📄 তার ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন
আল্লাহর নিষ্পাপ বান্দারা ছাড়া, (যাদেরকে পাপ থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা শপথ করেছেন) কোনো মানুষই নিখুঁত নয় এবং আমাদের সবার দ্বারাই কমবেশি ভুল-ভ্রান্তি হয়ে যায়। এটি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; তা পুরুষ হোক কিংবা নারী। নারীদের ক্ষেত্রে ভুলগুলো হতে পারে, তার স্বামীর সাথে রুঢ় আচরণ করা, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা, তার সাথে রুঢ় হওয়া বা অসতর্ক হওয়ার দরুন তার আর্থিক ক্ষতির কারণ হওয়া ইত্যাদি। অবশ্য এটা ঠিক যে, স্বামী-স্ত্রীর উচিত একে অপরকে সন্তুষ্ট রাখা, রাজি-খুশি রাখা এবং একে অপরের অসন্তুষ্টির কারণ না হওয়া। যাইহোক, এটা খুব কমই হয় যে একজন বা উভয়েই এই লাইন থেকে বিচ্যুত হয় না। কিছু মানুষ মনে করেন যে- স্ত্রীর ব্যাপারে তাদের কঠোর হওয়া উচিত; যেহেতু তারা বিশ্বাস করে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে স্ত্রীকে বিরত রাখার এটাই সঠিক পথ।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রায়শ এটার বিপরীত দৃশ্যই প্রদর্শন করে। একজন নারী, যার স্বামী তার সাথে কঠোর, তিনি হয়ত কিছু সময়ের জন্য তার সাথে মানিয়ে নেন, কিন্তু হতাশার ফলস্বরূপ শেষমেষ তিনি প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেন। তিনি ধীরে ধীরে তার স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বিরোধ দেখান এবং সংসারের প্রতি উদাসীন হয়ে যান। এভাবেই একজন স্বামী যিনি তার স্ত্রীর ভুলের ব্যাপারে ক্ষমা সুলভ নন, তিনি প্রকৃতপক্ষে তার স্ত্রীকে উদ্ধত ও অবাধ্য হতে সাহায্য করছেন। তিনি হয়ত এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে যেতে পারেন, কিন্তু তাকে নিশ্চিতভাবেই ভাবতে হবে যে, জীবনের বাকিটা পথ তার স্ত্রীর সাথে তাকে পাড়ি দিতে হবে। বাকি জীবন পর্যন্ত তাদের উভয়কেই তিক্ততার মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে তাদের। অথবা তিনি তার স্ত্রীকে একা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং যতটা সম্ভব তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে তার স্ত্রী ভাবতে পারেন তিনি হয়ত জিতে গেছেন এবং তার স্বামীর ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যেতে পারেন। এটা এমন পর্যায়েও পৌছাতে পারে যে স্ত্রী সুচিন্তিত ভাবে বড় কোনো ভুল করে ফেলার পরেও স্বামী এ ব্যাপারে চুপ থাকে। এভাবে তাদের দাম্পত্য-সম্পর্ক দিনে দিনে তিক্ত হয়ে যেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। স্মরণ রাখতে হবে যে বিবাহবিচ্ছেদ উভয়পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর কারণ নতুন জীবন শুরু করা কোনো সহজ বিষয় নয়।
বিচ্ছেদের পরে যে সুখ আসবে সেটাও নিশ্চিত নয়। তাই, কঠোরতা সবসময় কার্যকর নয় এবং প্রায়শ অনাকাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে যা আমরা মিডিয়া/ফেসবুকের মাধ্যমে দেখতে পাই। তাই সর্বোত্কৃষ্ট উপায় হল মধ্যমপন্থা অবলম্বণ করা এবং যৌক্তিক আচরণ করা।
আপনার স্ত্রীর ছোটখাট এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন। কারো ভুলের জন্য চিৎকার-চেঁচামেচির দরকার নেই; যা ভুলবশত হয়ে যায়। নিজেদের ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করার উদ্দেশ্যে অবশ্যই একজন অন্যজনকে উপদেশ দিতেই পারেন। মানুষ অজ্ঞতার দরুন অনেক ভুল করে ফেলে। তাই উত্তম হল ধৈর্যের সাথে নসিহা করা; যাতে তারা তাদের ভুল কাজগুলোকে বা ভুল ধারনাগুলোকে সংশোধন করে। অতঃপর উচিত নয় আপনার স্ত্রীকে জোর করে ভুল সংশোধনে বাধ্য করা, তার পরিবর্তে আপনার উচিত তাকে তার ভুলের ব্যাপারে যৌক্তিকভাবে বোঝানো এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলোর ব্যাপারেও পরামর্শ দিন যাতে তিনি এই ভুলের আর পুনরাবৃত্তি না করেন। এতে শুধু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই বৃদ্ধি পাবে না, অধিকন্তু ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তিও রোধ হবে। এটাই বুদ্ধিমানের কাজ; একজন পুরুষের জন্য তার স্ত্রীর ভুলগুলোকে যৌক্তিকভাবে থামানোর। কিন্তু তিনি যদি ক্রমাগত ভুল করেই যান, আবারো তার উচিত তার ভুলগুলোকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং তা এড়িয়ে যাওয়া। এটা ভুল হবে তাকে শাস্তি দেয়া এবং তাকে ভুল প্রমান করার চেষ্টা করা যাতে সে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য হয়। এটা এজন্যই যে মহিলারা প্রকৃতিগতভাবেই জেদী হয় এবং অযথা কড়াকড়ি তাদেরকে আগের চেয়ে আরো বেশি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাতে উস্কানি দিতে পারে। এটা আরো অপ্রীতিকর এবং ভয়ঙ্কর ঘটনা বয়ে আনতে পারে- এমনকি বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াতে পারে।
ইসলাম এই স্পর্শকাতর ব্যাপারটি উপলব্ধি করে পুরুষদেরকে মহিলাদের জন্য দায়িত্ববান করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : 'তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।”
এটা আপনার স্ত্রীর অধিকার যে আপনি তার সাথে দয়ালু আচরন করবেন। কারণ- সে আপনার নিশ্চয়তায় থাকে, আপনার উচিত তার ভরণপোষণ করা এবং পোশাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা এবং তার অজ্ঞতাবশত করা ভুল কাজগুলোকে মাফ করে দেয়া। একজন স্বামীকে অবশ্যই তার স্ত্রীর ভরনপোষণ এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ক্ষমা করে দিতে হবে সেই সমস্ত ভুলগুলো যা অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে গেছে। যে তার অধীনস্তদের শাস্তি দেয় সে সম্মানিত হওয়ার বা উচ্চপদের আশা করতে পারে না।
স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়ার অন্যতম একটি কারণ হলো- পারিবারিক বিষয়গুলোতে শাশুড়ির নাক গলানো। একজন মা, তার মেয়েকে বিয়ে দেয়ার আগে আশা করে তার মেয়ের স্বামী সব দিক দিয়ে পারফেক্ট হবে এবং তার সাথেই বিয়ে দিতে তিনি অনুমতি দেন যেখানে ছেলেটি তার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে। অনেক সময় তিনি তার জামাতাকে আশানুরূপ পান এবং অনেক সময় পান না। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তিনি তাকে প্রভাবিত করতে চান যতক্ষন পর্যন্ত না তিনি তার কাছে গ্রহনযোগ্য না হোন এবং এই জন্য তিনি প্রতিটি উপায় অবলম্বন করেন। যেমন, তার এবং অন্যদের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগান এবং বিভিন্ন ফন্দি করা শুরু করেন। তিনি মাঝেমাঝে সহানুভূতিশীল মাঝেমাঝে কঠোর হওয়ার ভান করেন। তিনি তার পথপ্রদর্শক এবং কাজের সংশোধক হিসেবে পাশে থাকতে পারেন বা অভিযোগও করতে পারেন।
যাইহোক, তার লক্ষ্য অর্জন করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হলো তার মেয়েকে প্রভাবিত করা; যাতে সে তার স্বামীর অবাধ্য না হয়। কিন্তু বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি তার মেয়েকে ব্যবহার করেন এবং এমনভাবে নির্দেশ দেন যাতে সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আচরণ করে। কাজেই স্বামী তার স্ত্রীকে একদিন একরকম অন্যদিন অন্যরকম হিসেবে পায়, একদিন কঠোর তো অন্যদিন সহনশীল। একজন অনভিজ্ঞ নারী এটা ভাবতে পারে যে তার মা তার বিয়ের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল এবং তাই তার উপদেশও মেনে চলতে হবে। এভাবে যদি তার স্বামী তার মায়ের (শাশুড়ির) মনমত না হয়, তখন সংসারে ঝগড়া শুরু হয়ে যায় যা ডিভোর্স এমনকি খুন পর্যন্ত গড়ায়। এই জন্যেই কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে তার শাশুড়িদের ভালো সম্পর্ক থাকে না। তারা তাদের স্ত্রীর অবাধ্যতার জন্য শাশুড়িদেরকে দায়ী করে এবং বিশ্বাস করে যে তাদের মায়েরা তাদের মেয়েদের এসব আচরণ/কথা শিখিয়ে দেয়।
একজন শাশুড়ি যখন তার মেয়ের জীবনে হস্তক্ষেপ করে এটা ভালোর উদ্দেশ্যে থেকেই, খারাপের জন্য নয়। তিনি সহানুভূতিশীল হতে চান; কিন্তু মাঝেমাঝে অজ্ঞতার দরুন কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন বা ক্ষতিকর উপদেশ দিয়ে থাকেন। তাই এই ব্যাপারে কারোরই বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়। একজন মা এবং মেয়ের সম্পর্ক হলো একটি প্রাকৃতিক সম্পর্ক; যা সহজেই ভেঙে পড়ে না এবং যে তা ভাঙার চেষ্টা করবে নিশ্চিতভাবেই সে ব্যর্থ হবে। এই ধরনের চেষ্টা প্রকৃতি-বিরোধী এবং কোনভাবেই তা সমর্থনযোগ্য নয়। যেভাবে একজন স্বামী তার পিতা-মাতার ব্যপারে আগ্রহী তেমনিভাবে একজন স্ত্রীও। ফলত শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের সাথে উত্তম সম্পর্ক বজায় রাখাই দুপক্ষের জন্যই কল্যাণকর। তাই সদাচরণ থেকে বিচ্যুত হবেন না, জ্ঞানী হোন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে সদয় আচরণ করুন নিজের দাম্পত্য জীবনকে সফল করার জন্য।
হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- অর্থ : “ 'তুমি যখন খাবে, তাকেও খাওয়াবে এবং তুমি যখন পরবে, তাকেও পরাবে। চেহারায় কখনো প্রহার করবে না, অসদাচরণ করবে না।' মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে দীর্ঘ বয়ানের একপর্যায়ে বলেছিলেন- অর্থ : 'অতএব, তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা রহমানকে ভয় করো, কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে গ্রহণ করেছ এবং তোমরা আল্লাহর হুকুমেই তাদের লজ্জাস্থানকে হালাল হিসেবে পেয়েছ।১০ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন- অর্থ : 'কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর ওপর রুষ্ট হবে না, কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারবে।১১
টিকাঃ
৮. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১১৬২।
১০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১২১৮।
১১. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪৬৯।
📄 মনোযোগী হোন
নারী জাতি হলো- আবেগপ্রবণ যারা যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে আবেগে বশীভূত হয়ে বেশী কাজ করে। তারা পুরুষদের তুলনায় সহজ সরল ও অধিক সংবেদনশীল। নারীদের প্রতারিত করা সহজ। কারণ আবেগ সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে তাদের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক ভাবে পুরুষদের থেকে কিছুটা কম। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেলে নারীরা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা খুব অল্পতেই আনন্দিত হয় বা মন খারাপ করে ফেলে। তাই স্বামী যদি তার স্ত্রীর আচার-আচরণ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা করে ফেলতে পারে তাহলে অনেক বিপদকেই পাশ কাটানো যায়।
আর এই কারণেই পবিত্র ধর্ম ইসলাম পুরুষকে তার পরিবারের অভিভাবক হিসেবে মনোনীত করেছে এবং পরিবারের সকল দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করেছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন- অর্থ : 'পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক। কারণ- আল্লাহ তাদেরকে নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষেরা নিজের ধন-সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সতী-সাধ্বী স্ত্রীরা স্বামীর প্রতি অনুগত এবং বিনয়ী। স্বামীর অনুপস্থিতিতে তারা তাঁর অধিকার ও গোপন বিষয় রক্ষা করে যেমন করে আল্লাহ গোপনীয় বিষয় গোপন রাখেন।১২
সুতরাং একজন পুরুষ; যাকে তার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষক হিসেবে আল্লাহ পাঠিয়েছেন, কোনো ক্রমেই তার স্ত্রীর কর্মকাণ্ডের প্রতি উদাসীন হওয়া চলবে না। স্বামীর উচিত তার স্ত্রীর অন্যের সাথে চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডের তত্ত্বাবধান করা, তার দৃষ্টি রাখতে হবে স্ত্রী যেন ভুল লোকের সাথে কোনো কাজে বা পথে পা না বাড়ায়। স্বামী তার স্ত্রীকে অসৎ সঙ্গের অপকারিতার বিষয়টি যুক্তি দিয়ে বুঝাবে। স্ত্রী যেন অশালীন বা যৌন উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে পারে এমন কোনো পোশাক পরে বাইরে যেতে না পারে তা স্বামীকে নিশ্চিত করতে হবে। স্ত্রীকে কোনো প্রকার খারাপ কর্মকাণ্ডে বা অপ্রয়োজনীয় আড্ডায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না।
একজন পুরুষ যে তার স্ত্রীকে অশালীন পোশাক পরে বাইরে বের হতে দিচ্ছে, যার তার সাথে বন্ধু হতে দিচ্ছে এবং খারাপ লোকদের আড্ডায় যেতে বারণ করছে না খুব সম্ভবত সে তার নিজের স্ত্রীর ও সন্তানদের সাথে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা করছে। এই ধরনের আচরণ তার স্ত্রীকে হাজারো রকমের বিপদজনক পরিস্থিতিতে পতিত করতে পারে যার থেকে সহজে মুক্তি পাওয়া যাবে না। পেট্রোল হলো দাহ্য তরল এবং এতে সহজেই আগুন ধরে যেতে পারে, তাই আগুনের সামনে পেট্রোল রেখে এতে আগুন ধরবে না ভেবে বসে থাকা বোকামো ভাবনা ছাড়া কিছুই না।
স্বামীকে হতে হবে মধ্যমপন্থী; তার মানে হলো- স্বামী কখনো তার স্ত্রীর প্রতি অতিরিক্ত কঠোর ও খিটখিটে হওয়া চলবে না আবার উদাসীনও হওয়া যাবে না। পুরুষদের মতো নারীদেরও স্বাধীনতা দরকার আছে এবং স্ত্রীর অধিকার রয়েছে এমন বিষয় গুলোতে তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। স্ত্রীকে অবশ্যই তার পিতা মাতা, ভাই-বোনদের সাথে যোগাযোগ করতে দিতে হবে এবং হালাল আত্মীয় স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। কেন স্বামী তার স্ত্রীকে নিকট আত্মীয়ের সাথে দেখা করতে বাধা দিবে? সে কী জানে না যে অতিরিক্ত কঠোরতা তার স্ত্রীকে অবাধ্য হওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে?
টিকাঃ
১২. সুরা নিসা: ৩৪
📄 একজন স্বামীর নৈতিক অধিকারসমূহ
স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই একটা সুন্দর পরিবার গড়ে তোলে। একটি ছোটো, সুন্দর সংসার! যেখানে তারা একে অপরের সবটুকু সুখ-দুঃখ শেয়ার করে। পরিবারের বিভিন্ন কাজে তারা একে অপরকে সাহায্য করে। কিন্তু তারপরেও কোথায় যেনো একটা কমতি থেকেই যায়। মতের অমিল হয়ে যায় কোথাও না কোথাও। সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন পুরুষ মনে করে পরিবারের সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র তার হাতে। স্ত্রীর সাথে একপ্রকার অমিমাংসিত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কেননা- স্ত্রীরও অধিকার আছে সিদ্ধান্ত নেয়ার; যেহেতু পরিবারটা দুজনের। আর এভাবেই ছোট ছোট ব্যাপার থেকে বড় ধরনের কলহ সৃষ্টি হয়, দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
পুরুষত্ব খাটিয়ে স্ত্রীর প্রতি অত্যাচার করার নজির কম নয়। অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীকে কাজের হুকুম দিয়ে থাকে। যদি কোনোভাবে তাতে ভুল হয় বা স্ত্রী করতে দ্বিধা জানিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে পুরুষটি অনেক সময় ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তাদের ধারণা- এটা তাদের অধিকার। তারা তাদের স্ত্রীর সাথে রাগ দেখাবে- হিংস্র হবে। প্রয়োজন হলে শারীরিক অত্যাচার করবে। কিন্তু এটা একদম ঠিক নয়। "আইয়্যাম এ জাহেলিয়াত" এর যুগে এমনটা ছিলো। তখন এভাবে নারীদের অত্যাচার করা হতো। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে আঘাত করে, সে তার আত্মার এমন ক্ষতি করে যে সে নানা জটিলতায় ভুগতে পারে; এবং পারিবারিক ভালবাসা এবং উষ্ণতা তার জীবন থেকে ক্রমশ দূরে যাবে। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- "হে পুরুষরা! তোমাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুললে অবশ্যই অনুতপ্ত হবে। তোমার স্ত্রী কে জড়িয়ে ধরবে।"১৩
ইসলাম কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রে তার স্ত্রীকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার পরামর্শ দেয় যেখানে তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়- ১. একজন পুরুষকে ইসলামিকভাবে এবং আইনতভাবে তার স্ত্রীর কাছ থেকে যৌন তৃপ্তি- সন্তুষ্টি পেতে এবং এই সম্পর্ক থেকে সমস্ত প্রকার উপভোগ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। স্বামীর যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা স্ত্রীর কর্তব্য। যদি কোনো মহিলা তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করতে অস্বীকার করে তবে স্বামীর প্রথমে তাকে সুশৃঙ্খলভাবে রাজি করানো উচিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন- অর্থ : "এবং যাদের বিষয়ে তুমি আশঙ্কা করো তাদেরকে উপদেশ দাও এবং তাদেরকে নির্জন জায়গায় ছেড়ে দাও এবং তাদেরকে মারধর কর; তবে যদি তারা তোমার কথা মেনে চলে তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসরণ করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী।”১৪
পুরুষদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলির কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়- ক. স্ত্রীর শারীরিক শাস্তির লক্ষ্য শিক্ষার উপায় হওয়া উচিত- প্রতিশোধ গ্রহণের নয়; খ. হাত দিয়ে বা হালকা কিছু ব্যবহার করে আঘাত করা উচিত; গ. ত্বকের বর্ণকে পরিবর্তনের জন্য যে পরিমাণ আঘাত করা যায় তা অনুমোদিত নয়; ঘ. শরীরের সংবেদনশীল অংশ যেমন চোখ, মাথা, পেট ইত্যাদি অংশে মারার অনুমতি নেই; ঙ. শারীরিক শাস্তি এতটা কঠোর হওয়া উচিত নয় যতটা দম্পতির মধ্যে ঘৃণা তৈরি করতে পারে। চ. কোনো ব্যক্তির যদি তার ইচ্ছার সাথে সম্মতি না রাখার বৈধ কারণ থাকে (অসুস্থতা বা পিরিয়ড); তবে তার স্ত্রীকে আঘাত করার অনুমতি নেই।১৫
একজন মহিলা তার স্বামীর অনুমতি পাওয়ার পরেই বাড়ির বাইরে যেতে পারবেন। তবে এই ক্ষেত্রে পুরুষদের স্ত্রীর সাথে খুব বেশি কঠোর হওয়া উচিত নয়। তাদের পক্ষে যখনই সম্ভব প্রয়োজনে তাদের স্ত্রীদের বাইরে যেতে দেওয়া উচিত। তবে কোনো মহিলা স্বামীর অনুমতি ব্যতীত নির্দিষ্ট কাজে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন- ক. ধর্মের প্রয়োজনীয় আদেশগুলি শেখার জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়া। খ. হজের জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময়। গ. ঋণ/দেনা শোধ করার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। ১৬
টিকাঃ
১৩. সুনানে দরামি: ৩২৪২।
১৪. সুরা নিসা: ৩৪।
১৫. ইমদাদুল ফতোয়া: ৩/১২০।
১৬. ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/১২০।
📄 সন্দেহপ্রবণ পুরুষ
পুরুষদের উচিত- তাদের স্ত্রী'র প্রতি সচেতন হওয়া। তবে তা সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়। কিছু কিছু পুরুষ আছেন; খুব সন্দেহপ্রবণ এবং তারা তাদের স্ত্রীদের বিশ্বস্ততায় সন্দেহ করেন; যা একটি পরিবারের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক এবং পরিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলে। যে ব্যাক্তি এমন সন্দেহপ্রবণ সমস্যায় ভুগছেন, সে ব্যক্তি ক্রমাগত তার স্ত্রীর উপর দোষ চাপান। তিনি তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সর্বত্র তাকে অনুসরণ করেন। তিনি তার স্ত্রীর প্রতিটি বিষয়ে সন্দেহ করেন এবং সে সন্দেহ শক্ত করার জন্য একটি সমর্থনযোগ্য প্রমাণও খুঁজে নেন; মূলত তার সন্দেহপ্রবন চিন্তা থেকে।
এই জাতীয় সমস্ত উদাহরণ একজন সন্দেহপ্রবন স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রমাণক হিসাবে সন্দেহ হতে পারে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়- যদি কোনো আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু তার সন্দেহের সাথে একমত পোষণ করে। লোকটি বাড়ির চারদিকে গোয়েন্দার মতো কাজ করে এবং তার স্ত্রীও মনে করতে পারে যে তাকে চোখে চোখে রাখা হচ্ছে। তারা উভয়ই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং ফলশ্রুতিতে তাদের বৈবাহিক জীবন বিপন্ন হয়ে উঠে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন- অর্থ : "আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গীনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।”১৭
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন- অর্থ : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক। কেননা কোনো কোনো বিষয়ে অধিক ধারণা করা পাপ।”১৮ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “অনুমান করা সম্পর্কে তোমরা সাবধান হও। কারণ অলীক ধারণা পোষণ সবচেয়ে বড় মিথ্যা।”১৯ আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : যে ব্যক্তি অন্যের বিরুদ্ধে যিনার অভিযোগ আনে, সে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করবে। আর যদি প্রমাণ করতে না পারে তাহলে তাকে আশি টা বেত্রাঘাত করো।২০
প্রিয় জনাব! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হলেও সন্দেহপ্রবণ হওয়া বন্ধ করুন। যুক্তি দিয়ে সমস্যাটি দেখুন। আপনার স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতক হওয়ার সম্ভাবনার মাত্রাটি পরিমাপ করুন এবং সেটি সুনির্দিষ্ট নাকি কেবল সন্দেহ তা আবিষ্কার করুন! আমি বলছি না যে- আপনার উদাসীন বা গাফিল হওয়া উচিত তবে আপনার কাছে যে পরিমাণ প্রমাণক রয়েছে তার ভিত্তিতে আপনার কাজ করা উচিত। আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে কোনো বিষয়ে সন্দেহ করে থাকেন তবে সেটি যার তার সাথে আলোচনা করবেন না। প্রয়োজনে আপনাকে অবশ্যই জ্ঞানী এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে। তবে সর্বোত্তম পন্থা হলো, আপনার স্ত্রীর সাথে এই বিষয়ে সরাসরি কথা বলা এবং তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া।
আল্লাহ তা'আলা কোরআনে বলেছেন- অর্থ : "তারা তোমাদের আবরণ এবং তোমরা তাদের আবরণ।”২১ বুদ্ধিমান হোন এবং নিজের সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার স্ত্রীকে আত্মহত্যা বা হত্যার প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন কারণ- আপনি এভাবে দুনিয়াতে আপনার জীবনকে নষ্ট করবেন এবং বদৌলতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনাকে পরকালে শাস্তি দিবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন - অর্থ : “তবে সৎকর্মশীলা নারী বা সাধ্বী রমণী তাঁরা, যাঁরা অনুগত এবং লোকচক্ষুর অন্তরালেও তাঁরা তা সংরক্ষণ করেন, যা আল্লাহ হেফাজতযোগ্য করে দিয়েছেন।”২২
প্রিয় বোনেরা! আপনার সন্দেহপ্রবণ স্বামী যদি কখনো আপনাকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে মেলামেশা করতে নিষেধ করেন বা কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বলেন; তবে তার কথাটি মান্য করুন। নইলে আপনার প্রতি তার সন্দেহের বীজ আরো দৃঢ় হবে। এমন সমস্ত কর্ম এড়িয়ে চলুন যা আপনার স্বামীকে আপনার উপর সন্দেহপ্রবণ করে তোলে। হযরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- অর্থ : "আমি যদি কাউকে অন্য লোকের প্রতি সেজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সেজদা করার নির্দেশ দিতাম।”২৬
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ'স রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- অর্থ : “সমগ্র পৃথিবীর মানুষের ভোগ্য বস্তুর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পূণ্যবতী স্ত্রী।”২৭ হুসাইন ইবনে মুহসিন রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- অর্থ : “স্বামীই আপনার জান্নাত কিংবা জাহান্নাম।”২৮ নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন- অর্থ : “সমগ্র পৃথিবীর মানুষের ভোগ্য বস্তুর মধ্যে সর্বোত্তম হলো পূণ্যবতী স্ত্রী।”২৯
হযরত আবু হুরাইরা রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : “কোনো বিশ্বাসী স্বামী কোনো বিশ্বাসী স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। তার একটি দোষ পেলে, অন্য গুণের কারণে তাকে ভালোবাসবে।”৩০ হযরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- অর্থ : স্ত্রীগণকে সৎ উপদেশ প্রদান করবে, কেননা পাজরের হাড় দ্বারা তার সৃষ্টি।৩১ সুতরাং স্ত্রীগণকে উপদেশ দিতে থাকো।৩২
টিকাঃ
১৭. সুরা আর রূম: ২১।
১৮. সুরা হুজুরাত: ১২।
১৯. সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬৬।
২০. ইবনে কাসির, খ. ৪ পৃষ্ঠা: ১২৩।
২১. সুরা বাকারা: ১৮৭।
২২. সুরা নিসা: ৩৪।
২০. সূরা আলে ইমরান: ২০০।
২১. সূরা শুরা: ৪৩।
২২. সূরা বাকারাহ : ১৫৫।
২৬. সুনানে তিরমিজ, হাদিস নং: ১১৫৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১৮৫৩।
২৭. সুনানে নাসায়ি হাদিস নং: ৩২৩২।
২৮. মুসনাদে আহমদ হাদিস নং: ৩২১২।
২৯. সুনানে নাসায়ি হাদিস নং: ৩২৩২।
৩০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৩২।
৩১. সুরা আল বাকারা: ১৮৭।
৩২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ২১২।