📄 পর্দা করুন
নারী ও পুরুষের পর্দার ব্যাপারে ইসলামে কতগুলো বিধান রয়েছে, যা উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আবার এমন কতগুলো বিধান রয়েছে যা বিশেষভাবে নারীর জন্য প্রযোজ্য। কেননা নারী জাতির মধ্যে সৃষ্টিগতভাবেই আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে কোমল, সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে। প্রকৃতিগতভাবেই তারা মুগ্ধকর, আকর্ষণীয়, পছন্দনীয় ও ভালোবাসার পাত্রী।
স্বামী চায় স্ত্রীর মধুরতা, ভালোবাসা, রংঢং, সৌন্দর্য, হাসি-তামাশা, রসিকতা ইত্যাদি শুধুমাত্র সে-ই উপভোগ করবে। স্ত্রী অন্য পুরুষদের থেকে এসব লুকিয়ে রাখবে। পুরুষের মানসিক প্রকৃতিই এমন; এরা নিজের স্ত্রীর দিকে অন্য লোকের তাকানোটাও সহ্য করতে পারে না। তার স্ত্রীর সাথে অন্য লোকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করে। সে চায় তার স্ত্রী ইসলামি পর্দা পালন করুক, নারীর জন্য ইসলামের সংবিধিবদ্ধ পোশাক পরিধান করুক।
একজন মুসলমান নারী ইসলামের আচার-আচরণ ও নিয়ম-কানুন পালনের মাধ্যমে তার স্বামীর আইনগত অধিকার রক্ষা করে। যেকোনো সৎ পুরুষেরই স্ত্রীর এ ধরনের গুণাবলির প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকবে। নারীর সামাজিক আচার-আচরণ যদি ইসলামি আচার-নীতির ওপর গড়ে ওঠে তবে সে তার স্বামীকে মানসিকভাবে শান্তিতে রাখতে পারবে। তখন তার স্বামী পরিবারের জন্য রোজগার করতে আগ্রহ পাবে, স্ত্রীর প্রতি অধিক ভালোবাসা দেখাবে। এসকল স্বামীরা পর-নারীর প্রতি আকৃষ্ট হবে না।
অপরদিকে যে পুরুষের স্ত্রী ইসলামের পর্দার বিধান পালন করে না, নিজের সৌন্দর্য পরপুরুষকে দেখিয়ে বেড়ায় এবং তাদের সাথে চলাফেরা করে, সে সকল স্বামীগণ মারাত্মকভাবে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। সে মনে করে যে— স্ত্রী তার অধিকার নষ্ট করছে। এই সকল স্বামীগণ সব সময় মর্ম-যাতনা ও হতাশায় ভোগে এবং আস্তে আস্তে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে।
সুতরাং সমাজ ও নারীজাতির কল্যাণের স্বার্থে নারীকে শালীন পোশাক পরিধান করতে হবে। লোকসমাজে সাজসজ্জাবিহীন অবস্থায় চলাফেরা করতে হবে। নিজের সৌন্দর্য, শোভা অপরের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে হবে।
পর্দা পালন করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
অর্থ: “ঈমানদার নারীদেরকে বলুন— তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং যেন তাদের স্বামী, পিতা, পুত্র, শ্বশুর, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও যে সকল বালক নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।”২৪
সমাজে পর্দা করে চললে নারীজাতি নিজেরাই বিভিন্নভাবে উপকৃত হবে। যেমন—
প্রথমত— এর মাধ্যমে একজন নারী সামাজিক মর্যাদা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধকে উত্তমভাবে সংরক্ষণ করতে পারে। নিজেদেরকে স্রেফ প্রদর্শনী পণ্য হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত— স্বামীর প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসার কার্যকর প্রমাণ পেশ করতে পারে। ফলশ্রুতিতে, পরিবারে একটি আন্তরিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। অসুস্থ পরিবেশ ও ঝগড়াঝাটি রোধ করা সম্ভব হয়। সংক্ষেপে বললে এধরনের মহিলারা স্বামীর মন জয় করতে পারে এবং পরিবারে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তৃতীয়ত— ইসলামি পর্দাপ্রথা পালনের মাধ্যমে অবৈধ কুদৃষ্টি বন্ধ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে ঝগড়া-ফাসাদ বন্ধ হয় ও পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তি মজবুত হয়। ফলে পারিবারিক অঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে।
চতুর্থত— মহিলারা যদি যথাযথভাবে পর্দা পালন করে তবে যুবসমাজ ভুল পথে যাওয়া থেকে বাঁচবে। তাদের চরিত্র সংরক্ষিত থাকবে, এতে নারীরও উপকার হবে।
পঞ্চমত— সকল মহিলা যদি সঠিক পর্দা পালন করে তবে স্ত্রীরা সবাই নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে যে— ঘরের বাইরে গেলে তার স্বামী কোনো দুশ্চরিত্রার প্রতি আকৃষ্ট হবে না এবং পরিবারের প্রতি মনোযোগ হারাবে না।
ইসলাম নারীজাতির সৃষ্টিগত বিশেষ প্রকৃতির ব্যাপারে সচেতন। সেই সাথে নারীকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেও বিবেচনা করেছে এবং তার ওপর বেশ কিছু দায়িত্বও আরোপ করেছে। ইসলাম চায় নারী পর্দা রক্ষা করে তার সামাজিক দায়িত্বগুলো পালন করুক। এতে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ মেয়াদি স্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও নিরাপত্তা রক্ষা হবে। জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত হবে। তবে একজন নারী অবশ্যই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার লাভ করবে আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মীয় দায়িত্বগুলো পালনের মাধ্যমে।
সম্মানিতা বোন!
তুমি যদি পরিবারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাও, তুমি যদি নারী অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হও, যদি যুবকদের মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে যত্নশীল হও এবং তাদের নৈতিক অধঃপতন রোধ করতে চাও, যদি বখাটেদের থেকে নারীর অসম্মান রোধ করতে চাও, সর্বোপরি যদি একজন বিশ্বাসী ও ত্যাগী মুসলিম হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাও, তবে তোমাকে ইসলামি পর্দা পূর্ণভাবে পালন করতে হবে। স্বীয় সৌন্দর্য নন-মাহরামদের সামনে প্রদর্শন কোরো না। এটা নিজের ঘরে শুধু মাহরামদের সামনেই কেবল প্রকাশ করো। তোমাকে পর্দা করতে হবে স্বামীর ভাই ও তাদের ছেলেদের সামনে, পর্দা করতে হবে খালু, ফুফা, খালাতো, চাচাতো, মামাতো ও ফুফাতো ভাইদের সামনে। তাদের সামনে ইসলামি পর্দা অনুযায়ী কাপড় না পরা গুনাহের কাজ এবং তাতে তোমার স্বামীর মন খারাপ হতে পারে। যদিও সে হয়তো কখনো তা উল্লেখ করবে না। একজন নারীর জন্য তার শ্বশুর, আপন ভাই ও তার ভাগ্নের সামনে ওইভাবে পর্দা করার প্রয়োজন নেই। তবে উত্তম হলো সে তাদের সামনেও একটি নির্দিষ্ট ইসলামি পর্দা মেনে চলবে। অর্থাৎ একজন নারী তার স্বামীর সামনে নিজেকে যতটা আকর্ষণীয় করবে, উপরোক্ত আত্মীয়দের সামনে ততটা করা উচিত হবে না। কারণ বেশিরভাগ পুরুষ চায় না, তার স্ত্রী অন্য ছেলের সামনে সাজবে বা আকর্ষণীয় কাপড় পরবে। আর এটা ভুলে গেলে চলবে না যে— মানসিক শান্তি এবং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর বিশ্বাস একটি পরিবার টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
টিকাঃ
২৪ সূরা নূর : ৩১।
📄 আপনার স্বামীর ভুল ক্ষমা করুন
দুজন ব্যবসায়িক অংশীদার, দুজন প্রতিবেশী, দুজন সহকর্মী, দুজন বন্ধু, বিশেষত স্বামী ও স্ত্রীর একে অপরের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া জরুরি। যদি কোনো পরিবারের সদস্যরা ক্ষমাশীল না হয় এবং একে অপরের ভুল অন্তরে ধারণ করে রাখে, তবে হয় পরিবারটি আলাদা হয়ে যাবে নয়তো তারা একটি অসহনীয় জীবন যাপন করবে।
প্রিয় বোন! আপনার স্বামী ভুল করতে পারেন। তিনি হয়তো আপনাকে অপমান করতে পারেন, আপনাকে গালাগালি করতে পারেন, মিথ্যা বলতে পারেন, আপনাকে আঘাত করতে পারেন। এই ধরনের কাজ যে কোনো লোক দ্বারা সংঘটিত হতে পারে।
যদি আপনার স্বামী কোনো ভুল করার পরে এটির জন্য অনুশোচনা করেন, বা আপনি মনে করেন যে—তিনি নিজের অসদাচরণের জন্য অনুতপ্ত, তবে তাকে ক্ষমা করুন এবং বিষয়টি মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
যদি তিনি অনুতপ্ত হন কিন্তু তা প্রকাশ করতে প্রস্তুত না থাকেন, তবে তার ভুলগুলো টেনে এনে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। অন্যথায় সে নিজে অপমান বোধ করতে পারে এবং আপনার ভুলগুলিও তুলে এনে তার শোধ তুলতে পারে। ফলস্বরূপ একটি বড় অশান্তির সূচনা হতে পারে।
সুতরাং যতক্ষণ না সে নিজের বিবেক থেকে নিজেকে নিন্দা করে এবং নিজে থেকেই অনুশোচনা বোধ করতে শুরু না করে, ততক্ষণ আপনার পক্ষে চুপ থাকা ভালো। তারপরে তিনি আপনাকে জ্ঞানশীল এবং অনুগত স্ত্রী হিসেবে মূল্যায়ন করবেন, যিনি তার স্বামী এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
অর্থ : “তোমরা সম্মানীয় লোকদের ত্রুটিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো।”২৫
আরেক বর্ণনায় এসেছে, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
অর্থ : “কোনো মুসলমান ক্ষমা চাওয়ার পরও যে ক্ষমা করে না, সে আর অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীর মতো কেয়ামতের দিন সমান গুনাহগার সাব্যস্ত হবে।”২৬
এটা কি দুঃখজনক নয় যে—একটি পবিত্র বৈবাহিক সম্পর্ক ভঙ্গ হচ্ছে শুধুমাত্র একজন মহিলা তার স্বামীর ভুলগুলো ক্ষমা করতে প্রস্তুত না হওয়ায়?
টিকাঃ
২৫ মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ২৫৪৭৪, আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪৩৭৫, সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৭২৫৩।
২৬ আবু দাউদ মারাসিল, হাদিস নং: ৫২১; ইবনে মাজা, হাদিস নং: ৩৭১৮।
📄 আপনার স্বামীর আত্মীয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন
আপনার স্বামীর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে রেষারেষিই আপনার পারিবারিক জীবনের অন্যতম সমস্যা। স্বামীর মা, বোন বা ভাইদের সাথে কিছু মহিলার ভালো সম্পর্ক থাকে না। একদিকে স্ত্রী তার স্বামীর উপর কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়, যাতে সে তার মা বা অন্য কোনো আত্মীয়ের দিকে গুরুত্ব দিতে না পারে। সে তাদের মধ্যে বিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। অন্যদিকে তার শাশুড়ি নিজেকে তার পুত্র এবং পুত্রবধূর অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করে। মা তার পুত্রের ওপর কর্তৃত্ব বহাল রাখতে কঠোর চেষ্টা করে এবং সতর্ক থাকে যে- নতুন পুত্রবধূ যেন তাকে পুরোপুরি অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে। তিনি তার পুত্রবধূ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতে পারেন বা তার মধ্যে দোষ খুঁজে বের করতে পারেন। এই জাতীয় কর্মকাণ্ড বাইরের অনেক অশুভাকাঙ্ক্ষী দ্বারাও ঘটতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে যদি তারা সবাই একই বাড়িতে থাকে।
যদিও এখানে দুজন মহিলার মধ্যে এই রেষারেষি হয়ে থাকে তবুও মাঝখান থেকে আসলে অশান্তি এবং হতাশা পুরুষকে ভোগায়। স্বামী এমন একটি দোটানায় আটকে পড়ে যেখানে সে কোনো পক্ষ নিতে পারে না। একদিকে হলেন- তাঁর স্ত্রী; যিনি অন্য কারো কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে চান। একজন স্বামী স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন যে- তাকে অবশ্যই তার স্ত্রীকে সমর্থন করতে হবে এবং তাকে খুশি রাখতে হবে। অন্যদিকে তিনি তার পিতামাতার কথাও চিন্তা করেন; যারা তাকে তাঁর জীবন, শিক্ষা এবং তাঁর প্রতিপালনের জন্য তাদের নিজের জীবন ব্যয় করেছেন। তিনি অনুভব করেন যে- তাঁর বাবা-মা আশা করেন; সে তাদের প্রয়োজনের সময় তাদের সহায়তা করবে এবং তাদের ত্যাগ করা মোটেও সম্ভব না। তদুপরি যদি তিনি নিজেই কোনো কিছুর অভাব বোধ করেন তবে তাঁর বাবা-মা ছাড়া আর কে তাকে এবং তাঁর পরিবারকে সহায়তা করবে? যার ফলে, তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর সেরা এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু তার বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং একজন বিচক্ষণ পুরুষের জন্য তার স্ত্রীকে বেছে নেওয়া এবং পিতামাতাকে ত্যাগ করা বা তদ্বিপরীত করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও বা এগুলির কোনোটিই সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, তাকে উভয় পক্ষকেই সামলাতে হয় এবং তাদের সন্তুষ্ট রাখতে হয়, যা একটি কঠিন কাজ।
পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলার একমাত্র সম্ভাব্য উপায় হলো- স্ত্রীকে কর্তব্যশীল এবং বিচক্ষণ হতে হবে। এই পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি তার সমস্যা সমাধানে তার স্ত্রীর সহায়তা পাবার প্রত্যাশা করে। যদি স্ত্রী তার শাশুড়িকে সম্মান করে, তার কাছ থেকে পরামর্শ প্রার্থনা করে এবং তার সাথে আনুগত্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে শাশুড়ি তার সবচেয়ে বড় সমর্থক হবে।
আপনি কি এটা বুঝতে পারেন না যে- জীবনের উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে একে অপরের; বিশেষত আত্মীয়-স্বজনদের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে? অন্যরা আপনাকে পরিত্যাগ করলেও তারা আপনাকে সমর্থন করবে? একে অপরকে বোঝা এবং ভালো আচরণের মাধ্যমে নিজের আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা ভালো নয় কি? নিজের কাছের সম্পর্ক ছিন্ন করে অপরিচিত ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা কী আসলেই বুদ্ধিমানের কাজ এবং ভালো কাজ? অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে- যখন কারো অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয় তখন বন্ধুরা তাকে ছেড়ে যায়। তবে পরিত্যাগ করা আত্মীয়রা তার সাহায্যের জন্য আসে। কারণ পারিবারিক বন্ধন অকৃত্রিম এবং এটা সহজে ভাঙা যায় না।
কেউ কখনও আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কিছুই করতে পারে না। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি অনেক থাকলেও সবারই সময় মতো আত্মীয়-স্বজনের সম্মান ও দয়ার প্রয়োজন হয়। তারাই শারীরিক ও মানসিকভাবে আপনাকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসবে। আত্মীয়রাই সর্বদা আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। প্রয়োজনের সময় তারা অন্যের চেয়ে দ্রুত আপনার সহায়তায় আসবে। যে তার স্বজনদের অস্বীকার করবে সে অনেক সাহায্যকারী হাতছাড়া করবে।
হে বোন! আপনার স্বামীর এবং আপনার নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আপনার আশেপাশের ভালো শুভাকাঙ্ক্ষীদের খুঁজে নিন। আপনার স্বামীর আত্মীয়দের সাথে মিশুন। স্বার্থপর এবং বোকা হবেন না; জ্ঞানী হোন এবং আপনার স্বামীকে যাতে কোনো সমস্যায় পড়তে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। আল্লাহ ও মানুষ উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একজন উত্তম ও অনুগত স্ত্রী হোন।
📄 স্বামীর পেশাকে সম্মান করুন
কাজের জন্যে আপনার স্বামীর প্রতিনিয়ত কষ্ট করতে হয় এবং প্রত্যেকেরই কাজের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ; একজন ড্রাইভার বেশিরভাগ সময় রাস্তায় থাকেন এবং প্রতি রাতে বাড়িতে আসতে পারেন না। আবার পুলিশকে কিছু রাত বাইরে থাকতে হতে পারে। একজন চিকিৎসক বা ডাক্তার পরিবারের সাথে খুব কম সময় কাটাতে পারেন। একজন প্রভাষক বা বিজ্ঞানী রাতে প্রচুর পরিমাণে পড়াশোনা করেন। একজন মিস্ত্রি, যার পোশাক নোংরা এবং তেলের গন্ধযুক্ত। একজন কারখানার কর্মী, যে রাতে কাজ করেন। অতএব, খুব কমই এমন চাকরি রয়েছে; যা পুরোপুরি সুবিধাজনক এবং পরিবারের সদস্যরা কোনো অস্বস্তি পোষণ করে না। পরিশ্রমের চেয়ে জীবনে সৎভাবে উপার্জনের আর কোনো উত্তম উপায় নেই। পুরুষরা কঠোর পরিশ্রমের চাপ সইতে হয় সারাজীবন।
আরও একটি সমস্যা রয়েছে—যা বেশিরভাগ পরিবারের অভিযোগ। মহিলারা সাধারণত তাদের পুরুষদের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন এবং অন্ধকার হয়ে গেলে তারা তাদেরকে বাড়িতে দেখতে পছন্দ করেন। মহিলারা চান যে—তাদের স্বামীদের মোটা বেতনের একটি ভালো চাকরি থাকুক এবং একই সাথে ঘরে থাকার জন্য পর্যাপ্ত সময় চান। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে, বেশিরভাগ পুরুষের চাকরি তাদের স্ত্রীর প্রত্যাশা অনুসারে হয় না এবং কিছু পরিবারের জন্যে এটি ঝগড়া এবং তর্কের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
একজন ড্রাইভার যিনি কয়েক রাত ধরে রাস্তায় ছিলেন, যিনি ভালো ঘুমোতে পারেননি এবং নিয়মিত খাননি, তিনি বিশ্রাম নিতে এবং পরিবারের সাথে শান্তিতে এবং আরামে সময় কাটাতে তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করেন। এরপর যখন তার স্ত্রী এক মুহূর্তও দেরি না করে চিৎকার ও কান্নাকাটি করে বলে— “এটা কেমন জীবন? আপনি আমাকে এই বাচ্চাদের সাথে কেন রেখে যান, এবং আপনি কোথায় ছিলেন? এখানকার সমস্ত কাজ আমার একাই করতে হয়। কারণ আপনি এখানে আমাকে সহায়তা করার জন্য নেই ও আমি এই দুষ্টু ছেলেমেয়েদের নিয়ে হয়রান। এমনকি আপনার গাড়ি চালানোও কোনো ভালো কাজ নয়। হয় আপনি চাকরি পরিবর্তন করুন অথবা আমার সাথে একটা বিহিত করুন। আমি আর এভাবে বাঁচতে পারছি না!”
বেচারা ড্রাইভার তার স্ত্রীর মুখে এসব শুনে সে তার কাজের প্রতি সঠিকভাবে মনোনিবেশ করতে পারবে তা আশা করা যায় না এবং হয়তোবা তার জীবনকেও বিপদের মুখে পতিত করতে পারে। একই সাথে তার যাত্রীদের জীবনও বিপদাপন্ন করতে পারে।
একজন ডাক্তার; যিনি সকাল থেকে রাত অবধি অনেক অনেক রোগী দেখেন; তিনি তার স্ত্রীর এইরকম অভিযোগের সাথে মানিয়ে নিতে পারেন না। এভাবে হলে তিনি কীভাবে তার চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখবেন? একজন শ্রমিক যে কিনা রাতের শিফটে কাজ করেন, এবং তার স্ত্রী যদি কুটবুদ্ধি সম্বলিত মহিলা হয় তবে সে অবশ্যই আগ্রহের সাথে নিজের চাকরিতে মনোনিবেশ করতে পারবে না। একজন বিজ্ঞানী কীভাবে তার গবেষণার ক্ষেত্রে সফল হতে পারেন যদি তার স্ত্রী তাকে নিয়ে ক্রমাগত হাসি-ঠাট্টা করে? এগুলি সেই অভীক্ষা যা বুদ্ধিমান মহিলাদেরকে বোকা মহিলাদের থেকে পৃথক করে।
প্রিয় বোন! আমরা আমাদের ইচ্ছানুরূপ বিশ্বকে পরিচালিত করতে পারব না, তবে আমরা বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য আপনার স্বামীর একটি চাকরি থাকা দরকার। তার চাকরির কিছু শর্ত রয়েছে; যার সাথে আপনাকে অবশ্যই মানিয়ে নিতে হবে। আপনাকে অবশ্যই আপনার পারিবারিক জীবনকে তার কাজ অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। আপনি কেন সবসময় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর কাজের দোষ খুঁজে বেড়াবেন? সুন্দর হাসি দিয়ে আপনার স্বামীকে ঘরে স্বাগত জানান এবং তার প্রতি দরদী হোন, বুদ্ধিমান হোন এবং তার কাজের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিন। যদি আপনার স্বামী একজন ড্রাইভার হয়ে থাকেন যে—বেশিরভাগ সময় রাস্তায় থাকে তবে বুঝতে চেষ্টা করুন যে—তিনি বাড়িতে থাকা আপনার জন্য এবং আপনার বাচ্চাদের জন্য টাকা রোজগারের চেষ্টা করছেন। তার চাকরিতে কোনো ভুল নেই। তিনি সমাজের একটা অংশ এবং তার সেরাটা দিয়ে তিনি সমাজের সেবা করে যাচ্ছেন। তিনি যদি অলস ব্যক্তি হতেন বা তিনি যদি কোনো অপকর্মে নিযুক্ত থাকতেন তবে কি আরও ভালো হত?
সুতরাং! দোষটি কিন্তু আপনার স্বামীর না। দোষটি আপনারই। প্রতি রাতেই তাকে বাড়িতে থাকার দাবি করা এবং সাথে সাথে আপনার নিজেকে তার বর্তমান অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা বা খাপ খাইয়ে নিতে না চাওয়াটাই আপনার দোষ।
তার বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে সবাইকে নিয়ে আরও আরামে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি? আপনি কি পারেন না তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানাতে এবং কাজের জন্য বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তাকে ভালোবাসার দু-চারটি কথা বলে বিদায় জানিয়ে তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহী করতে? আপনি যদি তার সাথে কোমল আচরণ করেন তবে পরিবারের প্রতি তার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং তিনি পরিবারের জন্য আরও কঠোর পরিশ্রম করতে পারবেন। তিনি আপনাদের থেকে নিজেকে দূরে দূরে রাখবেন না; যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িতে আসার চেষ্টা করবেন; তিনি দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে থাকবেন এবং মানসিকভাবেও সুস্থ থাকবেন।
যদি আপনার স্বামী একটি নাইট শিফট কর্মী হন তবে পরিবারের খরচ মেটাতে তিনি তার রাতের আরামের ঘুম বিসর্জন দিচ্ছেন। এর সাথে অভ্যস্ত হবার চেষ্টা করুন। তার চাকরিতে আপনার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন না। আপনি যদি একা বিরক্তি বোধ করেন, তবে আপনি কিছু কিছু বাড়ির কাজ করে ফেলতে পারেন। যেমন, রাতে সেলাই করা বা মাঝে মাঝে কিছু বইপত্র পড়া। সকালে আপনার স্বামী যখন কাজ থেকে ফিরে আসবে তখন তার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করুন। তারপর শান্ত জায়গায় তার জন্য বিছানা প্রস্তুত করুন। বাচ্চাদের শান্ত রাখুন এবং ঘুমানোর সময় তাদের পিতাকে বিরক্ত না করতে শিখিয়ে দিন। বা আপনি রাতে কম ঘুমাতে পারেন যাতে আপনি দিনের বেলা আপনার স্বামীর সাথে একসাথে বিশ্রাম নিতে পারেন। তবে ভুলে যাবেন না যে তিনি সারা রাত জেগে ছিলেন এবং দিনের বেলা তাঁর এই ঘুম আপনার রাতের ঘুমের সমান। এই পরিস্থিতিতে মহিলাদের দু-ভাবে তার কাজকর্মের আয়োজন করতে হয়, একটি তার এবং তার সন্তানদের জন্য এবং অপরটি তার স্বামীর জন্য। যদি আপনার স্বামী ড্রাইভার, ডাক্তার, কর্মী বা বিজ্ঞানী ইত্যাদি হন তবে আপনাকে অবশ্যই তার জন্য গর্বিত হওয়া উচিত।
আপনার স্বামী কোনো অলস ভবঘুরে নন বা কোনো অপকর্মের পেশায় নিযুক্ত নন। সুতরাং তার প্রশংসা করুন এবং তার প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করুন। তাকে তার চাকরি ছেড়ে দিতে বলবেন না বা এটা আশা করবেন না যে—সে চাকরি ছেড়ে দিক। শুধু তার বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। তিনি যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছেন বা গবেষণা করছেন তবে তাকে বিরক্ত করবেন না। আপনি বাড়ির অন্যান্য কাজগুলি করতে পারেন। একটি বই পড়তে পারেন বা তার অনুমতি নিয়ে আপনার বন্ধুদের বা আত্মীয়দের সাথে কোথাও যেতে পারেন বা দেখা করতে পারেন। তবে যখন তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন; ঘরে থাকার চেষ্টা করুন। তার খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের বন্দোবস্ত করুন। আপনার স্বামীকে হাসিমুখে এবং ভালো আচরণের সাথে গ্রহণ করুন। আপনার দয়া এবং আন্তরিকতা প্রদর্শন করে এবং তাকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আপনি তাকে তার ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারবেন।
আপনি যদি একজন ভালো স্ত্রী হন; তবে আপনি কেবল তার অগ্রগতিকেই ত্বরান্বিত করছেন না, বরং আপনি সমাজে তাঁর সেবার ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। সব স্ত্রীলোকেরাই এই ধরনের পরিশ্রমী পুরুষদের যোগ্য হতে পারে না। সুতরাং ভালো আচরণে এবং ত্যাগ স্বীকার করে প্রমাণ করুন যে আপনি তাঁর যোগ্য।
যদি আপনার স্বামীর কাজের জন্য তাকে এমন বিশেষ পোশাক পরিধান করতে হয় যা দ্রুত ময়লা হয়ে যায়, তবে তা ঘন ঘন ধুয়ে ফেলুন। তাকে দোষারোপ করবেন না এবং তার চাকরির জন্য তাকে খারাপ কথা শোনাবেন না। তাকে চাকরি পরিবর্তন করতে বলবেন না। চাকরি পরিবর্তন করা সহজ নয়। মেকানিক হওয়াটা কি কোনো ভুলের কাজ? যেভাবেই দেখুন না কেন, এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এবং এর কারণে একটা পরিবারকে ভেঙে ফেলা মোটেও উচিত নয়। একজন মহিলা আদালতে বিচারককে বলেছিলেন যে—তার স্বামীর কাজ কেরোসিন বিক্রি করা এবং এর জন্য সে সবসময় খারাপ গন্ধ পেতো এবং এতে সে এই পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছে।