি ব্যক্তিগত টেলিফোন লাইন, যদি তা নাই হয় এবং যদি কেউ শুনে ফেলছে বলে মনে করেন, তাহলেও কোন সমস্যা নেই। যতদূর সম্ভব, যে কেউ আমাদের এই আলাপে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়তে পারে, কিন্তু আমরাতো শুধু দুটি কণ্ঠ, তাই নয় কি, আর শুধুমাত্র কণ্ঠের আওয়াজ শুনে কেউ চিনতেই পারবে না, এ আমি এবং আপনি।”

এতে তিনি উৎসাহিত হলেন এবং প্রার্থনা শুরু করলেন, প্রথমে দ্বিধাগ্রস্তভাবে, তারপর গভীর আবেগের সাথে হৃদয় ঢেলে প্রার্থনা করতে থাকলেন, প্রার্থনা ভরে উঠল ঘৃণায়, নৈরাশ্যে; ব্যর্থতার গ্লানিতে, অর্থাৎ উনার নিজের অবস্থাটিকে প্রার্থনায় ব্যক্ত করলেন। করলেন অবশেষে প্রার্থনা করলেন বিলাপের সাথে; “হে ঈশ্বর, আমার মনের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে তোমার কাছে সবিনয় প্রার্থনা করছি। আমার জন্য যা হোক কিছু কর, কারণ তোমার জন্য আমি কখনও কিছুই করিনি। আমার ধারণা তুমি জান যে, আমি কেমন মূল্যহীন ও গুরুত্বহীন এক মানুষ। এমনকি যদিও আমি একজন বড় মানুষের ছদ্দবরণে রয়েছি, কিন্তু এসব সত্যেও আমি অসুস্থবোধ করছি, প্রিয় ঈশ্বর আমাকে সাহায্য কর।"

সুতরাং আমি আবার প্রার্থনা করলাম, এবং ঈশ্বরকে বললাম, ওর প্রার্থনার জবাব দাও, তরপর বললাম, “হে প্রভু ফোনের অপরপ্রান্তে আমার বন্ধুর উপর তোমার হাত রাখ এবং তাকে তোমার শান্তি দান কর। এখন তাকে সাহায্য কর যেন তিনি নিজেকে তোমার কাছে সর্ম্পণ করতে পারেন এবং তোমার আশীর্বাদের দান গ্রহণ করতে পারেন।” এরপর আমি থামলাম বেশ কিছুক্ষণের বিরতি; তারপর এমন এক কণ্ঠে তাকে বলতে শুনলাম, যা আমি জীবনে কখনও ভুলতে পারব না, বললেন : “এ অভিজ্ঞতার কথা আমি সব সময় মনে রাখব, এবং আমি আপনাদের জানাতে চাই যে বিগত মাসগুলির মধ্যে এই প্রথম আমি আমার ভেতরটাকে পরিচ্ছন্ন বলে স্যন করছি এবং অন্তরে সুখী ও শান্তিপূর্ণ বলে অনুভব করছি।” মনের শান্তি পাবার জন্য লোকটি খুবই সাদাসিধে একটি কৌশল কাজে লাগিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি তার মনকে একেবারেই খালি করে ফেলেছিলেন এবং এভাবেই গ্রহণ করেছিলেন ঈশ্বরের শান্তি রূপ দান।

একজন ডাক্তার হিসেবে বলছি: "আমার অনেক রোগী আছে, যাদের এমনিতে তেমন কোন দোষত্রুটি নেই, কিন্তু সমস্যাটা তাদের মনের ভাবনা চিন্তায়। সেজন্য আমার খুব প্রিয় প্রেসক্রিপশান আছে যা আমি আমার কিছু কিছু রোগীদের জন্য লিখে থাকি। যে প্রেসক্রিপশান আমি লিখি তা হলো, বাইবেলের উক্তি। (রোমান xii-2) এমনটি সব শাস্ত্রেই কিন্তু আছে। মনকে সুস্থ করার জন্য তা খুবই অপরিহার্য। আমি আমার রোগীদের ঐ প্রেসক্রিপশান দেখাই, এবং তারা এটি পড়ে দেখে,... আপনি আপনার মনকে নতুন করে সাজিয়ে নতুন জীবন ধারণ করুণ,... সুখি ও স্বাস্থ্যবান হবার জন্য আপনাদের মনের নবায়ন করা খুব প্রয়োজন, এবং তা হলো আপনাদের চিন্তাধারায় এক ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসা। যখন তারা এ ব্যবস্থাপত্রটি গ্রহণ করে, তারা আসলে তাদের মনে পরিপূর্ণ শান্তি লাভ করে। আর এভাবেই তারা সুস্বাস্থ্য ও সহায় সম্পদের নাগাল পায়।”

মনে পরিপূর্ন শান্তি পাবার জন্য প্রাথমিকভাবে একটি পদ্ধতি অনুশীলন করতে হয়, তা হলো, মনকে একেবারে শূন্য করে ফেলা। এ বিষয়ে জোরালো এবং বিস্তারিত জানান হবে পরবর্তী অধ্যায়ে, কিন্তু এখানে আমি উল্লেখ করছি, বার বার মন পরিষ্কার করার বিবেকের গুরুত্বকে হিসেবে ধরে রাখতে। এক্ষেত্রে আমি সুপারিশ করব যে, মন পরিষ্কার করার এ বিষয়টি দিনে অন্তত: দু'বার অভ্যাস করা ভালো, এমনকি প্রয়োজনে প্রায় প্রায়ই যদি করা যায় তাও ভালো। এখন কথা হল মন পরিষ্কার করার ব্যাপারটি হল মন থেকে ভয়ভীতি, ঘৃনাবোধ, নিরাপত্তাহীনতা, দুঃখ-সন্তাপ এবং দোষী ভাবার হীনতাসমূহ বিদূরিত করার অভ্যাস করা। কারণ এসব যদি মনকে সবসময় দখল করে রাখে তবে সেই মনের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায় না। মোদ্দা কথা হল, আপনি সচেতনভাবে এমন চেষ্টা করুণ যাতে আপনার মনটা পরিষ্কার হয় এবং শান্তিপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ দিতে পারে। এমন অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার কিংবা বন্দিত্ব মোচনের অভিজ্ঞতা কি আপনার হয়নি, যখন আপনি আপনার বিরক্তিকর বিষয়গুলোকে আপনার বিশ্বস্ত কারো হাতে ন্যস্ত করে একেবারে হালকা ও স্বচ্ছন্দবোধ করেছেন যে উপদ্রবগুলো আপনার বুকে পাথর চাপার মত ভারি হয়েছিল? একজন ধর্মযাজক হিসেবে আমি প্রায়ই লক্ষ্য করেছি যে, কাউকে খুব বিশ্বস্ত লোক হিসেবে পেয়ে তার কাছে মনের যত কষ্টের কথা সত্যি সত্যি এবং বিশ্বস্ততার সাথে ব্যক্ত করতে পেরে অনেকের জীবনে কেমন গুরুত্ব বয়ে এনেছে।

সম্প্রতি হনুলুলুর উদ্দেশ্যে এক সমুদ্রভিযানে S.S. Lurline জাহাজে আমি একটি ধর্মসভা পরিচালনা করেছিলাম। যারা তাদের মনে বিরক্তি বা দুশ্চিন্তা এসব বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, আপনারা জাহাজের পিছন দিকে গিয়ে, কাল্পনিকভাবে আপনাদের মনের উদ্বিগ্নকর দুশ্চিন্তাগুলোকে পানিতে ফেলে দিতে পারেন, দেখবেন এগুলো জাহাজের পিছনে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। একে একেবারেই শিশুসুলভ এক পরামর্শ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ঐদিনই পরে এক লোক এসে আমাকে জানালেন: আপনি যেমন পরামর্শ দিয়েছিলেন আমি ঠিক তেমনটিই করে অবাক হয়ে দেখলাম যে, কতটা শান্তি ও প্রান্তিবোধ করছি। উনি আও বললেন: “এই সমুদ্রযাত্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি আমার বিরক্তিগুলোকে পানিতে ফেলতে থাকি যে পর্যন্ত না আমার চেতনা থেকে সমস্ত জঞ্জাল ফেলা শেষ হয় এবং আমার মনস্তাত্বিক অবস্থার উন্নতি হয়। প্রতিদিন আমি দেখবো যে, সময় সমুদ্রে কেমন করে ওসব অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ধর্ম শাস্ত্রেও (বাইবেলে) কি ঠিক একথাই লিখেনি, যে যা পিছনে ফেলে এসেছ, তাকে ভুলে যাও?”

যে লোকটির কাছে এই পরামর্শটি বিশেষ অনুভুতি জাগিয়েছিল তিনি কিন্তু একজন অবাস্তব অনুভূতিপ্রবণ ব্যক্তি নয়। অন্যদিকে, তিনি একজন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা বিশিষ্ট লোক, তার নিজস্ব পরিমণ্ডলে তিনি একজন সুবিদিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।

অবশ্যই শুধুমাত্র মনটি পরিষ্কার কিম্বা জঞ্জালশূণ্য করাই যথেষ্ট নয়। মনটা যখন শূণ্য হয়ে গেল, তখন সেখানে অন্যকিছু প্রবেশ করতে বাধ্য। মন এমন এক জায়গা, যেখানটা দীর্ঘসময় খালি থাকতে পারে না। আপনি আপনার মনকে স্থায়ীভাবে শূন্য রেখে বেশিদূর চলতে পারেন না। আমি স্বীকার করি যে, কিছুসংখ্যক লোক ঐ সাহসিক কাজটি করে থাকে, কিন্তু সমস্যার সমস্ত দিক চিন্তা করে বলতে গেলে, শূন্য মন বা পুরনো মন, নতুনে পূর্ণ করা প্রয়োজন কারণ তাহলে সুখপ্রদ নয় এমন চিন্তাগুলো, যা আপনি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, তা আবার চুপে চুপে এসে আপনার মনের মধ্যে প্রবেশ করবে।

এমনটি ঘটে যাওয়াকে প্রতিহত করতে হলে, কালক্ষেপ না করে আপনাকে সৃষ্টিশীল ও সুস্থ চিন্তায় অণুভূতিতে মনকে ভরে ফেলতে হবে। তারপর যখন পুরনো ভয় ভীতি; ঘৃণা, বিরক্তি যেসব আপনাকে লম্বা সময় ধরে ভূতগ্রস্থ করে রেখেছিল সেগুলো আবার তীক্ষ্ণ হয়ে ফিরে আসতে চেষ্টা করবে, সেগুলো বস্তুত: আপনার মনের দরজার ওপর একটি চিহ্ন খুঁজে পাবে এবং পড়ে দেখবে, 'অধিকৃত' শব্দটি লিখা অর্থাৎ খালি নেই। আপনার মনের ভেতরে ঢুকবার জন্য ওরা প্রচণ্ডভাবে চেষ্টা করবে, উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘদিন আপনার মনের ভেতর থেকে যাওয়া, ওদের অণুভূতিটা এমন যে, আপনার মন ওদের প্রিয় বাসস্থান। কিন্তু যে সুস্থ এবং নতুন চিন্তা ভাবনা আপনার মনের মধ্যে আপনি ঠাঁই দিয়েছেন এখন তা হবে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী সুরক্ষিত এবং সেজন্যই ওদের বিতারিত করতে সক্ষম। উপস্থিতভাবে পুরনো চিন্তাগুলো একসাথে আপনাকে একা ছেড়ে চলে যাবে। আপনি তখন স্থায়ীভাবে শান্তিপূর্ণ এক সুন্দর 'মন' উপভোগ করতে পারবেন।

দিনের অবকাশ সময়ে নির্ধারিত শান্তিপূর্ণ চিন্তার ধারাবাহিক মানসিক চিত্র যা আপনি কখনও চাক্ষুস করেছেন তা আপনার মনের মধ্যে দিয়ে ধীরে চলতে দিন, উদাহরণ স্বরূপ, সন্ধ্যাবেলার যান। সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ইন্দ্রিয় অণুভূতির যে নিস্তব্ধতায় দারুণ সুন্দর কোন উপত্যকা যখন অস্তমিত সূর্য চলে যায় বিশ্রামে, ছায়াগুলো বড় হতে থাকে; তখনকার কথা। অথবা স্মরণ করুণ চাঁদের রূপালী আলো ক্ষুদ্র তরঙ্গায়িত পানির উপর পড়ছে, অথবা মনে করুণ সমুদ্রের স্বচ্ছ পানি বালুর নরম সৈকত আলতোভাবে ধুয়ে দিচ্ছে। এরকম শান্তিপূর্ণ চিন্তার মানসিক চিত্রাবলী আপনার মনের উপর আরোগ্যকারী ঔষধ হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং প্রতিদিন সময় সময় ঐ চলমান শান্তি রূপ ছবিগুলোকে ধীরে ধীরে আপনার মনের মধ্য দিয়ে চলতে দিন।

যেভাবে পরামর্শ দেয়া হয়েছে সেগুলোর সুস্পষ্ট উচ্চারণ কৌশল অভ্যাস করুণ, তাহলো বারংবার ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দগুলো শ্রুতিমধুর রূপে বলতে থাকুন। ঐসব বাণীর কিন্তু গভীর ইঙ্গিতপূর্ণ শক্তি আছে এবং ঐ বাণীগুলোর যথাযথ ভাবে বলার মধ্যে নিহিত রয়েছে আরোগ্য। একটু ভেবে দেখুন, আপনি যদি একটার পর একটা করে কিছু আতঙ্কজনক শব্দ বলতে থাকেন দেখবেন, আপনার মন খুব শীঘ্রই এক ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় চলে আসবে। আপনি সম্ভবত: অনুভব করবেন যে, আপনি আপনার উদর গহ্বরে ডুবে যাচ্ছেন এবং তা আপনার পুরো শারীরিক ক্রিয়াকলাপের উপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু অন্যদিকে আপনি যদি কিছু শান্তিপূর্ণ এবং শান্ত করার মত শব্দ উচ্চারণ করেন তবে দেখবেন আপনার মনের মধ্যে তার প্রতিফলন ঘটেছে, আপনার শান্ত এবং শান্তিপূর্ণ আচরণই তার প্রমাণ। এমন একটি শব্দ যেমন, 'প্রশান্তি ', (Tranquility) ধীরে ধীরে বার বার ঐ শব্দটি উচ্চারণ করুণ। Tranquility অর্থাৎ 'প্রশান্তি' শব্দটি ইংরেজি শব্দমালার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এবং শ্রুতিমধুর এক শব্দ, এবং শুধুমাত্র এই শব্দটি বলার মধ্য দিয়ে একটি প্রশান্তিকর অবস্থা বা আবেশ তৈরি করতে প্রয়াসী হোন।

আরেকটি নিরাময়কারী শব্দ হল 'Serenity' অর্থাৎ নির্মলতা। এই নির্মলতার ভাবটিকে মনে ধরে রাখার অনুশীলন করুণ। ধীরে ধীরে বার বার শব্দটি উচ্চারণ করুণ এবং এমন ভাব নিয়ে বলুন যেন এই শব্দটি একটি 'প্রতীক'। এই ধরনের শব্দগুলোর নিরাময় করার মত শক্তি আছে যদি তা উপরে উল্লিখিতভাবে ব্যবহার করা যায়।

কোন বিশেষ কবিতার কিছু লাইন বা ধর্মগ্রন্থের উধৃতি এসবের ব্যবহারও কিন্তু খুব কাজে আসে। আমার এক পরিচিত লোক, যিনি মনের শান্তি প্রতিষ্ঠার এক অসাধারণ সাফল্য লাভ করেছিলেন। তার অভ্যাস ছিল কার্ডের উপর শান্তি প্রকাশক অসাধারণ কিছু উক্তি লিখে রাখা। তিনি সবসময় তার ছোট চামড়ার থলেটির মধ্যে একটি কার্ড বয়ে বেড়াতেন, বার বার ঐ উক্তিগুলো উল্লেখ করার জন্য, যে পর্যন্ত না প্রতিটি উক্তি মুখস্ত হতো। তিনি বলেন যে, এরকম প্রতিটি ধারণা তার অবচেতন মনে শান্তি আনতে মসৃণকারী উপাদান হিসেবে ফোঁটা ফোঁটা পড়তে থাকত। শান্তিপূর্ণ ধারণাটি আসলে কষ্টকর চিন্তার উপর তৈলের মত কাজ করে। তিনি প্রয়োগ করতেন এমন একটি উক্তি যা ষোড়শ শতকের অতীন্দ্রিয় বিষয়: অর্থাৎ “কোন কিছুর দ্বারা নিজেকে বিরক্ত হতে দিওনা, কোন কিছুর দ্বারা ভীতও হইওনা। মনে রাখবে, খোদা ছাড়া সবার মৃত্যু হয়। খোদা একাই যথেষ্ট।”

বাইবেলের বাণীর (অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও আছে) একটি বিশেষভাবে শক্তিশালী আরোগ্যকর মূল্য আছে। শাস্ত্রের এসব বাণীকে আপনার মনের মধ্যে ফেলুন এবং আত্মচেতনায় একে গলে যেতে দিন, এবং অচিরেই তা আপনার সারা মানসিক অবস্থার উপর আরোগ্যকর মলমের মত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়বে। সাফল্য লাভের এটি একটি সহজতর পন্থা এবং মনে শান্তিলাভের সবচেয়ে ফলপ্রসু মাধ্যম।

কোন এক দোকানদার Mid-Western হোটেল কক্ষে ঘটে যাওয়া একটি কাহিনী আমাকে শোনান। এক ব্যবসায়ী দলের সদস্য হিসেবে তিনিও ঐ সভায় এসেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিল খুবই উত্তেজিত। তিনি ছিলেন রূক্ষমেজাজী, তর্কপ্রিয়, এবং অতিরিক্ত উত্তেজনাপ্রবণ একব্যক্তি। উপস্থিত সবাই তাকে ভালো করে জানতেন এবং বুঝেও ফেলেছিলেন যে, তিনি মারাত্মক স্নায়ু চাপের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু শেষে হলো কি যে ঐ লোকটার এমন উত্তেজনাকর মনোভাব উপস্থিত সবার স্নায়ুর উপর চাপ ফেলতে শুরু করল। ঠিক তখনই ঐ স্নায়ু প্রধান লোকটি তার ভ্রমণসঙ্গী ব্যাগটি খুলে তা থেকে দেখতে কালো ঔষধের একটি বড় বোতল বের কর আনলেন এবং ঢক ঢক করে কিছু ঔষধ গিলে ফেললেন। জিজ্ঞেস করলাম কিসের ঔষধ খেলেন, গোঁ গোঁ শব্দ করে বললেন, "ওহ, এটা হলো স্নায়ুর জন্য একটা কিছু। আমার মনে হচ্ছে যেন, আমি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছি। যে চাপের মধ্যে আমি কাটাচ্ছি, তা আমাকে অবাক করে দেয় যে, আমি হয়তো পাগল হতে যাচ্ছি। আমি এটা চেপে রাখতে চেষ্টা করি কিন্তু আমি ধারণা করছি এমনকি আপনারাও লক্ষ্য করেছেন যে, আমি একজন স্নায়ু রোগী। এ ঔষধটি খেতে সুপারিশ করা হয়েছিল আমাকে এবং কয়েক বোতল খেয়েছিও কিন্তু মনে হচ্ছে ভালো কিছু হচ্ছে না।”

অন্যেরা হেসে উঠল, তারপর একজন একটু সহানুভূতি দেখিয়ে বললেন, "বিল, যে ঔষধটি আপনি গিলছেন তা সম্বন্ধে আমি আপনাকে কিছু স্নায়ু রোগের ভালো ঔষধ দিতে পারি, যেগুলো আপনার এই ঔষধটি থেকেও ভালো কাজ করবে। আমি জানি, কারণ এই ঔষধ আমাকে সুস্থ করেছে এবং আমার অবস্থা ভূথিস্যর থেকে অনেক খারাপ ছিল।” রূক্ষস্বরে লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, "কি ঔষধ এটা?”

অপর লোকটি তার ব্যাগের কাছে গেলেন এবং একটি বই টেনে বের করলেন। বললেন, “এ বইটি তা করবে, এবং আমি সত্যি সত্যি তাই বোঝাচ্ছি। আমার অনুমান, আপনি ভাবছেন এটা কি আশ্চর্য যে, আমি আমার ব্যাগে একটি বাইবেল বয়ে বেড়াচ্ছি, কিন্তু কেউ তা জেনে ফেলল আমি তাতে পরোয়া করি না। আমি এর জন্য একটুও লজ্জিত নই। গত দু'বছর ধরে এ বাইবেলটি আমি আমার ব্যাগে বয়ে বেড়াচ্ছি এবং বইতে কিছু কিছু জায়গা আমি কালি দিয়ে চিহ্নিত করেছি যা মনের শান্তি বজায় রাখতে আমাকে সাহায্য করছে। (স্বস্ব ধর্ম গ্রন্থ অনশীলন করতে অনুরোধ করছি)। এর বাণী আমার জন্য কাজ করে, এবং আমি মনে করি তা আপনার জন্যও কিছু করবে। তবে কেন আপনি তা যাচাই করবেন না বলুন?"

অন্যরা বেশ আগ্রহ সহকারে এই অস্বাভাবিক বক্তব্য শুনছিলেন। স্নায়ু রোগী লোকটি তার চেয়ারে মাথা নীচু করে উপুর হয়ে রইলেন। তা দেখে মনে হলো, কথাগুলো লোকটার মনে কিছু ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছে, তাই বক্তা আবার শুরু করলেন: “কোন এক হোটেলে এবং কোন এক রাত্রে আমার একটি অদ্ভূত অভিজ্ঞতা হয় যা থেকে আমি বাইবেল পড়তে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। আমি এক সুন্দর ও উত্তেজনাকর অবস্থার মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কারণ ব্যবসা ভ্রমণ হেতু আমি বাইরে ছিলাম এবং পরন্ত সন্ধ্যায় আমি আমার কক্ষে ফিরে এসে কেমন ভরকে গেলাম। প্রয়োজনীয় কিছু চিঠি লিখতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাতে মন বসাতে পারলাম না। কক্ষের এদিক ওদিক বৃথাই ঘোরাফেরা করলাম, খবরের কাগজ পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তা আমাকে বিরক্তির মধ্যে ফেলে দিল তাই সিদ্ধান্ত নিলাম নীচে গিয়ে একটু মদ খাব, যা হোক কিছু একটা করবই যাতে এ অবস্থা থেকে রেহাই পাই।”

রান্নাঘরে সেলফের কাছে যখন দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে পরে থাকা একটি বাইবেলের উপর আমার চোখ পড়ল। হোটেল কক্ষে পরে এমন কত বাইবেল আমি আগেও দেখেছি; কিন্তু কখনও তার একটিও আমি পড়ে দেখিনি। যাহোক, কিছু একটা ব্যাপার ঘটল আমার মধ্যে, একটি বই হাতে তুলে নিয়ে পাতা উল্টালাম এবং সাম সঙ্গীতের একটি পাতা থেকে পড়তে শুরু করলাম। আমার ভালো মনে পড়ছে যে, এক পাতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পড়ে ফেললাম, তারপর বসে পড়লাম এবং আরেক পাতা পড়তে থাকলাম। ব্যাপারটা ছিল দারুণ চিত্তাকর্ষক, কিন্তু আমি নিজেই খুব বিস্মিত হয়ে গেলাম যে বাইবেল পড়ছি! আমার কাছে হাস্যকর লাগছিল, কিন্তু আমি পড়তে থাকলাম।

"শীঘ্রই আমি সাম ২৩ অধ্যায় পর্যন্ত আসলাম। রবিবাসরীয় স্কুলে যখন পড়ি আমি তখন বালক এবং তখন এ অধ্যায়টি আমি মুখস্ত করেছিলাম, আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে, আমি এখনও প্রায় সবই মনে করতে পারছি। আমি আবার দ্রুত চেষ্টা করলাম, বিশেষ করে ঐ লাইনটি, যেখানে লিখা আছে : "তিনি স্নিগ্ধ জলের ধারে আমাকে পরিচালিত করেন। তিনি আমার প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। এই লাইন দুটি আমার খুব পছন্দ। এ হলো নিজেকে খুঁজে পাওয়া। সেখানে বসেই আমি বার বার এ অংশটি পড়ে ফেললাম এবং শেষে যা ঘটল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, আমি জেগে উঠেছি।

“দৃশ্যত: আমি ঘুমিয়ে পড়লাম এবং শান্তি হলো আমার। অথচ আমি মাত্র মিনিট পনের ঘুমালাম, কিন্তু জেগে উঠার পর আমার নিজেকে এত সতেজ মনে হলো যেন আমি সারারাত চমৎকার ঘুমিয়েছি। পরিপূর্ণ সতেজ লাগার সেই বিস্ময়কর অনুভূতির কথা আমার এখনও মনে আছে। এরপর আমি বুঝতে পারলাম যে, আমি শান্তি অনুভব করছি এবং আপন মনেই বললাম: ব্যাপারটা কি অদ্ভুত না? আমার এমন কি ভুল হয়েছিল যে, এমন একটি বিস্ময়কর ব্যাপার আমার লক্ষ্যেই পড়েনি?”

“সুতরাং এই অভিজ্ঞতা লাভের পর, আমি একটি বাইবেল কিনলাম, ছোট একটি বাইবেল যাতে সহজেই তা আমার ব্যাগে ভরে রাখতে পারি এবং সেই থেকে এখন পর্যন্ত আমি তা বয়ে চলেছি। অকপট মনে এ বইটি পড়তে আমি ভালোবাসি, এবং তাতে আমি আগের মত স্নায়বিক উত্তেজনায় ভুগি না। কাজেই বিল, আমি বলব আপনি একটু পরীক্ষা করে দেখুন, যে এতে কাজ হয় কিনা।”

বিল তা পরীক্ষা করেছিলেন এবং ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। উনি জানিয়েছিলেন, প্রথমে ব্যাপারটা কিছুটা অদ্ভূত এবং কঠিনই ছিল তার জন্য এবং তিনি বাইবেল পড়েছিলেন চাতুর্যের সাথে যখন আশে পাশে কেউ থাকত না। তিনি নিজেকে পাক পবিত্র ভাবতে চাননি। কিন্তু এখন তিনি রেলগাড়িতে, উড়োজাহাজে অথবা যে কোন জায়গায় বাইবেল বের করে পড়ে থাকেন এবং তাতে তার অনেক মঙ্গল বয়ে আনে।

তিনি ঘোষণা দিয়েই পড়ে থাকেন এবং তাতে তার অনেক মঙ্গল বয়ে আনে কোন ঔষধের প্রয়োজন হয় না।" এই বিশেষ মন্ত্রণা অবশ্যই বিলের ক্ষেত্রে চমৎকার কাজ করেছে, কারণ এখন তার সহজেই উন্নতি হচ্ছে। তার আবেগ আপ্লুতি এখন সংযত। এই লোক দুজন বুঝতে পারলেন যে, মনের শান্তি লাভ করা কোন জটিল বিষয় নয়। আপনি শুধু আপনার মনকে এমন সব চিন্তায় ভরে দিন, যা আপনার মনের শান্তির কারণ হতে পারে। শান্তিভরা একটি মন পাবার জন্য আপনার মনকে আপনি শান্তিতে ভরে ফেলুন। একটি আরেকটির মতই সহজ।

আরো কিছু বাস্তব পন্থা আছে যা দিয়ে আপনি মনের প্রশান্তি ভাবকে এবং শান্ত মনোভাবকে আরো উন্নীত করতে পারেন। এর একটি পারেন আপনার কথাবার্তার মধ্য দিয়ে। যে কথাগুলো আমরা বলে থাকি এবং স্বরের যে রূপ ও মাত্রায় আমরা ব্যবহার করি তার উপর নির্ভর করে আমরা নিজেরাই আমাদের স্নায়ুবিক দুর্বলতার সময় চরম উত্তেজনার সময়, এবং মানসিক বিপর্যয়ের সময় বিশেষ কথামালা ব্যবহার করতে পারি। আমরাতো নানা ভাবেই কথা বলতে পারি এবং সেই কথা আমাদের পক্ষেও আসতে পারে আবার বিপক্ষেও যেতে পারে। আবার আমাদের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে একটি শান্ত প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারি। কাজেই কথা বলা উচিৎ মার্জিতভাবে যাতে শান্তি পাওয়া যায়।

যখন একটি দলের মধ্যে আলাপচারির অনুকূল অবস্থা দিকে চলে যেতে থাকে, তখন তার মধ্যে শান্তিপূর্ণ ধারণা উপস্থাপিত করার চেষ্টা করা উচিৎ। এখানে আমি আপনাকে টুকে নিতে বলব যে, কেমন করে স্নায়ুর চাপ উত্তেজনার সময় এ বিষয়টা বিপরীতভাবে কাজ করে। আলাপচারিতায় সাধারণত যা স্থান পায় তা সবসময় প্রত্যাশা মাফিক তত সুখকর হয় না। উদাহরণ স্বরূপ প্রাতঃরাশের সময় যে আলাপ-টালাপ হয়ে থাকে, তাতো প্রায় ঐ দিনের আমেজ নিয়েই হয়ে থাকে। অসুখকর আলোচনা অনুসারে তখন সামান্য কিছু বিস্ময়করই হয়ত প্রকাশ পায়। অনিষ্টকর আলোচনা উল্টো পরিস্থিতিকে আরো প্রভাবিত করে। উত্তেজনাকর এবং স্নায়ু প্রকৃতির কথাবার্তা নিশ্চিতভাবেই মানুষের ভেতরকার উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে তোলে। তার বদলে আপনি এমনভাবে প্রতিটি দিন আরম্ভ করুন, যেখানে মন থাকবে শান্তি পূর্ণ; পরিতৃপ্ত এবং সুখপ্রদ মনোবৃত্তি বজায় রেখে, দেখবেন আপনার দিনগুলো আনন্দদায়ক এবং সাফল্যের দিকে এগুচ্ছে। অবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে এমন মনোবৃত্তি সক্রিয় এবং নিশ্চিত একটি পথ। যদি আপনি শান্তিপূর্ণ মনের অবস্থাকে উন্নীত করতে চান তাহলে আপনি আপনার বাকচারিতার উপর সযত্ন নজর রাখুন।

আলাপ আলোচনা থেকে সমস্ত অনিষ্টকর ধারণাগুলোকে বের করে দেয়া খুবই জরুরী, কারণ ওসব ভেতরে ভেতরে আমাদের দুশ্চিন্তা এবং বিরক্তি উৎপাদন করে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যখন একদল মানুষের সাথে বসে আপনি মধ্যাহ্নে ভোজন করছেন, তখন এমন মন্তব্য করবেন না যে, কমিউনিস্টরা শীঘ্রই দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করবে। প্রথমত: কমিউনিস্টরা দেশের ক্ষমতা গ্রহন করতে যাচ্ছে না এবং এর দ্বারা আপনি উপস্থিত অন্যদের মনে নিশ্চিতরূপে একটি উদ্দমহীন প্রতিফলন তৈরি করছেন। এটা নিঃসন্দেহে উল্টো হজম শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হতোদ্দমকারী কোন উক্তি মনের উপস্থিত সমস্ত অবস্থার উপর তাৎক্ষণিকভাবে রাঙ্গিয়ে তোলে; এবং প্রত্যেকেই সম্ভবত: অল্প হলেও নিশ্চিতরূপে একটি বিরক্তিকর অনুভূতি দিয়ে দূরে সরে যায়। তারা আরো তাদের সাথে বয়ে বেড়ায় একটি কোমল কিন্তু সাথে সাথে এমন একটি নিশ্চিত অনুভূতি যে, সবকিছুর মধ্যেই কিছুনা কিছু ভুলভ্রান্তি রয়ে গেছে। এমন সময় আসবে যখন আমরা অবশ্যই এই কর্কষ প্রশ্নটির মুখোমুখি হবো এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে এবং উৎসাহের সাথে তা নিয়ে আলাপ আলোচনাও করবো এবং কমিউনিজমের জন্য আমার নিজের যতটা আছে তার থেকে বেশি ঘৃণ্য জন্য কারো নেই, কিন্তু সাধারণভাবে মনের শান্তি পাবার জন্য আপনার ব্যক্তিগত এবং দলবদ্ধ কথাবার্তাকে নিষ্টকর, সুখি, আশাপূর্ণ, এবং সন্তুষ্টজনক প্রকাশে পুর্ণ করে রাখুন।

যেসব কথাবার্তা আমরা বলি তার কিন্তু সরাসরি এবং সুনিশ্চিত একটি প্রভাব আমাদের চিন্তা ভাবনার উপর আছে। আর এই চিন্তাই কথা তৈরি করে দেয়, কারণ কথা হল আমাদের মনের ধারণা সমূহের পরিবাহক। কিন্তু কথা আবার চিন্তার উপর প্রভাবও খাটিয়ে থাকে এবং বর্তমান অবস্থা পরিস্থিতিকে সাহায্য করে থাকে যদি কেউ সুন্দর মনোভাব গড়ে তুলতে না চায়। আমলে যা প্রায়ই চিন্তার মধ্যে চলতে থাকে তা শুরু হয় কথার মধ্য দিয়ে। কাজেই যদি আমাদের চলতি কথাবার্তার মান পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষায় ভালো বলে গণ্য হয় এবং সুশৃঙ্খল মনে হয় এবং নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে যে, আমাদের উদ্ধৃত কথাবার্তা শান্তিপূর্ণ এর ফলশ্রুতিও হবে শান্তিপূর্ণ এবং সবশেষে আমাদের মনও শান্তি পাবে।

শান্তিপূর্ণ মন উন্নীত করার ক্ষেত্রে আরেকটি ফলপ্রসু কৌশল হল প্রতিদিন নীরবতা পালনের অভ্যাসের মধ্য দিয়ে। প্রতি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে অন্তত: পনের মিনিট সবাইকে যে কোন রকম চেষ্টায় পুরোপুরো চুপচাপ থাকার অভ্যাস করা উচিৎ। আপনার চেনা জানা সবচেয়ে নীরব একটি জায়গায় আপনি চলে যান এবং সেখানে বসে অথবা শুয়ে থেকে পনের মিনিট চুপচাপ থাকার কৌশল অভ্যেস করুন কারও সাথে কথা বলবেন না। কিছু লিখবেনও না। কিছু পড়বেনও না। যত অল্প পারা যায় ভাবুন। মনকে নিরপেক্ষ থাকতে দিন। কল্পনা করুন যে আপনার মন নিস্তব্ধ, নিষ্ক্রিয়। এটা করা প্রথমে হয়ত সহজ হবে না, কারণ নানা চিন্তা ভাবনা আপনার মনকে নাড়া দিচ্ছে, কিন্তু অভ্যাসের মধ্য দিয়ে আপনার দক্ষতা বাড়বে। মনে মনে কল্পনা করুণ যে আপনার মনটা হল বিশাল জলরাশির উপরিভাগের মত শান্ত নিশ্চল এবং দেখুন তাতে মনকে কতটা শান্ত আপনি করতে পারছেন, যেন একটি ক্ষুদ্র ঢেউও তাতে নেই। যখন একটি নিস্তব্ধতম অবস্থা আপনি লাভ করবেন, তারপর আপনি শুনতে থাকবেন গভীর সুরলালিত্যের শব্দ, উপভোগ করবেন এক শান্ত স্নিগ্ধ সৌন্দর্যকে, যার সবই উৎসারিত হয়েছে বিধাতার অপার মহিমা থেকে এবং এর সবই আপনি দেখতে ও অনুভব করতে পারবেন নীরবতার সুরভি থেকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যি যে, আমেরিকানরা এমন একটি সুন্দর অনুশীলনে মোটেই দক্ষ নয়, যা দুঃখজনক, কারণ যেমন টমাচ কার্লাইল বলেছেন, "নীরবতা হল এমন এক উপাদান যাতে মহৎ মহৎ অনেকরীতি, আদর্শ গঠিত হয়।” এযুগের আমেরিকানরা কিছু একটা থেকে বঞ্চিত হয়েছে যা আমাদের পূর্বপুরুষরা জানতেন এবং যা তাদের চরিত্র গঠনে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে সাহায্য করেছে এবং তাহলো বিশাল অরণ্যের অথবা সুদূরে স্থিত কোন সমতল ভূমির নিস্তব্ধতা।

সম্ভবত: আমাদের মনের শান্তির অভাবের কারণ অনেকটাই আমাদের স্নায়ুর উপর গোলমাল বা হট্টগোলের ফলস্বরূপ হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এটাই প্রমাণ করে যে, আমরা যেখানে কাজকর্ম করি, থাকি অথবা ঘুমাই সেখানকার কোন না কোন হট্টগোল আমাদের কর্মদক্ষতা একটি লক্ষণীয় মাত্রায়ণ কমিয়ে ফেলে। এই জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক ধারণার বিপরীতে, এটা সন্দেজনক যে, আমরা কখনও এই গোলমালের সাথে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে মানসিক ভাবে অথবা আমাদের স্নায়ু পদ্ধতিগত দিক থেকে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি কিনা। এটা কোন ব্যাপারই নয় যে কেমন করে কত রকম পরিচিতিও শব্দ বারে বারে এসে উপস্থিত হচ্ছে, অবচেতন মনের শ্রবনেন্দ্রিয়কে ফাঁকি দিয়ে তা কখনও চলে যেতে পারে না। মোটরগাড়ির হর্ণের শব্দ, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের গর্জন, এবং অন্যান্য শব্দগুলো আসলে দৈহিক ক্রিয়া কলাপের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করে থাকে এবং এ ব্যাপারটি ঘটে ঘুমের মধ্যে। এই শব্দের দ্বারা আবেগ প্রথমে স্নায়ুতে এবং পরে স্নায়ুর মধ্য দিয়ে চলে গিয়ে পেশীতে নড়াচড়া সৃষ্টি করে যা প্রকৃত বিশ্রামের থেকে কম হয়। যদি এই প্রতিক্রিয়াটি যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করে তাহলে স্নায়বিক উত্তেজনা ঘটাতে কাজ করে।

অন্যদিকে, নীরবতা হলো নিরাময়কারী, যন্ত্রণা উপশকারী এক স্বাস্থ্যপ্রদ অনুশীলন। স্টার ডেইলী পত্রিকা বলছে: “আমার পরিচিত এমন কোন পুরুষ বা মহিলা নেই যারা জানে না কেমন করে নীরবতা পালন অনুশীলন করতে হয় এবং আমার জানা মতে তাদের কখনও অসুস্থও হতে দেখিনি। আমি লক্ষ্য করেছি আমার মধ্যেও শারীরিক বা মানসিক ক্লেש এসে উপস্থিত হয়, যখন আমি মনের শিথিলতা প্রকাশের ভারসাম্য মেনে চলি না।” স্টার ডেইলী খুব মনোযোগের সাথে এই অংশটি পত্রিকায় যুক্ত করে যে, “নীরবতা পালনের সাহায্যে আধ্যাত্মিক নিরামায়।” এই যে বিশ্রামের অনুভূতি, এটা পুরোপুরি নীরবতা পালনের যে অনুশীলন তারই ফলস্বরূপ আসে এবং এ হলো অত্যন্ত মূল্যবান চিকিৎসা।

আধুনিক জীবনের যে দ্রুত গতিবেগ, তাতে নীরবতা পালনের অনুশীলন করাকে সবাই বলবে, তত সহজ কাজ নয়, যেমনটা সহজ ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের আমলে। বিরাট সংখ্যক গোলমাল উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি আমাদের এ যুগে চারপাশে ছড়িয়ে আছে, কিন্তু তারা তা দেখেনি। এসব আমাদের নিত্যদিনের নানা আচার অনুষ্ঠানকে উত্তেজিত করে চলেছে। আধুনিক বিশ্বে জায়গা জমিন অনেক ধ্বংস হয়েছে এবং দৃশ্যত: আমরাও সময়ের অনেক উৎপাদক ধ্বংস করে দেবার চেষ্টা করছি, যা না হারালে আমাদের অনেককিছু করার থাকত। কোন ব্যক্তির পক্ষে কেবলমাত্র তা তখনই সম্ভব যখন সে গভীর অরণ্যে পদচারণা করবে অথবা সমুদ্র তীরে বসবে অথবা পর্বত শিখরে বসে গভীর ধ্যান করবে, অথবা মহাসাগরে চলমান জাহাজের ডেকে বসবে। কিন্তু যখন আমরা এই অভিজ্ঞতাটি লাভ করি তখন সেই নীরব নিস্তব্ধ জায়গার ছবিটি এবং সেই শুভ মূহুর্তের অণুভূতি আমাদের মিষ্টত্যর পর্দায় এঁকে রাখা প্রয়োজন। কারণ ঐ মধুময় স্মৃতিগুলোকে পরে আবার অমিদের স্মৃতিপটে টেনে এনে আমাদের অনুভূতিকে ভরিয়ে দিতে হবে এমনভাবে যেন মনে হবে আমরা পেছনের সেই সুন্দর জায়গায় বসেই সেই সুখকর ছবিগুলিই উপভোগ করছি। আসলে যখন আপনি ঐ জগতে ফিরে যান তখন আপনার বর্তমানের তিক্ত অবস্থার অসুখকর উৎসগুলোকে হটিয়ে দিতে ঝুঁকে পরে।

আর কারণ হলো মানুষের স্মৃতির এই অদ্ভূত অথচ সুন্দর দেখাটি হল বর্তমানের প্রকৃত অবস্থার উপর একটি উন্নীতকরণ, কারণ মানুষের মন নিয়তই শুধুমাত্র পেছনে দেখা সুন্দর কিছুকে বার বার তার মনের পর্দায় গেঁথে রেখে তা অনুভব করতে পিয়াসী।

উদাহরণস্বরূপ যখন আমি এই কথাগুলি লিখি, তখন আমি বিশ্বের সুন্দরতম হোটেলগুলোর একটির ব্যালকনিতে বসে আছি, সেটি হল হনলুলুর বিখ্যাত এবং রোমান্টিক Waikiki Beach এ অবস্থিত the Royal Howoiin হোটেল। ব্যালকনিতে বসে তাকিয়ে আছি সুন্দর পাম গাছে ভরা বাগানটির দিকে, সুগন্ধি বাতাসে দোল খাচ্ছে পামগাছগুলো। বিদেশি ফুলের গন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত। এ দ্বীপটিতে অন্তত: দু'হাজার প্রকৃতির বিচিত্র “হিবিসকাস” ফুল আছে, আর এই বাগানটি সেই বিচিত্র ফুলে ভরা। জানালার বাইরে পেঁপে গাছ, পাকা ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। রাজকীয় পয়নসিয়ানার উজ্জ্বল বর্ণ বিচিত্রা, অরণ্যের গাছ থেকে আসা সুবাস, সব এসে পুরো দৃশ্যাবলীর বর্ণাট্য তার সাথে এসে যুক্ত হয়েছে এবং এ্যাকেসা গাছগুলো নুয়ে আছে তার অত্যন্ত সুন্দর সাদা ফুলের ভারে।

অবিশ্বাস্য সুন্দর নীল সাগরে ঘিরে আছে এই দ্বীপপুঞ্জকে, দিগন্ত বিস্তৃত দ্বীপগুলো। শ্বেত-শুভ্র তরঙ্গগুলো প্রচণ্ডভাবে তরঙ্গায়িত হচ্ছে, হাওয়াইনরা এবং আমার ভ্রমণসঙ্গিরা সার্প বোর্ডে এবং ক্যানোতে চড়ে সুন্দর উপভোগ করছে। সব মিলে একে বলা যায় সৌন্দর্যের প্রবেশদ্বারে প্রবেশ করার এক অপূর্ব দৃশ্য। আর আমার উপর এর নিরাময়কারী প্রভাব অবর্ণনীয়। যখন এখানে বসে আমি লিখতে থাকি তখন মনে হয় কিভাবে এই সৌন্দর্য জ্ঞান আমার শান্তিপূর্ণ মনে উৎপন্ন হয়েছে। সাধারণভাবে যেসব জরুরী দায়িত্ব নিয়ে আমি থাকি, মনে হয় সেসব অনেক দূরে। যদিও আমি অনেকগুলো বক্তৃতা দেবার জন্য এবং এ বইটি লিখতে হাওয়াইতে অবস্থান করছি, তা সত্যেও এই জায়গাটি যে শান্তিতে ভরা তা যেন আমাকে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত করে রাখে। এখনও আমি বুঝতে পারি যে, পাঁচ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত New York এ যখন আমি ফিরে আসি, আমি তখনই শুধুমাত্র ঐ অপূর্ব সৌন্দর্যের মধ্যে পাওয়া অত্যন্ত আনন্দের সত্যিকার স্বাদ উপভোগ করি, যা এখন আমি দেখছি এবং বুঝতে পারছি। অত্যন্ত মূল্যবান এক অবকাশ যাপন হিসেবে এটি আমার মনে বহুদিন সযত্নে লালিত থাকবে। আর আগামী দিনগুলোতে আমি যখন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়বো তখন মন ফিরে যাবে অবকাশ যাপনের এই অতি মূল্যবান স্মৃতির মধ্যে। যখন এই সরল ও মনোহর জায়গা থেকে আমি অনেক দূরে থাকব, মনের শান্তি পেতে প্রায়ই তখন আমি স্মৃতিতে ফিরে যাব Waikiki-র সারিবদ্ধ পাম গাছের পট্য সৌন্দর্যে এবং শুভ্র ফেনা বিধৌত সমুদ্র তটে।

সম্ভাব্য সমস্ত শান্তিপূর্ণ অভিজ্ঞতার মুখর मन ভরে ফেলুন এবং সুন্দর পরিকল্পনায় এবং সুন্দর উদ্দেশ্য নিয়ে স্মৃতিভ্য মনকে সেই জায়গাগুলোতে ভ্রমণে পাঠিয়ে দিন। যেখানে আপনি নৈসর্গিক সৌন্দর্যে আপ্লুত হয়েছিলেন। তখন আপনি অবশ্যই জানতে পারবেন আপনার মনের প্রতি চলে আসা সরলতম পথটি কিভাবে একটি সরল মন তৈরি করতে পারে। কাজটি করা সম্ভব হয়েছে অনুশীলনের মাধ্যমে কিছু সহজ নীতিমালা প্রয়োগ করে, যেগুলো এখানে খসড়া চিত্রের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। একটি কথা খুব সত্যি যে, শিক্ষা দেবার কাজের এবং নিয়ম শৃঙ্খলার বিষয় মন খুব দ্রুত সারা দেয়। আপনি আপনার মনকে পিছনের যে কোন স্মৃতি যা আপনি চান তা ফিরে পেতে কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন আপনার মন প্রথমে আপনাকে তাই ফেরত দিতে পারে যা আপনি প্রথমে তাকে দিয়েছিলেন। আপনার চিন্তা ভাবনাগুলোকে আপনি পরিপূর্ণভাবে শান্তিভরা অভিজ্ঞতায়, শান্তিপূর্ণ কথায় এবং ধারণায় ভরে ফেলুন এবং অবশেষে আপনি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নির্মাতা হিসেবে এক ভান্ডার আপনার মধ্যে পেয়ে যাবেন। যা নতুন শক্তি পাবার জন্য বিশেষভাবে কাজে লাগবে এবং এ পদ্ধতিটি হল আপনার শক্তির নবীকরণ পদ্ধতি। শক্তি পাবার বিরাট উৎস হিসেবে তা গণ্য হবে।

একবার এক বন্ধুর বাড়িতে রাত্রি যাপন করেছিলাম আমি, অপূর্ব সুন্দর বাড়ি।
যে খাবার ঘরে সকালের নাস্তা করলাম তা ছিল তুলনাহীন এবং বেশ আগ্রহ উদ্দীপক।
এর চার দেয়ালে টাঙানো ছিল পল্লী এলাকার রঙিন চিত্র যেখানে আমার বন্ধু বাল্যকালে লালিত পালিত হয়েছেন। দেয়ালের এ চিত্রটি হল বহুচিত্রের পূর্ণাঙ্গ সমাহার। এখানে আছে সারিবদ্ধ পাহাড়ের দৃশ্য, শান্ত উপত্যকা, জলস্রোতের কলতান, ফুটফুটে পরিষ্কার পানি এবং তাতে সূর্যের ছোট ছোট চিক চিক করা প্রভা, এবং তা যেন পাথরের উপর কুলকুল শব্দে পতিত হচ্ছে। আঁকা-বাঁকা রাস্তাগুলো যেন সতেজ সবুজ প্রান্তরের উপর দিয়ে একে বেঁকে চলেছে। এই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যে ছোট ছোট ঘর-বাড়িগুলোও অংকিত হয়েছে। মাঝখানে সুন্দর সাদা গীর্জাটি শোভা পাচ্ছে, উপরদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুদৃশ্য চুড়া।

যখন সকালের নাস্তা খাচ্ছিলাম আপ্যায়নকারী বন্ধু আমাকে ছবিতে দেখা এই অঞ্চলটি সম্বন্ধে বলল, এ তার যৌবনের স্মৃতিচারণ। দেয়ালের চারিদিকে অংকিত সমস্ত ছবিগুলোর বিভিন্ন এবং বিশেষ বিশেষ আকর্ষণীয় দিকগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে আমাকে বর্ণনা করে শোনাল। তারপর সে বলল: যতক্ষন আমি এই খাবার প্রেরে বসি, তখন প্রায়ই স্মৃতির মধ্য দিয়ে আসি যেন এর প্রতিটি বিশেষ বিশেষ জায়গায় চলে যাই এবং পেছনের দিনগুলোর মধ্যে বেঁচে থাকি। আমার মনে পড়ে যেন আমি সেই বালক খালি পায়ে ঐ রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি। আমি এখনও স্মরণ করতে পারি যে কিভাবে অনুভব করতাম পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে পরিষ্কার বালু কেমন লাগত। আমার মনে পড়ে গ্রীষ্মের বিকেলে মিষ্টি পানির নদীতে ঠান্ডা ধরার দৃশ্য এবং শীতের সময় পাহাড় ঘেষা উপকূল তটে বেড়ানো।

"এই সেই গীর্জা, বাল্যবয়সে যেখানে আমি প্রার্থনা করতে যেতাম।" একটু হেসে বলল; ঐ গীর্জাটায় অনেক সময় আমি ধর্ম উপদেশ শুনেছি কিন্তু কৃতজ্ঞতাভরে হৃদ্যতাপূর্ণ ঐ লোকগুলোর কথা এবং তাদের জীবনের আন্তরীকতার কথা আমি স্মরণ করি। এখানে বসে ছবির ঐ গীর্জাটির দিকে যখন আমি তাকাই তখন মনে পড়ে বাবা-মা'র সাথে ঘেরা সিটে বসে কত স্তবগান আমি শুনেছি। যদিও অনেক আগে তারা মারা গেছে, গীর্জার পাশেই তাদের সমাধিস্ত করা হয়েছে, কিন্তু স্মৃতির সেতু পাড়ি দিয়ে আমি যখন সমাধি পাশে দাঁড়াই মনে হয় সেই চলে যাওয়া দিনগুলোর মত তারা আমার সাথে কথা বলছে। আমি ক্লান্ত হয়ে যাই, কখনও কখনও বিব্রত হয়ে পড়ি, মানসিকভাবে উত্তেজনা বোধ করি। আর এই চিত্রগুলো আমাকে এখানে শান্ত হয়ে বসতে সাহায্য করে, এবং সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে ফিরে যাই, যখন আমার মনে কোন কষ্ট ছিলনা, যখন জীবন ছিল নতুন এবং তরতাজা। আসলেই এই ছবিগুলো আমার জন্য কিছু করে। এগুলো আমাকে শান্তি দেয়।"

হয়ত আমরা সবাই খাবার ঘরের দেয়ালে এমন চিত্রাবলী অংকিত করে রাখতে পারিনা কিন্তু আপনি আপনার মনের দেয়ালে এমন চিত্র অংকিত করে রাখতে পারেন: কেমন সে ছবি? অবশ্যই তা হবে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতার ছবি।

আর এই ছবিগুলোতে যে সুন্দর ভাব ফুটে উঠেছে, তাই দিয়ে আপনার চিন্তাগুলোকে সাজিয়ে সময় কাটান। আপনি কতখানি ব্যস্ত অথবা কতখানি দায়দায়িত্ব আপনাকে পালন করতে হয় সেটা কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু এই সহজ সরল, বরং তুলনাহীন এই অনুশীলন বয়ে এনেছে অনেক সাফল্য। যার ভূরি ভূরি উদাহরণ দেয়া যায় এবং এগুলোর হিতকর একটা প্রভাব আপনার উপর পড়বে নিঃসন্দেহে। শান্তিভরা মন উপভোগ করার ক্ষেত্রে এটি একটি সহজলব্ধ অনুশীলন। আভ্যন্তরীণ শান্তির বিষয় একটি বিশেষ কারণ আছে যা তার গুরুত্বের জন্য অবশ্যই বর্ণনা করা হবে। বার বার একই ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি যে, সব লোকের আভ্যন্তরীণ শান্তির অভাব তারা কোন না কোনভাবে আত্ম নিগ্রহের শিকার। কোন একসময় তারা হয়ত কোন পাপ করেছিল এবং সেই পাপ বোধ তাদেরকে ভূতের মত তারা করে বেড়ায়। তারা আন্ত রিকভাবে খোদার কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং করুণাময় খোদা সবসময় যে কোন ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন যদি তারা বিশেষভাবে তা যাঞ্চা করেন। যিহোক, মানুষের মনের মধ্যে অদ্ভুত একটি আত্মাভিমান আছে, যার ফলে একজন মানুষ নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না।

সে মনে মনে অনুভব করে যে সে শান্তির যোগ্য এবং সেজন্য সবসময় সে শাস্তির প্রত্যাশায়ই থাকে। ধরেই নেওয়া যেতে পারে কেও শান্তি আসছে। এর ফলে সে সবসময় একটা অমঙ্গলের আশঙ্কার মধ্যে সময় কাটায়; ভাবতে থাকে বাজে কিছু তার জীবনে ঘটতে যাচ্ছে। এই অবস্থায় শান্তি খুঁজে পাবার ক্ষেত্রে সে অবশ্যই তার কাজে কর্মে একটা তীব্র পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। সে অনুভব করে যে, কঠিন কাজ, কঠোর পরিশ্রম তাকে অপরাধ বোধ থেকে কিছুটা অব্যাহতি দেবে। একজন ডাক্তার আমাকে বলেছেন, যে তার চিকিৎসা কাজের মধ্য দিয়ে এমন বেশকিছু রোগী তিনি পেয়েছেন যারা স্নায়ু দূর্বলতায় ভুগছেন এবং খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে যে, তাদের ঐ অপরাধ বোধের জন্য তাদের অবচেতন মনে উন্মত্তের মত অতিপরিশ্রম করে পাপের ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করেছে। রোগী তার এই ভেঙ্গে পড়ার কারণ হিসেবে তার অপরাধবোধকে নির্দেশ করেনি, নির্দেশ করেছে তার অতিরিক্ত কাজ করায় যে অবস্থা তার হয়েছিল তাকে। "কিন্তু,” ডাক্তার সাহেব বললেন, "এই লোকগুলোর অতিরিক্ত কাজ করে ভেঙ্গে পড়ার কোন প্রয়োজনই ছিলনা, যদি প্রথম থেকেই তারা নিজেদের অপরাধ বোধকে পুরোপুরি মন থেকে ঝেরে ফেলতে পারত বা এর থেকে মুক্ত হতে পারত।"

এমন অবস্থায় পর্যাপ্ত পরিমাণ মনের শান্তি পাওয়া সম্ভব। যদি অপরাধ বোধ, মানসিক দুশ্চিন্তা এসবকে বশীভূত বা ত্যাগ করা যায় আর এক্ষেত্রে নিরাময়কারী চিকিৎসা হিসেবে সাহায্যে আসতে পারে শাস্ত্রবাণী (যেমন, বাইবেল, কুরাআন, গীতা, ইত্যাদি)।

এক আবাসিক হোটেলে একটু নিরিবিলি পরিবেশে লিখার জন্য আমি কয়েকদিন গিয়েছিলাম, সেখানে নিউইয়র্ক থেকে আসা এক লোকের সাথে আমি সাক্ষাৎ করেছিলাম, অল্পই চিনতাম তাকে। তিনি অত্যধিক স্নায়ুগ্রস্থ এক ব্যবসায়ী সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন এবং লোকটি অত্যধিক কাজের চাপের মধ্যে ছিলেন, গাড়ী চালাবার শ্রান্তিও তাকে কাহিল করে ফেলেছিল। আরাম কেদারায় রোদে বসেছিলেন লোকটি। তার আহ্বানে বসে পড়লাম এবং গালগল্প শুরু করলাম।

আমি মন্তব্য করে বললাম, "এই সুন্দর জায়গায় অবকাশ যাপন করতে পেরে আমি আনন্দিত।”

বিব্রত হয়ে লোকটি উত্তর দিল: "যদিও আমি এখানে কিন্তু আমার কোন কাজ নেই। বাড়িতে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছি আমি। নানা কারণে আমি একেবারে ভগ্নোদ্দম হয়ে পড়েছি, আমি এখন দুর্বল স্নায়ুর এক লোক, এবং ঠিকমত ঘুমাতেও পারি না। আমি আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছি। আমার স্ত্রী জেদ করাতে একসপ্তার জন্য আমি এখানে এসেছি। ডাক্তারী বলেন, আমার কোন সমস্যাই হবে না যদি আমি সঠিকভাবে চিন্তা করি এবং একটু শিথিল জীবন যাপন করি। কিন্তু এই পৃথিবীতে সেই কাজটি করা কিস্তৃত সম্ভব?” একথা বলে লোকটি চ্যালেঞ্জই করে বসলেন। তারপর করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, "ডাক্তার সাহেব," "যদি শান্তি পাই এবং শান্ত হতে পারি তাহলে আমি যে কোন কিছু আপনাকে দিতে প্রস্তুত। তাহলো এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার থেকে বেশি কিছু আমি চাই।"

আমরা অল্প কিছুক্ষণ কথা বললাম, এবং আলাপচারিতায় একটি বিষয় পরিষ্কার হলো যে, তিনি সবসময় একটি দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতেন যে এই বুঝি অমঙ্গলজনক কিছু ঘটল। বছরের পর বছর তিনি ভয়ানক কিছুর প্রত্যাশা করে আসছিলেন, বরাবর তার আশঙ্কা ছিল যে, তার স্ত্রীর, বাচ্চা-কাচ্চার এবং বাড়ির বুঝি কিছু ঘটল।

তার ব্যাপারটা বিশদ ব্যাখ্যা করা তেমন কঠিন কিছু ছিল না। তার এই নিরাপত্তাহীনতায় সন্ত্রস্ত হবার পেছনে দুটি কারণ ছিল-একিট তার শৈশবের নিরাপত্তাহীনতা থেকে, অন্যটি হয়েছে পরে তার অপরাধবোধের অভিজ্ঞতা থেকে। তার মাও ভাবতেন, কিছু একটা হতে যাচ্ছে, এবং ঐ লোকটি তার মায়ের উদ্বিগ্ন অনুভূতির মধ্যে ডুবেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কিছু পাপকর্মও করে ফেলেন, এবং তার অবচেতন মন আত্মনিগ্রহে নিগৃহীত হতে জেদী হয়ে ওঠে। এভাবে তিনি আত্মনিগৃহীত হবার কৌশলের বলি হয়ে পড়েন। দুঃখজনক এই ঘটনার সংযোগের ফলশ্রুতিতে আমি আজ তার মধ্যে স্নায়ু প্রতিক্রিয়ার অত্যন্ত কষ্টকর অবস্থা দেখতে পাই।

কথাবার্তা শেষ হলে আমি তার চেয়ারের পাশে এক মূহুর্ত দাঁড়াই। কাছে কোন লোকজন ছিলনা, তাই কিছুটা দ্বিধাগ্রহস্থভাবে তাকে পরামর্শ দিলাম: “যে কোন ভাবেই হোক আমি যদি আপনার সাথে একটু প্রার্থনা করতে চাই, আপনি কি তা পছন্দ করবেন?” মাথা নুয়ে তিনি সম্মতি জানালেন, এবং তার কাঁধে আমার একটি হাত রেখে আমি প্রার্থনা শুরু করলাম: প্রিয় খ্রীস্ট, অনেক আগে তুমি যখন অসুস্থদেরকে আরোগ্য করেছিলে এবং তাদের শান্তি দিয়েছিলে, সেইরূপ এই লোকটিকে সুস্থ কর। তাকে পুরোপুরি ক্ষমা দান কর। নিজেকে ক্ষমা করতে তাকে সাহায্য কর। সমস্ত পাপ থেকে তাকে মুক্ত কর, তাকে বুঝতে দাও যে, তার বিরোধীকে বিপক্ষে যেতে তুমি সাহসী হতে দাও না। শত্রুদের কাছ থেকে তাকে মুক্ত কর। তারপর তোমার শান্তি তার মনে, তার আত্মায় এবং তার শরীরে বয়ে দাও।"

অদ্ভুত দৃষ্টিতে তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং তারপর অন্যদিকে চোখ ফেরালেন, কারণ তখন তার চোখ অশ্রুতে ভরে গিয়েছিল এবং জিনি তা আমাকে দেখাতে চাননি। আমরা দুজনেই কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েছিলাম এবং আমি তাকে ছেড়ে চলে গেলাম। কয়েকমাস পরে আবার আমার সাথে তার দেখা হলো; এবং তিনি বললেন, “যখন ওখানে আমার জন্য আপনি প্রার্থনা করছিলেন ওখানেই আমার মধ্যে কিছু একটা ঘটেছিল। অসাধারণ একরকম নিস্তব্ধ এবং শান্তি আমি অনুভব করেছিলাম, এবং সাথে সাথে নিজেকে সুস্থ ও সবল হয়েছি।

এখন তিনি প্রতিদিন উপসনালয়ে যান এবং প্রতিদিন ধর্মশাস্ত্র পড়েন। ঐশী অনুশাসনগুলো অনুসরণ করে চলেন এবং এখন তার গাড়ী চালাতে কষ্ট হয় না। তার স্বাস্থ্য এখন চমৎকার, সত্যিকার সুখি মানুষ তিনি, কারণ হৃদয় ও মনে তার নিরবচ্ছিন্ন শান্তি।

📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 কিভাবে নিয়মিত শক্তি পাওয়া যায়

📄 কিভাবে নিয়মিত শক্তি পাওয়া যায়


বেসবল লীগের এক গুরুত্বপূর্ণ পিচার একবার একশ ডিগ্রীরও বেশি তাপমাত্রায় বেসবল খেলার সময় পিস করেছিলেন। বিকেল বেলার অতি তাপমাত্রায় খেলার ফলস্বরূপ অযথাই তার বেশ কয়েক ডলার খরচ হয়ে যায়। খেলার এক পর্যায়ে তার শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যায়। ফুরিয়ে যাওয়া শক্তি ফিরে পাবার তার যে পদ্ধতি তা সত্যিই অসাধারণ। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম থেকে সে একটি অংশ শুধু বারবার উচ্চারণ করতঃ “কিন্তু যারা বিধাতার জন্য অপেক্ষায় থাকে, তাদের শক্তি নবায়িত হবে; ঈগল পাখীর মত পাখা বিস্তার করে তারা অনেক উঁচুতে উড়তে সক্ষম হবে। তারা ছুটে বেড়াবে, কিন্তু শ্রান্ত হবে না; তারা হেঁটে বেড়াবে, কিন্তু দূর্বল হবে না। ঐ বেসবল পিচারের নাম ফ্রাঙ্ক হিলার (Frank Hiller) তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আমাকে বলল যে, অমন সঙ্গীন অবস্থায় শাস্ত্রের ঐ পদটি আবৃত্তির মাধ্যমে সে আসলেই নব শক্তি ফিরে পেয়েছিল, যার ফলে খেলাটা শেষ করার মতু শক্তি তার অবশিষ্ট ছিল। কৌশলটি ব্যাখ্যা করে সে বললঃ “শক্তি উৎপাদন করুর শক্তিশালী চিন্তার মধ্য দিয়ে আমার মনকে আমি পরিচালিত করেছি।'

আমরা কি ভাবছি, কেমন করে অনুভব করছি তার নিশ্চিত একটা ফল আছে যে, আসলে দৈহিকভাবে আমরা কেমন অনুভব করছি। যদি আপনার মন আপনাকে বলে যে আপনি ক্লান্ত, তাহলে আপনার শারিরীক যান্ত্রিকতা, স্নায়ু এবং পেশীগুলোও এই বিষয়টিকে সত্যি বলে ধরে নেবে। যদি অনিশ্চিত মন তীব্রভাবে আগ্রহী হয়, তাহলে একটি কাজের পেছনে আপনি হয়ত অনলসভাবে লেগে থাকতে পারেন। ধর্ম আমাদের চিন্তা চেতনার উপর দারুণভাবে কাজ করে থাকে, প্রকৃতপক্ষে এটা হলো একটা সুশৃঙ্খল চিন্তা পদ্ধতি। বিশ্বস্ত মনোবৃত্তি যদি মনকে যোগান দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে তা শক্তি সামর্থ বাড়িয়ে তুলছে। এটা আপনাকে আপনার অতি ভারী কাজগুলো সম্পন্ন করতে সাহায্য করবে, এর জন্য তা আপনাকে ইঙ্গিত দেবে যে, আপনার কৃতকার্য হতে প্রচুর অবলম্বন এবং শক্তির উৎস রয়েছে।

কানেকটি কাটে আমার এক বন্ধু আছে, প্রাণবন্ত এক লোক, জীবনী শক্তি এবং সাহসে ভরপুর, একদিন কথায় কথায় আমাকে বলল যে, নিয়মিত সে গীর্জায় যায় 'তার ব্যাটারী রিচার্জ করার জন্য।' তার এই ধারণাটি খুবই বলিষ্ঠ। বিধাতা সকল শক্তির উৎস আর বিশ্ব ভ্রমান্ডের সমস্ত শক্তি নিচয় যেমন পারমাণবিক শক্তি, বৈদ্যুতিক শক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তি; প্রকৃতপক্ষে সবধরনের শক্তি আসে সৃষ্টিকর্তা থেকে। ধর্মশাস্ত্রে এমন জোরালো বক্তব্য আছেঃ "বিধাতা দুর্বলদের শক্তিদান করেন, এবং যাদের কোন শক্তি নেই তাদের শক্তি বাড়িয়ে দেন।” (ঈশাইয়া ×1.29) বাইবেলের আর একটি বক্তব্যে উদ্যমশীল এবং পূণঃ উদম্যশীল করার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বর্ণিত আছেঃ "...আমরা তার শক্তিতেই বেঁচে থাকি, এবং চলাফেরা করি এবং তার শক্তিতেই আমরা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারি।” (এ্যাক্টস × viii 28)

বিধাতা আমাদের মধ্যে যা প্রতিষ্ঠিত করেছে তার সংস্পর্শে আসতে হবে এবং তাহলো, আমাদের মধ্যে বিরাজমান একই ধরনের শক্তি যা এই দুনিয়াকে নিরবধি পূণর্গঠিত করছে এবং প্রতিবছর আগত বসন্ত কালকে নবায়িত করছে। চিন্তন পদ্ধতিতে আমরা যখন আধ্যাত্মিকভাবে বিধাতার সংস্পর্শে আসি, তখন ঐশ্ব শক্তি আমাদের সৃজনশীল কর্মশক্তিকে নবায়িত করে। ঐশ্ব শক্তির সাথে আমাদের সংস্পর্শ যখন ভেঙ্গে যায় ব্যক্তিত্ব তখন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকে এবং তার প্রকাশ ঘটে শরীরে, মনে, এবং জীবনীশক্তিতে। একটি বিদ্যুৎ চালিত ঘড়ি যদি বাইরের কিছুর সাথে সংযুক্ত থাকে তবে তা ঠিকমত চলবে না এবং সঠিক সময় দিতে অনিশ্চিতি প্রকাশ করবে। প্লাগ বিচ্ছিন্ন করলে দেখা যাবে ঘড়ি থেমে গেছে। কারণটা হলো বিশ্বভ্রম্মান্ডের মধ্য দিয়ে যে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে ঘড়িটি তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণভাবে এই পদ্ধতিটি মানুষের জীবনেও ফলপ্রদ হতে দেখা যায় যদিও যান্ত্রিকতার পরিমাণটা কম।

বেশ কয়েক বৎসর আগে আমি এক জায়গায় বক্তব্য রাখতে গিয়েছিলাম, সেখানে এক বিরাট শ্রোতা সমাবেশে এক বক্তা জোর গলায় বললেন যে, তিনি বিগত ত্রিশবছর ধরে কোনরকম ক্লান্তিবোধ করেননি। কারণটা ব্যাখ্যা করে তিনি বললেন যে, ত্রিশবছর আগে তার একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হয়, সেক্ষেত্রে তিনি ঐশিশক্তির কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করেন। সেই থেকে আজও পর্যন্ত সব কাজে-কর্মে পর্যাপ্ত শক্তির ঘাটতি তার মধ্যে দেখা যায় না এবং ব্যাপারটি ছিল অতি আশ্চর্যজনক। । এমন সুস্পষ্টভাবে তিনি তার শিক্ষার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন যে, ঐ সভায় উপস্থিত সবার মনে তা গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল।

আমার কাছে এটা ছিল কোন সত্য ঘটনার প্রকাশের মত একটি বিষয়, যার মাধ্যমে আমাদের সচেতনতার মধ্য দিয়ে মনের অসীম ভান্ডারকে ভরে ফেলতে পারি এবং এর ফলস্বরূপ আমাদের বলশক্তি ক্ষয়ের, ভোগান্তির মত কোন পথে থাকবে না। বছরের পর বছর এই বিষয়টির উপর আমি ঘাটাঘাটি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি যে এই বক্তা যা বর্ণনা করেছেন এবং আমারও দৃঢ় বিশ্বাস যে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রয়োগ করলে তা বাধাহীন এবং সচেতন শক্তিপ্রবাহ মানুষের শরীরে এবং মনে বিশেষ প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম।

এই গবেষণালব্ধ ফলগুলো এক সুখ্যাত ডাক্তার সমর্থন করেছিলেন এবং তার সাথে আমাদের দুজনেরই পরিচিত এক লোক সম্বন্ধে আলাপ করছিলাম। এই লোকটির দায়-দায়িত্ব ছিল খুবই ভারি, কোনরকম বিরতি ছাড়াই তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতেন, কিন্তু তাকে দেখে মনে হত যে এর পরও নতুন কর্তব্য তিনি অবলীলায় গ্রহণ করতেন। তার কাজ-কর্ম সহজেই এবং দক্ষতার সাথে শেষ করার কর্মশক্তির ঘাটতি তার মধ্যে কখনও দেখা যায়নি।

ডাক্তার সাহেবকে আমি আমার ধারণা জানিয়ে বললাম যে, এই লোকটা এমন কোন বিপজ্জনক পদক্ষেপ কখনও নেয়নি যা সম্ভবত তার ভেঙ্গে পড়ার কারণ হতে পারত। ডাক্তার সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, "না" "তার ডাক্তার হিসেবে আমার মনে হয় না যে, ভেঙ্গে পড়ার মত কোন আশঙ্কা তার আছে, এবং এর পেছনে কারণটা হলো যে তিনি সম্পূর্ণরূপে একজন সুসংগঠিত ব্যক্তি এবং তার এই সংগঠিত অবস্থার শক্তি বেরিয়ে যাবার কোন ছিদ্রপথ নেই। সুনিয়ন্ত্রিত একটি যন্ত্র তিনি চালান। স্বচ্ছন্দশক্তি প্রয়োগে তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন এবং পরিশ্রমজনিত কোন ক্ষয় ক্ষতি স্বীকার না করেই দায়িত্বের ভার তিনি বহন করে যাচ্ছেন। এক আউন্স পরিমাণ শক্তি তিনি কখনও নষ্ট করেননি, কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টা প্রয়োগ করেছেন প্রচুর পরিমাণ বলের মাধ্যমে।”

"তার এই দক্ষতাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন ডাক্তার সাহেব? আপাতদৃষ্টিতে একে তো সীমাহীন শক্তি বলেই মনে হচ্ছে।” ডাক্তার এক মূহুর্ত ভাবলেন। "উত্তরটি হলো যে, তিনি একজন সাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক, আবেগের দিক থেকে সুসংবদ্ধ এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি একজন বলিষ্ঠ ধার্মিক লোক। ধর্ম থেকেই তিনি শিখেছেন, শক্তি নিষ্কাশিত হয়ে যাওয়া কে কিভাবে এড়িয়ে যেতে হয়। তার ধর্মশক্তি সক্রিয় এবং শক্তি যাতে ছিদ্রপথে বের হয়ে যেতে না পারে। ধর্মশক্তি তার প্রতিরোধক কৌশল স্বরূপ। কারও মধ্য থেকে শক্তি বের হয়ে যাওয়া কোন কঠিন কাজ নয়। একে বলা যেতে পারে আওপিত আন্দোলন, কিন্তু এই লোকটা ওসব থেকে মুক্ত এক ব্যক্তিত্ব।”

এমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যারা বিশ্বাস করছে যে বলিষ্ঠ ধর্মীয় জীবন যাপন শক্তি ও ব্যক্তিত্বের বল ভোগ করার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরকে এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, বিস্ময়কর ভাবে অনেক লম্বা সময় ধরে তা প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করতে পারে। যদি কোন ব্যক্তি এই দৃষ্টিকোন থেকে তার শরীরের প্রতি যুক্তিযুক্তভাবে যত্ন নেয় যে সে সঠিক খাবার খাবে, ব্যায়াম করবে, পরিমাণমত ঘুমাবে, শারীরীক অপব্যবহার করবে না, তাহলে সেই শরীর তাকে দেবে অবাক করে দেবার মত শক্তি এবং সুন্দর স্বাস্থ্য তার বজায় থাকবে নিঃসন্দেহে। একইভাবে যদি সে সুসংবদ্ধ আবেগঘন জীবনের প্রতি মনোযোগী হয়, তবে তার মধ্যে শক্তি সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু যদি সে বংশগত কারণে অথবা স্বেচ্ছায় আরোপিত কোন ধ্বংসকারী আবেগের প্রতিক্রিয়া বশবর্তী হয়ে আপন শক্তি হারায় তবে নিঃসন্দেহে তার জীবনরক্ষাকারী শক্তির অভাব দেখা দেবে। কোন ব্যক্তির স্বাভাবিক অবস্থা হল, যখন তার শরীর, মন এবং জীবনীশক্তি সুসমঞ্জসভাবে কাজ করে এবং এই অবস্থায় বুঝা যায় যে, নিয়মিতভাবে তার মধ্যে প্রয়োজনীয় শক্তির পুণঃস্থাপন ঘটছে।

মিসেস থোমাস এ. এডিসন, যার সাথে আমার প্রায়ই আলাপ হত তার বিখ্যাত স্বামীর অভ্যাস এবং বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তার স্বামী ছিলেন বিশ্ববরেণ্য আবিষ্কারক তাঁর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে জানালেন যে, মি. এডিসনের রীতি ছিল ল্যাবরেটোরী থেকে অনেক ঘন্টাব্যাপী পরিশ্রম করার পর বাসায় ফিরে তাঁর পুরানো আরাম কেদারায় শুয়ে পড়া। তিনি আমাকে বললেন যে, ছোট্ট শিশুর মত ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি, একেবারে সত্যিকারের বিশ্রাম, গভীর নীবিড় এবং উদ্বেগহীন প্রশান্ত ঘুমে তলিয়ে যেতেন। তিন ঘন্টা, চার ঘন্টা, এমনকি কোন কোন দিন পাঁচ ঘন্টা পর মূহুর্তমধ্যে জেগে উঠতেন, পুরোপুরি সতেজ তখন তিনি এবং কাজে ফিরে যাবার স্বচ্ছন্দ আগ্রহে ভরপুর।

আমার অনুরোধে মিসেস এডিসন আমাকে তার স্বামীর সাবলীলভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে বিশ্রাম নেবার সফল ধরণাটির কথা বিস্তারিতভাবে জানালেন। তিনি বললেন: “আমার স্বামী প্রকৃতির সন্তান” এর দ্বারা তিনি একথাই বোঝাতে চাইলেন যে, তিনি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতি এবং বিধাতার সাথে সুললিত এক ঐকতানে বাঁধা। তার মধ্যে ছিলনা কোন বদ্ধ সংস্কার; কোন বিশৃংঙ্খলা কোন দ্বন্দ, কোন আত্মাভিমান, কোন আবেগগত চাঞ্চল্য। যে পর্যন্ত না তিনি ঘুমাবার প্রয়োজন অনুভর করতেন সে পর্যন্ত একটানা কাজ করে যেতেন। ঘুমের সময় উপস্থিত হলে গভীর ঘুমে ডুবে যেতেন এবং যথাসময়ে যেগে উঠে কাজে যেতেন। তিনি অনেক বছর বেঁচেছিলেন, এবং সৃজনশীল অনেক বিশেষত্বে বিশিষ্ট ছিলেন আমেরিকা (মহাদেশে আগত অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মত। সমস্ত শক্তি তিনি সঞ্চয় করেছেন তাঁর আবেগসঞ্জাত আধিপত্যের দ্বারা এবং এভাবেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে পুরোপুরি শিথিল মনের ওপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্বব্রহ্মান্ডের সাথে তার বিস্ময়কর সুসমঞ্জস সম্পর্ক তৈরি হবার কারণ হলো প্রকৃতি, আর প্রকৃতিই তাঁর কাছে প্রকাশ করেছে এক দুর্জেয় গোপন রহস্য।

প্রত্যেক মহান ব্যক্তিত্বের বেলায় সব সময়ই আমি জেনেছি এবং এমন অনেককে আমি জেনেছি, যারা বিস্ময়কর কাজের মাঝে তাদের ধারণ ক্ষমতার নিশ্চিত প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই বিধাতার সাথে একই সুরে বাঁধা। এরকম প্রত্যেক ব্যক্তিই মনে হয় প্রকৃতির সাথে সমতানে বাঁধা এবং ঐশ্বরিক শক্তির সাথে সম্পর্কিত। তারা কিন্তু আবশ্যিকভাবে পবিত্র ব্যক্তিত্ব নয়, কিন্তু অপরিবর্তনীয়ভাবে এবং অসাধারণভাবে তাঁরা আবেগের এবং মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই সুসংগঠিত। রাগ বা বিরক্তিবোধ, শৈশবকালে এদের উপর মাতাপিতার কোন ত্রুটিবিচ্যুতির প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব পড়া, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ, এবং বদ্ধসংস্কার যেগুলো তাদের সুন্দরভাবে সমীকৃত ভারসাম্যকে নষ্ট করে দেয় এবং এভাবেই তাদের স্বাভাবিক শক্তির অনুচিত ব্যয়ভার বহনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাতে ভোগান্তি হয় উভয়পক্ষের।

যত দীর্ঘদিন আমি বাঁচবো তত অধিক বিশ্বাস আমার যে, না বয়স না অবস্থা বিশেষ, দুটির একটি ও দৈহিকশক্তি এবং জীবনীশক্তি থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে পারে না, তার কোন প্রয়োজনও নেই। শেষপর্যন্ত ধর্ম এবং শরীর এ দুটোর মধ্যে একটি নীবিড় সম্পর্ক আমাদের জাগিয়ে তুলতেই হচ্ছে। আমরা হৃদয় দিয়ে বুঝতে শুরু করেছি যে, একটি মূল সত্য এ পর্যন্ত উপেক্ষিত হয়েছে, যে আমাদের দৈহিক অবস্থা অনেকাংশে নির্ধারিত হয় আমাদের আবেগময় অবস্থার উপর নির্ভর করে এবং আমাদের আবেগময় জীবন গভীরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের জীবনের যত চিন্তা শক্তির দ্বারা।

বাইবেল সহ অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রের অনেক জায়াগাতেই জীবনীশক্তি, নৈতিক শক্তি এবং জীবনের কথা বর্ণিত আছে। যেমন বাইবেলে তেমনি অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থগুলোতেও সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে জীবনের উপর; এবং জীবন মানে জীবনীশক্তি, যা শক্তিতে পূর্ণ করতে হবে। যীশুখ্রীষ্টের মত সব ধর্ম নেতৃবৃন্দই একই উদ্দেশ্যে একই কথা বলেছেন তা হলো, "আমি এসেছি যেন মানুষ জীবন ফিরে পায়, এবং প্রচুর পরিমাণেই পায়।” তারমানে এই নয় যে জীবন থেকে ব্যথা-বেদনা, ভোগান্তি বা কষ্টক্লেש এসবকে একেবারে বাদ দেয়া যাবে, কিন্তু এর ভাবার্থ হলো, যদি কোন ব্যক্তি ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত নির্দোষ, নির্মল জীবন লাভের জন্য গঠনমূলক ও পূণর্গঠনমূলক কাজের অনুশীলন করে তবে সে পর্যাপ্ত মানসিক এবং দৈহিক শক্তি নিয়ে বাঁচতে পারে।

উপরে উল্লেখিত মৌলিক সত্যের অনুশীলন যদি করা যায় তবে তা যে কোন ব্যক্তির জীবনে বয়ে আনবে বেঁচে থাকার জন্য সঠিক লয়বন্ধতা। উচ্চগতিশীলতার কারনেই আমাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়, কারণ উচ্চগতিতে ছুটার জন্য আমরা অস্বাভাবিক পদক্ষেপে চলি। শক্তি সম্পদের সংরক্ষণ নির্ভর করে আপনাদের ব্যক্তিত্ব উদ্ভূত গতির উপর এবং সেই গতির মাত্রা বিধাতা প্রদত্ত স্বাভাবিক গতির সমকালীন হওয়া চাই। বিধাতা তো আপনার মধ্যেই আছে। যদি আপনি এক গতি মাত্রায় চলেন এবং বিধাতা অন্য আর এক মাত্রায় চলেন তাহলে আপনি নিঃসন্দেহে দূরে ছিটকে পড়বেন। “যদিও বিধাতার কল কোন কিছু ধীরে ধীরে চূর্ণ করে, কিন্তু এখনও তা অতিক্ষুদ্র আকারে চূর্ণ করে” কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ কলগুলো চূর্ণ করে অতি দ্রুতগতিতে এবং তাই সেগুলো চূর্ণ করে প্রচুর পরিমাণে। যখন আমরা বিধাতার সাথে একই সমন্বিত ছন্দে সুর বাঁধি তখন আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগত লয় উন্নতি হয় এবং শারীরীক শক্তি মুক্ত ছন্দে সামনে ছুটতে থাকে।

এ যুগের উন্মত্ত অভ্যাসগুলোর অনেক ধরনের অমঙ্গলজনক ফল আছে। আমার এক বান্ধবী একবার তার বয়স্ক বাবার দ্বারা পরিচালিত এক সমীক্ষায় প্রাপ্ত রিপোর্ট সম্বন্ধে আমাকে জানান। তিনি বলেন যে, সেই প্রাচীন যুগে যখন একজন যুবক তার অভিপ্রেত প্রণয় প্রার্থনার জন্য সন্ধাবেলায় এসে বৈঠকখানায় বসত, তখনকার দিনে সময় পরিমাণ করা হতো ধীরস্থিরভাবে, গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের বড় ঘড়ি পেন্ডুলামের আঘাত ছিল ভারী, কারণ ঐ ঘড়ির পেন্ডুলাম ছিল খুবই লম্বা। মনে হতো ঘড়ি যেন বলছে: "প্রচুর সময় আছে। প্রচুর সময় আছে। প্রচুর সময় আছে।” কিন্তু আধুনিক সময়ের ঘড়ির পেন্ডুলাম আকারে ছোট এবং তার আঘাতও অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং ঘড়ি যেন বলছে: "এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার। এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার। এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার। এখন সময় হলো ব্যস্ত থাকার।"

সবকিছু অতি গতিশীল হয়ে গেছে, এবং সেই কারণে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত এই সমস্যার সমাধান হলো, সর্বশক্তিমান যে সৃষ্টিকর্তা তার নির্ধারিত সময়ের সাথে সমান গতি মেনে চলা। এই কাজটি করার একটি পথ হচ্ছে কোন এক গরমের দিনে বাইরে গিয়ে মাটির উপর শুয়ে পড়তে হবে এবং মাটির সাথে কান ঠেকিয়ে শুনতে হবে। দেখবেন আপনি সব ধরনের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। বাতাস গাছপালায় যে শব্দ সৃষ্টি করে তা আপনি শুনতে পাবেন, কীট পতঙ্গের একঘেয়ে ডাক আপনি শুনতে পাবেন, এবং আপনি তৎক্ষণাৎ আবিষ্কার করতে পারবেন, এসব শব্দের মধ্যে একটি সুললিত লয় বিদ্যমান। ঐরূপ ছন্দবদ্ধ লয় আপনি কিন্তু শহরের রাস্তায় কর্মরত ট্রাফিকের বাঁশির শব্দের মধ্যে খুঁজে পাবেন না, কারণে ট্রাফিকের বাঁশির শব্দ নানান হৈ চৈ এর মধ্যে বিলীন হয়ে গিয়েছে। আবার খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা গীর্জার ঐশী বাণী এবং স্তোত্রগীতির মধ্যে এই লয়বদ্ধ শব্দ শুনতে পায়। মুসলিম সম্প্রদায়ে সবাই এমন লয়বদ্ধ শব্দ শুনতে পায় আযানের সুরে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা শুনতে পায় শঙ্খ ও ঘণ্টাধ্বনিতে। কারণ সত্য এখানে কম্পিত ছন্দে বিধাতার লয়ের সাথে মিলিত হয়। এমন ছন্দবদ্ধ শব্দ আপনি বিভিন্ন কলকারখানাতেও শুনতে পারেন। যদি আপনার তেমন একটি মন থাকে।

আমার এক বন্ধু, ওহিও রাজ্যে এই শিল্পপতির বিশাল শিল্পকারখানা আছে। একদিন তিনি আমাকে জানালেন যে তার এই শিল্প প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে ভালো শ্রমিকদের একটি লক্ষণীয় গুণ হলো, তাদের কাজের মধ্যে একটি সুসমন্বিত ছন্দবদ্ধতা। তা ঠিক যে যন্ত্রটি তারা চালায় তার মতই। তিনি জোর গলায় বললেন যে, যদি কোন কর্মী বা কর্মচারী তার যন্ত্রটির মতই ছন্দবদ্ধ লয়ে কাজ করে তাহলে দেখা যাবে সারাদিন কাজ করার পরও দিনের শেষে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েনি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন যে, একটি যন্ত্র হলো বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সুসমন্বিত রূপ যা বিধাতার সমন্বিত সুসংবদ্ধ নিয়ম কানুনের মতই। যখন আপনি একটি যন্ত্রকে ভালোবাসেন এবং এর খুটিনাটি সবকিছু জানতে পারেন, তখন আপনি স্বভাবতই যন্ত্রটির ছন্দবদ্ধ চলনের বিষয় সতর্ক হয়ে উঠবেন। এটা যেন ঠিক আমাদের শরীরের স্নায়ুর এবং আত্মার ছন্দবদ্ধতার মতই সুনিয়ন্ত্রিত এবং সুসমন্বিত। আর এটা হলো বিধাতার ছন্দ এবং আপনি এই যন্ত্রটি দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন এবং তাতে ক্লান্ত হয়ে যাবার কথা নয় যদি আপনি এর সাথে সমতান বা সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে চলেন। একইভাবে একটি ষ্টোভের ছন্দ আছে, টাইপরাইটার মেশিনের ছন্দ আছে, অফিসের মধ্যে ছন্দ আছে, মোটর গাড়ীর ছন্দ আছে, আপনার কাজের ও একটি ছন্দ আছে। কাজেই ক্লান্তি এড়াতে হলে, এবং দৈহিক বলশক্তি পেতে হলে আপনার জীবনের প্রতিদিনের চলার পথকে বিধাতার থেকে পাওয়া অত্যাবশ্যক ছন্দে এবং তার উদ্দেশ্যে সকল কাজ সম্পূর্ণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করুন।

এসব কাজ সমাধা করার জন্য, শারীরীকভাবে শিথীলতা বজায় রাখুন। তারপর কল্পনা শক্তির জোরে আপনার মনকেও আপনি শিথীলভাবে রাখুন। মনশ্চক্ষুতে দেখুন যেন আত্মা শান্ত হয়ে যাচ্ছে, এবং মনে মনে এই ধারণাকে অনুসরণ করুন। তারপর এভাবে প্রার্থনা শুরু করুনঃ “প্রিয়তম সৃষ্টিকর্তা, তুমিই সকল শক্তির উৎস। সৌরশক্তির উৎস তুমি, পরমাণুতে বিরাজমান শক্তি তোমা হতেই আসে, দৈহিক মাংসে স্থিত শক্তি তোমার, রক্ত-স্রোতে মনের অদৃশ্য শক্তি সবকিছু তোমা হতেই আসে। এসবের মাধ্যমে আমি তোমা থেকে শক্তি সংগ্রহ করি, তোমার এ শক্তির উৎস অনন্ত অসীম।” তারপর নিরবধি বিশ্বাস করতে থাকুন যে, আপনি বিধাতার কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছেন। সেই অসীমের সাথে সম সুর ও ছন্দ বজায় রাখুন।

অবশ্যই অনেক লোক ইতিমধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, সাধারণভাবে তার কারণ হলো, তারা কোন কিছুতেই আগ্রহী নয়। কোনোকিছুই তাদের গভীরভাবে নাড়া দেয় না। কোন কোন লোকের কাছে কি চলছে এবং কেমনটা চলছে তার মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে দেখার চেষ্টা করে না। তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলোই যেন অন্যদের চেয়ে উৎকৃষ্ট, এমনকি মানুষের ইতিহাসে সংকটকালে সংকটে তাদের এই একগুয়েমি ভাবটাই পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র তাদের খিটখিটে বিরক্তি তাদের আকাঙ্খা, এবং তাদের ঘৃণা ছাড়া কোনোকিছুই তাদের কাছে সত্যিকার পার্থক্য আছে বলে মনে করে না। তারা নিজেরা যে অসংখ্য অসংগত বিষয়ের মাঝে ভীতি এবং উদ্বিগ্ন অবস্থার মধ্যে ছিল তার পরিমাণ করা ভার। কাজেই তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল এমন কি তারা অসুস্থও হয়ে পড়েছিল। ক্লান্ত হয়ে না পড়ার সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হলো, এমন কিছুর মধ্যে আপনাকে ছেড়ে দিন যার মধ্যে আপনার গভীর বিশ্বাস আছে।

এক বিখ্যাত রাজনীতিবিদ একেকদিন সাতটা বক্তৃতা দিতেন, তা সত্যেও তাঁর মধ্যে শারীরিক শক্তির ঘাটতি দেখা যায়নি।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সাতটা বক্তৃতা দেবার পরও আপনি ক্লান্তি বোধ করলেন না, তা কিভাবে সম্ভব হলো?

তিনি বললেন, তার কারণ হলো, ঐ বক্তৃতাগুলিতে আমি যা বলেছি, তা আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি, আমার বিশ্বাসের প্রতি আমি অত্যন্ত আগ্রহী।

এই হলো তার শক্তির গোপন উৎস। কিছু কিছু বিষয়ের জন্য তিনি যেন আগুনে পুড়ছিলেন। এই শক্তি ঢেলে তিনি আগুন থেকে নিজেকে বের করে আনছিলেন। কাজেই আপনিও যদি এই বিষয়টি অনুসরণ করেন তবে আপনিও কখনও দৈহিক বা জীবনী শক্তি হারাবেন না। আপনি তখনই শক্তিহীন হয়ে পড়েন যখন আপনার মনের কাছে জীবনকে একটা বিষাদগ্রস্ত বিষয় বলে মনে হয়। আপনার মন অমন একঘেয়েমির শিকার হয়ে পরে এবং সে ক্ষেত্রে আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়াতে কোন কিছু করার ইচ্ছা থাকে না। ক্লান্তিকে আপনি ফাঁকি দিতে পারেন। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা। কোন একটি বিষয় আপনাকে নির্বাচন করতে হবে এবং তার পিছনে মনের অনুরাগ ঢেলে দিতে হবে। মনের মত কোন কিছুতে পুরোপুরি মুগ্ধ হয়ে পড়ুন। মনকে স্বচ্ছন্দ বিচরণ করতে দিন ঐ বিশেষ অবস্থার মধ্যে। নিজের গন্ডী থেকে বের হয়ে আসুন। কিছু বা কেউ একজন হবার চেষ্টা চালিয়ে যান। তার জন্য কিছু একটা করা শুরু করে দিন। চারিদিকে হয়ত খেদোক্তি করার মত অনেক কিছু আছে কিন্তু তাই নিয়ে অযথা বসে থাকবেন না, খবরের কাগজ পড়েও হয়ত বিরক্তিতে মন ভরে যেতে পারে, এবং আপনার বিরক্তও প্রতিবাদী মন হয়ত সোচ্চার হয়ে উঠে বলতে পারে, কেন ওরা কিছু একটা করছে না? এক্ষেত্রে আপনি নিজের স্বার্থ চিন্তা বাদ দিয়ে বড় কিছুর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন এবং তাতে আপনি দেখবেন বিরক্তিকর ক্লান্তি আপনাকে অচল করে রাখছেন না।

যতক্ষণ আপনি বড় এবং ভালো কোন নিমিত্তের সাথে নিজেকে না জড়াচ্ছেন ততক্ষন আপনি ক্লান্তির শিকার হতেই পারেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এমন অবস্থায় আপনি একজন খন্ডিত ব্যক্তি, আপনি একজন অবনত ব্যক্তি। আপনি মৃতকল্প আঙ্গুর গাছের মত। কিন্তু আপনি যত বড় নন তার চেয়ে বড় কিছুর সাথে যদি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তবে দেখবেন আপনার মধ্যেকার সুপ্ত বেড়ে গেছে বহুগুণ। তখন নিজেকে নিয়ে ভাববার সময় আপনার থাকবে না এবং আবেগময় কঠিনতার মধ্যে আপনি ডুবে যাবেন।

অপরিবর্তনীয় শক্তি নিয়ে বাঁচতে হলে যা আপনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আবেগগত দোষত্রুটির সংশোধন করা। তা না করা পর্যন্ত কখনও আপনি পরিপূর্ণ শক্তি পাবেন না।

স্বর্গত Knute Rockne (নুট রকনি), আমেরিকার ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়া খ্যাতনামা ফুটবল কোচদের একজন, বলেছেন যে, একজন ফুটবল খেলোয়ারের হয়তো দৈহিক বল যথেষ্ট পরিমাণ নাও থাকতে পারে যদি না তার আবেগ আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণে থাকে। মূলত: একথা বলতে গিয়ে তিনি অনেক দূর চিন্তা করেছেন যে, তাঁর দলে তিনি এমন কোন খেলোয়ারকে অন্তর্ভূক্ত করবেন না যে প্রত্যেক খেলোয়ারের সাথে সত্যিকার বন্ধু ভাবাপন্ন মানসিকতা বজায় রেখে খেলে। "আমাকে একজন খেলোয়ারের মধ্যে সর্বোচ্চ্য শক্তি পেতে হবে, এবং আমি এটা আবিষ্কার করেছি যে তা করা সম্ভব নয়, যদি সে অন্যজনকে ঘৃণা করে। ঘৃণা তার মধ্যে শক্তির আগমনের পথে অন্তরায় এবং সে সম্পূর্ণতা পায় না যদি না সে তার মধ্য থেকে ঘৃণাবোধকে বের করে দিতে না পারে এবং তা বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতিতে পরিণত না হয়।” যেসব লোকের দৈহিক ও মানসিকশক্তির অভাব তারা গভীর ও প্রধান আবেগময়তায় এবং মানসিক দ্বন্দ্বে এক বা একাধিক মাত্রায় অসংগঠিত। কোন কোন সময় এই বিশৃঙ্খলার ফল হয়ে যায় অত্যধিক, কিন্ত এর নিরাময় চিরদিনই সম্ভব।

মধ্য পাশ্চাত্যের কোন এক শহরে এক লোকের সাথে কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছিল আমাকে, যে জনগোষ্ঠী ঐ শহরে বসবাস করত উনি তাদের মধ্যে একজন খুবই কর্মঠ এক ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তাকে জীবনীশক্তির প্রবল ক্ষয় ভোগ করতে হয়েছিল। তার সহযোগীরা ভেবেছিলেন যে তার স্ট্রোক করেছিল। এরকম একটি ধারণা জন্ম নিয়েছিল তার এলোমেলো আচরণ থেকে, তার অস্বাভাবিক নিশ্চেষ্ট মনোভাব থেকে এবং তার কাজ কর্ম থেকে পুরোপুরি ভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা থেকে অথচ আগে তিনি তার কাজে অনেক লম্বা সময় ব্যয় করতেন। হতাশা ক্লান্ত এই লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে বসে কাটিয়ে দিতেন এবং প্রায়ই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। স্নায়ুবিক ধ্বংসের অনেক লক্ষণ তার মধ্যে প্রকাশ পেতো।

একটি সময় নির্ধারণ করে আমার হোটেল কক্ষে তার সাথে সাক্ষাত করার আয়োজন করলাম। আমার দরজা খোলাই ছিল, এবং সেপথে আমি পরিষ্কার এলিভেটরটি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার সুবিধামত সেদিকে তাকিয়ে দেখছিলাম যে, কখন লোকটি এলিভেটরের দরজা খুলে এলোমেলো চলন্ত চত্ত্বরের ভেতরে এসে ঢুকবেন। মনে হচ্ছিল যে কোন মূহুর্তে তিনি হুমড়ি খেয়ে এসে পড়বেন এবং আমার অনুমান সত্য প্রমাণ করে তিনি ভেতরে এসে ঢুকলেন এবং কোন রকমে আমাদের দুজনের মাঝের দূরত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হলেন। আমি তাকে বসতে বললাম, এবং তার সাথে কথাবার্তা জুড়ে দিলাম, কিন্তু সে কথাবার্তা প্রায় নিষ্ফলই বলা যায়, কারণ তা তার মনে খুবই সামান্য আলোকপাত করতে পারলো। কারণ তার কথার মধ্যে তার বর্তমান অবস্থার জন্য অভিযোগে ভর্তি ছিল এবং আমি যে তাকে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলাম তারপ্রতি সুচিন্তিত বিবেচনা করতে তিনি ছিলেন পুরোপুরি অক্ষম। এর জন্য দৃশ্যত: তার প্রচণ্ড করুণ দশাই দায়ী ছিল। যখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম আপনি ভালো এবং সুস্থ হতে চান কি না, সে উত্তেজিত এবং করুণভাবে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতেন। উত্তরদানের মধ্য দিয়ে তার মনের নৈরাশ্যই প্রকাশ পেতো। তিনি বলতেন, যদি তিনি তার শক্তি ফিরে পেতেন, যদি তিনি জীবনের আগ্রহ ফিরে পেতেন, একসময় যে জীবন তিনি উপভোগ করেছিলেন, তাহলে এই দুনিয়াতে তিনি যে কোন কিছু দিতে প্রস্তুত।

তার মধ্য থেকে আমি তার জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাপূর্ণ ঘটনাবলী একটা একটা করে বের করে আনতে থাকলাম। এসব ছিল পরিচিত ধরনের এবং ওসবের অনেক কিছুই তার চেতনার মধ্যে এমন গভীরভাবে বিদ্ধ হয়েছিল যে এটা তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে থেকে ছেটে ফেলা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শৈশবের পাওয়া নানা বদ্ধমূল ধারণা তার মধ্যে কাজ করছিল, এ সময়কার পাওয়া নানা ভীতিকর ধারণা তার মনে রীতিমত ডগা মেলে বসেছিল এবং এর বেশিরভাগই তিনি পেয়েছিলেন তার মায়ের কাছ থেকে। শুধু যে গুটিকতক অপরাধমূলক অবস্থাই তার মধ্যে এসে বাসা বেঁধেছিল তাই নয়। মনে হয় যেন সেসব বছরের পর বছর ধরে স্রোতের তোরে ধাক্কা খাওয়া বালুর মত নদীগর্ভে স্তুপ হয়ে জড়ো হয়ে উঠেছে। এতে ক্রমে ক্রমে জলধারার প্রবাহ শক্তি এতটা কমে গেছে যে, সে পথে খুবই সামান্য পরিমাণ শক্তি প্রবাহিত হতে পারছিল। লোকটির নিরুৎসাহ মন পুরোপুরিভাবে এমন এক পশ্চাৎপদ অবস্থায় এসে পড়েছিল যে, এর কারণ নির্ধারণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা এবং তার মনে কোন রকম আলোকপাত করা মনে হচ্ছিল একেবারেই অসম্ভব।

একটি পথনির্দেশ পাবার জন্য অনুসন্ধান করলাম এবং তা আমি পেয়েও গেলাম এবং আশ্চর্য হয়ে গেলাম যখন তার পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথার উপর আমার একটি হাত আমি রাখলাম। বিধাতার কাছে প্রার্থনা করলাম প্রভূ! লোকটিকে সুস্থ করে তোল। আর ঠিক তখনই হঠাৎ আমি সতর্ক হয়ে উঠলাম কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম যে, হাতটি আমি লোকটির মাথার উপর ন্যস্ত করেছি তার মধ্য দিয়ে অদ্ভূত এক শক্তি চালিত হচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি বললাম যে আমার হাতে কোন নিরাময়কারী শক্তি নেই, কিন্তু কোন কোন সময় কেউ একজন হয়ত এমন একটি মাধ্যম হয়ে যায় এবং এক্ষেত্রে স্পষ্টত: তাই ঘটেছিল, কারণ লোকটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অত্যন্ত খুশিতেও শান্তিতে মুখ তুলে তাকালেন এবং স্বাভাবিকভাবে বললেন: "তিনি এখানে ছিলেন, তিনি আমাকে স্পর্শ করেছেন, আমি এখন সম্পূর্ণ স্বস্তিদায়ক অনুভব করছি।"

এই সময় হতে তার অবস্থার অবধারিত উন্নতি পরিলক্ষিত হয় এবং বর্তমান সময়ে তিনি বাস্তবিকভাবে আবার তার আগের অবস্থায় চলে আসেন, কিন্তু বারতি যেটুকু তিনি লাভ করেন তা হলো, তার শান্ত এবং নির্মেঘ আত্মবিশ্বাস যা আগে কখনও তার মধ্যে ছিলনা। স্পষ্টত: তাঁর ব্যক্তিত্বের যে প্রণালী প্রায় আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, যেখান দিয়ে তার শক্তি চলাচল করত, অবরুদ্ধ সেই প্রণালী এখন উন্মুক্ত হয়েছে এবং তা হয়েছে বিশ্বাসের জোরে এবং শক্তির মুক্ত গতি এখন নবায়িত হয়েছে।

এই যে ঘটনাটি ঘটল তার মধ্য থেকে এই আভাসই পাওয়া যায় যে, এমন নিরাময় লাভ ঘটে, ঘটা সম্ভব এবং এও সত্যি যে, ক্রম সঞ্চিত মনস্তাত্বিক কারণগুলো শক্তি প্রবাহকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এ ঘটনার আরো একটা গুরুত্ব আছে, তাহলো এই একই কারণগুলো বিশ্বাসের শক্তির প্রতি বেশ সংবেদনশীল; কারণ এগুলো বিশ্বাসের শক্তিকে খণ্ডিত করে ফেলে এবং এভাবে ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে তার ঐশ্বরিক শক্তির প্রণালীকে নতুন করে খুলে দেয়।

অপরাধ ও দৈহিক শক্তিকে কেন্দ্র করে যে ভীতিজনক অনুভূতির সৃষ্টি হয় এবং এর যে ফলাফলটা ঘটে তা অনেকখানি চিনতে পারা যায় মনের সমস্ত প্রভাবের মধ্য দিয়ে। যা মানব প্রকৃতির সমস্যাগুলোতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। পরিমিত জীবনী শক্তির প্রয়োজন ব্যক্তি বিশেষকে হয় অপরাধ কিম্বা ভীতি থেকে স্বস্তি দেয়া অথবা দুটোকেই তা একসাথে করা, তা হবে একটি বিরাট কাজ কারণ প্রায়ই দেখা যায়, মোট জীবনীশক্তির অংশবিশেষ মাত্র বেঁচে থাকার প্রক্রিয়া নির্বাহ করার জন্য অবশিষ্ট থাকে। শক্তির ক্ষরণ ঘটে ভয় এবং অপরাধ অনুভূতির পীড়ন থেকে এবং তা এমন পরিমাণে ঘটে যে, কোন ব্যক্তির কাজ-কর্ম সম্পাদনের জন্য খুব সামান্য শক্তিই তখন অবশিষ্ট থাকে। এর ফলস্বরূপ যা দাঁড়ায় তা হলো, ঐ ব্যক্তি তখন তার হাতের কাজটি দ্রুত সমাপনের চেষ্টা করে। তার দায়দায়িত্বের পুরোপুরি আবশ্যকতা পূরণ করতে সক্ষম না হয়ে, সে ফিরে যায় এক করুণ, নিরস এবং অলস জীবনে, এমনকি সত্যি সত্যি সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে নিষ্কর্মার মত এক অর্থব অবস্থায় পড়ে থাকতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

এক মনস্তত্ববিদ তার এক ব্যবসায়ী রোগীকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। আমার মনে হলো যে রোগীটির নৈতিক চরিত্রগতভাব সম্পূর্ণ কঠোর এবং সৎ প্রকৃতির কিন্তু এক বিবাহিতা মহিলার সাথে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পরেন। সম্পর্কটি চুকিয়ে দেবার চেষ্টা তিনি করেছিলেন, কিন্তু তার এই ব্যভিচারীনি প্রণয়িনী তার পক্ষ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যদিও লোকটি মহিলাকে আন্তরিকভাবে এমন কাজ থেকে বিরত হতে আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন এবং আগের সামাজিক জীবনে ফিরে যেতে দিতে বলেছিলেন।

কিন্তু মহিলাটি লোকটিকে এই সম্ভাবনার কথা বলে যে যদি এ সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয় তবে সে তার স্বামীর কাছে তার এই উচ্ছঙ্খলতার কথা ফাঁস করে দেবে। রোগী লোকটি পুরো ঘটনাটি বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি এই ঘটনাটি মহিলা তার স্বামীর কাছে ফাঁস করে দেয় তাহলে সমাজে সে লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে পড়বে। অথচ সমাজে সে একজন খ্যাতনামা ব্যক্তি এবং সেখানে তাকে দামী লোক হিসাবে মূল্যায়নও করা হয়।

ঘটনাটি ফাঁস হয়ে যাবার ভয়ে এবং তার অপরাধবোধ তার ঘুম আর আরাম হারাম করে ফেলেছিল। এবং তখন থেকে দুতিন মাস পাড় হয়ে গিয়েছিল, শারীরিক শক্তির এতটা পতন হয়েছিল যে লোকটি দক্ষতার সাথে তার কাজকর্মও করার মত অবস্থায় ছিল না। যেহেতু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল তাই তার অবস্থাটাও হয়েছিল খুব গুরুতর। যখন ঐ মনস্তত্ববিদ আমার সাথে অর্থাৎ একজন ধর্মযাজকের সাথে দেখা করতে পাঠালেন, ঘুমাতে না পারার কারণে লোকটি আমার কাছে আসতেও প্রতিবাদ করেছিলেন। আপত্তির কারণ হিসেবে বললেন যে, আমার নিদ্রাহীনতা দূর করার মত কোন পথ ধর্মযাজক বাতলে দিতে পারবেন না। কিন্তু অন্যদিকে আমার মনে হচ্ছে একজন মেডিসিনের ডাক্তার ফলপ্রদ ঔষধ দিয়ে আমার এই জটিল অবস্থার নিরসন করতে পারবেন।

যখন তার মনোভাব তিনি আমার কাছে ব্যক্ত করলেন, আমি শুধু তার কাছে জানতে চাইলাম যে প্রচন্ড বিরক্তিকর অবস্থায় এবং অপ্রীতিকর শয্যাসঙ্গী যার সাথে তিনি ঘুমাবার চেষ্টা করছিলেন তখন কেমন করে তিনি ঘুমাবার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু প্রচণ্ড বিস্ময়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "শয্যাসঙ্গী কিসের শয্যাসঙ্গী?” "আমার কোন শয্যাসঙ্গী নেই।"

“ও আচ্ছা, কিন্তু আছে তো,” “এই পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে ঐ দু'জনকে ছাড়া ঘুমাতে পারে, একেকদিকে একজন করে নিয়ে ঘুমাতে যায়।”

তিনি জানতে চাইলেন, "আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?” আমি বললাম: "প্রতি রাতে আপনি এক পাশে ভয় অন্য পাশে অপরাধকে শয্যাসঙ্গী করে ঘুমাতে চেষ্টা করছেন এবং আপনি একটি অসম্ভব অসাধারণ কাজ করতে চাইছেন। এর সাথে কোন তফাৎ নেই যে কতগুলো ঘুমের বড়ি আপনি গিলছেন এবং আপনি স্বীকার করেছেন আরো কত ঘুমের বড়ি আপনি আগে গিলেছেন, কিন্তু ওসবে নিদ্রাহীনতার উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তার কারণটি হল যে, তা আপনার সমস্যার উপর কর্তৃত্ব করতে পারে না, কারণ ওসব আপনার মনের গভীরতর স্তরে পৌঁছতে পারে না, যেখানে এই নিদ্রাহীনতার উৎস এবং যা আপনার শক্তিকে আপনার মধ্য থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তাই অবশ্যই আপনাকে মন থেকে ভয়ভীতি এবং অপরাধবোধ উৎপাটিত করতে হবে এবং কাজটি করতে হবে ঘুমাতে যাবার আগেই তারপর আপনি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ঘুমাতে পারবেন এবং আপনার শক্তিও ফিরে পাবেন।

আমরা ভয়ভীতি নিয়ে আলাপ করলাম, কারণ এই আলাপটা ছিল একটা সাধারণ কৌশলের বহিঃপ্রকাশ। যাতে লোকটা পরে যা তার সঠিক কিছু করার ফলশ্রুতি হিসাবে এসে উপস্থিত হবে তার জন্য যেন মনে প্রস্তুত থাকতে পারে এবং তা করা হয়েছিল অবশ্যই যাতে তার অযুক্তি বাজে ফলাফলগুলোকে ভেঙ্গে দেয়া যায় তার জন্য। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, যা কিছু তিনি করেছিলেন তা ঠিকই ছিল এবং এথেকেই আসবে নির্ভেজাল সত্যটি। সঠিক কিছু করে কেউ কখনও বলতে পারে না যে, সে ভুল করেছে। আমি তাকে অনুরোধ করে বললাম যে, আপনার এই অবস্থাটি আপনি বিধাতার হাতে ছেড়ে দিন এবং শুধুমাত্র সঠিক কাজটি করুন। ফলাফল কি হবে সে ভার বিধাতার হাতে ন্যস্ত করুন।

লোকটি তা করলেন কিন্তু অকম্পিতচিত্তে নয় কিন্তু মোটামুটি আন্তরিক ভাবেই কাজটি করলেন। আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, মহিলাটিও হয় তার চাতুর্যের মধ্য দিয়ে কিম্বা তার শুভ প্রকৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে অথবা আরো কোন সন্দেহজনক কৌশল প্রয়োগ করে, হয়ত অন্য কোনো খানে, অন্য কারো প্রতি তার কুট প্রেম বা কুট মায়াজাল বিস্তার করে লোকটিকে রাহুমুক্ত করে দিল।

লোকটির অপরাধবোধের হাত থেকে রেহাই পাবার যে সুন্দর সূচনা ঘটলো, তার পিছনে কাজ করলো যে বিষয়টি তা হলো বিধাতার কাছে অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। যখন আন্তরিকভাবেই কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন ক্ষমা দিতে বিধাতা অস্বীকার করে না। এবং আমার রোগীটিও খুঁজে পেলেন অশান্তির নিবৃত্তি এবং পরিত্রান। এটা অবাক হবার মত একটা ব্যাপার ছিল যে, যখন দুটো ভারি ওজন কেমন করে তার মন থেকে তার ব্যক্তিত্ব থেকে তুলে নেয়া হল এবং আবার তিনি স্বাভাবিকভাবে আগের মতই কাজকর্ম শুরু করে দিলেন। আবার তিনি শান্তিতে ঘুমাতে পারছিলেন। আবার তিনি মনে শান্তি খুঁজে পেলেন নব উদ্যম নব শক্তি।

তার শরীরে নবশক্তি ফিরে এল খুব দ্রুতগতিতে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী এবং কৃতজ্ঞচিত্ত লোকে পরিণত হলেন তিনি এবং তার সমস্ত কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে থাকলেন।

জীবনীশক্তি কমে কমে যে অবস্থাটি এসে উপস্থিত হয় তা হলো, বিষাদগ্রস্ততা এবং তা বিরল কোন বিষয় নয়। মানসিক চাপ, একঘেয়েমি, এবং দায়দায়িত্ব পালনের যে ক্রমাগত ধারাবাহিকতা তা মনের সতেজ ভাবটিকে নিস্তেজ করে দেয়, অথচ সতেজ মন নিয়েই একজনকে তার সমস্ত কাজকর্ম সাফল্যের সাথে সমাধা করার জন্য এগিয়ে যেতে হয়। যেমন একজন এ্যাথলিট একসময় জ্বরাজীর্ণ হয়ে যায়, তেমন অন্য আরেকজনও হতে পারে তার পেশা যাই হোক না কেন শুকনো এবং নীরস দিনগুলোতে সে অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো কিছু পাবার জন্য যত্নবান হয়ে উঠে। মনের এমন অবস্থায় দেহ মনের প্রবলতর শক্তি খরচ হয়ে যায়, তখন সে কাজ করে করে অনেক কষ্টে কিন্তু একসময় সে এই কাজ করতে। অপেক্ষাকৃত আরো আরামে। এর ফলস্বরূপ যা ঘটে তা হলো, মানুষের মূল শক্তি যেটুকু একান্তভাবেই প্রয়োজন সেটুকু যোগান দিতে খুবই অসুবিধায় পড়ে যায় এবং সেই ব্যক্তি বিশেষ প্রায় তার মুষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। মনের এই অবস্থা থেকে মুক্তির একটি সেন্সর পথ বাতলে দিয়েছিলেন কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির খ্যাতনামা ব্যবসায়ী নেতা। এক অধ্যাপক সাহেব সভাপতি এবং একাধারে একজন অধ্যাপক একসময় যিনি ছিলেন সুবিদিত এবং অসাধারণ জনপ্রিয় কিন্তু কি কারনেই যেন তিনি শিক্ষক হিসাবে তার সামর্থ হারিয়ে ফেলছিলেন এবং একই সাথে তিনি তার ছাত্রদেরও অনুরাগী করে তোলার শক্তি হারাতে শুরু করেছিলেন। তাতে অসন্তুষ্ট ছাত্র-ছাত্রীরা এবং একই সাথে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরাও তাদের নিজ নিজ মন্তব্য জানিয়ে ঐ অধ্যাপককে দোষী করে বললেন যে, অবশ্যই তাকে তার হারানো দক্ষতা এবং অনুরাগ পুণরুদ্ধার করতে হবে। নয়তো তাকে বরখাস্ত করে অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করার প্রয়োজন হবে। এই শেষোক্ত কৌশলটি দ্বিধান্বিত মনে পোষণ করা হয়েছিল কারণ রিটায়ারমেন্টে যাবার আগে এখনও কয়েকটি বছর তার কাছ থেকে সফল শিক্ষকতা আশা করছিল কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টির ঐ ব্যবসায়ী অধ্যাপক সাহেবকে তার কার্যালয়ে আসতে বললেন এবং তাকে জানানো হলো যে, বোর্ড অব ট্রাস্টি তাকে ছয় মাসের যাবতীয় খরচ এবং বেতনসহ ছুটি দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ছুটির একমাত্র শর্ত হল যে, অধ্যাপক সাহেব কোন বিশেষ বিশ্রাম স্থলে যাবেন এবং পুরোপুরি দৈহিক এবং মানসিক শক্তিকে নবায়িত করবেন। ব্যবসায়ী ব্যক্তিটি অধ্যাপক সাহেবকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বললেন যে, আপনি নির্জন অরণ্যের মত জায়গায় আমার একটি বাড়ি আছে, তারই একটি কক্ষে এই ছুটিটা কাটাবেন। এবং বিশষ কিছু পরামর্শও তিনি তাকে দিলেন। বললেন আপনি সাথে করে অন্য কোন বই না নিয়ে শুধু মাত্র বাইবেলটি নেবেন। আর আপনার প্রতিদিনের করণীয় কাজ হবে হাঁটাহাঁটি করা; লেকে মাছ ধরা বাগানে কিছু হাতের কাজ আপনি করবেন, এবং প্রতিদিন সময় ধরে বাইবেলটি পড়বেন যাতে ছুটির এ ছ'মাস সময়ে বাইবেলটি আপনি অন্তত তিনবার পড়ে ফেলতে পারেন। তিনি আরো পরামর্শ দিয়ে বললেন যে, আপনি আপনার মনকে সম্পূর্ণরূপে পরিপুষ্ট করার জন্য বাইবেল থেকে বাছাই করে করে যতদূর সম্ভব বিশেষ বিশেষ অংশগুলো বিশেষ মূল্যবান কথাগুলো মুখস্ত করে ফেলবেন।

ব্যবসায়ী ব্যক্তিটি বললেন, আমি বিশ্বাস করি যে, যদি আপনি নানান কাজ নিয়ে ছ'মাস বাইরে কাটান, যেমন এ সময়টায় আপনি কাঠ কাটলেন মাটি খোঁড়াখুড়ি করলেন, বাইবেল পড়লেন যার যার ধর্ম মতে, (কুরআন, গীতা ইত্যাদি) এক গভীর হৃদে মাঝ ধরলেন, তাহলে দেখবেন যে আপনি এক নতুন মানুষে পরিণত হয়েছেন।

অদ্ভূত সুন্দর এই প্রস্তাবে অধ্যাপক সাহেব রাজি হয়ে গেলেন জীবনের এই ভিন্ন এবং আমূল পরিবর্তনযোগ্য ধরনের সাথে খাপ খাইয়ে নেব্বর। এটি ছিল একটি সহজতর পথ। যা সে নিজে কিম্বা অন্য কেউ আশাই করতে পারতো না। আসলে তিনি এমনই একটি পথ মনে মনে খুবই পছন্দ করতেন, আর তেমনি একটি পথ একেবারে হাতে নাগালের মধ্যে চলে আসাতে তিনি সেত্যিই বিস্মিত হয়ে গেলেন।

স্বচ্ছন্দভাবে মানিয়ে নিতে পেরে তিনি একটি কাজ সুন্দর বিষয় আবিস্কার করলেন যে, এমন একটি পরিবেশে কাটানোর আবেদনই আলাদা এবং এটাই তিনি প্রচুর পরিমাণে উপলব্ধি করলেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি হয়ত তার সুবিজ্ঞ বন্ধু-বান্ধবদের সাহচর্য থেকে এবং পড়াশুনা থেকে দূরে থাকলেন, কিন্তু প্রবলশক্তিতে তার মনকে আকর্ষিত করল বাইবেল, (প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের এমন শক্তি আছে) পড়ে দেখুন। তার সাথে থাকা একমাত্র বই, একেবারে নিমজ্জিত হয়ে গেলেন বইটির মধ্যে তার মনে হলো, এর মধ্যে যেন বিরাট এক লাইব্রেরী বিদ্যমান। বইটির পাতায় পাতায় তিনি খুঁজে পেলেন বিশ্বাস শান্তি আর শক্তির বাণী আর এভাবেই মাত্র ছ'মাসে তিনি এক নতুন মানুষে পরিণত হলেন।

ব্যবসায়ী লোকটি এখন আমাকে বলছেন যে, এই অধ্যাপক সাহেব এখন এক বর্ধিত শক্তির ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। বিষাদ ভাবটি একদম উবে গেছে, হারানো দিনের হারানো শক্তি আবার ফিরে পেয়েছেন, তার ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে মনের শক্তি আবার তরাঙ্গায়িত হচ্ছে। বেঁচে থাকার স্বাদ আবার নতুন রূপে চাঙ্গা করে তুলেছে তাকে।

📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 প্রার্থনার শক্তি পরীক্ষা করে দেখুন

📄 প্রার্থনার শক্তি পরীক্ষা করে দেখুন


শহরের রাজপথে অবস্থিত এক সুউচ্চ বাণিজ্যিক অফিসে দুজন লোক একান্তে বসে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছেন। এদের একজন মারাত্মক ব্যবসায়িক ঝামেলায় এবং আরো কিছু ব্যক্তিগত সংকটে পড়েছেন। প্রচণ্ড মানসিক চাপে বিরামহীনভাবে এপাশওপাশ হাঁটাহাঁটি করছেন। তারপর হয়ত একসময় বিষন্নভাবে বসে পড়লেন। যন্ত্রণা উত্তপ্ত মাথা হাতের উপর ন্যস্ত, যেন হতাশা ক্লান্ত এক ছবি। অপরজন জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ব বলে খ্যাত, ব্যবসয়ী লোকটি তারই কাছে এসেছেন উপদেশ লাভের জন্য। দুজনেই তারা একত্রে সমস্যাটা কি হতে পারে, কেন হতে পারে তা সবদিক থেকে আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছিল তা কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। অধিকন্তু তা শুধু লোকটার কষ্ট আর ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে এবং তাকে আরো ভগ্নোৎসাহি করে তুলেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটি শুধু বললেন, "আমি অনুমান করছি হয়ত দুনিয়াতে এমন কোনো শক্তি নেই যা আমাকে রক্ষা করতে পারে।"

তার এ হতাশাপূর্ণ ক্ষেদোক্তি অন্যজনের মনে মুহূর্তের জন্য প্রতিফলিত হলো, তারপর কিছুটা আস্থাহীনের মতই বললেন, "আমি এ বিষয়টিকে ওভাবে দেখতে চাই না। আপনি যে বলছেন, এমন কোন শক্তি নেই যা আপনাকে রক্ষা করতে পারে, আপনার এ কথাটি আমি বিশ্বাস করি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি দেখেছি যে, সমস্যা যাই হোক না কেন প্রতিটি সমস্যারই কোননা কোন সমাধান অবশ্যই আছে। কোন একটি শক্তি অবশ্যই আছে যা আপনাকে সাহায্য করতে পারে।" তারপর আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন, প্রার্থনার শক্তিকে কেন পরীক্ষা করে দেখেন না?

হতাশাগ্রস্ত লোকটি একথা শুনে কিছুটা বিস্মিত হয়ে গেলেন, এবং বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই, আমি প্রার্থনায় বিশ্বাসী, কিন্তু হয়ত আমি জানি না কেমন করে প্রার্থনা করতে হয়। আপনার কথায় প্রার্থনার বাস্তব ফলাফলের কিছুটা আভাস পাচ্ছি, এবং তা হয়ত ব্যবসা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানেরও উপযুক্ত। আমি কখনও ওভাবে ভেবে দেখিনি, কিন্তু আপনি যদি আমাকে একটু দেখিয়ে দেন যে, কেমন করে প্রার্থনা করতে হয় তাহলে আমার খুবই ইচ্ছা হয় যে একটু পরীক্ষা করে দেখি, প্রার্থনার শক্তি কেমন?

তিনি প্রার্থনার বাস্তব কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, এবং প্রদত্ত ধারায় প্রার্থনা করে তার জবাবও তিনি পেয়েছিলেন। পরিশেষে তার বিষয়গুলোর সন্তুষ্টজনক পরিবর্তন ঘটে। তবে এটা বলা যাবে না যে তার আর কোন কষ্ট ক্লেশ ছিল না। আসলে তার বরঞ্চ অপেক্ষাকৃত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। কিন্তু অবশেষে তিনি এসব কষ্ট ভোগের একটা সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। এখন তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, সত্যিই প্রার্থনার শক্তি আছে, এবং সম্প্রতি আমি তাকে বলতে শুনছি, সব সমস্যাই সমাধান করা যেতে পারে এবং সঠিকভাবে করা যেতে পারে, যদি আপনি প্রার্থনা করেন।

শারীরিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সমৃদ্ধ ব্যক্তিও প্রায়ই দেখা যায় প্রার্থনাকে রোগের চিকিৎসায় ব্যবস্থাপত্রের সাথে অন্তভূক্ত করে থাকেন। অক্ষমতা, দুঃশ্চিন্তা এবং সমজাতীয় কষ্টগুলোই হয়ত মানুষের আভ্যন্তরীন সামঞ্জস্যহীনতার ফলশ্রুতি হিসেবেই ঘটে থাকে। এটাই আশ্চর্যের বিষয় যে, কিভাবে প্রার্থনা শরীর এবং আত্মার সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকারীতা প্রত্যাপণ করে। আমার স্বাস্থ্য চিকিৎসক বন্ধু এক স্নায়ু রোগীকে একবার এক বার্তা দিয়ে বলছিলেন, "বিধাতা আমার আঙ্গুলের মধ্য দিয়ে কাজ করে। যখন আমি আপনার শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগহীন শিথিলতা কামনা করি, কারণ আপনার শরীর আপনার আত্মার মন্দির। যখন আমি আপনার বাইরের অবস্থা নিয়ে কাজ করি তখন আমি চাই, আপনি বিধাতার কাছে আভ্যন্তরীন শান্তির জন্য প্রার্থনা করেন।” রোগীটির কাছে এ ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি ধারণা। কিন্তু তিনি খুব দ্রুত কিছু পাবার ভাবনায় ব্যপৃত ছিলেন এবং কিছু শান্তিপূর্ণ চিন্তার মধ্যদিয়ে পরিচালিত করার চেষ্টাও করেছেন। তার মানসিক উদ্বেগের শিথিলতার এমন সুন্দর ফল পেয়ে তিনি খুবই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন।

জ্যাক স্মিথ, হেলথক্লাবের পরিচালক, নামী দামী অনেকের পৃষ্ঠপোষকতায় তার এই ক্লাব চলছিল, তারাও প্রার্থনা চিকিৎসায় বিশ্বাস করতেন এবং তা প্রয়োগ করতেন। একসময় লোকটি ছিলেন মল্ল-যোদ্ধা তারপর শরীরডাইভার এবং সবশেষে তিনি এই হেল্থক্লাব খোলেন। তিনি বলেন যে, যখন তিনি তার পৃষ্ঠপোষকদের দৈহিক নমনীয়তা তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করতে তখন তিনি তাদের আধ্যাত্মিক নমনীয়তাও পরীক্ষা করতেন। কারণ তিনি দুষ্টতার সাথে বলেন, “আপনি কোন ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে স্বাস্থ্যবান পাবেন যদি না তাকে আধ্যাত্মিকভাবে স্বাস্থ্যবান পাওয়া যায়।"

একদিন অভিনেতা ওয়াল্টার হাটসন জ্যাক স্মিথের পাশের ডেস্কে বসেছিলেন। দেয়ালের গায়ে বড় বড় হরফে লিখা একটি সংকেত তিনি দেখতে পেলেন; ঐ বর্ণমালাগুলোর অর্থ কি? স্মিথ একটু হেসে বললেন, এর অর্থ হলো নিশ্চয়তা জ্ঞাপক প্রার্থনা থেকে শক্তি নির্গত হয় যার দ্বারা ভালো ফল পাবার বিষয়টিও সম্পাদিত হয়।

বিস্ময়ে হাটসনের চোয়াল নীচে নেমে গেল, বেশ তো, আমি কখনও একটি হেলথ ক্লাব থেকে এমন কিছু শুনতে আশা করিনি।

মি. স্মিথ বললেন, আমি এই প্রক্রিয়াটি প্রয়োগ করে থাকি এবং তা আমি করি সবাইকে কৌতুহলী করার জন্য যাতে সবাই আমার কাছে জানতে চায় ঐ বর্ণ বিন্যাসের অর্থ কি? আর ঐ বিষয়টা আমাকে তাদের এ কথাটিই বলার সুযোগ করে দেয় যে, “যথার্থ প্রার্থনা অবশ্যই একটি ভালো ফল বয়ে আনে।” জ্যাক স্মিথ নামে এক ভদ্রলোক আমাকে শারীরিকভাবে ভালো থাকার ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছেন, লোকটির বিশ্বাসটিও এমন যে, প্রার্থনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যদি অধিকগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে না ও হয় তবে ব্যায়াম করুণ এবং ইষদুষ্ণ পানিতে স্নান করুন এবং ভালো করে শরীর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করুন। কারণ মন ও শরীর থেকে শক্তি উৎসারিত হবার পদ্ধতি হিসেবে এটিই প্রধান অংশ হিসেবে কাজ করে।

আজকাল মানুষ আগের তুলনায় অধিক প্রার্থনা করে। কারণ তারা একটি বিষয় বুঝতে পারছে যে, প্রার্থনা তাদের কাজে দক্ষতা বাড়াতে বাড়তি শক্তি যোগান দেয়। প্রার্থনা তাদের শক্তি সংগ্রহ করতে সাহায্য করে থাকে যা অন্য কোনোভাবে সহজলভ্য নয়।

কেন এক বিখ্যাত মনঃস্তত্ববিদ বলেন, প্রার্থনা হল এক মহানতম শক্তি যা ব্যক্তি বিশেষ তার ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে যথাযথভাবে কাজে লাগায়। সত্যিই এর শক্তি আমাকে অবাক করে দেয়।

প্রার্থনা শক্তি হলো মানসিক শক্তির প্রকাশ স্বরূপ। ঠিক যেমন বৈজ্ঞানিক কলাকুশল আণবিক শক্তির প্রকাশ ঘটায়। আবার ঠিক তেমনিভাবে বৈজ্ঞানিক কার্যপ্রণালীও আধ্যাত্মিক শক্তি নির্গত করে থাকে এবং তা হয় প্রার্থনার মধ্য দিয়ে উদ্যমশীল শক্তির উদ্দীপনাময় উপস্থাপনই এর সুস্পষ্ট প্রমাণ।

প্রার্থনা শক্তি মনে হয় বুড়িয়ে যাবার বিষয়টিকেও সাভাবিক একটি অবস্থায় ধরে রাখতে পারে। কিংবা নিবারন করতে পারে অথবা শারীরিক দৃঢ়তার অভাবকে এবং শরীরের আরো অবনতি ঘটতে একটি সীমিত অবস্থায় রাখতে পারে। বিগত বছরগুলোতে সংগৃহীত আপনার মূল দৈহিক জীবনী শক্তিকে কোনটিই হারাবার প্রয়োজন নেই বা দুর্বল হয়ে জীবনী শক্তি এসবের প্রতি উদাসীন হবারও কোন প্রয়োজন নেই। আপনার জীবনী শক্তিকে অবসন্ন বিস্বাদ করা অথবা জ্বরাজীর্ণ হতে দেবার কোন আবশ্যকতা নেই। প্রতিদিনের সন্ধ্যা প্রার্থনা আপনাকে সতেজ করে তুলতে পারে, এবং প্রতিদিন সকালেও আপনি নবায়তি মন নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন। আপনার যে কোন সমস্যায় আপনি সঠিক দিক নির্দেশনা পেতে পারেন যদি প্রার্থনাকে খুব সুক্ষ্মপথে আপনার অবচেতন মনে প্রবেশ করাতে পারেন। যেখানে আপনার সিদ্ধান্তকারী শক্তি বসে আছে, যে আপনাকে বলে দেয় আপনি সঠিক বা ভুল কোন কাজ করছেন কি না। আপনার মনের প্রতিক্রিয়াকে সঠিক রাখার এবং নিখুঁত রাখার মত শক্তি প্রার্থনার আছে। আপনার অবচেতন মনের গভীরে পরিচালিত প্রার্থনা শক্তি আপনাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম। প্রার্থনা শক্তি নির্গত করে এবং এর ধারাকে মুক্তভাবে প্রবাহিত করে।

যদি এই শক্তি সম্বন্ধে আপনার অভিজ্ঞতা না হয়ে থাকে তবে সম্ভবত আপনাকে প্রার্থনা করার নতুন কৌশল রপ্ত করতে হবে। একটি দক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে প্রার্থনা সম্বন্ধে পড়াশুনা করা ভালো। সাধারণত প্রার্থনার প্রতি ঝোঁক সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় ব্যাপার, যদিও দুটো ধারণার মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। বিজ্ঞানসম্মত আধ্যাত্মিক অনুশীলন স্টোরওটাইপ নিয়মাবলীকে বাতিল করে দেয়, এমনকি তা যখন সাধারণ বিজ্ঞানে করানো হয়। এমনকি তা যদি আপনার প্রতি কোন আশীর্বাদ বয়ে আনে এবং নিঃসন্দেহেই তা আনে, সম্ভবত আপনি আরও ফলপ্রসু প্রার্থনা করতে পারেন যদি প্রার্থনার ধারাটি একটু বদলে নিতে পারেন এবং তা আপনি করতে পারেন প্রার্থনার যথাযথ সূত্র প্রয়োগ করে। নতুন অন্তদৃষ্টি লাভ করুন। নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে চর্চা শুরু করুন যাতে বড় ধরনের ফল লাভ করা যায়।

এ বিষয়টি অনুধাবন করা খুবই জরুরী যে আপনি যখন প্রার্থনা করছেন তখন জগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর শক্তি পরিচালনা করছেন। এমন একটি ক্ষেত্রে আপনাকে আলোকিত করার জন্য অবশ্যই আপনি পুরনো ধাচের কোন কেরোসিনের বাতি ব্যবহার করবেন না। আপনি চাইবেন একটি আধুনিক ধাচের বাতি ব্যবহার করতে। নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই আজকাল আধ্যাত্মিক প্রতিভার জাগরণ দেখা যাচ্ছে। যারা একাধিক্রমে নতুন নতুন এবং যথার্থ আধ্যাত্মিক কলাকৌশলগুলো আবিস্কার করে যাচ্ছেন। বিষয়টি উপদেশযোগ্য যে, ঐসব আধ্যাত্মিক দ্রষ্টাদের উদ্ভাবিত পথ অবলম্বন করে আপনিও প্রার্থনার শক্তি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখুন যাতে প্রার্থনার শক্তি সবল এবং কার্যকারী প্রমাণিত হয়।

যদি প্রার্থনার এ প্রয়োগিক বিষয়টি নতুন এবং নিশ্চিত বলশুক্তি আপনাকে দিতে পারে এবং তা আশ্চর্যরূপে বৈজ্ঞানিক বলে প্রমাণিত হয় তবে মেনে রাখবেন প্রার্থনার গুপ্ত শক্তি সবচেয়ে ফলপ্রসুভাবে আপনার বিনীত এবং হৃদয়কে বিধাতামুখী করে তুলবে। যে কোন পন্থায়ই হোক না কেন আপনি যদি ঐশ্বিশক্তিকে নাড়া দিতে সক্ষম হন এবং তা আগনার মনে একটি ঐশ্বিশক্তি প্রবাহ দিতে পারে তবে সেই পন্থাই হবে বৈধ এবং ব্যবস্থার যোগ্য একটি পন্থা।

দু'জন বিখ্যাত শিল্পপতি তাদের জীবনে প্রয়োগকৃত ও বিজ্ঞানসম্মত প্রার্থনার একটি উদাহরণ চিত্র তৈরি করেছেন। যাদের নাম বিশেষ অনুমতি নিয়েই আমার পাঠকদের আমি জানাবো। যে দু'জনের কথা আমি বললাম তাদের ব্যবসা এবং কৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে একটি সভা ছিল। একজন হয়ত ভাবতে পারে যে, এই লোক দু'জন হয়ত তাদের এমন কোন সমস্যার কথা নিরেট কৌশলগত ভিত্তিতেই উপস্থাপন করতে পারে এবং আসলে তা তারা করেছেন ও এবং অধিকন্তু এ বিষয়ে তারা প্রার্থনাও করেছেন। কিন্তু তারা এর কোন কার্যকরী ফল লাভ করতে সক্ষম হননি। সেজন্য তাদেরকে মফস্বলের এক ধর্ম প্রচারকের কাছে ডাকা হয়েছিল, এবং ধর্ম প্রচারক ঐ দু'জনের একজনের পুরনো বন্ধু ছিলেন। কারণ তারা ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, বাইবেলের প্রার্থনার মূল বিষয় হলো, যেখানে দুজন বা তিনজন আমার নামে (সৃষ্টিকর্তার নামে) একত্রিত হয়, সেখানে আমি তাদের মধ্যে বিরাজ করি। তারা আরো একটি বিষয়ের দিকে নির্দেশ করে বলেছেন যেমন: "তোমাদের দু'জনও যদি একই উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীর যে কোন বস্তু স্পর্শ করে যে কোন কিছু চাও তবে স্বর্গে যিনি আছেন তার নামে তা পূর্ণ হবে।”

স্কুলে বিজ্ঞান বিষয়ে চর্চা করাতে তারা বিশ্বাস করেন যে, প্রার্থনার দ্বারা কোন কিছু করতে চাওয়া বিস্ময়কর এক ব্যাপার এবং তাদের উচিৎ অতি যত্নের সাথে বাইবেলে বর্ণিত (অন্যান্য ধর্ম শাস্ত্রে তদ্রূপ) বিষয়গুলোকে অনুসরন করা যাকে তারা আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের মূল বই হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিজ্ঞানকে কাজে লাগাবার যথার্থ প্রণালী হলো ঐ বিজ্ঞানের মূল বইয়ে বর্ণিত স্বীকৃত প্রণালীকে কাজে লাগানো। কারণ দর্শিয়ে তারা বলেছেন যদি বাইবেল এটাই নিদের্শ করে যে, দুজনে বা তিনজন একত্র হওয়া উচিৎ, সম্ভবত কারণটি হলো যে, তারা সাফল্য লাভ করতে পারছিলেন না, কাজেই তাদের তৃতীয় আরেকটি পক্ষের দরকার হয়ে পরেছিল।

কাজেই তিনজন একত্রে প্রার্থনা করলেন এবং এভাবেই পরিচালিত রীতিতে যাতে কোন ত্রুটি না থাকে তাই তাকে আগলে রাখলেন। তারা বাইবেলে বর্ণিত অন্যান্য কৌশল সম্বন্ধে ও নানা পরামর্শ দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, যেমন “তোমার বিশ্বাস অনুসারেই তোমার প্রতি তা বাস্তবায়িত হোক। তোমরা যাই বার্ষন করনা কেন, যখন তোমরা প্রার্থনা কর, এবং বিশ্বাস কর যে তা তোমরা পেয়েই যাচ্ছ।"

কয়েকটি পূর্ণঙ্গ প্রার্থনা সভার পর লোক তিনজন একত্রে এটাই নিশ্চিত হলেন যে, তারা তাদের প্রার্থনার উত্তর পেয়েই গেছেন। প্রার্থণার ফলাফল ছিল পুরোপুরি সন্তুষ্টজনক। পরবর্তীতে পাওয়া ফলাফল তাদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে আসলেই তারা স্বর্গীয় পথ-নির্দেশ পেয়েছিলেন।

এই লোকগুলো তেমন যথেষ্ট বড় বৈজ্ঞানিক নয়, যারা আধ্যাত্মিক বিধি বিধানগুলো প্রাকৃতিক বিধানগুলোর চেয়ে বেশি কিছু, তার যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন মনে করেন না, কিন্তু তারা সেসব ঘটনায় খুব সন্তুষ্ট যখন ঐসব বিধিবিধানগুলো সঠিক কৌশলাদি কাজে লাগায়।

তারা বললেন 'যখন আমরা এটা ব্যাখ্যা করতে পারিনা,' ব্যাপারটি তখন এমনি থেকে যায় যে আমরা আমাদের সমস্যার দ্বারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি এবং বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের পদ্ধতি অনুসারে প্রার্থনা করার চেষ্টা করেছি পদ্ধতিটি কাজে লেগেছে এবং আমরা খুব সুন্দর ফল লাভ করেছি।” তারা আরো বললেন যে, বিশ্বাস এবং ঐক্য দুটোই প্রার্থনা পরিচালনা রীতির ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এক লোক কয়েক বছর আগে নিউইয়র্ক শহরে ছোট খাটো একটি ব্যবসা শুরু করেছেন। তার প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপানের বৈশিষ্ট বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, দেয়ালের গায়ে ছোট্ট একটি গর্ত এ হলো তার প্রথম প্রতিষ্ঠা। তার একজন কর্মচারী ছিল। কয়েক বছরের মধ্যে তারা ওখান থেকে একটি বড় কক্ষে স্থানান্তরিত হল এবং তারপর আরো বড় বাড়িতে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন। শেষ পর্যন্ত তা খুবই সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলো।

লোকটির বর্ণনা অনুসারে তার এই ব্যবসা পদ্ধতি হল, আশাবাদী ও ভাবনা দিয়ে দেয়ালের গায়ে ছোট্ট গর্তটি আগে ভরে ফেল। পরিস্কার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, এই কঠিন কাজটি সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যদি একজনের হ্যাঁ ব্যঞ্জক চিন্তা থাকে, সুন্দর পরিচালনা শক্তি থাকে।

মানুষের সাথে তার ব্যবহার যদি সঠিক হয় এবং সর্বোপরি সে যদি যথার্থ প্রার্থনা করতে পারে। আমি দেখেছি যে লোকটি কেমন সৃজনশীল এবং অসাধারণ এক মনের মানুষ এবং তার নিজস্ব এবং সহজ সরল পদ্ধতি ব্যবহার করে কেমন করে তার সমস্যাগুলোকে তিনি সমাধান করেছেন এবং কিভাবে প্রার্থনাশক্তিকে ব্যবহার করে কঠিন অবস্থাগুলিকে তিনি একটির পর একটি জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি কৌতূহল জাগাবার মত 'সূত্র' কিন্তু আমি তা অভ্যাস করে দেখেছি যে তা কার্যকারী হয়। তাই আমি অনেক কেই এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছি এবং সত্যিই তারা তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে এ সূত্রটি প্রয়োগ করে তার উপকার পেয়েছেন পুরোপুরি। আপনাদের জন্য সূত্রটি সুপারিশ করা হলো।

সূত্রটি হলো : (১) প্রার্থনা অনুশীলন করুন। (২) প্রার্থনার বিষয়কে মনে ছবিতে পরিণত করুন। (৩) এবং কল্পিত ছবিকে বাস্তবায়িত করুন।

মনের আকাঙ্খাকে প্রার্থনায় পরিণত করা র্কে আমার ঐ বন্ধুটি এভাবে আমাকে বুঝিয়েছেন যে, প্রতিদিনের প্রার্থনা সৃজনশীল প্রার্থনা। যখনই তার কোন সমস্যা এসে উপস্থিত হত তখনই খুব সহজ সরলভাবে এবং সরাসরি সৃষ্টিকর্তার সাথে প্রার্থনার মাধ্যমে কথা বলতেন। অধিকন্তু, তার এই প্রার্থনার ভঙ্গিতে সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলার বিষয়টি ছিল অদ্ভূত। তিনি কিন্তু তার প্রার্থনালাপের সময় সৃষ্টিকর্তাকে সুদূর অবস্থিত বিরাট কোন ছায়াকৃত প্রতিবিম্ব কল্পনা করে প্রার্থনালাপ করেননি, কিন্তু তিনি সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে ধারণ করেছেন এমন ভাবে যে তিনি যেন তার অফিসেই বিরাজ করছেন, তার বাড়িতে, তার সাথে চলমান রাস্তায়, তার মটরগাড়িতে বিধাতা যেন সর্বদাই তার কাছাকাছি একজন সঙ্গীর মত, একজন ঘনিষ্ট সহচরের মত।

অবিরত প্রার্থনা কর বাইবেলের এই নির্দেশকে তিনি খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলেন। প্রতিটি সম্প্রদায়ের পাঠক তাদের নিজ নিজ শাস্ত্রবাণী এভাবে অনুশীলন করতে পারেন)। তিনি বিষয়টির এমন অর্থ দাঁড় করতে চেয়েছেন যে আমি মনে করেছি আমার নির্ধারিত এবং প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন বিধাতার সাথে স্বাভাবিক ও সাধারন ভাবে আলোচনা করা উচিৎ আর এভাবে একসময় বিধাতায় উপস্থিতি আমি বুঝতে পারবো এবং তিনি আমার চেতন এবং শেষে অবচেতন মনের চিন্তায় আধিপত্য বিস্তার করবেন। এভাবেই তিনি তার নিত্যদিনগুলোকে প্রার্থনায় ভরে তুলেছেন। তিনি হাটার সময় প্রার্থনা করেছেন। গাড়ি চালানোর সময় প্রার্থনা করেছেন। তার সকল কর্মের মধ্যেই তিনি সুযোগ মত প্রার্থনা করেছেন। তার প্রতিটি দিনকে তিনি প্রার্থনায় প্রার্থনায় ভরে তুলেছেন। তার মনে হলো তিনি প্রার্থনার মাধ্যমেই বেঁচে ছিলেন। প্রচলিত খ্রিস্টান রীতি অনুসারে তার প্রার্থনার ধরনটি ছিল এমন যেমন- সৃষ্টিকর্তাকে তিনি একজন ঘনিষ্ট সাথী হিসাবে বলেছেন, “হে প্রভু এ বিষয়ে আমি কি করব? বা এবিষয়ে আমাকে সুষ্ঠু ও সঠিক অন্তর্দৃষ্টি দাও প্রভু।” তিনি তার মনকে প্রার্থনাযুক্ত করেছেন, সেভাবে তার কাজকর্মও প্রার্থনাযুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ কাজ কর্মগুলো যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তার জন্য প্রার্থনা করা হতো।

তার সৃজনশীল প্রার্থনার উদ্ভাবিত দ্বিতীয় বিষয়টি হলো মনের পর্দায় ছবি অংকিত করা। পদার্থ বিদ্যার মূল কারণটি হলো 'শক্তি'। মনোবিজ্ঞানের মূল কারণটি হলো কোন কিছু বাস্তবায়িত করার মত সফল ইচ্ছাশক্তি। যেমন যে লোকটি কোন বিষয়ে সাফল্য লাভের প্রবল ঝোঁক মনে মনে ধারন করে সে সাফল্য পেয়েই যায়। আবার কেউ যদি সাফল্য না পাবার মত কমজোর ভাবে কোন বিষয় মনে মনে ধারণ করে, তার পক্ষে সাফল্য পাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই সাফল্য লাভ বা অসাফল্য লাভের বিষয়টি সেভাবেই ঘটে যে যেমন ভাবে অর্থাৎ যেমন বলিষ্টভাবে বা দুর্বলভাবে তার মনে মনে ছবিটি অঙ্কন করে।

মূল্যবান কিছু ঘটবে এমন বিষয়ে আশ্বস্ত হতে প্রথমে এ বিষয়ে প্রার্থনা করুন এবং তা যাচাই করে দেখুন যে, বিধাতার দৃষ্টতে অপুরণযোগ্য কিনা তারপর আপনি বিষয়টি আপনার মনের পর্দায় অঙ্কিত করুন কেন তা ঘটে, এবং আপনার সচেতন মনে ছবিটি নিবীড়ভাবে ধরে রাখুন। বিধাতার ইচ্ছার কাছে সেই ছবিটি ক্রমাগত সমর্পণ করতে থাকুন, আমি বলতে চাই বিষয়টি বিধাতার হাতে ছেড়ে দিন। দেখুন তিনি আপনাকে কি দিক নির্দেশনা দেন তা অনুসরণ করুন, বুদ্ধিমানের মত কঠোর পরিশ্রম করুন, এবং এভাবেই আপনার যা করনীয় তা করে সাফল্যকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসুন। বিশ্বাস করার চর্চা চালিয়ে যান এবং বিষয়টি আপনার চিন্তায় ভাবনায় নিবীড়ভাবে ধরে রাখুন। কাজটি করেন এবং আপনি অবাক হয়ে যাবেন যে কি অদ্ভূতভাবে আপনার সযত্ন রক্ষিত মনের ছবিটি বাস্তবে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই মনে মনে ভাবিত ছবি বাস্তব রূপ ধারণ করে। বাস্তবে পরিণত হবার মত যে মূল ইচ্ছা আপনি পোষণ করেছিলেন এবং তার জন্য আপনি প্রার্থনা পরিচালনা করেছেন, মনের ভাবনায় ছবি এঁকেছেন এবং তা বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন, তা কিন্তু সম্ভব হয়েছে বিধাতার শক্তি এর উপর বর্ষিত হবার মধ্য দিয়ে যা আপনি প্রার্থনা করেছিলেন এবং অধিকন্তু যদি আপনি নিজেকে পুরোপুরিভাবে এটা বাস্তবায়িত হবার জন্য সমর্পণ করেন তবে তা না হয়েই যায়না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ত্রিমাত্রিক প্রার্থনা পদ্ধতি অনুশীলন করে দেখেছি যে, এর মধ্যে কত বড় শক্তি নিহিত রয়েছে। ঠিক এ বিষয়টি অন্যদের অনুশীলন করার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছিল এবং তারাও ঠিক একইভাবে আমাকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন যে, প্রার্থনার এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে তারা এর মধ্য থেকে সৃজনশীল শক্তি নির্গত হতে দেখেছেন।

উদাহারণ স্বরূপ-এক মহিলার কথা বলছি। তিনি আবিস্কার করলেন যে, তার স্বামী একটু একটু করে তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের বিয়ে হয়েছিল খুবই সুখের ও আনন্দের। কিন্তু মহিলাটি পূর্বে থেকেই নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং তার স্বামী তার ব্যক্তিগত কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তা জানার আগেই তাদের মধ্যেকার যে গাঢ় এবং পুরনো সখ্যতা ছিল তা হারিয়ে গিয়েছিল। একদিন তিনি আবিস্কার করলেন তার স্বামী অন্য এক মহিলার প্রতি আসক্ত। তিনি উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে গেলেন এবং মূর্ছারোগে আক্রান্ত হলেন। তিনি স্থানীয় পুরোহিতের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলেন, তিনি খুব নিপুনভাবে এই আলাপ আলোচনাকে মহিলার নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি অপকটে স্বীকার করলেন যে তিনি ঘরনী হিসেবে যত্মশীল নন এবং তাই তিনি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন, কথায় বার্তায় খুব ধারাল এবং ত্যাক্ত বিরক্ত একজন মনোভাবোপন্ন মহিলা।

তিনি স্বীকার করলেন যে, তিনি কখনই নিজেকে তার স্বামীর সমকক্ষ মনে করেননি। স্বামী সম্পর্কে তার একটি গভীর হীন ধারণা ছিল। তার এমনই একটি অনুভূতি ছিল যে তিনি সামাজিকভাবেও বুদ্ধিগত দিক থেকে তার স্বামীর সাথে সমকক্ষতা বজায় রাখার উপযুক্ত ছিলেন না। তাই তিনি বিরোধী মনোভাব নিয়ে দূরে দূরে থাকতেন এবং তা তীর খিটখিটে মেজাজ এবং সমালোচনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়ত। পুরোহিত দেখলেন যে, মহিলা তখন যতটা প্রকাশ করছিলেন তারচেয়ে অনেক বেশি প্রতিভা সামর্থ এবং মোহিনী শক্তি তার ছিল। তিনি তাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন যাতে তিনি মনে মনে নিজের মধ্যে একজন সামর্থবান এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি বা ছবি এঁকে নেন। অনেকটা খামখেয়ালীভাবেই তিনি মহিলাকে বললেন যে, "বিধাতা একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করেন” এবং বিশ্বাস করার কৌশলই একজনের মুখশ্রী এবং মোহিনী শক্তি এনে দিতে পারে। এবং আচার আচরণেও একটি সহজ সরলভাব এনে দিতে তিনি তাকে কিছু নির্দেশ দিয়ে জানালেন যে কিভাবে প্রার্থনা করতে হয় এবং কিভাবে আধ্যাত্মিক শক্তি বলে যাচিত বিষয়ের ছবি মনে মনে এঁকে নিতে হয়। তিনি তাকে আরো উপদেশ দিয়ে বললেন যেন তিনি এমন একটি প্রতিবিম্ব মনে ধরে রাখেন যেন তার এবং তার স্বামীর মধ্যেকার হারিয়ে যাওয়া সখ্যতা আবার ফিরে এসেছে, মনশ্চক্ষুতে যেন দেখেন যে তার স্বামীর আগের সেই শুভ্র সুন্দর ভাবটি ফিরে এসেছে এবং মনের পর্দায় এই ছবিটিই ধরে রাখতে বলেছেন যে, তাদের দু'জনের মধ্যে আবার আগের সেই মিল ফিরে এসেছে। তাকে বলা হয়েছিল যেন এই ছবিটি বিশ্বাসের সাথে মনে রাখা হয়। এইভাবে তিনি তাকে খুবই চিত্তাকর্ষক এক ব্যক্তিগত যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রস্তুত করলেন।

ঠিক এই সময়ের কাছাকাছি একটি অবস্থায় তার স্বামী তাকে জানালেন যে, তিনি বিবাহ বিচ্ছেদ চান। রুদ্র রুক্ষ এই অনুরোধ রক্ষার জন্য তিনি নিজেকে এমন ভাবে এবং সেই লক্ষমাত্রা পর্যন্ত জয় করেছিলেন যে তিনি খুব শান্তভাবে তা গ্রহণ করলেন। তিনি স্বভাবিকভাবে জবাব দিলেন যে, যদি তিনি বিবাহ বিচ্ছেদ চান তবে তিনি তাতে রাজি আছেন, কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদ চুড়ান্ত হবার আগে নব্বই দিনের জন্য তা স্থগিত রাখার পরামর্শ দিলেন। বললেন যদি নব্বই দিনের পরেও অনুভব কর যে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া আবশ্যক তাহলে আমি তোমাকে সহযোগিতা করব। খুব শান্ত মেজাজে তিনি কথাগুলো বললেন, তিনি ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন কারণ তিনি একটি বিষ্ফোরন আশা করছিলেন।

রাতের পর রাত তিনি বাইরে চলে গেলেন, অন্যদিকে রাতের পর রাত মহিলা বাড়িতে বসে রইলেন, কিন্তু মনে মনে এমন ছবি আঁকলেন যেন তার স্বামী তার পাশেই পুরনো চেয়ারটিতে বসে আছেন। তিনি চেয়ারে বসেছিলেন এবং তিনি সার। তিনি চেয়ারে বসেছিলেন কিন্তু তিনি এমন একটি প্রতিবিম্ব আপন মনে তৈরি করলেন যেন তার স্বামী সেই সোফার মতই তার পাশে বসে বই পড়ছেন। মনশ্চক্ষুতে তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন যে স্বামী বাড়ির চারপাশে অলসভাবে বিচরন করছেন, রং করছেন এবং এটা সেটা এখানে ওখানে ঠিক ঠাক করছেন আগেরই মতই। এমনকি তিনি এমন ছবিও মনে মনে কল্পনা করলেন যেন তার স্বামী সেই বিবাহের প্রথম দিনগুলোতে যেমন থালাবাসন রোদে শুকাতেন এখনও তেমনটিই করছেন। মনশ্চক্ষুতে যেন দেখতে পাচ্ছেন তিনি আর স্বামী একত্রে গলফ খেলছেন এবং মনের আরও দু'জনে দীর্ঘ ভ্রমণ করছেন। কারণ একদিন সত্যিই তারা প্রমোদ ভ্রমণ করেছিলেন।

এমন সুন্দর একটি ছবি তিনি খুব স্থিরভাবে স্মৃতিতে ধরে রেখেছিলেন এবং একদিন রাতে সত্যিই তার স্বামী সেই পুরনো চেয়ারটিতে বসেছিলেন। পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য তিনি দুবার সেদিকে তাকালেন এবং তার মনে হলো, যে ছবি তিনি কল্পনা করেছিলেন এ যেন তার থেকেও বাস্তব। কিন্তু সম্ভবত এই ছবি অংকিতকরনই একটি বাস্তবতা কারণ যে কোন ভাবেই হোক সত্যিকার লোকটিই সেখানে বসেছিলেন। কখনও কখনও তিনি বাইরে যেতেন কিন্তু অনেক অনেক রাত্রে তিনি তার ঐ চেয়ারে বসতেন। তারপর তিনি তার সামনে পড়তে শুরু করতেন, যেন সেই হারনো দিনগুলোর মতই তারপর এক রৌদ্রজ্জ্বল শনিবারের দুপুর বেলায় জিজ্ঞেস করলেন, গলফ খেলার বিষয় তুমি কি বল?”

দিনগুলো সুখ সাচ্ছন্দেই কেটে গেল যে পর্যন্ত না তিনি বুঝতে পারলেন যে নব্বইতম দিনটি এসে উপস্থিত হয়েছে, তাই সেই সন্ধ্যায় তিনি স্বামীকে আস্তে জানালেন, "বিল, আজ হল নব্বইতম দিন।”

বিব্রত হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'নব্বইতম দিন'? তুমি কি বুঝাতে চাইছ? "কেন তোমার মনে পড়ছে না? বিবাহ বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হবার আগে নব্বই দিন পর্যন্ত আপেক্ষা করতে আমরা রাজি হয়েছিলাম, আর আজ সেই বিশেষ দিন?”

মুহূর্তের জন্য তিনি স্ত্রীর প্রতি তাকালেন, তারপর খবরের কাগজের পাতা উল্টিয়ে নিজের মুখ লুকালেন এবং বললেন, 'বোকার মত কথা বলো না,' আমি সম্ভবত তোমাকে ছাড়া চলতেই পারছিলাম না। তুমি কোথা থেকে এ ধারণা পেলে যে আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছিলাম?

ফরমুলাটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন প্রার্থনার বিষয়টিকে মনে চিত্রিত করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রার্থিত বিষয়টি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। প্রার্থনাশক্তি যেমন তার সমস্যার সমাধান করেছিল তেমনি তার স্বামীর সমস্যারও সমাধান দিয়েছিল।

আমি এমন অনেকের সম্পর্কেই জানি যারা সাফল্যের সাথে এই কৌশলটি প্রয়োগ করেছেন এবং তা যে শুধু তাদের ব্যক্তিগত কাজেই করেছেন তা নয়, ব্যাবসায়িক কাজেও এর সাফল্য প্রমাণিত হয়েছে। যখন আন্তরিকভাবে এবং বিচক্ষনতার সাথে এমন অবস্থায় বিষয়টি কাজে লাগাই তখন ফল এমনই চমৎকারভাবে পাওয়া যায় যে, একে অবশ্যই তখন একটি ফলদায়ক প্রার্থনা পদ্ধতি হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারি। মানুষ যখন এই পদ্ধতিকে সৃষ্টিকর্তার সাথে এবং সত্যিকারভাবে কাজে লাগান এর ফলাফল দেখে তারা বিস্মিত হয়ে যান।

শিল্পপতি সম্মেলনের এক সান্ধ্য ভোজে স্পিকারের কাছাকাছি টেবিলে আমি বসেছিলাম, ঠিক একজন লোকের পরেই আর যদিও একটু দৃষ্টিকটু দিক সেটা, কিন্তু লোকটি খুব পছন্দসই। কিন্তু আমার মনে হলো একজন প্রচারকের সান্নিধ্যে তিনি একটু আক্ষেপবোধ করছিলেন, যা স্পষ্টতই তাঁর বাঞ্চিত সঙ্গ ছিল না। খাবারের সময় তিনি কিছু ধর্ম সংক্রান্ত শব্দ ব্যবহার করলেন, কিন্তু তা একত্রে ধর্মীয় বিধিমালায় দাঁড় করানো যায় না। প্রতিটি শব্দ বিদারনের পর পরই তিনি ক্ষমাপ্রার্থী হলেন, কিন্তু আমি তাকে উপদেশ দিলাম যে, আমি আগে ওসব শব্দগুলো শুনেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে বাল্য বয়সে তিনি গীর্জার একজন সেবক ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন সেই পুরনো কাহিনী তিনি আমাকে শুনালেন যা আমি সারাজীবনে বহুবার শুনেছি এবং যা এখনও অনেকেই সম্পূর্ণ নতুনভাবে এমন পলায়নের ঘটনা ঘটাবে এবং বলবে যেমন: 'যখন আমি বালক ছিলাম, আমার পিতা আমাকে রবিবারের স্কুলে এবং গীর্জায় যেতে এবং ধর্মীয় পাঠগুলো আকণ্ঠ মুখস্ত করাতে বাধ্য করেছে। কাজেই আমি যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম তখন থেকে আমাকে আর এসব শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়নি এবং সেই থেকে কদাচিৎ আমাকে গীর্জায় যেতে হয়েছে।

তারপর এই লোক পর্যবেক্ষন করে দেখলেন যে, সম্ভবত তার আবার গীর্জায় যাওয়া আসা শুরু করা উচিত। যেহেতু তিনি বুড়া হয়ে যাচ্ছেন এখানে আমি একটু মন্তব্য করলাম যে, গীর্জায় গিয়ে যদি একটি সিট খুঁজে পান তবে আপনি ভাগ্যবান। তাতে তিনি আবাক হয়ে গেলেন, কারণ তিনি কখনও ভেবে দেখেননি যে মানুষ আজকাল আর গীর্জায় যায় কি না। আমি তাকে বললাম অনেক মানুষ এখন প্রতি সপ্তায় গীর্জায় যায় এবং দেশে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ঘনঘনই যায় আমার কথা শুনে তিনি অনেকটা দমে গেলেন।

লোকটি ছিলেন মধ্যম আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং তিনি আমাকে বলেই ফেললেন যে, গতবছর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কত টাকা গ্রহণ করেছে। আমি তাকে বললাম যে, আমি অন্তত গুটি কতক গীর্জার খবর জানি যে তাদের পাওয়া আপনার পাওয়ার থেকে বেশি। কথাটি আসলে তার উদর গহ্বরে দারুণভাবে আঘাত করল এবং গীর্জার প্রতি তার কতটা শ্রদ্ধা ভক্তি তা খুব দ্রুত বুঝতে পারলাম। তাকে বললাম যে, হাজার হাজার ধর্মীয় বই বিক্রি হয়ে গেছে যার সংখ্যা অন্যান্য বইয়ের চেয়ে বেশি। “হয়ত আপনারা অর্থাৎ গীর্জার লোকেরা কোন বল নৃত্যের মতই জমায়েত হয়েছেন ওখানে” বেশ অমার্জিত ভাষায় লোকটা কথাগুলি বললেন

এই মুহূর্তে অন্য একজন লোক আমাদের টেবিলের কাছে আসলেন এবং গভীর আগ্রহের সাথে আমাকে বললেন যে, বিস্ময়কর কিছু একটা তার জীবনে ঘটেছে। তিনি বললেন যে মানসিকভাবে খুবই অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন তিনি কারণ কোন কিছুই তার ঠিকঠাকমত চলছিল না। মনে মনে স্থির করলেন য়ে সপ্তাহ খানেকের কিম্বা কিছু অধিক সময়ের জন্য তিনি বাইরে যাবেন এবং আমার লিখা একটি বই পড়বেন যে বইয়ে বাস্তব সম্মতভাবে রেখাপাত করা হয়েছিল। তিনি জানালেন যে, বইটির বিষয়বস্তু তার মনে এই প্রথম একটি সন্তুষ্টজনক অবস্থা এনে দেয় এবং তিনি শান্তি অনুভব করেন। তার ব্যক্তিগত সম্ভাবনাগুলির জন্য বইটি তাকে উৎসাহিত করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তার কষ্ট কাঠিন্যের সঠিক জবাব পাওয়া যায় ধর্মের বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে।

"সুতরাং” তিনি বললেন, যে "আপনার বইয়ে উপস্থাপিত ধর্মীয় নীতিমালাগুলো আমি চর্চা করতে শুরু করে দিয়েছি আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে, যে উদ্দেশ্যগুলো আমি সম্পন্ন করার জন্য চেষ্টা করছিলাম সেগুলো সম্পন্ন হতে পারে একমাত্র বিধাতার সাহায্য বলে। একটি অদ্ভুত অনুভূতি এলো আমার মধ্যে যে, আমার সবকিছু যথাযথভাবে সম্পন্ন হতে চলেছে এবং তখন থেকে আমার মনে হল যে, কোন কিছুই আর আমাকে বিপর্যস্ত করতে পারবে না। আমি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারলাম যে, সবকিছু ঠিক ঠাক মত হতে যাচ্ছে। কাজেই আমার ভালো ঘুম হতে লাগল এবং ভালো অনুভব করতে লাগলাম। আমি এমনই অনুভব করতে লাগলাম যেন আমি বুঝি কোন বলকারক ঔষধ (Tonic) খেয়েছি। আমার নতুন জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক কৌশলাদির চর্চাই হল সন্ধিকাল। যখন তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন, আমার টেবিলের সঙ্গীটি যিনি এতক্ষণ এসব কথা শুনছিলেন, বললেন, এর আগে জীবনে কখনও এমন কথা শুনিনি। ঐ লোকটি যে ধর্মীয় বিষয়ে কথাগুলি বললেন তা যেমন সুখের এবং তেমনি তা কার্যকরও বটে। আর এমনভাবে কখনই তা আমার সামনে উপস্থিত হয়নি। তিনি এমন ধারণা ব্যক্ত করলেন যে, ধর্ম প্রায় বিজ্ঞানের মতই যা প্রয়োগ করে আপনি আপনার স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারেন এবং আপনার কাজে কর্মেরও উন্নতি ঘটাতে পারেন। আমি ধর্মকে কখনও ওভাবে চিন্তা করিনি।

তারপর আরও বললেন, "কিন্তু আপনি জানেন কি আমাকে কিসে আঘাত করেছিল?” লোকটির মুখের উপর তার অদ্ভুত দৃষ্টি।

এখন দেখুন সেই কৌতুকজনক ঘটনাটি কি, যখন আমার টেবিলের সঙ্গীটি ঐ উক্তিটি করলেন আবার সেই একই দৃষ্টি তার মুখের উপর দেখা গেল। প্রথমবার তিনি ধারণা পাচ্ছিলেন যে, ধর্মীয় বিশ্বাস পবিত্র উপাদান কিছু একটা নয় কিন্তু সাফল্যের সাথে বাঁচার একটি বৈজ্ঞানিক পন্থা মাত্র। সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে সরাসরি লক্ষ্য করছিলেন প্রার্থনার বাস্তব এবং কার্যকরী শক্তি কতখানি

ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি যে, প্রার্থনা এমন একটি ব্যাপার যে, ভাইব্রেশনের মাধ্যমে তা একজন থেকে আরেকজনের কাছে এবং বিধাতার কাছেও পাঠানো সম্ভব। সারা বিশ্বমন্ডল ভাইব্রেশনের আওতাধীন একটি টেবিলের অনুর মধ্যেও ভাইব্রেশন বর্তমান। বায়ুমন্ডল ভাইব্রেশনে ভরপুর। মানুষের মধ্যেকার প্রতিক্রিয়াও ভাইব্রেশনের ফলেই হয়ে থাকে। আপনি অন্য একজনের জন্য প্রার্থনা প্রেরণ করেন, তখন আপনি আপনার আধ্যাত্মিক জগতের সহজাত শক্তিকেই কাজে লাগান। আপনি তখন আপনার নিজের মধ্য থেকে আরেকজনের মধ্যে প্রেম, অসহায়তা সহানুভূতিসম্পন্ন সহযোগীতা শক্তিযুক্ত জ্ঞান এসব পরিবাহিত করেন এবং এই পদ্ধতিতে আপনি আপনার বিশ্বব্রহ্মান্ডীয় ভাইব্রেশনকে জাগিয়ে তুলছেন, যার মধ্য দিয়ে বিধাতা আপনার প্রার্থনার বস্তুগুলো পাঠিয়ে দেন। এই মূলতত্ত্বটি নিয়ে আপনি একটি পরীক্ষা নীরিক্ষা করে দেখুন, দেখবেন কেমন এর বিস্ময়কর ফল।

উদাহরণ স্বরূপ আমার একটি অভ্যাস আছে এবং প্রায়ই আমি তা ব্যবহার করি। অভ্যাসটি হল, যখন কোন লোকজনের পাশ দিয়ে যাই তখন আমি তাদের জন্য প্রার্থনা করি। একবার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার মধ্যদিয়ে ট্রেনে করে যাবার সময় অদ্ভুত একটি চিন্তা আমার মনে এসে উপস্থিত হয়েছিল। স্টেশন প্রাঙ্গণে একজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি আমি, ঠিক তখনই আমাদের ট্রেনটি সামনে এগুতে থাকে এবং লোকটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আমার কাছে মনে হল যে লোকটিকে আমি জীবনে প্রথমবারের মত এবং শেষবারের মত দেখছিলাম। তার এবং আমার জীবনের মধ্যে হালকা একটি স্পর্শ যেন অনুভূত হল মাত্র এক মুহূর্তের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য। সে চলে গেল তার রাস্তায় আর আমি গেলাম আমার রাস্তায়। আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম যে, কীভাবে তার জীবনটা আরও সাজানো গোছানো হবে।

তারপর আমি লোকটির জন্য মঙ্গলজনক প্রার্থনা করলাম যাতে লোকটির জীবন আশীর্বাদে পূর্ণ হতে পারে। ট্রেনটি চলছে, পেছনে ফেলে যাচ্ছি কত লোক, দেখতে দেখতে সবার জন্যই প্রার্থনা করতে থাকলাম। দেখলাম এক কৃষক জমি চাষ করছে, বিধাতার কাছে প্রার্থনা করলাম যেন সে ভালো ফসল ঘরে তুলতে পারে। এরপর দেখলাম এক মাকে, কাপড় শুকাদিচ্ছে, ধোয়া কাপড় ছোপড়ের লম্বা লাইন দেখে বুঝলাম মহিলাটির পরিবার বেশ বড়সড়। ক্ষনিক দৃষ্টিতে তার মুখে প্রভাটুকু দেখলাম এবং যেভাবে তিনি বাচ্চাদের কাপড় চোপড় নাড়াচাড়া করছিলেন তা আমাকে বলে দিল যে, তিনি সত্যিই সুখি জীবন যাপন করছেন। আমি তার জন্য প্রার্থনা করলাম, যেন তিনি সুখি জীবন যাপন করতে পারেন। যেন তার স্বামী তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন এবং তিনিও যেন তার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন। আমি আরো প্রার্থনা করলাম যেন তাদের পরিবারটি হয় একটি ধর্ম অনুরাগী পরিবার এবং যেন বাচ্চাগুলো শক্ত সামর্থবান, সম্মানজনক যুবক-যুবতী হিসেবে বেড়ে ওঠে।

এক স্টেশনে দেখলাম এক লোক অর্ধ ঘুমন্ত অবস্থায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে, এবং আমি প্রার্থনা করলাম যেন লোকটি জেগে ওঠে এবং ঐ অবস্থা থেকে মুক্তি পায় এবং ভালো কোন ফল লাভ করতে পারে।

তারপর আমরা আরেকটি স্টেশনে থামলাম এবং সেখানে দেখতে পেলাম খুব সুন্দর একটি বালক যে পাজামাটি পড়ে আছে তাকে পাজামাটি পা আরেকটি থেকে আলাদা। গলার কাছে সার্টটি খোলা, পড়ে থাকা সোয়েটারটি এত বড় যে বেখাপ্পা লাগছিল, চুল উষ্কখুষ্ক, মুখায়ব নোংরা। একটি ললিপপ চুষছিল সে, এবং তাই নিয়েই খুব ব্যস্ত ছিল। আমি তার জন্য প্রার্থনা করলাম এবং যেই ট্রেনটি যাবার জন্য নড়ে উঠেছে ঠিক তখন সে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল এবং মন কেড়ে নেবার মত সুন্দর হাসিটি উপহার দিল। আমি জানতাম আমার প্রার্থনা তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে, এবং আমি তার দিকে হাত নাড়লাম, সেও হাত নেড়ে জবাব দিল। আমি জানি খুব সম্ভবত জীবনে কোন দিন ছেলেটির আর দেখা পাবনা কিন্তু আমাদের উভয়ের জীবন একে অপরকে ছুঁয়ে গিয়েছিল খনিকের জন্য। যখন এই ছোট্ট ব্যাপারটি ঘটে সেই সময় পর্যন্ত আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন কিন্তু হঠাৎ করেই সূর্য মেঘের ঘোমটা সরিয়ে উঁকি মারল চারিদিক উদ্ভাসিত করে আর আমার মনে হল ছেলেটির হৃদয়ও তদ্রূপ আলোয় উজ্জ্বল হয়েছিল, কারণ ভিতরের আলোকছটা তার মুখের উপর ঠিকরে পড়েছিল। আনন্দে ভরে গিয়েছিল আমার মন। আমি নিশ্চিত যে, ছোট্ট ঘটনাটি ঘটল তার পেছনে ছিল বিধাতার শক্তি, যা চক্রাকারে ঘুরছিল আমার এবং ছেলেটির মধ্যে আবার ফিরে যাচ্ছিল বিধাতার কাছে; এবং আমরা সার্বিকভাবে প্রার্থনা শক্তির মুগ্ধকর বন্ধনে বাঁধা।

প্রার্থনার একটি গুরুত্মপূর্ণ কাজ হল সৃজনশীল ধারণাগুলোর উদ্দীপনা স্বরূপ কাজ করা। মনের মধ্যে যে সম্পদগুলো আমাদের আছে একটি সফল জীবন যাপনের জন্য তার সবই প্রয়োজন। সচেতনতার মধ্যে ঐ ধারণাগুলো উপস্থিত থাকে যেগুলো যখন বের হয়ে আসে এবং যথাযথভাবে কার্যেপরিণত হবার জন্য একত্রে সুযোগ প্রদান করে, তখন সেগুলো যে কোন পরিকল্পনা বা যে কোন কাজের দায়িত্ব ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি সফল কার্য পরিচালনা করে। যখন বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট বলে, "বিধাতার রাজ্য তোমার মধ্যেই,” উক্তিটি আমাদের জানিয়ে দেয় যে, বিধাতা আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের মনে এবং ব্যক্তিত্বে সমস্ত সম্ভাবনাময় শক্তিগুলোকে এবং সামর্থগুলোকে যেগুলো একটি সফল জীবন যাপনের জন্য আমাদের দরকার তা সবই তিনি স্থাপন করে রেখেছেন। সেসব শক্তি সামর্থগুলোকে একটু স্পর্শ করার জন্য এবং উন্নত করার জন্য সেই সম্ভাবনাময় বিধাতা প্রদত্ত শক্তি আমাদের মধ্যে সবসময় থেকেই যাচ্ছে।

উদাহরণ স্বরূপ, আমার চেনা জানা এক লোক ব্যবসার সাথে জড়িত এবং ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চারজন নির্বাহীর তিনি একজন। নিয়মিত বিরতির সময় এই লোকগুলো একটি বিশেষ সভায় মিলিত হতেন এবং এর নাম তারা দিয়েছিলেন ধারণা সভা (Idea session) এবং এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের চারজনের মনে উদিত যে কোন সৃজনশীল ধারনার একে একে উত্থাপন করা। এই সভার জন্য তারা যে কক্ষটি ব্যবহার করতেন সেখানে কোন টেলিফোন থাকত না, কোন বৈদ্যুতিক সংকেত যন্ত্র ছিল না অথবা অন্য কোন সাধারণ অফিসিয়াল সরঞ্জাম ও ছিলনা। সকল জানালা এমনভাবে সাটা ছিল যে রাস্তার শব্দ বেশির ভাগই ভিতরে ঢুকতে পারতো না।'

সভাশুরু হবার আগে চারজনের এই দলটি অন্তত দশ মিনিট নীরবতা পালন করতেন এবং ধ্যানের মধ্যে কাটাতেন এবং এমনভাবে বিধাতাকে মনে মনে কল্পনা করতেন যেন সত্যি সত্যিই তিনি তাদের কল্পনা কার্যকরী করে দিচ্ছেন। প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ভাবমত নীরব প্রার্থনার নিশ্চিত করতেন যেন বিধাতা তাদের ব্যবসায় প্রয়োজনীয় সমস্ত যথার্থ ধারণাগুলো মন থেকে উৎসারিত করেন।

নীরব সময়টুকু পাড় করে সবাই কথা বলতে শুরু করতেন এবং তাদের কার মনে কি ধারণা আসলো তা একে একে প্রকাশ করতেন। ধারণাগুলোর একটি তালিকা কাগজের উপর লিখা হত এবং টেবিলের উপর ফেলা হত। কাউকেই কারো মতের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে দেয়া হত না এমন একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে কারণ যুক্তিতর্ক সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে ব্যাহত করতে পারত। কার্যগুলো একত্র করা হত এবং প্রত্যেককেই পরবর্তী সভার জন্য মূল্যায়ন করা হত। কিন্তু প্রার্থনা শক্তি বলে উদ্দীপিত এটা ছিল তাদের একটি ধারণা উত্থাপন সভা।

যখন অধিক হারে উত্থাপিত যে সমস্ত ধারণাগুলো নিয়ে এই অনুশীলনটি শুরু হয়েছিল, সেগুলো কিন্তু প্রথম দিকে বিশেষ মূল্যবান বলে প্রামাণিত হয়নি, কিন্তু এ ধরনের সভা চলতে চলতে ভালো ভালো ধারণাগুলো আনুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। এখন তাদের অনেক ভালো ভালো মন্ত্রণা যেগুলো পরবর্তিতে তাদের বাস্তব মূল্য নিশ্চিত রূপে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নির্বাহী ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমরা আমাদের অন্তদৃষ্টি নিয়ে এপর্যন্ত এসেছি যা শুরুমাত্রই যে আমাদের স্থিতি-পত্র দেখায় তা নয় কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাসের নতুন অনুভূতিও এ থেকে লাভ করেছি। অধিকন্তু আমাদের চারজনের মধ্যে একটি বন্ধত্বপূর্ণ সখ্যতার গভীর অনুভূতিও এর মধ্যে নিহিত আছে এবং তা ঐ সংস্থার অন্যান্যদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে।

কাজেই বলতে চাই যে, কোথায় সে সেকেলে ব্যবসায়ী যে নাকি বলে বেড়ায় যে, ধর্ম হল একটি তাত্মিক বিষয় মাত্র, ব্যবসা বাণিজ্যে এর কোন স্থান নেই বা মূল্য নেই? আজকের দিনে যে কোন সফল এবং যোগ্য ব্যবসায়ী তার উৎপাদন ক্ষেত্রে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে পরীক্ষিত পদ্ধতিটিই যে কাজে লাগাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয় এই পদ্ধতি তিনি পন্য বিতরণ এবং প্রশাসনেরও কাজে লাগাবেন এবং অনেকেই আজ এটা আবিস্কার করছেন যে, দক্ষতা বাড়ানোর যতরকম পদ্ধতি আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম পদ্ধতি হল প্রার্থনা শক্তির প্রয়োগ।

সতর্ক লোকেরা সবজায়গাতেই প্রার্থনাশক্তি প্রয়োগ করে সেই সাফল্যই খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং তারা বুঝতে পারছেন যে, তাদের ভালো লাগছে, তারা ভালোভাবে কাজ-কর্ম করতে পারছেন, ভালো কিছু করতে পারছেন, ভালো ঘুম হচ্ছে তাদের অর্থাৎ সবকিছুই ভালো যাচ্ছে তাদের। আমার এক বন্ধু গ্রোভ প্যাটারসন-Potterson. টলিভো ব্লেভের, সম্পাদক, অসাধারণ প্রাণশক্তিতে ভরা এক মানুষ। তিনি বলেন যে, প্রার্থনা পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে দৈহিক শক্তি আংশিক হলেও খুব ভালোভাবে সুফল প্রদান করে।

উদাহরণ স্বরূপ তার পছন্দ হল ঘুম না করার মধ্য দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে ঠিক প্রার্থনা করার সময় তার অবচেতনমন সবচেয়ে বেশি শিথিল অবস্থায় থাকে আর অবচেতন অবস্থাতেই আমাদের জীবন বিরাটভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। যদি আপনি অবচেতন মনের সর্বোচ্চ শিথিল অবস্থায় একছিটে প্রার্থনাও করতে পারেন দেখবেন প্রার্থনার মধ্যে কত শক্তিশালী ফল নিহিত রয়েছে।

মি. প্যাটারসন মৃদু হাসতে হাসতে বললেন, “একবার আমি এক বিরত্তিকর অবস্থায় পড়েছিলাম কারণ প্রার্থনা করার সময় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন আসলে আমি বিষয়টি ঐভাবে আগের মতই পেতে চাইছি। তুলনাহীন অনেক প্রার্থনা পদ্ধতির প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে কিন্তু এর মধ্যে যেটি সবচেয়ে ফলপ্রদ তার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে ফ্র্যাঙ্ক লব্যাক তার চমৎকার বইতে বলেছেন, 'প্রার্থনা হল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা। আমি এই বইটিকে প্রার্থনার উপর রচিত সবচেয়ে বাস্তবানুগ বই বলে গণ্য করি, কারণ এ বইটি একেবারে নতুন ধরণের প্রার্থনা কৌশলগুলো বর্ণনা করেছে; যে গুলো সত্যিই কার্যকর।

ডক্টর লব্যাক বিশ্বাস করেন যে প্রার্থনা থেকেই সত্যিকারের ক্ষমতা উৎপন্ন হয়। তার প্রার্থনা পদ্ধতির একটি হল, রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা এবং চলমান মানুষের প্রতি প্রার্থনা ছুঁড়ে দেয়া। এই ধরণের প্রার্থনাকে তিনি 'হঠাৎদীপ্ত প্রার্থনা' নামে আখ্যায়িত করেছেন। পথচারীদের প্রতি এ যেন 'প্রার্থনা বোমা' নিক্ষেপের মত, অদ্ভুত এ বোমার মধ্য দিয়ে তিনি তাদের প্রতি তার শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসাই যেন পাঠিয়ে দিতেন। তিনি বলেন যে, লোকজন তাকে পাশ কেটে যাচ্ছে আর তিনি তাদের প্রতি প্রার্থনা ছুঁড়ে দিচ্ছেন। আর প্রায়ই যা ঘটছে তা হলো, ঐ লোকগুলো চারিদিকে চোখ ফেরাত এবং আমার দিকে তাকিয়ে হাসতো বৈদ্যুতিক শক্তির মতই কিছু নিঃসরিত হচ্ছে এটা তারা উপলব্ধি করত।

একদিন এক বাসে তিনি তার যাত্রীসঙ্গীদের দিকে এমনিভাবে প্রার্থনা ছুঁড়ে দিলেন। আর একদিন তিনি বাসে এক যাত্রীর পেছনে বসেছিলেন, লোকটিকে দেখতে খুব বিষন্ন লাগছিল। লোকটি যখন বাসে ঢুকে তখন তিনি তার মুখের গোমড়া ভাবটি লক্ষ্য করেছিলেন, তিনি লোকটির উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছাজ্ঞাপক এবং বিশ্বাসের প্রার্থনা প্রেরণ করতে থাকলেন। এমন বিশ্বাস নিয়ে তা করতে থাকলেন যেন যেন তোর প্রার্থনা বিষণ্ণ লোকটিকে ঘিরে ফেলছে এবং তা তার মনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। হঠাৎ করেই লোকটি তার মাথার পেছনদিকটা মৃদু ঠুকতে থাকলেন এবং যখন তিনি বাস থেকে নেমে গেলেন লক্ষ্য করলাম তার মুখের সেই গোমড়া ভাবটি আর নেই, বরং সেখানে স্থান পেয়েছে সুন্দর মৃদু হাসি। ডক্টর লব্যাক বিশ্বাস করেন যে, তিনি প্রায় লোকজনে ভরা গাড়ি বা বাসের ভেতরের এবং সেখানকার চারিদিকের পরিবেশ ভালোবাসা এবং প্রার্থনার দ্বারা ঘিরে ফেলার প্রয়োগে সম্পূর্ণরূপে বদলে ফেলতেন, এবং পারতেনও।

একবার পুলম্যান ক্লাবের এক গাড়িটায় অর্ধমাতাল এক লোক একেবারে উগ্রচন্ডী এবং নিষ্ঠুর, এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন উনি একজন কেউ কেটা এবং স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে বিরক্তিকর করে তুলেছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম যে গাড়ির কেউ আর তাকে পছন্দ করছিল না। গাড়িটি যখন অর্ধেক পথ পার হয়ে এলো, মনে মনে স্থির করলাম ফ্র্যাঙ্ক লব্যাকের পদ্ধতিটি একটু যাচাই করে দেখব। সুতরাং আমি তার জন্য প্রার্থনা করা শুরু করলাম, ইতিমধ্যে লক্ষ্য করলাম তার মধ্যে একটু ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, এবং তার প্রতি আমি শুভেচ্ছা পাঠাতে থাকলাম। খুব দেরি হয়নি মনে হল যেন সুস্পষ্ট কোন কারণ ছাড়াই লোকটি আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং রাগ বিদ্বেষহীন এক সুন্দর হাসি আমাকে উপহার দিলেন, এবং অভিবাদন করার ভঙ্গিতে হাতটি তুললেন তার মনের ভাব পাল্টে গিয়েছে এবং একেবারেই শান্ত অবস্থায় ফিরে এসেছে। কাজেই একথা বিশ্বাস করার পেছনে প্রতিটি যুক্তিই আমার গ্রহণযোগ্য যে, প্রার্থনা কার্যকরভাবেই তার কাছে পৌঁছেছে।

ঠিক এই কারণে যখন শ্রোতাদের কাছে আমি কোনো বক্তব্য রাখি তার আগে সবাইকে বলি, আপনারা উপস্থিত লোকদের জন্য প্রার্থনা করুন। আর ভালোবাসার মনোভাব ও শুভেচ্ছা তাদের প্রতি বর্ষণ করুন। কখনও কখনও আমি শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক বা দুজন লোক নির্ধারণ করি। যাদের দেখে মনে হয় এরা খুব বিমর্ষ বা এমনকি বিরোধী মনোভাবাপন্ন, আমি বিশেষকরে তাদের প্রতি আমার প্রার্থনা এবং শুভেচ্ছার মনোভাব প্রেরণ করি। সম্প্রতি দক্ষিণ পশ্চিমের এক শহরে চেম্বার অব কমার্সের বাৎসরিক নৈশভোজে যখন বক্তব্য রাখছিলাম তখন শ্রোতামন্ডলীর মাঝে একজনকে আমার দিকে গোমড়া মুখ করে তাকিয়ে থাকতে দেখি। আমি সব মিলিয়ে এটা এমন সম্ভব হতে পারে যে তার মুখের ভাবে এমন কিছু প্রকাশ পায়নি যা কোনোভাবেই আমার সাথে সম্পর্কিত কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে আমার বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন কথা বলতে শুরু করার আগে আমি তার জন্য প্রার্থনা করলাম এবং ধারাবাহিকভাবে কিছু প্রার্থনা ও শুভেচ্ছার মনোভাব তার প্রতি ছুড়ে দিলাম। যখন কথা বলছিলাম ঠিক একইসাথে ঐ প্রার্থনা পদ্ধতিটিও চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

সভা যখন শেষ হয়ে গেল, চারিদিকে সবার সাথে করমর্দন করছি হঠাৎ করেই আমার হাতটি আশ্চার্যজনকভাবে কারো দ্বারা ধৃত হল, আর আমি ঐ লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। খোলামেলাভাবে হাসছিলেন লোকটি। লোকটি বললেন, “আন্তরিকভাবে বলছি, এ সভায় যখন এলাম তখন সত্যিই আমি আপনাকে পছন্দ করতে পারিনি। ধর্ম প্রচারকদের আমার একদম পছন্দ নয় এবং আপনাকে অর্থাৎ একজন পুরোহিতকে আমাদের চেম্বার অব কমার্সের সোশভোজে বক্তা হিসেবে দেখে পছন্দ না করার কোন কারণও দেখিনি। আমি আশা করছিলাম যে, আপনার বক্তব্য কোনরকম সাফল্য পাবে না এখানে হোক, যেহেতু আপনি এমন কিছু বলেছেন মনে হচ্ছে তা আমাকে স্পর্শ করেছে। নতুন এক মানুষের মত মনে হচ্ছে নিজেকে। শান্তির এক অদ্ভূত অনুভূতি হল আমার, আমি নিবীড়ভাবে এটা ধরে রাখব। আমি আপনাকে পছন্দ করি।"

আমার বক্তব্যের মধ্যে এর প্রভাব ছিল তা নয়। এটা ছিল প্রার্থনা শক্তির নিঃস্বরণ। আমাদের মস্তিস্কে প্রায় দু বিলিয়ন (দুশত কোটি) ক্ষুদ্র ব্যাটারির সংগ্রহ রয়েছে। মানুষের মস্তিস্ক প্রার্থনা ও চিন্তাশক্তির দ্বারা সেই শক্তিকে অন্যদের মধ্যে প্রেরণ করতে পারে। মানুষের শরীরের চুম্বক শক্তি বাস্তবিক ভাবে পরীক্ষিত হয়েছে। আমাদের হাজার হাজার প্রেরক কেন্দ্র রয়েছে, যখন প্রার্থনার দ্বারা এগুলো এসে উপস্থিত হয়, তখন একজনের মধ্য দিয়ে বিস্ময়কর ক্ষমতা বা শক্তি বয়ে যাওয়া সম্ভব এবং মানুষ থেকে মানুষে তা সঞ্চালন ও করা যায় প্রার্থনার দ্বারা আমরা ক্ষমতা প্রেরণ করতে পারি যা প্রেরণ এবং ধারণ কেন্দ্র উভয়ভাবেই কাজ করে থাকে।

এ্যালকোহলে আসক্ত এক লোক ছিল, আমি তার সাথে অনেকদিন কাজ করছিলাম। প্রায় ছ'মাস ধরে লোকটি মাদক আখড়ায় কাটাচ্ছিলেন। ব্যবসয়িক যাত্রায় যাচ্ছিলেন লোকটি। ঐসময় এক মঙ্গলবার অপরাহ্নে প্রায় চারটার দিকে আমার মনে খুব জোরালোভাবে একটি বিষয় ছায়াপাত করল, আমার মনে হল লোকটি খুব কষ্টের মধ্যে আছে। লোকটির ঐ বিষয়টি আমার ভাবনার উপর দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। আমি অনুভব করলাম কিছু একটা আমাকে বিষয়টির দিকে টানছে। সবকিছু ছেড়েছুড়ে তার জন্য প্রার্থনা শুরু করলাম আমি। প্রায় আধঘণ্টা প্রার্থনা করলাম, তারপর মনে হল, আমার মনে ছায়াপাত করা ধারণাটি একটু সিথিয়ে পড়েছে এবং তারপর আমি আর প্রার্থনা চালিয়ে গেলাম না ওখানেই থামলাম।

কয়েকদিন পর তিনি আমাকে ফোন করলেন। বললেন, “সারা সপ্তাহ আমি বোস্টনে ছিলাম এবং আমি আপনাকে জানাতে চাই যে আমি এখনও মাদকতায় ভুগছি, কিন্তু সপ্তাহের গোড়ার দিকে আমার সময়টা ছিল খুবই কঠিন।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "সময়টা কি মঙ্গলবার চারটা ছিল? অবাক হয়ে তিনি বললেন, “কেনো, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি জানলেন কিভাবে? আপনাকে কে বলল?

জবাবে বললাম, "আমাকে কেউ বলেনি," "তার মানে কোন মানুষই আমাকে তা বলেনি।” আমি তাকে মঙ্গলবার চারটার সময়কার অনুভূতির কথা বিস্তারিত বললাম এবং তাকে জানালাম যে আমি ঐ সময় তার জন্য আধঘণ্টা প্রার্থনা করেছি।

একথা শুনে খুবই বিস্মিত হলেন তিনি, এবং ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, "আমি হোটেলে ছিলাম এবং বারের সামনে এসে নেমে যাই। আমার মধ্যে তখন এক ভয়ানক যুদ্ধ চলছিল যেন। আপনার কথাও ভেবেছি আমি, কারণ ঐ অত্যন্ত খারাপ মুহূর্তে আপনার সাহায্য আমার একান্ত দরকার ছিল এবং আমি প্রার্থনা করতে শুরু করি।"

প্রার্থনাগুলো শুরু হয়েছিল ঐ লোকটার থেকে এবং তা আমার কাছে এসে পৌঁছেছে, এবং আমি তার জন্য প্রার্থনা করা শুরু করেছি। আমাদের উভয়েই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত হয়েছিলাম এবং আমাদের দুইজনের মধ্যকার প্রদক্ষিণ সমাপ্ত হবার পর তা বিধাতার কাছে পৌঁছেছে এবং নিজের ঐ কঠিন সংকট মোকাবিলায় শক্তি ফিরে পাবার আকারে তার এবং আমার প্রার্থনার উত্তর খুঁজে পেয়েছে এবং তারপর কি করেছিলেন ঐ লোকটি?

তিনি গিয়েছিলেন একটি ঔষধের দোকানে, এবং কিনেছিলেন একবাক্স ক্যান্ডি এবং সবটুকুই তার খেয়ে ফেলেছিলেন একেবারে না থেমে। ঐ যে কাজটি তিনি করলেন তা তাকে এমন সুন্দর এক অবস্থায় নিয়ে এল, যে তিনি রীতিমত ঘোষণা দিয়ে বললেন, এ হল, প্রার্থনা এবং ক্যান্ডি।

বিবাহিতা এক যুবতী নারী আমার কাছে বললেন যে, প্রতিবেশীদের প্রতি এবং বন্ধুদের প্রতি তার মন ঘৃণা, ইর্ষা এবং বিদ্বেষে ভরা। তিনি খুব উদ্বিগ্নও ছিলেন, সবসময় তার বাচ্চাদের নিয়ে একটা বিরক্তিকর অবস্থার মধ্যে তার সময় কাটত, এই ভেবে, হয়ত তারা অসুস্থ হয়ে পড়বে, অথবা কোন দুর্ঘটনা ঘটবে; অথবা স্কুলের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে। তার জীবনটা ছিল নানারকম মিশ্র কারুণ্যে ভরা এবং তা হল অসন্তুষ্টি, ভয়, ঘৃণা এবং নিরানন্দ। আমি জানতে চাইলাম যে, সে কোনোদিন প্রার্থনা টার্থনা করেছে কিনা। জবাবে সে বলল, "শুধু তখনই প্রার্থনা করি যখন আমি এই অবস্থাগুলোর ঘোর বিরোধী হয়ে উঠি অর্থাৎ আমি তখন মরিয়া কিন্তু আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, আমার কাছে প্রার্থনা কোন অর্থ বয়ে আনে না, কাজেই আমি ঘন ঘন প্রার্থনা করি না।”

আমি তাকে পরামর্শ দিয়ে বললাম যে, সত্যিকারের প্রার্থনা অনুশীলনের মাধ্যমে সে তার জীবনকে বদলে ফেলতে পারে এবং তাকে আরো কিছু নির্দেশনা দিলাম যে, কিভাবে ঘৃণ্য চিন্তাভাবনার পরিবর্তে ভালোবাসাপূর্ণ চিন্তা ভাবনা সে সবার প্রতি প্রেরণ করতে পারে, এবং ভীতিপূর্ণ চিন্তা ভাবনার পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসপূর্ণ চিন্তা ভাবনা প্রেরণ করতে পারে। আমি তাকে আরো পরামর্শ দিলাম যেন তার বাচ্চারা স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রার্থনা করে এবং প্রার্থনাগুলোকে এমন নিশ্চয়তার সাথে করে যেন বিধাতার রক্ষাত্মক মঙ্গলভাবটির জন্যই যেন সবকিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রথমে সে সন্দিহান হয়ে পড়েছিল তারপর সে একজন অত্যন্ত আগ্রহী পক্ষ সমর্থনকারী হয়ে ওঠে এবং যতদূর জেনেছি যে, সে নিয়মিত প্রার্থনা অনুশীলন করেছে গা ছাড়া ভাবে কিছু বইপত্র এবং পুস্তিকা ইত্যাদি পড়ে এবং প্রতিটি কার্যকারী প্রার্থনাশক্তি কৌশলগুলো অনুশীলন করে। আর ঐ পন্থা অবলম্বন ক তোর জীবনে একটা পরিবর্তন আসে।

নিম্নেবর্ণিত চিঠি থেকে আমি সব জানতে পারি। সম্প্রতি এ চিঠিখানি সে আমাকে লিখেছিল।

আমি অনুভব করি যে আমার স্বামী এবং আমার দু'জনেরই গত কয়েক সপ্তায় অবস্থার অদ্ভূত উন্নতি হয়েছে। আমার এই বিরাট উন্নতির তারিখটি হল যে রাত্রে আপনি আমাকে বলেছিলেন যে, “যদি প্রার্থনা কর তবে প্রতিটি দিনই হবে চমৎকার।” তাই কার্যত আমি আপনার সেই প্রার্থনার নিশ্চয়তাজ্ঞাপক অনুশীলন শুরু করি যে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার মুহূর্ত থেকে আজ দিনটি যাবে চমৎকার এবং যেন নিশ্চিত বলতে পারি যে সেই হতে আমার কোন কাজে বা মন খারাপ করার মত দিন ছিল না। অবাক হবার মত বিষয় হল যে, সেই থেকে আসলেই আমার দিনগুলো পাল্টে যায়। যদিও খুব একটা স্নিগ্ধ যে হয়েছে তা নয়, আবার তুচ্ছ বিরক্তিগুলোও থেকে গেছে যেসব বরাবরই ছিল কিন্তু আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে ওসব এখন আমাকে আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে না। প্রতিরাত্রে যে বিষয়গুলির জন্য আমি কৃতজ্ঞ, যেগুলো আমার সারদিনে ঘটেছে এবং আমার সময়কে সুখপ্রদ করেছে তার একটি তালিকা তৈরি করি এবং তার উপর প্রার্থনা নিবেদন করি। আমি জানি এই অভ্যাসটি ভালো কিছু বাছাই করে নেবার জন্য এবং দুঃখজনক কিছু ভুলে থাকার জন্য আমার মনকে বিশেষ চালিকাশক্তি দান করেছিল। সত্যি কথা হল গত ছয়সপ্তাহের মধ্যে একটি বাজে দিনের দেখাও পাইনি আমি এবং আমার মন বিবেক কারো সাথে হীনমন্যতা দেখাতে আমাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি এবং ব্যাপারটি আমার কাছে বাস্তবিক খুবই বিস্ময়কর লাগছে।

প্রার্থনাশক্তি প্রয়োগ করে সে বিস্ময়কর শক্তি আবিস্কার করেছিল আপনিও তা করতে পারেন প্রার্থনাশক্তি প্রয়োগ করে কার্যকরী ফল পেতে পারেন অনুকরনীয় এমন দশটি নিয়ম এখানে প্রদত্ত হলঃ

১। প্রতিদিন অন্তত কয়েকমিনিট সবকিছু থেকে বিরত থাকুন। কোন কথাই বলবেন না। ঐ সময়টুকু শুধু মহান সৃষ্টিকর্তার কথা ভাবতে অভ্যাস করুন। আপনার মনকে আধ্যাত্মিকভাবে ধারণক্ষম করে তুলবে।
২। সহজ, স্বাভাবিক শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে মৌখিকভাবে প্রার্থনা করুন। মনে যা যা আছে সব বিধাতাকে বলুন। একেবারে অপরিবর্তনীয় পবিত্র শব্দাবলী ব্যবহার করতে হবে তা অবশ্যই ভাববেন না। বিধাতার সাথে আপনার নিজের ভাষায় কথা বলুন। তিনি তো তা বুঝেনই।
৩। প্রতিদিনের নির্ধারিত কাজে যাবার সময় পথে চলার সময়, বাসে চলার সময় অথবা যখন আপনি আপনার ডেস্কে বসে আছেন তখন আপনি প্রার্থনা করুন। চোখ মুদ্রিতকরে জগতসংসার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করুন এবং অল্পকিছুক্ষণের জন্য মনকে বিধাতার উপস্থিতি উপলব্ধির জন্য কেন্দ্রীভূত করে রাখুন এবং এক মিনিটের প্রার্থনাকে কাজে লাগাব প্রতিদিন যত বেশিহারে এ প্রার্থনা আপনি করবেন ততই আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে, বিধাতা আপনার কত কাছাকাছি।
৪। যখন আপনি প্রার্থনা করেন তখন শুধু চাওয়া ঠিক হবে না, কিন্তু তার বদলে আপনি নিশ্চিত হোন যে বিধাতা আপনাকে আশীর্বাদ দিচ্ছেন, এবং প্রার্থনার বেশিরভাগ সময় ব্যয় করুন বিধাতাকে ধন্যবাদ দিয়ে।
৫। এমন বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থনা করুন যে, আন্তরিক প্রার্থনা বিধাতার ভালোবাসা এবং তার সুরক্ষাশক্তি সহকারে আপনার প্রিয়তমদের অর্থাৎ যাদের মঙ্গলার্থে প্রার্থনা করছেন তাদের কাছে তা পৌঁছতে পারে এবং তাদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলতে পারে।
৬। প্রার্থনা করার সময় 'প্রার্থনা' পূর্ণ নাও হতে পারে এমন ভাবনা মনে স্থান দেবেন না। শুধুমাত্র 'প্রার্থনা' পূর্ণ হবে এই ভাবনাই মনে স্থান দেবেন কারণ তা নিশ্চিত ফলদায়ক।
৭। সবসময় বিধাতার ইচ্ছা মেনে নেবার প্রতি পূর্ণ সমর্থন দান করুন। আপনি যা চান তা তার কাছে চান, কিন্তু বিধাতা যাই আপনাকে দেন স্বেচ্ছায় তা প্রহণ করুন। আপনার চাওয়ার চেয়ে এমন পাওয়াটা অবশ্যই ভালো।

৮। এমন মনোভাব ধরে রাখতে অনুশীলন করুন যে, সবকিছুই বিধাতার হাতে। সবচেয়ে ভালো কিছু করার জন্য বিধাতার কাছে সামর্থ্য প্রার্থনা করুন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে ফলাফলের ভার বিধাতার হাতে ছেড়ে দিন।
৯। যাদের আপনি পছন্দ করেন না তাদের জন্য অথবা যারা আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তাদের জন্য প্রার্থনা করুন। বিদ্বেষ হল আধ্যাত্মিক শক্তির সর্বপ্রধান অন্তরায়।
১০। যাদের জন্য প্রার্থনা করবেন তাদের একটি তালিকা তৈরি করুন। অন্যদের জন্য আপনি যত প্রার্থনা করবেন বিশেষকরে যাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই সেই অধিক প্রার্থনার সুফল আপনার প্রতি ফিরে আসবে।

📘 দ্য পাওয়ার অফ পজিটিভ থিংকিং > 📄 কিভাবে নিজের সুখ নিজেই তৈরি করতে হয়

📄 কিভাবে নিজের সুখ নিজেই তৈরি করতে হয়


আপনি সুখি হবেন কি সুখি হবেন না সে সিদ্ধান্ত কে নেবে? উত্তরটি হল- আপনি নেবেন।

টেলিভিশনের এক যশস্বী ব্যক্তির এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এক বুড়া লোক উপস্থিত ছিলেন। তিনি আসলে খুব অসাধারণ প্রকৃতির এক বুড়াই ছিলেন। তার মন্তব্যগুলো ছিল পুরোপুরি অচিন্তিতপূর্ব এবং অবশ্যই তা ছিল সম্পূর্ণরূপে মহরাবিহীন। তার মধ্যে থেকে এসব বুদবুদের মত স্বাভাবিক ভাবে উঠে আসত এবং এগুলো ছিল আনন্দব্যঞ্জক এবং সুখকর এবং যখনই তিনি যা কিছু বলেছেন তা ছিল খুবই অকপট, খুবই উপযুক্ত; যেকারণে সমস্ত শ্রোতাবৃন্দ সোল্লাসে হেসে উঠত। তারা তাকে ভালোবাসত। স্বনামধন্য এ লোকটিও অনুপ্রাণিতবোধ করতেন এবং অন্যদের সাথে সেই মজার সময়টুকু উপভোগ করতেন।

অবশেষে তিনি সেই বৃদ্ধলোকটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কেন আপনি এত উল্লসিত ছিলেন। 'নিশ্চয়ই আপনার এই আনন্দ উল্লাসের পেছনে বিস্ময়কর এবং গোপন কোন কারণ আছে।"

'না' সোজাসুজি জবাব দিলেন বুড়া, "বড় ধরণের গোপন রহস্য এর পেছনে নেই আমার।” আপনার মুখের উপর যেমন একটি মার্ক আছে থাকাটা যেমন স্বাভাবিক আমার ব্যাপারটিও তেমনি স্বাভাবিক। সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, একটি ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন তিনি, "আমার দুটো জিনিস পছন্দ আছে, হয় সুখি হব, না হয় অসুখি হব। এবং আপনার কি মনে হয়; আমি কোনটা হব? অবশ্যই আমি সুখি হওয়াকেই পছন্দ করব, এবং আমার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণই আছে।

এই যে ব্যাপারটি; তা মনে হতে পারে অতিমাত্রা সাধারণ এবং এও মনে হতে পারে যে, বুড়া হয়ত ভাসা ভাসা প্রকৃতির এক মানুষ, কিন্তু আমার মনে পড়ে যে আব্রাহাম লিংকনকে নিশ্চয়ই এমন ভাসা ভাসা অর্থাৎ অগভীর প্রকৃতির লোক বলে অভিযুক্ত করবে না, কারণ তিনি ও বলেছিলেন, “জনগণ মনে মনে যতটা সুখি হতে চাইবেন প্রায় ঠিক ততটাই সুখি হতে পারবেন।" যদি আপনি চান তাহলে আপনি সুখি হতেই পারেন। কোনোকিছুকে কোন বিশেষ গুণে বিভূষিত করা এ দুনিয়াতে সচেয়ে সোজা কাজ। অসুখি হবেন ঠিক এমন একটি সিদ্ধান্ত নিন। চারিদিকে যান, একে ওকে বলেন যে, আপনার কিছুই ভালো যাচ্ছে না, কোন কিছুতেই সন্তুষ্টি নেই আপনার এবং এতে আপনার অসুখি হওয়া নিশ্চিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আপনি এমন কথা বলেন, “সবকিছু সুন্দরই যাচ্ছে। জীবনটা বেশ ভালো সুখ আমি পছন্দ করি।” এবং আপনি তাতে আপনার পছন্দ করা চাওয়াটা পাওয়ার জন্য পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে সুখের ব্যাপারে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক যদি তার মধ্য বয়স বা বৃদ্ধা বয়সে একজন কম বয়সের ছেলে বা মেয়ের প্রাণবন্ত ভাবটি গ্রহণ করতে পারে তাহলে তিনি হবেন একজন বিশিষ্ট লোক, কারণ তিনি সত্যিকারের সুখি বা প্রাণবন্ত মন মানসিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন। যার সাথে বিধাতা প্রদত্ত যৌবন সংযুক্ত হয়েছে। যীশুখ্রিস্টের দেয়া সুক্ষ ব্যাখ্যাটি স্মরণীয়, কারণ উনি আমাদের বলছেন যে “পৃথিবীতে তোমরা শিশুর মত হৃদয় ও মন নিয়ে বেঁচে থাক।” আবার অন্যভাবে বলেছেন, কখনও বৃদ্ধ বা নিরুৎসাহ বা শ্রান্ত হবে না। অতিমাত্রায় সংসারাভিজ্ঞ হতে যেয়ো না।"

আমার ছোট্ট মেয়ে এলিজাবেথ, নয় বছর বয়স সুখ সম্বন্ধে তার ধারণাটি কেমন দেখুন। একদিন আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, "মিষ্টি মেয়ে বলত তুমি কি সুখি?” জবাবে সে বলল, “অবশ্যই আমি সুখি।”

আবার তাকে জিজ্ঞাস করলাম, “তুমি কি সবসময় সুখি?” “অবশ্যই আমি সবসময়ই সুখি।” দ্বিধাহীন জবাব।

আমি জানতে চাইলাম, কি তোমাকে সুখি করে?

কেন সুখি তা আমি জানিনা, তবে আমি ঠিকই সুখি। আমি জোর দিয়েই বললাম, অবশ্যই কিছু না কিছু আছে যা তোমাকে সুখি করে।

সে বলল, “বেশ আমি তোমাকে বলছি কিভাবে আমি সুখি। আমার খেলার সাথীরা আমাকে সুখি করে। আমি তাদের পছন্দ করি। আমার স্কুল আমাকে সুখি করে। তাই প্রতিদিন স্কুলে যেতে ভালো লাগে আমার "(আমি তাকে কিছুই বলিনি। কিন্তু সে কখনই তা আমার কাছ থেকে শুনত না "আমি আমার শিক্ষকদের পছন্দ করি। গীর্জায় যেতে ভালো লাগে আমার রবিবারের স্কুল এবং সেখানকার শিক্ষকদের ভালো লাগে আমার, আমার বোন মার্গারেটকে ভালোবাসি, আমি এবং ভাই জনকেও আমি ভালোবাসি। আমি আমার বাবা মাকেও ভালোবাসি, তারা আমার যত্ন নেন। অসুস্থ হলে ও আমার যত্ন নেন তারা এবং তারা আমাকে ভালোবাসে এবং তারা আমার খুব প্রিয়।”

এ হলো এলিজাবেথের সুখি হবার মূলসূত্র এবং আমার মনে হয় সে যা যা বলেছে অর্থাৎ তার খেলার সাথীরা, স্কুল, রবিবারের স্কুল তার শিক্ষকরা, গীর্জা ভাই, বোন বাবা মায়ের সেবা যত্ন, ভালোবাসা এসব কিছুই তার সুখি হবার উৎসগুলোর মধ্যেই নিহিত। আপনার জীবনের সর্বোচ্চ সুখকর সময়।

একদল ছেলেমেয়েকে বলা হয়েছিল যে, যে বিষয়গুলো তোমাদের সবচেয়ে সুখি করেছিল তার একটা তালিকা তৈরি করার জন্য। তাদের জবাবগুলো ছিল মনে বেশ দাগ কাটার মত।

ছেলেদের তালিকাটা এখানে তুলে দেয়া হল একটি দোয়েল পাখি উড়ছে তাকিয়ে আছে গভীর স্বচ্ছ পানির নীচে, পানি কেটে চলছে নৌকা ধনুক রেখা এঁকে, দ্রুতগতি রেলগাড়ি ধেয়ে চলছে সম্মুখে; নির্মাণ কাজের ক্রেনটি উত্তোলন করছে ভারি কোন বস্তু, এবং আমার পোষা কুকুরের দুটো চোখ।

এখানে তুলে দেয়া হলো মেয়েরা কেমন করে সুখি হয়েছিল সেই তালিকাঃ নদীর পানিতে রাস্তার বাতির প্রতিফলন; গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে দেখা লাল লাল দালানকোঠার ছাদ চিমনী হতে উর্ধ্বে ওঠে আসা ধোঁয়া। লাল মখমলের কাপড় মেঘেঢাকা চাঁদ, কখনও আড়ালে কখনও আধখোলা মুখে উঁকি মারছে এ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের অসাধারণ সুরভির মধ্যে দারুণ কিছু একটা আছে। যা ওরা এসবের মধ্যে প্রকাশ করেছে, যদিও প্রকাশটা আধো আবরণে ঢাকা তবুও সুন্দর। তাই বলি যদি একজন সুখি মানুষ হতে চান তবে একটি পরিচ্ছন্ন আত্মাকে ধারণ করুন, ধারন করুণ সুন্দর দুটি চোখ। যা সাধারণ জায়গায় দেখতে পায় মনোহর কিছু, দেখতে পায় শিশুর সরলচিত্ত এবং আধ্যাত্মিক সরলতা।

আমাদের অনেকেই নিজেদের সুখ নিজেরাই প্রস্তুত করে। অবশ্য সব সুখই যে নিজেদের তৈরি তা নয়, সামাজিক অবস্থাও আমাদের বেশকিছু দল সুখই ওশি দুঃখ কষ্টের জন্য দায়ী। তবে এখনও এটা সত্যি যে, বহুলাংশে আমাদের চিন্তাশক্তি এবং মনোভাব যা আমরা আমাদের জীবন উপকরণ থেকে একটু একটু করে বের করে আনি তা আমাদের জন্য সুখপ্রদও হতে পারে আবার অসুখপ্রদও হতে পারে।

'পাঁচজন মানুষের মধ্যে চারজন মানুষই খুব একটা সুখী নয় যেমনটা তারা হতে পারে,' এ ধারণাটি ঘোষণা করে একটি বিখ্যাত লেখক এবং তিনি আরো বলেন, “সুখহীনতা হল মনের সবচেয়ে স্বাভাবিক একটি অবস্থা।"

একথা বলতে আমি দ্বিধাবোধ করব যে, মানুষের সুখবোধ এত নীচুস্তর পর্যন্ত আঘাত করতে পারে কিনা কিন্তু আমি অবশ্যই দেখতে পাই যে, আমি যতটুকু হিসাব করতে উদ্বিগ্নবোধ করি তার থেকে বেশিসংখ্যক লোক অসুখি জীবন যাপন করছেন। যেহেতু প্রতিটি মানুষের মৌলিক ইচ্ছা হল সুখের অবস্থায় থাকা কিন্তু তার জন্যতো কিছু করতে হবে। সুখি অবস্থা কার্যে পরিণত করা সম্ভব এবং সুখ পাওয়ার পদ্ধতি জটিল কিছু নয়। যে কেউ যদি সুখ পাবার বা সুখি হবার বাঞ্চা করে এবং যে সঠিক পদ্ধতি শেখে এবং সঠিক সূত্র প্রয়োগ করে সে সুখি হতে পারে।

একবার রেলগাড়ির ভোজনকক্ষে স্বামী স্ত্রী যুগলের বরাবর বসেছি এরা আমার কাছে অপরিচিত। মহিলাটি বহুমূল্যবান পোষাকে সজ্জিত, যেমন সুক্ষ পশুলোম হীরক এসব দ্রব্যে কারুকাজ খচিত পোষাক মহিলা পরেছিলেন কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হল অশান্তিতে সময় কাটছে মহিলার। বেশ জোরে জোরেই মহিলা সোজা সাপটা বলে দিলেন যে, গাড়িটা নোংরা এবং ঠাণ্ডা খাদ্য পরিবেশন একেবারে খারাপ, খাবার দাবারে কোন স্বাদগন্ধ নেই। নানানরকম নালিশ টালিশ করে সবকিছুর জন্য খুব বিরক্তি প্রকাশ করলেন।

কিন্তু অন্যদিকে তার স্বামী লোকটি কিন্তু সহানুভূতি সম্পন্ন অমায়িক এবং শান্তিপ্রিয় লোক। সুস্পষ্টভাবেই এটা বোঝা যায় যে, যা যেমন এসেছে উনি তার সবই সহজে মেনে নিতে পারছেন। আমার মনে হল যে তার স্ত্রীর এমন জটিল মনমানসিকতায় তিনি বিব্রতবোধ করছিলেন এবং কিছুটা হতাশও বোধ করছিলেন। যেহেতু তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন।

আলাপচারিতা পরিবর্তন করার জন্য তিনি জানতে চাইলেন আমি কিসের সাথে জড়িত তারপর নিজের সম্পর্কে বললেন, উনি একজন আইন ব্যবসায়ী। তারপরই বড় একটা ভুল করে ফেললেন তিনি, দেঁ তো হাসি হেসে বললেন, তার স্ত্রী শিল্পসামগ্রী উৎপাদনের ব্যবসার সাথে জড়িত। বিস্মিত হবার মত ব্যাপার ছিল যে তাকে দেখে আমার মনে হয়নি তিনি শিল্পপতি বা সহকারী হবার মত কেউ একজন তাই জানতে চাইলাম: "উনি কি তৈরি করেন।" "অসন্তুষ্টিতে” তিনি জবাব দিলেন। "উনি নিজেই নিজের অসন্তুষ্টি উৎপাদন করেন।"

বরফের মত ঠাণ্ডা হওয়া সত্যে ও অবিবেচনাপ্রসূত এই ব্যাপারটি যেন টেবিলের উপর স্থির হয়ে পড়ল। তার এই বিজ্ঞ মন্তব্যে আমি কতার্থ হয়েছিলাম। কারণ ঐ মন্তব্য এটাই বলে দেয় যে, “অসংখ্য লোক তো তাই করে। তারা নিজেরাই তাদের অসন্তুষ্টি উৎপাদন করে"।

এটা আরো দুঃজনক বিষয় যে, মানুষের মনই অনেক সমস্যার জন্ম দেয় এবং তা আমাদের সুখকর অবস্থাকে এত দুর্বল করে দেয় যে, পরবর্তীতে বোকার মত আমরা নিজেরাই মনে আরো অসন্তুষ্টি জমা দিয়ে দিয়ে থাকি। নিজেদের অজস্র কষ্ট ক্লেশের সাথে কেমন বোকার মত আমরা আমাদের ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি আরো বেশি করে তৈরি করি। যার উপর হয়ত সামান্য বা কোনরকম নিয়ন্ত্রণই নেই আমাদের।

নিজেদের অসন্তুষ্টি বৃদ্ধির যে পথ মানুষ অবলম্বন করে সেদিকে জোর না দিয়ে আসুন আমরা বরং সেই পথ ও পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হই। যার মাধ্যমে আমাদের দুঃখ কষ্ট অবসানের দিকে চিন্তা ভাবনা করেই আমাদের নানাবিধ অসন্তুষ্টি তৈরি করছি। একধরণের বিরূপ মনোভাব পোষণ করা আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেমন আমাদের এমন একটি অনুভূতি আছে যে, সবকিছুই খারাপ দিকে যাচ্ছে অথবা অন্যদের সম্বন্ধে ভাবি যে, ওরা যা পাবার উপযুক্ত নয় তাই ওরা পেয়ে যাচ্ছে এবং আমরা যা পাবার যোগ্য তা আমরা পাচ্ছি না। আমরা আমাদের দুঃখ কষ্টকে একটু একটু করে পরিপূর্ণ করে ফেলছি আমাদের চেতনাকে নানারকম বাজে অনুভূতির দ্বারা। যেমন, বিদ্বেষ, বাজে ইচ্ছা এবং ঘৃণা প্রকাশ দ্বারা অসন্তুষ্টি উৎপাদনকারী পদ্ধতি সবসময় ভয় এবং বিরক্তি উৎপাদনকারী উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার তৈরি করে। এসব বিষয়গুলো এই বইয়ের অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে। আমরা শুধুমাত্র বর্তমান সময়কেই নির্দেশ করতে চাই, এবং প্রচণ্ড জোর দিয়ে বলতে চাই যে, মেটিামুটি ভাবে সবার মধ্যে আনুপাতিকভাবে সুখহীনতার যে বিরাট অস্তিত্ব বর্তমান তার সবটাই নিজেদের তৈরি। তাহলে কিভাবে আমরা সুখহীনতার জায়গায় সুখি হবার মত অবস্থা তৈরি করতে পারবো। আমার রেলগাড়িতে ভ্রমণের এক ঘটনা থেকে এর একটি সদুত্তর পাওয়া যেতে পারে। একদিন সকালে একটি সেকেলে ধরনের পুলম্যান করে আমরা প্রায় মোটামুটি আধডজন লোক পুরুষদের বিশ্রাম কক্ষে বসে দাড়ি সেভ করছিলাম। সবসময়ই রেলগাড়ির এমন একটি আটসাট এবং জনার্কীন কক্ষে রাত্রি পার করার পর; এই আগন্তক দলটির একটু উল্লসিত হবার কোন ইচ্ছা ছিল না; এদের মধ্যে সামান্য কথাবার্তা চলছিল এবং বেশির ভাগ বিড় বিড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এরপর এক লোক মুখে বিস্তৃত হাসি নিয়ে এসে কক্ষে প্রবেশ করলেন। উৎফুল্লমনে সুপ্রভাত বলে সবাইকে অভিবাদন জানালেন, কিন্তু সবাই তার প্রতি কোন আগ্রহ না দেখিয়ে বরং কিছুটা ক্রোধান্বিত ভাবই দেখালেন। যখন তিনি সেভ করতে যাচ্ছিলেন সম্ভবত একেবারেই অসতর্কভাবে হালকা ফুড়ফুড়ে মনে গুণ গুণ করে গান গাইছিলেন। এতে কিছু লোকের তন্দ্রীতে যেন একটু ঘা পড়ল। শেষমেশ তো একজন কিছুটা বিদ্রূপের সাথে বলেই ফেলল, "আজকের সকালে আপনাকে খুব খুশি মনে হচ্ছে! এত খুশি হবার কারণটা কী?”

“হ্যাঁ,” লোকটি জবাবে বললেন, “সত্যি কথা কি, আমি খুশি। আমি অবশ্যই উৎফুল্ল বোধ করছি।” তারপর আবার বললেন, "খুশি হবার ব্যাপারটা আমি অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছি।” লোকটি যা বললেন তাতো ছিল এই কিন্তু আমি নিশ্চিত যে বিশ্রামকক্ষের সবকজন লোক মনে মনে ঐ মজার কথা গুলো গেঁথে নিয়েই ট্রেন ছেড়েছেন। 'খুশি হবার ব্যাপারটিকে আমি অভ্যাসে পরিণত করেছি।'

ভাবতে গেলে এ উক্তিটি খুবই গভীর কারণ, সুখি হওয়া বা দুঃখী হওয়াটা নির্ভর করে আমাদের মনের মধ্যে যে অভ্যাসের আবাদ আমরা করি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রার উপর। সারগর্ভ বাণীর যে সংগ্রহশালা, অর্থাৎ বাণী চিরন্তনী আমাদের বলে যে... "যার একটি হৃষ্টচিত্ত আছে তার আছে নিরন্তর আনন্দ।” (Proverbs XV.15) অন্যভাবে বলতে গেলে, হৃষ্ট চিত্ত ধরে রাখার আবাদ বা চর্চা করুন দেখবেন জীবন নিরন্তর আনন্দে ভরে ওঠেছে, তার মানে হল যে, আপনি প্রতিদিনই সুন্দর জীবন উপভোগ করতে পারবেন। সুখি অবস্থার অভ্যাস করনের মধ্যে দিয়েই এসে উপস্থিত হয় সুখি জীবন এবং যেহেতু আমরা অভ্যাসের চর্চা বা আবাদ করতে পারি, কাজেই নিজেদের সুখ নিজেরাই তৈরি করার ক্ষমতাও আমাদের আছে।

সুখি হবার অভ্যাসটি আরো উন্নত হতে পারে শুধুমাত্র সুখচিন্তনের অনুশীলনের মাধ্যমে। প্রথমে সুখচিন্তনের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন এবং প্রতিদিন কয়েকবার তা মনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত করুণ। যদি কোন একটি অসুখপ্রদ চিন্তা আপনার মনের ভেতর ঢুকে পড়ে অনতিবিলম্বে তা থামিয়ে দিন। সচেতনভাবেই তাকে মন থেকে দূর করে দিন এবং সকালে বিছানা ছাড়ার আগে, বেশ আয়েশ করে শুয়ে থাকুন এবং ধীরে ধীরে একটু একটু করে সুখচিন্তা আপনার সচেতন মনে বর্ষণ করতে থাকুন। সারাদিনে পেতে পারেন এমন সব সুখপ্রদ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক ছবি আপনার মনের উপর দিয়ে পরিচালিত করুন। এর আস্বাদন নিন। এধরনের চিন্তাগুলোর এভাবেই সুন্দর কিছু উৎপন্ন করতে বিশেষ সহায়ক হবে। এটা কখনই মনে গেঁথে বসতে দেবেন না, যে আজ আমার দিনটি ভালো যাবে না। কেবলমাত্র একথাটি দৃঢ়চিত্তে বলুন যে, আসলেই আমি সুখি হতে পারি। ছোট বড় সবধরনের হেতু বা কারণের সিন্ধান্ত নিজে নিন, দেখবেন অসুখকর অবস্থার বিষয় তা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। এর ফলস্বরূপ দেখবেন যে, আপনি নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করছেন; “আমার সবকিছুই খারাপ যাচ্ছে কেন? সব ব্যাপারই এমন কেন হচ্ছে?"

আপনার মননে একটি দিন আপনি কিভাবে শুরু করলেন, কার্যকরণ কিন্তু সরাসরি সেই পদাঙ্কই অনুসরণ করবে।

তারচেয়ে আপনি কাল আবার এই পরিকল্পনাটি নিয়ে চেষ্টা চালান। সুখন আপনি ঘুম থেকে ওঠেন তখন জোরে এই বাক্যটি তিনবার বলেন, "আজকের এই দিনটি বিধাতার সৃষ্টি; এই দিনটিতে আমি আনন্দে উল্লাসিত হব।” কেবলই আত্মস্থ হোন এবং বলুন এই দিনটিতে আমি আনন্দে উল্লাসিত হব। জোর দিয়ে পরিস্কার কণ্ঠে এবং নিশ্চয়তার ভাব নিয়ে জোরালোভাবে বার বার এই উক্তিটি অবশ্যই বাইবেলে উল্লিখিত এবং এটি একটি চমৎকার দুঃখনাশক ব্যবস্থা। প্রাত ভোজের আগে আপনি যদি এই উক্তিটি পুনপুন তিনবার বলেন এবং এর যা অর্থ তার উপর ধ্যান করেন, তাহলে ঐ দিনটির ধাত বদলে দিয়ে একটি সুন্দর মনস্তাত্বিক অবস্থা নিয়ে আপনি দিনটি শুরু করতে পারবেন।

কি কাপড় পরার সময়, কি সেভিং এর সময় কি প্রাতঃভোজনের সময়, নিম্নে উল্লেখিত কয়েকটি শব্দ জোরে জোরে বলুন, "আমি বিশ্বাস করি যে, আজকের দিনটি চমৎকার কাটতে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি যে আজকের সমস্ত সমস্যা আমি স্বর্থকরূপে সমাধান করতে পারব। স্বাস্থ্যগতভাবে মানসিকভাবে এবং আবেগের দিক থেকেও আমি আজ ভালো কাটাব। বেঁচে থাকাটা সত্যিই বিস্ময়কর। আমার যা যা ছিল তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ এবং এখন যা যা আছে তার সবকিছুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ এবং আগামীতে যা যা আমি পাব তার জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। কোনকিছুই আমা থেকে সরে যাচ্ছে না। সৃষ্টিকর্তা আমার সাথে সাথেই আছেন এবং তিনি আমাকে সবসময় দেখাশুনা করবেন। সমস্ত ভালোর জন্য তাকে ধন্যবাদ।

একসময় আমি এক অসুখি প্রকৃতির লোককে চিনতাম যে সবসময় প্রাতঃভোজনকালে তার স্ত্রীকে বলতেন, আর একটি কঠিন দিন কাটাতে যাচ্ছি। এটা যে তিনি আসলেই ভাবতেন তা নয়, কিন্তু এটা ছিল তার একটি মানসিক ছলের মতই, যাদ্বারা; যদি তিনি বলতেন যে আর একটি খারাপ দিন কাটাতে যাচ্ছি হয়ত দেখা যেতো যে ঐ দিনটি সুন্দরভাবেই কেটে যেতে পারতো। আসলে কিন্তু দিনটি তার শুরু হয়েছিল বাঝে ভাবেই, তাতে কিন্তু বিস্মিত হবার কিছুই ছিল না। কারণ যদি আপনি মনশ্চক্ষুতে দেখেন এক অসুখপ্রদ একটি ফল সম্বন্ধে নিশ্চিত হন, তবে তা দ্বারা আপনি ঠিক তেমন বাজে অবস্থার দিকেই বেঁকে পড়ছেন। কাজেই এর উল্টোটা করুণ, প্রতিদিনের শুরুতে এটাই ভাবুন যে আজকের দিনের ফলটি হবে সুখপ্রদ, এবং আপনি বিস্মিত হবেন এই দেখে যে সত্যি সত্যি কত ভালো কিছুই ঘটছে এ দিনটিতে।

কিন্তু এটা এমনি এমনি প্রয়োগ করলে হবে না, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও নিশ্চয়তাজ্ঞাপক চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে একে প্রয়োগ করতে হবে যেমনটা আমি আপনাদের পরামর্শ দিয়েছি, নচেৎ সারাদিন ব্যাপী আপনিও আপনর কাজের এবং মনোভাবের উপর সুখি ভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক নীতিগুলোকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করুন।

এমনই একটি অতি সাধারণ এবং মূল নীতি হল মানুষের অকাট্য ভালোবাসা এবং শুভেচ্ছা। আন্তরিক, সহানুভূতি প্রকাশের এবং কোমলতা প্রকাশের মধ্যে কি বিস্ময়কর সুখ রয়েছে তা সত্যি মুগ্ধ হবার মত। আমার বন্ধু ডা. স্যামুয়েল সুমেকার একবার তার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর ভ্রমণ গাঁথা লিখলেন ইয়াং নাম্বে বন্ধুটি নিউইয়র্কের গ্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের রেলস্টেশনে ৪২ নম্বর পোর্টার হিসেবে সুখ্যাত । জীবিকার জন্য যাত্রীদের ব্যাগ বয়ে থাকে কিন্তু তার আসল কাজ ছিল বিশ্বের বৃহত্তম রেলওয়ে স্টেশনগুলোর একটিতে পোর্টার হিসেবে খ্রিস্টীয় মনোভাক নিয়ে বেঁচে থাকা। যখন সে কোন লোকের সুটকেস বহন করত তখন সে তার জ্যাথে খ্রিস্টান সূলভ সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করত। সে খুব সতর্কভাবে একজন খদ্দেরকে লক্ষ করত এটাই নিরীখ করার জন্য যে, যদি তাকে আরো সাহস এবং আশাভরসা দেয়া যায়। আর এ বিষয়ে কিভাবে অগ্রসর হতে হবে সেদিক থেকে সে ছিল খুবই নিপুন।

উদাহরণ স্বরূপ একদিন এক ছোটখাটো বৃদ্ধা মহিলা তাকে ট্রেনে তুলে দিতে অনুরোধ করলেন। বৃদ্ধাটি ছিলেন একটি হুইল চেয়ারে। কাজেই তিনি তাকে এলিভেটরে উঠালেন। যখন সে তাকে হুইল চেয়ারে করে এলিভেটরের ভেতর নিয়ে যায় তখন লক্ষ করল যে বৃদ্ধার চোখে পানি। এলিভেটর যখন নীচে নামলো র‍্যালস্টোন ইয়াং সেখানে দাঁড়ালো, তার চোখ বন্ধ করলো এবং বিধাতার উদ্দেশ্যে বলল, কিভাবে এ বৃদ্ধাকে সে সাহায্য করতে পারে, এবং বিধাতা তাকে একটি পথ দেখালেন। যখন তাকে নিয়ে এলিভেটরে রাখল, তারপর বলল, "ম্যাম যদি কিছু মনে না করেন তা হলে একটি কথা বলি, এবং তা হলো অত্যন্ত সুন্দর একটি টুপি আপনি পরে আছেন। তিনি চোখ ফিরে তাকালেন র‍্যালের দিকে এবং বললেন, তোমাকে ধন্যবাদ।

"এবং আমি বলতে পারি, আপনি যে পোষাকটি পড়ে আছেন তাও অনেক সুন্দর, আপনার এ পোষাকটি আমার খুবই পছন্দ।”

একজন মহিলা হওয়াতে, আমার কথাগুলো খুবই মনে ধরল তার এবং তার ভালো লাগছিল না। তা সত্যেও তিনি খুশি হয়ে উঠলেন এবং জানতে চাইলেন, আমার এসব জিনিস খুব সুন্দর কেন তুমি আমাকে বলছ? তোমার কথাগুলো আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।

“বেশ, তাহলে বলছি, "আমি লক্ষ করলাম যে আপনি বেশ দুঃখিনী, দেখলাম যে আপনি নীরবে কাঁদছেন, এবং আমি বিধাতার কাছে জানতে চাইলাম যে, কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।” বিধাতা বললেন, “তার কাছে তার টুপির কথা বল।" "আর পোষাক সম্বন্ধে যে উল্লেখ করা হল তা নিজস্ব পরিকল্পনা থেকে করা হল।"

র‍্যালস্টোন তখন জিজ্ঞেস করলেন, এখন কি আপনার ভালো লাগছে না?

“না” তিনি জবাব দিলেন। "অনুক্ষণ আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমি কখনও এ থেকে রেহাই পাইনি। মাঝে মাঝে আমি ভাবি এর বিরুদ্ধে আমি রুখে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি কোনভাবে বলতে পার যে, সারাক্ষণ মনে কষ্ট থাকলে তার অর্থ কি দাঁড়ায়।

র‍্যালস্টোন এর জবাবে বলল, "হ্যাঁ ম্যাম, আমি পারি, কারণ আমার একটি চোখ আমি হারিয়েছি, এবং তপ্ত লোহার মত আমাকে সারাদিন কষ্ট দেয়।"

"কিন্তু তোমাকে দেখে এখন সুখিই মনে হয়। কিভাবে তা সম্ভব করেছ?

ইতোমধ্যে মহিলা ট্রেনে তার আসন করে নিয়েছেন এবং আমি বললাম শুধুমাত্র প্রার্থনার সাহায্যে, ম্যাম, শুধুমাত্র প্রার্থনার সাহায্যে।

নরম গলায় মহিলা বললেন, শুধুমাত্র প্রার্থনার সাহায্যে তোমার কষ্ট চলে গেল?

“বেশ, জবাব দিল র‍্যালস্টোন, "হয়ত সবসময়ই তা হয় না। আমি বলতে পারি না যে তা হয়-ই কিন্তু তা সবসময় আপনাকে আপনার প্রচণ্ড কষ্টকে জয় করতে শক্তি যোগাবে। আপনি শুধু প্রার্থনারত থাকুন, ম্যাম, এবং আমিও আপনার জন্য প্রার্থনা করব।"

এই সময়টায় তার চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, এবং তিনি সুন্দর হাসি মাখা মুখে র‍্যালস্টোনের দিকে তাকালেন, তার হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলেন এবং বললেন, তুমি আমার জন্যে অনেক ভালো কিছু করলে।” একটি বছর পার হয়ে গেল, এবং একরাতে গ্রান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনে র‍্যালস্টোন ইয়ং ভৃত্যটি ইনফরমেশন বুথে এলো। একজন যুবতি সেখানে অপেক্ষারত ছিলেন এবং বললেন, "আমি এক মৃতের কাছ থেকে একটি সংবাদ তোমার জন্য এনেছি। মৃত্যুর আগে আমার মা তোমাকে খুঁজে বের করতে বলেছেন এবং তোমাকে বলতে বলেছেন যে, গতবছর তুমি যখন তাকে হুইল চেয়ারে করে ট্রেনে তুলে দিয়েছিলে তখন তুমি তাকে কতখানি সাহায্য সহযোগিতা করে ছিলে। এমন কি পরলোক থেকেও তিনি সবসময় তোমাকে স্মরণ করবেন। তিনি তোমাকে এজন্য স্মরন করবেন কারণ তুমি তার প্রতি দয়া ও ভালোবাসা দেখিয়েছিলে এবং তুমি তার কষ্ট বুঝতে পেরেছিলে।” কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটির চোখ থেকে পানি ঝরছিল। এবং দুঃখে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো।

র‍্যালস্টোন শান্তভাবে তাকে লক্ষ্য করছিল। তারপর বলল, "কাঁদবেন না, মিসি, কাঁদবেন না। কান্নাকাটি করা ঠিক নয়, তারচেয়ে বিধাতাকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রার্থনা করুন।"

কিছুটা বিস্মিত হয়ে মেয়েটি বলল, "কেন আমি ধন্যবাদ দিয়ে প্রার্থনা করব?" 'কারণ, অনেক মানুষই আপনার থেকে কম বয়সে মা বাপ হারিয়ে এতিম হয়েছে। আপনি অনেক অনেকদিন আপনার মাকে সাথে পেয়েছেন, তাছাড়া আপনি এখনও তাকে সাথে পাচ্ছেন। আপনি আবার তাকে দেখতে পাবেন। তিনি আপনার কাছাকাছিই আছেন এবং সবসময় আপনার কাছাকাছিই থাকবেন। র‍্যালস্টোন আরো বলল, হয়ত, ঠিক এই মুহূর্তে তিনি আমাদের সাথেই আছেন আমাদের দুজনের সাথেই যখন আমরা কথা বলছি।

ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ থেমে গেল মেয়েটির, শুকিয়ে গেল চোখের পানিও। মায়ের মনে যেমনটি হয়েছিল ঠিক তেমনিভাবে র‍্যালস্টোনের মায়াজর কথা তার মেয়ের উপরও একই প্রভাব ফেলল। এতবড় স্টেশনে হাজারো মানুষের চলাচলের মধ্যে ঐ দুজন একজনের উপস্থিতি উপলব্ধি করছে যিনি আশ্চর্য্য ঐ ভুত্যকে অনুপ্রাণিত করেছেন চারিদিকের মানুষগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ছড়াতে।

টলষ্টয় বলেছেন, "কোথায় ভালোবাসা ঈশ্বর” “ঈশ্বর নিজেই ভালোবাসা” এবং আমরা আরও একটু বাড়িয়ে বলতে পারি, যেখানে ঈশ্বর আছে আর ভালোবাসা আছে, সেখানে আনন্দও বিরাজমান। কাজেই সুখ পাবার প্রধান এবং বাস্তব নিয়ম হল ভালোবাসার চর্চা করা।

আমার এক সত্যিকারের সুখি বন্ধু এইচ, জি, ম্যাটার্ন, উনার স্ত্রীও সমান সুখি মহিলা, স্বামীর কাজের সুবাদে দুজনেই সারাদেশ ঘুরে বেড়ান। মি. ম্যাটার্ন সাথে করে বয়ে বেড়ান তার অসাধারণ বিজনেস কার্ডটি যার উল্টো পিঠে কিছু দার্শনিক তত্ব লিখা আর এ লিখা তার এবং তার স্ত্রীর জীবনে নিয়ে এসেছে অনাবিল আনন্দ, এমন কি আরো শত শত সৌভাগ্যবান মানুষের জীবনেও; যারা এই দুই ব্যক্তিত্বের সাচর্যে এসেছেন এবং একাত্ব অনুভব করেছেন।

কার্ডে লিখা কথাগুলো এরকম, "সুখি হবার পথ” 'ঘৃনাবোধ থেকে এবং উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে আপনার হৃদয়কে মুক্ত রাখুন। সহজ সরল জীবন যাপন করুন। আশা করুন অল্প কিন্তু দান করুন বেশি। ভালোবাসা দিয়ে জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করুণ। হৃদয় থেকে সূর্যের মত জ্যোতি চারিদিকে ছড়িয়ে দিন। নিজের স্বার্থ ভুলে অপরের মঙ্গল চিন্তা করুন। অপরের প্রতি তেমন কিছু করুন যেমনটা নিজের জন্য আশা করেন। সপ্তাহখানেক এমনটি যাচাই করে দেখুন। দেখবেন বিস্মিত হবার মত কিছু ঘটে গেছে।'

একথা গুলো যখন আপনি পড়েন তখন হয়ত বলতে পারেন, 'এর মধ্যে নতুন কিছুই নেই।' প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে নতুন কিছু আছে, যদিনা আপনি কোনদিন পরীক্ষা করে থাকেন তবে কেমন করে তা বুঝবেন।

যখন আপনি বিষয়টি শুরু করবেন দেখবেন এটি একেবারে নতুন তরতাজা, সুখের। সবচেয়ে অবাক করে দেবার মত, এবং সাফল্যজনকভাবে বেঁচে থাকার একটি সুন্দর পদ্ধতি যা আপনি কখনই প্রয়োগ করে দেখেননি।

আর যদি জীবনে তা প্রয়োগই করে না থাকেন তাহলে সারাজীবন এসব মৌলিক নীতিমালা শুধু শুধু জেনে কি লাভ! এমন অদক্ষতা ও অযোগ্যতার সাথে বেঁচে থাকা সত্যিই দুঃখজনক। কারণ একবার এক লোক যে নাকি সারাজীবন গরীবির মাঝে কাটিয়েছে যদি সহসা তার দরজার সিড়ির সামনে স্বর্ণ দেখা যায় তাহলে বুঝতে হবে তার জীবনের এমন শুরুটা বুদ্ধিদীপ্ত নয়। এই সহজ সরল দর্শনই হলো সুখি হবার পথ। মাত্র একটি সপ্তাহ আপনি এই নিয়ম নীতিটা অনুশীলন করুন যেমনটা মি. ম্যাটার্ন পরামর্শ দেন, আর যদি দেখেন যে এতে প্রকৃত সুখ আপনার জীবনে বয়ে আনলো না। তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার অসুখি কারণটা আসলে বহু গভীরে বিদ্যমান।

অবশ্যই সুখি হবার নিয়মাবলীকে শক্তি দেবার জন্য এবং প্রদেয় কাজ করতে দেবার জন্য মনের প্রাণবন্ত গুণাবলীর মাধ্যমে উচিত ওগুলোকে সহযোগিতা দেয়া। আপনি সম্ভবত শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক শক্তি বা আধ্যাত্মিক নীতিমালাকে কার্যকরী ফলাফল নিশ্চিত করতে পারেন না।

যখন কোন ব্যক্তি আভ্যন্তরীনভাবে কার্যকরী আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনার অভিজ্ঞতা লাভ করে তখন সুখি হবার ধারণাগুলো প্রাপ্তি অসাধারণভাবে তার কাছে সহজ হয়ে যায়। যদি আপনি আধ্যাত্মিক নীতিমালুগালোকে ব্যবহার করতে শুরু করেন কোন প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই, তথাপি আপনি ধীরে ধীরে আভ্যন্তরীনভাবে আধ্যাত্মিক শক্তি উপলব্ধি করতে পারবেন। আমি আপনাকে নিশ্চিত বলতে পারি যে, সুখের প্রচণ্ডতম আকস্মিক অনুভূতি আপনি এথেকে পাবেন, যা কোনদিন আপনি উপলব্ধি করেন নি। আর এই সুখানুভূতি আপনার সাথে সাথেই থাকবে, যতদিন আপনি সৃষ্টিকর্তাকে মনের কেন্দ্রে স্থাপন করে জীবন কাটাবেন।

যখন দেশের এদিক সেদিক ভ্রমণ করছিলাম তখন ক্রমবর্ধণশীল সত্যিকারের সুখি মানুষদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। এ বইতে লিখিত নীতিসমূহ এবং অন্যান্য বইতে যেসব উপস্থাপন করা হয়েছে অন্যান্য লিখায় যেগুলো প্রকাশ করা হয়েছে, কথায় কথায় ও অনেক প্রকাশ করা হয়েছে এবং অন্যান্য লেখক এবং বক্তারাও ঠিক একইভাবে আগ্রহী মানুষের কাজে তা প্রকাশ করেছেন। তাদের বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ এই শিক্ষনীয় বিষয়গুলো অনুশীলন করছেন। অবাক হবার মত বিষয় হল যে অভ্যন্তরীণভাবে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা দ্বারা কিভাবে মানুষ সুখি হবার জন্য মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে সব ধরনের মানুষই সব খানে আজ এই অভিজ্ঞতা লাভ করছে প্রকৃতপক্ষে, এবিষয়টি আমাদের সময়কার একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রিয় বিস্ময়কর ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। এবং এটা যদি ক্রমশ উন্নত হতে থাকে এবং এর যদি বিস্তার ঘটে, তাহলে যে ব্যক্তি এধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করবে না, সে সেকেলে হিসেবে বিবেচিত হবে এবং অনেক পেছনে পড়ে থাকবে। বর্তমান সময়ে আধ্যাত্মিকভাবে বেঁচে থাকাটা খুবই বুদ্ধিমানের কাজ।

সুখ তৈরির মত সারবস্তুর রূপান্তর সাধনের কাজে কেউ যদি অজ্ঞতা এবং অনীহা দেখায়, তাহলে বুঝতে হবে সে সেকেলের হয়ে থাকায় অভ্যস্ত। অথচ আকজাল প্রায় সর্বত্র অনেকেই সুখি হবার বিষয়টিকে উপভোগ করছেন।

সম্প্রতি কোন এক শহরে যখন আমার বক্তৃতা দেয়া শেষ হয়েছে, তখন একজন লম্বা চওড়া ও শক্ত সমর্থ লোক আমার কাছে আসেন। তিনি আমার কাঁধের উপর এমন জোরে চাপড় মারেন যে তাতে আমি প্রায় পড়েই গিয়েছিলাম। গম্ভীর গর্জন করে তিনি আমাকে বললেন, ডাক্তার সাহেব একটি দল সম্বন্ধে কিছু প্রকাশ করে দেয়াকে কেমন মনে হয় আপনার? মি. স্মিথের বাড়িতে আমাদের একটি বড় দল অবস্থান করছে, এবং আপনি সেখানে এলে আমাদের খুব ভালো লাগব। আনন্দ ঘন হৈ চৈ হতে যাচ্ছে এখানে এবং আমি মনে করি আপনার এখানে একটু ঢু মেরে দেখা উচিত।

এভাবে লোকটি আমাকে তরতাজা আমন্ত্রণ করলেন। বেশ, তবে স্পষ্টতই কিন্তু প্রচারকদের জন্য এ দলটির থেকে যে শব্দ আসছে তা যথাযথ মনে হয় না, এবং তাই আমি একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম যে, আমিও না আবার ওদের ভঙ্গিতেই খিচতে থাকি। তাই আমি ওজর আপত্তি জানাতে থাকলাম।"

'ওহ্ ছাড়ুন তো এসব।' “কোন চিন্তা নেই এটি আপনার মনের মতই একটি দল। আপনি দেখে অবাক হয়ে যাবেন; জলদি আসুন। আপনি আপনার জীবনকেই হয়ত অপছন্দ করবেন আমাদেরটা দেখে।"

তো আমি রাজী হয়ে গেলাম, এবং প্রফুল্লমনা ও তেজদীপ্ত বন্ধুটির সাথে সাথে গেলাম এবং তিনি অর্থাৎ যখনই আমি যাদের সাক্ষাতকার নিয়েছি তাদের মধ্যেই সবচেয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী একজন ব্যক্তি। শীঘ্রই আমরা একটি বড়সড় বাড়িতে এলাম। গাছ গাছালীর মধ্যে চওড়া বিস্তীর্ণ গাড়ির রাস্তা একবারে সম্মুখের দরজা পর্যন্ত চলে গেছে বাড়িটির। খোলা জানালা পথে ভেতর থেকে যে হৈচৈ এর শব্দ আসছিল। তারমধ্যে থেকে কোন প্রশ্ন কানে এলো না। তাই ধরে নেয়া যায় যে সম্পূর্ণ দলটি বেশ উন্নতি পথে এগুচ্ছিল এবং আমি বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম এ ভেবে যে, আমি কিসের ভেতর ঢুকতে যাচ্ছিলাম। আমার নিমন্ত্রণদাতা লোকটি বেশ সারা শব্দ কারেই আমাকে ঘরের ভেতর নিয়ে এলেন, এবং আমরা বেশ কিছুক্ষণ করমর্দন করতে করতেই কাটিয়ে দিলাম এবং তিনি আমাকে বিরাট এক আনন্দে উচ্চসিত দলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, এরা ছিলেন আনন্দে উল্লাসিত বিরাট এক জনতা।

মদের দোকান দেখার আশায় চারিদিকে তাকালাম। কিন্তু তার একটিও চোখে পড়ল না। যা যা ওখানে খেতে দেয়া হয়েছিল তা হলো কফি, ফলের রস দ্রাক্ষারস, স্যান্ডুইচ, এবং আইসক্রীম, কিন্তু তার পরিমাণ ছিল অনেক। আমার বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললাম, 'যে এরা এখানে এসে পৌঁছার আগে নিশ্চয়ই কোথাও থেমেছিলেন।'

মনে হলো বন্ধু লোকটি কিছুটা ধাক্কা খেলেন এবং বললেন, কোথাও থেমেছিলেন মানে? কেন আপনি বুঝতে পারছেন না, এই লোকগুলো তাদের সঠিক জীবনীশক্তি পেয়েছে, কিন্তু তেমন জীবনীশক্তি নয় যেমনটা আপনি ভাবছেন। আপনার কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি আপনি কি বুঝতে পারছেন না যে কি কারণে এই লোকগুলো এত খুশি? তারা তাদের আধ্যাত্মিকতা নবায়ন করেছে। তারা একটা কিছু পেয়েছে নিজেদের মধ্যে যে বন্দীত্বদশা তাদের ছিল তা থেকে তারা মুক্ত হয়েছে। সত্যিকারভাবে বাঁচার জন্য তারা যা খুঁজে পেয়েছে সে হলো বিধাতা। তিনি অপরিহার্য এবং সাধুতাই সৎগুণ এই প্রকৃত সত্তার উপলব্ধি “হ্যাঁ, ওরা সঠিক জীবনীশক্তি পেয়েছে। কিন্তু তা সেরকম নয় যেমনটা আপনি একটি বোতল থেকে বের করতে পারেন তারা তাদের হৃদয়ে এ শক্তি ফিরে পেয়েছে।"

তরপর আমি দেখতে পেলাম যে, তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন। এই যে জনতা তাদের চেহারায় কোন দুঃখের ছাপ ছিল না। ছিল না কোনরকম নীরসভাব। এরা সবাই ছিলেন শহরের নেতৃবৃন্দ-কেউ ব্যবসায়ী কেউ আইনজ্ঞ কেউ ডাক্তার কেউ শিক্ষক, সামাজিক লোক এবং আরো অনেকেই ছিলেন সাধারণ গ্রাম্য জনতা, এবং এই আনন্দ সমাগমে তারা অসাধারণ সময় উপভোগ করছিলেন। কথা বলছিলেন বিধাতাকে নিয়ে, এবং এসবই তারা করছিলেন খুবই সাভাবিকভাবে যা কল্পনীয়। একজন আর একজনকে জানাচ্ছিলেন যে, তাদের জীবনে পুনরুজ্জীবিত আধ্যাত্মিক শক্তির মধ্য দিয়ে কেমন পরিবর্তন ঘটেছে।

এরমধ্যে যাদের সরল সোজা ধারণা আছে তাদের প্রতি আপনি হাসতেও পারেন না কিম্বা খুশিও হতে পারেন না। যখন আপনি একজন ধর্মপরায়ন ব্যক্তি হিসাবে অমন একটি আনন্দঘন সমাগমে যান।

এরপর বেশ চাঙ্গা মনে আমি ঐআনন্দ ঘন সমাগম থেকে বের হয়ে এলাম। মনে মনে বাইবেলের একটি বাণী আনাগোনা করছে, তা হলো তারই মাঝে ছিল জীবন এবং সে জীবন ছিল মানুষের জন্য জ্যোতি স্বরূপ (যোহন 1.4)।" এই সেই জ্যোতি যা আমি ঐ সুখি মানুষগুলোর মুখের উপর উদ্ভাসিত হয়ে থাকতে দেখলাম। অন্তরের উজ্জল আলো তাদের মুখের উপর প্রতিফলিত হতে দেখলাম এবং তা এসেছিল তাদের হর্ষোৎফুল্ল আধ্যাত্মিক কিছু একটা থেকে। যা তাদের মধ্যে তারা গ্রহণ করেছিলেন। জীবন অর্থ হলো জীবনীশক্তি, এবং ঐ লোকগুলো তাদের জীবনীশক্তি পাচ্ছিলেন বিধাতার কাছ থেকে। তারা সেই শক্তি খুঁজে পেয়েছেন যা, তা তাদের সুখ তৈরি করে দেয়।

এতো বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে সাহস করছি যে আপনার সম্প্রদায়ে, আপনি যদি ঐ ধরনের মানুষ খুঁজে পেতে চারিদিকে তাকান, তাহলে ঠিক উপরে বর্ণিত লোকগুলোর মত লোক আপনি অনেক দেখতে পাবেন। আপনি আপনার নিজস্ব শহরে যদি অমন লোক খুঁজে না পান তা হলে নিউইয়র্ক শহরের মার্বেল কলেজিয়েট গীর্জায় চলে আসুন এবং সেখানে তাদের অনেককেই আপনি দেখতে পাবেন। কিন্তু এই বইটি পড়লেও ঐ লোকগুলোর মত আপনিও একই রকম জীবনীশক্তি পাবেন যদি আগে সাধারণ এই নিয়মনীতিগুলো অনুশীলন করে নেন।

আপনি যখন পড়েন তখন বিশ্বাস করেন যে আপনি কি পড়ছেন কারণ তা সত্যি। তারপর এ বইটিতে যে বাস্তব পরামর্শ দেয়া হয়েছে তার উপর কাজ শুরু করুন এবং দেখবেন আপনিও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করছেন এবং তা থেকেই এমন গুণসম্পন্ন সুখ উৎসারিত হচ্ছে। আমি জানি তা হবে। কারণ এমন অনেককেই আমি নির্দেশ দিয়েছি, এবং আগামী অধ্যায়গুলোতে আমি আরো নির্দেশ করব। যারা একইভাবে তাদের অত্যাবশ্যক এবং সুন্দর জীবন খুঁজে পেরেছেন। তারপর অন্তরে পরিবর্তিত হয়ে আপনি নিজের মধ্যে সুখ তৈরি করতে থাকিবেন, সুখহীনতা নয়। আর সেই সুখ হবে এমনই সুখ, এমনই গুণসম্পন্ন এবং চিরিত্রের যে তা দেখে আপনি বিস্ময়াভূত হয়ে যাবেন যে আপনি কি সবার সাথে একই জগতে বাস করছেন কিনা। সত্যি বলতে কি, তা কিন্তু একই জগতের অংশ নয় কারণ আপনিও অন্যদের মত একই রকম নন এবং আপনি যা যা নির্ধারণ করবেন যে, যে জগতে আপনি বাস করছেন এবং আপনি যেমনটি পরিবর্তিত হচ্ছেন আপনার জগৎটি ঠিক তেমনি পরিবর্তিত হচ্ছে।

যদি সুখের বিষয়টি আমাদের চিন্তার মাধ্যমে স্থিরকৃত হয় তাহলে যেসব চিন্তা ভাবনা হতাশা এবং উৎসাহহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেসব মন থেকে হটিয়ে দেয়া আবশ্যক। একাজটি প্রথমেই করা সম্ভব, যদি শুধু স্থির করি যে এটা করব। দ্বিতীয়ত সহজ একটি কৌশল কাজে লগিয়েও এটা করা সম্ভব যা আমি একজন ব্যবসায়ী লোককে পরামর্শ দিয়েছিলাম।

একদিন এক মধ্যাহ্নভোজে লোকটির সাথে আমার দেখা হয়েছিল এবং এমন বিষণ্ণতা থেকে তিনি মুক্ত হয়েছিলেন যে, তেমন ঘটনা প্রায় শোনা যায় না। তার কথাবার্তা ছিল অত্যধিক হতাশাব্যঞ্জক এবং তা আমাকে খুবই পীড়া দিয়েছিল। ব্যাপারটাকে তার দুঃখবাদ হিসাবে গণ্য করা যায়। তাকে কথা বলতে শুনলে আপনার মনে হবে তার জীবনের সবকিছুই ছিল ধ্বংসের জন্য। নিঃসন্দেহে লোকটি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার জীবনে জমে উঠা সমস্যাগুলো তার মনকে অভিভূত করে ফেলেছিল। এমন একটি জগৎ থেকে তার মন মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছিল নিজেকে একটি নিরাপদ অবস্থানে আশ্রয় পেতে চেয়েছিলেন। কারণ এই দুঃসহ অবস্থা তার শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছিল। তার এই কষ্টের প্রধানতম কারণ ছিল তার হতাশাজনক চিন্তার ধরণ। তিনি চেয়েছিলেন তার মধ্যে আলো এবং বিশ্বাসের সমন্বিত অনুপ্রবেশ। সুতরাং কিছুটা সাহসের সাথেই আমি বলব, “যদি আপনি ভালো অনুভব করতে চান এবং নিঃস্ব ভাবটির ইতি টানতে চান, তার জন্য আমি আপনাকে এমন কিছু দিতে পারি যাতে আপনার সুন্দর একটি ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে।" একটুই নাসিকা ধ্বনি করে লোকটি বললেন, “কি করতে পারেন আপনি? আপনি কি অলৌকিক কাজ করতে পারেন?"

আমি বললাম, 'না' "কিন্তু আমি আপনাকে অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারে তার সংস্পর্শে রাখতে পারি, যিনি আপনার দুঃখ কষ্টগুলো আপনার মধ্য থেকে নিস্কাশিত করতে পারবেন এবং একটি সহজ সুন্দর ঢালু পথ আপনার জীবনে এনে দিতে পারবেন, আমি এটাই বুঝাতে চাইছি।” এটুকু বলে আমি শেষ করলাম।

দৃশ্যত তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন কারণ, পরবর্তীতে তিনি আমার সংস্পর্শে এসেছেন এবং 'thought conditioners' নামে একটি বই তাকে আমি দিয়েছিলাম। এর মধ্যে চল্লিশটি স্বাস্থ্য এবং সুখ গড়ার মত চিন্তন রয়েছে। যেহেতু এটি একটি পকেট সাইজ পুস্তিকা তাই আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছি যেন তিনি এটা সহজ মন্ত্রণার প্রয়োজনে বহন করেন এবং এ জাতীয় একটি চিন্তন বা ধ্যান যেন তিনি আপন মনে গেঁথে। তাই নিয়ে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ধ্যান চালিয়ে যান। আমি তাকে আরো পরামর্শ দিলাম যেন তিনি বিষয় মুখস্ত করে ফেলেন, এভাবে তার চেতনার মধ্যে মিলে যাবে, এবং তিনি মনশ্চক্ষুতে দেখতে পাবেন যে এই স্বাস্থ্যহিতকর ধ্যান একটি শান্তিদায়ী এবং আরোগ্যকর প্রভাব তার মনের মধ্যে ফেলছে। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম যে, যদি তিনি এই পরিকল্পনা অনুসরণ করে চলেন তা হলে এসব স্বাস্থ্যপ্রদ ধ্যান তার মনে পুঞ্জিভূত। এসব অসুস্থ চিন্তাগুলো মন থেকে হটিয়ে দেবে যেগুলো তার আনন্দ শক্তি এবং সৃজনশীল সমর্থকে গোপনে গোপনে ধবংস করে দিচ্ছিল।

এসব ধারণা প্রথম প্রথম তাকে কিছুটা অদ্ভূতভাবে অনুপ্রাণিত করছিল এবং এতে তার সন্দেহ ছিল, কিন্তু শেষ অবধি তিনি তা অনুসরণ করেছিলেন। প্রায় তিনি সপ্তাহ পর তিনি আমাকে টেলিফোনে ডাকলেন এবং চিৎকার করে বললেন, “বালক, এটা অবশ্যই কাজ করছে! এটা অদ্ভূত, বিস্ময়কর। আমি এতে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি, এবং আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে এটা সম্ভব!” তিনি পরম উৎসাহে এর অনুশীলন চালিয়ে যান এবং এখন তিনি সত্যিকার অর্থে একজন সুখি মানুষ। এই যে একটি সুখকর ফলাফল তিনি পেলেন। তার কারণ হলো, তার নিজের সুখ নিজে তৈরির ব্যাপারে তিনি তার শক্তি প্রয়োগে খুব দক্ষতা দেখিয়েছেন। পরে তিনি মন্তব্য করে বলেছেন যে, তার প্রথম মানসিক অতিক্রম ছিল সৎভাবে ঘটনাবলীর মুখোমুখি হওয়া; ঠিক যখন দুঃখ কাতরতা তাকে নিঃস্ব পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এখনও যখন তিনি বাসায় থাকতেন, সময়টা কাটত তার আত্মকষ্টে এর আত্মনিগ্রহ মূলক চিন্তায়। উনি জানতেন যে এসব পীড়াদায়ক চিন্তাগুলোই তার কষ্টের কারণ ছিল, কিন্তু যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিবর্তনের প্রয়োজন তার ছিল এবং যা তিনি প্রয়োজন মনে করেছিলেন তা করতে তিনি সংকুচিত হয়ে পড়তেন। কিন্তু যখন নির্দেশ মোতাবেক একটি প্রথাগত আধ্যাত্মিক চিন্তন মনের ভেতর প্রবেশ করালেন তখন প্রথমেই তিনি যা চাইলেন তাহলো একটি নতুন জীবন, তারপর তিনি অনুধাবন করলেন মনোমুগ্ধকর ঘটনা। যা তিনি পেতে পারতেন, তারপর আরো অভিভূতকর ঘটনা। যেগুলো তিনি পাচ্ছিলেন এর ফলাফল দাঁড়ালো এমন যে, তিন সপ্তাহের কিছু অধিক সময়ে আত্মোন্নতির পদ্ধতি প্রয়োগ করে তার জীবনে নতুন সুখস্বাচ্ছন্দ উপচে পড়তে লাগল।

সারা দুনিয়াব্যাপী প্রায় সর্বত্র আজ দলে দলে মানুষ নতুন সুখের সন্ধান পেয়েছেন। যদি প্রতিটি ছোটবড় গ্রামে ও শহরে ঠিক ঐ ধরনের একটি সংঘও থাকে তাহলে আমরাও আমাদের এই দেশটি জীবনের সুন্দর একটি গন্তব্যে আনতে সক্ষম হব এবং তা পারব খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে। কেমন হবে এসংঘ? আসুন আমি এর একটি ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

পশ্চিমের একটি শহরে একবার বক্তব্য দিচ্ছিলাম্ সেখান থেকে হোটেল কক্ষে পৌঁছতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। একটু ঘুমিয়ে নেবার ইচ্ছে ছিল আমার। কারণ হলো প্লেন ধরার জন্য পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাকে ঘুম থেকে উঠতে হবে। যখন বিছানায় যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক তখন টেলিফোনটা বেজে উঠল। অপরপ্রান্ত থেকে এক মহিলা কথা বললেন "আমরা প্রায় পঞ্চাশ জন আমার বাড়িতে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।"

আমি তাকে ব্যাখ্যা দিয়ে বললাম যে, আমি তো আসতে পারব না; কারণ কাল ভোরে আমাকে প্লেন ধরতে হবে।

"ওহ! মহিলা বললেন, দুজন লোক আপনাকে আনবার জন্য এতক্ষণ পথে রওয়ানা হয়েছেন। আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করছি, এবং আমরা সবাই চাই যে এ শহর ছেড়ে যাবার আগে আপনি আমাদের মাঝে আসুন এবং আমাদের সাথে প্রার্থনা করুন!"

আমি খুশি হয়েছিলাম এবং সেখানে গিয়েছিলাম যদিও ঐ রাত্রে আমার খুব কম ঘুম হয়েছিল।

যে লোক দুটো আমার জন্য এসেছিলেন তারা দুজনেই ছিলেন মদ্যপ এবং তারা বিশ্বাসের শক্তিতে সুস্থ হয়েছিল। তারা পরবর্তীতে খুবই সুখি হয়েছিলেন, সবার কাছে এমন প্রীতিভাজন হয়েছিলেন যে, আপনারা তা কল্পনাও করতে পারবেন না।

যে বাড়িতে তারা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সে বাড়িটি সম্পূর্ণ ভরে গিয়েছিল। আগত লোকজন সিড়ি পথে, টেবিলগুলোর উপর এবং মেঝে পর্যন্ত বসেছিলেন। এমন কি একজন লোক বড় পিয়ানোটার উপরে বসেছিলেন, এবং তারা কি করছিলেন? তারা সবাই মিলে একটি প্রার্থনা সভা পরিচালনা করছিলেন। তারা আমাকে বললেন যে, এমন ষাটটি প্রার্থনা সংঘ এই শহরে সারাক্ষণ প্রার্থনা পরিচালনা করে চলেছেন। এমন একটি সভায় থাকার সৌভাগ্য আমার এর আগে কখনও হয়নি। এটা স্থূলবুদ্ধি বিশিষ্ট একটি সংঘ ব্যতীত কিছু ছিল না। তারা ছিলেন মুক্ত, সুখি জনতা এবং সত্যিকারের মানুষ। পরম বিস্ময়ে সারাকক্ষ ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি। ঐ কক্ষটিতে উপস্থিত সবার জীবনীশক্তি ছিল বিস্ময়কর এবং তা ক্রমান্বয়ে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দলটি সশব্দে গান গাইতে শুরু করল, আমি কখনও এমনভাবে গান গাইতে শুনিনি। পুরো কক্ষটি অদ্ভুত প্রাণবন্ত হাসিতে ভরে গিয়েছিল।

তারপর একজন মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। আমি দেখলাম তিনি তার পায়ে ঠেকা দিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “ওরা বলেছিল যে আমি আর কোনদিন হাঁটতে পারব না। আপনি কি দেখতে চান যে আমি হাঁটতে পারি কিনা?" তিনি কক্ষটির একদিক থেকে আরেকদিক হেঁটে দেখালেন কখন করে এটা সম্ভব হল? আমি জানতে চাইলাম দ্বিধাহীন জবাব, 'যীশুখ্রিস্ট'।

তারপর আর একজন সুদর্শনা যুবতী বললেন, "আপনি কখনও ঘুমের ঔষধ সেবনকারী আত্মঘাতউম্মুখ কোন Victim কে দেখেছেনও? আমিই তেমন একজন এবং আমি এখন সুস্থ।” ওখানে বসে ছিল মেয়েটি, সুন্দর একটি মেয়ে, বিনীত স্বভাবা আকর্ষণীয়া এক যুবতী, এবং সেও বলল, "যীশুখ্রিস্ট আমাকে সুস্থ করেছে।"

তারপর এক যুগল সবেগে সামনে এলেন যে, তার আবার পূণর্মিলিত হয়েছে এবং আগের তুলনায় এখন অনেক সুখি। জিজ্ঞেস করলাম এটা কিভাবে ঘটল? জবাবে তারা বলল, যীশুখ্রিস্ট ঘটিয়েছেন।'

আর এক লোক বললেন, যে তিনি এ্যালকোহল Victim, এবং তিনি তার পরিবারকে এমন একজায়গায় টেনে নামিয়েছেন যে তারা শেষ পর্যন্ত দারিদ্রসীমার নীচে এক অতি কষ্টকর জীবন যাপন করছিলেন এবং তিনি একেবারেই ব্যর্থ একজন লোক ছিলেন, এবং এখন আমার সামনে এসে যখন দাঁড়িয়েছেন একেবারে শক্ত সামর্থ স্বাস্থ্যবান এক ব্যক্তি। আমি জানতে চাইলাম কেমন করে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন? মাথা হেট করে বললেন, 'যীশুখ্রিস্ট সাহায্য করেছেন।'

তারপর আবার সজোরে আর একটি গান ধরলেন, তখন একজন বাতিগুলো নিবু নিবু করে দিলেন এবং সবাই হাত ধরাধরি করে চক্রাকারে দাঁড়ালেন তখন আমার এমন অদ্ভুত এক অনুভূতি হল যে মনে হলো যেন আমি কোন বৈদ্যুতিক তার ধরেছিলাম। সারা কক্ষ জুড়ে এক বিশেষ শক্তি অবস্থান করছিল। নিঃসন্দেহে ঐ দলটির মধ্যে আমিই ছিলাম সর্বাপেক্ষা আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি। ঐ মুহূর্তে আমার এটাই মনে হয়েছিল যে, ঐ বাড়িটিতে তখন স্বয়ং যীশুখ্রিস্ট উপস্থিত ছিলেন এবং ঐ লোকগুলো তাকে দেখতে পেয়েছিলেন। তারা খ্রিস্টের শক্তির ছোঁয়া অনুভব করেছিলেন। তিনি তাদেরকে নতুন জীবন দান করেছিলেন। এই জীবন যেন অদম্য আনন্দে উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল।

এটাই হলো সুখি হবার গোপন রহস্য। বাকি সব দ্বিতীয় পর্যায়ের। এই অভিজ্ঞতা লাভ করে দেখুন এবং দেখবেন একেবারে খাঁটি নিখাদ আনন্দ আপনি পেয়ে গেছেন, একেবারে সবার সেরা যা জগতে আশা করা যায়। এটা অবশ্যই ভুল করবেন না, জীবনে যা কিছু করুন না কেন এটাই হলো সুখ্যতম। যার যার ধর্ম মতে এটা অনুকরণ ও অনুশীলন করা যেতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00