📄 আহার ও পরিচ্ছন্নতা
মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো— সন্তানদের আহারাদির ব্যবস্থা করা। শিশুর শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতা, মানসিক প্রফুল্লতা-নিরানন্দতা, আত্মিক সজীবতা-নির্জীবতা প্রভৃতির সিংহভাগই নির্ভর করে সন্তানের খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
বস্তুত প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্রময় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সপ্তাহ ঘুরে মাস পেরোলেই তাদের খাবারে আনতে হয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
তবে শিশুর জন্য সবচাইতে পুষ্টিকর খাদ্য হলো দুধ। একটি সুস্থ দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য উপাদানই দুধের মাঝে রয়েছে। তাই শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। কারণ মায়ের দুধে এমন কিছু উপাদান আছে, যা শিশুর হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে। এজন্যই মায়ের দুগ্ধপানে শিশুর কোনো প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। এছাড়া মায়ের দুধকে ফুটিয়ে কিংবা পাস্তুরিত করে অথবা ভিন্ন কোনো উপায়ে পরিশোধিত করার অতিরিক্ত কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। আর খাঁটি মানের নিশ্চয়তা একমাত্র মায়ের দুধেই মেলে। তাই বলা যায়, শিশুর জন্য মায়ের দুধের মতো স্বাস্থ্যসম্মত ও আদর্শ খাদ্য আর কিছুই হতে পারে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সাবেক প্রধান পরিচালক ডাক্তার এ. এইচ. তাবা বলেছিলেন— 'যে বিষয়টি শিশুকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নিপতিত করে, তা হলো মায়ের দুধপান থেকে বঞ্চিত হওয়া। এই মাতৃদুগ্ধই নবজাতকের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে।'
তবে মাতৃদুগ্ধ তখনই পুষ্টিকর হবে, যখন মায়ের খাদ্যের মান সুষম ও পুষ্টিকর হবে। তিনি যত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করবেন, তার দুধও ততো পুষ্টিকর হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যে মায়েরা অসচেতন, তারা বাচ্চাদের দুগ্ধ পান করাতে গেলে স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগবেন। তাদের বুকের দুধ খেয়ে বাচ্চারাও অপুষ্টিতে ভুগবে। তাই প্রতিটি বাবার উচিত, নিজ সন্তানের মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যত্নবান হওয়া। তাদেরকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দেওয়া। কারণ পুষ্টিহীনতা অতিমাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তা থেকেই নাম না জানা বহু দুরারোগ্য ব্যাধি জন্ম নেয়। তাই স্তন্যদানকারিণী প্রত্যেক মাকে নিজ খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে যত্নশীল হওয়া চাই। দুগ্ধজাত খাদ্য থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, শাক-সবজি, ফলমূল পর্যন্ত প্রতিটি উপাদানই তার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা চাই।
এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় জানা থাকা চাই— মাতৃদুগ্ধ সন্তানের মানবিক গুণাবলির ওপর প্রভাব ফেলে। এজন্যই দাইমা নিয়োগের প্রয়োজন হলে নিয়োগকালে একটু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত। কারণ মায়ের দুধের প্রভাব সন্তানের দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায়।
আর সন্তানকে দুধ পান করানোর নিয়ম হলো— রুটিনমাফিক নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে দিয়ে দুধ পান করানো। এতে করে বাচ্চা নিয়মানুবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শিশুকাল থেকেই সে সহনশীল মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠবে। তাছাড়া এটি তার পাকস্থলী ও হজম প্রক্রিয়াকেও স্থিতিশীল রাখবে। কিন্তু সময়জ্ঞানের তোয়াক্কা না করেই বাচ্চা কেঁদে উঠলেই যদি খেতে দেওয়া হয়, তাহলে তার মাঝে শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত হবে না। সামান্য কিছুতেই কান্না জুড়ে দিয়েই সব কিছু আদায় করে নেওয়ার মানসিকতা, সব আবদার মিটিয়ে নেওয়ার অভ্যাস কিন্তু সে সহসা ছাড়তে পারবে না। বড় হলেও এই ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবটি তার মাঝে রয়ে যেতে পারে। যার ফলে তার মাঝে কখনোই দৃঢ় মনোবল সৃষ্টি হবে না। আত্মপ্রত্যয়ের ঘাটতি তার মাঝে রয়ে যাবে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার উচ্চমানসিকতা তার নাও হতে পারে। সামান্য বিপর্যয়েই সে হতাশ হয়ে পড়তে পারে।
অনেকেই মনে করেন যে— বাচ্চা-কাচ্চাদের সুশৃঙ্খল করে গড়ে তোলা বড়ই ঝক্কিঝামেলার কাজ, এটি অসম্ভবপ্রায় একটা বিষয়। কারণ শিশুমন কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সদা-সর্বদা উল্লাসে মেতে থাকতে চায়। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়। বরং একটু কৌশলী হলেই, বাচ্চারাও নিজ থেকেই নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীনে চলে আসবে। তবে এজন্য একটু বেশিই ধৈর্যশীল হতে হবে এবং সুদূর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে— প্রতি ৩-৪ ঘণ্টা পরপর বাচ্চাকে দুধপান করাতে হবে। স্তন্যদানকালে কোলে তুলে নিন। পরম আবেশে জড়িয়ে ধরুন। এখন থেকেই তাকে অনুভব করতে দিন তার প্রতি আপনার ভালোবাসার গভীরতা।
শোয়া অবস্থায় বাচ্চাকে দুধ পান করানো উচিত নয়। কারণ দেখা যায়, দুধপান করাতে করাতে অনেকসময় মা ঘুমিয়ে পড়েন। তখন বাচ্চার মুখে মায়ের স্তন থাকায় কিছু ক্ষেত্রে তার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ-নির্গমন করতে অসুবিধা হয়। যেখান থেকে প্রাণনাশের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকলে বাচ্চাকে গাভীর দুধও পান করানো যেতে পারে। তবে যেহেতু মাতৃদুগ্ধের তুলনায় গাভীর দুধ একটু বেশি ঘন, তাই গাভীর দুধের সাথে পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে নিতে হবে। পাস্তুরিত দুধও পান করানো যেতে পারে। তবে সেটি আগে বিশ মিনিট উনুনে ফুটিয়ে নিতে হবে। প্রচণ্ড গরম কিংবা তীব্র ঠান্ডা দুধ শিশুকে পান করানো যাবে না।
বরং মাতৃদুগ্ধের তাপমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দুধ পান করাতে হবে। প্রতিবার দুধপান শেষ হলে ফিডার বোতল ও তার চোষক (চুচুক) ভালোভাবে ধুয়ে গরম পানিতে সিদ্ধ করে নিতে হবে। সাবধান, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা টক হয়ে যাওয়া দুধ কখনোই বাচ্চাকে খাওয়াবেন না। উত্তম হলো— শিশু কতটুকু দুধ পান করল, তার হিসাব রাখা। তাহলে বাচ্চাকে পরিমাণ মোতাবেক খাওয়ানো যাবে। অতিভোজন কিংবা স্বল্পভোজনের সমস্যা দেখা দেবে না।
শিশুকে গুঁড়োদুধ খাওয়াতে চাইলে— প্রথমে কোনো শিশুবিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। তার নির্দেশনা মোতাবেক বাচ্চাকে দুধ পান করাবেন।
বাচ্চার বয়স চার মাস পেরোলে দুধের পাশাপাশি তাকে বিভিন্ন ফলের রস পান করানো যেতে পারে। ছয় মাস হয়ে যাওয়ার পর তাকে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার ও স্যুপ খাওয়ানো শুরু করা যাবে। বিস্কুট, কেক ইত্যাদিও খাওয়ানো যাবে। দধি, পনির প্রভৃতি হলো এ সময়ের জন্য বেশ উপযোগী খাদ্য। এছাড়া মাঝে মাঝে বড়দের নিয়মিত খাবারের অংশবিশেষও তাকে খেতে দেওয়া যেতে পারে।
শিশুকে স্বাভাবিক খাবার খাওয়ালেই সে পিপাসার্ত হয়ে পড়বে। তাই সময় করে করে তাকে পানিও পান করানো চাই। তবে তাকে চা-কফি পান করানো একেবারেই অনুচিত। উঠতি বয়সী বাচ্চাদের জন্য ফলমূল, শাকসবজি, স্যুপ হলো সবচাইতে বেশি উপযোগী।
শিশুর বিছানাপত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, তোয়ালে-রুমালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুব বেশি খেয়াল রাখা চাই। কিছুক্ষণ পরপর তার হাত ও মুখ ধুয়ে দিতে হবে। নিয়মিত গোসল করাতে হবে। কারণ বাচ্চারা খুব সহজেই ময়লা ও রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাই শুরুতেই গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, হুপিংকাশি, পক্ষাঘাত, গলগণ্ড, হাম প্রভৃতি রোগের টিকা দিয়ে নেবেন। এসকল রোগের টিকা বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহজেই পাওয়া যায়। সকল প্রকার স্বাস্থ্যনীতির যথাযথ অনুসরণ করে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে চলতে পারলেই আমাদের সন্তানরা সুস্থ দেহ ও প্রশান্ত মনের অধিকারী হবে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকরী অবদান রাখবে।