📄 সৌদি রাজনীতি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকট
অষ্টাদশ অধ্যায় Theme: Making the Desert Modern
সৌদি রাজনীতি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকট
"The Stone Age didn't end for lack of stone, and the oil age will end long before the world runs out of oil." - Ahmed Zaki Yamani
সূচনা: বর্তমানে সৌদি আরবের সাথে তুরস্কের সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে সৌদির সাথে তুরস্কের ভালো সম্পর্কই-বা কখন ছিল? কখনোই ছিল না। সৌদি-তুর্কি দ্বন্দ্বের পেছনে একটি ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। সৌদি অতীতে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ধর্ম ইসলাম হলেও ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদের কারণে এরা একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র। ধর্ম এক হলেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এদেরকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। সৌদির জনগণ আরব জাতীয়তাবাদে, ইরান পারসিক জাতীয়তাবাদে, তুরস্ক তুর্কি জাতীয়তাবাদে, কুর্দিরা কুর্দি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। সাদ্দাম হুসেন প্রচণ্ড কুর্দি বিরোধী ছিলেন। সাদ্দাম একজন সুন্নি মুসলমান ছিলেন এবং কুর্দিরাও সুন্নি মুসলমান। তাহলে সমস্যাটি ছিল কোথায়? সমস্যাটি ছিল জাতীয়তাবাদে। সাদ্দাম ছিলেন আরব জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আর কুর্দিরা কুর্দি জাতীয়তাবাদে। সৌদি আরব সুন্নি মুসলিম দেশ, তুরস্কও সুন্নি মুসলিম দেশ। তাহলে সমস্যাটি হচ্ছে আরব বনাম তুর্কি জাতীয়তাবাদে। জাতীয়তাবাদের এই সমস্যাটি আজকের না, যার সূচনা অতীতে।
সৌদির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৩২ সালে। অতীতে জাজিরাতুল আরব বা আরব ভূখণ্ড উমাইয়াদের অধীনে ছিল। উমাইয়াদের পরে আসে আব্বাসীয়রা। আব্বাসীয়দের পর ফাতেমীয়রা, তাদের পর মামলুক রাজারা আরবের শাসন করে। সৌদির জনগণ তখন বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। তারপর সৌদি আরব উসমানি খেলাফতের অধীনে চলে যায়। ১৭৪৪ সালে বর্তমান রাজধানী রিয়াদের পাশে 'আদ দারিয়া' নামক ছোট্ট একটি শহর ছিল। সেই শহরের বেদুইন গোত্রপ্রধান ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে সউদ। সউদ তখন আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করেন। তাঁর সহায়তায় উসমানি খিলাফত থেকে আলাদা হয়ে 'দিরিয়া আমিরাত' নামে স্বতন্ত্র একটি ছোট্ট রাজ্য গঠন করেন। সেটিই প্রথম সৌদি রাজ্য। এজন্য বলা হয় ইবনে সউদ সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সউদের মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে আবদুল আজিজ ক্ষমতাসীন হন। আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সউদ বিন আবদুল আজিজ তুর্কিদের থেকে ১৮০৩ সালে মক্কা এবং ১৮০৪ সালে মদিনা দখল করে নেন। পরবর্তীতে এগুলো আবার তুর্কিদের অধীনে চলে যায়। সৌদি আরব বর্তমানে চারটি প্রধান অঞ্চল নিয়ে গঠিত- হেজাজ, নাজাদ, আল আহসা ও আসির। মক্কা ও মদিনা এই নাজাদে অবস্থিত। ১৯০২ সালে আবদুল আজিজ আবদুর রহমান আল সৌদ যুদ্ধের মাধ্যমে পুনরায় নাজাদ দখল করেন।
১৯১৩ সালে তুর্কিদের থেকে আল আহসা দখল করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ উসমানি খেলাফতের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। ১৯৩২ সালে সবগুলো অঞ্চল একত্রিকরণের মাধ্যমে আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠিত হয়। যেটাকে Reunification বলা হয়। উল্লেখ্য, অটোমানরা যখন ইউরোপীয়দের সাথে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় যুদ্ধে লিপ্ত ঠিক সেই মুহূর্তে ব্রিটিশ প্ররোচনায় অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরেই যে বিদ্রোহগুলো হচ্ছিল তন্মধ্যে হিজাজ অঞ্চল (বর্তমানে সৌদি) ছিল অন্যতম। যা অটোমান সাম্রাজ্যের শক্তিমত্তাকে দুর্বল করে দেয়।
সৌদি আরবের সরকার ব্যবস্থা
আয়তনের দিক থেকে এশিয়ার পঞ্চম বৃহৎ রাষ্ট্র সৌদি আরব। মোট ৮টি দেশের সাথে তার সীমান্ত রয়েছে। উত্তরে জর্ডান ও ইরাক, উত্তর-পূর্বে কুয়েত, পূর্বে কাতার, বাহরাইন ও আরব আমিরাত, দক্ষিণ-পূর্বে ওমান, আর পশ্চিমে ইয়েমেন। মুসলামনদের দুটি পবিত্র মসজিদের একটি মসজিদ উল হারাম মক্কায় অবস্থিত, অপরটি মসজিদে নববি মদিনায় অবস্থিত। সেজন্য সৌদি রাজাকে বলা হয় দুটি পবিত্র মসজিদের জিম্মাদার বা Custodian of The Two Holy Mosques। এই দুটি পবিত্র মসজিদের কারণে সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সৌদি আরবের গুরুত্ব অনেক। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মুসলিমকে হজব্রত পালনে সৌদিতে যেতে হয়। তেল-গ্যাসের বিশাল মজুদ রয়েছে সৌদি আরবে। আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ ১৯৩২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত একটানা ২১ বছর সৌদির ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে তথা ১৯৩৩ সালে মার্কিন তেল অনুসন্ধানকারী কোম্পানি 'স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া'র সাথে একটি চুক্তি হয়। দেশটিতে শুরু হয় তেল অনুসন্ধান। অবশেষে ১৯৩৮ সালে সৌদিতে প্রথম তেলের খনির সন্ধান মেলে। তেলের খনি আবিষ্কারের পর রাতারাতি পাল্টে যায় সৌদি আরবের চেহারা।
সৌদি আরব চরম রাজতন্ত্রের (Absolute Monarchy) দেশ। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেশ রাজা শাসন করবে। বংশপরম্পরায় এক রাজার মৃত্যুর পর আরেকজন রাজা হয়। এভাবে বংশ রাজার পদে আসীন হওয়াকে টার্ম হিসেবে Hereditary monarchy বলা হয়। রাজতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় যে-কোনো ধরনের রাজনৈতিক দল, সংগঠন কিংবা জাতীয় নির্বাচন সৌদি আরবে নিষিদ্ধ। বাদশাহ আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর সৌদ বিন আবদুল আজিজ ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ১১ বছর সৌদিকে শাসন করেন। তারপর বংশপরম্পরায় ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ বাদশা হন। তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মোট ১১ বছর সৌদি শাসন করেন। তার শাসনামলে ১৯৭০ সালে মেয়েদের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হয়। তারপর খালিদ বিন আবদুল আজিজ ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মোট ৭ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তারপর ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ ১৯৮২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর সৌদিকে শাসন করেন।
ফাহাদকে সৌদির সর্বশ্রেষ্ঠ বাদশাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। যিনি কিং ফাহাদ হিসেবে অধিক পরিচিত। তার আমলেই ১৯৯২ সালের ৩১ জানুয়ারি নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। মেট ০৯টি অধ্যায় ও ৮৩টি অনুচ্ছেদ এর সমন্বয়ে গঠিত সেই সংবিধানের অপর নাম 'Basic Law of Saudi Arabia'। ব্যাসিক ল হিসেবে প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে বাদশাহ পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। এজন্যই সৌদিকে বলা হয় Islamic Monarchy বা ইসলামিক রাজতন্ত্র। সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৭ম ও ৩৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাজা শরিয়া আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র শাসন করবে। চতুর্থ অধ্যায়ের ২-১তম অনুচ্ছেদে “alms tax” বা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ যাকাতের কথা বলা হয়েছে। সৌদিতে কোনো পার্লামেন্ট নেই। সংবিধানের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৪৫তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একজন ইসলামি বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি প্যানেল থাকবে যারা শরিয়া অনুযায়ী রাষ্ট্রের আইন তৈরি করবে (a panel of Islamic clergy)। ৫৬তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজা একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। অর্থাৎ রাজা হচ্ছেন Head of Government বা সরকার প্রধান এবং তার অধীনে মন্ত্রীরা কাজ করবে। রাজা সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ।
কিং ফাহাদের শাসনামল সৌদি আরবের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৯২ সালের তৈরিকৃত সেই সংবিধান অনুযায়ী এখন পর্যন্ত সৌদি আরব পরিচালিত হচ্ছে। তার আমলে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে সৌদি আরব নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে বা লিডিং পয়েন্টে ছিল। সৌদি আরবের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন থেকে শুরু করে দরিদ্র দেশসমূহে সাহায্য-সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের কারণে বিশ্ব দরবারে দেশটি উঠে আসে নতুন শক্তি হিসেবে। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নানান সংকট, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব পেরিয়ে বাদশাহ ফাহাদের যুগকে নানা দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নয়ন, বিভিন্ন দরিদ্র মুসলিম দেশে শিক্ষা বিস্তার এবং হজ-ওমরাহ পালনকারীদের উদ্দেশ্যে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির ব্যাপক উন্নয়নে তার অবদান ছিল অগ্রগণ্য।
কিং ফাহাদের পর বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট ১০ বছর সৌদি শাসন করেন। তার আমলে নারীদের জোরপূর্বক বিয়ে নিষিদ্ধ হয় এবং প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মন্ত্রী বানানো হয়। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের সময় থেকে মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ ২০১০ সালে আরব বসন্তের সূচনা হয় তিউনিসিয়াতে। আরব দেশগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে এবং শুরু হয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। আরব বসন্তের পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিয়েছিল সৌদি। আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ সৌদি আরবের সরকার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। Crown Prince বা যুবরাজ নামে একটি নতুন পদ তৈরি করেন। এটি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ। King বা রাজার পদবি হচ্ছে এক নম্বরে। আর Crown Prince বা যুবরাজের পদবি হচ্ছে দুই নম্বরে। রাজা তার পছন্দ অনুযায়ী যুবরাজ নিয়োগ দেবেন। রাজার অনুপস্থিতিতে বা অসুস্থতায় যুবরাজ রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। যিনি যুবরাজ হবেন তিনিই রাজার মৃত্যুর পর নতুন রাজা হিসেবে ক্ষমতায় আসীন হবেন। আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের পর ২০১৫ সালে রাজা হিসেবে ক্ষমতায় আসেন সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং এখন অবধি তিনিই ক্ষমতায়। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে তাঁর আমলেই। ক্ষমতায় এসে সালমান বিন আবদুল আজিজ যুবরাজ হিসেবে কাকে নিয়োগ দেবেন সেটা নিয়েই মূলত সংকটের সূচনা।
Heir presumptive (আনুমানিক উত্তরাধিকারী)
এই পরিভাষাটির মানে হলো আনুমানিক উত্তরাধিকারী। বংশপরম্পরায় ক্ষমতায় আসে এমন রাজতন্ত্রে বর্তমান রাজার মৃত্যুর পর পরবর্তী রাজা কে হবেন সেটা মূলত পূর্ব থেকেই অনুমান করা যায়। প্রথমত, বর্তমান রাজা ঠিক করে রাখেন কে পরবর্তী রাজা হবেন। দ্বিতীয়ত, রাজা ঠিক করে না দিয়ে গেলেও রাজার বড় ছেলে কিংবা পরিবারের কোনো সিনিয়র সদস্যই পরবর্তী রাজা হবেন এটাই যেন চিরায়ত নিয়ম। আর এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় Heir presumptive বা আনুমানিক উত্তরাধিকারী। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে, যিনি সম্ভাব্য রাজা হওয়ার কথা তিনি না হয়ে অপ্রত্যাশিত অন্য কেউ রাজা হয়ে যান। ২০১৭ সালে সৌদি আরবের যুবরাজ হওয়ার কথা ছিল মুহাম্মদ বিন নায়েফের। কিন্তু অবশেষে দেখা যায় ক্ষমতার উত্তরাধিকারী নায়েফকে সরিয়ে ক্ষমতায় চলে আসে মুহাম্মদ বিন সালমান। সালমান বিন আবদুল আজিজ তার ভাতিজা নায়েফকে কূটকৌশলে বাদ দিয়ে তার পুত্র মুহাম্মদ বিন সালমানকে ক্ষমতায় বসান। এই জন্য Heir presumptive এই পরিভাষাটি বর্তমানে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তাছাড়াও জাপান ও অস্ট্রিয়াতে এই টার্মটি ব্যবহার হয়।
সৌদির উত্তরসূরি কে হবেন সেটার জন্য ৪৩ সদস্যের একটি কমিটি আছে। আপন ভাই, সৎ ভাই, ভাইয়ের ছেলে, সৎ ভাইয়ের ছেলে, ভাতিজা, চাচাতো ভাই, বোন, বোনের সন্তানদের রাষ্ট্রীয় নানান পদে আসীন করে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। নিয়ম হচ্ছে রাজা ও যুবরাজ পিতা-পুত্র মিলে হতে পারবে না। কিন্তু মুহাম্মদ বিন সালমান তার বাবার শাসনামলে রীতি ভেঙে 'যুবরাজ' নিয়োগ পেয়েছেন। যা সৌদির ইতিহাসে প্রথম।
২০১৭ সালের ২১ জুন ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর মুহাম্মদ বিন সালমান নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সৌদিকে একটি অর্থোডক্স ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে শিফট করে মডারেট ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তর করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। সৌদিকে রক্ষণশীলতার পরিবর্তে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যাপক কর্মকাণ্ড হাতে নেন। প্রশ্ন হচ্ছে- সৌদিকে আধুনিকায়ন করার পেছনে সালমানের উদ্দেশ্য কী? সৌদির অর্থনীতি তেলনির্ভর অনেকটা। কিন্তু বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে। তাই সৌদি যেন 'ডাচ ডিজিসে' আক্রান্ত না হয় সেজন্য পর্যটন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য-সহ ইত্যাদি খাতগুলোতেও জোর দিচ্ছেন সালমান। (ফুটনোট: 'ডাজ ডিজিস' এর মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের রেভিনিউ সংগ্রহে শুধু একটি অর্থনৈতিক খাতের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়া)। তাই তেলের উপর থেকে অধিক পরিমাণে নির্ভরতা কমাতে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন দেশ গড়ার স্বপ্নে 'ভিশন ২০৩০' প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের সাবেক তেলমন্ত্রী আহমেদ জাকি ইয়েমেনির একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, "প্রস্তর যুগ পাথরের অভাবের জন্য শেষ হয়নি কিন্তু তেলের যুগ শেষ হবে পৃথিবীর তেল ফুরিয়ে যাওয়ার অনেক আগেই।" তাই তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে হবে। সৌদিকে আধুনিকায়ন ও মডারেট করলে বিশ্ব থেকে পর্যটকরা আসবে এবং বিনিয়োগ হবে। এতে করে সৌদির পর্যটন খাত অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে। তাই আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চালু হচ্ছে সিনেমা হল, তৈরি হচ্ছে বিকিনি বিচ ইত্যাদি। তাছাড়াও ইরানের সাথে সম্পর্কের অবনতি, কাতারের সাথে দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ইসরায়েলের সাথে পরোক্ষ যোগাযোগ ও সম্পর্ক নরমালাইজেশনের প্রচেষ্টা, ইয়েমেনে সামরিক আগ্রাসন ইত্যাদি নানা বিষয় বৈশ্বিক অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের যে সংকটগুলো আমরা প্রত্যক্ষ করেছি সেখানে সৌদি আরব তেমন কোনো ভূমিকা পালন করেনি, সৌদি যেটা করেছে উল্টো। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করার যে নৈতিক দায়িত্বটি সৌদি আরবের পালনের পরিবর্তে সৌদির ভূমিকা ছিল সেসব সংকট সমাধান করা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট মুসলমান দের বিভিন্ন সমস্যায় এগিয়ে এসেছিল। তথা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট তৈরিতে ভূমিকা ছিল সৌদি এখন সেখানে ব্যর্থ। মিশর, পাকিস্তান, সৌদি, ইরান, তুর্কি এই পাঁচটি দেশকে ইসলামি বিশ্বের 'Big Brother' বলা হয়। পাকিস্তান ও মিশরের বর্তমান অবস্থা নাজুক, দেশ দুটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। পাকিস্তান বর্তমানে ইমেজ সংকটে আছে। সৌদি-ইরান একে অপরের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। তুরস্ক মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তুরস্ক যেন ব্যর্থ হয় সেজন্য হয়তোবা ভবিষ্যতে তুরস্ক বনাম ইরানের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব বাঁধানোর চেষ্টা চালাতে পারে পরাশক্তিগুলো।
GCC ও সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব
Gulf Co-operation Council (GCC) বা উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা হচ্ছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬টি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক সংগঠন। সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৯৮১ সালে এটি গঠিত হয়। রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। জিসিসি এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে; (ক) সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। (খ) আরব দেশগুলোর মধ্যে বর্তমান ঐক্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুসংহত করা। (গ) সদস্য দেশসমূহের মধ্যে একটি একক মুদ্রার প্রচলন করা। (ঘ) বেসরকারি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। (ঙ) উপসাগরীয় অঞ্চল রক্ষায় সম্মিলিত সামরিক বাহিনী গঠন করা। (চ) সদস্য দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত করা ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- জিসিসি এর উদ্দেশ্যগুলো প্রায় আরব লীগের উদ্দেশ্যের সাথে সাদৃশ্যস্বরূপ। জিসিসি এর সদস্যভুক্ত ০৬টি রাষ্ট্রের সবাই আরব লীগের সদস্য। জোটের ভেতরে উপজোট। তাহলে আরব লীগ থাকতে সৌদি কেন GCC গঠন করে? লক্ষ্য করে দেখবেন যে জিসিসির ৬টি রাষ্ট্রই সুন্নি। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হলে শিয়া রাষ্ট্র ইরান সৌদির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব হ্রাস করতে এবং পুরো গালফকে সৌদির প্রভাবাধীনে রাখতে সৌদি আরব সুন্নি রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে জিসিসি গঠন করে। কাতারও তখন কিছুটা সৌদি ঘেঁষা ছিল। সময়টা এখন একুশ শতকের তৃতীয় দশক। বিংশ শতাব্দীতে যে দেশটি পরাধীনতার অধীনে ছিল, একুশ শতকে এসে সে তার প্রভুর দিকে আঙুল তুলে কথা বলছে। সে দেশটি হলো কাতার। সেও এখন বিশ্বের নেতা হতে চায়। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে কাতার এখন বিশ্বে প্রথম। বিশাল অর্থনীতির দেশ হয়ে সে কেন এখন বড় ভাই সৌদির তাঁবেদারি করবে? শুরু হয় কাতার-সৌদি দ্বন্দ্ব।
ফলশ্রুতিতে জিসিসির মধ্যেও আবার উপদল তৈরি হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন একত্রিত হয়ে অবরোধ করে কাতারকে। তাদেরকে সমর্থন দেয় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। আর কাতারকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান ও তুরস্ক। এভাবে প্রথমে জোট থেকে উপজোট (আরব লীগ থেকে জিসিসি), এখন আবার উপজোট থেকে মাইক্রো উপজোট। সৌদি-কাতার সংকট শুরু হয়েছিল মূলত ২০১৭ সালে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি ও সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগে ২০১৭ সালের জুনে কাতারের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় সৌদি সরকার। সৌদির সঙ্গে যোগ দেয় বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর। সম্পর্ক ছিন্নের পাশাপাশি স্থল, নৌ ও আকাশপথে কাতারের সাথে দেশগুলো যোগাযোগেও বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ চার বছর পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সৌদি প্রিন্স দ্বন্দ্ব নিরসনে কাতার ভ্রমণ করেন এবং অবরোধ তুলে নেন। কাতার ছোট দেশ হলেও এবং তার উপর অবরোধ থাকা সত্ত্বেও সে নত হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়ায় কাতার।
কতদিন টিকবে সৌদি ও আরব আমিরাত সম্পর্ক?
সৌদি আরবের সাথে বর্তমানে উদীয়মান শক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক দহরম মহরম। যৌথভাবে তারা অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে দেখার বিষয় এ সম্পর্ক কতদিন টিকে। কেননা সংযুক্ত আরব আমিরাতও বর্তমানে বিশ্বের নেতা হতে চায়, সেও বিশ্বরাজনীতিতে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে চায়। গত দশকে আরব আমিরাত বিশ্ব রাজনীতিতে নীরব থাকলেও এখন সে ইসরায়েল, আমেরিকা, মিশর, মরক্কো ইত্যাদি দেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সে এখন আগ বাড়িয়ে যায়। আফ্রিকার দেশগুলোতে সে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের মধ্যে যে ভালো সম্পর্ক বিদ্যমান- তেল উৎপাদনের কোটা নিয়ে সে সম্পর্কে মাঝেমধ্যেই ছেদ পড়ে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এখন প্রায়ই মতবিরোধ দেখা দেয়। ওপেক প্লাসের সদস্য সৌদি আরব এবং রাশিয়া তেল উৎপাদনের মাত্রা কম রাখার প্রস্তাব দিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তা প্রত্যাখ্যান করে। তেলের উত্তোলন আরও বাড়াতে চায় সংযুক্ত আরব আমিরাত কিন্তু সৌদি তাতে রাজি নয়। এ নিয়ে দুটি দেশের মধ্যে প্রকাশ্য তিক্ত মতভেদ দেখা দিয়েছে এবং বর্তমানে সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করেছে। তাই সৌদি আরব এর সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কতদিন বজায় থাকবে সেটা আগামী দিনগুলো বলে দেবে। ভবিষ্যতে কাতারের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতও সৌদি বলয়ের বাহিরে চলে গেলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদির প্রভাব যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পাবে।
সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের করণীয়
কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি-সহ উপসাগরীয় দেশগুলো বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাথে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ দৃঢ়, অন্যদিকে কাতার ক্রমবর্ধমান জনশক্তির বাজার এবং জ্বালানি আমদানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে বাংলাদেশের অসংখ্য প্রবাসী রয়েছে। দেশগুলো থেকে প্রতিবছর বিশাল অংকের রেমিট্যান্স আসছে। বাংলাদেশ তার জ্বালানির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। তাই এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এমন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে বাংলাদেশকে। অবশেষে বলব শ্রমশক্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানির প্রবাহ ঠিক রাখাটাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মোট ১৮ জন সদস্য 'গালফ শিল্ড-১' নামে সৌদি আরবের সাথে একটি যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। সৌদির সাথে এটাই বাংলাদেশের প্রথম সামরিক মহড়া। যতদূর জানি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অন্য রাষ্ট্রের সাথে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করাকে সাধারণত নিরুৎসাহিত করা হয়। আমরা আশা করছিলাম বাংলাদেশ হয়তোবা সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে সৌদির শ্রমবাজারকে বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য হারে সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য তার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করেনি। তাছাড়াও সৌদি আরব পূর্বে বাংলাদেশ-সহ আফ্রিকার দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে যে পরিমাণ সাহায্য সহযোগিতা করত বর্তমানে তা অনেক কমে এসেছে। রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশ সৌদি থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা পায়নি।
সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের গতিপ্রকৃতি
বিংশ শতাব্দীতে স্নায়ুযুদ্ধ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে। একবিংশ শতাব্দীতে স্নায়ুযুদ্ধ শিফট করছে মধ্যপ্রাচ্যে। সৌদি ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে যে প্রক্সি যুদ্ধটা চলছে সেটা 'Middle Eastern Cold War' নামে পরিচিত। সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের অন্যতম কিছু কারণ হলো:
মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব (Religious Schism)
সৌদি আরব ও ইরান দুটোই Theocratic State বা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সৌদি হলো সুন্নিপ্রধান দেশ, আর ইরান শিয়াপ্রধান। উভয়ই বেশ শক্তিশালী প্রতিবেশি। প্রতিবেশি হওয়া সত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলছে টানাপোড়েন। এই বিরোধের মূলে রয়েছে ধর্ম, রাজনীতি, আঞ্চলিক আধিপত্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো। মধ্যপ্রাচ্যের এই দুটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ এলাকায়। তবে সৌদি আরব ও ইরান কখনো সামরিক যুদ্ধে জড়ায়নি। দেশ দুটির মধ্যে যা হয়ে আসছে, তা Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ (Iran-Iraq War)
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত 'ইরান-ইরাক যুদ্ধ' হয়। যুদ্ধে ইরানের বিপক্ষে গিয়ে সৌদি আরব ইরাকের সুন্নি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে। ১৯৮৪ সালে সৌদির আকাশসীমায় ইরানি বিমান প্রবেশ করেছে, এই দাবি তুলে ইরানের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে সৌদি আরব সরকার। যুদ্ধ শেষ হতে না-হতেই ইরান সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রিয়াদ-তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত ছিল।
আল হেজাজ নিয়ে দ্বন্দ্ব (Hezbollah Al-Hejaz)
'হিজবুল্লাহ আল-হেজাজ' হচ্ছে লেবাননের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যা কি না ১৯৮৭ সালে ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা হয়েছিল। এদের কার্যক্রম প্রায় হিজবুল্লাহ এর মতোই। আল- হেজাজ প্রায়ই সৌদি রাজ পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিত। ১৯৮০ সালের শেষ দিকে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে যখন উত্তেজনা বেড়ে যায় তখন আল হেজাজ সৌদিকে উদ্দেশ্য করে বেশ কয়েকটি বড় বড় হামলা চালায়। ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদিতে লাগাতার আক্রমণ চালালে সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করে। ১৯৮৮ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ইরান। এবার সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করে রিয়াদ।
শীতল যুদ্ধের ধারাবাহিকতা (A continuation of the Cold War)
পারস্যীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব এই অঞ্চলের অন্যদেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যেটাকে টার্ম হিসেবে 'Heartburn' বলা হচ্ছে। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ইত্যাদি দেশগুলোর ইরান ভীতি দুটি কারণে। এক. তারা মনে করছে ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দুই. ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের শিয়াপন্থি হুতি বিদ্রোহীর প্রতিই তাদের বেশি ভয়। তাই কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ইত্যাদি দেশগুলো সৌদি আরবের পক্ষে বা ছায়াতলে। অন্যদিকে কাতার এখন ইরানের সঙ্গে। রিয়াদপন্থি ও তেহরানপন্থি দুটি ধারা তৈরি হয়ে গিয়েছে। তবে তুরস্ক ও রাশিয়া এক্ষেত্রে ভিন্ন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
তুরস্কের মতিগতি কিছুটা প্যারাডক্সিক্যাল। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রাখার নীতি নিয়ে এগুচ্ছে তুরস্ক। তুরস্ক চাচ্ছে দুই দেশের সাথেই একটি ভারসাম্য তৈরি করার জন্য। তবে নানা ইস্যুতে তুরস্ক আবার কিছুটা ইরান পন্থি। আবার দুই একটি বিষয়ে সৌদি পন্থি। যেমন- তুরস্ক ও ইরান উভয় দেশেই কুর্দি বিদ্রোহী রয়েছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দি বিদ্রোহী দমনে ইরান ও তুরস্ক একসাথে কাজ করছে। সিরিয়া ইস্যুতে তুরস্ক আবার ইরান বিরোধী। সেখানে তুরস্ক ও সৌদি আরব উভয়ই বাশার আল আসাদ সরকারের বিরোধী। রাশিয়া আবার হাঁটছে উল্টো গতিতে। সে কাউকে সমর্থন করতে চায় না এবং রাশিয়ার ইচ্ছে উভয়ের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করা। তাই রাশিয়া এখন সৌদি আরব এবং ইরান উভয়েরই মিত্র, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও দু দেশের কাছেই রাশিয়া উন্নত অস্ত্র বিক্রি করেছে। রাশিয়ার আগ্রহ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার। এবার আসি ইসরায়েল নিয়ে। ইরান ও ইসরায়েল হচ্ছে পরস্পরের চরম শত্রু। ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ ইসরায়েলকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেবার কথাও বলেছিলেন। চীন ও উত্তর কোরিয়া এই দুটি রাষ্ট্র ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে।
মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে (Leadership)
প্রথমত, সৌদিকে বলা হয় ইসলাম ধর্মের জন্মভূমি। মক্কা ও মদিনা সৌদি আরবে অবস্থিত। দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের পবিত্র দুটি মসজিদ- মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববি সৌদিতে অবস্থিত। বিশ্বের মুসলমানদের হজব্রতের জন্য সৌদিতে যেতে হয়। তৃতীয়ত, মুসলমানদের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) সৌদি আরবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই তিনটি ঐতিহাসিক কারণে সৌদি আরব নিজেদেরকে মুসলিম বিশ্বের নেতা মনে করে। কিন্তু সৌদি আরবকে নেতা মানতে নারাজ ইরান। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামিক বিপ্লব সৌদি আরবকে প্রথমবারের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। ইরানের দাবি ১৯৭৯ সালে ইসলামি রেভ্যুলেশনের মধ্যে দিয়েও ইরানও একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইরান মনে করছে ইরানিয়ান মডেল মুসলমান দেশগুলোর জন্য কার্যকরী।
ইরাক ইস্যু নিয়ে (Saudi and Iran in Iraq)
ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক ভালো ছিল। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সাদ্দাম উৎখাত হলে ইরাক সৌদির হাতছাড়া হয়ে যায়। সাদ্দাম পরবর্তী শিয়া নেতারা ইরাকের ক্ষমতায় আসেন। তাই বাগদাদের সাথে তেহরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। বাগদাদের সাথে দূরত্ব বাড়ে রিয়াদের। ইরাক বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণে এটা সৌদির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরাক ও সিরিয়ায় সুন্নি জিহাদিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা সুসজ্জিত সেনাবাহিনী রয়েছে সৌদি আরবের কাছে এবং দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক। কিন্তু আঞ্চলিকভাবে ইরান প্রভাব বিস্তার করবে এটা সৌদি আরবের কাছে মেনে নেওয়ার মতো না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা (America's Role in the Saudi-Iran Fault Line)
প্রথমত, সৌদি আরব সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আগে থেকেই তিক্ত। ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA এর সহায়তায় এক অভ্যুত্থানে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৭৯ সালে ইরানিয়ান ইসলামি বিপ্লবের বিরোধিতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সময়ে এসে সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিচ্ছে। যেমন- ইয়েমেনের হুতি, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ইত্যাদি গোষ্ঠীগুলোকে। অন্যদিকে ইরানের দাবি সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের 'চর' (Spy) হয়ে কাজ করছে। তৃতীয়ত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। তাই এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পাশে চায় রিয়াদ। ২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার নেতৃত্বে পরমাণু ইস্যুতে ইরানের সাথে ছয় জাতির 'P5+1' চুক্তি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল সৌদি কে কিন্তু সেটা বেশিদিন স্বস্তি দিতে পারেনি রিয়াদকে। তেহরান এখন তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরো উদ্যেমে বাস্তবায়ন করছে।
আরব বসন্ত ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে (Battle for Supremacy)
২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হলে আরব বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। প্রতিটি দেশে দুটি করে দল দেখা দেয়। সেসব দেশে একটি দল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, আরেকটি দল স্বৈরশাসকদের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সৌদি ও ইরান এটাকে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। সৌদি সমর্থন দিতে থাকে একটি দলকে এবং ইরান সমর্থন দেয় অপর আরেকটি দলকে। আরব বসন্তের পর লেবাননে ইরান-ঘনিষ্ঠ হিজবুল্লাহ সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে পূর্বের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে। সিরিয়াতে ইরান শুরু থেকেই বাশার আল আসাদকে সমর্থন দিয়ে আসছে কিন্তু সৌদি বাশার আল আসাদের উচ্ছেদ চায়। আরব বসন্ত আসাদকে উপড়ে ফেলতে পারেনি। আসাদ এখনো ক্ষমতায়। এখানে ইরান এখন পর্যন্ত জয়ী। ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের সরকার মনসুর হাদি বনাম হুতি বিদ্রোহীদের লড়াই চলছে। সৌদি সমর্থিত মনসুর হাদি ইয়েমেন থেকে পালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত শিয়াপন্থি হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের অনেক অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি ইরান ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে তার নতুন নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে। সেজন্য বলা হচ্ছে, Yemen Has Become Iran's Testing Ground for New Weapon। এভাবে আঞ্চলিক ভাবে ইরান সৌদি থেকে কিছুটা এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে জোট তৈরি করে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ঠেকাতে চাইছে সৌদি। তবে সৌদি একটি জায়গায় সফল। মিশরে ইরান সমর্থিত মুসলিম ব্রাদারহুডের মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। মিশরে বর্তমানে সৌদি সমর্থিত আবদুল ফাত্তাহ সিসি ক্ষমতায়।
তেলের মূল্য নির্ধারণ (Controlling Oil Prices)
তেলের মূল্য নির্ধারণে দুটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারী দেশ সৌদি। সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো এবং রিয়াদে অবস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে লক্ষ্য করে প্রায় সময় হুতি বিদ্রোহীরা হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ সৌদির গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে হামলা চালিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের তেলস্থাপনাগুলো গোটা বিশ্বের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হুতিদের হামলায় এগুলো অনেক সময় নাজুক অবস্থায় পড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে তেলের বাজারে। এসব হামলায় সৌদির তেল উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়, আর তেলের বাজারে দাম বৃদ্ধি পায়। সৌদি আরবের দাবি ইরান হুতিদের সামরিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে সৌদির তেলস্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে। তার সঙ্গে আছে উপসাগরীয় সমুদ্রপথে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইরান তেলবাহী জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। পারস্য উপসাগরে ইরানের বন্দর আব্বাসের নিকটে তেলের ট্যাংকারে যে হামলাগুলো হয় সেগুলোর জন্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীকে দায়ী করে। কিন্তু ইরান সেসব অভিযোগ বরাবরের মতো অস্বীকার করে। ব্রিটিশ পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার 'স্টেনা ইমপারো' ইরান কর্তৃক আটক করা নিয়েও লন্ডন-তেহরান সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল।
শিয়া ধর্মগুরুকে হত্যা
সর্বশেষ ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি সরকার শিয়া ধর্মগুরু শেখ নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর ইরানে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে ইরানি জনগণ হামলা চালায়। উল্লেখ্য, শেখ নিমর হচ্ছেন সৌদি আরবের শিয়া সম্প্রদায়ের একজন জনপ্রিয় নেতা। দূতাবাসে হামলাকে কেন্দ্র করে ইরান ও সৌদির কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে পৌঁছে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বের সমাধান যেকারণে জরুরি:
সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব যতদিন চলমান থাকবে তাতে উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সৌদি আরবের জন্য ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা কেন গুরুত্বপূর্ণ? প্রথমত, ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে সৌদির মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে। ইরানকে বাদ দিয়ে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, হুতিদের আক্রমণে সৌদির সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভয় তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র রাজধানী রিয়াদ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাও নিরাপদ থাকছে না। যার প্রভাব পড়ছে তেলের বাজারে। চতুর্থত, সৌদির সীমান্তে এরকম সশস্ত্র উত্তেজনা সৌদির জন্যও ক্ষতিকর। কারণ এরকম উত্তেজনা বহাল থাকলে বহির্বিশ্ব থেকে পর্যটক হিসেবে কিংবা সৌদিতে বাণিজ্য করতে কেউ ঝুঁকি নিয়ে আসতে চাইবে না। সৌদি বর্তমানে "ভিশন-২০৩০” সামনে রেখে শিল্প বাণিজ্য ও পর্যটননির্ভর যে অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় সেটা সম্ভব হবে না। এজন্য রিয়াদের প্রয়োজন তেহরানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ (De-escalation) করার। পঞ্চমত, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার পর এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কিছুটা কমে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নজর এখন চীনকে মোকাবিলা করা। তাই যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। তাই সৌদি আরবকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কনসার্নে থাকলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সৌদি নিয়ে অতটা উদ্বেগ নেই। তাই নিরাপত্তা রক্ষায় পেন্টাগন থেকে আগের মতো একচেটিয়া সমর্থন পাবে না সৌদি আরব। তাই সৌদির জন্য তেহরানের সাথে যতদ্রুত সম্ভব সম্পর্ক উন্নয়ন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচের দুই শক্তির মধ্যে সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।
সৌদি আরবকে ইরানের কেন প্রয়োজন?
উল্লেখ্য, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি টার্ম হিসেবে 'Saudi-Iranian rapprochement' বলা হয়। প্রথমত, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল। তাই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইরানের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়াটা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হতে পারে তাহলে এই অঞ্চলে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে। বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের 'Bargaining Capability' বাড়বে। ইরান যদি সম্পূর্ণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়ে যায় তখন যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা জবাব দিতে সক্ষম হবে এটা বলে যে, "If you threaten us, we'll respond"। ২০২২ সালের ৩ জানুয়ারি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া) একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে সবাই একযোগে কাজ করবে। অন্য রাষ্ট্র যেন পারমাণবিক শক্তিধর হতে না পারে সেদিকে নজর দেওয়া হবে। ইরানের দাবি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আগে তাদের সকল অস্ত্র ধ্বংস করুক, তখন আমরা বুঝবো তারা সত্যিকারভাবেই নিরস্ত্রীকরণ চাচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হতে অর্থনৈতিকভারে শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। সেই আর্থিক দিক বিবেচনায় সৌদিকে ইরানের পাশে প্রয়োজন। কারণ সৌদি ও ইরান দুটোই তেল সমৃদ্ধ দেশ। দু'টি রাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়ন হলে বৈশ্বিক তেলের মূল্য নির্ধারণ তাদের যৌথ ভূমিকা থাকবে। সেখান থেকে উভয়ই লাভবান হবে। দ্বিতীয়ত, সৌদি- ইরান দ্বন্দ্বের উপর নির্ভর করছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন হলে মধ্যপ্রাচ্যে সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব। সৌদি ও ইরানের মধ্যে যদি সম্পর্ক উন্নয়ন করা সম্ভব হয় তখন মধ্যপ্রাচ্যের কোন রাষ্ট্রকে তাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে হবে না। তাই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে উভয় রাষ্ট্রই চীনের নেতৃত্বে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে এবং জোর দিয়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে চীনের মধ্যস্থতায় এই দুটো দেশ তাদের সাত বছর ধরে চলমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং বৈরিতা ভুলে একে অপরের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক শুরু করতে রাজি হয়েছে। পুনরায় দূতাবাস চালু করা থেকে শুরু করে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে চায় দুটি দেশ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সৌদি-ইরান সমঝোতা কী বার্তা দিচ্ছে বিশ্বকে? মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে এই সমঝোতা কতোটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে?
সৌদি-ইরান সমঝোতার প্রভাব:
এক. চলমান বিভিন্ন সংকটের সমাধানের পথ উন্মুক্ত হবে: সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি- সিরিয়া সম্পর্কে আমরা যে সুবাতাস দেখতে পাচ্ছি সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে কাজ করবে আগামীর দিনগুলোতে। সৌদি-ইরান সমঝোতা বা সৌদি-ইরান রেপ্রোচমেন্ট-একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক উত্থানকে ত্বরান্বিত করবে, অপরদিকে সিরিয়া, ইয়াবেন, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অনেক সংকটের সমাধানের পথ উন্মুক্ত হবে。
দুই, সিরিয়া সংকটের জট খুলবে: ২০১১ সালের প্রথমদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বিরোধী দলগুলোর উপর দমনপীড়ন চালালে এবং সেটার পরিপ্রেক্ষিতে সিরিয়ায় ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আসাদ ও তার সরকারকে আরব লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে ইরান এবং আসাদ বিরোধী শক্তিগুলোকে সৌদি আরব সহযোগিতা করে আসছিল। তবে ২০২৩ সালের মে মাসে সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত আরব লীগের শীর্ষ সম্মেলনে দীর্ঘ ১২ বছর পর সিরিয়াকে আরব লীগের পূর্ণ সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে "Endless War" হিসেবে পরিচিত সিরিয়ার চলমান সংকট অনেকটা সমাধানের দিকে এগুবে বলে মনে করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে সৌদি-ইরান সুসম্পর্কের যে আভাস চীন বিশ্বকে দিয়েছে, সিরিয়াকে পুনরায় আরব লীগে শামিল করা সেটিরই একটি বহিঃপ্রকাশ।
তিন, আন্তর্জাতিক ফোরামে একক স্বার্থে কাজ করার সুযোগ: সৌদি-ইরান সমঝোতা আন্তর্জাতিক ফোরামে দুটি রাষ্ট্রকে এক হয়ে কাজ করতে সাহায্য করবে। ২০২৩ সালের আগস্টে ব্রিকস এর ১৫তম সম্মেলনে সৌদি আরব ও ইরানকে সদস্যপদ দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের পরস্পর বিরোধী তেলসমৃদ্ধ দুটি রাষ্ট্র একই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাই এটি বলা যায় যে, আগামী বিশ্বে ব্রিকস জোটের নেতৃত্বে তেলের রাজনীতি কিংবা Oil Politics গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠবে। আর সেখানে নেতৃত্ব দিবে সৌদি-ইরান।
চার, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক উত্থান: অতীতে চীন বড় ধরনের শান্তিচুক্তি করেনি। তাই এবারের ত্রিপক্ষীয় বিবৃতি যুক্তরাষ্ট্র ও সমগ্র পাশ্চাত্যের জন্য বিস্ময়কর ছিলো। সৌদি-ইরান সমঝোতার মধ্য দিয়ে আরবের রাজনীতিতে চীনের সম্পৃক্ততা আরও গভীর হবে। কারণ সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই চীন নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করে। ২০২১ সালে ইরানের সঙ্গে ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে চীন। এর পরের বছর দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করে। চীনের এই সফলতা বিশ্বরাজনীতিতেও বিস্তৃত হবে। এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এমন দেশকে দেখা গেল যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে আসেনি। চীনের দৃষ্টিভঙ্গি বেশির ভাগ আরব দেশ গ্রহণ করেছে ও স্বাগত জানিয়েছে।
পাঁচ. মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাবে: মধ্যপ্রাচ্যে কথিত শান্তিরক্ষাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিন যে একক কর্তৃত্ব ছিল, তা এখন অনেকটাই খর্ব হবে। এবং এই অঞ্চলের শান্তরক্ষাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ততা কমবে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে আরবদের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আব্রাহাম অ্যাকর্ড বড় ধরনের ধাক্কা খেল। এই অ্যাকর্ডের আওতায় মরক্কো, সুদান, আরব আমিরাত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। সৌদি আরবের অন্যতম নিরাপত্তাঝুঁকি হচ্ছে ইরান। ইরানের সঙ্গে সমঝোতা হলে এবং অস্ত্রের বিষয়ে চীন নিশ্চয়তা দিলে সৌদি আরবেরও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার ও সিরিয়ায় মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি কমানোর পর চীনের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরো ক্ষুণ্ণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক ছিল ইরান-সৌদি বিবাদকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বজায় রাখা। এটা তো করতে পারেইনি, বরং সমঝোতার বিষয়টি আগাম অনুমান করতেও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ছয়. আরব রাষ্ট্রগুলোর দর-কষাকষির সুযোগ বৃদ্ধি: ইরান-চীন-সৌদির ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং আরবদের সুবিধা দেবে। তাছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিকল্পনা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বের হতে চাচ্ছিলো। এই অবস্থায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কার্যকর উপস্থিতি আরব দেশগুলোর জন্য নতুন করে দর-কষাকষির সুযোগ করে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও চীন, সবার সঙ্গেই আরবরা নিজ স্বার্থ নিয়ে কথা বলতে পারবে। কারণ, তাদের হাতে একাধিক বিকল্প সুযোগ থাকছে এখন।
International Mediator হিসেবে চীনের উত্থান মূল্যায়ন:
সৌদি-ইরান ইস্যুতে চীনের এই হস্তক্ষেপের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কিভাবে কাজ করেছে তা বোঝার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে- চীন কেন এব্যাপারে মধ্যস্থতা করার জন্য এগিয়ে এলো? যেখানে চীন সবসময় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে অ-হস্তক্ষেপবাদী পররাষ্ট্রনীতি (Non-interventionist Approach) অনুসরণ করে এসেছে এবং অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সবসময় নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে। সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বে চীনের হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে পিপলস রিপাবলিক অফ চায়নার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং এর মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নতুন শক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। পৃথিবীর সকল পরাশক্তিগুলো যেখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান খুঁজতে ব্যস্ত সেখানে চীনের এই নতুন নীতি কি তবে রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে চীনের হস্তক্ষেপ এর পথকে সুগম করবে? নাকি এই হস্তক্ষেপ আরো বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে চীনের আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার বৃহৎ আকাঙ্ক্ষাকেই প্রকাশ করছে?
চীনের মধ্যস্থতা-নেহাৎই কাকতালীয় কি?
সৌদি-ইরান সমঝোতায় চীনের মধ্যস্থতাকে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা যায়-
প্রথমত, চীন, সৌদি ও GCC এর মধ্যে ঘনিষ্টতা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কয়েকটি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ভ্রমণ করেন। সেখানে সৌদি-চীন উভয় পক্ষ যুগ্মভাবে ঘোষণা করে যে, তারা একে অপরের মূল স্বার্থগুলোকে সমর্থন করবে, একে অপরের জাতীয় সার্ভভৌমত্ব রক্ষায় ও আঞ্চলিক ঐক্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে এবং যৌথভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে রক্ষা করবে।
পাশাপাশি ২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো চীন উপসাগরীয় অঞ্চলের জোট গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) সামিটে অংশগ্রহণ করে। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- চীন এবং জিসিসি এর উচিত বৃহত্তর সংহতির জন্য অংশীদার হওয়া, পারস্পরিক রাজনৈতিক বিশ্বাসকে আরও সুসংহত করা, একে অপরের মূল স্বার্থকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা। তার এই বক্তব্য চীনকে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের রক্ষক এবং জিসিসি সদস্যদের সহযোগিতায় একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো পরাশক্তি কিংবা অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ করার প্রবণতার বিরুদ্ধে শক্তভাবে অবস্থানকারী হিসাবে চিত্রিত করার অভিপ্রায়কে নির্দেশ করে।
দ্বিতীয়ত, চীন-ইরান সম্পর্ক উন্নয়ন।
শি জিন পিং এর রিয়াদ সফরের পর দ্বিতীয় যে ঘটনাটি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা হলো-২০২৩ এর ফেব্রুয়ারী মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির বেইজিং সফর, যা গত দুই দশকের মধ্যে চীনে ইরানের কোনো নেতার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। রাইসির সাথে আলোচনায়, শি জিন পিং ইরানের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যান্য দেশের হস্তক্ষেপ প্রতিহত করে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে বজায় রাখতে চীন বহিরাগত শক্তির বিরোধিতা করে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরানের প্রতি চীনের সহযোগিতার মনোভাব জাহির করেন। তাদের আলোচনার তিনটি মূল দিক মূলত সৌদি-ইরান চুক্তির মূল নীতিরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে:
প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে সক্রিয়ভাবে সম্পর্ক উন্নত করতে ইরানের অভিপ্রায়।
প্রতিবেশীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক অর্জনের জন্য আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিরোধ সমাধানে চীনের সমর্থন।
প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে গঠনমূলক ভূমিকা পালনে চীনের আগ্রহ।
লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, চীন বৈশ্বিক অঞ্চলে Mediator বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পূর্বে কখনো এগিয়ে আসেনি। যেটা করেছিলো দ্বন্দ্বরত যেকোনো একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে। অনেকক্ষেত্রে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইস্যুগুলো চীন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে তার বিনিয়োগের প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য। কিন্তু একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে চীন নিজেকে অনেকটা ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে। একক হেজিমন হয়ে উঠার উদ্দেশ্যে চীন Pragmatic Approach এ এগুচ্ছে। US-led Global Order কে পরিবর্তন করে বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণে চীন এখন সামনের কাতারে থাকতে চাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় চীন খুবই কৌশলে যে দুটি কাজ করছে তা হলো-
এক. আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে চীন প্রথমে দ্বন্দ্বরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলাদা আলাদা সম্পর্ক উন্নয়ন করার চেষ্টা করে। তারপর মধ্যস্থতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।
দুই. চীন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে যে, দ্বন্দ্বরত রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাইনা, এখানে বৈশ্বিক কোন রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও সমর্থন করি না। চীন চাচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ না করার মাধ্যমে মধ্যস্থতায় যেতে। যেমনটি আমরা দেখলাম সৌদি-ইরানের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ সৌদি এবং ইরান উভয়ের সাথেই সমঝোতার ক্ষেত্রগুলির মধ্যে চীন বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছে, বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ ব্যাতীত নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান করার বিষয়টিতে।
সৌদি-ইরান সমঝোতা এই সময়ের প্রেক্ষাপটে চীনের ভূ-রাজনৈতিক শক্তি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন তো করছেই তার সাথে শি জিনপিং এর তৃতীয় মেয়াদে চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে টিকে থাকার ভীতকে শক্তিশালী করছে, যেহেতু এই চুক্তির মাধ্যমে তিনি আবারও একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। চীন মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালনের মাধ্যমে অনেকটা তাদের নেগোসিয়েশন স্কিল পুরো পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে ভবিষ্যতে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের মত বড় মাপের দ্বন্দ্ব সমাধানে নিজের সক্ষমতা জাহির করার জন্য। ২০২৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী চীন অন্যান্য দেশেগুলোর বিপরীতে "Political Settlement of the Ukraine Crisis" বা "ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক নিষ্পত্তি" সূচক একটি পজিশন পেপার ইস্যু করে এবং এতে তাদের আর্গুমেন্ট ছিল যে "সংলাপ এবং আলোচনাই ইউক্রেন সংকটের একমাত্র কার্যকর সমাধান। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় চীন একটি 'Constructive Actor' হিসেবে নিজের ভূমিকা নিশ্চিত করতে চীন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, বেইজিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রধান অপরাধী হিসাবে দায়ী করেছে এবং বলার চেষ্টা করছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে উস্কে দিয়ে আগুনে ঘি ঢালার কাজটিও যুক্তরাষ্ট্রই করেছে যা বিশ্বের ক্ষমতাধর পরাশক্তি হিসেবে নিতান্তই "দায়িত্বজ্ঞানহীন (irresponsible) এবং অনৈতিক (immoral)" আচরণ। এবং সেইসাথে আনুষ্ঠানিকভাবে "US Hegemony and its Perils," (মার্কিন আধিপত্য এবং এর ধ্বংসাত্বক প্রভাব) বিষয়ক গবেষণাপত্র ইস্যু করে চীন বলার চেষ্টা করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশেগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য এর চেয়েও বেশি সাহসিকতার সাথে কাজ করেছে"।
এখানে লক্ষ করার বিষয় হল, বেইজিং ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতাকে 'হস্তক্ষেপ' বা Intervention বলে অভিহিত করলেও, 'ভাল অফিস দেওয়ার' অজুহাতে 'অ-হস্তক্ষেপ' হিসেবে নিজের ভূমিকাকে রক্ষা করে। তবে মজার ব্যাপার হলো চীন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে ‘হস্তক্ষেপ’ বলে আখ্যায়িত করলেও নিজেদের মধ্যস্থতাকে 'গুড অফিসেস' (good offices) প্রদানের অজুহাতে 'অ-হস্তক্ষেপ বলে তুলে ধরছে। তবুও, রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় চীনের আগ্রহ কোনো অর্থেই পরার্থপর নয়। বরং, এটি সম্পূর্ণই চীনের দূরদর্শী পরিকল্পনার ফল।
Question to think about?
সৌদি ও ইরান কি পারবে নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব ভুলে একটি স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য উপহার দিতে? মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চীনের কূটনৈতিক উত্থান আসলেই কি ইতিবাচক?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Al-Rasheed, Madawi (2018), Salman's Legacy: The Dilemmas of a New Era in Saudi Arabia, Oxford University Press
2. Koelbl, Susanne (2020), Behind the Kingdom's Veil: Inside the New Saudi Arabia Under Crown Prince Mohammed Bin Salman, Mango
3. Hiro, Dilip (2019), Cold War in the Islamic World: Saudi Arabia, Iran and the Struggle for Supremacy, Oxford University Press
4. Mabon, Simon (2015), Saudi Arabia and Iran: Power and Rivalry in the Middle East, I. B. Tauris
5. Hope, Bradley and Scheck, Justin (2020), Blood and Oil: Mohammed Bin Salman's Ruthless Quest for Global Power
6. Wynbrandt, James and Fawaz A. Gerges. (2010), A Brief History of Saudi Arabia
7. Bowen, Wayne H. (2007), The History of Saudi Arabia, The Greenwood Histories of the Modern Nations
📄 আধুনিক ইরান: সংকট ও সম্ভাবনা
ঊনবিংশ অধ্যায় Theme: The Persian Puzzle
আধুনিক ইরান: সংকট ও সম্ভাবনা
"If all of you gather and also invite your ancestors from hell– you will not be able to stop the Iranian nation.” -Mahmoud Ahmadinejad
একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল ইরানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিন্তু বর্তমানে এই যুক্তরাষ্ট্রই ইরানের সবচেয়ে বড় শত্রু। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- পশ্চিমারা কীভাবে এবং কেন ইরানের শত্রুতে পরিণত হলো? কীভাবে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ইরানের আবির্ভাব হয়েছে? আজকের আধুনিক ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে ইরানের যে শক্তিশালী অবস্থান তার পেছনে রয়েছে বিশাল এক ইতিহাস। দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে চলমান রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আধুনিক ইরানের আর্বিভাব হয়েছিল যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তার নাম 'ইরানিয়ান রেভ্যুলেশন'। এই ইসলামি বিপ্লব পরিবর্তন করে দিয়েছিল ইরানের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো। ইরানের এই ইসলামি বিপ্লবকে ফরাসি ও বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তাই এই অধ্যায়ে সংক্ষেপে ইরানের দীর্ঘ ইতিহাস, তাদের ঐতিহাসিক বিপ্লবের আদ্যোপান্ত এবং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।
রোড টু ইরানিয়ান রেভ্যুলেশন
আধুনিক বিশ্বের সূচনালগ্নে তিনটি শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে শাসন করেছিল। এই তিনটি সাম্রাজ্য হলো অটোমান, সাফাভিদ ও মোগল সাম্রাজ্য। তাই এই তিনটি সাম্রাজ্যকে একসাথে 'বারুদ সাম্রাজ্য' বা 'Gunpowder Empires' বলা হয়। ১৯৩৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত বহির্বিশ্বে ইরান "পারস্য” নামে পরিচিত ছিল। এই পারস্য বা ইরানকে দুইশো বছরেরও অধিক সময় ধরে শাসন করেছিল সাফাভিদ রাজবংশ। এই রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন প্রথম ইসমাইল। প্রথম ইসমাইল 'দ্বাদশী শিয়া মতবাদকে' ইরানের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সাফাভিদ রাজবংশের পর ইরানকে শাসন করেছিল কাজার রাজবংশ। কাজার রাজবংশ ১৭৮৫ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ইরানকে শাসন করেছিল। কাজার রাজবংশের শাসনামলে ১৯০৬ সালে কাজার রাজবংশের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের একটি সশস্ত্র বিপ্লব হয়েছিল। সেই বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের জনগণ কাজার রাজবংশকে একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং সেই সংবিধান মেনে দেশ শাসন করতে বাধ্য করে। তাছাড়া ১৯০৬ সালের সেই বিপ্লবের আরও দুটি বড় সাফল্য হলো ইরানে একটি আইনসভা প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বহাল রেখেই সংখ্যালঘুদের অধিকার সুসংহত করা। তবে শেষ পর্যন্ত কাজার রাজবংশের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের এই বিপ্লবটি ব্যর্থ হয়।
কারণ কাজার রাজবংশের শাসকরাই ধর্মীয় নেতাদেরকে (উলামাদের) রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান করেছিল। ফলস্বরূপ প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতারা জনগণের আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরপর এই কাজার রাজবংশের আমলেই ইরান-সহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে অল্পকিছু তেলের খনি আবিষ্কার হয়। তখন মধ্যপ্রাচ্যের এসব তেলের খনিগুলো দখল করার জন্য ব্রিটিশ, ফ্রান্স, আমেরিকা ইত্যাদি পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এমনকি তেলের বাজার নিজেদের দখলে নিতে ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠা করে ‘অ্যাংলো ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি', যা পরবর্তীতে ‘ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম' নাম ধারণ করে। ব্রিটিশদের এই কোম্পানি মূলত পরিচালিত হতো ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক। তখন ব্রিটিশরা ইরানের তেলের খনি দখল করতে কাজার রাজবংশের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র আঁটে।
১. কাজার রাজবংশের পতন : সময়টি ১৯২৫ সাল। তখন ইরানে কাজার রাজবংশের শাসন চলছে। হঠাৎ ব্রিটিশ সহায়তায় সেখানে সেই কাজার রাজবংশের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান হলো। সেই অভ্যুত্থানে কাজার রাজবংশের শেষ শাহ আহমদ শাহ কাজারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ক্ষমতায় বসানো হয় ব্রিটিশ অনুগত রেজা শাহ পাহলভীকে।
২. পাহলভী রাজবংশের উত্থান : কাজার রাজবংশের পতনের পর ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর নেতৃত্বে পাহলভী রাজবংশের শাসন শুরু হয়। পাহলভী রাজবংশ ছিল ব্রিটিশদের অনুগত। রেজা শাহ দেশের নাম “পারস্য” থেকে “ইরান” নামকরণ করেন। রেজা শাহ পশ্চিমাদের অনুকরণে ইরানকে ধর্মীয় রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চালান। তাই পশ্চিমারা তাকে ইরানের আতাতুর্ক বলে অভিহিত করেন। কিন্তু রেজা শাহ দেশের উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেননি। অধিক পরিমাণে পশ্চিমাপন্থি এবং সেকুলার মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে ইরানের জনগণ এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতারা রেজা শাহ এর প্রতি অসন্তুষ্ট হতে থাকে। ফলে ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রেজা শাহ পদত্যাগ করেন। রেজা শাহ পাহলভী ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন।
৩. ইরানে আবিষ্কৃত হয় তেলের খনি : রেজা শাহ পাহলভীর পর ১৯৪১ সালে ইরানের শাসক হিসেবে সিংহাসনে বসেন তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভী। তার শাসনামলেই ইরানের ভূখণ্ডে প্রচুর তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। মোহাম্মদ রেজা পাহলভী তেলের মতো ইরানের এসব মূল্যবান সম্পদ মার্কিন ও ব্রিটিশদের মালিকানায় রেখে বিলাসবহুল জীবন যাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
৪. তেলের খনিগুলো চলে যায় ব্রিটিশদের মালিকানায় : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, তেল সম্পদ ইরানের প্রধান সম্পদের একটিতে পরিণত হয়। ইরানের ভূখণ্ডে এত তেল সম্পদ আবিষ্কারের মূলে ছিল ব্রিটিশ বিভিন্ন কোম্পানিগুলো। যার ফলে যত তেলের খনি আবিষ্কার হয়েছে, তার অধিকাংশের মালিকানা ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। বিনিময়ে ইরানের পাহলভী বংশের শাসকগোষ্ঠীও ব্রিটিশদের থেকে প্রচুর পরিমাণে সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করতে থাকে। মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ও তার পরিবার অত্যন্ত বিলাসবহুল হয়ে উঠেছিলেন।
৫. ইরানের এই বেহাল পরিস্থিতিতে আবির্ভাব হয় জাতীয়তাবাদী নেতা মোসাদ্দেকের (১৯৫১-১৯৫৩) : তখন ইরানের এমন বেহাল পরিস্থিতিতে জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক নেতার আবির্ভাব ঘটে। নাম তার মোহাম্মদ মোসাদ্দেক (Mohammad Mosaddegh)। তিনি ছিলেন কিছুটা কমিউনিস্ট ভাবধারার। মোসাদ্দেক তখন মোহাম্মদ রেজার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে চেষ্টা করে। মোসাদ্দেকের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি থেকে তেলের মালিকানা মুক্ত করার মাধ্যমে তেল সম্পদ জাতীয়করণের (nationalization of the Iranian oil industry)। তার এমন জাতীয়তাবাদী ভাবধারা ইরানি জনগণকে খুব দ্রুত আকর্ষণ করে। ফলে পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ১৯৫১ সালের ২৮ এপ্রিল মোসাদ্দেক ইরানের প্রধানমন্ত্রী হন।
৬. মোসাদ্দেকের ক্ষমতা গ্রহণে বিপদে পড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য : মোসাদ্দেকের জয়ের ফলে হুমকির মুখে পড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ইরান থেকে তাদের স্বল্প দামে তেল আমদানি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রমে পৌঁছায়। মোসাদ্দেকের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণ করলে তেল রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে প্রচুর অর্থ গুনতে হয়। মোসাদ্দেকের উত্থানের কারণে এই দুটি রাষ্ট্রের জন্য ইরানের তেল হাতছাড়া হয়ে যায়। তাই মোসাদ্দেকের এ জয় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি তৎকালীন ক্ষমতাশালী যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্রুম্যান।
৭. মোসাদ্দেককে হটাতে নীল নকশা তৈরি করে সিআইএ ও এসআইএস : ফলস্বরূপ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা SIS ইরানে একটি সেনা বিপ্লবের নীল নকশা তৈরি করে। যার নাম দেওয়া হয় 'অপারেশন এজক্স' (Operation Ajax)। এই অপারেশন এজক্সকে আবার TPAJAX Project বা Operation Boot ও বলা হয়। CIA ও SIS লন্ডনে বসে অপারেশন 'এজক্স' এর নীল নকশাটি তৈরি করেছিল। যার ফলশ্রুতিতে কয়েকদিনের মধ্যেই ইরানে মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে এক সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ১৯৫৩ সালে ঘটে যাওয়া এই অভ্যুত্থানটি “1953 Iranian coup d'état" নামে পরিচিত। তারপর সেনাপতি ফজলুল্লাহ জাহেদী মোসাদ্দেককে পদত্যাগ করিয়ে নিজে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখনো মূল শাসন ক্ষমতা ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর হাতেই। অবশেষে মোসাদ্দেককে আটক করা হলো।
৮. যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ইরানের ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে আসে মোহাম্মদ রেজা : মোসাদ্দেকের আটকের মধ্যে দিয়ে ইরানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একরকম স্থগিত হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে, সেনা অভ্যুত্থানের পরদিনই, সেনাবাহিনীতে আরেকটি কাউন্টার অভ্যুত্থান হয় এবং সেই কাউন্টার অভ্যুত্থানে মোসাদ্দেককে উদ্ধার করা হয়। মোহাম্মদ রেজা পাহলভী তখন ইতালিতে পালিয়ে যায়। তখনো CIA ও SIS এর পরিকল্পনা অনুযায়ী আবারো অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। মাত্র দু'দিন পরেই আবারো সেনাবাহিনীতে বিপরীত অভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম হয় CIA ও SIS। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ইতালি থেকে আবার ফিরে আসে ইরানে। এভাবে পশ্চিমা বিশ্বের সহযোগিতায় ইরানে মোহাম্মদ রেজার শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, মোহাম্মদ রেজার শাসনামলে ইরানে প্রায় ২৮ জনের মতো প্রধানমন্ত্রীর অদলবদল হয়েছে। ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের CIA এর সহযোগিতায় মোহাম্মদ রেজা ইরানে "সাভাক" (SAVAK) নামে একটি গোপন পুলিশ ফোর্স গঠন করেন। এই সাভাকের কাজ ছিল বিরুদ্ধ মত দমন করা। যারাই শাহ রাজবংশের বিরুদ্ধে কিছু বলত তাদেরকে এই পুলিশ ফোর্স গোপনে আটক করে জেলে বন্দি করত।
৯. মোহাম্মদ রেজার হাত ধরে ইরানে প্রবেশ করে পশ্চিমা সংস্কৃতি : এভাবে পরপর কয়েকটি অভ্যুত্থানের কারণে শাহ বংশের ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই মোহাম্মদ রেজা ইরানের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখার মাধ্যমে শাহ বংশের প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা করেন। কিন্তু একইসাথে মোহাম্মদ রেজা পুরোপুরিভাবে হয়ে উঠেছিলেন পশ্চিম সংস্কৃতি ভাবধারার। সে-সময় ধীরে ধীরে পশ্চিমা সংস্কৃতি ইরানের আচার-আচরণ, অভ্যাস এসবে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে মুসলিম ভাবধারার ইরান যেরকম হয়ে উঠেছিল তা ছিল বিভীষিকাময়।
১০. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানায় ইরানের জনগণ রেজার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে: ইরানি জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরমভাবে আঘাত হানতে শুরু করে মোহাম্মদ রেজা ও তার পরিবার। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সকল ধরনের অনুষ্ঠানে পশ্চিমা নিয়মনীতি মেনে চলা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রাধান্য বৃদ্ধি পেলে ইরানের মুসলমানরা তার প্রতিবাদ করতে আবার রাস্তায় ফিরে আসে পাহলভীর বিরুদ্ধে। এমনকি ১৯৭৫ সালে যখন মোহাম্মদ রেজা ইরানের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন তখন জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। রাজনৈতিক নির্যাতন, সংবাদপত্রের উপর কঠোর বিধিনিষেধ, বিরুদ্ধমতকে দমন করা, আইন শৃঙ্খলার সার্বিক অবনতি, রাজনৈতিক হত্যা ও গুম ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ইরানি সাধারণ মানুষের মাঝে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন শাহ।
১১. আবির্ভাব হলো আয়াতুল্লাহ খোমেনীর: এমন সময় ইরান থেকে নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর পুনরায় আবির্ভাব ঘটে। এক সময়ে ইরানের এক স্বনামধন্য মসজিদের ইমাম ছিলেন খোমেনী। রেজা পাহলভীর পশ্চিমা নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় ১৯৬৩ সালে 'হোয়াইট রিভ্যুলেশন' এর মাধ্যমে খোমেনীকে গ্রেপ্তার করেছিল মোহাম্মদ রেজা। পরবর্তীতে খোমেনীকে নির্বাসনে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘ পনেরো বছর নির্বাসনে থাকার পর খোমেনী আবার ইরানে ফিরে আসেন রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে বিপ্লবের ডাক দিয়ে। ১৯৭৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের তেহরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনী রেজা পাহলভীর বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবের ডাক দেন।
১২. আন্দোলন দমাতে নির্বিচারে গুলি চালায় মোহাম্মদ রেজার বাহিনী: রেজা শাহ পাহলভী ভাবতেই পারেনি বিপ্লব এমন আকার ধারণ করতে পারে। আয়াতুল্লাহ খোমেনী যেদিন নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন সেই দিনটি ছিল শুক্রবার। সেদিন জুমার নামাজের পর তেহরানে একত্রিত হয় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ মানুষ। খোমেনী শিয়া মতাবলম্বী হলেও এই সমাবেশে শিয়া সুন্নি সকলে পাহলভীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে জড় হয় তেহরানে। পাহলভী দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিশাল জনসমাবেশকে প্রতিহত করতে পাহলভীর বাহিনী নির্বিচারে গুলি শুরু করে বিপ্লবীদের উপর। এতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে ইরানের ইতিহাসে দিনটি 'ব্লাক ফ্রাইডে' হিসেবে পরিচিত।
১৩. বিপ্লবের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকে আয়াতুল্লাহ খোমেনী: সেদিনের মতো শাহ বিপ্লবীদের দমন করতে সক্ষম হন। প্রাথমিকভাবে বিপলব স্তিমিত হয়ে যায়। সম্পর্ণ ইরানে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করতে শুরু করে। আয়াতুল্লাহ খোমেনী অভ্যন্তরে চূড়ান্ত বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। দীর্ঘকালের চলমান রাজতন্ত্রের অবসান করার পক্ষে, ইরানে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিপক্ষে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রভাব মুক্ত করে ইরানকে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র তৈরির পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে থাকেন খোমেনী। মোহাম্মদ রেজা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন খোমেনীর নেতৃত্বে তার বিরুদ্ধে বিপ্লব আর সম্ভব নয় কিন্তু খোমেনী গোপনে ৩ মাস অভ্যন্তরীণ প্রচারণা চালান। সে সময় মোহাম্মদ রেজা খোমেনীকে দমন করতে ও তাকে আবার গ্রেপ্তার করতে প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু সক্ষম হয়নি। কারণ খোমেনী তখন ইরান ছেড়ে প্যারিসের একটি গ্রামে অবস্থান নেন।
১৪. সূচনা হলো ইরানি বিপ্লবের তারপর ১৬ জানুয়ারি ১৯৭৯। আয়াতুল্লাহ খোমেনী আবার মোহাম্মদ রেজার বিরুদ্ধে এক গণ অভ্যুত্থানের ডাক দেন। ইতিহাসে এমন গণ অভ্যুত্থানের খুব একটি নজির নেই। লক্ষ লক্ষ জনতা ইরানের রাস্তায় চলে আসে। মোহাম্মদ রেজা ও তার সেনাবাহিনী এদের দমন করতে চেষ্টা করেন, কিন্তু সেনাবাহিনীর পক্ষে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
১৫. দেশ ছেড়ে পালায় মোহাম্মদ রেজা: মোহাম্মদ রেজা জনবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শাপর বখতিয়ারকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ঘোষণা করেন। মোহাম্মদ রেজার বন্ধুপ্রিয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও তখন তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। মোহাম্মদ রেজা আশ্রয়ের জন্য এদেশ ওদেশ করতে থাকে। ইতালিতে আশ্রয় লইলেও তারা ফেরত দেয় তাকে। পরবর্তীতে মোহাম্মদ রেজা মিশরে আশ্রয় নেন। মিশরে আশ্রিত অবস্থায় ৬০ বছর বয়সে রেজা শাহ পাহলভীর মৃত্যু ঘটে।
১৬. ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরলেন খোমেনী : ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসেই নির্বাসিত খোমেনীকে দেশে ফেরার অনুমতি দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান শাপর বখতিয়ার। ১৫ বছর নির্বাসন কাটিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন খোমেনী। সেই সময় বিমানবন্দরে লাখো লোক তাঁকে স্বাগত জানান।
১৭. বিপ্লব দিবস : ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে শাহের ক্ষমতাসীন প্রশাসনকে হটানো হয়। সেই সময় ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা হিসেবে প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন খোমেনী। এরপর থেকেই ১১ ফেব্রুয়ারিকে ইরানের বিপ্লব দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
১৮. ইসলামিক প্রজাতন্ত্র : ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের মাত্র দুই মাস পর ৩০ মার্চ দেশটিতে এক ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটের মাধ্যমে ইরানের জনগণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেয়। সেই সময় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ৯৮.২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এরপর ১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ইরানের শাসনকাঠামো ও গণতন্ত্র বিভ্রাট
কিছু প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। কেন ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো এত জটিল? ইরানকে কেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মানতে নারাজ পশ্চিমা বিশ্ব? কেন ইরানকে Rogue State বলা হয়? ২০২১ সালের ১৮ জুন ইরানের ১৩তম প্রেসিডেনসিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি চার বছর পরপর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বোঝার জন্য নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে পুরো ক্ষমতার কাঠামোটি আমাদের জানা প্রয়োজন। উপরের আলোচনায় আমরা দেখেছি ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়। যেটা ইরানকে পাশ্চাত্যপন্থি দেশ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে এবং পরিবর্তন করে দেয় ইরানের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো। তাই ইরানের এই ইসলামি বিপ্লবকে ফরাসি ও বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের শাসন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসে। যেখানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী দেওয়া হয় সুপ্রিম লিডারকে। ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত মাত্র দুইজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন। একজন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী। যিনি ১০ বছর ইরানকে শাসন করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর সুপ্রিম লিডার হন আলি খামেনি। এই আলি খোমেনী ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই দশক ধরে দেশটির ক্ষমতার আছেন। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো একটু জটিল। তাই সহজে বোঝার জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দিক থেকে ইরানের সরকার ব্যবস্থাটি পর্যায়ক্রমে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
০১. সুপ্রিম লিডার
• বর্তমান সুপ্রিম লিডার হচ্ছেন আলি খোমেনী। উনি ইরানের ধর্মীয় ও সর্বোচ্চ নেতা। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী ‘সুপ্রিম লিডার’ হবেন ইরানের সকল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিনির্ধারক।
• দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান-সহ যাবতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে দেখাশুনা করার দায়িত্ব তার।
• কোনো রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ বা শান্তি ঘোষণা করার ক্ষমতা শুধু সুপ্রিম লিডারের হাতে।
• বিচার বিভাগের নিয়োগ বা বহিষ্কার সম্পূর্ণরূপে এই সুপ্রিম লিডারের হাতে।
• শাসন কাঠামোর পাঁচ নম্বরে থাকা কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্সও নিয়োগ দিয়ে থাকেন তিনি।
০২. ইরানের প্রেসিডেন্ট
• প্রেসিডেন্টের পদটি ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর পদ। যদিও দেশটির সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় কিছুটা লাগাম টানা আছে। কারণ প্রেসিডেন্টকে চলতে হয় সুপ্রিম লিডারের অধীনে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন ইব্রাহিম রাইসি।
• প্রেসিডেন্ট মূলত সরকার প্রধান। তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ করেন।
• প্রেসিডেন্টের অধীনে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যা ২২ জন।
০৩. ইরানের পার্লামেন্ট
ক্ষমতার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট। পার্লামেন্ট এককক্ষ বিশিষ্ট। পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ২৯০ জন। যারা জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
• পার্লামেন্ট সাধারণত খসড়া আইন তৈরি করে, আন্তর্জাতিক নানা চুক্তির অনুমোদন দেয় এবং বাজেট নির্ধারণ করে।
• পার্লামেন্টে পাশ হওয়া আইন শরিয়া আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না বা সাংঘর্ষিক কি না তা যাচাই করে থাকে কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্স।
০৪. অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট
তারপর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট। জনগণের ভোটে নির্বাচিত ৮৬ জন ধর্মীয় নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট গঠন করা হয়, যাদের মেয়াদ আট বছর।
• অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট বছরে মাত্র একবার এক সপ্তাহের জন্য আলোচনায় বসেন।
• এই পর্ষদ থেকেই র্যাংক অনুযায়ী সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করা হয় এবং বাকিরা তাকে পর্যায়ক্রমে সম্মতি দেন। সুপ্রিম লিডারের সঙ্গে এই পর্ষদের মতপার্থক্য হওয়ার ঘটনা এখনো ঘটেনি।
০৫. কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্স
ক্ষমতার দিক থেকে কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্সের অবস্থান পঞ্চম। মোট ১২ জন আইন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্স গঠন করা হয়।
এই বারো জনের মধ্যে ছয়জনকে নিয়োগ দেন সুপ্রিম লিডার। আর প্রধান বিচারপতি বাকি ছয়জনকে মনোনয়ন দেন।
সুপ্রিম লিডার ও প্রধান বিচারপতি কর্তৃক কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্সের এই ১২ জন সদস্যকে পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়।
পার্লামেন্টে পাশ হওয়া কোনো আইন কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্স চাইলে পুনঃপর্যবেক্ষণের জন্য ফেরত পাঠাতে পারে।
নির্বাচনের সময় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীও তারা ঠিক করে দেন।
০৬. এক্সপিডিসি কাউন্সিল
গার্ডিয়ান্স কাউন্সিলের পর এক্সপিডিসি কাউন্সিলের অবস্থান। ইরানের সংবিধানের ১১২তম আর্টিকেলে উল্লিখিত এটা এক ধরনের প্রশাসনিক অ্যাসেম্বলি। এর সদস্যদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দিয়ে থাকে সুপ্রিম লিডার।
পার্লামেন্টের সদস্য ও কাউন্সিল অব গার্ডিয়ান্সের মধ্যে যে-কোনো ধরনের বিরোধ হলে এই বিরোধ মিটানোর দায়িত্ব হলো এক্সপিডিসি কাউন্সিলের।
০৭. জুডিশিয়ারি বা বিচার বিভাগ
• বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন বিরোধ, দ্বন্দ্ব ইত্যাদি তদন্ত করার মাধ্যমে সমাধান দেওয়া এই বিভাগের কাজ।
• এই বিভাগ জনগণের অধিকার রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং ইসলামি আইন অনুযায়ী অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া বিচার বিভাগের কাজ।
০৮. ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনটেলিজেন্স
ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনটেলিজেন্স এর অধীনে রয়েছে ইরানের সেনাবাহিনী, রেভ্যুলেশনারি গার্ড, ল' এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি ও গোয়েন্দা সংস্থা ইত্যাদি।
ইরানের এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যে একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কিত। ইরানে নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন হলেও ইরানকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ পশ্চিমা বিশ্লেষকরা। অবশ্য তার পেছনে কয়েকটি কারণও রয়েছে। এক. ইরানের প্রেসিডেন্ট জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলেও প্রেসিডেন্টকে চলতে হয় সুপ্রিম লিডারের অধীনে। দুই. প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সবাই হতে পারে না কারণ চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কারা হবে সেটা নির্ণয় করে দেয় গার্ডিয়ান কাউন্সিল। এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলরদের আবার নিয়োগ দেন সুপ্রিম লিডার। তাই ইরানের গণতন্ত্রকে কেউ আখ্যায়িত করে "Electoral Democracy" হিসেবে, কেউ বলে এটা হলো "Controlled Democracy", আবার অনেকে এটাকে ফেলে দেয় "Soft Tyranny" এর আন্ডারে।
আসলে গণতন্ত্রের রয়েছে বহুমুখী রূপ। গণতন্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। একেক জন একেকভাবে এটিকে চরিত্রায়ন করে। বিশ্বের যে-সকল দেশ পশ্চিমাদের কথামতো চলে না তাদের মধ্যে অন্যতম একটি হলো ইরান। তাই পশ্চিমা বিশ্ব ইরানকে "Rogue State" বা অবাধ্য রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পশ্চিমাদের এই অবাধ্য রাষ্ট্রের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে "দি রকেট ম্যান" হিসেবে পরিচিত কিম জন উনের উত্তর কোরিয়া।
The Democratic Paradox
মনে করুন আপনাদের দশ জনের চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কেউ চোখে একটু ঝাপসা দেখেন, আবার কেউ তুলনামূলকভাবে একটু কম দেখেন। তাই সবাই ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখল যে, চোখে সবকিছু পরিষ্কার দেখার জন্য সবারই একটি করে চশমা প্রয়োজন। এখন বলুন এই দশ জনের চশমার পাওয়ার একই হবে নাকি ভিন্ন ভিন্ন হবে? এটাই অনুমেয় যার চোখে সমস্যা বেশি তার চশমার পাওয়ারও বেশি হবে এবং যার চোখে সমস্যা কম তার চশমার পাওয়ার একটু কম হবে। এখন প্রশ্নটি হচ্ছে সবারই তো সমস্যা চোখে কিন্তু সবার চশমার পাওয়ায় কেন ভিন্ন ভিন্ন হলো? ডাক্তার তো চাইলে একই পাওয়ারের চশমা সবাইকে দিয়ে দিতে পারত। কেন ডাক্তার সবাইকে একই বা সেইম পাওয়ারের চশমা রেফার করল না? উত্তরটি হলো সমস্যাটি সবার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় (চোখে) হলেও সমস্যার ধরনটি কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন।
এবার চলুন 'Political Paradigm' এর সাথে চশমার এই বিষয়টি রিলেট করার চেষ্টা করি। বিশ্বে যেকয়টি স্বাধীন রাষ্ট্র রয়েছে সবগুলো রাষ্ট্রেরই কিছু না কিছু রাজনৈতিক সমস্যা (Political Gridlocks) রয়েছে। মানুষ যেমন অসুস্থ হয় তেমনি রাষ্ট্রগুলোও অসুস্থ হয়। হাত, পা, নাক, কান, চোখ ইত্যাদি যেমন মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তেমনিভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি শিক্ষা ইত্যাদি হলো রাষ্ট্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এখন মনে করুন দশটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গে সমস্যা বা অসুস্থতা দেখা দিয়েছে। সবার যেমন একটি নির্দিষ্ট জায়গা বা অঙ্গ হিসেবে চোখে সমস্যা ছিল তেমনি সবগুলো রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ হিসেবে রাজনীতিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন এই দশটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অসুস্থতার চিকিৎসা একইরকম হবে নাকি ভিন্ন ভিন্ন হবে? উত্তর হচ্ছে, সমস্যা একটি জায়গায় তথা রাজনীতিতে হলেও সমস্যার ধরন আলাদা তাই চিকিৎসাও হবে ভিন্ন ভিন্ন।
চোখের সমস্যার ঔষধ হিসেবে ছিল ভিন্ন ভিন্ন পাওয়ারের চশমা। আর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সমস্যার ঔষধ হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা Political System। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতো ইত্যাদি পশ্চিমা দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে পলিটিকাল সিস্টেম (ঔষধ) হিসেবে বেছে নিয়েছে গণতন্ত্রকে। চায়না তার রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য ঔষধ হিসেবে বেছে নিয়েছে একদলীয় শাসনব্যবস্থাকে। আফ্রিকার দেশ ইসোয়াতিনি বেছে নিয়েছে রাজতন্ত্রকে। অর্থাৎ একটি দেশের রাজনৈতিক সমস্যার ঔষধ কী হবে সেটি নির্ভর করে ঐদেশটির পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপরে ভিত্তি করে। সবগুলো রাষ্ট্রের জন্যই যে গণতন্ত্র পারফেক্ট হবে বিষয়টি এমন না।
তাই আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে হুবহু ইরানে প্রয়োগ করেন তাহলে কিন্তু সেটি ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। ব্যক্তি অধিকার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রে Homosexuality বা সমকামিতা বৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং রাজনীতিবিদরা মনে করেন ব্যক্তি স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়াও মানুষের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। এখন আপনি যদি সমকামিতাকে একটি গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইরানেও প্রয়োগ করেন তাহলে বিষয়টি কেমন দাঁড়ায়? ইরান নিজেদেরকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও ইরানের সংস্কৃতি, সামাজিকতা, সংরক্ষণশীল জীবনাচরণ, ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি ইরানে সমকামিতাকে বৈধতা দেয় না। তাই একটি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে সমকামিতা ইরানের গণতন্ত্রে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার কানাডায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মদ্য পান করার বৈধতা রয়েছে। কানাডা মনে করে প্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি মদ পান করতে চায় তাহলে সে অবশ্যই মদ্যপান করতে পারবে। কারণ এটি তার ব্যক্তিগত বা গণতান্ত্রিক অধিকার। এখন আপনি যদি বলেন কানাডায় যেহেতু মদপান করা বৈধ তাই সৌদি আরবেরও উচিত মদপান করাকে বৈধ হিসেবে ঘোষণা করা। তাহলে সৌদির প্রেক্ষিতে বিষয়টি কেমন দাঁড়ায়?
অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের জন্য কোন ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো ভালো হবে সেটি নির্ভর করে ঐদেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। তাই রাজনৈতিক সমস্যার ঔষধ হিসেবে পশ্চিমা গণতন্ত্র সব রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সমকামিতার বৈধতা ব্যক্তি অধিকার হলেও ইরানের নাগরিকদের জন্য এই সমকামিতা অধিকার নয়। কানাডার নাগরিকদের জন্য মদপান করা ব্যক্তি অধিকার হলেও সৌদি আরবের নাগরিকদের জন্য সেটা ব্যক্তি অধিকার নয়। কারণ একটি সংরক্ষণশীল দেশ মনে করে সমাকামিতা কিংবা মদ্যপানকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করলে তাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।
পশ্চিমা গণতন্ত্রকে হুবহু অন্য আরেকটি দেশে চাপিয়ে দেওয়াকে রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় “Misformation” বলা হয়। পশ্চিমা বিশ্বের এই চাপিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের কারণেই লিবিয়া আজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, ইরাক কোনোরকমে বেঁচে আছে, সিরিয়ার লাখো মানুষ শরণার্থী হয়েছে, ইয়েমেনে হাজারো শিশু পুষ্টিহীনতায় মারা যাচ্ছে। এই মিসফরমেইশনের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো আজ ভূরাজনীতির প্লে-গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছে। ইরানে আজকে পশ্চিমা মডেলের লিবারেল গণতন্ত্র নেই, তবে ইরানের গণতন্ত্র বলতে একটি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন হয়। তাই ইরানের বর্তমান গণতন্ত্রকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানে Rogue Democracy বা Electoral Democracy হিসেবে আখ্যায়িত করি।
নামেমাত্র ইরানের এই গণতন্ত্রকে পশ্চিমা বিশ্ব অনেক সমালোচনার চোখে দেখে কিন্তু ইরানে আজকে নামেমাত্র হলেও যেটুকু গণতন্ত্র আছে সেটা প্রতিষ্ঠা করতে বাধা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যেখানে সবচেয়ে বড় বাধা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন ইরানের গণতন্ত্রের সমালোচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র চায়নি ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হোক। ইরানে ১৯৭৯ সালে পাহলভী রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রাটি শুরু হয়। ১৯৭৯ এর পূর্বে ইরানে পাহলভী রাজবংশের শাসনাআমলে গণতান্ত্রিক সরকার মোসাদ্দেগকে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায়ই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এই পাহলভী রাজবংশের রাজাদের প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরানে যেন ইসলামি বিপ্লব না হয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি গণতন্ত্রের ধারক বাহক হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন মিশরের গণতান্ত্রিক সরকার মুরসিকে সরিয়ে সেখানে সেনা শাসক আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে? সেই আমেরিকাই যখন একদিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের একচ্ছত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে এবং অন্যদিকে এখনো স্বেচ্ছাচারী একনায়কদের সঙ্গে জোট বাঁধে- তখন তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে একটি প্রশ্ন জাগে।
Kirkpatrick Doctrine
কার্কপেট্রিক ডকট্রিন নিয়ে কিছু কথা বলি। যুক্তরাষ্ট্রের পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট জিয়ান কার্কপেট্রিক এর একটি মতবাদ রয়েছে। যেটি "Kirkpatrick Doctrine" হিসেবে পরিচিত। এই মতবাদের মূল কথা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে উদার গণতান্ত্রিক দেশ হলেও এবং গণতন্ত্রের ধারক বাহক হওয়া সত্ত্বেও বহির্বিশ্বে নিজের সবিধার্থে কখনো কখনো একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অসংখ্য শাসকদের উচ্ছেদ করে সেখানে স্বৈরাচারীদের বসিয়েছে। জিয়ান কার্কপেট্রিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের একটি উদাহরণ দিয়েছেন। রোনাল্ড রিগ্যান তার শাসনামলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক শাসকদের উৎখাত করে সেখানে সমাজতন্ত্র বিরোধী একনায়কদের ক্ষমতায় বসিয়েছেন। রিগ্যান প্রশাসন গুয়েতেমালা, ফিলিপাইন, আর্জেন্টিনা, নিকারাগুয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রে একনায়কদের সমর্থন দিয়েছিলেন। আসলে শুধু রিগ্যান কেন পরবর্তী সকল মার্কিন প্রেসিডেন্টই একই কাজ করেছেন। যেমন- চিলিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সালভাদর আলেন্দেকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একনায়ক অগাস্তো পিনোচেটকে বসিয়েছিল। লেখকের মতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বহিবিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এটি একটি ফাঁদ।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং এর কার্যপ্রণালি
২০২১ সালের ০৫ আগস্ট ইরানের অষ্টম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ইব্রাহিম রাইসি। সেই শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। ইতিহাসে এই প্রথম ইরানের কোনো প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইরানে গিয়েছিলেন। ইব্রাহিম রাইসির পূর্বে ইরানের ৭ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন হাসান রুহানি। এ পর্যন্ত যারা ইরানের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং ইরানের বর্তমান রাজনীতিবিদদের অধিকাংশই কনজার্ভেটিভ পলিটিশিয়ান। আমরা প্রায়ই Conservatism বা রক্ষণশীলতাবাদ নামে একটি টার্ম শুনে থাকি। ফরাসি বিপ্লবের পর ১৮১৮ সালে ফ্রান্সিস-রেনে দে সর্বপ্রথম এই রাজনৈতিক পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। সহজ করে বললে এই কনজার্ভেটিজম এর মানে হলো, সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলা ঐতিহ্যকে ধরে রাখা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আইনকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রথা ও ট্র্যাডিশনকে মেনে চলা ইত্যাদি। এটা মূলত, Secularism এবং Liberalism বা উদারতাবাদের বিপরীত। ইরানের সমসাময়িক রাজনীতি বিশ্লেষণ করে এটা দেখা যায় যে, ইরান একটি রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে।
এক. বর্তমান বিশ্বে ইরানের বন্ধু রাষ্ট্রের সংখ্যা খুবই কম। তাই একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে ইরানকে অন্যের উপর ভরসা না করে নিজের শক্তির উপর ভিত্তি করেই টিকে থাকতে হয়। টিকে থাকার জন্য এই শক্তির ভিত হিসেবে ইরানের প্রয়োজন একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়া। তাই বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য হচ্ছে পারমাণবিক দিক থেকে ইরানকে আরও বেশি শক্তিশালী করা।
দুই. আপনারা যদি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ইরানের জাতীয় রাজনীতির দিকে লক্ষ্য করেন তাহলে একটি বিষয় উপলব্ধি করবেন যে, ইরানের মানুষজন ইরানের সুপ্রিম লিডার ও প্রেসিডেন্টের উপর নানা কারণে ক্ষুব্ধ। কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক ইরানের উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি একেবারে খাদের কিনারায় পৌঁছেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী এবং দেশটির মুদ্রার মান অনেক কমে গিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তাদের দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাধ্য হচ্ছে ইরান থেকে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিতে। কারণ এসব কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাই ইরানের বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় প্রধান কাজ হওয়া উচিত নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এই অর্থনৈতিক অবরোধ কমিয়ে আনা।
তিন নাম্বারটি হলো "Foreign Policy Dilemma" বা কূটনৈতিক সংকট। বর্তমান সরকার যদি একদিকে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করে এবং অন্যদিকে ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, তিউনিসিয়ার আন নাহদা পার্টি, ইয়েমেনের হুতি ইত্যাদি গোষ্ঠীগুলোকে তৎপর রাখে তাহলে কোনোভাবেই ইরানের উপর পশ্চিমা বিশ্ব যে অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়েছে সেই অবরোধ তুলে নেবে না কিংবা অবরোধ শিথিল করবে না। তখন ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরও বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। তবে ইরানের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পশ্চিমাদের দেওয়া অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে ইরানকে রক্ষা করা। তাই ইরানের উচিত আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে নিজেকে রক্ষা করার দিকে মনোযোগ দেওয়া। কারণ একটি দেশের সবকিছুর মূলে রয়েছে তার অর্থনীতি। ইরানের প্রথম প্রয়োজন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া। অর্থনীতি ভালো না থাকলে ইরান তার শক্তি বৃদ্ধীর জন্য সামরিক খাতেও বেশি ব্যয় করতে পারবে না, পারমাণবিক কাজকর্মও বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না, দেশের জনগণও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করতে পারে।
এবার আসি অর্থনৈতিক অবরোধ বা Economic Sanctions কী তা নিয়ে। কেন বিশ্ব রাজনীতিতে এই অর্থনৈতিক অবরোধের সিস্টেমটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? বর্তমান পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই স্বয়ংসম্পূর্ণ (Autarky) নয়। নিজ দেশের প্রয়োজন মেটাতে একটি রাষ্ট্রকে অন্য আরেকটি রাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য আমদানি করতে হয় (Import)। একই ভাবে নিজ দেশের উদ্বৃত্ত সম্পদ অন্যদেশে রপ্তানি করতে হয় (Export)। আর এজন্যই একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিকভাবে শত্রু থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হয়। যেমন- ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের শত্রু হলেও এই দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। চায়না ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের শত্রু হলেও এই দুটি দেশের মধ্যেও প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। যেহেতু একটি রাষ্ট্রের সাথে অপর আরেকটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাজকর্ম অনিবার্য, তাই ধনী রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক অবরোধের এই সুযোগটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। দিনে দিনে কূটনীতি এবং যুদ্ধের মাঝে একটি কম ঝুঁকিপূর্ণ সমাধান হয়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অবরোধ। ধরুন কোনো রাষ্ট্র যদি যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম চেষ্টা করে সেই রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা করে একটি সমাধান করার। কিন্তু কূটনৈতিক উপায় ব্যর্থ হলে সেই রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ আদায় করার চেষ্টা করেছে পুরো বিংশ শতাব্দী ধরে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নতুন করে কোনো রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্র একটু ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। তাই কোনো শত্রু রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্র বশ করার জন্য এই অর্থনৈতিক অবরোধটা ব্যবহার করে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যেভাবে কাজ করে
এক. ইরান তার প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর থেকে আমদানি করে নিয়ে আসত কিন্তু অবরোধের কারণে এখন ইরান পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য আমদানি করতে পারছে না। যে-কারণে দেশের জনগণের চাহিদা ইরান সরকার মিটাতে পারছে না। ফলে ইরানিয়ানরা ক্ষোভে কয়েকদিন পরপর সরকার বিরোধী আন্দোলন করে।
দুই. ইরান এই অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে তার নিজস্ব কোনো পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না। রপ্তানি করতে না পারার কারণে ইরান বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করতে পারছে না। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে না পারায় অর্থের অভাবে ইরান বিনিয়োগ করতে পারছে না, অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন করতে পারছে না, সামরিক খাতে বাজেট বৃদ্ধি করতে পারছে না। ইরান সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তেল রপ্তানি করার মাধ্যমে। অবরোধের কারণে ইরান এখন অধিক পরিমাণে তেল রপ্তানি করতে পারছে না।
তিন. যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অসংখ্য প্রাইভেট কোম্পানি, কর্পোরেশন, ব্যবসায়ীরা ইরানে বাণিজ্য করত এবং একই ভাবে ইরানের অসংখ্য কোম্পানি, ব্যবসায়ীরাও পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য করত। কিন্তু এই অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর কোম্পানিগুলো ইরান থেকে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুটিয়ে নিয়েছে। একই ভাবে ইরানের বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যবসায়ীরাও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে তাদের বাণিজ্য করতে পারছে না। এবার ভাবুন একটি রাষ্ট্র যদি উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করতে না পারে তাহলে সে-দেশের অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? এক কথায়, এই Economic Sanctions হচ্ছে ইরানের উপর একধরনের অর্থনৈতিক শাস্তি। এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আবার ভিন্ন ভিন্ন রূপ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ :
1. Embargo: যদি একটি রাষ্ট্র অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়, তখন সেটিকে Embargo বলে। জ্বালানি তেলের উপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় সেটাকে 'Oil Embargo' বলা হয়। বিভিন্ন অস্ত্রের উপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় সেটাকে 'Arms Embargo' বলে।
2. Unilateral Sanction: কোনা একটি রাষ্ট্রের উপর যখন অন্য আরেকটি রাষ্ট্র সকল সম্পর্কের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন সেটিকে একপাক্ষিক (unilateral) নিষেধাজ্ঞা বলা হয়। তথা Unilateral এর মানে হলো শুধু একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নিষেধাজ্ঞা। উদাহরণস্বরূপ: ২০১৫ সালে তুরস্ক যখন রাশিয়ার একটি বিমানকে ভূপাতিত করে তখন তুরস্কের উপর রাশিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিউবাতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞা, জর্জিয়াতে রাশিয়ার আরোপিত নিষেধাজ্ঞা একপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞার উদাহরণ।
3. Multilateral Sanctions: কোনো একটি রাষ্ট্রের উপর যখন অসংখ্য রাষ্ট্র মিলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন সেটিকে বহুপাক্ষিক (multilateral) অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ: ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে নিষেধাজ্ঞা। তাছাড়াও ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ক্রিমিয়া দখল করে নেয় তখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান সম্মিলিতভাবে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এটাই বহুপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা।
4. Universal Sanction: আর যখন কোনো রাষ্ট্রের উপর বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন সেটিকে সর্বজনীন (universal) নিষেধাজ্ঞা বলা হয়। সাধারণত জাতিসংঘ কর্তৃক কোন রাষ্ট্রের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ সব রাষ্ট্রই জাতিসংঘের সদস্য। যেমন- ১৯৯২ সালে সোমালিয়াতে গৃহযুদ্ধের সময় জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। জাতিসংঘ ঘোষণা দিয়েছিল যে, কোনো রাষ্ট্র সোমালিয়াতে অস্ত্র সরবরাহ কিংবা বিক্রি করতে পারবে না। তাছাড়াও জাতিসংঘ কর্তৃক ২০১১ সালে লিবিয়াতে অস্ত্র বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপও সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার উদাহরণ।
5. Smart Embargo: 'স্মার্ট নিষেধাজ্ঞা' বলা হয় যখন সাধারণত পুরো দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি না করে ঐ দেশের ছোট কোনো গ্রুপের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এটা হতে পারে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদেশি কর্পোরেশন কিংবা কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের উপর।
উপরিউক্ত এসব কারণেই Economic Sanctionsটা একুশ শতাব্দীর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেখা যাক ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানে যে সংকট দেখা দিয়েছে তা ইরান কীভাবে মোকাবিলা করে।
সংকটের মাঝেও কিছু সম্ভাবনা
Rebound Effect নামে একটি টার্ম রয়েছে। এর মানে হচ্ছে একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নতুন আরেকটি সমস্যা তৈরি করা। অর্থনীতিতে এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে “ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট” বিশ্লেষণে এটি খুব বেশি প্রাসঙ্গিক। ইরানিয়ান রেভ্যুলেশনের পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের একটি শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সেই শত্রুতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ইরানবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ, ইরান বিরোধী জোট গঠন, ছয় জাতির P5+1 চুক্তি, কাসেম সোলেমানিকে হত্যা ইত্যাদি। ইরান সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের এই গৃহীত পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নতুন কিছু সমস্যা সৃষ্টি করেছে যা যুক্তরাষ্ট্রকে আগামীর ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিপদে ফেলতে পারে।
প্রথমত, ইরান সমস্যা সমাধানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান এখন অনেক বেশি চীনমুখী হয়েছে। চীনও যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান বিরোধী শক্তি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যাটি হলো এতে করে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী জোট অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। একই ভাবে নয়া পরাশক্তি চীনের সহায়তায় ইরানও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয়ত, ইরান সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে ইরানের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। এই কূটনৈতিক চাপের কারণে বিশ্ব রাজনীতির টেবিলে ইরান বারংবার আলোচনায় আসছে। কূটনৈতিক চাপের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ইরানবিরোধী আলাপ ইরানি জনগণকে দেশাত্মবোধের প্রতি আরও বেশি প্ররোচিত করে। এতে করে ইরানিদের মধ্যেও মার্কিনবিরোধী ক্ষোভ তীব্রতর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের সমন্বিত মনোভাব ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে অধিক স্বাধীনতা দেয়।
তৃতীয়ত, বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনায় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ, হোক সেটা ইতিবাচকভাবে অথবা নেতিবাচকভাবে। একটি বিষয় আলোচনায় আছে মানে ঐ বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই সরব থাকা ইরানের কাছে তার নিরাপত্তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ফলশ্রুতিতে ইরান পূর্বের তুলনায় তার পারমাণবিক কর্মসূচি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের এই পারমাণবিক কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য কিছুটা হলেও হ্রাস করবে। ইরানকে বলা হয় "Bounce Back Nation"। কারণ ঐতিহাসিকভাবে ইরান যতবারই সংকটে পড়েছে, ততবারই এই সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে যতই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, ইরানবিরোধী জোট ইত্যাদির মাধ্যমে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে ইরানও ততটা শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছে। ইরানবিরোধী এত পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও ইরান বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আর ঘুরে দাঁড়ানোর এই মনোভাবের কারণেই ইরানকে Bounce Back Nation বলা হয়।
Question to think about?
বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান বর্তমানে একটি উভয়সংকটের (diplomatic dilemma) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটটি হচ্ছে, ইরানের নিরাপত্তা রক্ষার্থে তাকে একদিকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে উঠার জন্য পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যদি এই পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকে তাহলে ইরান কোনোভাবেই তার উপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা হতে মুক্ত হতে পারবে না। আর এই নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হতে না পারলে তার পারমাণবিক কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হবে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান তাদের পারমাণবিক শক্তি উন্নয়ন এবং চলমান নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে এই দুয়ের মধ্যে কীভাবে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Mulder, Nicholas (2022), The Economic Weapon: The Rise of Sanctions as a Tool of Modern War, Yale University Press
2. Wright, Steven (2007), The United States and Persian Gulf Security: The Foundations of the War on Terror, Ithaca Press
3. Fischer, Michael M.J. (2003), Iran: from religious dispute to revolution. Madison: University of Wisconsin Press
4. Foltz, Richard (2016), Iran in World History, Oxford University Press
5. Axworthy, Michael (2008), A History of Iran: Empire of the Mind. Basic Books
6. Gasiorowski, Mark J. (2019), U.S. Perceptions of the Communist Threat in Iran during the Mossadegh Era, Journal of Cold War Studies
7. Benard, Cheryl (1984), The Government of God: Iran's Islamic Republic, Columbia University Press
8. Crist, David (2012), The Twilight War: The Secret History of America's Thirty-Year Conflict with Iran, Penguin Press
9. Alvandi, Roham (2016), Nixon, Kissinger, and the Shah: The United States and Iran in the Cold War, Oxford University Press
📄 সমসাময়িক আফ্রিকার ভূরাজনীতি
বিংশ অধ্যায় Theme: Old Problems in New Conflicts
সমসাময়িক আফ্রিকার ভূরাজনীতি
"Africa's largest dam power dreams of prosperity in Ethiopia- and fears of hunger in Egypt." - Sudarsan Raghavan
একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও সরব হয়ে উঠেছে আফ্রিকা। বিশেষ করে উত্তর, পশ্চিম ও হর্ন অব আফ্রিকার দেশগুলো। সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বকে ছাপিয়ে আফ্রিকার রাজনীতিতেও এখন অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে কাতার-বাহরাইন দ্বন্দ্ব। ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে কাতার ও বাহরাইন উভয়ই আফ্রিকার বিভিন্ন অবকাঠামো খাত নির্মাণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইথিওপিয়া নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা এবং গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম নিয়ে মিশরের সাথে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করেছে নতুন আরেকটি প্রক্সি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। সেখানে সুদানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং তাইগ্রে গৃহযুদ্ধ যোগ করেছে নতুন আরেকটি মাত্রা। সম্প্রতি উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক নরমালাইজেশনের বিষয়টিও পরিবর্তন আনবে ইউরোপ ও সাব সাহারা অঞ্চলের রাজনীতিতে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির পথপরিক্রমায় আমরা এই অধ্যায়ে উপরিউক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে আফ্রিকার ভূরাজনীতির স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করব।
ইথিওপিয়াতে তাইগ্রে গৃহযুদ্ধ
বিশ্ব হয়তোবা আরেকটি ভয়ংকর ও দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে। বিশ্বের যে দেশটি সবচেয়ে জনবহুল ল্যান্ডলকড কান্ট্রি হিসেবে পরিচিত এবং যে দেশটি কখনো সম্পূর্ণ কলোনিতে পরিণত হয়নি, সে দেশটির নাম ইথিওপিয়া। হর্ন অব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়াতে চলমান "সরকার বনাম তাইগ্রে" গৃহযুদ্ধটি খুবই জটিল আকার ধারণ করেছে। উল্লেখ্য, কোনো দেশের সরকারব্যবস্থা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর গঠন, পলিসি ও মতাদর্শগত চিন্তাধারা ধরতে পারলে ঐদেশের রাজনীতি বুঝতে পারা আমাদের জন্য খুবই সহজ। ইথিওপিয়ার রাজনীতিতে ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল হচ্ছে Ethiopian People's Revolutionary Democratic Front, যাকে সংক্ষেপে "EPRDF" বলে। এই রাজনৈতিক দলটির কাঠামো বুঝতে পারলে ইথিওপিয়ায় বর্তমানে চলমান ক্রাইসিসের মূল কারণগুলো সহজে বুঝতে পারা যাবে। ইথিওপিয়ার এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলটি নিচের চারটি দলের সমন্বয়ে (Coalition) গঠিত ছিল।
১. ইথিওপিয়ার উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়ি অঞ্চলটি হচ্ছে তাইগ্রে। ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া সীমান্তের মাঝখানে এই তাইগ্রে অঞ্চলটি অবস্থিত। এই তাইগ্রে জনগোষ্ঠী ইথিওপিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৬.১ শতাংশ। এই তাইগ্রে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী দল- Tigray People's Liberation Front, যা TPLF নামে পরিচিত।
২. ইথিওপিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হলো আমহারা। তারা ইথিওপিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ২৭.১%। এই আমহারাদের প্রতিনিধিত্বকারী দল হচ্ছে- Amhara Democratic Party (ADP)।
৩. ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হচ্ছে অরমো ভাষাভাষী জনগণ। মোট জনগোষ্ঠীর ৩৪.৬%, এদের প্রতিনিধিত্বকারী দল- Oromo Democratic Party (ODP)।
৪. ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের মোট ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত আধাস্বায়ত্তশাসিত একটি অঞ্চল রয়েছে। এই অঞ্চলটি “Southern Nation" নামে পরিচিত। এদের প্রতিনিধিত্বকারী দল- Southern Ethiopian People's Democratic Movement (SEPDM)।
ইথিওপিয়ার সরকারব্যবস্থা
ক) ইথিওপিয়া একটি ফেডারেল সংসদীয় প্রজাতন্ত্র। রাষ্ট্রের প্রধান হলেন প্রেসিডেন্ট, তবে প্রেসিডেন্টের হাতে তেমন ক্ষমতা নেই। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন সালেহ জেইদি (ইথিওপিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট)। সরকার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী, তার হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী আবি আহমেদ। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এই দুটি পদ ছাড়াও ইথিওপিয়ার সংবিধানে “Deputy Prime Minister” এই পদটিও রয়েছে। এই পদটি Vice president পদটির মতোই। তাই এটিকে Vice Prime Minister ও বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার প্রধানমন্ত্রীর কাজগুলো করে থাকেন। ইথিওপিয়া, অস্ট্রেলিয়া-সহ আরও কয়েকটি দেশে এই পদটি রয়েছে।
খ) Ethnofederalism - এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম। ইথিওপিয়া মোট দশটি ফেডারেল অঞ্চলে বিভক্ত। এই অঞ্চলগুলো আধাস্বায়ত্তশাসিত এবং তাদের নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্সও রয়েছে। এই অঞ্চলগুলো বিভক্ত করা হয়েছে ইথনিক জনগোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে। তাই নিজ নিজ অঞ্চলে নিজেদের গোষ্ঠীপ্রধানরাই অঞ্চলগুলো শাসন করে থাকে। ফরেইন পলিসি, সিকিউরিটি, মুদ্রা ব্যবস্থা এই তিনটি কেন্দ্রীয় সরকার (প্রধানমন্ত্রী) নিয়ন্ত্রণ করে, আর বাকিসব ফেডারেল গভর্নরের হাতে। তবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর হওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার তার নির্দিষ্ট তিনটি বিষয় ছাড়াও আধাস্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোরও সবকিছুতেই হস্তক্ষেপ করে থাকে। ভারত, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল স্টেটগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভৌগোলিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ভাগ করা, তাই এদেরকে "Federalism" বলে। কিন্তু ইথিওপিয়ার স্টেটগুলো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর উপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে বলে এটিকে "Ethnofederalism” বলে।
উপোরিউক্ত চারটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত এই EPRFD দলটি ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকলেও এই চারটি দলের মধ্য থেকে তিনটি দল থেকেই ঘুরেফিরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। কিন্তু Oromo Democratic Party থেকে কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেনি। তবে ২০১৮ সালে এন্টি গভার্নমেন্ট আন্দোলনের তোপে হেলমেরিয়াম প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করলে আবি আহমেদ Oromo Democratic Party থেকে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসে আবি আহমেদ রাজনীতিতে ব্যাপক সংস্কার করার চেষ্টা করেন। এই সংস্করণ থেকেই তাইগ্রে এর সাথে আবি আহমেদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।
ইথিওপিয়াতে গৃহযুদ্ধের কারণ
আবি আহমেদ ও তাইগ্রে নেতাদের মধ্যে আসলে দ্বন্দ্বের কারণগুলো কী কী?
প্রথমত, আবি আহমেদের সংস্করণের মধ্যে একটি ছিল যে, Ethiopian People's Revolutionary Democratic Front (EPRDF) এই সমন্বিত দলটি ভেঙে দেওয়া। দেশে মোট ৮০টির বেশি ভিন্ন জাতিসত্তার জনগোষ্ঠী থাকলেও EPRDF এই দলটি অল্পকয়েকটি কমিউনিটির সমন্বয়ে গঠিত। এই সমন্বিত দলটি ২৭ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশকে একদলীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। তাই এই সময়টিকে আবি আহমেদ "27 years of darkness" হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এই সমন্বিত দলটি ভেঙে দিয়ে দেশের সকল আদিবাসী ও ইথনিক জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে "Prosperity Party” নামে নতুন আরেকটি দল গঠন করেন। অন্য সকল নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী তাতে সাড়া দিলেও তাইগ্রে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দল "Tigray People's Liberation Front (TPLF)” তাতে সাড়া দেয়নি এবং আবি আহমেদের এই সমন্বিত নতুন জোট থেকে তাইগ্রেরা বের হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে আবি আহমেদ প্রশাসন অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে তাইগ্রে জনগোষ্ঠীরও অনেক নেতা ছিল। তাই তারা মনে করে যে, সরকার তাদেরকে দমন করার জন্য দুর্নীতি নির্মূলের নামে তাদের গ্রেপ্তার করেছে।
তৃতীয়ত, পূর্বে দীর্ঘদিন ধরে তাইগ্রেরা রাষ্ট্রের চার্চ, মিলিটারি চিফ ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসলে তারা তাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো হারান। তাই তাইগ্রে এর রাজনীতিবিদরা আবি আহমেদকে "এন্টি-তাইগ্রে” হিসেবে উল্লেখ করেন。
চতুর্থত, করোনার প্রকোপ ঠেকাতে আবি আহমেদ এর কেন্দ্রীয় সরকার সব ধরনের প্রাদেশিক নির্বাচন স্থগিত করলেও তাইগ্রেতে ২০২০ সালের ২১শে আগস্ট প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাইগ্রে স্টেটের এই নির্বাচনে তাইগ্রেদের প্রতিনিধিত্বকারী Tigray People's Liberation Front (TPLF) এই দলটি ১০০% ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। আবি আহমেদ এই নির্বাচনকে বয়কট করেন এবং TPLF কে অবৈধ ঘোষণা করেন।
পঞ্চমত, ১৯৬১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এই দুটি দেশ একসাথে ছিল। ইরিত্রিয়া অঞ্চলে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মাধ্যমে গণ আন্দোলন শুরু হলে ১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হয়ে যায়। তারপর ১৯৯৮ সালে পুনরায় ইথিওপিয়া- ইরিত্রিয়া যুদ্ধ বাঁধলে ২০০০ সালে একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হলেও সীমান্তে সংঘাত চলতেই থাকে। তারপর আবি আহমেদ ক্ষমতায় এসে ২০১৯ সালে ইরিত্রিয়ার সাথে শান্তি চুক্তি করে দীর্ঘদিনের সংঘাত বন্ধ করেন এবং এর কারণে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু ইরিত্রিয়ার সাথে আবি আহমেদের এই শান্তি চুক্তি মেনে নিতে নারাজ তাইগ্রে এর নেতারা। যেহেতু ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার ঠিক মাঝখানে তাইগ্রে অঞ্চলটি তাই তাইগ্রে এর নেতারা মনে করছে দুটি দেশ মিলে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে।
ষষ্ঠত, তাইগ্রে অঞ্চলে তাইগ্রে জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও স্বল্পসংখ্যক আমহারা ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীও ছিল। কিন্তু তাইগ্রেরা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণে তাইগ্রে অঞ্চলের আমহারাদের নির্বিচারে গণহত্যা করে এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের চার নভেম্বর TPLF এর সামরিক বাহিনী হঠাৎ ফেডারেল সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করলে আবি আহমেদ পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিলে টিপিএলএফ ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। রক্তাক্ত এই সংঘাতের কারণে হাজার হাজার মানুষ ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ শরণার্থী হয়ে সুদানে আশ্রয় নেয়। এই গৃহযুদ্ধ বর্তমানে হর্ন অব আফ্রিকাতে একটি ভয়ংকর অচলাবস্থা (Dangerous Stalemate) সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ বলছে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়াবে।
গৃহযুদ্ধের ভবিষ্যৎ
যেভাবে পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ এই গৃহযুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলবে? সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও, আফ্রিকান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সবাই ইথিওপিয়ার সরকার ও টিপিএলএফের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের সমঝোতার কথা বললে আবি আহমেদ বৈদেশিক হস্তক্ষেপকে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিজেরাই সমাধান করবেন বলে তিনি জানান। কিন্তু সেই সমাধান আর হচ্ছে না বরং সহিংসতা বেড়েই চলছে। সম্প্রতি ইথিওপিয়া নীলনদের উপর গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম নির্মাণ করে, যা নিয়ে মিশর ও সুদানের সাথে দ্বন্দ্ব বাঁধে। ধারণা করা হচ্ছে তাইগ্রে ইস্যুতে সুদান ও মিশর তাইগ্রে নেতাদের সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে আবার চীন ইথিওপিয়াতে উন্নয়নমূলক অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, ফলস্বরূপ আবি আহমেদের সাথে চীনের সম্পর্ক ভালোই। তাই চীন বিরোধীরা তাইগ্রে ইস্যু নিয়ে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করলে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে। সুযোগ নেবে অনেক জঙ্গি গোষ্ঠী। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ল্যান্ডলক এই দেশটি এবং যে দেশটি কখনো সম্পূর্ণ কলোনিতে পরিণত হয়নি, সে দেশটির বর্তমানে চলমান সংঘাত উসকে দেবে আল শাবাবের মতো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেও।
বাংলাদেশের ডিবিএল নামের একটি কোম্পানি ইথিওপিয়ার ট্রাইগ্রে অঞ্চলে একটি পোশাক কারখানা চালু করেছিল ২০১৮ সালে। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশি শ্রমিকরা সেখানেই কর্মরত ছিল কিন্তু হঠাৎ করেই লড়াই তীব্র হয়ে যাওয়ায় এই শ্রমিকদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। আবি আহমেদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া তাইগ্রে জনগোষ্ঠীর সাথে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয় না। একই ভাবে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই গৃহযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে তাহলে ইথিওপিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন দিকে যেতে পারে কেউ বলতে পারবে না। আফ্রিকার একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে মিশর পারে তার দায়িত্বশীল আচরণ এবং সুকৌশল কূটনীতির মাধ্যমে এই সংকটের গতিপথ নির্মাণ করতে। কারণ এ সংঘাতের স্থায়িত্ব যত গড়াবে, আঞ্চলিক রাজনীতি ও সার্বভৌমত্ব তত বেশি হুমকির মুখে পড়বে, আর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সেই সুবিধা গ্রহণ করবে পরাশক্তিগুলো।
মিশর-ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের স্বরূপ
ইতিহাসের পাতায় নীলনদের একটি ঐতিহাসিক মহত্ত্ব রয়েছে। নীল নদ বর্তমানে বিখ্যাত পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী হিসেবেও। নীলনদের শাখা নদী ব্লু নাইলে ড্যাম (বাঁধ) তৈরি করছে ইথিওপিয়া। যা 'গ্র্যান্ড রেনেসাঁস ড্যাম' নামে পরিচিত। এটি নিয়ে দুটো দেশের মধ্যে প্রায় যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। মিশরের বক্তব্য হচ্ছে, নীল নদ থেকে কেউ এক ফোঁটা পানিও উত্তোলন করতে পারবে না। অন্যদিকে ইথিওপিয়া বলছে পৃথিবীর কোন শক্তিই ইথিওপিয়াকে বাঁধ নির্মাণ থেকে আটকাতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে মিশর এখন সংকটে পড়েছে। কারণ ইথিওপিয়া এই বাঁধ বানালে মিশরের অস্তিত্ব নিয়ে সংকট দেখা দেবে। বুঝতেই পেরেছেন বিষয়টি কত জটিল ও সংবেদনশীল দুটি দেশের জন্য। আসুন বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি আসলে কী নিয়ে দুটি দেশ যুদ্ধের মুখোমুখি। মানচিত্রে তাকালে দেখবেন যে, নীল নদের দুটি শাখা নদী রয়েছে; একটি হোয়াইট নাইল (White Nile), অন্যটি ব্লু নাইল (Blue Nile)। হোয়াইট নাইলের উৎপত্তিস্থল মধ্য আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায়। আর ব্লু নাইল ইথিওপিয়ার তানা হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব নিকে প্রবাহিত হয়ে সুদানে প্রবেশ করেছে। দুইটি উপনদী সুদানের রাজধানী খার্তুমের নিকটে মিলিত হয়েছে। জলবিদ্যুৎ তৈরির জন্য নীল নদের শাখা নদী ব্লু নাইলের উপর এই বিশাল বাঁধ তৈরি করছে ইথিওপিয়া। যার নাম দিয়েছে গ্র্যান্ড রেনেসাঁ ড্যাম। এই বাঁধ তৈরি নিয়ে মিশর এবং ইথিওপিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছিল।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে ঐতিহাসিক চুক্তি মানতে নারাজ ইথিওপিয়া সরকার। ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে নীল নদের উৎস নদী ব্লু নীলে ২০১১ সালে বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু করে ইথিওপিয়া, যেখান থেকে নীল নদের মোট ৮৫ শতাংশ পানি প্রবাহিত হয়। ইথিওপিয়ার পরিকল্পিত এই বাঁধটি নির্মিত হলে ভবিষ্যতে সেটি হবে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ১৯২৯ সালে মিশর ও তৎকালীন আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেনের মধ্যে একটি চুক্তি হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে আরেকটি চুক্তি হয়, সেই চুক্তিতে মিশর এবং সুদানকে নীল নদের সমস্ত পানির উপর অধিকার দেয়া হয়। ঔপনিবেশিক আমলের সেসব নথিপত্রে নদীটির উজানে যে প্রকল্প পানি প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয় শুধু মিশর ও সুদানকে। তাই নীল নদের পানি প্রবাহে কেউ বাঁধা সৃষ্টি করলে সেখানে ভেটো দেওয়ার অধিকার রাখে শুধু মিশর ও সুদান। কিন্তু ইথিওপিয়া বলছে, শতবর্ষ পুরোনো এসব চুক্তি মানতে তারা বাধ্য নয়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় মিশরে অস্থিতিশীলতা শুরু হলে সেটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ইথিওপিয়া বাঁধের কাজকর্ম শুরু করে দেয়। তবে মিশরের দাবি, ১৯৫৯ সালের জলচুক্তি ইথিওপিয়াকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কারণ এটি যেহেতু আন্তর্জাতিক চুক্তি তাই ইথিওপিয়া সেই চুক্তি মানতে বাধ্য। ইথিওপিয়া এই চুক্তি মানতে নারাজ তার কারণ হলো অতীতের সেই চুক্তিতে নীল নদের জলের সবচেয়ে বেশি অংশ মিশরকে দেওয়া হয়েছিল এবং ইথিওপিয়াকে তখন সেই চুক্তির শরীক হিসেবে রাখা হয়নি। ইথিওপিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চুক্তির পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে চেয়েছিল কিন্তু মিশর ১৯৫৯ এর চুক্তি থেকে সরে আসতে রাজি নয়। তাছাড়াও ইথিওপিয়ার জনগণ এই বাঁধ বানানোর পক্ষে। ইথিওপিয়ার জনগণ মনে করে নিজেদের সীমানায় বাঁধ বানানো তাদের অধিকার এবং এতে মিশরের আপত্তি থাকার কথা নয়। এই অবস্থায় মিশর বলছে জলবণ্টন নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনগত ব্যবস্থা হোক। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার মধ্যে আলোচনার কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় মিশরের আপত্তিতে ভ্রুক্ষেপ না করে বাঁধের কাজ ২০২১ সালে পুনরায় পুরো উদ্যমে শুরু করে দিয়েছে ইথিওপিয়া। আর তাই নিয়ে তিন দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শুরু হয়েছে নানা বাকবিতন্ডা।
মিশর- ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের কারণসমূহ
বিবাদের পেছনে কারণগুলো কী কী? এক. মিশরের আশঙ্কা এর ফলে ইথিওপিয়া একসময় নীল নদীটির পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। দুই. পানির জন্য নীল নদের উপর ৯০ ভাগ নির্ভর করে মিশর। মিশর মনে করছে, ইথিওপিয়ার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে নীল নদের স্রোত প্রবাহের উপর প্রভাব পড়বে। তিন. নীল নদে যদি পানি প্রবাহ কমে যায়, তাহলে সেটি মিশরের লেক নাসেরকে প্রভাবিত করবে। যার ফলে মিশরের আসওয়ান বাঁধে পানির প্রবাহ কমে যাবে, যেখান থেকে মিশরের বেশির ভাগ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। ফলস্বরূপ মিশরের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাবে। চার. মিশরের আরও আশঙ্কা, ইথিওপিয়ার বাঁধের কারণে নীল নদের পানির প্রবাহ যদি অনেক কমে যায়, তাহলে সেটি দেশটির নদীপথে পরিবহন ব্যবস্থাকেও হুমকির মুখে ফেলবে এবং কৃষকদের কৃষি ও পশুপালনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কয়েক বছর পর কৃষি কাজের জন্য মিশর আর পানি পাবে না। তাই মিশরে কৃষকরাও অনেক ক্ষুব্ধ। পাঁচ. মিশরও বলছে, তারা পুরোপুরি নীল নদের জলের উপর নির্ভরশীল এবং জল যেহেতু কমছে, তাই ১০ কোটি লোকের জীবনের উপর বিশাল প্রভাব পড়বে। তাই মিশরের দাবি জতিসংঘ হস্তক্ষেপ না করলে সংঘাত অনিবার্য। ইথিওপিয়া বাঁধ নির্মাণ করলে মিশর ও সুদান মিলিয়ে ১৫ কোটি লোকের জীবন বিপদাপন্ন হয়ে যাবে। তাই এই বাঁধ তারা মানবে না।
এত বড় বাঁধ তৈরিতে ইথিওপিয়ার স্বার্থ কী?
প্রথমত, প্রায় চারশো কোটি ডলার খরচ করে বাঁধটি তৈরি করছে ইথিওপিয়া। এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে এই প্রকল্প থেকে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে দেশটি। বর্তমানে ইথিওপিয়ায় অনেক বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। দেশটির ৬৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। এই বাঁধ থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে, তা দেশটির নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত হয়ে প্রতিবেশি দেশগুলোতেও রপ্তানি করা যাবে। একদিকে নিজ দেশের চাহিদা পূরণ অন্যদিকে প্রতিবেশি রাষ্ট্রে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়ত, তারা যে আফ্রিকার একটি উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে যাচ্ছে এই বাঁধ স্থাপনের প্রচেষ্টা তারই একটি উদাহরণস্বরূপ।
অর্থাৎ ইথিওপিয়া তাদের সক্ষমতাকে প্রমাণ করার জন্য অনেক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও এই বাঁধটি নির্মাণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। এমনকি এই বাঁধ তৈরিতে বিদেশি কোনো অর্থায়নও নিচ্ছে না দেশটি। সরকারি বন্ড এবং বিভিন্ন প্রাইভেট ফান্ড থেকে বাঁধটি তৈরি করা হচ্ছে। ফলে এই বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপকে ইথিওপিয়া ভালো চোখে দেখছে না বরং ইথিওপিয়া মনে করছে তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ কখনোই কাম্য নয়। তৃতীয়ত, ইথিওপিয়াতে অসংখ্য লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। তাদের ১১ কোটি লোককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বানতে এই বাঁধ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে গেলে ইথিওপিয়া হয়ে উঠবে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ রপ্তানিকারী দেশ। তাই নীল নদের পানি নিয়ে মিশর, সুদান, ইথিওপিয়ার মধ্যে যে রাজনীতিটি হচ্ছে সেটিকে “Water Politics” হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
সুদানের ভূমিকা
ইথিওপিয়া ছাড়া আফ্রিকার আর কোন দেশ উপকৃত হবে? প্রতিবেশি সুদান, দক্ষিণ সুদান, কেনিয়া, জিবুতি এবং ইরিত্রিয়া ইত্যাদি দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকায় এই বাঁধ থেকে তারাও উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সুদান হলো মিশরের বন্ধু এবং ইথিওপিয়ার শত্রু। তা সত্ত্বেও সুদানের জন্য একটি সুবিধা হলো যে, এই বাঁধের কারণে সেখানকার নদীর পানি প্রবাহ সারা বছর ধরে একই রকম থাকবে। কারণ সাধারণত অগাস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে পানি প্রবাহ বেড়ে গিয়ে সুদানে অনেক সময় বন্যা দেখা দেয়। তাই বাঁধের কারণে সুদান কিছুটা বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে- সুদানের লাভ হওয়া সত্ত্বেও সুদান কেন এই বাঁধের বিরোধিতা করছে? তার অবশ্য দুটি কারণ রয়েছে। এক. মিশরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। দুই. সুদান মনে করছে নীল নদের পানির উপর শত্রু রাষ্ট্র ইথিওপিয়ার একবার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে সেটি হবে সুদানের জন্য হুমকিস্বরূপ। কেননা ইতোমধ্যে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার পর ব্লু নাইলের জল দৈনিক প্রায় ৯ কোটি কিউবিক মিটার কমে গিয়েছে, যা সুদানের জন্য ভালো খবর নয়।
মিশর-ইথিওপিয়া দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ
এই দ্বন্দ্ব নিরসনে অনেক আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলেও মিশর ও ইথিওপিয়া নেগোসিয়েশনে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। নিজ স্বার্থের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে উভয়ই সমঝোতায় আসতে নারাজ। এজন্যই উভয় দেশের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্ব আরও ত্বরান্বিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাগুলোকে “Futile Negotiations” বা “ব্যর্থ প্রচেষ্টা” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- এই দ্বন্দ্বের ভবিষ্যৎ কোন দিকে? এই বিতর্কের আশু সমাধান না হলে দেশগুলোর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মিশরের অর্থনীতি বর্তমানে খুব বেশি ভালো নয়। তার উপর আবার মিশরের অর্থনীতি সম্পূর্ণ নীল নদের উপর নির্ভরশীল। একই ভাবে সরকার বনাম তাইগ্রে গৃহযুদ্বের কারণে ভঙ্গুর অর্থনীতি কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে এই বাঁধ ইথিওপিয়ার জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প শুরুর দুই বছর পর ২০১৩ সালে বাঁধ তৈরিকে কেন্দ্র করে ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল মিশর। এমনকি ২০১৮ সালের দিকে মিশর ও সুদান মিলে ইরিত্রিয়ায় তাদের মিলিটারি পাঠিয়েছিল এই বাঁধ ধ্বংস করতে। মিশরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিসি বলেছেন, নীল নদের পানি নিয়ে তাদের অধিকার রক্ষায় মিশর সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত হয়েছে এই দ্বন্দ্বে। যুক্তরাষ্ট্রের এতে জড়িয়ে পড়া থেকে বোঝা যায় যে, পরিস্থিতি কতখানি গুরুতর এবং এই অচলাবস্থার অবসান কতটা জরুরি। এই অচল অবস্থা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়েছে মিশর, যা প্রথমে মানতে চায়নি ইথিওপিয়া। তবে পরে রাজি হয়েছে। উল্লেখ্য, মিশরের পাশাপাশি ইথিওপিয়াকেও যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত মিত্র মনে করে। তাই বলতে দ্বিধা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি মিত্র রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘর্ষ হলে অন্যান্য পরাশক্তিগুলোও জড়িয়ে পড়বে এই সংঘাতে। যার ভবিষ্যৎ প্রভাব পড়বে সুয়েজ খাল, হর্ন অফ আফ্রিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যি পথগুলোর নিরাপত্তা এবং এই প্রেক্ষাপটে বিরোধ কীভাবে মিটবে তার কোনো সংকেত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
আগামীর বিশ্ব রাজনীতিতে মরক্কো কেন ফ্যাক্টর
উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশ মরক্কো। দেশটি ১৯৫৬ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা পায়। দেশটিতে রাজতন্ত্র বিদ্যমান; তবে সেটি সাংবিধানিক। আরব বসন্তের প্রভাবে এবং জনগণের চাপে সংবিধান প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল মরক্কো সরকার। বাদশার পাশাপাশি একজন প্রধানমন্ত্রীও রয়েছে মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায়। নতুন সংবিধানে সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এটি একমাত্র আফ্রিকান দেশ যা আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য নয়। তবে এটি আরব লীগ, আরব মাগরেব ইউনিয়ন, ওআইসি, গ্রুপ অফ ৭৭ ইত্যাদি দেশের সদস্য। সম্প্রতি কিছু ভূরাজনৈতিক কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মরক্কোর সম্পর্ক উন্নয়ন চাচ্ছে তাই আফ্রিকার এই দেশটি এখন ন্যাটোরও মিত্র দেশ। ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো আরব রাষ্ট্র মরক্কোতে ইসরায়েল তার কূটনীতিক ভবন উদ্বোধন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন দীর্ঘদিন ধরে শত্রু হয়ে থাকা এই আরব রাষ্ট্রগুলো এখন ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে মনোনিবেশ করছে? কেন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এখন ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে? এর পেছনে ভূরাজনৈতিক কারণ কী হতে পারে?
আরব-ইসরায়েল নরমালাইজেশন
আরব রাষ্ট্রগুলোর মাতৃ সংগঠন হচ্ছে আরব লীগ। আরব লীগের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলো কখনোই দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সম্মতি দিয়েছিল। অবৈধভাবে ফিলিস্তিনিদের বসতি উচ্ছেদ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিজেদের দখলে নিচ্ছে ইসরায়েল। তাই আরব লীগের মতাদর্শ অনুযায়ী আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে কোনোরকমের সম্পর্ক বজায় না রাখার কথা। কিন্তু সেই ১৯৪৫ সালে তৈরী হওয়া আরব লীগের মতাদর্শ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে তার সদস্য রাষ্ট্রগুলো। একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিজেদের ক্ষমতার আধিপত্য ধরে রাখতে এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছু আরব রাষ্ট্র এখন আরব লীগের মতাদর্শ ভুলে গিয়ে ইসরায়েলের সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইসরায়েলের সাথে আরব লীগের সদস্যভুক্ত কোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে 'Normalization' বা 'সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ'।
বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই 'Normalization' টার্মটি বহুল আলোচিত। ধরুন, আরব লীগের একটি সদস্য রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করল, তখন এই সম্পর্কটিকে কূটনৈতিক অঙ্গনে বলা হচ্ছে "Arab- Isreal Normalization"। আরব লীগের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে নিয়ম ভেঙে সর্বপ্রথম ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় মিশর। এরপর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে জর্ডান। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সুদান এই রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে আগায়। আরব দেশ হিসেবে সর্বশেষ ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে মরক্কো। ২০২১ সালের আগস্টে ইসরায়েলের সাথে মরক্কোর তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী এখন থেকে মরক্কো ও ইসরায়েলের মধ্যে বিমান চলাচল শুরু হবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হবে। ক্রীড়া, যুব ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে- মরক্কোর সাথে ইসরায়েল কেন সম্পর্ক স্থাপন করল? এর পেছনে মোটাদাগে তিনটি কারণ প্রতীয়মান।
প্রথমত, ইসরায়েলি প্রযুক্তি পেগাসাস সম্পর্কে ইসরায়েল অধ্যায়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। গবেষণায় উঠে এসেছে পেগাসাসের মতো উন্নত ফটওয়্যার ব্যবহার করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ মরক্কোতে বসে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর উপর নজরদারি করে। ইউরোপের প্রায় সবগুলো রাষ্ট্রই ইসরায়েলের মিত্র রাষ্ট্র। তাই ইসরায়েলের গোয়েন্দারা ইউরোপে গিয়ে ইউরোপীয় কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের উপর নজরদারি করে ধরা পড়ে গেলে ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। আর সেটি ইসরায়েলের জন্যও নিরাপদ নয়, যেহেতু ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলোও প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নত। তাই নিরাপদ দূরত্বে বসে গোটা ইউরোপকে নজরদারি করার জন্য ইসরায়েলের প্রয়োজন একটি সেইফ জোন। সেই নিরাপদ জায়গা হিসেবে মরক্কো হচ্ছে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। আফ্রিকা মহাদেশের দেশ মরক্কো এমন এক ভৌগোলিক স্থানে অবস্থিত যেখানে বসে সহজেই গোটা ইউরোপকে নজরদারি করা যায়। কারণ মরক্কো থেকে ইউরোপের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটারের জিব্রাল্টার প্রণালি। এজন্য ইসরায়েলের প্রয়োজন মরক্কোকে। তাছাড়াও বাণিজ্যিক স্বার্থ তো আছেই। তার মধ্যে সুয়েজ খাল, জিব্রাল্টার প্রণালির মধ্যে দিয়ে বাণিজ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন হতে পারে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক করে মরক্কোর লাভ কি? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি সাধারণ নিয়ম হচ্ছে যে, কোনো একটি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো করা মানেই স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল-এর সাথেও সম্পর্ক ভালো হয়ে যাওয়া। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ভালো তাই ইসরায়েলের সাথেও সৌদির সম্পর্ক ভালো। একই ভাবে ইসরায়েলের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা মানেই স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়ে যাওয়া। যেমন- ইসরায়েলের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও ভারতের সম্পর্ক ভালো। তাই মরক্কো এই সুযোগটিই নিয়েছে। ইসরায়েলের সাথে মরক্কো তার সম্পর্কটি ভালো করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মরক্কোর একটি ভালো সম্পর্ক অটোমেটিক গড়ে উঠবে। তারপর মরক্কো সরকার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে একসাথে নিয়ে বিতর্কিত সাহারা অঞ্চলটি নিজেদের দখলে রাখতে পারবে। মরক্কো, আলজেরিয়া ও মৌরিতানিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে সাহারা অঞ্চলটি অবস্থিত। এমনকি ১৯৭৫ সালে পশ্চিম সাহারার অধিকাংশ অঞ্চল মরক্কো নিজের বলে দখল করে নিয়েছিল। এই বিতর্কি অঞ্চলটির দখল নিয়ে মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার ও মৌরিতানিয়ার একটি দ্বন্দ্ব চলা। ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে মরক্কো চাচ্ছে সম্পূর্ণ এই অঞ্চলটি আমেরিকার মাধ্যমে তাদের দখলে নিয়ে নিতে। পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসাই দেশটির উদ্দেশ্য।
তৃতীয়ত, মরক্কো একটি আরব বা ইসলামি রাষ্ট্র হলেও সেখানে প্রায় তিন লক্ষ ইহুদি বসবাস করছে। প্রশ্ন হচ্ছে মুসলিম দেশে এত সংখ্যক ইহুদি আসল কোথা থেকে? পনেরো শতকে স্পেনে ইহুদি নিধন শুরু হলে হাজার হাজার ইহুদি জিব্রাল্টার প্রণালি পাড়ি দিয়ে মরক্কোতে আশ্রয় নিয়েছিল। সে-কারণেই মরক্কোতে আজ এত ইহুদি জনগণের বসবাস। সেই তিন লক্ষ ইহুদি জনগণের নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েল মরক্কোর সাথে সম্পর্ক তৈরি করার আরেকটি কারণ হতে পারে। তাছাড়াও আজকের একুশ শতাব্দীতে এসে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল ও আমেরিকাকে পাশে পেলে মরক্কোর জন্যই লাভ বলে মনে করছে দেশটির কূটনীতিবিদরা। তাই Arab Isreal Normalizationটিকে মরক্কো তাদের একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার মানে হলো ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া। অথচ আরব দেশগুলোর মধ্যে বহু বছরের একটি ঐকমত্য ছিল। সেটি হচ্ছে, ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক একমাত্র ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার মাধ্যমেই হতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা যখন পূর্ব জেরুজালেমে আর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মধ্যে দুঃসহ দিন কাটাচ্ছে তখন ইসরায়েল এই আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করছে। একই ভাবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও ভূরাজনৈতিক কারণে আরব রাষ্ট্রগুলো একেক করে ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক স্থাপন করছে এবং ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দিচ্ছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোও নিজ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক নরমালাইজেশনের পথে হাঁটবে। যে-সকল আরব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের বিরোধিতা করে আসছে তারাই এখন সময়ের প্রয়োজনে ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, যা ইসরায়েলের কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি মাইলফলক। ইসরায়েলের ন্যাশনাল পলিটিক্সে "Iron Wal Trap" নামে একটি পরিভাষ আছে। এর মানে হলো, ইসরায়েল আয়রন ওয়াল বা লৌহ প্রাচীরের কৌশলে বিশ্বাসী। এই কৌশলের মূল কথা হচ্ছে, ইসরায়েলকে এতটাই উন্নত ও শক্তিশালী হতে হবে যে, যাতে করে শেষ পর্যন্ত আরবরা বুঝতে পারে ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আর এখন একুশ শতাব্দীতে এসে ইসরায়েল সেটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে পারছে। এজন্যই বলা হয় একটি রাষ্ট্রকে সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্য শুধু দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতিই যথেষ্ট।
"Fifth Column" নামে আরেকটি পরিভাষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই ফিফথ কলামের মানে হলো, একটি দেশের বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী সেই দেশের অনুগত না হয়ে অন্য আরকটি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত হয়। উদাহরণস্বরূপ: ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ইরান দাবি করত বাহরাইন তাদের দেশেরই অংশ। ইরান একটি শিয়া মুসলিম প্রধান দেশ। অন্যদিকে বাহরাইনের শাসকগোষ্ঠী সুন্নি হলেও দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিয়া। তাই বাহরাইনের সুন্নি শাসকরা তাদের দেশে বসবাসরত শিয়া জনগোষ্ঠীকে ইরানের মিত্র হিসেবে ভাবেন। ইরানের সাথে জনগোষ্ঠীর সাথে ইরানের যোগসাজশের ব্যাপারটি "Fifth Column" হিসেবে পরিচিত। আজকে বাহরাইনের শিয়া উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও বাহরাইনের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তার জন্য এটিও একটি অন্যতম কারণ। তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদিকে কেন্দ্র করে আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বিভাজন সেটিকে ইসরায়েল তার সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে এবং সেটিকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রগুলোকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসতে পারছে।
তিউনিসিয়ার সংকট ও ভূরাজনীতি
আরব বসন্তের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত তিউনিসিয়া। দেশটি ১৮৮১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময় (পঁচাত্তর বছর) ফ্রান্সের একটি উপনিবেশ ছিল। উপনিবেশবাদী শক্তি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিল তৎকালীন তিউনিসিয়ার একটি রাজনৈতিক দল। সেই রাজনৈতিক দলটির নাম হলো 'New-Destour' বা নব্য দোস্তর। ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্য রাজনৈতিক দল কংগ্রেস যে রকম ভূমিকা পালন করেছিল কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যে ভূমিকা পালন করেছিল ঠিক সেরকম তিউনিসিয়ার স্বাধীনতার জন্য দোস্তর দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৫৬ সালে তিউনিসিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদী নেতা হাবিব বোরগুইবা তিউনিসিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। হাবিব বোরগুইবা ১৯৫৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিউনিসিয়াকে শাসন করেন। তার শাসনামলে তিউনিসিয়া একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হলেও তিনি মূলত তিউনিসিয়াকে একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় (A Single Party State) পরিণত করেন। হাবিব বোরগুইবার পর ১৯৮৭ সালে তিউনিসিয়ার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হন জাইন আল আবেদিন বেন আলী। ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত স্বৈরশাসক বেন আলী তিউনিসিয়াকে শাসন করেন।
বেন আলীর শাসনামলে তিউনিসিয়া অনেক সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। তখন গ্রাজুয়েশন শেষ করা যুবকদের জন্য ছিল না কোনো চাকরি, রাষ্ট্রের আমলারা হয়ে ওঠে দুর্নীতিপরায়ণ, ছিল না মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ছিল অনেক। রাষ্ট্রের এই বেহাল দশার জন্য তিউনিসিয়ার সকল নাগরিক বেন আলীর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেই সময়টিতে বুআজিজি নামে তিউনিসিয়ার এক শিক্ষিত যুবক গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যা করেন। বুআজিজির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি পুরো তিউনিসিয়া জুড়ে স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের তোপে ১৪ জানুয়ারি বেন আলী তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি নেন এবং পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। তিউনিসিয়ার এই আন্দোলনটাই ইতিহাসে "আরব বসন্ত" হিসেবে পরিচিত। স্বৈরাচার বেন আলীর পতনের পর ২০১৪ সালে তিউনিসিয়া একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। স্বাধীনতার পর ১৯৫৭ থেকে ২০১৪ সালের নতুন সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত এই সময়টি 'First Republic' হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ ফার্স্ট রিপাবলিক পিরিয়ডে তিউনিসিয়াকে হাবিব বোরগুইবা ও বেন আলী শাসন করেছিলেন। আর ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই সময়টি তিউনিসিয়ার জন্য 'Second Republic' হিসেবে পরিচিত।
স্বৈরশাসক বেন আলীর পতনের পর ২০১৪ সালে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সংবিধানে ঠিক করা হয় রাষ্ট্রের নতুন শাসন ব্যবস্থা। সংবিধান অনুযায়ী ২০১৪ সালের ডিসেম্বরেই তিউনিসিয়া একটি নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিউনিসিয়ার প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ বাজি কায়িদ সাবসি। এক কথায় নতুন এই সংবিধান ও নির্বাচনের মাধ্যমে তিউনিসিয়া গোটা আরব বিশ্ব এবং উত্তর আফ্রিকার একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট কায়িদ সাবসি এর রাজনৈতিক দলের নাম ছিল নিদা তাউনিস (Nidaa Tounes)। সেকুলারিজমে বিশ্বাসী এই দলটি ছিল কিছুটা সমাজতন্ত্র ঘেঁষা। কায়িদ সাবসি এর মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিউনিসিয়ার দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হন কায়েস সাইয়েদ। ব্যক্তি জীবনে আইনজীবী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ এর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। একজন নিরপেক্ষ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিউনিসিয়ায় তার জনপ্রিয়তা অনেক।
২০২১ সালে করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের কারণে তিউনিসিয়ার বেশ কয়েকটি শহরে লাখ লাখ মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করে। তিউনিসিয়াতে সরকার বলতে মূলত প্রধানমন্ত্রীকেই বোঝায়। জনগণের লাগাতার আন্দোলন দেখে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট তখন প্রধানমন্ত্রীকে কয়েকবার সতর্ক হওয়ার জন্য বলেছিলেন এবং এটিও বলেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন তাহলে তাকে প্রধানমন্ত্রী থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। অবশেষে বিক্ষোভের মুখে ২০২১ সালের ২৫শে জুলাই তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিচাম মেচিচিকে বরখাস্ত করে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে দেন প্রেসিডেন্ট কায়েস সায়িদ। এখন দুইটি প্রশ্ন হতে পারে :
এক. বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে প্রেসিডেন্ট যদি কখনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যায় তাহলে প্রধানমন্ত্রী ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট সে-দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও কেন তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন নি? দুই. প্রেসিডেন্ট গণ আন্দোলনের তোপে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্টের স্পিকারকে বহিষ্কার করেছেন। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা কোথায় পেল? তিউনিসিয়াতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বেশি নাকি প্রধানমন্ত্রীর?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পদ্ধতি এবং প্রেসিডেন্ট- প্রধানমন্ত্রী কার কতটুকু ক্ষমতা এই দুইটি বিষয় জানতে হবে। শুধু উপরিউক্ত দুইটি প্রশ্নের ক্ষেত্রেই নয় বরং ২০১৪ সালের পর থেকে তিউনিসিয়ার যে-কোনো রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা সংকটকে সহজেই বিশ্লেষণ করা যাবে তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক সিস্টেমটি দিয়ে। তিউনিসিয়া যেহেতু ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে তাই তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক সিস্টেমটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক সিস্টেমের আদলে গড়া। দেশটিতে Semi Presidential System থাকায় প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রায় সমান। তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী প্রতি পাঁচবছর পরপর তিউনিসিয়াতে একটি নয় বরং একসাথে দুইটি নির্বাচন হয়।
First Election: প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
প্রথমে শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করা হয়। নির্বাচনে যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মোট ভোটের অর্ধেকের বেশি (৫০ শতাংশ) ভোট পাবেন সেই হবেন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট। এখন মনে করুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি কোনো প্রার্থীই ৫০% ভোট না পায় অর্থাৎ কোনো একজন প্রার্থী পেল ২৩% ভোট, আরেকজন পেল ৩৪%, আরেকজন পেল ২৮% ভোট। তখন যে দুই জন প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে তাদের নিয়ে আবার দ্বিতীয় রাউন্ড নির্বাচন হয়। এক কথায় নির্বাচনে কোনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীই অর্ধেকের বেশি ভোট না পেলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া এমন দুইজনকে নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড ভোটের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় রাউন্ড ভোটে দুইজনের যে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবে সেই হবে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট। এভাবে দুইবার ভোটের মাধ্যমে একজনকে প্রেসিডেন্ট বানানোর সিস্টেমকে বলা হয় 'Runoff Voting System'।
Second Election: পার্লামেন্টারি নির্বাচন
প্রথম ইলেকশনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তিন মাস পর তিউনিসিয়ার নির্বাচন কমিশন আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনটি হচ্ছে পার্লামেন্টারি বা সংসদীয় নির্বাচন। তিউনিসিয়াকে মোট ২১৭টি নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। তাই তিউনিসিয়ার সংসদ বা পার্লামেন্টের মোট আসন সংখ্যা হলো ২১৭টি। তিউনিসিয়ার যে রাজনৈতিক দল থেকে মেজরিটি সংখ্যক প্রতিনিধি আসবে তারাই হলেন পার্লামেন্টের বিজয়ী দল। আর এই বিজয়ী দলের নেতা হলেন তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট এককক্ষ বিশিষ্ট। পার্লামেন্ট বা সংসদের নাম হলো Assembly of the People's Representatives। পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে এই ২১৭ জন সদস্যদের ভোটাভুটিতে একজনকে সংসদের স্পিকার বানানো হয়। এই ২১৭ জন সদস্যদের মধ্যে যেহেতু অর্ধেকের বেশিই সরকারি দলের সদস্য, তাই মূলত সরকারি দলের একজন সদস্যই স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকারের পদটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিউনিসিয়ার স্পিকারকে বলা হয় 'ex officio Vice-President'। এর মানে হলো কোনো কারণে প্রেসিডেন্ট অযোগ্য বিবেচিত হলে কিংবা মারা গেলে তখন তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। মনে করুন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কোনো কারণে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হলেন। স্পিকার তখন প্রেসিডেন্ট হবেন। স্পিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ৪৫ দিন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তারপর ৪৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন আরেকটি প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনের আয়োজন করবেন।
Power Distribution (ক্ষমতার বণ্টন)
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা: (ক) Head of State: তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। (খ) Overseas Defence: অন্য রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ কিংবা বহিঃদেশের আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের। (গ) National Security: তিউনিসিয়াকে গৃহযুদ্ধ, জঙ্গি হামলা ইত্যাদি থেকে রক্ষা করার দায়িত্বও প্রেসিডেন্টের। (ঘ) Foreign Policy: তিউনিসিয়ার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্ট। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই দুইজনের নিয়োগে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা থাকে। (ঙ) Dissolving Parliament: তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতাটি অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা ঠিকমতো দেশ চালাতে পারছে না তাহলে যে-কোনো সময় প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পারেন এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও স্পিকারকে বরখাস্ত করতে পারেন। ঠিক এই কারণে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। প্রেসিডেন্টের এই সাংবিধানিক ক্ষমতাবলেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে পেরেছেন। (চ) Commander in Chief: প্রেসিডেন্ট হলেন তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ। সেনাবাহিনীরা সাধারণত প্রেসিডেন্ট এর আজ্ঞাবহ।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা
তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন সে দেশের সরকার প্রধান। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছাড়া বাকি সকল মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী তার পছন্দমতো নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রায় সকল পলিসি প্রধানমন্ত্রীই নিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখাশুনা, কোনো আইনের সংশোধন এসব মূলত প্রধানমন্ত্রীর হাতেই।
প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর উপরিউক্ত ক্ষমতার ভারসাম্য দেখে মনে হতে পারে সবই তে ঠিকঠাক আছে। তাহলে তিউনিসিয়াতে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট এর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধে কী নিয়ে? তিউনিসিয়ার বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট এর পদ নিয়ে যে সংকটটি চলছে সেটি কিংবা ভবিষ্যতে যদি তিউনিসিয়ায় কোনো বড় ধরনের সংকট দেখা দেয় তাহলে এসব সংকট খুবই সহজে আপনি অনুধাবন করতে পারবেন তিউনিসিয়ার উপরিউক্ত Semi Presidential System'টি বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে।
উপরে দেখেছিলাম এই সেমি প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম এর কারণে তিউনিসিয়ায় দুইটি নির্বাচন হয়- প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, পার্লামেন্ট নির্বাচন। এখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনে করুন 'নীদা তাউনিস' পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলো। তারপর পার্লামেন্ট নির্বাচনে মনে করুন নীদা তাউনিস পার্টি জয়ী হলো না বরং জয়ী হলো আন নাহদা পার্টি। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হলেন নীদা তাউনিস পার্টি থেকে আর প্রধানমন্ত্রী হলেন আন নাহদা পার্টি থেকে। আমরা যতই বলি না কেন রাজনীতি হলো জনগণের মঙ্গলের জন্য, আসলে রাজনীতির মূলে রয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ বা দলের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এজন্য দুই পার্টি থেকে দুজন ক্ষমতা আসায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন, পলিসি ও নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং এটাই স্বাভাবিক। আর কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন ভিন্ন দুটি রাজনৈতিক দল থেকে আসলে সেটিকে বলা হয় 'Cohabitation'।
ভবিষ্যতে কখনো যদি তিউনিসিয়াতে কোনো সংকট দেখা দেয় তাহলে আপনি শুধু দুইটি বিষয় সামনে নিয়ে আসবেন। এক. সেমি প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেমটি, দুই. প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কোন রাজনৈতিক দলের। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই কি একই রাজনৈতিক দলের নাকি ভিন্ন ভিন্ন দলের। যদি দেখেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের তাহলে বুঝবেন তিউনিসিয়ার সংকটটি মূলত তিউনিসিয়ার Semi Presidential System এর কারণেই। আর যদি দেখেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ই একই দলের তাহলে সংকটটি এই পলিটিক্যাল সিস্টেমের জন্য নয় বরং ভূরাজনৈতিক কারণে। একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, তিউনিসিয়ার জনগণ যখন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তখন প্রেসিডেন্ট তিউনিসিয়ার জনগণের পক্ষে অবস্থান করবে নাকি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে? উত্তর তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট যতবার ইচ্ছে ততবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। তাই দ্বিতীয় টার্মে জয়ী হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে জনগণের পক্ষেই অবস্থান করতে হয়। ২০২৪ সালে তিউনিসিয়াতে আবার প্রেসিডেনয়িশাল নির্বাচন হবে। ২০২৪ সালের সেই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্যই প্রেসিডেন্টকে তিউনিস জনগণের পক্ষ নিয়ে সংসদ ভেঙে দিতে হয়েছে। তাই তিউনিসিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পেছনে কিছুটা ভূরাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও মূল সংকটটি তিউনিসিয়ার পলিটিক্যাল সিস্টেমের কারণেই তৈরি হয়েছে।
তিউনিসিয়া নিয়ে ভূরাজনীতি
এবার কিছুটা ভূরাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা যাক। উত্তর পূর্ব আফ্রিকার পাঁচটি দেশ হলো মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো। একমাত্র মরক্কো ছাড়া বাকি চারটি দেশই একসময় উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে উসমানীয় সাম্রাজা বিলুপ্ত হওয়ার পর উত্তর আফ্রিকার এই দেশগুলো ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হাতে চলে যায়। এখন উত্তর আফ্রিকার এই দেশগুলো নিয়ে তিনটি এলায়্যান্স দেখা দিয়েছে।
এক. উত্তর আফ্রিকার এই মুসলিম দেশগুলো যেহেতু পূর্বে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল তাই তুরস্ক এখন চাচ্ছে এসব অঞ্চলে তার আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে। দুই. মিশর যেহেতু উত্তর আফ্রিকার দেশ তাই মিশর চাচ্ছে এখান থেকে তুরস্কের কর্তৃত্ব হটিয়ে এখানে মিশরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে।
তিন. মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে বিগত কয়েকবছর ধরে একটি পোলারাইজেশন তৈরি হয়েছে ইরান ও সৌদিকে কেন্দ্র করে। এতদিন মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে ইরান ও সৌদি ছন্দে লিপ্ত ছিল এবং এখনো চলমান। কিন্তু এখন এই ইরান-সৌদির দ্বন্দ্বকে ছাড়িয়ে নতুন আরেকটি বলয় তৈরি হয়েছে সেটি হলো- কাতার বনাম সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বন্দ্ব। কাতার ও আরব আমিরাত উভয়ই এখন চাচ্ছে এই অঞ্চলের হেজিমন হয়ে উঠতে। তাই উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো নিয়ে কাতার যোগ দিয়েছে তুরস্কের পক্ষে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত যোগ দিয়েছে মিশরের পক্ষে। চার. ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তিউনিসিয়ার আন নাহদা পার্টি এগুলোকে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সিকিউরিটির জন্য হুমকি হিসেবে মনে করে। তাই মিশরে যেন মুসলিম ব্রাদারহুডের পুনরায় উত্থান না হয় এবং তিউনিসিয়ায় যেন আন নাহদা পার্টিকে দমিয়ে রাখা যায় সেজন্য পশ্চিমা দেশগুলো উত্তর আফ্রিকার ইস্যুতে মিশরের পক্ষ নিয়েছে (তথা মিশর + সংযুক্ত আরব আমিরাত + যুক্তরাষ্ট্র এক ব্লকে। আর তুরস্ক + কাতার বিপরীত ব্লকে)।
Question to think about?
একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে কোন দেশই নিজেকে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। এক্ষেত্রে অনেক দেশের যুদ্ধ করার মতো সামর্থ্যও থাকে না। ইথিওপিয়া-মিশর এর মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্ব একটি যুদ্ধের আভাস দিচ্ছে। এখন এই সংকটটি যুদ্ধ ব্যতীত কীভাবে সমাধান করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Tareke, Gebru (2013), The Ethiopian Revolution: War in the Horn of Africa, Yale University Press
2. Olopade, Dayo (2014), The Bright Continent: Breaking Rules and Making Change in Modern Africa, Houghton Mifflin Harcourt
3. Davis, Cornelia E. (2019), Three Years in Ethiopia: How a Civil War and Epidemics Led Me to My Daughter, Konjit Publications
4. Schmidt, Elizabeth (2013), Foreign intervention in Africa: From the Cold War to the War on Terror, Cambridge University Press
5. Stenner, David (2019), Globalizing Morocco: Transnational Activism and the Postcolonial State, Stanford University Press
6. Burgis, Tom (2016), The Looting Machine: Warlords, Oligarchs, Corporations, Smugglers, and the Theft of Africa's Wealth, Public Affairs
📄 জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
একবিংশ অধ্যায় Theme: Afghanistan: The Wrong Enemy
জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
"The civil war in Afghanistan began as a civil war between Afghans and it will end as an agreement between Afghans." - Fred Halliday
ভূমিকা: একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির বিশাল একটি অংশ দখল করে আছে দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধপীড়িত দেশ আফগানিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসেই আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করেছেন। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানদের পুনরুত্থান এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক পটভূমি উন্মোচন করেছে। তালেবানদের সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-কায়দার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটা খুব অনুমেয় যে, আফগানিস্তানে আল-কায়দা এবং তার মতাদর্শী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হতে পারে। তালেবান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আল-কায়দার যদি পুনরুত্থান হয় তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব জানা সত্ত্বেও কেন জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সকল সেনা প্রত্যাহার করে নিলেন? আফগানিস্তান ঘিরে আমাদের এরকম অনেক কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে কতগুলো ফ্যাক্টর এনালাইসিস করতে হবে। আমাদেরকে জানতে হবে আফগানিস্তানের সরকারব্যবস্থা, জানতে হবে স্বাধীনতার পূর্বে শতকের পর শতক ধরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আফগানদের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস, জানতে হবে স্বাধীনতার পর কীভাবে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা, সেই গৃহযুদ্ধ থেকে কীভাবে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শুরু, জানতে হবে তালেবান আসলে কারা এবং কীভাবে উত্থান হলো আল-কায়দার এবং সর্বশেষ জানতে হবে কেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের হামলা হলো। আফগানিস্তানের স্বাধীনতা পূর্ব ইতিহাস থেকে শুরু করে আজকের একুশ সাল পর্যন্ত পুরো ইতিহাসটি কয়েকটি পর্বে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
স্বাধীনতা পূর্ব আফগানিস্তান
আফগানিস্তান। এই অঞ্চলটি নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দখল, বেদখল ও লড়াই যুগের পর যুগ ধরে চলছে। আফগানদের মননে মগজে বিদেশি আধিপত্যবাদ বিরোধী যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেটা শুধু গত কয়েক দশকেই গড়ে ওঠেনি। এজন্য আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে আফগানদের সেই পুরোনো ইতিহাসে। আফগানদের সাথে লড়াইয়ে টিকতে পারেনি আলেকজান্ডার, মুঘলরা, ব্রিটিশরা, রুশরা এবং সর্বশেষ এখন মার্কিনীরাও।
০১. আফগানিস্তানে উত্থান পতন ঘটতে থাকে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের: আফগানিস্তান একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বহু পূর্বে অনেক সাম্রাজ্য ও রাজ্যের শাসকরা আফগানিস্তানকে দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই বেশিদিন আফগানিস্তানে স্থায়ী হতে পারেনি। এখানে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল গ্রেকো-বারট্রিয়ান, কুশান, হেফথালিটিস, কাবুল শাহী, সাফারি, সামানি, গজনভী, ঘুরি, খিলজি, কারতি, মুঘল, ও সবশেষে হুতাক ও দুররানি সাম্রাজ্যের মতো বাঘা বাঘা সাম্রাজ্যের। স্থানীয় আফগানদের সাথে লড়াইয়ে কেউ টিকতে পারেনি। একেক করে বিদায় নিতে হয়েছে সবাইকে।
০২. আলেকজান্ডারের আগমন: বর্তমান আফগানিস্তান অঞ্চলটির পূর্ব নাম ছিল আরিয়ানা। অর্থাৎ তখন আফগানিস্তান বলতে 'আরিয়ানা' বোঝাতো। এই আরিয়ানা এলাকায় ২০০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের পর মধ্য এশিয়া থেকে আর্যরা আসে। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আর্যদের কাছ থেকে পারস্য সাম্রাজ্যের তৎকালীন সম্রাটরা আরিয়ানা দখল করে নেয়। পারস্যের সম্রাটকে আবার পরাজিত করে আলেকজান্ডার ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আরিয়ানা দখল করে নেয়। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার কুশান জাতি আরিয়ানা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ৪র্থ শতাব্দীতে এই কুশানদের আবার পরাজিত করে আরিয়ানা দখল করে নেয় হুন নামের মধ্য এশীয় এক তুর্কি জাতি। ৩য় থেকে ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত আরিয়ানার প্রধান ধর্ম ছিল বৌদ্ধধর্ম। ঐসময়কার অনেক বৌদ্ধমন্দিরের ধ্বংসস্তূপ এখনো আপনি আফগানিস্তানে দেখতে পাবেন।
০৩. আরবদের আগমন ও ইসলাম প্রচার: তারপর খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে আরব সৈন্যরা আরিয়ানায় আসে। এই অঞ্চলের উত্তর- পশ্চিমাংশ (বর্তমান হেরাত ও সিস্তান প্রদেশ) আরবরা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে এবং তারা এখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করে। আরবদের প্রভাবে অনেক স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু কিছুদিন পর আরবরা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে গেলে অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দারা ইসলাম ধর্ম ছেড়ে পুনরায় বৌদ্ধ ধর্মে ফিরে যায়।
০৪. গজনভী রাজবংশের পর ঘুরিদের উত্থান: আরবরা চলে যাওয়ার পর সামানিদ নামের আরেক মুসলিম শাসকবংশ আফগান এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে। পরবর্তীতে ১০ম শতাব্দীতে আফগানিস্তানের পূর্বাংশে (বর্তমান গজনীতে) গজনভী রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। গজনীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা মাহমুদ গজনভী আশেপাশের হিন্দু রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র আফগানিস্তানে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করেন। মাহমুদের হাত ধরে গজনী সাহিত্য ও শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং মাহমুদ অনেক বুদ্ধিজীবীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তন্মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল বিরুনী ও কবি ফেরদৌসী। গজনীর রাজা মাহমুদের মৃত্যুর পর ১২শ শতাব্দীতে ঘুরিরা পশ্চিম-মধ্য আফগানিস্তানের ঘুর শহরে ঘুরি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে।
০৫. চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং এর আগমন: তারপর মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজমি শাহেরা এই ঘুরিদেরকে এখান থেকে পরাজিত করে ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম আফগানিস্তানে খোয়ারিজমি শাসন প্রতিষ্ঠা করে। খোয়ারিজমিরাও বেশিদিন টিকতে পারেনি। মোঙ্গল সেনাপতি চেঙ্গিস খান ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দে এই অঞ্চল থেকে খোয়ারিজমিদের উৎখাত করে। চেঙ্গিস খানের পর এখানে আসে তৈমুর লং। ১৪শ শতাব্দীর শেষে মধ্য এশীয় সেনাপতি তৈমুর লং আফগানিস্তান জয় করে নেন।
০৬. মুঘল সাম্রাজ্যের জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবরও কাবুল দখল করতে এখানে আসেন: মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লঙের বংশধর জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবর ১৬শ শতাব্দীর প্রারম্ভে এখানকার আরঘুন রাজবংশের কাছ থেকে বর্তমান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করেন। ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে ভারতে অবস্থিত মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাটরা এবং পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের রাজারা এই আফগানিস্তানের দখল নিয়ে দুই শতক যুদ্ধ করেন। তখন মুঘলদের দখলে চলে যায় কাবুল, আর পারস্যের সাফাভিদ রাজবংশের রাজাদের দখলে চলে যায় হেরাত অঞ্চল। কান্দাহার একেক সময় একেকজনের দখলে থাকত।
০৭. সবশেষে হুতাক ও দুররানি শাসন: তারপর ১৭শ সালের প্রারম্ভে স্থানীয় ঝিলজাই গোত্রের নেতা মিরওয়াইস হুতাক এখান থেকে পারস্যের সাফাভিদদের পরাজিত করে হুতাক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। হুতাক শাসনের তিন দশক পরেই ১৭৪৭ সালে আহমদ শাহ দুররানি কান্দাহার শহরকে রাজধানী করে এখানে দুররানি সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। দুররানির মৃত্যুর পর তার পুত্র তৈমুর শাহ দুররানি কান্দাহার থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে কাবুলে নিয়ে আসেন।
০৮. আবির্ভাব হলো স্বাধীন আফগানিস্তানের: দুররানি সাম্রাজ্যের পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফগানিস্তান সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। ব্রিটিশদের সাথে আফগানদের তিন তিনটি যুদ্ধ হয়। প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ; ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২। দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ; ১৮৭৮ থেকে ১৮৮০। অবশেষে ১৯১৯ সালের 'তৃতীয় ব্রিটিশ আফগান যুদ্ধ' শেষে আফগানিস্তান যুক্তরাজ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। রাওলাপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন আফগানিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাই বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম স্বাধীন দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান।
স্বাধীনতা উত্তর আফগানিস্তান
এই পর্বে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যেভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যে-কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করেছিল, যেভাবে হয়েছিল মুজাহিদদের (পরবর্তীতে তালেবান) উত্থান এবং সর্বশেষ আলোচনা করব আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে।
০১. স্বাধীনতার পর রাজা জহিরের শাসন: ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজা জহির শাহ আফগানিস্তান শাসন করেন। রাজা জহির শাহের শাসনামলে আফগানিস্তানের ব্যাপক উন্নতি না হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক বহুতল ভবনের, ছিল নারীদের অধিকার, অন্যান্য দেশের সাথে ছিল মজবুত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। জহির শাহের সাথে যুক্তরাষ্ট্রেরও ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ১৯৩৪ সালে জহির শাহের নেতৃত্বে আফগানিস্তান 'লিগ অব নেশনস'র সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৭৩ সালে জহির শাহ চোখের চিকিৎসা করাতে ইতালি যান। আর এ সুযোগে তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ দাউদ খান অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেন।
০২. রাজা জহিরের পতন ও গৃহযুদ্ধের সূচনা: ১৯৭৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাজা জহিরের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসলেন দাউদ খান। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সাথে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিয়ে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যদিকে আমেরিকা আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করে।
০৩. যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখলের পরিকল্পনা করে: রাজা জহিরের পতন ও গৃহযুদ্ধ শুরুর এই সময়টি কিন্তু আশির দশক। সোভিয়েত বনাম আমেরিকার মধ্যকার চলা স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। পুঁজিবাদে বিশ্বাসী আমেরিকা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। সেই সময়টায় তথা ১৯৭৯ সালের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আফগানিস্তান রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে।
০৪. শুরু হলো সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত): এখন প্রশ্ন হচ্ছে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে হামলা করবে? উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কেমেনিস্তান ও কিরগিজিস্তান নামে মধ্য এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলো তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর মানচিত্রে তাকালে দেখবেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার এই রাষ্ট্রগুলোর সাথেই আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। তাই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র তার মিলিটারি ঘাঁটি গেঁড়ে খুবই সহজে সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত এই রাষ্ট্রগুলোতে হামলা করবে বলে ধারণা করেছিল সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা 'কেজিবি'। পরবর্তীতে 'কেজিবি' সোভিয়েত সরকারকে জানায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত হবে না আফগানিস্তানকে হাত ছাড়া করা। আর এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানিস্তান অপারেশন শুরু করে।
০৫. সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানকে প্রায় দখল করে নেয়: প্রবল পরাক্রমশালী তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনীর কাছে পরমাণু বোমা থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সব রকম সমরাস্ত্র ছিল। তাই ধারণা করা হচ্ছিল খুব সহজেই সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে। এমনকি আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাও ধারণা করেছিল সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান দখল করে নেবে খুব সহজেই। কয়েক মাসের মধ্যে এটা সত্যও প্রমাণিত হচ্ছিল কারণ প্রায় পুরো আফগানিস্তানেই সোভিয়েত সেনাবাহিনী নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েতের পক্ষে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা আফগানিস্তানের একদম ভেতরে প্রবেশ করা কখনোই সহজ ছিল না এবং এর চাইতেও দুরূহ কাজ ছিল আফগানিস্তানের দখল করা জায়গাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
০৬. উত্থান হলো আফগান মুজাহিদিনদের: নিজ দেশে সোভিয়েত বাহিনীর হামলা মেনে নিতে পারেনি সাধারণ আফগানরা। সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে তখন গড়ে ওঠে ছোট ছোট কিছু আফগান গোষ্ঠী। শত বছরের আফগান ইতিহাস থেকেই আমরা দেখেছিলাম স্বাধীনতার পূর্বে কীভাবে আফগানরা ঔপনেবেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। গ্রিক আমি আলেকজেন্দার দ্যা গ্রেট থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে আফগানরা অনেক আগে থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অতএব আমরা বুঝতে পারি বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং নিজ ভূখণ্ডকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াস আফগানদের একটি ঐতিহ্যগত বিষয়। এর ফলে বিশাল শক্তিধর সোভিয়েত রেড আর্মি আফগান এই ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এই ছোট ছোট বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে বলা হতো আফগান মুজাহিদিন; যার একাংশ পরবর্তীতে তালেবান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
০৭. আমেরিকার অনুপ্রবেশ: যেহেতু তখন আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তখন এই অঞ্চলে সোভিয়েত আধিপত্যকে রুখে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি আদর্শিক বিষয় ছিল। তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মুজাহিদিনদের সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছিল। সিআইএ তখন এটাও বিশ্বাস করেছিল যে, আমেরিকা যদি মুজাহিদিনদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে তাহলে এই আফগানরা রাশিয়ার সাথে হয়তো আজীবন যুদ্ধ করে যাবে। আফগানদের পুরোনো ইতিহাস ঘেঁটে আমেরিকা নিশ্চিত হলো যে, দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আফগানিস্তানকে মুক্ত করতে মুজাহিদিনরা অবশ্যই যুদ্ধ করবে। তাই সিআইএ মুজাহিদিনদের সোভিয়েত বিরোধী লড়াই ত্বরান্বিত করার জন্য ধর্মের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। আমেরিকা এই মুজাহিদিনদেরকে মুক্তিযোদ্ধা (Freedom Fighters) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
০৮. যেভাবে ধর্মকেও পুঁজি করেছিল আমেরিকা: আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা CIA বুঝতে পারে, আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ অনেক ধর্মভীরু। এমনকি আফগানরাও মনে করত সমাজতন্ত্রের অনুসারী সোভিয়েত ইউনিয়ন ধর্মে বিশ্বাসী নয়। সোভিয়েতরা নাস্তিক। তাই সাধারণ আফগানরাও ভয়ে ছিল সোভিয়েত যদি আফগানিস্তান সম্পূর্ণভাবে দখল করে নেয় তাহলে আফগানিস্তানের মানুষরা আর ধর্ম পালন করতে পারবে না। ধর্মের প্রতি সাধারণ আফগানদের এই সংবেদনশীলতা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা ধর্মের এই বিষয়টিকে পুঁজি করে মুজাহিদিনদের আরও প্ররোচিত করছে, যাতে আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে থাকে।
০৯. আমেরিকার আরেকটি লক্ষ্য ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া: এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র এই আফগান মুজাহিদিনদের ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সেই পুরোনো প্রতিশোধটাও মিটিয়ে নিতে চেয়েছিল। আপনারা জানেন যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামিজদের সাহায্য করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর এতে আমেরিকার অনেক সৈন্য মারা যায়, অনেক সামরিক ক্ষতিও হয়েছিল আমেরিকার। তাই আমেরিকা চাচ্ছিল আফগান মুজাহিদদের মাধ্যমে এর একটি প্রতিশোধ নিতে।
১০. পাকিস্তান ও সৌদিও এগিয়ে আসে মুজাহিদিনদের সহায়তা করতে: আমেরিকা গণমাধ্যম ব্যবহার করে সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধের একটি মোড়ক দিতে সক্ষম হয়েছিল। তাই মধ্যপ্রাচ্যের যেই দেশগুলো ধর্মীয় কারণে আফগানিস্তানের প্রতি পূর্ব থেকেই সহানুভূতিশীল ছিল তারাও এগিয়ে আসে অর্থ নিয়ে। তাদের পাশাপাশি পাকিস্তানও এগিয়ে আসে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত অর্থ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র আফগান মুজাহিদিনদের কাছে পৌঁছে দেয় খাইবার পাস হয়ে যে সীমান্ত আছে সেখান দিয়ে। আফগান মুজাহিদিনদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পর যোগ হয় সৌদি আরবের নাম। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের অংশগ্রহণ শুধু ধর্মীয় কারণেই ছিল বিষয়টি এরকম নয়। এখানে আরও অনেক ভূরাজনৈতিক কারণও ছিল।
১১. পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো আফগান যুদ্ধকে "জিহাদ বা ধর্ম যুদ্ধ” হিসেবে প্রচার করে: আফগান মুজাহিদিনরা আমেরিকার সাহায্যে সেখানে সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে প্রাণপণে লড়তে শুরু করে। এতে সোভিয়েত আর্মি বাধ্য হয় বিমান হামলা চালাতে। অন্যদিকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আরব-অনারব মিলিয়ে প্রায় ৪৩টি দেশ থেকে আগত সৈন্যরা মুজাহিদিনদের পক্ষে আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নেয়। এই বিশাল সংখ্যক সৈন্যের সমন্বয়ের কাজ করেছিলেন সৌদি ধনকুবের ওসামা বিন লাদেন। আফগান যুদ্ধে ওসামার সংযোজন এই মুজাহিদিনদের লড়াইকে নতুন মাত্রা প্রদান করে। উসামা বিন লাদেন উদ্ভাবন করেন পাহাড়ে সুরঙ্গ তৈরি করার যন্ত্র, দ্রুত দেয়াল তৈরি করার পদ্ধতি এবং আরও যুদ্ধ কৌশল। এসব কারণে আফগান মুজাহিদিনদের কাছে ওই সময়ে ওসামা খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১২. তখন আমেরিকাও স্বাগত জানিয়েছিল ওসামা বিন লাদেনকে: আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে সব তথ্যই জানত। যেহেতু ওসামা তখন আফগান মুজাহিদিনদের সাহায্য করছিল, সোভিয়েত সেনাদের হত্যা করছিল; তাই ওসামাকে নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা ছিল না। বরং তাকে নানা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণও দিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। ওই সময় যুদ্ধের কারণে তিন ভাগের এক ভাগ আফগান মানুষকে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
১৩. আবির্ভাব হলো তালেবানদের: পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে পৃথক করেছে ডুরাল্ড লাইন নামক সীমান্ত রেখা। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের সময় এই সীমান্ত এলাকায় অনেক আফগান নাগরিক অবস্থান নেয়। এই ভারতবর্ষে বি-ঔপনিবেশিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছে দারুলউলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। তাদের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এরই ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতাব্দী থেকে আফগানিস্তানের সীমান্ত এবং পাকিস্তানের উত্তর প্রদেশ এলাকায় দেওবন্দী ভাবধারার অনেক মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। যেখানে মূলত বেশির ভাগ জনসংখ্যাই পশতুন জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই সব মাদ্রাসায় যারা পড়ত তাদের বলা হতো “তালেব” অথবা “তালেবান”। তালেব অর্থ ছাত্র। তাদের শিক্ষক ছিল মোল্লা ওমরের মতো স্থানীয় কিছু আলমেরা। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় এখানকার ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানিস্তানে পাঠানো হতো সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।
১৪. আমেরিকা মুজাহিদিনদের হাতে তুলে দিল অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল: ১৯৮৬ সালে মুজাহিদিনদের যুদ্ধ কৌশলে স্টিংগার নামক অ্যান্টি এয়ারক্রাফট এর সংযোজন ছিল এই যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। মূলত অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইলের আঘাতেই ধসে পড়ত সোভিয়েত যুদ্ধ বিমানগুলো। আর এই মিসাইল মুজাহিদিনদের হাতে তুলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা ছিল ঐ সময়কার সবচেয়ে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি।
১৫. আফগানদের জয় ও সোভিয়েতের পতন: সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী মিখায়েল গর্বাচেভ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান ছেড়ে দিতে। কারণ তাদের অনেক রক্ত ঝরেছে। ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হওয়া আফগান মুজাহিদিনরা আমেরিকা থেকে পাওয়া মিসাইল দিয়ে এক কথায় দিশেহারা করে তুলেছিল সোভিয়েত বাহিনীকে। অবশেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে আসে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা এই ১০ বছরের যুদ্ধে আমেরিকা, সৌদি ও পাকিস্তানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত আফগান মুজাহিদিনদের জয় হয়। দ্বিতীয় বারের মতো মাতৃভূমিকে স্বাধীন করায় আফগান নাগরিকরা আনন্দিত হয়েছিল।
১৬. পতন হলো সমাজতন্ত্রের: এই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা আর কোনো দিন কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর পরেই মাত্র দেড় বছরের মাথায় ১৯৯০ সালে সমাজতন্ত্রের পতন হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও স্বাধীন হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে আফগান যুদ্ধের সুফল পেয়েছিল পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলো। ফলস্বরূপ তারা সোভিয়েত থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল।
১৭. তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েও সুফল পেল না আফগানিস্তান: দেখা গেল আফগান যুদ্ধ অন্যদের সুফল বয়ে আনলেও আফগানদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন হলো না। অনেকেই বাড়ি-ঘরহীন হয়ে গেল। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানদের মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করার মতো সক্ষমতা ছিল না। সোভিয়েত যুদ্ধে আফগানদের জয় ছিল মূলত আফগানিস্তানে আরেকটি যুদ্ধের শুরু। সোভিয়েত যুদ্ধের ফলস্বরূপ আফগানিস্তান পেয়েছিল নতুন আরেকটি গৃহযুদ্ধ। ১৯৯২-২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ (Civil War) চলছিল।
১৮. মুজাহিদিনদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল: সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে স্বাধীন হলো আফগানিস্তান। এখন প্রয়োজন নতুন সরকার গঠনের। কিন্তু কাকে বানানো হবে সরকার, কে হবেন রাষ্ট্রপ্রধান এ নিয়ে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েত যুদ্ধের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকলেও সোভিয়েত সেনারা চলে যাওয়ার পর দেখা গেল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এরা প্রতিটা প্রদেশে বিভক্ত হয়ে পড়ল এবং একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা শুরু করল। তারপর মুজাহিদ নেতারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে প্রদেশ শাসন করা শুরু করল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে। আর এই সময়ে মোল্লা ওমরের উত্থান ঘটে সাথে তালেবানের উত্থানও শুরু। কান্দাহার প্রদেশের মোল্লা উমর ঘোষণা করল, সে এখন একটি খাঁটি 'ইসলামিক স্টেট' প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
১৯. আফগানিস্তানের রাজনীতিতে তালেবানের প্রবেশ: যেহেতু তখন আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলছিল, এই সুযোগে মোল্লা ওমর ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বিপুল সংখ্যক অনুসারী তৈরি করেন। এতদিন যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল তারা সবাই মুজাহিদিন হিসেবেই পরিচিত ছিল। মোল্লা ওমরের গ্রুপে যোগ দেওয়া সেই মুজাহিদিনরাই 'তালেবান' হিসেবে পরিচিতি পেল। মুজাহিদিন থেকে তালেবান। ১৯৯৪ সালের মাঝেই মোল্লা ওমর ও তার অনুসারীরা আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সেখানে তার ভাষায় ইসলামি শরিয়া আইন চালু করে। আর সাধারণ মানুষও চেয়েছিল গৃহযুদ্ধের অবসান হোক। দেখা গেল সাধারণ মানুষের সহায়তায় তালেবানরা একের পর এক প্রদেশ দখল করতে থাকে।
২০. ওসামা বিন লাদেন পুনরায় আফগানিস্তানে ফিরে আসে: ১৯৯৫ সালে তালেবানরা ঘোষণা করল তারা আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়। তখন ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে আবার ফিরে আসে। ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমর নিজেদের মাঝে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। এক সময় তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে নেয়।
২১. আল-কায়দার উত্থান: একের পর এক প্রদেশ যখন তালেবানদের দখলে চলে আসতে থাকে ওসামা বিন লাদেন তখন তালেবান সরকারকে সাহায্য করতে থাকে কীভাবে প্রদেশগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়, কীভাবে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা যায়, নানান কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করেন তিনি। এই সুযোগে ১৯৯৬ সালে ওসামা বিন লাদেন তার পূর্ব গঠিত সশস্ত্র আর্মি নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে তোলেন। ফলশ্রুতিতে ওসামা নিজের একটি সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয় আফগানিস্তানে যার নাম হয় 'আল কায়েদা'।
২২. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বের সূচনা: তালেবানরা যখন কাবুলে ক্ষমতা দখল করল, তখন তারা ভেবেছিল আমেরিকা থেকে তারা সাহায্য পেতেই থাকবে। সাহায্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছিলও বটে। তারপর তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের একটি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। শুরু হয় তালেবানদের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন। দ্বন্দ্বের জেরে ওসামা বিন লাদেন তখন ঘোষণা করে আমেরিকানরা মুসলমানদের শত্রু। এভাবে আমেরিকার সাথে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। এরপর ধারণা করা হয় কেনিয়া-সহ বেশ কয়েকটি দেশে আমেরিকান দূতাবাসে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়দা হামলা চালায়। আমেরিকা তখন তালেবান নেতা মোল্লা ওমরকে এই বিষয়ে চাপ দিতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ওসামা বিন লাদেন তালেবানদের সহায়তায় সন্ত্রাসী হামলা করছে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মোল্লা ওমর সেটা অস্বীকার করে এবং আমেরিকাকে ইসলামের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে।
২৩. যেখান থেকে পশ্চিমা বিশ্বে তালেবান বিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়: এই সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের দুটো বিশাল মূর্তি, যা আগফানিস্তানে শত শত বছর ধরে ছিল, সেগুলো তালেবানরা ভেঙে ফেলে। এই ঘটনার পর আমেরিকা ছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও তালেবান বিরোধী একটি মনোভাব গড়ে ওঠে। তখন নানা কারণে সৌদি আরবও তালেবনাদের আর্থিক সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দেয়।
২৪. টুইন টাওয়ারের ঘটনা: পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র-সহ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর তালেবান পুনরায় বিশ্ববাসীর নজরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের এই হামলা আল-কায়েদাই চালিয়েছিল বলে অভিযোগ তোলে যুক্তরাষ্ট্রর। আর তাতে তালেবানদের উপরেও দোষারোপ ওঠে। কারণ, তালেবানরাই তাদের দেশে আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। আল-কায়েদার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল আফগানিস্তান। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তালেবানদের আলটিমেটাম দেয়, ওসামা বিন লাদেন এবং আল কায়েদার সদস্যদের আমেরিকার হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু তালেবান নেতা মোল্লা ওমর তাতে অস্বীকার করেন।
২৫. ন্যাটো জোটের আফগানিস্তান আক্রমণ ও তালেবান সরকারের পতন: মোল্লা ওমর আমেরিকার টুইনটাওয়ার হামলা প্রসঙ্গে জর্জ বুশকে বলেন এখানে আল-কায়দার বা তালেবানদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর জেরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন তালেবান বিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সিদ্ধান্ত নেন আফগানিস্তানে হামলা চালাবেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হলো হামলা। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ন্যাটো জোট তালেবানদের পতন ঘটায়। এভাবেই এক সময় যেই আমেরিকা নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ধর্মকে পুঁজি করে, অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সোভিয়েত আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তালেবানদের সাহায্য করেছিল; সেই আমেরিকাই আবার এই তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। শক্তিশালী ন্যাটো বাহিনীর কাছে পতন হয় তালেবানদের। এভাবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলা তালেবান শাসনের অবসান ঘটে।
২৬. তারপর আফগানিস্তান পেল নতুন একটি সংবিধান ও নির্বাচন: তালেবানদের পতনের পর জাতিসংঘ দেশটিতে বহুজাতিগোষ্ঠীয় সরকার স্থাপনে উৎসাহ দেয়। জার্মানির বন শহরে এ নিয়ে সম্মেলনের পর ২০০১-এর ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তার ৬ মাস পরে একটি মধ্যবর্তী সরকার গঠিত হয় যা ২০০৪ সালে একটি নতুন সংবিধান পাশ করে। নতুন সংবিধান অনুযায়ী আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট-ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৪ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রথম জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচনে জয়ী হয়ে হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। আফগানিস্তানের তথাকথিত নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং এখানকার গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানে থেকে যায়।
২৭. তালেবানদের সাথে হামিদ কারজাই এর দ্বন্দ্ব: নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মার্কিন মদদপুষ্ট হামিদ কারজাই আফগানিস্তানে সরকার গঠন করল। কিন্তু দেখা গেল এতেও আফগান সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। নতুন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সরকার কাবুলেই কেবল নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ভালো ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। বাকি প্রদেশগুলোতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ তারা নিতে পারনি। ২০০৬ সাল থেকে দেখা গেল তালেবানরা আবার বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত থেকে একত্রিত হয়ে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে শুরু করল আমেরিকান সেনাবাহিনীর উপর।
২৮. বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের ব্যর্থ পরিকল্পনা: নাইন-ইলেভেনের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট জঙ্গিবাদের দমন, আফগানিস্তানের জনগণের কথিত মানবাধিকার রক্ষা, এখানে গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করতে থাকে। তালেবানরা যেন পুনরায় সংগঠিত হয়ে আমেরিকাতে জঙ্গি হামলা চালাতে না পারে সেজন্য বছরের পর বছর মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে অবস্থান নেয়। ২০০৯ সালে বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পূর্বে বুশের সমালোচনা করে বলেছিলেন তিনি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন কিন্তু সেনা প্রত্যাহার দূরের কথা যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটির কথা বিবেচনা করে তিনি আরও সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছিলেন। তারপর ২০১৬ সালে ট্রাম্পও তার রাজনৈতিক প্রচারণায় বলেছিলেন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের দোহায় ট্রাম্পের নেতৃত্বে তালেবানের সাথে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল ১ মে ২০২১ এর মধ্যে ন্যাটোর সৈন্য আফগানিস্তানের মাটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার হবে। কিন্তু ন্যাটোর মিলিটারি অ্যালায়েন্সের সেক্রেটারি জেনারেল জেনস স্টোলটেনবার্গ এর সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্পের সাথে তালেবানদের যে চুক্তি হয়েছে সেখানে তালেবানরা আমাদের সকল দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তাই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় এখনো হয়নি।
২৯. অবশেষে বাইডেন সকল সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন: ট্রাম্পকে পরাজিত করে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসলেন জো বাইডেন। সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা দিয়েছেন আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। বাইডেন তাঁর ঘোষণায় বলেন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্পের পর তিনি চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যাঁকে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। সেনা প্রত্যাহারের এই দায়িত্বটি জো বাইডেন তার পরবর্তী কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য রেখে যেতে চান না। তাই বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আর সময় বৃদ্ধি করতে চাচ্ছিলেন না। অবশেষে বাইডেনের সিদ্ধান্তে ২০২১ সালের ২ জুলাই মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় বাগরাম বিমান ঘাঁটি ত্যাগ করে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে তালেবান আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেছেন। তাঁরা বলছেন, তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আল-কায়েদা আবার আফগানিস্তানকে তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের অভয়ারণ্যে পরিণত করতে পারে। তালেবানরা যে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এটা আমেরিকাও জানে। এটা জানা সত্ত্বেও বাইডেনের সকল সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক শিবিরে জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্ক।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কারণ
যে যে কারণে বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন :
০১. সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। "প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মতে ২০০১ ও ২০২১ সাল এক নয়। কারণ ২০০১ সালে আমরা আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন করেছি তার মানে এটা নয় যে আমাদেরকে ২০২১ সালে এসেও এখানে সেনা মোতায়েন রাখতে হবে।" এখন কথা হচ্ছে ২০০১ ও ২০২১ সাল কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন? ২০০১ সালে তালেবানরা এখনকার চেয়ে অনেক সংগঠিত ছিল এবং তখন আল-কায়দা যে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করে বসবে এটা যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার বাহিরে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি বর্তমানে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিত তালেবানদেরকে চোখে চোখে রাখছে, তারা তালেবানদের গতিবেগ সর্বদা পর্যবেক্ষণ করছে। তাই এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও এলছেন, "২০০১ ও ২০২১ সাল এক নয়।" একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে পরাশক্তি এমেরিকার উপর হামলা চালানোর মতো সাহস কারো নেই।
০২. আফগানিস্তান এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিঙ্কেনের ভাষ্যমতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন আফগানিস্তানের থেকেও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে আছে। তার মধ্যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, জলবায়ু সংকট, করোনা সংকটসহ দেশের জ্বালানি সম্পদের দেখভালের বিষয়গুলো রয়েছে। এখন এই বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে অধিকতর মনোযোগ দিতে হচ্ছে। করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতি সামাল দিতেই বাইডেন প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাবাহিনীর পেছনে আমেরিকার গত বিশ বছরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে এবং দুই হাজার তিনশো আমেরিকান সেনা নিহত হয়েছে। বাইডেন চাচ্ছে না এখন আর নতুন করে কোনো মার্কিন সেনা মারা যাক এবং বিদেশের মাটিতে অর্থ খরচের চেয়ে নিজ দেশই এখন বাইডেন প্রশাসনের অগ্রাধিকার।
০৩. যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ফক্স নিউজে তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরাক থেকে আমরা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাকের বিভিন্ন এলাকা জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের দখলে চলে গিয়েছিল। ফলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ফের ইরাকে পাঠাতে হয়েছিল। এখন কথা হচ্ছে আফগানিস্তানেও যদি এরকম কিছু ঘটে তাহলে বাইডেন কী করবেন? এই প্রশ্নোত্তরে বাইডেন বলেছেন, আফগানিস্তানে এরকম কিছু ঘটলে এটিকে মোকাবিলা করতে তিনি ড্রোন ব্যবহার করবেন। আমেরিকা থেকে ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন আফগানিস্তান থেকে একেবারে চোখ সরিয়ে নেবেন, বিষয়টি এমন নয়। আমেরিকা যে-কোনো সময় যে-কোনো স্থানে নিজের নিরাপত্তার জন্য অবস্থান গ্রহণে সক্ষম বলে দাবি করেছেন বাইডেন।
০৪. যুক্তরাষ্ট্র এখন জাতিসংঘকে বিকল্প হিসেবে ভাবছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের উপর দায়িত্ব অর্পণ। বাইডেন চাচ্ছে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর জাতিসংঘ আফগান পরিস্থিতির উপর নজর রাখবে। সেখানে নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা জাতিসংঘের রয়েছে। বাইডেন মূলত চাচ্ছে নিজ দেশের টাকা আফগানিস্তানে আর খরচ না করে বরং জাতিসংঘের অর্থায়নে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী জাতিসংঘের পিস কিপিং মিশনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।
০৫. আফগানিস্তানের দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র নেবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতে দায়ভারটি আফগান সরকারের। ২০২০ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিস তার নির্বাচনি প্রচারণায় বলেছিলেন, তিনি যে করেই হোক আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। তাই সেই নির্বাচনি মেনিফেস্টো বাস্তবায়নে সেনা প্রত্যাহার একটি পরোক্ষ কারণও বটে। যেহেতু আমেরিকা ২০ বছর পূর্বে সেনা মোতায়েন করেছিল আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আফগানদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে এবং যেহেতু এখন বাইডেন সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তাই এখন থেকে আফগান জনগণকে রক্ষা করবে কে? এমন প্রশ্নোত্তরে হোয়াইট হাউসের জবাব হলো আফগানিস্তানে যা হবার হোক এতে আমাদের দায়ভার নেই। সেখানে যদি এখন তালেবানদের সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় অথবা গৃহযুদ্ধে যদি সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয় সেটার দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র এখন কেন নেবে? যুক্তরাষ্ট্রের মতে সেটার দায়ভার আফগান সরকারের।
০৬. আরেকটি কারণ হলো তালেবানদের অবস্থা বিবেচনায়। গত বিশ বছর ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতিতে তালেবানদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক তালেবান সেনা নিহত হয়েছে। সাথে হাজার হাজার আফগান জনগণও মারা গিয়েছে। তাই বাইডেনের সকল সেনা প্রত্যাহারে তালেবানদেরও লাভ হয়েছে। নিজ দেশে তালেবানরা এখন সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। তালেবানরাও জানে নতুন করে যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে অথবা অন্য কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় তাহলে আমেরিকাও তাদেরকে ছেড়ে দেবে না. পাল্টা প্রতিশোধ নেবেই। এসব বিবেচনা করেই তালেবানরাও এখন আমেরিকার উপর হামলা, পাল্টা হামলার দিকে না গিয়ে নিজ দেশের দিকেই বেশি নজর দেবে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে। বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন সমীকরণ।
আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জয়-পরাজয়
হর্স রেইসের মতো আফগানিস্তান নিয়ে মিডিয়াগুলোর এত বেশি তৎপরতা এবং তাদের ক্লিক বেইটিং হেড লাইন দেখে কিছু স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে। কিছু হেডিং এরকম; আফগানিস্তান থেকে শূন্য হাতে ফিরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শান্তি না ফিরিয়ে আফগান ছাড়ছে ন্যাটো সৈন্যরা, তালেবানদের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে মার্কিন সেনারা, সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল করলেন জো বাইডেন ইত্যাদি। উপরিউক্ত মুখরোচক এসব হেডলাইন দেখে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন জাগে। এক. আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন আর কী কাজ করা বাকি আছে যেগুলো করতে পারলে আমরা বলতে পারতাম যুক্তরাষ্ট্র খালি হাতে ফেরেনি? দুই. আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এসেছিল? তিন. যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই আফগানিস্তান ইস্যুতে সফল হয় নি? চার, ভেটেরান ও চতুর জো বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি কি তাহলে ভুল ছিল? পাঁচ. আফগানিস্তানকে ধ্বংস করার মতো আর কি কিছু বাকি ছিলো
আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে ২০০১ সালে যখন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানের মাটিতে পা রাখে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ বলেছিল তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মোটাদাগে তিনটি। প্রথমত, আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয়ত, জঙ্গিবাদ দমন করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসেও আফগানিস্তানে শান্তিও নেই, গণতন্ত্রও নেই। এখন এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি আপনি বলতেই পারি যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ বা খালি হাতে ফিরে গিয়েছে। যেহেতু তাদের উদ্দেশ্যই ছিল শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কিন্তু কোনোটাই তারা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর শাসনামল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত যারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাদের সকলের পররাষ্ট্রনীতিগুলো একটু বিশ্লেষণ করলে আপনি দুটো বিষয় বা ধারা খুঁজে পাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সেই দুইটি উদ্দেশ্য হলো:
এক. Normative Goal: নরমেটিভ এর মানে হলো আদর্শগত। এমন কিছু করা যেটা আসলেই করা উচিত বা নীতিগত ভাবে সঠিক। ধরুন একটি দেশ খুবই সংকটে আছে, সেদেশের জনগণ খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছে, রাজনৈতিক সহিংসতা রয়েছে, মানবাধিকার অনুপস্থিত এবং সেখানে গৃহযুদ্ধে মানুষ মারা যাচ্ছে। তাই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সংকটে পড়া সে দেশটির পাশে দাঁড়িয়ে সংকটের সমাধান করা, গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা, শান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা এবং যুক্তরাষ্ট্রও এটা বিশ্বাস করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব আবশ্যক।
দুই. Realistic Goal: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো যে করেই হোক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মেটেরিয়ালিস্টিক লাভ। যে কাজটি করলে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেই কাজটিই করবে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব যুক্তরাষ্ট্র দেখে না। ধরুন একটি পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লাভ কিন্তু সেই নীতিটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল ক্ষতি বয়ে আনবে তখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে না। অর্থাৎ নিজের লাভ হলেই হলো। সহজ কথায় যুক্তরাষ্ট্র Zero-Sum Game এ বিশ্বাস করে। এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র জানত ইরাক বা লিবিয়ায় যুদ্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হবে কিন্তু ইরাক ও লিবিয়া দুটি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজের লাভের কথা বিবেচনা করে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এই দুইটি ধারার প্রথমটি (Normative Goal) হলো এক কথায় আই ওয়াশ। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই বলে আমরা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, বিশ্বে শান্তি আনতে চাই। এটা স্রেফ একটি আই ওয়াশ। আর দ্বিতীয় যে ধারাটি (Realistic Goal) এটাই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নীতি। আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এটাও ছিল একটি আই ওয়াশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এখন ভাষ্য হলো আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এটা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। জো বাইডেন বলছেন আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব আফগান সরকার ও আফগান জনগণের।
আফগানিস্তানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দ্বিতীয় যে রিয়ালিস্টিক উদ্দেশ্য সেটি ঠিকই আদায় করে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হলো?
এক. আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো উদ্দেশ্যের একটি ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ এই দীর্ঘ বিশ বছর যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে যুদ্ধ করে জয়ী হতে পারেনি। দক্ষিণ ভিয়েতনামিজদের তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন অত্যাধুনিক মিসাইল ও রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে। ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার সেনা নিহত হয় এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়ি ফিরতে হয়। ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চলা আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক একই কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় তালেবানরা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তালেবানদের হাতে হাজার হাজার সোভিয়েত সেনা নিহত হয়। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজয় বরণ করে আফগানিস্তান ত্যাগ করে। সময়টি যেহেতু কোল্ড ওয়ার পিরিয়ড: তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তালেবানদের জয়কে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জয় হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এই দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফল।
দুই, আফগানিস্তান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তালেবান ও আল-কায়দা মিলে খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি হুমকি ছিল। আফগানিস্তানে গত বিশ বছরের ন্যাটো বাহিনীর অবস্থান তালেবানদের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তালেবানদের সাথে আফগান জনগণের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাধাতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানদের পুনরুত্থানের পর আফগানিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য তালেবানরা আর হুমকি না। যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তার জন্য এখন তিনটি রাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে- রাশিয়া, ইরান, চীন। তাই আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন বজায় রেখে বিলিয়ন ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রের আসলে কোনো লাভ ছিল না। আফগানিস্তানে যে পরিমাণ টাকা খরচ হতো সেসব টাকা এখন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে পারবে। আফগানিস্তানে শুধু শুধু খরচ না করে মহামারির ফলে ভেঙে যাওয়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করাই জো বাইডেনের প্রাধান্য ছিল। অর্থাৎ Cost Benefit Analyses এর দিক থেকে জো বাইডেন যা করেছেন তাই ঠিকই আছে।
তিন. যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে গিয়েছে কিন্তু এখানে একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিয়ে যাচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো তালেবান শাসনকে কেন্দ্র করে নতুন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারে।
কী ক্ষতি হলো যুক্তরাষ্ট্রের
তবে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন একেবারেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে না, অন্যদিকে আশানুরূপ সাফল্যও পায়নি। আফগানিস্তান ইস্যুতে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র যে ইমেজ সংকটে পড়েছে সেটা কাটিয়ে উঠতে মার্কিনীদের আরও অনেক সময় লাগবে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার তালিকাটি অনেকটা 'স্নো-বল ইফেক্ট' এর মতো।
Snowball Effect
এই টার্মটি মাইক্রো ইকোনমিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ‘Snowball' এর সরল বাংলা হচ্ছে তুষারগোলক। একটি ছোট বরফের টুকরা যখন পাহারের চূড়া থেকে গড়াতে গড়াতে নিচে পড়তে থাকে তখন সেই ছোট বরফের টুকরাটি বিশাল আকার ধারণ করে। অর্থাৎ এমন কিছু যেটার প্রভাব প্রথমে ছোট থাকে কিন্তু পরবর্তীতে বিশাল আকার ধারণ করে। আফগানিস্তান ইস্যুতে Snowball effect টা হচ্ছে এরকম যে, মার্কিনীরা এই শতকের শুরুর দিকে আফগানিস্তানে এসেছিল নিজেদের তথাকথিত সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় মার্কিনীদের লাভের পরিবর্তে বিশাল ক্ষতি হয়েছে এবং সেই ক্ষয়ক্ষতির তালিকাটি দিনদিন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ;
এক. একটানা বিশ বছর এখানে ন্যাটো বাহিনী অবস্থান করেও রেজিম পরিবর্তন করতে পারেনি, ন্যাটো বাহিনী বিশ বছর আগে যাদেরকে সরাতে এখানে এসেছিল তারাই এখন সরকার গঠন করেছে। দুই, আফগানিস্তানে তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তিন, গত বিশ বছরে অনেক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। চার, কূটনৈতিক অঙ্গনে এটিকে মার্কিনীদের বড় পরাজয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পাঁচ, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ইমেজ নষ্ট হয়েছে (যেটাকে "Scars on the face" বা "চেহারায় ক্ষতের দাগ” বলা হচ্ছে)। তথা আফগান ইস্যুতে Snowball Effectটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির তালিকাটি পাহাড়ের চূড়া থেকে পতিত হওয়া তুষারগোলকের মতো দীর্ঘস্থায়ী হওয়া।
জাতিগত সংঘাতের আড়ালে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
আফগানিস্তান কী শুধুই বিদেশি রাষ্ট্র কর্তৃক আক্রমণের স্বীকার একটি দেশ? নাকি এই দেশটিতেও জাতিগত সংঘাত, গৃহযুদ্ধ ছিল ইতিহাসের বড় একটি অংশ? ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে যে-সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে সেইসব ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে মুজাহিদিনদের সশস্ত্র প্রতিরোধ, তালেবানদের উত্থান, এবং টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনার পর ন্যাটো জোটের আফগানিস্তান আক্রমণ ইত্যাদি সবগুলো ঘটনারই কেন্দ্রবিন্দুতেই এই আমেরিকা। ২০০১ সালে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আক্রমণ ২০২১ সালের ৩০ই আগস্ট সমাপ্ত হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল ক্রিস ডনাহিউ যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সৈন্য হিসেবে সেদিন আফগানিস্তানের মাটি ত্যাগ করেন।
সেই ১৯৮০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে আমেরিকানরা আসলে কীভাবে দেখে? আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্র আসলে কীভাবে মূল্যায়ন করে? জেরিমি সুরি হচ্ছেন একজন আমেরিকান ইতিহাসবিদ (ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ)। তার লিখিত বই, American Narratives: An Introductory Historiographical Reader। এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তান ইস্যুতে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আসলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে থেকেই যুগ যুগ ধরে সেখানে নিয়মিত বিরতিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এটা আমাদের ব্যর্থতা যে, এই যুদ্ধাবস্থার বিপরীতে আমরা আফগানিস্তানে তেমন কিছু প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি যা আমাদের মহত্ত্বকে মহিমান্বিত করে। আফগানিস্তানে মানুষজন ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত এবং তাদের জাতিগত সহিংসতা এতই বেশি যে সেখানে কখনোই সর্বজনীন আফগান জাতীয়তাবাদী পরিচয় বিরাজ করেনি। এই জাতিগত দ্বন্দ্ব এখন আরও বৃদ্ধি পাবে কারণ বিগত কয়েক দশকের যুদ্ধ তাদের কাছে খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন যুদ্ধসামগ্রী যেটা আগামী ৩০-৪০ বছরে তাদের মধ্যে জাতিগত সহিংসতাকে একটি ভয়ানক রূপ দিতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, আফগানিস্তান সংকট এবং গৃহযুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে একপাক্ষিক ভাবে দোষ দেয়া একটু একপেশে আলাপ। তিনি বলেন ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট রেজিম বিস্তারের ক্রমবর্ধমান প্রয়াস ১৯৭৯ সালে তাদের আফগানিস্তান আক্রমণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আফগানিস্তান জাতিগুলো যেহেতু সবসময় একটি যুদ্ধরত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে; সোভিয়েত আক্রমণ তাদের বিদ্রোহী সত্তাকে আরও চরমপন্থি করে তুলেছে। অর্থাৎ সে সময় সোভিয়েত সেখানে কমিউনিস্ট রেজিম স্থাপন সেখানকার মানুষের সামরিক প্রতিউত্তরকে ত্বরান্বিত করেছিল। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে না গেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের আক্রমণ বন্ধ করত না এবং মুজাহিদিনদের সাথে যুদ্ধ চালাত। আর যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া মুজাহিদিনরা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে এত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত না। সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল জোরপূর্বকভাবে একটি সিস্টেমকে আফগানিস্তানের উপর চাপিয়ে দিতে। তাই সেই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের না আসার মধ্যে কোনো এক্সক্লুসিভিটি নেই।"
১৯১৯ সালে আফগানিস্তান 'তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান' যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। আফগানিস্তানে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ৪টি অঞ্চলে বিভক্ত। অঞ্চলগুলো হলো হেরাত, কাবুল, মাজার ই শরীফ এবং কান্দাহার। এই অঞ্চলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন গোত্র ও জাতির বসবাস। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো পশতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, তার্কমেন, বেলুচ, নুরিস্তানি, পামারি, আরব, গোজার, আইমাক, কুইজিলবাশ, পাশাই, কির্গি ইত্যাদি। স্বাধীনতার আগ থেকেই তাদের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব বিরাজমান। যেমন- ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এর মধ্যে আমির আব্দুল রহমান খান হাজারাদের আফগানিস্তান থেকে বিতারিত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ করেন। কারণ হাজারারা ছিল শিয়া মুসলিম। তাদের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শুধু মাত্র শিয়া হওয়ার কারণে মারাত্মক হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে হয়। তাদের উপর নির্যাতন করা অধিকাংশ মানুষই ছিল সুন্নি মতাদর্শী সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতুন। তখন পশতুন গোত্রের ধর্মীয় নেতারা এমনও বলেছিলেন যে যদি কেউ হাজারাদের উপর ধংসযজ্ঞ চালায় তাহলে সে খোদা কর্তৃক পুরস্কৃত হবে। এই সময়ে ৬০% হাজারা নিহত হয় এবং আশেপাশের দেশে পালিয়ে চলে যায়। আর বাকিরা পশতুনদের দাসে পরিণত হয়। ১৯০১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পশতুনরা আফগানিস্তান থেকে পৃথক হওয়ার মাধ্যমে একটি "স্বাধীন পাসতুনিয়ান রাষ্ট্র” গঠনের দাবি তুলে। এই কাল্পনিক রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে নিয়ে গঠিত। তারা এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে সামরিক অভিযানও চালায়। যেগুলো অন্য সব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনে রসদ যোগায় যা আফগানিস্তানের জাতিগত সহিংসতাকে ত্বরান্বিত করে। আফগানিস্তানে জাতিগত দ্বন্দ্ব কতটা প্রকট সেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মুজাদিদদের মধ্যকার কোন্দলই তার বড় প্রমাণ। ১৯৯০-১৯৯৪ এ মুজাহিদ নেতারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে প্রদেশ শাসন করা শুরু করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯৫ তে আমেরিকার সহায়তায় যখন তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসে তখন তারা হাজারা, তাজিক, উজবেকদের উপর চরম নৃশংসতা চালায়। ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সালে তালেবানদের বিরোধী হিসেবে গঠিত হয় "নর্দান এলায়েন্স”। তারা ইরান, রাশিয়া এবং ভারতের সমর্থনও পায়। ১৯৯৭ সালে নর্দান এলায়েন্স দলটি প্রায় ২০০০ তালেবান সদস্যকে হত্যা করে। আগস্ট ৮, ১৯৯৮ সালে তালেবান মাজার ই শরীফ অঞ্চল আক্রমণ করে ৫ হাজার উজবেকদের হত্যা করে। অতএব, নর্দান এলায়েন্স এবং তালেবান দুটো বাহিনীর মধ্যে খুব বেশি মতাদর্শগত এবং ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য না থাকলেও তাদের জাতিগত পার্থক্য তাদের মধ্য রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানের সেই জাতিগত সমস্যা আরও বিরাট আকারে দেখা দিয়েছে তালেবান সরকারে পশতুনদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে।
আফগান জনগণের মধ্যে বংশ বা গোত্রপ্রথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নিজ নিজ গোত্রের প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। তাই শুধু তালেবানদের হাতেই ক্ষমতা থাকবে এটা আজকে না হলেও কয়েকবছর পর অন্য গোত্রের মানুষ মেনে নেবে না এটাই স্বাভাবিক। তাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য তালেবানদের উচিত সবাইকে শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা। বিশ্লেষকরা বলছেন তালেবানরা লেবাননদের রাজনৈতিক মডেল তথা "Confessionalist" অনুসরণ করা উচিত। Confessionalist এই সিস্টেমের মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বণ্টন করে দেওয়া। যেমন- লেবাননে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে লেবানন তার সংবিধানের কনফেশনালিস্ট সিস্টেমটি প্রয়োগ করেছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট হন একজন খ্রিষ্টান, প্রধানমন্ত্রী হন সুন্নি থেকে এবং স্পিকার হবেন শিয়া থেকে। অর্থাৎ সংঘাত এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সবগুলো গোষ্ঠীর সমন্বয় করে অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ব্যবস্থা তালেবানরা হয়তোবা গ্রহণ করবে না, যা পরবর্তী গোত্র দ্বন্দ্বকে উসকে দিতে পারে।
আফগানিস্তানে তালেবান ছাড়াও এখন বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সামরিক ও জিহাদি গ্রুপ রয়েছে যাদের মধ্যে ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ আফগানিস্তান, হক্কানি নেটওয়ার্ক, আইএসএস খোরাসান (ISIS K) ইত্যাদি অন্যতম। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালে বিলুপ্ত হওয়া নর্দান এলায়েন্স এখন আবার নতুন রূপে 'ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ অাফগানিস্তান' নামে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা শুরু করেছে। বর্তমানে 'ইসলামিক মুভমেন্ট অফ উজবেকিস্তান'ও তালেবানদের বিপক্ষে খুবই সক্রিয়। অন্যদিকে ইসলামি স্টেইটের শাখা ইসলামি স্টেট অব খোরাসান এই অঞ্চলে খুব বেশি পরিমাণে সক্রিয়। ইসলামি স্টেইটের সাথে ন্যাশনাল রেজিসটেন্স ফোর্স অফ আফগানিস্তানের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ইসলামি স্টেট খোরাসান এর বেশির ভাগ সদস্যই নন-পশতুন যারা মূলত আফগানিস্তানের উত্তরে বাস করে, আর পশতুনরা দক্ষিণে। অর্থাৎ একটি বিষয় খুব পরিষ্কার যে, কারা আইএসকে সমর্থন করবে আর কারা তালেবানকে সমর্থন করবে সেটা নির্ধারিত করে আসলে একজন ব্যক্তি কোনো নৃতাত্ত্বিক পরিচয়টি বহন করছে। জাতিগত দ্বন্দ্বের আবরণে আইএস বনাম তালেবান দ্বন্দ্ব আফগানিস্তান সমস্যাকে কোনদিকে ত্বরান্বিত করে সেটাই ভবিষ্যতে দেখার বিষয়। ২০১৪ সালের পর আল-কায়দা বনাম আইএস দ্বন্দ্ব, আইএস'র বিশ্বব্যাপী খিলাফতের ডাক এবং বৈশ্বিক সামরিক নেটওয়ার্ক আফগানিস্তান ইস্যুতে কেমন প্রভাব ফেলে সেটাই দেখার বিষয়। তালেবান এত সকল সংকট মোকাবিলা করতে পারবে কি না সেটা একটি বড় প্রশ্ন। তাই বিশ্লেষকদের দাবি এই জাতিগত সংকটকে কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তান হয়তোবা হয়ে উঠতে পারে আরেকটি যুদ্ধের ময়দান। আর তালেবানরা যদি এত কিছু সত্ত্বেও জাতিগত বৈষম্যের অবসান ঘটাতে পারে, যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে, যদি বর্তমান খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠতে পারে, যদি পূর্বের তুলনায় লিবারেল হয়ে নারী অধিকার রক্ষা করতে পারে, যদি তালেবানরা বহির্বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে, যদি অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সফলতা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, তাহলে যুগ যুগ ধরে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মাতৃভূমি স্বাধীন করা এই তালেবানদের কুর্নিশ করা বিশ্ববাসীর জন্য অত্যবশ্যকীয় হয়ে উঠবে।
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Mura, Andrea (2015), The Symbolic Scenarios of Islamism: A Study in Islamic Political Thought, London: Routledge
2. Dower, John W. (2017). The Violent American Century: War and Terror Since World War II, Haymarket Books
3. Goodson, Larry P. (2011), Afghanistan's Endless War: State Failure, Regional Politics, and the Rise of the Taliban, University of Washington Press
4. Johnson, Robert (2011), The Afghan Way of War: How and Why They Fight, Oxford University Press
5. Grau, Lester W.; Gress, Michael A. (2002). The Soviet-Afghan War: how a superpower fought and lost, University Press of Kansas
6. Caraley, Demetrios (2002), September 11, Terrorists Attacks, and U.S. Foreign Policy, Academy of Political Science
7. Bolton, M. Kent (2006), U.S. National Security and Foreign Policymaking After 9/11: Present at the Re-creation, Rowman & Littlefield
8. Burke, Jason (2nd ed. 2007), Al-Qaeda: The True Story of Radical Islam, London: Penguin