📄 সন্তান প্রতিপালন
সুন্দর এই পৃথিবীতে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ও পবিত্র শব্দের নাম 'মা'। এক অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ 'মা'। সন্তানের সাথে যার নাড়ির সম্পর্ক। স্নেহময়ী মায়ের হাসি, মন উজাড় করা ভালোবাসা, আদর-স্নেহে সন্তানের মনে বয়ে যায় অনাবিল আনন্দের ঝরনাধারা। সব দুঃখ-কষ্ট আর বেদনা 'মা' শব্দের মাঝে বিলীন হয়ে যায়। সন্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হচ্ছেন মা। মা হলেন একজন সন্তানের নিকট অধিক মর্যাদাবান ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তাই সন্তানের প্রতি মায়ের রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
মায়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো—নিজ সন্তানদেরকে যথাযথভাবে লালন-পালন করা। মমতা জড়ানো ভালোবাসা দিয়ে, স্নেহমাখা শাসন দিয়ে কোলে-পিঠে করে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা। তবে এটি সহজসাধ্য কোনো কাজ নয়। বরং তা বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র একটি দায়িত্ব। যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক মায়ের ওপরই ন্যস্ত হয়ে থাকে। সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্মরণে রাখা সবিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য—
১. সন্তান দাম্পত্য বন্ধনের ফসল
মানুষ মাত্রই একটি সময় পেরুলেই পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়। বহুদিনের স্বপ্নে বোনা জালের যেন ইতি ঘটে 'কবুল' শব্দ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। তবে বিয়ে করার পেছনে রয়েছে মানুষের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। জৈবিক চাহিদা পূরণ, প্রেমানুভূতির তীব্র আকর্ষণ প্রভৃতি কারণে প্রণয়যুগল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও, সন্তান লাভকে মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করে কোনো দম্পতি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে, এমন নজির খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে এই মানসিকতা বদলাতে খুব একটা সময়ও লাগে না। প্রকৃতির চিরাচরিত অমোঘ বিধান যখন তাদের কাছে প্রতিভাত হয়, তখন সন্তান লাভের এক দুর্বার আকর্ষণ তাদেরকে পেয়ে বসে। সমগ্র হৃদয়জুড়ে ছেয়ে যায়, একটি সন্তান লাভের অনিঃশেষ আকুলতা।
একটি ঘর আলোকিত করে যখন কোনো নব অতিথির আগমন ঘটে, তখনই দাম্পত্য জীবন কেমন যেন সার্থকতা লাভ করে। সন্তানবিহীন সংসার, এ যেন ফলবিহীন বৃক্ষ। একটি শিশুই পারে স্বামী-স্ত্রীর হৃদ্যতার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে তুলতে। শিশুই পারে পিতার কর্মোদ্যমতা বাড়িয়ে তুলতে, সংসারকে গুছিয়ে তোলার ব্যাপারে মাকে অনুপ্রাণিত করতে। নিছক যৌন ক্ষুধা ও কামচাহিদা নিবারণের সমাজসিদ্ধ পদ্ধতি ভেবে বিয়ে করলে সে বিবাহ কখনোই টেকসই হয় না। স্বার্থ চুকে গেলে কিংবা মোহ কেটে গেলে সহসাই বিবাহাবসান ঘটে যায়। যেই ভিত্তিমূল বিবাহবন্ধনকে সুদৃঢ় করে, তা হলো সন্তান গ্রহণ।
তখন একান্ত মিলনের মাধ্যমে যৌন স্বাদ গ্রহণের চাইতে সন্তান গ্রহণের বিষয়টিই দম্পতিদের মুখ্য উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। দৈহিক তৃপ্তিটা তখন গৌণ উদ্দেশ্যে পর্যবসিত হয়। একটা সন্তান লাভের জন্য স্বামী-স্ত্রীর দিন-রাত চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না। কোমলমতি সন্তানের আধো আধো বোলে কথা বলা, নিষ্পাপ হাসির আভা ফুটিয়ে সমগ্র ঘরময় আলোকিত করে তোলা, এগুলোই যেন পিতামাতার হৃদয়ে উষ্ণ আবেগানুভূতির ছোঁয়া দিয়ে যায়।
এজন্যই আমাদের প্রিয় নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— অর্থ: "প্রতিটি শিশুই জান্নাতি হয়ে জন্ম নেয়।"
তিনি আরও বলেন—
অর্থ: “অধিক সন্তান গ্রহণের মাধ্যমে তোমরা বংশ বৃদ্ধি করো। কারণ আমার একান্ত ইচ্ছা, কিয়ামতের দিনে অন্যান্য নবিগণের সম্প্রদায়ের ওপর তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমার গর্বের কারণ হবে।”১১৯
২. শিশু শিক্ষা
সন্তানের প্রতি মায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, স্বীয় সন্তানকে শিক্ষা-দীক্ষায় পরিপূর্ণ করে, মেধা-মননে বিকশিত করে, তাকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা। যদিও মাতা-পিতা উভয়কেই সমানতালে দেখভালো করে সন্তানকে গড়ে তুলতে হয়, তবে মায়ের দায়িত্বটা তুলনামূলক একটু বেশিই বটে। কারণ একমাত্র মায়েরাই পারেন তাদের সন্তানকে সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় রাখতে।
মায়েরা যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের সন্তানদের লালন-পালন করতে পারেন, তাহলে শুধু গোটা জাতি নয়, বরং সমগ্র বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। সুতরাং বলা যেতেই পারে, নারী জাতির হাতেই রয়েছে সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। হাদিসে এসেছে—
অর্থ: 'এক ব্যক্তি জিহাদে যাওয়ার বিষয়ে নবিজীর কাছে পরামর্শ চাইলে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মা জীবিত আছে?” লোকটি বললো, 'হ্যাঁ'। নবিজী বললেন, “যাও মায়ের সেবায় লেগে থাকো। কেননা, তার পদতলেই জান্নাত।”১২০
আরেক বর্ণনায় আছে—
অর্থ: “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।”১২১
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজ তারা যা শিখবে আগামীতে সেটাই তারা প্রয়োগ করবে। পরিবারগুলো ভালো হলে গোটা সমাজব্যবস্থায় এক অনাবিল শান্তি বিরাজ করবে। কারণ নির্দিষ্ট সংখ্যক পরিবারের সমন্বয়েই গঠিত হয় একটি সমাজ। আগামীর বিশ্ব দূষিত হবে আজকের রগচটা, একগুঁয়ে, জেদি, অকালকুষ্মাণ্ড, কাপুরুষ, স্বার্থপর, বেপরোয়া, নির্দয় বাচ্চাদের দ্বারা। অপরদিকে আজকের শিশুরা যদি হয় সৎ, শিষ্টাচারবোধ সম্পন্ন, সুহৃদয়, আস্থাভাজন ও সাহসী, তাহলে আগামীর বিশ্ব হবে আরও সুন্দর, আরও উন্নত এবং তারাই এর সুফল ভোগ করবে।
অতএব নিজ শিশুকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে পিতা, বিশেষভাবে মাতা সমাজের নিকট দায়বদ্ধ। নিজ সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ রূপে গড়ে তুলে বাবা-মাও সমাজ বিনির্মাণে কার্যকরী অবদান রাখতে পারেন। আর সন্তানদের প্রতি দায়িত্বহীনতা তাদেরকে কেয়ামতের দিন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে অমোঘ বিধান হলো—প্রত্যেক মাতাপিতার হৃদয়ে এই ভাবানুভূতি জাগ্রত হওয়া চাই যে—আমার সন্তান আমারই প্রতিনিধিত্ব করছে। সে ভালো হলে তার কৃতিত্ব আমাকেই দেয়া হবে। আবার সে বখাটে হয়ে গেলে তার দায়ভারও আমি কিছুতেই এড়াতে পারবো না। তাকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলা, সুশিক্ষায় দীক্ষিত করে তোলা, প্রকৃত সত্য-সুন্দরের পথের সন্ধান দেয়া, সর্বোপরি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্বের পরিধি অপরসিম। মোটকথা—বাবা-মায়ের নিবিড় পরিচর্যায় সন্তান আদর্শ মানবে পরিণত হলে বাবা-মায়ের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার। অপরদিকে তাদের ভাবলেশহীন গুরুত্বহীনতার কারণে সন্তান বিপথে চলে গেলে এর জন্য হতে হবে কঠোর জবাবদিহিতার সম্মুখীন।
তবে একথাও সত্য—একটি শিশুকে আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে বহুবিধ কার্যকরী কলাকৌশল রয়েছে, সে সম্পর্কে আজকালকার মায়েদের অভিজ্ঞতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এজন্য প্রথমে তাদেরকে অভিজ্ঞজনদের থেকে এই কলাকৌশলগুলো আয়ত্ত করে নিতে হবে। এছাড়া বর্তমান বাজারে এ সংক্রান্ত অসংখ্য বইয়েরও সন্ধান পাওয়া যায়। বিজ্ঞ লেখকগণ তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলির সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়ে বইগুলোকে পাঠকবান্ধব করতে, সৃজনশীলতার অনুপম প্রয়োগে মনের মাধুরী দিয়ে ঢেলে সাজাতে কোনো প্রকার কার্পণ্য করেননি।
মায়েরা এসকল বই সংগ্রহ করতে পারেন। তারপর নিজের লব্ধ অভিজ্ঞতার সাথে সমন্বয় করে সে আঙ্গিকে বাচ্চাদের দীক্ষিত করতে পারেন। ধীরে ধীরে তিনিও বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠবেন। তখন তিনি আবার নবীন মায়েদের তালিম দিবেন।
একটি বিষয় ভালোভাবে জেনে রাখা দরকার, আমাদের অনেকেই 'শিক্ষাদান' ও 'প্রশিক্ষণদান' শব্দদ্বয়কে এক ও অভিন্ন মনে করে গুলিয়ে ফেলি। অথচ এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। শিক্ষাদান মানে হলো, জ্ঞান অর্জন বা বিতরণ। আর প্রশিক্ষণদান মানে হলো, অর্জিত জ্ঞানের বাস্তব প্রতিফলন। বাচ্চাদেরকে শিক্ষণীয় গল্প শোনানো, গঠনমূলক কবিতা আবৃত্তি করানো, পবিত্র কুরআনের মর্মবাণী অনুধাবন করানো, নবি-রাসূলগণের জীবনচরিত ও মণীষীগণের গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের আলোচনা শোনানো, প্রভৃতি শুধু তাদের জানার পরিধিকেই বিস্তৃত করবে। জানাকে মানায় পরিণত করাই হলো মূল বিবেচ্য বিষয়। স্বর্ণযুগের সোনালী মানুষদের স্বর্ণালী ইতিহাস পড়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না, বরং তাঁদের জীবনালেখ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সেই আলোকে জীবন গঠনের মাঝেই রয়েছে প্রকৃত সার্থকতা।
সুতরাং আমাদের এমন এক দ্বীনি আবহ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেই পরিবেশের নূরানি প্রবাহে নিজ থেকেই বাচ্চারা নিজেদেরকে সৎ ও ন্যায়-নিষ্ঠাবান হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রাণিত হবে। কোনো বাচ্চা যদি এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যেখানে সততা, সাহসিকতা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলাবোধ, ভালোবাসা, অনুরাগ, ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, আস্থানির্ভরতা ইত্যাদির চর্চা ও অনুশীলন হয়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাচ্চাটির মাঝেও এই সুকুমারবৃত্তিগুলোর বিকাশ ঘটবে।
অন্যদিকে যেই পরিমণ্ডলের নিত্যদিনের সঙ্গী হলো দুর্নীতি, প্রতারণা, রেষারেষি, অন্যায়, অশালীনতার প্রাদুর্ভাব, এমন নাভিশ্বাস হয়ে ওঠা পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানের মাঝেও কুণ্ডলী পাকিয়ে ফণা তুলে থাকবে বিষধর কাল নাগসাপ। খতিয়ে দেখলে জানা যাবে—এই বাচ্চাটিও অসংখ্য গুণগ্রাহী ব্যক্তির জীবনী পড়েছে, শুনেছে। কিন্তু তা হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি, সেই আলোকে জীবন পরিচালিত করতে পারেনি।
মা-বাবা যদি সৎ ও আদর্শবান না হন, তাহলে সন্তানকে যতই কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান বিতরণ করা হোক না কেন, সেই সন্তানের শিষ্টজ্ঞান সম্পন্ন সভ্য ও ভদ্র সন্তান হিসেবে গড়ে ওঠা খুব কঠিন। কারণ প্রত্যেক সন্তানের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থাকে তার বাবা-মায়ের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনার দিকে; তারা সন্তানকে কী উপদেশ দিচ্ছে বা নীতিবাক্য গলধঃকরণ করাচ্ছে, সেদিকে নয়।
সুতরাং আমরা যারা প্রকৃত অর্থেই নিজ সন্তানদেরকে উত্তম মানসিকতার অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, সর্বপ্রথম আমাদের নিজেদের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সর্বাগ্রে নিজেদেরকে শুধরে নিতে হবে। এটি হলো একমাত্র পথ ও পন্থা।
টিকাঃ
১১৯ আবু দাউদ, হাদিস নং: ২০৫০, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ২০৪৩; বাইহাকি, হাদিস নং: ২৭৩৩।
১২০ মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ১৫৫৩৮, সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৩১০৪।
১২১ মুসনাদুশ শিহাব, হাদিস নং: ১১৯।
📄 আহার ও পরিচ্ছন্নতা
মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো— সন্তানদের আহারাদির ব্যবস্থা করা। শিশুর শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতা, মানসিক প্রফুল্লতা-নিরানন্দতা, আত্মিক সজীবতা-নির্জীবতা প্রভৃতির সিংহভাগই নির্ভর করে সন্তানের খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
বস্তুত প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্রময় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সপ্তাহ ঘুরে মাস পেরোলেই তাদের খাবারে আনতে হয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
তবে শিশুর জন্য সবচাইতে পুষ্টিকর খাদ্য হলো দুধ। একটি সুস্থ দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য উপাদানই দুধের মাঝে রয়েছে। তাই শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। কারণ মায়ের দুধে এমন কিছু উপাদান আছে, যা শিশুর হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে। এজন্যই মায়ের দুগ্ধপানে শিশুর কোনো প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। এছাড়া মায়ের দুধকে ফুটিয়ে কিংবা পাস্তুরিত করে অথবা ভিন্ন কোনো উপায়ে পরিশোধিত করার অতিরিক্ত কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। আর খাঁটি মানের নিশ্চয়তা একমাত্র মায়ের দুধেই মেলে। তাই বলা যায়, শিশুর জন্য মায়ের দুধের মতো স্বাস্থ্যসম্মত ও আদর্শ খাদ্য আর কিছুই হতে পারে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সাবেক প্রধান পরিচালক ডাক্তার এ. এইচ. তাবা বলেছিলেন— 'যে বিষয়টি শিশুকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নিপতিত করে, তা হলো মায়ের দুধপান থেকে বঞ্চিত হওয়া। এই মাতৃদুগ্ধই নবজাতকের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে।'
তবে মাতৃদুগ্ধ তখনই পুষ্টিকর হবে, যখন মায়ের খাদ্যের মান সুষম ও পুষ্টিকর হবে। তিনি যত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করবেন, তার দুধও ততো পুষ্টিকর হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যে মায়েরা অসচেতন, তারা বাচ্চাদের দুগ্ধ পান করাতে গেলে স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগবেন। তাদের বুকের দুধ খেয়ে বাচ্চারাও অপুষ্টিতে ভুগবে। তাই প্রতিটি বাবার উচিত, নিজ সন্তানের মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যত্নবান হওয়া। তাদেরকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দেওয়া। কারণ পুষ্টিহীনতা অতিমাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তা থেকেই নাম না জানা বহু দুরারোগ্য ব্যাধি জন্ম নেয়। তাই স্তন্যদানকারিণী প্রত্যেক মাকে নিজ খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে যত্নশীল হওয়া চাই। দুগ্ধজাত খাদ্য থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, শাক-সবজি, ফলমূল পর্যন্ত প্রতিটি উপাদানই তার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা চাই।
এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় জানা থাকা চাই— মাতৃদুগ্ধ সন্তানের মানবিক গুণাবলির ওপর প্রভাব ফেলে। এজন্যই দাইমা নিয়োগের প্রয়োজন হলে নিয়োগকালে একটু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত। কারণ মায়ের দুধের প্রভাব সন্তানের দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায়।
আর সন্তানকে দুধ পান করানোর নিয়ম হলো— রুটিনমাফিক নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে দিয়ে দুধ পান করানো। এতে করে বাচ্চা নিয়মানুবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শিশুকাল থেকেই সে সহনশীল মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠবে। তাছাড়া এটি তার পাকস্থলী ও হজম প্রক্রিয়াকেও স্থিতিশীল রাখবে। কিন্তু সময়জ্ঞানের তোয়াক্কা না করেই বাচ্চা কেঁদে উঠলেই যদি খেতে দেওয়া হয়, তাহলে তার মাঝে শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত হবে না। সামান্য কিছুতেই কান্না জুড়ে দিয়েই সব কিছু আদায় করে নেওয়ার মানসিকতা, সব আবদার মিটিয়ে নেওয়ার অভ্যাস কিন্তু সে সহসা ছাড়তে পারবে না। বড় হলেও এই ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবটি তার মাঝে রয়ে যেতে পারে। যার ফলে তার মাঝে কখনোই দৃঢ় মনোবল সৃষ্টি হবে না। আত্মপ্রত্যয়ের ঘাটতি তার মাঝে রয়ে যাবে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার উচ্চমানসিকতা তার নাও হতে পারে। সামান্য বিপর্যয়েই সে হতাশ হয়ে পড়তে পারে।
অনেকেই মনে করেন যে— বাচ্চা-কাচ্চাদের সুশৃঙ্খল করে গড়ে তোলা বড়ই ঝক্কিঝামেলার কাজ, এটি অসম্ভবপ্রায় একটা বিষয়। কারণ শিশুমন কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সদা-সর্বদা উল্লাসে মেতে থাকতে চায়। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়। বরং একটু কৌশলী হলেই, বাচ্চারাও নিজ থেকেই নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীনে চলে আসবে। তবে এজন্য একটু বেশিই ধৈর্যশীল হতে হবে এবং সুদূর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে— প্রতি ৩-৪ ঘণ্টা পরপর বাচ্চাকে দুধপান করাতে হবে। স্তন্যদানকালে কোলে তুলে নিন। পরম আবেশে জড়িয়ে ধরুন। এখন থেকেই তাকে অনুভব করতে দিন তার প্রতি আপনার ভালোবাসার গভীরতা।
শোয়া অবস্থায় বাচ্চাকে দুধ পান করানো উচিত নয়। কারণ দেখা যায়, দুধপান করাতে করাতে অনেকসময় মা ঘুমিয়ে পড়েন। তখন বাচ্চার মুখে মায়ের স্তন থাকায় কিছু ক্ষেত্রে তার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ-নির্গমন করতে অসুবিধা হয়। যেখান থেকে প্রাণনাশের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকলে বাচ্চাকে গাভীর দুধও পান করানো যেতে পারে। তবে যেহেতু মাতৃদুগ্ধের তুলনায় গাভীর দুধ একটু বেশি ঘন, তাই গাভীর দুধের সাথে পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে নিতে হবে। পাস্তুরিত দুধও পান করানো যেতে পারে। তবে সেটি আগে বিশ মিনিট উনুনে ফুটিয়ে নিতে হবে। প্রচণ্ড গরম কিংবা তীব্র ঠান্ডা দুধ শিশুকে পান করানো যাবে না।
বরং মাতৃদুগ্ধের তাপমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দুধ পান করাতে হবে। প্রতিবার দুধপান শেষ হলে ফিডার বোতল ও তার চোষক (চুচুক) ভালোভাবে ধুয়ে গরম পানিতে সিদ্ধ করে নিতে হবে। সাবধান, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা টক হয়ে যাওয়া দুধ কখনোই বাচ্চাকে খাওয়াবেন না। উত্তম হলো— শিশু কতটুকু দুধ পান করল, তার হিসাব রাখা। তাহলে বাচ্চাকে পরিমাণ মোতাবেক খাওয়ানো যাবে। অতিভোজন কিংবা স্বল্পভোজনের সমস্যা দেখা দেবে না।
শিশুকে গুঁড়োদুধ খাওয়াতে চাইলে— প্রথমে কোনো শিশুবিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। তার নির্দেশনা মোতাবেক বাচ্চাকে দুধ পান করাবেন।
বাচ্চার বয়স চার মাস পেরোলে দুধের পাশাপাশি তাকে বিভিন্ন ফলের রস পান করানো যেতে পারে। ছয় মাস হয়ে যাওয়ার পর তাকে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার ও স্যুপ খাওয়ানো শুরু করা যাবে। বিস্কুট, কেক ইত্যাদিও খাওয়ানো যাবে। দধি, পনির প্রভৃতি হলো এ সময়ের জন্য বেশ উপযোগী খাদ্য। এছাড়া মাঝে মাঝে বড়দের নিয়মিত খাবারের অংশবিশেষও তাকে খেতে দেওয়া যেতে পারে।
শিশুকে স্বাভাবিক খাবার খাওয়ালেই সে পিপাসার্ত হয়ে পড়বে। তাই সময় করে করে তাকে পানিও পান করানো চাই। তবে তাকে চা-কফি পান করানো একেবারেই অনুচিত। উঠতি বয়সী বাচ্চাদের জন্য ফলমূল, শাকসবজি, স্যুপ হলো সবচাইতে বেশি উপযোগী।
শিশুর বিছানাপত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, তোয়ালে-রুমালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুব বেশি খেয়াল রাখা চাই। কিছুক্ষণ পরপর তার হাত ও মুখ ধুয়ে দিতে হবে। নিয়মিত গোসল করাতে হবে। কারণ বাচ্চারা খুব সহজেই ময়লা ও রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাই শুরুতেই গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, হুপিংকাশি, পক্ষাঘাত, গলগণ্ড, হাম প্রভৃতি রোগের টিকা দিয়ে নেবেন। এসকল রোগের টিকা বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহজেই পাওয়া যায়। সকল প্রকার স্বাস্থ্যনীতির যথাযথ অনুসরণ করে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে চলতে পারলেই আমাদের সন্তানরা সুস্থ দেহ ও প্রশান্ত মনের অধিকারী হবে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকরী অবদান রাখবে।