📄 পরিবেশ সামলাতে শিখুন, প্রথম শ্রেণির মানুষ হয়ে উঠুন
মনটা এক অদ্ভুত মেশিন। শরীর যেমন আমাদের খাবার-দাবারের প্রতিফলন, মন পরিবেশের প্রভাবের প্রতিফলন। পরিবেশ আমাদের গড়ে তোলে, আমাদের ভাবনা চিন্তাকে প্রভাবিত করে। উচ্চাভিলাষী মানুষের সঙ্গে থেকে আমরাও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠি। প্রগতিশীল মানুষের সংস্পর্শে থাকুন।
নিজেকে সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করার উপায়:
১। যারা বলে কাজটা অসম্ভব, তারা প্রায় অনিবার্যভাবে অফল মানুষ। তাদের থেকে দূরে থাকুন। মহৎ ব্যক্তি বড় বিশাল ভাবনা চিন্তাকে কখনই হেসে উড়িয়ে দেয় না।
২। সঠিক পরামর্শের উৎস সম্বন্ধে সজাগ থাকুন। সফল মানুষের পরামর্শ নিন। প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকলে সেই বিষয়টির বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকেই প্রশ্ন করুন।
৩। আপনার সামাজিক পরিবেশ 'প্রথম শ্রেণি'র করে তুলুন। নতুন নতুন মানুষের সাথে মেলামেশা করুন। ভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। এতে আপনার চিন্তার পরিধি বাড়বে।
৪। মনকে বিষিয়ে যেতে দেবেন না। পরনিন্দা বা পরচর্চাকে প্রশ্রয় দেবেন না। পরচর্চা মানেই অন্যের বিষয়ে নিন্দা করা যা আপনার ব্যক্তিত্বকে ছোট করে দেয়। অন্যের ব্যাপারে আলোচনা করুন, তবে তা যেন ইতিবাচক হয়।
৫। সব কাজে প্রথম শ্রেণিতে থাকবেন। প্রথম শ্রেণির জিনিসে আসলে সাশ্রয়ই হয়। সস্তার তিন অবস্থার চেয়ে একটি ভালো জিনিস ব্যবহার করা বা ভালো সেবার সান্নিধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়।
পরিবেশ যেন আপনার স্বপক্ষে কাজ করে। সফল মানুষের পরামর্শ নিন, মনকে প্রগতিশীল রাখুন এবং সবসময় প্রথম শ্রেণির মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলুন।
টিকাঃ
১. 'সস্তার তিন অবস্থা' একটি প্রচলিত বাংলা প্রবাদ যার অর্থ সস্তা জিনিসের স্থায়িত্ব কম হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।
📄 আপনার দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের সঙ্গী করে নিন
আপনি কী অন্যের মনের কথা বুঝতে পারেন? অপরের মনের কথা বোঝা কিন্তু খুব সহজ ব্যাপার। হয়তো আপনি এভাবে কথাটা ভেবে দেখেননি, অথচ আপনি কিন্তু প্রতিদিন অন্যের মনের কথা পড়ার চেষ্টা করছেন, অন্যরাও আপনার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করছে।
কী করে এমন হয়? দৃষ্টিভঙ্গি বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমনটি হয়। কয়েক বছর আগে বিং ক্রসবীর গাওয়া জনপ্রিয় গান 'ইউ ডোন্ট নীড টু নো দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ টু সে ইউ আর ইন লাভ' মনে আছে কী? ঐ সহজ সরল গানের ভাষায় লুকিয়ে রয়েছে মনোস্তত্ত্বের গূঢ় কথা। ভালোবাসার কোনো ভাষা নেই। যে কখনো ভালোবেসেছে সেই জানে এ কথা।
একই রকমভাবে 'তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে' বা 'আমি তোমাকে মোটেই পছন্দ করি না' কিংবা 'আমার মনে হয় আপনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি' বা 'তাচ্ছিল্যের পাত্র' কিংবা 'তোমার নিজের কাজটা বেশ পছন্দ' বা 'আমি বিরক্ত' বা 'আমি ক্ষুধার্ত' বোঝাতে ভাষা জানা বা ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না। এর জন্য কোনো শব্দেরই দরকার হয় না।
আমাদের ভাবনা চিন্তা আমাদের কাজে, ভঙ্গিতে স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে। দৃষ্টিভঙ্গি বা আচরণ ভঙ্গি মনের আয়না। এতে ভাবনা চিন্তার প্রতিফলন লক্ষণীয়। ডেস্কে বসা ভদ্রলোকের দিকে তাকালে তার মনের ভাবটা বুঝতে পারবেন। তার ভঙ্গি ও আচরণ দেখে কাজের প্রতি মনোভাব বোঝা যায়। সেলসম্যান, ছাত্র, স্বামী-স্ত্রী, সবার মনোভাব বোঝা সম্ভব।
ভঙ্গি যে শুধু চোখে দেখা যায় তাই নয়, শোনাও যায়। যখন কোনো সেক্রেটারি 'সুপ্রভাত, মি. সুমেকারের অফিস থেকে বলছি,' কথাগুলি বলে তখন শুধু যে ঐ অফিসের পরিচয় জানায় তাই নয়, সে বলে, 'আমি আপনার সঙ্গে কথা বলে আনন্দিত, আমার আপনাকে ভালো লেগেছে, আপনি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, আমি নিজের কাজকে ভালোবাসি।' অথচ আরেকজন সেক্রেটারি ঐ একই কথা বলে অথচ মনে হয় 'দূর ছাই, জ্বালিয়ে মারল! ফোন কেন করেছেন? আমার কাজটা বড় বিরক্তিকর আর আপনারা আরো বিরক্ত করেন।'
মুখভঙ্গি, গলার আওয়াজ ও সুর শুনে মনের ভাবটা সহজেই বোঝা যায়। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সঠিক মনোভাব থাকলে আমাদের ক্ষমতা সর্বাধিক ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে, সুফল অবশ্যম্ভাবী হয়।
এই তিন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব বিকশিত করুন:
১। 'সক্রিয়' মনোভাব রাখুন।
২। 'আপনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি' মনোভাব পোষণ করুন।
৩। 'কাজ সবার আগে' মনোভাব পোষণ করুন।
অন্যদের কাজে উদ্দীপ্ত উৎসুক করে তোলার আগে নিজে উৎসাহিত হয়ে উঠুন। ইতিহাস থেকে আমরা শিখি—ছাত্রদের উৎসাহের অভাবের আসল কারণ প্রফেসরের নিজের উদ্দীপনার অভাব। যার নিজের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনার অভাব, সে কিছুতেই অন্যদের মনে উৎসাহ জাগাতে পারবে না। উৎসাহ বৃদ্ধি করার উপায় হলো—গভীরভাবে অধ্যয়ন করে দেখুন। যে বিষয়টিতে আপনার কোনো আগ্রহ নেই সেই বিষয়টিতে উৎসাহিত হয়ে ওঠার জন্য বিষয়টি নিয়ে অধ্যয়ন করুন। গভীরভাবে দেখলে আপনার উৎসাহ উদ্দীপনা বাড়বে।
সব কাজেই চাই আগ্রহ ও উদ্দীপনা। হাত মেলানোর সময় সোৎসাহে এগিয়ে আসুন, জোরে হাত মেলান। আপনার হাসিটাকে জীবন্ত করে তুলুন। 'আপনি-গুরুত্বপূর্ণ' মনোভাব বিকশিত করুন। প্রতিটি মানুষ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে চায়। কোনো মানুষকে গুরুত্ব দিলে সে আপনার জন্য আরো তৎপর হয়ে কাজ করবে। অন্যদের গুরুত্বপূর্ণ অনুভব করায় সাহায্য করে আপনিই লাভবান হবেন, নিজের গুরুত্বটা উপলব্ধি করবেন।
অন্যদের গুরুত্ব দেওয়ার তিনটি উপায়:
১। অন্যের প্রশংসা করতে শিখুন।
২। লোকদের নাম উল্লেখ করে ডাকার অভ্যাস করুন।
৩। সব প্রশংসা নিজে নিয়ে নেবেন না, বাকিদের তাতে অংশ দিন।
কাজে প্রাধান্য দিন, অর্থ আপনাকে অনুসরণ করতে বাধ্য। কোম্পানি বেতন বাড়ালে তবেই ভালো কাজ করব—এভাবে ভাবা ভুল। আরো ভালো করে দেখাতে পারলে তবেই বেতন বাড়বে। কাজ ও সেবার বীজ বপন করলে তবেই ফল পাওয়া যাবে।
📄 মানুষের প্রতি সঠিক মনোভাব বজায় রাখুন
সাফল্যের একটা মূল নীতি হলো—অন্যের সাহায্যেই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। আপনার বর্তমান অবস্থা ও আপনি ভবিষ্যতে যা হয়ে উঠতে চান তার মধ্যে একমাত্র বাধা হলো অন্যের সমর্থন। আজ মানুষ স্বেচ্ছায় আপনাকে সমর্থন করবে, না হলে করবে না।
মানুষের প্রতি সঠিক মনোভাব রাখলে তারা আপনাকে পছন্দ করবে ও সমর্থন করবে। বন্ধুত্ব কেনা যায় না, তা অর্জন করতে হয়। বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য প্রথম পদক্ষেপটি নিজেকেই নিতে হবে।
নতুন বন্ধুত্ব পাতানোর ছয়টি উপায়:
১। সুযোগ পেলেই নতুন লোকের সঙ্গে আলাপ করুন।
২। লক্ষ রাখবেন অন্যজন যেন আপনার নামটা স্পষ্ট বুঝতে পারে।
৩। অন্যজনের নামটা গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখুন।
৪। নাম এবং ঠিকানা প্রয়োজনমতো লিখে নিন।
৫। নতুন পরিচিতদের সাথে পরে যোগাযোগ করুন (নোট বা ফোন মারফত)।
৬। অচেনা মানুষকেও ভালো কথা বলুন।
মনে রাখবেন পৃথিবীতে কেউ নিখুঁত বা নির্ভুল নয়। অন্যজন আপনার চেয়ে আলাদা বা ভিন্ন হতেই পারে। নিজেকে সবসময় সবজান্তা প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। আপনার মনটা হলো একটি মানসিক বেতার কেন্দ্র। অন্য মানুষের কথা ভাবার সময় সবসময় চ্যানেল 'প' (পজিটিভ) সক্রিয় রাখুন। যদি কারো বিষয়ে মনে বিরূপ ধারণা আসে, সাথে সাথে চ্যানেল বদলে তার ভালো দিকটির কথা চিন্তা করুন।
পরচর্চা বা পরনিন্দা হলো মনের বিষ। এটি আপনার চিন্তাধারাকে সংকীর্ণ করে দেয়। অন্যকে ছোট করে বা অন্যের নিন্দা করে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করা যায় না। মানুষের প্রতি সঠিক মনোভাব রাখা এবং সব কাজে প্রথম শ্রেণিতে থাকা আপনাকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যাবে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলেও অন্যের প্রতি সঠিক মনোভাব হারাবেন না।
📄 সক্রিয়তা অনুশীলন করুন
সেরা ধ্যানধারণাই সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়, যদি না তা কাজে প্রয়োগ করা হয়। যে ধারণাটি কাজে প্রয়োগ করা হয়েছে তা অন্য যেকোনো অলস ধারণার চেয়ে শতগুণ ভালো। সফল মানুষেরা সবসময় সক্রিয় বা কর্মতৎপর হন, তারা কাজ করায় বিশ্বাসী। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ তাদের কাজ ক্রমাগত পিছিয়ে দেয়।
সক্রিয় হওয়ার জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতির দোহাই দেবেন না। কোনো কিছুই ১০০ শতাংশ নিখুঁত হয় না। কাজ করার মাধ্যমেই ভয় দূর হয়। যে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন তা শুরু করে দিলেই দেখবেন ভয় উবে গিয়েছে।
কাজ শুরু করলে অনুপ্রেরণা আপনিই আসে। অনেক সময় প্রেরণার জন্য প্রতীক্ষায় বসে না থেকে 'যান্ত্রিক উপায়ে' কাজ শুরু করা উচিত। মনোসংযোগের জন্য কাগজ-কলম ব্যবহার করুন। পেন্সিল দিয়ে কাগজে কিছু লিখতে থাকলে বা নকশা আঁকতে থাকলে মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঐ কাজে কেন্দ্রীভূত হয়।
'এখনই শুরু করব'—এই মানসিকতা গড়ে তুলুন। 'আগামীকাল', 'পরে' বা 'আরেকটু ভালো সময় এলে'—এগুলো ব্যর্থতার লক্ষণ। প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া বা উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতা আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলবে। আপনার কাজের ক্ষেত্রে বা সমাজে যদি কোনো উন্নতির প্রয়োজন দেখেন, তবে নিজেই তা শুরু করুন। জেহাদ ঘোষণা করুন উন্নতির পক্ষে এবং স্বেচ্ছায় কাজে এগিয়ে আসুন। যারা সক্রিয় ও তৎপর, বাকিরা তাদেরই অনুসরণ করে।