📄 খাদ্য প্রস্তুত করা
পরিবারের সকলের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করাও একজন গৃহিণীর গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। একজন ভালো গৃহিণী একইসাথে একজন ভালো রাঁধুনিও বটে, যিনি স্বল্প ব্যয়ে সুস্বাদু খাবার প্রস্তুত করতে সক্ষম। কিন্তু একজন অদক্ষ গৃহিণী দামি ও ভালো উপকরণ থাকা সত্ত্বেও সুস্বাদু খাবার প্রস্তুত করতে পারেন না। সুস্বাদু খাবারের মাধ্যমে স্বামী তার স্ত্রীর দিকে আকর্ষিত হন। একজন স্বামী, যার স্ত্রী ভালো রান্না করেন, তিনি খুব উপভোগ করেন ও তৃপ্তি নিয়ে খাবার খান।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
অর্থ: “মহিলা যদি নিজ স্বামীর হক (যথার্থরূপে) জানত, তাহলে তার দুপুর অথবা রাতের খাবার খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে (তার পাশে) দাঁড়িয়ে থাকত।”৭৪
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন—
অর্থ: “পরিবারের জন্য তুমি যা ব্যয় করবে তার প্রতিদান অবশ্যই পাবে। এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমাটি তুলে দিবে, তার প্রতিদানও।”৭৫
এমনকি হাদিসে এটাও উল্লেখ করা আছে—
অর্থ: "তোমাদের প্রত্যেকে নিজ স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও সদকা।"৭৬
হযরত আবু বকর রাযিআল্লাহু আনহু-এর কন্যা আসমা রাযিআল্লাহু আনহা বলেন—
অর্থ: 'আমি নিজে আমার স্বামী যুবাইরের সংসারের সব কাজ করতাম। তার কিছু ঘোড়া ছিল, আমি সেগুলো দেখাশোনা করতাম। সংসারের সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ঘোড়া পালন। আমি সেগুলোর জন্য ঘাস কাটতাম এবং যাবতীয় সব দেখাশোনা করতাম।”৭৭ আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি আরও বলেন, 'আমি বালতিতে করে দূর থেকে পানি আনতাম। আটা পিষতাম। রুটি বানাতাম। তিন মাইল দূরের বাগান থেকে খেজুরের বোঝা মাথায় করে নিয়ে আসতাম”।৭৮
সুস্বাদু রন্ধনপ্রণালীর জন্য অনেকগুলো রেসিপি আছে, যার সবগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই রেসিপির উপর অনেক ভালো ভালো বই আছে, যেগুলো রান্নার কাজে অনেকে ব্যবহার করে থাকেন। তবে কিছু পয়েন্ট মনে রাখা জরুরি—
খাওয়ার উদ্দেশ্য কিন্তু শুধু পেট ভরা নয়। এটি যেন একইসাথে শরীরের পুষ্টি এবং ভিটামিন সরবরাহ করে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে, যার মাধ্যমে আমাদের দেহপ্রক্রিয়া সচল থাকে। দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো মাছ, মাংস, ফলমূল, শাকসবজি এবং শস্য থেকে পাওয়া যায়। এই পুষ্টি উপাদানগুলোকে ৬টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ৬টি শ্রেণি উল্লেখ করা হলো:
▶ পানি।
▶ খনিজ জাতীয় পদার্থ। যেমন—ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ইত্যাদি।
▶ শর্করা জাতীয় পদার্থ।
▶ চর্বি জাতীয় পদার্থ।
▶ প্রোটিন।
▶ ভিটামিন এ, বি, সি, ডি, ই, কে ইত্যাদি।
একজন মানুষের দেহের ওজনের বেশিরভাগ অংশই হচ্ছে পানি। শক্ত খাবারগুলোকে পানি অন্ত্রে শোষণের উপযোগী করে তোলে, হজমে সাহায্য করে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। হাড়, দাঁত, মাংসপেশির গঠন ও ক্রিয়াকলাপের নিয়ন্ত্রণের জন্য খনিজ পদার্থ ও পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্বোহাইড্রেট তাপ ও শক্তি উৎপাদন করে। প্রোটিন দেহের বৃদ্ধিতে পুরনো বা মৃত কোষগুলোর প্রতিস্থাপনে সহায়তা করে। ভিটামিনগুলো শরীরের বৃদ্ধিতে, হাড় শক্তিশালীকরণে, দেহের রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে এবং একটি সুস্থ স্বাভাবিক স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপরোক্ত সবগুলি পদার্থ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়।
অপুষ্টিজনিত কারণ অনেক অসুস্থতার সৃষ্টি করে এবং তা মারাত্মক রূপও ধারণ করতে পারে। খাবারের গুণগত মান খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং একজন মানুষের জীবনচক্র, তার সুখ-দুঃখ, তার সৌন্দর্য, কদর্যতা, সুস্থ স্নায়ুতন্ত্র এমনকি মানসিক ব্যাধিগুলোর সাথে খাবারের সম্পর্ক সমানুপাতিক। আমরা তাই-ই যা আমরা খাই। যদি কেউ তার খাবার পর্যবেক্ষণ করেন এবং খাদ্যাভ্যাসের যত্ন নেন তবে তিনি কম অসুস্থ হন। গুণগত মান বিচার না করে কেবল সুস্বাদু খাবার খাওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। গুণগত মান দেখে, পুষ্টিকর খাবারই আমাদের গ্রহণ করা উচিত।
সঠিক খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ না করার ফলে কারো স্বাস্থ্য যদি একবার ভেঙে যায় তাহলে তাকে অবশ্যই চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আগের মতো স্বাস্থ্য আবার ফিরে পাওয়া বেশ কঠিন। মিকদাম ইবনে মাদীকারিব রাযিআল্লাহু আনহু বলেন—
অর্থ: 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, "মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র ভর্তি করে না। যতটুকু আহার করলে মেরুদণ্ড সোজা রাখা সম্ভব, ততটুকু খাদ্যই কোনো ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। এরপরও যদি কারো আরও খেতেই হয়, তবে সে পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।”৭৯
যেহেতু একটি পরিবারের রন্ধন প্রণালী ও খাবার প্রস্তুত করার দায়িত্ব গৃহিণীর উপর, তাই তাকে সবার স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রেখে পুষ্টিকর ও গুণমানসম্পন্ন খাদ্য প্রস্তুত করতে হবে। তার ছোট্ট একটি অসতর্কতা পরিবারের সবার স্বাস্থ্য ঝুঁকির এবং অসুস্থতার কারণ হতে পারে। সুতরাং একজন গৃহিণীর ভালো রান্না করা ছাড়াও খাবারের গুণগত মান শনাক্ত করার সক্ষমতা থাকা উচিত।
প্রথমত—তাকে এমন সব খাবার তৈরি করতে হবে যা সঠিক এবং সুষম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এবং যা একজন মানুষের দেহের কাজগুলো সঠিকভাবে চালনা করতে সক্ষম। একবার নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক নারীকে জিজ্ঞেস করলেন—
অর্থ: “তুমি তোমার স্বামীর সাথে কেমন আচরণ কর?” তিনি বললেন, 'নিজের সাধ্যের মধ্যে আমি তার সেবা-যত্নে বিন্দুমাত্রও ত্রুটি করি না।' নবিজী বললেন, “সাবধান থেকো! তার সেবাই তোমাকে জান্নাতে পৌঁছাবে বা জাহান্নামে”।৮০
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
অর্থ: “আমি কি বলে দেবো তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে জান্নাতি কারা? যারা মমতাময়ী, অধিক সন্তান প্রসবকারী, স্বামীবান্ধব, নিজের দোষ বা স্বামীর দোষ উভয় ক্ষেত্রেই সে স্বামীর হাতে হাত রেখে বলে, আপনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমার চোখে ঘুম নামবে না।”৮১
দ্বিতীয়ত—সকল মানুষের খাদ্যতালিকা এক রকম নয়। বয়স, শরীরের আকার এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলি আমাদের দেহের পুষ্টির প্রয়োজনীয়তার মাত্রা নির্ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়:
১. একটি শিশু, যার বাড়ন্ত শরীর, মাঝারি বয়সী ব্যক্তির তুলনায় তার আরও বেশি ক্যালসিয়াম প্রয়োজন।
২. যুবকদের খাদ্য তালিকায় শর্করা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য প্রয়োজন। কারণ শর্করা জাতীয় খাদ্য শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে; তারা সবসময় কোনো না কোনো ক্রিয়াকর্মের মধ্যেই থাকে। একজন মানুষের কাজের ধরনও নির্ধারণ করে প্রতিদিন তার কী ধরনের খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ—একজন শ্রমিকের চর্বি, চিনি এবং স্টার্চযুক্ত খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ তিনি খুব সক্রিয়, সবসময় কাজের মধ্যেই থাকেন।
খাদ্যদ্রব্যের ভিন্নতার আরেকটি কারণ হচ্ছে আবহাওয়া। আমাদের শরীরে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা গ্রীষ্ম এবং শীত ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন হয়। এছাড়াও একজন অসুস্থ ব্যক্তি ও একজন সুস্থ ব্যক্তির খাদ্যদ্রব্যের তালিকা আলাদা হয়। একজন ভালো গৃহিণীর এই সমস্ত বিষয়ের প্রতি সমানভাবে দৃষ্টি রাখা উচিত।
তৃতীয়ত—এটি সত্য যে, কারো বয়স যদি চল্লিশ বা তার বেশি অতিক্রম করে, তখন তার চর্বি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সম্ভবত কিছু লোক এই স্থূলতাকে সুস্বাস্থ্যের চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। কিন্তু তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। স্থূলতা কখনোই স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী নয়। এটি একটি অসুস্থতা, যা হার্ট, রক্তচাপ, কিডনি, পিত্তথলি এবং যকৃতের উপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলে এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো কঠিন রোগ হতে পারে। চিকিৎসা উৎস থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান মতে—পাতলা লোকেরা স্থূল ও চর্বিযুক্ত লোকদের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকে।
চল্লিশ বছর বয়সের পরে একজন ব্যক্তির সক্রিয়তা কমে যায়। তার কাজকর্মে আর আগের মতো ব্যস্ততা থাকে না। যার ফলে তার বেশি ফ্যাট, চিনি এবং স্টার্চযুক্ত খাবারের প্রয়োজন হয় না। ক্যালরিগুলো আগের মতো আর শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না, যা শরীরের মেদ বাড়িয়ে দেয়। তাই, এই খাদ্যদ্রব্যের ব্যবহার যত বেশি হ্রাস করা যায় ততই স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।
যে মহিলা তার স্বামীর স্বাস্থ্যের যত্ন নিচ্ছেন তাকে অবশ্যই একটি বিশেষ ডায়েট অনুসরণ করা উচিত, যেন তার স্বাস্থ্য এবং মেদ না বেড়ে যায়। তাকে খুবই স্বল্প পরিমাণে মিষ্টি, চর্বি এবং ক্রিম জাতীয় খাবার খাওয়ানো উচিত। তবে ডিম, কলিজা, হাঁস-মুরগি, মাছ, লাল মাংস এবং পনির বেশি পরিমাণে খেতে হবে। দুগ্ধজাত খাদ্যদ্রব্যও তার স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী হতে পারে যদি তা ডাক্তার দ্বারা অনুমোদিত হয়। অতিরিক্ত ভারী ব্যক্তির জন্য প্রচুর পরিমাণে ফলমূল এবং শাকসবজি গ্রহণ করা উচিত।
আপনি যদি আপনার স্বামীর প্রতি বিরক্ত হন বা আপনি যদি বিধবা হতে পছন্দ করেন অথবা যদি চান কোনো মামলা-মোকদ্দমার ঝুঁকি ছাড়াই আপনার স্বামীকে হত্যা করবেন, তাহলে আপনাকে বেশি কিছু করতে হবে না। আপনি শুধু তার সামনে প্রচুর পরিমাণে সুস্বাদু এবং চর্বিযুক্ত খাবার রাখুন। তাকে যতটা সম্ভব বারগার, ভাত এবং কেক খেতে উৎসাহিত করুন। ফলস্বরূপ আপনি তার কাছ থেকে মুক্তি পাবেন। এবং আপনি যে কেবল তাকে হত্যা করতে পারবেন তা নয়, তিনি আপনাকে এই সমস্ত সুস্বাদু খাবার খাওয়ানোর জন্য ধন্যবাদও জানাতে পারেন।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন—
অর্থ: “যে নারী স্বামীর মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তার কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, আল্লাহ তাআলা তার দিকে ফিরেও তাকান না।"৮২
আপনি হয়তোবা এটিও বলতে পারেন যে—এই ধরনের পরিকল্পনা শুধু ধনী ব্যক্তিদের জন্যই সম্ভব। কারণ তারা চাইলে যেকোনো ধরনের খাবার কিনতে পারেন। যারা তত স্বচ্ছল পরিবারের নয় তাদের জন্য এই পরিকল্পনা অসম্ভব বলেও মনে করতে পারেন। তবে একজন মানুষের একথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে—সমস্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার খুবই সহজলভ্য এবং প্রাকৃতিক খাবারগুলিতেই সেই পুষ্টিগুণ লুকানো থাকে।
রান্নায় অভিজ্ঞ একজন মহিলা আপনাকে বলতে পারবেন যে—ফলমূল, শাকসবজি, সিরিয়াল বা ভক্ষ্যশস্য জাতীয় খাদ্য এবং দুগ্ধজাত খাবার থেকে একজন ব্যক্তি তার শরীরের জন্য সমস্ত পুষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারেন। একজন ব্যক্তি এসব উপাদানগুলি মিলিয়ে খুব সুস্বাদুভাবে তার জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতে পারেন, যা একইসাথে স্বাস্থ্যকর এবং সস্তা।
টিকাঃ
৭৪ তাবারানি, হাদিস নং: ১৬৭৪৭।
৭৫ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২৭৪২-৩৯৩৬।
৭৬ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৩২৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৫৩।
৭৭ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১৮২।
৭৮ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১৮৩।
৭৯ সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ১৫৯৫; জামে তিরমিজি, হাদিস নং: ২৩৮০।
৮০ মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ১৯০০৩; মুসতাদরাক, হাদিস নং: ২৮১৮।
৮১ সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৯০৯৪।
৮২ সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৯০৮৬; বায়হাকি, হাদিস নং: ১৪৭২০; মুসতাদরাক, হাদিস নং: ২৮২০।
📄 অতিথি আপ্যায়ন
মাঝেমধ্যে মেহমান বা অতিথিদের আপ্যায়ন করা প্রত্যেক পরিবারের জন্য একটি অনিবার্য দায়িত্ব। এটি একটি মজার ঐতিহ্য আর এই ঐতিহ্য পালনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার আত্মীয়তার সম্পর্ক শক্তিশালী হয় এবং কিছু সময়ের জন্যে হলেও মানুষ তার সমস্যাগুলি ভুলে থাকতে পারে। এছাড়া আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দেওয়া সময় কাটানোর অন্যতম ভালো মাধ্যম।
একজন উদার ব্যক্তি অপরের প্রদানকৃত খাবার গ্রহণ করে থাকে, যাতে অন্যরাও তার দেয়া খাবার গ্রহণ করে। অন্যদিকে কৃপণ ব্যক্তি অপরের দেয়া খাবার গ্রহণ করে না এই ভয়ে যে অন্যরা তার খাবারে ভাগ বসাবে।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন- অর্থ : “যারা আমার জন্য পরস্পর বন্ধুত্ব করে তাদেরকে ভালোবাসা আমার দায়িত্ব হয়ে যায়।”<sup>৮৩</sup> আরেক হাদিসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “যারা পরস্পর আমার জন্য বন্ধুত্ব করে তাদেরকে আমি কেয়ামতের দিন বিশেষ ছায়া দান করবো, যে দিন আমার ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।”<sup>৮৪</sup>
আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে মানুষের মন মানসিকতা পরিপক্কতা লাভ করে এবং কিছুটা হলেও তার আত্মা সজীব হয়। জীবনের অশান্ত সাগরে মানুষ শান্তির প্রয়োজন অনুভব করে এবং আত্মীয় বা বন্ধুর সাথে সময় কাটালে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় মানুষ তার সমস্যাসমূহের কথা ভুলে যায়। এর মাধ্যমে কেবল বন্ধুত্ব সম্পর্কই শক্তিশালী হয় না বরং এতে তার নৈতিকতার ও বিকাশ ঘটে।
অতিথি আপ্পায়ন করা মানুষের উত্তম আচার ব্যবহারের অন্যতম। এর উপকারিতা অনস্বীকার্য। তবে দুইটি কারণে বহুবছরের ঐতিহ্যবাহী এই ব্যাপারে কিছু পরিবার অনাগ্রহী হয়ে যায়-
প্রথমত- বিভিন্ন বিলাস সামগ্রীর কারণে এবং পরস্পরের সাথে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা আমাদের অনেকের জীবনকে কঠিন বানিয়ে ফেলেছে। গৃহস্থালী ব্যবহার্য জিনিসপত্র মূলত তৈরী করা হয়েছে আমাদের আরামের জন্যে এবং আমাদের জীবন সহজ করার জন্যে। অথচ এগুলো এখন লৌকিকতা ও বড়াইয়ের মাধ্যম হয়ে গেছে। এসবের কারণে লোকজনের মধ্যে সামাজিক মেলামেশার প্রবণতা কমে গেছে। এমনকি যারা সামাজিক হতে চায় তারাও মেহমানদারির বিষয়টি এড়িয়ে চলতে চাইছে। তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে, যেহেতু তাদের ঘরে যথেষ্ট পরিমাণ বিলাসবহুল পণ্য-দ্রব্য নেই, তাই তারা মনে করে, লোকজনের সাথে দূরত্ব বজায় রাখাই ভালো, এতে তারা লজ্জার হাত থেকে বেঁচে থাকবে। এ ধরনের চিন্তাচেতনা মানুষের পরকালীন জীবন নষ্ট করে এবং দুনিয়ায় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে।
বোন! তোমার বন্ধুরা কি তোমার ঘরে এসব বিলাসী জিনিসপত্র দেখতে আসে? এমন হলে তাদেরকে বলো, তোমার ঘরের বদলে যেকোনো শো-রুম বা জাদুঘরে গিয়ে ঘুরে আসতে। অন্যের সাথে মেলামেশার উদ্দেশ্য হচ্ছে বন্ধুত্ব বাড়ানো ও কিছু মজার সময় কাটানো। লোকজনকে বিলাসিতা দেখানো বা কারো উদরপূর্তি করানো এর উদ্দেশ্য নয়। এ ধরনের বিলাসিতা ও এ ব্যাপারে প্রতিযোগিতা সকলের কাছেই বিরক্তিকর। কিন্তু তবুও তারা এই ভুল ঐতিহ্য ত্যাগ করতে চায় না।
তুমি তোমার মেহমানদেরকে সহজ অনাড়ম্বরভাবে আপ্যায়ন করেই দেখো। দেখবে তারাও তোমার অনুসরণ করছে। এ পন্থা অবলম্বন করলে তুমি সহজে কম কষ্টের মধ্যেই বন্ধুদের সাথে মেলামেশার পারবে। এভাবে এ সমস্যার সমাধান করা খুবই সহজ। অপরের সাথে সম্পদের তুলনা না করে উদারতার মাধ্যমে সবার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা করা উচিত।
দ্বিতীয়ত- আরেকটি কঠিন ব্যাপার হচ্ছে অতিথিকে আপ্যায়ন করা। মেহমানদের খাবার প্রস্তুত করার জন্যে একজন গৃহিনীকে বেশ কয়েক ঘন্টা যাবত কষ্ট করতে হয়। কিছু কিছু মহিলা মজা করে রান্না করতে পারে না। এতে স্বামী মনঃক্ষুণ্ণ হয়। এসব খাবারের প্রতি সে বিরক্তিও দেখাতে পারে। এ কারণে কিছু দম্পতি বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় লোকজনকে দাওয়াত দেয়। পারতপক্ষে তারা কাউকে দাওয়াত দেওয়াকে এড়িয়ে চলতে চায়।
এটা অবশ্য সত্যি যে- একটি ভোজসভার আয়োজন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু মূল সমস্যার উদ্ভব হয় তখন, যখন ঘরের গৃহিনী মেহমানদের আপ্যায়ন করতে জানে না এবং এ ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে না। মেহমানদের আতিথেয়তা সহজ হয় যখন একজন মানুষ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে প্রস্তুত হয়।
নিচে দুটি কেসস্ট্যাডি প্রকাশ করা হলো। অতিথি আপ্যায়নের যে পদ্ধতি আপনার পছন্দ হয় সেটি অনুসরণ করতে পারেন।
ঘটনা :
“এক লোক তার স্ত্রীকে জানালো যে- শুক্রবার রাত্রে তার দশজন অতিথি আসবে। তারা রাতে খাবে। অতীতে বিভিন্ন দাওয়াতের সময় তিক্ত অভিজ্ঞতা পাওয়া স্ত্রী হঠাৎ করে রেগে যায় এবং স্বামীর সাথে প্রতিবাদ আরম্ভ করে। অনেক লম্বা আলোচনা ও স্বামী বহু মিনতি করার পর স্ত্রী অতিথিদের জন্যে বেশ বিরক্তি নিয়েই খাবার প্রস্তুত করতে রাজী হয়। শুক্রবার পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী দুজনে বিশ্রামহীন উত্তেজনার সাথে সময় কাটায়। শুক্রবার সকালে একজন কেনাকাটা করতে বের হয় এবং তার কাছে যেসব জিনিস প্রয়োজনীয় মনে হয় সেগুলো কিনে নিয়ে আসে।
গৃহিনী দুপুরের খাবার খাওয়ার পর তার কাজ আরম্ভ করে। সে অনেকগুলো সমস্যায় পড়ে যায়। তাকে রান্নাবান্না করতে হয়, ধোয়ামোছা করতে হয়, ধূলোবালি ঝাড়তে হয়, অতিথির জন্যে ঘর গোছাতে হয়, ইত্যাদি। একজনমাত্র সাহায্যকারী নিয়ে বেশিরভাগ কাজ সে একাই করে।
মাথায় অনেক চিন্তা নিয়ে সে কাজ শুরু করে। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে ছুরি খুঁজে বের করতে হয়, লবণ খুঁজে বের করা লাগে, তারপর দেখে ঘরে টমেটো নেই। টমেটো আনতে কাউকে পাঠায়। এরপর তাকে মুরগী ভাজি করতে হয়, গোশ্ত কাটতে হয়, চাল ভিজানো লাগে, সবজি ধোয়া লাগে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব কারণে তার মেজাজ গরম হয়ে যায় এবং সে হতাশ হয়ে পড়ে। এরপর কাজের মেয়ের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে, নিজের মেয়েকে অভিশাপ দেয়, ছেলে মার খায়। এমন দুঃসময়ে দেখা যায় চুলায় গ্যাস বা কেরোসিন ফুরিয়ে গেছে। সে চিৎকার দিয়ে বলে, ওহ আল্লাহ! এখন আমি কী করব!
এমন সময় হঠাৎ করে ডোরবেল বেজে উঠে, মেহমানরা এসে গেছে। তারা একে একে ভেতরে ঢুকতে থাকে। স্বামী গিয়ে তাদেরকে স্বাগত জানিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে বসায়। সে জানে যে তার স্ত্রী বেশ দুশ্চিন্তা করছে। সে মেহমানকে চা দিতে চায়, এবং দেখে তা এখনো রেডি হয়নি। কেন চায়ের কেতলি বসানো হয়নি এজন্যে সে ছেলে-মেয়েকে বকা দেয়। কোনো মতে চা বানানোর পর সে দেখে ঘরে পর্যাপ্ত চিনি নেই। আরও চিনি এনে কয়েক কাপ চা বানিয়ে মেহমানের সামনে উপস্থিত করে। মেহমানের দিকে চোখ থাকলেও তার মন থাকে রান্নাঘরে। সে তো জানেই সেখানে কী চলছে। বেচারা আরাম করে বসতেও পারে না। মেহমানের সাথে শান্ত মনে গল্পও করতে পারে না। রাতের খাবার নিয়ে সে চিন্তিত থাকে।
মেহমানদের মধ্যে মহিলা সদস্যরা থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। তারা এসে বারবার গৃহকর্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করে। স্বামীকেও বারবার বলতে হয় যে তার স্ত্রী রান্নাঘরে ব্যস্ত আছে, শীঘ্রই সে তাদের মাঝে উপস্থিত হবে। স্ত্রী মাঝে মাঝে মেহমানের সামনে যায়, তবে বেশিক্ষণ বসতে পারে না। তাদের কাছে মাফ চেয়ে সে আবার রান্নাঘরে ছুটে। এমতাবস্থায় মজাদার কিছু রান্না করা তার দ্বারা সম্ভব হয় না। রান্না শেষ করার পর থালাবাসন, পানীয়, গ্লাস, ইত্যাদি প্রস্তুত করতে হয়। লবণদান ও মরিচদান ভরে রাখতে হয়। অতিথিরা আহার শেষে বিদায় জানিয়ে চলে যায়।
উপসংহার: শেষ পর্যন্ত দেখা যায় খাবারে হয়তো লবণ বেশি নয়তো কম হয়েছে। কোনো খাবার পুড়ে গেছে তো কোনোটা আবার সেদ্ধই হয়নি। কোনো আইটেম ভুলে যাওয়ার কারণে মেহমানের সামনেই আনা হয়নি। মধ্যরাতে স্ত্রী ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে যায়। দুপুর থেকে তার কোনো বিশ্রামের সুযোগ হয়নি। মেহমানদের সাথে ঠিকমত আড্ডা দিতে পারেনি। স্বামী সারাদিন বেশ দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটিয়েছে। দাওয়াতের জন্যে তার বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে। তারপরও সেই সন্ধ্যা তাদের জন্যে উপভোগ্য হয়নি। এই দম্পতি শুধুমাত্র যে দাওয়াতে মজা করতে পারেনি এমন নয়, বরং এই দাওয়াত নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়ে গেছে। পরিশেষে তারা এ সিদ্ধান্তও নিতে পারে যে তারা আর কখনো এ ধরনের দাওয়াত করবে না।
দাওয়াতে আগত মেহমানরাও মজা করতে পারেনি। তাদের মনে হয়েছে যে এখানে এসে তারা স্বাগতিক পরিবারকে কষ্ট দিয়েছে। তারা মনে মনে ভাবতে পারে যে- তারা না আসলেই ভালো হতো।
সম্মানিত পাঠকগণ! নিঃসন্দেহে এমন পরিস্থিতি উপভোগ করবেন না এবং এমন পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুতও হবেন না কিংবা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতেও চাইবেন না। জানেন- এই সমস্যার উৎস কী? এসবের পেছনে একটিমাত্র আসল কারণ হচ্ছে, অভিজ্ঞতার অভাব এবং অতিথি আপ্পায়ণ সম্পর্কে গৃহিনীর কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা। নতুবা একটি ভোজসভার আয়োজন করা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়।
এখন কথা বলব দ্বিতীয় অপশন নিয়ে-
ঘটনা :
“আরেক লোক তার স্ত্রীকে জানালো শুক্রবার রাতে তার দশজন অতিথি আসবে এবং তারা রাতের খাবার খাবে। উত্তরে স্ত্রীর জবাব হয় এমন, 'খুব ভালো কথা। সে রাতে মেহমানের জন্যে আমরা কী প্রস্তুত করব?' দম্পতি দুজন এ ব্যাপারে একসাথে আলোচনা করে দাওয়াতের জন্যে সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটি তালিকা করে নেয়। তারা আবারো খুঁজে দেখে তাদের আরো কী কী প্রয়োজন। এরপর ঘরে যে যে জিনিস মজুদ রয়েছে তালিকায় সেগুলোর উপর ক্রস চিহ্ন দিয়ে রাখে। আর যেসব জিনিস আরো কেনা লাগবে সেগুলো তালিকায় যোগ করে নেয়। তারপর সুবিধাজনক সময়ে সেগুলো কিনে আনে।
বৃহস্পতিবার! অর্থাৎ দাওয়াতের একদিন আগে তারা কিছু কাজ সেরে রাখে। যেমন পেঁয়াজ কাটা, আলুগুলি ধুয়ে রাখা। লবণ ও মরিচদান ভর্তি করে রাখা, টেবিল ক্লথ প্রস্তুত করে ফেলা, ইত্যাদি। পরেরদিন সকালে ঘরের সবার নাস্তা খাওয়ানোর পরই গৃহিনী আরো কিছু কাজ করে ফেলে। যেমন, ধোয়ামোছা, কাটাকাটি করা, মাংস, মুরগী, আলু ইত্যাদি ভেজে রাখা ইত্যাদি। তারপর দুপুরের খাবার খাওয়ার পর সে বিশ্রাম নিতে পারে। এবং এরপর উঠে বাকি কাজগুলো করে ফেলতে পারে।
তাই কোনো প্রকার তাড়াহুড়া বা দুশ্চিন্তা না করেই সে সব রান্না শেষ করতে পারে। সবকিছুতে শৃঙ্খলা রাখতে পারে। নিজে তৈরী হওয়ার জন্যেও তার হাতে যথেষ্ট সময় থাকে। মেহমান আসার পর তাদের জন্যে চা প্রস্তুত করতে পারবে এবং স্বামীর পাশাপাশি সেও মেহমানদেরকে আপ্পায়ন করতে পারবে, তাদের সাথে গল্পও করতে পারবে। সবকিছু ঠিকমত হয়েছে কিনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্যে সে রান্নাঘরে যাবে। মেহমানদের সামনে খাবার দেওয়ার সময় সে স্বামীর সাহায্য নিতে পারবে। ফলশ্রুতিতে, সকলেই স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে তাদের মজাদার খাবার উপভোগ করবে।"
উপসংহার: উপরোক্ত ঘটনায় দেখা যায়, মেহমানরা মেজবানের সঙ্গ উপভোগ করেছে। তারা গল্প করতে পেরেছে ও তাদের মধ্যকার আত্মীয়তা আরো শক্তিশালী হয়েছে। তারা আয়োজনকৃত খাদ্য উপভোগ করতে পেরেছে। এমন আপ্যায়নের জন্যে তারা গৃহিনীর প্রশংসাও করবে। মোটকথা, তারা একটি আনন্দময় সন্ধ্যা কাটাতে পেরে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তা মনে রাখবে।
স্বামী মেহমানের সাথে আড্ডা দিতে পেরেছে। মেহমানের সাথে একটি ভালো সময় কাটিয়েছে। তাদের সামনে তার কোনো লজ্জা পেতে হয়নি। এজন্যে সে তার স্ত্রীর প্রতি খুশি। তারা আরো কয়েকবার আত্মীয়দের দাওয়াত দিতে উৎসাহ পাবে।
গৃহিনী ধৈর্যশীলা ও আতিথেয়তার জ্ঞান রাখার কারণে কোনো সমস্যা ছাড়াই সহজভাবে মেহমানদের আপ্যায়ন করতে পেরেছে। সে নিজের প্রতি ও তার স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট। এভাবে সে প্রমাণ করতে পেরেছে যে সে একজন ভালো মেজবান।
এখন আপনার ইচ্ছে, উপরের কোনো উদাহরণটি আপনি অনুসরণ করতে চান।
টিকাঃ
৮০. সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৬৯০, মুয়াত্তা, হাদিস নং: ১৮৩৮।
৮৪. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৬৫৪৮।
📄 বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক
পুরুষরাই সাধারণত একটি পরিবারের অভিভাবক। তারা কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করে এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য ব্যয় করে। তারা এটিকে তাদের দায়িত্ব বলেই মনে করে এবং তাদের কষ্টের জন্য কখনো অসন্তুষ্টি বা অভিযোগ করে না। তবে পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের মিতব্যয়ী হওয়ার এবং তাদের অর্থ অতিরঞ্জিতভাবে ব্যয় না করার প্রত্যাশা করে। এমনকি স্ত্রী যেন খরচ করার ক্ষেত্রগুলো শ্রেণিবদ্ধ করে রাখে এবং খাদ্য, জামাকাপড়, ওষুধ, ভাড়া, বিদ্যুৎবিল, টেলিফোন, গ্যাস এবং পানির বিলের মতো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতেই ব্যয় করে পুরুষরা তার আশা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
অর্থ: “পুরুষগণ নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল, যেহেতু আল্লাহ একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ হতে ব্যয়ও করে।”৮৫ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন— “তারা তোমাদের আবরণ এবং তোমরা তাদের আবরণ।”৮৬
ব্যয়ের অগ্রাধিকারের তালিকায় বিলাসবহুল সামগ্রী স্থাপন করা অনেকটা অপব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা এবং অর্থের অপব্যবহার করা একদম পছন্দ করে না। কোনো ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে তার অর্থের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে, যদি সে নিশ্চিত হয় যে তার স্ত্রী অপব্যয় করে না এবং এও নিশ্চিত হয় যে তার কষ্টের উপার্জিত অর্থ অপচয় হয় না, তবে সে আরও কঠোর পরিশ্রমের উৎসাহ পায়।
হাদিস শরিফের ভাষায়—
অর্থ: ‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন— রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন— “সমগ্র পৃথিবী মানুষের ভোগ্যবস্তু, এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পুণ্যবতী স্ত্রী।”৮৭
হযরত ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন—
অর্থ: নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তাকওয়ার পরে মুমিন বান্দার সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হলো নেককার স্ত্রী। যে স্বামীর আদেশ অমান্য করে না এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও নিজের সতীত্বের হেফাজত করে।”৮৮
অন্যদিকে স্ত্রী যদি পোশাক এবং সাজসজ্জার পেছনেই সব খরচ করে ফেলে, বা সে যদি অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে এবং চলার জন্য তাদের ধার নিতে হয়, অথবা পরিবার যদি একজন কাফের শত্রুর মতো তার সম্পদ লুণ্ঠন করে, তবে লোকটি হতাশ হয়ে যায়। সে কাজ করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে এবং তার পরিবারকে সহায়তা করতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠে। তার কঠোর পরিশ্রম করা এবং পরিবারকে আর্থিক সাপোর্ট দেওয়া অযৌক্তিক মনে হয়। কারণ তারা তার কাজের মূল্যায়ন করে না এবং তাকে কাজের প্রতি উৎসাহ দেয় না। সে পথভ্রষ্ট হয়ে দুর্নীতির পথে চলে যেতে পারে এবং এটি একটি পরিবারের ভিত্তিকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কেননা— নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
অর্থ: “যে নারী স্বামীর মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তার কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, আল্লাহ তাআলা তার দিকে ফিরেও তাকান না।”৮৯
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে—
অর্থ: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— “আমি জাহান্নাম কয়েক বার দেখেছি, কিন্তু আজকের ন্যায় ভয়ানক দৃশ্য আর কোনো দিন দেখিনি। তার মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি দেখেছি।” সাহাবীরা বলল— হে আল্লাহর রাসূল, 'কেন?' তিনি বললেন, “তাদের অকৃতজ্ঞতার কারণে।” জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তারা কি আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ?' বললেন— “না, তারা স্বামীর শুকরিয়া করে না, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না। তুমি যদি তাদের কারো ওপর যুগ যুগ ধরে ইহসান করো, অতঃপর কোনো দিন তোমার কাছে তার বাসনা পূর্ণ না হয় তবে সে বলবে, আজ পর্যন্ত তোমার কাছে কোনো কল্যাণই পেলাম না।”৯০
হাদিস শরিফে এসেছে যে—
অর্থ: “যতক্ষণ স্বামী তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকবে তার কোনো নামাজ মাথার এক হাত ওপরেও উঠবে না (কবুল হবে না)।”৯১
প্রিয় বোন!
যদিও আপনার স্বামীর অর্থ-সম্পদ আপনার হাতে রয়েছে, এটিকে আপনার নিজের সম্পদ বলে বিবেচনা করবেন না। সম্পদ আইনগতভাবে আপনার স্বামীর এবং আপনি তার বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধায়ক। তার কোনো জিনিস আপনার দখলে নেওয়া, ফেলে দেওয়া বা কোনো জিনিস বিক্রি করার জন্য অবশ্যই তার অনুমতি প্রয়োজন। আপনি তার সম্পদের জন্য দায়বদ্ধ এবং আপনাকে অবশ্যই এটি রক্ষা করতে হবে। যদি আপনি নিজের দায়বদ্ধতা থেকে সরে আসেন এবং তার সম্পদ সংকুচিত করেন তবে আপনাকে পরকালে অবশ্যই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
অর্থ: “প্রত্যেক নারী তার স্বামীর গৃহের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর কিয়ামতের দিন সে তার এ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”৯২
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
অর্থ: "নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, আব্রু রক্ষা করে, স্বামীর নির্দেশ মান্য করে, তবে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করতে পারবে।”৯৩
আল্লাহর নবি হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন—
অর্থ: “সর্বোত্তম নারী হলো স্বামী যাকে দেখলে পুলকিত হয়, আদেশ করলে মেনে নেয়, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও নিজের সতীত্বের হেফাজত করে।”৯৪
টিকাঃ
৮৫. সুরা নিসা : ৩৪।
৮৬. সূরা বাকারা : ১৮৭।
৮৭. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৬৪৯; সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৩২৩২।
৮৮. ইবনে মাজা, হাদিস নং: ১৮৫৭।
৮৯. সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৯০৮৬; বায়হাকি, হাদিস নং: ১৪৭২০, মুসতাদরাক, হাদিস নং: ২৮২০।
৯০. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১০৯।
৯১. সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ২৪৫১; ইবনে মাজা, হাদিস নং: ৭৯১।
৯২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২৫৪৬।
৯৩. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ১৬১৬; তাবারানি, হাদিস নং: ৪৫৯৮।
৯৪. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ৭৪২১, সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৩২৩১।
📄 মহিলাদের পেশা
এটা ঠিক যে- একটি পরিবারের জীবনধারণের ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য উপার্জন একটি বাধ্যতামূলক কাজ এবং মহিলাদের এই কাজের জন্য ইসলামিকভাবে (ইসলামিক আইন অনুসারে) কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। খুব বেশি ঘুম এবং অত্যাধিক বিশ্রাম শরীরের জন্য ক্ষতিকর। খুব বেশি ঘুম কারও পার্থিব জীবন এবং ধর্ম (দুনিয়ার ও পরকালের জীবন) উভয়কেই নষ্ট করে দেয়। তাই মহিলাদেরও কাজ করা উচিত। কারণ ইসলামে অলসতা নিন্দনীয়। হযরত ফাতেমা জোহরা রাযিআল্লাহু আনহা বাড়িতে কাজ করতেন।
যে কোনো মানুষেরই প্রয়োজন হোক বা না হোক কোনো কাজ করা উচিত। কোনো কাজ না করে তার জীবন নষ্ট করা উচিত নয়। তার অবশ্যই সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অংশ নেওয়া উচিত। যদি প্রয়োজন হয়, তবে নিজের উপার্জন নিজের পরিবার এবং নিজের জন্য ব্যয় করতে হবে। আর যদি প্রয়োজন না হয় তাহলে উপার্জন থেকে একটা অংশ তাদেরকে দান করুন যাদের আপনার সহযোগিতার প্রয়োজন। অলসতা ক্লান্তিকর এবং তা একইসাথে ব্যক্তিকে মানসিক এবং শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত করে, পাশাপাশি নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়।
হযরত সাওবান রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ : “কোনো ব্যক্তির ব্যয়কৃত অর্থের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট অর্থ তা-ই; যা সে তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, যা আল্লাহর পথে তার বাহনের জন্য ব্যয় করে এবং যা আল্লাহর পথে তার সাথীগণের জন্য ব্যয় করে।”৯৫
বিবাহিত মহিলাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হলো বাড়ির যত্ন নেওয়া। গৃহিণীপনা, সন্তানের লালন-পালন ও যত্ন করা, ইত্যাদি হলো মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম কাজ। যা তারা খুব সহজেই করতে পারেন। একজন মেধাবী এবং পরিশ্রমী গৃহিণী তার বাচ্চা এবং স্বামীর জন্য বাড়িকে একটি স্বর্গীয় বাসস্থানে পরিণত করতে পারেন এবং এটি একটি মূল্যবান এবং সার্থক কাজ।
হযরত আবদুল্লাহ্ বিন্ আমর রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ : “পৃথিবীর সব কিছুই সম্পদ। এ পার্থিব সম্পদের মধ্যে উৎকৃষ্ট সম্পদ হলো সতী স্ত্রী।”৯৬
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- গৃহবধূদের শুধু গৃহকর্মেই ব্যস্ত না থেকে অন্য কাজও করা উচিত। তারা বই পড়তে পারেন। দরকারি বিষয়গুলোর উপর গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন। যার মাধ্যমে তাদের জ্ঞান এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, নিবন্ধ এবং এমনকি বইও লিখতে পারেন। অঙ্কন, চিত্রকলা, সেলাই, বুনন এবং আরও কিছু কাজের মধ্যে জড়িত থাকতে পারেন। ফলস্বরূপ, তারা তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করতে পারেন। পাশাপাশি তাদের প্রতিভা সবার কাছে উন্মুক্ত করে সমাজে অবদান রাখতে পারেন এবং সকলকে উৎসাহিত করতে পারেন। কাজের মধ্যে থাকলে তা মানুষকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থতা প্রদানে সহায়তা করে।
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ : “আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন যে- তোমাদের কেউ যে কোন কাজ করলে যেন তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করে।”৯৭
অনেক মহিলা বাড়িতে কাজ করেন আবার কেউ কেউ বাইরে চাকরি পছন্দ করেন। এই পছন্দটি কারো অর্থনৈতিক বা অন্য কারণেও হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য সর্বাধিক উত্তম কাজ হলো সাংস্কৃতিক পেশা বা পরিষেবা। নার্সারি, প্রাইমারি বা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হলো উপযুক্ত জায়গা। যেখানে মহিলারা মেয়ে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষাপ্রদান ও প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। হাসপাতালও একটি উপযুক্ত জায়গা। যেখানে তারা নার্স বা ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন। তবে পরপুরুষের উপস্থিতিতে তার চাকরি করা মোটেও কাম্য নয়।
নিম্নলিখিত পরামর্শগুলি তাদের জন্য যারা বাইরে চাকরি করছেন বা চাকরি করতে চান-
১. কোনো কাজ নেয়ার আগে আপনার স্বামীর সাথে পরামর্শ করুন। আপনাকে বাইরে কাজ করার জন্য অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়া আপনার স্বামীর অধিকার। আপনি যদি আপনার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কাজ শুরু করেন তাহলে তা আপনার পরিবারের নির্মলতা এবং প্রেমময় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।
আল্লাহ তাআলা নবীপত্নীগণকে লক্ষ করে বলেন-
অর্থ : “তোমরা ঘরে অবস্থান কর।”৯৮
ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
“তোমরা ঘরকে আঁকড়ে ধর, কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হইয়ো না।”
নারীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করা যেমন ওয়াজিব, তেমন ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য তার অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী ঘর থেকে বের হবে না। যদি বের হয় তবে ফিরে আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।”৯৯
বুখারিতে আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : “নারী তার স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখবে না এবং তার অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে আসতে দিবে না।”১০০
আরেক বর্ণনায় এসেছে-
অর্থ : স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখলে সে গুনাহগার হবে এবং তা কবুল হবে না।১০১
এই হাদিসের আলোকে ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন-
অর্থ : 'নারীর জন্য নফল ইবাদত করার চেয়ে স্বামীর অধিকার আদায় করা বেশি জরুরি।'১০২
হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
অর্থ: "যদি কোনো ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তির সিজদাহ করার আদেশ দিতাম, তবে আমি স্ত্রীকে বলতাম তার স্বামীকে সিজদাহ করতে।"১০৩
পুরুষদেরকে তাদের স্ত্রীদের ঘরের বাইরে কাজ করার ব্যাপারে খুব কঠোর ও নেতিবাচক না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যদি কাজের সংশ্লিষ্ট জায়গাটি তার পক্ষে অনুপযুক্ত বিবেচিত না হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের উদ্দেশে বলেন-
অর্থ : “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য প্রয়োজনে বাহিরে বের হওয়ার অনুমতি আছে।”১০৪
২. নারীদের যথাযথ ইসলামী হিজাব পরিধান করা উচিত। কোনো মেকআপ ছাড়া এবং সরল পোশাক পরিধান করে কাজ করা উচিত। মাহরাম নয় (মাহরাম নয় বলতে বোঝায় এমন পুরুষ যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ নয়) এমন পুরুষদের সাথে মিশ্রণ অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
অর্থ : “তোমরা ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলি (বর্বরতাপূর্ণ) যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন কোরো না।”১০৫
অফিস হচ্ছে কাজ করার জায়গা এবং এটি দেখানোর উদ্দেশ্যে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নয়। আপনি কী পরিধান করে আছেন তা দেখে আপনার প্রতিপত্তি এবং মর্যাদা আসবে না। বরং আপনি কী কাজ করেন এবং কতটুকু ভালোভাবে করেন তা দিয়েই আপনাকে মূল্যায়ন করা হয়। একজন মুসলিম মহিলার মতো আচরণ করুন এবং পরিপূর্ণ মুসলিম হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার আত্মসম্মান বজায় রাখুন এবং আপনার স্বামীর অনুভূতিতে আঘাত করবেন না। আপনার সাজসজ্জা বাড়িতে স্বামীর জন্য করুন এবং সুন্দর পোশাকগুলি তার জন্যই সংরক্ষণ করুন।
'আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আলকুয়েতিয়্যাহ' নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে- 'নারীরা ৩টি শর্তে নিজ গৃহের বাইরে চাকরি বা কাজ করতে যেতে পারবে-
১. কাজটি গুনাহের না হওয়া।
২. নারীর কাজটি এমন স্থানে না হওয়া যেখানে পরপুরুষের সাথে একত্রে কাজ করতে হয়।
৩. কাজের জন্য এমন সাজসজ্জা সহকারে বের না হওয়া, যা ফিতনা-ফ্যাসাদের দিকে প্ররোচিত করে।১০৬
৪. মহিলাদের এই বিষয়টিতে সচেতন হওয়া উচিত যে- যদিও আপনি বাড়ির বাইরে কাজ করছেন তবুও আপনার স্বামী ও সন্তান গৃহকর্ম, রান্নাবান্না এবং ওয়াশিং এর মতো কাজগুলি আপনার কাছেই প্রত্যাশা করে। পরিবারের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে। এটিও খেয়াল রাখতে হবে, যেন বাইরের একটি চাকরি পুরো পরিবারকে হতাশ করার পথ প্রশস্ত না করে।
গৃহকর্মেও বিষয়ে পুরুষদেরকেও তাদের স্ত্রীদের সহায়তার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বামীদের জন্য তাদের স্ত্রীদের বাড়ির বাইরে এবং ভিতরে উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করার আশা করা উচিত নয়। এ জাতীয় প্রত্যাশা বৈধ বা ন্যায্যও নয়। পুরুষ এবং মহিলাদের ঘরের কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়া উচিত।
হাদিসে এসেছে, হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহা কে জিজ্ঞাসা করা হলো-
অর্থ: 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে কী কাজ করতেন? উত্তরে হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহা বলেন- “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের মানুষদের সেবায় নানা কাজে অংশ নিতেন। আর নামাজের সময় হলে বেরিয়ে যেতেন।”১০৭
আরেক বর্ণনায় আছে- 'হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তার কাপড় সেলাই করতেন; নিজের জুতা মেরামত করতেন এবং সাংসারিক কাজে অংশ গ্রহণ করতেন।'১০৮
আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : “অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া (এই বলে) কবুল করে নিলেন যে- আমি তোমাদের কোনো পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর এক।”১০৯
৩. বাইরে কাজ করেন এমন কোনো মহিলার যদি ছোট সন্তান থেকে থাকে, তাহলে তার উচিত বাচ্চাটিকে বিশ্বস্ত এবং দয়ালু কোনো ব্যক্তির কাছে বা বিশ্বস্ত কোনো নার্সারি বা চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে রেখে যাওয়া। বাচ্চাদেরকে নিজের হালে বাড়িতে একা রেখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বাচ্চাটি খুব ভয় পেয়ে যাবে এবং অসহায় হয়ে পড়বে। এতে বড় কোনো দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।
যদি কোনো মহিলা মনে করেন, উপরের কাজগুলি এবং দায়িত্বগুলি ছাড়াও তার উচিত অন্য একটি চাকরি গ্রহণ করা, তাহলে অবশ্যই তার স্বামীর সাথে বোঝাপড়া করা উচিত। এবং চাকরি অবশ্যই তার অনুমতি এবং পরামর্শের অধীনে নেওয়া উচিত। স্বামী যদি রাজি না হয়, তবে তার চাকরির চিন্তা ভুলে যাওয়া উচিত।
বুখারিতে হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : “নারী তার স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখবে না এবং তার অনুমতি ছাড়া তার ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দেবে না।”১১০
আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : “তোমরা ঘরে অবস্থান কর”।১১১
ইবনে কাসির (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন-
অর্থ : “তোমরা ঘরকে আঁকড়ে ধর, কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হইয়ো না।”১১২
হাদিস শরিফে এসেছে যে-
অর্থ : “স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরের বাহিরে বের হলে নারীর কোনো নামাজ কবুল হয় না।”১১৩
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : "যদি নারীরা পুরুষের অধিকার সম্পর্কে জানত, তাহলে দুপুর কিংবা রাতের খাবারের সময় হলে, তাদের খানা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা বিশ্রাম নিত না।”১১৪
স্বামী যদি স্ত্রীর কাজ করার বিষয়ে সম্মত হন, তবে তাকে অবশ্যই এমন একটি চাকরি বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে যেখানে তিনি ন্যূনতম বা খুব কম সংখ্যক পুরুষের সংস্পর্শে আসবেন। এটি তার নিজের এবং সমাজ উভয়েরই স্বার্থে। যাই হোক না কেন, তার বাড়ির বাইরে থাকাকালীন অবশ্যই তাকে ইসলামী পদ্ধতিতে হিজাব পরিধান করতে হবে। খুবই সহজ সাধারণ এবং কোনো রকম সাজসজ্জা ব্যতীত কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
অর্থ : “মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত। মুমিন নারীদের বলে দিন, যেন তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। সাধারণত যা প্রকাশ পায়, তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন ঘাড় ও বুক মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে।”১১৫
টিকাঃ
৯৫ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৩১১।
৯৬ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৩৬৪৯; সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং : ৩২৩২।
৯৭ বাইহাকি, হাদিস নং : ৫৩১৩-৫৩১৪।
৯৮ সূরা আহযাব: ৩৩।
৯৯ মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস নং: ২৪৫৫।
১০০ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫১৯৫; আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৪৫৮।
১০১ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ৯৮০২।
১০২ ফতহুল বারি ৯/২৩৪।
১০৩ ইবনে মাজা, হাদিস নং: ১৮৫২; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ২১৯৮৬।
১০৪ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪৭৯৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৫৭৯৬।
১০৫ সূরা আহযাব : ৩৩।
১০৬ আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আলকুয়েতিয়্যাহ ৭/৮৩-৮৪।
১০৭ সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬০৩৯।
১০৮ সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৬৭৬।
১০৯ সূরা আলে ইমরান : ১৯৫।
১১০ সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৫; আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৪৫৮।
১১১ সূরা আহযাব : ৩৩।
১১২ তাফসিরে ইবনে কাসির: ৩/৫৮৯।
১১৩ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস নং: ১৭৪২২।
১১৪ তাবারানি, হাদিস নং: ১৬৭৪৭।
১১৫ সূরা নূর: ৩০-৩১।