📄 অযথা দোষ খোঁজা থেকে বিরত থাকুন
কিছু পুরুষ ক্রমাগত সমস্ত কিছুতে ত্রুটি খুঁজতেই থাকে। তারা প্রতিটি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিৎকার শুরু করে যে- “এই টেবিলটি কেন নোংরা হয়ে আছে? দুপুরের খাবার কেন এখনও প্রস্তুত হয়নি? ফুলদানিটি কেনো এখানে? ছাই রাখার পাত্রটি মেঝেতে কেনো?” ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু পুরুষ এত দ্রুত তার মনোভাব পরিবর্তন করে যে- এটি তাদের পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং কখনও কখনও এই আচরণের ফলে তাদের পরিবারের বিচ্ছেদও ঘটে। অবশ্যই আমরা বলছি না যে- পুরুষের তাদের স্ত্রীদের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত না সেটা বলার কোনো অধিকার নেই।
মহিলারাও যেন পরিবার সম্পর্কিত পরামর্শের বিষয়ে একগুঁয়েমি না দেখায়। যদিও পুরুষেরা পরিবারের অভিভাবক হিসেবে নিজের কর্তব্যটি যাতে সঠিকভাবে পালন করতে পারে সে হিসেবে নিজের বুদ্ধি ও যুক্তিসংগত কাজ করা উচিত। স্ত্রী যদি বাড়ির কাজে কোনো পরামর্শ দেয় তবে সেটা বিবেচনায় নিতে আন্তরিক মনোভাব রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, যেহেতু একজন পুরুষের হাতে পরিবারের সমস্ত কাজে অংশ নেওয়ার মত পর্যাপ্ত সময় থাকে না এবং কোন বিষয়ে যদি তার পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকে, তবে পরিবারের কিছু বিষয় স্ত্রীর উপর ছেড়ে দেয়াই তার জন্য সুবিধাজনক। ঘর চালানোর ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির উচিত তার স্ত্রীকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেওয়া। যদিও পুরুষরা প্রায় ক্ষেত্রেই জোর না করে পরামর্শ দেয়ার অজুহাতে তাদের সিদ্ধান্ত স্ত্রীদের উপর চাপিয়ে দেয়। যখন একজন বুদ্ধিমান মহিলা কোনও বিষয়ে তার স্বামীর ইচ্ছাটা বুঝতে পারে, তখন সে তা মেনে চলার চেষ্টা করে।
অতএব, একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা যারা একে অপরের সম্পর্কে এবং তাদের পরিবারের সম্পর্কে যত্নশীল, তখন তারা যে কোনো বিষয়ে পরস্পর বিনীতভাবে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এইভাবে, বেশিরভাগ মহিলারা তার স্বামীর সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে তার স্বামী যদি ক্রমাগত তার দোষ খুঁজতেই থাকে এবং অশান্তির সৃষ্টি করতে থাকে তখন তার স্ত্রী নেতিবাচক মনোভাব এর উপর অভ্যস্ত হতে থাকে এবং ফলস্বরূপ এই মনোভাবটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যার থেকে কোন ভালো ফলাফল আর আশা করা যায় না।
যে মহিলার স্বামী এমন মনোভাব পোষণ করে সে তার স্বামীর কোনো কথাই গুরুত্ব সহকারে নেয় না। এমনকি সে তার স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিকেও তখন অবহেলার চোখে দেখা শুরু করে। সে নিজেই ভাবতে থাকে- “আমি কেনো এতো কষ্ট করবো, যদি আমার স্বামী কখনই আমার কোনো কাজে সন্তুষ্ট না হয়? সে কেবল তার স্বামীকেই দোষারোপ করবে না, এমনকি তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারে। তখন তাদের বাড়ি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে উঠবে। এইভাবে একটি পরিবার ভেঙে যায় এবং বিচ্ছেদ হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে একজন মহিলা কখনই নিজেকে দোষারোপ করে না, কারণ একজন বিজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল স্ত্রীও তার স্বামীর এমন অমানবিক আচরণের কারণে তার ধৈর্য সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে। তখন সে ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করে, দাবি করে যে- তার স্ত্রী তার বাড়ি ছেড়ে দুমাস আগে চলে গিয়ে তার বাবা-মার সাথে থাকছে। তারপর আরও অনুসন্ধান করা শুরু করলে, ওই ব্যক্তির স্ত্রী তখন বলে যে- আমার স্বামী আমার ঘর সামলানোর পদ্ধতি পছন্দ করে না। তিনি আমার রান্না, আমার বাড়ির কাজ পরিচালনা সম্পর্কে ক্রমাগত সমালোচনা এবং অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। তাই আমি তাকে ছেড়ে চলে এসেছি।
পুরুষদের মনে রাখা উচিত যে- সংসারের কাজটা তাদের স্ত্রীদের দায়িত্ব পালনের একটি জায়গা। এই জায়গায় তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা তাদের পুতুল হিসাবে বিবেচনা করাটা সম্পূর্ণরূপে একটি ভুল কাজ। তারা যেভাবে পছন্দ করে সেভাবেই তাদের সংসারের কাজ করতে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ফলস্বরূপ- আপনার স্ত্রী উৎসাহের সাথে তার কাজগুলো করবে এবং আপনিও সুখী থাকবেন এবং আপনার বাড়ি হয়ে উঠবে “একটি সুখী পরিবার”।
📄 তাকে সন্তুষ্ট রাখুন এবং সহানুভূতি প্রকাশ করুন
একজন মহিলাও পুরুষের মতো আবেগীয় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। সে আনন্দ, রাগ, দুঃখ ইত্যাদি অনুভব করে। সে ঘরের কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে; বাচ্চাদের উপর বিরক্ত হয়। এসময় অন্যদের সমালোচনা তাকে মর্মাহত করতে পারে। সে অন্যান্য মানুষের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে। মোটকথা- অনেক সমস্যা মহিলাদের এমনভাবে প্রভাবিত করে যে- সে ছোটোখাটো ব্যাপারেও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এটা বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, কারণ তারা খুবই সংবেদনশীল এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। নারীরা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তাকে সন্তুষ্ট রাখা উচিৎ। একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী হিসেবে পুরুষের উচিৎ তাকে সান্ত্বনা দেওয়া কারণ তার স্ত্রী তাকে বিশ্বাস করে।
প্রিয় জনাব!
আপনি যখন আপনার স্ত্রীকে রাগান্বিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান, তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন। ঘরে প্রবেশ করে যদি দেখেন সে আপনাকে সম্ভাষণ করছে না তাহলে আপনি তাকে সালাম দিন। এতে আপনি ছোট হয়ে যাবেন না। তার সাথে হাসিমুখে কথা বলুন। কর্কশ ভাষা পরিহার করুন। তার ঘরের কাজে সাহায্য করুন। তাকে কোনভাবেই রাগান্বিত করে তুলবেন না। তাকে উত্ত্যক্ত করবেন না। সে যদি কথা বলতে না চায়, তাকে তার মতো ছেড়ে দিন। তাকে বলবেন না, “তোমার কী সমস্যা?”
সে যদি কথা বলতে চায় তবে তার কথা শুনুন এবং তার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করুন। এমন ভান করুন যেন তার সমস্যা নিয়ে তার চেয়ে আপনি বেশি চিন্তিত। তাকে তার অভিযোগ প্রকাশ করতে দিন। অতঃপর একজন দয়ালু প্রিয়জনের মতো অর্থাৎ একজন সহানুভূতিশীল স্বামীর মতো তার সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করুন। তাকে ধৈর্য ধরতে উৎসাহ দিন। যুক্তি ও বুদ্ধি দ্বারা সমস্যাগুলো মামুলি হিসেবে তার কাছে তুলে ধরুন। তাকে সাহস দিন এবং তার বিরক্তির কারণ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করুন। ধৈর্য ধরুন এবং তার সাথে যৌক্তিক আচরণ করুন। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং আপনাদের সাংসারিক জীবন দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। অপরপক্ষে আপনার ভুল আচরণ তাকে আরও ঝামেলায় ফেলে দিবে। এর প্রভাব আপনার উপরেও পড়বে এবং তা থেকে ঝগড়াবিবাদের সৃষ্টি হতে পারে যার ফলে আপনারা দুইজনেই কষ্ট পাবেন।
📄 দোষ ধরবেন না
পৃথিবীতে কোনো মানুষই সর্ব গুণসম্পন্ন হয় না। কেউই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। কেউ হয়তো খুব মোটা বা কেউ হয়তো খুব চিকন। কারো মুখ বড় হতে পারে, আবার কারো নাক বা দাঁত বড় হতে পারে। কেউ নোংরা হতে পারে আবার কেউ অভদ্র, লাজুক, নির্লজ্জ, হতাশাগ্রস্ত, বদমেজাজি, হিংসুক, অলস বা স্বার্থপর হতে পারে। কোনো মহিলা হয়তো ভালো রান্না পারেন না আবার কেউ হয়তোবা অতিথি সেবায় খুব একটা পারদর্শী নয়। কেউ হয়তো খুব বেশি খায়, আবার কেউ হয়তো বেহিসেবী খরচ করে। মোটথায়- প্রত্যেকেই অসম্পূর্ণ এবং পৃথিবীতে কেউই নিখুঁত নয়। পুরুষেরা সাধারণত বিয়ের আগে তার স্ত্রীকে সমস্ত দোষত্রুটি মুক্ত হিসেবে কল্পনা করে। তারা ভুলে যায় যে, পৃথিবীতে কেউই ফেরেশতা নয়। এরপর এই লোকগুলো বিয়ের পর যখন দেখে তার স্ত্রী নিখুঁত নয়, তখন তাদের দোষ ধরতে শুরু করে। এমনকি তারা তাদের বিবাহকে ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করে এবং নিজেদেরকে দুর্ভাগ্যবান ভাবতে থাকে। এসব লোকরা সবসময় হাহাকার করতে থাকে এবং তার স্ত্রীর ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকেও রেহাই দেয় না। কিছু পুরুষ স্ত্রীদের দোষত্রুটিগুলোকে বাড়িয়ে পাহাড়সম করে তোলে।
তারা প্রায়ই এইসব দোষত্রুটি নিয়ে তাদের স্ত্রীদের অপমান করে। এমনকি তারা এইসমস্ত ব্যাপার বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের কাছে তুলে ধরতেও দ্বিধা করে না। ফলশ্রুতিতে, তাদের দাম্পত্যজীবনে ফাটল ধরতে শুরু করে। মহিলাটি হতাশাগ্ৰস্ত হয়ে পড়ে এবং স্বামী ও সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যে সবসময় তার সমালোচনা করে তার জন্য কিছু করাকে অর্থহীন ভাবতে থাকে যা তাকে প্রতিশোধ নেওয়ার দিকে ধাবিত করতে পারে।
এক লোক তার স্ত্রীকে বললো- “তোমার নাক কী বড় আর কুৎসিত!” তখন তার স্ত্রী জবাব দিলো- “তোমার বিশ্রী চেহারা আর বিকৃত আকৃতির মতো এতো খারাপ তো না!”
এরপর লোকটি বলতে পারে- “তোমার পায়ে কী দুর্গন্ধ!” মহিলা উত্তর দিলো- “তোমার বিশাল মুখ বন্ধ করো।”
ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। এই ধরনের কথাবার্তা চলতে থাকলে ঘর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, দম্পতিরা নিজেদেরকে অপমান-অবমাননা করতে থাকে। এভাবে চলতে থাকলে তারা তাদের জীবন উপভোগ করতে ব্যর্থ হয়। কারণ- যে ঘরে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা নেই, সে ঘর কখনো শান্তির নীড় হয়ে উঠতে পারে না। তদুপরি, যে পুরুষ নিজেকে দুর্ভাগ্যবান মনে করে এবং বিবাহকে ব্যর্থ মনে করে, সে তার স্ত্রীকে ক্রমাগত অপমান করতে থাকে যার ফলে তারা দুইজনই মানসিক অশান্তি এবং অন্যান্য অসুস্থতায় ভুগতে থাকে। ঝগড়া- বিবাদের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে এক সময় তালাক ও বিচ্ছেদের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।
বিচ্ছেদ কারো জন্যই সুখকর না, বিশেষ করে যদি সেই পরিবারে সন্তান থাকে। আমাদের সমাজ তালাকপ্রাপ্তদের তেমন একটা সম্মান দেয় না। এছাড়া তালাকের ফলে একজন পুরুষের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা সহজে পূরণ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে সে যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় সেক্ষেত্রে তাকে অনেক খরচ করতে হয়। উপরন্তু, একজন তালাকপ্রাপ্ত লোক যে- তার আশানুরূপ স্ত্রী খুঁজে পাবে এটিও নিশ্চিত নয়। তার পূর্বে বিয়ে করার রেকর্ড থাকায় পুনরায় বিয়ে করাও সহজ হবে না। এমনকি সে পরবর্তীতে যেই মহিলাকে খুঁজে পাবে তারও অবশ্যই কিছু ত্রুটি থাকবে। এমনকি সে তার প্রথম স্ত্রীর চেয়েও খারাপ হতে পারে। তখন লোকটিকে তার সাথে মানিয়ে চলতে হবে। এর কারণ কিছু পুরুষ এতোটাই অহংকারী হয় যে নিজের ত্রুটি স্বীকার করতে চায় না। দ্বিতীয় বিয়েতে সন্তুষ্ট এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এমনও হয় যে, অনেক লোক তার প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরে যায়।
প্রিয় জনাব!
আপনি কেনো আপনার স্ত্রীর দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ান! কেনো ছোটখাটো ভুলগুলোকে এতো গুরুত্ব দেন! কেনো তার ঘাটতিগুলোকে এতো বড় করে দেখেন; যা আপনার পরিবারে অশান্তির কারণ হয়! আপনি কি কখনো কোনো নিখুঁত মহিলা দেখেছেন? আপনি নিজে কি নিখুঁত? এই তুচ্ছ দোষত্রুটিগুলো কী এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে যার কারণে আপনি নিজের বিবাহিত জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারেন?
নিশ্চিত থাকুন যে- আপনি যদি যৌক্তিক ও ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গিতে আপনার স্ত্রীর দিকে নজর দেন তাহলে তার অনেক ভালো দিকও দেখতে পাবেন। তখন দেখবেন- তার গুণাবলী তার ঘাটতি ছাড়িয়ে যাবে। ইসলাম এই ধরনের আচরণকে ক্ষতিকর ও অপছন্দনীয় হিসেবে বিবেচনা করে এবং অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বের করতে নিষেধ করে।
📄 সমালোচকদের নিন্দনীয় কথাকে এড়িয়ে চলুন
কিছু লোকের অন্যের সম্পর্কে নিন্দা করার অভ্যাস রয়েছে। এই ঘৃণ্য আচরণ বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে এবং পরিবারে ভাঙন ধরাতে পারে। এমনকি এটি হত্যাকাণ্ডের কারণও হতে পারে। এই ঘৃণ্য আচরণের অনেক কারণ রয়েছে। যেমন হিংসা, ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও শত্রুতা। কিছু লোক নিজেদের অহংকারকে অক্ষুণ্ণ রাখতে, অন্যদের মনোযোগ নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে অথবা কারও প্রতি সহানুভূতি দেখাতে কুৎসা রটনা করে থাকে। কিন্তু, এটি খুব কমই দেখা যায় যে, কুৎসা রটানো হয়েছে ভালো উদ্দেশ্যে।
সুতরাং! একজন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তির উচিত এই ধরনের কুৎসিত বিষয়কে এড়িয়ে চলা। অবশ্যই তিনি ওই ব্যক্তির বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করবেন যাতে তিনি ঐ ব্যক্তির দুষ্ট উদ্দেশ্য দ্বারা প্রতারিত বা প্রভাবিত না হন।
পুরুষদের মনে রাখা উচিত যে- আপাত দৃষ্টিতে তাদের মা, বোন ও ভাইদের সাথে তাদের স্ত্রীদের সম্পর্ক ভালো বলে মনে হলেও তা কিছুক্ষেত্রে সত্যি নয়। এর কারণ হচ্ছে- বিয়ের আগে পিতা-মাতার সংসারে একজন পুরুষের খুব বেশী স্বাধীনতা থাকে না। তার পিতা মাতা, যারা তাকে বড় করে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন তারা প্রত্যাশা করেন তাদের ছেলে বৃদ্ধ বয়সে তাদের জন্য সাহায্যকারী হবে। এমনকি ছেলেদের বিয়ে এবং স্বাধীনতা দেবার পরও পিতা-মাতা প্রত্যাশা করেন যে- তাদের ছেলে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী চলবে। তারা আরও প্রত্যাশা করেন যে- তাদের ছেলে তাদের প্রতি অধিক মনোযোগী হবে তার স্ত্রীর চেয়েও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার উল্টোটা। যখন একজন পুরুষ তার বৈবাহিক জীবন শুরু করেন, তখন তিনি তার নতুন পরিবার, স্ত্রী এবং স্বাধীনতার প্রতি অধিক মনোযোগী হন। তিনি তার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করেন এবং তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। যতই তিনি এদিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করেন, ততই তিনি তার পিতা-মাতা থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন।
এভাবেই তার মা ও বোনেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা ভাবতে শুরু করে যে- নতুন বউ তাদের ছেলেকে তাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে। এমনও হতে পারে তারা নতুন বউকে তাদের ছেলের পরিবার থেকে পৃথক করবার জন্য দোষারোপ করতে পারে।
কিছু মায়েরা ভাবেন যে- এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো স্ত্রীদের প্রতি তাদের ছেলেদের ভালোবাসা নিঃশেষ করাকে। এই ধরনের মায়েরা তাদের পুত্রবধূর দোষ বের করেন, তাদের সম্পর্কে কুৎসা রটান এবং তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন।
যদি একজন মানুষ সাধারণ অথবা সহজ সরল হন তবে তিনি তার মায়ের রটানো কুৎসা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে তিনি তার পরিবারের হাতের খেলার পুতুল হয়ে ওঠেন। পিতা-মাতার দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তিনি তার স্ত্রীর দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করেন এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করতে শুরু করেন। তখন তিনি হরহামেশাই তার স্ত্রীর সমালোচনা করে থাকেন। ফলশ্রুতিতে পরিবারটিতে বিষণ্ণতা নেমে আসে। পুরুষদের মা ও বোনদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ফলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দেয়াল তৈরি হয়। এমনকি তাদের মধ্যে কলহের সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে একজন গৃহবধূ আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে পারে।
একবার এক বিবাহিত নারী তার বিবাহের দুই সপ্তাহের শেষ দিকে আলপিন খান। আলপিনগুলো তার পাকস্থলী থেকে বের করার পর তিনি হাসপাতালে বলেন- প্রায় দুই সপ্তাহ আগে আমার বিবাহ হয়েছিল। যেই দিন আমি আমার স্বামীর ঘরে প্রবেশ করি, সেদিন আমিও অন্যান্য বিবাহিত নারীদের মতো নিজেকে সৌভাগ্যবান অনুভব করেছিলাম। কিন্তু দুদিন পরেই আমার স্বামী ও তার বোন আমার দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করতে লাগলো। তাদের আচরণ আমার জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। অবশেষে আমি নিজেকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং কিছু আলপিন খাই।
আরেকটি ঘটনা- এক নারী তার স্বামীর ভাইদের কটু কথায় ভীষণ অপমানিত হয়। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে সে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এখানে একজন নতুন বিবাহিত নারী তার শাশুড়ি এবং স্বামীর ভাইদের মন্দ আচরণের দ্বারা এতটাই কষ্ট পেয়েছিল যে- সে নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে।
সুতরাং মা, বোন ও দেবরের সমালোচনা, মন্দ আচরণ এবং নিন্দনীয় ভাষা খুবই ক্ষতিকর হতে পারে এবং তাই একজন পুরুষের তাদের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। অবশ্যই লোকদের মুখ বন্ধ করা সম্ভব নয় তবে তাদের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করার জন্য অনুপ্রাণিত করা সম্ভব। একজন পুরুষকে তার স্ত্রীর সম্পর্কে তার মা ও বোনের করা সমালোচনার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা- তারা অনেকক্ষেত্রেই সহানুভূতি বা ভালো উদ্দেশ্য থেকে এই ধরনের সমালোচনা করে না, বরং হিংসা, শত্রুতা ও স্বার্থপরতা থেকে করে। তাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, যখন সে তার স্ত্রীর অনেক কাছে চলে আসে তখন তার পরিবার তার স্ত্রীকে তাদের শত্রু এবং তাদের ছেলের দখলদার হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলশ্রুতিতে তারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা যাতে বৃদ্ধি না পায় তার উপায় খুঁজে বেড়ায়।
প্রিয় জনাব!
সংক্ষেপে বলতে গেলে- এই ধরনের মা-বোনেরা এবং ভাইয়েরা আপনার সুখ নিয়ে চিন্তিত নয় বরং তাদের নিজেদের স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা যদি আপনার সুখ নিয়ে চিন্তিত থাকতো তবে তারা ভিন্ন কিছু করত। এটি খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে- পিতা-মাতারা যেই নারীর সাথে তার ছেলের বিয়ে দেন তার সম্পর্কে বিয়ের আগে ভূয়সী প্রশংসা করেন। কিন্তু একবার তাদের ছেলে সেই নারীকে বিয়ে করার পর তারা সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করেন।
জনাব! প্রতারিত হবেন না। আপনার পরিবার আপনার স্ত্রীর বিরুদ্ধে যেই দোষ ত্রুটিগুলোর উল্লেখ করেছে সেগুলো প্রাসঙ্গিক নয়; এমনকি সেগুলো যদি তুচ্ছ ভুল হয়েও থাকে তবে মনে রাখবেন যে- কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। যাইহোক- আপনার মা, বোন অথবা যারা আপনার স্ত্রীর সমালোচনা করেন তারা কী ভুলের ঊর্ধ্বে? তাদের মন্দ কথায় মনোযোগ দিয়ে, আপনি আপনার পারিবারিক জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছেন। এমনকি আপনি এই অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে বিবাহ-বিচ্ছেদের আশ্রয় নিতে পারেন যা আপনার মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হবে।
পুনরায় বিবাহ করা সহজ নয়। এমনকি আপনি যদি অন্য নারীকে বিবাহ করেন স্পষ্টতই আপনি বলতে পারছেন না- তিনি আপনার আগের স্ত্রীর চেয়ে ভালো হবেন। আবার আপনি কীভাবে নিশ্চিত হন আপনার পরিবার তার সাথে আপনার আগের স্ত্রীর মত মন্দ আচরণ করবে না?
আপনার মা, বোন এবং অন্যদের জানানো উচিত যে- আপনি আপনার স্ত্রীকে আপনার জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেন এবং তাকে ভালোবাসেন। আপনাকে অবশ্যই তাদেরকে জানিয়ে দিতে হবে যে- তাদের উচিত আপনার স্ত্রীর সম্পর্কে কটু কথা বলা বন্ধ করা। যখন তারা আপনার দৃঢ় মনোভাব বুঝতে পারবে তখন তারা আপনাকে আর প্রভাবিত করতে চেষ্টা করবে না এবং হয়তোবা আপনিও আপনার স্ত্রী শান্তি খুঁজে পাবেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কিছু মায়েরা ও বোনেরা সহজে হাল ছেড়ে দেয় না এবং আশ্রয় নেয় জঘন্য অভিযোগের। সমস্যাটা এতই মারাত্মক হয়ে উঠে যে- একজন ব্যক্তি তার মায়ের কথায় তার স্ত্রীকে তালাক অথবা খুন করতে পারে।
এক নব দম্পতি তাদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন আদালতে নিয়ে গিয়েছিল। লোকটি আদালতে বলেছিল- আমার স্ত্রী খুলনায় বসবাসরত আমার ভাইকে প্রেমের চিঠি লেখেন। গত রাতে আমি তার কয়েকটি চিঠি পেয়েছি। তার স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আমার শাশুড়ি মা এবং ননদ আমাকে পছন্দ করেন না এবং ক্রমাগত আমার দোষ ত্রুটি ধরায় ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু তাদের ওই দুষ্ট কাজগুলো আমার স্বামীকে প্রভাবিত করতে পারেনি, তাই তারা এখন কিছু নকল প্রেমের চিঠি আমার পোশাকের মধ্যে রেখেছে যাতে আমার স্বামী তাতে প্ররোচিত হয়ে আমাকে ডিভোর্স দেন। আদালত নব দম্পতির মধ্যে পুনরায় মিলন ঘটান এবং স্বামীকে পরামর্শ প্রদান করে যে- সে যেন তার মা ও বোনকে তার স্ত্রীর সম্পর্কে মন্দ কাজগুলো বন্ধ করতে বলে।
একজন চৌত্রিশ বছর বয়সী নারী নিজের ওপর এক বোতল কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। প্রতিবেশীরা দ্রুত আগুন নিভিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি হাসপাতালে বলেন- আমি আমার স্বামী এবং তার মায়ের সাথে বাস করি। আমার শাশুড়ি ক্রমাগত আমার দোষ ত্রুটি খুঁজে বেড়ান। তিনি অজুহাত সৃষ্টি করেন এবং আমার উপর চড়াও হন। তিনি আমার ও আমার স্বামীর মধ্যে দেয়াল তৈরি করার একটি সুযোগও হাতছাড়া করেন না। গতকাল আমি কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম এবং দুর্ভাগ্যক্রমে আমার বিদ্যালয়ের এক পুরানো সহপাঠীর সাথে দেখা হয়। আমরা কিছুক্ষণ কথা বলেছিলাম এবং তারপর আমি বাড়ি ফিরে আসি। আমার শাশুড়ি আমাকে প্রশ্ন করতে লাগলেন, বাড়ি ফিরতে আমার কেন এত দেরি হল? আমি ব্যাখ্যা করলাম কিন্তু তিনি তাতে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি বলেছিলেন যে আমি মিথ্যা বলছি এবং তিনি আরও বললেন যে- আমাদের রাস্তার কসাই এর সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে। আমি ভীষণ অপমানিত ও হতাশ হয়ে নিজেকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
সুতরাং! একজন ব্যক্তিকে সবসময় এই ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত, না হলে ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে। তার উচিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে ভালভাবে অনুসন্ধান করা এবং অন্ধভাবে কোনো সিদ্ধান্তে না আসা।
অবশ্যই একজন পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে অনেক পরিশ্রম ও দুর্ভোগ সহ্য করেন। এভাবেই সন্তানরা তাদের পিতামাতার সকল আশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তারা প্রত্যাশা করেন তাদের সন্তানরা বৃদ্ধ বয়সে তাদের সাহায্যকারী হবে এবং তাদের প্রত্যাশা অবশ্যই যৌক্তিক। সুতরাং এটি মোটেও ঠিক নয় যে, যখন কেউ স্বাধীনতা পায় তখন সে তার পিতা মাতার ওপর তার অর্পিত কর্তব্যগুলো ভুলে যাবে। এমনকি তার বিবাহের পরেও পিতা মাতার ন্যায়সঙ্গত চাওয়াগুলো পূরণ করতে হবে। তাকে অবশ্যই তাদের যথাযথ সম্মান করতে হবে এবং তাদের সামনে নম্র থাকতে হবে। পিতা মাতার যদি অর্থ সাহায্য প্রয়োজন হয় তবে সে সাহায্য করতে দায়বদ্ধ। একজন পুরুষের তার পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত নয় এবং অবশ্যই তার বাড়িতে তাদের যত্ন করা উচিত। তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের বলবেন তার পিতা-মাতাকে সম্মান করতে। তিনি তার স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলবেন যে- যদি সে তার পিতা-মাতাকে সম্মান করে তবে তার পিতা-মাতা তাকে বিরক্ত করবেন না। বরং তার জন্য গর্বিত হবেন এবং তাকে সাহায্য করবেন।
অবশেষে নারীদের মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন যে- তাদের স্বামীরা বিয়ের পর তাদের পিতা মাতাকে ত্যাগ করবে নারীদের এমন আশা করার কোন অধিকার নেই। এটা সম্ভবও নয়- ন্যায়সঙ্গতও নয়। একজন বুদ্ধিমান নারী তার শ্বশুরবাড়িতে এমনভাবে আচরণ করেন যাতে তারা তাকে তাদের নিজেদের পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলে মনে করেন। এটি কেবলমাত্র তখনই সম্ভব যখন তিনি তাদের সম্মান করেন, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ চান এবং তাদের সহায়তা করেন ইত্যাদি।