📘 দ্য কেয়ারিং ওয়াইফ > 📄 মহিলাদের পেশা

📄 মহিলাদের পেশা


এটা ঠিক যে- একটি পরিবারের জীবনধারণের ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য উপার্জন একটি বাধ্যতামূলক কাজ এবং মহিলাদের এই কাজের জন্য ইসলামিকভাবে (ইসলামিক আইন অনুসারে) কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। খুব বেশি ঘুম এবং অত্যাধিক বিশ্রাম শরীরের জন্য ক্ষতিকর। খুব বেশি ঘুম কারও পার্থিব জীবন এবং ধর্ম (দুনিয়ার ও পরকালের জীবন) উভয়কেই নষ্ট করে দেয়। তাই মহিলাদেরও কাজ করা উচিত। কারণ ইসলামে অলসতা নিন্দনীয়। হযরত ফাতেমা জোহরা রাযিআল্লাহু আনহা বাড়িতে কাজ করতেন।

যে কোনো মানুষেরই প্রয়োজন হোক বা না হোক কোনো কাজ করা উচিত। কোনো কাজ না করে তার জীবন নষ্ট করা উচিত নয়। তার অবশ্যই সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অংশ নেওয়া উচিত। যদি প্রয়োজন হয়, তবে নিজের উপার্জন নিজের পরিবার এবং নিজের জন্য ব্যয় করতে হবে। আর যদি প্রয়োজন না হয় তাহলে উপার্জন থেকে একটা অংশ তাদেরকে দান করুন যাদের আপনার সহযোগিতার প্রয়োজন। অলসতা ক্লান্তিকর এবং তা একইসাথে ব্যক্তিকে মানসিক এবং শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত করে, পাশাপাশি নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়।

হযরত সাওবান রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ : “কোনো ব্যক্তির ব্যয়কৃত অর্থের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট অর্থ তা-ই; যা সে তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, যা আল্লাহর পথে তার বাহনের জন্য ব্যয় করে এবং যা আল্লাহর পথে তার সাথীগণের জন্য ব্যয় করে।”৯৫

বিবাহিত মহিলাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হলো বাড়ির যত্ন নেওয়া। গৃহিণীপনা, সন্তানের লালন-পালন ও যত্ন করা, ইত্যাদি হলো মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম কাজ। যা তারা খুব সহজেই করতে পারেন। একজন মেধাবী এবং পরিশ্রমী গৃহিণী তার বাচ্চা এবং স্বামীর জন্য বাড়িকে একটি স্বর্গীয় বাসস্থানে পরিণত করতে পারেন এবং এটি একটি মূল্যবান এবং সার্থক কাজ।

হযরত আবদুল্লাহ্ বিন্ আমর রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ : “পৃথিবীর সব কিছুই সম্পদ। এ পার্থিব সম্পদের মধ্যে উৎকৃষ্ট সম্পদ হলো সতী স্ত্রী।”৯৬

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- গৃহবধূদের শুধু গৃহকর্মেই ব্যস্ত না থেকে অন্য কাজও করা উচিত। তারা বই পড়তে পারেন। দরকারি বিষয়গুলোর উপর গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন। যার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, নিবন্ধ এবং এমনকি বইও লিখতে পারেন। অঙ্কন, চিত্রকলা, সেলাই, বুনন এবং আরও কিছু কাজের মধ্যে জড়িত থাকতে পারেন। ফলস্বরূপ, তারা তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে পারেন। পাশাপাশি তাদের প্রতিভা সবার কাছে উন্মুক্ত করে সমাজে অবদান রাখতে পারেন এবং সকলকে উৎসাহিত করতে পারেন। কাজের মধ্যে থাকলে তা মানুষকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থতা প্রদানে সহায়তা করে।

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ : “আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন যে- তোমাদের কেউ যে কোন কাজ করলে যেন তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করে।”৯৭

অনেক মহিলা বাড়িতে কাজ করেন আবার কেউ কেউ বাইরে চাকরি পছন্দ করেন। এই পছন্দটি কারো অর্থনৈতিক বা অন্য কারণেও হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য সর্বাধিক উত্তম কাজ হলো সাংস্কৃতিক পেশা বা পরিষেবা। নার্সারি, প্রাইমারি বা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হলো উপযুক্ত জায়গা। যেখানে মহিলারা মেয়ে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষাপ্রদান ও প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। হাসপাতালও একটি উপযুক্ত জায়গা। যেখানে তারা নার্স বা ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন। তবে পরপুরুষের উপস্থিতিতে তার চাকরি করা মোটেও কাম্য নয়।

নিম্নলিখিত পরামর্শগুলি তাদের জন্য যারা বাইরে চাকরি করছেন বা চাকরি করতে চান-

১. কোনো কাজ নেয়ার আগে আপনার স্বামীর সাথে পরামর্শ করুন। আপনাকে বাইরে কাজ করার জন্য অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়া আপনার স্বামীর অধিকার। আপনি যদি আপনার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কাজ শুরু করেন তাহলে তা আপনার পরিবারের নির্মলতা এবং প্রেমময় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।

আল্লাহ তাআলা নবীপত্নীগণকে লক্ষ করে বলেন-
অর্থ : “তোমরা ঘরে অবস্থান কর।”৯৮

ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
“তোমরা ঘরকে আঁকড়ে ধর, কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হইয়ো না।”

নারীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করা যেমন ওয়াজিব, তেমন ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য তার অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী ঘর থেকে বের হবে না। যদি বের হয় তবে ফিরে আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”৯৯

বুখারিতে আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : “নারী তার স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখবে না এবং তার অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে আসতে দিবে না।”১০০

আরেক বর্ণনায় এসেছে-
অর্থ : স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখলে সে গুনাহগার হবে এবং তা কবুল হবে না।১০১

এই হাদিসের আলোকে ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন-
অর্থ : 'নারীর জন্য নফল ইবাদত করার চেয়ে স্বামীর অধিকার আদায় করা বেশি জরুরি।'১০২

হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ: "যদি কোনো ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তির সিজদাহ করার আদেশ দিতাম, তবে আমি স্ত্রীকে বলতাম তার স্বামীকে সিজদাহ করতে।"১০৩

পুরুষদেরকে তাদের স্ত্রীদের ঘরের বাইরে কাজ করার ব্যাপারে খুব কঠোর ও নেতিবাচক না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যদি কাজের সংশ্লিষ্ট জায়গাটি তার পক্ষে অনুপযুক্ত বিবেচিত না হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের উদ্দেশে বলেন-
অর্থ : “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য প্রয়োজনে বাহিরে বের হওয়ার অনুমতি আছে।”১০৪

২. নারীদের যথাযথ ইসলামী হিজাব পরিধান করা উচিত। কোনো মেকআপ ছাড়া এবং সরল পোশাক পরিধান করে কাজ করা উচিত। মাহরাম নয় (মাহরাম নয় বলতে বোঝায় এমন পুরুষ যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ নয়) এমন পুরুষদের সাথে মিশ্রণ অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
অর্থ : “তোমরা ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলি (বর্বরতাপূর্ণ) যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন কোরো না।”১০৫

অফিস হচ্ছে কাজ করার জায়গা এবং এটি দেখানোর উদ্দেশ্যে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নয়। আপনি কী পরিধান করে আছেন তা দেখে আপনার প্রতিপত্তি এবং মর্যাদা আসবে না। বরং আপনি কী কাজ করেন এবং কতটুকু ভালোভাবে করেন তা দিয়েই আপনাকে মূল্যায়ন করা হয়। একজন মুসলিম মহিলার মতো আচরণ করুন এবং পরিপূর্ণ মুসলিম হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার আত্মসম্মান বজায় রাখুন এবং আপনার স্বামীর অনুভূতিতে আঘাত করবেন না। আপনার সাজসজ্জা বাড়িতে স্বামীর জন্য করুন এবং সুন্দর পোশাকগুলি তার জন্যই সংরক্ষণ করুন।

'আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আলকুয়েতিয়্যাহ' নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে- 'নারীরা ৩টি শর্তে নিজ গৃহের বাইরে চাকরি বা কাজ করতে যেতে পারবে-
১. কাজটি গুনাহের না হওয়া।
২. নারীর কাজটি এমন স্থানে না হওয়া যেখানে পরপুরুষের সাথে একত্রে কাজ করতে হয়।
৩. কাজের জন্য এমন সাজসজ্জা সহকারে বের না হওয়া, যা ফিতনা-ফ্যাসাদের দিকে প্ররোচিত করে।১০৬

৪. মহিলাদের এই বিষয়টিতে সচেতন হওয়া উচিত যে- যদিও আপনি বাড়ির বাইরে কাজ করছেন তবুও আপনার স্বামী ও সন্তান গৃহকর্ম, রান্নাবান্না এবং ওয়াশিং এর মতো কাজগুলি আপনার কাছেই প্রত্যাশা করে। পরিবারের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে। এটিও খেয়াল রাখতে হবে, যেন বাইরের একটি চাকরি পুরো পরিবারকে হতাশ করার পথ প্রশস্ত না করে।

গৃহকর্মেও বিষয়ে পুরুষদেরকেও তাদের স্ত্রীদের সহায়তার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বামীদের জন্য তাদের স্ত্রীদের বাড়ির বাইরে এবং ভিতরে উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করার আশা করা উচিত নয়। এ জাতীয় প্রত্যাশা বৈধ বা ন্যায্যও নয়। পুরুষ এবং মহিলাদের ঘরের কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়া উচিত।

হাদিসে এসেছে, হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহা কে জিজ্ঞাসা করা হলো-
অর্থ: 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কী কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহা বলেন- “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের মানুষদের সেবায় নানা কাজে অংশ নিতেন। আর নামাজের সময় হলে বেরিয়ে যেতেন।”১০৭

আরেক বর্ণনায় আছে- 'হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তার কাপড় সেলাই করতেন; নিজের জুতা মেরামত করতেন এবং সাংসারিক কাজে অংশ গ্রহণ করতেন।'১০৮

আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : “অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া (এই বলে) কবুল করে নিলেন যে- আমি তোমাদের কোনো পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর এক।”১০৯

৩. বাইরে কাজ করেন এমন কোনো মহিলার যদি ছোট সন্তান থেকে থাকে, তাহলে তার উচিত বাচ্চাটিকে বিশ্বস্ত এবং দয়ালু কোনো ব্যক্তির কাছে বা বিশ্বস্ত কোনো নার্সারি বা চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে রেখে যাওয়া। বাচ্চাদেরকে নিজের হালে বাড়িতে একা রেখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বাচ্চাটি খুব ভয় পেয়ে যাবে এবং অসহায় হয়ে পড়বে। এতে বড় কোনো দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।

যদি কোনো মহিলা মনে করেন, উপরের কাজগুলি এবং দায়িত্বগুলি ছাড়াও তার উচিত অন্য একটি চাকরি গ্রহণ করা, তাহলে অবশ্যই তার স্বামীর সাথে বোঝাপড়া করা উচিত। এবং চাকরি অবশ্যই তার অনুমতি এবং পরামর্শের অধীনে নেওয়া উচিত। স্বামী যদি রাজি না হয়, তবে তার চাকরির চিন্তা ভুলে যাওয়া উচিত।

বুখারিতে হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : “নারী তার স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখবে না এবং তার অনুমতি ছাড়া তার ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দেবে না।”১১০

আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : “তোমরা ঘরে অবস্থান কর”।১১১

ইবনে কাসির (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন-
অর্থ : “তোমরা ঘরকে আঁকড়ে ধর, কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হইয়ো না।”১১২

হাদিস শরিফে এসেছে যে-
অর্থ : “স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরের বাহিরে বের হলে নারীর কোনো নামাজ কবুল হয় না।”১১৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : "যদি নারীরা পুরুষের অধিকার সম্পর্কে জানত, তাহলে দুপুর কিংবা রাতের খাবারের সময় হলে, তাদের খানা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা বিশ্রাম নিত না।”১১৪

স্বামী যদি স্ত্রীর কাজ করার বিষয়ে সম্মত হন, তবে তাকে অবশ্যই এমন একটি চাকরি বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে যেখানে তিনি ন্যূনতম বা খুব কম সংখ্যক পুরুষের সংস্পর্শে আসবেন। এটি তার নিজের এবং সমাজ উভয়েরই স্বার্থে। যাই হোক না কেন, তার বাড়ির বাইরে থাকাকালীন অবশ্যই তাকে ইসলামী পদ্ধতিতে হিজাব পরিধান করতে হবে। খুবই সহজ সাধারণ এবং কোনো রকম সাজসজ্জা ব্যতীত কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : “মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত। মুমিন নারীদের বলে দিন, যেন তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। সাধারণত যা প্রকাশ পায়, তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন ঘাড় ও বুক মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে।”১১৫

টিকাঃ
৯৫ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৩১১।
৯৬ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৬৪৯; সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং : ৩২৩২।
৯৭ বাইহাকি, হাদিস নং : ৫৩১৩-৫৩১৪।
৯৮ সূরা আহযাব: ৩৩।
৯৯ মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস নং: ২৪৫৫।
১০০ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫১৯৫; আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৪৫৮।
১০১ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ৯৮০২।
১০২ ফতহুল বারি ৯/২৩৪।
১০৩ ইবনে মাজা, হাদিস নং: ১৮৫২; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ২১৯৮৬।
১০৪ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪৭৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৫৭৯৬।
১০৫ সূরা আহযাব : ৩৩।
১০৬ আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আলকুয়েতিয়্যাহ ৭/৮৩-৮৪।
১০৭ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬০৩৯।
১০৮ সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৬৭৬।
১০৯ সূরা আলে ইমরান : ১৯৫।
১১০ সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৫; আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৪৫৮।
১১১ সূরা আহযাব : ৩৩।
১১২ তাফসিরে ইবনে কাসির: ৩/৫৮৯।
১১৩ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ১৭৪২২।
১১৪ তাবারানি, হাদিস নং: ১৬৭৪৭।
১১৫ সূরা নূর: ৩০-৩১।

📘 দ্য কেয়ারিং ওয়াইফ > 📄 অবসর সময় অপচয় করবেন না

📄 অবসর সময় অপচয় করবেন না


গৃহেই একজন নারীর জন্য বিশাল পরিমাণ কাজ থাকে। একজন গৃহিণী নিজের দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করলে, বাড়তি কাজ করার মতো অতিরিক্ত সময় তাঁর কাছে থাকে না। তাঁর ওপর ঘরে কয়েকটি বাচ্চা থাকলে ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। তবে সব কাজের পরও সকল গৃহিণী কিছুটা অবসর সময় পেয়ে থাকেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবসর বিভিন্নভাবে কাটান। কিছু মহিলা সময় অপচয় করেন। অপ্রয়োজনে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ান। নয়তো অন্য মহিলাদের সাথে গল্পগুজবে মেতে ওঠেন। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় যে—তাদের কয়েক ঘণ্টা গল্পগুজবের এক পয়সাও মূল্য থাকে না। দেখা যায় যে তারা একই কথা বারবার শুনছেন। এতে কেবল সময়ের অপচয় হয় এবং মানসিক চাপ বাড়ে। আর এসব অলস গল্প মানুষের নৈতিক অধঃপতন ঘটায়। যেসব মহিলারা এভাবে জীবন কাটান নিঃসন্দেহে তাঁরা দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আশ্চর্যের বিষয়! লোকে টাকাপয়সা হারালে বেশ চিন্তায় পড়ে যায়, অথচ জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলো হারালে ভ্রুক্ষেপও করে না। বিচক্ষণ ব্যক্তি মাত্রই তাঁর জীবনের মূল্যবান সময়ের সবটুকু যথাসম্ভব কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। এটাই মানুষের জীবনের দামি অর্জন। অলসতার বেশ কিছু ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। এটা বিভিন্ন মানসিক সমস্যা ও হতাশার সৃষ্টি করে। অলস মানুষেরা চিন্তা করে করে কষ্ট পাওয়ার নানা পথ খুঁজে বের করে। বিভিন্ন দুশ্চিন্তায় জর্জরিত হতে হতে তাঁর চিন্তাধারা এলোমেলো হয়ে যায়।

সুখী মানুষেরা সারাক্ষণ কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন। মানুষ দুঃখী হয় তখন, যখন তাঁর কাছে অতিরিক্ত অলস সময় থাকে, যখন সে জীবনের উত্থান ও পতন নিয়ে চিন্তা করতে পারে। ব্যস্ত থাকতে পারা মানুষকে আনন্দ দেয় আর অলসতা হতাশার জন্ম দেয়। এটা কি দুঃখের বিষয় নয় যে—একজন তার জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করার বিনিময়ে কিছুই পাবে না?

হে বোন! একটু সদিচ্ছা থাকলেই আপনি আপনার অবসরের প্রতিটা মুহূর্ত কাজে লাগাতে পারেন। আপনি বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক কাজকর্ম করতে পারেন। বই কিনে পড়াশোনা করতে পারেন। এক্ষেত্রে স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারেন। এভাবে আপনার জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে পারেন। এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কোর্স করতে পারেন। যেমন: কুরআন, হাদিস, পদার্থ, রসায়ন, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য ও মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি। এসব পড়াশোনা আপনাকে আনন্দ দেবে এবং ধীরে ধীরে হয়তো একদিন আপনি নিজের জ্ঞান দিয়ে সমাজের উপকার করতে পারবেন। আপনি আর্টিকেল লিখতে পারেন, বই লিখতে পারেন; যার মাধ্যমে মৃত্যুর পরও আপনার নাম বেঁচে থাকবে। আর এভাবে আপনি কিছুটা রোজগারও করতে পারেন। মনে করবেন না এগুলো একজন গৃহিণীর জন্য উচ্চবিলাসী চিন্তা। ভাববেন না ইতিহাসের বিখ্যাত নারীগণ অলস হয়ে বসে থাকতেন। তাঁরাও গৃহিণী ছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের অবসর সময় অপচয় করেননি।

মিসেস ডরোথি কার্নেগী ছিলেন একজন গৃহিণী। তিনি একটি ভালো বই লিখেছেন। গৃহস্থালি কাজ করার পাশাপাশি তিনি তাঁর স্বামী ডেল কার্নেগীকে তাঁর বিখ্যাত বই—'হাউ টু মেক ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পীপল' লিখতে সহযোগিতা করেছেন। স্বামীর যত্ন নেওয়ার মূলনীতি নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন; সে বইয়ে তিনি লিখেছেন—'আমার বাচ্চা যখন দু'ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়ে যেত সেই সময়ে আমি এই বই লিখেছি। আমার ভেজা চুল শুকাতে শুকাতে আমি বেশ কিছু পড়াশোনা করে ফেলতাম।'

অনেক নারী লেখিকা অনেক বড় বড় বই লিখেছেন। অনেকে আবার বৈজ্ঞানিক অঙ্গনে বড় অবদান রেখেছেন। আগ্রহ থাকলে আপনার দ্বারাও এমন কিছু করা সম্ভব। আপনার স্বামী কোনো বিষয়ে গবেষণা করলে তাঁকে সাহায্য করুন। একজন নারী শিক্ষিত হওয়ার পরও তাঁর সকল জ্ঞান বেকার ফেলে রাখা কষ্টের বিষয় নয় কি? জ্ঞানের চেয়ে উৎকৃষ্ট সম্পদ আর কিছু নেই। যে ব্যক্তি রাত-দিন জ্ঞান অর্জনের পেছনে ব্যয় করে, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর ওপর দয়া করবেন।

পড়াশোনা কিংবা গবেষণার কাজ ইত্যাদিতে যদি আপনার আগ্রহ না থাকে তাহলে বিভিন্ন হাতের কাজ, সৌখিন শিল্প, যেমন: জামা বানানো, ছবি আঁকা, কাপড় বোনা, ফুল সাজানো ইত্যাদি কাজ করতে পারেন। এই ধরনের শৈল্পিক কাজ শিখে প্র্যাকটিস করতে পারেন। এগুলোতে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে আপনি আর্থিক ও মানসিকভাবে উপকৃত হবেন।

ইসলাম নারীদেরকে অবসরে হাতের কাজ করার প্রতি উৎসাহিত করেছে। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন—
অর্থ: “আমাদের মাঝে দরাজ হাতের অধিকারী ছিলেন যয়নব। কারণ তিনি (হস্তশিল্পে দক্ষতার কারণে) নিজ হাতে কাজ করতেন এবং (টাকা উপার্জন করে) দান করে দিতেন।”১১৬

আরেক বর্ণনায় আছে—
অর্থ: 'হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর স্ত্রী হস্তশিল্পে দক্ষ ছিলেন। হস্তশিল্পের আয় দ্বারা স্বামী-সন্তানের ব্যয় নির্বাহ করতেন। একবার তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন—'হে আল্লাহর রাসূল, আমি হাতের কাজ করে তা বিক্রি করি এবং স্বামী-সন্তানের আয়ের আর কোনো উৎস না থাকায় আমি নিজেই তাদের পিছনে ব্যয় করি। তাদের জন্য ব্যয়ের কারণে আর কাউকে দান-সদকা করতে পারি না। আমি কি এই ব্যয়ের সওয়াব পাবো?' নবীজি বললেন— “ব্যয় করতে থাকো অবশ্যই তুমি (সদকার) সওয়াব লাভ করবে।”১১৭

টিকাঃ
১১৬ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৬৩১৬।
১১৭ মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ১৬০৮৬।

📘 দ্য কেয়ারিং ওয়াইফ > 📄 সন্তান প্রতিপালন

📄 সন্তান প্রতিপালন


সুন্দর এই পৃথিবীতে সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ও পবিত্র শব্দের নাম 'মা'। এক অক্ষরের একটি ছোট্ট শব্দ 'মা'। সন্তানের সাথে যার নাড়ির সম্পর্ক। স্নেহময়ী মায়ের হাসি, মন উজাড় করা ভালোবাসা, আদর-স্নেহে সন্তানের মনে বয়ে যায় অনাবিল আনন্দের ঝরনাধারা। সব দুঃখ-কষ্ট আর বেদনা 'মা' শব্দের মাঝে বিলীন হয়ে যায়। সন্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হচ্ছেন মা। মা হলেন একজন সন্তানের নিকট অধিক মর্যাদাবান ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তাই সন্তানের প্রতি মায়ের রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

মায়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো—নিজ সন্তানদেরকে যথাযথভাবে লালন-পালন করা। মমতা জড়ানো ভালোবাসা দিয়ে, স্নেহমাখা শাসন দিয়ে কোলে-পিঠে করে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা। তবে এটি সহজসাধ্য কোনো কাজ নয়। বরং তা বড়ই গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র একটি দায়িত্ব। যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক মায়ের ওপরই ন্যস্ত হয়ে থাকে। সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্মরণে রাখা সবিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য—

১. সন্তান দাম্পত্য বন্ধনের ফসল
মানুষ মাত্রই একটি সময় পেরুলেই পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়। বহুদিনের স্বপ্নে বোনা জালের যেন ইতি ঘটে 'কবুল' শব্দ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। তবে বিয়ে করার পেছনে রয়েছে মানুষের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। জৈবিক চাহিদা পূরণ, প্রেমানুভূতির তীব্র আকর্ষণ প্রভৃতি কারণে প্রণয়যুগল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও, সন্তান লাভকে মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করে কোনো দম্পতি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে, এমন নজির খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে এই মানসিকতা বদলাতে খুব একটা সময়ও লাগে না। প্রকৃতির চিরাচরিত অমোঘ বিধান যখন তাদের কাছে প্রতিভাত হয়, তখন সন্তান লাভের এক দুর্বার আকর্ষণ তাদেরকে পেয়ে বসে। সমগ্র হৃদয়জুড়ে ছেয়ে যায়, একটি সন্তান লাভের অনিঃশেষ আকুলতা।

একটি ঘর আলোকিত করে যখন কোনো নব অতিথির আগমন ঘটে, তখনই দাম্পত্য জীবন কেমন যেন সার্থকতা লাভ করে। সন্তানবিহীন সংসার, এ যেন ফলবিহীন বৃক্ষ। একটি শিশুই পারে স্বামী-স্ত্রীর হৃদ্যতার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে তুলতে। শিশুই পারে পিতার কর্মোদ্যমতা বাড়িয়ে তুলতে, সংসারকে গুছিয়ে তোলার ব্যাপারে মাকে অনুপ্রাণিত করতে। নিছক যৌন ক্ষুধা ও কামচাহিদা নিবারণের সমাজসিদ্ধ পদ্ধতি ভেবে বিয়ে করলে সে বিবাহ কখনোই টেকসই হয় না। স্বার্থ চুকে গেলে কিংবা মোহ কেটে গেলে সহসাই বিবাহাবসান ঘটে যায়। যেই ভিত্তিমূল বিবাহবন্ধনকে সুদৃঢ় করে, তা হলো সন্তান গ্রহণ।

তখন একান্ত মিলনের মাধ্যমে যৌন স্বাদ গ্রহণের চাইতে সন্তান গ্রহণের বিষয়টিই দম্পতিদের মুখ্য উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। দৈহিক তৃপ্তিটা তখন গৌণ উদ্দেশ্যে পর্যবসিত হয়। একটা সন্তান লাভের জন্য স্বামী-স্ত্রীর দিন-রাত চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না। কোমলমতি সন্তানের আধো আধো বোলে কথা বলা, নিষ্পাপ হাসির আভা ফুটিয়ে সমগ্র ঘরময় আলোকিত করে তোলা, এগুলোই যেন পিতামাতার হৃদয়ে উষ্ণ আবেগানুভূতির ছোঁয়া দিয়ে যায়।

এজন্যই আমাদের প্রিয় নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— অর্থ: "প্রতিটি শিশুই জান্নাতি হয়ে জন্ম নেয়।"

তিনি আরও বলেন—
অর্থ: “অধিক সন্তান গ্রহণের মাধ্যমে তোমরা বংশ বৃদ্ধি করো। কারণ আমার একান্ত ইচ্ছা, কিয়ামতের দিনে অন্যান্য নবিগণের সম্প্রদায়ের ওপর তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমার গর্বের কারণ হবে।”১১৯

২. শিশু শিক্ষা
সন্তানের প্রতি মায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, স্বীয় সন্তানকে শিক্ষা-দীক্ষায় পরিপূর্ণ করে, মেধা-মননে বিকশিত করে, তাকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা। যদিও মাতা-পিতা উভয়কেই সমানতালে দেখভালো করে সন্তানকে গড়ে তুলতে হয়, তবে মায়ের দায়িত্বটা তুলনামূলক একটু বেশিই বটে। কারণ একমাত্র মায়েরাই পারেন তাদের সন্তানকে সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় রাখতে।

মায়েরা যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের সন্তানদের লালন-পালন করতে পারেন, তাহলে শুধু গোটা জাতি নয়, বরং সমগ্র বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। সুতরাং বলা যেতেই পারে, নারী জাতির হাতেই রয়েছে সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। হাদিসে এসেছে—
অর্থ: 'এক ব্যক্তি জিহাদে যাওয়ার বিষয়ে নবিজীর কাছে পরামর্শ চাইলে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মা জীবিত আছে?” লোকটি বললো, 'হ্যাঁ'। নবিজী বললেন, “যাও মায়ের সেবায় লেগে থাকো। কেননা, তার পদতলেই জান্নাত।”১২০

আরেক বর্ণনায় আছে—
অর্থ: “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।”১২১

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজ তারা যা শিখবে আগামীতে সেটাই তারা প্রয়োগ করবে। পরিবারগুলো ভালো হলে গোটা সমাজব্যবস্থায় এক অনাবিল শান্তি বিরাজ করবে। কারণ নির্দিষ্ট সংখ্যক পরিবারের সমন্বয়েই গঠিত হয় একটি সমাজ। আগামীর বিশ্ব দূষিত হবে আজকের রগচটা, একগুঁয়ে, জেদি, অকালকুষ্মাণ্ড, কাপুরুষ, স্বার্থপর, বেপরোয়া, নির্দয় বাচ্চাদের দ্বারা। অপরদিকে আজকের শিশুরা যদি হয় সৎ, শিষ্টাচারবোধ সম্পন্ন, সুহৃদয়, আস্থাভাজন ও সাহসী, তাহলে আগামীর বিশ্ব হবে আরও সুন্দর, আরও উন্নত এবং তারাই এর সুফল ভোগ করবে।

অতএব নিজ শিশুকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে পিতা, বিশেষভাবে মাতা সমাজের নিকট দায়বদ্ধ। নিজ সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ রূপে গড়ে তুলে বাবা-মাও সমাজ বিনির্মাণে কার্যকরী অবদান রাখতে পারেন। আর সন্তানদের প্রতি দায়িত্বহীনতা তাদেরকে কেয়ামতের দিন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে অমোঘ বিধান হলো—প্রত্যেক মাতাপিতার হৃদয়ে এই ভাবানুভূতি জাগ্রত হওয়া চাই যে—আমার সন্তান আমারই প্রতিনিধিত্ব করছে। সে ভালো হলে তার কৃতিত্ব আমাকেই দেয়া হবে। আবার সে বখাটে হয়ে গেলে তার দায়ভারও আমি কিছুতেই এড়াতে পারবো না। তাকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলা, সুশিক্ষায় দীক্ষিত করে তোলা, প্রকৃত সত্য-সুন্দরের পথের সন্ধান দেয়া, সর্বোপরি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্বের পরিধি অপরসিম। মোটকথা—বাবা-মায়ের নিবিড় পরিচর্যায় সন্তান আদর্শ মানবে পরিণত হলে বাবা-মায়ের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার। অপরদিকে তাদের ভাবলেশহীন গুরুত্বহীনতার কারণে সন্তান বিপথে চলে গেলে এর জন্য হতে হবে কঠোর জবাবদিহিতার সম্মুখীন।

তবে একথাও সত্য—একটি শিশুকে আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে বহুবিধ কার্যকরী কলাকৌশল রয়েছে, সে সম্পর্কে আজকালকার মায়েদের অভিজ্ঞতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এজন্য প্রথমে তাদেরকে অভিজ্ঞজনদের থেকে এই কলাকৌশলগুলো আয়ত্ত করে নিতে হবে। এছাড়া বর্তমান বাজারে এ সংক্রান্ত অসংখ্য বইয়েরও সন্ধান পাওয়া যায়। বিজ্ঞ লেখকগণ তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলির সর্বোচ্চটা নিংড়ে দিয়ে বইগুলোকে পাঠকবান্ধব করতে, সৃজনশীলতার অনুপম প্রয়োগে মনের মাধুরী দিয়ে ঢেলে সাজাতে কোনো প্রকার কার্পণ্য করেননি।

মায়েরা এসকল বই সংগ্রহ করতে পারেন। তারপর নিজের লব্ধ অভিজ্ঞতার সাথে সমন্বয় করে সে আঙ্গিকে বাচ্চাদের দীক্ষিত করতে পারেন। ধীরে ধীরে তিনিও বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠবেন। তখন তিনি আবার নবীন মায়েদের তালিম দিবেন।

একটি বিষয় ভালোভাবে জেনে রাখা দরকার, আমাদের অনেকেই 'শিক্ষাদান' ও 'প্রশিক্ষণদান' শব্দদ্বয়কে এক ও অভিন্ন মনে করে গুলিয়ে ফেলি। অথচ এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। শিক্ষাদান মানে হলো, জ্ঞান অর্জন বা বিতরণ। আর প্রশিক্ষণদান মানে হলো, অর্জিত জ্ঞানের বাস্তব প্রতিফলন। বাচ্চাদেরকে শিক্ষণীয় গল্প শোনানো, গঠনমূলক কবিতা আবৃত্তি করানো, পবিত্র কুরআনের মর্মবাণী অনুধাবন করানো, নবি-রাসূলগণের জীবনচরিত ও মণীষীগণের গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের আলোচনা শোনানো, প্রভৃতি শুধু তাদের জানার পরিধিকেই বিস্তৃত করবে। জানাকে মানায় পরিণত করাই হলো মূল বিবেচ্য বিষয়। স্বর্ণযুগের সোনালী মানুষদের স্বর্ণালী ইতিহাস পড়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না, বরং তাঁদের জীবনালেখ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সেই আলোকে জীবন গঠনের মাঝেই রয়েছে প্রকৃত সার্থকতা।

সুতরাং আমাদের এমন এক দ্বীনি আবহ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেই পরিবেশের নূরানি প্রবাহে নিজ থেকেই বাচ্চারা নিজেদেরকে সৎ ও ন্যায়-নিষ্ঠাবান হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রাণিত হবে। কোনো বাচ্চা যদি এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যেখানে সততা, সাহসিকতা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলাবোধ, ভালোবাসা, অনুরাগ, ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, আস্থানির্ভরতা ইত্যাদির চর্চা ও অনুশীলন হয়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাচ্চাটির মাঝেও এই সুকুমারবৃত্তিগুলোর বিকাশ ঘটবে।

অন্যদিকে যেই পরিমণ্ডলের নিত্যদিনের সঙ্গী হলো দুর্নীতি, প্রতারণা, রেষারেষি, অন্যায়, অশালীনতার প্রাদুর্ভাব, এমন নাভিশ্বাস হয়ে ওঠা পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানের মাঝেও কুণ্ডলী পাকিয়ে ফণা তুলে থাকবে বিষধর কাল নাগসাপ। খতিয়ে দেখলে জানা যাবে—এই বাচ্চাটিও অসংখ্য গুণগ্রাহী ব্যক্তির জীবনী পড়েছে, শুনেছে। কিন্তু তা হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি, সেই আলোকে জীবন পরিচালিত করতে পারেনি।

মা-বাবা যদি সৎ ও আদর্শবান না হন, তাহলে সন্তানকে যতই কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান বিতরণ করা হোক না কেন, সেই সন্তানের শিষ্টজ্ঞান সম্পন্ন সভ্য ও ভদ্র সন্তান হিসেবে গড়ে ওঠা খুব কঠিন। কারণ প্রত্যেক সন্তানের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থাকে তার বাবা-মায়ের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনার দিকে; তারা সন্তানকে কী উপদেশ দিচ্ছে বা নীতিবাক্য গলধঃকরণ করাচ্ছে, সেদিকে নয়।

সুতরাং আমরা যারা প্রকৃত অর্থেই নিজ সন্তানদেরকে উত্তম মানসিকতার অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, সর্বপ্রথম আমাদের নিজেদের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সর্বাগ্রে নিজেদেরকে শুধরে নিতে হবে। এটি হলো একমাত্র পথ ও পন্থা।

টিকাঃ
১১৯ আবু দাউদ, হাদিস নং: ২০৫০, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ২০৪৩; বাইহাকি, হাদিস নং: ২৭৩৩।
১২০ মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ১৫৫৩৮, সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৩১০৪।
১২১ মুসনাদুশ শিহাব, হাদিস নং: ১১৯।

📘 দ্য কেয়ারিং ওয়াইফ > 📄 আহার ও পরিচ্ছন্নতা

📄 আহার ও পরিচ্ছন্নতা


মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো— সন্তানদের আহারাদির ব্যবস্থা করা। শিশুর শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতা, মানসিক প্রফুল্লতা-নিরানন্দতা, আত্মিক সজীবতা-নির্জীবতা প্রভৃতির সিংহভাগই নির্ভর করে সন্তানের খাদ্যাভ্যাসের ওপর।

বস্তুত প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্রময় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সপ্তাহ ঘুরে মাস পেরোলেই তাদের খাবারে আনতে হয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

তবে শিশুর জন্য সবচাইতে পুষ্টিকর খাদ্য হলো দুধ। একটি সুস্থ দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য উপাদানই দুধের মাঝে রয়েছে। তাই শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। কারণ মায়ের দুধে এমন কিছু উপাদান আছে, যা শিশুর হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলে। এজন্যই মায়ের দুগ্ধপানে শিশুর কোনো প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। এছাড়া মায়ের দুধকে ফুটিয়ে কিংবা পাস্তুরিত করে অথবা ভিন্ন কোনো উপায়ে পরিশোধিত করার অতিরিক্ত কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। আর খাঁটি মানের নিশ্চয়তা একমাত্র মায়ের দুধেই মেলে। তাই বলা যায়, শিশুর জন্য মায়ের দুধের মতো স্বাস্থ্যসম্মত ও আদর্শ খাদ্য আর কিছুই হতে পারে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সাবেক প্রধান পরিচালক ডাক্তার এ. এইচ. তাবা বলেছিলেন— 'যে বিষয়টি শিশুকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নিপতিত করে, তা হলো মায়ের দুধপান থেকে বঞ্চিত হওয়া। এই মাতৃদুগ্ধই নবজাতকের জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করে।'

তবে মাতৃদুগ্ধ তখনই পুষ্টিকর হবে, যখন মায়ের খাদ্যের মান সুষম ও পুষ্টিকর হবে। তিনি যত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করবেন, তার দুধও ততো পুষ্টিকর হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যে মায়েরা অসচেতন, তারা বাচ্চাদের দুগ্ধ পান করাতে গেলে স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগবেন। তাদের বুকের দুধ খেয়ে বাচ্চারাও অপুষ্টিতে ভুগবে। তাই প্রতিটি বাবার উচিত, নিজ সন্তানের মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যত্নবান হওয়া। তাদেরকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দেওয়া। কারণ পুষ্টিহীনতা অতিমাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তা থেকেই নাম না জানা বহু দুরারোগ্য ব্যাধি জন্ম নেয়। তাই স্তন্যদানকারিণী প্রত্যেক মাকে নিজ খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে যত্নশীল হওয়া চাই। দুগ্ধজাত খাদ্য থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, তরি-তরকারি, শাক-সবজি, ফলমূল পর্যন্ত প্রতিটি উপাদানই তার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা চাই।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় জানা থাকা চাই— মাতৃদুগ্ধ সন্তানের মানবিক গুণাবলির ওপর প্রভাব ফেলে। এজন্যই দাইমা নিয়োগের প্রয়োজন হলে নিয়োগকালে একটু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত। কারণ মায়ের দুধের প্রভাব সন্তানের দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায়।

আর সন্তানকে দুধ পান করানোর নিয়ম হলো— রুটিনমাফিক নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে দিয়ে দুধ পান করানো। এতে করে বাচ্চা নিয়মানুবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শিশুকাল থেকেই সে সহনশীল মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠবে। তাছাড়া এটি তার পাকস্থলী ও হজম প্রক্রিয়াকেও স্থিতিশীল রাখবে। কিন্তু সময়জ্ঞানের তোয়াক্কা না করেই বাচ্চা কেঁদে উঠলেই যদি খেতে দেওয়া হয়, তাহলে তার মাঝে শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত হবে না। সামান্য কিছুতেই কান্না জুড়ে দিয়েই সব কিছু আদায় করে নেওয়ার মানসিকতা, সব আবদার মিটিয়ে নেওয়ার অভ্যাস কিন্তু সে সহসা ছাড়তে পারবে না। বড় হলেও এই ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবটি তার মাঝে রয়ে যেতে পারে। যার ফলে তার মাঝে কখনোই দৃঢ় মনোবল সৃষ্টি হবে না। আত্মপ্রত্যয়ের ঘাটতি তার মাঝে রয়ে যাবে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার উচ্চমানসিকতা তার নাও হতে পারে। সামান্য বিপর্যয়েই সে হতাশ হয়ে পড়তে পারে।

অনেকেই মনে করেন যে— বাচ্চা-কাচ্চাদের সুশৃঙ্খল করে গড়ে তোলা বড়ই ঝক্কিঝামেলার কাজ, এটি অসম্ভবপ্রায় একটা বিষয়। কারণ শিশুমন কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সদা-সর্বদা উল্লাসে মেতে থাকতে চায়। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়। বরং একটু কৌশলী হলেই, বাচ্চারাও নিজ থেকেই নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীনে চলে আসবে। তবে এজন্য একটু বেশিই ধৈর্যশীল হতে হবে এবং সুদূর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে— প্রতি ৩-৪ ঘণ্টা পরপর বাচ্চাকে দুধপান করাতে হবে। স্তন্যদানকালে কোলে তুলে নিন। পরম আবেশে জড়িয়ে ধরুন। এখন থেকেই তাকে অনুভব করতে দিন তার প্রতি আপনার ভালোবাসার গভীরতা।

শোয়া অবস্থায় বাচ্চাকে দুধ পান করানো উচিত নয়। কারণ দেখা যায়, দুধপান করাতে করাতে অনেকসময় মা ঘুমিয়ে পড়েন। তখন বাচ্চার মুখে মায়ের স্তন থাকায় কিছু ক্ষেত্রে তার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ-নির্গমন করতে অসুবিধা হয়। যেখান থেকে প্রাণনাশের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকলে বাচ্চাকে গাভীর দুধও পান করানো যেতে পারে। তবে যেহেতু মাতৃদুগ্ধের তুলনায় গাভীর দুধ একটু বেশি ঘন, তাই গাভীর দুধের সাথে পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে নিতে হবে। পাস্তুরিত দুধও পান করানো যেতে পারে। তবে সেটি আগে বিশ মিনিট উনুনে ফুটিয়ে নিতে হবে। প্রচণ্ড গরম কিংবা তীব্র ঠান্ডা দুধ শিশুকে পান করানো যাবে না।

বরং মাতৃদুগ্ধের তাপমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দুধ পান করাতে হবে। প্রতিবার দুধপান শেষ হলে ফিডার বোতল ও তার চোষক (চুচুক) ভালোভাবে ধুয়ে গরম পানিতে সিদ্ধ করে নিতে হবে। সাবধান, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা টক হয়ে যাওয়া দুধ কখনোই বাচ্চাকে খাওয়াবেন না। উত্তম হলো— শিশু কতটুকু দুধ পান করল, তার হিসাব রাখা। তাহলে বাচ্চাকে পরিমাণ মোতাবেক খাওয়ানো যাবে। অতিভোজন কিংবা স্বল্পভোজনের সমস্যা দেখা দেবে না।

শিশুকে গুঁড়োদুধ খাওয়াতে চাইলে— প্রথমে কোনো শিশুবিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। তার নির্দেশনা মোতাবেক বাচ্চাকে দুধ পান করাবেন।

বাচ্চার বয়স চার মাস পেরোলে দুধের পাশাপাশি তাকে বিভিন্ন ফলের রস পান করানো যেতে পারে। ছয় মাস হয়ে যাওয়ার পর তাকে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার ও স্যুপ খাওয়ানো শুরু করা যাবে। বিস্কুট, কেক ইত্যাদিও খাওয়ানো যাবে। দধি, পনির প্রভৃতি হলো এ সময়ের জন্য বেশ উপযোগী খাদ্য। এছাড়া মাঝে মাঝে বড়দের নিয়মিত খাবারের অংশবিশেষও তাকে খেতে দেওয়া যেতে পারে।

শিশুকে স্বাভাবিক খাবার খাওয়ালেই সে পিপাসার্ত হয়ে পড়বে। তাই সময় করে করে তাকে পানিও পান করানো চাই। তবে তাকে চা-কফি পান করানো একেবারেই অনুচিত। উঠতি বয়সী বাচ্চাদের জন্য ফলমূল, শাকসবজি, স্যুপ হলো সবচাইতে বেশি উপযোগী।

শিশুর বিছানাপত্র, পোশাকপরিচ্ছদ, তোয়ালে-রুমালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুব বেশি খেয়াল রাখা চাই। কিছুক্ষণ পরপর তার হাত ও মুখ ধুয়ে দিতে হবে। নিয়মিত গোসল করাতে হবে। কারণ বাচ্চারা খুব সহজেই ময়লা ও রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাই শুরুতেই গুটিবসন্ত, জলবসন্ত, হুপিংকাশি, পক্ষাঘাত, গলগণ্ড, হাম প্রভৃতি রোগের টিকা দিয়ে নেবেন। এসকল রোগের টিকা বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহজেই পাওয়া যায়। সকল প্রকার স্বাস্থ্যনীতির যথাযথ অনুসরণ করে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে চলতে পারলেই আমাদের সন্তানরা সুস্থ দেহ ও প্রশান্ত মনের অধিকারী হবে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকরী অবদান রাখবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00