📄 মার্জিত হোন
আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে মানুষকে তার নিজ ইচ্ছায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পথ বা উপায় সৃষ্টি করে দেন। একটার পর একটা ঘটনা ঘটান ও প্রকাশ করেন। বিশাল পৃথিবীতে আমাদের এই ক্ষুদ্র অস্তিত্ব একটি ক্ষুদ্র কণার মতো যা প্রতিনিয়ত স্থানান্তর হয় এবং প্রত্যেক সময় অন্যকণাগুলোর সাথে ধাক্কা খেতে থাকে। পৃথিবীর পরিচালনা ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই এবং পৃথিবীর ঘটনাগুলোও আমাদের ইচ্ছায় হয় না।
যে মুহূর্ত থেকে একজন ব্যক্তি সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়, সেই মুহূর্ত থেকে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে আসা পর্যন্ত একজন মানুষ শত অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। এভাবে একজন ব্যক্তি সারা জীবনে অনেক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়।
কেউ হয়ত অন্যের দ্বারা অপমানিত হয়, কারো অবন্ধুসুলভ সহকর্মী থাকে; বাাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে হয়, কর্মক্ষেত্রে অভিযুক্ত হতে হয়, কেউ টাকা হারিয়ে ফেলে, কেউবা সর্বস্বান্ত হয়। এ ধরনের এক বা একাধিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন, যে কেউ যেকোন সময়, যে কোনো জায়গায়। আপনি আপনার জীবনের প্রতিদিনকার ঘটনা প্রবাহে হতাশ হয়ে পড়তে পারেন যা একটা টাইম বোমার সদৃশ, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। হ্যাঁ, আপনি হয়ত আপনার ঘটনাগুলোর জন্য অন্য কাউকে বা পৃথিবীকে দোষারোপ করতে পারেন না। তাই আপনি যখন ঘরে আসেন আপনার স্ত্রী বা সন্তানের উপর রাগ ঝাড়ার চেষ্টা করেন। আপনি ঘরে এমন ভাবে প্রবেশ করেন; যেন ঘরে আজরাইল (মৃত্যুর ফেরেশতা) প্রবেশ করেছে। আপনার সন্তানরা আপনার সামনে থেকে ছোট্ট ইঁদুরগুলোর মতো পালিয়ে যায়। ইসলাম এমন আচরন করতে নিষেধ করেছে।
আপনার উচিত- এর থেকে শোধরানোর উপায় বের করা। আপনার খাবারে পরিমাণ মতো লবণ থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে, আপনার চায়ের কাপ এখনো প্রস্তুত নাও হতে পারে, আপনার ঘরটি অপরিষ্কার থাকতে পারে, কিংবা আপনার সন্তানেরা শোরগোল করতেই পারে। আপনার নিজের ঘরে সবার উপরে ফেটে পড়তে এসব আপনার জন্য অজুহাত হিসেবে কাজ করে। আপনি তখন ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে সবার সাথে চিৎকার চেঁচামেছি শুরু করে দেন, তাদের গালাগালি করেন, সন্তানদের মারধর করেন ইত্যাদি চলতে থাকে। এভাবে আপনি মায়া-মমতায়-বন্ধুত্বে ঘেরা ঘরটিকে জ্বলন্ত জাহান্নামে পরিণত করেন যেখানে আপনি এবং আপনার পরিবারের বাকিদেরও ভুগতে হয়। যদি বাচ্চারা ঘর থেকে পালিয়ে রাস্তায় চলে যেতে পারত তাহলে তারা তাই করতো। যদি সেটা করতে না পারে তাহলে তারা সময় গুনতে থাকবে, কখন আপনি বাড়ি থেকে বের হবেন। এই ধরণের পরিবারগুলো চরম উদাসীন এবং ভীতিপ্রদ পরিবেশ দ্বারা বেষ্টিত থাকে তা সুস্পষ্ট। সবসময় ঝগড়া এবং বাকবিতন্ডা চলতে থাকে। তাদের ঘরগুলোতে সবসময় বিশৃঙ্খলা বিরাজ থাকে।
স্ত্রী তার স্বামীর চেহারা দেখতে ঘৃণা করে। কীভাবে একজন স্ত্রী ভীষণ বদমেজাজি একজন মানুষের সাথে সুখে শান্তিতে বসবাস করবে? এর চেয়েও বাজে ব্যাপার হলো সেই সন্তানদেরকে এই পরিবেশে বড় হতে হয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? মা-বাবার এই ঝগড়াগুলো নিশ্চিতভাবেই তাদের ছোট্ট মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই ধরণের সন্তানেরা বড় হয়ে ক্রুদ্ধ, আক্রমণাত্মক, বিষণ্ণ এবং হতাশাবাদী স্বভাবের হয়। তারা পরিবারে হতাশ হয়ে পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায়। তারা অসৎসঙ্গের ফাঁদে পড়ে এবং বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এমনও হতে পারে তারা বেশ জটিল এবং মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে যার ফলে তারা অন্যদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং খুন-খারাবীতে লিপ্ত হয়। এমনকি তারা আত্মহত্যাও করে অনেক সময়। সম্মানিত পাঠকবৃন্দকে অপরাধীদের উত্থানের পটভূমি সম্পর্কে গবেষণা করার অনুরোধ রইল। পরিসংখ্যান এবং অপরাধীদের প্রাত্যাহিক ঘটনা তাই প্রমাণ করে। এর দায়ভার পরিবারের সেইসব 'হর্তাকর্তাদের' ওপর বর্তায়; যারা নিজেদের রাগ আর বদমেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। এই ধরণের ব্যক্তিরা এজীবনে তো সুখের ছোঁয়া পায়ই না এবং পরবর্তী জীবনেও শাস্তির সম্মুখীন হবে।
হে জনাব!
পৃথিবীর ঘটনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। দুর্ঘটনা, কষ্ট এবং দুঃখজনক ঘটনাগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সবাই কষ্টের সম্মুখীন হয় বিভিন্ন সময়। আসল ব্যাপার হলো একজন মানুষ কষ্টের মধ্য দিয়েই পরিপক্কতা অর্জন করে। একজন মানুষকে সাহসের সাথে এসবের মুখোমুখি হতে হবে এবং এসবের সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। মানুষের এমন হাজারো ছোট-বড় সমস্যার মোকাবেলা করার শক্তি আছে, আল্লাহ তা'য়ালা তা দিয়েছেন।
জাগতিক ঘটনাগুলোই আমাদের মানসিক বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ নয়, বরং আমাদের নার্ভাস সিস্টেম যা এসব ঘটনাগুলোতে প্রভাবিত হয় এবং আমাদের মধ্যে অস্বস্তির সৃষ্টি করে। তাই- একজন ব্যক্তি যখন মন্দ ঘটনার সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে বিরক্ত বা ক্রুদ্ধ হয় না। ধরুন আপনি একটা অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। এই ঘটনাটা আপনার দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যাতে আমাদের কোন হাত নেই বা যা আমরা প্রতিরোধ করতে পারি। অথবা এটা এমন কোন ঘটনাও হতে পারে যাতে আমরা আমাদের সিদ্ধান্তের প্রয়োগ করতে পারি। এটা সুস্পষ্ট যে- প্রথম ক্ষেত্রে আমাদের রাগ বা ক্রোধ কোন কাজে আসবে না। আমরা ভুল করব যদি আমরা রেগে যাই বা মেজাজ হারিয়ে ফেলি। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে আমরা এটা ঘটার জন্য দায়ী ছিলাম না এবং আমাদের উচিত হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানানো। কিন্তু আমাদের খারাপ অভিজ্ঞতা যদি দ্বিতীয় প্রকারের হয়, তাহলে আমরা এর উপযুক্ত সমাধান খুঁজতে পারি। যদি আমরা দুঃখকষ্টের সময়গুলোতে আশা না হারাই এবং নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি তাহলে বিজ্ঞতার সাথে আমরা আমাদের সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারব। এইভাবে আমরা ক্রোধের শরণাপন্ন হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারি এবং আমরা স্বয়ং নিজেই আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারি।
তাই একজন জ্ঞানী মানুষ হলেন তিনি যিনি কষ্টের মাঝেও ভেঙে পড়েন না। ধৈর্য এবং জ্ঞানের দ্বারা আমরা চাইলেই আমাদের বাধা-বিপত্তিগুলোকে পেরিয়ে যেতে পারি। এটা কি দুঃখের বিষয় নয় যে- আমরা সেই সমস্ত বিষয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি যা ঘটা একেবারেই অবশ্যম্ভাবী? অধিকন্তু কেন আপনি আপনার স্ত্রী এবং সন্তানদের আপনার দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করবেন? আপনার স্ত্রী তার দায়িত্ব পালন করছে। তাকে ঘরবাড়ি তত্ত্বাবধান করতে হয়, সন্তানদের দেখভাল করতে হয়, কাপড় ধুতে হয়, রান্নাবান্না করতে হয়, কাপড় ইস্ত্রি করতে হয়, ঘর পরিষ্কার করতে হয় ইত্যাদি বিভিন্ন রকম কাজ করতে হয়। আপনার উচিত আপনার আচার আচরণ দ্বারা তাকে উৎসাহিত করা।
আপনার সন্তানরাও তাদের নিজ নিজ কাজ করছে। তারাও তাদের বাবার জন্য অপেক্ষা করে, যে তাদেরকে আনন্দ দেবে। তাদেরকে ভাল জিনিস শেখান এবং তাদেরকে পড়াশোনায় উৎসাহদান করুন। এটা কি সুন্দর দেখায় যে আপনি আপনার পরিবারের সাথে একটা ভয়ানক আর ক্রুদ্ধ চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছেন? তারা আপনার কাছে তাদের ন্যায়নিষ্ঠ ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পূরণের বাসনা রাখে। তারা আপনার কাছে দয়ার আশা করে এবং নম্র এবং সুন্দর আচরণ কামনা করে। তারা আপনাকে ঘৃণা করবে তাদের অনুভূতিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এবং ঘরকে অন্ধকার করে রাখার জন্য যেখানে কোন সুখের ঝলকই নেই। আপনি কী জানেন তারা কতটা ভুগবে আপনার এই অপ্রীতিকর এবং কঠোর আচরণের দ্বারা? এমনকি আপনি যদি আপনার পরিবারকে অতটা গুরুত্বসহকারে নাও নেন, অন্ততপক্ষে নিজেকে একটু দয়া করুন। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে- আপনি এমন বদমেজাজী হওয়ার দরুন নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন।
কীভাবে আপনি আপনার কাজকর্ম চালিয়ে যাবেন আর কিভাবেই বা আপনি কোনকিছুতে সাফল্য লাভ করবেন? কেন আপনি আপনার ঘরকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলছেন? এটাই কী ভালো নয় যে আপনি সবসময় সুখে থাকবেন এবং ক্রোধের দ্বারা নয় বরং প্রজ্ঞার দ্বারা নিজের সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করবেন? আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন না যে- রাগ আপনার সমস্যাকে সমাধান করতে পারে না বরং এটা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়? আপনি কি একমত হবেন না যে, যখন ঘরে থাকবেন, আপনার বিশ্রাম নেয়া উচিত এবং শক্তি সঞ্চয় করা উচিত যাতে আপনি প্রশান্ত মন দ্বারা একটা উপযুক্ত সমাধান খুঁজে পান?
আপনার হাসিমুখের সাথে আপনার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা উচিত। আপনার তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করা উচিত সুন্দরতম উপায়ে এবং পরিবারে একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা উচিত। আপনার উচিত তাদের সাথে পানাহার করা, বিশ্রাম নেয়া। এভাবে আপনি এবং আপনার পরিবার সুখের ছোঁয়া পাবে এবং আপনি বিভিন্ন সমস্যাকে খুব সহজেই সমাধান করতে পারবেন। তাই পবিত্র জীবন বিধান ইসলাম ধর্ম ঈমানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি নিদর্শন হিসেবে সদাচরণের ওপর জোর দিয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : “যার আচরণ যত ভালো তার ঈমান তত বেশি পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কল্যাণ করে।”
লুকমান হাকিম বলেন-
“একজন জ্ঞানীলোকের অবশ্যই পরিবারের সাথে শিশুসুলভ আচরণ করতে হবে, এবং পুরুষোচিত আচরণ ঘরের বাইরের জন্য রাখতে হবে।”
টিকাঃ
* বায়হাকি, হাদিস নং: ৬৬৫৩।
📄 অযথা অভিযোগ করবেন না
জীবনে অনেক সমস্যাই থাকে। এমন কেউ নেই যে সে তার পরিস্থিতি নিয়ে পুরোপুরি খুশি। কিছু লোকেরা তাদের কষ্টের তুলনায়, অন্যের চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। তারা তাদের কষ্ট ও পরিশ্রম কে মাথায় রাখে এবং তা প্রকাশের যথার্থ সময় ছাড়া সেটা প্রকাশ করে না। অন্য দিকে, এমন অনেক লোক আছে যারা এতই দুর্বল যে, তারা কখনো নিজের সমস্যার কথা নিজের মধ্যে রাখতে পারে না। তারা অভিযোগ করতে এতটাই অভ্যস্ত যে- অন্যদের সাথে দেখা হওয়ার সাথে সাথেই, তারা তাদের জীবনের সমস্যা নিয়ে সমালোচনা করা শুরু করে দেয়। যেখানেই তারা যায় এবং যখনই কোনো সমাবেশে উপস্থিত হয়, তখনই তারা তাদের প্রতিদিনের সমস্যাগুলোর সম্পর্কে সমালোচনা করা শুরু করে দেয়। যা অন্যদের জীবনকেও প্রভাবিত করতে থাকে (যেন মনে হয় অন্যের সুখ নষ্ট করার জন্য শয়টান নিজেই তাদেরকে একটি মিশনে নামিয়েছে)।
এজন্য বেশিরভাগ বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়স্বজন এসব বিষয়ে নিজেকে জড়াতে চায় না এবং তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করে। তবে তাদের স্ত্রীর জন্য বিষয়টা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তাদের বাচ্চাদের জন্যও। কারণ আর কেউ যখন তাদের এই সমালোচনা শুনার জন্য প্রস্তুত থাকে না, তখন এইসব পুরুষরা তাদের পরিবারের সাথেই তাদের সমস্যর কথাগুলো বলতে থাকে। তারা কখনও কখনও তাদের ব্যয়, ট্যাক্স, বন্ধু, সহকর্মী, তাদের ব্যবসা, রোগ, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ করতেই থাকে। এই পুরুষেরা খুবই হতাশাবাদী এবং পৃথিবীতে ভালো কোনোকিছুই তারা দেখতে পায় না। তারা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশেষত তাদের পরিবারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে।
শ্রদ্ধেয় পাঠক! সারাক্ষণ অভিযোগ করে কী লাভ? ক্রুদ্ধ হয়ে আপনি কী অর্জন করবেন? কেন আপনি ট্যাক্সি ড্রাইভারের উপর করা রাগ, আপনার পরিবারের উপর দেখাবেন? আপনার ব্যবসার ক্ষতি হলে কেনো আপনি আপনার স্ত্রীকে তার জন্য দোষারোপ করবেন? আপনি ভুলে যাবেন না যে- আপনার এই মনোভাব আপনার পরিবারকে আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তারা আপনার উপর এবং বাড়ির সকলের উপর বিরক্ত হয়ে উঠবে। এমনকি তারা বাড়ি থেকে পালাতে পারে এবং বিভিন্ন কুট-জালের ফাঁদে পড়ে দুর্নীতি ও অপরাধের শিকার হতে পারে। সর্বোপরি এটি তাদের উপর একটি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে। আপনার পরিবারের সুখ নষ্ট না করাটা কী আপনার জন্য ভালো নয়? বাড়ি ফিরে, আপনি আপনার সমস্যাগুলি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার পরিবারের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, হাসি-ঠাট্টা করুন। তাদের সঙ্গোকে উপভোগ করুন।
ইসলামে ধৈর্যের কথাও বলা হয়েছে এবং জীবনের সমস্যাগুলোর উপর অভিযোগ-অনুশোচনা না করে ধৈর্য ধারণ করলে তার জন্য পুরস্কার বরাদ্দ করা হয়েছে। যখন মুসলমানদের উপর কষ্ট আসে, তখন তাদের আল্লাহর উপর অভিযোগ/ অনুশোচনা করা উচিত না বরং সমস্ত সমস্যার মূল চাবিকাঠির অধিকারী আল্লাহর কাছে তাদের সাহায্য চাওয়া উচিত।'
📄 অযথা দোষ খোঁজা থেকে বিরত থাকুন
কিছু পুরুষ ক্রমাগত সমস্ত কিছুতে ত্রুটি খুঁজতেই থাকে। তারা প্রতিটি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিৎকার শুরু করে যে- “এই টেবিলটি কেন নোংরা হয়ে আছে? দুপুরের খাবার কেন এখনও প্রস্তুত হয়নি? ফুলদানিটি কেনো এখানে? ছাই রাখার পাত্রটি মেঝেতে কেনো?” ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু পুরুষ এত দ্রুত তার মনোভাব পরিবর্তন করে যে- এটি তাদের পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং কখনও কখনও এই আচরণের ফলে তাদের পরিবারের বিচ্ছেদও ঘটে। অবশ্যই আমরা বলছি না যে- পুরুষের তাদের স্ত্রীদের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত না সেটা বলার কোনো অধিকার নেই।
মহিলারাও যেন পরিবার সম্পর্কিত পরামর্শের বিষয়ে একগুঁয়েমি না দেখায়। যদিও পুরুষেরা পরিবারের অভিভাবক হিসেবে নিজের কর্তব্যটি যাতে সঠিকভাবে পালন করতে পারে সে হিসেবে নিজের বুদ্ধি ও যুক্তিসংগত কাজ করা উচিত। স্ত্রী যদি বাড়ির কাজে কোনো পরামর্শ দেয় তবে সেটা বিবেচনায় নিতে আন্তরিক মনোভাব রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, যেহেতু একজন পুরুষের হাতে পরিবারের সমস্ত কাজে অংশ নেওয়ার মত পর্যাপ্ত সময় থাকে না এবং কোন বিষয়ে যদি তার পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকে, তবে পরিবারের কিছু বিষয় স্ত্রীর উপর ছেড়ে দেয়াই তার জন্য সুবিধাজনক। ঘর চালানোর ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির উচিত তার স্ত্রীকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দেওয়া। যদিও পুরুষরা প্রায় ক্ষেত্রেই জোর না করে পরামর্শ দেয়ার অজুহাতে তাদের সিদ্ধান্ত স্ত্রীদের উপর চাপিয়ে দেয়। যখন একজন বুদ্ধিমান মহিলা কোনও বিষয়ে তার স্বামীর ইচ্ছাটা বুঝতে পারে, তখন সে তা মেনে চলার চেষ্টা করে।
অতএব, একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা যারা একে অপরের সম্পর্কে এবং তাদের পরিবারের সম্পর্কে যত্নশীল, তখন তারা যে কোনো বিষয়ে পরস্পর বিনীতভাবে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এইভাবে, বেশিরভাগ মহিলারা তার স্বামীর সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। তবে তার স্বামী যদি ক্রমাগত তার দোষ খুঁজতেই থাকে এবং অশান্তির সৃষ্টি করতে থাকে তখন তার স্ত্রী নেতিবাচক মনোভাব এর উপর অভ্যস্ত হতে থাকে এবং ফলস্বরূপ এই মনোভাবটি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যার থেকে কোন ভালো ফলাফল আর আশা করা যায় না।
যে মহিলার স্বামী এমন মনোভাব পোষণ করে সে তার স্বামীর কোনো কথাই গুরুত্ব সহকারে নেয় না। এমনকি সে তার স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিকেও তখন অবহেলার চোখে দেখা শুরু করে। সে নিজেই ভাবতে থাকে- “আমি কেনো এতো কষ্ট করবো, যদি আমার স্বামী কখনই আমার কোনো কাজে সন্তুষ্ট না হয়? সে কেবল তার স্বামীকেই দোষারোপ করবে না, এমনকি তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারে। তখন তাদের বাড়ি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে উঠবে। এইভাবে একটি পরিবার ভেঙে যায় এবং বিচ্ছেদ হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে একজন মহিলা কখনই নিজেকে দোষারোপ করে না, কারণ একজন বিজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল স্ত্রীও তার স্বামীর এমন অমানবিক আচরণের কারণে তার ধৈর্য সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে। তখন সে ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করে, দাবি করে যে- তার স্ত্রী তার বাড়ি ছেড়ে দুমাস আগে চলে গিয়ে তার বাবা-মার সাথে থাকছে। তারপর আরও অনুসন্ধান করা শুরু করলে, ওই ব্যক্তির স্ত্রী তখন বলে যে- আমার স্বামী আমার ঘর সামলানোর পদ্ধতি পছন্দ করে না। তিনি আমার রান্না, আমার বাড়ির কাজ পরিচালনা সম্পর্কে ক্রমাগত সমালোচনা এবং অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। তাই আমি তাকে ছেড়ে চলে এসেছি।
পুরুষদের মনে রাখা উচিত যে- সংসারের কাজটা তাদের স্ত্রীদের দায়িত্ব পালনের একটি জায়গা। এই জায়গায় তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা তাদের পুতুল হিসাবে বিবেচনা করাটা সম্পূর্ণরূপে একটি ভুল কাজ। তারা যেভাবে পছন্দ করে সেভাবেই তাদের সংসারের কাজ করতে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ফলস্বরূপ- আপনার স্ত্রী উৎসাহের সাথে তার কাজগুলো করবে এবং আপনিও সুখী থাকবেন এবং আপনার বাড়ি হয়ে উঠবে “একটি সুখী পরিবার”।
📄 তাকে সন্তুষ্ট রাখুন এবং সহানুভূতি প্রকাশ করুন
একজন মহিলাও পুরুষের মতো আবেগীয় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়। সে আনন্দ, রাগ, দুঃখ ইত্যাদি অনুভব করে। সে ঘরের কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে; বাচ্চাদের উপর বিরক্ত হয়। এসময় অন্যদের সমালোচনা তাকে মর্মাহত করতে পারে। সে অন্যান্য মানুষের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে। মোটকথা- অনেক সমস্যা মহিলাদের এমনভাবে প্রভাবিত করে যে- সে ছোটোখাটো ব্যাপারেও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এটা বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, কারণ তারা খুবই সংবেদনশীল এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। নারীরা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তাকে সন্তুষ্ট রাখা উচিৎ। একজন বিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী হিসেবে পুরুষের উচিৎ তাকে সান্ত্বনা দেওয়া কারণ তার স্ত্রী তাকে বিশ্বাস করে।
প্রিয় জনাব!
আপনি যখন আপনার স্ত্রীকে রাগান্বিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান, তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করুন। ঘরে প্রবেশ করে যদি দেখেন সে আপনাকে সম্ভাষণ করছে না তাহলে আপনি তাকে সালাম দিন। এতে আপনি ছোট হয়ে যাবেন না। তার সাথে হাসিমুখে কথা বলুন। কর্কশ ভাষা পরিহার করুন। তার ঘরের কাজে সাহায্য করুন। তাকে কোনভাবেই রাগান্বিত করে তুলবেন না। তাকে উত্ত্যক্ত করবেন না। সে যদি কথা বলতে না চায়, তাকে তার মতো ছেড়ে দিন। তাকে বলবেন না, “তোমার কী সমস্যা?”
সে যদি কথা বলতে চায় তবে তার কথা শুনুন এবং তার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করুন। এমন ভান করুন যেন তার সমস্যা নিয়ে তার চেয়ে আপনি বেশি চিন্তিত। তাকে তার অভিযোগ প্রকাশ করতে দিন। অতঃপর একজন দয়ালু প্রিয়জনের মতো অর্থাৎ একজন সহানুভূতিশীল স্বামীর মতো তার সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করুন। তাকে ধৈর্য ধরতে উৎসাহ দিন। যুক্তি ও বুদ্ধি দ্বারা সমস্যাগুলো মামুলি হিসেবে তার কাছে তুলে ধরুন। তাকে সাহস দিন এবং তার বিরক্তির কারণ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করুন। ধৈর্য ধরুন এবং তার সাথে যৌক্তিক আচরণ করুন। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং আপনাদের সাংসারিক জীবন দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। অপরপক্ষে আপনার ভুল আচরণ তাকে আরও ঝামেলায় ফেলে দিবে। এর প্রভাব আপনার উপরেও পড়বে এবং তা থেকে ঝগড়াবিবাদের সৃষ্টি হতে পারে যার ফলে আপনারা দুইজনেই কষ্ট পাবেন।