📄 বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের করণীয়
"We have no eternal allies, and we have no perpetual enemies. Our interests are eternal and perpetual, and those interests it is our duty to follow" - Lord Palmerston
ভূমিকা: শুধু ১৯৬২ সালে ভারতের সাথে একটি যুদ্ধ ব্যতীত উল্লেখযোগ্য বৃহৎ আকারের আর কোনো যুদ্ধে এ পর্যন্ত জড়িত হয়নি চীন। তাই ১৯৬২ তে ভারতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া চীনের কাছে একটি স্মরণীয় ব্যাপার। সেই যুদ্ধের এক দশকের মাথায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান করায় চীনের কাছে সেটি পছন্দ হয়নি। চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং এটিকে পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে আখ্যা দেয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদের জন্য আবেদন করলে ১৯৭২ সালের ১০ আগস্ট চীন সেখানে ভেটো দেয়। এমনকি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মাওলানা ভাসানী চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। অবশেষে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। তখন চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং চুয়াত্তরের বন্যায় চীন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে সাহায্য প্রদান করে। তারপর ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর চীন বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর এদিনই চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে আমাদের একটি দূতাবাস এবং হংকং ও কুনমিংয়ে কনস্যুলেট রয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম সহযোগী মিত্র। আমাদের বৃহত্তম আমদানি বাজার হচ্ছে চীন।
একুশ শতকে কেমন হওয়া উচিত বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পামারস্টোনের একটি উক্তি আছে- "আমাদের কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই, এবং নেই কোনো চিরস্থায়ী শত্রু। আমাদের স্বার্থই কেবল চিরস্থায়ী, আর আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই স্বার্থ অনুযায়ী চলা।” এই উক্তিটি আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যথার্থ। কারণ পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা। একাত্তরে চীনের ভূমিকা ছিল হতাশাজনক এবং একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসেও চীনের ভূমিকা একটি কারণে আমাদের জন্য দুঃখজনক। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ চীনকে পাশে পাচ্ছে না। চীনের অবস্থান বার্মিজ সেনাদের পক্ষেই। তারপরেও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশের কাছে চীনের বিকল্প নেই। ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বার্থে; কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রাধান্য একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। ঠিক এজন্যই অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবে চীনকে আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশি দেশ। বাংলাদেশ থেকে চীনের সীমান্ত খুব বেশি দূরে নয়। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে আসলে "ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক" নতুন দিকে মোড় নেয়। চীনা প্রেসিডেন্ট সোনাদিয়া কিংবা পায়রায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের কথা বিবেচনা করে কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে এই দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারতের থেকে চীনের অবস্থান ভিন্ন। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে চীনের তেমন আগ্রহ নেই, চীনের আগ্রহ শুধু বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে। চীনের আগ্রহ আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে।
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় ও কলম্বোতে চীনের অর্থায়নে দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে চীনা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বন্দরগুলো পরিচালিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে- হাম্বানটোটায় দায়িত্ব ও মালিকানার প্রায় নব্বই ভাগই চীনের হাতে, তাহলে শ্রীলঙ্কার লাভ কি? প্রথমত, আমার যেখানে সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আর্থিক সক্ষমতা নেই, যেখানে আমাদের দক্ষ জনশক্তি নেই, সেখানে চীন নিজে অর্থায়ন দিয়েছে এবং বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছে। তাই চীনের মালিকানা থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই এটিকে Big Game হিসেবে দেখা উচিত না। আমার সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চীনের থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নেওয়াটাই মুখ্য। যে হাম্বানটোটা আগে জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল তা আজকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরে পরিণত হয়েছে। এতে শ্রীলঙ্কারও লাভ কম হয়নি।
বর্তমানে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর বাণিজ্যের জন্য অতটা উপযোগী নয়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে বড় বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। তাই ছোট ছোট জাহাজে পণ্য আনতে হয়। বড় জাহাজগুলো চট্টগ্রামে পণ্য খালাস করতে বেগ পেতে হয়। ফলশ্রুতিতে সময়ের অপচয় হয় প্রচুর। তাই সোনাদিয়া কিংবা পায়রায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে বড় বড় জাহাজে পণ্য নিয়ে আসা যাবে, সময়ও বেঁচে যাবে, চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপও কমে যাবে অনেক। কিন্তু চীনের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশ দেবে কি না সেটাও দেখার বিষয়। কারণ এতে আপত্তি তুলতে পারে ভারত। ভারত চাচ্ছে না তার কোনো মিত্র রাষ্ট্র চীনের সাথে ওঠাবসা করুক। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য ব্যবহৃত মোট সমরাস্ত্রের ৭৫ ভাগ চীন থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে। ট্যাংক থেকে শুরু করে ফাইটার প্লেন, সাঁজোয়া যান ইত্যাদি চীন থেকে ক্রয় করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ 'এমএফ-৯০' ক্ষেপণাস্ত্রও চীন থেকে ক্রয় করেছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর জন্য চীন থেকে 'নবযাত্রা' ও 'জয়যাত্রা' নামে দুইটি সাবমেরিন ক্রয় করে। চীনের সাথে বাংলাদেশের এমন অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপনের কারণে প্রতিবেশি অনেক দেশের মাথাব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই সরকারকেও এসব বিষয়ে দক্ষতার সাথে ব্যালেন্স করতে হচ্ছে।
গোটা পৃথিবীই অর্থনৈতিক স্বার্থের উপর চলছে। বৈশ্বিক রাজনীতি এখন অর্থনৈতিক রাজনীতি। চীনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্যই হচ্ছে চীন থেকে সহযোগিতা নিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অর্থনৈতিক দিক থেকে চীন ও ভারতের মধ্যে কে শক্তিশালী? বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য চীন ও ভারতের মধ্যে কার সক্ষমতা বেশি? উত্তর যদি হয় চীন তাহলে বলব বেইজিং এর সাথে ঢাকার সম্পর্ক উন্নয়নে নয়াদিল্লি যদি কিছুটা বিরাগভাজনও হয় তাতে আমাদের বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। স্বার্থ ছাড়া একুশ শতকে সম্পর্ক হয় না। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পেছনে চীনেরও স্বার্থ রয়েছে। চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ অংশীদার। বাংলাদেশ চীনের এই প্রকল্পটিতে স্বাক্ষর করে ২০১৬ সালে। তবে আমাদের কূটনৈতিক অদক্ষতার জায়গাটি এই জায়গায় যে, ভারত ও চীন উভয়ই বাংলাদেশকে যা দিচ্ছে তার থেকে অধিক পরিমাণে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারত উভয়ের সাথেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। এবিষয়ে ঢাকাকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে। চীন হয়তোবা ভবিষ্যতে পুনরায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। সে দিকেও বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা চীনা পণ্যে দেশীয় বাজার সয়লাব হওয়ার একটি শঙ্কা তৈরি হতে পারে। যার প্রভাব পড়বে আমাদের ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রিগুলোর উপর।
প্রথমত, চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের একটি পরোক্ষ সুবিধাও রয়েছে। এতে করে ভারতের সাথে বাংলাদেশের Bargaining Power বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হবে যদি বাংলাদেশ সেটি কাজে লাগাতে পারে। দ্বিতীয়ত, কাপড় ও যন্ত্রপাতির মতো পণ্যগুলোর প্রায় সবই চীন থেকে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশ চীনে যে পরিমাণ রপ্তানি করে তার থেকে ১২ গুণ বেশি চীন থেকে আমদানি করায় আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি ব্যাপক। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, চীন বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশ সে তুলনায় চীনা বিনিয়োগ আনতে পারছে না। "চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে" শুধু এতটুকুতেই থেমে থাকলে হবে না। চীনের সাথে কূটনৈতিক দক্ষতায় ঢাকাকে আরও কৌশলী হতে হবে। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে আসলে চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে। চুক্তি বাস্তবায়নে তৃতীয় পক্ষ থেকে কোনো বাঁধা আসলে আমাদের ডিপ্লোমেটিক ক্যাপিটাল ব্যবহার করে সেই বাঁধা অতিক্রম করতে হবে। চতুর্থত, রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল, এক্সেসরিজ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের উপর বাংলাদেশের নির্ভরতা অনেক হলেও ভূরাজনৈতিক কারণে চীনেরও প্রয়োজন বাংলাদেশকে। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার মাধ্যমে চীন পৃথিবীব্যাপী পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চীনের আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে "মুক্তার মালা নীতি” (string of pearls)। "স্ট্রিং অব পার্লস” হলো চীনা নৌবাহিনীর ভূকৌশলগত একটি পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় চীনা নৌবাহিনী সমুদ্রপথে হংকং থেকে শুরু করে পোর্ট সুদান পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন তেল আমদানি করার জন্য একটি "সী কমিউনিকেশন চ্যানেল” তৈরি করতে চায়। এই যাত্রা পথে যে দেশগুলোর অবস্থান সেখানে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে এবং করতে চাচ্ছে; যা ম্যাপের আকারে অনেকটা মুক্তার মালার ন্যায়। এই মুক্তার মালার অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি চেক পয়েন্ট হচ্ছে- বাব এল মান্দেব (লোহিত সাগর), হরমুজ প্রণালি (ইরান), মালাক্কা প্রণালি (মালয়েশিয়া), লম্বোক প্রণালি (ইন্দোনেশিয়া), পক প্রণালি (শ্রীলঙ্কা), গোয়াদর বন্দর (পাকিস্তান), দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ, হাম্বানটোটা (শ্রীলঙ্কা), চট্টগ্রাম (বাংলাদেশ), সিটাওয়ে ও রেঙ্গুন (মায়ানমার)। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, উপরিউক্ত অধিকাংশ চেকপয়েন্টগুলোতে ইতোমধ্যে চীনের আধিপত্য প্রতীয়মান। তাই Pearl Trade Policy বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে প্রয়োজন চীনের। তাই বাংলাদেশের এই কৌশলগত গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে চীন থেকে আমাদের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ আদায় করে নিতে হবে।
পঞ্চমত, ভারত মহাসাগর হয়ে বর্তমানে নয়াদিল্লি, মুম্বাই কিংবা অন্যান্য ভারতীয় শহরে চীনা পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ১৪/১৫ দিনের সমুদ্রযাত্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের পায়রা বন্দর দিয়ে চীন তাদের পণ্য কুনমিং বন্দর থেকে সহজেই পায়রার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে পারে। তবে বাংলাদেশের পায়রা বন্দরে চীনা বিনিয়োগের বিষয়টি নয়াদিল্লি ভালো চোখে দেখছে না। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে পায়রা সমুদ্রবন্দরের স্বত্বাধিকারী কারো হাতে না দিয়ে চীনকে এখানে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া। বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশের হাতে রেখে উইন-উইন চুক্তিতে যেতে হবে। তা-না হলে চীনের Debt Trap এ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ নিয়ে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের মধ্যে দুজন হচ্ছে ফরেস্ট কুকসন ও টম ফেলিক্স জোয়েনক। "China and India's geopolitical tug of war for Bangladesh” এই শিরোনামে লেখক কুকসন ও টম ফেলিক্স অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইস্ট এশিয়া ফোরামে' একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ নিয়ে চীন এবং ভারতের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ। তাদের মতে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশকে প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি হচ্ছে, ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্সের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের সহায়তা ভারতের আবশ্যক। রাজনৈতিক বিষয়টি হচ্ছে, বাংলাদেশের মধ্যে চীন বা অন্য কোনো পরাশক্তির উপস্থিতি ভারতের জন্যও অস্বস্তিকর। লেখক ফরেস্ট কুকসনের মতে, ধর্মীয় কারণটি হলো ভারত মনে করে বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অন্যদিকে চীনের সাথে বাংলাদেশের সীমানা না থাকলেও চীনের বাংলাদেশকে প্রয়োজন তার আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক কারণে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ বাংলাদেশ। ভারত চাচ্ছে বাংলাদেশ যেন চীন থেকে সামরিক অস্ত্র ক্রয় করার পরিবর্তে ভারত থেকে ক্রয় করে। কিন্তু ভারতের সামরিক অস্ত্রের মান নিয়ে বাংলাদেশের সন্দেহ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন কুকসন। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাথে। চীনের তুলনায় ভারত যেদিকে এগিয়ে আছে, তা হলো বাংলাদেশের উপর ভারতের সাংস্কৃতিক প্রভাব। এর বিপরীতে চীনের সাংস্কৃতিক প্রভাব নগণ্য। ঢাকায় চীন একটি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে চীনা ভাষা শেখানো হয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুটি দেশই সুবিধেজনক অবস্থানে আছে। দুটি দেশ বাংলাদেশকে যা দিচ্ছে তার চেয়ে বহুগুণ নিয়ে যাচ্ছে। ফরেস্ট কুকসন ও টিম ফেলিক্সের গবেষণায় উঠে এসেছে চীন বাংলাদেশে রপ্তানি করে প্রায় ১৬ হতে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে এত পরিমাণ রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশে থেকে চীন আমদানি করে মাত্র ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশকে চীন বাৎসরিক একশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২৪ বিলিয়ন বা দুই হাজার চারশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। চীনের বিপরীতে ভারত বাংলাদেশে বাৎসরিক রপ্তানি করে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু আমদানি করে মাত্র ২৬ কোটি ডলারের। তাছাড়াও ভারতের অনুকূলে দুদেশের মধ্যে অনেক Informal Trade বা অবৈধ বাণিজ্য হয়। এর পরিমাণ কমপক্ষে দুই হতে তিন বিলিয়ন ডলারের সমান হবে বলে উল্লেখ করেন কুকসন। বাংলাদেশে যে-সকল ভারতীয় নাগরিক কাজ করেন তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও দুই হতে চার বিলিয়ন ডলারের মতো। ভারত বাংলাদেশকে বছরে ১৫ কোটি ডলারের বৈদেশিক সহায়তা করে। কুকসনের দাবি যত অর্থ তারা বাংলাদেশকে ঋণ দেয়, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি অর্থ তারা নিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে, সমুদ্রবন্দর স্থাপনে ও রেল প্রকল্পে চীন ও ভারত উভয়ের সমান আগ্রহ রয়েছে। অবকাঠামো খাতে চীন-ভারতের এই প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ খুব একটি লাভবান হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারিং এবং জ্বালানি খাতে চীন বা ভারত, কেউই বড় কোনো বিনিয়োগে যায়নি। তারা শুধু আগ্রহ দেখায়।
ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এই ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ কোনো নিস্ক্রিয় ভিক্টিম (passive victim) নয়, বরং নিজের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এটি থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বলছেন, বাংলাদেশও বুঝতে পেরে গিয়েছে যে, দুটি দেশই আসলে বাংলাদেশকে যা দেয়, তার উল্টো অনেক বেশি নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের অবকাঠামো এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্পগুলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় খুব নিম্নমানের। কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক তাদের প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশকে দেখিয়ে দিয়েছে চীন এবং ভারত আসলে কেবল 'সুদিনের বন্ধু' (Fair-Weather Friends)। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যে-কোনো পদক্ষেপ চীন আটকে দিচ্ছে। এটাকে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো কাজ বলে মনে করে না। অন্যদিকে ভারতের অবস্থাও বাংলাদেশের অনুকূল নয়। বাংলাদেশ তাদের আচরণকে 'Unfriendly Act' হিসেবে বিবেচিত করেছে। তারাও এই ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে দুই দেশের বাণিজ্য নীতি। দুটি দেশের কোনোটিই নিজেদের স্বার্থ ব্যতীত বাংলাদেশকে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় এখনো পর্যন্ত দিচ্ছে না। বরং দুটি দেশই বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যাপক 'আন্ডার ইনভয়েসিং' এর সুযোগ দিচ্ছে, যেটি কি না বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মনীতির লঙ্ঘন। "Under-Invoicing" এই টার্মটির মানে হচ্ছে, নিজ দেশের পণ্যদ্রব্য অন্যদেশে রপ্তানি করার সময় এমন ভাব নেওয়া যেন প্রকৃত মূল্য থেকেও আরও কম মূল্যে পণ্য সাপ্লাই দিচ্ছি। কিন্তু দেখা যায় প্রকৃত মূল্যের থেকেও অনেক বেশি মূল্য নিয়ে নেওয়া হচ্ছে রপ্তানিকৃত দেশ থেকে। তাই আন্ডার ইনভয়েসিং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনৈতিক। যত অর্থ তারা বাংলাদেশকে ঋণ দেয়, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি অর্থ তারা নিয়ে নেয় এভাবে। উপসংহারে তারা বলেছেন, চীনের অর্থনীতি ভারতের তুলনায় অনেক বড়। বাণিজ্যেও ভারত থেকে চীন এগিয়ে। কাজেই বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য চীন যদি কোনোদিন তাদের বাজার খুলে দেয়, এই চীন-ভারত দ্বন্দ্বে সুস্পষ্টভাবেই চীন জয়ী হবে, আর বাংলাদেশও ঝুঁকে পড়বে চীনের দিকেই। (বিস্তারিত দেখুন: China and India's geopolitical tug of war for Bangladesh, East Asia Forum, 11 April 2018)
ডেট ট্র্যাপ ডিপ্লোমেসি ও বাংলাদেশ
"There are two ways to conquer and enslave a country: One is by the sword; the other is by debt." - John Adams
জন এডামসের বিখ্যাত এই উক্তিটি বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে খুব বেশি প্রাসঙ্গিক। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপের পর উগান্ডা হতে যাচ্ছে চতুর্থ রাষ্ট্র যে কি না চীনের Debt Trap বা ঋণের ফাঁদে পড়েছে। পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কেনিয়া, সুদান, জিবুতি, ইথিওপিয়া, লাওস ও কম্বোডিয়া ঋণের ফাঁদে পড়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে। আরও অসংখ্য রাষ্ট্র চীনের Debt-trap diplomacy'র শিকার হতে যাচ্ছে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সহযোগিতায় 'ঋণ' হয়ে উঠেছে কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫০টি দেশ চীনের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে ঋণ নিয়েছে। বর্তমানে উগান্ডা সবচেয়ে বড় ন্যাশনাল ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটির সাথে চীনের একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীনা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে ২০৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণ নিয়েছিল উগান্ডা সরকার। এখন সেই লোন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে উগান্ডা। তাই শর্তানুযায়ী উগান্ডার একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর 'এন্টেবা এয়ারপোর্ট' চীনের দখলে চলে যাচ্ছে।
যদিও উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইউয়েরি মুসেভিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং বিমানবন্দরের উপর অধিকার ধরে রাখতে চীনের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, আমার মনে হয় তিনি খুব বেশি সফল হবেন না। চীনের হাতে হাতছাড়া হয়ে যাবে দেশের একমাত্র এন্টেবা এয়ারপোর্ট। কারণ এই এয়ারপোর্ট চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি অংশ। চীন ইতোমধ্যে বিশ্বের মোট ১৬৩টি দেশে রাস্তা, সেতু, বন্দর ও হাসপাতাল তৈরিতে বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮৪,৩০০ কোটি ডলার) বিনিয়োগ করেছে। এই তালিকায় আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকা সব অঞ্চলই রয়েছে। এই অর্থের অধিকাংশই হচ্ছে চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে আসা। বিশ্লেষকরা যাকে “ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ ঋণের ফাঁদে ফেলে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র ও বিমানবন্দর কজায় নেওয়া চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' প্রকল্পেরই একটি কৌশল। ঋণের ফাঁদে ফেলে কোনো একটি রাষ্ট্রকে নিজের ছায়াতলে নিয়ে আসাকেই Debt Trap Diplomacy বলা হয়। পাকিস্তানে 'চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর' (যেটিকে সংক্ষেপে সিপেক বা সিপিইসি বলে) ও গোয়াদর সমুদ্রবন্দর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও কলম্বো চায়নিজ সিটি, মালদ্বীপের আন্তঃদ্বীপ যোগাযোগ সেতু, মিয়ানমারের কিয়াকফ্যু গভীর সমুদ্রবন্দর ও তেল-গ্যাস পাইপলাইন- ইত্যাদি সবগুলোই চীনা ঋণের ফাঁদের টেক্সটবুক উদাহরণ। শ্রীলঙ্কা তার হাম্বানটোটা বন্দরটি চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে। ছোট রাষ্ট্রগুলো এটি থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বিপদে পড়তে হবে। চীনের এসব ঋণকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে “China's Leverage" বা "চীনের উদ্দেশ্য হাসিল করার মাধ্যম"।
ব্রেটনউডস প্রতিষ্ঠানসমূহের ঋণ প্রকল্পের সাথে চীনা ঝণ প্রকল্পের পার্থক্য
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে এরকম ঋণের ফাঁদে ফেলেছিল। যদিও এখনো তার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এএফডিবি, সিডিবি ও আইডিবি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলে সেখানে আধিপত্য বিস্তার করার। এখন একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ভূরাজনৈতিক আধিপত্য মোকাবিলায় একই কাজটি চীন করছে একটু ভিন্ন ওয়েতে ও আকর্ষণীয়ভাবে। চীন তার বিশ্ব আধিপত্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইউটিলিটি, টেলিযোগাযোগ, মহাসড়ক, রেলপথ, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট, খনিজ আহরণ প্রকল্প ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। নিজেদের অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তবতায় দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো সহজ শর্তে এসব ঋণ লুফে নেওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারছে না। এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সমর্থন পেয়ে ঋণগ্রহীতা অনেক দেশ তাদের দেশে চীনা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও মেনে নিচ্ছে। নিজেদের সার্বভৌমত্ববিরোধী নানা সুবিধা চীনকে দিতে বাধ্য হচ্ছে। মহাদেশজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্যই নয়, এইসব অঞ্চলে থাকা বিশাল চীনা বিনিয়োগকে রক্ষা করার জন্যও বটে।
অনুন্নত দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলে তাদেরকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসার যে কৌশলটি তা প্রথম প্রবর্তন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলটি বাস্তবায়ন করার জন্য অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে ব্রেটনউডসের প্রতিষ্ঠানসমূহ (বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ)। নব্বইয়ের দশকে চীনকে বলা হতো "Sleeping Giant" বা "ঘুমন্ত দানব"। তবে বর্তমান একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে চীন এখন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার চেষ্টার যে কৌশল সেটিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যই চীনও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের প্রকল্পকে বেছে নিয়েছে। চীনের এই ঋণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে চীনা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-সহ আরও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। চীনের এই নয়া ঋণ কৌশলের মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে হাতে নিয়েছে "Built Back Better World" পলিসি। এই যে অনুন্নত দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে ঋণ প্রদানের যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে তাকে "Infrastructure War" হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ব্রেটনউডস প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রদান পদ্ধতির সাথে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রদান পদ্ধতির তফাত কোথায়? কেন উন্নয়নশীল দেশগুলো চীনা ঋণের প্রতি ঝুঁকে যাচ্ছে। প্রথমত, বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ শর্তের তুলনায় চীন অনেক সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে। যার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো চীনের থেকে ঋণ গ্রহণে বেশি উৎসাহী হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বাংলাদেশের পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক নানামুখী শর্তারোপ করলে বাংলাদেশ তখন চীনমুখী হয়। দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংক সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ দিয়ে থাকে। অন্যদিকে চীন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ দিয়ে থাকলেও তার পরিমাণটি থাকে বিশ্ব ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশ চীনা ঋণের ফাঁদে পড়বে কি না
এখন একটি প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশ এই ফাঁদে পা দেবে কি না? বাংলাদেশ সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের ঋণ সহায়তা নিয়েছে। তার কয়েকটি উদাহরণ হলো-
• কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বাংলাদেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ চীনা অর্থায়নে স্থাপিত হচ্ছে যার দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৪০০ মিটার।
• পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিতব্য ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে চীন বিনিয়োগ করেছে ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো।
• পদ্মা বহুমুখী সেতুতে রেল সংযোগের কাজ করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনা রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (CIC)। এ প্রকল্পে ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক。
• প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মানাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল প্রকল্পের অর্থায়ন করেছে চীন।
• ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় ঢাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি প্রকল্পে চীন বিনিয়োগ করেছে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা।
• ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার বিশাল অর্থায়ন করছে চীন।
উপরের উদাহরণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ও অর্থায়নের পরিমাণ কতটা ব্যাপক। বাংলাদেশ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে চীনা বিনিয়োগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্রহীতা। আর পাকিস্তান হচ্ছে এই তালিকায় প্রথম। তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো বাংলাদেশের পায়রা বন্দরের নিয়ন্ত্রণও চীনের হাতে চলে যেতে পারে। বলে রাখা জরুরি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। দক্ষতার সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের ব্যবস্থাপনা করায় বাংলাদেশ চীনা ঋণের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা খুবই কম বলে মত দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকালে যে ২৭টি প্রকল্পে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা হয়েছিল সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশ যথেষ্ট সচেতন।
বাংলাদেশ চীন থেকে ঋণ গ্রহণে একটি কূটনৈতিক চতুরতা (Diplomatic Manoeuvre) দেখিয়েছে যাতে চীন কোনো একটি প্রকল্পে তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। পায়রা বন্দর চীনের দখলে যে চলে যাবে না তার অন্যতম কয়েকটি কারণও রয়েছে। প্রথমত, সম্পূর্ণ বন্দরের দায়িত্ব বাংলাদেশ চীনের হাতে তুলে দেয়নি। পায়রা বন্দরটি সফলভাবে বাস্তবায়ন এবং ঋণের ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য সরকার সম্পূর্ণ বন্দরের কাজটি বিভিন্ন ইউনিট বা কম্পোনেন্টে ভাগ করেছে। যেমন- বন্দরের ড্রেজিং কাজে বাংলাদেশ নিজে অর্থায়ন করছে, ভারত একটি টার্মিনাল নির্মাণে অর্থায়ন করছে, কিছু কম্পোনেন্ট জাপান, কিছু কম্পোনেন্ট চীন, কিছু আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশ তার অধিকাংশ বড় প্রকল্প কোনো একটি একক দেশের উপর ছেড়ে না দিয়ে বিভিন্ন দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তার মানে চীন কখনোই এসে দাবি করতে পারবে না যে, বন্দরটি আমাকে দিয়ে দাও। কারণ এখানে চীন ছাড়াও আরও অনেক দেশের বিনিয়োগ বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর তথ্যমতে, একটি দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ যখন ঐ দেশের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশের বেশি ছাড়িয়ে যায় তখন সেটি বিপজ্জনক (Danger Mark)। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক লোনের পরিমাণ মোট জিডিপির ১৫ শতাংশ। তথা বাংলাদেশ Safe Zone এ অবস্থান করছে। তাই বলা যায় বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা নেই। তৃতীয়ত, অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে বাংলাদেশ যাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ গ্রহণ করে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপানের প্রতিষ্ঠান জাইকা চীন, রাশিয়া ও ভারত থেকে। অর্থাৎ তথ্যগুলো থেকে এটি পরিষ্কার যে, ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভিন্ন ভিন্ন স্টকহোল্ডারের দ্বারস্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো একটি একক রাষ্ট্রের উপর ঝুঁকে পড়েনি। তাছাড়াও পায়রা বন্দরের নজরদারির দায়িত্ব বাংলাদেশ তার নিজের হাতে রেখেছে। শ্রীলঙ্কা যেটি করেছে তা হলো সম্পূর্ণ বন্দরের নজরদারির দায়িত্ব চীনের উপর ছেড়ে দিয়েছিল।
তাই একটু কৌশলী হলে একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে নেওয়া ঋণের চাপে পড়ার আশঙ্কা খুবই কম। তবে এটির একটি ফ্লিপ সাইডও রয়েছে। কারণ একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশকে একসাথে অন্তর্ভুক্ত করলে প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি আসে না। তারপরেও চীন যেহেতু বাংলাদেশের অনেক মেগা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করছে তাই 'ঋণের ফাঁদ' বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ চীন এগুচ্ছে “Machiavellian Strategy” নিয়ে। এই স্ট্র্যাটেজির মানে হচ্ছে একটি রাষ্ট্র দখলের এমন একটি পদ্ধতি যেখানে দখলকৃত রাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে বুঝতেই পারবে না যে তাকে দখল করার প্রক্রিয়া চলমান। তবে আমরা আশাবাদী যে, আগামীর দিনগুলোতে বাংলাদেশ দক্ষতার সাথেই এসব বিষয় মোকাবিলা করবে।
Question to think about?
চীন বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যে পরিমাণে বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশ সে-তুলনায় আশানুরূপ চীনা বিনিয়োগ আনতে পারছে না। এমন পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে চীনের সাথে বাংলাদেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কীভাবে বাড়ানো যায় বলে আপনি মনে করছেন? দ্বিতীয়ত, চীন এবং ভারত উভয়ের সাথেই বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। তাই এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Winston, Rachel A. (2021), Belts and Roads Under Beijing's Thumb: Economic Domination & Debt-Trap Diplomacy, Lizard Publishing
2. McMahon, Dinny (2018), China's Great Wall Of Debt: Shadow Banks, Ghost Cities, Massive Loans, and the End of the Chinese Miracle, Harper Business
3. Church, Sally K. (2004), The Giraffe of Bengal: A Medieval Encounter in Ming China, The Medieval History Journal
4. Hellström, Jerker (2009), China's Emerging Role in Africa: a Strategic Overview, Swedish Defence Research Agency
5. Wyatt, Don J. (2009), The Blacks of Premodern China. Encounters with Asia, University of Pennsylvania Press
6. Garver, John W. (2018), China's Quest: The History of the Foreign Relations of the People's Republic, comprehensive scholarly history
7. Yahuda, Michael (2016), End of Isolationism: China's Foreign Policy After Mao, Macmillan International Higher Education
📄 বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
Theme: From a Nation to a State
পূর্বপাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপট
দীর্ঘ দুইশো বছর শাসন করার পর, ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ত্যাগ করার সময় সিদ্ধান্ত নিল ধর্মের ভিত্তিতে দুটি দেশ গঠিত হবে। হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে ভারত, আর ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ইন্ডিয়ান 'ইন্ডিপেন্ডেন্স এ্যাক্ট' এ ভারতবর্ষের দুটি প্রধান মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল (পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান) নিয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয়। অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নামের এই দুটি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হলো 'পাকিস্তান' নামের স্বাধীন একটি দেশ। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব ছিল ১২শো মাইলেরও বেশি এবং এই দুই পাকিস্তানের মধ্যখানে ছিল বিশাল ভারত। সেই পশ্চিম পাকিস্তানে বসেই পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন করা হতো। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ। হাজার হাজার মাইল দূরত্বের এই দুই পাকিস্তানের মধ্যে শুধু ধর্ম ছাড়া আর কোনো মিল ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ছিল উর্দু, আর পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা ছিল বাংলা। ভাষাগত অমিল-সহ নানা বৈষম্যের কারণে দুই পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে এবং দুই পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ছিল না। যে-কারণে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতাও সেখানেই কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা-সহ রাষ্ট্রের সমস্ত সেক্টরে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা পদে পদে বৈষম্যের শিকার হয়।
দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য
পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে উভয় পাকিস্তানের মাথাপিছ আয় ছিল প্রায় সমান কিন্তু বৈষম্যের কারণে ১৯৭০ সালের দিকে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষদের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগের অভাবে শত শত স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়, অথচ পশ্চিমে বেড়ে গিয়েছিল তিন গুণ। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে, সেনাবাহিনীর উচু পদে বাঙালিদের নিয়োগ পাওয়া খুব কঠিন ছিল। বড় বড় সকল কলকারখানা গড়ে তোলা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। অবহেলায় পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল পশ্চিমের কলকারখানার কাঁচামালের যোগানদাতা এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রধান ক্রেতা। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ব্যবহার করা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য। এসকল বৈষম্যের কারণেই বাঙালিরা নিজেদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করে।
আওয়ামী লীগের উত্থান
ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে কতগুলো রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছিল। হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কংগ্রেস নামের রাজনৈতিক দলটি ছিল সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। তাই ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কংগ্রেস ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিল। আর মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মুসলিম লীগ নামের এই রাজনৈতিক দলটি ছিল অন্যতম। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর মুসলিম লীগ হয়ে উঠে পাকিস্তানের ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী। মুসলিম লীগের প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হন। মুসলিম লীগের প্রায় সব নেতারাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। তাই মুসলিম লীগের রাজনীতির বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা শক্তিশালী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি রাজনৈতিক দল গঠনের আলোচনা শুরু করে, যার প্রেক্ষাপটে প্রথমে ছাত্রলীগ (১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি) এবং পরে আওয়ামী মুসলিম লীগ (১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন) গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের জন্য দলের নামকরণ করা হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ'। সেই সঙ্গে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনের নাম রাখা হয় 'নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ', যার সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি কেটে দলের নাম রাখা হয় আওয়ামী লীগ। অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এই আওয়ামী লীগ হয়ে উঠে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র আস্থা।
ভাষা আন্দোলন
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে আসছিল। পাকিস্তান সরকার এ যৌক্তিক দাবির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ শুরু হয়। এ প্রতিবাদে পুনরুজ্জীবিত হয়েই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্ররা একত্রিত হয়। পুলিশ এ জনসমাবেশের উপর গুলি চালানোর ফলে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকেই শহীদ হয়। আর এটাই ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিত লাভ করে।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন
প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে পাকিস্তানকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল। সিন্ধু, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও বেলুচিস্তান এগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তান অংশের প্রভিন্স বা প্রদেশ। আর পূর্ব পাকিস্তান পুরোটা মিলে ছিল একটি প্রদেশ। ১৯৫৪ সালে প্রদেশগুলোতে নির্বাচন আয়োজন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের এই প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক নির্বাচনে দুটি দল দাঁড়ায়। একটি হলো কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ, আরেকটি হলো পূর্ব পাকিস্তানের সবগুলো দল একজোট। করে আওয়ামী লীগ পর্যন্ত ইত্যাদির মধ্যে একটি ভাঙন তৈরি হয়েছিল। এমনকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চরমপন্থি কিছু রাজনৈতিক দলের উত্থান হয়। বিভিন্ন জায়গায় হত্যা, সন্ত্রাস, দেশের সম্পদ লুটপাট ইত্যাদি ছিল নিয়মিত ঘটনা। ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দলের উত্থান হলে বাংলাদেশে তখন একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এরকম নৈরাজ্যময় পরিস্থিতিতে দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের সবগুলো রাজনৈতিক দল নিয়ে শুধু একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। আর এই অভিন্ন প্লাটফর্মটি 'বাকশাল' হিসেবে পরিচিত।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড এবং কিছু ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
অবশেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিয়দংশ এবং স্বীয় দলের কিছু রাজনীতিবিদের ষড়যন্ত্রে সংঘটিত অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে ছিল ভারত ও রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। সময়টি যেহেতু ছিল কোল্ড ওয়ার পিরিয়ড তাই সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষ নেওয়ায় স্বভাবগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল। তাই বাংলাদেশের জয় মানেই এই অঞ্চলে রাশিয়ার জয় হয়েছে বলে মনে করত মার্কিনীরা। তৎকালীন মার্কিন সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের বিদেশি শত্রুর তালিকায় যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম তিনজন হলো চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে, ভিয়েতনামের থিউ এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে কিসিঞ্জার তার ব্যক্তিগত পরাজয়ের শামিল ছিল বলে মনে করেন। তাই বলা হয় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সাথে বিদেশি (আমেরিকার) ষড়যন্ত্রও ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নীলনকশায় আমরা লরেন্স লিফশুলজের সেই Track I এবং Track II পলিসির কথা স্মরণ করতে পারি। দ্বিতীয়ত, ১৯৭৩ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরায়েলের একটি যুদ্ধ হয়, যেটা "আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ” নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গিয়ে আরবদের সমর্থন দিয়েছিল। আরবদের প্রতি সমর্থন এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মিশরে চা উপহার পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশের পাঠানো উপহারের কথা ভুলেননি। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিশরের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসেন। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ৩০টি ট্যাংক উপহার দিয়েছিলেন। আনোয়ার সাদাতের দেওয়া উপহার সেই ট্যাংক দিয়েই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র পাঁচ বছর পরেই মিশরের আনোয়ার সাদাতকেও হত্যা করা হয়। ঠিক এই কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে যে বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল সেটাও স্পষ্ট।
নৈরাজ্যময় এক বাংলাদেশ
বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরবর্তী ৩ মাসে রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থান চলতে থাকে, যার পরিসমাপ্তিতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়ার হাত ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল কিছুটা সোভিয়েত ঘেঁষা। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী এমন রাষ্ট্রনেতাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর ভালো বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান এর শাসনামলে বাংলাদেশ পূর্বের পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে সোভিয়েত বিরোধী জোটগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার চেষ্টা করে। ১৯৮১ সালে জিয়া চট্টগ্রাম সফরের সময় আরেকটি অভ্যুত্থানে নিহত হন। চট্টগ্রামে সেনা অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্রের পুনরুত্থান
তারপর ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতবিহীন আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এরশাদের আমলে ১৯৯০ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশ ইরাকের বিরুদ্ধে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়। তখন বাংলাদেশের সেনারা প্রথমবারের মতো কোনো বৈদেশিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তার শাসনামলেই বাংলাদেশ থেকে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এরশাদ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন। ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সহ বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো একসাথে হয়ে সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই গণ অভ্যুত্থানের তোপে পড়ে এরশাদ ক্ষমতা ত্যাগ করলে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নব্বই পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদল
১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই পনেরো বছরের মিলিটারি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দল বিএনপি জয়ী হয় এবং দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল হতে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং দলনেতা হিসেবে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি পুনরায় জয়ী হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ২০০৬ সালে যখন জাতীয় নির্বাচনের সময় আসে তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে নিজেই ক্ষমতা দখল করে নেন। পরবর্তীতে জনগণের কঠোর সমালোচনায় ফখরুদ্দিন আহমেদ ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেন। এই নির্বাচনে পুনরায় আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব লাভ করেন। তারপর ২০০৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায়।
বাংলাদেশের রাজনীতির তিনটি পর্যায়
এতক্ষণ আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে একটি ধারাবাহিক ধারণা পেলাম। এখন আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তিনটি পর্যায় সম্পর্কে জানব।
১. Nationalist (১৯৪৭-১৯৭১): ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই সময়টিকে 'Nationalist Period' বলা হয়। পাকিস্তানের অধীনে এই পঁচিশ বছরের শাসনামলে বাঙালিরা ছিল ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তানিদের যে-কোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সকল বাঙালিরা একসাথে আন্দোলন করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই একসাথে দেশ স্বাধীন করেছে। নিজ স্বার্থের কথা বিবেচনা না করে সবাই জাতীয় স্বার্থে একসাথে কাজ করেছে (Collective Goal)।
২. Reformist (১৯৭১-১৯৯০): দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন পর্যন্ত এই সময়টি 'Reformist Period' হিসেবে পরিচিত। এই বিশ বছরের সময়টিতে বাংলাদেশের যুবকরা ঘনিষ্ঠভাবে (Closely) তেমন কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিল না। অর্থাৎ যুবকরা কোনো একক রাজনৈতিক পার্টি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়নি। জিয়াউর রহমানের সেনা শাসন কিংবা এরশাদের শাসনামলে যুবকরা এক হয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্কারের জন্য আন্দোলন করেছে। এমনকি ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদকে এই যুবকরাই আন্দোলন করে হটিয়েছে। অর্থাৎ যুবকরা একটি ইনডিপেনডেন্ট এজেন্ট হিসেবে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে (Youth as Independent agent)।
৩. Opportunistic (১৯৯০-বর্তমান): ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর যখন “আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি” রাজনীতি শুরু হয় তখন বাংলাদেশের যুবকরা ঘনিষ্ঠভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়! যুবকরা ভাগ হয়ে পার্টি বা দলভিত্তিক রাজনীতি শুরু করে। যেটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে 'Clientlike Political Culture' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে একটি দলীয় রাজনীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।[বিস্তারিত দেখুন- Youth for Democratic Resilience: Prospects Beyond the Degeneration of Youth Politics in Bangladesh]
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও শাটল ডিপ্লোমেসি
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারত ও রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য জোর দিয়েছিলেন। পাকিস্তান, চীন ও সৌদি আরবের সাথে জিয়াউর রহমানের সুসম্পর্ক ছিল। তারপর এরশাদের শাসনামলেও বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার চেষ্টা করে। পরবর্তী সরকাররা বঙ্গবন্ধুর গৃহীত "Friendship to all, malice to none” এই পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। অর্থাৎ সব রাষ্ট্রের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, কোনো রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা নয়। আজকের একুশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে ২০১৭ সালে যে-সকল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদেরকে পুনরায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো। তাই বাংলাদেশ এখন "Shuttle Diplomacy” এর দিকে প্রবেশ করেছে। ধীরে ধীরে শাটল ডিপ্লোমেসির দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। যে কারণে কূটনীতির এই পরিভাষাটি সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সাথে ইসরায়েল সরকারের একটি সরাসরি সম্পর্ক বা যোগাযোগ রয়েছে। একই ভাবে তুরস্কের সাথে ইরান সরকারেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে (Direct Relationship)। সরাসরি সম্পর্ক বলতে মূলত বোঝায় দুটি দেশের সরকারের মধ্যে নিয়মিত ফোনালাপ, উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে অপরের দেশে ভ্রমণ, দুটি দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ডায়ালগ ইত্যাদি। দুটি দেশের সরকারের মধ্যে এই ডিরেক্ট সম্পর্কটিকে আমরা বলি "Principal-to-Principal Contact"। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন দ্বন্দ্ব, ক্রাইসিস কিংবা যুদ্ধের কারণে একটি দেশ অপর আরেকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। যেমন- রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের সাথে মিয়ানমার সরকারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ নেই। ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন এই দুটি দেশের সরকারের মধ্যেও তেমন কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই। একই ভাবে Spying বা নজরদারির কারণে একসময় যুক্তরাষ্ট্র তার দেশ থেকে রাশিয়ার সকল কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছিল। পরবর্তীতে রাশিয়া সরকারও তার দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। ফলস্বরূপ রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। একে অপরের সাথে রেষারেষি, দ্বন্দ্ব কিংবা যুদ্ধের কারণে সম্পর্কচ্ছেদ হলে তখন তৃতীয় আরেকটি দেশের প্রয়োজন হয় এই দুটি দেশের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য। যেমন- জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করতে তৃতীয় দেশ হিসেবে তুরস্ক ও মিশর এগিয়ে এসেছিল। তুরস্ক ও মিশরের মধ্যস্থতায় পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি হয়। বিবদমান দুটি দেশের মধ্যে মীমাংসা করতে যখন তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় তখন সেটাকে "Shuttle Diplomacy” বলা হয়।
বাংলাদেশ এখন এই শাটল ডিপ্লোমেসি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি মধ্যস্থতার লক্ষ্যে এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় একটি পক্ষকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে চীনের সমর্থন চাচ্ছে, কখনো আবার রাশিয়ার কাছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমাধান করিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ তৃতীয় একটি দেশকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর এটাকেই বলা হচ্ছে 'শাটল ডিপ্লোমেসি'। আরও সহজ করে বললে দুইটি রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে যখন কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয় এবং তাদের সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয় তখন অন্য কোনো পক্ষ বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার নামই শাটল ডিপ্লোমেসি। মধ্যস্থতা করার জন্য একটি দেশই যে হতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই, আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাও হতে পারে এই মধ্যস্থতাকারী।
Shuttle Diplomacy এর প্রথম উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল ১৯৭০-র দশকে। হেনরি কিসিঞ্জার এ কূটনীতির উদ্ভাবক। হেনরি কিসিঞ্জার সর্বপ্রথম এই ডিপ্লোমেসির প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন ইসরায়েল, মিশর ও সিরিয়ার মাঝে। শাটল ডিপ্লোমেসি এর আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। "ফকল্যান্ড” হচ্ছে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপ। এই দ্বীপ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটিশদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিরোধ চলছিল। এমনকি এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি যুদ্ধ হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুটি দেশের মধ্যে একটি মীমাংসা হয়। যে-কারণে ফকল্যান্ড দ্বীপের এই সংকট নিরসনকে বলা হয় শাটল ডিপ্লোমেসি এর জ্বলন্ত উদাহরণ। রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের জন্য তৃতীয় পক্ষ হিসেবে রাশিয়া, ভারত, জাপান, চীন, আমেরিকা কাউকেই বাংলাদেশ পাশে পাচ্ছে না। মধ্যস্থতা করিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো রাষ্ট্রই এগিয়ে আসছে না। তাই অনেকে বলছেন বাংলাদেশ তুরস্ককে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আহ্বান করতে পারে। আসলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি মধ্যস্থতা করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কোন দেশটিকে পাশে পাবে সেটা নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়াকে নিয়ে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনীতির উপর।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
আমাদের সবার মাথায় কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ঘুরপাক খায়। সেগুলো হচ্ছে ভারত কেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন দিচ্ছে না? রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতিসংঘে কখনো এই আরাকান অঞ্চলে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। এসব কারণে এই আরাকান রাজ্যটি চীনের প্রয়োজন। আর এজন্যই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করছে এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছে।
ভারত
জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থাৎ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা ভোটদানে বিরত থাকার চেষ্টা করে। আর বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ ইত্যাদি রাষ্ট্র ভোট দিয়ে থাকে। তথা তিনটিই মুসলিম প্রধান দেশ। তার মানে কি এই যে, এই ভোটাভুটিতে রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় পরিচয় একটি বড় নিয়ামক? নাকি নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা প্রতিবেশি ভারতকে অনুসরণ করে ভোটদানে বিরত থেকেছে? প্রশ্ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, জাতিসংঘের মতো একটি বৈশ্বিক অঙ্গনে ভোট দেওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এটি সেই দেশের পুরো পররাষ্ট্রনীতিরও অংশ। এবার আসি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন নিরপেক্ষ থাকছে তা নিয়ে।
প্রথমত, ভারতের সাথে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরিতে অন্যতম আরেকটি কারণ হলো, ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহী তৎপরতায় লিপ্ত যোদ্ধাদের অনেকেই মিয়ানমারের জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ফলে তাদের শায়েস্তা করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ভারতের প্রয়োজন। তৃতীয়ত, চায়নার পাশাপাশি মিয়ানমারে ভারতও এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের সাথে যুক্ত। রাখাইন রাজ্যেই ভারত একটি বন্দর এবং নদীপথ প্রকল্পে জড়িত। ভারতের মিজোরাম এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মধ্যে একটি সড়ক নির্মাণেও ভারত জড়িত। তাছাড়াও ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে কিছুটা ফাটল ধরানো। চতুর্থত, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপস্থিতি ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কারণে জঙ্গি তৎপরতার জন্য সহায়ক হলে তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে বলে মনে করছেন ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। জঙ্গির অজুহাতে ভারতের আশেপাশে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি ভবিষ্যতে ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলে দিতে পারে। পঞ্চমত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থাৎ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে এবং বাকি দেশগুলো মিয়ানমারের পক্ষে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই দুটি দেশ বাংলাদেশের পক্ষে থাকার অন্যতম কারণ হলো ধর্মীয়। আসিয়ানভুক্ত অন্য সকল দেশ যেমন- সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, লাউস সবাই মিয়ানমারের পক্ষে। আর ভারত দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে আসিয়ান জোটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য। তাই ভারত ভোটদানে বিরত থাকে। সে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, আসিয়ানভুক্ত সবগুলো দেশের সাথেই একটি কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
রাশিয়া
প্রথমত, মিয়ানমারের জাতীয় রাজনীতি দুইভাগে বিভক্ত। মিয়ানমারের জাতীয় রাজনীতিতে একদিকে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি ও তার রাজনৈতিক দল। আর অন্যদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সুচি ক্ষমতায় এসে দীর্ঘদিন ধরে চেয়েছিলেন মিয়ানমারের রাজনীতি থেকে কীভাবে সেনাবাহিনীর প্রভাব কমানো যায়। এই নিয়ে অং সান সুচি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি পরোক্ষ দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এই দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ রূপ নেয় যখন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তারা ক্যু ঘটিয়ে অং সান সুচিকে গ্রেফতার করে এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। অং সান সুচি হলো পশ্চিমাপন্থি আর মিলিটারিরা হলো রাশিয়াপন্থি।
দ্বিতীয়ত: মিয়ানমারের সেনাবাহিনীরা তাদের যাবতীয় অস্ত্র ও মিলিটারি সরঞ্জাম রাশিয়া থেকে ক্রয় করে। অর্থাৎ মিয়ানমার হলো রাশিয়ার জন্য অস্ত্র বিক্রির একটি বড় বাজার। অন্যদিকে বাংলাদেশ বেশির ভাগ অস্ত্র ও মিলিটারি সরঞ্জাম ক্রয় করে চায়না থেকে। এমনকি বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু অস্ত্র চায়নার পাশাপাশি তুরস্ক থেকেও ক্রয় করছে। অথচ এশিয়া মহাদেশের অস্ত্রের বাজারে রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চীন ও তুরস্ক। রাশিয়া থেকে অস্ত্র না কিনে বরং চীন ও তুরস্ক থেকে অস্ত্র ক্রয় করায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ রাশিয়াকে তার সাথে পাচ্ছে না। এমনকি ২০২১ সালের ১৪ জুলাই সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল কালাম আব্দুল মোমেন উজবেকিস্তানে গিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। সেই সাক্ষাৎ এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাশিয়াকে বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বললে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো জবাব না দিয়ে চুপ ছিলেন। এই চুপ থাকার মানে হলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাশিয়াও বাংলাদেশকে সহায়তা করতে চাচ্ছে না।
তৃতীয়ত, আমার কাছে মনে হচ্ছে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চুপ থাকা বাংলাদেশের জন্য দুটি ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছে। মিয়ানমারে বর্তমানে ক্ষমতায় আছে মিলিটারি জান্তারা। একটি সামরিক সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে যে পরিমাণ অস্ত্র লাগবে বাংলাদেশের কিন্তু সে পরিমাণে অস্ত্র লাগবে না। তাই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাশিয়া থেকে ভবিষ্যতে আরও বেশি অস্ত্র ক্রয় করতে থাকবে। ঠিক এজন্য রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে রাশিয়া কখনোই মিয়ানমারের বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। অর্থাৎ ভবিষ্যতে গিয়েও আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কখনোই রাশিয়াকে পাশে পাব না এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় অশুভ বার্তাটি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে অনেকগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। তাই রোহিঙ্গারা এই অঞ্চলে একসময় একটি বিগ টেরোরিস্ট হাব হয়ে উঠতে পারে। তখন রাশিয়া এই রোহিঙ্গাদের কাছে তাদের অস্ত্র বিক্রি করার একটি বড় বাজার খুঁজে পাবে (Possibility)। কারণ রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে অস্ত্র বিক্রি একটি মুখ্য বিষয়।
জাপান
আরেকটি প্রশ্ন হতে পারে, জাপান তো বাংলাদেশের অনেক ভালো বন্ধু হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশকে বিদেশি সাহায্যে একক দেশ হিসেবে শীর্ষে আছে জাপান। এমনকি বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জাপান। তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপান কেন বাংলাদেশের পাশে নেই? তার অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে ধর্মীয় বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তাদের মতে মিয়ানমার হচ্ছে একটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বী দেশ। আর জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম। ঠিক এই ধর্মের কারণে অধিকাংশ জাপানিজ কিছুটা মিয়ানমারের পক্ষে। জাপান রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে না থাকার পেছনে আসলে ধর্মীয় কারণটি যৌক্তিক নয়। কারণ বর্তমানে জাপানের পররাষ্ট্রনীতিতেও একটি পরিবর্তন এসেছে, সেটি হচ্ছে Neutrality বা নিরপেক্ষতা। বর্তমানে যে-কোনো দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বে জাপান নিজেকে জড়াতে চায় না। জাপান নিরপেক্ষ হিসেবে থাকতে চায়। তাই বাংলাদেশে যেভাবে জাপান অনেক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঠিক একই ভাবে মিয়ানমারেও জাপান অনেকগুলো উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ভারত, চীন, জাপান, রাশিয়া কাউকেই পাশে পাচ্ছে না। এখন বাকি আছে শুধু যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশকে তো আর এমনি এমনিই সহযোগিতা করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব হচ্ছে বাংলাদেশ যদি সেন্টমার্টিন কিংবা কক্সবাজারের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি মিলিটারি ঘাঁটি বসানোর সুযোগ দেয় তখনই কেবল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সরাসরি সহযোগিতা করবে। কেননা সোফা (SOFA) চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আগ্রহ আমাদেরকে এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি মিলিটারি ঘাঁটি বসাতে পারলে ভারতীয় উপমহাদেশ-সহ এসব অঞ্চলে তাদের একটি কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশে বসেই এসব অঞ্চল থেকে চীনের কর্তৃত্ব হটাতে পারবে। এখন ইতিহাস বলছে কোনো একটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি ঘাঁটি বসানো মানেই ঐ দেশটি সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া।
আফ্রিকার দেশগুলো
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আফ্রিকার দেশগুলোর অবস্থান কী হবে তা নির্ভর করে চীনের উপর। অর্থাৎ চীন বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে তার উপর নির্ভর করেই তারা সিদ্ধান্ত নেয়। চীন এই ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ স্টেইকহোল্ডার। কারণ আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোকে বেইজিং আর্থিকভাবে সহায়তা করছে এবং সেখানে তাদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাধারণত কঙ্গো, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, নামিবিয়া, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে ইত্যাদি আফ্রিকান দেশগুলো বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান করেছে এবং মধ্য আফ্রিকার অনেক দেশ ভোটদানে বিরত থেকেছে। তাছাড়া ইতোমধ্যে চীন আফ্রিকার বিরাট অঞ্চল নগদ টাকায় কিনে ফেলেছে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি অর্থনৈতিক। আফ্রিকায় চীনের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানই তাদেরকে চীনের বিপক্ষে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখে। ফলে তারা এমন কোনো পলিসি গ্রহণ করে না, যা তাদের সাথে চীনের একটি দ্বন্দ্ব তৈরি করবে। তাই চীন যেখানে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে সেখানে তারা বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়ে চীনের বিরাগভাজন হতে চায় না। লক্ষণীয় যে আফ্রিকার একমাত্র দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেয়। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটি আফ্রিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক উন্নত ও আধুনিক। তাই এই দেশটিতে চীনা বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম।
আমরা যতই বলি না কেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো, বিভিন্ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়া কিংবা মিয়ানমারের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা ইত্যাদি কথাগুলোর তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ ভারত, চীন, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাংলাদেশ কাকে নিয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করবে? এদেরকে ছাড়া মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ বাংলাদেশ কীভাবে বসাতে পারবে? এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে বাংলাদেশ।
ইরাক যুদ্ধের কারণে মানবিক দিক বিবেচনা করে মিলিয়ন মিলিয়ন ইরাকি উদ্বাস্তুদের জায়গা দিয়েছিল সিরিয়া। এখন সিরিয়া পরাশক্তির রণক্ষেত্র, পরাশক্তির পাপ বইতে বইতে সিরিয়া এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। এক কথায়, ভূরাজনীতির প্লে গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছে সিরিয়া। বাংলাদেশ বর্তমান সরকারও কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রথমে আশ্রয় দিতে চায়নি। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ দেখে বাংলাদেশের মানুষ সরকারকে চাপ প্রয়োগ করেছিল রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে এবং বাংলাদেশ সরকারও মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। তাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি যথেষ্ট পরিণত ও দূরদর্শীসম্পন্ন হতে হবে যেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি ইরাক কিংবা সিরিয়ার মতো না হয়। তবে আমরা আশাবাদী এই জন্য যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, পূর্বের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেক কৌশলী।
Question to think about?
এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য একটি নিরাপত্তা সংকট। কিন্তু বর্তমানে নানা ভূরাজনৈতিক সমীকরণে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন একটি অনিশ্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে বাংলাদেশের একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে আপনি কি মনে করেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে বর্তমান পরিস্থিতির স্বীকার বিবেচনা না করে মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Talukdar, Shawon; Aktar, Sania and Mia, Muhammad Miraj (2022), Youth for Democratic Resilience: Prospects Beyond the Degeneration of Youth Politics in Bangladesh, SJRSS
2. Bass, Gary J. (2014), The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide, Vintage
3. Raghavan, Srinath (2014), 1971: A Global History of the Creation of Bangladesh, Harvard University Press
4. Abdul Bari, Muhammad (2018), The Rohingya Crisis: A People Facing Extinction, Kube Publishing Ltd
5. Uddin, Nasir (2021), The Rohingya Crisis: Human Rights Issues, Policy Concerns and Burden Sharing, SAGE Publishing India
6. Wade, Francis and French, Paul (2017), Myanmar's Enemy Within: Buddhist Violence and the Making of a Muslim 'Other', Zed Books
7. Karim, Mohd Aminul (2020), Genocide and Geopolitics of the Rohingya Crisis, Nova Science Pub Inc
📄 দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি
Theme: The Politics of Disequilibrium
ভূমিকা: দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং চলমান সংকটগুলো বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় চরিত্র কেমন (National Characters) এবং আমার উপর প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব (Neighbourhood Effects) কিরকম সেটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে দক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশ এই অঞ্চলের রাজনীতিতে নিজেকে সক্রিয় রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের উদ্যোগে সার্ক গঠন এবং ঢাকায় বিমসটেক এর স্থায়ী সদরদপ্তর স্থাপন এই অঞ্চলে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। একই ভাবে আমাদের পাশ্ববর্তী অঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্ব বাংলাদেশের কাছে শুধু আর্থিক নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আরও বেগবান করাও বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই অধ্যায়ে আমরা দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক (SAARC)
দক্ষিণ এশিয়া কৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত এই অঞ্চলটি মোট আটটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছিল সার্ক (SAARC)। SAARC এর পূর্ণরূপ হচ্ছে- South Asian Association for Regional Cooperation! যাকে বাংলায় বলা হয়- দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা। একসময় কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে দেখা হতো দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা সার্কের গঠনকে। কারণ সার্ক (SAARC) গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রস্তাবেই। সার্ককে ঘিরে বর্তমানে যে ভূরাজনীতিটি হচ্ছে সেটি বিস্তারিত না জানলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিও বুঝতে পারা একটু জটিল হবে। সার্কের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশের উদ্যোগে সার্ক গঠন ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় মাইলফলক ও অর্জন। বিশ্বে তখন ঢাকার সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সফলতার স্মারক ছিল সার্ক।
সার্ক গঠন করার প্রেক্ষাপট
১৯৭৭-১৯৮১ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭৯ সালে শ্রীলঙ্কা সফর করেন। তিনি শ্রীলঙ্কা সফরকালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে একটি আঞ্চলিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন এবং নিজে সক্রিয় উদ্যোগ নেন। তারপর জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগে তৎকালীন ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ অনুপ্রাণিত হন এবং জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে সাড়া দেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে একাধিক সম্মেলন হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সার্কের নেতৃত্ব দেন। অবশেষে ১৯৮৩ সালে এই ৭টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সমবেত হয়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তারপর ১৯৮৫ সালে ঢাকায় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯৮৭ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুকে সার্কের সদর দপ্তর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সার্কের সদস্য রাষ্ট্র: বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান এবং আফগানিস্তান এই ৮টি দেশ সার্কের সদস্য। সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় আফগানিস্তান সদস্য ছিল না। ২০০৭ সালে আফগানিস্তান সার্কের সদস্য পদ লাভ করে। তারপর থেকেই সার্কের মোট সদস্য রাষ্ট্র ৮টি। এবার আসি সার্ক গঠনের উদ্দেশ্য কী কী ছিল সেটি নিয়ে।
সার্কের প্রাথমিক উদ্দেশ্য
1. পারস্পরিক সহযোগিতা (Mutual Cooperation): সার্কের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, কারিগরি, বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। একই ভাবে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গেও এই সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এমনকি প্রথমদিকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নানাবিধ সমস্যার সমাধান এবং বিভিন্ন বিষয়ে সাফল্যের ক্ষেত্রে সার্ক যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছিল।
2. উন্নয়ন ও স্বাধীনতা রক্ষা (Development): দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের এই রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি এবং সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো ছিল সার্কের আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য। সার্কের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করার শপথ নিয়েছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলো。
3. যোগাযোগ বৃদ্ধি (Communication): সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্যের আদানপ্রদান এবং সেসব দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। এমনকি প্রথমদিকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন দেশে সহজে যাতায়াত ও থাকার জন্য সার্ক ভিসার নিয়মকানুনও শিথিল করতে সক্ষম হয়েছিল।
4. নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ (Security and Preventing Terrorism): দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ করাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। সিকিউরিটি জোরদার করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া ও সংবেদনশীলতার পরিবেশ তৈরি করা ইত্যাদি।
5. হস্তক্ষেপ না করা (Sovereignty): সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা ও অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা সার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। সার্কের চার্টারে বলা হয়েছে দ্বিপাক্ষিক কিংবা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একে অপরের উপরে হস্তক্ষেপ করবে না। যেমন- পাকিস্তান-ভারত দ্বন্দ্ব হলে সেখানে এই দুটি দেশ ছাড়া সেখানে সদস্যভুক্ত অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যেহেতু এটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যা তাই ভারত-পাকিস্তান মিলে সমাধান করে নেবে। আর অভ্যন্তরীণ বিষয়টি হচ্ছে এরকম যে, ধরুন ভারতের কাশ্মীরে কাশ্মীরী জনগণ বনাম ভারত সরকারের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব দেখা দিল, তাই কাশ্মীর যেহেতু ভারতের অংশ তাই সেটি ভারত নিজেই সমাধান করে নেবে। সেখানে সার্কভুক্ত অন্য কোনো রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে না এটি হচ্ছে নিয়ম।
6. মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (Free Trade): সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃদেশীয় বাজার ও অর্থনৈতিক লেনদেন বৃদ্ধি করা। অর্থনৈতিক লেনদেন বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে সার্কের দ্বাদশ সম্মেলনে সাফটা বা 'দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল' নামে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর দ্বারা সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তঃবাণিজ্যে শুল্কের হার ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি।
7. পুরস্কার (Accolades): দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ বিশেষ কৃতী মানুষ যারা সমাজের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে অথবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেগুলো সমাজের কল্যাণে অবদান রাখবে তাদেরকে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সার্ক পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করবে।
৪. খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security): সংকট, দুর্যোগ ইত্যাদি সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একে অপরের সাহায্য করবে। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে ইত্যাদি।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও সার্কের ব্যর্থতা
ভারসাম্যহীনতা (Asymmetric Relationship)
বিভিন্ন দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে আমরা সাধারণত Symmetrical Relationship এবং Asymmetric Relationship নামে দুইটি পরিভাষা ব্যবহার করি। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দুটি রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রায় সমান শক্তিশালী হয় তখন সেই দুটি দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। কারণ সমান শক্তিশালী হওয়ায় কেউ কারো উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না এবং উভয়েই একে অপরের উপর সমানভাবে নির্ভরশীল হয়। সমান ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্য সম্পর্কটিকে বলা হয় Symmetrical relationship বা সমান্তরাল সম্পর্ক। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার সম্পর্ক, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যকার সম্পর্ক, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক ইত্যাদি। কিন্তু যখন এমন দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক হয় যেখানে একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী আর অপর রাষ্ট্রটি অনেক বেশি দুর্বল। তখন সেই দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ককে বলা হয় Asymmetric Relationship বা সামঞ্জস্যহীন সম্পর্ক। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক, ভারত ও নেপালের মধ্যকার সম্পর্ক, অস্ট্রেলিয়া ও নাউরুর মধ্যকার সম্পর্ক, চীন ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার সম্পর্ক ইত্যাদি। একটি বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ছোট রাষ্ট্রের তুলনা করলে দেখা যায় সেখানে ভারসাম্য বজায় থাকে না। কারণ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উপর যতটা নির্ভরশীল হবে যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু বাংলাদেশের উপর ততটা নির্ভরশীল হবে না। নেপাল ভারতের উপর যতটা নির্ভরশীল হবে ভারত কিন্তু নেপালের উপর ততটা নির্ভরশীল হবে না। এখন সার্ক নিয়ে সমস্যাটি হচ্ছে ঠিক এখানেই। সার্কভুক্ত আটটি দেশের মধ্যে ভারতের একা যে পরিমাণ ইকোনমিক এবং রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ এই সবগুলো দেশ একসাথে করলেও সেই পরিমাণ শক্তি হবে না। কারণ সার্কের বড় দেশ ভারতের অর্থনীতি জোটের অন্য সব দেশের মোট অর্থনীতির সঙ্গে তুলনীয়। সার্কের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটি বড় দেশ ও তাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ছোট রাষ্ট্রের সংগঠন। তাই এখানে ভারত 'বড় ভাই' বা 'Big Brother Mind' এর ভূমিকাটি প্রয়োগ করছে। সার্ক ব্যর্থ হওয়ার পেছনে এই Asymmetric Relationship'টি হলো একটি অন্যতম এবং প্রাকৃতিক কারণ। এটিই বাস্তবতা। কারণ দিল্লিতে যে পরিমাণ Capital Flow হয় সেটি কাঠমুন্ডু, ইসলামাবাদ কিংবা ঢাকাতে হয় না। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে লক্ষ্য করুন সেখানে একক আধিপত্য বিস্তারকারী কোনো দেশ নেই। সেখানে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, পোল্যান্ড, ইতালির মতো অনেকগুলো বড় রাষ্ট্র রয়েছে। তাই সেখানে কেউ একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। আর সেজন্য সেখানে একটি ভারসাম্য রয়েছে যেটি আমাদের সার্কে নেই।
ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব
সার্কভুক্ত ৮টি রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দুইটি রাষ্ট্র হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান। কারণ দুটি দেশেরই আছে পারমাণবিক শক্তি। কিন্তু ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই এই দুটি রাষ্ট্র একে অপরের শত্রু। সীমান্ত নিয়ে চলছে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ। দুটি দেশের মধ্যে সবসময় যুদ্ধযুদ্ধ ভাব বিরাজ করে। তাই আঞ্চলিক স্বার্থে এই দুটি দেশ কখনো একমত হতে পারে না। কারণ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের রয়েছে আলাদা আলাদা স্বার্থ। তার উপর রয়েছে এই অঞ্চল নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা। একদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ যেখানে পাকিস্তান প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা কোয়াড যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এই অঞ্চলে ভারত কাজ করছে। ঠিক একারণে সার্কের কোনো সিদ্ধান্তে ভারত ও পাকিস্তান একমত হতে পারে না। সার্কের গৃহীত কোন সিদ্ধান্তে এই দুই দেশের কোনো একটি ভেটো দিলে সার্কের সেই সিদ্ধান্তটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। আজ সার্ক একটি অকার্যকর ও ব্যর্থ সংস্থায় পরিণত হওয়ার মূল এবং একমাত্র কারণ ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব। ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি সার্ককে একটি পঙ্গু সংস্থায় পরিণত করেছে। আজকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেন এত সফল? কারণটি হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে (ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি ইত্যাদি) সীমানা নিয়ে, আধিপত্য নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মতো এত দ্বন্দ্ব নেই। মূলত, ভারত- পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ক্রসফায়ারে সার্ক এখন মৃত্যুপথযাত্রী।
আঞ্চলিক বিভেদ (Regional Disintegration)
একটি অঞ্চলে সুসম্পর্ক গড়ে উঠার আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যতা (Melting Pot)। দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, গোষ্ঠী ইত্যাদির ভিত্তিতে রয়েছে নানা দল উপদল (Heterogeneous Society)। যে কারণে এই অঞ্চলে জাতিগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, Identity Politics ইত্যাদি প্রকট।
একটি বাস্তব সত্যি হচ্ছে যে, পাকিস্তানি জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধী মনোভাবটি Inherently বা জন্মগতভাবেই চলে আসে কাশ্মীর, সীমান্ত, ধর্মীয় ইত্যাদি কারণে। তেমনিভাবে ভারতের জনগণও ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানকে নিজেদের শত্রু ভাবে। অন্যদিকে আমরা যদি বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাই ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। তার অন্যতম কারণ লিথাল ওয়েপন ব্যবহার করে বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে হত্যা, বন্যার পানি ছেড়ে দেওয়া, তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া, ভারতের Citizenship Amendment Act (CAA) ইত্যাদি বিষয়গুলো। শ্রীলঙ্কায় ভারত বিরোধী মনোভাবের অন্যতম দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শ্রীলঙ্কা মনে করছে শ্রীলঙ্কার তামিল জঙ্গিদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ঘটনার সাথে ভারত জড়িত। শ্রীলঙ্কা মনে করছে তামিল জঙ্গিদেরকে ভারত মদদ দিচ্ছে এবং সহযোগিতা করছে। দ্বিতীয়ত, শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। অর্থাৎ আঞ্চলিক ঐক্যকে দৃঢ় করবে, এমন কোনো কার্যকরী বৈশিষ্ট্য নেই দক্ষিণ এশিয়াতে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ধর্মগত (ইসলাম) একটি মিল থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো না। একই ভাবে জঙ্গিবাদের ইস্যুতে আফগানিস্তানের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক অতটা ভালো নয়। তাই সার্ক ব্যর্থ বা অকার্যকর হওয়ার পেছনে আঞ্চলিক বিভেদ বা Regional Disintegration কে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
চায়নার উপস্থিতি (China's Role to SAARC)
সার্কভুক্ত ০৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হলো ভারত। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রতিবেশি রাষ্ট্র চীন অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারতের চেয়েও বহুগুণে শক্তিশালী। একই অঞ্চলের বা সার্কভুক্ত দেশ হিসেবে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশগুলো ভারতের কাছে আশানুরূপ সহযোগিতা পাচ্ছে না। সার্কের বা দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের কাছে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর যে প্রত্যাশা তা ভারত আশানুরূপ মিটাতে পারছে না। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে চীন। সার্ক অকার্যকর হওয়ায় ভারতের তেমন লাভ হয়নি বরং ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলোতে সহজভাবে প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। সার্কভুক্ত এই ছোট ছোট দেশগুলোকে 'দুই হাতে' দিচ্ছে বেইজিং। সার্কভুক্ত দেশগুলোর বড় বড় মেগা প্রজেক্টে চীন অর্থায়ন করছে এবং অবকাঠামো খাতে ঋণ দিচ্ছে চীন। তাই বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো চীনমুখী হচ্ছে। আর ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান তো অবশ্যই চীনের 'All Time Friend' বা 'সব সময়ের বন্ধু' হিসেবে পরিচিত। নেপাল অতীতে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রভাবলয়ের মধ্যে থাকলেও গত এক দশকে চীনের কাছ থেকে সড়ক ও অবকাঠামোগত অনেক সহায়তা পেয়েছে, এখনো পাচ্ছে। এমনকি সার্ক নেতারা মাঝে মাঝে কাঠমান্ডুতে যে সরকারি বাসভবনে বসে সম্মেলন করে, তা-ও চীনের সহায়তায় তৈরি। যদিও সার্কভুক্ত দেশগুলোতে চীনের সহায়তা প্রদান ও ঋণদান প্রকল্পে চীনের মূল উদ্দেশ্য তার Debt Trap Policy এবং Belt and Road Initiative প্রকল্প বাস্তবায়ন করা, তবুও বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এসব দেশগুলো সার্কের থেকেও অধিক পরিমাণে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে চীনের উপর।
নিয়মিত হচ্ছে না শীর্ষ সম্মেলন (Irregular SAARC Summit)
১৯৮৫ সালে গঠিত হওয়া সার্কের বয়স ৩৭ অতিক্রম করলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো অর্জন নেই সার্কের। সার্কভুক্ত দেশগুলোর দেড়শো কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ ভাগই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। প্রতি দুই বছর পরপর সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে একটি সম্মেলন করা হচ্ছে সার্কের নিয়ম। কিন্তু প্রতি দুই বছর অন্তর আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলন এখন অনিয়মিত হয়ে গিয়েছে। যেখানে পৃথিবীর সকল সফল আঞ্চলিক সংস্থাগুলো নিয়মিত সম্মেলন আয়োজন করছে সেখানে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে না বললেই চলে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানে সার্কের ১৯তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের উরির সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে সম্মেলন বয়কট করে ভারত। ভারতের সাথে সাথে এই সম্মেলন বয়কট করে বাংলাদেশ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। এরপর থেকে মোটামুটি অকার্যকর দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনাময়ী এই সংস্থাটি। পরবর্তীতে আর সম্মেলনটি হয়নি। সার্কের এখন পর্যন্ত ১৮টি শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে। এর তিন দশকের ইতিহাসে দ্বিপক্ষীয় বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে বার্ষিক সার্ক সম্মেলন ১১ বার স্থগিত করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে সার্কের অধীনে অসংখ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে সেগুলো পর্যাপ্তভাবে এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) প্রায়শই সার্কের একটি বিশিষ্ট ফলাফল হিসেবে হাইলাইট করা হয়, তবে তা এখনো কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে শুরু করে করোনাকালীন কোনো দৃশ্যমান গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ সার্ক থেকে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাস্তবায়ন হচ্ছে না সাফটা চুক্তি- [The South Asian Free Trade Area (SAFTA)]
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (সাফটা) এর মূল কথা ছিল সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কম শুল্কে বাণিজ্য হবে এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে। ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সার্কভুক্তদেশগুলো এ চুক্তি স্বাক্ষর করে। সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অবশেষে ২০০৬ সালের পহেলা জানুয়ারি সার্ক সচিবালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করার মাধ্যমে সাফটা চুক্তি বলবৎ করা হয়েছিল। বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনার প্রসার, বাণিজ্যের প্রসার ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশসমূহের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সাফটার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। সাফটা চুক্তির ভূমিকায়ও সুবিধাজনক বাণিজ্য ব্যবস্থায় সদস্যভুক্ত দেশসমূহে আন্তঃসীমান্ত পণ্য আদান-প্রদানের অসুবিধা দূরীকরণের মাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার অভিপ্রায় ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছিল। এছাড়া ভিসামুক্ত দক্ষিণ এশিয়া ও অভিন্ন মুদ্রা চালুর ব্যাপারটিও আলোচনা হয়েছিল।
২৫ অনুচ্ছেদ সম্বলিত সাফটা চুক্তিতে নিম্নোক্ত চারটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য চিহ্নিত করা হয়েছে :
এক, চুক্তিভুক্ত সদস্যদেশসমূহের বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও এ সকল দেশে আন্তঃসীমানা পণ্য আদানপ্রদানের প্রবাহকে সহায়তা প্রদান।
দুই. এ সকল দেশে স্বকীয় অর্থনৈতিক অবস্থার আলোকে মুক্তবাণিজ্য এলাকাভুক্ত অঞ্চলে ন্যায্য প্রতিযোগিতার এবং পক্ষপাতমুক্ত ও ন্যায়বিচারপূর্ণ সুবিধাদির প্রবর্তন।
তিন. সাফটা চুক্তির বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, যুগ্ম ব্যবস্থাপনা এবং বিরোধের নিষ্পত্তি।
চার. আঞ্চলিক সহযোগিতার অধিকতর সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো স্থাপন এবং পারস্পরিক সুবিধাদি বৃদ্ধি। সার্ক সচিবালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছিল।
বাণিজ্য প্রসারিতকরণের উদ্দেশ্যে সাফটা বা SAFTA চুক্তিটি ছিল সার্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সফলতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সাফটা চুক্তির ফলে চুক্তিভুক্ত দেশসমূহে বাণিজ্যের প্রসার ঘটেনি। দেখা যায় যে, এ চুক্তির বাস্তবায়ন বাণিজ্য উদারীকরণ পরিকল্পনার মধ্যেই সীমিত। দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অসহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে এই চুক্তির ফলে বাণিজ্যের পরিধিও বাড়েনি, পরিমাণও বৃদ্ধি পায়নি। উল্লেখ্য, অনেকেই একটি বিষয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। সেটি হলো সাফটা (SAFTA) ও সাপটার (SAPTA) মধ্যে (একটিতে 'F' অন্যটাতে 'P')। ২০০৪ সালে স্বাক্ষরিত হওয়া সাফটা চুক্তির পূর্বে বাণিজ্য সংক্রান্ত আরেকটি চুক্তি ১৯৯৩ সালে ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ঐ চুক্তিটি ইংরেজিতে SAARC Preferential Trading Arrangement, সংক্ষেপে SAPTA (সাপটা) নামে অভিহিত। সাপটার আওতায় চুক্তিবদ্ধ দেশসমূহের মধ্যে বাণিজ্য উদারীকরণ, বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতার ক্ষতিকর দিক প্রতিরোধ করা, সব পণ্যের জন্য শুল্কহ্রাস, খাতভিত্তিক পণ্যের আদান-প্রদান এবং প্রত্যক্ষ বাণিজ্য ইত্যাদি ছিল সাপটার উদ্দেশ্য। সাপটা (SAPTA) চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি বলেই ২০০৬ সালে সাপটা চুক্তি বিলোপ করে সাফটা (SAFTA) চুক্তি গ্রহণ করা হয়েছিল।
সার্ক মোটরযান চুক্তি (এমভিএ)
২০১৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে আয়োজিত ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় "সার্ক রিজিওনাল মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট” নামে। এই চুক্তির মূল বিষয়বস্তু ছিল এরকম যে, সার্কের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে এমন একটি সড়ক তৈরি করা হবে যার মাধ্যমে ঠিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতোই সার্কভুক্ত দেশগুলোও কোনো ভিসা ছাড়াই নিজের ইচ্ছেমতো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে পারবে। একই ভাবে রেলপথেও সার্ক অঞ্চলের যে-কোনো দেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করা যাবে। এভাবেই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে। 'সার্ক রিজিওনাল মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট ফর সার্ক মেম্বারস স্টেটস' শীর্ষক চুক্তির তৈরি করা খসড়ায় এটিও বলা হয়েছিল সরকারি- বেসরকারি দুই ধরনের ট্রাক বা বাস চলাচল করতে পারবে। অনুমোদন নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেও ট্রানজিট নিতে পারবেন যে-কোনো সার্ক নাগরিক। তবে পরিবহন গাড়িগুলোর বৈধ নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ, বিমা পলিসি থাকতে হবে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন সনদও নিতে হবে। আবার পণ্য খালাস ও উঠানো যাবে। তবে গাড়ি প্রবেশের সময় প্রতিটি দেশের নির্ধারিত কাস্টম শুল্ক দিতে হবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে গাড়ি চালানোর জন্য গাড়িচালকের বিশেষ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে, যা সার্ক সচিবালয় বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করবে। এছাড়া দুর্ঘটনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গাড়ির আঞ্চলিক বিমার শর্ত রাখা হয়েছে। যে-কোনো দেশেই এ বিমা করা যাবে। আর যেহেতু শ্রীলঙ্কা ও দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত নয় তাই এই দুটি দেশ নির্দিষ্ট সমুদ্র বন্দরে এসে তারপর সেখান থেকে সড়কপথে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যেতে পারবে। এই এগ্রিমেন্ট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর শুধু পাকিস্তান ছাড়া সবগুলো দেশ রাজি হয়েছিল। পাকিস্তান এই চুক্তিতে রাজি না হওয়ার কারণে এটি আর সফল হয়নি। এখন প্রশ্ন হতে পারে- পাকিস্তান কেন এই অভিন্ন সড়কপথের বিরোধিতা করছে? উত্তরটি হচ্ছে দুইটি। প্রথমত, পাকিস্তানের ভয় দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশকে সংযুক্ত করে এমন একটি সড়ক পথ হলে সেটির সবচেয়ে সুবিধা লাভ করবে ভারত। পাকিস্তান মনে করছে ভারতের বিশাল জনসংখ্যা থাকায় এই সড়কপথে ভারতের আধিপত্য বৃদ্ধি পাবে যা পাকিস্তানের জন্য হুমকি। বিভিন্ন রাষ্ট্রে অবাধ চলাচলের সুযোগ হয়ে গেলে এই অঞ্চলে ভারতের গোয়েন্দা তৎপরতা বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা পাকিস্তানের। দ্বিতীয়ত, চীন হচ্ছে পাকিস্তানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই দক্ষিণ এশিয়াতে যদি একটি অভিন্ন সড়কপথ হয়ে যায় তাহলে সেটি চীনের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দেশগুলো তখন চীনের প্রকল্পের উপর কম নির্ভরশীল হবে। যেহেতু চীন এটি চাচ্ছে না, তাই পাকিস্তান এই সার্ক মোটরযান চুক্তিতে অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
উপ আঞ্চলিকতাবাদ (Sub Regionalism)
সার্ক মোটরযান চুক্তি (এমভিএ) থেকে পাকিস্তান সরে যাওয়ায় সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ভারত ও বাংলাদেশ উপ আঞ্চলিকতাবাদের দিকে জোর দিয়েছে। জোর দিচ্ছে উপ আঞ্চলিক "বিবিআইএন” কাঠামোর উপর। বিবিআইএন বা “বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল সংযুক্তি” হলো সার্কভুক্ত চারটি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি পরিকাঠামো। যেটির উদ্দেশ্য জলের উৎসের সঠিক ব্যবহার এবং এই চারটি দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সার্ক গঠনের ১২ বছর পর যখন ১৯৯৭ সালে বিবিআইএন (BBIN) গঠিত হয় তখনই বলা হয়েছিল সার্কের গুরুত্ব কমে যাবে। ভুটান এই উপ আঞ্চলিক উদ্যোগে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শামিল হয়নি। কারণ ভুটান মনে করে, এই উদ্যোগে শামিল হলে তার পরিবেশ ও প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে ভুটানের Gross National Happiness (GNH) বৃদ্ধির লক্ষ্য ব্যাহত হবে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সুখী দেশ ভুটান তার জীবনযাপনের মান বিচার করার জন্য জিডিপি এর পরিবর্তে Gross National Happiness (GNH) কে ব্যবহার করে।
বিমসটেক গঠন, সার্কের সম্ভাবনা ও পুনরায় কার্যকরী করে তোলার উপায়
বিমসটেক বা BIMSTEC এর প্রেক্ষাপট: ১৯৯৭ সালের ৬ জুন থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে- ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড এই চারটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত হয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংস্থা BISTEC (বিসটেক)। সংস্থার নাম দেওয়া হয়েছিল উপরিউক্ত চারটি দেশের নামের অদ্যাক্ষর দিয়ে। পূর্ণরূপ হচ্ছে BISTEC: Bangladesh, India, Sri Lanka, Thailand Economic Cooperation। পরে ১৯৯৭ সালে যখন মিয়ানমার এতে যোগ দেয় তখন BISTEC- এর সাথে M যুক্ত হয়ে তা হয়ে যায় BIMSTEC। তারপর ২০০৪ সালে নেপাল ও ভুটান জোটে যোগ দেয়। জোটের সদস্য সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ০৭ টি- ভারত, বাংলাদেশ, নোপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি দেশ দক্ষিণ এশিয়ার আর পরবর্তী দুইটি দেশ (মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড) দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার। আমরা জানি যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য স্বতন্ত্র আঞ্চলিক সংস্থা হচ্ছে সার্ক (SAARC) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য স্বতন্ত্র আঞ্চলিক সংস্থা হচ্ছে আসিয়ান (ASEAN)।
কিন্তু বিমসটেক এমন একটি সংস্থা যেখানে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এই দুইটি অঞ্চলেরই সমন্বয় ঘটেছে। তাই অনেকে বিমসটেককে Inter-Regional বা আন্তঃআঞ্চলিক সংস্থাও বলে থাকেন। একই ভাবে বিমসটেককে একটি উপ-আঞ্চলিক সংস্থাও বলা হয় এই অর্থে যে, এখানে সার্কের সবগুলো দেশ নেই এবং আসিয়ানেরও সবগুলো দেশ নেই। প্রতিষ্ঠার ৭ বছর পর ২০০৪ সালের ৩১ জুলাই বিমসটেকের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং জোট সদস্য ৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এতে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে নামের সংক্ষিপ্ত রূপটি অর্থাৎ BIMSTEC এটি ঠিক রেখে পূর্ণরূপটি পরিবর্তন করা হয়। পূর্ণরূপ দেওয়া হয় "BIMSTEC- Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation"। বিমসটেক এর স্থায়ী সদরদপ্তর বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত এবং ২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা উদ্বোধন করেন।
বিমসটেক-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
বিমসটেক এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা। ব্যবসা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পর্যটন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, মৎস্য সম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পোশাক ও চামড়া শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে পরস্পরকে সহযোগিতা করা।
বিমসটেক এর ১৪টি সেক্টর: পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বিমসটেকে মোট ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই চৌদ্দটি সেক্টরের দায়িত্ব আবার সদস্যভুক্ত সাতটি দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
১. Business: ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে প্রধান ভূমিকা পালন এবং দেখাশোনার দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ।
২. Climate Change: জলবায়ু পরিবর্তন এর ক্ষেত্রে সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে সহযোগিতায় বাংলাদেশ নেতৃত্বে থাকবে।
৩. Transportation: পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ভারত মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
৪. Tourism: পর্যটন খাতের সহযোগিতায় থাকবে ভারত।
৫. Preventing Terrorism: সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেবে ভারত।
৬. Environment: পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও সহযোগিতা করবে ভারত।
৭. Natural Resources: প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে Energy খাতের সহযোগিতায় মুখ্য ভূমিকা পালন করবে মায়ানমার।
৮. Agriculture: কৃষি খাতে সহযোগিতায় মিয়ানমার প্রধান ভূমিকা পালন করবে।
৯. Technology: প্রযুক্তি খাতের দায়িত্বে থাকবে শ্রীলঙ্কা।
১০. Fisheries: মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে থাইল্যান্ড।
১১. Communication: জনসংযোগ অথবা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখাশোনা করবে থাইল্যান্ড।
১২. Public Health: সদস্যভুক্ত দেশগুলোর জনস্বাস্থ্যে নজর রাখবে থাইল্যান্ড।
১৩. Poverty Alleviation: দারিদ্র্য দূরীকরণের দায়িত্বে থাকবে নেপাল।
১৪. Culture: সংস্কৃতি বা সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো দেখাশোনা করবে ভুটান।
সার্ক ও বিমসটেক এর মধ্যে তুলনা
বিশ্লেষকদের দাবি বাংলাদেশ ও ভারত দুটি রাষ্ট্রেরই পাকিস্তান ছাড়া এই অঞ্চলে আরেকটি আলাদা জোট গঠন করার অভিপ্রায় ছিল। ২০১৬ সালে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে সার্কের সামিট বাতিল হয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে 'BRICS- BIMSTEC Outreach Summit' নামে একটি সম্মেলন হয়। আর সেখানে ভারতেরও প্রস্তাব ছিল SAARC without Pakistan এমন কিছু করার জন্য। তাই বিমসটেকে যেহেতু পাকিস্তান নেই তাই সার্ককে বিমসটেকের বিকল্প ভাবা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সার্কের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব নিয়ে সার্কে আলোচনা করা যাবে না। কিন্তু আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে সার্ক আজকে অচল দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বের কারণেই। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, আফগানিস্তান-ভারত দ্বন্দ্ব, বাংলাদেশ-ভারত সমস্যা ইত্যাদি দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব যদি সার্ক সমাধান করতে না পারে তাহলে সার্কের কাজ কী? সার্ক যদি এসব দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বের সমাধানকে তার গঠনতন্ত্রের বাহিরে রাখে তাহলে সার্কের প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছে বলাটাই উত্তম। সেদিক থেকে বিমসটেকে গুরুত্বারোপ করাটাই শ্রেয়। তৃতীয়ত, সার্কে কোন প্রস্তাব পাশ হতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিবর্তে ১০০% ভোট প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে কোনো প্রস্তাব পাশ হতে শতভাগ সমর্থন পাওয়া অসম্ভব। ভারত যেই প্রস্তাবে হ্যাঁ বলবে পাকিস্তান সেই প্রস্তাবে না বলবে এটাই স্বাভাবিক। তাই কোনো প্রস্তাব শতভাগ ভোটও পাবে না এবং প্রস্তাব আজীবন প্রস্তাব আকারেই থাকবে; কখনো পাশ হবে না। তাই সার্কের পরিবর্তে বিমসটেকে গুরুত্বারোপ করা যেতে পারে। চতুর্থত, বিমসটেকে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। সমুদ্র জয়ের পর বাংলাদেশের কাছেও বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়াও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে ইন্দো-প্যাসিফিক, অকাস, জাপানের বিগ-বি, চীনের আগ্রহ ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রমাণ করে এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সার্কের চেয়ে বিমসটেকের দিকে ঝুঁকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে সদস্য দেশগুলো।
বিমসটেকে কেন আগ্রহ ভারতের?
সার্কের সঙ্গে বিমসটেকের গঠনগত পার্থক্য হলো সার্কের সদস্যভুক্ত আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বিমসটেেকে নেই। আবার বিমসটেকের মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সার্কে নেই। গঠনগত এই ভিন্নতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারত চাইছে সার্কের মৃতদেহের উপর বিমসটেক সক্রিয় হয়ে উঠুক। কারণ, সার্কের একটি স্যাটেলাইট এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোয় গাড়ি চলাচলের (মোটরযান চুক্তি) যে প্রস্তাব ভারত দিয়েছিল সেখানে পাকিস্তান বিরোধিতা করেছিল। কারণ পাকিস্তান চীনের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক করিডোর গড়ছে। ভারত-পাকিস্তান এসব দ্বন্দ্বের কারণে ভারত বিগত কয়েকবছর ধরে সার্কের পরিবর্তে বিমসটেকে বেশি জোর দিচ্ছে। কারণ বিমসটেক এ পাকিস্তান নেই। এমনকি পাকিস্তানকে সার্কের চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে অনিচ্ছুক ভারত, যার জন্য তারা বিমসটেককে পুনরুজ্জীবিত করেছে। সার্কের পরিবর্তে ভারতের বর্তমান চিন্তা বিমসটেককে নিয়ে। দেখুন এখানে বিমসটেক বলতে বোঝানো হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো। সেটি নামের মধ্যেই স্পষ্ট করে বলা আছে -Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation I
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ভুটান ও নেপাল মোটেই বঙ্গোপসাগর লাগোয়া দেশ নয়। বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে তাদের কোনো সীমানাও নেই। ভুটান ও নেপাল হচ্ছে ভারতের উত্তরে অবস্থিত। মূলত, ভারতের চাপে বা অনুরোধেই যে তারা এই জোটভুক্ত হয়েছে, সেটি অনুমান করা যায়। সার্ককে নিষ্ক্রিয় করে বিমসটেককে শক্তি যুগিয়ে ভারত মূলত কয়েকটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চাইছে। প্রথমত, পাকিস্তানকে বাদ দেওয়া। এটির মূল পয়েন্ট আঞ্চলিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে একঘরে করা। পাকিস্তান সার্কে থাকলেও বিমসটেেকে তাদের নেওয়া হয়নি। এমনকি তাদেরকে সদস্য হওয়ার জন্যেও অনুরোধ করা হয়নি। ভারতের উদ্দেশ্য সার্ককে নিষ্ক্রিয় করে বিমসটেককে সক্রিয় করার মাধ্যমে পাকিস্তানকে এই অঞ্চলে কোণঠাসা করা। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করা। কারণ ভারত দিল্লি থেকে সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলো হয়ে মিয়ানমার দিয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত সড়কপথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে। তৃতীয়ত, ভারতের উদ্দেশ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের উদীয়মান আধিপত্য মোকাবিলাতেও বিমসটেক কাজে লাগবে। আসলে সার্ককে নিষ্ক্রিয় করে বিমসটেককে সক্রিয় করার মাধ্যমে ভারতে যে খুব বেশি সফলতা পেয়েছে বিষয়টি এরকম নয়। সার্কের মতো বিমসটেকও এখন মৃতপ্রায়। প্রথম কারণ হলো ভারত ও ভুটান ছাড়া বিমসটেকের অপর পাঁচটি দেশ ইতোমধ্যে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরই) যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ উভয়ই বিমসটেকের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। একই ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতও এগিয়ে আসছে না। বরং রোহিঙ্গা সমস্যার শুরুতেই ভারতের সমর্থন মিয়ানমারের দিকে। তাই বাংলাদেশ সার্কের মতো বিমসটেকেও তার আগ্রহ হারিয়েছে।
মূল্যায়ন: সার্কে দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ না থাকলেও অতীতে সার্কের মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের চরম উত্তেজনা দুইবার সমাধান হয়েছিল। প্রথমবার ১৯৮৭ সালে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত সার্কের দ্বিতীয় সম্মেলনে। ১৯৮৬-১৯৮৭ তে রাজস্থান সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সৈন্য সমাবেশ ঘটেছিল। তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিয়াউল হক, আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজিব গান্ধী। 'অপারেশন ব্রাসট্যাক্স' নামে এই সৈন্য সমাবেশের মধ্যেই বেঙ্গালুরুতে সার্কের দ্বিতীয় সম্মেলনে জিয়াউল হক ও রাজীব গান্ধী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের সেই ব্যক্তিগত আলাপের পর তৎক্ষণাৎ সৈন্য সমাবেশ সরিয়ে পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়েছিল। দ্বিতীয়টি ২০০১-২০০২ সালে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে পুনরায় সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। ২০০৪ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ১২তম সার্ক সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তান সফর করেন। তাদের সাথে আলোচনা হয়। তারপর হঠাৎ করেই দুই দেশের সাথে সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে বিশ্ব রাজনীতির অনেক কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানকে নিয়ে পরাশক্তি চীনের পরিকল্পনা, ভারতকে নিয়ে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে আরও জটিল করে তুলবে সামনের দিনগুলো। তাই ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার কোনো সমাধান আসলে নেই। আমরা যতই বলি যে, সার্ককে পুনরায় কার্যকরী করে তুলতে সার্ক সনদ সংস্কারের প্রয়োজন। আসলে সনদ সংস্কার করেও আদৌ কোনো লাভ নেই যতদিন পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কোনো সমাধান না হয়। আর পৃথিবী যতদিন থাকবে ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বও ততদিন থাকবে। দু-দেশের মধ্যে শুধু বর্ডার নিয়েই কনফ্লিক্ট নয়, সমস্যাটি মনস্তাত্ত্বিক, ধর্মীয় বিভাজন, তন্মধ্যে আবার কাশ্মীর ইস্যু, আঞ্চলিক আধিপত্য, দু-দেশকে নিয়ে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনীতি ইত্যাদি এই দুই দেশের সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। তাই সার্ককে কার্যকরী করে তোলার জন্য বুদ্ধিজীবীদের থেকে যতই পরামর্শ আসুক না কেন আদতে কোনো লাভ নেই। তাই সার্ক নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো কিছু নেই। তাই বাংলাদেশেরও উচিত এসব কথিত আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর উপর জোর না দিয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলোর সাথে কীভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন করে নিজের স্বার্থ হাসিল করা যায় সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে জাতীয় শক্তিকে আরও শক্তিশালী করা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংস্থা আসিয়ান এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এর ভূমিকা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তথা আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলো-সহ চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক সম্পর্ক সেটিকে পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি বা Look East Diplomacy বলা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এই রাষ্ট্রগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখছে। মিয়ানমার, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ইত্যাদি হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক সংস্থা হচ্ছে আসিয়ান (ASEAN)। ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট গঠিত হওয়া এই জোটের পূর্ণরূপ হচ্ছে- Association of Southeast Asian Nations (ASEAN)। আসিয়ান এর মূলনীতি হচ্ছে; (ক) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একে অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা, (খ) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংগঠিত চলমান সংঘাতগুলো নিষ্পত্তিকরণ, (গ) একে অপরের জাতীয় পরিচয়ের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা ইত্যাদি। এবার আসি আসিয়ানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। এই আঞ্চলিক জোটের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সংকট নিরসনে আলোচনা করা এবং সমাধানের চেষ্টা করা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা, কারিগরি ও প্রশাসনিক উন্নতি সাধনের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দারিদ্র্য-ক্ষুধা, নিরক্ষরতা এবং স্বাস্থ্য সমস্যা দূরীকরণের মাধ্যমে জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধিতে কাজ করা। তৃতীয়ত, ন্যায়বিচার, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং জাতিসংঘ সনদকে আমলে নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা।
আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় ক্যারেক্টার ভিন্ন ভিন্ন। তাই এই অঞ্চলের যে-কোনো ইস্যুত্তে তাদের অবস্থানও ভিন্ন। রাষ্ট্রগুলোর People to People সম্পর্কের দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে, এখানকার বাসিন্দাদের ধর্মপরিচয় ভিন্ন। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রায় সবগুলো দেশেই রয়েছে পরিপক্ক গণতন্ত্রের অভাব। থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাবাহিনীর সক্রিয়তা লক্ষণীয়। লাওসে আবার একদলীয় শাসন বিদ্যমান (Catch-all Party)। উল্লেখ্য, এই Catch-all Party এর মূল কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রের অন্য সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে দমিয়ে রেখে একা আধিপত্য বিস্তার করা। এটিকে আবার অনেকে Big Tent হিসেবে উল্লেখ করে। ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারে সেনাশাসন বিদ্যমান। মাঝখানে যে কয়েকদিন মিয়ানমারে গণতন্ত্র ছিল সেখানে আবার পার্লামেন্টের মোট আসনের ২৫% বরাদ্দ ছিল সেনাবাহিনীর জন্য। এখন আবার পুরো দেশের শাসনক্ষমতা দখলে নিয়েছে দেশটির মিলিটারি জান্তারা। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাই এই তিনটি দেশ মুসলিম প্রধান। ব্রুনাইতে রয়েছে রাজতন্ত্র। মালয়েশিয়াতে গণতন্ত্র থাকলেও সেটি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় Controlled Democracy বলা হয়। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে যে-সকল স্বৈরশাসক ক্ষমতায় রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম কম্বোডিয়ার শাসক। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন হুন সেন, যিনি ১৯৮৪ থেকে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বছর ক্ষমতায় আছেন। ভিয়েতনামে চলছে মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা একদলীয় শাসন। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় চরিত্র ও একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রভাব থাকলেও আসিয়ান গোষ্ঠীর কার্যপ্রণালিতে মানবাধিকারের বিষয়টি মুখ্য। ফলে আসিয়ানভুক্ত দেশ মিয়ানমারে মানবতা সংকট তথা রোহিঙ্গাদের উপর ইথনিক ক্লিনজিং এর বিষয়টিকে আসিয়ান ভালো চোখে দেখছে না।
দ্বিতীয়ত, আসিয়ানভুক্ত দশটি দেশের মধ্যে তিনটি দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী উদ্বাস্তু হিসেবে আছে। দেশ তিনটি হলো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। থাইল্যান্ডে প্রায় ৩০ হাজার, মালয়েশিয়াতে দুই লাখ, ইন্দোনেশিয়াতেও ৩০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তিনটি দেশই বর্তমানে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের যে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে হবে এ নিয়ে আসিয়ানভুক্ত এই তিনটি দেশের অবস্থানই এক। তৃতীয়ত, ২০১৮ সালে আসিয়ান জোটের সেক্রেটারি জেনারেল রাখাইনের সার্বিক পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি নিয়ে জোর দেন এবং একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন। ২০১৯ সালে পুনরায় আসিয়ান জোট রোহিঙ্গাদের সংকট সমাধান এবং নিরসনের উপায় খুঁজতে বাংলাদেশের ক্যাম্পে অবস্থান করা ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে 'যাচাই-বাছাইয়ের' পর প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করা যায় এমন মত দেওয়া হয়েছিল। এই ব্যাপারে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনে আসিয়ান সচিবালয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে। চতুর্থত, ২০২১ সালে আসিয়ান জোটের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষ বৈঠক হয় ব্রুনেইয়ে। সেই বৈঠকে জোটভুক্ত ০৯টি সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করলেও মিয়ানমারকে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। তথা এটি থেকে প্রতীয়মান যে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-সহ আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোও ভালো চোখে নিচ্ছে না।
যেহেতু আসিয়ানভুক্ত অনেকগুলো রাষ্ট্রেই কমবেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বিদ্যমান তাই ঐ দেশগুলোও চায় এই সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হোক। এক্ষেত্রে আসিয়ান সাংগঠনিকভাবে দেশগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে। বাংলাদেশও চাচ্ছে এই সমর্থনকে জোরালো করার মাধ্যমে মিয়ানমারের উপর কূটনৈতিক চাপ আরও বেশি বেগবান করতে。
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
দক্ষিণ চীন সাগরের যারা অংশীজন তাদের মধ্যে অধিকাংশই আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্র। পূর্ব চীন সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত মাঝখানের এই অঞ্চলটিকে বলা হয় 'Global Energy Interstate' বা বৈশ্বিক এনার্জির আন্তঃরাজ্য'। কারণ এখানে রয়েছে প্রচুর তেল-গ্যাস। তাই চীন দখল করে নিতে চায় পুরো দক্ষিণ চীন সাগর। তাই চীন এই অঞ্চল থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনকে। ফিলিপাইন আন্তর্জাতিক আদালতে এ নিয়ে মামলাও করেছে। চীন এখানে কৃত্রিম স্যাটেলাইটও তৈরি করেছে, দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে বহুগুণে। দক্ষিণ চীন সাগরকে বলা হয় এশিয়ার ভূমধ্যসাগর (Asian Mediterranean)। ভূমধ্যসাগর যেমন ইউরোপের প্রবেশদ্বার তেমনিভাবে বৈশ্বিক এনার্জির আন্তঃরাজ্যের প্রবেশদ্বার হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগর। এসব বিবেচনায় আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব।
উপরিউক্ত ঘটনার সাথে আমরা একটি মিল খুঁজে পাই। আর ইতিহাসের মজাটি এখানেই। ভিন্নরূপে যার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আজকের একুশ শতকে চীন তেল-গ্যাস সমৃদ্ধ দক্ষিণ চীন সাগরকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে তাদের ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে। ঠিক একই ভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে হটিয়ে সমৃদ্ধিশালী ক্যারিবিয়ান সাগর দখল করে নিয়েছিল। সমৃদ্ধিশীল দক্ষিণ চীন সাগরের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নজরও দীর্ঘদিনের, এই সাগরের আশেপাশে তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সামরিক ঘাঁটি। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার শাসনামলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে সশরীরে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে সফর করেছেন। এই অঞ্চলের কথা মাথায় রেখে জো বাইডেন ক্ষমতায় এসেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে আবদ্ধ হয়েছেন 'অকাস' চুক্তিতে। ব্রুনেইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ান জোটের শীর্ষ বৈঠকে (ওয়েবিনার) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলে কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জো বাইডেন আসিয়ান ব্লককে ১০ কোটি ২০ লক্ষ ডলার প্রদানের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
একুশ শতকের আগামী দশকে এই অঞ্চল কতটা অনিরাপদ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনীতি বিশ্লেষক রবার্ট ক্যাপলানের মতে, “একুশ শতকে দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়বে।” আর এটিকেই টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে The End of a Stable Pacific তথা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তির সমাপ্তি। আধিপত্যবাদ বিস্তারের লড়াই নিয়ে সাবেক মধ্যপ্রাচ্যের মতো এই অঞ্চল পরিণত হবে ভূরাজনীতির প্লে-গ্রাউন্ডে। হয়তোবা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটি হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে কেন্দ্র করেই। এই অঞ্চলের আশেপাশের অধিকাংশ রাষ্ট্রই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি (Unipolar Military Dominance)। এই অঞ্চলের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার সাথেও ইসরায়েল বর্তমানে সম্পর্ক নরমালাইজেশন এর দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
Question to think about?
মিয়ানমার আসিয়ানভুক্ত একটি রাষ্ট্র। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বেগবান করতে পারে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Ganguly, Sumit (2020), India, Pakistan, and Bangladesh: Civil-Military Relations, Oxford: Oxford University Press
2. Khan, Zafar (2019), Balancing and stabilizing South Asia: Challenges and opportunities for sustainable peace and stability, International Journal of Conflict Management
3. Kaplan, Robert D. (2015), Asia's Cauldron: The South China Sea and the End of a Stable Pacific, Random House Trade Paperbacks
4. Beckwith, Christopher I. (2009), Empires of the Silk Road, Princeton University Press
5. Brass, Paul R. (2013), Routledge Handbook of South Asian Politics: India, Pakistan, Bangladesh, Sri Lanka, and Nepal, Routledge
6. DeVotta, Neil (2015), An Introduction to South Asian Politics, Routledge
7. Collins, Allan (2013), Building a People-oriented Security Community the ASEAN Way, Abingdon, Oxfordshire/New York: Routledge,
8. Lee, Yoong, ed. (2011), ASEAN Matters! Reflecting on the Association of Southeast Asian Nations, Singapore: World Scientific Publishing,
📄 বাংলাদেশ: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা
Theme: Major Leaps by a Minor Power
"There is some self-interest behind every friendship. There is no friendship without self-interests. This is a bitter Truth." -Chanakya
ভূমিকা: যে-কোনো রাষ্ট্রের জন্য ইউরোপের বিশাল বাজারে নিজেদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, কূটনীতি ইত্যাদি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ইউরোপ মহাদেশের রয়েছে একটি স্বতন্ত্রতা। বর্তমান একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে ইউরোপে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। একই ভাবে রাশিয়ার সাথে আমাদের রয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক। তাই এই অধ্যায়টিতে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি থেকে শুরু করে রাশিয়ার সাথে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে এবং এই ঘনিষ্ঠতা কেন বাংলাদেশের জন্য সমস্যাজনক। কিছু সমসাময়িক জটিল প্রশ্ন দিয়ে এই অধ্যায়টি শুরু করা যাক। কোন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাথে ঐতিহাসিকভাবে ভালো সম্পর্কে থাকা রাশিয়া আজ মিয়ানমারের পক্ষে? মিয়ানমারের সাথে চীনের আপাতদৃষ্টিতে ভালো সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে একটি পরোক্ষ দ্বন্দ্ব চলমান রয়েছে। এখন প্রশ্নটি হচ্ছে সেই দ্বন্দ্বটি আসলে কী নিয়ে? ফ্রান্স ও বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন যাত্রাটি ইউরোপে বাংলাদেশের জন্য যে সম্ভাবনার ক্ষেত্র উন্মোচন করছে তা বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাতে পারে?
বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। স্বীকৃতি দানের একদিন পরেই তথা ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের সাথে সোভিয়েতের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বর্তমানে মস্কোতে আমাদের দূতাবাস রয়েছে। ঢাকাতেও রাশিয়ার একটি দূতাবাস এবং চট্টগ্রামে একটি কনস্যুলেট-জেনারেল রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা
রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত এর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি পাক বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চিঠি লিখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ০৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সাথে ভারতের সরাসরি যুদ্ধ বেঁধে গেলে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী গঠন করে। যুক্তরাষ্ট্র তখন পাকিস্তানের সমর্থনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে। কিন্তু সেই প্রস্তাবে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ ছিল না। পক্ষ-বিপক্ষ দেখানো হলো ভারত ও পাকিস্তানকে। অথচ যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। ৭ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটি হলো। পাকিস্তানের পক্ষে ভোট পড়ল ১০৪ এবং বিপক্ষে মাত্র ১১। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে জাতিসংঘে ভেটো প্রদান করে। জাতিসংঘের সেই ভোটাভুটিতে কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেয়নি। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে যাওয়া মুসলিম ঐতিহ্যের পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করেছিল মুসলিম রাষ্ট্রগুলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে শুধু একবার না তিন তিনবার জাতিসংঘে ভেটো দিয়েছিল। বেলজিয়াম, ইতালি ও জাপান যৌথভাবে পুনরায় জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আবারও ভেটো প্রদান করে। তারপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হলে নিক্সন প্রশাসন পুনরায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয়বারের মতো নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে ভেটো প্রয়োগ করে। জাতিসংঘে রাশিয়ার ভেটো মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত করেছিল। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার ৭ম নৌবহরকে মোকাবিলার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের পারমাণবিক অস্ত্রবহনকারী সাবমেরিন বহর পাঠায়। সোভিয়েত নৌবহরের আগমনের ফলে মার্কিন নৌবহর পাকিস্তানকে সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়। মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা আমরা সর্বদা কৃতজ্ঞতার সাথেই স্মরণ করি।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রাশিয়ার ভূমিকা
১৯৭২ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মস্কো সফরে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় সহায়তার জন্য সোভিয়েত সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সেই সফরে বাংলাদেশ ও সোভিয়েতের মধ্যে "Soviet Union-Bangladesh Joint Declaration 1972" নামে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা, সামরিক, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী সদ্য স্বাধীন ভঙ্গুর বাংলাদেশের পুনর্গঠনেও এগিয়ে এসেছিল রাশিয়া।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরে, মংলা বন্দরে এবং কর্ণফুলি নদীতে পাকসেনারা অসংখ্য স্থল মাইন পুঁতে রেখেছিল। যে-কারণে বন্দরগুলো পুরোপুরি অচলাবস্থায় ছিল। এমনকি বাংলাদেশের হাতেও ছিল না তেমন কোনো নৌযান। পুঁতে রাখা মাইন ও নৌযানের অভাবে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠেছিল।
ওই চুক্তির কারণেই বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত সফরের মাত্র একমাসের মাথায় তথা এপ্রিল মাসে মাইন অপসারণে এগিয়ে আসে সোভিয়েত নৌবাহিনীর একটি মাইন অপসারণকারী দল। দীর্ঘ সময় ধরে এসব মাইন অপসারণে কাজ করেন সোভিয়েত মেরিন সেনারা। এমনকি মাইন বিস্ফোরণে ইউরি রেদকিন নামক একজন সোভিয়েত মেরিন প্রাণ হারান। অবশেষে সোভিয়েত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রতি তার সাহায্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। তাছাড়াও তখন স্বাধীন বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে 'মিগ-২১ ইউএম' যুদ্ধবিমান দিয়ে সোভিয়েত আমাদেরকে সহায়তা করেছিল।
সম্পর্কের পালাবদল
১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সোভিয়েতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পরবর্তী সামরিক শাসকরা সোভিয়েত বিরোধী জোট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক আফগানিস্তানে আক্রমণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিবাদে যে ৬৪টি রাষ্ট্র ১৯৮০ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস বয়কট করেছিল তার মধ্যে বাংলাদেশও একটি। আফগানিস্তান ইস্যুকে কেন্দ্র করে ১৩ জন সোভিয়েত দূতাবাস কর্মকর্তাকেও বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল এই তিনটি ক্ষেত্রের উন্নয়নে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত অর্থায়নে নরসিংদীতে বাংলাদেশের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়।
একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-রাশিয়া
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাংলাদেশ রাশিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সোভিয়েতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনরায় উন্নতি হতে শুরু করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের সফরে রাশিয়া যান। সেখানে ভ্লাদিমির পুতিন ও শেখ হাসিনার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ৭টি এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) ও ৩টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাবনা জেলার রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে প্রাক-কাঠামো নির্মাণ বিষয়ে ৫০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি, ১০০ কোটি ডলারের সামরিক অস্ত্র ক্রয় সম্পর্কিত ঋণ চুক্তি ও বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারে রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক শক্তি তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর মস্কো সফরের পর এটাই ছিল বাংলাদেশের সাথে রাশিয়ার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু, আর ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়া সফর করেন। অন্যদিকে এই পর্যন্ত কোনো রুশ প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসেননি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে 'ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান' এবং 'এমআই-১৭১ এসএইচ হেলিকপ্টার' ক্রয় করে। বর্তমানে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীতে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী রাষ্ট্রের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সাথে আমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
১৯৭১ এবং ২০১৭ এই দুটি সালের মধ্যে ফারাক অনেক। ১৯৭১ এ পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের গণহত্যাতে বিরোধিতা করেছিল রাশিয়া। একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বিপক্ষে থাকলেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে আজ আমাদের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়া আমাদের পক্ষে থাকলেও আজ রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের বিপক্ষে। দুটি দেশের মধ্যে বিপরীত অবস্থান। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক জাতিগত নিধনকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ আজকের রাশিয়া। রোহিঙ্গাদের জঙ্গি গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে রাশিয়া। অথচ একাত্তরে ছিল উল্টো। তখন ভারতীয় উপমহাদেশে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্বার্থ থাকলেও আদর্শগত একটি ব্যাপার ছিল বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার। একাত্তরে রাশিয়ার ভূমিকা শুধু জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়নি, এর পেছনে কিছু নীতিগত অবস্থানও ছিল।
মিয়ানমার-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন দিক
একটি প্রশ্ন হচ্ছে- মিয়ানমারকে কেন রাশিয়ার প্রয়োজন? ঝুঁকিহীন কৌশলে রাশিয়া যেভাবে এগুচ্ছে সেটার একটি স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করব।
প্রথমত, মিয়ানমারে রাশিয়ার স্বার্থ অর্থনৈতিক ও সামরিক। রাখাইন রাজ্যের গ্যাস-তেল চীন একা ভোগ করবে, রাশিয়া এটা চায় না। চীন ইতোমধ্যে নিজ দেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সরাসরি সড়ক ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ নির্মাণ করেছে। পূর্ব রাখাইনে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর এবং গ্যাস ও জ্বালানি তেলের টার্মিনাল তৈরি করেছে। সম্পূর্ণ মিয়ানমার চীন ও ভারতের হাতে ছেড়ে না দিয়ে রাশিয়াও মিয়ানমারের সামরিক বাজারটি দখলে রাখতে চায়। সে-কারণেই রাশিয়া মিয়ানমার বিমানবাহিনীকে তাদের অত্যাধুনিক 'মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান' সরবরাহ করে আসছে এবং সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সহায়তা করছে। মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ছাড়াও ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান, ওরলান-১০ই গোয়েন্দা ড্রোন, মি-৩৫পি হেলিকপ্টার, পান্তসির এস-১ বিমান, পেচোরা-২এম ক্ষেপনাস্ত্র ইত্যাদি সকল আধুনিক রুশ অস্ত্রের অন্যতম ক্রেতা মিয়ানমার। ১৯৯০-এর পর রাশিয়ার সহযোগিতায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর শক্তি বেড়েছে বহুগুণ। মিয়ানমার সেনাদের রাশিয়া প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। রুশ অর্থায়নে মিয়ানমারে একটি পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। আণবিক শক্তি রপ্তানি ও সামরিক সরঞ্জামাদি রপ্তানির মাধ্যমে রাশিয়া তার ফরেইন রিজার্ভ অর্জন করতে চায়।
দ্বিতীয়ত, নোবেল লরিয়েট অং সান সূচি একজন পশ্চিমাপন্থি রাজনীতিবিদ এবং তার দুই সন্তানও ব্রিটিশ নাগরিক। মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকুক সেটা রাশিয়া চায় না। আর গণতান্ত্রিক সরকার রাশিয়া থেকে তেমন অস্ত্র ক্রয়ও করবে না। কারণ গণতান্ত্রিক সরকারের তুলনায় সেনাশাসকদের অস্ত্রের বেশি প্রয়োজন। তাই রাশিয়াপন্থি সেনাবাহিনী মিয়ানমারে ক্ষমতায় থাকুক সেটাই রাশিয়ার ইচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাশিয়া বর্তমানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিচ্ছে। রাশিয়াকে মিয়ানমারের 'Key Backer' বা 'প্রধান রক্ষাকর্তা' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
তৃতীয়ত, মিয়ানমারের মতো রাশিয়াকেও নিজ দেশেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিদ্রোহকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও রাশিয়ার সংখ্যালঘু চেচেনদের অবস্থা খুব একটি ভিন্ন নয়। রোহিঙ্গাদের উপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে রাশিয়াতে চেচেনদের উপরও একই কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। বড় ভাই রাশিয়ার কাছ থেকেই হয়তো বার্মিজ সেনারা এই শিক্ষাটি পেয়েছে।
চতুর্থত, রাশিয়া মিয়ানমারকে আসিয়ানের প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ ভৌগোলিকভাবে মিয়ানমারের কৌশলগত অবস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে নজরদারি রাখা সহজ। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসেফিক কৌশলের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও রয়েছে। তাই ভারত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত মিয়ানমারে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারলে এই অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও মিয়ানমার রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ。
পঞ্চমত, রাশিয়ার সাথে মিয়ানমারের কোন সীমানা নেই। দুই মহাদেশে দুটি দেশের অবস্থান। তাই মিয়ানমার ইস্যুতে রাশিয়ার নিরাপত্তার কোন ঝুঁকিও নেই। মস্কো থেকে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনের দূরত্ব সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি। মিয়ানমারে বড় ধরনের কোন গৃহযুদ্ধ বা সংঘাত সৃষ্টি হলেও রাশিয়ায় প্রত্যক্ষ কোন প্রভাব পড়বে না। তাই বার্মিজ সেনাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করলে রাশিয়ার কোনো ঝুঁকি নেই।
ষষ্ঠত, মিয়ানমারে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে হাজারের মতো বার্মিজ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কাচিন রাজ্যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে সেনাবাহিনীকে বিমান হামলা করতে হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সেনাশক্তির বদলে বিমানশক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। যে কারণে মিয়ানমারের বিমানবাহিনীকে রাশিয়ার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
চীন-মিয়ানমার সম্পর্কের ফাটল
চীন সীমান্তের কাছাকাছি মিয়ানমারের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অনেকগুলো বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে। এসব গোষ্ঠী মিয়ানমার সরকার থেকে দীর্ঘদিন স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে যুদ্ধ করেছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক শাসক ক্ষমতায় আসার পূর্বে তথা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন অং সান সূচির চেষ্টায় প্রায় ১৪টি বিদ্রোহী বাহিনী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও আটটি গোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসন না পাওয়া অবধি তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মত দেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দাবি এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে গোপনে অস্ত্র বিক্রি করছে চীন। চীনের অস্ত্র ব্যবহার করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে পুরোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) সঙ্গে সম্প্রতি সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। এ সহিংসতা থেকে বাঁচতেই কারেন রাজ্য থেকে পালিয়ে অনেকে থাইল্যান্ড সীমান্তে আশ্রয় নিচ্ছে। তাছাড়াও কাচিন বিদ্রোহী, সান স্টেট আর্মি, টাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি ও ওয়াহ স্টেট আর্মিকে চীন এখনো সহায়তা জুগিয়ে যাচ্ছে। এই সংগঠনগুলো চীনের পরোক্ষ সহায়তায় তাদের জায়গায় নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করেছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি অদৃশ্য ফাটল তৈরি হয়েছে চীন-মিয়ানমার সম্পর্কে। মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে এসব বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়ে আসছে চীন। প্রশ্ন হচ্ছে- তাহলে মিয়ানমারের সেনারা চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? কারণ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অর্থনৈতিক দিক থেকে চীনের উপর নির্ভরশীল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। তাই মিয়ানমারের অর্থনীতি বাঁচাতে চীনের বিকল্প নেই সেনা শাসকদের কাছে। আর চীন সেই সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদেরকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে চীন।
এখন প্রশ্ন হতে পারে চীনের বিষয়টি না হয় বুঝলাম কিন্তু ভারতকে কেন মিয়ানমারের প্রয়োজন? চীনের দ্বিমুখী আচরণে মিয়ানমার কিছুটা অসন্তুষ্ট। কিন্তু মিয়ানমার যে চীনের উপর কিছুটা অসন্তুষ্ট সেটা কখনো প্রকাশ্যে নিয়ে আসে না চীনের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কথা বিবেচনা করে। তাই নিজ দেশের মধ্যে চীনা সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন মিয়ানমারের। আর ভারতেরও প্রয়োজন মিয়ানমারকে। ভারতের সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলোর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাই তাদেরকে দমন করতেও ভারতের প্রয়োজন মিয়ানমারকে।
বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক: সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
ফ্রান্স বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিটারেন্ড ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। এর দশ বছরের মাথায় তথা ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সরকারি সফরের অংশ হিসেবে প্যারিস ভ্রমণ করেন। তারপর পর্যায়ক্রমে ২০০৬ সালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান এবং ২০১০ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ফ্রান্স সফরে যান। উপরের বর্ণনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে ফ্রান্সকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্কের নতুন দিক
২০২১ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্স সফর করেন। সেই সফরে বাংলাদেশ ফ্রান্সের সাথে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি (অভিপ্রায়পত্র বা লেটার অব ইনটেন্ট) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিগুলোতে মোটাদাগে ছয়টি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়; এক. আর্থিক সহযোগিতা, দুই. বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, তিন. প্রযুক্তিগত সহায়তা, চার. প্রযোজনের নিরিখে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা, পাঁচ. প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রশিক্ষণ সবিধা দেওয়া, ছয়. বিমান নিরাপত্তা-সহ বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজন করা ইত্যাদি। তাই নির্দ্বিধায় এটি বলা যায় যে, ফ্রান্সের সাথে বাংলাদেশের এই চুক্তি আমাদের একটি অন্যতম কূটনৈতিক বিজয় এবং কূটনৈতিক পরিপক্কতার (Diplomatic Maturity) বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের জন্য একটি আশার বাণী হলো যে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ফ্রান্স বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছে। প্রথমত, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ফ্রান্স আন্তরিকতার সহিত দেখছে। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তহবিল নিশ্চিত করতে ফ্রান্স বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তৃতীয়ত, শুধু সাময়িক সময়ের জন্যই নয় বরং রোহিঙ্গাদের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফ্রান্স বাংলাদেশকে এই বিষয়ে সহায়তা করবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে বাণিজ্যও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার পরিমাণ প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের মতো। প্রথমত, যে দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে সে তালিকায় ফ্রান্সের অবস্থান পঞ্চম। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ফ্রান্স থেকে জাহাজ ও বিমানের যন্ত্রাংশ আমদানি করে। তৃতীয়ত, ইউরোপীয় বাজার থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি করার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তার একটি অন্যতম অংশ আসে ফ্রান্স থেকে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রযুক্তি বিনিময়ের মতো সম্মতিপত্র সই করেছে ফ্রান্স।
সবশেষ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম জি-২০ সম্মেলন শেষে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঢাকা সফরে আসেন। বিমানবন্দরে রাডার সিস্টেম স্থাপন, স্যাটেলাইট তৈরির ইউনিট স্থাপন ও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে প্রেসিডেন্ট ম্যাঁখোর এ সফর বাংলাদেশের জন্য নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
বাংলাদেশ যে-কারণে ফ্রান্সের কাছে গুরুত্বপূর্ণ
চারটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশ ফ্রান্সের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে。
এক. ইউরোপ ও আফ্রিকায় শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের কোনো Diplomatic Settlement বা কূটনৈতিক বন্দোবস্ত করার সুযোগ ফ্রান্সের হয়ে উঠেনি। তাই দেশটি সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিষয়ে চীন-রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝামাঝি একটা অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে দেশটির কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের রয়েছে ভূ-কৌশলগত সুবিধা। যার ফলে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তাই এই অঞ্চলে ফ্রান্স বাংলাদেশকে তার পাশে চায়।
দুই. উভয় দেশের মূল লক্ষ্য সামগ্রিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে একটি অবাধ, মুক্ত এবং নিরাপদ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। একটি বিষয় প্রতীয়মান যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের পাশাপাশি ফ্রান্সের কাছেও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সও এখানে নিজের সম্ভাবনা দেখছে।
তিন. এই অঞ্চলে রয়েছে দুটি শক্তিশালী বাজার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের যে বিশাল বাজারটি রয়েছে ফ্রান্স সেখানে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চায়। আর এজন্য এই দুটি অঞ্চলের প্রবেশপথ (Gateway) হিসেবে বাংলাদেশ ফ্রান্সের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
চার. আফ্রিকায় সাম্রাজ্য হাতছাড়া হওয়ায় সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে ফ্রান্স। তাই এই সময়ে ফ্রান্সের দরকার নতুন ব্যবসায়িক গন্তব্য। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ হতে পারে ফ্রান্সের জন্য প্রযুক্তি রপ্তানির অন্যতম অংশীদার। গত কয়েক বছরে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্স বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। ঢাকায় ফরাসি দূতাবাসের তথ্য মতে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৯৯০ সালে ২১০ মিলিয়ন ইউরো থেকে বর্তমানে ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক যেভাবে ফলপ্রসূ হতে পারে
প্রথমত, জাতিসংঘের একটি স্থায়ী সদস্য হিসেবে ফ্রান্সের ভেটো পাওয়ার রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফ্রান্স আন্তরিক হওয়ায় তাদের আন্তর্জাতিক শক্তিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বিশাল সহযোগিতা পেতে পারে। আর এই সুযোগটি বাংলাদেশকে কূটনৈতিক দক্ষতার সাথে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফরাসী প্রেসিডেন্টের এই সফর শুধু ফ্রান্স-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই উন্নয়ন করবে না বরং ইউরোপীয় অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যাত্রাটি উন্মোচিত করবে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, সার্ক ও আসিয়ানের বিশাল বাজার ইত্যাদি কারণে ফ্রান্সের দেখাদেখি ইউরোপিয় অন্যান্য দেশ স্পেন, জার্মানি, ইতালিও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতি জোর দিতে পারে। তৃতীয়ত, ফ্রান্স অন্যান্য দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নগণ্য। তাই নতুন এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কীভাবে ফরাসি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের উপর আকৃষ্ট করানো যায় সেদিকেও নজর দিতে হবে。
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ইংল্যান্ড বেরিয়ে যাওয়ায় ফ্রান্স এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম শক্তি। বলা যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে হর্তাকর্তা হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। তাই ফ্রান্সের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কীভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে নিজেদের প্রবেশাধিকার আরো বেশি বৃদ্ধি করতে পারে সেটি নির্ভর করে আমাদের Diplomatic Capital এর উপর। অপরদিকে ফ্রান্সের সহায়তায় ও অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রান্সের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি সুযোগ ছিলো এই সফর।
Question to think about?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ইংল্যান্ড বেরিয়ে যাওয়ায় ফ্রান্স এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম শক্তি। বলা যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে হর্তাকর্তা হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। তাই ফ্রান্সের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কীভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে নিজেদের প্রবেশাধিকারকে আরও বেশি বৃদ্ধি করতে পারে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Rieker, Pernille (2018), French Foreign Policy in a Changing World: Practising Grandeur, Palgrave Macmillan
2. Ambrosio, Thomas and Vandrovec, Geoffrey (2013), Mapping the Geopolitics of the Russian Federation: The Federal Assembly Addresses of Putin and Medvedev, Geopolitics Routledge
3. Gvosdev, Nikolas K. and Marsh, Christopher (2013), Russian Foreign Policy: Interests, Vectors, and Sectors, Washington: CQ Press
4. Kanet, Roger E. (2011), Kanet, Roger E (ed.), Russian foreign policy in the 21st century, London
5. Lanuzo, Steve L. (2018), The Impact of Political Liberalization on Sino Myanmar Cooperation, Naval Postgraduate School
6. Legvold, Robert (2007), Russian Foreign Policy in the 21st Century and the Shadow of the Past, Columbia University Press
7. Egreteau, Renaud (2008), India's Ambitions in Burma: More Frustration than Success? Asian Survey
8. Mankoff, Jeffrey (2011), Russian Foreign Policy: The Return of Great Power Politics, Rowman & Littlefield
9. Myers, Steven Lee (2015), The New Tsar: The Rise and Reign of Vladimir Putin, New York: Alfred A. Knopf
10. Stent, Angela E. (2014), The Limits of Partnership: U.S. Russian Relations in the Twenty-First Century, Princeton University Press.
11. Yian, Goh Geok (2010), The Question of 'China' in Burmese Chronicles, Journal of Southeast Asian Studies