📄 প্রসববেদনার ভয়
একটি শিশু প্রসব করা কোনো সহজ ঘটনা নয়। প্রসববেদনা কখনো কখনো মারাত্মক হতে পারে। গর্ভবতী মহিলারা প্রায়ই প্রসববেদনা এবং শিশু-জন্মের সাথে সম্পর্কিত সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তিত হন এবং সন্তান জন্মদানের পর তিনি এসব চিন্তা থেকে মুক্তি লাভ করেন। যদিও মহিলাদের গর্ভাবস্থার সাথে মানিয়ে নেয়া, তার প্রাত্যহিক অপরিহার্য কাজগুলো করা এবং তার সন্তানদের খাওয়ানো সহ সংশ্লিষ্ট কাজে আন্তরিক থাকা উচিত। পুরুষদেরও উচিত— সন্তানদের লালনপালন করার ক্ষেত্রে স্ত্রীকে সহায়তা করা।
আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারিমে বলেন- অর্থ : “তারা তোমাদের আবরণ এবং তোমরা তাদের আবরণ।”৭৯
সৃষ্টির নিয়মানুসারে- যদিও ভ্রূণ একজন মহিলার গর্ভে বিকাশ লাভ করা শুরু করে; কিন্তু সন্তানের বাবাও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সুতরাং পুরুষদের উচিত সন্তানের জন্মের সময় তাদের স্ত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যা কিছু সম্ভব করা এবং জরুরীভাবে যদি কোনো কিছু প্রয়োজন হয় তবে তার ব্যবস্থা করা। গর্ভবতী স্ত্রীর চিকিৎসা ও প্রসবের সুবিধার জন্য যা প্রয়োজন তার জন্য একজন স্বামীর সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। কারণ- এটি একজন স্বামীর একইসাথে ইসলামিক ও মানবিক দায়িত্ব।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন- অর্থ : “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।”৮০
একজন স্বামীর উচিত— তাদের সন্তান জন্মের পর তার স্ত্রীর সাথেই থাকার চেষ্টা করা। তবে যদি তিনি তা করতে সক্ষম না হন তবে তার উচিত স্ত্রীর সাথে মোবাইল যোগে প্রতি মুহূর্তের খোঁজ খবর নেয়া এবং কোনো আত্মীয়কে তার কাছে থাকার জন্য প্রেরণ করা। স্ত্রীকে হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে স্বামীর নিজেরই যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত এবং ঘরের কাজকর্মে স্ত্রীকে সহায়তা করা উচিত; যেনো স্ত্রী পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম করার সুযোগ পান এবং তার হারানো শক্তি আবার ফিরে পেতে সক্ষম হন। যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে ভাল ব্যবহার করেন; আল্লাহ তাআলা সে ব্যক্তিকে পরকালে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করবেন।
ইবন আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি।”৮১
একজন স্বামী; যিনি তার স্ত্রীর সাথে ভালো আচরণ করেন; তাদের পারিবারিক জীবন আরো প্রাণবন্ত এবং স্নেহ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়। পরিবারের ভিত্তিগুলি আরো মজবুত হয়। এতে তার স্ত্রী, তার স্বামীর প্রেম ও ভালোবাসার অনুভূতি কখনোই ভুলতে পারেনা। ফলে, তাদের বিবাহের বন্ধন আরো দৃঢ় হয়।
টিকাঃ
৭৯. সুরা বাকারা: ১৮৭।
৮০. সুরা আর রূম: ২১।
৮১. ইবন মাজাহ, হাদিস নং: ১৯৭৭; জামে তিরমিজি, হাদিস নং: ৩৮৯৫।
📄 সন্তানদের লালনপালনের ক্ষেত্রে সহায়তা
সন্তান একটি বিবাহের ফল। স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই এই সৃষ্টিতে একটি ভূমিকা পালন করেন এবং তারা তাদের সন্তানের সমস্ত সমস্যা এবং সুখের সাথে জড়িত। একটি সন্তানকে লালনপালন করার দায়িত্ব শুধুমাত্র মায়ের একা নয়; এটি পিতা-মাতা উভয়েরই কর্তব্য। যদিও মায়েরাই মূলত তাদের বাচ্চাদের যত্ন নেন। তাদের খাওয়ানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব সবই মা গ্রহণ করেন এবং তাদের বাবারাও মায়ের এই দায়িত্বকে খুব সহজভাবেই গ্রহন করেন। কোনো পুরুষের পক্ষে এটি মোটেও ধরে নেওয়া উচিত নয় যে- সন্তানের দেখা-শোনা এবং লালনপালন করার দায়িত্ব কেবলমাত্র মায়েরই কর্তব্য এবং এই ক্ষেত্রে বাবার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এটা ঠিক নয় যে- কোনো স্বামী তার ক্রন্দনরত বাচ্চাকে তার স্ত্রীর কাছে রেখে আলাদা ঘরে বিশ্রাম নেবেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- অর্থ : “ অর্থাৎ- আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু'বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য; বিধি মোতাবেক মায়েদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। কষ্ট দেয়া যাবে না কোনো মাকে তার সন্তানের জন্য, কিংবা কোনো বাবাকে তার সন্তানের জন্য। আর ওয়ারিশের উপর রয়েছে অনুরূপ দায়িত্ব। অতঃপর তারা যদি পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শের মাধ্যমে দুধ ছাড়াতে চায়; তাহলে তাদের কোন পাপ হবে না। আর যদি তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে অন্য কারো থেকে দুধ পান করাতে চাও, তাহলেও তোমাদের উপর কোন পাপ নেই, যদি তোমরা বিধি মোতাবেক তাদেরকে যা দেবার তা দিয়ে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।"৮২
প্রিয় জনাব! আপনার সন্তান আপনার দায়িত্ব। আপনার ক্রন্দনরত বাচ্চার দায়িত্ব স্ত্রীর কাছে দিয়ে আপনার আলাদা রুমে বিশ্রাম করাটা কি আসলেই শোভনীয়? বাড়িতে আপনার স্ত্রীকে মূল্যায়ন করার এটি কি সঠিক উপায় হলো? আপনি যেমন বাড়ির বাইরে কঠোর পরিশ্রম করেন, আপনার স্ত্রীও গৃহের ভিতরে ঠিক আপনার মতোই কঠোর পরিশ্রম করেন এবং আপনার মতো তার নিজেরও সঠিক ঘুম এবং বিশ্রাম প্রয়োজন। চিৎকার করে ক্রন্দনরত বাচ্চার কান্না আপনার স্ত্রীরও ভালো লাগেনা তবুও সে ধৈর্য ধারণ করে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন- অর্থ : অর্থাৎ “ধৈর্যশীলদেরকে তো অগণিত পুরস্কার দেওয়া হবে।”৮৩
জনাব! সন্তান লালন-পালনে স্ত্রীকে সহায়তা করা একজন স্বামীর মানবিক দায়িত্ব পাশাপাশি পবিত্র ইসলাম ধর্মানুযায়ী এটিই বিধান। আপনারা ঘরের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করুন নাহয় পালাবদল করে কাজ করুন। আপনার স্ত্রী যদি একটি নিদ্রাহীন রাত্রিযাপন করেন এবং সকালের নামাজের পর ঘুমিয়ে পড়েন; তবে আপনার উচিত হবে না- স্ত্রীর কাছে অন্যান্য দিনের মতো সকালের নাস্তা প্রস্তুত আশা করা। আপনার নিজের নাস্তা নিজে প্রস্তুত করে, আপনার স্ত্রীর জন্যও প্রস্তুত করে রাখা উচিত এবং আপনার স্ত্রীর জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।
হযরত আসওয়াদ রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- অর্থ : “আমি একদা হযরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের মধ্যে কী কাজ করতেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, অর্থাৎ গৃহস্থালি কাজে পরিবার-পরিজনের সহযোগিতায় থাকতেন। যখন নামাজের সময় হতো নামাজে চলে যেতেন।”৮৪
আপনি যখন বাড়ির বাইরে বা কোনো প্রমোদভ্রমণে থাকবেন তখন সন্তানদের দেখাশোনা করার জন্য আপনার স্ত্রী দায়বদ্ধ নন। সংক্ষেপে বলতে গেলে- আপনার স্ত্রীকে আপনার সহযোগিতা করা উচিত এবং সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয়া উচিত। এতে করে আপনাদের পারিবারিক জীবন দৃঢ় হবে।
হযরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহু অন্য এক বর্ণনায় বলেন- অর্থ : তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বীয় কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন এবং সাধারণ মানুষের মতোই ঘরের কাজকর্ম করতেন।”৮৫
অবশেষে স্ত্রীদেরও মনে রাখা উচিত যে- তাদের স্বামীরা জীবনধারণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন এবং তাদের সক্ষমতা ছাড়িয়ে গিয়ে কোনো সহায়তা স্বামীদের কাছে আশা করা উচিত নয়। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত স্বামীদের বাড়ি ফিরে আসার সাথে সাথে সন্তানের দেখাশোনার ভার স্বামীর উপর দেয়া শোভনীয় নয়।
টিকাঃ
৮২. সূরা বাকারা: ২৩৩।
৮৩. সূরা: যুমার: ১০।
৮৪. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬৭৬।
৮৫. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ২৪৯০৩।
📄 মতবিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা
পারিবারিক সমস্যাগুলি সমাধানে সবচেয়ে বড় বাঁধা হলো আত্মকেন্দ্রিকতা এবং আত্ম-গর্ব। দুর্ভাগ্যক্রমে; অনেক ব্যক্তিরাই এই বৈশিষ্ট্যগুলি দ্বারা প্রভাবিত। এই ধরনের লোকদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধির অভাব থাকে যার মাধ্যমে তারা অন্যদের কাছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য কেবল নিজেদের গুণাবলী জাহির করেন, মালিক ভেবে নিজেদের ব্যর্থতা দেখতে পাননা।
চরিত্রের এই ব্যাধি যখন অন্য একজন দ্বারা সমালোচিত হয় তখন মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দেয়। কখনো কখনো স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই এই সমালোচনার দরুন ভুগে থাকেন এবং তাদের মধ্যে দিন রাত ঝগড়া হয়। প্রত্যেকেই নিজেকে সমস্ত ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করার জন্য অন্যের সমালোচনা করে থাকেন এবং অন্যকে দোষারোপ করেন। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- অর্থ : অর্থাৎ “অহংকারবশতঃ তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই যদি এই ব্যাধিতে ভুগেন; তবে তাদের মধ্যে পুনর্মিলন করা বিশেষত কঠিন। কারণ- তারা কারো পরামর্শ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না। স্বামী পারিবারিক নৈতিকতার উপর একটি বই কিনে এনে তার সঙ্গিনীর হাতে দিতে পারেন। দুঃখজনক যে- অনেক সময় স্ত্রী সেটি পড়ার কোনো প্রয়োজনীয়তাই বোধ করেন না। এমন উদাসীনতার কারণে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : “তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ কর। কেননা তাদেরকে পাঁজরের হাড্ডি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড্ডিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা হল উপরেরটি। সুতরাং তুমি যদি তা সোজা করতে যাও তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি একেবারে ছেড়ে দাও তাহলে বাঁকাই থেকে যাবে। তাই স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ কর।”৮৭
কোনোরকম কুসংস্কার ছাড়াই তাদের একে অপরের কথা শোনা উচিত। প্রত্যেকের নিজের একটি ক্ষুদ্রতম সমস্যাকেও উপেক্ষা না করে এবং সেগুলি সংশোধন করার অভিপ্রায় নিয়ে নিজেদের ত্রুটিগুলো মস্তিষ্কে নোট করে নেয়া উচিত। তারপরে তাদের উভয়েরই নিজেদের সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে, যদি পুনর্মিলন অর্জনে তারা অক্ষম হন তবে একজন অভিজ্ঞ, বিশ্বস্ত, সচেতন, বিশ্বাসযোগ্য এবং কল্যাণময় ব্যক্তির কাছে তাদের সমস্যাগুলো বিস্তারিত বলা উচিত।
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন- অর্থ : “ অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) লোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন।”৮৮
পিতামাতার স্বামী বা স্ত্রীর কারো প্রতিই পক্ষ নেওয়া উচিত নয়। এইভাবে- আল্লাহর সাহায্যে তাদের সমস্যাগুলি খুব শীঘ্রই সমাধান হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- অর্থ : “ যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতির আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। যদি তারা উভয়ের মীমাংসা করিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করে, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং সকল বিষয়ে অবহিত।”৮৯
টিকাঃ
৮৭. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৪৪৪৩।
৮৮. সূরা: বাকারাহ: ১৫৫।
৮৯. সূরা আন নিসা: ৩৫।
📄 বিবাহ বিচ্ছেদ
যদিও বিবাহবিচ্ছেদকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে- তবে এটি সবচেয়ে ঘৃণিত ও খারাপ কাজ। কেননা- তালাক আল্লাহর আরশকে কাঁপিয়ে দেয়। আস-সাদিক (রহ.) বলেন- “আল্লাহ ঐ ঘরকে পছন্দ করেন যা বিবাহের মাধ্যমে আবাদ করা হয় এবং ঐ ঘরকে অপছন্দ করেন যা তালাকের মাধ্যমে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আল্লাহর নিকট তালাকের চেয়ে ঘৃণ্য আর কিছু নেই”।
বিয়ে হচ্ছে একটি ঐশ্বরিক চুক্তি, যার মাধ্যমে দুইজন মানুষ মৃত্যু পর্যন্ত বন্ধু, সমব্যথী এবং প্রেমিক-প্রেমিকার মতো একসাথে থাকে। বিয়ে কোনও কাম-লালসাপূর্ণ বিষয় নয়- কোন তুচ্ছ বিষয়ের অজুহাতে একটি দম্পতি বিবাহিত সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে না। যদিও তালাক আইনত স্বীকৃত, তবুও এটি একটি মারাত্মক ঘৃণিত কাজ এবং এটিকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিৎ। স্বার্থপরতার কারণে স্বামী বা স্ত্রী একটি ছোট সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে এবং বিবাহিত জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
যে দম্পতি বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী নয়; তারা এই ধরনের ছোটোখাটো বিষয়ের ফাঁদে পড়ে তালাকের আবেদন করতে পারে। বিবাহবিচ্ছেদের চিন্তা মাথায় আসলেই তাড়াহুড়ো করা উচিৎ না। বরং তাদের সতর্কতার সাথে এর পরবর্তী পরিণতি এবং তাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে বিশদভাবে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে দুইটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
প্রথমত- তালাকের পরে বেশিরভাগ দম্পতিই পুণরায় বিবাহ করতে চায়। কিন্তু, তাদের মনে রাখা উচিৎ যে- তালাকের পরে ব্যক্তি তালাক প্রাপ্ত হিসেবে বিবেচিত হয় যা বিয়ের বাজারে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। একজন মানুষের পূর্ববর্তী বিয়ে ও তালাকের উপর ভিত্তি করে একজন নারী তার বিশ্বস্ততা ও চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। একজন তালাকপ্রাপ্ত মানুষকে বাকি জীবন একা কাটাতে হতে পারে এবং সে একাকিত্বে ভুগতে পারে। নিঃসঙ্গতা এতোটাই কঠিন পরিস্থিতি যে- একাকী মানুষ এই অসহনীয় জীবনের চেয়ে অনেকক্ষেত্রেই মৃত্যুকে বেশি পছন্দ করে।
দ্বিতীয়ত- যদি কোনো দম্পতি বিচ্ছেদ চায়; তাহলে তাদের অবশ্যই সন্তানদের কথা বিবেচনা করতে হবে। পরিবারের বাবা-মা একসাথে থেকে সন্তানদের লালনপালন করার মধ্যে ছেলে-মেয়েদের জীবনের সুখ-শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য নিহিত। কিন্তু তাদের এই পরিবার ভেঙে গেলে তারা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়। শুধু বাবা তাদের দেখাশোনা করলে তারা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে। তারা সৎ মায়ের সাথে থাকলে জীবন উপভোগ করতে পারবেনা। তালাক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। পরিবারের সন্তানরা অসহায় ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের স্বার্থপরতার কারণে শিশুরা ভুক্তভোগী হয়।
হে জনাব/ জনাবা! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও আপনার মাসুম বাচ্চার কথা চিন্তা করে, একে অপরের প্রতি সদয় হোন। একে অপরের ছোটোখাটো সমস্যাগুলোকে বাড়িয়ে তুলবেন না এবং আপনার যুক্তিতে অটল থাকবেন না। একে অপরের দোষ খুঁজে বেড়াবেন না। আপনার এবং আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করুন। মনে রাখবেন, আপনার সন্তানরা আপনার উপর আস্থা রাখে এবং তাদের সুখ-শান্তি আপনাদের উপর নির্ভর করে। তাদের প্রতি দয়া করুন এবং তাদের জীবন ধ্বংস করবেন না। যদি আপনি তাদের একান্ত ইচ্ছাগুলোকে অবহেলা করেন এবং তাদের ছোট হৃদয় ভেঙে দেন, তাহলে আপনি তাদের জীবনে অশান্তি সৃষ্টির দায় এড়াতে পারবেন না। এতে, আপনিও তাদের সাথে একত্রে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনে ব্যর্থ হবেন- আর এভাবেই জীবনের এক পর্যায়ে গিয়ে আপনি অশান্তির দাবানলে জ্বলতে থাকবেন।