📄 একজন স্বামীর নৈতিক অধিকারসমূহ
স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই একটা সুন্দর পরিবার গড়ে তোলে। একটি ছোটো, সুন্দর সংসার! যেখানে তারা একে অপরের সবটুকু সুখ-দুঃখ শেয়ার করে। পরিবারের বিভিন্ন কাজে তারা একে অপরকে সাহায্য করে। কিন্তু তারপরেও কোথায় যেনো একটা কমতি থেকেই যায়। মতের অমিল হয়ে যায় কোথাও না কোথাও। সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন পুরুষ মনে করে পরিবারের সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র তার হাতে। স্ত্রীর সাথে একপ্রকার অমিমাংসিত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কেননা- স্ত্রীরও অধিকার আছে সিদ্ধান্ত নেয়ার; যেহেতু পরিবারটা দুজনের। আর এভাবেই ছোট ছোট ব্যাপার থেকে বড় ধরনের কলহ সৃষ্টি হয়, দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
পুরুষত্ব খাটিয়ে স্ত্রীর প্রতি অত্যাচার করার নজির কম নয়। অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীকে কাজের হুকুম দিয়ে থাকে। যদি কোনোভাবে তাতে ভুল হয় বা স্ত্রী করতে দ্বিধা জানিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে পুরুষটি অনেক সময় ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তাদের ধারণা- এটা তাদের অধিকার। তারা তাদের স্ত্রীর সাথে রাগ দেখাবে- হিংস্র হবে। প্রয়োজন হলে শারীরিক অত্যাচার করবে। কিন্তু এটা একদম ঠিক নয়। "আইয়্যাম এ জাহেলিয়াত" এর যুগে এমনটা ছিলো। তখন এভাবে নারীদের অত্যাচার করা হতো। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে আঘাত করে, সে তার আত্মার এমন ক্ষতি করে যে সে নানা জটিলতায় ভুগতে পারে; এবং পারিবারিক ভালবাসা এবং উষ্ণতা তার জীবন থেকে ক্রমশ দূরে যাবে। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- "হে পুরুষরা! তোমাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুললে অবশ্যই অনুতপ্ত হবে। তোমার স্ত্রী কে জড়িয়ে ধরবে।"১৩
ইসলাম কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রে তার স্ত্রীকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার পরামর্শ দেয় যেখানে তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়- ১. একজন পুরুষকে ইসলামিকভাবে এবং আইনতভাবে তার স্ত্রীর কাছ থেকে যৌন তৃপ্তি- সন্তুষ্টি পেতে এবং এই সম্পর্ক থেকে সমস্ত প্রকার উপভোগ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। স্বামীর যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা স্ত্রীর কর্তব্য। যদি কোনো মহিলা তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করতে অস্বীকার করে তবে স্বামীর প্রথমে তাকে সুশৃঙ্খলভাবে রাজি করানো উচিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন- অর্থ : "এবং যাদের বিষয়ে তুমি আশঙ্কা করো তাদেরকে উপদেশ দাও এবং তাদেরকে নির্জন জায়গায় ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে মারধর কর; তবে যদি তারা তোমার কথা মেনে চলে তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসরণ করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী।”১৪
পুরুষদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলির কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়- ক. স্ত্রীর শারীরিক শাস্তির লক্ষ্য শিক্ষার উপায় হওয়া উচিত- প্রতিশোধ গ্রহণের নয়; খ. হাত দিয়ে বা হালকা কিছু ব্যবহার করে আঘাত করা উচিত; গ. ত্বকের বর্ণকে পরিবর্তনের জন্য যে পরিমাণ আঘাত করা যায় তা অনুমোদিত নয়; ঘ. শরীরের সংবেদনশীল অংশ যেমন চোখ, মাথা, পেট ইত্যাদি অংশে মারার অনুমতি নেই; ঙ. শারীরিক শাস্তি এতটা কঠোর হওয়া উচিত নয় যতটা দম্পতির মধ্যে ঘৃণা তৈরি করতে পারে। চ. কোনো ব্যক্তির যদি তার ইচ্ছার সাথে সম্মতি না রাখার বৈধ কারণ থাকে (অসুস্থতা বা পিরিয়ড); তবে তার স্ত্রীকে আঘাত করার অনুমতি নেই।১৫
একজন মহিলা তার স্বামীর অনুমতি পাওয়ার পরেই বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন। তবে এই ক্ষেত্রে পুরুষদের স্ত্রীর সাথে খুব বেশি কঠোর হওয়া উচিত নয়। তাদের পক্ষে যখনই সম্ভব প্রয়োজনে তাদের স্ত্রীদের বাইরে যেতে দেওয়া উচিত। তবে কোনো মহিলা স্বামীর অনুমতি ব্যতীত নির্দিষ্ট কাজে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন- ক. ধর্মের প্রয়োজনীয় আদেশগুলি শেখার জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়া। খ. হজের জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময়। গ. ঋণ/দেনা শোধ করার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। ১৬
টিকাঃ
১৩. সুনানে দরামি: ৩২৪২।
১৪. সুরা নিসা: ৩৪।
১৫. ইমদাদুল ফতোয়া: ৩/১২০।
১৬. ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/১২০।
📄 সন্দেহপ্রবণ পুরুষ
পুরুষদের উচিত- তাদের স্ত্রী'র প্রতি সচেতন হওয়া। তবে তা সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়। কিছু কিছু পুরুষ আছেন; খুব সন্দেহপ্রবণ এবং তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বস্ততায় সন্দেহ করেন; যা একটি পরিবারের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক এবং পরিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলে। যে ব্যাক্তি এমন সন্দেহপ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন, সে ব্যক্তি ক্রমাগত তার স্ত্রীর উপর দোষ চাপান। তিনি তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সর্বত্র তাকে অনুসরণ করেন। তিনি তার স্ত্রীর প্রতিটি বিষয়ে সন্দেহ করেন এবং সে সন্দেহ শক্ত করার জন্য একটি সমর্থনযোগ্য প্রমাণও খুঁজে নেন; মূলত তার সন্দেহপ্রবন চিন্তা থেকে।
এই জাতীয় সমস্ত উদাহরণ একজন সন্দেহপ্রবন স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রমাণক হিসাবে সন্দেহ হতে পারে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়- যদি কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু তার সন্দেহের সাথে একমত পোষণ করে। লোকটি বাড়ির চারদিকে গোয়েন্দার মতো কাজ করে এবং তার স্ত্রীও মনে করতে পারে যে তাকে চোখে চোখে রাখা হচ্ছে। তারা উভয়ই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং ফলশ্রুতিতে তাদের বৈবাহিক জীবন বিপন্ন হয়ে উঠে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন- অর্থ : "আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।”১৭
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন- অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক। কেননা কোনো কোনো বিষয়ে অধিক ধারণা করা পাপ।”১৮ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “অনুমান করা সম্পর্কে তোমরা সাবধান হও। কারণ অলীক ধারণা পোষণ সবচেয়ে বড় মিথ্যা।”১৯ আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : যে ব্যক্তি অন্যের বিরুদ্ধে যিনার অভিযোগ আনে, সে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করবে। আর যদি প্রমাণ করতে না পারে তাহলে তাকে আশি টা বেত্রাঘাত করো।২০
প্রিয় জনাব! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হলেও সন্দেহপ্রবণ হওয়া বন্ধ করুন। যুক্তি দিয়ে সমস্যাটি দেখুন। আপনার স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতক হওয়ার সম্ভাবনার মাত্রাটি পরিমাপ করুন এবং সেটি সুনির্দিষ্ট নাকি কেবল সন্দেহ তা আবিষ্কার করুন! আমি বলছি না যে- আপনার উদাসীন বা গাফিল হওয়া উচিত তবে আপনার কাছে যে পরিমাণ প্রমাণক রয়েছে তার ভিত্তিতে আপনার কাজ করা উচিত। আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে কোনো বিষয়ে সন্দেহ করে থাকেন তবে সেটি যার তার সাথে আলোচনা করবেন না। প্রয়োজনে আপনাকে অবশ্যই জ্ঞানী এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে। তবে সর্বোত্তম পন্থা হলো, আপনার স্ত্রীর সাথে এই বিষয়ে সরাসরি কথা বলা এবং তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া।
আল্লাহ তা'আলা কোরআনে বলেছেন- অর্থ : "তারা তোমাদের আবরণ এবং তোমরা তাদের আবরণ।”২১ বুদ্ধিমান হোন এবং নিজের সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার স্ত্রীকে আত্মহত্যা বা হত্যার প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন কারণ- আপনি এভাবে দুনিয়াতে আপনার জীবনকে নষ্ট করবেন এবং বদৌলতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনাকে পরকালে শাস্তি দিবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন - অর্থ : “তবে সৎকর্মশীলা নারী বা সাধ্বী রমণী তাঁরা, যাঁরা অনুগত এবং লোকচক্ষুর অন্তরালেও তাঁরা তা সংরক্ষণ করেন, যা আল্লাহ হেফাজতযোগ্য করে দিয়েছেন।”২২
প্রিয় বোনেরা! আপনার সন্দেহপ্রবণ স্বামী যদি কখনো আপনাকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে মেলামেশা করতে নিষেধ করেন বা কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বলেন; তবে তার কথাটি মান্য করুন। নইলে আপনার প্রতি তার সন্দেহের বীজ আরো দৃঢ় হবে। এমন সমস্ত কর্ম এড়িয়ে চলুন যা আপনার স্বামীকে আপনার উপর সন্দেহপ্রবণ করে তোলে। হযরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- অর্থ : "আমি যদি কাউকে অন্য লোকের প্রতি সেজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সেজদা করার নির্দেশ দিতাম।”২৬
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ'স রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- অর্থ : “সমগ্র পৃথিবীর মানুষের ভোগ্য বস্তুর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পূণ্যবতী স্ত্রী।”২৭ হুসাইন ইবনে মুহসিন রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- অর্থ : “স্বামীই আপনার জান্নাত কিংবা জাহান্নাম।”২৮ নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “সমগ্র পৃথিবীর মানুষের ভোগ্য বস্তুর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পূণ্যবতী স্ত্রী।”২৯
হযরত আবু হুরাইরা রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “কোনো বিশ্বাসী স্বামী কোনো বিশ্বাসী স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। তার একটি দোষ পেলে, অন্য গুণের কারণে তাকে ভালোবাসবে।”৩০ হযরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : স্ত্রীগণকে সৎ উপদেশ প্রদান করবে, কেননা পাজরের হাড় দ্বারা তার সৃষ্টি।৩১ সুতরাং স্ত্রীগণকে উপদেশ দিতে থাকো।৩২
টিকাঃ
১৭. সুরা আর রূম: ২১।
১৮. সুরা হুজুরাত: ১২।
১৯. সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬৬।
২০. ইবনে কাসির, খ. ৪ পৃষ্ঠা: ১২৩।
২১. সুরা বাকারা: ১৮৭।
২২. সুরা নিসা: ৩৪।
২০. সূরা আলে ইমরান: ২০০।
২১. সূরা শুরা: ৪৩।
২২. সূরা বাকারাহ : ১৫৫।
২৬. সুনানে তিরমিজ, হাদিস নং: ১১৫৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১৮৫৩।
২৭. সুনানে নাসায়ি হাদিস নং: ৩২৩২।
২৮. মুসনাদে আহমদ হাদিস নং: ৩২১২।
২৯. সুনানে নাসায়ি হাদিস নং: ৩২৩২।
৩০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৩২।
৩১. সুরা আল বাকারা: ১৮৭।
৩২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২১২।
📄 অবিশ্বস্ত নারী
একবার যখন কোনো মহিলা তথ্য প্রমাণ দ্বারা ব্যভিচারী সাব্যস্ত হয়, তখন তার স্বামী খুব কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। একদিকে তার মান-সম্মান নষ্ট হয়; অন্যদিকে এ জাতীয় অপমান সহ্য করা কারও জন্যই সহজ নয়। সে এমন এক ফাঁদে পড়ে যায়- যার থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : “জেনে রাখো! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং নিজ নিজ অধীনস্থের বিষয়ে তোমাদের প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের উপর দায়িত্বশীল। স্ত্রী তার স্বামীগৃহের উপর দায়িত্বশীলা। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”৩৩
প্রিয় নবি হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : “তিন ব্যক্তির জন্যে আল্লাহ তাআলা জান্নাত হারাম করেছেন- নেশাদার দ্রব্যে আসক্ত ব্যক্তি, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, এবং দাইয়ুস।”৩৪ দাইয়ুস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “ঐ ব্যক্তিকে দাইয়ুস বলা হয় যে তার পরিবারের অশ্লীলতা ও কুকর্মকে মেনে নেয়।”৩৫ অর্থাৎ- যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-কন্যা সহ পরিবারের অধীনস্ত অন্য সদস্যদের বেপর্দা চলাফেরা ও অশ্লীল কাজকর্ম বা ব্যভিচারকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে অথবা কোনোরূপ বাধা না দিয়ে মৌনতা অবলম্বন করে। এ ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “দাইয়ুস কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”৩৬
সে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। এটিই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এটা ঠিক যে- বিবাহবিচ্ছেদ পারিবারিক জীবনকে ধ্বংস করে দেয় এবং এর কারণে তাকে ও তার সন্তানদের অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, কিন্তু এছাড়া কোনো উপায় নেই। তাকে তালাক দেওয়া উচিৎ এবং বাচ্চাদের তার স্ত্রীর কাছে না রাখাই উত্তম। কেননা- এমন একজন অসতী নারীর কাছে তার সন্তানদের রেখে দেওয়া ঠিক হবে না। যদিও, সন্তান লালনপালন করা কোনো পুরুষের পক্ষে সহজ কাজ নয়, কিন্তু তাকে বিশ্বাস রাখতে হবে যে- আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করবেন। নিশ্চয়ই তিনি তাকে সম্মানজনক জীবন যাপন করতে সাহায্য করবেন।
টিকাঃ
৩৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯।
৩৪. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ৫৮৩৯।
৩৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ৩২৪৩।
৩৬. সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং: ২৫৬২।
📄 অন্য নারীর কাছে যাবেন না
একজন পুরুষকে অবশ্যই তার জন্য একজন উপযুক্ত নারী খুঁজে নিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। তাকে অবশ্যই যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে জীবনসঙ্গিনী খুঁজতে হবে। তবে বিয়ের পর অবশ্যই তার অন্য মহিলার কাছে যাওয়া উচিৎ নয়। এমনকি তার নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো মহিলার কথা চিন্তা করাও উচিৎ না। তাকে বুঝতে হবে যে, একটি মেয়ে তার পরিবার ছেড়ে তার সাথে থাকছে এবং তার পক্ষে তার ছেলেমানুষী ইচ্ছাগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিৎ নয়। নতুন পরিবারের সবাইকে একত্রিত করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে এবং বাড়িতে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। একটি লোক যদি সুখী থাকতে চায়; তাহলে বিয়ের পর অবশ্যই তাকে নির্লজ্জ চিন্তাভাবনা ত্যাগ করতে হবে এবং নতুন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। অন্য মহিলার সাথে হাসি-ঠাট্টা করা বা তাদের কারো প্রতি আসক্তি প্রকাশ করা চরম বোকামি। একজন পুরুষ কখনও অন্য পুরুষের সাথে তার স্ত্রীর হাসি-তামাশা করা পছন্দ করবে না, তেমনিভাবে একজন মহিলাও অন্য মহিলাদের প্রতি তার স্বামীর এই ধরনের আচরণ পছন্দ করবে না। কোনো মহিলা তার স্বামীকে অন্য কারো সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখলে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়বে ও কষ্ট পাবে। সে সংসার ও পরিবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেবে। সেও প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অনুরূপ কাজ করতে পারে বা তালাক চাইতে পারে।
একজন বিবাহিত পুরুষের জন্য অন্য মহিলার দিকে নজর দেওয়া ঠিক নয়। অন্য মহিলাদের প্রতি কামাতুর দৃষ্টিতে নজর দেওয়া পরিবারের মধ্যে অশান্তি, অস্থিরতার ও উদাসীনতা সৃষ্টি করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- অর্থ : “মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।”৩৭
কুদৃষ্টি হচ্ছে শয়তান দ্বারা নিক্ষিপ্ত একটি বিষাক্ত তীর। একসময় এই দৃষ্টি কষ্ট ও অনুতাপের কারণ হয়ে উঠবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা প্রেমের অভিনয় করাকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যে চোখ এ ধরনের বদঅভ্যাসে অভ্যস্ত তা কখনও শান্তি পায় না। এ ধরনের দৃষ্টি মানুষকে অনেক পাপের পথে পরিচালিত করে; যুবকদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। চোখ যা দেখেনা- হৃদয় তার প্রতি আসক্ত হয় না। প্রথমদিকে মানুষ নিষিদ্ধ দৃষ্টির মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক থাকলেও পরবর্তীতে সে সব ভুলে গিয়ে যা দেখে তা দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ঘন ঘন (নিষিদ্ধ) দৃষ্টি অন্তরে কামনার সৃষ্টি করে, এবং তা দৃষ্টিনিক্ষেপকারীর ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। কামদৃষ্টির ক্ষতির কারণে ইসলাম এটিকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একজন পুরুষের যদি হঠাৎ রাস্তায় বা অন্য কোথাও কোনো মহিলার দিকে দৃষ্টি যায়; তাহলে সে সাথে সাথে অন্য কোথাও দৃষ্টি সরিয়ে ফেলবে বা চোখ বন্ধ করে ফেলবে। সে মহিলাদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে না। প্রথমদিকে- কঠিন মনে হলেও সামান্য অনুশীলন করলেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে। বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানে যে- নিষিদ্ধ দৃষ্টি পরিহার করা মানুষকে অনেক পাপ কাজ থেকে বাঁচিয়ে দেয়। যেমন- খুন, অপরাধ, আত্মহত্যা, বিবাহবিচ্ছেদ, স্নায়ুবৈকল্য, মানসিক ব্যধি, দুর্বলতা, অস্থিরতা, পারিবারিক অশান্তি, ইত্যাদিসহ সম্ভাব্য আরও অনেক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
আপনি যদি বিবাহিত জীবনে সুখী হতে চান; তাহলে অন্য মহিলাদের দিকে নজর দিবেন না। স্ত্রীর সামনে অন্য নারীর প্রশংসা করবেন না। কখনো এভাবে বলবেন না যে, “আমি যদি অমুক মহিলাকে বিয়ে করতে পারতাম......অনেক ভালো সুযোগ হাতছাড়া না করতাম..."
এই ধরনের কথা আপনার স্ত্রীকে কষ্ট দিবে, ফলে সে আপনার প্রতি ও জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এমনকি সে একই কাজে লিপ্ত হতে পারে, একই ধরনের কথা বলতে পারে। দুর্ভাগ্য ঐ সকল পুরুষদের জন্য যারা ক্ষণিকের চাহিদার জন্য নিজের পবিত্র স্ত্রীকে ছেড়ে অসৎ মহিলাদের কাছে যায়। তারা কখনও পারিবারিক বন্ধন ও ভালোবাসা চিনেনি। এইসমস্ত পুরুষ পশুর মতো, যারা শুধু খাওয়া, ঘুম ও লালসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। তারা মানবতা ও ভালোবাসা সম্পর্কে অজ্ঞ।
টিকাঃ
৩৭. সূরা নূর : ৩০