📘 দ্য কেয়ারিং হাজব্যান্ড 📄 স্ত্রীর দেখাশোনা করা

📄 স্ত্রীর দেখাশোনা করা


একটি পরিবারের উন্নতি এতে নিহিত আছে যে- প্রত্যেক স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি যত্নবান হবে তেমনিভাবে স্ত্রীও তার স্বামীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে; যেটাকে ইসলামেও অনেক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং এটাই হলো একজন মানুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন বিবাহিত পুরুষকে জানতে হবে কীভাবে আচরণ করলে তার স্ত্রীর চরিত্র ফেরেশতাতুল্য হয়ে উঠে। স্ত্রীর আশা- আকাঙ্ক্ষা ও বৈধ চাহিদা অনুযায়ী স্বামীকে তার জীবন গড়ে তুলতে হবে। একমাত্র ভদ্র আচরণ ও ব্যবহার দ্বারা সে স্ত্রীকে তার দিকে আকৃষ্ট করতে পারে। পাশাপাশি তার ঘর-সংসারের প্রতিও আগ্রহী করে তুলতে পারে। এই বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন; যা পরবর্তীতে এই বইয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।

📘 দ্য কেয়ারিং হাজব্যান্ড 📄 স্ত্রীকে ভালোবাসুন

📄 স্ত্রীকে ভালোবাসুন


নারীরা হলো কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভালোবাসা ও মায়া-মমতাতেই তার অস্তিত্ব। সে অন্যের নিকট ভালোবাসা কামনা করে। সে অন্যের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পেতে প্রচুর পরিমাণে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে। এই প্রবণতা তার মাঝে এতো বেশি থাকে যে- সে উপলব্ধি করে কেউ তাকে ভালোবাসে না, অতঃপর সে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে। সে হতাশ ও বিমর্ষ হয়ে পড়ে। কাজেই এটা সর্বজনবিদিত যে- একজন সফল মানুষের সুখী বৈবাহিক জীবনের রহস্য স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশের মধ্যে নিহিত।

প্রিয় জনাব!
আপনার স্ত্রী বিয়ের পূর্বে তার বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও আদরযত্নে বেড়ে উঠেছে। এখন সে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে এবং তার বাকি জীবন একসাথে কাটানোর জন্য আপনাকে বেছে নিয়েছে; সে আশা করে আপনি তার ভালোবাসা ও আবেগ-অনুভূতির সকল চাহিদা পূরণ করবেন। সে তার বাবা-মা ও বন্ধু-বান্ধবের চেয়েও আপনার কাছে বেশি ভালোবাসা কামনা করে। সে আপনাকে প্রচন্ডরকম বিশ্বাস করেছে বলেই তার অস্তিত্ব আপনার কাছে অর্পণ করেছে। একটি সুখী প্রণয়ের রহস্য স্ত্রীর প্রতি আপনার ভালোবাসা প্রকাশের মধ্যে লুকায়িত।

যদি আপনি তার হৃদয় জয় করতে চান- তাকে আপনার বাধ্যগত করতে চান; আপনি যদি আপনার সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে চান, যদি চান স্ত্রী আপনাকে ভালোবাসুক এবং আপনার প্রতি বিশ্বস্ত থাকুক; তাহলে সবমসময় তাকে স্নেহ করুন এবং তার প্রতি আপনার ভালোবাসা প্রকাশ করুন। স্ত্রীকে যদি স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেন তাহলে সে তার সংসার, সন্তান এবং আপনিসহ সবকিছুর উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। আপনার ঘর-বাড়ীর অবস্থা সব-সময় অগোছালো থাকবে। সে এমন একজন মানুষের জন্য কষ্ট করতে রাজি হবে না; যে তাকে ভালোবাসে না। সংসার এমন একটি জায়গা যেখানে হাজব্যান্ড-ওয়াইফের মাঝে কোনো মায়া-মমতা না থাকলে তা নরক-তুল্য হয়ে যায়; যদিও তা সাজানো গোছানো এবং বিলাসবহুল জিনিসপত্রে পরিপূর্ণ থাকে।

অশান্তির সংসারে আপনার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা তার স্নায়ুবৈকল্য হতে পারে। সে যদি আপনার দ্বারা সন্তুষ্ট না হয় তাহলে সে অন্যের নিকট গ্রহণযোগ্যতা খোঁজার চেষ্টা করবে। সে আপনার প্রতি এতোটাই অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে যে হয়তো তালাক নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারে। এসব কিছুর জন্য আপনি দায়ী। কেননা- আপনি তাকে সন্তুষ্ট রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটা সত্য যে- অনেক তালাক এই ধরনের নির্দয়তার ফলস্বরূপও হয়ে থাকে। নিম্নোক্ত পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়; ভালোবাসার মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা, স্ত্রীর ইচ্ছার প্রতি স্বামীর উদাসীনতা, নারীর মানসিক অবস্থার গুরুত্বকে অবহেলা করা অনেক ডিভোর্সের জন্য দায়ী।

২০২০ সনের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঢাকায় দৈনিক ৩৯টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি তালাক হয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার পেছনে করোনার কারণে তৈরি হওয়া মানসিক, আর্থিকসহ নানামুখী চাপের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন এবং যোগাযোগ কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। পরিসংখ্যান বলছে তালাক দেওয়ার তালিকায় নারীদের সংখ্যাই বেশি। শহুরে বা মফস্বল, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, ধনী বা শ্রমজীবী যেকোনও হিসাবেই নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি হারে তালাক দিচ্ছে। এর পেছনে অধিকাংশ নারীরা তাদের জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, সম্পর্কের প্রতি হতাশা এবং তাদের ইচ্ছা এবং আবেগ-অনুভূতির প্রতি স্বামীর উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন।

'একজন মহিলা আদালতে জবানবন্দি দেয় যে- সে পণের টাকা পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলো এমনকি তার স্বামীকে ডিভোর্সে রাজি করানোর জন্য তাকে কিছু টাকাও প্রদান করে। সে বলে, তার স্বামী তার চেয়ে তার টিয়াপাখির প্রতি বেশি আগ্রহী। তাই সে আর তার সাথে থাকতে চায় না।'

পারিবারিক ভালোবাসা এবং বন্ধুত্ব যে কোনো কিছুর চেয়ে অধিক মূল্যবান এবং এটা আল্লাহর আলৌকিক শক্তির এক অন্যতম নিদর্শন এবং মানবজাতির জন্য এক বিশেষ নেয়ামত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
অর্থ : “এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর এক নিদর্শন (হচ্ছে)- তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন; নিশ্চয় চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে নিদর্শন আছে।”

আমাদের বন্ধু সে-ই যে তার স্ত্রীর প্রতি অধিক দয়াশীল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : 'তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।'৭ আল্লাহর নবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে- তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ স্ত্রীর প্রতি দয়াশীল।

যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এ কথা বলে যে,- 'আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি' তা কখনোই স্ত্রীর হৃদয় ছেড়ে যাবে না।'

আপনার স্নেহ-ভালোবাসা অবশ্যই খাঁটি হতে হবে তবেই তা অন্যের হৃদয়কে স্পর্শ করবে এবং শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট নয়, স্নেহ- ভালোবাসার প্রকাশও অত্যন্ত জরুরি। আপনি যদি কথা এবং কাজে স্ত্রীর প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন; তবে যে ভালোবাসা আপনি প্রদর্শন করেছেন তা আপনার নিকট-ই ফিরে আসবে এবং আপনাদের প্রেমের বন্ধন আরও মজবুত হবে। তাই আপনার স্ত্রীর প্রতি খোলামেলাভাবে ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে ইতস্ততবোধ করবেন না। স্ত্রীর উপস্থিতি ও অনুপস্থিতিতে আপনার উচিৎ তার প্রশংসা করা। ঘরের বাইরে গেলে তাকে লিখুন এবং তাকে জানান যে- আপনি তাকে মিস করছেন। মাঝে মাঝে তার জন্য কিছু কিনে আনুন। অফিসে থাকাকালীন তাকে ফোন দিয়ে তার খোঁজ-খবর নিন। এই ধরনের ভালোবাসার প্রকাশ নারীর মনে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একজন নারী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন-

“কোনো এক শরতের রাতে আমার বিয়ে হয়। আমরা খুব সুখে শান্তিতে বসবাস করতাম। আমি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী মনে করতাম। আমি তার ছোট্ট বাড়িটিতে ছয়টি বছর একসাথে থেকেছি। আমি যখন বুঝতে পারি আমি গর্ভবতী হয়েছি তখন আরও শতগুণ আনন্দ অনুভব করি। আমি যখন স্বামীকে এই খবর জানাই; তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে কেঁদে ফেলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এরপর তিনি বাইরে গিয়ে নিজের সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে আমার জন্য একটি হীরার নেকলেস কিনে আনেন। তিনি আমাকে নেকলেসটি দিয়ে বলেন- “আমি আমার জীবনে দেখা পৃথিবীর সেরা নারীকে এই নেকলেসটি উপহার দিচ্ছি।” এই ঘটনা তার সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার বেশিদিন আগের নয়।

টিকাঃ
৭. আল্লাহর নবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে- তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ স্ত্রীর প্রতি দয়াশীল।

📘 দ্য কেয়ারিং হাজব্যান্ড 📄 আপনার স্ত্রীকে সম্মান করুন

📄 আপনার স্ত্রীকে সম্মান করুন


একজন নারী নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করতেই পারে যেভাবে পারে একজন পুরুষ। সেও অন্যদের কাছ থেকে সম্মান পেতে পছন্দ করে। সে কষ্ট পায় যখন কেউ তাকে অপমান করে বা হেয় করে। তার ভালো লাগে; যখন সে সম্মান পায় এবং তাদেরকে সে ঘৃণা করে; যারা তার সম্মানহানি করতে চায়।

প্রিয় জনাব!
আপনার স্ত্রী আপনার কাছ থেকে অন্যদের চেয়ে বেশি সম্মান পাওয়ার হকদার। তার জীবন-সঙ্গী এবং সবচেয়ে ভালো বন্ধুর কাছে যত্ন পাওয়ার প্রতিটি অধিকার সে রাখে। সে আপনার এবং আপনার ছেলেমেয়েদের ভালোর জন্য কাজ করে তাই সে আপনার কাছ থেকে তার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মূল্যায়ন এবং সম্মানের আশা করে। তাকে সম্মান দেখানোতে আপনার সম্মান তো কমবেই না বরং এটা তার প্রতি আপনার ভালোবাসা এবং আকর্ষণেরই প্রমাণ বহন করবে। তাই তাকে অন্যের চেয়ে বেশি সম্মান করুন এবং তার সাথে নম্রভাবে কথা বলুন। তার উপর অযথা চিৎকার চেঁচামেছি করবেন না। তাকে সম্মানজনক এবং গুণবাচক শব্দগুলো দ্বারা সম্বোধন করুন। যখন আপনি ঘরে প্রবেশ করবেন, যদি সে সালাম জানাতে ভুলে যায়, আপনি নিজেই তাকে সালাম দিন, উত্তম হয় আপনিই আগে তাকে সালাম দেওয়া। যখন ঘরের বাইরে যাবেন তাকে বিদায় সম্ভাষণ (আল্লাহ হাফেজ) জানান। তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করবেন না যখন আপনি ভ্রমণে বের হন বা ঘরের বাইরে যান। তার সাথে ফোনে কথা বলুন! এসএমএস করুন। যখন অনেক মানুষের মাঝে থাকেন তখনও তাকে সম্মান করুন। সব ধরনের অপমানজনক ও মানহানিকর আচরণ বর্জন করুন। তাকে কখনও গালাগালি করবেন না এমনকি মজার ছলেও তাকে উত্যক্ত করবেন না। এটা ভাববেন না যে; আপনি তার অনেক কাছের মানুষ বলে আপনি তাকে নিয়ে মজা করলে সে কিছু মনে করবে না। সে হয়ত মুখে কিছু বলবে না কিন্তু মনে মনে বিষয়টাকে অপছন্দ করবে। একজন সম্মানিত মহিলা, বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি, তার ডিভোর্স রিকুয়েস্টে বলেন-

“আমরা বিয়ে করেছি বারো বছর হলো। আমার স্বামী একজন ভালো মানুষ। ভালো এবং অমায়িক মানুষ হবার মতো তার অনেক গুণ রয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো এটা বুঝতে চাননি যে আমি তার স্ত্রী এবং তারই দুই সন্তানের মা। তিনি সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে নিজেকে একজন জুতসই ব্যক্তি মনে করেন, কিন্ত তিনি সেখানে আমাকে বিরক্ত এবং অপমান করার মাধ্যমে নিজেকে জাহির করেন। আপনারা এটা বিশ্বাসই করতে পারবেন না যে- আমি এতে কতটা আহত হই। আমার স্নায়ুতন্ত্র এসব কারণে এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছে যে আমাকে মানসিক চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হয় প্রতিনিয়ত। এ ব্যপারে আমি আমার স্বামীর সাথে অনেকবার কথা বলেছি। আমি তাকে অনেকবার অনুরোধ করেছি আমার সাথে এভাবে আচরণ না করতে। আমি তার সামনে “তার স্ত্রী” হিসেবে আমার অবস্থান এবং বয়সের ম্যাচুরিটির বিষয়টা তুলে ধরে বলেছি যে তার জন্য এটা উচিত না অন্যদের সামনে আমার সাথে ঠাট্টা করা যাতে তারা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে পারে। আমি এতে সবার সামনে বিব্রতবোধ করি। যেহেতু আমি কখনোই একজন রসিক বা মজাদার মানুষ ছিলাম না, আমি তার সাথে পেরে উঠতাম না। যেহেতু উনি আমার সমস্যাগুলোকে পাত্তাই দেন না আমি তার থেকে আলাদা হয়ে যেতে চাই। আমি জানি আমি নিজে নিজে সুখী হতে পারব না, কিন্ত আমি এমন একজন পুরুষের সাথে বসবাস করতে পারব না যিনি প্রতিনিয়তই আমাকে হেয় করেন।

সব স্ত্রীই চায় যে তাদের স্বামীরা তাদের সম্মান করুক এবং সবাই এটা অপছন্দ করবে যে- তাদের স্বামীরা তাদের অপমান করবে। যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর অপমানের সামনে চুপ করে থাকে তার মানে এই না যে সে এটা পছন্দ করে। যদি আপনি আপনার স্ত্রীকে সম্মান করেন সেও আপনাকে সম্মান করবে এবং এভাবে আপনাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরালো হবে। আপনি অন্যদের কাছ থেকেও সম্মান পেতে পারেন। যদি আপনি তার সাথে খারাপ আচরণ করেন সেও আপনার সাথে তাই করবে। আবারো দোষটা আপনার, তার না।

প্রিয় জনাব!
বিয়ে করা মানে দাস কেনা না। আপনি একজন মুক্ত মানুষের সাথে দাসের মতো আচরণ করতে পারেন না। আপনার স্ত্রী আপনাকে বিয়ে করেছে এইজন্য যে- যাতে সে তার বাকি জীবন এমন পুরুষের সাথে কাটাতে পারে; যাকে সে ভালবাসে। সে আপনার কাছে তাই আশা করে যা আপনি তার কাছে থেকে আশা করেন। তাই তার সাথে তেমন আচরণই করুন; যেমন আচরণ আপনি তার কাছ থেকে আশা করেন। যে বিয়ে করে, সে যেনো তার স্ত্রীকে সম্মান করে। কারণ, যে একজন মুসলিমকে সম্মান করবে, আল্লাহও তাকে সম্মানিত করবেন।” এছাড়াও মহৎ ব্যক্তি ছাড়া তার স্ত্রীকে কেউ সম্মান করে না, আর নীচ ব্যক্তি ছাড়া কেউ তার স্ত্রীকে অপমান করে না। যে তার পরিবারকে অপমান করবে সে তার জীবন থেকে সুখ হারিয়ে ফেলবে।

📘 দ্য কেয়ারিং হাজব্যান্ড 📄 মার্জিত হোন

📄 মার্জিত হোন


আল্লাহ তা'য়ালা পৃথিবীতে মানুষকে তার নিজ ইচ্ছায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পথ বা উপায় সৃষ্টি করে দেন। একটার পর একটা ঘটনা ঘটান ও প্রকাশ করেন। বিশাল পৃথিবীতে আমাদের এই ক্ষুদ্র অস্তিত্ব একটি ক্ষুদ্র কণার মতো যা প্রতিনিয়ত স্থানান্তর হয় এবং প্রত্যেক সময় অন্যকণাগুলোর সাথে ধাক্কা খেতে থাকে। পৃথিবীর পরিচালনা ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই এবং পৃথিবীর ঘটনাগুলোও আমাদের ইচ্ছায় হয় না।

যে মুহূর্ত থেকে একজন ব্যক্তি সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়, সেই মুহূর্ত থেকে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে আসা পর্যন্ত একজন মানুষ শত অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। এভাবে একজন ব্যক্তি সারা জীবনে অনেক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়।

কেউ হয়ত অন্যের দ্বারা অপমানিত হয়, কারো অবন্ধুসুলভ সহকর্মী থাকে; বাাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে হয়, কর্মক্ষেত্রে অভিযুক্ত হতে হয়, কেউ টাকা হারিয়ে ফেলে, কেউবা সর্বস্বান্ত হয়। এ ধরনের এক বা একাধিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন, যে কেউ যেকোন সময়, যে কোনো জায়গায়। আপনি আপনার জীবনের প্রতিদিনকার ঘটনা প্রবাহে হতাশ হয়ে পড়তে পারেন যা একটা টাইম বোমার সদৃশ, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। হ্যাঁ, আপনি হয়ত আপনার ঘটনাগুলোর জন্য অন্য কাউকে বা পৃথিবীকে দোষারোপ করতে পারেন না। তাই আপনি যখন ঘরে আসেন আপনার স্ত্রী বা সন্তানের উপর রাগ ঝাড়ার চেষ্টা করেন। আপনি ঘরে এমন ভাবে প্রবেশ করেন; যেন ঘরে আজরাইল (মৃত্যুর ফেরেশতা) প্রবেশ করেছে। আপনার সন্তানরা আপনার সামনে থেকে ছোট্ট ইঁদুরগুলোর মতো পালিয়ে যায়। ইসলাম এমন আচরন করতে নিষেধ করেছে।

আপনার উচিত- এর থেকে শোধরানোর উপায় বের করা। আপনার খাবারে পরিমাণ মতো লবণ থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে, আপনার চায়ের কাপ এখনো প্রস্তুত নাও হতে পারে, আপনার ঘরটি অপরিষ্কার থাকতে পারে, কিংবা আপনার সন্তানেরা শোরগোল করতেই পারে। আপনার নিজের ঘরে সবার উপরে ফেটে পড়তে এসব আপনার জন্য অজুহাত হিসেবে কাজ করে। আপনি তখন ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে সবার সাথে চিৎকার চেঁচামেছি শুরু করে দেন, তাদের গালাগালি করেন, সন্তানদের মারধর করেন ইত্যাদি চলতে থাকে। এভাবে আপনি মায়া-মমতায়-বন্ধুত্বে ঘেরা ঘরটিকে জ্বলন্ত জাহান্নামে পরিণত করেন যেখানে আপনি এবং আপনার পরিবারের বাকিদেরও ভুগতে হয়। যদি বাচ্চারা ঘর থেকে পালিয়ে রাস্তায় চলে যেতে পারত তাহলে তারা তাই করতো। যদি সেটা করতে না পারে তাহলে তারা সময় গুনতে থাকবে, কখন আপনি বাড়ি থেকে বের হবেন। এই ধরণের পরিবারগুলো চরম উদাসীন এবং ভীতিপ্রদ পরিবেশ দ্বারা বেষ্টিত থাকে তা সুস্পষ্ট। সবসময় ঝগড়া এবং বাকবিতন্ডা চলতে থাকে। তাদের ঘরগুলোতে সবসময় বিশৃঙ্খলা বিরাজ থাকে।

স্ত্রী তার স্বামীর চেহারা দেখতে ঘৃণা করে। কীভাবে একজন স্ত্রী ভীষণ বদমেজাজি একজন মানুষের সাথে সুখে শান্তিতে বসবাস করবে? এর চেয়েও বাজে ব্যাপার হলো সেই সন্তানদেরকে এই পরিবেশে বড় হতে হয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? মা-বাবার এই ঝগড়াগুলো নিশ্চিতভাবেই তাদের ছোট্ট মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই ধরণের সন্তানেরা বড় হয়ে ক্রুদ্ধ, আক্রমণাত্মক, বিষণ্ণ এবং হতাশাবাদী স্বভাবের হয়। তারা পরিবারে হতাশ হয়ে পড়ে এবং ধ্বংস হয়ে যায়। তারা অসৎসঙ্গের ফাঁদে পড়ে এবং বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এমনও হতে পারে তারা বেশ জটিল এবং মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে যার ফলে তারা অন্যদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং খুন-খারাবীতে লিপ্ত হয়। এমনকি তারা আত্মহত্যাও করে অনেক সময়। সম্মানিত পাঠকবৃন্দকে অপরাধীদের উত্থানের পটভূমি সম্পর্কে গবেষণা করার অনুরোধ রইল। পরিসংখ্যান এবং অপরাধীদের প্রাত্যাহিক ঘটনা তাই প্রমাণ করে। এর দায়ভার পরিবারের সেইসব 'হর্তাকর্তাদের' ওপর বর্তায়; যারা নিজেদের রাগ আর বদমেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। এই ধরণের ব্যক্তিরা এজীবনে তো সুখের ছোঁয়া পায়ই না এবং পরবর্তী জীবনেও শাস্তির সম্মুখীন হবে।

হে জনাব!
পৃথিবীর ঘটনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। দুর্ঘটনা, কষ্ট এবং দুঃখজনক ঘটনাগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সবাই কষ্টের সম্মুখীন হয় বিভিন্ন সময়। আসল ব্যাপার হলো একজন মানুষ কষ্টের মধ্য দিয়েই পরিপক্কতা অর্জন করে। একজন মানুষকে সাহসের সাথে এসবের মুখোমুখি হতে হবে এবং এসবের সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। মানুষের এমন হাজারো ছোট-বড় সমস্যার মোকাবেলা করার শক্তি আছে, আল্লাহ তা'য়ালা তা দিয়েছেন।

জাগতিক ঘটনাগুলোই আমাদের মানসিক বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ নয়, বরং আমাদের নার্ভাস সিস্টেম যা এসব ঘটনাগুলোতে প্রভাবিত হয় এবং আমাদের মধ্যে অস্বস্তির সৃষ্টি করে। তাই- একজন ব্যক্তি যখন মন্দ ঘটনার সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে বিরক্ত বা ক্রুদ্ধ হয় না। ধরুন আপনি একটা অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। এই ঘটনাটা আপনার দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যাতে আমাদের কোন হাত নেই বা যা আমরা প্রতিরোধ করতে পারি। অথবা এটা এমন কোন ঘটনাও হতে পারে যাতে আমরা আমাদের সিদ্ধান্তের প্রয়োগ করতে পারি। এটা সুস্পষ্ট যে- প্রথম ক্ষেত্রে আমাদের রাগ বা ক্রোধ কোন কাজে আসবে না। আমরা ভুল করব যদি আমরা রেগে যাই বা মেজাজ হারিয়ে ফেলি। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে আমরা এটা ঘটার জন্য দায়ী ছিলাম না এবং আমাদের উচিত হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানানো। কিন্তু আমাদের খারাপ অভিজ্ঞতা যদি দ্বিতীয় প্রকারের হয়, তাহলে আমরা এর উপযুক্ত সমাধান খুঁজতে পারি। যদি আমরা দুঃখকষ্টের সময়গুলোতে আশা না হারাই এবং নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি তাহলে বিজ্ঞতার সাথে আমরা আমাদের সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারব। এইভাবে আমরা ক্রোধের শরণাপন্ন হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারি এবং আমরা স্বয়ং নিজেই আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারি।

তাই একজন জ্ঞানী মানুষ হলেন তিনি যিনি কষ্টের মাঝেও ভেঙে পড়েন না। ধৈর্য এবং জ্ঞানের দ্বারা আমরা চাইলেই আমাদের বাধা-বিপত্তিগুলোকে পেরিয়ে যেতে পারি। এটা কি দুঃখের বিষয় নয় যে- আমরা সেই সমস্ত বিষয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি যা ঘটা একেবারেই অবশ্যম্ভাবী? অধিকন্তু কেন আপনি আপনার স্ত্রী এবং সন্তানদের আপনার দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী করবেন? আপনার স্ত্রী তার দায়িত্ব পালন করছে। তাকে ঘরবাড়ি তত্ত্বাবধান করতে হয়, সন্তানদের দেখভাল করতে হয়, কাপড় ধুতে হয়, রান্নাবান্না করতে হয়, কাপড় ইস্ত্রি করতে হয়, ঘর পরিষ্কার করতে হয় ইত্যাদি বিভিন্ন রকম কাজ করতে হয়। আপনার উচিত আপনার আচার আচরণ দ্বারা তাকে উৎসাহিত করা।

আপনার সন্তানরাও তাদের নিজ নিজ কাজ করছে। তারাও তাদের বাবার জন্য অপেক্ষা করে, যে তাদেরকে আনন্দ দেবে। তাদেরকে ভাল জিনিস শেখান এবং তাদেরকে পড়াশোনায় উৎসাহদান করুন। এটা কি সুন্দর দেখায় যে আপনি আপনার পরিবারের সাথে একটা ভয়ানক আর ক্রুদ্ধ চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছেন? তারা আপনার কাছে তাদের ন্যায়নিষ্ঠ ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা পূরণের বাসনা রাখে। তারা আপনার কাছে দয়ার আশা করে এবং নম্র এবং সুন্দর আচরণ কামনা করে। তারা আপনাকে ঘৃণা করবে তাদের অনুভূতিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এবং ঘরকে অন্ধকার করে রাখার জন্য যেখানে কোন সুখের ঝলকই নেই। আপনি কী জানেন তারা কতটা ভুগবে আপনার এই অপ্রীতিকর এবং কঠোর আচরণের দ্বারা? এমনকি আপনি যদি আপনার পরিবারকে অতটা গুরুত্বসহকারে নাও নেন, অন্ততপক্ষে নিজেকে একটু দয়া করুন। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে- আপনি এমন বদমেজাজী হওয়ার দরুন নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন।

কীভাবে আপনি আপনার কাজকর্ম চালিয়ে যাবেন আর কিভাবেই বা আপনি কোনকিছুতে সাফল্য লাভ করবেন? কেন আপনি আপনার ঘরকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলছেন? এটাই কী ভালো নয় যে আপনি সবসময় সুখে থাকবেন এবং ক্রোধের দ্বারা নয় বরং প্রজ্ঞার দ্বারা নিজের সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করবেন? আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন না যে- রাগ আপনার সমস্যাকে সমাধান করতে পারে না বরং এটা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়? আপনি কি একমত হবেন না যে, যখন ঘরে থাকবেন, আপনার বিশ্রাম নেয়া উচিত এবং শক্তি সঞ্চয় করা উচিত যাতে আপনি প্রশান্ত মন দ্বারা একটা উপযুক্ত সমাধান খুঁজে পান?

আপনার হাসিমুখের সাথে আপনার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা উচিত। আপনার তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করা উচিত সুন্দরতম উপায়ে এবং পরিবারে একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা উচিত। আপনার উচিত তাদের সাথে পানাহার করা, বিশ্রাম নেয়া। এভাবে আপনি এবং আপনার পরিবার সুখের ছোঁয়া পাবে এবং আপনি বিভিন্ন সমস্যাকে খুব সহজেই সমাধান করতে পারবেন। তাই পবিত্র জীবন বিধান ইসলাম ধর্ম ঈমানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি নিদর্শন হিসেবে সদাচরণের ওপর জোর দিয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
অর্থ : “যার আচরণ যত ভালো তার ঈমান তত বেশি পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কল্যাণ করে।”

লুকমান হাকিম বলেন-
“একজন জ্ঞানীলোকের অবশ্যই পরিবারের সাথে শিশুসুলভ আচরণ করতে হবে, এবং পুরুষোচিত আচরণ ঘরের বাইরের জন্য রাখতে হবে।”

টিকাঃ
* বায়হাকি, হাদিস নং: ৬৬৫৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px