📄 অন্য নারীর কাছে যাবেন না
একজন পুরুষকে অবশ্যই তার জন্য একজন উপযুক্ত নারী খুঁজে নিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। তাকে অবশ্যই যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে জীবনসঙ্গিনী খুঁজতে হবে। তবে বিয়ের পর অবশ্যই তার অন্য মহিলার কাছে যাওয়া উচিৎ নয়। এমনকি তার নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো মহিলার কথা চিন্তা করাও উচিৎ না। তাকে বুঝতে হবে যে, একটি মেয়ে তার পরিবার ছেড়ে তার সাথে থাকছে এবং তার পক্ষে তার ছেলেমানুষী ইচ্ছাগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিৎ নয়। নতুন পরিবারের সবাইকে একত্রিত করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে এবং বাড়িতে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। একটি লোক যদি সুখী থাকতে চায়; তাহলে বিয়ের পর অবশ্যই তাকে নির্লজ্জ চিন্তাভাবনা ত্যাগ করতে হবে এবং নতুন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। অন্য মহিলার সাথে হাসি-ঠাট্টা করা বা তাদের কারো প্রতি আসক্তি প্রকাশ করা চরম বোকামি। একজন পুরুষ কখনও অন্য পুরুষের সাথে তার স্ত্রীর হাসি-তামাশা করা পছন্দ করবে না, তেমনিভাবে একজন মহিলাও অন্য মহিলাদের প্রতি তার স্বামীর এই ধরনের আচরণ পছন্দ করবে না। কোনো মহিলা তার স্বামীকে অন্য কারো সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখলে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়বে ও কষ্ট পাবে। সে সংসার ও পরিবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেবে। সেও প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অনুরূপ কাজ করতে পারে বা তালাক চাইতে পারে।
একজন বিবাহিত পুরুষের জন্য অন্য মহিলার দিকে নজর দেওয়া ঠিক নয়। অন্য মহিলাদের প্রতি কামাতুর দৃষ্টিতে নজর দেওয়া পরিবারের মধ্যে অশান্তি, অস্থিরতার ও উদাসীনতা সৃষ্টি করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- অর্থ : “মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।”৩৭
কুদৃষ্টি হচ্ছে শয়তান দ্বারা নিক্ষিপ্ত একটি বিষাক্ত তীর। একসময় এই দৃষ্টি কষ্ট ও অনুতাপের কারণ হয়ে উঠবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা প্রেমের অভিনয় করাকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যে চোখ এ ধরনের বদঅভ্যাসে অভ্যস্ত তা কখনও শান্তি পায় না। এ ধরনের দৃষ্টি মানুষকে অনেক পাপের পথে পরিচালিত করে; যুবকদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। চোখ যা দেখেনা- হৃদয় তার প্রতি আসক্ত হয় না। প্রথমদিকে মানুষ নিষিদ্ধ দৃষ্টির মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকলেও পরবর্তীতে সে সব ভুলে গিয়ে যা দেখে তা দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ঘন ঘন (নিষিদ্ধ) দৃষ্টি অন্তরে কামনার সৃষ্টি করে, এবং তা দৃষ্টিনিক্ষেপকারীর ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। কামদৃষ্টির ক্ষতির কারণে ইসলাম এটিকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একজন পুরুষের যদি হঠাৎ রাস্তায় বা অন্য কোথাও কোনো মহিলার দিকে দৃষ্টি যায়; তাহলে সে সাথে সাথে অন্য কোথাও দৃষ্টি সরিয়ে ফেলবে বা চোখ বন্ধ করে ফেলবে। সে মহিলাদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে না। প্রথমদিকে- কঠিন মনে হলেও সামান্য অনুশীলন করলেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে। বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানে যে- নিষিদ্ধ দৃষ্টি পরিহার করা মানুষকে অনেক পাপ কাজ থেকে বাঁচিয়ে দেয়। যেমন- খুন, অপরাধ, আত্মহত্যা, বিবাহবিচ্ছেদ, স্নায়ুবৈকল্য, মানসিক ব্যধি, দুর্বলতা, অস্থিরতা, পারিবারিক অশান্তি, ইত্যাদিসহ সম্ভাব্য আরও অনেক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
আপনি যদি বিবাহিত জীবনে সুখী হতে চান; তাহলে অন্য মহিলাদের দিকে নজর দিবেন না। স্ত্রীর সামনে অন্য নারীর প্রশংসা করবেন না। কখনো এভাবে বলবেন না যে, “আমি যদি অমুক মহিলাকে বিয়ে করতে পারতাম......অনেক ভালো সুযোগ হাতছাড়া না করতাম..."
এই ধরনের কথা আপনার স্ত্রীকে কষ্ট দিবে, ফলে সে আপনার প্রতি ও জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এমনকি সে একই কাজে লিপ্ত হতে পারে, একই ধরনের কথা বলতে পারে। দুর্ভাগ্য ঐ সকল পুরুষদের জন্য যারা ক্ষণিকের চাহিদার জন্য নিজের পবিত্র স্ত্রীকে ছেড়ে অসৎ মহিলাদের কাছে যায়। তারা কখনও পারিবারিক বন্ধন ও ভালোবাসা চিনেনি। এইসমস্ত পুরুষ পশুর মতো, যারা শুধু খাওয়া, ঘুম ও লালসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। তারা মানবতা ও ভালোবাসা সম্পর্কে অজ্ঞ।
টিকাঃ
৩৭. সূরা নূর : ৩০
📄 কৃতজ্ঞ হোন
ঘরের কাজ কিছু পুরুষের কাছে সহজ মনে হলেও এটিকে কঠোর ও ক্লান্তিকর কাজ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ। এমনকি একজন গৃহিণী সারাদিন রাত কাজ করেও তার ঘরের কাজ শেষ করতে পারে না। রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়া এবং ইস্ত্রি করা, থালাবাসন ধুয়ে গুছিয়ে রাখা, বিছানা ও আসবাবপত্র গুছিয়ে রাখা, এবং সর্বোপরি বাচ্চাদের লালন-পালন করা, একদিন নয়, প্রতিদিন একই কাজ করা খুবই কষ্টসাধ্য। একজন পুরুষ ভাবতে পারে, তার স্ত্রী মাত্র তিনবেলা রান্না করতে গিয়ে বাকি কাজ করতে ভুলে যায়। কিন্তু কোনো পুরুষ যদি একমাস ঘরে থেকে সংসারের কাজ করে তাহলেই সে স্ত্রীর কাজের চাপ বুঝতে পারবে। তখন সে তার স্ত্রীর প্রশংসা করতে শুরু করবে। একজন গৃহিণী ঘরের সমস্ত কাজ খুশিমনে করে থাকে, কিন্তু সে আশা করে তার স্বামী কাজের প্রশংসা করবে ও তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
হে জনাব! ঘরের কাজের জন্য আপনার স্ত্রীর প্রশংসা করতে দোষ কী! আপনি কেনো তার রান্না করা খাবারের প্রশংসা করেন না? আপনার সন্তানদের লালনপালনে তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করতে সমস্যা কোথায়? আপনি কী জানেন না যে- আপনার প্রশংসা তাকে উৎসাহিত ও মানসিকভাবে সতেজ করবে? আপনি যদি তার খাটুনির প্রতি উদাসীন থাকেন অথবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করেন, তাহলে সে ঘরের কাজ-কর্মের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়বে এবং তখন আপনি তার সম্পর্কে অভিযোগ করতে শুরু করবেন। আপনার বোঝা উচিৎ- আপনি আপনার স্ত্রীর উদাসীনতার কারণ হতে পারেন। যদি কোনো অপরিচিত ব্যক্তি আপনার প্রতি একটি ছোট্ট অনুগ্রহ করে তবে আপনি তাকে বহুবার ধন্যবাদ দেন; তাহলে আপনার স্ত্রীর এতো অনুগ্রহেও আপনি কি তাকে একটিবারও ধন্যবাদ দিবেন না! এমনকি আপনি তার কাজের জন্য আপনার প্রশংসা দিয়েও তাকে খুশি করতে পারবেন না?
২৯ বছর বয়সী এক গৃহিণী ফেসবুকে লিখেছেন যে- “আমি একজন অকৃতজ্ঞ পুরুষকে বিয়ে করেছি; যে আমার ঘরের কাজে সাহায্য করাকে উপেক্ষা করে। আমি কাপড় ধুই, থালা-বাসন পরিষ্কার করি, ঘর গুছাই, পরিবারের সবার জন্য রান্না করি, তার জুতা পালিশ করি, তার কাপড় ইস্ত্রিসহ আরও অনেক কাজ করি, কিন্তু সে কখনও আমাকে ধন্যবাদ পর্যন্ত দেয় না। যখনই আমি বাড়ির কাজের বিষয়ে তার সাথে কথা বলি; সে এড়িয়ে যায় এবং বলে যে- আমার তার সামনে এসব ব্যাপারে নিজের প্রশংসা করা উচিৎ না। তিনি আমার প্রচেষ্টাকে ছোট করে দেখেন; যেখানে তার সাফল্যের পেছনে আমার কঠোর পরিশ্রম রয়েছে।"
অনেক পুরুষ স্ত্রীর ঘরের কাজকে অবজ্ঞা করাকে পুরুষালি আচরণ মনে করে। তারা ভাবে- তারা যদি স্ত্রীর ঘরের কাজের প্রশংসা করে তাহলে মহিলারা খারাপ হয়ে যাবে। এমনকি তারা এ-ও মনে করে যে- স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ধন্যবাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের এই চিন্তাভাবনা ঠিক নয়। কেননা- মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যে কোনো ভালো কাজের প্রশংসা করা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রশংসা একজন মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে, এবং এটা বিশেষ করে গৃহিণীদের জন্য সত্য, যারা প্রতিদিন একই ক্লান্তিকর কাজ দিনরাত করে যায়। এজন্যই ইসলাম কারো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাকে চরিত্রের একটি ভালো দিক হিসেবে বিবেচনা করে। যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের প্রশংসা করে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকে বহু পুরষ্কারে ভূষিত করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— অর্থ : “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে সম্মান করে এবং তার সাথে নম্রভাবে কথা বলে, আল্লাহ তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিবেন এবং সে সর্বদা আল্লাহর রহমতের মধ্যে থাকবে।”
📄 বাড়িতেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন
সর্বত্র এবং সর্বদাই প্রত্যেকের নিজস্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত রাখা জরুরি। একজনকে অবশ্যই সবসময় তার শরীর এবং কাপড় পরিষ্কার রাখতে হবে। তাকে অবশ্যই নিয়মিত গোসল করতে হবে এবং নিয়মিত তার মুখ এবং হাত সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। তাকে অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করতে হবে; চুল আঁচড়াতে হবে; চুল ছোট করে কেটে রাখতে হবে; পা ধুয়ে নিতে হবে এবং পরিষ্কার মোজা এবং অবশ্যই পরিষ্কার পোশাক পরিধান করতে হবে। ইসলাম পবিত্র ধর্ম এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়কে জোর তাগিদ করা হয়েছে। আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : “ইসলাম পরিচ্ছন্ন। সুতরাং তোমরা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করো। নিশ্চয়ই জান্নাতে কেবল পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিই প্রবেশ করবে।”৩৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ: "জুমার দিনে গোসল করা প্রতিটি বালেগ পুরুষের জন্যে আবশ্যক।"৩৯ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। যখন কেউ তার ভাইদের সাথে সাক্ষাতে যায়, সে যেন নিজেকে পরিপাটি করে নেয়।”৪০ হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : “আল্লাহর জন্য প্রতিটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য হলো (অন্তত) প্রতি সাত দিনের মাথায় তার মাথা ও শরীর ধৌত করা।”৪১
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- অর্থ : “নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।”৪২ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একজন লোককে দেখেছিলেন; যে দেখতে অপরিচ্ছন্ন, চুল উষ্কখুষ্ক এবং আকর্ষণশূন্য ছিলো। জাবের রাযিআল্লাহু আনহু বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আমাদের বাড়িতে এলেন। এক ব্যক্তির চুল উষ্কখুষ্ক দেখে বললেন- অর্থ : “তার কি এমন কিছু নেই যার দ্বারা সে তার চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি রাখতে পারে। আরেক ব্যক্তির কাপড় ময়লা দেখে বললেন- সে কি তার কাপড় পরিষ্কার রাখার মত কিছু পায় না?”৪৩
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “যদি আমি আমার উম্মতের জন্যে কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করতে আদেশ দিতাম।”৪৪ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “মেসওয়াক মুখের জন্যে পবিত্রতা আর প্রভুর সন্তুষ্টির মাধ্যম।”৪৫ হযরত আলি রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন- “আল্লাহ তাআলা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন এবং তিনি তাঁর বান্দাদের উপর তাঁর নিয়ামতের প্রভাব দেখতে পছন্দ করেন।”
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সৌন্দর্য কেবল মহিলাদের জন্যই নয়, পুরুষদেরও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকা এবং ভালো পোশাক পরিধান করা উচিত। কিছু কিছু পুরুষরা তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মাথা ঘামায় না এবং কদাচিৎ একবার গোসল করে। তারা তাদের পোশাক সম্পর্কে সচেতন না। তাদের শরীরে দুর্গন্ধ হয় এবং কেউ তাদের সাথে মিশতে চায়না, দূরে সরে যায়। হযরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “দশটি বিষয় 'ফিতরাত'র অন্তর্ভুক্ত: গোঁফ কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, চামড়ার ভাঁজের জায়গাগুলো ধোয়া, বগলের নিচের চুল তুলে ফেলা, নাভির নিচের চুল মুণ্ডানো, (মলমূত্র ত্যাগের পর) পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। সম্ভবত কুলি করা।”৪৬
বাস্তবে দেখা যায়- যে পুরুষরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে যত্নবান এবং তাদের পোশাকের প্রতি গুরুত্ব দেন, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের ঘরের বাইরে থাকেন। তার এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সুন্দর পোশাক শুধু বাইরের লোকদের জন্য তার বাড়ির ভিতরে তার পরিবারের জন্য নয়। রাস্তায়, সমাবেশ ইত্যাদিতে তাদের খুব স্মার্ট দেখা যায় কিন্তু বাড়ি ফিরে আসার সাথে সাথে পুরনো, জরাজীর্ণ পোশাক পরিধান করে নেয়। তারা খুব কমই তাদের পরিবারের জন্য সুন্দর এবং পরিপাটি হয়ে সাজেন। অনেক পুরুষ আছেন যারা সকালে নাস্তা খাওয়ার আগে মুখ ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করেন না।
হে জনাব! আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে কোনো নোংরা এবং জঞ্জালযুক্ত পোশাক পরিধান করা অবস্থায় সহ্য করতে না পারেন এবং যদি তার কাছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর, পরিপাটি রূপ দেখতে প্রত্যাশা করেন, তবে আপনিও নিশ্চিত হন যে তিনিও আপনার কাছে থেকে একই প্রত্যাশা করেন। তিনিও একজন নোংরা, গন্ধযুক্ত এবং অপরিচ্ছন্ন স্বামীকে ঘৃণা করেন। তিনি আপনাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং স্মার্ট দেখতে ভালোবাসেন।
আপনার স্ত্রী অন্য পুরুষদের দিকে লক্ষ্য করবে না যদি আপনি নিজের স্ত্রীর কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন। রাস্তার অপরিচিত লোকদের জন্য কেনো আপনি এতো ভালো করে, ফিটফাট হয়ে বের হবেন যেখানে নিজের স্ত্রী এবং সন্তানদের কাছেই আপনি অগোছালো হয়ে থাকছেন? কাজেই, পবিত্র ইসলাম ধর্মে পুরুষদেরকে তাদের স্ত্রীর জন্য নিজেকে সুশোভিত করার নির্দেশনা দিয়েছে। হাকিম ইবনে মুআবিয়াহ আল-কুশাইরি রাযিআল্লাহু আনহু'র পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- অর্থ : “একদা আমি বলি- “হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো উপর তার স্ত্রীর কি হক রয়েছে? তিনি বললেন, আপনি যখন আহার করবেন তাকেও আহার করাবেন। আপনি পোশাক পরিধান করলে তাকেও পোশাক দিবেন। তার মুখমণ্ডলে আঘাত করবেন না, তাকে গালমন্দ করবেন না এবং পৃথক রাখতে হলে ঘরের মধ্যেই রাখবেন।”৪৭
টিকাঃ
৩৮. ফাইজুল কাদির, হাদিস নং: ৩০৬৫।
৩৯. সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ৮৫৮।
৪০. আমালুল ইয়াউমি ওয়াল লাইলাহ, হাদিস নং: ১৭৩।
৪১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৯৭; মুসলিম, হাদিস নং : ৮৪৯।
৪২. সূরা আল-বাকারা: ২২২।
৪৩. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪০৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ১৪৮৫০।
৪৪. সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৮৮৭।
৪৫. সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং: ৫।
৪৬. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৭৫৭।
৪৭. সুনানে আবু দাউদ: ২১৪২।
📄 স্ত্রীর সেবা শুশ্রুষা করুন
স্বামী এবং স্ত্রীকে সর্বদা একে অপরের প্রতি সহযোগিতাপ্রবণ এবং প্রেমময় হওয়া প্রয়োজন। তবে অসুস্থতা এবং অনুরূপ সমস্যার সময়গুলোতে এই প্রয়োজনগুলো আরো তীব্র হয়। একজন অসুস্থ ব্যক্তির যেমন ডাক্তার এবং ওষুধের প্রয়োজন; তেমনি সেবা শুশ্রুষা ও প্রেমময় যত্নের প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে বলেছেন— অর্থ : “তারা তোমাদের আবরণ এবং তোমরা তাদের আবরণ।”৪৮
একজন ভালো সেবিকা একজন রোগীকে তার গুরুতর অবস্থা থেকে খুব দ্রুত সুস্থ করে তুলতে পারে। একজন মহিলাও তার অসুস্থতায় তার স্বামীর কাছ থেকে সেবা শুশ্রুষা আশা করে। এমনকি তার বাবা-মায়ের চেয়েও বেশী প্রত্যাশা থাকে তার স্বামীর কাছে। যে মহিলা কাজের মেয়েটির মতো ঘরের সমস্ত কাজ করে, সে তার স্বামীর কাছে এমন প্রেমময় যত্নের দাবি রাখতেই পারে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি।”৪৯
স্ত্রীর চিকিৎসা এবং ওষুধের জন্য টাকা ব্যয় করা স্বামীর অন্যতম একটি দায়িত্ব এবং স্ত্রীর প্রয়োজনীয় হাতখরচ দেয়া তার কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- অর্থ : “পুরুষগণ নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল, যেহেতু আল্লাহ একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ হতে ব্যয়ও করে।”৫০ মহান আল্লাহ তাআলা আরো বলেন- অর্থ : “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। আর যদি তাকে তোমার অপছন্দও হয়, তবুও তুমি যা অপছন্দ করছ হয়তো আল্লাহ তাতে সীমাহীন কল্যাণ দিয়ে দেবেন।”৫১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- অর্থ : “কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর ওপর রাগান্বিত হবে না। কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার জন্য সে তার ওপর সন্তুষ্ট হতে পারবে।”৫২ কিছু পুরুষ আছে; তারা স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ যদি বেশী বলে মনে করে, তবে ইচ্ছে করেই চিকিৎসার গাফিলতি করে; যার কারণে অনেক সময় তাদের স্ত্রী মৃত্যুবরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “তোমরা নারীদের ব্যাপারে কল্যাণকামী হও। কারণ, তারা পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্ট। তোমরা তাদের কল্যাণকামী হও এবং তাদের ব্যাপারে সৎ-উপদেশ গ্রহণ কর।”৫০
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।”৫৪
হে জনাব! আপনি যদি নিজের সুখ এবং পরিবারের উন্নতিেত মনোযোগী হোন; তবে আপনার স্ত্রী অসুস্থ হলে অবশ্যই তাকে একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তাকে যত্নসহকারে পরিচর্যা ও সেবা শুশ্রুষা করতে হবে। তিনি আপনার জীবনসঙ্গী এবং আপনার সন্তানের মা। তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করুন এবং দ্রুত সুস্থতা কামনা করুন। আপনার ভালোবাসা আপনার স্ত্রী বিশেষভাবে লক্ষ করেন এবং আপনার প্রতি তারও ভালোবাসা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তিনি এজন্য আপনাকে নিয়ে গর্ববোধ করবেন এবং সুস্থ হওয়ার পর আপনার প্রতি এবং সন্তানদের প্রতি আরো বেশী মনোযোগী হবেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি।”৫৫ রোগীর সেবার মাধ্যমে দুনিয়ায় পার্থিব সম্বল যেমন অর্জিত হয় তেমনি আখিরাতের সম্বলও অর্জিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- রোগীর সেবা শুশ্রূষাকারী বেহেশতের ফলমূল আহরণে রত থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে না প্রত্যাবর্তন করে।
টিকাঃ
৪৮. সুরা বাকারা: ১৮৭।
৪৯. সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস নং : ১৯৭৭; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং : ৩৮৯৫।
৫০. সুরা নিসা: ৩৪।
৫১. সূরা নিসা: ১৯।
৫২. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪৬৯।
৫০. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১২২৩।
৫৪. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১১৬২।
৫৫. ইবনে মাজাহ: হাদিস নং: ১৯৭৭; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ৩৮৯৫।