📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ

📄 জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ


একবিংশ অধ্যায় Theme: Afghanistan: The Wrong Enemy
জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ

"The civil war in Afghanistan began as a civil war between Afghans and it will end as an agreement between Afghans." - Fred Halliday

ভূমিকা: একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির বিশাল একটি অংশ দখল করে আছে দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধপীড়িত দেশ আফগানিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসেই আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেছেন। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানদের পুনরুত্থান এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক পটভূমি উন্মোচন করেছে। তালেবানদের সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-কায়দার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটা খুব অনুমেয় যে, আফগানিস্তানে আল-কায়দা এবং তার মতাদর্শী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হতে পারে। তালেবান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আল-কায়দার যদি পুনরুত্থান হয় তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব জানা সত্ত্বেও কেন জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সকল সেনা প্রত্যাহার করে নিলেন? আফগানিস্তান ঘিরে আমাদের এরকম অনেক কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে কতগুলো ফ্যাক্টর এনালাইসিস করতে হবে। আমাদেরকে জানতে হবে আফগানিস্তানের সরকারব্যবস্থা, জানতে হবে স্বাধীনতার পূর্বে শতকের পর শতক ধরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আফগানদের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস, জানতে হবে স্বাধীনতার পর কীভাবে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা, সেই গৃহযুদ্ধ থেকে কীভাবে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শুরু, জানতে হবে তালেবান আসলে কারা এবং কীভাবে উত্থান হলো আল-কায়দার এবং সর্বশেষ জানতে হবে কেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের হামলা হলো। আফগানিস্তানের স্বাধীনতা পূর্ব ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের একুশ সাল পর্যন্ত পুরো ইতিহাসটি কয়েকটি পর্বে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

স্বাধীনতা পূর্ব আফগানিস্তান
আফগানিস্তান। এই অঞ্চলটি নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দখল, বেদখল ও লড়াই যুগের পর যুগ ধরে চলছে। আফগানদের মননে মগজে বিদেশি আধিপত্যবাদ বিরোধী যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটা শুধু গত কয়েক দশকেই গড়ে ওঠেনি। এজন্য আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে আফগানদের সেই পুরোনো ইতিহাসে। আফগানদের সাথে লড়াইয়ে টিকতে পারেনি আলেকজান্ডার, মুঘলরা, ব্রিটিশরা, রুশরা এবং সর্বশেষ এখন মার্কিনীরাও।

০১. আফগানিস্তানে উত্থান পতন ঘটতে থাকে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের: আফগানিস্তান একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বহু পূর্বে অনেক সাম্রাজ্য ও রাজ্যের শাসকরা আফগানিস্তানকে দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই বেশিদিন আফগানিস্তানে স্থায়ী হতে পারেনি। এখানে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গ্রেকো-বারট্রিয়ান, কুশান, হেফথালিটিস, কাবুল শাহী, সাফারি, সামানি, গজনভী, ঘুরি, খিলজি, কারতি, মুঘল, ও সবশেষে হুতাক ও দুররানি সাম্রাজ্যের মতো বাঘা বাঘা সাম্রাজ্যের। স্থানীয় আফগানদের সাথে লড়াইয়ে কেউ টিকতে পারেনি। একেক করে বিদায় নিতে হয়েছে সবাইকে।

০২. আলেকজান্ডারের আগমন: বর্তমান আফগানিস্তান অঞ্চলটির পূর্ব নাম ছিল আরিয়ানা। অর্থাৎ তখন আফগানিস্তান বলতে 'আরিয়ানা' বোঝাতো। এই আরিয়ানা এলাকায় ২০০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের পর মধ্য এশিয়া থেকে আর্যরা আসে। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আর্যদের কাছ থেকে পারস্য সাম্রাজ্যের তৎকালীন সম্রাটরা আরিয়ানা দখল করে নেয়। পারস্যের সম্রাটকে আবার পরাজিত করে আলেকজান্ডার ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আরিয়ানা দখল করে নেয়। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার কুশান জাতি আরিয়ানা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ৪র্থ শতাব্দীতে এই কুশানদের আবার পরাজিত করে আরিয়ানা দখল করে নেয় হুন নামের মধ্য এশীয় এক তুর্কি জাতি। ৩য় থেকে ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত আরিয়ানার প্রধান ধর্ম ছিল বৌদ্ধধর্ম। ঐসময়কার অনেক বৌদ্ধমন্দিরের ধ্বংসস্তূপ এখনো আপনি আফগানিস্তানে দেখতে পাবেন।

০৩. আরবদের আগমন ও ইসলাম প্রচার: তারপর খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে আরব সৈন্যরা আরিয়ানায় আসে। এই অঞ্চলের উত্তর- পশ্চিমাংশ (বর্তমান হেরাত ও সিস্তান প্রদেশ) আরবরা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে এবং তারা এখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করে। আরবদের প্রভাবে অনেক স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু কিছুদিন পর আরবরা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে গেলে অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দারা ইসলাম ধর্ম ছেড়ে পুনরায় বৌদ্ধ ধর্মে ফিরে যায়।

০৪. গজনভী রাজবংশের পর ঘুরিদের উত্থান: আরবরা চলে যাওয়ার পর সামানিদ নামের আরেক মুসলিম শাসকবংশ আফগান এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে। পরবর্তীতে ১০ম শতাব্দীতে আফগানিস্তানের পূর্বাংশে (বর্তমান গজনীতে) গজনভী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। গজনীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা মাহমুদ গজনভী আশেপাশের হিন্দু রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র আফগানিস্তানে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করেন। মাহমুদের হাত ধরে গজনী সাহিত্য ও শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং মাহমুদ অনেক বুদ্ধিজীবীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তন্মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল বিরুনী ও কবি ফেরদৌসী। গজনীর রাজা মাহমুদের মৃত্যুর পর ১২শ শতাব্দীতে ঘুরিরা পশ্চিম-মধ্য আফগানিস্তানের ঘুর শহরে ঘুরি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে।

০৫. চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং এর আগমন: তারপর মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজমি শাহেরা এই ঘুরিদেরকে এখান থেকে পরাজিত করে ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম আফগানিস্তানে খোয়ারিজমি শাসন প্রতিষ্ঠা করে। খোয়ারিজমিরাও বেশিদিন টিকতে পারেনি। মোঙ্গল সেনাপতি চেঙ্গিস খান ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দে এই অঞ্চল থেকে খোয়ারিজমিদের উৎখাত করে। চেঙ্গিস খানের পর এখানে আসে তৈমুর লং। ১৪শ শতাব্দীর শেষে মধ্য এশীয় সেনাপতি তৈমুর লং আফগানিস্তান জয় করে নেন।

০৬. মুঘল সাম্রাজ্যের জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবরও কাবুল দখল করতে এখানে আসেন: মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লঙের বংশধর জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবর ১৬শ শতাব্দীর প্রারম্ভে এখানকার আরঘুন রাজবংশের কাছ থেকে বর্তমান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করেন। ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে ভারতে অবস্থিত মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাটরা এবং পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের রাজারা এই আফগানিস্তানের দখল নিয়ে দুই শতক যুদ্ধ করেন। তখন মুঘলদের দখলে চলে যায় কাবুল, আর পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের রাজাদের দখলে চলে যায় হেরাত অঞ্চল। কান্দাহার একেক সময় একেকজনের দখলে থাকত।

০৭. সবশেষে হুতাক ও দুররানি শাসন: তারপর ১৭শ সালের প্রারম্ভে স্থানীয় ঝিলজাই গোত্রের নেতা মিরওয়াইস হুতাক এখান থেকে পারস্যের সাফাভিদদের পরাজিত করে হুতাক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। হুতাক শাসনের তিন দশক পরেই ১৭৪৭ সালে আহমদ শাহ দুররানি কান্দাহার শহরকে রাজধানী করে এখানে দুররানি সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। দুররানির মৃত্যুর পর তার পুত্র তৈমুর শাহ দুররানি কান্দাহার থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে কাবুলে নিয়ে আসেন।

০৮. আবির্ভাব হলো স্বাধীন আফগানিস্তানের: দুররানি সাম্রাজ্যের পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফগানিস্তান সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। ব্রিটিশদের সাথে আফগানদের তিন তিনটি যুদ্ধ হয়। প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ; ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২। দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ; ১৮৭৮ থেকে ১৮৮০। অবশেষে ১৯১৯ সালের 'তৃতীয় ব্রিটিশ আফগান যুদ্ধ' শেষে আফগানিস্তান যুক্তরাজ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। রাওলাপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন আফগানিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাই বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম স্বাধীন দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান।

স্বাধীনতা উত্তর আফগানিস্তান
এই পর্বে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যেভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যে-কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করেছিল, যেভাবে হয়েছিল মুজাহিদদের (পরবর্তীতে তালেবান) উত্থান এবং সর্বশেষ আলোচনা করব আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে।

০১. স্বাধীনতার পর রাজা জহিরের শাসন: ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজা জহির শাহ আফগানিস্তান শাসন করেন। রাজা জহির শাহের শাসনামলে আফগানিস্তানের ব্যাপক উন্নতি না হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক বহুতল ভবনের, ছিল নারীদের অধিকার, অন্যান্য দেশের সাথে ছিল মজবুত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। জহির শাহের সাথে যুক্তরাষ্ট্রেরও ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ১৯৩৪ সালে জহির শাহের নেতৃত্বে আফগানিস্তান 'লিগ অব নেশনস'র সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৭৩ সালে জহির শাহ চোখের চিকিৎসা করাতে ইতালি যান। আর এ সুযোগে তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ দাউদ খান অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেন।

০২. রাজা জহিরের পতন ও গৃহযুদ্ধের সূচনা: ১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাজা জহিরের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসলেন দাউদ খান। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সাথে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিয়ে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যদিকে আমেরিকা আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করে।

০৩. যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করে: রাজা জহিরের পতন ও গৃহযুদ্ধ শুরুর এই সময়টি কিন্তু আশির দশক। সোভিয়েত বনাম আমেরিকার মধ্যকার চলা স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। পুঁজিবাদে বিশ্বাসী আমেরিকা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। সেই সময়টায় তথা ১৯৭৯ সালের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আফগানিস্তান রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে।

০৪. শুরু হলো সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত): এখন প্রশ্ন হচ্ছে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে হামলা করবে? উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কেমেনিস্তান ও কিরগিজিস্তান নামে মধ্য এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলো তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর মানচিত্রে তাকালে দেখবেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলোর সাথেই আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। তাই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তার মিলিটারি ঘাঁটি গেঁড়ে খুবই সহজে সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত এই রাষ্ট্রগুলোতে হামলা করবে বলে ধারণা করেছিল সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা 'কেজিবি'। পরবর্তীতে 'কেজিবি' সোভিয়েত সরকারকে জানায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত হবে না আফগানিস্তানকে হাত ছাড়া করা। আর এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানিস্তান অপারেশন শুরু করে।

০৫. সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানকে প্রায় দখল করে নেয়: প্রবল পরাক্রমশালী তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনীর কাছে পরমাণু বোমা থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সব রকম সমরাস্ত্র ছিল। তাই ধারণা করা হচ্ছিল খুব সহজেই সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে। এমনকি আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাও ধারণা করেছিল সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান দখল করে নেবে খুব সহজেই। কয়েক মাসের মধ্যে এটা সত্যও প্রমাণিত হচ্ছিল কারণ প্রায় পুরো আফগানিস্তানেই সোভিয়েত সেনাবাহিনী নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েতের পক্ষে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা আফগানিস্তানের একদম ভেতরে প্রবেশ করা কখনোই সহজ ছিল না এবং এর চাইতেও দুরূহ কাজ ছিল আফগানিস্তানের দখল করা জায়গাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।

০৬. উত্থান হলো আফগান মুজাহিদিনদের: নিজ দেশে সোভিয়েত বাহিনীর হামলা মেনে নিতে পারেনি সাধারণ আফগানরা। সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে তখন গড়ে ওঠে ছোট ছোট কিছু আফগান গোষ্ঠী। শত বছরের আফগান ইতিহাস থেকেই আমরা দেখেছিলাম স্বাধীনতার পূর্বে কীভাবে আফগানরা ঔপনেবেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। গ্রিক আমি আলেকজেন্দার দ্যা গ্রেট থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে আফগানরা অনেক আগে থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অতএব আমরা বুঝতে পারি বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং নিজ ভূখণ্ডকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াস আফগানদের একটি ঐতিহ্যগত বিষয়। এর ফলে বিশাল শক্তিধর সোভিয়েত রেড আর্মি আফগান এই ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এই ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে বলা হতো আফগান মুজাহিদিন; যার একাংশ পরবর্তীতে তালেবান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

০৭. আমেরিকার অনুপ্রবেশ: যেহেতু তখন আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তখন এই অঞ্চলে সোভিয়েত আধিপত্যকে রুখে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আদর্শিক বিষয় ছিল। তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মুজাহিদিনদের সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছিল। সিআইএ তখন এটাও বিশ্বাস করেছিল যে, আমেরিকা যদি মুজাহিদিনদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে তাহলে এই আফগানরা রাশিয়ার সাথে হয়তো আজীবন যুদ্ধ করে যাবে। আফগানদের পুরোনো ইতিহাস ঘেঁটে আমেরিকা নিশ্চিত হলো যে, দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আফগানিস্তানকে মুক্ত করতে মুজাহিদিনরা অবশ্যই যুদ্ধ করবে। তাই সিআইএ মুজাহিদিনদের সোভিয়েত বিরোধী লড়াই ত্বরান্বিত করার জন্য ধর্মের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। আমেরিকা এই মুজাহিদিনদেরকে মুক্তিযোদ্ধা (Freedom Fighters) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

০৮. যেভাবে ধর্মকেও পুঁজি করেছিল আমেরিকা: আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা CIA বুঝতে পারে, আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ অনেক ধর্মভীরু। এমনকি আফগানরাও মনে করত সমাজতন্ত্রের অনুসারী সোভিয়েত ইউনিয়ন ধর্মে বিশ্বাসী নয়। সোভিয়েতরা নাস্তিক। তাই সাধারণ আফগানরাও ভয়ে ছিল সোভিয়েত যদি আফগানিস্তান সম্পূর্ণভাবে দখল করে নেয় তাহলে আফগানিস্তানের মানুষরা আর ধর্ম পালন করতে পারবে না। ধর্মের প্রতি সাধারণ আফগানদের এই সংবেদনশীলতা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা ধর্মের এই বিষয়টিকে পুঁজি করে মুজাহিদিনদের আরও প্ররোচিত করছে, যাতে আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে থাকে।

০৯. আমেরিকার আরেকটি লক্ষ্য ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া: এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র এই আফগান মুজাহিদিনদের ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সেই পুরোনো প্রতিশোধটাও মিটিয়ে নিতে চেয়েছিল। আপনারা জানেন যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামিজদের সাহায্য করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এতে আমেরিকার অনেক সৈন্য মারা যায়, অনেক সামরিক ক্ষতিও হয়েছিল আমেরিকার। তাই আমেরিকা চাচ্ছিল আফগান মুজাহিদদের মাধ্যমে এর একটি প্রতিশোধ নিতে।

১০. পাকিস্তান ও সৌদিও এগিয়ে আসে মুজাহিদিনদের সহায়তা করতে: আমেরিকা গণমাধ্যম ব্যবহার করে সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধের একটি মোড়ক দিতে সক্ষম হয়েছিল। তাই মধ্যপ্রাচ্যের যেই দেশগুলো ধর্মীয় কারণে আফগানিস্তানের প্রতি পূর্ব থেকেই সহানুভূতিশীল ছিল তারাও এগিয়ে আসে অর্থ নিয়ে। তাদের পাশাপাশি পাকিস্তানও এগিয়ে আসে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অর্থ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র আফগান মুজাহিদিনদের কাছে পৌঁছে দেয় খাইবার পাস হয়ে যে সীমান্ত আছে সেখান দিয়ে। আফগান মুজাহিদিনদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পর যোগ হয় সৌদি আরবের নাম। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের অংশগ্রহণ শুধু ধর্মীয় কারণেই ছিল বিষয়টি এরকম নয়। এখানে আরও অনেক ভূরাজনৈতিক কারণও ছিল।

১১. পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আফগান যুদ্ধকে "জিহাদ বা ধর্ম যুদ্ধ” হিসেবে প্রচার করে: আফগান মুজাহিদিনরা আমেরিকার সাহায্যে সেখানে সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে প্রাণপণে লড়তে শুরু করে। এতে সোভিয়েত আর্মি বাধ্য হয় বিমান হামলা চালাতে। অন্যদিকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আরব-অনারব মিলিয়ে প্রায় ৪৩টি দেশ থেকে আগত সৈন্যরা মুজাহিদিনদের পক্ষে আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেয়। এই বিশাল সংখ্যক সৈন্যের সমন্বয়ের কাজ করেছিলেন সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন। আফগান যুদ্ধে ওসামার সংযোজন এই মুজাহিদিনদের লড়াইকে নতুন মাত্রা প্রদান করে। উসামা বিন লাদেন উদ্ভাবন করেন পাহাড়ে সুরঙ্গ তৈরি করার যন্ত্র, দ্রুত দেয়াল তৈরি করার পদ্ধতি এবং আরও যুদ্ধ কৌশল। এসব কারণে আফগান মুজাহিদিনদের কাছে ওই সময়ে ওসামা খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১২. তখন আমেরিকাও স্বাগত জানিয়েছিল ওসামা বিন লাদেনকে: আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে সব তথ্যই জানত। যেহেতু ওসামা তখন আফগান মুজাহিদিনদের সাহায্য করছিল, সোভিয়েত সেনাদের হত্যা করছিল; তাই ওসামাকে নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা ছিল না। বরং তাকে নানা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণও দিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। ওই সময় যুদ্ধের কারণে তিন ভাগের এক ভাগ আফগান মানুষকে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

১৩. আবির্ভাব হলো তালেবানদের: পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে পৃথক করেছে ডুরাল্ড লাইন নামক সীমান্ত রেখা। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের সময় এই সীমান্ত এলাকায় অনেক আফগান নাগরিক অবস্থান নেয়। এই ভারতবর্ষে বি-ঔপনিবেশিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছে দারুলউলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। তাদের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এরই ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতাব্দী থেকে আফগানিস্তানের সীমান্ত এবং পাকিস্তানের উত্তর প্রদেশ এলাকায় দেওবন্দী ভাবধারার অনেক মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। যেখানে মূলত বেশির ভাগ জনসংখ্যাই পশতুন জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই সব মাদ্রাসায় যারা পড়ত তাদের বলা হতো “তালেব” অথবা “তালেবান”। তালেব অর্থ ছাত্র। তাদের শিক্ষক ছিল মোল্লা ওমরের মতো স্থানীয় কিছু আলমেরা। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় এখানকার ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানিস্তানে পাঠানো হতো সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

১৪. আমেরিকা মুজাহিদিনদের হাতে তুলে দিল অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল: ১৯৮৬ সালে মুজাহিদিনদের যুদ্ধ কৌশলে স্টিংগার নামক অ্যান্টি এয়ারক্রাফট এর সংযোজন ছিল এই যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। মূলত অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইলের আঘাতেই ধসে পড়ত সোভিয়েত যুদ্ধ বিমানগুলো। আর এই মিসাইল মুজাহিদিনদের হাতে তুলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা ছিল ঐ সময়কার সবচেয়ে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি।

১৫. আফগানদের জয় ও সোভিয়েতের পতন: সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী মিখায়েল গর্বাচেভ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান ছেড়ে দিতে। কারণ তাদের অনেক রক্ত ঝরেছে। ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হওয়া আফগান মুজাহিদিনরা আমেরিকা থেকে পাওয়া মিসাইল দিয়ে এক কথায় দিশেহারা করে তুলেছিল সোভিয়েত বাহিনীকে। অবশেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে আসে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা এই ১০ বছরের যুদ্ধে আমেরিকা, সৌদি ও পাকিস্তানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত আফগান মুজাহিদিনদের জয় হয়। দ্বিতীয় বারের মতো মাতৃভূমিকে স্বাধীন করায় আফগান নাগরিকরা আনন্দিত হয়েছিল।

১৬. পতন হলো সমাজতন্ত্রের: এই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা আর কোনো দিন কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর পরেই মাত্র দেড় বছরের মাথায় ১৯৯০ সালে সমাজতন্ত্রের পতন হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও স্বাধীন হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে আফগান যুদ্ধের সুফল পেয়েছিল পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলো। ফলস্বরূপ তারা সোভিয়েত থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল।

১৭. তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েও সুফল পেল না আফগানিস্তান: দেখা গেল আফগান যুদ্ধ অন্যদের সুফল বয়ে আনলেও আফগানদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন হলো না। অনেকেই বাড়ি-ঘরহীন হয়ে গেল। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানদের মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করার মতো সক্ষমতা ছিল না। সোভিয়েত যুদ্ধে আফগানদের জয় ছিল মূলত আফগানিস্তানে আরেকটি যুদ্ধের শুরু। সোভিয়েত যুদ্ধের ফলস্বরূপ আফগানিস্তান পেয়েছিল নতুন আরেকটি গৃহযুদ্ধ। ১৯৯২-২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ (Civil War) চলছিল।

১৮. মুজাহিদিনদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল: সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে স্বাধীন হলো আফগানিস্তান। এখন প্রয়োজন নতুন সরকার গঠনের। কিন্তু কাকে বানানো হবে সরকার, কে হবেন রাষ্ট্রপ্রধান এ নিয়ে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েত যুদ্ধের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকলেও সোভিয়েত সেনারা চলে যাওয়ার পর দেখা গেল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এরা প্রতিটা প্রদেশে বিভক্ত হয়ে পড়ল এবং একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করল। তারপর মুজাহিদ নেতারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে প্রদেশ শাসন করা শুরু করল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে। আর এই সময়ে মোল্লা ওমরের উত্থান ঘটে সাথে তালেবানের উত্থানও শুরু। কান্দাহার প্রদেশের মোল্লা উমর ঘোষণা করল, সে এখন একটি খাঁটি 'ইসলামিক স্টেট' প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

১৯. আফগানিস্তানের রাজনীতিতে তালেবানের প্রবেশ: যেহেতু তখন আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলছিল, এই সুযোগে মোল্লা ওমর ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বিপুল সংখ্যক অনুসারী তৈরি করেন। এতদিন যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল তারা সবাই মুজাহিদিন হিসেবেই পরিচিত ছিল। মোল্লা ওমরের গ্রুপে যোগ দেওয়া সেই মুজাহিদিনরাই 'তালেবান' হিসেবে পরিচিতি পেল। মুজাহিদিন থেকে তালেবান। ১৯৯৪ সালের মাঝেই মোল্লা ওমর ও তার অনুসারীরা আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সেখানে তার ভাষায় ইসলামি শরিয়া আইন চালু করে। আর সাধারণ মানুষও চেয়েছিল গৃহযুদ্ধের অবসান হোক। দেখা গেল সাধারণ মানুষের সহায়তায় তালেবানরা একের পর এক প্রদেশ দখল করতে থাকে।

২০. ওসামা বিন লাদেন পুনরায় আফগানিস্তানে ফিরে আসে: ১৯৯৫ সালে তালেবানরা ঘোষণা করল তারা আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়। তখন ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে আবার ফিরে আসে। ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমর নিজেদের মাঝে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। এক সময় তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে নেয়।

২১. আল-কায়দার উত্থান: একের পর এক প্রদেশ যখন তালেবানদের দখলে চলে আসতে থাকে ওসামা বিন লাদেন তখন তালেবান সরকারকে সাহায্য করতে থাকে কীভাবে প্রদেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়, কীভাবে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা যায়, নানান কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করেন তিনি। এই সুযোগে ১৯৯৬ সালে ওসামা বিন লাদেন তার পূর্ব গঠিত সশস্ত্র আর্মি নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে তোলেন। ফলশ্রুতিতে ওসামা নিজের একটি সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয় আফগানিস্তানে যার নাম হয় 'আল কায়েদা'।

২২. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বের সূচনা: তালেবানরা যখন কাবুলে ক্ষমতা দখল করল, তখন তারা ভেবেছিল আমেরিকা থেকে তারা সাহায্য পেতেই থাকবে। সাহায্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছিলও বটে। তারপর তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের একটি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় তালেবানদের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন। দ্বন্দ্বের জেরে ওসামা বিন লাদেন তখন ঘোষণা করে আমেরিকানরা মুসলমানদের শত্রু। এভাবে আমেরিকার সাথে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। এরপর ধারণা করা হয় কেনিয়া-সহ বেশ কয়েকটি দেশে আমেরিকান দূতাবাসে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়দা হামলা চালায়। আমেরিকা তখন তালেবান নেতা মোল্লা ওমরকে এই বিষয়ে চাপ দিতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ওসামা বিন লাদেন তালেবানদের সহায়তায় সন্ত্রাসী হামলা করছে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মোল্লা ওমর সেটা অস্বীকার করে এবং আমেরিকাকে ইসলামের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে।

২৩. যেখান থেকে পশ্চিমা বিশ্বে তালেবান বিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়: এই সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের দুটো বিশাল মূর্তি, যা আগফানিস্তানে শত শত বছর ধরে ছিল, সেগুলো তালেবানরা ভেঙে ফেলে। এই ঘটনার পর আমেরিকা ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও তালেবান বিরোধী একটি মনোভাব গড়ে ওঠে। তখন নানা কারণে সৌদি আরবও তালেবনাদের আর্থিক সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়।

২৪. টুইন টাওয়ারের ঘটনা: পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র-সহ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর তালেবান পুনরায় বিশ্ববাসীর নজরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের এই হামলা আল-কায়েদাই চালিয়েছিল বলে অভিযোগ তোলে যুক্তরাষ্ট্রর। আর তাতে তালেবানদের উপরেও দোষারোপ ওঠে। কারণ, তালেবানরাই তাদের দেশে আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। আল-কায়েদার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল আফগানিস্তান। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তালেবানদের আলটিমেটাম দেয়, ওসামা বিন লাদেন এবং আল কায়েদার সদস্যদের আমেরিকার হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু তালেবান নেতা মোল্লা ওমর তাতে অস্বীকার করেন।

২৫. ন্যাটো জোটের আফগানিস্তান আক্রমণ ও তালেবান সরকারের পতন: মোল্লা ওমর আমেরিকার টুইনটাওয়ার হামলা প্রসঙ্গে জর্জ বুশকে বলেন এখানে আল-কায়দার বা তালেবানদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর জেরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন তালেবান বিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সিদ্ধান্ত নেন আফগানিস্তানে হামলা চালাবেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হলো হামলা। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ন্যাটো জোট তালেবানদের পতন ঘটায়। এভাবেই এক সময় যেই আমেরিকা নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ধর্মকে পুঁজি করে, অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তালেবানদের সাহায্য করেছিল; সেই আমেরিকাই আবার এই তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। শক্তিশালী ন্যাটো বাহিনীর কাছে পতন হয় তালেবানদের। এভাবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলা তালেবান শাসনের অবসান ঘটে।

২৬. তারপর আফগানিস্তান পেল নতুন একটি সংবিধান ও নির্বাচন: তালেবানদের পতনের পর জাতিসংঘ দেশটিতে বহুজাতিগোষ্ঠীয় সরকার স্থাপনে উৎসাহ দেয়। জার্মানির বন শহরে এ নিয়ে সম্মেলনের পর ২০০১-এর ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তার ৬ মাস পরে একটি মধ্যবর্তী সরকার গঠিত হয় যা ২০০৪ সালে একটি নতুন সংবিধান পাশ করে। নতুন সংবিধান অনুযায়ী আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট-ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৪ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রথম জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচনে জয়ী হয়ে হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। আফগানিস্তানের তথাকথিত নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং এখানকার গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানে থেকে যায়।

২৭. তালেবানদের সাথে হামিদ কারজাই এর দ্বন্দ্ব: নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মার্কিন মদদপুষ্ট হামিদ কারজাই আফগানিস্তানে সরকার গঠন করল। কিন্তু দেখা গেল এতেও আফগান সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। নতুন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সরকার কাবুলেই কেবল নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ভালো ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বাকি প্রদেশগুলোতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ তারা নিতে পারনি। ২০০৬ সাল থেকে দেখা গেল তালেবানরা আবার বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত থেকে একত্রিত হয়ে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে শুরু করল আমেরিকান সেনাবাহিনীর উপর।

২৮. বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের ব্যর্থ পরিকল্পনা: নাইন-ইলেভেনের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট জঙ্গিবাদের দমন, আফগানিস্তানের জনগণের কথিত মানবাধিকার রক্ষা, এখানে গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করতে থাকে। তালেবানরা যেন পুনরায় সংগঠিত হয়ে আমেরিকাতে জঙ্গি হামলা চালাতে না পারে সেজন্য বছরের পর বছর মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে অবস্থান নেয়। ২০০৯ সালে বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পূর্বে বুশের সমালোচনা করে বলেছিলেন তিনি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন কিন্তু সেনা প্রত্যাহার দূরের কথা যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটির কথা বিবেচনা করে তিনি আরও সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছিলেন। তারপর ২০১৬ সালে ট্রাম্পও তার রাজনৈতিক প্রচারণায় বলেছিলেন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের দোহায় ট্রাম্পের নেতৃত্বে তালেবানের সাথে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল ১ মে ২০২১ এর মধ্যে ন্যাটোর সৈন্য আফগানিস্তানের মাটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার হবে। কিন্তু ন্যাটোর মিলিটারি অ্যালায়েন্সের সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টোলটেনবার্গ এর সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্পের সাথে তালেবানদের যে চুক্তি হয়েছে সেখানে তালেবানরা আমাদের সকল দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তাই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় এখনো হয়নি।

২৯. অবশেষে বাইডেন সকল সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন: ট্রাম্পকে পরাজিত করে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসলেন জো বাইডেন। সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা দিয়েছেন আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। বাইডেন তাঁর ঘোষণায় বলেন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্পের পর তিনি চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যাঁকে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। সেনা প্রত্যাহারের এই দায়িত্বটি জো বাইডেন তার পরবর্তী কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য রেখে যেতে চান না। তাই বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আর সময় বৃদ্ধি করতে চাচ্ছিলেন না। অবশেষে বাইডেনের সিদ্ধান্তে ২০২১ সালের ২ জুলাই মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় বাগরাম বিমান ঘাঁটি ত্যাগ করে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে তালেবান আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেছেন। তাঁরা বলছেন, তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আল-কায়েদা আবার আফগানিস্তানকে তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে পারে। তালেবানরা যে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এটা আমেরিকাও জানে। এটা জানা সত্ত্বেও বাইডেনের সকল সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক শিবিরে জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্ক।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কারণ
যে যে কারণে বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন :
০১. সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। "প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মতে ২০০১ ও ২০২১ সাল এক নয়। কারণ ২০০১ সালে আমরা আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন করেছি তার মানে এটা নয় যে আমাদেরকে ২০২১ সালে এসেও এখানে সেনা মোতায়েন রাখতে হবে।" এখন কথা হচ্ছে ২০০১ ও ২০২১ সাল কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন? ২০০১ সালে তালেবানরা এখনকার চেয়ে অনেক সংগঠিত ছিল এবং তখন আল-কায়দা যে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করে বসবে এটা যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার বাহিরে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি বর্তমানে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিত তালেবানদেরকে চোখে চোখে রাখছে, তারা তালেবানদের গতিবেগ সর্বদা পর্যবেক্ষণ করছে। তাই এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও এলছেন, "২০০১ ও ২০২১ সাল এক নয়।" একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে পরাশক্তি এমেরিকার উপর হামলা চালানোর মতো সাহস কারো নেই।

০২. আফগানিস্তান এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিঙ্কেনের ভাষ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন আফগানিস্তানের থেকেও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে আছে। তার মধ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, জলবায়ু সংকট, করোনা সংকটসহ দেশের জ্বালানি সম্পদের দেখভালের বিষয়গুলো রয়েছে। এখন এই বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে অধিকতর মনোযোগ দিতে হচ্ছে। করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতি সামাল দিতেই বাইডেন প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর পেছনে আমেরিকার গত বিশ বছরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে এবং দুই হাজার তিনশো আমেরিকান সেনা নিহত হয়েছে। বাইডেন চাচ্ছে না এখন আর নতুন করে কোনো মার্কিন সেনা মারা যাক এবং বিদেশের মাটিতে অর্থ খরচের চেয়ে নিজ দেশই এখন বাইডেন প্রশাসনের অগ্রাধিকার।

০৩. যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ফক্স নিউজে তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরাক থেকে আমরা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের বিভিন্ন এলাকা জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের দখলে চলে গিয়েছিল। ফলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ফের ইরাকে পাঠাতে হয়েছিল। এখন কথা হচ্ছে আফগানিস্তানেও যদি এরকম কিছু ঘটে তাহলে বাইডেন কী করবেন? এই প্রশ্নোত্তরে বাইডেন বলেছেন, আফগানিস্তানে এরকম কিছু ঘটলে এটিকে মোকাবিলা করতে তিনি ড্রোন ব্যবহার করবেন। আমেরিকা থেকে ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন আফগানিস্তান থেকে একেবারে চোখ সরিয়ে নেবেন, বিষয়টি এমন নয়। আমেরিকা যে-কোনো সময় যে-কোনো স্থানে নিজের নিরাপত্তার জন্য অবস্থান গ্রহণে সক্ষম বলে দাবি করেছেন বাইডেন।

০৪. যুক্তরাষ্ট্র এখন জাতিসংঘকে বিকল্প হিসেবে ভাবছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের উপর দায়িত্ব অর্পণ। বাইডেন চাচ্ছে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর জাতিসংঘ আফগান পরিস্থিতির উপর নজর রাখবে। সেখানে নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা জাতিসংঘের রয়েছে। বাইডেন মূলত চাচ্ছে নিজ দেশের টাকা আফগানিস্তানে আর খরচ না করে বরং জাতিসংঘের অর্থায়নে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী জাতিসংঘের পিস কিপিং মিশনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।

০৫. আফগানিস্তানের দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতে দায়ভারটি আফগান সরকারের। ২০২০ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিস তার নির্বাচনি প্রচারণায় বলেছিলেন, তিনি যে করেই হোক আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। তাই সেই নির্বাচনি মেনিফেস্টো বাস্তবায়নে সেনা প্রত্যাহার একটি পরোক্ষ কারণও বটে। যেহেতু আমেরিকা ২০ বছর পূর্বে সেনা মোতায়েন করেছিল আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আফগানদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে এবং যেহেতু এখন বাইডেন সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তাই এখন থেকে আফগান জনগণকে রক্ষা করবে কে? এমন প্রশ্নোত্তরে হোয়াইট হাউসের জবাব হলো আফগানিস্তানে যা হবার হোক এতে আমাদের দায়ভার নেই। সেখানে যদি এখন তালেবানদের সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় অথবা গৃহযুদ্ধে যদি সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয় সেটার দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র এখন কেন নেবে? যুক্তরাষ্ট্রের মতে সেটার দায়ভার আফগান সরকারের।

০৬. আরেকটি কারণ হলো তালেবানদের অবস্থা বিবেচনায়। গত বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতিতে তালেবানদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক তালেবান সেনা নিহত হয়েছে। সাথে হাজার হাজার আফগান জনগণও মারা গিয়েছে। তাই বাইডেনের সকল সেনা প্রত্যাহারে তালেবানদেরও লাভ হয়েছে। নিজ দেশে তালেবানরা এখন সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। তালেবানরাও জানে নতুন করে যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে অথবা অন্য কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় তাহলে আমেরিকাও তাদেরকে ছেড়ে দেবে না. পাল্টা প্রতিশোধ নেবেই। এসব বিবেচনা করেই তালেবানরাও এখন আমেরিকার উপর হামলা, পাল্টা হামলার দিকে না গিয়ে নিজ দেশের দিকেই বেশি নজর দেবে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে। বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন সমীকরণ।

আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জয়-পরাজয়
হর্স রেইসের মতো আফগানিস্তান নিয়ে মিডিয়াগুলোর এত বেশি তৎপরতা এবং তাদের ক্লিক বেইটিং হেড লাইন দেখে কিছু স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে। কিছু হেডিং এরকম; আফগানিস্তান থেকে শূন্য হাতে ফিরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শান্তি না ফিরিয়ে আফগান ছাড়ছে ন্যাটো সৈন্যরা, তালেবানদের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে মার্কিন সেনারা, সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল করলেন জো বাইডেন ইত্যাদি। উপরিউক্ত মুখরোচক এসব হেডলাইন দেখে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন জাগে। এক. আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন আর কী কাজ করা বাকি আছে যেগুলো করতে পারলে আমরা বলতে পারতাম যুক্তরাষ্ট্র খালি হাতে ফেরেনি? দুই. আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এসেছিল? তিন. যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই আফগানিস্তান ইস্যুতে সফল হয় নি? চার, ভেটেরান ও চতুর জো বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি কি তাহলে ভুল ছিল? পাঁচ. আফগানিস্তানকে ধ্বংস করার মতো আর কি কিছু বাকি ছিলো

আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে ২০০১ সালে যখন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানের মাটিতে পা রাখে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ বলেছিল তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মোটাদাগে তিনটি। প্রথমত, আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয়ত, জঙ্গিবাদ দমন করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসেও আফগানিস্তানে শান্তিও নেই, গণতন্ত্রও নেই। এখন এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি আপনি বলতেই পারি যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ বা খালি হাতে ফিরে গিয়েছে। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্যই ছিল শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কিন্তু কোনোটাই তারা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর শাসনামল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত যারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাদের সকলের পররাষ্ট্রনীতিগুলো একটু বিশ্লেষণ করলে আপনি দুটো বিষয় বা ধারা খুঁজে পাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সেই দুইটি উদ্দেশ্য হলো:

এক. Normative Goal: নরমেটিভ এর মানে হলো আদর্শগত। এমন কিছু করা যেটা আসলেই করা উচিত বা নীতিগত ভাবে সঠিক। ধরুন একটি দেশ খুবই সংকটে আছে, সেদেশের জনগণ খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছে, রাজনৈতিক সহিংসতা রয়েছে, মানবাধিকার অনুপস্থিত এবং সেখানে গৃহযুদ্ধে মানুষ মারা যাচ্ছে। তাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সংকটে পড়া সে দেশটির পাশে দাঁড়িয়ে সংকটের সমাধান করা, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা, শান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা এবং যুক্তরাষ্ট্রও এটা বিশ্বাস করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব আবশ্যক।

দুই. Realistic Goal: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো যে করেই হোক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মেটেরিয়ালিস্টিক লাভ। যে কাজটি করলে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেই কাজটিই করবে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব যুক্তরাষ্ট্র দেখে না। ধরুন একটি পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লাভ কিন্তু সেই নীতিটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল ক্ষতি বয়ে আনবে তখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে না। অর্থাৎ নিজের লাভ হলেই হলো। সহজ কথায় যুক্তরাষ্ট্র Zero-Sum Game এ বিশ্বাস করে। এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র জানত ইরাক বা লিবিয়ায় যুদ্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হবে কিন্তু ইরাক ও লিবিয়া দুটি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজের লাভের কথা বিবেচনা করে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এই দুইটি ধারার প্রথমটি (Normative Goal) হলো এক কথায় আই ওয়াশ। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই বলে আমরা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, বিশ্বে শান্তি আনতে চাই। এটা স্রেফ একটি আই ওয়াশ। আর দ্বিতীয় যে ধারাটি (Realistic Goal) এটাই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নীতি। আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এটাও ছিল একটি আই ওয়াশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এখন ভাষ্য হলো আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এটা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। জো বাইডেন বলছেন আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব আফগান সরকার ও আফগান জনগণের।

আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দ্বিতীয় যে রিয়ালিস্টিক উদ্দেশ্য সেটি ঠিকই আদায় করে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হলো?

এক. আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো উদ্দেশ্যের একটি ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ এই দীর্ঘ বিশ বছর যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে যুদ্ধ করে জয়ী হতে পারেনি। দক্ষিণ ভিয়েতনামিজদের তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্যাধুনিক মিসাইল ও রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে। ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার সেনা নিহত হয় এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়ি ফিরতে হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক একই কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তালেবানরা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তালেবানদের হাতে হাজার হাজার সোভিয়েত সেনা নিহত হয়। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজয় বরণ করে আফগানিস্তান ত্যাগ করে। সময়টি যেহেতু কোল্ড ওয়ার পিরিয়ড: তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তালেবানদের জয়কে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জয় হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এই দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফল।

দুই, আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তালেবান ও আল-কায়দা মিলে খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি হুমকি ছিল। আফগানিস্তানে গত বিশ বছরের ন্যাটো বাহিনীর অবস্থান তালেবানদের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তালেবানদের সাথে আফগান জনগণের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাধাতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানদের পুনরুত্থানের পর আফগানিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য তালেবানরা আর হুমকি না। যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তার জন্য এখন তিনটি রাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে- রাশিয়া, ইরান, চীন। তাই আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন বজায় রেখে বিলিয়ন ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রের আসলে কোনো লাভ ছিল না। আফগানিস্তানে যে পরিমাণ টাকা খরচ হতো সেসব টাকা এখন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে পারবে। আফগানিস্তানে শুধু শুধু খরচ না করে মহামারির ফলে ভেঙে যাওয়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করাই জো বাইডেনের প্রাধান্য ছিল। অর্থাৎ Cost Benefit Analyses এর দিক থেকে জো বাইডেন যা করেছেন তাই ঠিকই আছে।

তিন. যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে গিয়েছে কিন্তু এখানে একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিয়ে যাচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো তালেবান শাসনকে কেন্দ্র করে নতুন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারে।

কী ক্ষতি হলো যুক্তরাষ্ট্রের
তবে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন একেবারেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে না, অন্যদিকে আশানুরূপ সাফল্যও পায়নি। আফগানিস্তান ইস্যুতে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র যে ইমেজ সংকটে পড়েছে সেটা কাটিয়ে উঠতে মার্কিনীদের আরও অনেক সময় লাগবে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার তালিকাটি অনেকটা 'স্নো-বল ইফেক্ট' এর মতো।

Snowball Effect
এই টার্মটি মাইক্রো ইকোনমিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ‘Snowball' এর সরল বাংলা হচ্ছে তুষারগোলক। একটি ছোট বরফের টুকরা যখন পাহারের চূড়া থেকে গড়াতে গড়াতে নিচে পড়তে থাকে তখন সেই ছোট বরফের টুকরাটি বিশাল আকার ধারণ করে। অর্থাৎ এমন কিছু যেটার প্রভাব প্রথমে ছোট থাকে কিন্তু পরবর্তীতে বিশাল আকার ধারণ করে। আফগানিস্তান ইস্যুতে Snowball effect টা হচ্ছে এরকম যে, মার্কিনীরা এই শতকের শুরুর দিকে আফগানিস্তানে এসেছিল নিজেদের তথাকথিত সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় মার্কিনীদের লাভের পরিবর্তে বিশাল ক্ষতি হয়েছে এবং সেই ক্ষয়ক্ষতির তালিকাটি দিনদিন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ;
এক. একটানা বিশ বছর এখানে ন্যাটো বাহিনী অবস্থান করেও রেজিম পরিবর্তন করতে পারেনি, ন্যাটো বাহিনী বিশ বছর আগে যাদেরকে সরাতে এখানে এসেছিল তারাই এখন সরকার গঠন করেছে। দুই, আফগানিস্তানে তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তিন, গত বিশ বছরে অনেক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। চার, কূটনৈতিক অঙ্গনে এটিকে মার্কিনীদের বড় পরাজয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পাঁচ, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ নষ্ট হয়েছে (যেটাকে "Scars on the face" বা "চেহারায় ক্ষতের দাগ” বলা হচ্ছে)। তথা আফগান ইস্যুতে Snowball Effectটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির তালিকাটি পাহাড়ের চূড়া থেকে পতিত হওয়া তুষারগোলকের মতো দীর্ঘস্থায়ী হওয়া।

জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
আফগানিস্তান কী শুধুই বিদেশি রাষ্ট্র কর্তৃক আক্রমণের স্বীকার একটি দেশ? নাকি এই দেশটিতেও জাতিগত সংঘাত, গৃহযুদ্ধ ছিল ইতিহাসের বড় একটি অংশ? ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে যে-সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে সেইসব ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে মুজাহিদিনদের সশস্ত্র প্রতিরোধ, তালেবানদের উত্থান, এবং টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনার পর ন্যাটো জোটের আফগানিস্তান আক্রমণ ইত্যাদি সবগুলো ঘটনারই কেন্দ্রবিন্দুতেই এই আমেরিকা। ২০০১ সালে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আক্রমণ ২০২১ সালের ৩০ই আগস্ট সমাপ্ত হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল ক্রিস ডনাহিউ যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সৈন্য হিসেবে সেদিন আফগানিস্তানের মাটি ত্যাগ করেন।

সেই ১৯৮০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে আমেরিকানরা আসলে কীভাবে দেখে? আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্র আসলে কীভাবে মূল্যায়ন করে? জেরিমি সুরি হচ্ছেন একজন আমেরিকান ইতিহাসবিদ (ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ)। তার লিখিত বই, American Narratives: An Introductory Historiographical Reader। এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তান ইস্যুতে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আসলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে থেকেই যুগ যুগ ধরে সেখানে নিয়মিত বিরতিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এটা আমাদের ব্যর্থতা যে, এই যুদ্ধাবস্থার বিপরীতে আমরা আফগানিস্তানে তেমন কিছু প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি যা আমাদের মহত্ত্বকে মহিমান্বিত করে। আফগানিস্তানে মানুষজন ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত এবং তাদের জাতিগত সহিংসতা এতই বেশি যে সেখানে কখনোই সর্বজনীন আফগান জাতীয়তাবাদী পরিচয় বিরাজ করেনি। এই জাতিগত দ্বন্দ্ব এখন আরও বৃদ্ধি পাবে কারণ বিগত কয়েক দশকের যুদ্ধ তাদের কাছে খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী যেটা আগামী ৩০-৪০ বছরে তাদের মধ্যে জাতিগত সহিংসতাকে একটি ভয়ানক রূপ দিতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, আফগানিস্তান সংকট এবং গৃহযুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে একপাক্ষিক ভাবে দোষ দেয়া একটু একপেশে আলাপ। তিনি বলেন ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট রেজিম বিস্তারের ক্রমবর্ধমান প্রয়াস ১৯৭৯ সালে তাদের আফগানিস্তান আক্রমণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আফগানিস্তান জাতিগুলো যেহেতু সবসময় একটি যুদ্ধরত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে; সোভিয়েত আক্রমণ তাদের বিদ্রোহী সত্তাকে আরও চরমপন্থি করে তুলেছে। অর্থাৎ সে সময় সোভিয়েত সেখানে কমিউনিস্ট রেজিম স্থাপন সেখানকার মানুষের সামরিক প্রতিউত্তরকে ত্বরান্বিত করেছিল। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে না গেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের আক্রমণ বন্ধ করত না এবং মুজাহিদিনদের সাথে যুদ্ধ চালাত। আর যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া মুজাহিদিনরা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে এত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত না। সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল জোরপূর্বকভাবে একটি সিস্টেমকে আফগানিস্তানের উপর চাপিয়ে দিতে। তাই সেই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের না আসার মধ্যে কোনো এক্সক্লুসিভিটি নেই।"

১৯১৯ সালে আফগানিস্তান 'তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান' যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। আফগানিস্তানে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ৪টি অঞ্চলে বিভক্ত। অঞ্চলগুলো হলো হেরাত, কাবুল, মাজার ই শরীফ এবং কান্দাহার। এই অঞ্চলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন গোত্র ও জাতির বসবাস। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, তার্কমেন, বেলুচ, নুরিস্তানি, পামারি, আরব, গোজার, আইমাক, কুইজিলবাশ, পাশাই, কির্গি ইত্যাদি। স্বাধীনতার আগ থেকেই তাদের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব বিরাজমান। যেমন- ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এর মধ্যে আমির আব্দুল রহমান খান হাজারাদের আফগানিস্তান থেকে বিতারিত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ করেন। কারণ হাজারারা ছিল শিয়া মুসলিম। তাদের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শুধু মাত্র শিয়া হওয়ার কারণে মারাত্মক হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়। তাদের উপর নির্যাতন করা অধিকাংশ মানুষই ছিল সুন্নি মতাদর্শী সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতুন। তখন পশতুন গোত্রের ধর্মীয় নেতারা এমনও বলেছিলেন যে যদি কেউ হাজারাদের উপর ধংসযজ্ঞ চালায় তাহলে সে খোদা কর্তৃক পুরস্কৃত হবে। এই সময়ে ৬০% হাজারা নিহত হয় এবং আশেপাশের দেশে পালিয়ে চলে যায়। আর বাকিরা পশতুনদের দাসে পরিণত হয়। ১৯০১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পশতুনরা আফগানিস্তান থেকে পৃথক হওয়ার মাধ্যমে একটি "স্বাধীন পাসতুনিয়ান রাষ্ট্র” গঠনের দাবি তুলে। এই কাল্পনিক রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে নিয়ে গঠিত। তারা এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে সামরিক অভিযানও চালায়। যেগুলো অন্য সব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনে রসদ যোগায় যা আফগানিস্তানের জাতিগত সহিংসতাকে ত্বরান্বিত করে। আফগানিস্তানে জাতিগত দ্বন্দ্ব কতটা প্রকট সেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মুজাদিদদের মধ্যকার কোন্দলই তার বড় প্রমাণ। ১৯৯০-১৯৯৪ এ মুজাহিদ নেতারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে প্রদেশ শাসন করা শুরু করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯৫ তে আমেরিকার সহায়তায় যখন তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসে তখন তারা হাজারা, তাজিক, উজবেকদের উপর চরম নৃশংসতা চালায়। ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সালে তালেবানদের বিরোধী হিসেবে গঠিত হয় "নর্দান এলায়েন্স”। তারা ইরান, রাশিয়া এবং ভারতের সমর্থনও পায়। ১৯৯৭ সালে নর্দান এলায়েন্স দলটি প্রায় ২০০০ তালেবান সদস্যকে হত্যা করে। আগস্ট ৮, ১৯৯৮ সালে তালেবান মাজার ই শরীফ অঞ্চল আক্রমণ করে ৫ হাজার উজবেকদের হত্যা করে। অতএব, নর্দান এলায়েন্স এবং তালেবান দুটো বাহিনীর মধ্যে খুব বেশি মতাদর্শগত এবং ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য না থাকলেও তাদের জাতিগত পার্থক্য তাদের মধ্য রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানের সেই জাতিগত সমস্যা আরও বিরাট আকারে দেখা দিয়েছে তালেবান সরকারে পশতুনদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে।

আফগান জনগণের মধ্যে বংশ বা গোত্রপ্রথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নিজ নিজ গোত্রের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। তাই শুধু তালেবানদের হাতেই ক্ষমতা থাকবে এটা আজকে না হলেও কয়েকবছর পর অন্য গোত্রের মানুষ মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য তালেবানদের উচিত সবাইকে শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা। বিশ্লেষকরা বলছেন তালেবানরা লেবাননদের রাজনৈতিক মডেল তথা "Confessionalist" অনুসরণ করা উচিত। Confessionalist এই সিস্টেমের মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বণ্টন করে দেওয়া। যেমন- লেবাননে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে লেবানন তার সংবিধানের কনফেশনালিস্ট সিস্টেমটি প্রয়োগ করেছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট হন একজন খ্রিষ্টান, প্রধানমন্ত্রী হন সুন্নি থেকে এবং স্পিকার হবেন শিয়া থেকে। অর্থাৎ সংঘাত এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সবগুলো গোষ্ঠীর সমন্বয় করে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ব্যবস্থা তালেবানরা হয়তোবা গ্রহণ করবে না, যা পরবর্তী গোত্র দ্বন্দ্বকে উসকে দিতে পারে।

আফগানিস্তানে তালেবান ছাড়াও এখন বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সামরিক ও জিহাদি গ্রুপ রয়েছে যাদের মধ্যে ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ আফগানিস্তান, হক্কানি নেটওয়ার্ক, আইএসএস খোরাসান (ISIS K) ইত্যাদি অন্যতম। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালে বিলুপ্ত হওয়া নর্দান এলায়েন্স এখন আবার নতুন রূপে 'ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ অাফগানিস্তান' নামে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা শুরু করেছে। বর্তমানে 'ইসলামিক মুভমেন্ট অফ উজবেকিস্তান'ও তালেবানদের বিপক্ষে খুবই সক্রিয়। অন্যদিকে ইসলামি স্টেইটের শাখা ইসলামি স্টেট অব খোরাসান এই অঞ্চলে খুব বেশি পরিমাণে সক্রিয়। ইসলামি স্টেইটের সাথে ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ আফগানিস্তানের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ইসলামি স্টেট খোরাসান এর বেশির ভাগ সদস্যই নন-পশতুন যারা মূলত আফগানিস্তানের উত্তরে বাস করে, আর পশতুনরা দক্ষিণে। অর্থাৎ একটি বিষয় খুব পরিষ্কার যে, কারা আইএসকে সমর্থন করবে আর কারা তালেবানকে সমর্থন করবে সেটা নির্ধারিত করে আসলে একজন ব্যক্তি কোনো নৃতাত্ত্বিক পরিচয়টি বহন করছে। জাতিগত দ্বন্দ্বের আবরণে আইএস বনাম তালেবান দ্বন্দ্ব আফগানিস্তান সমস্যাকে কোনদিকে ত্বরান্বিত করে সেটাই ভবিষ্যতে দেখার বিষয়। ২০১৪ সালের পর আল-কায়দা বনাম আইএস দ্বন্দ্ব, আইএস'র বিশ্বব্যাপী খিলাফতের ডাক এবং বৈশ্বিক সামরিক নেটওয়ার্ক আফগানিস্তান ইস্যুতে কেমন প্রভাব ফেলে সেটাই দেখার বিষয়। তালেবান এত সকল সংকট মোকাবিলা করতে পারবে কি না সেটা একটি বড় প্রশ্ন। তাই বিশ্লেষকদের দাবি এই জাতিগত সংকটকে কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তান হয়তোবা হয়ে উঠতে পারে আরেকটি যুদ্ধের ময়দান। আর তালেবানরা যদি এত কিছু সত্ত্বেও জাতিগত বৈষম্যের অবসান ঘটাতে পারে, যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে, যদি বর্তমান খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠতে পারে, যদি পূর্বের তুলনায় লিবারেল হয়ে নারী অধিকার রক্ষা করতে পারে, যদি তালেবানরা বহির্বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে, যদি অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সফলতা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, তাহলে যুগ যুগ ধরে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মাতৃভূমি স্বাধীন করা এই তালেবানদের কুর্নিশ করা বিশ্ববাসীর জন্য অত্যবশ্যকীয় হয়ে উঠবে।

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Mura, Andrea (2015), The Symbolic Scenarios of Islamism: A Study in Islamic Political Thought, London: Routledge
2. Dower, John W. (2017). The Violent American Century: War and Terror Since World War II, Haymarket Books
3. Goodson, Larry P. (2011), Afghanistan's Endless War: State Failure, Regional Politics, and the Rise of the Taliban, University of Washington Press
4. Johnson, Robert (2011), The Afghan Way of War: How and Why They Fight, Oxford University Press
5. Grau, Lester W.; Gress, Michael A. (2002). The Soviet-Afghan War: how a superpower fought and lost, University Press of Kansas
6. Caraley, Demetrios (2002), September 11, Terrorists Attacks, and U.S. Foreign Policy, Academy of Political Science
7. Bolton, M. Kent (2006), U.S. National Security and Foreign Policymaking After 9/11: Present at the Re-creation, Rowman & Littlefield
8. Burke, Jason (2nd ed. 2007), Al-Qaeda: The True Story of Radical Islam, London: Penguin

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 এশিয়ার ভূরাজনীতি ও নতুন সমীকরণ

📄 এশিয়ার ভূরাজনীতি ও নতুন সমীকরণ


আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশ্লেষক টিম মার্শালের মতে, বিশ্ব রাজনীতির মূল হচ্ছে জিওগ্রাফি বা ভূগোল। ভৌগোলিক অবস্থানই নির্ধারণ করে দেয় বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কেমন হবে। “Maps tell us everything” নামে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে। ধরুন পাশাপাশি অবস্থিত দুটি দেশের মাঝখানে বিশাল একটি পাহাড় রয়েছে। ঐ পাহাড়ের কারণে দুটি দেশ সহজে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে না। আবার মনে করুন, একটি দেশের সমুদ্রবন্দর রয়েছে; কিন্তু আরেকটি দেশ ভূবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। তাই যে দেশটির সমুদ্রবন্দর রয়েছে; সে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী হবে। বিশ্বের মানচিত্রটি হচ্ছে একটি দাবার ছকের (Chessboard) মতো। কোথাকার রাজনীতি কী হবে সেটা মানচিত্রই আমাদেরকে বলে দিচ্ছে। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তিনদিকেই ভারত, তাই ম্যাপ আমাদেরকে বলছে, ভারতকে অবজ্ঞা করে বাংলাদেশের সিকিউরিটি নিশ্চিত করা অসম্ভব। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার নাইজারে প্রচুর ইউরেনিয়াম রয়েছে, ম্যাপ বলছে একারণেই আমেরিকান কোম্পানিগুলো নাইজারের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রচুর তেল-গ্যাস রয়েছে, তাই চীন পুরো সাগর দখল করে নিতে চাচ্ছে। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই পাশে দুইটি মহাসাগর অবস্থিত, তাই ম্যাপ আমাদের বলে দিচ্ছে বিশাল মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার উপর হামলা করা প্রায় অসম্ভব। ভৌগোলিকভাবে আমেরিকার এই সুবিধার জন্যই আমেরিকাকে বলা হয়- "America is Awesome"। এই মানচিত্র ছিদ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যখন একটি প্রক্সি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে বসানো হলো, তখনই মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির সূচনা হলো। যুক্তরাষ্ট্র যখন মানচিত্রে দেখতে পেল যে, পানামা রাষ্ট্রটি দুই বিশাল মহাসাগরকে সবচেয়ে কাছের দূরত্বে নিয়ে এসেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে কলম্বিয়া থেকে স্বাধীন করিয়ে সেখানে পানামা খাল তৈরির কাজ শুরু করে দেয়। মানচিত্রে যখন আমি দেখি শুধু রাশিয়াই গোটা বিশ্বের চারভাগের একভাগ একাই দখল করে রেখেছে, তখন যুক্তি ছাড়াই আমাকে মেনে নিতে হয় রাশিয়া একটি শক্তিধর রাষ্ট্র। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে, চীনের উইঘুর মুসলিমদের উসকে দিতে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ম্যাপ আমাদেরকে বলে দিচ্ছে আফগানিস্তানের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাকে নিয়ে পরাশক্তিগুলো বারবার ভূরাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠবে।

পাকিস্তান: দ্যা লাইফলাইন অব চীন
আফগানিস্তানের পূর্বদিকে পাকিস্তান। এই পূর্ব দিক দিয়েই আফগানিস্তানের ছোট এক ফালা ভূখণ্ড পাকিস্তান ও তাজিকিস্তান এর মাঝখান দিয়ে চীনের সাথে মিলিত হয়েছে। চীন সীমান্তে মিলিত হওয়া আফগানিস্তানের ছোট এই ভূখণ্ডটি 'ওয়াখান করিডোর' (The Wakhan Corridor) নামে পরিচিত। আফগানিস্তানের এই ওয়াখান করিডোর দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এখান থেকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে খুব সহজে যাতায়াত করা যায়। আর এই জিনজিয়াং প্রদেশেই উইঘুর মুসলিমদের বসবাস। দ্বিতীয়ত, এই ওয়াখান করিডোরের সন্নিকটে চীন এবং পাকিস্তানের সংযোগস্থল। সেখানে রয়েছে চীন-পাকিস্তানের মধ্যখানে কারাকোরাম মহাসড়ক।

চীন যদি আরব সাগর কিংবা লোহিত সাগরে আসতে চায় তাহলে তাকে পাকিস্তানের উপর দিয়ে আসতে হবে। তাই চীনের একমাত্র বিকল্প রাস্তা হচ্ছে তাকে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে একটি দীর্ঘতম স্থলপথের ব্যবস্থা করা। কিন্তু চীন-পাকিস্তান সীমান্তে কারাকোরাম নামে একটি বিশাল পাহাড় রয়েছে, যার কারণে চীন পাকিস্তানে প্রবেশ করতে পারত না। খাড়া ও দুর্গম এই কারাকোরাম পাহাড়টির প্রায় ৮৮৭ কিলোমিটার পাকিস্তান অঞ্চলে এবং ৪১৩ কিলোমিটার চীনের মধ্যে পড়েছে। সেই দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে মহাসড়ক। এখন এই পথ দিয়ে চীন তার জিনজিয়াং প্রদেশ হয়ে পাকিস্তানের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে করাচি বন্দর পর্যন্ত চলে আসতে পারে। এই মহাসড়কের নাম দেওয়া হয়েছে কারাকোরাম মহাসড়ক। এই মহাসড়কটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর একটি অংশ। এই মহাসড়ক দিয়ে চীন প্রথমে পাকিস্তানের করাচি বন্দরে আসে, অতঃপর সেখান থেকে বেলুচিস্তানের গোয়াদর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পাকিস্তানের গোয়াদর সমুদ্রবন্দরটি চীন নির্মাণ করে দিয়েছে। এই বন্দর দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের যোগাযোগের পথ সুগম হবে। পারস্য উপসাগরীয় দেশ থেকে চীন কম খরচে তেল ও গ্যাস আমদানি করতে পারবে এই গোয়াদর বন্দর দিয়ে।

পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদর এই দু'টি বন্দর আরব সাগরের পারে হলেও তা একদিকে ভারত মহাসাগর এবং অন্যদিকে পারস্য উপসাগর, এমনকি লোহিত সাগরের দিকে পাড়ি দেয়ার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ফলে এই দুই বন্দর ব্যবহার করে চীন একই সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় নির্মিত তার হাম্বানটোটা বন্দরের সঙ্গেও সংযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হবে। এমনকি চীন এখান থেকে বঙ্গোপসাগরেও পৌঁছাতে পারবে। সেখানেও নজরদারি করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিলে চীনের ভারত মহাসাগরে আসার সেই মালাক্কা প্রণালিটি বন্ধ করে দিলেও চীন করাচি ও গোয়াদর বন্দর দিয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে। এই সঙ্গে চীন যে 'ওয়ানবেল্ট ওয়ান রোড' প্রকল্প নিয়ে বিশটি বাণিজ্যপথ চালু করতে চলেছে; এটি হবে তার অন্যতম একটি রুট। যে কারণে এই মহাসড়কটি চীনের 'Life Line' হিসেবে পরিচিত। চীন ও পাকিস্তানের এই কারাকোরাম মহাসড়কটি একবিংশ শতাব্দীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। তাই আরব সাগরে, পারস্য উপসাগরে, লোহিত সাগরে এবং ভারত মহাসাগরে অল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে আসার জন্য চীনের প্রয়োজন পাকিস্তানকে। আর এই প্রয়োজনটি শুধু সাময়িক সময়ের জন্য নয়। পাকিস্তানকে চীনের প্রয়োজন আজীবন। এজন্য আগামী বিশ্বে চীনের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হবে পাকিস্তানের। তাই চীনের অর্থায়নে পাকিস্তান গড়ে তুলেছে একটি বিশেষ বাহিনী। যারা এই মহাসড়ক ও সমুদ্রবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সজাগ।

যেখানে ব্যর্থ হবে চীনের 'Debt Trap' পলিসি
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, চীন পাকিস্তানকে কৌশলে তার 'Debt Trap' এ ফেলে দেবে। কিন্তু আমার কাছে এরকম কখনোই মনে হচ্ছে না। বরং আমার কাছে মনে হচ্ছে চীন পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ছলচাতুরি করলেও পাকিস্তানের সাথে সেটা করবে না এবং সেটা করলে লং-টার্মে গিয়ে চীন নিজেই বিপদে পড়বে। প্রথমত, পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে কারাকোরাম মহাসড়ক, পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদর বন্দর ব্যবহার ইত্যাদি চীনের খুবই প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজন কোনো সাময়িক সময়ের জন্য নয় বরং আজীবনের জন্য। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে এবং উত্তর আফ্রিকার জ্বালানি সঞ্চালনের প্রধান পথ হলো পাকিস্তান। তৃতীয়ত, কারাকোরাম হাইওয়ে শুধু দুটি দেশের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থাই নয়, সামরিক দিক থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সামরিক সরঞ্জাম আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় এই পথ। চতুর্থত, চীন আরও চাচ্ছে এই মহাসড়কটি আফগানিস্তান হয়ে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করতে।

আগামী বিশ্বে চীন কখনোই পাকিস্তানকে উপেক্ষা করতে পারবে না। তাই নিঃসন্দেহে পাকিস্তান হবে চীনের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধু। একই ভাবে পাকিস্তানের জন্যও এই মহাসড়কটি তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এক. পাকিস্তান ভারতের একেবারে সীমানার কাছে গিয়ে তার মিলিটারি সেটআপ বসাতে পারবে। উঁচু থেকে গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে পারবে। দুই. ভারত থেকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিতর্কিত অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করতে পাকিস্তানের সক্ষমতা বাড়াবে এই কারাকোরাম মহাসড়ক। তিন. এই মহাসড়কের সামান্য উত্তর দিকেই বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলটি অবস্থিত। কারাকোরাম মহাসড়ক তৈরিতে চীনকে যেন কোনোরকম সমস্যায় পড়তে না হয় সেজন্যই চীনও কাশ্মীরের একটি অংশ দখল করে নিয়েছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করেছিল, যা আজ আজাদ-কাশ্মীর এবং গিলগিত-বাল্টিস্তান নামে পরিচিত। আর চীন কাশ্মীরের যে অঞ্চলটি দখল করেছে সেটা একসাই চীন নামে পরিচিত (চীন যাকে তিব্বতের এবং জিনজিয়াং প্রদেশের অংশ হিসেবে মনে করে)।

ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ইরান
পাকিস্তানের করাচির সাথে আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের সীমানা রয়েছে। আফগানিস্তান ভূবেষ্টিত (Landlocked) হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীল। আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্য করতে হয়। আফগানিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ইরানের অবস্থান। ইরানের দক্ষিণ পূর্বে ওমান উপসাগরের নিকট চাবাহার বন্দরটি (Chabahar Port) অবস্থিত। আফগানিস্তান একটি ভূবেষ্টিত রাষ্ট্র। ভারত যদি স্থলপথে আফগানিস্তানে যেতে চায় তাহলে পাকিস্তানের উপর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ভারতের জন্য পাকিস্তানের সকল সীমান্ত বন্ধ। তাই ভারতকে আফগানিস্তানে যেতে হলে প্রথমে ইরানের চাবাহার বন্দরে যেতে হয়, সেখান থেকে ইরানের ভিতর দিয়ে আফগানিস্তানের কান্দাহারে পৌঁছাতে হয়। তাই জিওপলিটিক্যাল কারণে ইরানের চাবাহার বন্দরটি ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা (Miscalculation)
আফগানিস্তান যেহেতু স্থলবেষ্টিত: তাই তার বেশির ভাগ বহির্বাণিজ্য হয় পাকিস্তানি সমুদ্রবন্দর দিয়ে। পাকিস্তানের শর্ত হচ্ছে যে, পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করে আফগানিস্তান ভারত ব্যতীত যে-কোনো দেশের সাথেই বাণিজ্য করতে পারবে। পাকিস্তানের এই আপত্তির কারণে স্থলপথে আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি বন্ধ। ফলশ্রুতিতে বিকল্প রুট হিসেবে ইরানের চাবাহার সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ভারতের কাছে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, ভারতের ছিল আরও সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। ভারত ইরানের চাবাহার বন্দর ব্যবহার করে শুধু আফগানিস্তানের সঙ্গে নয়, তুর্কমেনিস্তান-সহ সমগ্র মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। তাই স্ট্যাটেজিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ২০১৬ সালে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছিল। আফগানিস্তানের আশরাফ গানী, ভারতের নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের হাসান রুহানির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পাকিস্তানে চীনের গোয়াদর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের বিকল্প ভাবা হচ্ছিল চাবাহারকে। পাকিস্তানে গোয়াদর বন্দর নির্মাণ করে চীন যেভাবে এই অঞ্চলে কর্তৃত্ব খাটাচ্ছে, একই ভাবে ভারতও চেয়েছিল ইরানের চাবাহার বন্দরটি নির্মাণ করে এখান থেকে চীনের একক আধিপত্য রোধ করতে। তাছাড়াও চাবাহার বন্দরটি ভারতের দখলে আসলে আফগানদের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব ও নির্ভরতা কমে যেত। আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের একটি বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তোলাই ছিল এই চুক্তির মূল লক্ষ্য।

চুক্তি অনুযায়ী ভারত চাবাহার বন্দর উন্নয়নে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করবে এবং চাবাহার থেকে আফগানিস্তানের জারাঞ্জ পর্যন্ত রেল ও সড়কপথ নির্মাণ করবে। আগাম পরিকল্পনা হিসেবে ভারত আফগানিস্তানের ভিতরে ২০০ কিলোমিটার সড়কও তৈরি করে ফেলে। চুক্তিতে আফগানিস্তানকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, এসব প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বন্দরের পরিবর্তে ইরানের বন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু সেই চুক্তির চার বছর পর বিশেষ কোনো অগ্রগতি না-হওয়ায় সম্প্রতি ইরান ঘোষণা দিয়েছে, এই প্রকল্পে ভারতের অর্থায়নের জন্য তারা আর অপেক্ষা করতে প্রস্তুত নয়। তাই ইরান নিজ অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ চাবাহার বন্দর প্রকল্পের একাংশ থেকে ভারতকে কৌশলে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। এখানে একটি জটিল ভূরাজনীতি হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি রেলপথ নির্মাণের এত বিশাল বাজেট ইরান কোথায় পাবে? তাদের মতে, নিশ্চয়ই ইরানকে চীন গোপনে অর্থায়ন দিচ্ছে। ভারতের গড়িমসির এই সুযোগে চীন ইরানকে কনভিন্স করে ফেলে। তাই ভবিষ্যতে চাবাহার বন্দরটিও চীনের কর্তৃত্বে চলে যাবে। চীনের সঙ্গে পরবর্তীতে ইরানের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের একটি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হতে যাওয়া সেই চাবাহার বন্দরেও এখন চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এটাকে ভারতের 'Diplomatic Failure' বলা হচ্ছে।

সামুদ্রিক আধিপত্যে আরও একধাপ এগিয়ে চীন
প্রশ্ন হতে পারে চাবাহার বন্দরটি চীনের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ? চাবাহার বন্দরের নিকটে চীন একটি তেল শোধনাগার (Refinery) বানাচ্ছে। ইরানের তেল সেখানে পরিশোধন করে তারপর পাইপলাইনে গোয়াদর বন্দরে নিয়ে এসে সেখান থেকে আবার পাকিস্তানের কারাকোরাম হয়ে নিজেদের দেশে সেই তেল নিয়ে আসতে চায় চীন। চীন তার জ্বালানি তেলের জন্য মালাক্কা প্রণালির উপর অধিক নির্ভরশীল। কিন্তু সেখানে চীনের প্রবেশাধিকার যে-কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই বিকল্প হিসেবে চীন এখন চাবাহার বন্দরকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শীঘ্রই ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতের হাত থেকে ছিটকে চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সেখানে ভারতের কিছু শেয়ার থাকলেও মূল কলকাঠি নাড়াবে চীন। ভারতের এই বিপর্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রও কিছুটা দায়ী। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তখন বহির্বিশ্বে তেল বিক্রি করতে না পেরে ইরান কম দামে চীনের কাছে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া ভারতও এখন আর ইরানের কাছ থেকে তেল কিনছে না, সেটাও ইরানের ক্ষোভের অন্যতম একটি কারণ। অন্যদিকে চীন বলছে, আমরা তোমাদের সব তেল কিনে নিতে রাজি, ফলে ইরানের তো চীনকে বেছে নেওয়া ছাড়া আর উপায়ও নেই।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। নতুন করে আবার ইরানের উপর কখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কেউ বলতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে খুব বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইরানের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনবে। কারণ ভারত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র। তাই হয়তো আগেই সতর্ক তেহরান। ইরানকে কাজে লাগিয়ে মধ্য এশিয়া তথা পূর্ব ইউরোপে পৌঁছনোর ভারতীয় পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের বন্দর এবং রেল সেক্টরে চীনের বিনিয়োগের ফলে ভারতীয় পণ্য মধ্য এশিয়ায় পৌঁছনোর প্রশ্নে সংশয় তৈরি হবে। চাবাহার বন্দরের পরিচালনার ভার চীন না পেলেও গোটা প্রকল্প ঘিরে যাবতীয় পরিকাঠামো তাদের হাতে চলে গেলে এই বন্দরে এত দিন ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ভারতের জন্য অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি অংশ হচ্ছে ইরান হয়ে পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত রুট নির্মাণ। তাই চীন সেই পথেই এগুচ্ছে। চাবাহার বন্দরে চীন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। সামুদ্রিক আধিপত্যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল চীন। ভারতের জন্য আরেকটি সমস্যা হচ্ছে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ঐ চুক্তি হয়েছিল আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানী সরকারের সাথে। কিন্তু এখন ক্ষমতায় তালেবান। তাই তালেবান সরকার চীন ও পাকিস্তানের পথেই হাঁটবে।

তালেবানদের পুনরুত্থানে কোন দিকে এগুচ্ছে এশিয়ার ভূরাজনীতি
আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী মোট ৬টি দেশ হচ্ছে পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান ও চীন। আফগানিস্তান নিয়ে প্রত্যেকটি দেশের রয়েছে আলাদা আলাদা স্বার্থ। পরাশক্তিগুলোর রয়েছে স্বতন্ত্র ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। এখন সেই জটিল বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।

রাশিয়া
আফগানিস্তানের উত্তরে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান। আফগানিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি পশতুনদের বাইরে তাজিক আছে ২৭ শতাংশ, উজবেক ৯ শতাংশ, তুর্কমেন ৩ শতাংশ। একদিকে এই তিনটি দেশের সাথে তালেবানদের জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে এই দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে রাশিয়া। এই তিনটি দেশ অতীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। তাই এখানে রাশিয়ার একটি প্রভাব রয়েছে। এমনকি তুর্কমেনিস্তান রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত। তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের অন্যতম তেল সমৃদ্ধ দেশ। রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত উপরিউক্ত তিন দেশের তুর্কি, উজবেক, তাজিক জাতিগোষ্ঠীর অনেক লোক আফগানিস্তানের উত্তরদিকের প্রদেশগুলোতে বসবাস করছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন ও রাশিয়া কৌশলগত মিত্র হলেও নিজ স্বার্থে এদের রয়েছে স্বতন্ত্র অবস্থান। একটি উদাহরণ দিচ্ছি বুঝতে সহজ হবে। বিতর্কিত অঞ্চল লাদাখে ভারত-চীন উত্তেজনা তুঙ্গে থাকাকালীন চীনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে রাশিয়া ভারতকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছিল। তাই তালেবানদের ঘিরে চীনের একক আধিপত্য কখনোই মেনে নেবে না রাশিয়া। এই অঞ্চল নিয়ে রাশিয়ার রয়েছে আলাদা স্বার্থ। তাই এখন আফগানিস্তানে রুশ প্রভাব পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পাকিস্তান
আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি সীমানা পাকিস্তানের সাথে। প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ 'ডুরান্ড লাইন' ভাগ করেছে এই দুটি দেশকে। উল্লেখ্য, পশতুন জাতিগোষ্ঠীর মানুষরা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী জায়গায় বসবাস করছে।

আফগানিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আশরাফ গানী সরকার ভারতের বলয়ে ছিল। পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। শুধু তালেবান সরকার ছাড়া। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালে তালেবানরা ক্ষমতায় আসলে যে তিনটি রাষ্ট্র তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তার একটি পাকিস্তান। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবানকে আশ্রয় দিয়েছে আফগানিস্তানে তাদের পছন্দের সরকার নিশ্চিত করতে, সেখানে ভারতের প্রভাব কমাতে এবং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের পথ নিশ্চিত করতে।

এখন তালেবানরা ক্ষমতায় আসায় পাকিস্তান অনেক সুপরিকল্পিতভাবে আফগানিস্তানকে ঘিরে কৌশল নিচ্ছে। পাকিস্তান এখন আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সরাসরি বাণিজ্য রক্ষা করতে পারবে। অন্যদিকে তালেবান ক্ষমতায় আসায় ভারত সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে যাবে। তবে পাকিস্তানের জন্যও একটি রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে।

পাকিস্তানের কট্টরপন্থি একটি সংগঠন হচ্ছে "তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)"। আফগান তালেবান আর পাকিস্তান তালেবান দুটোই পৃথক সংগঠন। এরাও জাতিতে পশতুন। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তেই এদের বসবাস। পাকিস্তান এটিকে অনেক আগেই নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানি সরকারকে উৎখাত ও দেশটিতে ইসলামি শরিয়া আইনভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানে লড়াই করছে টিটিপি। অস্ত্র বিরতি নিয়ে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা হলেও ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তারা আর অস্ত্র বিরতি চুক্তি মানবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের উপর হামলা চালানোর পর বিশ্বে পরিচিতি পায় টিটিপি। বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের বোমা ও আত্মঘাতী হামলায় কয়েক হাজার পাকিস্তানি মারা গিয়েছে। ২০১৪ সালে পেশাওয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৩২ জন শিশুকে হত্যা করেছিল। এটা ছাড়াও পাকিস্তানে আরও কিছু উগ্র গোষ্ঠী রয়েছে। তালেবানদের পুনরুত্থানে তারাও পাকিস্তানে সহিংস হয়ে উঠতে পারে। আফগানিস্তানে তালেবান থাকলে চীন-পাকিস্তানের যেমন সুবিধা আছে, তেমন ঝুঁকিও অনেক। তাই ইমরান খান নিজ দেশের উগ্র সংগঠন টিটিপির থেকে দেশের নিরাপত্তাকে রক্ষা করবে নাকি আফগানিস্তান নিয়ে ভূরাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠবে সেটি একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।

চীন
তালেবানরা ক্ষমতায় এসে চীনের দিকে ঝুঁকছে। কারণ পুরো দেশকে ঢেলে সাজাতে তালেবানদের অনেক অর্থ প্রয়োজন। আর চীনও আগ্রহ নিয়ে বসে আছে কখন সে নতুন করে আফগানিস্তানে বিনিয়োগ করবে। তাছাড়াও গত কয়েক বছরে চীন আফগানিস্তানে যা বিনিয়োগ করেছে, তা সে সুরক্ষা করতে চায়। চীনের নজর আফগানিস্তানের লোহা, সিরামিক ও তামার খনিগুলোতে। চীনের দ্বিতীয় মাথাব্যথার জায়গাটি হচ্ছে তালেবানরা যেন উইঘুর মুসলিমদের বিষয়ে নীরব থাকে। ইতোমধ্যে তালেবানরাও ঘোষণা দিয়েছে উইঘুর বিষয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদারে তালেবানরাও এখন বলছে উইঘুর চীনের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম ধর্মাবলম্বী এই উইঘুর জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই চীন থেকে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল। তালেবান প্রতিনিধি মোল্লা হারাদার আখুন্দের সঙ্গে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর বৈঠকে তালেবানরা সেটা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। চীনের একটি আশঙ্কা তালেবানদের পুনরুত্থানে মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াং প্রদেশে সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এ জন্য চীন অনেক আগে থেকেই উইঘুর ভিত্তিক “ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টকে” (ETIM) দায়ী করে। যেটাকে সংক্ষেপে ইটিআইএম বলা হয়।
এই ইটিআইএম আফগানিস্তানে যথেষ্ট সক্রিয় এবং অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে জোটবদ্ধ। চীন সরকারের দাবি নবগঠিত তালেবান সরকার যেন এই ETIM গোষ্ঠীকে উসকানি না দেয় এবং তাদেরকে যেন আফগানিস্তানে আশ্রয় না দেওয়া হয়। এটা নিশ্চিত করতেই তালেবানের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে চীনকে। ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট ছাড়াও চীনের আরেকটি শঙ্কার জায়গা আল-কায়দা নিয়ে। আল-কায়দা আফগানিস্তানে পুনর্গঠিত হলে চীনের উপর দুইটি প্রভাব পড়তে পারে। প্রথমত, তারাও উইঘুর মুসলিমদের গোপনে মদদ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে নতুন আল-কায়দার উপস্থিতি দেখা দিলে ন্যাটো জোট এখানে পুনরায় হামলা চালাতে পারে। ফলশ্রুতিতে চীনের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ভারত
হাক্কানি-আইএসআই জোট ২০০৮ সালে কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়ে ভারতীয় কূটনীতিক-সহ ৫৮ জনকে হত্যা করেছিল। ভারত আফগানিস্তানকে নিয়ে অতীতেও স্বস্তিতে ছিল না, আর এখনো নেই। ভারতের সাথে আফগানিস্তানের কোনো সীমানা না থাকলেও তালেবানদের পুনরুত্থানে অস্বস্তিতে পড়েছে ভারত সরকার। এক. আশরাফ গানী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ইরান থেকে আফগানিস্তান হয়ে ভারতে গ্যাস সরবরাহের একটি পাইপলাইন প্রকল্পও ছিল আলোচনাতে। তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসায় ভারতের এই প্রকল্প এক কথায় ব্যর্থ হয়েছে। আশরাফ গানীর শাসনামলে ভারত আফগানিস্তানের অনেক প্রজেক্টে বিনিয়োগ করেছিল। দুই. তালেবানরা যে আইডিওলজি বা মতাদর্শে পরিচালিত সেটির সাথে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার একটি সংযোগ রয়েছে। যার জন্য ভারতের অনেক ইসলামিক সংগঠন, ইসলামিক স্কলারদেরও তালেবানের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। তারাও তালেবান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একত্রিত হয়ে উঠতে পারে বলে দাবি করছেন ভারতীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তিন. কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের জন্য তালেবান বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এর আগেও তালেবান ও আল-কায়দার সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয়। কাশ্মীরে নতুন করে আরেকটি উত্তেজনা সৃষ্টি হোক সেটা ভারত কখনো চাইবে না। তাই দিল্লি এখন 'Back Channel Diplomacy' এর দিকে আগাবে। আফগানিস্তানে বর্তমানে ভারতের কোনো দূতাবাস নেই। ফলে ভারত কাশ্মীর ইস্যুতে তালেবান সরকারের সাথে টেবিলে বসতে ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোমেসির দিকে আগাতে হবে।

বাংলাদেশ
১৯৯৬ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশে উগ্রতা কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। এমনকি এ দেশ থেকে কিছু রেডিক্যাল মানুষজন আফগানিস্তানে তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধে গিয়েছিল। পরে তারা দেশে ফিরে এসে নানা জঙ্গি সংগঠনের জন্ম দেয়। তাই তালেবানদের পুনরুত্থানে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুনরায় একত্রিত হওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে বলে দাবি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। আফগানিস্তানের নবগঠিত তালেবান সরকারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন বাংলাদেশ আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ঢাকার সাথে কাবুলের সম্পর্ক কেমন হবে। তার একটি কারণও রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিলে তারপর বাংলাদেশ তালেবানদের স্বীকৃতি দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে। কেননা আগেভাগেই স্বীকৃতি দিয়ে দিলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের উপর একটি চাপ তৈরি হতে পারে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ব্যবসা বাণিজ্য সহজীকরণ করতে আফগানিস্তানকে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন। কেননা আফগানিস্তান হচ্ছে মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বার। বেসরকারি পর্যায়ে ব্র্যাকের কার্যক্রমও পুনরায় চালু হতে পারে। আমরা আশাবাদী ঢাকা সঠিক পথেই আগাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে 'শান্তির সংস্কৃতি' বা 'Culture of Peace' কে বেশি গুরুত্বারোপ করছে। শান্তিপূর্ণভাবে বিবাদ মীমাংসার হিসেবে এবং সার্কের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কাছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব রয়েছে। একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে অরক্ষিত হয়ে উঠলে তার প্রভাব পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতেও পড়ে। তাই আফগানিস্তানে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ইরান
ইরান হচ্ছে শিয়া মুসলিম প্রধান দেশ। আর তালেবানরা সুন্নি মুসলাম। তাই তালেবানদের সাথে ইরানের একটি ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তালেবানরা সরকার গঠন করলে ইরান তখন আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে তালেবানদের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এবার ইরান তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। ইরানও এখন তালেবানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারে তিনটি কারণে। প্রথমত, আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরানের অনেক বড় লাভ হয়েছে। আফগানিস্তান আর ইরান রাষ্ট্র দুটি পাশাপাশি অবস্থিত। তাই আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি ইরানকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল। এখন ইরানের দোরগোড়ায় আর যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকছে না। এটা ইরানের জন্য স্বস্তির। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত কারণে। ইরানের মিত্র চীন ও পাকিস্তান তালেবান সরকারের পক্ষে। চীনের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এই দুটি বিষয় ইরানকে আফগানিস্তানে চীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করবে। তাই ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ইরান তালেবানদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা বেশি। আফগানিস্তানে অবস্থিত শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তালেবান শাসনে সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় আছে সেখানে অবস্থানরত শিয়া সংখ্যালঘু হাজারা জাতি। ইরানও উদ্বিগ্ন সে কারণে। তাই শিয়া হাজারা সম্প্রদায় যেন নিরাপদে থাকে সেই বিষয়ে তালেবানদের সাথে ইরানের চলছে কূটনৈতিক আলোচনা। কিন্তু আফগানিস্তানে অবস্থিত শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের সাথে ভবিষ্যতে যদি তালেবানদের দ্বন্দ্ব বেঁধে যায় তাহলে ইরান-তালেবান সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।

যুক্তরাষ্ট্র
পূর্বেও বলেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে সেটা শিফট করছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। সামনের দিনগুলোতে চীনকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞচল ঘিরে নানা পদক্ষেপ ও কৌশল নেবে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে এখানকার ভালনারেবল কমিউনিটিগুলোকে টার্গেট করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যেটা করেছে তা হলো যে অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, প্রথমে সেই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তারপর সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিয়ে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে দমনের নামে সামরিক বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তাই আগামী বিশ্বে চীনকে মোকাবিলা করার জন্য এশিয়ার এই অঞ্চলে কৃত্রিম অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা হতে পারে। এখানে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু উর্বর গ্রাউন্ডও রয়েছে। পাঁচটি ভালনারেবল কমিউনিটিও রয়েছে। যেমন- বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী জেমা ইসলামিয়াহ, পাকিস্তানে তালেবানপন্থি সংগঠন টিটিপি, পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম ধর্মাবলম্বী উইঘুর জাতিগোষ্ঠী, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দশ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ম্যালিগনাইজড জোন কাশ্মীরী জনগণ ইত্যাদি। অর্থাৎ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত ভালনারেবল গোষ্ঠী রয়েছে। এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনো ফায়দা নিতে না পারে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। এই অঞ্চলকে হতে হবে আরও বেশি সচেতন। উপরিউক্ত রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো মাথায় রেখে সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।

মূল্যায়ন
একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে, তার চেহারা পরিবর্তন করে দিতে পারে, ভৌগোলিক কারণে একটি দেশ পরাশক্তিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনো রাষ্ট্র যদি তার গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে না পারে তাহলে সেটা হিতে বিপরীত হয়। যেমন আজকের আফগানিস্তান। গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান যখন অভ্যন্তরীণ দুর্বল নীতির কারণে রাষ্ট্রের ধ্বংস ডেকে আনে তখন সেটাকে বলা হয় 'ভৌগোলিক অভিশাপ' বা 'Geographical Anathema'। কেউ আবার নাম দিয়েছেন 'The Curse of Geography' হিসেবে। বৈদেশিক নীতি বিশেষজ্ঞ টিম মার্শাল এটার নাম দিয়েছেন 'Prisoners of Geography'। এই প্রিজনারস অব জিওগ্রাফির শিকার হয়েছে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, ক্রিমিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্র। ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্র যদি বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে না পারে সেটা সেই রাষ্ট্রের জন্য ব্যর্থতা। বঙ্গোপসাগরের কারণে বাংলাদেশের অবস্থান পরাশক্তিগুলোর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ। এখন এই গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি অন্যতম 'Diplomatic Capital'। বৈদেশিক অঙ্গনে আমাদের 'Bargaining Power' হচ্ছে আমাদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিতে হবে। ভৌগোলিক শক্তি যেন ভৌগোলিক অভিশাপে পরিণত না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।

Question to think about?
দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তানে সরকার পরিবর্তন, এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে রাশিয়ার কর্তৃত্ব, আরব সাগর ও পশ্চিম এশিয়াকে কেন্দ্র করে চীন-ইরান-পাকিস্তান এর নতুন সমীকরণ, মধ্য এশিয়াকে ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বিবেচনা করে এশিয়াকেন্দ্রিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত?

টিকাঃ
1. Padukone, Neil (2014), Beyond South Asia: India's Strategic Evolution and the Reintegration of the Subcontinent, Bloomsbury Publishing
2. George, Anns (2014), Chabahar Port and India's New Strategic Outpost in Middle East, Allied Publishers
3. Charlton, Sue Ellen M. (4th ed. 2014), Comparing Asian Politics: India, China, and Japan, Routledge
4. Shambaugh, David and Yahuda, Michael (2nd ed. 2014), International Relations of Asia, Rowman & Littlefield Publishers
5. Hagerty, Devin T. (2005), South Asia in World Politics, Rowman & Littlefield Publishers
6. Garlick, Jeremy (2018), Deconstructing the China-Pakistan Economic Corridor: Pipe Dreams Versus Geopolitical Realities, Journal of Contemporary China
7. Wolf, Siegfried O. (2020), The China-Pakistan Economic Corridor of the Belt and Road Initiative, Springer International Publishing
8. Bhatnagar, Aryaman and John, Divya (2013), Accessing Afghanistan and Central Asia: Importance of Chabahar to India, Observer Research Foundation

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি

📄 আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি


ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
Theme: Frankenstein the CIA Created
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি

"There is a proliferation of terrorism as a result of the war in Iraq. What America has created is a den for terrorists to breed in Iraq as a result of the war and to ship their ideologies and their fears and their capabilities around the world, not just in the Middle East, but in other continents." - David E. Bonior

কিছু বিষয় রয়েছে যা নিজে বুঝতে পারাটাই অত্যন্ত কঠিন। সেই বিষয়গুলো আবার অন্যকে সহজ করে বোঝানো আরও কষ্টকর। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ। এটা খুবই বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ ১৯৯০ সালে শেষ হওয়ার পর, যুক্তরাষ্ট্র নামক দেশটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অথবা আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য যে দেশেই তাদের সামরিক অভিযান ও আগ্রাসন চালিয়েছে সে দেশেই কোনো না কোনো সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। হোক সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী শক্তি হিসেবে। বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে আমরা অনেক জিহাদি গোষ্ঠীর নামই শুনতে পাই এবং সেটা সংখ্যার হিসেবে বিবেচনা করলে তালিকাটা দীর্ঘ হতে থাকবে। তবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আইএস এবং আল-কায়েদা।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের দৃষ্টিতে Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ বলতে আমরা বোঝাচ্ছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী নিজেদের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে সৃষ্ট দুই পরাশক্তির মধ্যকার রাজনৈতিক অস্থিরতা। সন্ত্রাসবাদের যে-কোনো আলোচনায় 'রাজনৈতিক অস্থিরতা' এই শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালের বার্লিন অবরোধ, ১৯৪৯ সালে জার্মানির দুই ভাগে বিভক্ত হওয়া, ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে ইরানের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ, ১৯৫৯ সালে কিউবার মিসাইল সংকট বা অক্টোবর সংকট, ১৯৬১ সাল CIA'র পৃষ্ঠপোষকতায় কিউবাতে 'বে অফ পিগস ইনভেশন', ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয় ইন্দোচীন বা ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনাসমূহ রাজনৈতিক অস্থিরতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। তারই অংশ হিসেবে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানের নবনির্বাচিত সোভিয়েতপন্থি সরকারকে সামরিক সহায়তা দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে সামরিক অভিযান চালায়। অপরদিকে আফগানিস্তানের স্থানীয় বিদ্রোহীদের তথা মুজাহেদিনদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আরব-অনারব মিলিয়ে প্রায় ৪৩টি দেশ থেকে আগত সৈন্যরা মুজাহিদিনদের পক্ষে আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেয়। এই বিশাল সংখ্যক সৈন্যের সমন্বয়ের কাজ করেছিলেন সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সৈন্যদের নিয়ে আফগানিস্তানের ভূমিতে তৈরি হওয়া জিহাদিস্ট নেটওয়ার্ককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ওসামা বিন লাদেন এবং আব্দুল্লাহ আজম মিলে প্রতিষ্ঠা করেন আল-কায়দা নামক সামরিক জিহাদিস্ট সংগঠন। যাদের কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মুসলমানদের সমরাস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া এবং একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করা। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের কিছুদিনের মধ্যেই আল-কায়েদা একটি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের নেটওয়ার্কের চাইতে অনেক বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায়। এটি পরিণত হয় বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করা একটি জিহাদি সংগঠনে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আল-কায়দার সমস্যাটি কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্র ও আল-কায়দার মধ্যকার দ্বন্দ্ব
যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে এসেছিল এই অঞ্চল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য হ্রাস করতে। কিন্তু দেখা যায় আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আল-কায়দার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের সূচনা এই জায়গাটিতেই। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতকে হটাতে এখানে এসেছে এবং সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর এই অঞ্চলের শাসনভার এই অঞ্চলের মানুষদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বরং নিজে আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে। সোভিয়েতকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই অঞ্চলের মোড়ল হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্র বনাম আল-কায়দা দ্বন্দ্ব এখান থেকেই জটিল আকার ধারণ করে। আল-কায়দা সাংগঠনিকভাবে বিশ্বাস করে যারা ইসলামের বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিটি মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। আল-কায়দার এই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক থাকলেও এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যকে আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সকল ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখতে চায়। আল-কায়দার দাবি আফগানিস্তানে সোভিয়েত আধিপত্য উৎখাতের পর ওয়াশিংটন তাদেরকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামি শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠায় বাধা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকেও প্যালেস্টাইনি আরবদের অধিকার ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করবে। কিন্তু আমেরিকা তা করেনি বরং ইসরায়েলের বর্বর আন্দোলনে আরও সাহায্য যোগাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সোভিয়েত আধিপত্য উৎখাত করে সেখানে একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ওয়াশিংটনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল।

আল-কায়দার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
আল-কায়দার সাবেক প্রধান আয়মান মুহাম্মাদ রবি' আল-জাওয়াহিরি তাদের অবস্থান সম্পর্কে এরকম বলেছিলেন- (১) ইসলামিক রাষ্ট্র তথা যেগুলো ঐতিহাসিকভাবেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই রাষ্ট্রগুলো অবশ্যই শরীয়াহ আইন দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। তার মতে সেকুলার বা মানবসৃষ্ট সরকার ব্যবস্থা ইসলামিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক একটি বিষয়। (২) তিনি আরও মনে করেন, আক্রমণকারীদের হাত থেকে মুসলিম ভূখণ্ডের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রভাবমুক্ত রাখা ব্যতীত মুসলিমদের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ অসম্ভব। (৩) তিনি মধ্যপ্রাচ্যের এনার্জি রিসোর্সের (তেল সম্পদ) উপর নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপনের প্রতি জোর দেন। তার মতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। উপরের তিনটি বক্তব্য থেকে এই বিষয়টি খুবই প্রতীয়মান যে, আল-কায়দার প্রধান মনোযোগ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভূখণ্ডে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করা। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করে আল-কায়দার মধ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। তবে তাদের মতে আল-কায়দা মনে করে, খিলাফত দরকার কিন্তু সেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার সময় এখনো আসেনি কারণ জিহাদি সম্প্রদায় এবং মুসলিম সমাজগুলো এখনো খিলাফতের জন্য তৈরি নয়। তাই খেলাফত প্রতিষ্ঠা তাদের কাছে বর্তমানে অগ্রাধিকার নয়।

আল-কায়েদার ক্রমবিকাশ
ফাওয়াদ হোসেন একজন জর্ডানিয়ান সাংবাদিক এবং লেখক। তিনি আল-কায়দার সাবেক প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন। ফাওয়াদ হোসেন তার বর্ণনায় আল-কায়দার ক্রমবিকাশকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন।
১. উন্মেষ কাল; The Awakening (২০০১-২০০৩)- এই সময়টাতে আল-কায়দা যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্র রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের হামলা চালাত। এই হামলা চালানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে অভিযান চালানোর জন্য প্ররোচিত করত।
২. বিকাশ কাল; Opening Eyes (২০০৩-২০০৬)- যেহেতু এই সময়টাতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে, তাই ইরাক অভিযান হয়ে ওঠে আল-কায়দার অপারেশনের প্রাণকেন্দ্র। তখন বিশাল সংখ্যক যুবক বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আল-কায়দায় যোগদান করতে থাকে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে আল-কায়দা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। অর্থাৎ আল-কায়দা নিজে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে একটি আদর্শ হয়ে ওঠে।
৩. স্থিতিকাল; Arising and Standing up (২০০৭-২০১০)- এই সময়টিতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ প্রায় দরজার কাছে কড়া নাড়ছিল। তাই আল-কায়দা সিরিয়ার প্রতি মনোযোগ স্থাপন করে।
৪. টিকে থাকার লড়াই: Survival (২০১১- ২০১৯)- আল-কায়দার প্রধান ওসামা বিন লাদেন মৃত্যুর পর দলটি চরম দুর্যোগে পড়ে। নেতৃত্ব বদল। তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের মৃত্যু। আল নুসরাহ ফ্রন্ট এবং আইএস এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, সবকিছু আল-কায়দার দুর্বল হওয়ার পেছনের কারণ। এই সময় আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের চেয়ে টিকে থাকাই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. নবজাগরণ; Renaissance (২০২০- বর্তমান)- গত দশকের শেষের দিকেই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা নড়বড়ে হতে থাকে। করোনার কারণে ভঙ্গুর অর্থনীতি, আফগানিস্তানে প্রচুর সামরিক খরচ ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। এটা পরিষ্কার যে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অবশ্যই আফগানিস্তানে নয়। তথা চীনের বিকাশমান অর্থনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নজরে আসার ফলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতি তাদের মনোযোগ তুলনামূলক ক্ষীণই বলা যায়। যেহেতু আফগানিস্তানে এখন তালেবান সরকার ক্ষমতায় এবং তালেবানের সাথে আল-কায়দার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, আফগানিস্তান এখন হতে পারে আল-কায়দার জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের অবস্থানে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন হওয়ার সুযোগে সেখানে আল-কায়দার সদস্য সংখ্যা বাড়তে পারে বলে দাবি করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

আল-কায়দা ও আইএসের মধ্যে বিভাজনের কারণ
উপরে আল-কায়দাকে নিয়ে এত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলাম; তার কারণ আল-কায়দা এবং আইএস এই দুটি সশস্ত্র বাহিনী একে অপরের সাথে খুব গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ২০১৪ সালে আবু বকর আল বাগদাদীর নেতৃত্বে আইএস সাংগঠনিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও এর সূচনা হয়েছিল মূলত ১৯৯৯ সালে। সময় এবং ক্রমবিকাশের ধারায় অতীতের নাম পরিবর্তন করে ২০১৪ সালে আইএস নামটি ধারণ করেছিল। ১৯৯৯ সাল তথা সূচনাকালে আইএস এর নাম ছিল "জামা'আত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ”। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবু মুসাআব আল-যারকায়ি। তখন তাদের কার্যকলাপ ইরাক এবং জর্ডানের কিছু এলাকা জুড়েই সম্পাদিত হতো।

এরপরে যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক আক্রমণ চালায় তখন আল-কায়দা তাদের মনোযোগ ইরাকে কেন্দ্রীভূত করে। তার ফলাফলস্বরূপ আল-কায়দা তাদের ইরাকি শাখা হিসেবে আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তুলে। যার নাম 'আল-কায়দা ইন ইরাক (AQI)'। এই 'আল-কায়দা ইন ইরাক' হচ্ছে সেই সংগঠন, ১৯৯৯ সালে যার নাম ছিল 'জামাআত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ'।
অর্থাৎ ২০০৪ সালে 'জামাআত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ' এই স্বতন্ত্র সংগঠনটি আল-কায়দার অধীনে গিয়ে নাম ধারণ করে আল-কায়দা ইন ইরাক (AQI) নামে। তার মানে আল-কায়দা ইন ইরাক নামে নতুন কোনো সংগঠন ইরাকে তৈরি করা হয়নি বরং জামায়াত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ সংগঠনটিই আল-কায়দার অধীনে এসে তার একটি শাখা হিসেবে আল-কায়দা ইন ইরাক নাম ধারণ করেছিল।

এরপর থেকেই এ সংগঠনটি ইরাকে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে ও শিয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাতে ইরাকি সুন্নিরা দলে দলে যোগ দেয়। যেহেতু ইরাকে সুন্নিদের ভেতর শুরু থেকেই শিয়াদের সাথে শত্রুতা ছিল তাই 'আল-কায়দা ইন ইরাক' এবারে শিয়াদের উপর নৃশংসতাকে জনসমর্থন লাভের উপায় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। তাই শিয়া উপাসনালয়ে হামলা ও বর্বরতা চালিয়ে এরা সুন্নিদের সমর্থন অর্জন করার চেষ্টা করে। বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রীয় আল কায়েদার সাথে ইরাকি আল কায়েদার বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের কারণ হলো কেন্দ্রীয় আল-কায়দার বিধিবিধানকে তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত নৃশংসতা, শিয়া গণহত্যা ও বাড়াবাড়ি করেছিল ইরাকি আল-কায়দার নেতারা। তাছাড়াও ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর আল-কায়েদা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলশ্রুতিতে সহযোগী অঙ্গসংগঠনগুলোর উপর তাদের প্রভাব কমতে থাকে। অন্যদিকে আল-কায়দা ইন ইরাক'র অবারিত সফলতা রাজনৈতিকভাবে তাদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। কেন্দ্রের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। ইরাকের প্রধান তেল ক্ষেত্রগুলো দখলের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতিও ফুলেফেঁপে ওঠে। সকল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে "আল-কায়দা ইন ইরাক” এই নামটি পরিবর্তন করে সংগঠনের নতুন নাম দেওয়া হয় আইএস। সে-বছর রমজান মাসের ১ তারিখ সংগঠনটির নেতা আবু বকর আল বাগদাদী সারা বিশ্বব্যাপী খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। খিলাফত ঘোষণার পাশাপাশি সংগঠনটি নিজেদের নাম পরিবর্তন করে রাখে 'ইসলামিক স্টেট' বা আইএস। আইএসকে আরবিতে 'আল দাওলা আল ইসলামিয়া' বলা হয়। খিলাফত ঘোষণার পর তারা শুধু ইরাক ও সিরিয়াতে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই নয় বরং পুরো মুসলিম উম্মাহ'র উপর নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করে তত্ত্বগতভাবে তারা পৃথিবীর কোনো অঞ্চল নয়, সমগ্র মুসলিম দুনিয়ার ওপরেই কর্তৃত্ব দাবি করে বসে। আঞ্চলিকভাবে জাবাত আল নুসরাকে তাদের অধীনে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিকভাবে আল-কায়দার চেয়ে জিহাদি রাজনীতির নেতৃত্বে এগিয়ে থাকার প্রচেষ্টাও ছিল তাদের মধ্যে। তাদের এই লক্ষ্য ও প্রচেষ্টা অনেকাংশেই সফল হয়েছে। খেলাফত ও ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণার কয়েক মাসের মধ্যেই তারা পরিণত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিহাদি সংগঠনে। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় আল-কায়দাকে ছাড়িয়ে এই সাবেক আল-কায়দা অনুসারী সংগঠনটি আন্তর্জাতিক জিহাদি রাজনীতির প্রধান নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালে সিরিয়ায় আইএস এর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ টুল (tool) হয়ে ওঠে 'আল নুসরাহ ফ্রন্ট'। আরবিতে 'জাবাত আল নুসরাহ' নামে পরিচিত এটাও একটি সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠী। ২০১১ সালে আল-কায়দা ইন ইরাকের সিরিয়ান শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এই সংগঠনটি। মূলত আল-কায়দা ইন ইরাক (AQI) এর পৃষ্ঠপোষকতায়ই এই সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। যদিও আল নুসরাহ ফ্রন্টের নেতা জাওলানী এবং বাগদাদী ছিলেন কেন্দ্রীয় আল-কায়দার অধীন। আইএস গঠনের পরপরই তারা এবারে সিরিয়াতে আল কায়দার শাখা সংগঠন জাবহাত আন নুসরাকে আদেশ দেয় জাবহাত যাতে তার নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডগুলো নিয়ে ইসলামিক স্টেট অফ ইরাকে যোগ দেয়। জাওলানী এই প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানান। স্পষ্ট জানালেন, কেন্দ্রীয় আল কায়দার নির্দেশ ছাড়া জাবহাত আইএস এর সাথে একীভূত হবে না। এবার জাবহাত আন নুসরার অনেক কমান্ডার ও কর্মী (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) জাওলানীকে অমান্য করে আইএস-এ যোগ দেয়। কেন্দ্র থেকে জানানো হয় আইএস এর অপারেশন এরিয়া হবে ইরাক, আর জাবহাতের অপারেশন এরিয়া হবে সিরিয়া। কিন্তু আইএস কেন্দ্রীয় সংগঠন আল-কায়দাকে অমান্য করে জাবাত আন নুসরাকে সাথে নিয়েই খিলাফতের ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালে আন নুসরার আল-কায়দা অংশের সাথে আইএস অংশের সংঘর্ষও হয়। সিরিয়া অঞ্চলে আন নুসরার আল-কায়দা অংশ আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যায়। এখন বর্তমানে আন নুসরাকে আইএস এর মিত্র বলেই ধরা হয়।

এই লেখায় আন নুসরাহ ফ্রন্ট কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা এবার বলার পালা। ইসলামিক স্টেট বিশ্ব রাজনীতির দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়কেই তাদের প্রধান এবং অন্যতম শত্রু বলে দাবি করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একসাথে দুই দুটি পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আসলেই কঠিন। এটা মোটামুটি নিশ্চিত রাশিয়ার সাথে তাদের শত্রুতা অবধারিত। কারণ রাশিয়া সিরিয়ায় শিয়া সমর্থিত সরকার বাসার আল আসাদকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে রাশিয়া অনেকবার প্রকাশ্যে আইএসের সেনা ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরোধী হিসেবে সিরিয়ায় আইএসের অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্টর এবং সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। সৌদি আরব শিয়াদের আধিপত্য যে-কোনো মূল্যে দমন করতে চায়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অর্থ সাহায্য পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা জিহাদিরা এক সময় প্রথমবারের মতো সংগঠিত হয়, যা থেকে পরবর্তী সময়ে আল-কায়দার জন্ম হয়। তৎকালীন আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আল-কায়দা নামক সশস্ত্র সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ'র সহযোগিতায়। আইএস এর জন্ম হয়েছিল আল-কায়দার ইরাকি শাখা হিসেবে। তাদের দাবি সে হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতার পেছনে সৌদি আরবের জড়িত থাকার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়াও, সৌদি আরবকে আইএস'র শত্রু হিসেবে গণ্য করা হলেও আন নুসরাহ ফ্রন্টের সাথে সৌদি আরবের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। আন নুসরাহও হতে পারে আইএস বনাম সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রক্সি মাধ্যম। এ কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষ্য করার মতো তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র (এবং তাদের মিত্র) আসলেই যদি আইএস'র শত্রু হয় তাহলে আইএস'র কাছ থেকে এত পরিমাণ তেল ক্রয় করে কারা? তাদের ছাড়া কোথায় আছে তেলের এত বড় বাজার?

আইএস এবং আল-কায়দার মধ্যে পার্থক্য
এখন আসি আলোচনার তৃতীয় এবং শেষ পর্যায়ে। আল-কায়দা এবং আইএস'র কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কৌশলের পার্থক্যগুলো কোথায়? প্রথমত, আল-কায়দা মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং তাদের এলাকাকে সবসময় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাশ্চাত্য এবং তাদের মিত্রদের প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করে, যাতে তারা এই নির্দিষ্ট অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্য) তাদের কল্পিত ইসলামিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আল-কায়দার প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। অন্যদিকে আইএস যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের প্রতি কম মনোযোগী। আইএস এর প্রধান মনোযোগ হচ্ছে ইরাক এবং সিরিয়াকে কেন্দ্র করে তাদের ভৌগোলিক আধিপত্য প্রসারিত করা। প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে তাদের অধিকৃত এলাকার উপর একক খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, আল-কায়দার উদ্দেশ্যই হচ্ছে পাশ্চাত্যেকে একটি ভয় এবং অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে রাখা। অন্যদিকে আইএস'র প্রধান উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্ত করা। তৃতীয়ত, শিয়াদেরকে আল-কায়েদা ধর্মদ্রোহী মনে করে, তবে তাদের বিশ্বাস শিয়াদের হত্যা করাটা একটি চরমপন্থা, সম্পদের অপচয় এবং জিহাদি প্রকল্পের জন্য ক্ষতিকর। অর্থাৎ আল-কায়দা সংগঠনটি শিয়াদের খারাপ মনে করলেও তাদের ক্ষতি সাধন করতে রাজি নয়। অন্যদিকে আইএস মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সম্প্রদায় এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরেও আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা শিয়া এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যাকে ইসলামের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে (Purification of Islam)। সাম্প্রতিক সময়ে আইএস তাদের লক্ষ্য অর্জনে আল-কায়দার তুলনায় অনেকটা সফল। তাদের অঞ্চলের উপর সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ, সংগঠিত সৈন্য বাহিনী তাদের সফলতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আল-কায়দা এবং আইএস'র মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব দুটি গোষ্ঠীকেই দুর্বল করে তুলেছে।

ব্রিফনোট: স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পরাশক্তিগুলো কর্তৃক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয় আল-কায়দা নেটওয়ার্ক ও তালেবান নামে দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠী → তালেবানদের সাথে ভালো সম্পর্ক আল-কায়দার→কেন্দ্রীয় এই আল-কায়দার শাখা হিসেবে তৈরি হয় আল ‘কায়দা ইন ইরাক' → কেন্দ্রীয় আল-কায়দার সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে 'আল-কায়দা ইন ইরাক' আত্মপ্রকাশ করে 'আইএস' নামে→ আইএস প্রতিষ্ঠার পর সিরিয়ার আন নুসরা ফ্রন্ট আইএস এর সাথে যোগ দেয় → বর্তমানে আবার আন নুসরা ফ্রন্টের কিছু অনুসারী কেন্দ্রীয় আল-কায়দার পক্ষে, আর অধিকাংশ অনুসারী আইএস এর পক্ষে।

যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ
কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী আছে যেগুলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে (By default), কিছু আবার পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তৈরি করা হয় (By design)। প্রশ্ন হচ্ছে- এই গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের যোগানদাতা কে বা কারা? এবং যুক্তরাষ্ট্র কেন এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করার ঘোষণা দেয়? আমেরিকার বক্তব্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার্থে এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে অস্ত্র বিক্রি করা। অস্ত্র কার কাছে বিক্রি করা হয়? এবং অস্ত্র বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ফায়দা কি? যে-কোনো রাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি যারাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয় করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করে। যাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হয় সেই অস্ত্র বিক্রির পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডও অতটা যাচাই-বাছাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অনেক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কিংবা কংগ্রেসও জানে না কাদের কাছে গোপনে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে। ১৯৭০ এর দশকে নিক্সন প্রশাসন সোভিয়েত আগ্রাসন প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশে অস্ত্র পাঠায় যেটা 'Nixon Doctrine' হিসেবে পরিচিত। তখন সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবিলায় সেনাবাহিনী পাঠানোর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ঐসব দেশে শুধু অস্ত্র পাঠাত।

ইরান, ইথিওপিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ইত্যাদি রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ওয়েপনস সেল করা হয়েছিল। ইরানের পাহলভী ডাইনেস্টির কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করা হয়েছিল। তৎকালীন ইরানের কাছে কার্গো প্লেন থেকে শুরু করে সুপারসনিক ইন্টাসেপসন, প্যান্টম বোমার্স, সারফেস টু সারফেস মিসাইল-সহ পনেরো বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সব অস্ত্রই বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে যে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যে ইরানকে Rogue State এর তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যে ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়া থেকে বিরত রাখতে ছয় জাতীয় সম্মিলিত P5+1 চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেই ইরানের কাছেই কেন অর্ধশতক আগে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত অস্ত্র বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? তখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল সম্পদ নিজের দখলে নিয়ে আসা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সোভিয়েত আধিপত্য হ্রাস করা। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যায়। বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যেসব আধুনিক অস্ত্র বিক্রি করেছিল সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ইরানি বিপ্লবের পর ইরান রাজতন্ত্র থেকে বের হয়ে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে প্রবেশ করে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্র ইরান তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে শুরু করে। যেটাকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে 'Blowback' বা পাল্টা আঘাত।

একই কাহিনি ঘটেছে পানামার ক্ষেত্রেও। পানামাও একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র ছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে বিপুল পরিমাণ মিলিটারি সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করে। কিন্তু ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সরকারকে সরিয়ে সেখানের ক্ষমতা দখল করে নেয় জেনারেল এনুয়েল নরিয়েগা। তখন আমেরিকা পানামাতে আক্রমণ চালালে আমেরিকা থেকে ক্রয় করা অস্ত্র দিয়েই পানামা সেটা প্রতিহত করে। মার্কিন সৈন্যদের মার্কিন অস্ত্রের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয়েছিল সেখানে। ইরানের মতো পানামাতেও যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রীত অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ব্যাকফায়ার করে। অস্ত্র বিক্রির পূর্বে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই-বাছাই না করার এটাই হচ্ছে ফ্লিপ সাইড। ইরান যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল তখন ইরানের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ইরাকে ক্ষমতায় ছিলেন সাদ্দাম হোসেন। সাদ্দাম ছিলেন প্রচণ্ড ইরান বিরোধী। তখন ইরানকে শায়েস্তা করতে মার্কিন প্রশাসন ইরাকের কাছেও অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা যখন ইরাকে আক্রমণ করে তখন ইরাক আমেরিকা থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্র দিয়েই আমেরিকাকে প্রতিরোধ করে। ১৯৯২ সালে সোমালিয়াতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র মিসাইল ও ট্যাংক পাঠিয়েছিল; কিন্তু সেসব অস্ত্র পরবর্তীতে সোমালিয়ার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে।

আফগান মুজাহিদদের সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে বিপুল অস্ত্র সাপ্লাই দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তালেবানরা সেই অস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। প্রশ্ন হচ্ছে- এই যে বারংবার Blowback বা পাল্টা আঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে তারপরেও কেন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে অস্ত্র বিক্রি করতে আগ্রহী? যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়কৃত সকল অস্ত্র পরবর্তীতে রেজিম পরিবর্তন হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হতে পারে সেটা আমাদের থেকে মার্কিন নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজিস্টরা ভালো করেই জানে। পেন্টাগনও সে বিষয়ে অধিক সতর্ক। প্রশ্ন থেকে যায় তারপরেও কেন যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করছে না? তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোন সিক্রেট উদ্দেশ্য রয়েছে। নাইন-ইলেভেনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৬৭টি দেশের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র বিক্রি করেছে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে এবং মানবাধিকার রক্ষার্থে। ১৬৭টি দেশের মধ্যে অসংখ্য স্বৈরশাসকও রয়েছেন যারা মার্কিন অস্ত্র ক্রয় করেছে। প্রশ্ন হলো মানবাধিকার রক্ষার্থে যদি অস্ত্র বিক্রি করা হয় তাহলে যে-সকল স্বৈরশাসকের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে তারা তো সবাই নিজ দেশে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তাহলে মানবাধিকার রক্ষা হলো কীভাবে? তাহলে এটা প্রতীয়মান মানবাধিকার রক্ষা করাটাও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য না, শুধু আইওয়াশ মাত্র। উদ্দেশ্যটা আসলে কি? সুদান, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, ডি আর কঙ্গো ইত্যাদি রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রীত অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে নেই কোনো শান্তি, নেই কোনো মানবাধিকার। বর্তমানে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করা অস্ত্র ব্যবহার করছে ইয়েমেন, সিরিয়া ও তিউনিসিয়াতে। তার মানে যুক্তরাষ্ট্র নিজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অস্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধাবস্থা তৈরি করছে। বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে আরও ত্বরান্বিত করছে। মার্কিন মুল্লুকে রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন গত পাঁচ দশকে অস্ত্র বিক্রির পলিসি বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে যে-সকল অস্ত্র বিক্রি করে সেগুলোকে 'War Machine' বলা যায়। তথা যুদ্ধ তৈরির মাধ্যম।

এবার আসি যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্যের জায়গায়। প্রথমত- Economic benefits: নিক্সন থেকে শুরু করে জিমি কার্টার, রিগ্যান, ক্লিনটন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্প, সর্বশেষ বাইডেন সবাই অস্ত্রকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার বানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত- Influence: যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি করা হচ্ছে এবং যে দেশে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে সেই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় থাকে। তৃতীয়ত- Shadow supremacy: অস্ত্র বিক্রির সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শর্ত থাকে। ফলশ্রুতিতে যেসব রাষ্ট্র মার্কিন অস্ত্র ক্রয় করে তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব রাষ্ট্র জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করে না। এখন অস্ত্র বিক্রির এই সমস্যাটি কোথায়? কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসব অস্ত্র রাষ্ট্রের কাছে থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাপ্লাইকৃত এসব অস্ত্র রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনেক সময় অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকদের হাতে চলে যাচ্ছে। সিরিয়াতে আইএস দমনে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র সাপ্লাই দিয়েছিল, কিন্তু সেই অস্ত্রের একটি অংশ ২০১৪ সালে আইএসের হাতে চলে যায়। আইএস টুইট করে ধন্যবাদও জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সরকারের কাছে রপ্তানিকৃত অস্ত্রের একটি অংশ পরবর্তীতে ইয়েমেনিয় আল-কায়দার দখলে চলে যায়। এভাবে দেখা যায় একটি অঞ্চল আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আর রাজনৈতিকভাবে একটি অঞ্চল যতবেশি নৈরাজ্যময় হবে যুক্তরাষ্ট্রও ততবেশি অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে। যতবেশি সেল ততবেশি ফরেইন রিজার্ভ। এইতো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি! এটা কে বুঝবে যে, যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্র ব্যবহার করছে তারা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকদের কাছে যে অস্ত্র বিক্রি করছে সে-ই বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য বড় থ্রেট।

Question to think about?
যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দিয়েছিল তখন সেখানে অসংখ্য জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। হোক সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী শক্তি হিসেবে। আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নজর মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে এসেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে। তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিক এই অঞ্চলে নতুন কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী উত্থানের সম্ভাবনা আছে কি?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Michael, George (2006), The Enemy of My Enemy: The Alarming Convergence of Militant Islam and the Extreme Right, University Press of Kansas
2. Mura, Andrea (2015), The Symbolic Scenarios of Islamism: A Study in Islamic Political Thought, London: Routledge
3. Ahmed, Nafeez Mosaddeq (2005), The War on Truth: 9/11, Disinformation, and the Anatomy of Terrorism, Olive Branch Press
4. Murad, Nadia (2018), The Last Girl, Tim Duggan Books
5. Bergen, Peter (2011), The Longest War: The Enduring Conflict between America and Al-Qaeda, Free Press
6. Mamdani, Mahmood (2004), Good Muslim, Bad Muslim: America, the Cold War, and the Roots of Terror, Pantheon
7. Nance, Malcolm (2016), Defeating ISIS: Who They Are, How They Fight, What They Believe, Skyhorse Publishing
8. Coll, Steve (2004), Ghost Wars: The Secret History of the CIA, Afghanistan, from the Soviet Invasion to September 10, 2001, Penguin Press
9. Friedman, George (2005), America's Secret War: Inside the Hidden Worldwide Struggle Between the United States and Its Enemies, Broadway
10. Gerges, Fawaz A. (2005), The Far Enemy: Why Jihad Went Global, Cambridge University Press,
11. Nance, Malcolm (2014), The Terrorists of Iraq: Inside the Strategy and Tactics of the Iraq Insurgency 2003-2014, CRC Press

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 নয়া স্নায়ুযুদ্ধ: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ

📄 নয়া স্নায়ুযুদ্ধ: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ


চতুর্বিংশ অধ্যায়
Theme: The Coming Anarchy
নয়া স্নায়ুযুদ্ধ: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ

"The rise of China as a new power is another great challenge for the US. Our failure to properly handle Germany and Japan earlier in the 20th century cost us and the world dearly. We must not make this same mistake with China." - Steve Forbes

সূচনা: ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য এবং ইস্টার্ন হেমিস্ফিয়ারে চীনের। ধারণা করা হচ্ছে এই দুই পরাশক্তি একুশ শতকের বিশ্বকে বিপাকে ফেলে দেবে। নতুন পরাশক্তি চীনের উত্থান হচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, চীনের উত্থানটি যেভাবে হচ্ছে সেটি শুধু চীনের জন্যই ভালো; কিন্তু এই উত্থান বিশ্বের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে কি না সেটি একটি প্রশ্ন। যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে তখন তার কাছে বিশ্বের অনেক কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- চীনের কাছ থেকে তাহলে বিশ্ব কী পাবে? বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চীন কোন ধরনের ভূমিকা রাখবে? উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে চীন বিভিন্ন নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশ্বের মধ্যবয়সি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো চীন থেকে এই মেসেজটি পাচ্ছে যে, আজকাল গণতন্ত্রের কি দরকার বরং চীনের মতো একনায়কতান্ত্রিক হলে রাষ্ট্রের উন্নতি আরও বেশি হবে। চীনে তো কোনো গণতন্ত্র নেই। তা সত্ত্বেও চীন আজ অনেক বেশি উন্নত। তাই কী দরকার নির্বাচন আয়োজন করে বিলিয়ন ডলার খরচ করার। চীন আজকে বিশ্বকে শেখাচ্ছে কীভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করতে হয় (হংকং), চীন বিশ্বকে শেখাচ্ছে কীভাবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখা যায় (তিব্বত), চীন শেখাচ্ছে কীভাবে একটি মুসলিম কমিউনিটিকে 'Re-education' এর নামে ধ্বংস করতে হয় (উইঘুর), আরও শেখাচ্ছে কীভাবে অন্যের সমুদ্র তট নিজের বলে দাবি করা যায় (দক্ষিণ চীন সাগর), চীন বিশ্বকে শেখাচ্ছে কীভাবে 'National Humiliation' এর গান গেয়ে পুরো এশিয়া দখল করা যায়। আসলে চীনের এই উত্থানটি শান্তিপূর্ণ (Peaceful) না। অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হিসেবে চীন অনুন্নত দেশগুলোকে দুহাত ভরে দিচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সেটি পরবর্তীতে চীনের 'Debt Trap Policy' তে পরিণত হচ্ছে। আমি আসলে চীন বিরোধী কিংবা আমেরিকা প্রেমিক কোনোটাই না। শুধু এটি বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপার পাওয়ার হিসেবে উত্থানটি যেমন বিশ্বের জন্য ভয়ংকর ছিল, তেমনিভাবে একুশ শতকে চীনের উত্থানও বিশ্বের জন্য কল্যাণকর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানে বিশ্বে যেমন যুদ্ধ বৃদ্ধি পেয়েছে, মুসলিম দেশগুলো ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, দুনিয়াজুড়ে অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের উত্থানেও বিশ্ব ভালো কিছু পাবে নাকি গ্লোবাল অর্ডার আরও খারাপের দিকে যাবে সেটি সামনের দিনগুলোই বলে দেবে। অর্থাৎ বিশ্বে হেজেমনিক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটলেও শান্তি আসে না। জন মিয়ারশেমিয়ার এর মতে- "The tragedy of great power politics is inescapable."

খুসিডাইডিস ফাঁদ
যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে তখন তাকে 'Declining Power' বলা হয়। বিপরীতভাবে যখন একটি দুর্বল রাষ্ট্র ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকে তখন তাকে 'Rising Power' বলা হয়। থুসিডাইডিস এর মতে, এই ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকা রাষ্ট্রটির সাথে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকা রাষ্ট্রটির সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং সেই সংঘাত থেকে পরবর্তীতে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অবধারিত হয়ে ওঠে। যেমন- এনশিয়েন্ট পিরিয়ডে এথেন্স যখন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে, স্পার্টা তখন ক্রমান্নয়ে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। তখন উদীয়মান শক্তি এথেন্স ও ক্ষয়িষ্ণু শক্তি স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ অবধারিত হয়ে উঠেছিল। অবশেষে এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে 'পেলপোনেশিয়ান যুদ্ধ' হয়েছিল। একই ভাবে আঠারো শতকে উদীয়মান শক্তি ব্রিটেনের সাথে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি ফ্রান্সের মধ্যেও অনেকগুলো যুদ্ধ হয়, তন্মধ্যে অন্যতম একটি 'সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ'। এই যে উদীয়মান শক্তি এবং ক্ষয়িষ্ণু শক্তি এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে সেটাকেই বলে 'Thucydides Trap' বা 'খুসিডাইডিস ফাঁদ'। বর্তমান একুশ শতকে এসে Declining Power এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, আর Rising Power এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে চীন। তাই চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে একে অপরের সাথে অসংখ্য সংঘাতে লিপ্ত। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, তাহলে কি উদীয়মান শক্তি চীন এবং ক্ষয়িষ্ণু শক্তি যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই থুসিডাইডিস ফাঁদে পা দেবে বা যুদ্ধে লিপ্ত হবে?

ভূরাজনীতির নতুন গ্রাউন্ড
এই খুসিডাইডিস ফাঁদের একটি অংশ হিসেবে শীঘ্রই ভূরাজনীতির নতুন একটি গ্রাউন্ড (Ground) তৈরি হতে যাচ্ছে। একই ভাবে বিশ্ব রাজনীতিতেও ঘটতে যাচ্ছে আরেকটি অশুভ পরিবর্তন এবং উন্মোচন হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গেইম। এই অবস্থায় কী করবে বাংলাদেশ? অশুভ এই পরিবর্তনটি বিস্তারিতভাবে একটু পরেই ব্যাখ্যা করছি। তার আগে বলে নেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঘটতে যাওয়া এই নতুন পরিবর্তনটিকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছেন, কেউ আবার এটিকে নেতিবাচক হিসেবে নিচ্ছেন। যারা এই পরিবর্তনটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন, তারা এটিকে আখ্যায়িত করেছেন "Political Shift" হিসেবে। তাদের মতে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত হওয়া কিংবা কয়েকদিন পরপর বিশ্ব রাজনীতির মোড় পরিবর্তন হওয়া এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। আর যারা বিশ্ব রাজনীতিতে আশু ঘটতে যাওয়া নতুন এই পরিবর্তনটিকে নেতিবাচক হিসেবে নিচ্ছেন তারা এটিকে আখ্যায়িত করেছেন 'Political Earthquake' বা 'রাজনৈতিক ভূমিকম্প' হিসেবে। তাদের মতে নতুন এই পরিবর্তনটি কিছু রাষ্ট্রের জন্য অমঙ্গলজনক হতে পারে, কিছু রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে, এমনকি কিছু রাষ্ট্র পঙ্গু (Failed state) হয়ে যেতে পারে। তাই বৈশ্বিক রাজনীতির এই পরিবর্তনটিকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি এই পরিবর্তনের সঙ্গে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বাংলাদেশও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এবার প্রশ্ন হচ্ছে- বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটতে যাওয়া নতুন এই পরিবর্তনটি আসলে কী?

গত দুই দশকের বিশ্ব রাজনীতিটি ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে। মধ্যপ্রাচ্য ছিল ভূরাজনীতির 'Play Ground'। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে- ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক নরমালাইজেশন, War Against Terrorism, আইএস, আল-কায়দা, লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন, ইরাক যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়েই গত দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। উপরিউক্ত এই ঘটনাগুলোই ছিল গত দু-দশক ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড় কোনদিকে সেটি মূলত অনেকটা নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের উপর। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছুটা নজর সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন জোর দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপর। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিক ভিশন, কোয়াড, চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অধিক মনোযোগ, নতুন এক আফগানিস্তানের উত্থান ইত্যাদি এটাই প্রমাণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আগামীর বিশ্ব রাজনীতিটি হবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্য থেকে শিফট করে চলে এসেছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে। তাই আগামী বছরগুলোতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পরিণত হবে ভূরাজনীতির একটি প্লে-গ্রাউন্ডে। এই যে বিশ্ব রাজনীতিটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে শিফট করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে চলে আসছে, এটাকেই ইতিবাচকভাবে বলা হচ্ছে 'Political Shift' (রাজনীতির পট পরিবর্তন), আর নেতিবাচকভাবে বলা হচ্ছে 'Political Earthquake' (রাজনৈতিক ভূমিকম্প)।

যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যেদিকে মুভ করে সেখানে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র কখনোই একা মুভ করে না। যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গী হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়াকে সাথে রাখে। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র যেদিকেই মুভ করেছে তার ফলাফল ভালো আসেনি। ফলাফল ছিল সবসময়ই নেতিবাচক। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্ব রাজনীতির প্লে-গ্রাউন্ড ছিল ল্যাটিন আমেরিকা। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক কিংবা রুশপন্থি সরকারগুলোকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত পাপেট বা পুতুল সরকার বসানো হয়েছিল। ল্যাটিন আমেরিকার পর যুক্তরাষ্ট্র নজর দিয়েছিল আফ্রিকাতে। আফ্রিকায় অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা স্বৈরতন্ত্র পতনের নামে লুট করেছে সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ, ধ্বংস করেছে লিবিয়াকে, গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়েছে মিশরে, অস্থিতিশীল করে রেখেছে সাব-সাহারা অঞ্চলকে। তারপর আফ্রিকা থেকে নজর সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নজর দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানেও পঙ্গু করে দিয়েছে সিরিয়া, ইয়েমেন, প্যালেস্টাইন, লেবাননের মতো রাষ্ট্রগুলোকে। এবার যুক্তরাষ্ট্র নজর দিয়েছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে। উপরে দেখানোর চেষ্টা করেছি যুক্তরাষ্ট্র যেদিকেই মুভ করেছে সেখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মুভমেন্ট ভালো কোনো বার্তা দিচ্ছে না।

আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যুক্তরাষ্ট্র যে একেবারেই নজর দেবে না বিষয়টি এরকম নয়। কেন নয় সেটাও ব্যাখ্যার দাবি রাখে। যুক্তরাষ্ট্র পুরো বিশ্বের রাজনীতি দুইভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রথমটি হচ্ছে 'Central Control' এর মাধ্যমে, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে 'Peripheral Control' এর মাধ্যমে। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য এসব অঞ্চলের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি অংশগ্রহণ করবে না। এসব অঞ্চলের রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র দেখাশোনা করবে পরোক্ষভাবে ও প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। সেসব প্রতিনিধিরাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বাস্তবায়ন করবে। যেমন- ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হচ্ছে ব্রাজিল। আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হচ্ছে মিশর ও মরক্কো। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হচ্ছে ইসরায়েল। এই প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করাকে বলা হয় 'Peripheral Control' তথা নিরাপদ দূরত্বে বসে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ। এই পেরিফ্যারাল কন্ট্রোলের আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশে যারা সরকার বিরোধী আন্দোলন করে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে সমর্থন করবে। গোটা বিশ্বকে সরাসরি অংশগ্রহণ বা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই Peripheral System'টি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে।

কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে, রাজনীতির জন্য নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করতে, গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে অস্ত্রের ব্যবসা চলমান রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কিছু কিছু অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন সরাসরি হস্তক্ষেপ করার এবং প্রয়োজন প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করার। আর সেটিকেই বলে Central Control বা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। তাই বিশ্ব রাজনীতির জন্য নতুন একটি গ্রাউন্ড তৈরি করতে এবং চীনের আধিপত্য হ্রাস করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী কয়েক দশকের রাজনীতি হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কেন্দ্র করে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশগ্রহণ করবে। তাই আগামী কয়েক দশকের জন্য দক্ষিণ এশিয়া হবে গ্লোবাল পলিটিক্স এর কেন্দ্রভূমি (Geopolitical Hub), যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে বা পরোক্ষভাবে নয় বরং সরাসরি অংশগ্রহণ করবে। এক কথায় আগামী কয়েকদশক ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা মহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য এসব অঞ্চলের রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিনিধি রাষ্ট্রের (Like Minded Countries) মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করবে। আর দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এবং প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত করবে।

এবার প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এখন যুক্তরাষ্ট্রের নজর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে? এর প্রাথমিক উত্তর হচ্ছে চীনকে প্রতিহত করা। যুক্তরাষ্ট্র তার সিকিউরিটির জন্য এখন আর কোনো জঙ্গি সংগঠন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একনায়কতান্ত্রিক দেশকে হুমকি মনে করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এখন থ্রেট হচ্ছে চীন ও রাশিয়া। যেহেতু চীনের মূল বাণিজ্য দক্ষিণ চীন সাগর ও মালাক্কা প্রণালিকে কেন্দ্র করে, যেহেতু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের যাত্রাটি শুরু হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকেই; তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন এসব অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাই দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এগুচ্ছে মোটাদাগে পাঁচটি প্রকল্প নিয়ে। এই প্রকল্পগুলো হচ্ছে; (১) ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিক ভিশন, (২) কোয়াড, (৩) Build Back Better World, (৪) অকাস (AUKUS), (৫) ANZUS বা আনজুস।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নয়া স্নায়ুযুদ্ধ
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর, মার্কিন-সোভিয়েত এর মধ্যে যে শীতল যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেটা শেষ হয়েছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে নয়া স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে তার সাথে অতীতের সেই স্নায়ুযুদ্ধের মিল-অমিল উভয়ই রয়েছে। প্রথমত, সোভিয়েত-মার্কিন শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তাদের মিত্র দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতি থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু নয়া এই স্নায়ুযুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি কিছুটা ব্যতিক্রম। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এখন একটি অপরিহার্য অংশ। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান থাকা সত্ত্বেও এই দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঠিকই হচ্ছে। চীনের অর্থনীতিও জড়িয়ে আছে মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে। অর্থাৎ পার্থক্যের জায়গাটি হলো যে, অতীতের সোভিয়েত-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধে উভয় পরাশক্তির মধ্যে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল না; কিন্তু বর্তমানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান এই নয়া স্নায়ুযুদ্ধে দুটি দেশের মধ্যেই পরস্পর বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত, মার্কিন-সোভিয়েত শীতল যুদ্ধে প্রযুক্তিরও একটি ভূমিকা ছিল- যুদ্ধাস্ত্র এবং মহাকাশে অভিযান নিয়ে দুই পক্ষ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েছিল। নতুন চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে প্রযুক্তির বিশাল ভূমিকা রয়েছে। চীন গুগলের বিকল্প বাইদু, ফেসবুকের বিকল্প উইচ্যাট, ইউটিউবের বিকল্প টিকটক, আমাজনের বিকল্প আলীবাবা, উবারের বিকল্প ডিডি ইত্যাদি দাঁড় করিয়েছে। তাছাড়াও চীনের হুয়াই, জেটটিই'র মতো ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ফাইভ-জি'র বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তৃতীয়ত, আধুনিক চীন কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী শক্তি হিসেবে চীন বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। অর্থনৈতিক দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল, তখন সোভিয়েতের জিডিপি ছিল মার্কিন অর্থনীতির তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে চীন অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। উনিশ শতক হতে আজ পর্যন্ত চীনের মতো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তাই চীন-মার্কিন এই নয়া স্নায়ুযুদ্ধ অতীতের স্নায়ুযুদ্ধ থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এই নয়া স্নায়ুযুদ্ধের অংশ হিসেবে একে অপরের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, বাস্তবায়ন করছে বিভিন্ন প্রকল্প, মিত্র রাষ্ট্রগুলো নিয়ে গঠন করছে জোট এবং লিপ্ত হয়েছে বাকবিতণ্ডায়। এবার আমরা নয়া স্নায়ুযুদ্ধের স্বরূপ জানতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ বা Terminologies ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।

ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চল
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এবং ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোকে একসাথে বলা হয় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল (Indo-Pacific Region)। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ২০১১ সাল থেকে কূটনৈতিক অঙ্গনে “ইন্দো-প্যাসিফিক” অঞ্চলটি বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় আসে। অর্থাৎ তখন থেকেই এই অঞ্চলকে ঘিরে ভূরাজনীতি শুরু হয়। এই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, তিমুর লেসেথ, ফিলিপাইন, ব্রুনেই, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস, ফিজি, পাপুয়া নিউগিনি, তাইওয়ান, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো অন্তর্ভুক্ত।

ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি
দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় এসব অঞ্চল ভূরাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চীন তার নানা প্রকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলগুলোতে নিজের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে। এসব অঞ্চল ঘিরে চীনের এই আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখতে পারছে না। ফলস্বরূপ, এই অঞ্চল থেকে চীনের আধিপত্য কমিয়ে এবং এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিস্তার করতে যুক্তরাষ্ট্রও হাতে নিয়েছিল 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' (Indo-Pacific strategy)। দক্ষিণ এশিয়া, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এবং এসব অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব হ্রাস করতে ২০১১ সালে ওবামা প্রশাসন 'Rebalancing to Asia' নামে একটি প্রকল্প ঘোষণা করে। এরপর ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই প্রকল্পের সাথে আরও কিছু সংযোজন করে এটিকে 'Indo-Pacific Strategy Vision' হিসেবে ঘোষণা করে। তবে এই ভিশন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনও বেশিদূর এগোতে পারেনি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চীনের আগ্রাসী মনোভাব এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে মনোযোগ পুনঃস্থাপন করতে বাধ্য করছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও জোর দিচ্ছেন এই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ
প্রাচীনকালে তৎকালীন চীন যে পথ ব্যবহার করে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের সাথে বাণিজ্য করত সেই পথটিকে বলা হয় 'সিল্ক রোড'। প্রাচীন সেই সিল্ক রোডকে পুনরায় সক্রিয় করতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং ২০১৩ সালে একটি ইনিশিয়েটিভ গ্রহণ করেন। যার নাম দেওয়া হয় ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (OBOR)। কেউ কেউ আবার এটাকে বলছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)। Belt মানে জায়গা, আর Road মানে রাস্তা। অর্থাৎ যেখানে জায়গা সেখানেই রাস্তা। গোটা বিশ্বকেই চীন তার একটি বাণিজ্যিক রুটের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারণ করতে আজকের একুশ শতাব্দীতে এসে, চীন মূলত চাচ্ছে বিভিন্ন দেশের সাথে সড়ক ও সমুদ্র উভয় পথে সংযুক্ত হতে। এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করা। এই পরিকল্পনার অংশ মূলত দুটি। এক. সড়কপথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। কারণ তার সাথে ১৪টি দেশের সীমান্ত রয়েছে, এমনকি চীনের পশ্চিমাংশ ভূবেষ্টিত (landlocked); তাই প্রতিবেশিদের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সড়ক নেটওয়ার্ক চীনের জন্য সুবিধাজনক। এই সড়ক পথের সঙ্গে রেলপথ ও তেলের পাইপলাইনও থাকবে। দুই. সমুদ্রপথের মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকার সাথে যুক্ত হওয়াও চীনের লক্ষ্য। এরই অংশ হিসেবে চীন বিভিন্ন দেশে সমুদ্রবন্দর তৈরি করতে সহযোগিতা করছে। উল্লেখ্য, বিশেষ করে সমুদ্রপথের মাধ্যমে চীন ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে।

Build Back Better World (B3W)
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বিশ্বের এমন সাতটি দেশ নিয়ে গঠিত G-7 জোট। G-7 এর পূর্ণরূপ হলো- Group of Seven। জোটের সদস্য দেশ হলো- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই জোটের একটি অংশ। ২০২১ সালের ১২ জুন যুক্তরাজ্যের কর্নওয়েলে এর শীর্ষ সম্মেলন হয়। এই জি সেভেন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফরটি করেছিলেন। সেখানে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থানকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে G-7 ভুক্ত এই ৭টি দেশ নিয়ে নতুন একটি প্রকল্প ঘোষণা করেন। নতুন সেই প্রকল্পটির নাম দেওয়া হলো- 'Build Back Better World'। যাকে সংক্ষেপে 'B3W' বলা হয়। পলিটিক্যাল ইকোনমিস্টরা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই 'Build Back Better World' প্রকল্পটি মূলত চীনের 'Belt and Road Initiative' প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রাধান্য দিচ্ছে।

চতুর্ভুজীয় সুরক্ষা সংলাপ (কোয়াড)
কোয়াডের পুরো নাম হচ্ছে- Quadrilateral Security Dialogue বা চতুর্ভুজীয় সুরক্ষা সংলাপ। যেহেতু নামের মধ্যেই সিকিউরিটি শব্দটি রয়েছে; তাই ধরেই নেওয়া যায় এটি একটি সামরিক জোট। যার সদস্য দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। আনুষ্ঠানিকভাবে কোয়াডের জন্ম ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এর উৎসাহে। চতুর্ভুজীয় সুরক্ষা সংলাপকে বলা হচ্ছে এশিয়ার ন্যাটো। কোয়াডের দুটি লক্ষ্যও রয়েছে। এক. ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া যেন অবাধে তাদের নৌ চলাচল করাতে পারে এবং এই পথে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যেন নিরাপদ থাকে। দুই. এখান থেকে চীনের চলমান প্রভাব হ্রাস করানো। লক্ষ্য করুন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চারটি রাষ্ট্রই ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্র্যাটেজির অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই কোয়াডকে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্র্যাটেজির বিকল্পও বলা হয়। তাই এখন কোয়াড মানে চীনবিরোধী চার দেশীয় একটি জোটের নাম। যেভাবে চীনের ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের আপডেট ভার্সন হচ্ছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ঠিক তেমনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির আপডেট ভার্সন হচ্ছে এই কোয়াড।

Like Minded Countries
আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে কূটনৈতিক দক্ষতা ও শক্তিমত্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকে 'Big Brother' হিসেবে উল্লেখ করে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই চায় যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে থাকুক। তাই যুক্তরাষ্ট্র যা বলে তারা সাধারণত তা শুনার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো চলে এমন রাষ্ট্রগুলোকে টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Like Minded Countries' বা 'সমমনা রাষ্ট্র'। আর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভারত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম একটি সমমনা রাষ্ট্র। তাই কোয়াড ইস্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো ভারতের পক্ষে অবস্থান করা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান করা।

বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সংকট এবং করণীয়
যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে বাংলাদেশ যেন চীনের বলয় থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বলয়ে (কোয়াডে) অন্তর্ভুক্ত হয়। যেহেতু কোয়াড কিংবা দক্ষিণ এশিয়া হতে যাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির নতুন দিক; তাই কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশ পড়ে গিয়েছে কূটনৈতিক সংকটে। বাংলাদেশ চীনমুখী হবে নাকি ভারতমুখী? কোয়াডে অংশগ্রহণ করবে নাকি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে? কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক সংকটকেই 'Foreign Policy Dilemma' বলা হচ্ছে।

চীন এবং ভারতের মধ্যে বর্তমানে দুটি দ্বন্দ্ব চলছে- একদিকে চলছে বিতর্কিত কিছু সীমানা নিয়ে লড়াই (Territorial), অন্যদিকে উভয়ের মধ্যেই রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই (Hegemonic)। ভারত এখন উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি। তাই ভারত চায় এশিয়া-সহ পুরো বিশ্বে তাদের আধিপত্য বিস্তার এবং প্রভাব বৃদ্ধি করতে। একই ভাবে চীনও আধিপত্য বিস্তার চায়। চীন মনে করে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরাশক্তি, ভারতের তুলনায় বহু গুণে তাদের অনেক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, তাদের সামরিক শক্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন এবং ভারতের এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে কষা হচ্ছে নতুন নতুন সমীকরণ। আমার কাছে মনে হচ্ছে পরস্পরবিরোধী এই দুটি দেশই যখন আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তাই শুধু বাংলাদেশ কেন তারা পুরো অঞ্চলকেই টার্গেট করেছে। চীনের সাথে যোগ দেবে নাকি ভারতের সাথে যোগ দেবে এই ডিলেমাটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয় বরং এই সংকটে আছে মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ এটা নিয়ে সংকটে আছে যে, চীনের সাথে যোগ দেবে নাকি ভারতের সাথে যোগ দেবে।

চীনের সাথে যোগ দিলে স্বভাবতই ভারতের সাথে সম্পর্ক অবনতি হবে। একই ভাবে ভারতের সাথে যোগ দিলে চীনের সাথে সম্পর্ক অবনতি হবে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো দেশ অনেক বেশি চীনমুখী হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো দেশ ভারত বা কোয়াডমুখী হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে বাংলাদেশ যেন চীনের বলয় থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বলয়ে (কোয়াডে) অন্তর্ভুক্ত হয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন কোয়াডে বাংলাদেশ যোগ দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি-সহ উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বসেছে চীন। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অধিক পরিমাণে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলে বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো হবে, সে সমস্যা সমাধানের সামর্থ্য এই কোয়াডের নেই। কারণ বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নকে গতিশীল রাখা আর রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীনের বিকল্প নেই বাংলাদেশের সামনে। তাছাড়া বিনিয়োগ ও আমদানিতে চীনের উপরই বাংলাদেশ বেশি নির্ভরশীল।

অন্যদিকে বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিমা বাণিজ্য ইত্যাদি সবদিক মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও পথ নেই বাংলাদেশের। তাই উভয়ের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখা ব্যতীত বিকল্প নেই বাংলাদেশের। দুটি পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করার সফল উদাহরণ ব্রাজিল। কূটনৈতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র ব্রাজিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্রাজিল সর্বদা বদ্ধপরিকর। ব্রাজিল হয়তোবা ভবিষ্যতে ন্যাটোর সদস্যও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে ব্রাজিলের এখন চীনকেও দরকার। তাই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে ব্রাজিল চীনের সাথেও সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে পেরেছে। করোনা মহামারিতে চীন ব্রাজিলকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছে। ব্রাজিলের 5G মার্কেট চীনের দখলে। অর্থাৎ ব্রাজিল দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথে একটি ভারসাম্য রক্ষা করে তার পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি ব্রাজিল ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না।

অকাস (AUKUS): তিন দেশীয় নিরাপত্তা চুক্তি
নয়া স্নায়ুযুদ্ধের একটি অংশ হিসেবেই চীনকে মোকাবিলা করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স, জাপান ও ভারতকে বাদ দিয়ে “Trilateral Security Pact” বা “তিন দেশীয় নিরাপত্তা চুক্তি” নামে নতুন একটি জোট গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া। নতুন গঠিত হওয়া তিন দেশের এই জোটকে সংক্ষেপে বলা হয় AUKUS বা অকাস। যার পূর্ণরূপ হচ্ছে, A= Australia, UK= United Kingdom, US= United States। পারমাণবিক সাবমেরিনকে কেন্দ্র করে গঠিত হওয়া এই নতুন জোট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য খুব বেশি সুখকর নয়। অকাস জোটের সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া এই তিনটি দেশের অবস্থান পৃথিবীর তিন প্রান্তে হওয়া সত্ত্বেও এদের মধ্যে অনেকগুলো মিল রয়েছে। প্রথমত, তিনটি দেশই ইংলিশ-স্পিকিং-কান্ট্রি। দ্বিতীয়ত, এই তিনটি দেশের উভয় পাশেই সমুদ্র রয়েছে। অর্থাৎ তিনটি দেশেরই সমুদ্রের সাথে সীমানা রয়েছে। তৃতীয়ত, এই তিনটি দেশই লিবারেল গণতান্ত্রিক দেশ। এসব মিল থাকার কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া এই তিনটি দেশকে একসাথে বলা হয়- “Three English-Speaking Maritime Democracies”। একই ভাবে মতাদর্শগত মিল থাকায় এই তিনটি দেশ বিগত ৭০ বছর ধরে একে অপরের বন্ধু। শুধু বন্ধুই না বরং পরীক্ষিত এবং বিশ্বস্ত বন্ধু (Like Minded Countries)।

"Animal Spirit” নামে আরেকটি পরিভাষা রয়েছে। যদিও এই পরিভাষাটি ইকোনমিতে ব্যবহার হয় কিন্তু ইদানীং অস্ট্রেলিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিভাষাটি ব্যবহার হচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করেছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে অস্ট্রেলিয়া নিজেকে যথাসম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০২১ সালের মার্চ মাস থেকে অস্ট্রেলিয়া ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে খুবই সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণত কেউ হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়লে আমরা তাকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার জন্য হালকা ধাক্কা (Shove) দেই। একই ভাবে যখন কারো ব্যবসা মূলধনের অভাবে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন তাকে স্বল্প সুদে কিছু ঋণ দিয়ে বা Bail Out পলিসির মাধ্যমে পুনরায় তার ব্যবসা সক্রিয় করে তুলতে সহযোগিতা করা হয়। এই যে কাউকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা কিংবা ব্যবসা পুনরায় সক্রিয় করে তোলার জন্য কিছু ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করা, এটিকে বলা হয় "Animal Spirit"। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঘুমিয়ে পড়া সেই অস্ট্রেলিয়াকে কিছু আশ্বাস দেওয়ার মাধ্যমে পুনরায় সক্রিয় করে তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্ব রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠতে প্রণোদনা বা Animal Spirit'টি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অস্ট্রেলিয়াকে দেওয়া এই অ্যানিমেল স্পিরিটটি হচ্ছে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন। এবার এটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছি।

তিন দেশীয় নিরাপত্তা চুক্তি
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী এই জোটের প্রাথমিক উদ্দেশ্য তিনটি। এক. ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিকে স্থিতিশীল (Stable) রাখা। দুই. ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি (Peace) প্রতিষ্ঠা করা। তিন. চুক্তির আওতায় তারা নিজেদের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পরস্পরকে বিনিময় করবে। ভাবা যায় দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে রাজনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া? এই অঞ্চলে এমন কী অশান্তি বিরাজ করছে যে, তিনটি রাষ্ট্র কর্তৃক যৌথভাবে এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে? গত দুই দশক ধরে তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে ল্যাটিন আমেরিকাতে, শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চলে, শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে আফগানিস্তানে, শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে সিরিয়া-ইয়েমেন-লিবিয়াতে। এখন শান্তি প্রতিষ্ঠা করার বাকি আছে শুধু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে! তাই অতীতের মতো এই অঞ্চলেও নাকি এরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে এবং এই অঞ্চলটিকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রাখবে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে এটা তো শুধু যৌথ বিবৃতিতে লেখা। এবার আসি মূল উদ্দেশ্য নিয়ে। যেহেতু এই জোটে তিনটি দেশ অন্তর্ভুক্ত তাই তিনটি দেশের উদ্দেশ্যগুলো স্বতন্ত্রভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য
AUKUS বা অকাস গঠন করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী? এক. দক্ষিণ চীন সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কমিয়ে আনা। দুই. দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ রাখা। তিন. অস্ট্রেলিয়াকে ব্যবহার করে চীনের উপর প্রভাব বিস্তার করা। ঠিক সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মিলে অস্ট্রেলিয়াকে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা করেছে। অকাস নামের এই চুক্তির আওতায় থাকবে Artificial Intelligence, কোয়ান্টাম টেকনোলজি ও সাইবারের মতো বিষয়গুলো। অনেক দূরত্বে বসে এই সাবমেরিনগুলোকে পরিচালনা করা যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে সাগরতলে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্য
অকাস গঠন করার পেছনে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্য কী? (ক) Security: যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতায় অস্ট্রেলিয়া নিউক্লিয়ার সাবমেরিন পাবে এবং এই তিন দেশের অংশীদারিত্বের ফলে অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মতো পরমাণু শক্তি চালিত সাবমেরিন তৈরিতে সক্ষম হতে যাচ্ছে। (খ) Prosperity: অস্ট্রেলিয়ার চারদিকেই সমুদ্র। তাই দেশটির নিরাপত্তা মূলত নির্ভর করে নৌবাহিনীর উপর কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর পরমাণু শক্তি চালিত কোনো সাবমেরিন নেই। এই চুক্তির ফলে অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। এই পারমাণবিক সাবমেরিনের কারণে অস্ট্রেলিয়া তার মেরিটাইম বাউন্ডারির নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি সামুদ্রিক সম্পদের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই চুক্তির ফলে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ তাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের প্রশংসা করেছেন।

যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্য
অকাস গঠন করার পেছনে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্য কী? যুক্তরাজ্যের মতে Trilateral Security Pact বা তিন দেশীয় এই নিরাপত্তা চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় একসাথে কাজ করবে এবং এই চুক্তির ফলে যুক্তরাজ্যে চাকরি বৃদ্ধি পাবে। তবে যুক্তরাজ্যের অনেকে এটিকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখছেন। বিশেষ করে লেবার পার্টি থেকে। তারা বলছে যে, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার কোনো সম্পর্ক নাই। দ্বিতীয়ত, নিউক্লিয়ার সাবমেরিন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিন উপহার দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তাদের দাবি জনগণের ট্যাক্সের টাকা যুক্তরাজ্যের উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।

অকাস চুক্তি নিয়ে যে-কারণে ফ্রান্স ক্ষুব্ধ
নতুন এই চুক্তির ফলে ফ্রান্স কেন ক্ষুব্ধ হয়েছে? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এই চুক্তিকে “Regrettable” বা অনুশোচনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তার প্রধান কারণ দুটি। এক. এই চুক্তিতে ফ্রান্সকে সাথে রাখা হয়নি। দুই. ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে ফ্রান্সের একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে ১২টি সাবমেরিন সরবরাহের কাজটি পেয়েছিল ফ্রান্স। একইসাথে অস্ট্রেলিয়ায় নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি তৈরি করার একটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা নিয়ে কথা হয়েছিল ফ্রান্সের সাথে। কিন্তু এখন অকাস চুক্তির কারণে ফ্রান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফ্রান্সের পরিবর্তে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য লাভবান হবে।

নিউজিল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া কী?
নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া এই দুটি দেশ প্রায় কাছাকাছি জায়গায় অবস্থিত। চুক্তি প্রকাশিত হওয়ার পর নিউজিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট জেসিন্ডা অর্ডান বলেছেন নিউজিল্যান্ডের সীমান্তে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্লিয়ার সাবমেরিন প্রবেশ করা কিংবা মহড়া দেওয়া ইত্যাদি নিউজিল্যান্ড সর্মথন করবে না। নিউজিল্যান্ডের মেরিটাইম বর্ডারে এসব সাবমেরিন প্রবেশ করতে পারবে না। নিউজিল্যান্ডের জনগণও এতে সমর্থন দিয়েছেন। এর পেছনে অবশ্য দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিউজিল্যান্ড হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Neutral State)! বিতর্কিত কোনো আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তারা নিজেদেরকে জড়ানো পছন্দ করে না। দ্বিতীয়ত, প্রভোকেইটিভ কোনো ইস্যুতে যোগ দিয়ে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে নিজেদের সম্পর্ক খারাপ করতে নিউজিল্যান্ড আগ্রহী নয়। তাছাড়াও চীনের সাথে নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।

অকাসের সাথে আনজুস ট্রিটির (ANZUS) পার্থক্য কোথায়?
ANZUS বা আনজুস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত আরেকটি সমন্বিত নিরাপত্তার চুক্তি। যার পূর্ণরূপ হলো, A=Australia, NZ= New Zealand, US= United States। এই চুক্তিরও মূল উদ্দেশ্য ছিল ইন্দো-প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তিনটি দেশ পরস্পরকে সহযোগিতা করা। লক্ষণীয় যে আনজুসে কোনো ধরনের পরমাণু শক্তির ব্যবহারের কথা উল্লেখ ছিল না। অপরদিকে অকাসে পরমাণু শক্তি বা নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের কথা বলা হয়েছে। এই পরমাণু শক্তির সরবরাহ এবং তার ব্যবহার অকাস ও আনজুসের মধ্যে মূল পার্থক্যের বিষয়। তাছাড়াও নিউজিল্যান্ড অনেক আগেই তার সামরিক ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, তাই নতুন জোট অকাসে নিউজিল্যান্ডের অংশগ্রহণ নেই।

ভারতকে যে-কারণে রাখা হয়নি
একটি বড় প্রশ্ন হলো ভারতকে কেন এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি? ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই এই জোট। অথচ এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি ভারতকেই জোটে নেওয়া হয়নি। এমনকি কোয়াডে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও AUKUS এ ভারতকে না রাখা একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, এই চুক্তির মধ্যে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা বা Security এর মতো একটি সেনসেটিভ ইস্যু, যেখানে রাষ্ট্রগুলো তাদের সিকিউরিটি রক্ষা করবে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন এর মাধ্যমে। এই পরমাণু শক্তি চালিত সাবমেরিনগুলো গোপনে এবং নিরাপদ দূরত্বে বসে চীনের বিরুদ্ধে পরিচালনা করা হবে। তাই এই ধরনের চুক্তিগুলো মূলত করতে হয় অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথেই। দ্বিতীয়ত, এই চুক্তিতে ভারতকে না রাখার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ভারতকে। আবার ভারতের নিজ প্রয়োজনেই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন। এই অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে পাকিস্তানকে কাজে লাগিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে চীনকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ভারতের সহায়তা।

জাপানকে কেন রাখা হয়নি?
আসলে কোয়াডে শুধু ভারত নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু রাষ্ট্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও রাখা হয়নি। এখন প্রশ্ন হতে পারে এই দুটি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষিত বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কেন জোটে রাখা হয়নি? উত্তর হচ্ছে দুটি। এক. যুক্তরাষ্ট্র এই জোটে এশিয়ার কোনো রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় না। কারণ চীনও এশিয়ার একটি বৃহৎ রাষ্ট্র। দুই. চীন, জাপান, কোরিয়ার এই তিনটি দেশের জনগণের মধ্যে কিছুটা ইথনিক বা জাতিগত মিলও রয়েছে।

চীনের প্রতিক্রিয়া কি?
দেং জিয়াও পিং এর শাসনামল থেকে অর্থাৎ ১৯৮০ থেকে শুরু করে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চীনের ডিপ্লোমেসি যেরকম ছিল এখন কিন্তু সেরকম নেই। চীনের কূটনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। চীনের পূর্বের ডিপ্লোমেসি ছিল অনেকটা রক্ষণশীল। অতীতে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চীন ছয়টি ধাপে বিচার বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে অনেক ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নিত। এই ছয়টি ধাপ ছিল এইরকম- (১) চীনের বিরুদ্ধে সংঘটিত হওয়া যে কোনো ইস্যুকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা (observe calmly), (২) সেই ইস্যুর উপর নিজেদের অবস্থান ঠিক করা (secure our position), (৩) সেই বিষয়টির সাথে খাপ খাইয়ে আরও ভালোভাবে বিষয়টিকে জানা (cope with affairs calmly), (৪) তারপর নিজেদের শক্তিমত্তা অন্যদের কাছে প্রকাশ্যে প্রকাশ না করা এবং ধৈর্য ধরা (hide capacities and bide our time), (৫) এমন অবস্থান নেওয়া যেন অন্য রাষ্ট্রগুলো বুঝতে না পারে চীন আসলে কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে (be good at maintaining a low profile), (৬) তারপর বুঝেশুনে সেই ইস্যুর ব্যাপারে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া (finally take decision)।

এই যে আন্তর্জাতিক কোনো বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করা, দীর্ঘ সময় নিয়ে বিষয়টি ভাবা, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া, এটি ছিল চীনের অতীতের পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু চীন বর্তমানে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অত বেশি সময় নেয় না। কেউ চীনের বিরুদ্ধে কিছু বললে চীন এখন সেটা সাথে সাথে রেসপন্স করে। কালবিলম্ব না করে সেটার জবাব দেয়। আর এটাকেই বলা হচ্ছে চীনের Wolf Warrior Diplomacy বা Combating Diplomacy। এটির মানে হচ্ছে, বসে না থেকে শত্রুকে তাৎক্ষণিক মোকাবিলা করা। নতুন জোট AUKUS সম্পর্কে চীন কালবিলম্ব না করেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। প্রথমত, চীন বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক AUKUS নামের নতুন এই চুক্তিটি হচ্ছে “Provocative”, যা যুদ্ধকে উসকে দেয়। দ্বিতীয়ত, চীন এটিকে আখ্যায়িত করেছে “The Cold War Mentality” হিসেবে। চীনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছে করেই এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে এবং স্নায়ুযুদ্ধের একটি পরিবেশ তৈরি করছে।

কী ঘটবে ভবিষ্যতে?
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও ভারত হচ্ছে বিশ্বে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের পারমাণবিক শক্তি থাকলেও আন্তর্জাতিক মহল থেকে এই রাষ্ট্রগুলো এখনো পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে অফিশিয়াল স্বীকৃতি পায়নি। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো কিছু দেশ পারমাণবিক শক্তিধর নয়। কিন্তু নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই চীনকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মিলে অস্ট্রেলিয়াকেও হয়তোবা একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করে ফেলবে।

চীনের এখন কী করা উচিত?
শুধু চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এত পদক্ষেপ দেখে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন একটি আলোচনা শুরু হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যুত্তরে চীনের কী করা উচিত? প্রথমত, চীনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমগুলো পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য চীন যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত বেশি জোট গঠন করে না। চীন বরং নিজের সামর্থ্য বলে একা একাই সেটা প্রতিহত করার চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত, অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকা মহাদেশে এবং ল্যাটিন আমেরিকায় যেভাবে একক প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সেটা আদৌ সম্ভব নয়। তথা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন করতে কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ এশিয়ায় এসে চীনের বিরুদ্ধে লড়তে হলে তাকে অবশ্যই চীনের পাশাপাশি রাশিয়া, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়াকেও মোকাবিলা করতে হবে। যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। তৃতীয়ত, অনেকে আবার মনে করছেন, ভারসাম্য রক্ষার্থে চীনের উচিত হবে ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো এসব দেশগুলোকে পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে উঠতে সহযোগিতা করা। একই ভাবে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান, উত্তর কোরিয়া মিলে নতুন আরেকটি সামরিক জোট গঠন করা।

আগামী বিশ্বের হেজিমন: চীন নাকি যুক্তরাষ্ট্র? (Conflict over Hegemony)
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্ন হচ্ছে কে হবে আগামী বিশ্বের সুপার পাওয়ার? নতুন করে কোন দিকে গড়াচ্ছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক? অনেকে মনে করছেন শীঘ্রই চীন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পরাশক্তির স্থানটি কেড়ে নেবে। তাদের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে চীন হয়ে উঠবে আগামী বিশ্বের একক পরাশক্তি। আসলে তারা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে এমনটি বলছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, চীন আগামী বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে উঠবে বটে তবে সেটি একক পরাশক্তি হিসেবে নয়। বিষয়টি কখনোই এরকম নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বের পরাশক্তি থাকবে না এবং শুধু চীন হয়ে উঠবে একক পরাশক্তি। পরবর্তী আলোচনায় এটি দেখানোর চেষ্টা করব যেভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের উদীয়মান উত্থান সত্ত্বেও আগামী কয়েক শতক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরাশক্তি হিসেবে ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো শক্তির দ্রুত পতন ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন।

সাম্প্রতিক সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যখনই চীন-যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি দেশের আলোচনা হয় তখনই দুই দেশ একে অপরের উপর বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে। যেমন- চীনের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে বিশেষ করে শিনজিয়াং, হংকং, তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার হামলা, Intellectual Property Theft, মার্কিন মিত্রদের উপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসে। একই ভাবে চীনের অভিযোগ হচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাটি অপব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক স্বাভাবিক বাণিজ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে এবং অন্যকিছু দেশকে প্ররোচনা দিচ্ছে চীনের উপর হামলা করার জন্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই দুটি দেশের মধ্যে সমস্যাটি আসলে কোথায়? বিশ্বের পরাশক্তিধর দুটি দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব আসলে কী নিয়ে?

এই দুটি দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের অনেক কারণ থাকলেও মূল কারণ হচ্ছে কে হবে আগামী বিশ্বের সুপার পাওয়ার বা Hegemon তা নিয়ে। Superpower কিংবা World hegemon এসব ধারণা হাজার বছর আগের। সময়ের আবর্তনে সুপার পাওয়ার রাষ্ট্রের ধারণা ও সময়সীমা পরিবর্তন হয়েছে। একসময় রোমান সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের সুপার পাওয়ার। হাজারের বেশি সময় নিয়ে সুপার পাওয়ার হিসেবে টিকে ছিল রোমান সাম্রাজ্য। তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বের সুপার পাওয়ার হয়ে ওঠে ব্রিটেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে নয়া দুই সুপার পাওয়ার আবির্ভূত হয়। একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র অন্যটি হলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়লে বিশ্বে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ৩০ বছর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হিসেবে টিকে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এখন পরাশক্তি হিসেবে উত্থান হয়েছে চীনের। বিংশ শতাব্দীতে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতিটি আবর্তিত হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। সেই দ্বন্দ্বটি পরিচিত ছিল Cold War কিংবা স্নায়ুযুদ্ধ হিসেবে। এখন একুশ শতকে এসে পুরো বিশ্ব রাজনীতির ফোকাস পয়েন্ট যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব। তাই আজকের একুশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকে শুরু করে আগামী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত কে হবে বিশ্বের পরাশক্তি এটা নিয়ে আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধটির সময়সীমা ছিল মাত্র ৪৫ বছর (১৯৪৫-১৯৯০)। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন এই নয়া স্নায়ুযুদ্ধটি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্বে এ পর্যন্ত যতটি পরাশক্তির উত্থান হয়েছে কেউ স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারেনি। যেমন- রোমান সাম্রাজ্য, ব্রিটেন ইত্যাদি।

আবার বিশ্বে একসাথে দুটি পরাশক্তি থাকলেও কিছুদিন পর একটি পরাশক্তির পতন হয়। যেমন- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছিল। এখন একুশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বে একসাথে দুটি পরাশক্তির অবস্থান- যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তাই ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বলা যায় যে, আগামী কয়েক শতাব্দী পর বিশ্বে যে কোনো একটি পরাশক্তি টিকে থাকবে। হয় চীন না-হয় যুক্তরাষ্ট্র। এটি হচ্ছে ঐতিহাসিক যুক্তি। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। চীন এখন তুলনামূলক ভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আবার অন্যদিকে প্রযুক্তি ও ইন্টেলেকচুয়াল (Intellectuals) দিক থেকে চীনের থেকে অনেক এগিয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই এই দুটি পরাশক্তির মধ্যে যে-কোনো একটির শীঘ্রই পতন হবে এমনটি আদৌও সম্ভব না। সুপার পাওয়ার কিংবা World Hegemon হয়ে উঠার কয়েকটি মানদণ্ড রয়েছে। এই মানদণ্ডগুলোর তুলনামূলক আলোচনা করে দেখা যাক কে এগিয়ে। চীন নাকি যুক্তরাষ্ট্র?

1. বৃহৎ জনসংখ্যা (Huge Population) : একটি দেশের বৃহৎ জনসংখ্যা একটি দেশের সুপার পাওয়ার হয়ে উঠার প্রধান অস্ত্র। বৃহৎ জনসংখ্যা মানে বৃহৎ কর্মক্ষম জনশক্তি। তা সে দক্ষ হোক আর না হোক। বৃহৎ জনসংখ্যা থাকলে দুটি সুবিধা। প্রথমত, বৃহৎ জনসংখ্যা মানে দেশের অভ্যন্তরে বিশাল বাজার, যা বিদেশি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহায়ক হবে। একই ভাবে শক্তিশালী হবে অর্থনীতি। সিআইএ ফ্যাক্টবুক এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা তেত্রিশ কোটি ছিয়ানব্বই লক্ষ। অন্যদিকে চীনের মোট জনসংখ্যা একশো একচল্লিশ কোটি একত্রিশ লক্ষ। তথা জনসংখ্যার দিক থেকে চীন অনেক এগিয়ে। কিন্তু চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা অনেক কম থাকা সত্ত্বেও গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ কূটনীতিবিদ, এক্সপার্ট গোয়েন্দা ইত্যাদির সংখ্যা চীনের থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলকভাবে বেশি। কম জনসংখ্যা হলেও যুক্তরাষ্ট্র বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে এগিয়ে।

2. সেনাবাহিনী (Military): এছাড়া বৃহৎ জনসংখ্যা মানে বৃহৎ সেনাবাহিনী। বর্তমান সময়ে সেনাবাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দিয়ে সেনাবাহিনীর শক্তি বোঝায় না। তবুও বর্তমানে সময়ে একটি সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য থাকা আব্যশক মনে করা হয়। এছাড়া যে দেশের সেনাবাহিনী যত বড় ওই দেশ তত দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও রাখে। Military Expenditure Country Ranks-এর তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর তার মোট জিডিপি ৩.৪০% (গড়ে) সেনাবাহিনীর পেছনে খরচ করে। চীন প্রতিবছর তার মোট জিডিপির গড়ে ১.৫০% খরচ করে। তাছাড়াও চীনের আশেপাশের রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো মিলিটারি ঘাঁটি রয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আশেপাশে চীনের একটি মিলিটারি ঘাঁটিও নেই। যদিও Military Expenditure এর দিক থেকে বর্তমানে চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে, তবে আগামী কয়েকবছর পর থেকে মিলিটারি খরচ চীন আরও বৃদ্ধি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

3. অর্থনীতি (Economy): শক্তিশালী অর্থনীতি একটি দেশের সুপার পাওয়ার হওয়ার প্রধান শর্ত। ১৯৯২ সালে ভেঙে পড়ার আগে সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি ছিল। তাই সুপার পাওয়ার হয়ে উঠার জন্য শক্তিশালী অর্থনীতি থাকা আবশ্যক।
যুক্তরাষ্ট্রের Industry সেক্টর: ইন্ডাস্ট্রি র‍্যাংকিং অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়, উচ্চ-প্রুক্তি উদ্ভাবক এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প উৎপাদক। তাছাড়াও পেট্রোলিয়াম, ইস্পাত, মোটর গাড়ি, মহাকাশ, টেলিযোগাযোগ, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিক্স, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভোগ্যপণ্য, কাঠ, খনি ইত্যাদি শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে আধিপত্য।
চায়নার Industry সেক্টর: শিল্পজাত পণ্য উৎপাদনে চীন হচ্ছে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। খনি এবং আকরিক প্রক্রিয়াকরণ, লোহা, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং অন্যান্য ধাতু, কয়লা, যন্ত্র নির্মাণ ও অস্ত্র ইত্যাদি শিল্পে রয়েছে চীনের আধিপত্য। টেক্সটাইল, পোশাক, পেট্রোলিয়াম, সিমেন্ট, রাসায়নিক সার, ভোগ্যপণ্য (পাদুকা, খেলনা এবং ইলেকট্রনিক্স-সহ), অটোমোবাইল, রেলগাড়ির যন্ত্র, লোকোমোটিভ, জাহাজ, বিমান-সহ পরিবহন সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি, বাণিজ্যিক মহাকাশ লঞ্চ যানবাহন এবং স্যাটেলাইট ইত্যাদি ক্ষেত্রেও চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে।

CIA RANK অনুযায়ীও ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কিত সার্বিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন এগিয়ে। তবে প্রযুক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত ইন্ডাস্ট্রির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে যে, চীন বর্তমানে প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও চীন এখন তার টেকনোলজিক্যাল খাতে যে পরিমাণে বিনিয়োগ করছে তাতে ভবিষ্যতে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সমপরিমাণ হয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

4. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি (Advancement in Science and Technology) : বিশ্বের অতীত শক্তিশালী সাম্রাজ্য ও বর্তমান সুপার পাওয়ারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একটি দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যত বেশি উন্নত ওই দেশের জনসংখ্যা তত বেশি দক্ষ এবং ওই দেশের অর্থনীতিও তত শক্তিশালী। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলে। যা একটি দেশের সুপার পাওয়ার হয়ে উঠার পূর্ব শর্ত। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি বর্তমান সুপার পাওয়ার আমেরিকার কথা। যার এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে কোন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীও নেই। এছাড়া অতীত সুপার পাওয়ার ব্রিটেনের কথাও বলা যায়। অতীতে ব্রিটিশরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা CIA এবং Intelligent Forces, এফবিআই ইত্যাদি চায়নার থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কৌশলী।

6. বৃহৎ আয়তন (Vast Territories) : বৃহৎ আয়তন একটি দেশের সুপার পাওয়ার হয়ে উঠার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের বৃহৎ আয়তন থাকলে দেশটি সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, গোপন গবেষণা, বিশাল জনসংখ্যা দক্ষকরণ এবং অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারে। একটি দেশের আয়তন বৃহৎ হলে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ বেশি হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও গবেষণা স্থাপনার পর্যাপ্ত উপকরণ পাওয়া সম্ভব। একটি দেশের আয়তন যতবড় এর প্রতিবেশি দেশের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। আর সেই দেশের প্রভাবও সেই প্রতিবেশি দেশগুলোর উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এছাড়া অনেক গোপন প্রজেক্ট চালানোও বৃহৎ আয়তনের দেশগুলোর জন্য সহজ। মোট ১৪টি রাষ্ট্রের সাথে চীনের সীমানা রয়েছে। আর অপরদিকে মাত্র ২টি রাষ্ট্রের (কানাডা ও মেক্সিকো) সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা রয়েছে। সীমানা নিয়ে চীনের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব আছে (Border Conflict) কিন্তু সীমানা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্ব নেই। এই দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট আয়তন ৯৮,৩৩,৫১৭ স্কোয়ার কিলোমিটার। আর চীনের মোট আয়তন ৯৫,৯৬,৯৬০ স্কোয়ার কিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন চীনের থেকে একটু বেশি।

7. সমুদ্রসীমা (Sea Boundary): এবার আসা যাক নিজস্ব সমুদ্রসীমার ব্যাপারে। বিখ্যাত গ্রিক সেনানায়ক থেমিসটোক্লিস বলেছিলেন, "যে শক্তিগুলো সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে তারাই দেবীর সম্পদ ও পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করবে।" গ্রিক সেনানায়ক থেমিসটোক্লিস আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের আগে এই কথাটি বলেছিলেন। আর আজ আধুনিক সময়েও গ্রিক সেনানায়কের এই উক্তি সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী আজ পৃথিবীর যেসব দেশের সমুদ্রসীমা রয়েছে ওই প্রত্যেকটি দেশের সমুদ্রসীমার কাছে অবস্থান করছে। এমন কোনো দেশের সমুদ্রসীমা নেই যার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর অবস্থান করছে না। উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সমুদ্রসীমার কাছেও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর অবস্থান করছে (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায়)। পৃথিবীর বাণিজ্যের বেশির ভাগ আজ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। যা ২৪ শতাংশ। একটি দেশের পরাশক্তি হওয়ার জন্য সমুদ্রসীমা ও শক্তিশালী নৌবাহিনী পূর্বশর্ত। সমুদ্রসীমা চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সমুদ্রসীমা বা Maritime Border নিয়ে প্রতিবেশি রাষ্ট্র কানাডা ও মেক্সিকো কারো সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কনফ্লিক্ট নেই কিন্তু সমুদ্রসীমা নিয়ে চীনের সাথে ফিলিপাইন, জাপান, ব্রুনাই ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয় 'Virtual Island'। এর মানে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র প্রাকৃতিকভাবেই অনেকটা নিরাপদ (সিকিউরড)। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে রয়েছে কানাডা, দক্ষিণে মেক্সিকো। উভয়ের সাথেই যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক থাকায় উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে স্থলপথে যুক্তরাষ্ট্রকে কেউ আক্রমণ করতে পারবে না। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর এবং পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর। এই দুই পাশে বিশাল মহাসাগর থাকায় সমুদ্রপথেও কেউ যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করতে পারবে না।

৮. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা (Political stability): আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা না থাকলে ঐ দেশের ব্যবসা বাণিজ্য-সহ সকল কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এছাড়া কোনো দেশে স্থিতিশীলতা না থাকলে ওই দেশের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেয় অন্যান্য দেশ। ফলে ওই দেশ কখনো সুপার পাওয়ার হয়ে উঠতে পারে না। তাই সুপার পাওয়ার হয়ে উঠার পূর্বশর্ত হলো অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। চীনের অংশ হংকং ও তাইওয়ানে প্রায়ই চীন বিরোধী আন্দোলন হয়। এই দিক থেকে চীনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য বর্তমানে স্বাধীনতা লাভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ বনাম কৃষ্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব প্রকট।

9. সফট পাওয়ার (Soft Power): সফট পাওয়ার হলো কোনো দেশের পণ্য, নাটক, সিনেমা, গান বাজনা বা আদর্শ। যা সারা পৃথিবীর মানুষ গ্রহণ করে থাকে। এখন পর্যন্ত আমেরিকা এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। উদীয়মান সুপার পাওয়ার চীনের আদর্শ পৃথিবীর মানুষের গ্রহণযোগ্য নয়। আর তাছাড়া চীনের কাছে মিডিয়ার প্রপাগান্ডা শক্তিও নেই। এছাড়া চীনা ভাষার চীনের বাইরে তেমন প্রচলন নেই। যেখানে ইংরেজি হচ্ছে আন্তর্জাতিক ভাষা। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলার দিয়ে সারা বিশ্বে বাণিজ্য হয়।
অর্থাৎ আগামী বিশ্বের পরাশক্তি হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই থাকবে। পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের পতন ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। তবে এটি বলা যায় যে, ভবিষ্যতে মিলিটারি ও রাজনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেশি আধিপত্য বিস্তার করবে এবং ইকোনমিক দিক থেকে চীন বেশি আধিপত্য বিস্তার করবে। দুটি পরাশক্তির যে-কোনো একটির পতন হবে বিষয়টি এরকম কখনোই নয়।

Question to think about?
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ত্রিমাত্রিক সংকটে পড়েছে (ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র)। এই সংকটময় মুহূর্তে একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে পারে?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Hanania, Richard (2020), There Is No Thucydides Trap Between the U.S. and China, Real Clear Defense
2. Auslin, Michael R. (ed. 2020), Asia's New Geopolitics: Essays on Reshaping the Indo-Pacific, Stanford: Hoover Institution Press
3. Zhiqun, Zhu (2006), US-China relations in the 21st century : Power Transition and Peace, London; New York: Routledge
4. Allison, Graham (2017), Destined for War: Can America and China Escape Thucydides's Trap?, New York: Houghton Mifflin Harcourt
5. Monaghan, Andrew (2015), A New Cold War?: Abusing History, Misunderstanding Russia, London: Chatham House
6. Smith, Stephen N. (2021), China's Major Country Diplomacy: Legitimation and Foreign Policy Change, Foreign Policy Analysis
7. Tjia, Yin-nor Linda (2020), The Unintended Consequences of Politicization of the Belt and Road's China-Europe Freight Train Initiative, The China Journal
8. Schenoni, Luis (2019), Hegemony, Oxford Research Encyclopedia of International Studies, Oxford University Press
9. Woodward, Jude (2017), The US Vs China: Asia's New Cold War?, Manchester University Press

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00