📄 স্বামীকে নিয়েই সুখে থাকুন
হে বোন! তোমার স্বামী ছাড়া অন্য কারও দিকে নজর দিও না। বিয়ের আগে হয়তো তোমার আরও অনেক প্রস্তাব ছিল। হয়তো ঐ প্রস্তাবগুলো ছিল সুন্দর, শিক্ষিত, সম্পদশালী ছেলেদের পক্ষ থেকে, যাদেরকে তুমি বিয়ে করতে চেয়েছিলে। বিয়ের আগে এরকম আশা করা, স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক ছিল। তবে এখন তুমি তোমার জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছো এবং তার সাথে সারা জীবন একত্রে থাকার জন্য একটি পবিত্র চুক্তি স্বাক্ষর করেছো। তাই এখন অতীতের সবকিছু ভুলে যাও। অবশ্যই এখন তোমার উচিত অতীতের সব ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও বিয়ের সেই সব প্রস্তাব ভুলে যাওয়া।
নিজের স্বামী ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পুরুষকে ভেবো না। স্বামীকে নিয়েই সুখে থাকো। তুমি যদি তা না করো তবে নিজেই নিজেকে চাপে ফেলে দিবে। যেহেতু তুমি তোমার স্বামীর সাথে সংসার করতে রাজি হয়েছো, তাহলে কেন এখন অন্য পুরুষের দিকে মনোযোগ দিবে? কেন তাকে অন্য ছেলেদের সাথে তুলনা করবে? নিজেকে কষ্ট দেওয়া এবং নিজের মানসিক যন্ত্রণা বাড়ানো ছাড়া অন্য পুরুষদের দিকে তাকিয়ে তুমি কী আর অর্জন করতে পারবে?
যে তার চোখকে স্বাধীন ছেড়ে দেয়, সে সর্বদা কষ্টে থাকে আর স্থায়ীভাবে হিংসা-বিদ্বেষের মধ্যে আটকা পড়ে; এটাই স্বাভাবিক। অন্য পুরুষদের দিকে তাকিয়ে এবং তোমার স্বামীকে তাদের সাথে তুলনা করে তুমি হয়তো এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পাবে যার মাঝে তোমার স্বামীর দোষগুলো নেই। তুমি তখন ভাবতে পারো ঐ ব্যক্তি নিখুঁত। কারণ তার দোষত্রুটি কোথায় তুমি তা জানো না। তারপর তুমি নিজের বিয়েকে একটি ব্যর্থতা হিসেবে ধরে নিতে পারো; যা তোমাকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে।
“আঠারো বছরের এক মেয়েকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। যে তার বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটি পুলিশকে জানায়, বিয়ের তিন বছর পর এক সময় তার কাছে মনে হয়েছে, সে তার স্বামীকে ভালোবাসে না। মেয়েটি বলে- 'আমি প্রায়ই আমার স্বামীর চেহারা অন্য পুরুষের সাথে তুলনা করতাম আর ওর সাথে বিয়ে হওয়ায় আফসোস করতাম।”
হে বোন! তুমি যদি তোমার বৈবাহিক জীবন স্থায়ী করতে চাও, যদি মানসিক অশান্তি থেকে বাঁচতে চাও, যদি একটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাও, তাহলে স্বার্থ ও অর্থের মোহের পেছনে ছোটা বন্ধ করো। কখনো অন্য পুরুষের প্রশংসা করো না। নিজের স্বামী ছাড়া অন্য লোককে নিয়ে ভেবো না। মনে মনে এমন আফসোস করো না, 'হায়, আমার যদি অমুকের সাথে বিয়ে হতো! আমার স্বামী যদি অমুকের মতো সুদর্শন হতো! হায়, আমার স্বামী যদি এমন ভালো একটা চাকরি করতো! হায় এটা, হায় ওটা!'
কেন? কেন নিজেকে এসব চিন্তার মাঝে বন্দী করে রাখছো? কেন নিজ হাতে নিজের বৈবাহিক জীবনের ভিত দুর্বল করে দিচ্ছো? ধরো, এসব আকাঙ্ক্ষার কোনোটা সফল হয়ে গেলো; এবার তুমি কি নিশ্চিত যে- এটা আসলেই তোমাকে সুখ এনে দেবে? তোমার কী ধারণা, যেসব পুরুষকে দেখে মনে হয় তাদের সব আছে, কোনো অভাব নেই, তাদের সবার স্ত্রী তাদেরকে নিয়ে খুব সুখী?
হে বোন! তোমার স্বামী যদি কখনো এটা সন্দেহ করে বসে যে- তুমি অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছো, তাহলে তার মনটা ভেঙে যাবে, তোমার প্রতি সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। সাবধান! কখনো কোনো পুরুষের সাথে হাসি-তামাশা, ওঠাবসা ইত্যাদি করো না। পুরুষের মন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাদের স্ত্রী অন্য পুরুষের ছবি দেখে প্রশংসা করবে, এতোটুকুও তারা সহ্য করতে পারে না।
📄 পর্দা করুন
নারী ও পুরুষের পর্দার ব্যাপারে ইসলামে কতগুলো বিধান রয়েছে, যা উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আবার এমন কতগুলো বিধান রয়েছে যা বিশেষভাবে নারীর জন্য প্রযোজ্য। কেননা নারী জাতির মধ্যে সৃষ্টিগতভাবেই আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে কোমল, সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে। প্রকৃতিগতভাবেই তারা মুগ্ধকর, আকর্ষণীয়, পছন্দনীয় ও ভালোবাসার পাত্রী।
স্বামী চায় স্ত্রীর মধুরতা, ভালোবাসা, রংঢং, সৌন্দর্য, হাসি-তামাশা, রসিকতা ইত্যাদি শুধুমাত্র সে-ই উপভোগ করবে। স্ত্রী অন্য পুরুষদের থেকে এসব লুকিয়ে রাখবে। পুরুষের মানসিক প্রকৃতিই এমন; এরা নিজের স্ত্রীর দিকে অন্য লোকের তাকানোটাও সহ্য করতে পারে না। তার স্ত্রীর সাথে অন্য লোকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করে। সে চায় তার স্ত্রী ইসলামি পর্দা পালন করুক, নারীর জন্য ইসলামের সংবিধিবদ্ধ পোশাক পরিধান করুক।
একজন মুসলমান নারী ইসলামের আচার-আচরণ ও নিয়ম-কানুন পালনের মাধ্যমে তার স্বামীর আইনগত অধিকার রক্ষা করে। যেকোনো সৎ পুরুষেরই স্ত্রীর এ ধরনের গুণাবলির প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকবে। নারীর সামাজিক আচার-আচরণ যদি ইসলামি আচার-নীতির ওপর গড়ে ওঠে তবে সে তার স্বামীকে মানসিকভাবে শান্তিতে রাখতে পারবে। তখন তার স্বামী পরিবারের জন্য রোজগার করতে আগ্রহ পাবে, স্ত্রীর প্রতি অধিক ভালোবাসা দেখাবে। এসকল স্বামীরা পর-নারীর প্রতি আকৃষ্ট হবে না।
অপরদিকে যে পুরুষের স্ত্রী ইসলামের পর্দার বিধান পালন করে না, নিজের সৌন্দর্য পরপুরুষকে দেখিয়ে বেড়ায় এবং তাদের সাথে চলাফেরা করে, সে সকল স্বামীগণ মারাত্মকভাবে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। সে মনে করে যে— স্ত্রী তার অধিকার নষ্ট করছে। এই সকল স্বামীগণ সব সময় মর্ম-যাতনা ও হতাশায় ভোগে এবং আস্তে আস্তে পরিবারের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে।
সুতরাং সমাজ ও নারীজাতির কল্যাণের স্বার্থে নারীকে শালীন পোশাক পরিধান করতে হবে। লোকসমাজে সাজসজ্জাবিহীন অবস্থায় চলাফেরা করতে হবে। নিজের সৌন্দর্য, শোভা অপরের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে হবে।
পর্দা পালন করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
অর্থ: “ঈমানদার নারীদেরকে বলুন— তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং যেন তাদের স্বামী, পিতা, পুত্র, শ্বশুর, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও যে সকল বালক নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।”২৪
সমাজে পর্দা করে চললে নারীজাতি নিজেরাই বিভিন্নভাবে উপকৃত হবে। যেমন—
প্রথমত— এর মাধ্যমে একজন নারী সামাজিক মর্যাদা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধকে উত্তমভাবে সংরক্ষণ করতে পারে। নিজেদেরকে স্রেফ প্রদর্শনী পণ্য হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত— স্বামীর প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসার কার্যকর প্রমাণ পেশ করতে পারে। ফলশ্রুতিতে, পরিবারে একটি আন্তরিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। অসুস্থ পরিবেশ ও ঝগড়াঝাটি রোধ করা সম্ভব হয়। সংক্ষেপে বললে এধরনের মহিলারা স্বামীর মন জয় করতে পারে এবং পরিবারে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
তৃতীয়ত— ইসলামি পর্দাপ্রথা পালনের মাধ্যমে অবৈধ কুদৃষ্টি বন্ধ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে ঝগড়া-ফাসাদ বন্ধ হয় ও পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তি মজবুত হয়। ফলে পারিবারিক অঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে।
চতুর্থত— মহিলারা যদি যথাযথভাবে পর্দা পালন করে তবে যুবসমাজ ভুল পথে যাওয়া থেকে বাঁচবে। তাদের চরিত্র সংরক্ষিত থাকবে, এতে নারীরও উপকার হবে।
পঞ্চমত— সকল মহিলা যদি সঠিক পর্দা পালন করে তবে স্ত্রীরা সবাই নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে যে— ঘরের বাইরে গেলে তার স্বামী কোনো দুশ্চরিত্রার প্রতি আকৃষ্ট হবে না এবং পরিবারের প্রতি মনোযোগ হারাবে না।
ইসলাম নারীজাতির সৃষ্টিগত বিশেষ প্রকৃতির ব্যাপারে সচেতন। সেই সাথে নারীকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেও বিবেচনা করেছে এবং তার ওপর বেশ কিছু দায়িত্বও আরোপ করেছে। ইসলাম চায় নারী পর্দা রক্ষা করে তার সামাজিক দায়িত্বগুলো পালন করুক। এতে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ মেয়াদি স্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও নিরাপত্তা রক্ষা হবে। জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত হবে। তবে একজন নারী অবশ্যই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার লাভ করবে আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মীয় দায়িত্বগুলো পালনের মাধ্যমে।
সম্মানিতা বোন!
তুমি যদি পরিবারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাও, তুমি যদি নারী অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হও, যদি যুবকদের মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে যত্নশীল হও এবং তাদের নৈতিক অধঃপতন রোধ করতে চাও, যদি বখাটেদের থেকে নারীর অসম্মান রোধ করতে চাও, সর্বোপরি যদি একজন বিশ্বাসী ও ত্যাগী মুসলিম হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাও, তবে তোমাকে ইসলামি পর্দা পূর্ণভাবে পালন করতে হবে। স্বীয় সৌন্দর্য নন-মাহরামদের সামনে প্রদর্শন কোরো না। এটা নিজের ঘরে শুধু মাহরামদের সামনেই কেবল প্রকাশ করো। তোমাকে পর্দা করতে হবে স্বামীর ভাই ও তাদের ছেলেদের সামনে, পর্দা করতে হবে খালু, ফুফা, খালাতো, চাচাতো, মামাতো ও ফুফাতো ভাইদের সামনে। তাদের সামনে ইসলামি পর্দা অনুযায়ী কাপড় না পরা গুনাহের কাজ এবং তাতে তোমার স্বামীর মন খারাপ হতে পারে। যদিও সে হয়তো কখনো তা উল্লেখ করবে না। একজন নারীর জন্য তার শ্বশুর, আপন ভাই ও তার ভাগ্নের সামনে ওইভাবে পর্দা করার প্রয়োজন নেই। তবে উত্তম হলো সে তাদের সামনেও একটি নির্দিষ্ট ইসলামি পর্দা মেনে চলবে। অর্থাৎ একজন নারী তার স্বামীর সামনে নিজেকে যতটা আকর্ষণীয় করবে, উপরোক্ত আত্মীয়দের সামনে ততটা করা উচিত হবে না। কারণ বেশিরভাগ পুরুষ চায় না, তার স্ত্রী অন্য ছেলের সামনে সাজবে বা আকর্ষণীয় কাপড় পরবে। আর এটা ভুলে গেলে চলবে না যে— মানসিক শান্তি এবং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর বিশ্বাস একটি পরিবার টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
টিকাঃ
২৪ সূরা নূর : ৩১।
📄 আপনার স্বামীর ভুল ক্ষমা করুন
দুজন ব্যবসায়িক অংশীদার, দুজন প্রতিবেশী, দুজন সহকর্মী, দুজন বন্ধু, বিশেষত স্বামী ও স্ত্রীর একে অপরের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া জরুরি। যদি কোনো পরিবারের সদস্যরা ক্ষমাশীল না হয় এবং একে অপরের ভুল অন্তরে ধারণ করে রাখে, তবে হয় পরিবারটি আলাদা হয়ে যাবে নয়তো তারা একটি অসহনীয় জীবন যাপন করবে।
প্রিয় বোন! আপনার স্বামী ভুল করতে পারেন। তিনি হয়তো আপনাকে অপমান করতে পারেন, আপনাকে গালাগালি করতে পারেন, মিথ্যা বলতে পারেন, আপনাকে আঘাত করতে পারেন। এই ধরনের কাজ যে কোনো লোক দ্বারা সংঘটিত হতে পারে।
যদি আপনার স্বামী কোনো ভুল করার পরে এটির জন্য অনুশোচনা করেন, বা আপনি মনে করেন যে—তিনি নিজের অসদাচরণের জন্য অনুতপ্ত, তবে তাকে ক্ষমা করুন এবং বিষয়টি মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন।
যদি তিনি অনুতপ্ত হন কিন্তু তা প্রকাশ করতে প্রস্তুত না থাকেন, তবে তার ভুলগুলো টেনে এনে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। অন্যথায় সে নিজে অপমান বোধ করতে পারে এবং আপনার ভুলগুলিও তুলে এনে তার শোধ তুলতে পারে। ফলস্বরূপ একটি বড় অশান্তির সূচনা হতে পারে।
সুতরাং যতক্ষণ না সে নিজের বিবেক থেকে নিজেকে নিন্দা করে এবং নিজে থেকেই অনুশোচনা বোধ করতে শুরু না করে, ততক্ষণ আপনার পক্ষে চুপ থাকা ভালো। তারপরে তিনি আপনাকে জ্ঞানশীল এবং অনুগত স্ত্রী হিসেবে মূল্যায়ন করবেন, যিনি তার স্বামী এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল।
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
অর্থ : “তোমরা সম্মানীয় লোকদের ত্রুটিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো।”২৫
আরেক বর্ণনায় এসেছে, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
অর্থ : “কোনো মুসলমান ক্ষমা চাওয়ার পরও যে ক্ষমা করে না, সে আর অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীর মতো কেয়ামতের দিন সমান গুনাহগার সাব্যস্ত হবে।”২৬
এটা কি দুঃখজনক নয় যে—একটি পবিত্র বৈবাহিক সম্পর্ক ভঙ্গ হচ্ছে শুধুমাত্র একজন মহিলা তার স্বামীর ভুলগুলো ক্ষমা করতে প্রস্তুত না হওয়ায়?
টিকাঃ
২৫ মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ২৫৪৭৪, আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪৩৭৫, সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ৭২৫৩।
২৬ আবু দাউদ মারাসিল, হাদিস নং: ৫২১; ইবনে মাজা, হাদিস নং: ৩৭১৮।
📄 আপনার স্বামীর আত্মীয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন
আপনার স্বামীর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে রেষারেষিই আপনার পারিবারিক জীবনের অন্যতম সমস্যা। স্বামীর মা, বোন বা ভাইদের সাথে কিছু মহিলার ভালো সম্পর্ক থাকে না। একদিকে স্ত্রী তার স্বামীর উপর কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়, যাতে সে তার মা বা অন্য কোনো আত্মীয়ের দিকে গুরুত্ব দিতে না পারে। সে তাদের মধ্যে বিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। অন্যদিকে তার শাশুড়ি নিজেকে তার পুত্র এবং পুত্রবধূর অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করে। মা তার পুত্রের ওপর কর্তৃত্ব বহাল রাখতে কঠোর চেষ্টা করে এবং সতর্ক থাকে যে- নতুন পুত্রবধূ যেন তাকে পুরোপুরি অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে। তিনি তার পুত্রবধূ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতে পারেন বা তার মধ্যে দোষ খুঁজে বের করতে পারেন। এই জাতীয় কর্মকাণ্ড বাইরের অনেক অশুভাকাঙ্ক্ষী দ্বারাও ঘটতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে যদি তারা সবাই একই বাড়িতে থাকে।
যদিও এখানে দুজন মহিলার মধ্যে এই রেষারেষি হয়ে থাকে তবুও মাঝখান থেকে আসলে অশান্তি এবং হতাশা পুরুষকে ভোগায়। স্বামী এমন একটি দোটানায় আটকে পড়ে যেখানে সে কোনো পক্ষ নিতে পারে না। একদিকে হলেন- তাঁর স্ত্রী; যিনি অন্য কারো কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে চান। একজন স্বামী স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন যে- তাকে অবশ্যই তার স্ত্রীকে সমর্থন করতে হবে এবং তাকে খুশি রাখতে হবে। অন্যদিকে তিনি তার পিতামাতার কথাও চিন্তা করেন; যারা তাকে তাঁর জীবন, শিক্ষা এবং তাঁর প্রতিপালনের জন্য তাদের নিজের জীবন ব্যয় করেছেন। তিনি অনুভব করেন যে- তাঁর বাবা-মা আশা করেন; সে তাদের প্রয়োজনের সময় তাদের সহায়তা করবে এবং তাদের ত্যাগ করা মোটেও সম্ভব না। তদুপরি যদি তিনি নিজেই কোনো কিছুর অভাব বোধ করেন তবে তাঁর বাবা-মা ছাড়া আর কে তাকে এবং তাঁর পরিবারকে সহায়তা করবে? যার ফলে, তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর সেরা এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু তার বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজন। সুতরাং একজন বিচক্ষণ পুরুষের জন্য তার স্ত্রীকে বেছে নেওয়া এবং পিতামাতাকে ত্যাগ করা বা তদ্বিপরীত করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও বা এগুলির কোনোটিই সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, তাকে উভয় পক্ষকেই সামলাতে হয় এবং তাদের সন্তুষ্ট রাখতে হয়, যা একটি কঠিন কাজ।
পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলার একমাত্র সম্ভাব্য উপায় হলো- স্ত্রীকে কর্তব্যশীল এবং বিচক্ষণ হতে হবে। এই পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি তার সমস্যা সমাধানে তার স্ত্রীর সহায়তা পাবার প্রত্যাশা করে। যদি স্ত্রী তার শাশুড়িকে সম্মান করে, তার কাছ থেকে পরামর্শ প্রার্থনা করে এবং তার সাথে আনুগত্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে শাশুড়ি তার সবচেয়ে বড় সমর্থক হবে।
আপনি কি এটা বুঝতে পারেন না যে- জীবনের উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে একে অপরের; বিশেষত আত্মীয়-স্বজনদের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে? অন্যরা আপনাকে পরিত্যাগ করলেও তারা আপনাকে সমর্থন করবে? একে অপরকে বোঝা এবং ভালো আচরণের মাধ্যমে নিজের আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা ভালো নয় কি? নিজের কাছের সম্পর্ক ছিন্ন করে অপরিচিত ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা কী আসলেই বুদ্ধিমানের কাজ এবং ভালো কাজ? অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে- যখন কারো অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয় তখন বন্ধুরা তাকে ছেড়ে যায়। তবে পরিত্যাগ করা আত্মীয়রা তার সাহায্যের জন্য আসে। কারণ পারিবারিক বন্ধন অকৃত্রিম এবং এটা সহজে ভাঙা যায় না।
কেউ কখনও আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কিছুই করতে পারে না। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি অনেক থাকলেও সবারই সময় মতো আত্মীয়-স্বজনের সম্মান ও দয়ার প্রয়োজন হয়। তারাই শারীরিক ও মানসিকভাবে আপনাকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসবে। আত্মীয়রাই সর্বদা আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। প্রয়োজনের সময় তারা অন্যের চেয়ে দ্রুত আপনার সহায়তায় আসবে। যে তার স্বজনদের অস্বীকার করবে সে অনেক সাহায্যকারী হাতছাড়া করবে।
হে বোন! আপনার স্বামীর এবং আপনার নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আপনার আশেপাশের ভালো শুভাকাঙ্ক্ষীদের খুঁজে নিন। আপনার স্বামীর আত্মীয়দের সাথে মিশুন। স্বার্থপর এবং বোকা হবেন না; জ্ঞানী হোন এবং আপনার স্বামীকে যাতে কোনো সমস্যায় পড়তে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। আল্লাহ ও মানুষ উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একজন উত্তম ও অনুগত স্ত্রী হোন।