📄 সমসাময়িক আফ্রিকার ভূরাজনীতি
বিংশ অধ্যায় Theme: Old Problems in New Conflicts
সমসাময়িক আফ্রিকার ভূরাজনীতি
"Africa's largest dam power dreams of prosperity in Ethiopia- and fears of hunger in Egypt." - Sudarsan Raghavan
একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও সরব হয়ে উঠেছে আফ্রিকা। বিশেষ করে উত্তর, পশ্চিম ও হর্ন অব আফ্রিকার দেশগুলো। সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বকে ছাপিয়ে আফ্রিকার রাজনীতিতেও এখন অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে কাতার-বাহরাইন দ্বন্দ্ব। ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে কাতার ও বাহরাইন উভয়ই আফ্রিকার বিভিন্ন অবকাঠামো খাত নির্মাণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইথিওপিয়া নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা এবং গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম নিয়ে মিশরের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করেছে নতুন আরেকটি প্রক্সি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। সেখানে সুদানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং তাইগ্রে গৃহযুদ্ধ যোগ করেছে নতুন আরেকটি মাত্রা। সম্প্রতি উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক নরমালাইজেশনের বিষয়টিও পরিবর্তন আনবে ইউরোপ ও সাব সাহারা অঞ্চলের রাজনীতিতে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির পথপরিক্রমায় আমরা এই অধ্যায়ে উপরিউক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে আফ্রিকার ভূরাজনীতির স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করব।
ইথিওপিয়াতে তাইগ্রে গৃহযুদ্ধ
বিশ্ব হয়তোবা আরেকটি ভয়ংকর ও দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে। বিশ্বের যে দেশটি সবচেয়ে জনবহুল ল্যান্ডলকড কান্ট্রি হিসেবে পরিচিত এবং যে দেশটি কখনো সম্পূর্ণ কলোনিতে পরিণত হয়নি, সে দেশটির নাম ইথিওপিয়া। হর্ন অব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়াতে চলমান "সরকার বনাম তাইগ্রে" গৃহযুদ্ধটি খুবই জটিল আকার ধারণ করেছে। উল্লেখ্য, কোনো দেশের সরকারব্যবস্থা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর গঠন, পলিসি ও মতাদর্শগত চিন্তাধারা ধরতে পারলে ঐদেশের রাজনীতি বুঝতে পারা আমাদের জন্য খুবই সহজ। ইথিওপিয়ার রাজনীতিতে ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল হচ্ছে Ethiopian People's Revolutionary Democratic Front, যাকে সংক্ষেপে "EPRDF" বলে। এই রাজনৈতিক দলটির কাঠামো বুঝতে পারলে ইথিওপিয়ায় বর্তমানে চলমান ক্রাইসিসের মূল কারণগুলো সহজে বুঝতে পারা যাবে। ইথিওপিয়ার এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলটি নিচের চারটি দলের সমন্বয়ে (Coalition) গঠিত ছিল।
১. ইথিওপিয়ার উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়ি অঞ্চলটি হচ্ছে তাইগ্রে। ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া সীমান্তের মাঝখানে এই তাইগ্রে অঞ্চলটি অবস্থিত। এই তাইগ্রে জনগোষ্ঠী ইথিওপিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৬.১ শতাংশ। এই তাইগ্রে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী দল- Tigray People's Liberation Front, যা TPLF নামে পরিচিত।
২. ইথিওপিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হলো আমহারা। তারা ইথিওপিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ২৭.১%। এই আমহারাদের প্রতিনিধিত্বকারী দল হচ্ছে- Amhara Democratic Party (ADP)।
৩. ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হচ্ছে অরমো ভাষাভাষী জনগণ। মোট জনগোষ্ঠীর ৩৪.৬%, এদের প্রতিনিধিত্বকারী দল- Oromo Democratic Party (ODP)।
৪. ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের মোট ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত আধাস্বায়ত্তশাসিত একটি অঞ্চল রয়েছে। এই অঞ্চলটি “Southern Nation" নামে পরিচিত। এদের প্রতিনিধিত্বকারী দল- Southern Ethiopian People's Democratic Movement (SEPDM)।
ইথিওপিয়ার সরকারব্যবস্থা
ক) ইথিওপিয়া একটি ফেডারেল সংসদীয় প্রজাতন্ত্র। রাষ্ট্রের প্রধান হলেন প্রেসিডেন্ট, তবে প্রেসিডেন্টের হাতে তেমন ক্ষমতা নেই। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন সালেহ জেইদি (ইথিওপিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট)। সরকার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী, তার হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আবি আহমেদ। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এই দুটি পদ ছাড়াও ইথিওপিয়ার সংবিধানে “Deputy Prime Minister” এই পদটিও রয়েছে। এই পদটি Vice president পদটির মতোই। তাই এটিকে Vice Prime Minister ও বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার প্রধানমন্ত্রীর কাজগুলো করে থাকেন। ইথিওপিয়া, অস্ট্রেলিয়া-সহ আরও কয়েকটি দেশে এই পদটি রয়েছে।
খ) Ethnofederalism - এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম। ইথিওপিয়া মোট দশটি ফেডারেল অঞ্চলে বিভক্ত। এই অঞ্চলগুলো আধাস্বায়ত্তশাসিত এবং তাদের নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্সও রয়েছে। এই অঞ্চলগুলো বিভক্ত করা হয়েছে ইথনিক জনগোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে। তাই নিজ নিজ অঞ্চলে নিজেদের গোষ্ঠীপ্রধানরাই অঞ্চলগুলো শাসন করে থাকে। ফরেইন পলিসি, সিকিউরিটি, মুদ্রা ব্যবস্থা এই তিনটি কেন্দ্রীয় সরকার (প্রধানমন্ত্রী) নিয়ন্ত্রণ করে, আর বাকিসব ফেডারেল গভর্নরের হাতে। তবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর হওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার তার নির্দিষ্ট তিনটি বিষয় ছাড়াও আধাস্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোরও সবকিছুতেই হস্তক্ষেপ করে থাকে। ভারত, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল স্টেটগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভৌগোলিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ভাগ করা, তাই এদেরকে "Federalism" বলে। কিন্তু ইথিওপিয়ার স্টেটগুলো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে বলে এটিকে "Ethnofederalism” বলে।
উপোরিউক্ত চারটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত এই EPRFD দলটি ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকলেও এই চারটি দলের মধ্য থেকে তিনটি দল থেকেই ঘুরেফিরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। কিন্তু Oromo Democratic Party থেকে কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেনি। তবে ২০১৮ সালে এন্টি গভার্নমেন্ট আন্দোলনের তোপে হেলমেরিয়াম প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করলে আবি আহমেদ Oromo Democratic Party থেকে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসে আবি আহমেদ রাজনীতিতে ব্যাপক সংস্কার করার চেষ্টা করেন। এই সংস্করণ থেকেই তাইগ্রে এর সাথে আবি আহমেদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।
ইথিওপিয়াতে গৃহযুদ্ধের কারণ
আবি আহমেদ ও তাইগ্রে নেতাদের মধ্যে আসলে দ্বন্দ্বের কারণগুলো কী কী?
প্রথমত, আবি আহমেদের সংস্করণের মধ্যে একটি ছিল যে, Ethiopian People's Revolutionary Democratic Front (EPRDF) এই সমন্বিত দলটি ভেঙে দেওয়া। দেশে মোট ৮০টির বেশি ভিন্ন জাতিসত্তার জনগোষ্ঠী থাকলেও EPRDF এই দলটি অল্পকয়েকটি কমিউনিটির সমন্বয়ে গঠিত। এই সমন্বিত দলটি ২৭ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশকে একদলীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। তাই এই সময়টিকে আবি আহমেদ "27 years of darkness" হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এই সমন্বিত দলটি ভেঙে দিয়ে দেশের সকল আদিবাসী ও ইথনিক জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে "Prosperity Party” নামে নতুন আরেকটি দল গঠন করেন। অন্য সকল নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী তাতে সাড়া দিলেও তাইগ্রে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দল "Tigray People's Liberation Front (TPLF)” তাতে সাড়া দেয়নি এবং আবি আহমেদের এই সমন্বিত নতুন জোট থেকে তাইগ্রেরা বের হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে আবি আহমেদ প্রশাসন অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে তাইগ্রে জনগোষ্ঠীরও অনেক নেতা ছিল। তাই তারা মনে করে যে, সরকার তাদেরকে দমন করার জন্য দুর্নীতি নির্মূলের নামে তাদের গ্রেপ্তার করেছে।
তৃতীয়ত, পূর্বে দীর্ঘদিন ধরে তাইগ্রেরা রাষ্ট্রের চার্চ, মিলিটারি চিফ ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসলে তারা তাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো হারান। তাই তাইগ্রে এর রাজনীতিবিদরা আবি আহমেদকে "এন্টি-তাইগ্রে” হিসেবে উল্লেখ করেন。
চতুর্থত, করোনার প্রকোপ ঠেকাতে আবি আহমেদ এর কেন্দ্রীয় সরকার সব ধরনের প্রাদেশিক নির্বাচন স্থগিত করলেও তাইগ্রেতে ২০২০ সালের ২১শে আগস্ট প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাইগ্রে স্টেটের এই নির্বাচনে তাইগ্রেদের প্রতিনিধিত্বকারী Tigray People's Liberation Front (TPLF) এই দলটি ১০০% ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। আবি আহমেদ এই নির্বাচনকে বয়কট করেন এবং TPLF কে অবৈধ ঘোষণা করেন।
পঞ্চমত, ১৯৬১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এই দুটি দেশ একসাথে ছিল। ইরিত্রিয়া অঞ্চলে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মাধ্যমে গণ আন্দোলন শুরু হলে ১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হয়ে যায়। তারপর ১৯৯৮ সালে পুনরায় ইথিওপিয়া- ইরিত্রিয়া যুদ্ধ বাঁধলে ২০০০ সালে একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হলেও সীমান্তে সংঘাত চলতেই থাকে। তারপর আবি আহমেদ ক্ষমতায় এসে ২০১৯ সালে ইরিত্রিয়ার সাথে শান্তি চুক্তি করে দীর্ঘদিনের সংঘাত বন্ধ করেন এবং এর কারণে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু ইরিত্রিয়ার সাথে আবি আহমেদের এই শান্তি চুক্তি মেনে নিতে নারাজ তাইগ্রে এর নেতারা। যেহেতু ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার ঠিক মাঝখানে তাইগ্রে অঞ্চলটি তাই তাইগ্রে এর নেতারা মনে করছে দুটি দেশ মিলে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
ষষ্ঠত, তাইগ্রে অঞ্চলে তাইগ্রে জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও স্বল্পসংখ্যক আমহারা ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীও ছিল। কিন্তু তাইগ্রেরা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণে তাইগ্রে অঞ্চলের আমহারাদের নির্বিচারে গণহত্যা করে এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের চার নভেম্বর TPLF এর সামরিক বাহিনী হঠাৎ ফেডারেল সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করলে আবি আহমেদ পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিলে টিপিএলএফ ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। রক্তাক্ত এই সংঘাতের কারণে হাজার হাজার মানুষ ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ শরণার্থী হয়ে সুদানে আশ্রয় নেয়। এই গৃহযুদ্ধ বর্তমানে হর্ন অব আফ্রিকাতে একটি ভয়ংকর অচলাবস্থা (Dangerous Stalemate) সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ বলছে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়াবে।
গৃহযুদ্ধের ভবিষ্যৎ
যেভাবে পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ এই গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলবে? সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও, আফ্রিকান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সবাই ইথিওপিয়ার সরকার ও টিপিএলএফের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের সমঝোতার কথা বললে আবি আহমেদ বৈদেশিক হস্তক্ষেপকে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিজেরাই সমাধান করবেন বলে তিনি জানান। কিন্তু সেই সমাধান আর হচ্ছে না বরং সহিংসতা বেড়েই চলছে। সম্প্রতি ইথিওপিয়া নীলনদের উপর গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম নির্মাণ করে, যা নিয়ে মিশর ও সুদানের সাথে দ্বন্দ্ব বাঁধে। ধারণা করা হচ্ছে তাইগ্রে ইস্যুতে সুদান ও মিশর তাইগ্রে নেতাদের সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে আবার চীন ইথিওপিয়াতে উন্নয়নমূলক অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, ফলস্বরূপ আবি আহমেদের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালোই। তাই চীন বিরোধীরা তাইগ্রে ইস্যু নিয়ে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করলে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে। সুযোগ নেবে অনেক জঙ্গি গোষ্ঠী। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ল্যান্ডলক এই দেশটি এবং যে দেশটি কখনো সম্পূর্ণ কলোনিতে পরিণত হয়নি, সে দেশটির বর্তমানে চলমান সংঘাত উসকে দেবে আল শাবাবের মতো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেও।
বাংলাদেশের ডিবিএল নামের একটি কোম্পানি ইথিওপিয়ার ট্রাইগ্রে অঞ্চলে একটি পোশাক কারখানা চালু করেছিল ২০১৮ সালে। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশি শ্রমিকরা সেখানেই কর্মরত ছিল কিন্তু হঠাৎ করেই লড়াই তীব্র হয়ে যাওয়ায় এই শ্রমিকদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। আবি আহমেদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া তাইগ্রে জনগোষ্ঠীর সাথে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয় না। একই ভাবে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই গৃহযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে তাহলে ইথিওপিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে যেতে পারে কেউ বলতে পারবে না। আফ্রিকার একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে মিশর পারে তার দায়িত্বশীল আচরণ এবং সুকৌশল কূটনীতির মাধ্যমে এই সংকটের গতিপথ নির্মাণ করতে। কারণ এ সংঘাতের স্থায়িত্ব যত গড়াবে, আঞ্চলিক রাজনীতি ও সার্বভৌমত্ব তত বেশি হুমকির মুখে পড়বে, আর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সেই সুবিধা গ্রহণ করবে পরাশক্তিগুলো।
মিশর-ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের স্বরূপ
ইতিহাসের পাতায় নীলনদের একটি ঐতিহাসিক মহত্ত্ব রয়েছে। নীল নদ বর্তমানে বিখ্যাত পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী হিসেবেও। নীলনদের শাখা নদী ব্লু নাইলে ড্যাম (বাঁধ) তৈরি করছে ইথিওপিয়া। যা 'গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম' নামে পরিচিত। এটি নিয়ে দুটো দেশের মধ্যে প্রায় যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। মিশরের বক্তব্য হচ্ছে, নীল নদ থেকে কেউ এক ফোঁটা পানিও উত্তোলন করতে পারবে না। অন্যদিকে ইথিওপিয়া বলছে পৃথিবীর কোন শক্তিই ইথিওপিয়াকে বাঁধ নির্মাণ থেকে আটকাতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে মিশর এখন সংকটে পড়েছে। কারণ ইথিওপিয়া এই বাঁধ বানালে মিশরের অস্তিত্ব নিয়ে সংকট দেখা দেবে। বুঝতেই পেরেছেন বিষয়টি কত জটিল ও সংবেদনশীল দুটি দেশের জন্য। আসুন বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি আসলে কী নিয়ে দুটি দেশ যুদ্ধের মুখোমুখি। মানচিত্রে তাকালে দেখবেন যে, নীল নদের দুটি শাখা নদী রয়েছে; একটি হোয়াইট নাইল (White Nile), অন্যটি ব্লু নাইল (Blue Nile)। হোয়াইট নাইলের উৎপত্তিস্থল মধ্য আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায়। আর ব্লু নাইল ইথিওপিয়ার তানা হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব নিকে প্রবাহিত হয়ে সুদানে প্রবেশ করেছে। দুইটি উপনদী সুদানের রাজধানী খার্তুমের নিকটে মিলিত হয়েছে। জলবিদ্যুৎ তৈরির জন্য নীল নদের শাখা নদী ব্লু নাইলের উপর এই বিশাল বাঁধ তৈরি করছে ইথিওপিয়া। যার নাম দিয়েছে গ্র্যান্ড রেনেসাঁ ড্যাম। এই বাঁধ তৈরি নিয়ে মিশর এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে ঐতিহাসিক চুক্তি মানতে নারাজ ইথিওপিয়া সরকার। ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে নীল নদের উৎস নদী ব্লু নীলে ২০১১ সালে বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু করে ইথিওপিয়া, যেখান থেকে নীল নদের মোট ৮৫ শতাংশ পানি প্রবাহিত হয়। ইথিওপিয়ার পরিকল্পিত এই বাঁধটি নির্মিত হলে ভবিষ্যতে সেটি হবে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ১৯২৯ সালে মিশর ও তৎকালীন আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেনের মধ্যে একটি চুক্তি হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে আরেকটি চুক্তি হয়, সেই চুক্তিতে মিশর এবং সুদানকে নীল নদের সমস্ত পানির উপর অধিকার দেয়া হয়। ঔপনিবেশিক আমলের সেসব নথিপত্রে নদীটির উজানে যে প্রকল্প পানি প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয় শুধু মিশর ও সুদানকে। তাই নীল নদের পানি প্রবাহে কেউ বাঁধা সৃষ্টি করলে সেখানে ভেটো দেওয়ার অধিকার রাখে শুধু মিশর ও সুদান। কিন্তু ইথিওপিয়া বলছে, শতবর্ষ পুরোনো এসব চুক্তি মানতে তারা বাধ্য নয়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় মিশরে অস্থিতিশীলতা শুরু হলে সেটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ইথিওপিয়া বাঁধের কাজকর্ম শুরু করে দেয়। তবে মিশরের দাবি, ১৯৫৯ সালের জলচুক্তি ইথিওপিয়াকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কারণ এটি যেহেতু আন্তর্জাতিক চুক্তি তাই ইথিওপিয়া সেই চুক্তি মানতে বাধ্য। ইথিওপিয়া এই চুক্তি মানতে নারাজ তার কারণ হলো অতীতের সেই চুক্তিতে নীল নদের জলের সবচেয়ে বেশি অংশ মিশরকে দেওয়া হয়েছিল এবং ইথিওপিয়াকে তখন সেই চুক্তির শরীক হিসেবে রাখা হয়নি। ইথিওপিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চুক্তির পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে চেয়েছিল কিন্তু মিশর ১৯৫৯ এর চুক্তি থেকে সরে আসতে রাজি নয়। তাছাড়াও ইথিওপিয়ার জনগণ এই বাঁধ বানানোর পক্ষে। ইথিওপিয়ার জনগণ মনে করে নিজেদের সীমানায় বাঁধ বানানো তাদের অধিকার এবং এতে মিশরের আপত্তি থাকার কথা নয়। এই অবস্থায় মিশর বলছে জলবণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনগত ব্যবস্থা হোক। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার মধ্যে আলোচনার কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় মিশরের আপত্তিতে ভ্রুক্ষেপ না করে বাঁধের কাজ ২০২১ সালে পুনরায় পুরো উদ্যমে শুরু করে দিয়েছে ইথিওপিয়া। আর তাই নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শুরু হয়েছে নানা বাকবিতন্ডা।
মিশর- ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের কারণসমূহ
বিবাদের পেছনে কারণগুলো কী কী? এক. মিশরের আশঙ্কা এর ফলে ইথিওপিয়া একসময় নীল নদীটির পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। দুই. পানির জন্য নীল নদের উপর ৯০ ভাগ নির্ভর করে মিশর। মিশর মনে করছে, ইথিওপিয়ার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে নীল নদের স্রোত প্রবাহের উপর প্রভাব পড়বে। তিন. নীল নদে যদি পানি প্রবাহ কমে যায়, তাহলে সেটি মিশরের লেক নাসেরকে প্রভাবিত করবে। যার ফলে মিশরের আসওয়ান বাঁধে পানির প্রবাহ কমে যাবে, যেখান থেকে মিশরের বেশির ভাগ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। ফলস্বরূপ মিশরের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাবে। চার. মিশরের আরও আশঙ্কা, ইথিওপিয়ার বাঁধের কারণে নীল নদের পানির প্রবাহ যদি অনেক কমে যায়, তাহলে সেটি দেশটির নদীপথে পরিবহন ব্যবস্থাকেও হুমকির মুখে ফেলবে এবং কৃষকদের কৃষি ও পশুপালনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কয়েক বছর পর কৃষি কাজের জন্য মিশর আর পানি পাবে না। তাই মিশরে কৃষকরাও অনেক ক্ষুব্ধ। পাঁচ. মিশরও বলছে, তারা পুরোপুরি নীল নদের জলের উপর নির্ভরশীল এবং জল যেহেতু কমছে, তাই ১০ কোটি লোকের জীবনের উপর বিশাল প্রভাব পড়বে। তাই মিশরের দাবি জতিসংঘ হস্তক্ষেপ না করলে সংঘাত অনিবার্য। ইথিওপিয়া বাঁধ নির্মাণ করলে মিশর ও সুদান মিলিয়ে ১৫ কোটি লোকের জীবন বিপদাপন্ন হয়ে যাবে। তাই এই বাঁধ তারা মানবে না।
এত বড় বাঁধ তৈরিতে ইথিওপিয়ার স্বার্থ কী?
প্রথমত, প্রায় চারশো কোটি ডলার খরচ করে বাঁধটি তৈরি করছে ইথিওপিয়া। এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে এই প্রকল্প থেকে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে দেশটি। বর্তমানে ইথিওপিয়ায় অনেক বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। দেশটির ৬৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। এই বাঁধ থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে, তা দেশটির নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত হয়ে প্রতিবেশি দেশগুলোতেও রপ্তানি করা যাবে। একদিকে নিজ দেশের চাহিদা পূরণ অন্যদিকে প্রতিবেশি রাষ্ট্রে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়ত, তারা যে আফ্রিকার একটি উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে যাচ্ছে এই বাঁধ স্থাপনের প্রচেষ্টা তারই একটি উদাহরণস্বরূপ।
অর্থাৎ ইথিওপিয়া তাদের সক্ষমতাকে প্রমাণ করার জন্য অনেক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও এই বাঁধটি নির্মাণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। এমনকি এই বাঁধ তৈরিতে বিদেশি কোনো অর্থায়নও নিচ্ছে না দেশটি। সরকারি বন্ড এবং বিভিন্ন প্রাইভেট ফান্ড থেকে বাঁধটি তৈরি করা হচ্ছে। ফলে এই বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপকে ইথিওপিয়া ভালো চোখে দেখছে না বরং ইথিওপিয়া মনে করছে তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ কখনোই কাম্য নয়। তৃতীয়ত, ইথিওপিয়াতে অসংখ্য লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। তাদের ১১ কোটি লোককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বানতে এই বাঁধ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে গেলে ইথিওপিয়া হয়ে উঠবে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ রপ্তানিকারী দেশ। তাই নীল নদের পানি নিয়ে মিশর, সুদান, ইথিওপিয়ার মধ্যে যে রাজনীতিটি হচ্ছে সেটিকে “Water Politics” হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
সুদানের ভূমিকা
ইথিওপিয়া ছাড়া আফ্রিকার আর কোন দেশ উপকৃত হবে? প্রতিবেশি সুদান, দক্ষিণ সুদান, কেনিয়া, জিবুতি এবং ইরিত্রিয়া ইত্যাদি দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় এই বাঁধ থেকে তারাও উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সুদান হলো মিশরের বন্ধু এবং ইথিওপিয়ার শত্রু। তা সত্ত্বেও সুদানের জন্য একটি সুবিধা হলো যে, এই বাঁধের কারণে সেখানকার নদীর পানি প্রবাহ সারা বছর ধরে একই রকম থাকবে। কারণ সাধারণত অগাস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে পানি প্রবাহ বেড়ে গিয়ে সুদানে অনেক সময় বন্যা দেখা দেয়। তাই বাঁধের কারণে সুদান কিছুটা বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে- সুদানের লাভ হওয়া সত্ত্বেও সুদান কেন এই বাঁধের বিরোধিতা করছে? তার অবশ্য দুটি কারণ রয়েছে। এক. মিশরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। দুই. সুদান মনে করছে নীল নদের পানির উপর শত্রু রাষ্ট্র ইথিওপিয়ার একবার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে সেটি হবে সুদানের জন্য হুমকিস্বরূপ। কেননা ইতোমধ্যে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার পর ব্লু নাইলের জল দৈনিক প্রায় ৯ কোটি কিউবিক মিটার কমে গিয়েছে, যা সুদানের জন্য ভালো খবর নয়।
মিশর-ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ
এই দ্বন্দ্ব নিরসনে অনেক আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলেও মিশর ও ইথিওপিয়া নেগোসিয়েশনে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। নিজ স্বার্থের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে উভয়ই সমঝোতায় আসতে নারাজ। এজন্যই উভয় দেশের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্ব আরও ত্বরান্বিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাগুলোকে “Futile Negotiations” বা “ব্যর্থ প্রচেষ্টা” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- এই দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ কোন দিকে? এই বিতর্কের আশু সমাধান না হলে দেশগুলোর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মিশরের অর্থনীতি বর্তমানে খুব বেশি ভালো নয়। তার উপর আবার মিশরের অর্থনীতি সম্পূর্ণ নীল নদের উপর নির্ভরশীল। একই ভাবে সরকার বনাম তাইগ্রে গৃহযুদ্বের কারণে ভঙ্গুর অর্থনীতি কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে এই বাঁধ ইথিওপিয়ার জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প শুরুর দুই বছর পর ২০১৩ সালে বাঁধ তৈরিকে কেন্দ্র করে ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল মিশর। এমনকি ২০১৮ সালের দিকে মিশর ও সুদান মিলে ইরিত্রিয়ায় তাদের মিলিটারি পাঠিয়েছিল এই বাঁধ ধ্বংস করতে। মিশরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিসি বলেছেন, নীল নদের পানি নিয়ে তাদের অধিকার রক্ষায় মিশর সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত হয়েছে এই দ্বন্দ্বে। যুক্তরাষ্ট্রের এতে জড়িয়ে পড়া থেকে বোঝা যায় যে, পরিস্থিতি কতখানি গুরুতর এবং এই অচলাবস্থার অবসান কতটা জরুরি। এই অচল অবস্থা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়েছে মিশর, যা প্রথমে মানতে চায়নি ইথিওপিয়া। তবে পরে রাজি হয়েছে। উল্লেখ্য, মিশরের পাশাপাশি ইথিওপিয়াকেও যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত মিত্র মনে করে। তাই বলতে দ্বিধা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি মিত্র রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষ হলে অন্যান্য পরাশক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়বে এই সংঘাতে। যার ভবিষ্যৎ প্রভাব পড়বে সুয়েজ খাল, হর্ন অফ আফ্রিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যি পথগুলোর নিরাপত্তা এবং এই প্রেক্ষাপটে বিরোধ কীভাবে মিটবে তার কোনো সংকেত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
আগামীর বিশ্ব রাজনীতিতে মরক্কো কেন ফ্যাক্টর
উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশ মরক্কো। দেশটি ১৯৫৬ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা পায়। দেশটিতে রাজতন্ত্র বিদ্যমান; তবে সেটি সাংবিধানিক। আরব বসন্তের প্রভাবে এবং জনগণের চাপে সংবিধান প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল মরক্কো সরকার। বাদশার পাশাপাশি একজন প্রধানমন্ত্রীও রয়েছে মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। নতুন সংবিধানে সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এটি একমাত্র আফ্রিকান দেশ যা আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য নয়। তবে এটি আরব লীগ, আরব মাগরেব ইউনিয়ন, ওআইসি, গ্রুপ অফ ৭৭ ইত্যাদি দেশের সদস্য। সম্প্রতি কিছু ভূরাজনৈতিক কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক উন্নয়ন চাচ্ছে তাই আফ্রিকার এই দেশটি এখন ন্যাটোরও মিত্র দেশ। ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো আরব রাষ্ট্র মরক্কোতে ইসরায়েল তার কূটনীতিক ভবন উদ্বোধন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন দীর্ঘদিন ধরে শত্রু হয়ে থাকা এই আরব রাষ্ট্রগুলো এখন ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে মনোনিবেশ করছে? কেন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এখন ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে? এর পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণ কী হতে পারে?
আরব-ইসরায়েল নরমালাইজেশন
আরব রাষ্ট্রগুলোর মাতৃ সংগঠন হচ্ছে আরব লীগ। আরব লীগের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলো কখনোই দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সম্মতি দিয়েছিল। অবৈধভাবে ফিলিস্তিনিদের বসতি উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিজেদের দখলে নিচ্ছে ইসরায়েল। তাই আরব লীগের মতাদর্শ অনুযায়ী আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে কোনোরকমের সম্পর্ক বজায় না রাখার কথা। কিন্তু সেই ১৯৪৫ সালে তৈরী হওয়া আরব লীগের মতাদর্শ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে তার সদস্য রাষ্ট্রগুলো। একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিজেদের ক্ষমতার আধিপত্য ধরে রাখতে এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছু আরব রাষ্ট্র এখন আরব লীগের মতাদর্শ ভুলে গিয়ে ইসরায়েলের সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইসরায়েলের সাথে আরব লীগের সদস্যভুক্ত কোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে 'Normalization' বা 'সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ'।
বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই 'Normalization' টার্মটি বহুল আলোচিত। ধরুন, আরব লীগের একটি সদস্য রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করল, তখন এই সম্পর্কটিকে কূটনৈতিক অঙ্গনে বলা হচ্ছে "Arab- Isreal Normalization"। আরব লীগের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে নিয়ম ভেঙে সর্বপ্রথম ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় মিশর। এরপর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে জর্ডান। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সুদান এই রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে আগায়। আরব দেশ হিসেবে সর্বশেষ ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে মরক্কো। ২০২১ সালের আগস্টে ইসরায়েলের সাথে মরক্কোর তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী এখন থেকে মরক্কো ও ইসরায়েলের মধ্যে বিমান চলাচল শুরু হবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হবে। ক্রীড়া, যুব ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে- মরক্কোর সাথে ইসরায়েল কেন সম্পর্ক স্থাপন করল? এর পেছনে মোটাদাগে তিনটি কারণ প্রতীয়মান।
প্রথমত, ইসরায়েলি প্রযুক্তি পেগাসাস সম্পর্কে ইসরায়েল অধ্যায়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। গবেষণায় উঠে এসেছে পেগাসাসের মতো উন্নত ফটওয়্যার ব্যবহার করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ মরক্কোতে বসে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপর নজরদারি করে। ইউরোপের প্রায় সবগুলো রাষ্ট্রই ইসরায়েলের মিত্র রাষ্ট্র। তাই ইসরায়েলের গোয়েন্দারা ইউরোপে গিয়ে ইউরোপীয় কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের উপর নজরদারি করে ধরা পড়ে গেলে ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। আর সেটি ইসরায়েলের জন্যও নিরাপদ নয়, যেহেতু ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলোও প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নত। তাই নিরাপদ দূরত্বে বসে গোটা ইউরোপকে নজরদারি করার জন্য ইসরায়েলের প্রয়োজন একটি সেইফ জোন। সেই নিরাপদ জায়গা হিসেবে মরক্কো হচ্ছে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। আফ্রিকা মহাদেশের দেশ মরক্কো এমন এক ভৌগোলিক স্থানে অবস্থিত যেখানে বসে সহজেই গোটা ইউরোপকে নজরদারি করা যায়। কারণ মরক্কো থেকে ইউরোপের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটারের জিব্রাল্টার প্রণালি। এজন্য ইসরায়েলের প্রয়োজন মরক্কোকে। তাছাড়াও বাণিজ্যিক স্বার্থ তো আছেই। তার মধ্যে সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালির মধ্যে দিয়ে বাণিজ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন হতে পারে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক করে মরক্কোর লাভ কি? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি সাধারণ নিয়ম হচ্ছে যে, কোনো একটি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো করা মানেই স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল-এর সাথেও সম্পর্ক ভালো হয়ে যাওয়া। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ভালো তাই ইসরায়েলের সাথেও সৌদির সম্পর্ক ভালো। একই ভাবে ইসরায়েলের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা মানেই স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়ে যাওয়া। যেমন- ইসরায়েলের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও ভারতের সম্পর্ক ভালো। তাই মরক্কো এই সুযোগটিই নিয়েছে। ইসরায়েলের সাথে মরক্কো তার সম্পর্কটি ভালো করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মরক্কোর একটি ভালো সম্পর্ক অটোমেটিক গড়ে উঠবে। তারপর মরক্কো সরকার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একসাথে নিয়ে বিতর্কিত সাহারা অঞ্চলটি নিজেদের দখলে রাখতে পারবে। মরক্কো, আলজেরিয়া ও মৌরিতানিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে সাহারা অঞ্চলটি অবস্থিত। এমনকি ১৯৭৫ সালে পশ্চিম সাহারার অধিকাংশ অঞ্চল মরক্কো নিজের বলে দখল করে নিয়েছিল। এই বিতর্কি অঞ্চলটির দখল নিয়ে মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার ও মৌরিতানিয়ার একটি দ্বন্দ্ব চলা। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে মরক্কো চাচ্ছে সম্পূর্ণ এই অঞ্চলটি আমেরিকার মাধ্যমে তাদের দখলে নিয়ে নিতে। পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসাই দেশটির উদ্দেশ্য।
তৃতীয়ত, মরক্কো একটি আরব বা ইসলামি রাষ্ট্র হলেও সেখানে প্রায় তিন লক্ষ ইহুদি বসবাস করছে। প্রশ্ন হচ্ছে মুসলিম দেশে এত সংখ্যক ইহুদি আসল কোথা থেকে? পনেরো শতকে স্পেনে ইহুদি নিধন শুরু হলে হাজার হাজার ইহুদি জিব্রাল্টার প্রণালি পাড়ি দিয়ে মরক্কোতে আশ্রয় নিয়েছিল। সে-কারণেই মরক্কোতে আজ এত ইহুদি জনগণের বসবাস। সেই তিন লক্ষ ইহুদি জনগণের নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েল মরক্কোর সাথে সম্পর্ক তৈরি করার আরেকটি কারণ হতে পারে। তাছাড়াও আজকের একুশ শতাব্দীতে এসে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল ও আমেরিকাকে পাশে পেলে মরক্কোর জন্যই লাভ বলে মনে করছে দেশটির কূটনীতিবিদরা। তাই Arab Isreal Normalizationটিকে মরক্কো তাদের একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার মানে হলো ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া। অথচ আরব দেশগুলোর মধ্যে বহু বছরের একটি ঐকমত্য ছিল। সেটি হচ্ছে, ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক একমাত্র ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার মাধ্যমেই হতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা যখন পূর্ব জেরুজালেমে আর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মধ্যে দুঃসহ দিন কাটাচ্ছে তখন ইসরায়েল এই আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করছে। একই ভাবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও ভূরাজনৈতিক কারণে আরব রাষ্ট্রগুলো একেক করে ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক স্থাপন করছে এবং ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দিচ্ছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোও নিজ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক নরমালাইজেশনের পথে হাঁটবে। যে-সকল আরব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের বিরোধিতা করে আসছে তারাই এখন সময়ের প্রয়োজনে ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, যা ইসরায়েলের কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি মাইলফলক। ইসরায়েলের ন্যাশনাল পলিটিক্সে "Iron Wal Trap" নামে একটি পরিভাষ আছে। এর মানে হলো, ইসরায়েল আয়রন ওয়াল বা লৌহ প্রাচীরের কৌশলে বিশ্বাসী। এই কৌশলের মূল কথা হচ্ছে, ইসরায়েলকে এতটাই উন্নত ও শক্তিশালী হতে হবে যে, যাতে করে শেষ পর্যন্ত আরবরা বুঝতে পারে ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আর এখন একুশ শতাব্দীতে এসে ইসরায়েল সেটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে পারছে। এজন্যই বলা হয় একটি রাষ্ট্রকে সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্য শুধু দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতিই যথেষ্ট।
"Fifth Column" নামে আরেকটি পরিভাষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই ফিফথ কলামের মানে হলো, একটি দেশের বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী সেই দেশের অনুগত না হয়ে অন্য আরকটি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত হয়। উদাহরণস্বরূপ: ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইরান দাবি করত বাহরাইন তাদের দেশেরই অংশ। ইরান একটি শিয়া মুসলিম প্রধান দেশ। অন্যদিকে বাহরাইনের শাসকগোষ্ঠী সুন্নি হলেও দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিয়া। তাই বাহরাইনের সুন্নি শাসকরা তাদের দেশে বসবাসরত শিয়া জনগোষ্ঠীকে ইরানের মিত্র হিসেবে ভাবেন। ইরানের সাথে জনগোষ্ঠীর সাথে ইরানের যোগসাজশের ব্যাপারটি "Fifth Column" হিসেবে পরিচিত। আজকে বাহরাইনের শিয়া উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও বাহরাইনের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তার জন্য এটিও একটি অন্যতম কারণ। তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদিকে কেন্দ্র করে আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বিভাজন সেটিকে ইসরায়েল তার সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে এবং সেটিকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রগুলোকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসতে পারছে।
তিউনিসিয়ার সংকট ও ভূরাজনীতি
আরব বসন্তের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত তিউনিসিয়া। দেশটি ১৮৮১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময় (পঁচাত্তর বছর) ফ্রান্সের একটি উপনিবেশ ছিল। উপনিবেশবাদী শক্তি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন তিউনিসিয়ার একটি রাজনৈতিক দল। সেই রাজনৈতিক দলটির নাম হলো 'New-Destour' বা নব্য দোস্তর। ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্য রাজনৈতিক দল কংগ্রেস যে রকম ভূমিকা পালন করেছিল কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যে ভূমিকা পালন করেছিল ঠিক সেরকম তিউনিসিয়ার স্বাধীনতার জন্য দোস্তর দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৫৬ সালে তিউনিসিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদী নেতা হাবিব বোরগুইবা তিউনিসিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। হাবিব বোরগুইবা ১৯৫৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিউনিসিয়াকে শাসন করেন। তার শাসনামলে তিউনিসিয়া একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হলেও তিনি মূলত তিউনিসিয়াকে একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় (A Single Party State) পরিণত করেন। হাবিব বোরগুইবার পর ১৯৮৭ সালে তিউনিসিয়ার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হন জাইন আল আবেদিন বেন আলী। ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসক বেন আলী তিউনিসিয়াকে শাসন করেন।
বেন আলীর শাসনামলে তিউনিসিয়া অনেক সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। তখন গ্রাজুয়েশন শেষ করা যুবকদের জন্য ছিল না কোনো চাকরি, রাষ্ট্রের আমলারা হয়ে ওঠে দুর্নীতিপরায়ণ, ছিল না মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ছিল অনেক। রাষ্ট্রের এই বেহাল দশার জন্য তিউনিসিয়ার সকল নাগরিক বেন আলীর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেই সময়টিতে বুআজিজি নামে তিউনিসিয়ার এক শিক্ষিত যুবক গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যা করেন। বুআজিজির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি পুরো তিউনিসিয়া জুড়ে স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের তোপে ১৪ জানুয়ারি বেন আলী তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি নেন এবং পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। তিউনিসিয়ার এই আন্দোলনটাই ইতিহাসে "আরব বসন্ত" হিসেবে পরিচিত। স্বৈরাচার বেন আলীর পতনের পর ২০১৪ সালে তিউনিসিয়া একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। স্বাধীনতার পর ১৯৫৭ থেকে ২০১৪ সালের নতুন সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত এই সময়টি 'First Republic' হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ ফার্স্ট রিপাবলিক পিরিয়ডে তিউনিসিয়াকে হাবিব বোরগুইবা ও বেন আলী শাসন করেছিলেন। আর ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই সময়টি তিউনিসিয়ার জন্য 'Second Republic' হিসেবে পরিচিত।
স্বৈরশাসক বেন আলীর পতনের পর ২০১৪ সালে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সংবিধানে ঠিক করা হয় রাষ্ট্রের নতুন শাসন ব্যবস্থা। সংবিধান অনুযায়ী ২০১৪ সালের ডিসেম্বরেই তিউনিসিয়া একটি নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিউনিসিয়ার প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ বাজি কায়িদ সাবসি। এক কথায় নতুন এই সংবিধান ও নির্বাচনের মাধ্যমে তিউনিসিয়া গোটা আরব বিশ্ব এবং উত্তর আফ্রিকার একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট কায়িদ সাবসি এর রাজনৈতিক দলের নাম ছিল নিদা তাউনিস (Nidaa Tounes)। সেকুলারিজমে বিশ্বাসী এই দলটি ছিল কিছুটা সমাজতন্ত্র ঘেঁষা। কায়িদ সাবসি এর মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিউনিসিয়ার দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হন কায়েস সাইয়েদ। ব্যক্তি জীবনে আইনজীবী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ এর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। একজন নিরপেক্ষ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিউনিসিয়ায় তার জনপ্রিয়তা অনেক।
২০২১ সালে করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের কারণে তিউনিসিয়ার বেশ কয়েকটি শহরে লাখ লাখ মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করে। তিউনিসিয়াতে সরকার বলতে মূলত প্রধানমন্ত্রীকেই বোঝায়। জনগণের লাগাতার আন্দোলন দেখে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট তখন প্রধানমন্ত্রীকে কয়েকবার সতর্ক হওয়ার জন্য বলেছিলেন এবং এটিও বলেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন তাহলে তাকে প্রধানমন্ত্রী থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে বিক্ষোভের মুখে ২০২১ সালের ২৫শে জুলাই তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিচাম মেচিচিকে বরখাস্ত করে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেন প্রেসিডেন্ট কায়েস সায়িদ। এখন দুইটি প্রশ্ন হতে পারে :
এক. বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে প্রেসিডেন্ট যদি কখনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যায় তাহলে প্রধানমন্ত্রী ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সে-দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও কেন তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন নি? দুই. প্রেসিডেন্ট গণ আন্দোলনের তোপে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্টের স্পিকারকে বহিষ্কার করেছেন। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা কোথায় পেল? তিউনিসিয়াতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বেশি নাকি প্রধানমন্ত্রীর?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পদ্ধতি এবং প্রেসিডেন্ট- প্রধানমন্ত্রী কার কতটুকু ক্ষমতা এই দুইটি বিষয় জানতে হবে। শুধু উপরিউক্ত দুইটি প্রশ্নের ক্ষেত্রেই নয় বরং ২০১৪ সালের পর থেকে তিউনিসিয়ার যে-কোনো রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা সংকটকে সহজেই বিশ্লেষণ করা যাবে তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক সিস্টেমটি দিয়ে। তিউনিসিয়া যেহেতু ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে তাই তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক সিস্টেমটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক সিস্টেমের আদলে গড়া। দেশটিতে Semi Presidential System থাকায় প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রায় সমান। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী প্রতি পাঁচবছর পরপর তিউনিসিয়াতে একটি নয় বরং একসাথে দুইটি নির্বাচন হয়।
First Election: প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
প্রথমে শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করা হয়। নির্বাচনে যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মোট ভোটের অর্ধেকের বেশি (৫০ শতাংশ) ভোট পাবেন সেই হবেন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট। এখন মনে করুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি কোনো প্রার্থীই ৫০% ভোট না পায় অর্থাৎ কোনো একজন প্রার্থী পেল ২৩% ভোট, আরেকজন পেল ৩৪%, আরেকজন পেল ২৮% ভোট। তখন যে দুই জন প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে তাদের নিয়ে আবার দ্বিতীয় রাউন্ড নির্বাচন হয়। এক কথায় নির্বাচনে কোনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীই অর্ধেকের বেশি ভোট না পেলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া এমন দুইজনকে নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড ভোটের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় রাউন্ড ভোটে দুইজনের যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে সেই হবে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট। এভাবে দুইবার ভোটের মাধ্যমে একজনকে প্রেসিডেন্ট বানানোর সিস্টেমকে বলা হয় 'Runoff Voting System'।
Second Election: পার্লামেন্টারি নির্বাচন
প্রথম ইলেকশনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তিন মাস পর তিউনিসিয়ার নির্বাচন কমিশন আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনটি হচ্ছে পার্লামেন্টারি বা সংসদীয় নির্বাচন। তিউনিসিয়াকে মোট ২১৭টি নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। তাই তিউনিসিয়ার সংসদ বা পার্লামেন্টের মোট আসন সংখ্যা হলো ২১৭টি। তিউনিসিয়ার যে রাজনৈতিক দল থেকে মেজরিটি সংখ্যক প্রতিনিধি আসবে তারাই হলেন পার্লামেন্টের বিজয়ী দল। আর এই বিজয়ী দলের নেতা হলেন তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট এককক্ষ বিশিষ্ট। পার্লামেন্ট বা সংসদের নাম হলো Assembly of the People's Representatives। পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে এই ২১৭ জন সদস্যদের ভোটাভুটিতে একজনকে সংসদের স্পিকার বানানো হয়। এই ২১৭ জন সদস্যদের মধ্যে যেহেতু অর্ধেকের বেশিই সরকারি দলের সদস্য, তাই মূলত সরকারি দলের একজন সদস্যই স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকারের পদটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিউনিসিয়ার স্পিকারকে বলা হয় 'ex officio Vice-President'। এর মানে হলো কোনো কারণে প্রেসিডেন্ট অযোগ্য বিবেচিত হলে কিংবা মারা গেলে তখন তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। মনে করুন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কোনো কারণে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হলেন। স্পিকার তখন প্রেসিডেন্ট হবেন। স্পিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ৪৫ দিন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তারপর ৪৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন আরেকটি প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনের আয়োজন করবেন।
Power Distribution (ক্ষমতার বণ্টন)
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা: (ক) Head of State: তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। (খ) Overseas Defence: অন্য রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ কিংবা বহিঃদেশের আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের। (গ) National Security: তিউনিসিয়াকে গৃহযুদ্ধ, জঙ্গি হামলা ইত্যাদি থেকে রক্ষা করার দায়িত্বও প্রেসিডেন্টের। (ঘ) Foreign Policy: তিউনিসিয়ার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্ট। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই দুইজনের নিয়োগে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা থাকে। (ঙ) Dissolving Parliament: তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতাটি অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা ঠিকমতো দেশ চালাতে পারছে না তাহলে যে-কোনো সময় প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পারেন এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও স্পিকারকে বরখাস্ত করতে পারেন। ঠিক এই কারণে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। প্রেসিডেন্টের এই সাংবিধানিক ক্ষমতাবলেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পেরেছেন। (চ) Commander in Chief: প্রেসিডেন্ট হলেন তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ। সেনাবাহিনীরা সাধারণত প্রেসিডেন্ট এর আজ্ঞাবহ।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা
তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন সে দেশের সরকার প্রধান। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছাড়া বাকি সকল মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী তার পছন্দমতো নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রায় সকল পলিসি প্রধানমন্ত্রীই নিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখাশুনা, কোনো আইনের সংশোধন এসব মূলত প্রধানমন্ত্রীর হাতেই।
প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর উপরিউক্ত ক্ষমতার ভারসাম্য দেখে মনে হতে পারে সবই তে ঠিকঠাক আছে। তাহলে তিউনিসিয়াতে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট এর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধে কী নিয়ে? তিউনিসিয়ার বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট এর পদ নিয়ে যে সংকটটি চলছে সেটি কিংবা ভবিষ্যতে যদি তিউনিসিয়ায় কোনো বড় ধরনের সংকট দেখা দেয় তাহলে এসব সংকট খুবই সহজে আপনি অনুধাবন করতে পারবেন তিউনিসিয়ার উপরিউক্ত Semi Presidential System'টি বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে।
উপরে দেখেছিলাম এই সেমি প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম এর কারণে তিউনিসিয়ায় দুইটি নির্বাচন হয়- প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, পার্লামেন্ট নির্বাচন। এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনে করুন 'নীদা তাউনিস' পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো। তারপর পার্লামেন্ট নির্বাচনে মনে করুন নীদা তাউনিস পার্টি জয়ী হলো না বরং জয়ী হলো আন নাহদা পার্টি। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হলেন নীদা তাউনিস পার্টি থেকে আর প্রধানমন্ত্রী হলেন আন নাহদা পার্টি থেকে। আমরা যতই বলি না কেন রাজনীতি হলো জনগণের মঙ্গলের জন্য, আসলে রাজনীতির মূলে রয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ বা দলের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এজন্য দুই পার্টি থেকে দুজন ক্ষমতা আসায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন, পলিসি ও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং এটাই স্বাভাবিক। আর কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন ভিন্ন দুটি রাজনৈতিক দল থেকে আসলে সেটিকে বলা হয় 'Cohabitation'।
ভবিষ্যতে কখনো যদি তিউনিসিয়াতে কোনো সংকট দেখা দেয় তাহলে আপনি শুধু দুইটি বিষয় সামনে নিয়ে আসবেন। এক. সেমি প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেমটি, দুই. প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কোন রাজনৈতিক দলের। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই কি একই রাজনৈতিক দলের নাকি ভিন্ন ভিন্ন দলের। যদি দেখেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের তাহলে বুঝবেন তিউনিসিয়ার সংকটটি মূলত তিউনিসিয়ার Semi Presidential System এর কারণেই। আর যদি দেখেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ই একই দলের তাহলে সংকটটি এই পলিটিক্যাল সিস্টেমের জন্য নয় বরং ভূরাজনৈতিক কারণে। একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, তিউনিসিয়ার জনগণ যখন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তখন প্রেসিডেন্ট তিউনিসিয়ার জনগণের পক্ষে অবস্থান করবে নাকি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে? উত্তর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট যতবার ইচ্ছে ততবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। তাই দ্বিতীয় টার্মে জয়ী হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে জনগণের পক্ষেই অবস্থান করতে হয়। ২০২৪ সালে তিউনিসিয়াতে আবার প্রেসিডেনয়িশাল নির্বাচন হবে। ২০২৪ সালের সেই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্যই প্রেসিডেন্টকে তিউনিস জনগণের পক্ষ নিয়ে সংসদ ভেঙে দিতে হয়েছে। তাই তিউনিসিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পেছনে কিছুটা ভূরাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও মূল সংকটটি তিউনিসিয়ার পলিটিক্যাল সিস্টেমের কারণেই তৈরি হয়েছে।
তিউনিসিয়া নিয়ে ভূরাজনীতি
এবার কিছুটা ভূরাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা যাক। উত্তর পূর্ব আফ্রিকার পাঁচটি দেশ হলো মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো। একমাত্র মরক্কো ছাড়া বাকি চারটি দেশই একসময় উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে উসমানীয় সাম্রাজা বিলুপ্ত হওয়ার পর উত্তর আফ্রিকার এই দেশগুলো ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হাতে চলে যায়। এখন উত্তর আফ্রিকার এই দেশগুলো নিয়ে তিনটি এলায়্যান্স দেখা দিয়েছে।
এক. উত্তর আফ্রিকার এই মুসলিম দেশগুলো যেহেতু পূর্বে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল তাই তুরস্ক এখন চাচ্ছে এসব অঞ্চলে তার আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে। দুই. মিশর যেহেতু উত্তর আফ্রিকার দেশ তাই মিশর চাচ্ছে এখান থেকে তুরস্কের কর্তৃত্ব হটিয়ে এখানে মিশরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে।
তিন. মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে বিগত কয়েকবছর ধরে একটি পোলারাইজেশন তৈরি হয়েছে ইরান ও সৌদিকে কেন্দ্র করে। এতদিন মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে ইরান ও সৌদি ছন্দে লিপ্ত ছিল এবং এখনো চলমান। কিন্তু এখন এই ইরান-সৌদির দ্বন্দ্বকে ছাড়িয়ে নতুন আরেকটি বলয় তৈরি হয়েছে সেটি হলো- কাতার বনাম সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বন্দ্ব। কাতার ও আরব আমিরাত উভয়ই এখন চাচ্ছে এই অঞ্চলের হেজিমন হয়ে উঠতে। তাই উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো নিয়ে কাতার যোগ দিয়েছে তুরস্কের পক্ষে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত যোগ দিয়েছে মিশরের পক্ষে। চার. ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তিউনিসিয়ার আন নাহদা পার্টি এগুলোকে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সিকিউরিটির জন্য হুমকি হিসেবে মনে করে। তাই মিশরে যেন মুসলিম ব্রাদারহুডের পুনরায় উত্থান না হয় এবং তিউনিসিয়ায় যেন আন নাহদা পার্টিকে দমিয়ে রাখা যায় সেজন্য পশ্চিমা দেশগুলো উত্তর আফ্রিকার ইস্যুতে মিশরের পক্ষ নিয়েছে (তথা মিশর + সংযুক্ত আরব আমিরাত + যুক্তরাষ্ট্র এক ব্লকে। আর তুরস্ক + কাতার বিপরীত ব্লকে)।
Question to think about?
একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে কোন দেশই নিজেকে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। এক্ষেত্রে অনেক দেশের যুদ্ধ করার মতো সামর্থ্যও থাকে না। ইথিওপিয়া-মিশর এর মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্ব একটি যুদ্ধের আভাস দিচ্ছে। এখন এই সংকটটি যুদ্ধ ব্যতীত কীভাবে সমাধান করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Tareke, Gebru (2013), The Ethiopian Revolution: War in the Horn of Africa, Yale University Press
2. Olopade, Dayo (2014), The Bright Continent: Breaking Rules and Making Change in Modern Africa, Houghton Mifflin Harcourt
3. Davis, Cornelia E. (2019), Three Years in Ethiopia: How a Civil War and Epidemics Led Me to My Daughter, Konjit Publications
4. Schmidt, Elizabeth (2013), Foreign intervention in Africa: From the Cold War to the War on Terror, Cambridge University Press
5. Stenner, David (2019), Globalizing Morocco: Transnational Activism and the Postcolonial State, Stanford University Press
6. Burgis, Tom (2016), The Looting Machine: Warlords, Oligarchs, Corporations, Smugglers, and the Theft of Africa's Wealth, Public Affairs
📄 জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
একবিংশ অধ্যায় Theme: Afghanistan: The Wrong Enemy
জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
"The civil war in Afghanistan began as a civil war between Afghans and it will end as an agreement between Afghans." - Fred Halliday
ভূমিকা: একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির বিশাল একটি অংশ দখল করে আছে দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধপীড়িত দেশ আফগানিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসেই আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেছেন। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানদের পুনরুত্থান এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক পটভূমি উন্মোচন করেছে। তালেবানদের সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-কায়দার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটা খুব অনুমেয় যে, আফগানিস্তানে আল-কায়দা এবং তার মতাদর্শী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হতে পারে। তালেবান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আল-কায়দার যদি পুনরুত্থান হয় তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব জানা সত্ত্বেও কেন জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সকল সেনা প্রত্যাহার করে নিলেন? আফগানিস্তান ঘিরে আমাদের এরকম অনেক কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে কতগুলো ফ্যাক্টর এনালাইসিস করতে হবে। আমাদেরকে জানতে হবে আফগানিস্তানের সরকারব্যবস্থা, জানতে হবে স্বাধীনতার পূর্বে শতকের পর শতক ধরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আফগানদের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস, জানতে হবে স্বাধীনতার পর কীভাবে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা, সেই গৃহযুদ্ধ থেকে কীভাবে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শুরু, জানতে হবে তালেবান আসলে কারা এবং কীভাবে উত্থান হলো আল-কায়দার এবং সর্বশেষ জানতে হবে কেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের হামলা হলো। আফগানিস্তানের স্বাধীনতা পূর্ব ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের একুশ সাল পর্যন্ত পুরো ইতিহাসটি কয়েকটি পর্বে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
স্বাধীনতা পূর্ব আফগানিস্তান
আফগানিস্তান। এই অঞ্চলটি নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দখল, বেদখল ও লড়াই যুগের পর যুগ ধরে চলছে। আফগানদের মননে মগজে বিদেশি আধিপত্যবাদ বিরোধী যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটা শুধু গত কয়েক দশকেই গড়ে ওঠেনি। এজন্য আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে আফগানদের সেই পুরোনো ইতিহাসে। আফগানদের সাথে লড়াইয়ে টিকতে পারেনি আলেকজান্ডার, মুঘলরা, ব্রিটিশরা, রুশরা এবং সর্বশেষ এখন মার্কিনীরাও।
০১. আফগানিস্তানে উত্থান পতন ঘটতে থাকে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের: আফগানিস্তান একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বহু পূর্বে অনেক সাম্রাজ্য ও রাজ্যের শাসকরা আফগানিস্তানকে দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই বেশিদিন আফগানিস্তানে স্থায়ী হতে পারেনি। এখানে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গ্রেকো-বারট্রিয়ান, কুশান, হেফথালিটিস, কাবুল শাহী, সাফারি, সামানি, গজনভী, ঘুরি, খিলজি, কারতি, মুঘল, ও সবশেষে হুতাক ও দুররানি সাম্রাজ্যের মতো বাঘা বাঘা সাম্রাজ্যের। স্থানীয় আফগানদের সাথে লড়াইয়ে কেউ টিকতে পারেনি। একেক করে বিদায় নিতে হয়েছে সবাইকে।
০২. আলেকজান্ডারের আগমন: বর্তমান আফগানিস্তান অঞ্চলটির পূর্ব নাম ছিল আরিয়ানা। অর্থাৎ তখন আফগানিস্তান বলতে 'আরিয়ানা' বোঝাতো। এই আরিয়ানা এলাকায় ২০০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের পর মধ্য এশিয়া থেকে আর্যরা আসে। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আর্যদের কাছ থেকে পারস্য সাম্রাজ্যের তৎকালীন সম্রাটরা আরিয়ানা দখল করে নেয়। পারস্যের সম্রাটকে আবার পরাজিত করে আলেকজান্ডার ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আরিয়ানা দখল করে নেয়। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার কুশান জাতি আরিয়ানা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ৪র্থ শতাব্দীতে এই কুশানদের আবার পরাজিত করে আরিয়ানা দখল করে নেয় হুন নামের মধ্য এশীয় এক তুর্কি জাতি। ৩য় থেকে ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত আরিয়ানার প্রধান ধর্ম ছিল বৌদ্ধধর্ম। ঐসময়কার অনেক বৌদ্ধমন্দিরের ধ্বংসস্তূপ এখনো আপনি আফগানিস্তানে দেখতে পাবেন।
০৩. আরবদের আগমন ও ইসলাম প্রচার: তারপর খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে আরব সৈন্যরা আরিয়ানায় আসে। এই অঞ্চলের উত্তর- পশ্চিমাংশ (বর্তমান হেরাত ও সিস্তান প্রদেশ) আরবরা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে এবং তারা এখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করে। আরবদের প্রভাবে অনেক স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু কিছুদিন পর আরবরা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে গেলে অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দারা ইসলাম ধর্ম ছেড়ে পুনরায় বৌদ্ধ ধর্মে ফিরে যায়।
০৪. গজনভী রাজবংশের পর ঘুরিদের উত্থান: আরবরা চলে যাওয়ার পর সামানিদ নামের আরেক মুসলিম শাসকবংশ আফগান এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে। পরবর্তীতে ১০ম শতাব্দীতে আফগানিস্তানের পূর্বাংশে (বর্তমান গজনীতে) গজনভী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। গজনীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা মাহমুদ গজনভী আশেপাশের হিন্দু রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র আফগানিস্তানে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করেন। মাহমুদের হাত ধরে গজনী সাহিত্য ও শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং মাহমুদ অনেক বুদ্ধিজীবীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তন্মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল বিরুনী ও কবি ফেরদৌসী। গজনীর রাজা মাহমুদের মৃত্যুর পর ১২শ শতাব্দীতে ঘুরিরা পশ্চিম-মধ্য আফগানিস্তানের ঘুর শহরে ঘুরি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে।
০৫. চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং এর আগমন: তারপর মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজমি শাহেরা এই ঘুরিদেরকে এখান থেকে পরাজিত করে ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম আফগানিস্তানে খোয়ারিজমি শাসন প্রতিষ্ঠা করে। খোয়ারিজমিরাও বেশিদিন টিকতে পারেনি। মোঙ্গল সেনাপতি চেঙ্গিস খান ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দে এই অঞ্চল থেকে খোয়ারিজমিদের উৎখাত করে। চেঙ্গিস খানের পর এখানে আসে তৈমুর লং। ১৪শ শতাব্দীর শেষে মধ্য এশীয় সেনাপতি তৈমুর লং আফগানিস্তান জয় করে নেন।
০৬. মুঘল সাম্রাজ্যের জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবরও কাবুল দখল করতে এখানে আসেন: মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লঙের বংশধর জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবর ১৬শ শতাব্দীর প্রারম্ভে এখানকার আরঘুন রাজবংশের কাছ থেকে বর্তমান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করেন। ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে ভারতে অবস্থিত মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাটরা এবং পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের রাজারা এই আফগানিস্তানের দখল নিয়ে দুই শতক যুদ্ধ করেন। তখন মুঘলদের দখলে চলে যায় কাবুল, আর পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের রাজাদের দখলে চলে যায় হেরাত অঞ্চল। কান্দাহার একেক সময় একেকজনের দখলে থাকত।
০৭. সবশেষে হুতাক ও দুররানি শাসন: তারপর ১৭শ সালের প্রারম্ভে স্থানীয় ঝিলজাই গোত্রের নেতা মিরওয়াইস হুতাক এখান থেকে পারস্যের সাফাভিদদের পরাজিত করে হুতাক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। হুতাক শাসনের তিন দশক পরেই ১৭৪৭ সালে আহমদ শাহ দুররানি কান্দাহার শহরকে রাজধানী করে এখানে দুররানি সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। দুররানির মৃত্যুর পর তার পুত্র তৈমুর শাহ দুররানি কান্দাহার থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে কাবুলে নিয়ে আসেন।
০৮. আবির্ভাব হলো স্বাধীন আফগানিস্তানের: দুররানি সাম্রাজ্যের পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফগানিস্তান সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। ব্রিটিশদের সাথে আফগানদের তিন তিনটি যুদ্ধ হয়। প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ; ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২। দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ; ১৮৭৮ থেকে ১৮৮০। অবশেষে ১৯১৯ সালের 'তৃতীয় ব্রিটিশ আফগান যুদ্ধ' শেষে আফগানিস্তান যুক্তরাজ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। রাওলাপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন আফগানিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাই বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম স্বাধীন দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান।
স্বাধীনতা উত্তর আফগানিস্তান
এই পর্বে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যেভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যে-কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করেছিল, যেভাবে হয়েছিল মুজাহিদদের (পরবর্তীতে তালেবান) উত্থান এবং সর্বশেষ আলোচনা করব আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে।
০১. স্বাধীনতার পর রাজা জহিরের শাসন: ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজা জহির শাহ আফগানিস্তান শাসন করেন। রাজা জহির শাহের শাসনামলে আফগানিস্তানের ব্যাপক উন্নতি না হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক বহুতল ভবনের, ছিল নারীদের অধিকার, অন্যান্য দেশের সাথে ছিল মজবুত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। জহির শাহের সাথে যুক্তরাষ্ট্রেরও ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ১৯৩৪ সালে জহির শাহের নেতৃত্বে আফগানিস্তান 'লিগ অব নেশনস'র সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৭৩ সালে জহির শাহ চোখের চিকিৎসা করাতে ইতালি যান। আর এ সুযোগে তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ দাউদ খান অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেন।
০২. রাজা জহিরের পতন ও গৃহযুদ্ধের সূচনা: ১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাজা জহিরের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসলেন দাউদ খান। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সাথে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিয়ে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যদিকে আমেরিকা আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করে।
০৩. যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করে: রাজা জহিরের পতন ও গৃহযুদ্ধ শুরুর এই সময়টি কিন্তু আশির দশক। সোভিয়েত বনাম আমেরিকার মধ্যকার চলা স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। পুঁজিবাদে বিশ্বাসী আমেরিকা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। সেই সময়টায় তথা ১৯৭৯ সালের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আফগানিস্তান রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে।
০৪. শুরু হলো সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত): এখন প্রশ্ন হচ্ছে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে হামলা করবে? উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কেমেনিস্তান ও কিরগিজিস্তান নামে মধ্য এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলো তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর মানচিত্রে তাকালে দেখবেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলোর সাথেই আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। তাই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তার মিলিটারি ঘাঁটি গেঁড়ে খুবই সহজে সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত এই রাষ্ট্রগুলোতে হামলা করবে বলে ধারণা করেছিল সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা 'কেজিবি'। পরবর্তীতে 'কেজিবি' সোভিয়েত সরকারকে জানায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত হবে না আফগানিস্তানকে হাত ছাড়া করা। আর এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানিস্তান অপারেশন শুরু করে।
০৫. সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানকে প্রায় দখল করে নেয়: প্রবল পরাক্রমশালী তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনীর কাছে পরমাণু বোমা থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সব রকম সমরাস্ত্র ছিল। তাই ধারণা করা হচ্ছিল খুব সহজেই সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে। এমনকি আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাও ধারণা করেছিল সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান দখল করে নেবে খুব সহজেই। কয়েক মাসের মধ্যে এটা সত্যও প্রমাণিত হচ্ছিল কারণ প্রায় পুরো আফগানিস্তানেই সোভিয়েত সেনাবাহিনী নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েতের পক্ষে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা আফগানিস্তানের একদম ভেতরে প্রবেশ করা কখনোই সহজ ছিল না এবং এর চাইতেও দুরূহ কাজ ছিল আফগানিস্তানের দখল করা জায়গাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
০৬. উত্থান হলো আফগান মুজাহিদিনদের: নিজ দেশে সোভিয়েত বাহিনীর হামলা মেনে নিতে পারেনি সাধারণ আফগানরা। সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে তখন গড়ে ওঠে ছোট ছোট কিছু আফগান গোষ্ঠী। শত বছরের আফগান ইতিহাস থেকেই আমরা দেখেছিলাম স্বাধীনতার পূর্বে কীভাবে আফগানরা ঔপনেবেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। গ্রিক আমি আলেকজেন্দার দ্যা গ্রেট থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে আফগানরা অনেক আগে থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অতএব আমরা বুঝতে পারি বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং নিজ ভূখণ্ডকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াস আফগানদের একটি ঐতিহ্যগত বিষয়। এর ফলে বিশাল শক্তিধর সোভিয়েত রেড আর্মি আফগান এই ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এই ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে বলা হতো আফগান মুজাহিদিন; যার একাংশ পরবর্তীতে তালেবান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
০৭. আমেরিকার অনুপ্রবেশ: যেহেতু তখন আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তখন এই অঞ্চলে সোভিয়েত আধিপত্যকে রুখে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আদর্শিক বিষয় ছিল। তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মুজাহিদিনদের সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছিল। সিআইএ তখন এটাও বিশ্বাস করেছিল যে, আমেরিকা যদি মুজাহিদিনদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে তাহলে এই আফগানরা রাশিয়ার সাথে হয়তো আজীবন যুদ্ধ করে যাবে। আফগানদের পুরোনো ইতিহাস ঘেঁটে আমেরিকা নিশ্চিত হলো যে, দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আফগানিস্তানকে মুক্ত করতে মুজাহিদিনরা অবশ্যই যুদ্ধ করবে। তাই সিআইএ মুজাহিদিনদের সোভিয়েত বিরোধী লড়াই ত্বরান্বিত করার জন্য ধর্মের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। আমেরিকা এই মুজাহিদিনদেরকে মুক্তিযোদ্ধা (Freedom Fighters) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
০৮. যেভাবে ধর্মকেও পুঁজি করেছিল আমেরিকা: আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা CIA বুঝতে পারে, আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ অনেক ধর্মভীরু। এমনকি আফগানরাও মনে করত সমাজতন্ত্রের অনুসারী সোভিয়েত ইউনিয়ন ধর্মে বিশ্বাসী নয়। সোভিয়েতরা নাস্তিক। তাই সাধারণ আফগানরাও ভয়ে ছিল সোভিয়েত যদি আফগানিস্তান সম্পূর্ণভাবে দখল করে নেয় তাহলে আফগানিস্তানের মানুষরা আর ধর্ম পালন করতে পারবে না। ধর্মের প্রতি সাধারণ আফগানদের এই সংবেদনশীলতা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা ধর্মের এই বিষয়টিকে পুঁজি করে মুজাহিদিনদের আরও প্ররোচিত করছে, যাতে আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে থাকে।
০৯. আমেরিকার আরেকটি লক্ষ্য ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া: এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র এই আফগান মুজাহিদিনদের ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সেই পুরোনো প্রতিশোধটাও মিটিয়ে নিতে চেয়েছিল। আপনারা জানেন যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামিজদের সাহায্য করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এতে আমেরিকার অনেক সৈন্য মারা যায়, অনেক সামরিক ক্ষতিও হয়েছিল আমেরিকার। তাই আমেরিকা চাচ্ছিল আফগান মুজাহিদদের মাধ্যমে এর একটি প্রতিশোধ নিতে।
১০. পাকিস্তান ও সৌদিও এগিয়ে আসে মুজাহিদিনদের সহায়তা করতে: আমেরিকা গণমাধ্যম ব্যবহার করে সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধের একটি মোড়ক দিতে সক্ষম হয়েছিল। তাই মধ্যপ্রাচ্যের যেই দেশগুলো ধর্মীয় কারণে আফগানিস্তানের প্রতি পূর্ব থেকেই সহানুভূতিশীল ছিল তারাও এগিয়ে আসে অর্থ নিয়ে। তাদের পাশাপাশি পাকিস্তানও এগিয়ে আসে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অর্থ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র আফগান মুজাহিদিনদের কাছে পৌঁছে দেয় খাইবার পাস হয়ে যে সীমান্ত আছে সেখান দিয়ে। আফগান মুজাহিদিনদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পর যোগ হয় সৌদি আরবের নাম। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের অংশগ্রহণ শুধু ধর্মীয় কারণেই ছিল বিষয়টি এরকম নয়। এখানে আরও অনেক ভূরাজনৈতিক কারণও ছিল।
১১. পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আফগান যুদ্ধকে "জিহাদ বা ধর্ম যুদ্ধ” হিসেবে প্রচার করে: আফগান মুজাহিদিনরা আমেরিকার সাহায্যে সেখানে সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে প্রাণপণে লড়তে শুরু করে। এতে সোভিয়েত আর্মি বাধ্য হয় বিমান হামলা চালাতে। অন্যদিকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আরব-অনারব মিলিয়ে প্রায় ৪৩টি দেশ থেকে আগত সৈন্যরা মুজাহিদিনদের পক্ষে আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেয়। এই বিশাল সংখ্যক সৈন্যের সমন্বয়ের কাজ করেছিলেন সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন। আফগান যুদ্ধে ওসামার সংযোজন এই মুজাহিদিনদের লড়াইকে নতুন মাত্রা প্রদান করে। উসামা বিন লাদেন উদ্ভাবন করেন পাহাড়ে সুরঙ্গ তৈরি করার যন্ত্র, দ্রুত দেয়াল তৈরি করার পদ্ধতি এবং আরও যুদ্ধ কৌশল। এসব কারণে আফগান মুজাহিদিনদের কাছে ওই সময়ে ওসামা খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১২. তখন আমেরিকাও স্বাগত জানিয়েছিল ওসামা বিন লাদেনকে: আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে সব তথ্যই জানত। যেহেতু ওসামা তখন আফগান মুজাহিদিনদের সাহায্য করছিল, সোভিয়েত সেনাদের হত্যা করছিল; তাই ওসামাকে নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা ছিল না। বরং তাকে নানা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণও দিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। ওই সময় যুদ্ধের কারণে তিন ভাগের এক ভাগ আফগান মানুষকে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
১৩. আবির্ভাব হলো তালেবানদের: পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে পৃথক করেছে ডুরাল্ড লাইন নামক সীমান্ত রেখা। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের সময় এই সীমান্ত এলাকায় অনেক আফগান নাগরিক অবস্থান নেয়। এই ভারতবর্ষে বি-ঔপনিবেশিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছে দারুলউলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। তাদের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এরই ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতাব্দী থেকে আফগানিস্তানের সীমান্ত এবং পাকিস্তানের উত্তর প্রদেশ এলাকায় দেওবন্দী ভাবধারার অনেক মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। যেখানে মূলত বেশির ভাগ জনসংখ্যাই পশতুন জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই সব মাদ্রাসায় যারা পড়ত তাদের বলা হতো “তালেব” অথবা “তালেবান”। তালেব অর্থ ছাত্র। তাদের শিক্ষক ছিল মোল্লা ওমরের মতো স্থানীয় কিছু আলমেরা। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় এখানকার ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানিস্তানে পাঠানো হতো সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।
১৪. আমেরিকা মুজাহিদিনদের হাতে তুলে দিল অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল: ১৯৮৬ সালে মুজাহিদিনদের যুদ্ধ কৌশলে স্টিংগার নামক অ্যান্টি এয়ারক্রাফট এর সংযোজন ছিল এই যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। মূলত অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইলের আঘাতেই ধসে পড়ত সোভিয়েত যুদ্ধ বিমানগুলো। আর এই মিসাইল মুজাহিদিনদের হাতে তুলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা ছিল ঐ সময়কার সবচেয়ে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি।
১৫. আফগানদের জয় ও সোভিয়েতের পতন: সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী মিখায়েল গর্বাচেভ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান ছেড়ে দিতে। কারণ তাদের অনেক রক্ত ঝরেছে। ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হওয়া আফগান মুজাহিদিনরা আমেরিকা থেকে পাওয়া মিসাইল দিয়ে এক কথায় দিশেহারা করে তুলেছিল সোভিয়েত বাহিনীকে। অবশেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে আসে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা এই ১০ বছরের যুদ্ধে আমেরিকা, সৌদি ও পাকিস্তানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত আফগান মুজাহিদিনদের জয় হয়। দ্বিতীয় বারের মতো মাতৃভূমিকে স্বাধীন করায় আফগান নাগরিকরা আনন্দিত হয়েছিল।
১৬. পতন হলো সমাজতন্ত্রের: এই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা আর কোনো দিন কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর পরেই মাত্র দেড় বছরের মাথায় ১৯৯০ সালে সমাজতন্ত্রের পতন হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও স্বাধীন হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে আফগান যুদ্ধের সুফল পেয়েছিল পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলো। ফলস্বরূপ তারা সোভিয়েত থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল।
১৭. তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েও সুফল পেল না আফগানিস্তান: দেখা গেল আফগান যুদ্ধ অন্যদের সুফল বয়ে আনলেও আফগানদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন হলো না। অনেকেই বাড়ি-ঘরহীন হয়ে গেল। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানদের মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করার মতো সক্ষমতা ছিল না। সোভিয়েত যুদ্ধে আফগানদের জয় ছিল মূলত আফগানিস্তানে আরেকটি যুদ্ধের শুরু। সোভিয়েত যুদ্ধের ফলস্বরূপ আফগানিস্তান পেয়েছিল নতুন আরেকটি গৃহযুদ্ধ। ১৯৯২-২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ (Civil War) চলছিল।
১৮. মুজাহিদিনদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল: সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে স্বাধীন হলো আফগানিস্তান। এখন প্রয়োজন নতুন সরকার গঠনের। কিন্তু কাকে বানানো হবে সরকার, কে হবেন রাষ্ট্রপ্রধান এ নিয়ে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েত যুদ্ধের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকলেও সোভিয়েত সেনারা চলে যাওয়ার পর দেখা গেল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এরা প্রতিটা প্রদেশে বিভক্ত হয়ে পড়ল এবং একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করল। তারপর মুজাহিদ নেতারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে প্রদেশ শাসন করা শুরু করল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে। আর এই সময়ে মোল্লা ওমরের উত্থান ঘটে সাথে তালেবানের উত্থানও শুরু। কান্দাহার প্রদেশের মোল্লা উমর ঘোষণা করল, সে এখন একটি খাঁটি 'ইসলামিক স্টেট' প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
১৯. আফগানিস্তানের রাজনীতিতে তালেবানের প্রবেশ: যেহেতু তখন আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলছিল, এই সুযোগে মোল্লা ওমর ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বিপুল সংখ্যক অনুসারী তৈরি করেন। এতদিন যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল তারা সবাই মুজাহিদিন হিসেবেই পরিচিত ছিল। মোল্লা ওমরের গ্রুপে যোগ দেওয়া সেই মুজাহিদিনরাই 'তালেবান' হিসেবে পরিচিতি পেল। মুজাহিদিন থেকে তালেবান। ১৯৯৪ সালের মাঝেই মোল্লা ওমর ও তার অনুসারীরা আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সেখানে তার ভাষায় ইসলামি শরিয়া আইন চালু করে। আর সাধারণ মানুষও চেয়েছিল গৃহযুদ্ধের অবসান হোক। দেখা গেল সাধারণ মানুষের সহায়তায় তালেবানরা একের পর এক প্রদেশ দখল করতে থাকে।
২০. ওসামা বিন লাদেন পুনরায় আফগানিস্তানে ফিরে আসে: ১৯৯৫ সালে তালেবানরা ঘোষণা করল তারা আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়। তখন ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে আবার ফিরে আসে। ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমর নিজেদের মাঝে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। এক সময় তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে নেয়।
২১. আল-কায়দার উত্থান: একের পর এক প্রদেশ যখন তালেবানদের দখলে চলে আসতে থাকে ওসামা বিন লাদেন তখন তালেবান সরকারকে সাহায্য করতে থাকে কীভাবে প্রদেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়, কীভাবে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা যায়, নানান কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করেন তিনি। এই সুযোগে ১৯৯৬ সালে ওসামা বিন লাদেন তার পূর্ব গঠিত সশস্ত্র আর্মি নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে তোলেন। ফলশ্রুতিতে ওসামা নিজের একটি সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয় আফগানিস্তানে যার নাম হয় 'আল কায়েদা'।
২২. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বের সূচনা: তালেবানরা যখন কাবুলে ক্ষমতা দখল করল, তখন তারা ভেবেছিল আমেরিকা থেকে তারা সাহায্য পেতেই থাকবে। সাহায্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছিলও বটে। তারপর তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের একটি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় তালেবানদের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন। দ্বন্দ্বের জেরে ওসামা বিন লাদেন তখন ঘোষণা করে আমেরিকানরা মুসলমানদের শত্রু। এভাবে আমেরিকার সাথে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। এরপর ধারণা করা হয় কেনিয়া-সহ বেশ কয়েকটি দেশে আমেরিকান দূতাবাসে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়দা হামলা চালায়। আমেরিকা তখন তালেবান নেতা মোল্লা ওমরকে এই বিষয়ে চাপ দিতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ওসামা বিন লাদেন তালেবানদের সহায়তায় সন্ত্রাসী হামলা করছে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মোল্লা ওমর সেটা অস্বীকার করে এবং আমেরিকাকে ইসলামের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে।
২৩. যেখান থেকে পশ্চিমা বিশ্বে তালেবান বিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়: এই সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের দুটো বিশাল মূর্তি, যা আগফানিস্তানে শত শত বছর ধরে ছিল, সেগুলো তালেবানরা ভেঙে ফেলে। এই ঘটনার পর আমেরিকা ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও তালেবান বিরোধী একটি মনোভাব গড়ে ওঠে। তখন নানা কারণে সৌদি আরবও তালেবনাদের আর্থিক সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়।
২৪. টুইন টাওয়ারের ঘটনা: পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র-সহ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর তালেবান পুনরায় বিশ্ববাসীর নজরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের এই হামলা আল-কায়েদাই চালিয়েছিল বলে অভিযোগ তোলে যুক্তরাষ্ট্রর। আর তাতে তালেবানদের উপরেও দোষারোপ ওঠে। কারণ, তালেবানরাই তাদের দেশে আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। আল-কায়েদার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল আফগানিস্তান। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তালেবানদের আলটিমেটাম দেয়, ওসামা বিন লাদেন এবং আল কায়েদার সদস্যদের আমেরিকার হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু তালেবান নেতা মোল্লা ওমর তাতে অস্বীকার করেন।
২৫. ন্যাটো জোটের আফগানিস্তান আক্রমণ ও তালেবান সরকারের পতন: মোল্লা ওমর আমেরিকার টুইনটাওয়ার হামলা প্রসঙ্গে জর্জ বুশকে বলেন এখানে আল-কায়দার বা তালেবানদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর জেরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন তালেবান বিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সিদ্ধান্ত নেন আফগানিস্তানে হামলা চালাবেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হলো হামলা। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ন্যাটো জোট তালেবানদের পতন ঘটায়। এভাবেই এক সময় যেই আমেরিকা নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ধর্মকে পুঁজি করে, অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তালেবানদের সাহায্য করেছিল; সেই আমেরিকাই আবার এই তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। শক্তিশালী ন্যাটো বাহিনীর কাছে পতন হয় তালেবানদের। এভাবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলা তালেবান শাসনের অবসান ঘটে।
২৬. তারপর আফগানিস্তান পেল নতুন একটি সংবিধান ও নির্বাচন: তালেবানদের পতনের পর জাতিসংঘ দেশটিতে বহুজাতিগোষ্ঠীয় সরকার স্থাপনে উৎসাহ দেয়। জার্মানির বন শহরে এ নিয়ে সম্মেলনের পর ২০০১-এর ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তার ৬ মাস পরে একটি মধ্যবর্তী সরকার গঠিত হয় যা ২০০৪ সালে একটি নতুন সংবিধান পাশ করে। নতুন সংবিধান অনুযায়ী আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট-ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৪ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রথম জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচনে জয়ী হয়ে হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। আফগানিস্তানের তথাকথিত নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং এখানকার গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানে থেকে যায়।
২৭. তালেবানদের সাথে হামিদ কারজাই এর দ্বন্দ্ব: নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মার্কিন মদদপুষ্ট হামিদ কারজাই আফগানিস্তানে সরকার গঠন করল। কিন্তু দেখা গেল এতেও আফগান সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। নতুন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সরকার কাবুলেই কেবল নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ভালো ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বাকি প্রদেশগুলোতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ তারা নিতে পারনি। ২০০৬ সাল থেকে দেখা গেল তালেবানরা আবার বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত থেকে একত্রিত হয়ে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে শুরু করল আমেরিকান সেনাবাহিনীর উপর।
২৮. বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের ব্যর্থ পরিকল্পনা: নাইন-ইলেভেনের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট জঙ্গিবাদের দমন, আফগানিস্তানের জনগণের কথিত মানবাধিকার রক্ষা, এখানে গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করতে থাকে। তালেবানরা যেন পুনরায় সংগঠিত হয়ে আমেরিকাতে জঙ্গি হামলা চালাতে না পারে সেজন্য বছরের পর বছর মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে অবস্থান নেয়। ২০০৯ সালে বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পূর্বে বুশের সমালোচনা করে বলেছিলেন তিনি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন কিন্তু সেনা প্রত্যাহার দূরের কথা যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটির কথা বিবেচনা করে তিনি আরও সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছিলেন। তারপর ২০১৬ সালে ট্রাম্পও তার রাজনৈতিক প্রচারণায় বলেছিলেন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের দোহায় ট্রাম্পের নেতৃত্বে তালেবানের সাথে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল ১ মে ২০২১ এর মধ্যে ন্যাটোর সৈন্য আফগানিস্তানের মাটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার হবে। কিন্তু ন্যাটোর মিলিটারি অ্যালায়েন্সের সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টোলটেনবার্গ এর সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্পের সাথে তালেবানদের যে চুক্তি হয়েছে সেখানে তালেবানরা আমাদের সকল দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তাই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় এখনো হয়নি।
২৯. অবশেষে বাইডেন সকল সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন: ট্রাম্পকে পরাজিত করে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসলেন জো বাইডেন। সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা দিয়েছেন আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। বাইডেন তাঁর ঘোষণায় বলেন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্পের পর তিনি চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যাঁকে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। সেনা প্রত্যাহারের এই দায়িত্বটি জো বাইডেন তার পরবর্তী কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য রেখে যেতে চান না। তাই বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আর সময় বৃদ্ধি করতে চাচ্ছিলেন না। অবশেষে বাইডেনের সিদ্ধান্তে ২০২১ সালের ২ জুলাই মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় বাগরাম বিমান ঘাঁটি ত্যাগ করে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে তালেবান আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেছেন। তাঁরা বলছেন, তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আল-কায়েদা আবার আফগানিস্তানকে তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে পারে। তালেবানরা যে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এটা আমেরিকাও জানে। এটা জানা সত্ত্বেও বাইডেনের সকল সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক শিবিরে জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্ক।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কারণ
যে যে কারণে বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন :
০১. সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। "প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মতে ২০০১ ও ২০২১ সাল এক নয়। কারণ ২০০১ সালে আমরা আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন করেছি তার মানে এটা নয় যে আমাদেরকে ২০২১ সালে এসেও এখানে সেনা মোতায়েন রাখতে হবে।" এখন কথা হচ্ছে ২০০১ ও ২০২১ সাল কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন? ২০০১ সালে তালেবানরা এখনকার চেয়ে অনেক সংগঠিত ছিল এবং তখন আল-কায়দা যে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করে বসবে এটা যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার বাহিরে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি বর্তমানে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিত তালেবানদেরকে চোখে চোখে রাখছে, তারা তালেবানদের গতিবেগ সর্বদা পর্যবেক্ষণ করছে। তাই এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও এলছেন, "২০০১ ও ২০২১ সাল এক নয়।" একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে পরাশক্তি এমেরিকার উপর হামলা চালানোর মতো সাহস কারো নেই।
০২. আফগানিস্তান এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিঙ্কেনের ভাষ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন আফগানিস্তানের থেকেও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে আছে। তার মধ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, জলবায়ু সংকট, করোনা সংকটসহ দেশের জ্বালানি সম্পদের দেখভালের বিষয়গুলো রয়েছে। এখন এই বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে অধিকতর মনোযোগ দিতে হচ্ছে। করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতি সামাল দিতেই বাইডেন প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর পেছনে আমেরিকার গত বিশ বছরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে এবং দুই হাজার তিনশো আমেরিকান সেনা নিহত হয়েছে। বাইডেন চাচ্ছে না এখন আর নতুন করে কোনো মার্কিন সেনা মারা যাক এবং বিদেশের মাটিতে অর্থ খরচের চেয়ে নিজ দেশই এখন বাইডেন প্রশাসনের অগ্রাধিকার।
০৩. যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ফক্স নিউজে তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরাক থেকে আমরা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের বিভিন্ন এলাকা জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের দখলে চলে গিয়েছিল। ফলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ফের ইরাকে পাঠাতে হয়েছিল। এখন কথা হচ্ছে আফগানিস্তানেও যদি এরকম কিছু ঘটে তাহলে বাইডেন কী করবেন? এই প্রশ্নোত্তরে বাইডেন বলেছেন, আফগানিস্তানে এরকম কিছু ঘটলে এটিকে মোকাবিলা করতে তিনি ড্রোন ব্যবহার করবেন। আমেরিকা থেকে ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন আফগানিস্তান থেকে একেবারে চোখ সরিয়ে নেবেন, বিষয়টি এমন নয়। আমেরিকা যে-কোনো সময় যে-কোনো স্থানে নিজের নিরাপত্তার জন্য অবস্থান গ্রহণে সক্ষম বলে দাবি করেছেন বাইডেন।
০৪. যুক্তরাষ্ট্র এখন জাতিসংঘকে বিকল্প হিসেবে ভাবছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের উপর দায়িত্ব অর্পণ। বাইডেন চাচ্ছে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর জাতিসংঘ আফগান পরিস্থিতির উপর নজর রাখবে। সেখানে নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা জাতিসংঘের রয়েছে। বাইডেন মূলত চাচ্ছে নিজ দেশের টাকা আফগানিস্তানে আর খরচ না করে বরং জাতিসংঘের অর্থায়নে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী জাতিসংঘের পিস কিপিং মিশনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।
০৫. আফগানিস্তানের দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতে দায়ভারটি আফগান সরকারের। ২০২০ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিস তার নির্বাচনি প্রচারণায় বলেছিলেন, তিনি যে করেই হোক আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। তাই সেই নির্বাচনি মেনিফেস্টো বাস্তবায়নে সেনা প্রত্যাহার একটি পরোক্ষ কারণও বটে। যেহেতু আমেরিকা ২০ বছর পূর্বে সেনা মোতায়েন করেছিল আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আফগানদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে এবং যেহেতু এখন বাইডেন সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তাই এখন থেকে আফগান জনগণকে রক্ষা করবে কে? এমন প্রশ্নোত্তরে হোয়াইট হাউসের জবাব হলো আফগানিস্তানে যা হবার হোক এতে আমাদের দায়ভার নেই। সেখানে যদি এখন তালেবানদের সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় অথবা গৃহযুদ্ধে যদি সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয় সেটার দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র এখন কেন নেবে? যুক্তরাষ্ট্রের মতে সেটার দায়ভার আফগান সরকারের।
০৬. আরেকটি কারণ হলো তালেবানদের অবস্থা বিবেচনায়। গত বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতিতে তালেবানদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক তালেবান সেনা নিহত হয়েছে। সাথে হাজার হাজার আফগান জনগণও মারা গিয়েছে। তাই বাইডেনের সকল সেনা প্রত্যাহারে তালেবানদেরও লাভ হয়েছে। নিজ দেশে তালেবানরা এখন সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। তালেবানরাও জানে নতুন করে যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে অথবা অন্য কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় তাহলে আমেরিকাও তাদেরকে ছেড়ে দেবে না. পাল্টা প্রতিশোধ নেবেই। এসব বিবেচনা করেই তালেবানরাও এখন আমেরিকার উপর হামলা, পাল্টা হামলার দিকে না গিয়ে নিজ দেশের দিকেই বেশি নজর দেবে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে। বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন সমীকরণ।
আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জয়-পরাজয়
হর্স রেইসের মতো আফগানিস্তান নিয়ে মিডিয়াগুলোর এত বেশি তৎপরতা এবং তাদের ক্লিক বেইটিং হেড লাইন দেখে কিছু স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে। কিছু হেডিং এরকম; আফগানিস্তান থেকে শূন্য হাতে ফিরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শান্তি না ফিরিয়ে আফগান ছাড়ছে ন্যাটো সৈন্যরা, তালেবানদের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে মার্কিন সেনারা, সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল করলেন জো বাইডেন ইত্যাদি। উপরিউক্ত মুখরোচক এসব হেডলাইন দেখে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন জাগে। এক. আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন আর কী কাজ করা বাকি আছে যেগুলো করতে পারলে আমরা বলতে পারতাম যুক্তরাষ্ট্র খালি হাতে ফেরেনি? দুই. আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এসেছিল? তিন. যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই আফগানিস্তান ইস্যুতে সফল হয় নি? চার, ভেটেরান ও চতুর জো বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি কি তাহলে ভুল ছিল? পাঁচ. আফগানিস্তানকে ধ্বংস করার মতো আর কি কিছু বাকি ছিলো
আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে ২০০১ সালে যখন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানের মাটিতে পা রাখে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ বলেছিল তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মোটাদাগে তিনটি। প্রথমত, আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয়ত, জঙ্গিবাদ দমন করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসেও আফগানিস্তানে শান্তিও নেই, গণতন্ত্রও নেই। এখন এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি আপনি বলতেই পারি যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ বা খালি হাতে ফিরে গিয়েছে। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্যই ছিল শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কিন্তু কোনোটাই তারা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর শাসনামল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত যারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাদের সকলের পররাষ্ট্রনীতিগুলো একটু বিশ্লেষণ করলে আপনি দুটো বিষয় বা ধারা খুঁজে পাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সেই দুইটি উদ্দেশ্য হলো:
এক. Normative Goal: নরমেটিভ এর মানে হলো আদর্শগত। এমন কিছু করা যেটা আসলেই করা উচিত বা নীতিগত ভাবে সঠিক। ধরুন একটি দেশ খুবই সংকটে আছে, সেদেশের জনগণ খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছে, রাজনৈতিক সহিংসতা রয়েছে, মানবাধিকার অনুপস্থিত এবং সেখানে গৃহযুদ্ধে মানুষ মারা যাচ্ছে। তাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সংকটে পড়া সে দেশটির পাশে দাঁড়িয়ে সংকটের সমাধান করা, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা, শান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা এবং যুক্তরাষ্ট্রও এটা বিশ্বাস করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব আবশ্যক।
দুই. Realistic Goal: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো যে করেই হোক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মেটেরিয়ালিস্টিক লাভ। যে কাজটি করলে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেই কাজটিই করবে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব যুক্তরাষ্ট্র দেখে না। ধরুন একটি পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লাভ কিন্তু সেই নীতিটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল ক্ষতি বয়ে আনবে তখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে না। অর্থাৎ নিজের লাভ হলেই হলো। সহজ কথায় যুক্তরাষ্ট্র Zero-Sum Game এ বিশ্বাস করে। এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র জানত ইরাক বা লিবিয়ায় যুদ্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হবে কিন্তু ইরাক ও লিবিয়া দুটি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজের লাভের কথা বিবেচনা করে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এই দুইটি ধারার প্রথমটি (Normative Goal) হলো এক কথায় আই ওয়াশ। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই বলে আমরা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, বিশ্বে শান্তি আনতে চাই। এটা স্রেফ একটি আই ওয়াশ। আর দ্বিতীয় যে ধারাটি (Realistic Goal) এটাই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নীতি। আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এটাও ছিল একটি আই ওয়াশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এখন ভাষ্য হলো আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এটা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। জো বাইডেন বলছেন আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব আফগান সরকার ও আফগান জনগণের।
আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দ্বিতীয় যে রিয়ালিস্টিক উদ্দেশ্য সেটি ঠিকই আদায় করে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হলো?
এক. আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো উদ্দেশ্যের একটি ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ এই দীর্ঘ বিশ বছর যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে যুদ্ধ করে জয়ী হতে পারেনি। দক্ষিণ ভিয়েতনামিজদের তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্যাধুনিক মিসাইল ও রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে। ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার সেনা নিহত হয় এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়ি ফিরতে হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক একই কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তালেবানরা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তালেবানদের হাতে হাজার হাজার সোভিয়েত সেনা নিহত হয়। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজয় বরণ করে আফগানিস্তান ত্যাগ করে। সময়টি যেহেতু কোল্ড ওয়ার পিরিয়ড: তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তালেবানদের জয়কে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জয় হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এই দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফল।
দুই, আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তালেবান ও আল-কায়দা মিলে খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি হুমকি ছিল। আফগানিস্তানে গত বিশ বছরের ন্যাটো বাহিনীর অবস্থান তালেবানদের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তালেবানদের সাথে আফগান জনগণের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাধাতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানদের পুনরুত্থানের পর আফগানিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য তালেবানরা আর হুমকি না। যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তার জন্য এখন তিনটি রাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে- রাশিয়া, ইরান, চীন। তাই আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন বজায় রেখে বিলিয়ন ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রের আসলে কোনো লাভ ছিল না। আফগানিস্তানে যে পরিমাণ টাকা খরচ হতো সেসব টাকা এখন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে পারবে। আফগানিস্তানে শুধু শুধু খরচ না করে মহামারির ফলে ভেঙে যাওয়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করাই জো বাইডেনের প্রাধান্য ছিল। অর্থাৎ Cost Benefit Analyses এর দিক থেকে জো বাইডেন যা করেছেন তাই ঠিকই আছে।
তিন. যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে গিয়েছে কিন্তু এখানে একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিয়ে যাচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো তালেবান শাসনকে কেন্দ্র করে নতুন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারে।
কী ক্ষতি হলো যুক্তরাষ্ট্রের
তবে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন একেবারেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে না, অন্যদিকে আশানুরূপ সাফল্যও পায়নি। আফগানিস্তান ইস্যুতে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র যে ইমেজ সংকটে পড়েছে সেটা কাটিয়ে উঠতে মার্কিনীদের আরও অনেক সময় লাগবে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার তালিকাটি অনেকটা 'স্নো-বল ইফেক্ট' এর মতো।
Snowball Effect
এই টার্মটি মাইক্রো ইকোনমিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ‘Snowball' এর সরল বাংলা হচ্ছে তুষারগোলক। একটি ছোট বরফের টুকরা যখন পাহারের চূড়া থেকে গড়াতে গড়াতে নিচে পড়তে থাকে তখন সেই ছোট বরফের টুকরাটি বিশাল আকার ধারণ করে। অর্থাৎ এমন কিছু যেটার প্রভাব প্রথমে ছোট থাকে কিন্তু পরবর্তীতে বিশাল আকার ধারণ করে। আফগানিস্তান ইস্যুতে Snowball effect টা হচ্ছে এরকম যে, মার্কিনীরা এই শতকের শুরুর দিকে আফগানিস্তানে এসেছিল নিজেদের তথাকথিত সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় মার্কিনীদের লাভের পরিবর্তে বিশাল ক্ষতি হয়েছে এবং সেই ক্ষয়ক্ষতির তালিকাটি দিনদিন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ;
এক. একটানা বিশ বছর এখানে ন্যাটো বাহিনী অবস্থান করেও রেজিম পরিবর্তন করতে পারেনি, ন্যাটো বাহিনী বিশ বছর আগে যাদেরকে সরাতে এখানে এসেছিল তারাই এখন সরকার গঠন করেছে। দুই, আফগানিস্তানে তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তিন, গত বিশ বছরে অনেক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। চার, কূটনৈতিক অঙ্গনে এটিকে মার্কিনীদের বড় পরাজয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পাঁচ, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ নষ্ট হয়েছে (যেটাকে "Scars on the face" বা "চেহারায় ক্ষতের দাগ” বলা হচ্ছে)। তথা আফগান ইস্যুতে Snowball Effectটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির তালিকাটি পাহাড়ের চূড়া থেকে পতিত হওয়া তুষারগোলকের মতো দীর্ঘস্থায়ী হওয়া।
জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
আফগানিস্তান কী শুধুই বিদেশি রাষ্ট্র কর্তৃক আক্রমণের স্বীকার একটি দেশ? নাকি এই দেশটিতেও জাতিগত সংঘাত, গৃহযুদ্ধ ছিল ইতিহাসের বড় একটি অংশ? ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে যে-সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে সেইসব ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে মুজাহিদিনদের সশস্ত্র প্রতিরোধ, তালেবানদের উত্থান, এবং টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনার পর ন্যাটো জোটের আফগানিস্তান আক্রমণ ইত্যাদি সবগুলো ঘটনারই কেন্দ্রবিন্দুতেই এই আমেরিকা। ২০০১ সালে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আক্রমণ ২০২১ সালের ৩০ই আগস্ট সমাপ্ত হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল ক্রিস ডনাহিউ যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সৈন্য হিসেবে সেদিন আফগানিস্তানের মাটি ত্যাগ করেন।
সেই ১৯৮০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে আমেরিকানরা আসলে কীভাবে দেখে? আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্র আসলে কীভাবে মূল্যায়ন করে? জেরিমি সুরি হচ্ছেন একজন আমেরিকান ইতিহাসবিদ (ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ)। তার লিখিত বই, American Narratives: An Introductory Historiographical Reader। এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তান ইস্যুতে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আসলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে থেকেই যুগ যুগ ধরে সেখানে নিয়মিত বিরতিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এটা আমাদের ব্যর্থতা যে, এই যুদ্ধাবস্থার বিপরীতে আমরা আফগানিস্তানে তেমন কিছু প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি যা আমাদের মহত্ত্বকে মহিমান্বিত করে। আফগানিস্তানে মানুষজন ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত এবং তাদের জাতিগত সহিংসতা এতই বেশি যে সেখানে কখনোই সর্বজনীন আফগান জাতীয়তাবাদী পরিচয় বিরাজ করেনি। এই জাতিগত দ্বন্দ্ব এখন আরও বৃদ্ধি পাবে কারণ বিগত কয়েক দশকের যুদ্ধ তাদের কাছে খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী যেটা আগামী ৩০-৪০ বছরে তাদের মধ্যে জাতিগত সহিংসতাকে একটি ভয়ানক রূপ দিতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, আফগানিস্তান সংকট এবং গৃহযুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে একপাক্ষিক ভাবে দোষ দেয়া একটু একপেশে আলাপ। তিনি বলেন ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট রেজিম বিস্তারের ক্রমবর্ধমান প্রয়াস ১৯৭৯ সালে তাদের আফগানিস্তান আক্রমণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আফগানিস্তান জাতিগুলো যেহেতু সবসময় একটি যুদ্ধরত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে; সোভিয়েত আক্রমণ তাদের বিদ্রোহী সত্তাকে আরও চরমপন্থি করে তুলেছে। অর্থাৎ সে সময় সোভিয়েত সেখানে কমিউনিস্ট রেজিম স্থাপন সেখানকার মানুষের সামরিক প্রতিউত্তরকে ত্বরান্বিত করেছিল। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে না গেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের আক্রমণ বন্ধ করত না এবং মুজাহিদিনদের সাথে যুদ্ধ চালাত। আর যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া মুজাহিদিনরা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে এত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত না। সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল জোরপূর্বকভাবে একটি সিস্টেমকে আফগানিস্তানের উপর চাপিয়ে দিতে। তাই সেই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের না আসার মধ্যে কোনো এক্সক্লুসিভিটি নেই।"
১৯১৯ সালে আফগানিস্তান 'তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান' যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। আফগানিস্তানে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ৪টি অঞ্চলে বিভক্ত। অঞ্চলগুলো হলো হেরাত, কাবুল, মাজার ই শরীফ এবং কান্দাহার। এই অঞ্চলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন গোত্র ও জাতির বসবাস। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, তার্কমেন, বেলুচ, নুরিস্তানি, পামারি, আরব, গোজার, আইমাক, কুইজিলবাশ, পাশাই, কির্গি ইত্যাদি। স্বাধীনতার আগ থেকেই তাদের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব বিরাজমান। যেমন- ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এর মধ্যে আমির আব্দুল রহমান খান হাজারাদের আফগানিস্তান থেকে বিতারিত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ করেন। কারণ হাজারারা ছিল শিয়া মুসলিম। তাদের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শুধু মাত্র শিয়া হওয়ার কারণে মারাত্মক হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়। তাদের উপর নির্যাতন করা অধিকাংশ মানুষই ছিল সুন্নি মতাদর্শী সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতুন। তখন পশতুন গোত্রের ধর্মীয় নেতারা এমনও বলেছিলেন যে যদি কেউ হাজারাদের উপর ধংসযজ্ঞ চালায় তাহলে সে খোদা কর্তৃক পুরস্কৃত হবে। এই সময়ে ৬০% হাজারা নিহত হয় এবং আশেপাশের দেশে পালিয়ে চলে যায়। আর বাকিরা পশতুনদের দাসে পরিণত হয়। ১৯০১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পশতুনরা আফগানিস্তান থেকে পৃথক হওয়ার মাধ্যমে একটি "স্বাধীন পাসতুনিয়ান রাষ্ট্র” গঠনের দাবি তুলে। এই কাল্পনিক রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে নিয়ে গঠিত। তারা এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে সামরিক অভিযানও চালায়। যেগুলো অন্য সব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনে রসদ যোগায় যা আফগানিস্তানের জাতিগত সহিংসতাকে ত্বরান্বিত করে। আফগানিস্তানে জাতিগত দ্বন্দ্ব কতটা প্রকট সেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মুজাদিদদের মধ্যকার কোন্দলই তার বড় প্রমাণ। ১৯৯০-১৯৯৪ এ মুজাহিদ নেতারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে প্রদেশ শাসন করা শুরু করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯৫ তে আমেরিকার সহায়তায় যখন তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসে তখন তারা হাজারা, তাজিক, উজবেকদের উপর চরম নৃশংসতা চালায়। ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সালে তালেবানদের বিরোধী হিসেবে গঠিত হয় "নর্দান এলায়েন্স”। তারা ইরান, রাশিয়া এবং ভারতের সমর্থনও পায়। ১৯৯৭ সালে নর্দান এলায়েন্স দলটি প্রায় ২০০০ তালেবান সদস্যকে হত্যা করে। আগস্ট ৮, ১৯৯৮ সালে তালেবান মাজার ই শরীফ অঞ্চল আক্রমণ করে ৫ হাজার উজবেকদের হত্যা করে। অতএব, নর্দান এলায়েন্স এবং তালেবান দুটো বাহিনীর মধ্যে খুব বেশি মতাদর্শগত এবং ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য না থাকলেও তাদের জাতিগত পার্থক্য তাদের মধ্য রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানের সেই জাতিগত সমস্যা আরও বিরাট আকারে দেখা দিয়েছে তালেবান সরকারে পশতুনদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে।
আফগান জনগণের মধ্যে বংশ বা গোত্রপ্রথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নিজ নিজ গোত্রের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। তাই শুধু তালেবানদের হাতেই ক্ষমতা থাকবে এটা আজকে না হলেও কয়েকবছর পর অন্য গোত্রের মানুষ মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য তালেবানদের উচিত সবাইকে শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা। বিশ্লেষকরা বলছেন তালেবানরা লেবাননদের রাজনৈতিক মডেল তথা "Confessionalist" অনুসরণ করা উচিত। Confessionalist এই সিস্টেমের মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বণ্টন করে দেওয়া। যেমন- লেবাননে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে লেবানন তার সংবিধানের কনফেশনালিস্ট সিস্টেমটি প্রয়োগ করেছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট হন একজন খ্রিষ্টান, প্রধানমন্ত্রী হন সুন্নি থেকে এবং স্পিকার হবেন শিয়া থেকে। অর্থাৎ সংঘাত এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সবগুলো গোষ্ঠীর সমন্বয় করে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ব্যবস্থা তালেবানরা হয়তোবা গ্রহণ করবে না, যা পরবর্তী গোত্র দ্বন্দ্বকে উসকে দিতে পারে।
আফগানিস্তানে তালেবান ছাড়াও এখন বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সামরিক ও জিহাদি গ্রুপ রয়েছে যাদের মধ্যে ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ আফগানিস্তান, হক্কানি নেটওয়ার্ক, আইএসএস খোরাসান (ISIS K) ইত্যাদি অন্যতম। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালে বিলুপ্ত হওয়া নর্দান এলায়েন্স এখন আবার নতুন রূপে 'ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ অাফগানিস্তান' নামে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা শুরু করেছে। বর্তমানে 'ইসলামিক মুভমেন্ট অফ উজবেকিস্তান'ও তালেবানদের বিপক্ষে খুবই সক্রিয়। অন্যদিকে ইসলামি স্টেইটের শাখা ইসলামি স্টেট অব খোরাসান এই অঞ্চলে খুব বেশি পরিমাণে সক্রিয়। ইসলামি স্টেইটের সাথে ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ আফগানিস্তানের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ইসলামি স্টেট খোরাসান এর বেশির ভাগ সদস্যই নন-পশতুন যারা মূলত আফগানিস্তানের উত্তরে বাস করে, আর পশতুনরা দক্ষিণে। অর্থাৎ একটি বিষয় খুব পরিষ্কার যে, কারা আইএসকে সমর্থন করবে আর কারা তালেবানকে সমর্থন করবে সেটা নির্ধারিত করে আসলে একজন ব্যক্তি কোনো নৃতাত্ত্বিক পরিচয়টি বহন করছে। জাতিগত দ্বন্দ্বের আবরণে আইএস বনাম তালেবান দ্বন্দ্ব আফগানিস্তান সমস্যাকে কোনদিকে ত্বরান্বিত করে সেটাই ভবিষ্যতে দেখার বিষয়। ২০১৪ সালের পর আল-কায়দা বনাম আইএস দ্বন্দ্ব, আইএস'র বিশ্বব্যাপী খিলাফতের ডাক এবং বৈশ্বিক সামরিক নেটওয়ার্ক আফগানিস্তান ইস্যুতে কেমন প্রভাব ফেলে সেটাই দেখার বিষয়। তালেবান এত সকল সংকট মোকাবিলা করতে পারবে কি না সেটা একটি বড় প্রশ্ন। তাই বিশ্লেষকদের দাবি এই জাতিগত সংকটকে কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তান হয়তোবা হয়ে উঠতে পারে আরেকটি যুদ্ধের ময়দান। আর তালেবানরা যদি এত কিছু সত্ত্বেও জাতিগত বৈষম্যের অবসান ঘটাতে পারে, যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে, যদি বর্তমান খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠতে পারে, যদি পূর্বের তুলনায় লিবারেল হয়ে নারী অধিকার রক্ষা করতে পারে, যদি তালেবানরা বহির্বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে, যদি অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সফলতা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, তাহলে যুগ যুগ ধরে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মাতৃভূমি স্বাধীন করা এই তালেবানদের কুর্নিশ করা বিশ্ববাসীর জন্য অত্যবশ্যকীয় হয়ে উঠবে।
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Mura, Andrea (2015), The Symbolic Scenarios of Islamism: A Study in Islamic Political Thought, London: Routledge
2. Dower, John W. (2017). The Violent American Century: War and Terror Since World War II, Haymarket Books
3. Goodson, Larry P. (2011), Afghanistan's Endless War: State Failure, Regional Politics, and the Rise of the Taliban, University of Washington Press
4. Johnson, Robert (2011), The Afghan Way of War: How and Why They Fight, Oxford University Press
5. Grau, Lester W.; Gress, Michael A. (2002). The Soviet-Afghan War: how a superpower fought and lost, University Press of Kansas
6. Caraley, Demetrios (2002), September 11, Terrorists Attacks, and U.S. Foreign Policy, Academy of Political Science
7. Bolton, M. Kent (2006), U.S. National Security and Foreign Policymaking After 9/11: Present at the Re-creation, Rowman & Littlefield
8. Burke, Jason (2nd ed. 2007), Al-Qaeda: The True Story of Radical Islam, London: Penguin
📄 এশিয়ার ভূরাজনীতি ও নতুন সমীকরণ
আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশ্লেষক টিম মার্শালের মতে, বিশ্ব রাজনীতির মূল হচ্ছে জিওগ্রাফি বা ভূগোল। ভৌগোলিক অবস্থানই নির্ধারণ করে দেয় বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কেমন হবে। “Maps tell us everything” নামে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে। ধরুন পাশাপাশি অবস্থিত দুটি দেশের মাঝখানে বিশাল একটি পাহাড় রয়েছে। ঐ পাহাড়ের কারণে দুটি দেশ সহজে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে না। আবার মনে করুন, একটি দেশের সমুদ্রবন্দর রয়েছে; কিন্তু আরেকটি দেশ ভূবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। তাই যে দেশটির সমুদ্রবন্দর রয়েছে; সে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী হবে। বিশ্বের মানচিত্রটি হচ্ছে একটি দাবার ছকের (Chessboard) মতো। কোথাকার রাজনীতি কী হবে সেটা মানচিত্রই আমাদেরকে বলে দিচ্ছে। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তিনদিকেই ভারত, তাই ম্যাপ আমাদেরকে বলছে, ভারতকে অবজ্ঞা করে বাংলাদেশের সিকিউরিটি নিশ্চিত করা অসম্ভব। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে আফ্রিকার নাইজারে প্রচুর ইউরেনিয়াম রয়েছে, ম্যাপ বলছে একারণেই আমেরিকান কোম্পানিগুলো নাইজারের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রচুর তেল-গ্যাস রয়েছে, তাই চীন পুরো সাগর দখল করে নিতে চাচ্ছে। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই পাশে দুইটি মহাসাগর অবস্থিত, তাই ম্যাপ আমাদের বলে দিচ্ছে বিশাল মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার উপর হামলা করা প্রায় অসম্ভব। ভৌগোলিকভাবে আমেরিকার এই সুবিধার জন্যই আমেরিকাকে বলা হয়- "America is Awesome"। এই মানচিত্র ছিদ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যখন একটি প্রক্সি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে বসানো হলো, তখনই মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির সূচনা হলো। যুক্তরাষ্ট্র যখন মানচিত্রে দেখতে পেল যে, পানামা রাষ্ট্রটি দুই বিশাল মহাসাগরকে সবচেয়ে কাছের দূরত্বে নিয়ে এসেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে কলম্বিয়া থেকে স্বাধীন করিয়ে সেখানে পানামা খাল তৈরির কাজ শুরু করে দেয়। মানচিত্রে যখন আমি দেখি শুধু রাশিয়াই গোটা বিশ্বের চারভাগের একভাগ একাই দখল করে রেখেছে, তখন যুক্তি ছাড়াই আমাকে মেনে নিতে হয় রাশিয়া একটি শক্তিধর রাষ্ট্র। মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে, চীনের উইঘুর মুসলিমদের উসকে দিতে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ম্যাপ আমাদেরকে বলে দিচ্ছে আফগানিস্তানের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাকে নিয়ে পরাশক্তিগুলো বারবার ভূরাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠবে।
পাকিস্তান: দ্যা লাইফলাইন অব চীন
আফগানিস্তানের পূর্বদিকে পাকিস্তান। এই পূর্ব দিক দিয়েই আফগানিস্তানের ছোট এক ফালা ভূখণ্ড পাকিস্তান ও তাজিকিস্তান এর মাঝখান দিয়ে চীনের সাথে মিলিত হয়েছে। চীন সীমান্তে মিলিত হওয়া আফগানিস্তানের ছোট এই ভূখণ্ডটি 'ওয়াখান করিডোর' (The Wakhan Corridor) নামে পরিচিত। আফগানিস্তানের এই ওয়াখান করিডোর দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এখান থেকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে খুব সহজে যাতায়াত করা যায়। আর এই জিনজিয়াং প্রদেশেই উইঘুর মুসলিমদের বসবাস। দ্বিতীয়ত, এই ওয়াখান করিডোরের সন্নিকটে চীন এবং পাকিস্তানের সংযোগস্থল। সেখানে রয়েছে চীন-পাকিস্তানের মধ্যখানে কারাকোরাম মহাসড়ক।
চীন যদি আরব সাগর কিংবা লোহিত সাগরে আসতে চায় তাহলে তাকে পাকিস্তানের উপর দিয়ে আসতে হবে। তাই চীনের একমাত্র বিকল্প রাস্তা হচ্ছে তাকে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে একটি দীর্ঘতম স্থলপথের ব্যবস্থা করা। কিন্তু চীন-পাকিস্তান সীমান্তে কারাকোরাম নামে একটি বিশাল পাহাড় রয়েছে, যার কারণে চীন পাকিস্তানে প্রবেশ করতে পারত না। খাড়া ও দুর্গম এই কারাকোরাম পাহাড়টির প্রায় ৮৮৭ কিলোমিটার পাকিস্তান অঞ্চলে এবং ৪১৩ কিলোমিটার চীনের মধ্যে পড়েছে। সেই দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে মহাসড়ক। এখন এই পথ দিয়ে চীন তার জিনজিয়াং প্রদেশ হয়ে পাকিস্তানের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে করাচি বন্দর পর্যন্ত চলে আসতে পারে। এই মহাসড়কের নাম দেওয়া হয়েছে কারাকোরাম মহাসড়ক। এই মহাসড়কটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর একটি অংশ। এই মহাসড়ক দিয়ে চীন প্রথমে পাকিস্তানের করাচি বন্দরে আসে, অতঃপর সেখান থেকে বেলুচিস্তানের গোয়াদর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পাকিস্তানের গোয়াদর সমুদ্রবন্দরটি চীন নির্মাণ করে দিয়েছে। এই বন্দর দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের যোগাযোগের পথ সুগম হবে। পারস্য উপসাগরীয় দেশ থেকে চীন কম খরচে তেল ও গ্যাস আমদানি করতে পারবে এই গোয়াদর বন্দর দিয়ে।
পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদর এই দু'টি বন্দর আরব সাগরের পারে হলেও তা একদিকে ভারত মহাসাগর এবং অন্যদিকে পারস্য উপসাগর, এমনকি লোহিত সাগরের দিকে পাড়ি দেয়ার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ফলে এই দুই বন্দর ব্যবহার করে চীন একই সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় নির্মিত তার হাম্বানটোটা বন্দরের সঙ্গেও সংযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হবে। এমনকি চীন এখান থেকে বঙ্গোপসাগরেও পৌঁছাতে পারবে। সেখানেও নজরদারি করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিলে চীনের ভারত মহাসাগরে আসার সেই মালাক্কা প্রণালিটি বন্ধ করে দিলেও চীন করাচি ও গোয়াদর বন্দর দিয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে। এই সঙ্গে চীন যে 'ওয়ানবেল্ট ওয়ান রোড' প্রকল্প নিয়ে বিশটি বাণিজ্যপথ চালু করতে চলেছে; এটি হবে তার অন্যতম একটি রুট। যে কারণে এই মহাসড়কটি চীনের 'Life Line' হিসেবে পরিচিত। চীন ও পাকিস্তানের এই কারাকোরাম মহাসড়কটি একবিংশ শতাব্দীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। তাই আরব সাগরে, পারস্য উপসাগরে, লোহিত সাগরে এবং ভারত মহাসাগরে অল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে আসার জন্য চীনের প্রয়োজন পাকিস্তানকে। আর এই প্রয়োজনটি শুধু সাময়িক সময়ের জন্য নয়। পাকিস্তানকে চীনের প্রয়োজন আজীবন। এজন্য আগামী বিশ্বে চীনের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হবে পাকিস্তানের। তাই চীনের অর্থায়নে পাকিস্তান গড়ে তুলেছে একটি বিশেষ বাহিনী। যারা এই মহাসড়ক ও সমুদ্রবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সজাগ।
যেখানে ব্যর্থ হবে চীনের 'Debt Trap' পলিসি
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, চীন পাকিস্তানকে কৌশলে তার 'Debt Trap' এ ফেলে দেবে। কিন্তু আমার কাছে এরকম কখনোই মনে হচ্ছে না। বরং আমার কাছে মনে হচ্ছে চীন পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ছলচাতুরি করলেও পাকিস্তানের সাথে সেটা করবে না এবং সেটা করলে লং-টার্মে গিয়ে চীন নিজেই বিপদে পড়বে। প্রথমত, পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে কারাকোরাম মহাসড়ক, পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদর বন্দর ব্যবহার ইত্যাদি চীনের খুবই প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজন কোনো সাময়িক সময়ের জন্য নয় বরং আজীবনের জন্য। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে এবং উত্তর আফ্রিকার জ্বালানি সঞ্চালনের প্রধান পথ হলো পাকিস্তান। তৃতীয়ত, কারাকোরাম হাইওয়ে শুধু দুটি দেশের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থাই নয়, সামরিক দিক থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সামরিক সরঞ্জাম আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় এই পথ। চতুর্থত, চীন আরও চাচ্ছে এই মহাসড়কটি আফগানিস্তান হয়ে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করতে।
আগামী বিশ্বে চীন কখনোই পাকিস্তানকে উপেক্ষা করতে পারবে না। তাই নিঃসন্দেহে পাকিস্তান হবে চীনের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধু। একই ভাবে পাকিস্তানের জন্যও এই মহাসড়কটি তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এক. পাকিস্তান ভারতের একেবারে সীমানার কাছে গিয়ে তার মিলিটারি সেটআপ বসাতে পারবে। উঁচু থেকে গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে পারবে। দুই. ভারত থেকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিতর্কিত অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করতে পাকিস্তানের সক্ষমতা বাড়াবে এই কারাকোরাম মহাসড়ক। তিন. এই মহাসড়কের সামান্য উত্তর দিকেই বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলটি অবস্থিত। কারাকোরাম মহাসড়ক তৈরিতে চীনকে যেন কোনোরকম সমস্যায় পড়তে না হয় সেজন্যই চীনও কাশ্মীরের একটি অংশ দখল করে নিয়েছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করেছিল, যা আজ আজাদ-কাশ্মীর এবং গিলগিত-বাল্টিস্তান নামে পরিচিত। আর চীন কাশ্মীরের যে অঞ্চলটি দখল করেছে সেটা একসাই চীন নামে পরিচিত (চীন যাকে তিব্বতের এবং জিনজিয়াং প্রদেশের অংশ হিসেবে মনে করে)।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ইরান
পাকিস্তানের করাচির সাথে আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের সীমানা রয়েছে। আফগানিস্তান ভূবেষ্টিত (Landlocked) হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীল। আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করে বাণিজ্য করতে হয়। আফগানিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ইরানের অবস্থান। ইরানের দক্ষিণ পূর্বে ওমান উপসাগরের নিকট চাবাহার বন্দরটি (Chabahar Port) অবস্থিত। আফগানিস্তান একটি ভূবেষ্টিত রাষ্ট্র। ভারত যদি স্থলপথে আফগানিস্তানে যেতে চায় তাহলে পাকিস্তানের উপর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ভারতের জন্য পাকিস্তানের সকল সীমান্ত বন্ধ। তাই ভারতকে আফগানিস্তানে যেতে হলে প্রথমে ইরানের চাবাহার বন্দরে যেতে হয়, সেখান থেকে ইরানের ভিতর দিয়ে আফগানিস্তানের কান্দাহারে পৌঁছাতে হয়। তাই জিওপলিটিক্যাল কারণে ইরানের চাবাহার বন্দরটি ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা (Miscalculation)
আফগানিস্তান যেহেতু স্থলবেষ্টিত: তাই তার বেশির ভাগ বহির্বাণিজ্য হয় পাকিস্তানি সমুদ্রবন্দর দিয়ে। পাকিস্তানের শর্ত হচ্ছে যে, পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করে আফগানিস্তান ভারত ব্যতীত যে-কোনো দেশের সাথেই বাণিজ্য করতে পারবে। পাকিস্তানের এই আপত্তির কারণে স্থলপথে আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি বন্ধ। ফলশ্রুতিতে বিকল্প রুট হিসেবে ইরানের চাবাহার সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ভারতের কাছে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, ভারতের ছিল আরও সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। ভারত ইরানের চাবাহার বন্দর ব্যবহার করে শুধু আফগানিস্তানের সঙ্গে নয়, তুর্কমেনিস্তান-সহ সমগ্র মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। তাই স্ট্যাটেজিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ২০১৬ সালে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছিল। আফগানিস্তানের আশরাফ গানী, ভারতের নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের হাসান রুহানির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পাকিস্তানে চীনের গোয়াদর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের বিকল্প ভাবা হচ্ছিল চাবাহারকে। পাকিস্তানে গোয়াদর বন্দর নির্মাণ করে চীন যেভাবে এই অঞ্চলে কর্তৃত্ব খাটাচ্ছে, একই ভাবে ভারতও চেয়েছিল ইরানের চাবাহার বন্দরটি নির্মাণ করে এখান থেকে চীনের একক আধিপত্য রোধ করতে। তাছাড়াও চাবাহার বন্দরটি ভারতের দখলে আসলে আফগানদের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব ও নির্ভরতা কমে যেত। আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের একটি বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তোলাই ছিল এই চুক্তির মূল লক্ষ্য।
চুক্তি অনুযায়ী ভারত চাবাহার বন্দর উন্নয়নে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করবে এবং চাবাহার থেকে আফগানিস্তানের জারাঞ্জ পর্যন্ত রেল ও সড়কপথ নির্মাণ করবে। আগাম পরিকল্পনা হিসেবে ভারত আফগানিস্তানের ভিতরে ২০০ কিলোমিটার সড়কও তৈরি করে ফেলে। চুক্তিতে আফগানিস্তানকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, এসব প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বন্দরের পরিবর্তে ইরানের বন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু সেই চুক্তির চার বছর পর বিশেষ কোনো অগ্রগতি না-হওয়ায় সম্প্রতি ইরান ঘোষণা দিয়েছে, এই প্রকল্পে ভারতের অর্থায়নের জন্য তারা আর অপেক্ষা করতে প্রস্তুত নয়। তাই ইরান নিজ অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ চাবাহার বন্দর প্রকল্পের একাংশ থেকে ভারতকে কৌশলে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। এখানে একটি জটিল ভূরাজনীতি হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি রেলপথ নির্মাণের এত বিশাল বাজেট ইরান কোথায় পাবে? তাদের মতে, নিশ্চয়ই ইরানকে চীন গোপনে অর্থায়ন দিচ্ছে। ভারতের গড়িমসির এই সুযোগে চীন ইরানকে কনভিন্স করে ফেলে। তাই ভবিষ্যতে চাবাহার বন্দরটিও চীনের কর্তৃত্বে চলে যাবে। চীনের সঙ্গে পরবর্তীতে ইরানের ৪০০ বিলিয়ন ডলারের একটি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হতে যাওয়া সেই চাবাহার বন্দরেও এখন চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এটাকে ভারতের 'Diplomatic Failure' বলা হচ্ছে।
সামুদ্রিক আধিপত্যে আরও একধাপ এগিয়ে চীন
প্রশ্ন হতে পারে চাবাহার বন্দরটি চীনের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ? চাবাহার বন্দরের নিকটে চীন একটি তেল শোধনাগার (Refinery) বানাচ্ছে। ইরানের তেল সেখানে পরিশোধন করে তারপর পাইপলাইনে গোয়াদর বন্দরে নিয়ে এসে সেখান থেকে আবার পাকিস্তানের কারাকোরাম হয়ে নিজেদের দেশে সেই তেল নিয়ে আসতে চায় চীন। চীন তার জ্বালানি তেলের জন্য মালাক্কা প্রণালির উপর অধিক নির্ভরশীল। কিন্তু সেখানে চীনের প্রবেশাধিকার যে-কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই বিকল্প হিসেবে চীন এখন চাবাহার বন্দরকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শীঘ্রই ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতের হাত থেকে ছিটকে চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সেখানে ভারতের কিছু শেয়ার থাকলেও মূল কলকাঠি নাড়াবে চীন। ভারতের এই বিপর্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রও কিছুটা দায়ী। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তখন বহির্বিশ্বে তেল বিক্রি করতে না পেরে ইরান কম দামে চীনের কাছে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। তাছাড়া ভারতও এখন আর ইরানের কাছ থেকে তেল কিনছে না, সেটাও ইরানের ক্ষোভের অন্যতম একটি কারণ। অন্যদিকে চীন বলছে, আমরা তোমাদের সব তেল কিনে নিতে রাজি, ফলে ইরানের তো চীনকে বেছে নেওয়া ছাড়া আর উপায়ও নেই।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। নতুন করে আবার ইরানের উপর কখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কেউ বলতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে খুব বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইরানের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনবে। কারণ ভারত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র। তাই হয়তো আগেই সতর্ক তেহরান। ইরানকে কাজে লাগিয়ে মধ্য এশিয়া তথা পূর্ব ইউরোপে পৌঁছনোর ভারতীয় পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের বন্দর এবং রেল সেক্টরে চীনের বিনিয়োগের ফলে ভারতীয় পণ্য মধ্য এশিয়ায় পৌঁছনোর প্রশ্নে সংশয় তৈরি হবে। চাবাহার বন্দরের পরিচালনার ভার চীন না পেলেও গোটা প্রকল্প ঘিরে যাবতীয় পরিকাঠামো তাদের হাতে চলে গেলে এই বন্দরে এত দিন ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ভারতের জন্য অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি অংশ হচ্ছে ইরান হয়ে পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত রুট নির্মাণ। তাই চীন সেই পথেই এগুচ্ছে। চাবাহার বন্দরে চীন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। সামুদ্রিক আধিপত্যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল চীন। ভারতের জন্য আরেকটি সমস্যা হচ্ছে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ঐ চুক্তি হয়েছিল আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানী সরকারের সাথে। কিন্তু এখন ক্ষমতায় তালেবান। তাই তালেবান সরকার চীন ও পাকিস্তানের পথেই হাঁটবে।
তালেবানদের পুনরুত্থানে কোন দিকে এগুচ্ছে এশিয়ার ভূরাজনীতি
আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী মোট ৬টি দেশ হচ্ছে পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান ও চীন। আফগানিস্তান নিয়ে প্রত্যেকটি দেশের রয়েছে আলাদা আলাদা স্বার্থ। পরাশক্তিগুলোর রয়েছে স্বতন্ত্র ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। এখন সেই জটিল বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।
রাশিয়া
আফগানিস্তানের উত্তরে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান। আফগানিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি পশতুনদের বাইরে তাজিক আছে ২৭ শতাংশ, উজবেক ৯ শতাংশ, তুর্কমেন ৩ শতাংশ। একদিকে এই তিনটি দেশের সাথে তালেবানদের জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে এই দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে রাশিয়া। এই তিনটি দেশ অতীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। তাই এখানে রাশিয়ার একটি প্রভাব রয়েছে। এমনকি তুর্কমেনিস্তান রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত। তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের অন্যতম তেল সমৃদ্ধ দেশ। রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত উপরিউক্ত তিন দেশের তুর্কি, উজবেক, তাজিক জাতিগোষ্ঠীর অনেক লোক আফগানিস্তানের উত্তরদিকের প্রদেশগুলোতে বসবাস করছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন ও রাশিয়া কৌশলগত মিত্র হলেও নিজ স্বার্থে এদের রয়েছে স্বতন্ত্র অবস্থান। একটি উদাহরণ দিচ্ছি বুঝতে সহজ হবে। বিতর্কিত অঞ্চল লাদাখে ভারত-চীন উত্তেজনা তুঙ্গে থাকাকালীন চীনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে রাশিয়া ভারতকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছিল। তাই তালেবানদের ঘিরে চীনের একক আধিপত্য কখনোই মেনে নেবে না রাশিয়া। এই অঞ্চল নিয়ে রাশিয়ার রয়েছে আলাদা স্বার্থ। তাই এখন আফগানিস্তানে রুশ প্রভাব পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পাকিস্তান
আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি সীমানা পাকিস্তানের সাথে। প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ 'ডুরান্ড লাইন' ভাগ করেছে এই দুটি দেশকে। উল্লেখ্য, পশতুন জাতিগোষ্ঠীর মানুষরা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী জায়গায় বসবাস করছে।
আফগানিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আশরাফ গানী সরকার ভারতের বলয়ে ছিল। পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। শুধু তালেবান সরকার ছাড়া। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালে তালেবানরা ক্ষমতায় আসলে যে তিনটি রাষ্ট্র তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তার একটি পাকিস্তান। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবানকে আশ্রয় দিয়েছে আফগানিস্তানে তাদের পছন্দের সরকার নিশ্চিত করতে, সেখানে ভারতের প্রভাব কমাতে এবং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের পথ নিশ্চিত করতে।
এখন তালেবানরা ক্ষমতায় আসায় পাকিস্তান অনেক সুপরিকল্পিতভাবে আফগানিস্তানকে ঘিরে কৌশল নিচ্ছে। পাকিস্তান এখন আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সরাসরি বাণিজ্য রক্ষা করতে পারবে। অন্যদিকে তালেবান ক্ষমতায় আসায় ভারত সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে যাবে। তবে পাকিস্তানের জন্যও একটি রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে।
পাকিস্তানের কট্টরপন্থি একটি সংগঠন হচ্ছে "তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)"। আফগান তালেবান আর পাকিস্তান তালেবান দুটোই পৃথক সংগঠন। এরাও জাতিতে পশতুন। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তেই এদের বসবাস। পাকিস্তান এটিকে অনেক আগেই নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানি সরকারকে উৎখাত ও দেশটিতে ইসলামি শরিয়া আইনভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানে লড়াই করছে টিটিপি। অস্ত্র বিরতি নিয়ে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা হলেও ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তারা আর অস্ত্র বিরতি চুক্তি মানবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের উপর হামলা চালানোর পর বিশ্বে পরিচিতি পায় টিটিপি। বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের বোমা ও আত্মঘাতী হামলায় কয়েক হাজার পাকিস্তানি মারা গিয়েছে। ২০১৪ সালে পেশাওয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৩২ জন শিশুকে হত্যা করেছিল। এটা ছাড়াও পাকিস্তানে আরও কিছু উগ্র গোষ্ঠী রয়েছে। তালেবানদের পুনরুত্থানে তারাও পাকিস্তানে সহিংস হয়ে উঠতে পারে। আফগানিস্তানে তালেবান থাকলে চীন-পাকিস্তানের যেমন সুবিধা আছে, তেমন ঝুঁকিও অনেক। তাই ইমরান খান নিজ দেশের উগ্র সংগঠন টিটিপির থেকে দেশের নিরাপত্তাকে রক্ষা করবে নাকি আফগানিস্তান নিয়ে ভূরাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠবে সেটি একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
চীন
তালেবানরা ক্ষমতায় এসে চীনের দিকে ঝুঁকছে। কারণ পুরো দেশকে ঢেলে সাজাতে তালেবানদের অনেক অর্থ প্রয়োজন। আর চীনও আগ্রহ নিয়ে বসে আছে কখন সে নতুন করে আফগানিস্তানে বিনিয়োগ করবে। তাছাড়াও গত কয়েক বছরে চীন আফগানিস্তানে যা বিনিয়োগ করেছে, তা সে সুরক্ষা করতে চায়। চীনের নজর আফগানিস্তানের লোহা, সিরামিক ও তামার খনিগুলোতে। চীনের দ্বিতীয় মাথাব্যথার জায়গাটি হচ্ছে তালেবানরা যেন উইঘুর মুসলিমদের বিষয়ে নীরব থাকে। ইতোমধ্যে তালেবানরাও ঘোষণা দিয়েছে উইঘুর বিষয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদারে তালেবানরাও এখন বলছে উইঘুর চীনের একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম ধর্মাবলম্বী এই উইঘুর জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই চীন থেকে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল। তালেবান প্রতিনিধি মোল্লা হারাদার আখুন্দের সঙ্গে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর বৈঠকে তালেবানরা সেটা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। চীনের একটি আশঙ্কা তালেবানদের পুনরুত্থানে মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াং প্রদেশে সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এ জন্য চীন অনেক আগে থেকেই উইঘুর ভিত্তিক “ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টকে” (ETIM) দায়ী করে। যেটাকে সংক্ষেপে ইটিআইএম বলা হয়।
এই ইটিআইএম আফগানিস্তানে যথেষ্ট সক্রিয় এবং অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে জোটবদ্ধ। চীন সরকারের দাবি নবগঠিত তালেবান সরকার যেন এই ETIM গোষ্ঠীকে উসকানি না দেয় এবং তাদেরকে যেন আফগানিস্তানে আশ্রয় না দেওয়া হয়। এটা নিশ্চিত করতেই তালেবানের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে চীনকে। ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট ছাড়াও চীনের আরেকটি শঙ্কার জায়গা আল-কায়দা নিয়ে। আল-কায়দা আফগানিস্তানে পুনর্গঠিত হলে চীনের উপর দুইটি প্রভাব পড়তে পারে। প্রথমত, তারাও উইঘুর মুসলিমদের গোপনে মদদ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে নতুন আল-কায়দার উপস্থিতি দেখা দিলে ন্যাটো জোট এখানে পুনরায় হামলা চালাতে পারে। ফলশ্রুতিতে চীনের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভারত
হাক্কানি-আইএসআই জোট ২০০৮ সালে কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়ে ভারতীয় কূটনীতিক-সহ ৫৮ জনকে হত্যা করেছিল। ভারত আফগানিস্তানকে নিয়ে অতীতেও স্বস্তিতে ছিল না, আর এখনো নেই। ভারতের সাথে আফগানিস্তানের কোনো সীমানা না থাকলেও তালেবানদের পুনরুত্থানে অস্বস্তিতে পড়েছে ভারত সরকার। এক. আশরাফ গানী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ইরান থেকে আফগানিস্তান হয়ে ভারতে গ্যাস সরবরাহের একটি পাইপলাইন প্রকল্পও ছিল আলোচনাতে। তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসায় ভারতের এই প্রকল্প এক কথায় ব্যর্থ হয়েছে। আশরাফ গানীর শাসনামলে ভারত আফগানিস্তানের অনেক প্রজেক্টে বিনিয়োগ করেছিল। দুই. তালেবানরা যে আইডিওলজি বা মতাদর্শে পরিচালিত সেটির সাথে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার একটি সংযোগ রয়েছে। যার জন্য ভারতের অনেক ইসলামিক সংগঠন, ইসলামিক স্কলারদেরও তালেবানের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। তারাও তালেবান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একত্রিত হয়ে উঠতে পারে বলে দাবি করছেন ভারতীয় রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তিন. কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের জন্য তালেবান বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এর আগেও তালেবান ও আল-কায়দার সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয়। কাশ্মীরে নতুন করে আরেকটি উত্তেজনা সৃষ্টি হোক সেটা ভারত কখনো চাইবে না। তাই দিল্লি এখন 'Back Channel Diplomacy' এর দিকে আগাবে। আফগানিস্তানে বর্তমানে ভারতের কোনো দূতাবাস নেই। ফলে ভারত কাশ্মীর ইস্যুতে তালেবান সরকারের সাথে টেবিলে বসতে ব্যাক চ্যানেল ডিপ্লোমেসির দিকে আগাতে হবে।
বাংলাদেশ
১৯৯৬ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশে উগ্রতা কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। এমনকি এ দেশ থেকে কিছু রেডিক্যাল মানুষজন আফগানিস্তানে তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধে গিয়েছিল। পরে তারা দেশে ফিরে এসে নানা জঙ্গি সংগঠনের জন্ম দেয়। তাই তালেবানদের পুনরুত্থানে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুনরায় একত্রিত হওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে বলে দাবি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। আফগানিস্তানের নবগঠিত তালেবান সরকারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন বাংলাদেশ আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ঢাকার সাথে কাবুলের সম্পর্ক কেমন হবে। তার একটি কারণও রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিলে তারপর বাংলাদেশ তালেবানদের স্বীকৃতি দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে। কেননা আগেভাগেই স্বীকৃতি দিয়ে দিলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের উপর একটি চাপ তৈরি হতে পারে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ব্যবসা বাণিজ্য সহজীকরণ করতে আফগানিস্তানকে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন। কেননা আফগানিস্তান হচ্ছে মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বার। বেসরকারি পর্যায়ে ব্র্যাকের কার্যক্রমও পুনরায় চালু হতে পারে। আমরা আশাবাদী ঢাকা সঠিক পথেই আগাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে 'শান্তির সংস্কৃতি' বা 'Culture of Peace' কে বেশি গুরুত্বারোপ করছে। শান্তিপূর্ণভাবে বিবাদ মীমাংসার হিসেবে এবং সার্কের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কাছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব রয়েছে। একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে অরক্ষিত হয়ে উঠলে তার প্রভাব পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতেও পড়ে। তাই আফগানিস্তানে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ইরান
ইরান হচ্ছে শিয়া মুসলিম প্রধান দেশ। আর তালেবানরা সুন্নি মুসলাম। তাই তালেবানদের সাথে ইরানের একটি ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তালেবানরা সরকার গঠন করলে ইরান তখন আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে তালেবানদের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এবার ইরান তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। ইরানও এখন তালেবানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতে পারে তিনটি কারণে। প্রথমত, আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরানের অনেক বড় লাভ হয়েছে। আফগানিস্তান আর ইরান রাষ্ট্র দুটি পাশাপাশি অবস্থিত। তাই আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি ইরানকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল। এখন ইরানের দোরগোড়ায় আর যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকছে না। এটা ইরানের জন্য স্বস্তির। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত কারণে। ইরানের মিত্র চীন ও পাকিস্তান তালেবান সরকারের পক্ষে। চীনের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এই দুটি বিষয় ইরানকে আফগানিস্তানে চীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করবে। তাই ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ইরান তালেবানদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা বেশি। আফগানিস্তানে অবস্থিত শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তালেবান শাসনে সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় আছে সেখানে অবস্থানরত শিয়া সংখ্যালঘু হাজারা জাতি। ইরানও উদ্বিগ্ন সে কারণে। তাই শিয়া হাজারা সম্প্রদায় যেন নিরাপদে থাকে সেই বিষয়ে তালেবানদের সাথে ইরানের চলছে কূটনৈতিক আলোচনা। কিন্তু আফগানিস্তানে অবস্থিত শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের সাথে ভবিষ্যতে যদি তালেবানদের দ্বন্দ্ব বেঁধে যায় তাহলে ইরান-তালেবান সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।
যুক্তরাষ্ট্র
পূর্বেও বলেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে সেটা শিফট করছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। সামনের দিনগুলোতে চীনকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞচল ঘিরে নানা পদক্ষেপ ও কৌশল নেবে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবে এখানকার ভালনারেবল কমিউনিটিগুলোকে টার্গেট করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যেটা করেছে তা হলো যে অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, প্রথমে সেই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তারপর সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিয়ে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে দমনের নামে সামরিক বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তাই আগামী বিশ্বে চীনকে মোকাবিলা করার জন্য এশিয়ার এই অঞ্চলে কৃত্রিম অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা হতে পারে। এখানে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু উর্বর গ্রাউন্ডও রয়েছে। পাঁচটি ভালনারেবল কমিউনিটিও রয়েছে। যেমন- বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী জেমা ইসলামিয়াহ, পাকিস্তানে তালেবানপন্থি সংগঠন টিটিপি, পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম ধর্মাবলম্বী উইঘুর জাতিগোষ্ঠী, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দশ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ম্যালিগনাইজড জোন কাশ্মীরী জনগণ ইত্যাদি। অর্থাৎ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত ভালনারেবল গোষ্ঠী রয়েছে। এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনো ফায়দা নিতে না পারে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। এই অঞ্চলকে হতে হবে আরও বেশি সচেতন। উপরিউক্ত রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো মাথায় রেখে সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
মূল্যায়ন
একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে, তার চেহারা পরিবর্তন করে দিতে পারে, ভৌগোলিক কারণে একটি দেশ পরাশক্তিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনো রাষ্ট্র যদি তার গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে না পারে তাহলে সেটা হিতে বিপরীত হয়। যেমন আজকের আফগানিস্তান। গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান যখন অভ্যন্তরীণ দুর্বল নীতির কারণে রাষ্ট্রের ধ্বংস ডেকে আনে তখন সেটাকে বলা হয় 'ভৌগোলিক অভিশাপ' বা 'Geographical Anathema'। কেউ আবার নাম দিয়েছেন 'The Curse of Geography' হিসেবে। বৈদেশিক নীতি বিশেষজ্ঞ টিম মার্শাল এটার নাম দিয়েছেন 'Prisoners of Geography'। এই প্রিজনারস অব জিওগ্রাফির শিকার হয়েছে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, ক্রিমিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্র। ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্র যদি বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে না পারে সেটা সেই রাষ্ট্রের জন্য ব্যর্থতা। বঙ্গোপসাগরের কারণে বাংলাদেশের অবস্থান পরাশক্তিগুলোর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ। এখন এই গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি অন্যতম 'Diplomatic Capital'। বৈদেশিক অঙ্গনে আমাদের 'Bargaining Power' হচ্ছে আমাদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিতে হবে। ভৌগোলিক শক্তি যেন ভৌগোলিক অভিশাপে পরিণত না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।
Question to think about?
দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তানে সরকার পরিবর্তন, এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে রাশিয়ার কর্তৃত্ব, আরব সাগর ও পশ্চিম এশিয়াকে কেন্দ্র করে চীন-ইরান-পাকিস্তান এর নতুন সমীকরণ, মধ্য এশিয়াকে ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে বিবেচনা করে এশিয়াকেন্দ্রিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত?
টিকাঃ
1. Padukone, Neil (2014), Beyond South Asia: India's Strategic Evolution and the Reintegration of the Subcontinent, Bloomsbury Publishing
2. George, Anns (2014), Chabahar Port and India's New Strategic Outpost in Middle East, Allied Publishers
3. Charlton, Sue Ellen M. (4th ed. 2014), Comparing Asian Politics: India, China, and Japan, Routledge
4. Shambaugh, David and Yahuda, Michael (2nd ed. 2014), International Relations of Asia, Rowman & Littlefield Publishers
5. Hagerty, Devin T. (2005), South Asia in World Politics, Rowman & Littlefield Publishers
6. Garlick, Jeremy (2018), Deconstructing the China-Pakistan Economic Corridor: Pipe Dreams Versus Geopolitical Realities, Journal of Contemporary China
7. Wolf, Siegfried O. (2020), The China-Pakistan Economic Corridor of the Belt and Road Initiative, Springer International Publishing
8. Bhatnagar, Aryaman and John, Divya (2013), Accessing Afghanistan and Central Asia: Importance of Chabahar to India, Observer Research Foundation
📄 আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
Theme: Frankenstein the CIA Created
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি
"There is a proliferation of terrorism as a result of the war in Iraq. What America has created is a den for terrorists to breed in Iraq as a result of the war and to ship their ideologies and their fears and their capabilities around the world, not just in the Middle East, but in other continents." - David E. Bonior
কিছু বিষয় রয়েছে যা নিজে বুঝতে পারাটাই অত্যন্ত কঠিন। সেই বিষয়গুলো আবার অন্যকে সহজ করে বোঝানো আরও কষ্টকর। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ। এটা খুবই বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ ১৯৯০ সালে শেষ হওয়ার পর, যুক্তরাষ্ট্র নামক দেশটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অথবা আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য যে দেশেই তাদের সামরিক অভিযান ও আগ্রাসন চালিয়েছে সে দেশেই কোনো না কোনো সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। হোক সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী শক্তি হিসেবে। বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে আমরা অনেক জিহাদি গোষ্ঠীর নামই শুনতে পাই এবং সেটা সংখ্যার হিসেবে বিবেচনা করলে তালিকাটা দীর্ঘ হতে থাকবে। তবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আইএস এবং আল-কায়েদা।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের দৃষ্টিতে Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ বলতে আমরা বোঝাচ্ছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী নিজেদের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে সৃষ্ট দুই পরাশক্তির মধ্যকার রাজনৈতিক অস্থিরতা। সন্ত্রাসবাদের যে-কোনো আলোচনায় 'রাজনৈতিক অস্থিরতা' এই শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালের বার্লিন অবরোধ, ১৯৪৯ সালে জার্মানির দুই ভাগে বিভক্ত হওয়া, ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে ইরানের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ, ১৯৫৯ সালে কিউবার মিসাইল সংকট বা অক্টোবর সংকট, ১৯৬১ সাল CIA'র পৃষ্ঠপোষকতায় কিউবাতে 'বে অফ পিগস ইনভেশন', ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয় ইন্দোচীন বা ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনাসমূহ রাজনৈতিক অস্থিরতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। তারই অংশ হিসেবে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানের নবনির্বাচিত সোভিয়েতপন্থি সরকারকে সামরিক সহায়তা দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে সামরিক অভিযান চালায়। অপরদিকে আফগানিস্তানের স্থানীয় বিদ্রোহীদের তথা মুজাহেদিনদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আরব-অনারব মিলিয়ে প্রায় ৪৩টি দেশ থেকে আগত সৈন্যরা মুজাহিদিনদের পক্ষে আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেয়। এই বিশাল সংখ্যক সৈন্যের সমন্বয়ের কাজ করেছিলেন সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সৈন্যদের নিয়ে আফগানিস্তানের ভূমিতে তৈরি হওয়া জিহাদিস্ট নেটওয়ার্ককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ওসামা বিন লাদেন এবং আব্দুল্লাহ আজম মিলে প্রতিষ্ঠা করেন আল-কায়দা নামক সামরিক জিহাদিস্ট সংগঠন। যাদের কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মুসলমানদের সমরাস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া এবং একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করা। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের কিছুদিনের মধ্যেই আল-কায়েদা একটি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের নেটওয়ার্কের চাইতে অনেক বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায়। এটি পরিণত হয় বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করা একটি জিহাদি সংগঠনে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আল-কায়দার সমস্যাটি কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র ও আল-কায়দার মধ্যকার দ্বন্দ্ব
যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে এসেছিল এই অঞ্চল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য হ্রাস করতে। কিন্তু দেখা যায় আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আল-কায়দার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের সূচনা এই জায়গাটিতেই। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতকে হটাতে এখানে এসেছে এবং সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর এই অঞ্চলের শাসনভার এই অঞ্চলের মানুষদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বরং নিজে আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছে। সোভিয়েতকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই অঞ্চলের মোড়ল হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্র বনাম আল-কায়দা দ্বন্দ্ব এখান থেকেই জটিল আকার ধারণ করে। আল-কায়দা সাংগঠনিকভাবে বিশ্বাস করে যারা ইসলামের বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিটি মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। আল-কায়দার এই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক থাকলেও এই বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যকে আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সকল ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখতে চায়। আল-কায়দার দাবি আফগানিস্তানে সোভিয়েত আধিপত্য উৎখাতের পর ওয়াশিংটন তাদেরকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামি শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠায় বাধা দেবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকেও প্যালেস্টাইনি আরবদের অধিকার ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করবে। কিন্তু আমেরিকা তা করেনি বরং ইসরায়েলের বর্বর আন্দোলনে আরও সাহায্য যোগাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সোভিয়েত আধিপত্য উৎখাত করে সেখানে একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ওয়াশিংটনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল।
আল-কায়দার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
আল-কায়দার সাবেক প্রধান আয়মান মুহাম্মাদ রবি' আল-জাওয়াহিরি তাদের অবস্থান সম্পর্কে এরকম বলেছিলেন- (১) ইসলামিক রাষ্ট্র তথা যেগুলো ঐতিহাসিকভাবেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই রাষ্ট্রগুলো অবশ্যই শরীয়াহ আইন দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। তার মতে সেকুলার বা মানবসৃষ্ট সরকার ব্যবস্থা ইসলামিক বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক একটি বিষয়। (২) তিনি আরও মনে করেন, আক্রমণকারীদের হাত থেকে মুসলিম ভূখণ্ডের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রভাবমুক্ত রাখা ব্যতীত মুসলিমদের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ অসম্ভব। (৩) তিনি মধ্যপ্রাচ্যের এনার্জি রিসোর্সের (তেল সম্পদ) উপর নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপনের প্রতি জোর দেন। তার মতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। উপরের তিনটি বক্তব্য থেকে এই বিষয়টি খুবই প্রতীয়মান যে, আল-কায়দার প্রধান মনোযোগ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভূখণ্ডে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করা। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করে আল-কায়দার মধ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। তবে তাদের মতে আল-কায়দা মনে করে, খিলাফত দরকার কিন্তু সেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার সময় এখনো আসেনি কারণ জিহাদি সম্প্রদায় এবং মুসলিম সমাজগুলো এখনো খিলাফতের জন্য তৈরি নয়। তাই খেলাফত প্রতিষ্ঠা তাদের কাছে বর্তমানে অগ্রাধিকার নয়।
আল-কায়েদার ক্রমবিকাশ
ফাওয়াদ হোসেন একজন জর্ডানিয়ান সাংবাদিক এবং লেখক। তিনি আল-কায়দার সাবেক প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন। ফাওয়াদ হোসেন তার বর্ণনায় আল-কায়দার ক্রমবিকাশকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন।
১. উন্মেষ কাল; The Awakening (২০০১-২০০৩)- এই সময়টাতে আল-কায়দা যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্র রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের হামলা চালাত। এই হামলা চালানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে অভিযান চালানোর জন্য প্ররোচিত করত।
২. বিকাশ কাল; Opening Eyes (২০০৩-২০০৬)- যেহেতু এই সময়টাতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে, তাই ইরাক অভিযান হয়ে ওঠে আল-কায়দার অপারেশনের প্রাণকেন্দ্র। তখন বিশাল সংখ্যক যুবক বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আল-কায়দায় যোগদান করতে থাকে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে আল-কায়দা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। অর্থাৎ আল-কায়দা নিজে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে একটি আদর্শ হয়ে ওঠে।
৩. স্থিতিকাল; Arising and Standing up (২০০৭-২০১০)- এই সময়টিতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ প্রায় দরজার কাছে কড়া নাড়ছিল। তাই আল-কায়দা সিরিয়ার প্রতি মনোযোগ স্থাপন করে।
৪. টিকে থাকার লড়াই: Survival (২০১১- ২০১৯)- আল-কায়দার প্রধান ওসামা বিন লাদেন মৃত্যুর পর দলটি চরম দুর্যোগে পড়ে। নেতৃত্ব বদল। তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের মৃত্যু। আল নুসরাহ ফ্রন্ট এবং আইএস এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, সবকিছু আল-কায়দার দুর্বল হওয়ার পেছনের কারণ। এই সময় আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের চেয়ে টিকে থাকাই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
৫. নবজাগরণ; Renaissance (২০২০- বর্তমান)- গত দশকের শেষের দিকেই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা নড়বড়ে হতে থাকে। করোনার কারণে ভঙ্গুর অর্থনীতি, আফগানিস্তানে প্রচুর সামরিক খরচ ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। এটা পরিষ্কার যে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অবশ্যই আফগানিস্তানে নয়। তথা চীনের বিকাশমান অর্থনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি ইত্যাদি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নজরে আসার ফলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতি তাদের মনোযোগ তুলনামূলক ক্ষীণই বলা যায়। যেহেতু আফগানিস্তানে এখন তালেবান সরকার ক্ষমতায় এবং তালেবানের সাথে আল-কায়দার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, আফগানিস্তান এখন হতে পারে আল-কায়দার জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের অবস্থানে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন হওয়ার সুযোগে সেখানে আল-কায়দার সদস্য সংখ্যা বাড়তে পারে বলে দাবি করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
আল-কায়দা ও আইএসের মধ্যে বিভাজনের কারণ
উপরে আল-কায়দাকে নিয়ে এত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলাম; তার কারণ আল-কায়দা এবং আইএস এই দুটি সশস্ত্র বাহিনী একে অপরের সাথে খুব গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ২০১৪ সালে আবু বকর আল বাগদাদীর নেতৃত্বে আইএস সাংগঠনিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও এর সূচনা হয়েছিল মূলত ১৯৯৯ সালে। সময় এবং ক্রমবিকাশের ধারায় অতীতের নাম পরিবর্তন করে ২০১৪ সালে আইএস নামটি ধারণ করেছিল। ১৯৯৯ সাল তথা সূচনাকালে আইএস এর নাম ছিল "জামা'আত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ”। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবু মুসাআব আল-যারকায়ি। তখন তাদের কার্যকলাপ ইরাক এবং জর্ডানের কিছু এলাকা জুড়েই সম্পাদিত হতো।
এরপরে যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক আক্রমণ চালায় তখন আল-কায়দা তাদের মনোযোগ ইরাকে কেন্দ্রীভূত করে। তার ফলাফলস্বরূপ আল-কায়দা তাদের ইরাকি শাখা হিসেবে আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তুলে। যার নাম 'আল-কায়দা ইন ইরাক (AQI)'। এই 'আল-কায়দা ইন ইরাক' হচ্ছে সেই সংগঠন, ১৯৯৯ সালে যার নাম ছিল 'জামাআত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ'।
অর্থাৎ ২০০৪ সালে 'জামাআত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ' এই স্বতন্ত্র সংগঠনটি আল-কায়দার অধীনে গিয়ে নাম ধারণ করে আল-কায়দা ইন ইরাক (AQI) নামে। তার মানে আল-কায়দা ইন ইরাক নামে নতুন কোনো সংগঠন ইরাকে তৈরি করা হয়নি বরং জামায়াত আল তাওহীদ ওয়াল জিহাদ সংগঠনটিই আল-কায়দার অধীনে এসে তার একটি শাখা হিসেবে আল-কায়দা ইন ইরাক নাম ধারণ করেছিল।
এরপর থেকেই এ সংগঠনটি ইরাকে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে ও শিয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাতে ইরাকি সুন্নিরা দলে দলে যোগ দেয়। যেহেতু ইরাকে সুন্নিদের ভেতর শুরু থেকেই শিয়াদের সাথে শত্রুতা ছিল তাই 'আল-কায়দা ইন ইরাক' এবারে শিয়াদের উপর নৃশংসতাকে জনসমর্থন লাভের উপায় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। তাই শিয়া উপাসনালয়ে হামলা ও বর্বরতা চালিয়ে এরা সুন্নিদের সমর্থন অর্জন করার চেষ্টা করে। বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রীয় আল কায়েদার সাথে ইরাকি আল কায়েদার বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের কারণ হলো কেন্দ্রীয় আল-কায়দার বিধিবিধানকে তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত নৃশংসতা, শিয়া গণহত্যা ও বাড়াবাড়ি করেছিল ইরাকি আল-কায়দার নেতারা। তাছাড়াও ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর আল-কায়েদা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলশ্রুতিতে সহযোগী অঙ্গসংগঠনগুলোর উপর তাদের প্রভাব কমতে থাকে। অন্যদিকে আল-কায়দা ইন ইরাক'র অবারিত সফলতা রাজনৈতিকভাবে তাদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। কেন্দ্রের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। ইরাকের প্রধান তেল ক্ষেত্রগুলো দখলের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতিও ফুলেফেঁপে ওঠে। সকল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে "আল-কায়দা ইন ইরাক” এই নামটি পরিবর্তন করে সংগঠনের নতুন নাম দেওয়া হয় আইএস। সে-বছর রমজান মাসের ১ তারিখ সংগঠনটির নেতা আবু বকর আল বাগদাদী সারা বিশ্বব্যাপী খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। খিলাফত ঘোষণার পাশাপাশি সংগঠনটি নিজেদের নাম পরিবর্তন করে রাখে 'ইসলামিক স্টেট' বা আইএস। আইএসকে আরবিতে 'আল দাওলা আল ইসলামিয়া' বলা হয়। খিলাফত ঘোষণার পর তারা শুধু ইরাক ও সিরিয়াতে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই নয় বরং পুরো মুসলিম উম্মাহ'র উপর নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করে তত্ত্বগতভাবে তারা পৃথিবীর কোনো অঞ্চল নয়, সমগ্র মুসলিম দুনিয়ার ওপরেই কর্তৃত্ব দাবি করে বসে। আঞ্চলিকভাবে জাবাত আল নুসরাকে তাদের অধীনে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিকভাবে আল-কায়দার চেয়ে জিহাদি রাজনীতির নেতৃত্বে এগিয়ে থাকার প্রচেষ্টাও ছিল তাদের মধ্যে। তাদের এই লক্ষ্য ও প্রচেষ্টা অনেকাংশেই সফল হয়েছে। খেলাফত ও ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণার কয়েক মাসের মধ্যেই তারা পরিণত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিহাদি সংগঠনে। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় আল-কায়দাকে ছাড়িয়ে এই সাবেক আল-কায়দা অনুসারী সংগঠনটি আন্তর্জাতিক জিহাদি রাজনীতির প্রধান নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে সিরিয়ায় আইএস এর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ টুল (tool) হয়ে ওঠে 'আল নুসরাহ ফ্রন্ট'। আরবিতে 'জাবাত আল নুসরাহ' নামে পরিচিত এটাও একটি সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠী। ২০১১ সালে আল-কায়দা ইন ইরাকের সিরিয়ান শাখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এই সংগঠনটি। মূলত আল-কায়দা ইন ইরাক (AQI) এর পৃষ্ঠপোষকতায়ই এই সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। যদিও আল নুসরাহ ফ্রন্টের নেতা জাওলানী এবং বাগদাদী ছিলেন কেন্দ্রীয় আল-কায়দার অধীন। আইএস গঠনের পরপরই তারা এবারে সিরিয়াতে আল কায়দার শাখা সংগঠন জাবহাত আন নুসরাকে আদেশ দেয় জাবহাত যাতে তার নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডগুলো নিয়ে ইসলামিক স্টেট অফ ইরাকে যোগ দেয়। জাওলানী এই প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানান। স্পষ্ট জানালেন, কেন্দ্রীয় আল কায়দার নির্দেশ ছাড়া জাবহাত আইএস এর সাথে একীভূত হবে না। এবার জাবহাত আন নুসরার অনেক কমান্ডার ও কর্মী (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) জাওলানীকে অমান্য করে আইএস-এ যোগ দেয়। কেন্দ্র থেকে জানানো হয় আইএস এর অপারেশন এরিয়া হবে ইরাক, আর জাবহাতের অপারেশন এরিয়া হবে সিরিয়া। কিন্তু আইএস কেন্দ্রীয় সংগঠন আল-কায়দাকে অমান্য করে জাবাত আন নুসরাকে সাথে নিয়েই খিলাফতের ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালে আন নুসরার আল-কায়দা অংশের সাথে আইএস অংশের সংঘর্ষও হয়। সিরিয়া অঞ্চলে আন নুসরার আল-কায়দা অংশ আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যায়। এখন বর্তমানে আন নুসরাকে আইএস এর মিত্র বলেই ধরা হয়।
এই লেখায় আন নুসরাহ ফ্রন্ট কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা এবার বলার পালা। ইসলামিক স্টেট বিশ্ব রাজনীতির দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়কেই তাদের প্রধান এবং অন্যতম শত্রু বলে দাবি করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একসাথে দুই দুটি পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আসলেই কঠিন। এটা মোটামুটি নিশ্চিত রাশিয়ার সাথে তাদের শত্রুতা অবধারিত। কারণ রাশিয়া সিরিয়ায় শিয়া সমর্থিত সরকার বাসার আল আসাদকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে রাশিয়া অনেকবার প্রকাশ্যে আইএসের সেনা ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরোধী হিসেবে সিরিয়ায় আইএসের অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্টর এবং সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। সৌদি আরব শিয়াদের আধিপত্য যে-কোনো মূল্যে দমন করতে চায়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অর্থ সাহায্য পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা জিহাদিরা এক সময় প্রথমবারের মতো সংগঠিত হয়, যা থেকে পরবর্তী সময়ে আল-কায়দার জন্ম হয়। তৎকালীন আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আল-কায়দা নামক সশস্ত্র সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ'র সহযোগিতায়। আইএস এর জন্ম হয়েছিল আল-কায়দার ইরাকি শাখা হিসেবে। তাদের দাবি সে হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতার পেছনে সৌদি আরবের জড়িত থাকার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়াও, সৌদি আরবকে আইএস'র শত্রু হিসেবে গণ্য করা হলেও আন নুসরাহ ফ্রন্টের সাথে সৌদি আরবের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। আন নুসরাহও হতে পারে আইএস বনাম সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রক্সি মাধ্যম। এ কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষ্য করার মতো তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র (এবং তাদের মিত্র) আসলেই যদি আইএস'র শত্রু হয় তাহলে আইএস'র কাছ থেকে এত পরিমাণ তেল ক্রয় করে কারা? তাদের ছাড়া কোথায় আছে তেলের এত বড় বাজার?
আইএস এবং আল-কায়দার মধ্যে পার্থক্য
এখন আসি আলোচনার তৃতীয় এবং শেষ পর্যায়ে। আল-কায়দা এবং আইএস'র কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কৌশলের পার্থক্যগুলো কোথায়? প্রথমত, আল-কায়দা মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং তাদের এলাকাকে সবসময় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাশ্চাত্য এবং তাদের মিত্রদের প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করে, যাতে তারা এই নির্দিষ্ট অঞ্চলে (মধ্যপ্রাচ্য) তাদের কল্পিত ইসলামিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আল-কায়দার প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। অন্যদিকে আইএস যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের প্রতি কম মনোযোগী। আইএস এর প্রধান মনোযোগ হচ্ছে ইরাক এবং সিরিয়াকে কেন্দ্র করে তাদের ভৌগোলিক আধিপত্য প্রসারিত করা। প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে তাদের অধিকৃত এলাকার উপর একক খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, আল-কায়দার উদ্দেশ্যই হচ্ছে পাশ্চাত্যেকে একটি ভয় এবং অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে রাখা। অন্যদিকে আইএস'র প্রধান উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্ত করা। তৃতীয়ত, শিয়াদেরকে আল-কায়েদা ধর্মদ্রোহী মনে করে, তবে তাদের বিশ্বাস শিয়াদের হত্যা করাটা একটি চরমপন্থা, সম্পদের অপচয় এবং জিহাদি প্রকল্পের জন্য ক্ষতিকর। অর্থাৎ আল-কায়দা সংগঠনটি শিয়াদের খারাপ মনে করলেও তাদের ক্ষতি সাধন করতে রাজি নয়। অন্যদিকে আইএস মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সম্প্রদায় এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরেও আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা শিয়া এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যাকে ইসলামের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে (Purification of Islam)। সাম্প্রতিক সময়ে আইএস তাদের লক্ষ্য অর্জনে আল-কায়দার তুলনায় অনেকটা সফল। তাদের অঞ্চলের উপর সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ, সংগঠিত সৈন্য বাহিনী তাদের সফলতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আল-কায়দা এবং আইএস'র মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্ব দুটি গোষ্ঠীকেই দুর্বল করে তুলেছে।
ব্রিফনোট: স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পরাশক্তিগুলো কর্তৃক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয় আল-কায়দা নেটওয়ার্ক ও তালেবান নামে দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠী → তালেবানদের সাথে ভালো সম্পর্ক আল-কায়দার→কেন্দ্রীয় এই আল-কায়দার শাখা হিসেবে তৈরি হয় আল ‘কায়দা ইন ইরাক' → কেন্দ্রীয় আল-কায়দার সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে 'আল-কায়দা ইন ইরাক' আত্মপ্রকাশ করে 'আইএস' নামে→ আইএস প্রতিষ্ঠার পর সিরিয়ার আন নুসরা ফ্রন্ট আইএস এর সাথে যোগ দেয় → বর্তমানে আবার আন নুসরা ফ্রন্টের কিছু অনুসারী কেন্দ্রীয় আল-কায়দার পক্ষে, আর অধিকাংশ অনুসারী আইএস এর পক্ষে।
যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ
কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী আছে যেগুলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে (By default), কিছু আবার পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তৈরি করা হয় (By design)। প্রশ্ন হচ্ছে- এই গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের যোগানদাতা কে বা কারা? এবং যুক্তরাষ্ট্র কেন এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করার ঘোষণা দেয়? আমেরিকার বক্তব্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার্থে এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে অস্ত্র বিক্রি করা। অস্ত্র কার কাছে বিক্রি করা হয়? এবং অস্ত্র বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ফায়দা কি? যে-কোনো রাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি যারাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয় করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করে। যাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হয় সেই অস্ত্র বিক্রির পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডও অতটা যাচাই-বাছাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অনেক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কিংবা কংগ্রেসও জানে না কাদের কাছে গোপনে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে। ১৯৭০ এর দশকে নিক্সন প্রশাসন সোভিয়েত আগ্রাসন প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশে অস্ত্র পাঠায় যেটা 'Nixon Doctrine' হিসেবে পরিচিত। তখন সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবিলায় সেনাবাহিনী পাঠানোর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ঐসব দেশে শুধু অস্ত্র পাঠাত।
ইরান, ইথিওপিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ইত্যাদি রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ওয়েপনস সেল করা হয়েছিল। ইরানের পাহলভী ডাইনেস্টির কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করা হয়েছিল। তৎকালীন ইরানের কাছে কার্গো প্লেন থেকে শুরু করে সুপারসনিক ইন্টাসেপসন, প্যান্টম বোমার্স, সারফেস টু সারফেস মিসাইল-সহ পনেরো বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সব অস্ত্রই বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে যে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যে ইরানকে Rogue State এর তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যে ইরানকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়া থেকে বিরত রাখতে ছয় জাতীয় সম্মিলিত P5+1 চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেই ইরানের কাছেই কেন অর্ধশতক আগে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত অস্ত্র বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? তখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল সম্পদ নিজের দখলে নিয়ে আসা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সোভিয়েত আধিপত্য হ্রাস করা। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যায়। বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যেসব আধুনিক অস্ত্র বিক্রি করেছিল সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ইরানি বিপ্লবের পর ইরান রাজতন্ত্র থেকে বের হয়ে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে প্রবেশ করে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্র ইরান তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে শুরু করে। যেটাকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে 'Blowback' বা পাল্টা আঘাত।
একই কাহিনি ঘটেছে পানামার ক্ষেত্রেও। পানামাও একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র ছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে বিপুল পরিমাণ মিলিটারি সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করে। কিন্তু ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সরকারকে সরিয়ে সেখানের ক্ষমতা দখল করে নেয় জেনারেল এনুয়েল নরিয়েগা। তখন আমেরিকা পানামাতে আক্রমণ চালালে আমেরিকা থেকে ক্রয় করা অস্ত্র দিয়েই পানামা সেটা প্রতিহত করে। মার্কিন সৈন্যদের মার্কিন অস্ত্রের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হয়েছিল সেখানে। ইরানের মতো পানামাতেও যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রীত অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ব্যাকফায়ার করে। অস্ত্র বিক্রির পূর্বে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই-বাছাই না করার এটাই হচ্ছে ফ্লিপ সাইড। ইরান যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল তখন ইরানের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ইরাকে ক্ষমতায় ছিলেন সাদ্দাম হোসেন। সাদ্দাম ছিলেন প্রচণ্ড ইরান বিরোধী। তখন ইরানকে শায়েস্তা করতে মার্কিন প্রশাসন ইরাকের কাছেও অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা যখন ইরাকে আক্রমণ করে তখন ইরাক আমেরিকা থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্র দিয়েই আমেরিকাকে প্রতিরোধ করে। ১৯৯২ সালে সোমালিয়াতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র মিসাইল ও ট্যাংক পাঠিয়েছিল; কিন্তু সেসব অস্ত্র পরবর্তীতে সোমালিয়ার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে।
আফগান মুজাহিদদের সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে বিপুল অস্ত্র সাপ্লাই দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তালেবানরা সেই অস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। প্রশ্ন হচ্ছে- এই যে বারংবার Blowback বা পাল্টা আঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে তারপরেও কেন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে অস্ত্র বিক্রি করতে আগ্রহী? যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়কৃত সকল অস্ত্র পরবর্তীতে রেজিম পরিবর্তন হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হতে পারে সেটা আমাদের থেকে মার্কিন নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজিস্টরা ভালো করেই জানে। পেন্টাগনও সে বিষয়ে অধিক সতর্ক। প্রশ্ন থেকে যায় তারপরেও কেন যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করছে না? তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোন সিক্রেট উদ্দেশ্য রয়েছে। নাইন-ইলেভেনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৬৭টি দেশের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র বিক্রি করেছে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে এবং মানবাধিকার রক্ষার্থে। ১৬৭টি দেশের মধ্যে অসংখ্য স্বৈরশাসকও রয়েছেন যারা মার্কিন অস্ত্র ক্রয় করেছে। প্রশ্ন হলো মানবাধিকার রক্ষার্থে যদি অস্ত্র বিক্রি করা হয় তাহলে যে-সকল স্বৈরশাসকের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে তারা তো সবাই নিজ দেশে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। তাহলে মানবাধিকার রক্ষা হলো কীভাবে? তাহলে এটা প্রতীয়মান মানবাধিকার রক্ষা করাটাও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য না, শুধু আইওয়াশ মাত্র। উদ্দেশ্যটা আসলে কি? সুদান, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, ডি আর কঙ্গো ইত্যাদি রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রীত অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে নেই কোনো শান্তি, নেই কোনো মানবাধিকার। বর্তমানে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করা অস্ত্র ব্যবহার করছে ইয়েমেন, সিরিয়া ও তিউনিসিয়াতে। তার মানে যুক্তরাষ্ট্র নিজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অস্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধাবস্থা তৈরি করছে। বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে আরও ত্বরান্বিত করছে। মার্কিন মুল্লুকে রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন গত পাঁচ দশকে অস্ত্র বিক্রির পলিসি বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে যে-সকল অস্ত্র বিক্রি করে সেগুলোকে 'War Machine' বলা যায়। তথা যুদ্ধ তৈরির মাধ্যম।
এবার আসি যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্যের জায়গায়। প্রথমত- Economic benefits: নিক্সন থেকে শুরু করে জিমি কার্টার, রিগ্যান, ক্লিনটন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্প, সর্বশেষ বাইডেন সবাই অস্ত্রকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার বানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত- Influence: যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি করা হচ্ছে এবং যে দেশে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে সেই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় থাকে। তৃতীয়ত- Shadow supremacy: অস্ত্র বিক্রির সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শর্ত থাকে। ফলশ্রুতিতে যেসব রাষ্ট্র মার্কিন অস্ত্র ক্রয় করে তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব রাষ্ট্র জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করে না। এখন অস্ত্র বিক্রির এই সমস্যাটি কোথায়? কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসব অস্ত্র রাষ্ট্রের কাছে থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাপ্লাইকৃত এসব অস্ত্র রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনেক সময় অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকদের হাতে চলে যাচ্ছে। সিরিয়াতে আইএস দমনে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র সাপ্লাই দিয়েছিল, কিন্তু সেই অস্ত্রের একটি অংশ ২০১৪ সালে আইএসের হাতে চলে যায়। আইএস টুইট করে ধন্যবাদও জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সরকারের কাছে রপ্তানিকৃত অস্ত্রের একটি অংশ পরবর্তীতে ইয়েমেনিয় আল-কায়দার দখলে চলে যায়। এভাবে দেখা যায় একটি অঞ্চল আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আর রাজনৈতিকভাবে একটি অঞ্চল যতবেশি নৈরাজ্যময় হবে যুক্তরাষ্ট্রও ততবেশি অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে। যতবেশি সেল ততবেশি ফরেইন রিজার্ভ। এইতো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি! এটা কে বুঝবে যে, যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয়কৃত অস্ত্র ব্যবহার করছে তারা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকদের কাছে যে অস্ত্র বিক্রি করছে সে-ই বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য বড় থ্রেট।
Question to think about?
যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দিয়েছিল তখন সেখানে অসংখ্য জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। হোক সেটা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী শক্তি হিসেবে। আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নজর মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে এসেছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে। তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিক এই অঞ্চলে নতুন কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী উত্থানের সম্ভাবনা আছে কি?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Michael, George (2006), The Enemy of My Enemy: The Alarming Convergence of Militant Islam and the Extreme Right, University Press of Kansas
2. Mura, Andrea (2015), The Symbolic Scenarios of Islamism: A Study in Islamic Political Thought, London: Routledge
3. Ahmed, Nafeez Mosaddeq (2005), The War on Truth: 9/11, Disinformation, and the Anatomy of Terrorism, Olive Branch Press
4. Murad, Nadia (2018), The Last Girl, Tim Duggan Books
5. Bergen, Peter (2011), The Longest War: The Enduring Conflict between America and Al-Qaeda, Free Press
6. Mamdani, Mahmood (2004), Good Muslim, Bad Muslim: America, the Cold War, and the Roots of Terror, Pantheon
7. Nance, Malcolm (2016), Defeating ISIS: Who They Are, How They Fight, What They Believe, Skyhorse Publishing
8. Coll, Steve (2004), Ghost Wars: The Secret History of the CIA, Afghanistan, from the Soviet Invasion to September 10, 2001, Penguin Press
9. Friedman, George (2005), America's Secret War: Inside the Hidden Worldwide Struggle Between the United States and Its Enemies, Broadway
10. Gerges, Fawaz A. (2005), The Far Enemy: Why Jihad Went Global, Cambridge University Press,
11. Nance, Malcolm (2014), The Terrorists of Iraq: Inside the Strategy and Tactics of the Iraq Insurgency 2003-2014, CRC Press