📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট

📄 যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট


Theme: The Past is Never Dead

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট

"Domestic policy can only defeat us; foreign policy can kill us." - John F. Kennedy

ঢাকাতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবাই-ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। "যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার শত্রুর দরকার নেই” এরকম একটি ন্যারেটিভ প্রচলিত থাকলেও বৈদেশিক নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত বন্ধু হতে পারলে আসলে ক্ষতি নেই। বরং অনেক লাভ রয়েছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। পূর্বে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কতটা বিভীষিকাময় ছিল কল্পনাও করা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে আক্রমণ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। দুই দুটি পারমাণবিক বোমার তেজে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় জাপান। তখন জাপানের নেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুধাবন করল, তা হচ্ছে- "যে আমেরিকা আমাকে ধ্বংস করতে পারে সে আমেরিকাই ভবিষ্যতে আমাকে রক্ষা করতে পারবে”। তাই পেছনের ইতিহাস ভুলে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করল জাপান। সেদিনের এই অনুধাবনটি জাপানকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। গোটা এশিয়ায় জাপান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। এমনকি জাপানের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে। জাপান উন্নতির কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বন্ধু দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। দক্ষিণ কোরিয়া আজ একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেন ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় এটা বোঝার জন্য জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণই যথেষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সংকট

একুশ শতকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয় বরং অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত সেই বিষয়টি বোঝার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করব। বিগত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে বাংলাদেশের সাথে একটি এগ্রিমেন্ট করার কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কোনোমতেই রাজি হচ্ছে না। এমন কী আছে সেই চুক্তিতে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ দেখাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ রাজি হচ্ছে না?

A Status of Forces Agreement (SOFA)

সোফা এগ্রিমেন্ট হচ্ছে একধরনের সামরিক বা নিরাপত্তা চুক্তি। সাধারণত একটি দেশে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অবস্থান করার বৈধতা নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সাথে প্রায়ই চুক্তি করে এবং সেই চুক্তির মাধ্যমে ঐসব দেশে নিজেদের মিলিটারি ঘাঁটি স্থাপন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন করার অনুমতি আদায় করে নেয়। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে তার সেনা মোতায়েন করার বৈধতা পায়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিটি করেছে। ১৯৯৮ সালে মার্কিন সেনাপ্রধান ডেনিস রাইমা বাংলাদেশের কাছেও সোফা এগ্রিমেন্টটি প্রস্তাব করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনা সরকারকেও কয়েকবার প্রস্তাব করেছে এধরনের একটি চুক্তি করার। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সোফা প্রস্তাবে অনেকটা এরকম শর্ত থাকে:

1. Entry and Exit: বাংলাদেশে মার্কিন সেনাদের বিনা ভিসায় প্রবেশাধিকার এবং দেশের মধ্যে তাদেরকে অবাধ চলাচলের অনুমতি দেওয়া।

2. Tax liabilities: হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশ তাদের উপর কোনো ট্যাক্স আরোপ করতে পারবে না। তাদেরকে কাস্টমস ছাড়পত্র ছাড়াই বিভিন্ন মিলিটারি সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে বাংলাদেশে আসার সুযোগ দিতে হবে।

3. Criminal Status: বাংলাদেশে প্রবেশের পর কোনো মার্কিন সেনা যদি অপরাধ কিংবা ক্রাইমে লিপ্ত হয় তখন তাকে মার্কিন আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিচার করা যাবে না।

উপরিউক্ত শর্তগুলো দেখে নতুন করে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সাবেক স্টেট সেক্রেটারি হিলারি ক্লিনটনও বাংলাদেশের সাথে সোফা এগ্রিমেন্টটি করার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এ নিয়ে বাংলাদেশে এখনো বিতর্ক চলছে। মার্কিনদের এমন প্রস্তাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকার অত্যন্ত কৌশলের সাথে সোফা চুক্তির প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও তারা বলেছিল বাংলাদেশে ঐরকমভাবে কোনো মিলিটারি ঘাঁটি স্থাপনের আগ্রহ নেই, তারা বাংলাদেশে শুধু মাঝে মাঝে কিছু সেনা মোতায়েন করবে।

সোফা এগ্রিমেন্ট ও ঝুঁকিসমূহ

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা এগ্রিমেন্টে আবদ্ধ হলে একটি রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিগুলো কী কী?

প্রথমত, Host Nation Concerns: সাউথ কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সোফা এগ্রিমেন্ট রয়েছে। সেখানে ২০০২ সালে এক মার্কিন সেনা প্রশিক্ষণ শেষে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে ক্যাম্পে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে এক্সিডেন্টে দুজন স্থানীয় কোরিয়ান মেয়ে তাৎক্ষণিক মারা যায়। যেহেতু চুক্তিতে বলা ছিল মার্কিন আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে সেহেতু দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত সেই অভিযুক্ত মার্কিন সেনাকে বিচারের আওতায় আনতে পারেনি। সেই ঘটনার জেরে পুরো দক্ষিণ কোরিয়া জুড়ে তাদের দেশে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি বিরোধী বিক্ষোভ হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো মার্কিন সেনারা হোস্ট কান্ট্রির যে অঞ্চলে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে ঐ অঞ্চলের মেয়েরা কিছুটা অনিরাপদ বোধ করে। জাপানে মার্কিন সেনাদের অনেক রেইপ স্ক্যানডাল এর কাহিনিও আমরা শুনতে পাই।

দ্বিতীয়ত, Sovereignty Issues: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা। সোফা এগ্রিমেন্ট এর সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। যে এত সাল থেকে এত সাল পর্যন্ত আপনি আমার দেশে সেনা মোতায়েন রাখতে পারবেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পোন্নত কোনো দেশের সাথে একবার সোফা চুক্তি স্বাক্ষরিত করলে সেই চুক্তিটির বৈধতা তারা আজীবন ধরে রাখতে চাইবে। যেমন- প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাকের সাথে সোফা চুক্তি করেছিলেন সেই ২০০৮ সালে। চুক্তিটির নাম ছিল- "U.S.-Iraq Status of Forces Agreement"। কিন্তু চুক্তির দশ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে এখনো ইরাকে মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখার বৈধ অধিকার আছে। কিন্তু বর্তমানে ইরাক বলছে চুক্তি হয়েছিল এক দশক আগে এবং তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী। তাই বর্তমানে আমাদের মাটিতে কোনো বিদেশি সেনার উপস্থিতি মেনে নিতে পারব না। বিষয়টি ঠিক এরকম যে, ধরুন বাংলাদেশ আজকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করল। মনে করি আজ থেকে বিশ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে একজন যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট এর আগমন ঘটল। তখন সেই যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট দেখল শত্রু রাষ্ট্র চীনের সাথে যুদ্ধ অবধারিত। তাই চীন এবং বাংলাদেশের দূরত্ব কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্র দেখল বাংলাদেশ থেকে চীনকে আক্রমণ করা অনেক সহজ। তখন সে বলবে চীনকে শায়েস্তা করতে বাংলাদেশে মার্কিন সেনা পাঠাও। আমরা তো বাংলাদেশের সাথে অতীতে একবার সোফা চুক্তি করেছিলামই। তাই এখন আর সেনা মোতায়েনে বাংলাদেশের অনুমতি লাগবে না। যদি এরকম একটি চিত্র ভবিষ্যতে দাঁড়ায় তাহলে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে তা সার্বভৌমত্বের জন্য কতটুকু হুমকি? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি শুধু একটি উদাহরণ হলেও পৃথিবীর অনেক দেশে এটি একটি তিক্ত বাস্তবতা। প্রিয়া সাহা যখন হোয়াইট হাউসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের 'মাইনরিটি অপ্রেশন' নিয়ে অভিযোগ দিচ্ছিলেন তখন এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ট্রাম্প বলেছিলেন আমরা কি সেখানে এখনো আমাদের সেনা পাঠাইনি? "Has it landed the helicopter? Have we landed out there yet?"- Donald Trump

তৃতীয়ত, Political Issues: সোফা এগ্রিমেন্ট এর তৃতীয় ঝুঁকি হচ্ছে রাজনৈতিক। একটি দেশে যখন মার্কিন সেনা অবস্থান করে তখন বিভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সেনাদের সাথে বিভিন্ন গোপন চুক্তি করার মাধ্যমে তাদের সাথে আঁতাত করার চেষ্টা করে। এমনকি নিজ স্বার্থের জন্য মার্কিন সেনাদের সাথে গোপনে রাষ্ট্র বিরোধী চুক্তিও করে থাকে। ১৯৭০ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন করা হলো। অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭২ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন আদর্শবাদী নেতা এডওয়ার্ড গগ হুইটল্যাম। তখন এডওয়ার্ড হুইটল্যাম অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বললেন আমাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পলিসিতে কেন অন্য আরেকটি দেশের প্রভাব থাকবে? তাই এখন থেকে অস্ট্রেলিয়া সকল বৈদেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে এবং অস্ট্রেলিয়াও এখন থেকে অন্য দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। হুইটল্যাম যুক্তরাষ্ট্রকে তোয়াক্কা না করেই ভিয়েতনাম থেকে অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিলেন, বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা ও রোডেশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপকে সমর্থন করলেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের নিয়ম বাতিল করলেন। হুইটল্যামের পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন স্বার্থবিরোধী হওয়ায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশে সিআইএ হুইটল্যামকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

সোফা এগ্রিমেন্ট নিয়ে এতটুকু আলোচনাই যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা এগ্রিমেন্ট এর বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়তা ও কৌশলের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা আমাদের কূটনৈতিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশও বটে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্ভর করে তার বৈদেশিক সম্পর্ক বা নীতির উপর। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকগণ গোড়া থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাজতান্ত্রিক নীতি বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন সরকারের অনেক অসন্তুষ্টি ছিল। অসন্তুষ্টি থাকা সত্ত্বেও এবং বঙ্গবন্ধুর আমলেই যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য ও পণ্য দিয়ে বাংলাদেশকে মানবিক সহযোগিতা করেছিল। প্রশ্ন হলো কেন যুক্তরাষ্ট্র তখন বাংলাদেশকে মানবিক সাহায্য দিয়েছিল? উত্তরটি হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব হ্রাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ছিল। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে কিউবায় পাটের থলি রপ্তানি করার উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য প্রদান স্থগিত করে দেয়। কারণ কিউবা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করতে হয়েছিল। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সামগ্রীর খুবই প্রয়োজন ছিল তখন। এবার আমরা মার্কিনদের চোখে বাংলাদেশের কিছু অর্জন নিয়ে আলোচনা করব।

1. Non-Proliferation Treaty (NPT): বঙ্গবন্ধুর পর ক্ষমতায় আসে জিয়াউর রহমান। তার শাসনামলে বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালেই এনপিটি বা পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলে। এনপিটি চুক্তি নিয়ে সংক্ষেপে দুচারটা কথা বলি। এটি মূলত বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধের জন্য একটি চুক্তি, যা ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত হয় কিন্তু ১৯৭০ সাল থেকে কার্যকর হয়। এই চুক্তির তত্ত্বাবধায়নকারী (Depositary) তিনটি রাষ্ট্র হচ্ছে; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করলেও পাঁচটি দেশ (ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান ও সাউথ সুদান) এখনো অংশগ্রহণ করেনি। এমনকি সম্প্রতি ভারত প্রথম দেশ হিসেবে জাপানের সঙ্গে 'সিভিল নিউক্লিয়ার ডিল' করার কথাও ব্যক্ত করেছে। যেখানে ভারত-পাকিস্তানের মতো দুটি পরমাণুশক্তিধর রাষ্ট্র এখনো এনপিটি চুক্তি স্বাক্ষর করেনি সেখানে ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ চল্লিশ বছর আগেই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে ফেলে। সেজন্য মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে।

2. The United Nations Iran-Iraq Military Observer Group (UNIIMOG): ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে বাংলাদেশি সেনারা ইরাকের বিরুদ্ধে লড়েছে। ১৯৯০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নিলে শুরু হয়েছিল উপসাগরীয় যুদ্ধ। বাংলাদেশ সেই উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম অংশ ছিল। এই যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নির্দেশে বাংলাদেশ ২,৩০০ সৈন্য প্রেরণ করেছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর এটাই ছিল বাংলাদেশি সৈন্যদের জন্য প্রথম বৈদেশিক যুদ্ধ।

3. Comprehensive Nuclear-Test-Ban Treaty (CTBT): সিটিবিটি হলো পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি। চুক্তির লক্ষ্য সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে যাবতীয় পারমাণবিক পরীক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা। ১৯৯৬ সালের জুনে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসেই ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সিটিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। দ্রুত সময়ে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান মার্কিনদের কাছে প্রশংসিত হয়।

4. Humanitarian Assistance Needs Assessment (HANA): সংক্ষেপে হানা চুক্তি। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হানা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির মূল কথা হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বাংলাদেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে মানবিক সহযোগিতা করবে। প্রয়োজন হলে খাদ্যসামগ্রী-সহ মার্কিন সেনাদের বাংলাদেশে পাঠাবে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যখন ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে তখন হানা চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন সেনারা দুটি হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ নিয়ে বাংলাদেশে আসে। মার্কিন মেরিন সেনারা বাংলাদেশের উপকূলীয় দুর্গম অঞ্চলে হেলিকপ্টার নিয়ে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়। এমনকি মার্কিন সেনারা দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থান করেছিল।

বাংলাদেশের কেন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন

অর্থাৎ অতীতে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে মেজর জিয়া, জেনারেল এরশাদ, বেগম জিয়া, শেখ হাসিনা সরকার সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বের সাথে দেখেছে। বর্তমান একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের খুবই দরকার। প্রথমত, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৃহত্তম বাজার এখন যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ভারসাম্য বাংলাদেশের অনুকূলে থাকার পেছনে তৈরি পোশাকের ভূমিকা অন্যতম। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। যদি বাংলাদেশ মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে চায় তাহলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রকে। কেননা যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ ছাড়া মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব। তৃতীয়ত, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা ইত্যাদির উদ্দেশ্যে অসংখ্য মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা আবশ্যক। চতুর্থত, বাংলাদেশের পোশাক কিংবা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে যেন বিনা শুল্কে (জিএসপি সুবিধা) প্রবেশ করতে পারে সেটার জন্যও বাংলাদেশ বর্তমানে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ঢাকাতে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১১৩২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সরব হয় যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংস্থাগুলোর তৎপরতায় বারাক ওবামা প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (GSP) স্থগিত করে দেয়। "Trade Act of 1974" নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ট্রেড প্রোগ্রাম রয়েছে। এই প্রোগ্রামের অধীনে কিছু দেশকে যুক্তরাষ্ট্র তার দেশে স্বল্প শুল্কে, কখনো আবার সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। এটাকেই GSP সুবিধা বলে, যার পূর্ণরূপ Generalized System of Preferences (GSP)।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন বাংলাদেশকে প্রয়োজন

শুধু বাংলাদেশেরই যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার বিষয়টি এরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রেরও বাংলাদেশকে খুব প্রয়োজন দুটো কারণে। একটি অর্থনৈতিক, আরেকটা রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক কারণটা হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বঙ্গোপসাগরে ভবিষ্যতে তেল-গ্যাস আবিষ্কারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিককালে তেল ও গ্যাস আহরণের সম্ভাবনাপূর্ণ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি বর্তমান সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে বেশ কটি মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিজেদেরকে জড়িত করেছে। আর রাজনৈতিক কারণটা হলো এই অঞ্চল থেকে চীনের প্রভাব সংকুচিত করা। অতীতে সোভিয়েত প্রভাব প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যেভাবে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ঠিক সেভাবেই বর্তমানে চীনকে মোকাবিলা করতে বাংলাদেশকে প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুবই স্ট্র্যাটেজিক মনে হয়েছে। তবে ইম্পরটেন্ট বিষয় হচ্ছে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় মিত্র ভারত। তাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে নাকি বাংলাদেশকে স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্ব দেবে সেটা অনেকটা নির্ভর করে ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতার উপর। তার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন 'Diplomatic Capital' বৃদ্ধি করা। ড্যানিস রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রেবেকা এডলারের মতে, বিচক্ষণ কূটনীতিক গড়ে তোলা, বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করা এবং নেগোসিয়েশন করার দক্ষতা অর্জন করাকেই ডিপ্লোমেটিক ক্যাপিটাল বলে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

১৯৫৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে আলোচিত ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে, পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শাসন করেছিলেন। নিক্সনের পরামর্শদাতা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। যিনি বাংলাদেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি বিশ্বজুড়ে দাবার ঘুঁটি চালিয়েছিলেন। "One Man Against the World: The Tragedy of Richard Nixon” এই বিখ্যাত বইটি লিখেছেন আমেরিকান লেখক টিম ওয়েনার। বইটি রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার এর শাসনামল নিয়ে লেখা। নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার বইটি এটি। লেখক দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঐ সময়ে নিক্সন প্রশাসন অনেক সিদ্ধান্তই নিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি মার্কিন কংগ্রেস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের বিরোধিতা সত্ত্বেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে সহায়তা করেছিল। নিক্সন বাংলাদেশে গণহত্যার কথা আমলে নেননি। বরং মার্কিন কংগ্রেস ভারত ও পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা উপেক্ষা করে তিনি তৃতীয় দেশ ইরান ও জর্ডানের মাধ্যমে পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠান।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাটি ছিল কিছুটা প্যারাডক্সিকাল। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্যারাডক্সিকাল এই অর্থে যে, একদিকে আমেরিকা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও সিভিল সোসাইটি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করেছিল। দ্বিতীয়ত, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সে সময়ে পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রাখে, আবার অন্যদিকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য ভারতকে সাহায্য পাঠাতে থাকে। একাত্তরের মে মাসে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য ত্রিশ লক্ষ মার্কিন ডলার সাহায্য দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কি একসাথে বাংলাদেশকে সহযোগিতা ও বিরোধিতা দুটোই করেছিল?

আমি যখন বলছি মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে, তখন মূলত রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় এসে উভয়ই একই অর্থ বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র বলতে ওই আমলের নিক্সন সরকারকে বোঝাচ্ছে। আমি যদি বলি বর্তমানে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো নয়, এখানে বাংলাদেশ বলতে মূলত বর্তমান সরকারকে বোঝায়। আশাকরি বিষয়টি এখন বোধগম্য। তাই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বলতে মূলত সরকারের সিদ্ধান্তকেই বোঝায়। পররাষ্ট্রনীতিিতে দেশের জনগণ কী ভাবছে, জনগণ কোন দেশের পক্ষে অবস্থান করেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সরকার কোন পক্ষকে সমর্থন করছে সেটা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। যেমন- উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ইরাকি জনগণের পক্ষে ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে লড়েছে। যেহেতু রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তাই বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধটি সংগঠিত হয়েছিল। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিল ভারত। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। তাই স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। যে-কারণে নিক্সন প্রশাসন বাংলাদেশ সমস্যাকে পাকিস্তানের একটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে উল্লেখ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে নাইজেরিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী বায়াফ্রার সঙ্গে তুলনা করে। এটিকে ভারত বনাম পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে লেবেল করা হয়।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে পাকিস্তানের পক্ষে যাবতীয় সমর্থন আদায়ের নির্দেশ দেন। কূটনৈতিক ভাষায় যাকে বলা হয় 'Tilt Policy'- কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা। এই পলিসির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকে এবং ভারতের জন্য আর্থিক সাহায্য স্থগিত করে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কিছু সিনেটর, রিপ্রেজেনটেটিভস, বুদ্ধিজীবী, কিছু মার্কিন সংবাদপত্র-সহ বেসরকারি পর্যায়ের অনেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ কনসার্ট' জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। মার্কিন সরকারের মুখ্য কর্মকর্তা হিসেবে তখন ঢাকাতে ছিলেন হার্বার্ট স্পাইভ্যাক। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের একটি বার্তা হস্তান্তর করেন। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের সাথে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ৯ এপ্রিল একটি চিঠি পাঠান যাতে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। সে বছরেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৭২ সালের ১৮ই মে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হার্বার্ট স্পাইভ্যাক হন ভারপ্রাপ্ত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করেন। ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় ভাষণ দান করেন। ১৯৭৪ সালে অক্টোবরে হেনরি কিসিঞ্জার দক্ষিণ এশিয়ায় সফরকালে ঢাকায় এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার পর তিনি বঙ্গবন্ধুকে 'A man of vast conception' বলে অভিহিত করেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন: স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৫৫ সালের ১৮ থেকে ২৪ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার বান্দুংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল 'বান্দুং এশিয়ান আফ্রিকা কনফারেন্স'। সেখানে বলা হয়েছিল এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলো কোন জোটে বা ব্লকে যোগ না দিয়ে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। বান্দুং সম্মেলনের পর ১৯৬০ সালের দিকে এশিয়া ও আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো সিদ্ধান্ত নেয় তারা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো ব্লকে যোগ দেবে না। ফলশ্রুতিতে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, ঘানার কাওয়ামে ক্রুমাহ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ সুকর্ণ এসব রাষ্ট্রনেতারা গড়ে তোলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম)। যাকে ইংরেজিতে Non-Aligned Movement (NAM) বলা হয়। ১৯৬১ সালে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ২৫টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ন্যামের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। ১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ই সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত হয় ন্যামের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন। এতে প্রথমবারের মতো যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান সৃদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখে এই সফর। সম্মেলনে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল, যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি-সহ অন্যান্য বিশ্বনেতারাও অংশ নিয়েছিলেন। যারা ন্যাম গঠনের অগ্রদূত ছিলেন তারা সবাই মূলত পরোক্ষভাবে কিছুটা সোভিয়েত ঘেঁষা ছিলেন। এমনকি মার্শাল টিটু, ফিদেল ক্যাস্ত্রো নিজ নিজ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই যুক্তরাষ্ট্র জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনকে ভালো চোখে দেখেনি। ১৯৭২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর চার দিনের সোভিয়েত সফর, বৈশ্বিক অঙ্গনে সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর উঠা বসা এবং বাংলাদেশের সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি কারণে বঙ্গবন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হন।

Track I এবং Track II পলিসি: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নাম হচ্ছে- Central Intelligence Agency (CIA)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে এবং মার্কিন বিরোধী যে-কোনো ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করতে বিভিন্ন সিক্রেট এজেন্ডা নিয়ে থাকে এই গোয়েন্দা সংস্থাটি। তাদের গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে যেসব অপারেশন পরিচালনা করা হয় সেগুলোর বিভিন্ন কোড নেইম বা Cryptonym থাকে। পূর্ব থেকেই তাদের অপারেশন সম্পর্কে যেন কেউ আঁচ করতে না পারে সেজন্যই এসব কল সাইন ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: Track I এবং Track II হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম দুটি সিক্রেট প্রজেক্ট। এই কর্মসূচির শিকার হয়েছিলেন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে, বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান, কঙ্গোর লুমুম্বা, এবং ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো-সহ অসংখ্য রাষ্ট্রপ্রধান। "Track I" পদ্ধতি অনুযায়ী বিদেশে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে তৎপরতা চালায়, বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপ এবং কর্পোরেশনগুলোকে অর্থায়ন করে তাদের পক্ষ হয়ে কাজ করতে। ট্র্যাক ওয়ান পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে "Track II" গ্রহণ করা হয়। চিলির আলেন্দে হত্যার পর আলেন্দের স্ত্রী ১৯৭৪ সালে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে Track II সম্পর্কে বলেছিলেন। মিসেল আলেন্দে বলেছিলেন, কোনো পপুলার গভার্নমেন্টকে উৎখাত করার জন্য সিআইএ প্রথমে সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে দেয়। তারপর নানা গোলযোগ সৃষ্টি করে। শ্রমিক ধর্মঘট উসকে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। দেশব্যাপী আন্দোলন নামাতে পেশাজীবীদের মদদ দেয়, বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্রের চালান পাঠায়। এভাবে পপুলার নেতা বা গভর্নমেন্টের জনপ্রিয়তা নষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। জনমতকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের দিকে নেয়। প্রথমে ওরা ভাব দেখায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে মিলিটারির মধ্য থেকে ওদের বাছাই করা লোকটিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়। এভাবে কঙ্গোতে লুমুম্বাকে মেরে ওরা বসিয়েছে মবুতুকে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণকে সরিয়ে বসিয়েছে সুহার্তোকে। চিলিতে আলেন্দেকে সরিয়ে বসিয়েছে পিনোচেটকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্র্যাক ওয়ান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেন স্বাধীন হতে না পারে সেজন্য মার্কিন ভূমিকা ছিল বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে। ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দ্বিতীয় ট্র্যাক ব্যবহার করা হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে মোট ৮ জন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়। লাগাতার পাটের গুদামে আগুন, চোরাচালান বৃদ্ধি, খাদ্যশস্য মজুদ, চালের চালান আটক করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি, জাসদের নামে জামায়াত-রাজাকার- আলবদরদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে প্রকাশ্য মুজিব বিরোধিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ জন ছাত্র খুনের ঘটনা যেন মিসেস আলেন্দের ভাষায় সিআইএর সেট প্যাটার্ন। [দেখুন- ইতিহাসের রক্ত পলাশ: পনেরো আগস্ট, পঁচাত্তর- আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী]

দি ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার (The Trial of Henry Kissinger)

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিবলয় প্রভাব- প্রতিপত্তির ক্ষেত্রে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বলয় নিয়ে মার্কিন প্রশাসনও নানামুখী তৎপরতা শুরু করে। এছাড়া সত্তরের দশকে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার রাজনীতি প্রতিহত করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের গোয়েন্দা সংস্থা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। "The Trial of Henry Kissinger" নামে আমেরিকান কলামিস্ট ক্রিস্টোফার হিচেন্স এর একটি বই আছে। ১৪৫ পৃষ্ঠার এই বিখ্যাত বইটি ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। লেখক পুরো বই জুড়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চিলি, সাইপ্রাস, পূর্ব তিমুর, ইন্দোচীন ইত্যাদি রাষ্ট্রে হেনরি কিসিঞ্জারের সম্পৃক্ততা। তার বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়টি হচ্ছে, Bangladesh: One Genocide, One Coup and One Assassination! এই অধ্যায়ে পাকিস্তানি সেনাদের হামলার নিন্দা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সিআইএর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সমর্থন করেছেন। ক্রিস্টোফার হিচেন্স লিখেছেন, 'চুয়াত্তরের নভেম্বরে কিসিঞ্জার দক্ষিণ এশিয়ায় সফরে গিয়ে বাংলাদেশে আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেন এবং এখন আমরা জানতে পারছি যে, এর পরপরই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের একাংশ গোপনীয়ভাবে মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্ররত একদল বাংলাদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে।

"In November 1974, on a brief face-saving tour of the region, Kissinger made an eight-hour stop in Bangladesh and gave a three-minute press conference in which he refused to say why he had sent the USS Enterprise into the Bay of Bengal three years before. Within a few weeks of his departure, we now know, a faction at the US embassy in Dacca began covertly meeting with a group of Bangladeshi officers who were planning a coup against Mujib. On 14 August 1975, Mujib and forty members of his family were murdered in a military takeover."
- Christopher Hitchens

লরেন্স লিফশুলজের গবেষণায় বাংলাদেশ

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের লরেন্স লিফশুলজ বাংলাদেশ নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। ক্রিস্টোফার হিচেন্স তার বইয়ে লরেন্সের গবেষণাটিও উল্লেখ করেছেন। লরেন্সের গবেষণায় উঠে এসেছে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডেও মার্কিন ভূমিকা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। নিক্সন প্রশাসন এবং কিসিঞ্জার বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সহজভাবে নিতে পারেনি। ভারত এবং রাশিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশের জন্ম হওয়ায় মার্কিন প্রশাসন দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে বিচলিত ছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় গভীর ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে উপদলীয় কোন্দল, খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করে সরকারকে অজনপ্রিয় করার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। ১৯৭৪ সালে মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশে খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল কিউবায় বাংলাদেশের পাট রপ্তানির অজুহাতে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের লরেন্স লিফশুলজ তার গবেষণায় দাবি করছেন যে, বাংলাদেশেও ওই Track I এবং Track II দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল। সিআইএ মুজিব হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালিদের ব্যবহার করেছিল।

[বিস্তারিত দেখুন: Christopher Hitchens, The Trial of Henry Kissinger, Page-53]

Question to think about?
স্নায়ুযুদ্ধকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। আজকের একুশ শতাব্দীতে এসেও কি যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের মধ্যকার নয়া স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বাংলাদেশের বিরোধিতা করবে?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
১. ইতিহাসের রক্ত পলাশ: পনেরো আগস্ট, পঁচাত্তর- আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী।
২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলিলপত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড- মিজানুর রহমান খান।
৩. বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি- তারেক শামসুর রেহমান।
4. Bass, Gary J. (2014), The Blood Telegram: Nixon, Kissinger and a Forgotten Genocide, Vintage
5. Hitchens, Christopher (2001), The Trial of Henry Kissinger, Verso Books
6. Lewis, David (2011), Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society, Cambridge University Press
7. Weiner, Tim (2016), One Man Against the World: The Tragedy of Richard Nixon, Griffin
8. Voetelink, Joop (2015), Status of Forces: Criminal Jurisdiction over Military Personnel Abroad, Springer
9. Mason, R. Chuck (2009), Status of Forces Agreement: What Is It, and How Has it Been Utilized? Congressional Research Service
10. United States Embassy (1996), Backgrounder: Status of Forces Agreement; A summary of U.S. foreign policy issues

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 ল্যাটিন আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতি

📄 ল্যাটিন আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতি


Theme: The Return of Geopolitics and A Problem from Hell
ল্যাটিন আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতি

"It's not that China understands Latin America better than the U.S. Rather, China has a pragmatic approach that fits the profile of Latin American governments and leaders." - Thiago de Aragao

ভূমিকা: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ল্যাটিন আমেরিকা একটি উপেক্ষিত বিষয়। অনেকে মনে করেন ল্যাটিন আমেরিকা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিলে সেখানে আলোচনার আর কিছুই থাকে না। তবে ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি অনেক বৈচিত্র্যময়। চিলির রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে সেটি অনেকের মাথায় না-ও আসতে পারে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতেও যে থাকতে পারে বাংলাদেশের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনা; তা মোটামুটি আলোচনারই বাহিরে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভেনেজুয়েলার “Dutch Disease” থেকে বাংলাদেশও যে শিক্ষা নিতে পারে সেটি ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্কে আলোচনা না করলে বোঝা সম্ভব নয়। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুকে না দেখলে বুঝতেই পারবেন না যে, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশেও “Impeachment” এর মতো ঘটনা সম্ভব। দরিদ্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বশ্যতা খুব সহজে মেনে নিলেও ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলমান রাখতে পারেনি। আমরা গত শতাব্দী ধরে ল্যাটিন আমেরিকাকে কেন্দ্র করে কেমন ভূরাজনৈতিক খেলা হয়েছে তা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। তবে বর্তমানে চীনের উত্থান এবং ল্যাটিন আমেরিকাকে ঘিরে তাদের Pragmatic Embrace Strategy ল্যাটিন আমেরিকার ভূরাজনীতিতে কেমন মাত্রা যোগ করবে তাই এখন দেখার পালা।

মনরো ডকট্রিন: যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে ওঠে
ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছে যাদের হাত ধরে তাদেরকে বলা হয় 'Founding Fathers'। তাদের মধ্যে ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন, জন এ্যাডামস, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন, থমাস জেফারসন, জেমস মনরোর মতো প্রমুখ নেতা। ১৮১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন জেমস মনরো। মনরো শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কুটনীতিক। উনিশ শতকে জেমস মনরো পরাশক্তি হওয়ার যে ভিত গেঁথে গিয়েছিলেন সেটার উপর নির্ভর করে আজও যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করছে।

বলতে পারবেন, একটি দেশের সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক পলিসি কোনটি? উত্তর হচ্ছে ফরেইন পলিসি বা পররাষ্ট্রনীতি। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে সেটি কখনো জনগণ নির্ধারণ করে দেয় না। এমনকি জনগণকে জানিয়ে কোনো রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে না। রাজনীতি বিজ্ঞানে "Camarilla" নামে একটি টার্ম রয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে সরকারের গোপন পরামর্শদাতা। প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রনায়ক বা শাসকদের কিছু গোপন এডভাইজার থাকে। আনঅফিশিয়াল এই পরামর্শদাতারা রাজনৈতিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এরা মূলত লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে কাজ করে (Behind the Scene)। ক্ষমতাসীন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান মূলত এদের থেকেই পরামর্শ নিয়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে। তাই পররাষ্ট্রনীতিকে "Least Democratic Policy" বলা হয়।

একজন দক্ষ ও কূটনৈতিক দূরদর্শীসম্পন্ন নেতা একাই একটি রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। শুধু রিয়ালিস্টিক পররাষ্ট্রনীতির উপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র যে বিশ্বের হেজিমন হতে পারে সেটি আমেরিকার উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট। এই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের যারা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাদের অনেকেই ছিলেন দক্ষ কূটনীতিক। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে জেমস মনরো। এই পর্বে তার যুগান্তকারী মনরো ডকট্রিন (Monroe Doctrine) নিয়ে কিছু কথা বলব। পরবর্তী আলোচনা থেকে আঁচ করতে পারবেন তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে কতটা দূরদর্শীসম্পন্ন ছিলেন।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অন্যতম শক্তিশালী দেশ আমেরিকা। অর্থ, সম্পদ, সামরিক সরঞ্জাম, তথ্য ও প্রযুক্তি সব দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে দারুণ আধিপত্য। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলে আমি-আপনিও হয়তোবা এই আধিপত্যের প্রশংসা করতাম। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ঠিকই এটি প্রত্যাশা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিক এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নেতা হোক। এখন প্রশ্ন হলো বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা হলো? আজকের যুক্তরাষ্ট্র হুট করেই বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি। তারা পরিকল্পনা করে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়েছে। মনরো ডকট্রিনের মাধ্যমে প্রথমে নিজেদের প্রতিবেশি অঞ্চল ল্যাটিন আমেরিকায়, তারপর মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপে, সোভিয়েত পতনের পর মিডল ইস্ট পলিসির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে, ওয়াশিংটন কনশেনসাসের মাধ্যমে আফ্রিকা ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সেই আধিপত্য ধরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে নিয়েছিল নানা থিওরি ও তত্ত্ব। উদাহরণস্বরূপ- কখনো হেজিমনিক স্ট্যাবিলিটি পলিসি, কখনো ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন তত্ত্ব, কখনো আবার ডেমোক্রেটিক পিস থিওরি, কখনো হেজিমনিক সভরেন্টি, কখনো ডুয়াল ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি ইত্যাদি।

১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। লক্ষ্য করে দেখবেন যে, ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত এই সময়টিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ঐ সময়টিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সবগুলো দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মান ও পুর্তগিজদের কলোনিতে পরিণত হয়েছিল। এসব অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আধিপত্যই ছিল না। ১৮১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ক্ষমতায় এসে চিন্তা করল যে, আমাদের পার্শবর্তী এসব অঞ্চল থেকে ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য হটাতে হবে এবং এখানে কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ মনরো বুঝতে পেরেছিল নিজ ঘরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে পুরো বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। তারপর সে অনুযায়ী মনরো তার পররাষ্ট্রনীতি সাজালেন। ১৮২৩ সালে তিনি কংগ্রেসে ঘোষণা করলেন মনরো নীতি। তার সেই পররাষ্ট্রনীতিকেই বলা হয় Monroe Doctrine বা মনরো নীতি। কী ছিল মনরো নীতিতে?

১. ল্যাটিন আমেরিকার যে-কোনো বিষয়ে ইউরোপের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বা উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অবৈধ হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ ল্যাটিন আমেরিকার ভূখণ্ডে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের প্রভাব বা কর্তৃত্ব আমেরিকা মেনে নেবে না। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা ও পানামাকে নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে স্পেন থেকে স্বাধীন করায়। সে আলোচনা একটু পর বিস্তারিত বলছি।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজ ভৌগোলিক সীমানার বাইরে তথা আটলান্টিক এর উপারের অন্য কোনো রাষ্ট্রকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। এটি দ্বারা জেমস মনরো ইউরোপীয়দের একটি মেসেজ দিয়েছিলেন যে, আমরা তোমাদের ঐদিকে (ইউরোপে) যাব না, তোমরাও আমাদের এদিকে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) এসো না। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফাঁদ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এই সময়টিতে নিরবচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছিল। আর এই ১০০ বছর যুক্তরাষ্ট্র নিজের ঘরকে গুছিয়েছে। কারণ বিশ্বের পরাশক্তি হতে হলে নিজেকে আগে শক্তিশালী হতে হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের অর্থনীতি, রাজনীতি, মিলিটারি ও প্রযুক্তিগত উন্নতিতে মনোনিবেশ করে। পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে শক্তিশালী করার এই নীতিকে টার্ম হিসেবে “Non-Interventionist Policy" বলা হয়। অর্থাৎ বিশ্বের রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রথমে শক্তিশালী করেছে। মোটামুটিভাবে শক্তিশালী হওয়ার পর বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের আধিপত্য জানান দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে সময়টিতে নিজেকে গড়েছে সেই সময়টিতে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

৩. ট্র্যাপ হিসেবে মনরো নীতিতে উল্লেখ করা হয় যে, আমেরিকা ইউরোপের কোনো প্রকার রাজনীতিতে অংশ নেবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের কোনো প্রকার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। মূলত মনরো নীতির উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পৃথিবীর প্রায় সকল ঘটনার সাথে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজের ঘরকে (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) আগে সামলানো। আর একারণেই মনরো নীতিকে বলা হয়- Policy of Isolation বা বিচ্ছিন্ন থাকার নীতি।

৪. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূখণ্ডকে পৃথিবীর কোনো দেশের রাজনৈতিক বা ঔপনিবেশিক স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। তথা এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার সীমানা বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। মেক্সিকো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, ওয়াইয়োমিং, ইউটাহ, কলোরাডো, অ্যারিজোনা এবং নিউ মেক্সিকো শহরগুলোর পুরোপুরি বা অংশবিশেষ দখল করে নেয়। এক লাফে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা বহুগুণ বেড়ে যায়।

৫. ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি ভুল পথে চলে তবে সেই দেশকে শাসন করার অধিকার থাকবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের। এখানে ভুল পথে চলা বলতে মার্কিন বিরোধী হওয়া। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি ল্যাটিন আমেরিকার যে রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয়ে আশ্রয় নিয়েছিল কিংবা যারা সমাজতান্ত্রিক মতবাদে দেশ পরিচালনা করেছিল তাদের যুক্তরাষ্ট্র পথভ্রষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

লক্ষ্য করে দেখবেন যে, মনরো নীতির এই বৈশিষ্ট্যগুলো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার করার পথ সুগম করে দিয়েছিল। আমরা দেখেছি পরবর্তীতে ঠিক সেটাই হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকায় ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য কমে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি মেনে নিয়েছিল কী? প্রথমত, "উপনিবেশবাদের একাল সেকাল" অধ্যায়ে আমরা দেখেছিলাম ফ্রান্সে নেপোলিয়নের উত্থান, শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ, নিজেদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল ইত্যাদির কারণে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া ব্রিটেন এই মনরো ডকট্রিনকে সাদরে গ্রহণ করেছিল তাদের সুবিধার্থে। কারণ ব্রিটেনের জন্য সেই সময়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। লন্ডনে ব্যাপক শিল্পায়নের কারণে সেই শিল্প থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাজার দরকার ছিল ব্রিটেনের। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা ল্যাটিন আমেরিকায় বাণিজ্য করত। তাই অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করেনি। দ্বিতীয়ত, ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে ইউরোপিয়ান কলোনি বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এই পলিসি ল্যাটিন আমেরিকার নেতাদের কাছে আশীর্বাদ হিসেবে মনে হয়েছিল। সিমন বলিভারও মনরো ডকট্রিন আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেন। কারণ তখন গোটা আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে ইউরোপীয় কলোনি বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছিল। তাই সবাই তখন 'Pan-Americanism' এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিল। প্যান আমেরিকানিজমের মানে হচ্ছে, আমেরিকা মহাদেশীয় সকল রাষ্ট্র একতাবদ্ধ থাকা এবং একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসা।

পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও মনরোর এই লিগ্যাসি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এই নীতির প্রথম আক্রমণাত্মক প্রয়োগ দেখান থিওডোর রুজভেল্ট। তিনি বলেছিলেন পশ্চিম গোলাধে (Western Hemisphere) কোনো রাষ্ট্রের সমস্যা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা হবে আন্তর্জাতিক পুলিশি ভূমিকা, সেক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। বিংশ শতকের শুরুতে ২৬তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট মনরো ডকট্রিনে আরও কয়েকটি নতুন বিষয় যুক্ত করেন। তিনি এটিকে আরেকটু ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেন। ফলশ্রুতিতে বলা হয় ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশ যদি মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল পথে চালিত হয়, তবে সেই দেশকে শাসন করার অধিকারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে। এই যে মনরো নীতিকে ঢেলে সাজানোর মাধ্যমে রুজভেল্ট নতুন একটি আগ্রাসী সংস্করণ দাঁড় করালেন সেটিকে "Roosevelt Corollary" বলা হয়। এর মানে হচ্ছে রুজভেল্ট মূলত ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে চেয়েছিলেন। এভাবে মনরো ডকট্রিন ঘোষিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকায় আগ্রাসন শুরু করে এবং সে দেশগুলোর জন্য নিজেদের পছন্দের শাসক বেছে নেয়। কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করি।

• মার্কিন প্রশাসন ১৯৮০ সালে এল সালভাদরে যে সামরিক অভ্যুত্থানটি হয়েছিল সেখানে সহায়তা করে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী সরকারকে সরিয়ে আমেরিকার মদদপুষ্ট সরকারকে বসানো হয়。
• ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন নিকারাগুয়ার কন্ট্রা বিদ্রোহীদের সহায়তা করেন, যারা দীর্ঘ নয় বছর লড়াই করে প্রায় ত্রিশ হাজার নিকারাগুয়ান মানুষকে হত্যা করে।
• ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র গ্রানাডায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
• ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাদকবিরোধী অভিযানের অজুহাতে পানামায় সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেছিল এবং নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।
• ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে জৈব অস্ত্র আধুনিকায়নের অভিযোগ তুলে দেশটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল।
• ২০০৯ সালে হন্ডুরাসের সামরিক অভ্যুত্থানে মার্কিন প্রশাসন সমর্থন দিয়েছিল। সমসাময়িক ভেনেজুয়েলা, পেরু, বলিভিয়া, চিলিতে যুক্তরাষ্ট্র একই কায়দায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায় লিপ্ত। ল্যাটিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্র যে কাজটি বেশি করেছিল সেটি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোকে উৎখাত করে তদস্থলে সামরিক শাসক বসানোর চেষ্টা করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সেখানে মিলিটারি শাসনও প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এরকম দ্বিচারিতা শুধু বিংশ শতাব্দীতেই নয় একবিংশ শতাব্দীতেও বহাল তবিয়তে রয়েছে। কেমেলিওনের মতো যুক্তরাষ্ট্র তার রং বদল করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনি এমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। পরাশক্তি হওয়ার জন্য যে কৌশলে কাজ করতে হয় প্রতিটি কৌশল সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা একটু খারাপ হলেও বিশ্বে দেশটির প্রভাব কখনোই কমবে না, যেটি সোভিয়েতের ক্ষেত্রে হয়েছিল। চীন যতই চেষ্টা করুক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে অতিক্রম করে তদস্থলে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

কিউবা: যাকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি হওয়ার দ্বিতীয় যাত্রাটি শুরু হয়
একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় চরিত্র (National Character) খুবই আগ্রাসী। কিন্তু আজকের আধিপত্যবাদী এই আমেরিকা একটি সময়ে বিশ্ব রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ১৮৬৫ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ সমাপ্তির পর, ১৮৯৮ সালেই আমেরিকা স্পেনের সাথে একটি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাল্টে যায় আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির ধরন এবং বিশ্ব রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় আমেরিকা হয়ে ওঠে প্রবল সাম্রাজ্যবাদী। বিশ্বে পরাশক্তি হয়ে উঠার পেছনে মনরো ডকট্রিনের পর এই যুদ্ধটি ছিল আমেরিকার দ্বিতীয় পদক্ষেপ।

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অবস্থিত ফিদেল ক্যাস্ত্রোর দেশ কিউবা। ভারতীয় উপমহাদেশে যারা বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের কাছে সমাজতান্ত্রিক কিউবা একটি ফ্যান্টাসির জায়গা। কিউবা আজকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শত্রু রাষ্ট্র। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় এই কিউবা স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। কলোনিয়াল পিরিয়ডে কিউবা ছিল স্পেনের একটি উপনিবেশ। ১৮৯৫ সালে কিউবাতে স্পেনবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমাতে স্প্যানিশ সরকার আন্দোলনকারীদের বন্দি করে বন্দিশিবিরে আটক করে রাখত। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বন্দিশিবিরেই অসংখ্য কিউবানদের মৃত্যু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো কিউবার এই করুণ ইতিহাস সম্প্রচার করত। এমনকি সংবাদপত্রের কাটতি বাড়ানোর জন্য মিডিয়াগুলো অতিরঞ্জিত ভাবে কিউবানদের নিয়ে সংবাদ উপস্থাপন করত। সেখান থেকেই মূলত 'Yellow Journalism' বা হলুদ সাংবাদিকতার সূচনা।

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও কিউবার প্রতি একটি সহনাভূতি জাগে। ২৫তম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি তখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায়। কিউবাকে কেন্দ্র করে ১৮৯৮ সালে শুরু হয় স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধ। যুদ্ধে স্পেন পরাজিত হয় এবং প্যারিসে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী স্পেন কিউবাকে স্বাধীনতা দেয় এবং পুয়ের্তো রিকো ও গুয়াম দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় আসে। যুক্তরাষ্ট্র যে কিউবাকে মানবিক কারণে সহযোগিতা করেছে বিষয়টি এরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দুইটি স্বার্থ ছিল। প্রথমত, কিউবাতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানির বাণিজ্য ছিল। দ্বিতীয়ত, আরেকটি স্বার্থ ছিল আমেরিকার অঞ্চল থেকে উপনিবেশবাদী স্পেনের আধিপত্য হ্রাস করা। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯০৩ সালে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে 'Platt Amendment' নামে একটি চুক্তি করে। প্ল্যাট চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কিউবার পররাষ্ট্রনীতিতে, অর্থনীতিতে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার পায়। সেই চুক্তি অনুযায়ী কিউবার বিখ্যাত 'গুয়ান্তানামো বে' ইজারা নিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক "বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের" বন্দি করে রাখা হয় এই গুয়ান্তানামো বে ক্যাম্পে। গোপনে পরিচালিত এই ক্যাম্পে বন্দিদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকে এখন পর্যন্ত পুরো গুয়ানতানামো বে কারাগারেই চলছে বন্দিদের উপর অমানবিক নির্যাতন। ৯/১১-এ যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ২০০২ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ কারাগার চালু করেন। কিউবার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিতে এ কারাগার অবস্থিত। এভাবে স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবেশ করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা মত দেয় যে, বিশ্বের পরাশক্তি হতে হলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আবশ্যক।

চীন: ল্যাটিন আমেরিকায় চীনের 'Pragmatic Embrace Strategy'
লাটিন আমেরিকাকেন্দ্রিক চীনের স্ট্র্যাটেজিগুলো যুক্তরাষ্ট্র এখনো বুঝে উঠতে পারছে না। বৈদেশিক নীতি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক থিয়াগো আরাগা-ও এমনটি দাবি করেছেন। বিগত দুশো বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ল্যাটিন আমেরিকায় ফলপ্রসূ হচ্ছে না। মিলিটারি ইন্টারভেনশন কিংবা শিকাগো বয়েজদের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তন করে সাময়িক কিছু সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র পেলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান আসছে না। কারণ ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো ক্ষমতাসীন সরকারকে (Incumbent Government) উৎখাত করে তদস্থলে মার্কিন মদদপুষ্ট কাউকে বসালেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। যেমন- বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্রী ইভো মোরালেস সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট জিনাইন এ্যানেজকে ক্ষমতায় বসালেও মাত্র দুই বছর যেতে না যেতেই বলিভিয়ায় পুনরায় ইভো মোরালেসের উত্তরসূরিরা ক্ষমতায় চলে এসেছে। অথচ চীন এগুচ্ছে ভিন্ন আরেকটি কৌশলে।

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট প্রতিপক্ষ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিভিন্ন অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থ এবং সোভিয়েত পলিসি মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ভালোভাবে বুঝে উঠতে পেরেছিলেন বলেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আজকের একুশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট প্রতিপক্ষ হচ্ছে চীন। চীনের সক্ষমতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে চীনের পররাষ্ট্রনীতি বুঝে উঠতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চীনের পার্থক্য এখানেই। মার্কিনীরা চীনের এপ্রোচ বুঝে উঠতে পারছে না। তাই নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা চীনের এই কৌশলগত অবস্থানকে 'Pragmatic Embrace Strategy' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিই চীনের এপ্রোচ বুঝে উঠতে পারছে না সেখানে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের নিম্ন ডিপ্লোমেটিক ক্যাপিটাল নিয়ে কীভাবে চীনের কৌশলগত আচরণ বুঝে উঠবে? তাই এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বিরোধ চলছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্বকে বলা হচ্ছে "A Prelude to a Second Cold War" বা দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধের পূর্বরঙ্গ। ল্যাটিন আমেরিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি হচ্ছে, মার্কিন বিরোধী সরকারদের উৎখাত করে সেখানে মার্কিনপন্থি কাউকে ক্ষমতায় বসানো। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র একটি স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন চায়। রাশিয়া পূর্বের তুলনায় ল্যাটিন আমেরিকায় কিছুটা নিষ্ক্রিয়। তবে রাশিয়ার নীতি হচ্ছে এখানে আইডিওলজি পিচ করা। তথা সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া। অন্যদিকে চীনের ফরেইন পলিসি সরকার পরিবর্তন নিয়েও নয়, এখানে মতাদর্শ প্রচার করাও নয়। চীনের নীতি হচ্ছে যে পন্থি সরকারই ক্ষমতায় আসুক আমার এতে সমস্যা নেই, তারা যেসব মতাদর্শে বিশ্বাস করে, তাতেও আমার সমস্যা নেই। আমি (চীন) আগাবো অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে। অন্য রাষ্ট্রগুলোকে কীভাবে চীনের উপর নির্ভরশীল করে রাখা যায় সেই কৌশলে এগুচ্ছে বেইজিং। উদাহরণস্বরূপ: চীনের কৌশলটি এরকম যে, চীন প্রথমে একটি দেশে কূটনৈতিক সফরে যাবে। তারপর বলবে আপনার দেশে তো কোনো রেলওয়ে নেই। তাই যাতায়াতের সুবিধার্থে আমি এখানে একটি রেললাইন করে দিতে চাই। আপনাদের তো কোনো সাবমেরিন নেই। নিরাপত্তা জোরদারে আমি কয়েকটি সাবমেরিন উপহার দিতে চাই। সমস্যা নেই টাকা-পয়সা যা লাগে পরে দিলেও হবে। চীনা কোম্পানিগুলো আপনার দেশে বিনিয়োগ করলে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। তখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে। এটিই হচ্ছে চীনের কৌশল। তথা এভাবে অর্থনৈতিক সাহায্য ও বিনিয়োগ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোকে বশে আনার যে কৌশল চীন বেছে নিয়েছে সেটিকে “Checkbook Diplomacy” বলা হয়।

এক কথায় যুক্তরাষ্ট্র এগুচ্ছে Political Approach নিয়ে, রাশিয়া এগুচ্ছে Ideological Approach নিয়ে, আর চীন এগুচ্ছে Economic Approach নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ ব্রাজিলের কথা বলা যায়। এটি স্বীকৃত যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র রাষ্ট্র। ভবিষ্যতে হয়তোবা ব্রাজিল ন্যাটো জোটেরও সদস্য হবে। কিন্তু সেই ব্রাজিলের 5G বাজার এখন চীনের দখলে। চীনের হুয়াওয়ে মোবাইল ব্রাজিলে খুবই জনপ্রিয়। ব্রাজিলও এখন আকরিক ধাতু ও শস্যদানা (Ore and Grains) বেইজিংয়ে রপ্তানি করছে। আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা ও নিকারাগুয়াতে চীন একই পদ্ধতিতে এগোচ্ছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সরকার পরিবর্তনে গুরুত্বারোপ করছে না, রাশিয়ার মতো আলোচনার টেবিলে কোনো মতাদর্শ নিয়ে আসছে না, চীন নেগোসিয়েশন করছে অর্থনীতি নিয়ে।

চিলি: যে দেশটির সাথে মিশে আছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের রক্তাক্ত ইতিহাস
স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যে-সকল নেতারা তৃতীয় বিশ্বের গণমানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন এবং যারা জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছিলেন তাদের মধ্যে বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান ও চিলির সালভাদর আলেন্দে অন্যতম। ঢাকার সাথে সান্তিয়াগোর যে দুইটি মিল রয়েছে তন্মধ্যে একটি ভৌগোলিক অন্যটি রাজনৈতিক। বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র ভেদ করে সরলরেখা বরাবর যদি কোনো গর্ত খুঁড়ে যাওয়া যায় তবে আমরা সবাই চিলির নিকট প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে বের হব। কারণ বাংলাদেশের প্রতিপাদস্থান (Antipodal point) হচ্ছে চিলির নিকট প্রশান্ত মহাসাগরে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের ঠিক অপজিটে চিলির অবস্থান। চিলির সাথে বাংলাদেশের দ্বিতীয় যে সাদৃশ্যটি রয়েছে সেটি খুব বেদনাদায়ক। বঙ্গবন্ধু ও সালভাদর আলেন্দে সমকালীন নেতা ছিলেন। এক চিঠিতে সালভাদর আলেন্দে বাংলাদেশে সফর করে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার ইচ্ছেও ব্যক্ত করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই দুই নেতাকেই মার্কিন সহযোগিতায় স্বীয় দেশের সেনাবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে ১৯৭৩ সালে সে দেশের সেনাবাহিনী হত্যা করেছিল। তার মাত্র দুবছর পরেই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।

রাজনীতি বিজ্ঞানের একজন স্টুডেন্ট হওয়ার সুবাদে চিলির রাজনীতি আমাদেরকে আকৃষ্ট করেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সরু দেশ হিসেবে পরিচিত চিলিকে আজ হয়তো বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় কম দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের সাথে চিলির রাজনৈতিক ইতিহাসের মিল থাকায় চিলি সম্পর্কে কিছু মৌলিক ধারণা থাকা আবশ্যক। কলম্বাসের নতুন দুনিয়া আবিষ্কারের পর থেকে তিনশো বছর দেশটি স্পেনের কলোনি ছিল। তাই চিলির ভাষা স্প্যানিশ, মুদ্রা পেসো। ১৮১৮ সালে স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং বর্তমান সংবিধানটি ১৯৮০ সালে প্রণয়ন করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী চিলি একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজধানী ও বৃহত্তম শহর সান্তিয়াগো। বর্তমানে চিলি বিশ্বের বৃহত্তম তামা উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। চিলির রাজনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে; গণতান্ত্রিক, সামরিক এবং পুনরায় গণতন্ত্র।

সালভাদর আলেন্দে ও চিলির গণতান্ত্রিক শাসন (১৯৩২-৭৩)
১৯৩২-৭৩ সাল পর্যন্ত চিলিতে গণতান্ত্রিক শাসন ছিল। তখন চিলি ছিল ল্যাটিন আমেরিকার একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা ছিল এবং দীর্ঘ চল্লিশ বছরে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেনি। তখন সেখানে কোনো বিশাল গণ আন্দোলন হয়নি এবং নির্বাচনগুলো ছিল স্বচ্ছ। চিলি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয় যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসীন হন। তার নাম সালভাদর আলেন্দে। সময়টি যেহেতু স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন; তাই এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কুনজর পড়তে সময় লাগেনি। আলেন্দে ক্ষমতায় আসীন হয়েই সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেন। ব্যাপকহারে শিল্প প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করেন। নারীশিক্ষা ও নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য চিলিতে প্রথম নারী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনিই। এসব সমাজতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞ পছন্দ হয়নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের। ফলশ্রুতিতে চিলিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয় নিক্সন প্রশাসন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার চিলির সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। প্ল্যান অনুযায়ী ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হত্যা করা হয় আলেন্দেকে। আলেন্দে হত্যাকাণ্ডের পর চিলির সেনাপ্রধান পিনোচেটকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

বাংলাদেশ ও চিলি: ভাগ্য যেন একসূত্রে গাঁথা
চিলিতে প্রায় সতেরো বছর সামরিক শাসন ছিল (১৯৭৩-৯০)। মার্কিন মদদপুষ্ট পিনোচেট ক্ষমতায় এসেই তামা ইন্ডাস্ট্রিগুলো বেসরকারিকরণ করেন। চিলির ২৬ জন অর্থনীতিবিদকে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। এসব অর্থনীতিবিদরা চিলির অর্থনীতি এমনভাবে সাজান যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষিত হয়। ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যায় চিলির অর্থনীতি। মার্কিনপন্থি এসব অর্থনীতিবিদরাই টার্ম হিসেবে 'The Chicago Boys' নামে পরিচিত। এসব অর্থনীতিবিদদের কাজ হচ্ছে এরা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে প্রশিক্ষণ নেবে। তারপর নিজ দেশে এসে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে এমন সব ইকোনমিক পলিসি গ্রহণ করবে। দীর্ঘ সেনা শাসনের পর চিলিতে ১৯৮১ সালে একটি গণভোট হয়, যেখানে জনগণ পুনরায় গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে যাওয়ার পক্ষে রায় দেয়। গণ আন্দোলনে পিনোচেটও এরশাদের মতো পদত্যাগ করেন। ১৯৯০ সালে চিলিতে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। চিলির রাজনৈতিক এই ইতিহাস বাংলাদেশের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়; তাই না? বাংলাদেশ এবং চিলির ভাগ্য যেন একসূত্রে গাঁথা ছিল।

আলেন্দে সমাজতান্ত্রিক পলিসি গ্রহণ করায় নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন চিলিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত ইউনিয়নে সফর, সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ, সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবায় পাট রপ্তানির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন বাংলাদেশের কাছেও খাদ্যসামগ্রী রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। আলেন্দেকে হত্যা করার পর চিলিতে সেনা শাসন জারি হয়। একই ভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশেও সেনা শাসন কায়েম হয়। আলেন্দে হত্যার বিচার যাতে না হয় সেজন্য তার হত্যাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা হয়। তেমনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার যাতে না হয় সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকারীদের ক্ষমতায় রাখা হয়। ১৯৯০ সালে সেনাশাসক পিনোচেটের পতন ঘটিয়ে চিলিতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। একই ভাবে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার হয়। শুধু সালের দিক থেকেই মিল নয়; এমনকি চিলির বর্তমান জনসংখ্যাও বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখার সমান (১৭ কোটি)। চিলিয়ান রাজনীতির তৃতীয় ধাপ হচ্ছে ১৯৯০ এর পর থেকে বর্তমান সময়টি।

চিলিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের মূলত দুটি স্বার্থ ছিল। প্রথমটি হলো ল্যাটিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্রের বিস্তার রোধ। সালভাদর আলেন্দে ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকারপ্রধান, যিনি কি না নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তিনিই বিশ্বের প্রথম নেতা যিনি সাহস দেখিয়েছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে ইতিহাস গড়া যায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় স্বার্থটি হলো মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। যুদ্ধাস্ত্র, গাড়ি, এমনকি নিত্য ব্যবহার্য টিভি ও ফ্রিজে তামার ব্যবহার অপরিহার্য। অন্যদিকে পৃথিবীতে তামার সর্বোচ্চ উৎপাদক হলো চিলি। কিন্তু চিলির তামা খনিসমূহের উৎপাদন ও রপ্তানি ছিল অ্যানাকোন্ডা ও কেইনকোট নামক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দুই কোম্পানির অধীনে। সালভাদর আলেন্দে ক্ষমতায় এসে কয়েক মাসের মধ্যে কংগ্রেসে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে উক্ত কোম্পানি দুটোর জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। ফলে চিলির তামা শিল্প হাতছাড়া হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের। এই হচ্ছে চিলির বিস্তারিত ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিলির সাথে আমাদের ঐতিহাসিক অনেক মিল থাকলেও চিলিতে বাংলাদেশের কোন অ্যাম্বাসি নেই। এমনকি চিলির সাথে সম্পর্ক জোরদারে ঢাকার কোন তৎপরতাও নেই। চিলিতে বর্তমানে কমুউনিস্ট বিরোধী ডানপন্থি নেতারা ক্ষমতায়। পৃথিবীর যে-সকল দেশে আয়বৈষম্য প্রকট চিলি তাদের মধ্যে একটি। এই আয়বৈষম্যের কারণে চিলিতে কয়েকদিন পরপর গণ আন্দোলন হয়। আর তখনই মাঝে মাঝে পত্রিকার পাতায় চিলির নামটি উঠে আসে। সেই উঠে আসা থেকে মানসপটে চিত্রাঙ্কিত হয় বঙ্গবন্ধু, আলেন্দে ও ফিদেল ক্যাস্ত্রোর চরিত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দিয়েছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমন্ত্রিত বিশ্ব নেতাদের মাঝে ছিলেন সালভাদর আলেন্দে, ফিদেল ক্যাস্ট্রো প্রমুখেরা। সেখানে ফিদেল বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, "মুজিব, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি অনুসরণের জন্য আমাদের বুকে ও পিঠে বুলেট বরাদ্দ হয়ে গেল। তাই সাবধানে থাকবেন।" সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি অনুসরণের কারণে তাদের সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেও তাদের আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। তাদের আদর্শ তো একটি জ্বলন্ত লাভার মতো, সেই লাভা নিভানোর সাধ্য কার? সুহার্তো, বঙ্গবন্ধু, ক্যাস্ত্রো, আলেন্দের প্রীতির কাছে হেরে গিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা। চিলির সামনের দিনগুলো কেমন হবে সেটি জানতে আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে চিলির একেবারেই বিপরীত প্রান্তে অবস্থিত দেশটির পক্ষ থেকে সবসময় শুভকামনা।

ভেনেজুয়েলা: বাংলাদেশ যেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে
পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তেলের মজুত, হীরক-সহ নানাবিধ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা। অথচ দেশটি বর্তমানে খুবই জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকট তৈরি হয়েছে প্রেসিডেন্ট পদটিকে কেন্দ্র করে। কারণ দেশটির প্রেসিডেন্ট এখন একসাথে দুইজন। একজন নিকোলাস মাদুরো, আরেকজন হুয়ান গুয়াইদো। দেশটির জনগণ ও সেনাবাহিনী দুভাগে বিভক্ত। কেউ সমর্থন করছে মাদুরোকে, কেউ আবার হুয়ান গুয়াইদোকে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার বলয়াধীন কানাডা, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে হুয়ান গুয়াইদোকে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন এবং তাদের বলয়াধীন তুরস্ক, ইরান এই রাষ্ট্রগুলো প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে নিকোলাস মাদুরোকে। এ যেন নতুন কোনো স্নায়ুযুদ্ধ। বৃহৎ শক্তিগুলো দ্বিধা বিভক্ত হয়ে দুটি পক্ষকে সমর্থন দেওয়ায় ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট কোন দিকে মোড় নিতে পারে সেটি নিশ্চিত করে বলাটা বেশ মুশকিল হয়ে পড়েছে। ১৯৬২ সালের কিউবার মিসাইল সংকটকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে যে ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল- ভেনেজুয়েলার সংকটকে নিয়েও সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশ ভেনেজুয়েলা। তিনশো বছর স্পেনের কলোনি থাকার পর ১৮১১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। বর্তমান সংবিধান প্রণয়ন করা হয় ১৯৯৯ সালে। বিপ্লবী নেতা সিমন বলিভারের স্মরণে দেশটির অফিশিয়াল নাম 'Bolivarian Republic of Venezuela'। কারাকাস হচ্ছে দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। সংবিধান অনুযায়ী ভেনেজুয়েলায় রয়েছে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা। দেশটির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হচ্ছে- United Socialist Party of Venezuela, এই দলের আলোচিত নেতা হচ্ছে হুগো শ্যাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো। বিশ্বে বামধারার রাজনীতির সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত কিংবা যারা কমুউনিস্টপন্থি তাদের কাছে এই সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ শ্রদ্ধার পাত্র।

১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা চৌদ্দ বছর ভেনেজুয়েলাকে শাসন করেছিলেন হুগো শ্যাভেজ। তার শাসনামলে ভেনেজুয়েলাতে একধরনের 'সমাজতন্ত্র কায়েম' করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শ্যাভেজের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। মাদুরো ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে মিলিটারিদের বসান। সংবিধান অনুযায়ী প্রতি ছয় বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়। সেই অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০১৮ সালে হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝখানে দেশটিতে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ভেনেজুয়েলার সাংবিধানিক পার্লামেন্টের নাম হচ্ছে National Assembly, যার বর্তমান আসন সংখ্যা ২৭৭টি।

২০১৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরোধী Democratic Unity Roundtable নামের এই দলটি সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। পার্লামেন্টে যেহেতু বিরোধী দলের প্রাধান্য, তাই ২০১৮ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দল থেকেই প্রেসিডেন্ট আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তাই নিকোলাস মাদুরো নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে এবং পুনরায় নির্বাচিত হতে সেনাবাহিনীর কিয়দংশের সমর্থন নিয়ে নতুন আরেকটি প্যারালাল পার্লামেন্ট তৈরি করেন। যার নাম দেন ‘National Constituent Assembly’। নতুন এই পার্লামেন্টের অধীনে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়। পরিকল্পিতভাবে মাদুরো পুনরায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দল বলছে আমাদের তো সাংবিধানিক পার্লামেন্ট আছেই কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক সুবিধার্থে নতুন আরেকটি পার্লামেন্ট তৈরি করা সম্পূর্ণ অবৈধ (illegitimate)। দ্বিতীয়ত, সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে এবং এতে কারচুপি হয়েছে। তাই মাদুরো প্রেসিডেন্ট হিসেবে বৈধ নয়। ভেনেজুয়েলার সংবিধানে বলা আছে যে, প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হলে পার্লামেন্টের তথা National Assembly এর যিনি সভাপতি তিনিই প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ফলস্বরূপ যেহেতু নিকোলাস মাদুরো অবৈধ; তাই পার্লামেন্টের সভাপতি হিসেবে বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। সেনাবাহিনীর আরেক অংশ হুয়ান গুয়াইদোকে সমর্থন দিচ্ছেন। মূলত সেখান থেকেই সংকটের সূচনা। এই দুই প্রেসিডেন্টকে নিয়ে শুরু হয় বিশ্ব রাজনীতি। ভূরাজনৈতিক এই পরিপ্রেক্ষিতে ভেনেজুয়েলার অবস্থা এখন খুবই দুর্দশাগ্রস্ত। দেশটির বর্তমান রাজনীতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চারটি টার্ম দিয়ে খুব সহজে ফুটিয়ে তোলা যায়।

১. Deep state: রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ থাকা কখনোই উচিত না। যখন রাষ্ট্রের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী প্রভাব খাটায় কিংবা রাষ্ট্রের পলিসি তৈরিতে তাদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় তখন সেই রাষ্ট্রকে 'Deep state' বলা হয়। ভেনেজুয়েলার রাজনীতি বিগত কয়েক দশক ধরে সেদেশের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় এসেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনাদের বসিয়েছেন。

২. Kleptocracy: দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার। যে দেশের রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা নিজ দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে- ঐদেশের রাজনীতিকে 'Kleptocracy' বলা হয়। ভেনেজুয়েলার বর্তমান অবস্থা ঠিক এরকমই।

৩. Kakistocracy: নিকৃষ্ট এবং অদক্ষ মানুষদের শাসন। অধিক মাত্রায় রাজনৈতিক দলীয়করণের কারণে যখন যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য স্থানে না বসিয়ে অযোগ্যদের বসানো হয় তখন সেই শাসনব্যবস্থাকে 'Kakistocracy' বলা হয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ব্যক্তিগত জীবনে একজন ট্রাকচালক ছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উঠে এসেছিলেন। রাজনীতিতে অজ্ঞ এই ব্যক্তি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিজের অনুসারীদের বসান। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই আজকে শাসিত হচ্ছে Kakistocracy এর মাধ্যমে। যেটাকে 'Ruled by worst people'ও বলা যায়。

৪. Plutocracy: ধনিকগোষ্ঠীর শাসন। রাষ্ট্রে যারা আর্থিকভাবে অনেক ধনী তাদের কর্তৃক রাষ্ট্র শাসনকেই 'Plutocracy' বলা হয়। ভেনেজুয়েলাতে যারা বড় বড় কোম্পানি বা কর্পোরেশনের মালিক তারাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে। জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে তারা নিজ স্বার্থে দেশ পরিচালনা করে।

শুধু একটি আর্থিক সোর্সের উপর নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র চলতে পারে না। তার জ্বলন্ত উদাহরণ ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি শুধু তেলের উপর নির্ভরশীল ছিল। ভেনেজুয়েলার সরকার তেল ছাড়া অন্য কোনো শিল্পের উপর অতটা নজর দেয়নি। আজকে ভেনেজুয়েলাতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির (Hyperinflation) কারণে শুধু একটি পাউরুটি ক্রয় করতেই একবস্তা সমপরিমাণ টাকা লাগে। এভাবে বিশেষ একটি সেক্টরের অর্থনৈতিক উন্নতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াকে টার্ম হিসেবে "Dutch Disease" বলে। ১৯৫৯ সালে নেদারল্যান্ডসের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। কারণ নেদারল্যান্ডস অধিক পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর হয়ে গিয়েছিল। গ্যাস শিল্পে বিপর্যয় আসলে নেদারল্যান্ডস অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে। ভেনেজুয়েলারও একই অবস্থা। শুধু তেলের উপর নির্ভরতার কারণে আজ ভেনেজুয়েলার করুণ দশা। বাংলাদেশও এই Dutch Disease এ আক্রান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে শুধু পোশাক শিল্পের উপরেই অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত শুধু পোশাকশিল্পের উপরেই জোর না দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক অন্য খাতগুলো আরও ডাইভার্সিফাই করা। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ভবিষ্যতেও যে এরকম রমরমা থাকবে সেটির নিশ্চয়তা আমরা কেউ দিতে পারছি না। কারণ সময়টি এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের। বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে দারুণ উন্নতি করতে পেরেছে তার অন্যতম কারণ আমাদের সস্তাশ্রম (Cheap labour)। আমাদের এখানে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায়। কিন্তু রোবটিক্স, অটোমেশন ইত্যাদি কারণে ভবিষ্যতে সস্তা শ্রম অতটা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। দুশো জন শ্রমিক দশ দিনে যে পরিমাণ পোশাক তৈরি করতে পারে সেখানে একটি রোবট মাত্র এক ঘণ্টায় তার চেয়ে বেশি পোশাক তৈরিতে সক্ষম হবে। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে দেশগুলো রোবটের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের প্রয়োজনীয় পোশাক তৈরি করে নেবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নেওয়া খুবই জরুরি।

বলিভিয়া: একুশ শতকে রেজিম (regime) পরিবর্তনের নতুন প্যাটার্ন
একজন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে, একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে যে-সকল নতুন ট্রেন্ড যুক্ত হচ্ছে সেগুলোর সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বিশ্বজুড়ে সরকার পতনের অনেক ট্র্যাডিশনাল মডেল রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সরকার পতনের নতুন একটি মডেল আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথমে ট্র্যাডিশনাল মডেলগুলো একটু জেনে নেই।

১. A coup d'état (সেনা অভ্যুত্থান) ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ইতিহাস বিশ্বে অসংখ্য। যেমন- মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে সে-দেশের সামরিক বাহিনী উৎখাত করে। সুদানে তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার পর প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত করে সুদানের সেনাবাহিনী। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিয়ানমারের নিয়মতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে সে-দেশের সেনাবাহিনী।

২. Mass Upsurge (গণ অভ্যুত্থান) ক্ষমতাসীন সরকারের লাগামহীন ব্যর্থতা, দুর্নীতি ইত্যাদির কারণে দেশজুড়ে গণ অভ্যুত্থান হয়। সেই গণ অভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও এর অসংখ্য নজির রয়েছে। ২০১১ সালের গণ আন্দোলনে পতন হয়েছিল তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বেন আলীর। মিশরে পতন হয়েছিল ত্রিশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা হোসনি মোবারকের। পতন হয়েছিল ইয়েমেনের স্বৈরশাসক সালেহ এর।

আর বর্তমানে সরকার পতনের নতুন মডেলটি উপরের দুটি পদ্ধতির সংমিশ্রণে গঠিত। নতুন মডেলটি হচ্ছে Military-People Coup তথা সেনা-গণ অভ্যুত্থান। বর্তমানে সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলকে বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। তাই আজকের দুনিয়ায় সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। পূর্বে সাধারণত সামরিক বাহিনী নিজেই অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করত অথবা জনসাধারণের গণ অভ্যুত্থান হতো। কিন্তু এখনকার নয়া কৌশল হচ্ছে গণ-সামরিক অভ্যুত্থান। এ প্রক্রিয়ার শুরুতে সেনাবাহিনী কিছু মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দেয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে। তারপর কিছু স্বার্থান্বেষী জনগণ দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ এনে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। তখন বাহির থেকে মনে হয় সরকার বিরোধী আন্দোলনটি জনগণ থেকেই শুরু হয়েছে। এরপর সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে।

ফলস্বরূপ দূর থেকে পুরো ঘটনাই গণতান্ত্রিক আন্দোলন মনে হয়। কিন্তু এর অন্তরালে থাকে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক স্বার্থ। আর এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় Military-People Coup বা সেনা-গণ অভ্যুত্থান। এতে সরাসরি সামরিক শাসন কায়েম করা হয় না, আবার সামরিক সামরিক একটি ভাব থাকে। এতে সব কুলই রক্ষা হয়। জিম্বাবুয়ে, সুদানে সম্প্রতি এ ধরনের অভ্যুত্থান হয়েছে। সেনা-গণ অভ্যুত্থানের আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ বলিভিয়া।

ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোকে পরিবর্তন করতে যুক্তরাষ্ট্রও বর্তমানে একই পন্থা বেছে নিয়েছে। কোনো দেশের রেজিম পরিবর্তন করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ঐদেশের সেনাবাহিনীর সাথে আঁতাত করে, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সেনাবাহিনীরা কিছু জনগণকে আন্দোলনের জন্য মাঠে নামিয়ে দেয়। তারপর জনগণ আন্দোলন শুরু করে এবং মিলিটারিরা ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। তারপর মিলিটারি সমর্থিত বিরোধীদলীয় নেতা নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে ঘোষণা করে। তারপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব অন্তর্বর্তীকালীন সেই সরকারকে সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে এরকমই হচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ও বলিভিয়া তার টেক্সটবুক এক্সাম্পল। মনে করুন ল্যাটিন আমেরিকার কোনো একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গেল। তখন ঐদেশের মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমথর্ন নিয়ে পশ্চিমা গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিশ্বাসী এমন একজন বিরোধীদলীয় নেতা আন্দোলন শুরু করে দেবে। অভিযোগ ওঠাবে যে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। সুতরাং যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি অবৈধ। তাই এখন থেকে আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তখন যুক্তরাষ্ট্র এসে বলবে হ্যাঁ হ্যাঁ নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি। তাই যিনি নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে আমরা তাকেই সরকার হিসেবে সমর্থন করি।

দক্ষিণ আমেরিকার একটি ল্যান্ডলকড কান্ট্রি বলিভিয়া। দেশটির অফিশিয়াল নাম 'Plurinational State of Bolivia'। প্রশাসনিক রাজধানী হচ্ছে লাপাজ। এই লাপাজ পৃথিবীর উচ্চতম রাজধানী। বলিভিয়ার সবচেয়ে বৃহত্তম শহর হচ্ছে সেন্ট্রা ক্রুজ। এখানেই রাষ্ট্রের বড় বড় শিল্পকারখানাগুলো অবস্থিত। সিমন বলিভারের নেতৃত্বে দেশটি ১৮২৫ সালে স্পেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তাই তাদের ভাষা হচ্ছে স্প্যানিশ। দেশের অধিকাংশ জনগণই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ২০০৯ সালে দেশটি একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। সংবিধান অনুযায়ী বলিভিয়া একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সম্পূর্ণ দেশকে প্রশাসনিকভাবে ০৯টি জেলায় (Departments) বিভক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকেই সবগুলো জেলা শাসন করা হয় (Unitary)। প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়।

চার পাঁচটি সক্রিয় রাজনৈতিক দল রয়েছে। 'Movement for Socialism' নামের এই দলটি সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের এবং কিছুটা চীন ও রাশিয়াপন্থি। বর্তমানে আলোচিত প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস এই দলেরই। 'Civic Community' নামের দলটি উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং সংস্কারক। আর 'Creemos' নামের এই দলটি ডানপন্থি এবং সমাজতন্ত্র বিরোধী। এগুলো হচ্ছে বলিভিয়ার সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক দল। নিয়ম অনুযায়ী দুই বারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারে না। প্রেসিডেন্ট এর সহযোগী হিসেবে একজন ভাইস প্রেসিডেন্টও রয়েছে। পেরু ও ফ্রান্সের মতো বলিভিয়ার নির্বাচনেও Runoff System রয়েছে। এই সিস্টেমের মানে হচ্ছে নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ৫০% এর উপরে ভোট না পেলে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে এমন দুজন প্রার্থীকে নিয়ে পুনরায় নির্বাচন হয়। এটাই রানঅফ সিস্টেম হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে বলিভিয়া একটি রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের সাথে বলিভিয়ার রাজনৈতিক সংকটটি হুবহু মিলে যায়। সংকটটি 'Bolivian political crisis' হিসেবেও পরিচিত। এই সংকটটি শুরু হয়েছে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব একপক্ষকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া ও চীন অন্য পক্ষকে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আমেরিকার চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিনপন্থি সরকাররা ক্ষমতায়। তাই যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে গোটা দক্ষিণ আমেরিকাতেই মার্কিন ঘেঁষা সরকাররা ক্ষমতায় আসুক। সম্পূর্ণ দক্ষিণ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। কিন্তু ভেনেজুয়েলা ও বলিভিয়ার মতো কয়েকটি রাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়। তাই এগুলো যত দ্রুত দূর করা যায় ততই আমেরিকার মঙ্গল।

বলিভিয়ার প্রথম আদিবাসী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচিত হন ইভো মোরালেস। ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোরালেস চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হন। বলিভিয়ার ইতিহাসে মোরালেসই প্রথম টানা চারবার নির্বাচিত হয়েছেন। তবে মোরালেসের টানা ক্ষমতায় থাকাকে তাঁর সমর্থক-সহ অনেকেই সহজভাবে নেননি। তাছাড়াও সংবিধানের নিয়ম হচ্ছে দুইবারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তাই সংবিধান পরিবর্তন করতে মোরালেস গণভোটের আয়োজন করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সংবিধান পরিবর্তন না করার জন্য রায় দেয়। জনগণেরও রায় দুইবারের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। কিন্তু তার মধ্যে হঠাৎ সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা দেয় নির্বাচনে প্রার্থীর জন্য কোনো বাঁধা নেই। যতবার ইচ্ছে ততবারই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। তাই ২০১৯ সালে মোরালেস চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে দাঁড়ান এবং জয়ী হন। তারপর দুইটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, বিরোধী দলগুলোর দাবি এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তাই মোরালেস বৈধ সরকার নয়। তারা শুরু করে আন্দোলন। দ্বিতীয়ত, মোরালেস হচ্ছে মার্কিন বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই চাচ্ছে মোরালেসের পতন ঘটিয়ে একজন মার্কিনপন্থি নেতাকে বলিভিয়ার ক্ষমতায় বসাতে। তখন যুক্তরাষ্ট্র দেখল এটাই বড় সুযোগ মোরালেসকে হটানোর। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিতে লাগল আন্দোলনকারীদের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যাগুলো আসলে কোথায়?

এক. মোরালেস বিভিন্ন সময় ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন, কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপকে ঘৃণার চোখে দেখেছেন, মার্কিন সমর্থিত হন্ডুরাসের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন, ফকল্যান্ড দ্বীপের উপর আর্জেন্টিনার মালিকানার বিষয়েও তিনি সোচ্চার ছিলেন।

দুই. তিনি ভেনেজুয়েলার প্রয়াত নেতা হুগো শ্যাভেজের নেতৃত্বে ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপে যোগ দিয়েছিলেন। এই জোটে যুক্তরাষ্ট্রকে রাখা হয়নি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সমন্বয় সাধনের জন্য এ জোটের উপর মোরালেস গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তিন. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি এজেন্সি হিসেবে কাজ করে 'NSA'। যার পূর্ণরূপ National Security Agency-এর ব্যাপ্তি বিশ্বজুড়ে। এই NSA এর কাজ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন মিলিটারি রিলেটেড তথ্যগুলো সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রকে অভিহিত করানো। এডওয়ার্ড স্নোডেন নামের একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ সিআইএ এর সাথে কাজ করত। কিন্তু ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেন যুক্তরাষ্ট্র মিলিটারি অপারেশনের কিছু গোপন তথ্য ফাঁস করে দেন। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। ইভো মোরালেস এই এডওয়ার্ড স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের পক্ষে কথা বলেছিলেন।

চার. মোরালেস বলিভিয়ার খনিজ সম্পদ জাতীয়করণ করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্রি মার্কেটের নামে যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে সেগুলো প্রাইভেটাইজেশন করা হোক। যেন মার্কিন কোম্পানিগুলো খনিজ সম্পদ উত্তোলনের অংশীদার হতে পারে। মোরালেস নয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধে সবাইকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

পাঁচ. তিনি বলিভিয়ায় শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আদিবাসীদের জন্য ভূমি নীতি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। উল্লেখ্য, বলিভিয়া-সহ গোটা ল্যাটিন আমেরিকায় আজকে যারা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী তারা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপ থেকে এসেছিলেন। আর আদিবাসীরাই হচ্ছে এখানকার স্থায়ী অধিবাসী যারা প্রাচীনকাল থেকেই এখানে বসবাস করছে। বিভিন্ন সংস্কার নীতি গ্রহণ করে মোরালেস বলিভিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা করেছেন।

মোরালেসকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সফল গণতান্ত্রিক শাসক বলা হয়। ইভো মোরালেস বলিভিয়ার অর্থনীতিতে একটি সংস্কার আনেন যা "ইভোনোমিক্স" হিসেবে পরিচিত। এই সংস্কারের মাধ্যমে তিনি আয়বৈষম্য হ্রাস করেন। তাঁর শাসনামলে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায়, ইকোনমিতে স্থিতিশীলতা আসে, সম্পদের পুনর্বণ্টনের (redistribution) মাধ্যমে বৈষম্য কমিয়ে আনতেও সফল হয়েছিলেন মোরালেস। তার আমলে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা (Purchasing power) বৃদ্ধি পায়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাম ধারার এই রাজনীতিবিদ চেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক ইকোনমিক পলিসি গ্রহণ করতে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ায় এবং তার সরকারের কিছু মানুষের দুর্নীতির জন্য জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে যায়। এ সুযোগেই মার্কিনঘেঁষা ডানপন্থিদের উত্থান ঘটে। তাই ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সেনাবাহিনীর চাপে মোরালেস পদত্যাগ করেন এবং বলিভিয়া ত্যাগ করে মেক্সিকোতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে মার্কিনপন্থি জিনাইন এ্যানেজকে ক্ষমতায় বসানো হয়। উল্লেখ্য, জিনাইন এ্যানেজ বলিভিয়ার ইতিহাসে দ্বিতীয় মহিলা প্রেসিডেন্ট। তার আগে লিডিয়া টেজাডা ছিলেন প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে ২০২০ সালের নির্বাচনে বলিভিয়ার জনগণ পুনরায় মোরালেসেরই এক সহযোগীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে। বলিভিয়ার রাজনীতি পুনরায় স্থিতিশীল হবে কি না সেটি সামনের দিনগুলোই বলে দেবে। কিংবা সেখানে পুনরায় মার্কিন মদদপুষ্ট Chicago Boys দের উত্থান ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পেরু: ইনকা সাম্রাজ্যের এই দেশটি বিশ্বে পরিচিত তার স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনজন প্রেসিডেন্টের অদলবদল হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনজন প্রেসিডেন্টের অদলবদল হয়েছিল উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতেও, যা এখন পর্যন্ত বিশ্ব রেকর্ড। বিশ্বের ১৭টি 'Megadiverse Country' এর মধ্যে অন্যতম ইনকা সাম্রাজ্যের দেশ পেরু। যে-সকল দেশে সবচেয়ে বেশি বর্গের প্রাণী বা প্রজাতি রয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য অনেক এমন সকল দেশকে মেগাডাইভার্স কান্ট্রি বলা হয়। পেরুর সরকার ব্যবস্থাও আমাদের কাছে আকর্ষণীয়।

একসাথে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী: পেরুতে একইসাথে একজন প্রেসিডেন্ট, একজন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও একজন প্রধানমন্ত্রী তিনজনই রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন সাধারণত দুইজন অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকেন (যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে) অথবা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী থাকেন (যেমন- বাংলাদেশ ও জাপানে), অপরদিকে পেরুতে তিনজনই একসাথে আছে। এই ধরনের সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “প্রিমিয়র” (Premier)। এখানে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার প্রধান হিসেবে কাজ করেন। পেরুর মন্ত্রিসভার মোট ১৮ জন সদস্যের প্রধান এই প্রিমিয়র। আর রাষ্ট্রপতি সরকার প্রধান।

রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা: বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই অনেক রাজনৈতিক দল (Multi-Party System) থাকলেও প্রধান বা ডমিনেন্ট রাজনৈতিক দল কিন্তু থাকে মাত্র দুইটি। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, যুক্তরাজ্যের কনজার্ভেটিভ ও লেবার পার্টি, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান, ভারতের কংগ্রেস ও জনতা পার্টি। কিন্তু পেরু এমন এমন একটি দেশ যেখানে প্রধান বা ডমিনেন্ট রাজনৈতিক দল দশটির উপরে, নির্দিষ্ট করে বললে ১২টি। তাই পেরুর পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর ফলাফলের দিকে তাকালে দেখবেন যে, কোনো দল সাধারণত ১৩% এর বেশি ভোট পায় না।

Runoff Voting/Two Round System: নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আপনাকে যদি কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট হতে হয় তাহলে আপনাকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ৫০% ভোট পেতে হয়। একটি রাষ্ট্রে যখন অনেকগুলো সক্রিয় রাজনৈতিক দল থাকে তখন আপনি একাই ৫০% ভোট পাবেন না। পেরুতে প্রায় ১০/১২টি সক্রিয় দল থাকায় কোনো দলই সাধারণত ১৩% এর বেশি ভোট পায় না, সেহেতু পেরুতে সেকেন্ড রাউন্ড ভোট হয়। যেটিকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানে "Runoff Voting" বা "Ballotage" বলি। কোনো কোনো দেশে এটিকে "Two Round System"ও বলে। তখন এই ১০/১২টি দলের সকল প্রার্থীদের মধ্যে যে দুইজন প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল তাদের দুইজনকে নিয়ে পুনরায় নির্বাচন হয় পেরুতে। এভাবে সেকেন্ড রাউন্ড ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এইরকম Runoff Voting পেরু ছাড়াও ২০০২ সালে ফ্রান্সে হয়েছিল। এই সিস্টেমটি চেক রিপাবলিকে সিনেটর নির্বাচনে এবং ইরানের পার্লামেন্টেও ব্যবহার হয়।

কেন পেরুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি স্বচ্ছ?
একটি উদাহরণ দেই- ২০২০ সালে পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ঘুষের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারাকে সংসদে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট Impeachment করার পদ্ধতি তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেটি পেরুকে না দেখলে বোঝা যেত না। মার্টিন ভিজকারা অভিশংসিত হওয়ার পর পেরুর সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতায় আসেন কংগ্রেসের প্রধান ও স্পিকার ম্যানুয়েল মেরিনো। মেরিনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মার্টিন ভিজকারার সমর্থকরা পেরুতে গত দুই দশকের সবচেয়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলে। মেরিনো বললেন, “জনগণ যেহেতু আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, তারা যেহেতু আমাকেও চাচ্ছে না তাই আমি ক্ষমতায় থেকে কী করব?” আন্দোলনের তোপে পড়ে মেরিনোও পদত্যাগ করেন। তারপর কংগ্রেসের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন জনপ্রিয় আইনজীবী ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ফ্রানসিসকো সাগান্তি। সাগস্তি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন। তারপর নির্বাচন চলে আসলে সাগস্তিও ক্ষমতা ছেড়ে দেন। আজকে একুশ শতাব্দীতে এসে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ (Transparent) রাজনীতি হয় যে দেশে সেটি হলো এই ইনকা সাম্রাজ্যের দেশ পেরুতে। আমাজন, আন্দিজ পর্বতমালা, টিটিকাকা লেক, সেক্রেড ভ্যালি এসবের জন্য পেরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ টুরিস্টদের কাছে, ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন মাচু-পিচুর কারণে পেরু যেমন আকর্ষণীয় ইতিহাসবিদের কাছে, কফি-তামা-স্বর্ণের জন্য পেরু যেমন লোভনীয় ব্যবসায়ীদের কাছে, ঠিক তেমনি রাজনীতি বিজ্ঞানে পেরু গুরুত্বপূর্ণ তার ট্রান্সপারেন্ট পলিটিকাল কালচারের কারণে。

একজন চে গুয়েভারা ও তার আদর্শ
পুরো ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ হয়ে গেল অথচ চে গুয়েভারা নিয়ে কোনো আলোচনা আসল না। তাহলে অপূর্ণতা থেকে যায়। ছোট করে মূল বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। "নিষ্ঠুর নেতাদের পতন ও প্রতিস্থাপন চাইলে নতুন নেতৃত্বকেই নিষ্ঠুর হতে হবে।"-এই উক্তিটি বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার। তরুণদের টি-শার্টে চে গুয়েভারার ছবি না থাকলে আজকাল মানায় না। ১৯২৮ সালে আইরিশ পিতা ও স্প্যানিশ মাতার ঘরে আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণ করেন চে গুয়েভারা। জন্ম আর্জেন্টিনায়, মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন কিউবায় আর মারা গিয়েছেন বলিভিয়ায়। ১৯৫১ সালে ডাক্তারি পড়াশোনা শেষ করে বাইসাইকেল চড়ে পুরো ল্যাটিন আমেরিকা ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ভ্রমণ করার সময় তার চোখে ভালো করে ধরা পড়ে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সার্বিক অসহায়ত্ব ও শোষিত মানুষের জগৎ। বুঝতে পেরেছিলেন এসবের পেছনে মূল কারণ বৈষম্য, একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ। যা চে গুয়েভারাকে বিপ্লবী করে তুলে।

কিউবাতে তখন একনায়ক বাতিস্তার শাসন চলছে। স্বৈরাচারী বাতিস্তাকে উৎখাত করতে মেক্সিকো সিটিতে বসে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও তার ভাই রাউল ক্যাস্ট্রো পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। চে গুয়েভারা ঘটনাক্রমে মেক্সিকো সিটিতেই ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেখা পান, তাদের সাথে পরিচিত হন। তাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হন চে। সিদ্ধান্ত নেন তিনিও গণমানুষের পক্ষে কিউবার বিপ্লবে যোগদান করবেন। ১৯৫৯ সালে কিউবায় যে বিপ্লবে একনায়ক বাতিস্তাকে উৎখাত করা হয়, তাতে চে-র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারপর ১৯৬৪ সালে কিউবার হয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তিনি ভাষণ দেন। কমিউনিস্ট বিপ্লবের কারণে সিআইএ এর তালিকাভুক্ত হয়ে যান চে। ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার একদিন পর তাকে হত্যা করা হয়। যে সকল ব্যক্তিদের নিয়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বই লেখা হয়েছে তাদের মধ্যে চে গুয়েভারা অন্যতম। শুধু সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার মানুষদের কাছেই নয় বরং সারা বিশ্বের নিপীড়িত মজলুম জনতার কাছে চে গুয়েভারার আদর্শ এখনো অম্লান।

বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন
২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দূতাবাস খুলেছে আর্জেন্টিনা। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় "Sport Diplomacy" নয়া রূপ লাভ করেছে। ১৯৭১ সালে টেবিল টেনিস খেলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক উঞ্চ হয়। যেটাকে আমরা Ping Pong Diplomacy হিসেবে জানি। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে Football Diplomacy কে কেন্দ্র করে এশিয়ার দেশগুলোতে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে মেরাডোনা-মেসিদের দেশ আর্জেন্টিনা। মূলত গত কাতার বিশ্বকাপে এশিয়ার দেশগুলোতে এতো বেশি আর্জেন্টাইন সমর্থক দেখে এশিয়ার দেশগুলোতে সম্পর্ক স্থাপনে অনুপ্রাণিত হয়েছে আর্জেন্টিনা। যেটিকে মূলত "Messi-led Renaissance" বলা হয়。

বাংলাদেশের সাথে আর্জেন্টিনার পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হলে বাংলাদেশ কীভাবে লাভবান হতে পারে সেই দিকটি আলোচনা করা জরুরি। উল্লেখ্য, তার পূর্বে উভয় দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কটিও জানা জরুরি। আর্জেন্টিনার সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয় ১৯৭২ সালে। মাত্র ছয় বছর পর তথা ১৯৭৮ সালে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তী ভঙ্গুর, অনুন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা আর্জেন্টিনার জন্য সুবিধাজনক ছিলো না। উভয় দেশের মধ্যে বিনিময়যোগ্য পণ্য ও সেবা তখন সেভাবে ছিলো না। বিশাল দূরত্বের দুটো দেশে সাংস্কৃতিক বিনিময় কিংবা পিপল মুভিলাইজেশনও তেমন হতো না। সবদিক বিবেচনা করে প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে ঢাকার সাথে বুয়েন্স আয়ার্সের নতুন করে সম্পর্কে স্থাপনের তেমন কোন উপলক্ষ তৈরি হয়নি বলে দাবি উভয় দেশের। আর্জেন্টিনায় আমাদের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও ঢাকা থেকেও সম্পর্ক উন্নয়নে তেমন তোরজোর নেওয়া হয়নি। তবে এতোদিন ধরে বাংলাদেশের একজন অ্যাম্বাসেডর যিনি ব্রাজিলে অবস্থান করে বাংলাদেশ ও আর্জেটিনার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর দেখভাল করেছেন। একইভাবে আর্জেন্টিনার একজন অ্যাম্বাসেডর ভারতের নয়া দিল্লিতে অবস্থান করে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে একটি শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পারস্পরিক সুবিধা নিয়ে আসার এবং উভয় দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে অবদান রাখার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এবং আর্জেন্টিনা উভয়ই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য, যেমন জাতিসংঘ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এই ফোরামগুলিতে সহযোগিতা করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি উভয়ের ভাগ করা স্বার্থ প্রচার করতে একসাথে কাজ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বাণিজ্য মূলত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা কেন্দ্রিক। দক্ষিণ আমেরিকায় আমাদের উপস্থিতি যৎসামান্য, তাই রপ্তানির পরিমাণও কম। তাছাড়া ল্যাটিন আমেরিকায় যেতে চাইলে ভিসা পেতেও বেশ জটিলতা পোহাতে হয়। তাই আর্জেন্টিনার সাথে দূতাবাস খোলার একটি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ আছে। আমাদের দৃষ্টিকোন সেখানে রপ্তানি বাণিজ্যের বিস্তার ঘটানো। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই তার বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন নতুন বাজার খুঁজছে। তাই আর্জেন্টিনা আমাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ হতে পারে।

ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাব্য বড় রপ্তানি গন্তব্যস্থল হিসেবে অবহেলিত এক মহাদেশের নাম ল্যাটিন আমেরিকা। পেরু ল্যাটিন আমেরিকার একটি অন্যতম সমৃদ্ধিশালী দেশ যা তামা, স্বর্ণ ও কফির জন্য বিখ্যাত। অথচ পেরুতে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। ফাইন্যান্সিয়াল রিজার্ভের দিক থেকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়াও এখন অনেক এগিয়ে। এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে বলিভিয়ায়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভিসের তথ্যমতে, বিশ্বের মোট লিথিয়ামের ৫০-৭০% রিজার্ভ রয়েছে বলিভিয়াতেই। অথচ বলিভিয়ার রাজধানী লাপাজের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ঢাকার কোনো তোড়জোড় নেই。

ল্যাটিন আমেরিকার মোট ২০টি দেশের মধ্যে মাত্র তিনটি দেশে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসি রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা আর মেক্সিকোতে। আর গোটা আমেরিকা মহাদেশের ৩৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ০৫টি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। দেশগুলো হলো কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তবে চিলিতে নতুন দূতাবাস খোলার পরিকল্পনা বাংলাদেশের থাকলেও এর বাস্তবায়ন কবে হবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশে যেহেতু বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই ফলে সেখানকার ক্রেতারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানে না। ফলশ্রুতিতে সেখানে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির বিকাশ হচ্ছে না। অথচ ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সব দেশই হতে পারে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বড় বাজার। তাই আমরা আশা করব ঢাকা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের জন্য কী কী সম্ভাবনা থাকতে পারে তা খতিয়ে দেখার মাধ্যমে সেখানে বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণের দিকে মনোযোগ দেবে।

উপসংহার: পড়শি দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকাকে সমৃদ্ধিশালী করে গড়ে তুলতে পারত। অথচ সমাজতন্ত্র দমনের নামে দেশগুলোকে শেষ করে দিয়েছে। তাই আজ ল্যাটিন আমেরিকার প্রত্যেকটি দেশে তীব্র মার্কিন বিদ্বেষী (Anti-Americanism) মনোভাব বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র দুটি প্যারাডক্সিক্যাল পররাষ্ট্রনীতির উপর জোর দিয়েছিল। একটি মার্শাল প্ল্যান, অপরটি ট্রম্যান ডকট্রিন। যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে ইউরোপে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে 'Truman Doctrine' এর মূল কথা ছিল বিশ্বের যেখানেই যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী কিংবা সমাজতন্ত্রী সরকার ক্ষমতায় আসবে, সেখানেই হস্তক্ষেপ করে সেই সরকারকে উৎখাত করতে হবে। এই ট্রুম্যান ডকট্রিনের আলোকে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকাতে গণতান্ত্রিক সরকারদের উৎখাত করে সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। অস্থিতিশীল করে তুলেছিল পুরো অঞ্চলকে। আসলে এটাই আমেরিকার রাজনীতি। তাদের দাবার ছকে মন্ত্রীর চেয়ে ঘোড়ার চাল কখন বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে কেউ বলতে পারে না。

Question to think about?
লাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে ঢাকা কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Bryne, Alex (2020), The Monroe Doctrine and United States National Security in the Early Twentieth Century, Springer
2. May, Robert E. (2017), The Irony of Confederate Diplomacy: Visions of Empire, the Monroe Doctrine, and the Quest for Nationhood, Journal of Southern History
3. Ryan, Keegan D. (2018), The Extent of Chinese Influence in Latin America, Naval Postgraduate School
4. Weeks, Gregory (2014), Understanding Latin American Politics, Pearson
5. Hellinger, Daniel C. (2014), Comparative Politics of Latin America: Democracy at Last? Routledge
6. Chasteen, John Charles (2001), Born in Blood and Fire: A Concise History of Latin America, Norton
7. Jozsa Jr., Frank P. (2013), Baseball beyond Borders: From Distant Lands to the Major Leagues, Scarecrow Press.
8. Winn, Peter (2004), Victims of the Chilean Miracle: Workers and Neoliberalism in the Pinochet Era, 1973–2002, Duke University Press
9. McGuire, J.W. (2010), Wealth, Health, and Democracy in East Asia and Latin America, Cambridge University Press
10. Sweig, Julia E. (2004), Inside the Cuban Revolution: Fidel Castro and the Urban Underground (New ed.), Harvard University Press
11. Crompton, Samuel (2009), Che Guevara: The Making of a Revolutionary, Gareth Stevens

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত ও আগামীর বিশ্ব

📄 ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত ও আগামীর বিশ্ব


Theme: A Peace to End All Peace
ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত ও আগামীর বিশ্ব

“The matter of international relations is very subtle and exquisite.” - Vladimir Zhirinovsky

“The Arab-Israeli conflict is the biggest problem, but small problems shape the daily lives of Israelis. Unless there happens to be a war going on, the Arab-Israeli conflict is irrelevant in daily life.” - Yair Lapid

গত শতাব্দী থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডে কীভাবে ইসরায়েলের মতো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো এবং কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ইসরায়েল হয়ে উঠল পশ্চিমা বিশ্বের একটি প্রক্সি রাষ্ট্র তার পেছনের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করব। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, নবী হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম ছিল 'ইসরায়েল'। তাঁর নামানুসারে তাঁর বংশধররা 'বনি ইসরায়েল' হিসেবে পরিচিত। সেই ইসরায়েল এর নাম অনুসারেই বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রের নাম। হজরত ইয়াকুব (আ.) এর বড় পুত্রের নাম ছিল 'ইয়াহুদা'। সেই নামের অংশবিশেষ থেকে 'ইহুদি' নামকরণ হয়। ইহুদি সম্প্রদায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন- বনি ইসরায়েল, ইসরায়েলের বংশধর, ইংরেজিতে JEW ইত্যাদি। তাদের ধর্ম 'জুদাইজম' এসেছে ইয়াকুব (আ.) এর আরেক পুত্রের নামানুসারে। মুসলমানদের পবিত্র কোরআনে তাদেরকে 'আহলিল কিতাব', 'বনি ইসরায়েল', এবং 'ইহুদি' এ তিন নামেই সম্বোধন করা হয়েছে।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের উত্থান
বর্তমান মানচিত্রের যেখানে ইসরায়েল রাষ্ট্রটির অবস্থান সেখানে রাজা তালুতের সময় বনি ইসরায়েলদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তালুত ছিলেন বনি ইসরায়েলদের প্রথম রাজা। রাজা তালুতকে বাইবেলে সল (Saul) বলা হয়। রাজা তালুতের পর প্রথমে দাউদ (আ.), তারপর সুলাইমান (আ.) পর্যন্ত তাদের রাজত্ব টিকে ছিল। সুলাইমান (আ.) বনি ইসরায়েলদের রাজ্য অনেক সম্প্রসারিত করেছিলেন। তার আমলেই জেরুজালেমে বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদে আকসা) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা ছিল। সোলাইমান (আ.) এর পুত্র রেহোবামের রাজত্বকালে বনি ইসরায়েলদের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বনি ইসরাইলিদের রাষ্ট্র দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তরে ইসরায়েল, দক্ষিণে জুদাহ নামে। অন্যদিকে ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্য শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের এই অঞ্চলে ব্যবিলনীয়রা আক্রমণ করলে এখান থেকে অসংখ্য বনি ইসরায়েল (ইহুদি) নির্বাসিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার শুরু হয় রোমানরাও এখানে আক্রমণ চালিয়ে পুনরায় বনি ইসরাইলিদের নির্বাসিত করে। ফলশ্রুতিতে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে তারা পাড়ি জমায়। এজন্যই ইহুদিরা বর্তমানে বলছে ইসরায়েল হচ্ছে তাদের মাতৃভূমি যেখান থেকে তাদেরকে উৎখাত করা হয়েছিল। ইহুদিদের দাবি তাদের সাময়িক পাপাচারের কারণে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে ঈশ্বর পুনরায় তাদের মাতৃভূমি ফিরিয়ে দেবেন। ইহুদিরা নিজেদেরকে খোদার 'পছন্দের একমাত্র বান্দা' (Chosen people of God) মনে করে।

তালুত শাসনামলে ফিলিস্তিনে বনি ইসরায়েলদের শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে সেখানে কেনান আদিবাসীদের বসবাস ছিল। যারা মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী ছিল। কেনানদের আগে সেখানে হিভাইট, জেবুসাইট, এমরাইট, হিট্রাইট, পেরিসাইট ইত্যাদি গোত্রের লোকেরাও বসবাস করত। ইসলামি স্কলারদের দাবি ইহুদিরা যদি ফিলিস্তিনকে তাদের পিতৃভূমি হিসেবে দাবি করে তাহলে ইহুদিদের আগে যারা ফিলিস্তিনে বসবাস করেছিল তারাও কেন ফিলিস্তিনকে নিজেদের পিতৃভূমি হিসেবে দাবি করতে পারবে না? বর্তমান ফিলিস্তিনিরা হচ্ছে সেই কেনান বংশের যারা বনি ইসরায়েলদের অনেক আগ থেকেই এখানে বসবাস করত। কিন্তু ইহুদিদের দাবি তাদের পূর্বপুরুষ নবী ইয়াকুব (আ.)-এর পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ফিলিস্তিন অঞ্চলটি তাদেরকে উপহার দেবেন। তাই ফিলিস্তিন হচ্ছে ইহুদিদের ‘Promised Land' বা ঈশ্বরের উপহার।

উল্লেখ্য, সপ্তম শতাব্দীতে জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে চলে যায় এবং খোলাফায়ে রাশেদীন মদিনা থেকে জেরুজালেমে শাসন করতে থাকে। ১০৯৯ সালে আবার ইউরোপীয় খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম দখল করে নেয়। তখন জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে মুসলমান বনাম খ্রিষ্টান যে যুদ্ধটি হয়েছিল সেটাই 'ক্রুসেড' নামে পরিচিত। কিন্তু ১১৮৭ সালে মুসলিম সেনাপতি গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবি পুনরায় জেরুজালেম দখল করে জেরুজালেমকে মুসলমানদের অধীনে নিয়ে আসেন। এই সময়টিতে ইহুদিরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে বসবাস করতে শুরু করে। ইউরোপে তখন খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাব ব্যাপক। স্পেনে মুসলিম শাসনের পতন ঘটিয়ে গ্রানাডা দখল করে রানী ইসাবেলা ও রাজা ফার্দিনান্দ।

১৪৭৮ সালের ১ নভেম্বর স্পেন 'স্প্যানিশ ইনকুইজিশন' (Spanish Inquisition) নামে একটি পলিসি গ্রহণ করে। এতে বলা হয় স্পেনে বসবাসরত সকল ইহুদি ও মুসলিমদের হয় স্পেন ত্যাগ করতে হবে না-হয় খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। স্পেনে শুরু হয় ইহুদি এবং মুসলিম নিধন। স্পেন থেকে ইহুদিরা পালিয়ে কিছু গ্রিস ও পোল্যান্ডে চলে যায়। কিছু আবার আফ্রিকার মরক্কো হয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীন ফিলিস্তিনে আশ্রয় নিতে থাকে। এমনকি উসমানীয় সাম্রাজ্যের তৎকালীন শাসক স্পেনের উপকূলে জাহাজ পাঠিয়েছিল নির্যাতিত ইহুদি ও মুসলিমদের উদ্ধার করতে। তখন শুধু স্পেন নয়, ইউরোপীয় অন্য দেশগুলোতেও শুরু হয় ইহুদি নিধন। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলো ছিল খ্রিষ্টান প্রধান। তাই ইউরোপে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হলে ইহুদি বিদ্বেষ প্রবল আকার ধারণ করে। ইংল্যান্ডের রাজারাও অসংখ্য ইহুদি নিধন করেন। উল্লেখ্য, এর মাঝখানে আবার ১৫৩৮ সালে উসমানীয় সুলতান সুলেমান জেরুজালেমকে ঘিরে বিখ্যাত দেয়াল তুলে দেন যাতে করে জেরুজালেমকে আর কেউ দখল করে নিতে না পারে। যেটা এখন 'Wall of Jerusalem' নামে পরিচিত।

উনিশ শতকের শুরুতে (১৮৩০) ইউরোপে নিপীড়নের শিকার এমন সকল ইহুদিদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। সেই প্রবণতা থেকে 'জায়নবাদ আন্দোলন' মাথাচাড়া দেয়। এই আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লিখিত পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল ইহুদিরা স্বাধীনভাবে ও একসঙ্গে বসবাস করবে। ১৮৮০ সালে Nathan Birnbaum নামে এক অস্ট্রিয়ান ইহুদি জেরুজালেমে ফিরে যেতে আন্দোলন শুরু করার প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাবে তিনি 'Zion' শব্দটি উল্লেখ করেন।

১৮৮২ সালে রাশিয়ান ইহুদিরা 'হোভেভেই জায়ন' নামে আরেকটি মুভমেন্ট শুরু করে। জায়ন জেরুজালেমের একটি ঐতিহাসিক পাহাড়ের নাম। জায়ন থেকে পরবর্তীতে জায়নবাদ। জায়নবাদ বা Zionism এর মানে হচ্ছে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলন। আর যারা এই জায়োনিজমে বিশ্বাস করে তাদের বলা হয় জায়োনিস্ট। ১৮৮৭ সালে থিউডর হার্জেল (Theodore Herzl) নামক এক হাংগেরিয়ান ইহুদি Der Judenstaat (The State of the Jews) নামক একটি বই লেখেন এবং "International Zoinst Organization” নামে একটি পূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপরেখা দাঁড় করান। যার মূল লক্ষ্য ছিল যে করেই হোক ফিলিস্তিনে (প্যালেস্টাইনে) একটি ইহুদি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। তারপর থেকেই ইহুদিদের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মনোভাব দৃঢ় হতে থাকে।

পশ্চিম এশিয়ায় তখনো উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসন চলছিল। জেরুজালেম ছিল উসমানীয় সালতানাতের অধীনে। উসমানীয় সুলতান আব্দুল হামিদকে ফিলিস্তিন অঞ্চলটি বিক্রির প্রস্তাব দেয় ইহুদিরা। আব্দুল হামিদ তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এবার ভিন্ন কৌশল নেয় তারা। ধনী ইহুদিদের কাজ থেকে টাকা সংগ্রহ করে ফিলিস্তিনে বসবাসরত মুসলিমদের থেকে ছোট ছোট জমি ক্রয় করতে থাকে। প্রথমে একজন দুইজন করে সিরিয়া হয়ে ফিলিস্তিনে আসতে থাকে। ১৯০২ সালে শুরু হয় আলিয়া। আলিয়া এর মানে হচ্ছে ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদিদের ফিলিস্তিন অঞ্চলে চলে আসা। মুসলিম প্রধান ফিলিস্তিনে শুরু হয় ইহুদি পুর্নবাসন (First Aliyah)।

১৯১৪ সাল। ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসকরা ব্রিটেনের বিরুদ্ধে গিয়ে জার্মানির সাথে যোগ দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে উসমানীয়দের থেকে গ্লিসারিন ক্রয় করত ব্রিটিশরা। সামরিক অস্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই গ্লিসারিন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তুরস্ক ব্রিটেনে গ্লিসারিন রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এতে বিপাকে পড়ে যায় ব্রিটিশরা। তখন ইহুদি বিজ্ঞানী ওয়াইজম্যান গ্লিসারিনের বিকল্প এসিটোন আবিষ্কার করেন এবং এর ফর্মুলা ব্রিটিশদের কাছে তুলে দেন। ওয়াইজম্যান এর বিনিময়ে ব্রিটিদের কাছে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমির দাবি করেন। তখন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন লর্ড আর্থার বেলফোর। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর, আর্থার বেলফোর ব্রিটিশ ইহুদি নেতা ওয়াল্টার রথসচাইল্ডকে ৬৭ শব্দের একটি চিঠি লিখেন। সেই চিঠিতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন, যা 'বেলফোর ঘোষণা' নামে পরিচিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় ঘটে। ফিলিস্তিন-সহ উসমানীয় সাম্রাজ্যের অনেক অঞ্চল চলে যায় ব্রিটিশদের দখলে। এতে করে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পথ সুগম হয়ে যায়। আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ার পর বিপুল সংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। ১৯১৪ সালে অসংখ্য ইহুদি ইউরোপ ত্যাগ করে ফিলিস্তিনে আসে। যেটাকে বলা হয় '২য় আলিয়া' (Second Aliyah)। উল্লেখ্য, ১৯০৫-১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার। যেটা তৃতীয় আলিয়া হিসেবে পরিচিত। তারপর ১৯৩১ সালে সেটা পৌঁছে ১ লক্ষ ৮০ হাজারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে মোট ইহুদিদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় লক্ষ [নোট: একেকটি আলিয়াতে সঠিক কত সংখ্যক ইহুদিদের পূর্নবাসন হয়েছিল সেটি একেক বইয়ে একেক রকম]। এভাবে একের পর এক আলিয়া তথা ইউরোপীয় ইহুদিদের ফিলিস্তিনে পূর্নবাসন হতে থাকে। এসব পুর্নবাসনের খরচ ইউরোপ আমেরিকায় বসবাসরত ধনী ইহুদিদের কাছ থেকে আসত। ইউরোপে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয় ইহুদিদের হাত ধরেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির একনায়ক হিটলার জার্মানিতে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ ইহুদি হত্যা করে। ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি আরও জোরদার হয়। ব্রিটেনের উপর চাপ বাড়তে থাকে। একতরফা দায় এড়াতে ব্রিটেন কৌশলে বিষয়টিকে জাতিসংঘে উপস্থাপন করে। ১৯৪৭ সালের ১৫ মে গঠিত হয় United Nations Special Committee on Palestine (UNSCOP)। পাঁচ মাস পরেই নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ-(ক) ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্যালেস্টাইন, (খ) ইহুদিদের জন্য স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল, (গ) আর বলা হলো জেরুজালেম যেহেতু ইহুদি, মুসলিম, খ্রিষ্টান সবারই উপাসনালয় তাই এটা ইহুদি-মুসলিম সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তটি 'The two-state Solution' নামে পরিচিত। অর্থাৎ, ভূখণ্ড ফিলিস্তিনি মুসলমানদের হলেও সেখানে রাষ্ট্র হবে দুটি। ইহুদিরা মাত্র ১০ শতাংশ ভূখণ্ডের মালিক হলেও তাদের দেওয়া হয় মোট ভূখণ্ডের অর্ধেক। অথচ আরবদের জনসংখ্যা ও জমির মালিকানা ছিল তাদের থেকে দ্বিগুণ। জাতিসংঘের রায় ঘোষণার পর ইহুদি কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের উপর উচ্ছেদ কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এই সময় লাখ লাখ আরব বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করতে থাকে। নিজ ভূমি থেকে আরবদের দলে দলে দেশ ত্যাগ করাকে টার্ম হিসেবে বলা হয় 'নাকাবা' (Nakba Day)। অনেকে আবার এটিকে 'The Palestinian Catastrophe' ও বলে থাকেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয়দের থেকে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ইহুদিদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে সকল ব্রিটিশ সেনা ফিলিস্তিন ত্যাগ করে। ১৪ মে রাতেই ইহুদি নেতারা ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেয়। ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ডি ফ্যাক্টো রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি এস ট্রুম্যান। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট স্ট্যালিনও। তারপর স্বীকৃতি দেয় ব্রিটেন। দ্বিখণ্ডিত হলো ফিলিস্তিনের মানচিত্র।

প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৪৮-৪৯)
তাৎক্ষণিকভাবে আরব রাষ্ট্রগুলো (মিশর, ট্রান্সজর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, সৌদি আরব, ইয়েমেন) স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে প্রত্যাখ্যান করে। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে আসে আরব রাষ্ট্রগুলো। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে শুরু হলো আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। আসলে আরব বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত অসংখ্য মুসলিম রাষ্ট্র থাকলেও অল্প কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনিদের পক্ষ হয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। মূলত মিশর, সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান এই চারটি রাষ্ট্র ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করেছিল। আরব রাষ্ট্রগুলো ধর্মের দিক থেকে ইসলাম হলেও প্রতিটি দেশ আবার জাতিগতভাবে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। ১৯৪৯ সালের ৯ জানুয়ারি যুদ্ধ শেষ হয়। আরবরা ইসরায়েলের কাছে পরাজিত হয়। সদ্য সৃষ্টি হওয়া ইসরায়েলের কাছে প্রথমদিকে ভারী অস্ত্র ছিল না। যুদ্ধের সময় চেকোস্লোভাকিয়া জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসরায়েলকে অস্ত্র সাপ্লাই দেয়। আরব-ইসরায়েলদের প্রথম যুদ্ধটি ছিল ইসরায়েলদের নিকট স্বাধীনতার যুদ্ধ। যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হলে ইসরায়েল জাতিসংঘের পরিকল্পনায় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৫৬ শতাংশের জায়গায় মোট ৭৭ শতাংশ দখল করে নেয়।

দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৫৬)
সুয়েজ খালকে কেন্দ্র করে ১৯৫৬ সালের ২৯ অক্টোবর ইসরায়েল স্থল ও আকাশ উভয় পথে মিশরের উপর আক্রমণ করলে শুরু হয় দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন গামাল আবদেল নাসের। তিনি ক্ষমতায় এসেই মিশরকে বহিরাগতদের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েলের জন্য সুয়েজ খাল বন্ধ ঘোষণা করেন। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সমর্থন নিয়ে ইসরায়েল মিশরে আক্রমণ চালায়। এতে প্রায় ছয় হাজার মিশরি নিহত হয়। নভেম্বরের ৭ তারিখ যুদ্ধ স্থগিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় সুয়েজ খাল মিশরের অধীনেই থেকে যায়। ইতিহাসে এটা "সুয়েজ যুদ্ধ” নামেও পরিচিত। তারপর ১৯৬৪ সালের ২৮ মে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিদের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠে পিএলও। যার পূর্ণরূপ, Palestine Liberation Organization (PLO)।

তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৬৭)
দুটি যুদ্ধ শেষে উভয়ই প্রস্তুতি নিচ্ছিল তৃতীয় আরেকটি যুদ্ধের। আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরায়েলের দ্বন্দ্বও দিনদিন বেড়েই চলেছিল। ইসরায়েলও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হতে থাকে। ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের কাছ থেকে যুদ্ধ বিমান ও ট্যাংক ক্রয় করে ইসরায়েল। তখন সময়টি ছিল স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন আধুনিক বিমান ব্যবস্থা দিয়ে মিশরকে সাহায্য করে। কিন্তু ইসরায়েলের সাথে পেরে উঠতে পারেনি মিশর। তখন ইসরায়েলের সেনা প্রধান ছিলেন আইজ্যাক রবিন। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন শুরু হয় তৃতীয় দফায় যুদ্ধ। ১০ জুন পর্যন্ত যুদ্ধ চলায় এটিকে "ছয়দিন ব্যাপী যুদ্ধ" বলা হয়। আরবরা লজ্জাজনকভাবে হেরে যায় এবং ইসরায়েলের তুলনায় আরবদের অসংখ্য সেনা নিহত হয়। এই যুদ্ধ মাত্র ছয় দিনের হলেও এর তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। ইসরাইলি বাহিনী মিশরের কাছ থেকে গাজা উপত্যকা ও সিনাই উপদ্বীপ, জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি ছিনিয়ে নেয়। জেরুজালেম ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং সেখান থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বিতাড়িত হয়। ইসরায়েলের সীমানা আগের তুলনায় তিনগুণ বড় হয়ে যায়। পরাজয়ের এই শোকে মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৭৩)
নাসেরের মৃত্যুর পর মিশরের প্রেসিডেন্ট হন আনোয়ার সাদাত। সাদাতের নেতৃত্বে মিশর ও সিরিয়া একত্রিত হয় তাদের হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করতে। তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গোল্ডা মায়ার। তিনিই ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ও হারানো ভূমি সিনাই উপদ্বীপ ও গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধার করতে ইসরায়েলের উপর আক্রমণ করে বসে মিশর ও সিরিয়া। অক্টোবর মাসে মূলত ইসরায়েলে ইয়ম কিপুর (ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব) চলছিল। উৎসবে ব্যস্ত থাকায় তারা কল্পনাও করতে পারেনি মিশর হঠাৎ করে আক্রমণ করে বসবে। ৬ থেকে ২৪ অক্টোবর ১৮ দিন ব্যাপী চলে ইতিহাসের চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এজন্য এটি আরবদের কাছে 'অক্টোবর যুদ্ধ' নামে এবং ইসরাইলিদের কাছে 'ইয়ম কিপুরের' যুদ্ধ নামে পরিচিত। ইরাক, জর্ডান, মরক্কো, আলজেরিয়া, সুদান ও সৌদি আরব ইত্যাদি আরব রাষ্ট্র মিশরকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ইসরায়েলকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। ১৯৭৩ সালে তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে তেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে টার্ম হিসেবে "Oil Weapon” বলা হয়। তখন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আরব রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন দেন। সেজন্যই বঙ্গবন্ধু মোসাদের কালো তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ২৫ অক্টোবর চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। পরাজিত হওয়ার পর মিশরের আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেগিন ১৯৭৮ সালে হোয়াইট হাউসে গোপনে "ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি” সই করেন। পরবর্তীতে তারা উভয়েই নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তাতে মিশরের সাথে বাকি আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক খারাপ হয়।

ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি থেকে বর্তমান
কথিত ক্যাম্প ডেভিড শান্তি চুক্তি হয়েছিল ঠিকই কিন্তু শান্তি আর আসেনি। দফায় দফায় ইসরায়েল দখল করতে থাকে প্যালেস্টাইনের ভূমি। ফিলিস্তিনের মুক্তির দাবিতে গড়ে উঠা দল PLO লেবানন থেকে কার্যক্রম চালাতো। পিএলওকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ১৯৮২ সালে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী লেবানন আক্রমণ করে এবং নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। সেখানে হাজার হাজার মুসলমান নিহত এবং গৃহহারা হয়। ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘ এক সম্মেলনের ডাক দেয় এবং সেখানে অন্যান্য প্রতিনিধিদের মাঝে পিএলওকেও ফিলিস্তিনবাসীদের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদানের আহ্বান করা হয়। নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ১৯৯৩ সালে অত্যন্ত গোপনে এক আপস মীমাংসার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি সই হয়েছিল, যা "অসলো চুক্তি" নামে পরিচিত।

চুক্তিতে বলা হয় ফিলিস্তিনিরা স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পাবে এবং ইসরায়েল প্রথমে পশ্চিম তীরের জেরিকো এবং তারপর গাজা থেকে তার সকল সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। তার বদলে, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বৈধতা স্বীকার করে নেবে পিএলও। চুক্তির ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে পশ্চিম তীর ও গাজায় নামকাওয়াস্তে ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন কায়েম হয়। অসলো চুক্তির সফলতা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে মতবিরোধ থাকলেও দশকের পর দশক ধরে অচলাবস্থার কিছুটা সমাধান হয়। তাই এই চুক্তির জন্য ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিন নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পূর্বের সকল শান্তি আলোচনা বিফলে যায়।

অসলোতে শান্তি চুক্তি হলেও কয়েকটি বিষয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল কখনো কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। যেমন- ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে নিজেদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হওয়া সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি বন্ধুদের জন্য কোথায় বসতি স্থাপন করা হবে, জেরুজালেমে ইসরায়েল ও পেলেস্টাইন উভয়ের কর্তৃত্ব থাকবে কি না, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি থাকবে কি না, ইসরায়েলের সাথেই একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরি হবে কি না ইত্যাদি। এসব অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই বারবার সংঘাত সহিংসতা হয়েছে উভয় পক্ষের মধ্যে। যা এখনো চলমান। সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস কখনো অসলো চুক্তি মেনে নেয়নি। উভয়পক্ষ একে অপরকে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে প্রায়শই হামলা-পাল্টা হামলায় লিপ্ত হয়েছে।

২০০০ সালে পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিডে একটি সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। উল্লেখ্য, ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের চলমান সংগ্রাম কালকে 'দ্বিতীয় ইন্তিফাদা' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপর ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ম্যারিল্যান্ডে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। যাতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মাহমুদ আব্বাস অংশ নেন। ম্যারিল্যান্ড সম্মেলন থেকেও আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যায়নি।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তখন সেই সংঘাত নতুন দিকে মোড় নেয়। তারপর ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করে ২০২১ সালের মে মাসে। পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ শহর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের বিষয়ে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি পুলিশের হামলা শুরু হয়। ৬ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত হামাস বনাম ইসরায়েলের মধ্যে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। ইসরায়েলের সুরক্ষা বলয় আয়রন ডোমকে ভেদ করে হামাসের রকেট ইসরায়েলের ভিতরে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে ২১ মে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ফলে এর সমাপ্তি ঘটে।

সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর দখলদারী অপরাধের সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া হিসেবে হামাসের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি বড় আকারের আক্রমণ শুরু করে। যেটিকে হামাস "অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড" নামে আখ্যায়িত করে। এই অপারেশনের অংশ হিসেবে হামাস ইসরায়েলি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পাল্টা জবাব হিসেবে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর ইসরায়েলও গাজায় সর্বাত্মক অবরোধ ঘোষণা করে এবং অব্যাহত বিমান হামলা চালানো শুরু করে। যা এখনো চলমান। এই হামলার মধ্যে দিয়ে ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে হামাসের উত্থান ঘটে। হামাস এই আতর্কিত হামলা এমন একটি সময়ে চালিয়েছে যখন কি না সৌদি আরব ও ইসরায়েল রাষ্ট্র দুটি তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে এগুচ্ছিলো।

ফিলিস্তিনের হামাস ও ফাতাহ নিয়ে কিছু কথা
প্যালেস্টাইন মূলত পশ্চিম তীর (ফাতাহ) ও গাজা (হামাস) এই দুইটি অংশে বিভক্ত। মানচিত্রে তাকালে দেখবেন যে, ইসরায়েলের দখলদারিত্বের কারণে ভৌগোলিকভাবে পশ্চিম তীর ও গাজা এই দুইটি অঞ্চল একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। ফাতাহ ও হামাস ফিলিস্তিনের প্রভাবশালী দুইটি রাজনৈতিক দল। ফাতাহ এর নিয়ন্ত্রণে পশ্চিম তীর। আর হামাসের নিয়ন্ত্রণে গাজা অঞ্চল। পশ্চিমা বিশ্ব ফাতাহকে একটি বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে মনে করে কিন্তু হামাসকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে। এবার হামাস ও ফাতাহ সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু তথ্য জানা যাক।

ফাতাহ এর গঠন: তৎকালীন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে ফাতাহ গঠিত হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে গঠিত হলেও মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের অনুরোধে ফাতাহ নিজ অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করে ১৯৬৫ সালে। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড মুক্ত করাই ছিল ফাতাহ এর মূল উদ্দেশ্য। মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের শাসনামলে মিশর ফাতাহকে অস্ত্র ও সামরিক উপকরণের যোগান দেয়। ১৯৯৩ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে "অসলো চুক্তি” স্বাক্ষরের পর ফাতাহ কেবল দেশীয় রাজনৈতিক সংগ্রামেই সীমিত হয়ে পড়ে।

হামাসের গঠন: ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থি সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হামাস। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলি দখলদারির অবসানের দাবিতে “ইন্তিফাদা” বা “ফিলিস্তিনি গণজাগরণ” শুরুর পর ১৯৮৭ সালে হামাস গঠিত হয়। সংগঠনটির সনদ অনুযায়ী তারা ইসরায়েলকে প্রতিরোধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর তাদের চাওয়া হলো, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে বর্তমান ইসরায়েল, গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে গঠিত একক ইসলামি রাষ্ট্র। হামাস প্রাথমিকভাবে দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়। প্রথমত, এর সামরিক শাখা "ইজ্জেদিন আল-কাশেম ব্রিগেডসের" মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা।

ফাতাহ-হামাস দ্বন্দ্বের সূচনা: ফিলিস্তিনে ২০০৫ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে মোট ১৩২টি আসনের মধ্যে হামাস মেজরিটি আসন পেয়ে (৭০টি আসন) জয়ী হয়। আরব লিগ ও ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (OIC) পর্যবেক্ষকরা-সহ আন্তর্জাতিক অন্যান্য পর্যবেক্ষকরা হামাসের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে ওই নির্বাচনকে সুষ্ঠু বলে ঘোষণা করে। ফলে ফিলিস্তিনে ইসমাইল হানিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় হামাসের সরকার। অভ্যন্তরীণ জনসমর্থন নিয়ে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের আলোকে এগিয়ে যায় হামাস। কিন্তু আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ দলটি তখন হামাস সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে এবং এভাবে দুই পক্ষের মধ্যে বিভেদ জোরদার হয় এবং সংঘাত তুঙ্গে ওঠে ২০০৭ সালে যখন হামাস এক লড়াইয়ে ফাতাহ এর কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয়। সেই থেকে ফিলিস্তিনের দুটি ভূখণ্ডের মধ্যে গাজা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে হামাস, আর পশ্চিম তীর এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করছে ফাতাহ।

হামাসকে অস্ত্রের যোগান দেয় কে?
হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল কর্তৃক স্থল ও সমুদ্র উভয়পথে অবরুদ্ধ। মিশরের সাথে গাজার অল্প একটু সীমানা থাকলেও আবদুল ফাত্তাহ সিসি ক্ষমতায় এসে সেটি ব্লক করে দেয়। শক্তিশালী ইসরায়েলি সেনাদের অত্যাচার থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য হামাসের প্রয়োজন ব্যাপক অস্ত্র ও মিলিটারি সরঞ্জাম। কিন্তু অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় অন্য রাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ও মিসাইল আমদানি করা খুবই কষ্টসাধ্য। সম্পূর্ণ দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এই গাজা উপত্যকা দখল করতে ইসরায়েল এ পর্যন্ত কয়েকশবার অভিযান চালিয়েছে এবং হামাসের প্রতিরোধে প্রতিবারই ইসরায়েল পিছু হটতে বাধ্য হয়। গাজা অঞ্চল অবরুদ্ধ থাকায় এখন প্রশ্ন হলো হামাস কোথায় থেকে তাদের অস্ত্র আমদানি করে? ২০২১ সালের মে মাসে নতুন করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্বে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্য করে অন্তত দেড় হাজার রকেট নিক্ষেপ করেছিল ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলের রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত "আয়রন ডোম” হচ্ছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত এই আয়রন ডোম ইসরায়েলের দিকে ছুড়ে মারা যে-কোনো রকেটকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই আয়রন ডোমের সুরক্ষা বলয় ভেদ করেই ইসরায়েলি পাইপলাইনে আঘাত করেছিল হামাসের রকেট। এতে পাইপলাইনের একটি বড় অংশে আগুনও ধরে যায়। হামাসের রকেট হামলার সময় স্থবির হয়ে গিয়েছিল ইসরায়েলের জনজীবন। গাজা অঞ্চলটি অবরুদ্ধ থাকায় এখন প্রশ্ন হলো আধুনিক রকেট বানানোর মতো ম্যাটেরিয়ালস হামাস পায় কোথায় থেকে?

প্রথমত: ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা মনে করছে হামাস তাদের অস্ত্র ও ম্যাটেরিয়াল ইরান থেকে পাচ্ছে। তাদের দাবি সুদান ও সিনাই পর্বতের রুট ব্যবহার করে এসব অস্ত্র চোরাইপথে ইরান থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে কিন্তু ইরান ও হামাস বরাবরই এটি অস্বীকার করছে।

দ্বিতীয়ত: হামাসের তৈরিকৃত অস্ত্রের উৎস নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা আরবিতে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে। সেখানে দেখানো হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের কিছু জাহাজ গাজা উপত্যকার সমুদ্র উপকূলে ডুবে গিয়েছিল। হামাসের মিলিটারি শাখার ডুবুরি দল সেই জাহাজগুলোর সন্ধান পায়। তারা আবিষ্কার করে যে, এই জাহাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র এখনো ব্যবহারের উপযুক্ত। পরবর্তীতে হামাসের ডুবুরি দল জাহাজগুলো থেকে এসব সরঞ্জাম উদ্ধার করে। হামাসের নিরাপত্তা বাহিনীর টিম পুরাতন এসব জাহাজগুলোকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে সেখান থেকেই তৈরি করছে নানা ধরনের অস্ত্র। এসব অস্ত্র দিয়েই ইসরায়েলের হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে হামাস।

তৃতীয়ত, বলা হয়ে থাকে ইসরায়েল তার অভ্যন্তরীণ পানির সংকট মেটাতে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার নিচ দিয়ে কিছু গোপন পাইপলাইন বসিয়েছিল। গোপনে স্থাপন করা লাইনগুলো বন্ধ করে দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন পাইপলাইনগুলোতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশগুলো হামাস তাদের অস্ত্রের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ২-৩টি এমন ডুবোজাহাজ আর পানির পাইপলাইন থেকে হাজার হাজার রকেট বানানো কীভাবে সম্ভব? এতদিনে এসব কাঁচামালও শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। অফুরন্ত কাঁচামাল ছাড়া আর অন্য কোনো দেশের সাহায্য ছাড়া গাজার মতো জেলখানা এলাকা থেকে এত এত রকেট যন্ত্রপাতি বানানো অসম্ভব। তাই মনে করা হচ্ছে ইরান, তুরস্ক, রাশিয়া বা চীন এদের মধ্য কেউ গোপনে সেখানে অস্ত্রের কাঁচামাল পাঠাচ্ছে। ফাতাহ দলের মাহমুদ আব্বাস এর ক্ষমতার প্রতি লোভের কারণে ফিলিস্তিনে হামাস সরকার গঠিত হয়নি। অথচ ইসরায়েল আক্রমণ চালালে হামাস প্রতিবার এগিয়ে এসে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে ফিলিস্তিন এখনো রাজনৈতিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। অন্যদিকে ইসরায়েল সব পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং আরব দেশ মিশরও পথ ব্লক করে দিয়েছে। এর পরিণাম ভোগ করছে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা। হামাস যদি এতদিন ক্ষমতায় থাকত তাহলে হয়তো এতদিনে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে আরও একদফা এগিয়ে যেত পারত।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান: স্থায়ী সমাধান হিসেবে ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে Two State Solution এর কথা বলা হয়েছে। এই Two State Solution বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এর মূল কথা হচ্ছে, ১৯৬৭ সালের জাতিসংঘের দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। Two State Solution অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে। যেহেতু গাজা ও পশ্চিম তীর একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং মাঝখানে ইসরায়েলের অবস্থান, সেহেতু এই দুটি অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হবে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি কোরিডোর স্থাপনের মাধ্যমে। আর স্বাধীন ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল রাষ্ট্র দুটির রাজধানী প্রতিষ্ঠা করা হবে Geneva Accord অনুযায়ী। জেনেভা চুক্তি অনুসারে জেরুজালেমের ইহুদি বসতি এলাকা হবে ইসরায়েলের রাজধানী। অপরদিকে জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি বসতি এলাকা হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী। ইসরায়েল ইহুদিদের বড় বসতি এলাকাগুলো সংযুক্ত করবে এবং বিনিময়ে অন্য জমি ছেড়ে দেবে।

এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ইসরায়েল-পেলেস্টাইন সংঘাত নিরসনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বা Two State Solution এর বিকল্প নেই। তবে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, ইসরায়েল এই সংকটের সমাধান হিসেবে সবসময় One State Solution এর কথা বলে আসছে। তেল আবিব চায় সম্পূর্ণ ভূখণ্ডে ইসরায়েল নামে একটি মাত্র রাষ্ট্র হবে। যেখানে ফিলিস্তিনের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। নেতানিয়াহু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে কোনো সমঝোতায় যেতে চান বলে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র Two State Solution এর সপক্ষে বললেও তার সাথে একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তা হলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে হতে হবে একটি অসামরিক রাষ্ট্র। যা হামাসের পক্ষে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

ইসরায়েলের বিরোধিতা, যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত, হামাস-ফাতাহ দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে জটিল করে তুলেছে। তবে এই সমাধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা। কারণ ইসরায়েল ও পেলেস্টাইনের মধ্যে চলমান সংঘাতের টেকসই সমাধান কেবল যুক্তরাষ্ট্রই দিতে পারে। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্য যে রাষ্ট্রটি অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারে তা হচ্ছে সৌদি আরব। সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রই পারে ইসরায়েলকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান মেনে নিতে বাধ্য করাতে।

দ্বি রাষ্ট্র সমাধানের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কিছু ধর্মীয় কারণও রয়েছে। ইহুদিদের মধ্যেও বর্তমানে নানা দল উপদল রয়েছে। আলিয়া বা ইউরোপ থেকে যারা এখানে এসেছিল তারা "আশকেনাজি জুইশ" হিসেবে পরিচিত। জার্মানি ও ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা এই আশকেনাজি জুইশরা অনেক উগ্র টাইপের। এরাই মূলত ইসরায়েলের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। ইউরোপীয় ইহুদিরা এখানে আসার পূর্বে এখানে স্থানীয় কিছু আরব ইহুদি ছিল। যাদের ধর্ম ইহুদি হলেও ভাষা আরবি এবং সংস্কৃতি প্রায় আরবদের মতো। এদেরকে বলা হয় "মিজরাতি জুইশ"। এদের মধ্যে যারা আবার কালো তারা ইসরায়েলে প্রায় বর্ণবাদের শিকার হয়। এজন্য মাঝে মাঝে ইসরায়েলে আন্দোলনও হয়। আর যারা অর্থোডক্স জুইশ হিসেবে পরিচিত তারা মূলত ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরোধী। এদের দাবি ইহুদি ধর্ম অনুযায়ী মেসিয়াহ বা দাজ্জাল না আসা পর্যন্ত ইহুদিদের জন্য আলাদা দেশ গঠন করা পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা
বিশ্বের সবচেয়ে জটিল রাজনীতি হয় যে দেশে সেটি হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলে প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়। ইসরায়েলের শাসনব্যবস্থা হলো প্রধানমন্ত্রী শাসিত (Parliamentary System of Government)। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর হাতে সকল ক্ষমতা। প্রধানমন্ত্রী যতবার ইচ্ছে ততবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দুইবারের বেশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ইসরায়েলের এরকম কোনো নিয়ম নেই। যতবার ইচ্ছে আপনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই Term-Length কে রাজনীতি বিজ্ঞানে আমরা 'Renewable Indefinitely' বলে থাকি। ইসরায়েলের পার্লামেন্টের নাম হচ্ছে নেসেট (Knesset)। পার্লামেন্টের মোট আসন সংখ্যা ১২০টি। তাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য পার্লামেন্টে মোট ৬১টি আসন পেতে হয়। দেশটির ৭২ বছরের ইতিহাসে কোনো একক রাজনৈতিক দল পার্লামেন্টের মোট ১২০ আসনের মধ্যে কখনই ৬১টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়নি। তাই নিয়ম রয়েছে যদি কোন দল একা ৬১টি আসন না পায় তাহলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা দুই তিনটি দল একসাথে মিলিত হয়ে মোট ৬১টি আসন নিশ্চিত করে ক্ষমতায় আসতে পারবে। যেটাকে আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জোট বা কোয়ালিশন সরকার (Coalition Government) বলি। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে আরেকটু সহজ হবে। ধরুন নির্বাচনে A পার্টি ৪০টি আসন পেয়েছে, B পার্টি পেয়েছে ১২টি, C পার্টি পেয়েছে ৯টি আসন। তথা কোনো পার্টি এককভাবে ৬১টি আসন পায়নি। এখন এই তিনটি দল (A,B,C) একসাথে হলে ৬১টি আসন হয়ে যাচ্ছে। তাই এই তিনটি দল মিলে জোট সরকার গঠন করতে পারে। জোট গঠন করার মাধ্যমে রাজনৈতিক পদগুলো ভাগ বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়।

কেন ইসরায়েলে বারবার সরকার ভেঙে যায়?
উদাহরণ দেখে মনে হবে তাহলে তো জোট সরকার গঠন করা খুবই সহজ কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষেত্রে বিষয়টি মোটেই এত সহজ নয়। ইসরায়েলের সক্রিয় রাজনৈতিক দল রয়েছে মোট ১৩ টিরও উপরে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ (Ideology) ভিন্ন ভিন্ন। এক দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে অন্য দলের মতাদর্শ সাংঘর্ষিক। যেমন- 'ইয়েশ আতিদ' নামের রাজনৈতিক দলটি বিশ্বাস করে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন নামে দুইটি আলাদা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত। কিন্তু 'ইয়ামিনা' নামের যে রাজনৈতিক দলটি রয়েছে তারা আবার বিশ্বাস করে প্যালেস্টাইন নামে কোনো রাষ্ট্রই থাকতে পারে না, রাষ্ট্র হবে শুধু একটি এবং সেটা ইসরায়েল। ফলস্বরূপ আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে দুই তিনটি দল মিলে জোট সরকার গঠন করা খুবই কঠিন। এসব কারণে অনেক সময় তিন-চারটি দল মিলে জোট সরকার গঠিত হলেও সেই জোটভুক্ত দলগুলো একসাথে কয়েকবছর থাকাটাও মুশকিল হয়ে পড়ে। যে-কারণে দেখা যায় জোট গঠনের এক-দুই বছরের মাথায় সেই জোট আবার ভেঙে যায়। ফলস্বরূপ ইসরায়েলের নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের নির্ধারিত সময় আসার পূর্বেই নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। এই কারণে মাত্র দুই বছরে (২০২০-২০ ২০২১) ইসরায়েল চার চারটি জাতীয় নির্বাচনের সম্মুখীন হয়েছিল।

তিন দফা নির্বাচনের পর ২০২০ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁরই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্তজ মিলে জোট গঠন করে সরকার গঠন করেছিলেন। তবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বাজেট ইস্যুতে দুই দলের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব দেখা দিলে গান্তজ জোট ভেস্তে দেয়। ঘোষণা করা হয় নতুন নির্বাচনের তারিখ। তারপর ২০২০ সালের ২৩শে মার্চ চতুর্থ বারের মতো নির্বাচন হয়েছিল। সেখানেও কোনো দল ৬১টি আসন পায়নি। নির্ধারিত সময়ে নেতানিয়াহু জোট গঠন করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিরোধী নেতা ইয়েশ আতিদ নেতানিয়াহুকে বাদ দিয়ে অন্যান্য দলগুলোর সাথে জোট গঠন করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ৬১টি আসন নিশ্চিত করে ফেলে। তাই প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ হারিয়েছেন দীর্ঘ বারো বছর ধরে ইসরায়েলকে শাসন করা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের ইতিহাসে নেতানিয়াহু সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন। যেহেতু জোট সরকার তাই নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দুইজন। একজন ইয়েশ আতিদ পার্টির নেতা ইয়ার লাপিড আর একজন ইয়ামিনা পার্টির নেতা নাফতালি বেনেট। কোয়ালিশন অনুযায়ী ইয়ার লাপিড প্রথম দুই বছর (২০২১-২০২৩) এবং নাফতালি বেনেট পরবর্তী দুই বছর (২০২৩-২০২৫) প্রধানমন্ত্রী থাকবেন বলে একমত হন। ইয়ার লাপিড ও নাফতালি বেনেটের মধ্যেও আদর্শগত কোনো মিল নেই। তাই যথারীতি ২০২২ সালে এই জোট সরকারেরও নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পূর্বেই পতন ঘটে।

অন্যদিকে ইয়ার লাপিড নিজেকে মধ্য-বামপন্থি ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র থাকা উচিত। আর একজন নাফতালি বেনেট হলেন ধর্মীয় উগ্রপন্থি। তার মতে, ইসরায়েলের উচিত অধিকৃত পশ্চিম তীরের অধিকাংশ দখল করে নেওয়া। অবশেষে তারাও ব্যর্থ হন। মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে ভেঙে যায় তাদের জোট। ফলে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পুনরায় নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হন। আসলে ইসরায়েলের ক্ষমতায় যেই আসুক ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সবার পলিসি একই। পৃথিবীর অন্য সকল দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে ইসরায়েলের নির্বাচন ব্যবস্থাও ভিন্ন। আমরা সাধারণত নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে (প্রার্থীকে) ভোট দেই কিন্তু ইসরায়েলিরা কোনো ব্যক্তিকে নয়, বরং সরাসরি দলকে ভোট দেয়। তবে অন্য দেশের মতোই প্রপোরশনাল রিপ্রেজেনটেটিভ থাকে। দলের একটি Open list ও Close list থাকে। এসব লিস্টে লেখা থাকে কোন অঞ্চলে কে কে রিপ্রেজেনটেটিভ হবে। ওপেন লিস্টের রিপ্রেজেনটেটিভদের নাম নির্বাচনের আগেই প্রকাশ করা হয় কিন্তু ক্লোজ লিস্টে যারা থাকে তাদের নাম শুধু পার্টি সদস্যরা জানে। এই সিস্টেম শুধু ইসরায়েলেই নয় তুর্কি-সহ অনেক দেশেই আছে।

পেরু ও কানাডার সাথে তুলনা
এখন একটি প্রশ্ন হতে পারে, ইনকা সাম্রাজ্যের দেশ পেরুতেও তো ইসরায়েলের মতো অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে। তাহলে পেরুতে সমস্যা হয় না কেন? পেরুতে প্রায় ১০/১২টি সক্রিয় রাজনৈতিক দল থাকায় কোনো দলই ১৩ শতাংশের বেশি ভোট পায় না, সেহেতু পেরুতে সেকেন্ড রাউন্ড ভোট হয়। যেটিকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানে 'Runoff Voting' বা 'Ballotage' বলি। কোনো কোনো দেশে এটিকে আবার 'Two Round System'ও বলে থাকে। তখন এই ১০/১২টি দলের সকল প্রার্থীদের মধ্যে যে দুইজন প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল তাদের দুজনকে নিয়ে পুনরায় নির্বাচন হয়। দুজনের মধ্যে যে বেশি ভোট পাবে সেই প্রেসিডেন্ট হবেন। এভাবে সেকেন্ড রাউন্ড ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বানানো হয়। যে কারণে পেরুতে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হয় না। এইরকম Runoff Voting পেরু ছাড়াও ২০০২ সালে ফ্রান্সে হয়েছিল। এই সিস্টেমটি চেক রিপাবলিকের সিনেটর নির্বাচনে ও ইরানের পার্লামেন্টেও ব্যবহার হয়। কিন্তু ইসরায়েলের সংবিধানে এই রান অফ ভোটিং সিস্টেম নেই, তাই ইসরায়েলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হয়। এবার আরেকটি প্রশ্ন হতে পারে, ইসরায়েলের মতো কানাডায়ও তো অনেক রাজনৈতিক দল। ইসরায়েলের মতো কানাডায়ও Runoff Voting সিস্টেম নেই। তাহলে কানাডায় সরকার গঠন করতে কোনো সমস্যা হয় না কেন? উত্তর হচ্ছে কানাডায় অসংখ্য রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পলিসিগত তেমন বেশি পার্থক্য নেই। তাই নির্বাচনের পর কোয়ালিশন গঠন করা কানাডায় তুলনামূলকভাবে সহজ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে কয়েকটি নতুন পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি তার কনভেনশনাল সিস্টেম থেকে নতুন একধরনের সিস্টেমে শিফট করতে যাচ্ছে। তাই বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের নতুন এই শিফটগুলো জানতে হবে। সতেরো ও আঠারো শতকের দিকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশগুলোতে একনায়কতন্ত্র ছিল, অনেক দেশ ইউরোপিয়ান কলোনির অধীনে ছিল এবং কিছু দেশ ছিল বিভিন্ন রাজা বা রানীর অধীনে। তারপর বিংশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রগুলো কলোনি থেকে স্বাধীন হয়, অনেক নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। নতুন এসব অধিকাংশ রাষ্ট্রগুলোতেই মিলিটারি শাসন কায়েম হয়। তারপর বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে রাষ্ট্রগুলো মিলিটারি শাসন থেকে বেরিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রাথমিক ধাপে প্রবেশ করে। গণতন্ত্রের এই প্রাথমিক অবস্থাকে আমরা 'Nascent Democracy' বা 'সদ্য জন্ম হয়েছে এমন গণতন্ত্র' হিসেবে আখ্যায়িত করি।

একুশ শতাব্দীর শুরুতে এসে রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটতে থাকে। এখন প্রযুক্তির আধুনিকতার এই যুগে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো নতুন একধরনের সিস্টেম বা ধারায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে। নতুন এই ধারাটিকে কেউ কেউ 'Soft Totalitarianism' হিসেবে, আবার ইউভাল নোয়া হারারির মতো ইতিহাসবিদরা 'Digital Authoritarianism' হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। হারারির মতে এই ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদের মানে হচ্ছে বর্তমান দুনিয়ায় শাসকরা প্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করছে, ম্যালওয়ার বা সফটওয়‍্যার দিয়ে জনগণের উপর নজরদারি করছে (Mass Surveillance), যা কি না গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে তোয়াক্কা না করে রাষ্ট্রযন্ত্র ডিজিটাল প্রযুক্তির 'বিগ ডেটা অ্যানালিসিস' ও 'মাইক্রো টার্গেটিং' এর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যবহারকারীর আচরণবিধি, আগ্রহ ও চাহিদা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে নিখুঁত আইডিয়া নিয়ে নিচ্ছে। এখন এই সুবিধার কারণে রাজনীতিবিদরাও আলাদাভাবে প্রত্যেক মানুষের মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারছে। ফলস্বরূপ গণতন্ত্র এখন একটি অনিশ্চিত মধ্যবয়সের সংকটে পড়েছে।

আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্ট বা মাইক্রোচিপ ব্যবহারের ফলে নিকট ভবিষ্যতে আপনার ব্যবহৃত গাড়ি আপনার যাতায়াত সংক্রান্ত তথ্য সরকারকে জানাবে, ফ্রিজ জানাবে কী ধরনের খাবার আপনি খেতে পছন্দ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া তথ্যের মাধ্যমে জানা যাবে আপনার দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয় সম্পর্কে। একুশ শতকের এই নতুন প্যাটার্নটিকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের প্রধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড রাঞ্চিম্যান 'রাজনৈতিক ভূমিকম্প' বা 'Political Earthquake' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শুধু একটি দেশের জনগণই নয় বরং পুরো বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে বর্তমান বিশ্বের হাইলি এডভ্যান্সড একটি দেশ হলো ইসরায়েল। গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইসরায়েলের একটি মেগা প্রজেক্ট রয়েছে। আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে ইসরায়েলের তিনজন নাগরিক (নিভ কার্মি, সালেভ ভুলিও এবং ওমরি লেভাই) একটি প্রযুক্তি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করে। সেই তিনজন নাগরিকের নামের আদ্যক্ষর দিয়েই তাদের প্রযুক্তি ফার্মের নাম দেওয়া হয় 'NSO Group'। বর্তমান পৃথিবীর একটি সেরা প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে পরিণত হয়েছে এই এনএসও গ্রুপ। ইসরায়েল সরকার কর্তৃক লাইসেন্সকৃত এই বেসরকারি এনএসও গ্রুপ 'পেগাসাস' (Pegasus) নামে একটি অত্যাধুনিক সফটওয়্যার তৈরি করেছে। NSO Group এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে তারা দাবি করছে, তাদের এই সফটওয়্যার নজরদারি বা Spying করার জন্য ওয়ার্ল্ডের সব থেকে সফিস্টিকেটেড সফটওয়্যার। তাদের দাবি কোনো ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট থেকে শুরু করে তার কল লিস্ট, কল লগ, কাকে সে এসএমএস করছে, কোনো অপর এপ্লিকেশন দিয়ে সে চ্যাটিং করছে কি না, সম্পূর্ণ তথ্য পেগাসাস দ্বারা পাওয়া সম্ভব। আর এই অত্যাধুনিক সফটওয়‍্যারটি ক্রয় করতে হয় তাদের এই অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকেই। ওয়েবসাইটে স্পষ্ট করে তারা লিখে দিয়েছে যে, তারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে এই সফটওয়্যার ডেভেলপ করেনি। এই সফটওয়্যার নাকি ডেভেলপ করা হয়েছে গ্লোবাল সিকিউরিটি এবং স্ট্যাবিলিটির জন্য।

তাদের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে শুধু পেগাসাস নয়, সিকিউরিটি রিলেটেড আরও অনেক রকম সফটওয়্যার এবং ডিভাইস তারা ডেভেলপ করে থাকে। তাদের ভাষ্যমতে আতঙ্কবাদী, টেরোরিস্ট এবং ড্রাগ সাপ্লায়ারদের রুখতে এসব স্পাইওয়্যার সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান NSO Group এর তৈরিকৃত 'পেগাসাস' সফটওয়‍্যার ব্যবহার করে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না এ নিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় গবেষণা করেছে। আজকের একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে বন্ধু রাষ্ট্র হোক কিংবা শত্রু রাষ্ট্র কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। সে-কারণেই ২০১৬ সালে কানাডিয়ান সিকিউরিটি সংস্থা 'The Citizen Lab' সর্বপ্রথম ইসরায়েলের এই প্রযুক্তি কোম্পানির উপর গবেষণা শুরু করে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সিটিজেন ল্যাব তার একটি রিপোর্টে দেখিয়েছে যে, ইসরায়েলের এই সফটওয়‍্যার বর্তমানে পৃথিবীর মোট ৪৫টি দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারপর ২০১৯ সালের অক্টোবরে হোয়াটসঅ্যাপ এরকম একটি তথ্য প্রকাশ করে যে, ভারত সরকার তার দেশের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপর এই ডিভাইস ব্যবহার করছে। রিপোর্টে উঠে আসে আরও ভয়ংকর সব তথ্য। যেমন- পেগাসাসের মাধ্যমে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও কুর্দিস্থানের নেতা বাহরাম সালিহকে টার্গেট করা হয়েছে সৌদি আরব থেকে। লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে টার্গেট করা হয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে টার্গেট করা হয়েছিল ভারত থেকে এবং তার আলামত অনুসন্ধানে পাওয়া গিয়েছে। নজরদারি করা হয়েছিল দীর্ঘ সময়ের মার্কিন কূটনীতিক রবার্ট ম্যালিকে। যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন। উল্লেখ্য, পেগাসাসের অধিকাংশ নজরদারি মেইনটেইন করা হয়েছে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশ মরক্কো থেকে। কারণ মরক্কো মুসলিম দেশ হলেও সেখানে প্রায় তিন লক্ষ ইহুদি জনগণের বসবাস, যারা কর্ডোবা পতনের পর স্পেন থেকে পালিয়ে মরক্কোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

প্রথমত, ম্যালওয়‍্যারটির বিক্রেতা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসও এর দাবি, উপরিউক্ত এইসব হ্যাকিংয়ের সঙ্গে তারা যুক্ত নয়। বরং মানবাধিকার রেকর্ড ভালো এমন দেশের সামরিক বাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা বিভাগের কাছে তারা এই সফটওয়্যার বিক্রি করেছে। এনএসও জানিয়েছে ৪০টি দেশের ৬০টি সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেতা।

ইসরায়েলি এই কোম্পানির দাবি শুধু সন্ত্রাসী এবং শিশু যৌন নির্যাতনকারী, মাদক ব্যবসায়ী বা মানব পাচারকারীদের মতো গুরুতর অপরাধীদের নজরদারি করার শর্তেই এই সফটওয়্যার তারা বিক্রি করে। এনএসও দাবি করছে যে, রাজনীতিবিদ কিংবা নিরপরাধ সাধারণ জনগণকে এই সফটওয়্যার দিয়ে টার্গেট না করার জন্য ক্রেতাদের উপর শর্ত দেয়া হয়। অনুসন্ধানী প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে এক বিবৃতিতে এনএসও আরও বলেছে, ক্রেতা রাষ্ট্রগুলো কীভাবে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করছে তার উপর তারা নিয়মিত নজর রাখে এবং শর্ত ভাঙলে সফটওয়্যারটির ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু শর্ত ভাঙার দায়ে এনএসও কোনো দেশে তাদের সার্ভিস বন্ধ করেছে তার কোনো প্রমাণ এখনো নেই।

দ্বিতীয়ত, ভারতের নিউজ পোর্টাল দ্য ওয়্যার প্রকাশিত হ্যাকিংয়ের তালিকায় ভারতের অন্তত ৩০০ রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বিজ্ঞানীর নাম রয়েছে এমন নিউজ প্রকাশ করেছে। এটি নিয়ে ভারতের বিরোধী দল বিক্ষোভ প্রতিবাদও করেছে। বিক্ষোভের পর সরকার দলের দাবি তারা কখনোই বিরোধী দলকে নজরদারি করছে না বরং ভারতের নিরাপত্তার জন্য যারা হুমকি তাদের উপর নজরদারি করছে। ভারত সরকারের দাবি তারা ইসরায়েল থেকে ক্রয়কৃত এই সফটওয়্যার শুধু সিকিউরিটির ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।

উপরিউক্ত এই বিষয়গুলো থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। এক. ইসরায়েল নিজে নজরদারি করছে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা এই ম্যালওয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রমিনেন্ট রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আইনজীবী, আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, ইরানের মতো বিভিন্ন দেশের সাইনটিস্ট, আরব দেশগুলোর রাজা-বাদশাদের উপর নজরদারি করছে। দুই. একেতো ইসরায়েল নিজে নজরদারি করছে, তারপর আবার বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের নিজ দেশে এটি ব্যবহার করে ইসরায়েলকে আরও সহযোগিতা করছে। কারণ বিভিন্ন দেশের সরকাররা যখন এই সফটওয়্যার ইসরায়েল থেকে ক্রয় করে নিয়ে আসেন এই সফটওয়্যার এর মূল নিয়ন্ত্রণ কিন্তু ইসরায়েলের হাতেই থেকে যায়। অর্থাৎ তারা নিজ দেশের জনগণের উপর যে নজরদারিটি করছে সেটি কিন্তু ইসরায়েল গোপনে জেনে নিতে পারছে। এক কথায়, নিজেদের দেশের তথ্য ইসরায়েলে চলে যাচ্ছে। ইসরায়েল যখন বলে ক্রেতা রাষ্ট্রগুলো কীভাবে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করছে তার উপর তারা প্রতিনিয়ত নজর রাখে এবং শর্ত ভাঙলে সফটওয়্যারটির ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া হয়। তার মানে কী দাঁড়ায়? ইসরায়েলে বসে যদি ক্রেতা রাষ্ট্রগুলোর সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ক্রেতা রাষ্ট্রগুলোর সংগ্রহকৃত তথ্যও ইসরায়েলে বসেই দেখতে পারা যায়। তিন. মনে করুন ব্রাজিল, বাহরাইন কিংবা মরক্কোতে ইসরায়েল বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করতে চাচ্ছে। এখন নজরদারির জন্য ইসরায়েলকে এসব দেশে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের পাঠাতে হয়। মনে করুন বাহরাইন, ব্রাজিলের সরকার ইসরায়েল থেকে পেগাসাস সফটওয়্যারটি ক্রয় করেছে এবং মরক্কো ক্রয় করেনি। যেহেতু বাহরাইন ও ব্রাজিল সফটওয়্যারটি ক্রয় করেছে তাই এখন ইসরায়েলকে আর কষ্ট করে বাহরাইন ও ব্রাজিলে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পাঠাতে হবে না। ঘরে বসেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ বাহরাইন ও ব্রাজিলের সকল তথ্য পেয়ে যাবে। অর্থাৎ যে সকল রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েল থেকে এই সফটওয়্যারটা ক্রয় করেছে তারা মূলত ইসরায়েলকেই পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছে, নিজ দেশকে ফেলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ সংকটে। ক্রয়কৃত দেশগুলোর সরকার এসব সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নজরদারি করে সাময়িক কিছু রাজনৈতিক সুবিধা পেলেও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য দেশকে ফেলে দিচ্ছে হুমকির মুখে।

Question to think about?
ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত নিরসনে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Tishby, Noa (2021), Israel: A Simple Guide to the Most Misunderstood Country on Earth, Simon & Schuster Audio and Blackstone Publishing
2. Gordis, Daniel (2016), Israel: A Concise History of a Nation Reborn, Ecco
3. Gelvin, James L. (2005), The Israel-Palestine Conflict: One Hundred Years of War, Cambridge University Press
4. Gutwein, Danny (2016), The Politics of the Balfour Declaration: Nationalism, Imperialism and the Limits of Zionist-British Cooperation, Journal of Israeli History
5. Klug, Brian (2012), Being Jewish and Doing Justice: Bringing Argument to Life, Vallentine Mitchell
6. Lewis, Geoffrey (2009), Balfour and Weizmann: The Zionist, the Zealot and the Emergence of Israel, A&C Black
7. Oren, Michael B. (2003), Six Days of War: June 1967 and the Making of the Modern Middle East, Presidio Press
8. Grossman, David (2011), To the End of the Land, Vintage
9. Shindler, Colin (2002), The Land Beyond Promise: Israel, Likud and the Zionist Dream, I.B.Tauris Publishers
10. Johnson, Paul (1998), A History of the Jews, Harper Perennial

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও ভূরাজনীতি

📄 মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও ভূরাজনীতি


সপ্তদশ অধ্যায় Theme: Middle East: The Dilemma
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও ভূরাজনীতি

"It's about time that we as Arabs take things into our own hands and figure out our own future, rather than keep depending on some outside force to do it for us, particularly when intervention by this outside force has not particularly been beneficial to the region in recent history." -Marwan Muasher

সাধারণত যখন মধ্যপ্রাচ্যের দুরবস্থা নিয়ে আলাপ করা হয়, তখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটগুলোর প্রেক্ষাপট হিসেবে একচ্ছত্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা শক্তির কূটকৌশলকে দায়ী করা হয়ে থাকে। সবক্ষেত্রেই পশ্চিমা বিশ্বকে টেনে নিয়ে আসা হয়। বিষয়টি কি আসলেই তাই? নাকি মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের দায়কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার লক্ষ্যে বারবার যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বকে সামনে টেনে আনা হয়? বিষয়টি কি এতটাই সরলরৈখিক নাকি এর পেছনে রয়েছে সামগ্রিক কোনো দৃষ্টিভঙ্গি। কিছু ঐতিহাসিক এবং সমসাময়িক প্রশ্ন দিয়ে এই অধ্যায়ের আলোচনা শুরু করা যাক। নব্বইয়ের দশকে সাদ্দাম হোসেন যদি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কুয়েত দখল না করত তাহলে কি বর্তমান ইরাকের এই পরিণতি হতো? বাংলাদেশ কোন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম সেন্টিমেন্টের বিপক্ষে গিয়ে উপসাগরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ অবলম্বন করেছিল? আরব বসন্ত কি পশ্চিমা চক্রান্তের একটি বাই-প্রোডাক্ট নাকি আরব রাষ্ট্রগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা নিপীড়নের প্রতিবাদ হিসেবে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? মুসলিম ধর্মাবলম্বী দেশ ইয়েমেনের ধ্বংস হওয়ার পেছনে শুধুই কি পশ্চিমা চক্রান্ত দায়ী নাকি সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বই এর অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে? না হয় বোঝা গেল মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর একটি ফায়দা রয়েছে কিন্তু কোন কারণে তুরস্ক সিরিয়াতে বোমা হামলা চালাচ্ছে? আরব বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তর জাতিগোষ্ঠী কুর্দিরা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও কেন মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর দ্বারাই তারা যুগযুগ ধরে নির্যাতিত হচ্ছে? এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়েই এই অধ্যায়টি শুরু করা যাক।

উপসাগরীয় দ্বন্দ্ব ও ভূরাজনীতি
পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী ৮টি দেশকে Gulf State বা উপসাগরীয় দেশ বলা হয়। দেশগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও ইরান। তেল সমৃদ্ধ এই পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয়। তাই এই রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্ব অনেক। মধ্যপ্রাচ্যে আজকে যে সংকট চলমান সেটার সূচনার কথা বললে প্যালেস্টাইন সংঘাতের পর সর্বপ্রথম আসে উপসাগরীয় যুদ্ধ। এই অঞ্চলে সংঘটিত হওয়া দুটি যুদ্ধ পরিবর্তন করে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। প্রথম যুদ্ধটি ইরাক শুরু করেছিল। আর দ্বিতীয় যুদ্ধটি ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল। প্রথমটি জাতিসংঘের অনুমোদনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি বহুজাতিক বাহিনী ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। আর পরেরটিতে জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের একক উদ্যোগে ওই যুদ্ধের সূচনা।

প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০)
ইরাকের কাছে রয়েছে বিপুল তেলসম্পদ। ইরাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিয়া মুসলিম। ১৯৭৯ সালের ১৬ জুলাই সুন্নি বাথ পার্টি থেকে ইরাকের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় আসেন। ইরাকের প্রতিবেশি রাষ্ট্র কুয়েত। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় দশ শতাংশ রয়েছে ছোট দেশ কুয়েতে। ঐতিহাসিকভাবে মনে করা হয় কুয়েত ইরাকেরই একটি অংশ। তাই সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় এসে কুয়েতকে ইরাকের একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করতে থাকেন। আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চেয়েছিল কুয়েতের বিপুল তেলের সরবরাহ যেন তাদের জন্য সবসময় উন্মুক্ত থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে- হঠাৎ করে সাদ্দাম কেন কুয়েতকে দখল করার প্ল্যান করলেন? এটি বুঝতে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে।

উপসাগরীয় যুদ্ধের পূর্বে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত, এই দীর্ঘ আট বছর ইরান ও ইরাক একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। যেটি ইতিহাসে 'ইরাক-ইরান যুদ্ধ' নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, সাদ্দাম হোসেন যে বছর ক্ষমতায় আসে সেই বছরই তথা ১৯৭৯ সালে ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব হয়েছিল এবং বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে ইরান একটি শিয়া প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইরাকও শিয়া প্রধান রাষ্ট্র। কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে অন্য জায়গায়। ইরাক শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হলেও সাদ্দাম হোসেন ছিলেন সুন্নি। শিয়াদের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ফোর্সও গঠন করেছিলেন সাদ্দাম হোসেন। যা ইরানের সাথে ইরাকের সম্পর্কের দূরত্ব বৃদ্ধি করে। দ্বিতীয়ত, ইরাকের সাথে ইরানের অটোমান আমল থেকেই সীমান্ত নিয়ে সমস্যা ছিল। একপর্যায়ে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়, সেই দ্বন্দ্ব থেকেই যুদ্ধ। ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইরাক কর্তৃক ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়।

ইরানের বিমান বাহিনী 'অপারেশন স্কর্চ সোর্ড' (Operation Scorch Sword) নামে ইরাকের পারমাণবিক চুল্লির উপর আক্রমণ চালালে যুদ্ধের গতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অবশেষে ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্ট ইরান কর্তৃক জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই লড়াইয়ে ইরান ও ইরাক কেউ জয় লাভ করেনি বরং দীর্ঘ যুদ্ধে উভয় দেশেরই সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়। প্রায় পাঁচ থেকে দশ লক্ষ সেনা নিহত হয়। ভঙ্গুর হয়ে পড়ে তেলসমৃদ্ধ দুটি দেশের অর্থনীতি। যুদ্ধে ইরাকের প্রায় ৫৬১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। যুদ্ধ চলাকালে ইরাক কুয়েত থেকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেয়। যুদ্ধ শেষে বিলিয়ন ডলারের ঋণে পড়ে যায় সাদ্দাম হোসেনের সরকার। এখন ইরাক এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবে?

বিশাল অঙ্কের ঋণ শোধ করার জন্য সাদ্দাম হোসেনের সরকার বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন মূলত ইরাক, কুয়েত, সৌদি থেকেই সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করা হতো। এখন ইরাক একা দাম বৃদ্ধি করলেই তো হবে না যদি অন্য রাষ্ট্র দুটি তেলের দাম বৃদ্ধি না করে। এজন্য ইরাক বিশ্ব বাজারে কুয়েতকে তার তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার অনুরোধ করে। কারণ কুয়েত তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিলে সবাই বাধ্য হয়ে ইরাকের কাছ থেকেই তেল ক্রয় করতে হবে। কিন্তু ইরাকের এ অনুরোধ উপেক্ষা করে কুয়েত তেল উত্তোলন কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাবার পরিবর্তে তেলের দাম পূর্বের তুলনায় আরও কমে যায়। কুয়েতের এরকম আচরণ ইরাকের হৃদয়ে আঘাত হানে। কুয়েত ও সৌদি আরবের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র কুয়েত থেকে কম দামে তেল ক্রয় করতে শুরু করে। তখন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসাইন দুটি দাবি করেন। এক. কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রের কথায় বৈশ্বিক তেলের দাম কমিয়ে দিয়েছে। দুই. যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়ে আসা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ইরাকের 'রুমালিয়া তেলক্ষেত্র' থেকে কুয়েত অবৈধভাবে তেল উত্তোলন করছে এমনটি দাবি করেন সাদ্দাম হোসেন।

১৯৯০ সালের ২ আগস্ট প্রায় দশ লাখেরও বেশি বিশাল সামরিক বহর নিয়ে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করে বসে। ছোট দেশ কুয়েত সামরিকভাবে অতটা শক্তিশালী ছিল না। তাই বলা যায় বিনা বাঁধায় ইরাক কুয়েত দখল করে ফেলে। কুয়েতকে ইরাকের ১৯তম প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘ ও আরব লীগ এর বিরোধিতা করে সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত ত্যাগ করার নির্দেশ দিলে ইরাক সেটা নাকচ করে দেয়। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় সিনিয়র জর্জ ডব্লিউ বুশ। বুশ প্রশাসন দেখল ইরাকের নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের মোট তেল সম্পদের প্রায় বিশ ভাগ চলে যাচ্ছে। সৌদি আরবের দুশ্চিন্তা ছিল সাদ্দাম হোসেন হয়তোবা কয়েকদিন পর সৌদিতেও আক্রমণ করে বসবেন। সৌদি সহায়তা চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সৌদিকে সহায়তা ও কুয়েতকে মুক্ত করার নামে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী পা রাখে রিয়াদে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীদের সেটাই প্রথম সৌদিতে পা রাখা। সেই থেকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সৌদিতে অবস্থান করছে। সৌদি আরবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল একটি ঘাঁটিও রয়েছে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে অপর আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তাই জাতিসংঘ ইরাকের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাশকৃত 'রেজল্যুশন ৬৭৮'তে বলা হয় কুয়েত থেকে সকল ইরাকি সৈন্য অপসারণ করতে হবে অন্যথায় সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জবাবে সাদ্দাম হোসেন দুটি শর্ত দিলেন। এক. ইরাক তখনই কুয়েত থেকে সৈন্য অপসারণ করবে যদি সিরিয়া ও লেবানন থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সেনা প্রত্যাহার করে। দুই, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অপসারণ করতে হবে। যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মানা অসম্ভব ছিল। এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে- ইরাক যুদ্ধের সাথে সাদ্দাম হোসেন কেন ইসরায়েলের প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে আসলেন? উত্তর হচ্ছে সাদ্দাম হোসেন ভেবেছিলেন এই যুদ্ধে কোনোরকমে ইসরায়েলকে যুক্ত করতে পারলে অন্যান্য আরব দেশগুলো সাদ্দাম হোসেনের পক্ষে এগিয়ে আসবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ৩৯টি দেশ মিলে কোয়ালিশন ফোর্স গঠন করে ইরাকে আক্রমণ শুরু করে। সম্মিলিত ফোর্সের কাছে ইরাকের ভয়াবহ পরাজয় হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে কুয়েত, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, ফ্রান্স, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ করে। আর ইরাকের পক্ষে ছিল ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনের পিএলও। 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম' নামে আক্রমণটিও এই ইরাক যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত। অবশেষে ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। পরাজিত ইরাকের অবস্থা পূর্বের তুলনায় শতগুণ খারাপ হয়। যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে কুয়েত ইরাকের দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি পায়, সৌদি আরবে মার্কিন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, ওসামা বিন লাদেনকে সৌদি আরব থেকে বহিষ্কার করা হয়, পিএলও ইরাককে সমর্থন দেওয়ায় কুয়েত থেকে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কার করা হয়। সৌদির মাটিতে কেন মার্কিনী সেনাদের জায়গা দেওয়া হলো এটির প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন ওসামা বিন লাদেন। মার্কিন প্রোপাগান্ডায় সৌদি ওসামাকে ১৯৯১ সালে বহিষ্কার করলে ওসামা বিন লাদেন এবং তার অনুসারীরা আফগানিস্তানে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে ১৯৯২ সালে সুদানে চলে যান। তালেবানরা যখন আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে তখন ১৯৯৬ সালে ওসামা বিন লাদেন পুনরায় আফগানিস্তানে চলে আসেন। ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত উপসাগরীয় এই যুদ্ধটি মোট সাতটি নামে পরিচিত। পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ (Persian Gulf War), প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ (First Gulf War), কুয়েত যুদ্ধ (Kuwait War), কুয়েত আক্রমণ (Kuwait Invasion), ইরাক-কুয়েত দ্বন্দ্ব (Iraq-Kuwait conflict), জাতিসংঘ-ইরাক দ্বন্দ্ব (U.N-Iraq conflict), কেউ আবার সকল যুদ্ধের মা (The mother of all battles) ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেছেন।

দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধে (২০০৩)
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ বন্ধের যে চুক্তি হয়েছিল, সেটি ইরাক ভঙ্গ করেছে বলে দাবি উঠায় যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ বিরতি অনুযায়ী ইরাকের উপর শর্ত দেওয়া হয় তার মজুত করা পরমাণু এবং অন্যান্য মারণাস্ত্র নষ্ট করতে হবে, কুর্দি জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ফ্রি জোন হিসেবে মেনে নিতে হবে। যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে সাদ্দাম হোসেন ২০০৩ সালে কুর্দি অঞ্চলে ইরাকি সেনা পাঠিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, আমেরিকা দাবি উঠায় যে, সাদ্দাম ইরাকে প্রচুর মারাত্মক পারমাণবিক ও রাসায়নিক মারণাস্ত্র মজুত করেছে। তারা বলছে ইরাকের কাছে Weapons of Mass Destruction (WMD) রয়েছে। এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার জন্য তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ। বুশের তৃতীয় অভিযোগটি ছিল ওসামা বিন লাদেন এবং তার সংগঠন 'আল-কায়দা'-র সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের যোগসূত্র আছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা পুনরায় হামলা চালায় ইরাকে। শুরু হয় দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ। মার্কিন বাহিনী পরাজিত করে সাদ্দাম হোসেনকে। সাদ্দাম পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলেও মার্কিন বাহিনী তাঁকে খুঁজে বের করে। সাদ্দাম 'মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ' করেছে এই অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড় করানো হয় সাদ্দাম হোসেনকে। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর অসংখ্য গবেষণা হয়েছে এটা নিয়ে যে, ইরাকে আসলেই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র ছিল কি না। সাদ্দাম হোসেন বা ইরাকের কাছে পারমাণবিক ও রাসায়নিক মারণাস্ত্র মজুত ছিল এটি কেউ প্রমাণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশ কেন উপসাগরীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে?
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর এটি ছিল বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর জন্য প্রথম কোনো বৈদেশিক যুদ্ধ। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ থেকে ২,৩০০ সৈন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত তিনটি রাষ্ট্রের সাথেই ঢাকার উষ্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ১৯৯০ সালে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ঢাকার সামনে তিনটি অপশন খোলা ছিল; (ক) যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে নিরপেক্ষ থাকা। যেহেতু স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়'। (খ) দ্বিতীয় অপশন ছিল ইরাকের সাথে যোগ দেওয়া। প্রথম আরব দেশ হিসেবে ইরাক বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেয়। ইরাকে অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী ছিল, ইরাক বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস ছিল। এমনকি ৮৮'এর বন্যায় ইরাক বাংলাদেশকে আর্থিক সহযোগিতা করেছিল। ১৯৭৩ সালের চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে বাংলাদেশেরও অবস্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিপক্ষে। পিএলও ইরাকের পক্ষে ছিল। তাছাড়াও বাংলাদেশের পাবলিক সেন্টিমেন্ট ছিল ইরাকের পক্ষে। এসব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের কাছে অপশন ছিল ইরাকের পক্ষে যোগ দেওয়া। (গ) বাংলাদেশের সামনে তৃতীয় অপশনটি ছিল সৌদি, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের জোটে যোগ দেওয়া। কারণ সৌদি ও কাতারে তখন অসংখ্য বাংলাদেশি কর্মরত ছিল। রেমিট্যান্স এর বিশাল একটি অঙ্ক আসত এই দুটি দেশ থেকে।

প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশ কেন শেষের অপশনটি বেছে নিয়েছিল? বাংলাদেশে তখন ক্ষমতায় ছিলেন হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল মার্কিন ঘেঁষা। উল্লেখ্য সময়টা ১৯৯০। একদিকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, অন্যদিকে বাংলাদেশে এরশাদ বিরোধী প্রকট আন্দোলন। যেহেতু সোভিয়েতের পতন হয়েছে এবং গণতন্ত্রের জয় হয়েছে, তাই স্বৈরশাসকদের টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ ছিল না। তাই এরশাদ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা লাভ করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। এজন্য এরশাদ উপসাগরীয় যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে অসংখ্য জনগণকে প্রতিবছর হজ্জের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যেতে হয়। কারণ ইসলামের পবিত্র স্থান মক্কা ও মদিনা সৌদি আরবে অবস্থিত। এই বিষয়টিও এরশাদ সরকারকে বিবেচনা করতে হয়েছে। তৃতীয়ত, সৌদি ও কুয়েত থেকেও বাংলাদেশে অনেক রেমিট্যান্স আসত। ইরাক থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসত তার থেকে বেশি আসত সৌদি ও কুয়েত থেকে। উপরিউক্ত তিনটি কারণ তো শুধু যুক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলাম। কেউ আবার বাংলাদেশের ইরাকের বিপক্ষে অংশ নেওয়ার পেছনে একটি নৈতিক যুক্তি বা Moral Ground দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। সেটি হচ্ছে সাদ্দাম হোসেন যে কাজটি করেছিলেন (কুয়েত দখল) সেটি আদৌ ঠিক ছিল কি না? একটি রাষ্ট্র কর্তৃক আরেকটি রাষ্ট্রকে দখল করে নেওয়া আমি-আপনি সমর্থন করি কি না? বাংলাদেশকে যদি একটি বড় রাষ্ট্র এসে দখল করে নেয় আমরা সেটি কখনো সমর্থন করব কি না? এসব বিবেচনায় এখানে অসংখ্য জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ থাকলেও ইরাকের কুয়েত দখল করা কখনোই উচিত হয়নি বলে মনে করছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা।

ইরাকের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক
ইরাকের কাছ থেকে বাংলাদেশের কিছু পাওনা আছে। বাংলাদেশ সরকার চাচ্ছে ইরাকের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে সেই পাওনাগুলো বুঝে নিতে। প্রয়াত ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি করেছিলেন। কিন্তু আট বছর ধরে চলমান ইরাক-ইরান যুদ্ধের ফলে ইরাকের অর্থনীতি তখন খাদের কিনারায় দাঁড়ায়। তারপর আবার ইরাকের বিরুদ্ধে শুরু হয় উপসাগরীয় যুদ্ধ। এসব নানা কারণে বাংলাদেশ থেকে নেওয়া সেই আমদানিকৃত পাটের মূল্য পরিশোধ করা হয়নি। বাংলাদেশ ইরাকের কাছে পাট রপ্তানির সেই টাকা এখনো পায়নি। ইরাক বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৭.৩৬ মিলিয়ন ডলারের পাট আমদানি করেছিল। ২০২০ সাল পর্যন্ত বকেয়া ওই অর্থের বিপরীতে সুদ-সহ মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪.৯০ মিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ থেকে ইরাকে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে ১৯৮৫ সালে এক চুক্তির আওতায় তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ইরাকের সেন্ট্রাল ব্যাংকে বড় অংকের টাকা ডিপোজিট করেছিল। মানব সম্পদ রপ্তানি এগ্রিমেন্টের আওতায় ইরাকি সেন্ট্রাল ব্যাংকে যে অর্থ ডিপোজিট করেছিল তা ২০১৫ সালে সুদ-সহ প্রায় ৮.৯৯ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। বর্তমানে আরও বেড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর ইরাকের কাছ থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে সুদ-সহ এত বিশাল অঙ্কের টাকা আদায় করার পক্ষে না। ইরাকেরও সামর্থ্য নেই। তাই বাংলাদেশ চাচ্ছে ইরাকের পক্ষে যতটুকু সম্ভব এটলিস্ট বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনাটি যেন ইরাকের বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে দেয়।

আরব বসন্ত : “আরব বসন্ত”-মধ্যপ্রাচ্যকে যেভাবে পরিণত করেছে ভূরাজনীতির প্লে-গ্রাউন্ডে
গোটা আরব বিশ্বই এখনো বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম ফোকাস পয়েন্ট। প্রতি ইঞ্চি জায়গা যেখানে ভূরাজনৈতিক কূটচালে পৃষ্ট। আরব বিশ্বে শত্রু-মিত্র পার্থক্য করা অনেকটা দুরূহ ব্যাপার। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আমরা যতটা সহজ মনে করছি আদতে তা নয়। কারণ এখানে কেবলমাত্র একটি সরকারের সাথে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লড়াই হয় না বরং এখানে এমন কোনো শক্তি বাকি নেই যারা এই অঞ্চলের ভূরাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত নয়। মোদ্দাকথা মধ্যপ্রাচ্য একটি যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধে কেউ বা সরাসরি যুক্ত, আবার কেউ প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধের উত্তাপ মধ্যপ্রাচ্য পেরিয়ে চলে গিয়েছে বেলজিয়াম থেকে সুইডেন পর্যন্ত। যেখানকার আকাশ আমেরিকান, ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান, রাশিয়ান ও সুইডিশ যুদ্ধবিমানের ধোঁয়ায় একাকার হয়ে গিয়েছে। যেখানে আল-কায়দার মতো বৈশ্বিক সশস্ত্র গোষ্ঠী, আইএস, হিজবুল্লাহ, হামাস এর মতো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী, এমনকি ইরানি শিয়া মিলিশিয়াগুলোও তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ে হন্যে হয়ে ছুটছে। তাই আরব বিশ্বের রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে 'আরব বসন্ত'কে। তাই এই পর্বে আরব বসন্ত নিয়ে আলোচনা করব।

যে যুবকের আত্মহত্যা থেকে আরব বসন্তের সূত্রপাত: ২৬ বছরের একজন শিক্ষিত যুবক। নাম তার বুআজিজি। তিউনিসিয়ার নাগরিক। পড়াশুনা শেষ করে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো চাকরি না পেয়ে স্বল্প পুজি নিয়ে রাস্তায় ফলের দোকান নিয়ে বসেন। রাস্তায় ফল বিক্রির কারণে তিনি পুলিশের মার খেয়েছেন অনেকবার। নানা অপমানও সহ্য করেছেন পুলিশের হাতে। লাইসেন্সবিহীন ফল বিক্রি করায় তিউনিসিয়ার পুলিশ তার কাছ থেকে বিভিন্ন সময় জরিমানা নিয়েছে। মাঝেমধ্যে পয়সা দিতে অস্বীকার করায় তাকে মালামাল-সহ কয়েকবার আটক করা হয়েছে।

হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন বারবার: একদিন বলা হলো, ব্যবসার পারমিট বা লাইসেন্স না হলে আর ফেরি করা যাবে না। বুআজিজি স্টেট অফিসে যোগাযোগ করে দেখলেন, ফেরি করার জন্য কোনো পারমিট লাগে না। অথচ পারমিটের জন্য ফায়জা হামদি নামে এক মহিলা পুলিশ তাকে হেনস্তা করেছেন। তার গালে চড় মারেন, মুখে থু থু দেন। আরব সংস্কৃতিতে মুখে থু দেয়া খুবই অপমানজনক কাজ। ওই মহিলা পুলিশ তার ইলেকট্রনিক মাপযন্ত্রও ছিনিয়ে নিয়ে ফলের গাড়িটি ধাক্কা দিয়ে নর্দমায় ফেলে দেন। এরপর বুআজিজি গভর্নর অফিসে গেলেন। তবে তার আবেদন সেখানে নাকচ করে দেয়া হয়। তদুপরি সাক্ষাৎকারের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়। বুআজিজি তখন বলেন, 'যদি সাক্ষাতের অনুমতি না দেন গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করব।' তার কথা কেউ শোনেনি। ঘণ্টাখানেক পর গভর্নর অফিসের সামনের ব্যস্ত রাস্তায় অনেক লোকজনের সম্মুখে নিজের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন বুআজিজি। তখন তিনি বলেছিলেন, 'আমার বাঁচার কোনো পথ খোলা ছিল না।'

জানাজা থেকেই আরব বসন্তের বীজ বপন : ১৮ দিন বেহুঁশ হয়ে হাসপাতালে থাকার পর ৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বুআজিজি। তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। সেখানেই লোকজন প্রতিশোধের শপথ নিয়েছিল। ওই দিনের জানাজার নামাজ এবং শপথ 'আরব বসন্তের' বীজ বপন করেছিল। ঐদিন পুলিশের বাধা সত্ত্বেও অনেক লোক মিছিল করে। বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তিউনিসিয়ার শাসক বেন আলীর দুঃশাসনের বিরুদ্ধেও যাদের অবস্থান, তারাও সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকেন।

পতন হলো স্বৈরশাসক বেন আলীর: উন্নত প্রশাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার, সেবা খাতের উন্নয়ন, বেকার সমস্যার সমাধান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ,- এসব নিয়ে তিউনিসিয়ার নাগরিকদের অনেক দিন থেকেই ক্ষোভ। বুআজিজির আত্মহত্যা যেন সেই ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বুআজিজির শরীরের আগুন যেন স্পর্শ করেছিল প্রতিটি তিউনিসিয়ান নাগরিকের হৃদয়ে। তিউনিসিয়ানদের এই চাপা ক্ষোভ আর বুআজিজি নিহত হওয়ার তাজা শোক ত্বরান্বিত করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ফলে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি বেন আলী তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি নেন এবং পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

মিশরের একনায়ক হোসনি মোবারকের পতন : তিউনিসিয়ার পর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মিশর। মিশরে প্রায় ৩০ বছর ধরে একনায়কতন্ত্রের শাসন পরিচালনা করে আসছিলেন হোসনি মোবারক। তিউনিসিয়া থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই হোসনি মোবারকের একক শাসনের বিরুদ্ধে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সমতার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে মিশরের জনগণ। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড সর্বপ্রথম আন্দোলন শুরু করে। কাঁপতে থাকে তাহরীর স্কয়ার। ফলশ্রুতিতে ১৮ দিনের গণবিক্ষোভে একনায়ক হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন। স্বৈরাচার পতন পরবর্তী দেশটির সেনাবাহিনী সংবিধান ও সংসদ বাতিল করে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। মিশরের জনগণ প্রথম দেখতে পায় গণতন্ত্র কী জিনিস। ব্রাদারহুডের ড. মোহাম্মদ মুরসি প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন কিন্তু সেই গণতন্ত্র আর বেশি দিন স্থায়ী হলো না। ২০১৩ সালেই বৈধ সরকারকে উৎখাত করে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি একটি ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে মুরসিকে জেলে আবদ্ধ করেন। বিক্ষোভরত শত শত ব্রাদারহুড কর্মীকে হত্যা করা হয়। অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

পতন হলো লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফির প্রায় একই সময়ে অন্যদিকে লিবিয়ার সাধারণ জনগণও দীর্ঘস্থায়ী একনায়ক মোয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। গাদ্দাফি আন্দোলনকারী জনগণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের হটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি বরং আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বিদ্রোহীদেরকে ইউরোপ ও আমেরিকা অস্ত্র সরবরাহ করে। ফলে লিবিয়াতে এটি একটি গৃহযুদ্ধের আকার ধারণ করে। এই অবস্থা দীর্ঘ নয় মাস চলার পর ২০ অক্টোবর গাদ্দাফি পরাজিত ও নিহত হন। তবে গাদ্দাফির আমলে মানুষ পারতপক্ষে না খেয়ে মরেনি। গাদ্দাফিকে হত্যা করা হলেও আজও ফেরেনি লিবিয়ার শান্তি। দলে-উপদলে বিভক্ত আজ লিবিয়ার জনগণ। যুদ্ধ যেন তাদের অবিচ্ছেদ্য নিয়তি। যেদিন জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে সেদিনই হয়তো লিবিয়ানদের এই নিয়তির কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে। সেখানে এখন আইএস, আল-কায়দার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী সদা তৎপর।

পতন হলো ইয়েমেনের স্বৈরশাসক সালেহ'র : ১৯৯৯ সালে ইয়েমেনে প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে তখন ইয়েমেনের ক্ষমতায় এসেছিলেন সালেহ। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সালেহ স্বৈরশাসক বনে চলে যান। কিন্তু ২০১১ সালের তিউনিসিয়ার আরব বসন্তের ঢেউ এসে পড়ে ইয়েমেনেও। অন্যান্য আরব দেশের স্বৈরশাসক বিরোধী আন্দোলনের মতো ইয়েমেনেও শুরু হয়েছিল সালেহ বিরোধী আন্দোলন। আন্দোলনের তোপে সালেহ পদত্যাগ করেন এবং উপ রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনসুর হাদি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তারপর আরব বসন্তের ফলাফল হিসেবে ২০১২ সালে ইয়েমেন একটি নির্বাচন পেল। ২০১২ সালের নির্বাচনে আবদুল্লাহ মনসুর হাদিই জয়লাভ করেন। কিন্তু উত্তর ইয়েমেনের শক্তিশালী শিয়া হুতিরা নির্বাচন বর্জন করে। এটিই ছিল ইয়েমেনে বর্তমানে চলমান গৃহযুদ্ধের ভিত্তি।

সিরিয়ায় শুরু হলো রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের : আরবের একমাত্র শাসক যার পতন ঘটাতে পারেনি আরব বসন্ত। আরব বসন্ত থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে সিরিয়ায় স্বৈরাচার বাশার আল আসাদকে উৎখাত করার জন্য সাধারণ জনগণ বিদ্রোহ শুরু করেছিল। বিদ্রোহীদের মার্কিনীরা অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়ে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। অপরদিকে যখন বাশার পরাজিত হওয়ার পথে তখনই তার পাশে এসে দাঁড়ায় রাশিয়া ও ইরান। ফলে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়। আরব বসন্তের হাওয়া সিরিয়ার মানুষদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে তো পারেইনি বরং কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার তাজা প্রাণ। আর বিনষ্ট করেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

আরব বসন্তকে কেন এখন বলা হচ্ছে আরব উইন্টার : দীর্ঘ একযুগ পর এখনো পুরোনো সমস্যাই আরব দেশগুলোতে বিরাজ করছে। আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় সরকার পরিবর্তন হলেও অবস্থার সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। অর্থনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। গণতন্ত্রের সুফলের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিভেদ বেড়েছে। দেশটিতে রাজনৈতিক শৃঙ্খলার বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং অন্তঃকোন্দলের কারণে দেশটি আজও অস্থিতিশীল। যেখানে মন্ত্রী পরিবর্তন হওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কাউকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে, কেউ আবার নিজের ইচ্ছায় সরে যাচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আরব বসন্তের নতুন নামকরণ করা হয়েছে 'আরব উইন্টার' বা শীতল আরব。

ইয়েমেন সংকট এবং তার ভবিষ্যৎ
দুই ইয়েমেনের একত্রিকরণ থেকে যেভাবে গৃহযুদ্ধের সূচনা : কেন সৌদি এখন যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দিচ্ছে? ইয়েমেন থেকে বের হয়ে পুনরায় আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে চাচ্ছে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। সম্প্রতি চলমান গৃহযুদ্বের অবসান ঘটাতে সৌদি যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবও দিয়েছে। তাই ইয়েমেন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান দক্ষিণ ইয়েমেনের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, হুতি বিদ্রোহীদের সাথে মনসুর হাদির দ্বন্দ্ব এবং সৌদি-ইরানের মধ্যে প্রক্সি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বুঝতে আমাদের একটু অতীত ইতিহাসে ফিরে যেতে হবে।

মানচিত্রে অবস্থান
একটু মানচিত্রের দিকে তাকালেই দেখবেন যে ইয়েমেনের পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর। এটি আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বাব এল মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বে সৌদি আরব এবং পূর্বে ওমান অবস্থিত। ভৌগোলিক এই অবস্থানের কারণেই ইয়েমেন আজ ভূরাজনীতির শিকার।

যেভাবে তৈরি হলো দক্ষিণ ইয়েমেন
ইয়েমেন মূলত উত্তর ইয়েমেন ও দক্ষিণ ইয়েমেন এই দুইভাগে বিভক্ত ছিল। এডেন উপসাগরের কাছাকাছি থেকে একটি ব্রিটিশ জাহাজের ধ্বংসাবশেষ চুরি হয়ে যাওয়ার অজুহাতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটেন এডেন বা ইয়েমেনের দক্ষিণাংশ দখল করে নিয়েছিল। সেই থেকে দক্ষিণ ইয়েমেন ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ নভেম্বর দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীনতা লাভ করে। দক্ষিণ ইয়েমেনে মার্ক্সবাদীদের উত্থান ঘটে। ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট প্রথমে দেশের নেতৃত্ব দেয়। পরবর্তীতে তা ইয়েমেন সোশ্যালিস্ট পার্টি হিসেবে রূপ ধারণ করে। সে-সময়ে দক্ষিণ ইয়েমেন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তা ও অন্যান্য সমর্থন লাভ করত।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর সৃষ্টি হয় উত্তর ইয়েমেনের : অপরদিকে সৌদি আরবের বর্ডার ঘেঁষে ইয়েমেনের উত্তরাংশ ১৫১৭ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। যা উত্তর ইয়েমেন হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯২৪ সালে এই উত্তর ইয়েমেন লাওসান চুক্তির মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত হয়। গোত্রীয় প্রতিনিধিত্ব অন্তর্ভুক্ত করে উত্তর ইয়েমেনে প্রজাতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ প্রতি গোত্র বা বংশ থেকে রিপ্রেজেনটেটিভ নিয়ে সরকার গঠিত হতো।

কায়রো চুক্তি : ১৯৭২ সালের অক্টোবরে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যে একটি লড়াই শুরু হয়। সৌদি আরব উত্তর ইয়েমেনকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ ইয়েমেনকে সমর্থন দিয়েছিল। দুই রাষ্ট্রকে একীভূত করার জন্য ১৯৭২ সালের ২৮ অক্টোবর কায়রো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দুই ইয়েমেনের একত্রিকরণ হয় যেভাবে : ১৯৮০ এর দশকের শেষদিকে দুই রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী এলাকায় তেল আবিষ্কারের পর একত্রিকরণের ব্যাপারে দুই পক্ষ আগ্রহী হয়। ১৯৯০ সালের দিকে পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানি একীভূত হওয়ার পর পরই উত্তর ইয়েমেন (আরব প্রজাতন্ত্র) এবং দক্ষিণ ইয়েমেন (গণপ্রজাতন্ত্রী ইয়েমেন) দেশ দুটি একত্রিত হয়ে ইয়েমেন রাষ্ট্র গঠন করে। উত্তর ইয়েমেনের সাবেক রাজধানী সানাকে রাজধানী করা হয়। দক্ষিণের জাতীয় সংগীতকে রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত নির্ধারণ করা হয়। সাবেক রাষ্ট্রসমূহের সকল চুক্তি ও দায় নতুন রাষ্ট্র গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু তাই বলে দেশটিতে বিভক্তি এড়ানো যায়নি। এখানে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব লেগেই ছিল; যা দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও দুর্বল করে দেয়। এই দক্ষিণ ইয়েমেন এখন আবার বের হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চাচ্ছে।

শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব থেকে গৃহযুদ্ধ: দেশটিতে ৬০ ভাগ সুন্নি ও ৪০ ভাগ শিয়া মুসলমানদের বসবাস। ইয়েমেনের উত্তরে শিয়া ধর্মাবলম্বী জাইদি সম্প্রদায়ের লোক বাস করে, যারা হুতি নামে পরিচিত। অন্যদিকে বরাবরের মতো দেশটির রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল সুন্নি গোষ্ঠী: যা শিয়ারা কখনই ভালোভাবে মেনে নেয়নি। ফলস্বরূপ ১৯৯৪ সালে ইয়েমেনে একটি গৃহযুদ্ধও সংঘটিত হয়।

অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন : ১৯৯৯ সালে ইয়েমেনে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ইয়েমেনের ক্ষমতায় আসেন আলি আবদুল্লাহ সালেহ। সালেহ দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে দেশ শাসন করেছিলেন। ২০১১ সালে যখন তিউনিসিয়ায় আরব বসন্ত শুরু হয়; তার ঢেউ এসে পড়ে ইয়েমেনে। অন্যান্য আরব দেশের স্বৈরশাসক বিরোধী আন্দোলনের মতো ইয়েমেনেও শুরু হয়েছিল সালেহ বিরোধী আন্দোলন।

আন্দোলনের তোপে সালেহ এর পদত্যাগ এবং উপ রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনসুর হাদির ক্ষমতা গ্রহণ : আলি আবদুল্লাহ সালেহকে অপসারণের জন্য ইয়েমেনে আন্দোলনের সূচনা হয়। আন্দোলনের মুখে পড়ে সালেহ উপ রাষ্ট্রপতি মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইয়েমেনের সংকট শুরু হয় মূলত তখন থেকেই। এরপর আরব বিশ্বের সব থেকে গরিব দেশটি আরও গরিব হতে থাকে। হাদি যখন খাদের কিনারা থেকে ইয়েমেনকে টেনে তুলতে চাচ্ছিলেন সেই পথে বাধা হয়ে হয়ে দাঁড়ান সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ। যেই হুতিরা এক সময় পূর্বের প্রেসিডেন্ট সালেহর বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল তারাই আবার সালেহর পক্ষ নিয়ে হাদির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এছাড়া হাদির প্রশাসনের এক অংশ তখনো সালেহর অনুগত ছিল। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ ছিল সালেহর অনুগত। তাই হাদি প্রশাসন কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাদি ও তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেন।

হুতিদের ক্ষমতা দখল : এই সুযোগে ২০১৪ সালে হুতিরা দেশটির রাজধানী সানা-সহ উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয়। কিন্তু দক্ষিণের ৪টি সুন্নি প্রধান প্রদেশ হুতিদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। এমন অবস্থায় হাদি সানা থেকে পালিয়ে গিয়ে এডেনে অবস্থান নেন এবং পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দেশটি পুনরায় দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় হুতিদের হাতে আর সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণের নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় প্রেসিডেন্ট হাদির হাতে। এখন হুতিরা চাচ্ছে দেশটিতে শিয়াদের আধিপত্য বিস্তার করতে আর সুন্নিরা চাচ্ছে হাদি সরকারকে。

আল-কায়দা ও আইএসের অনুপ্রবেশ : আর দেশটির এ অস্থিতিশীল অবস্থার সুযোগ নিয়ে দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠী (আল-কায়দা ইন দ্য অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা এবং ইসলামি স্টেট) দেশটিতে ঢুকে পড়ে। ইয়েমেনের আল-কায়দা বিশ্বের সব থেকে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন বলে ধারণা করা হয়। পুরো বিশ্বও এখন মোটামুটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে এক দল হুতিদের পক্ষে আর এক দল হাদির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এখানে আসলে সবাই সবার স্বার্থ দেখছে। পশ্চিমা বিশ্বও যাতে তাদের ভূরাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক স্বার্থ বজায় থাকে সেদিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। দেশটির অসহায় জনগণের কথা কেউ ভাবছে না। সৌদি আরবসহ আটটি সুন্নির দেশ (বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, জর্ডান, মরোক্ক ও সুদান) ইয়েমেনের হাদি সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স তারাও হাদিকে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে শিয়া প্রধান দেশ ইরান ও হিজবুল্লাহ অবস্থান নেয় বিদ্রোহী হুতিদের পক্ষে। এমনিতেই সুন্নি প্রধান সৌদি আরব এবং শিয়া প্রধান ইরানের মধ্যে বর্তমানে একটি প্রক্সি যুদ্ধ বিদ্যমান। তাই ইয়েমেনে তাদের বিপরীতমুখী অবস্থানকে অনেকে আঞ্চলিক ক্ষমতা দখলের লড়াই হিসেবেও দেখছেন।

কেন যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে সমর্থন দিচ্ছে?
০১. যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে অস্ত্র রপ্তানি করার মাধ্যমে। আর গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সেই অস্ত্রের বড় বাজার হলো সৌদি। সৌদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আধুনিক এই অস্ত্র ক্রয় করে ব্যবহার করছে হুতিদের বিরুদ্ধে।
০২. সৌদি যদি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা না পায় এবং মনসুর হাদিকে সাহায্য না করে তাহলে হুতিরা ইরানের সাহায্য নিয়ে ইয়েমেনের ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। যার কারণে এডেন উপসাগরে ইরান তার প্রভাব বিস্তার করবে।

ইয়েমেনে সৌদির হামলা: ২০১৫ সালে মার্চে হাদির সমর্থনে সৌদি আরব ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর সানায় সৌদি জোটের হামলায় ১৪০ জন নিহত হয়, আহত হন আরও ৬০০ জন। সৌদি আরব বরাবরই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান হোদাইদা বন্দর ব্যবহার করে হুতি বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ইরান শুরু থেকেই সৌদি আরবের এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। একই ভাবে সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রি করায় ইরান বরং পশ্চিমা দেশগুলোকে সমালোচনা করে আসছে।

সৌদি কেন মনসুর হাদিকে সমর্থন করছে?
প্রথমত, হুতিদের বসবাস সৌদির সীমান্ত ঘেঁষে উত্তর ইয়েমেনে। তাই তারা ক্ষমতায় আসলে সৌদির নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। দ্বিতীয়ত, এডেন উপসাগর বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখান থেকে ইরানের প্রাধান্য কমিয়ে মনসুর হাদিকে ক্ষমতায় বসিয়ে এই অঞ্চলের আধিপত্য সৌদিও নিতে চায়।

সৌদি কেন হঠাৎ ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে?
ইয়েমেনে যুদ্ধে বিরতির জন্য নতুন একটি শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরব। ২০২১ সালের ২২ মার্চ এই ঘোষণাটি দিয়েছিলেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। তার প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, জাতিসংঘের নজরদারিতে ইয়েমেনজুড়ে যুদ্ধবিরতি পালিত হবে এবং সানা বিমানবন্দরের পাশাপাশি জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির জন্য হোদায়দা সমুদ্রবন্দরও খুলে দেওয়া হবে। তবে সৌদির এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা।
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের অংশ হিসেবে প্রায় অর্ধযুগ আগে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দমনে একটি নিরন্তর যুদ্ধে নিজেদের জড়িয়ে ছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এ যুদ্ধে বিশ্ব দেখেছে ইতিহাসের অন্যতম করুণ মানবিক সংকট; যার ফলাফল হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ইয়েমেনের হাজার হাজার নিরীহ মানুষ এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক লাখ পরিবার। মাটির সাথে মিশে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সকল অবকাঠামো। জাতিসংঘের মতে, বিশ্বে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে ইয়েমেনে। দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষেরই জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এরপরও নতজানু হয়নি ইয়েমেনি বিদ্রোহীরা। এ অবস্থায় সৌদি আরব হঠাৎ যুদ্ধবিরতি কেন চাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সৌদি সরকারের এভাবে পিছু হটার পেছনে মূলত তিনটি কারণ প্রতীয়মান
০১. সৌদি আরব তাদের সবচেয়ে বড় মিত্র সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আর পাশে না পেয়ে চাপে পড়েছে। বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসেই সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করেছে। ইয়েমেনে মানবিক সংকট তৈরির অভিযোগে সৌদি আরবে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে ইতালি, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোও। ফলে বহির্বিশ্বে শক্ত সমর্থন ছাড়া সৌদির পক্ষে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
ছয় বছর ধরে যুদ্ধ করে সৌদি সরকার হয়তো অনুধাবন করছে, ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের এভাবে দমন করা সহজ নয়। এতদিন হামলার শিকার হওয়া হুতি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি রিয়াদ-সহ সৌদির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাল্টা হামলা শুরু করেছে। তাছাড়া, সৌদি আরবের জন্য যুদ্ধের ব্যয়ভারও অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দেওয়ার পরপরই সৌদি পুনরায় ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি মুখে মুখে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছে আবার একইসাথে বিমান হামলাও চালাচ্ছে। তাই হুতি বিদ্রোহীরা বলছে সৌদির এধরনের প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। তাই ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আদৌ বন্ধ হবে কি না বলাটা অনিশ্চিত।

শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে করে তুলেছে জটিল থেকে জটিলতর!
এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় যেটি সেটি হচ্ছে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। সারাবিশ্বের মোট মুসলমানদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিমই সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী। আর বাকি ২০ শতাংশ মুসলিম শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী। ইরান, ইরাক, বাহরাইন ও আজারবাইজানে শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এছাড়াও লেবানন, ইয়েমেন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ভারতে রয়েছে কিছু শিয়া মুসলমানদের বসবাস। অপরদিকে মরক্কো থেকে শুরু করে, সৌদি আরব, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া-সহ প্রায় ৪০টি দেশে সুন্নি মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া এই মতবাদ একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেশে দেশে তৈরি করেছে গভীর ও অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক সংকট।
ইসলামে মুসলিমদের মধ্যে কোনো ভাগ নেই বরং যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তারা সবাই এক। ইসলাম, কুরআন বা হাদিস কোথাও শিয়া-সুন্নি এর কথা নেই। ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা মুসলিম হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ঐতিহাসিক কারণে মুসলমানরা দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি হলো শিয়া এবং অপরটি সুন্নি। যুগের ধারাবাহিকতায় শিয়া মুসলিমদের মধ্যেও আবার কিছু দল উপদল রয়েছে। একই ভাবে সুন্নি মুসলিমদের মধ্যেও কিছু দল উপদল রয়েছে। অথচ শুধু কয়েকটি বিষয় ছাড়া ইসলামের অধিকাংশ মৌলিক বিষয়েই এরা প্রায় একমত। যেমন- উভয় দলই বিশ্বাস করে আল্লাহ এক, অভিন্ন ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পবিত্র কুরআনকেই মানে এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে সর্বশেষ নবী হিসেবেই বিশ্বাস করে। উভয় দলই মৃত্যু পরবর্তী পরকালের জীবন ও বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস করে। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ও নারীদের পর্দা করা যে ফরজ এসব মৌলিক বিষয়-সহ আরও অনেক বিষয়েই দুই শাখার মুসলিমরা একমত। তাহলে কেন মুসলমানদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি নামে দুটি উপদল বের হলো? শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বটি বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে মুসলমানদের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে (৭ম শতাব্দীতে) মহানবীর ওফাতের (মৃত্যুর) পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব কে দেবেন, কে হবেন মুসলমানদের নেতা সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মহানবী (স.) এর তিনজন পুত্র সন্তান জন্ম নিলেও তারা সবাই অল্প বয়সেই মারা যায়। প্রথমত, তিনজন পুত্র সন্তানের সবাই মারা যাওয়ার কারণে মুহাম্মদ (স.) এর কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী ছিল না। দ্বিতীয়ত, মহানবী জীবিত থাকাকালীন কাউকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাননি যিনি তার পরবর্তী সময়ে মুসলিম উম্মাহের নেতৃত্ব দেবেন। তাই তাঁর ওফাতের পর অনুসারী বা সাহাবিদের মধ্যে নেতা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
তখন মুহাম্মদ (স.) এর বেশির ভাগ অনুসারীই চেয়েছিলেন তাদের মধ্য থেকে যাদের সবচেয়ে বেশি ইসলামি জ্ঞানে পাণ্ডিত্য রয়েছে, যাদেরকে মুসলমানরা তাদের নেতা হিসেবে মেনে নেবে এমন কিছু সাহাবিদের থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে একজনকে মুসলিম উম্মাহের নেতা বা খলিফা নির্বাচন করা হোক। অপর দিকে কিছু সাহাবির ইচ্ছে ছিল মুহাম্মদ (স.) এর পরিবারের কাউকে মুসলিম উম্মাহর নেতা বানানো হোক। যেহেতু অধিকাংশ অনুসারীই চাচ্ছিলেন নির্বাচনের মাধ্যমে খলিফা বানানো হোক, তাই পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলমানদের খলিফা নির্বাচিত হলেন হযরত আবু বকর (রা.)। আবু বকর (রা.) এর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় খলিফা হলেন হযরত ওমর (রা.)। তৃতীয় খলিফা হলেন হযরত ওসমান (রা.)। তারপর ওসমান (রা.) এর মৃত্যুর পর চতুর্থ খলিফা হলেন হযরত আলী (রা.)।
উল্লেখ্য, আলী (রা.) ছিলেন হজরত মুহাম্মদ (স.) এর পরিবারের। খলিফা হওয়ার পর ৬৬১ সালে হজরত আলী (রা.) এক আততায়ীর হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। খোলাফায়ে রাশেদীন তথা আবু বকর এবং ওমর (রা.) খলিফা নির্বাচনে কোনো ধরনের বিপত্তি ঘটেনি। শুধু ওসমান এবং আলী (রা.) সময় শুধু কে হবেন ৩য় খলিফা তা নিয়ে ওসমান এবং আলী (রা.) এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল কিন্তু তাদের মধ্যে কখনো বিরোধ ছিল না। হজরত আলী (রা.) এর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কিছু বিষয় জটিল আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক সেই ঘটনাও মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্বকে আরও ত্বরান্বিত করে। খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলেও সেটি আসলে দ্বন্দ্বের পর্যায়ে পৌঁছাত না, তার আগেই সমাধান হয়ে যেত। তখন অনেক ইহুদি মিথ্যা মুসলিম সেজে প্রায়ই মুসলমানদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করত কিন্তু কখনো সফল হয়নি। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে মুসলমানদের মধ্যে মূলত দ্বন্দ্বটি প্রকটভাবে প্রস্ফুটিত হয়। তাই আব্বাসীয় সময়টিকে অনেকে বিশৃঙ্খলার যুগ হিসেবে উল্লেখ করে। মূলত আব্বাসীয় শাসনামল থেকেই মুসলমানরা স্পষ্ট দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সময় যত গড়ায় মুসলমানরাও তাদের আদর্শ থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। সেই দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় মুসলমানরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি শিয়া, অপরটি সুন্নি। অনেকে শিয়া ও সুন্নি দ্বন্দ্বের সূচনা বোঝাতে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলকে টার্গেট করলেও সেটি আসলে সঠিক নয়। দ্বন্দ্বের সূচনা মূলত আব্বাসীয় শাসনামল থেকে।

ইরান যেভাবে শিয়া রাষ্ট্র হলো?
১৫ শতকের দিকে ইরান (পারস্য) ছিল একটি সুন্নিপ্রধান ভূখণ্ড এবং জ্ঞানচর্চার সূতিকাগার। তবে ১৬ শতকে আজেরি (আজারবাইজানি তুর্ক) গোত্রের শাসকরা এই ভূখণ্ড দখল করে নেয়। তারা ইরানে এসে সাফাভিদ রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। সাফাভিদ রাজবংশ ছিল মূলত শিয়া ধর্ম মতাবলম্বী। তাদের আদর্শিক জায়গা থেকে ইরানকে সুন্নিপ্রধান একটি অঞ্চল থেকে শিয়াপ্রধান অঞ্চলে পরিণত করে। তাদের সময়কাল থেকে ইরান হয়ে ওঠে শিয়াদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ইরানের এই আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক সময় সাফাভিদরা সামরিক শক্তিরও প্রয়োগ ঘটান। সেই আজেরি্দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সাফাভিদ রাজবংশের সিসিলিয়া তুর্কিদেরই একটি শাখা। তুরস্কের পূর্বাঞ্চল থেকেই তারা ইরানে এসেছিল। তুরস্ক এবং ইরানের ঐতিহাসিক সম্পর্কটি মূলত এখানেই। এই সাফাভিদরাই পশ্চিমের সুন্নি উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে এবং সুন্নি মুঘল মুসলিমদের থেকে পারস্যকে আলাদা করেছিল।

সবশেষে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব
শিয়া-সুন্নি এই দুপক্ষের দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার মধ্যমে। এই বিপ্লব সারা বিশ্বের ছড়িয়ে থাকা শিয়াদের জন্য একটি নবজাগরণ হিসেবে কাজ করে। ঐতিহাসিকভাবে চলমান শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বটি এই বিপ্লবের মাধ্যমেই নতুন মাত্রা পায়। এরপর ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি যুদ্ধের ময়দানে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বটি অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে শিয়া মুসলিমরা চাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল তাদের আয়ত্তে নিয়ে একটি "Greater Iran" বা একটি "Greater Parisian State" গঠন করতে। ইসলামের এই দুটি অনুসারীদের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অন্তঃকোন্দলের কারণে একুশ শতকেও তারা বারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। নব্বই এর দশকে সুন্নি নেতা সাদ্দাম হোসেনের উত্থানে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব আরও বেশি প্রকট হয়। যার ফলাফল হিসেবে সুন্নি নেতা সাদ্দাম হোসেনের সাথে শিয়া শাসিত ইরানের একটি যুদ্ধও হয়েছে। সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে এই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। বাশার আল আসাদের প্রতি ইরানের সমর্থন থাকার পেছনে এটাও একটি অন্যতম কারণ। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্থান হয়েছে আইএস ও আল-কায়দার মতো বিভিন্ন জিহাদি ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন-সহ বিভিন্ন জায়গায় শিয়া সুন্নি একে অপরের বিরুদ্ধে আজ সংঘাতে লিপ্ত। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি অন্যতম শক্তি সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলমান সেখানেও তেল ঢেলেছে এই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব।
আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকীকরণ আরও প্রকট হতে পারে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ইত্যাদি দেশগুলো বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও এই দেশগুলোতে রয়েছে গোষ্ঠীতন্ত্র। একই পরিবারের সবাই কালক্রমে আমির, রাজা বা খলিফা ইত্যাদি হয়। তাই রাজনীতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে এই দেশগুলোতে। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে। তবে তাদের মাঝে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান কিছুটা ব্যতিক্রম। যদিও তিনি যেসব রাজনীতিবিদদের কাছে ধর্ম একটি রাজনীতির অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয় মূলত স্ট্রং অটোক্রেটিক রোলে চলে গিয়েছেন। তবে এরদোয়ানের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে, তিনি তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে যতটা সম্ভব ইসরায়েল ও আমেরিকার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে সফল হয়েছেন। এর জন্য তিনি অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন। কারণ ভৌগোলিকভাবে মুসলিম সভ্যতার একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দেশটি। ইউরোপের দেশগুলো তুরস্ককে তুরস্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় অবস্থিত। ইউরোপিয়ান খ্রিষ্টবাদ আর এশিয়ান হিসেবে কাজ করে তুরস্ক। ফলে ইউরোপের কাছে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতিক্রম করে এশিয়ায় আসতে হয়। ইউরোপীয় দেশগুলো এবং এশিয়ার মধ্যকার সংযোগস্থল ইরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তাই সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, ইরাকের মতো তুরস্ককেও আয়ত্তে নিতে পারলে ইউরোপীয়দের লাভ। কিন্তু এরদোয়ান সেটা হতে দেননি। আর এটিই পশ্চিমাদের জন্য বিশাল মাথাব্যথার কারণ।

সিরিয়া সংকট এবং এর সমাধান
১ম পর্ব: কীভাবে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সূচনা হলো? কেন সিরিয়া পরিণত হলো ভূরাজনীতির প্লে- গ্রাউন্ডে? কে লড়ছে কার বিরুদ্ধে? কেন এই যুদ্ধ 'Endless War'এ রূপ নিয়েছে?
২০২১ সালের ২৬ মে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সিরিয়াতে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারপর থেকেই সিরিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল সিরিয়ায় আয়োজিত দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই পর্বে আলোচনা করব সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সূচনা কীভাবে এবং কেন সিরিয়া ভূরাজনীতির প্লে-গ্রাউন্ডে পরিণত হলো তা নিয়ে। সিরিয়াতে চলমান এই সংকটটি বুঝতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই আরব বসন্তে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, সিরিয়ায় হয়তো আরব বসন্তের প্রভাব পড়বে না। অবশ্য তার পেছনে কারণও ছিল। প্রথমত, দেশটিতে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় বাসার আল-আসাদের বাথ পার্টি। পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করে নিয়েছিল বাথ পার্টি। দ্বিতীয়ত, বাশারের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কায়েমে অনেক সুন্নি মুসলিমেরও সমর্থন ছিল। পরবর্তীতে দেখা গেল আরব বসন্তের হাওয়া সিরিয়াতেও লাগল। ২০১১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ দেখা দেয়। তবে তা ছিল অন্যান্য আরব দেশগুলোর তুলনায় ছোট ও বিচ্ছিন্ন। একনায়ক বাশার আল আসাদ তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে থাকেন।

যেভাবে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত: আসাদ বিরোধী আন্দোলনের কারণে চারজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে সরকারি বাহিনী। দেশটির ডেরা শহরের এ ঘটনার প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সিরিয়ার জনগণ। সেখানে সরকারি বাহিনী আসাদের নির্দেশে ব্যাপকভাবে গুলি ছোড়ে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী মারা যান। তারপর সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। একপর্যায়ে আন্দোলনরত জনগণের সাথে একাত্মতা পোষণ করে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর এক অংশ এবং তারাও সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাত শুরু করে। এটি থেকেই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত।

যেভাবে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে: পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে বাশার আল-আসাদ ট্যাংক, আর্টিলারি এবং হেলিকপ্টার গানশিপ সহকারে দেশব্যাপী অপারেশন চালাতে থাকে। মাত্র তিন মাসে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়। বিদ্রোহীরাও হয়ে উঠতে থাকে আরও শক্তিশালী। এরপরের ঘটনাপ্রবাহ এতই জটিল, সঠিক হিসাব রাখা মুশকিল। সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, শহর দখল, সেই দখল থেকে আবার মুক্ত, আবার পুনর্দখলের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে বছরের পর বছর। নিহত হয় লাখ লাখ মানুষ, শরণার্থী হয়ে দেশ ত্যাগ করতে থাকে হাজারো সাধারণ জনগণ।

বিদ্রোহীরা গঠন করে ফ্রী সিরিয়ান আর্মি এই বিদ্রোহীদের মাঝেও রয়েছে নানা দল- উপদল। বিদ্রোহীরা প্রথমে অগোছালো থাকলেও ধীরে ধীরে বাইরের সমর্থনে সংগঠিত হয়। তারা একত্র হয়ে একটি সংগঠিত ফোর্স গঠন করে। যার নাম দিয়েছে "ফ্রি সিরিয়ান আর্মি"। পশ্চিমাদের পূর্ণ সমর্থন পায় বিদ্রোহীরা। অন্যদিকে রাশিয়া সব বিষয়ে বাশার আল-আসাদকে সহোযোগিতা করতে থাকে। শিয়া রাষ্ট্র ইরান ও ইরাক এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ বাশার আল-আসাদের পক্ষ নেয়। অন্যদিকে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ তুরস্ক, কাতার এবং সৌদি আরব আসাদবিরোধীদের সমর্থন করে। এভাবে সিরিয়া পরিণত হয় ভূরাজনৈতিক এক প্লে- গ্রাউন্ডে।

বিদ্রোহীরা দখল করতে থাকে একের পর এক শহর: ১৯৮২ সালে বাশারের পিতা হাফিজ আল আসাদ মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর সামরিক অভিযানের আদেশ দিয়েছিলেন। সেই অভিযানে ব্রাদারহুডের হাজারো কর্মী নিহত হয়। সেই পুরোনো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্রাদারহুডের কর্মীরাও বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে গিয়ে ফ্রি সিরিয়ান আর্মিতে যোগ দেয়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে তুরস্ক "ফ্রি সিরিয়ান আর্মি" কে সরাসরি মদদ দেয়। ২০১১ সালের অক্টোবরে বিদ্রোহীরা বাশার আল আসাদের সেনাবাহিনীর উপর ট্যাংক এবং হেলিকপ্টার সহযোগে প্রথম হামলা চালায় কোম শহর দখল করার জন্য। এরপর থেকে ফ্রি সিরিয়ান আর্মি দেশের অনেক অংশ দখল করে। বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায় আলেপ্পোর মতো বড় বড় শহরগুলো। দেশের নানা অংশে নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে বাশার আল আসাদ।

একমাত্র সিরিয়া ছিল আরব বিশ্বে রাশিয়ার পা রাখার জায়গা: কিন্তু বিদ্রোহীরা তাদের এই দাপট বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। ২০১৫ সালে আসাদের পক্ষ নিয়ে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ পাল্টে দেয় সকল হিসেব-নিকেশ। আসাদের জন্য সামরিক উপদেষ্টাও নিয়োগ করে রাশিয়া। তখন আরব বিশ্বে সিরিয়া ছাড়া রাশিয়ার আর ভালো কোনো বন্ধু রাষ্ট্র ছিল না। সিরিয়া ব্যতীত মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার পা রাখার মতো কোনো জায়গাও ছিল না। তাই সিরিয়াকে বলা হয় রাশিয়ার ফুটহোল্ড (Foothold) বা পা রাখার জায়গা।

কেন রাশিয়া বাশার আল আসাদের পক্ষ নিল? আরব বিশ্বে রাশিয়ার সবচেয়ে ভালো ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাশার আল আসাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার লক্ষ্যে এবং সিরিয়ায় রাশিয়ার মিলিটারি ঘাঁটি তৈরি করে আরব বিশ্বের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে, রাশিয়া অস্ত্র সাপ্লাই দিয়ে আসাদের পাশে দাঁড়ায়। আসাদ সরকার সাধারণত ট্যাংক, বোমা, মিসাইল এসব দিয়ে বিদ্রোহীদের দখলকৃত জায়গায় আক্রমণ করত। ট্যাংক-মিসাইলের প্রভাব বেশিদিন থাকত না। আক্রমণের সময় বিদ্রোহীরা ঐসব অঞ্চল থেকে কিছুদিনের জন্য পালিয়ে যেত কিন্তু আক্রমণের পর বিদ্রোহীরা পুনরায় এসব জায়গায় একত্রিত হয়ে কার্যক্রম চালাত।

রাশিয়ার সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়াল বাশার আল আসাদ: তারপর ২০১৫ সালে রাশিয়া ও আসাদ মিলে ক্যামিক্যাল/বায়োলজিক্যাল ওয়েপন্স ব্যবহার করে আক্রমণ চালাতে শুরু করে যেন বিদ্রোহীরা পুনরায় সরকারের দখলকৃত জায়গায় একত্রিত না হতে পারে। কেননা এসব রাসায়নিক অস্ত্রের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্রের কারণে একটি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। রাশিয়া সিরিয়ার বিদ্রোহীদের উপর সরাসরি বিমান থেকে বোমাবর্ষণ শুরু করে। রুশদের সহায়তায় একে একে দামেস্কের বড় অংশ ও আলেপ্পো শহরে নিজেদের হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় বাশার আল আসাদ।

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সিরিয়াতে তার প্রবেশ নিশ্চিত করে: আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি সাধারণ বিষয় হলো রাশিয়া যেখানে আমেরিকাও সেখানে। রাশিয়া যাকে সমর্থন করে আমেরিকা তার বিরুদ্ধে অবস্থান করে। যেহেতু রাশিয়া বাসার আল আসাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেহেতু আমেরিকা বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা শুরু করে। সিরিয়ার এই অস্বাভাবিক যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষাপটে সেখানে আইএস এর মতো অনেক জঙ্গি গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। সেই জঙ্গি গোষ্ঠী দমনের নামে বারাক ওবামার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াতে প্রবেশ করে। উল্লেখ্য, "সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি" অধ্যায়ে এ নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

সিরিয়াকে যে-কারণে ইরানের খুবই প্রয়োজন: লেবাননে একটি রাজনৈতিক দল রয়েছে, যার নাম হিজবুল্লাহ। প্যালেস্টাইন এবং ইসরায়েলের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলছে সেখানে লেবাননের রাজনৈতিক দল হিজবুল্লাহ প্যালেস্টাইনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। এই হিজবুল্লাহকে আবার অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে ইরান। হিজবুল্লাহ আর ইরান মিলে ইসরায়েলকে বশে রাখতে চাচ্ছে। তাই ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সহায়তা দিতে যে রাস্তা দিয়ে যেতে হয় সেটা হলো সিরিয়া। লেবাননে পৌঁছাতে ইরানকে সিরিয়ার রুট ব্যবহার করতে হয়। তাই ইরানের সিরিয়াকে প্রয়োজন। এই প্রয়োজন থেকেই ইরান সিরিয়ার বাসার আল আসাদের পক্ষ নেয়। তাছাড়াও ইরান মনে করেছিল, সিরিয়ায় আসাদের পতন ঘটলে, সে তার মিত্র হারাবে।

যেভাবে সিরিয়া পরিণত হলো প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে এবং এখন কে কার বিরুদ্ধে লড়ছে? প্রথমত, ইরান হিজবুল্লাহকে সহায়তা করছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়তে, দ্বিতীয়ত, ইরান বাসার আল আসাদের পক্ষে। তাই ইসরায়েল আসাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও ইসরায়েল সবসময় আমেরিকার সাথে। আমেরিকা যেদিকে ইসরায়েল সেদিকে। তারপর থেকেই সিরিয়ার যুদ্ধ সরকার বনাম বিদ্রোহীদের মধ্যে না থেকে এই যুদ্ধ রূপ নেয় প্রক্সি যুদ্ধে। একপক্ষে রয়েছে আমেরিকা, ইসরায়েল, সৌদি, তুরস্ক, আইএস, মুসলিম ব্রাদারহুড ও সিরিয়ার বিদ্রোহী মিলিটারি। অন্যপক্ষে রয়েছে বাসার আল আসাদ, রাশিয়া, ইরান, ইরাক, হিজবুল্লাহ।

২য় পর্ব: কেন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল? সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সমাধান কী হতে পারে?
সবচেয়ে জটিল একটি বিষয় হচ্ছে সিরিয়ার এই যুদ্ধে কারা পক্ষে এবং কারা বিপক্ষে এটি নির্দিষ্ট করে বলা যায়না। কেননা যারা এখন পক্ষে কিছুদিন পর দেখা যায় তারাই আবার বিপক্ষে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজ হবে।
উদাহরণ-০১
আইএসের হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছিল। আইএস ও আমেরিকা উভয়েই একসাথে বাশার আল আসাদের বিপক্ষে লড়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো জোটের মাধ্যমে জঙ্গি দমনের নামে সেই আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।
উদাহরণ-০২
ইরাক ও সিরিয়ার উত্তরে কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় আইএস তাদের তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তাই কুর্দিরা চায়নি তাদের অঞ্চলগুলো আইএসের দখলে চলে যাক। তাই তারা আইএসদের বিরুদ্ধে লড়ছে। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের সব রকমের সহায়তা করেছিল। আইএস উৎখাতের পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসে কুর্দিদের সকল ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। তাই কুর্দিরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপর ক্ষুব্ধ।
উদাহরণ-০৩
তুরস্ক ন্যাটো জোটভুক্ত দেশ। ন্যাটো জোটের বাহিনীরা যখন এখানে আইএস দমন করতে আসে তখন তুরস্ক চেয়েছিল কৌশলে ন্যাটো জোটকে ব্যবহার করে উত্তর সিরিয়ার কুর্দিদের দমন করতে। সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যবর্তী সীমানায় কুর্দিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সিরিয়ার কুর্দিরা চাচ্ছে সিরিয়া থেকে বের হয়ে একটি স্বাধীন "কুর্দি রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে তুরস্কে বসবাসরত কুর্দিদের পিকেকে (PKK) নামে একটি সংগঠন আছে। তুরস্কের দাবি, সিরিয়ার কুর্দিরা পিকেকের কুর্দিদের সঙ্গে যুক্ত। পিকেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীনতার জন্য তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। দেশটিতে পিকেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তুরস্ক যখন সিরিয়ার এই কুর্দিদের উপর আক্রমণ শুরু করে তখন কুর্দিদের একটি অংশ যারা পূর্বে বাশার আল আসাদের বিরোধিতা করেছিলেন তারাও সাময়িক সময়ের জন্য আসাদের পক্ষ নেয়।

এবার আসি সমাধান নিয়ে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা কিংবা একটি সমাধানে পৌঁছাতে একেক রাষ্ট্র একেক রকমের মতামত দিচ্ছে। একেক রাষ্ট্র একেক রকমের সমাধান দিচ্ছে:
১. সিরিয়া: বাশার আল আসাদ চাচ্ছে আরব বসন্তের পূর্বে আসাদের যে-রকম ক্ষমতা ছিল ঠিক সেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে। একটি সাক্ষাৎকারে আসাদ বলেছেন ক্ষমতার ব্যাপারে তিনি কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তার মতে গৃহযুদ্ধের সমাধান হিসেবে বিদ্রোহীদের উচিত আসাদকে মেনে নেওয়া। কিন্তু অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র আসাদের এই সমাধান মেনে নিতে নারাজ।
২. যুক্তরাষ্ট্র: সিরিয়া সংকট সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী চাচ্ছে সেটি বলা মুশকিল। এই গৃহযুদ্ধ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের মত হলো বাশার আল আসাদকে হটিয়ে নতুন করে নির্বাচনের মাধ্যমে অন্য কেউ ক্ষমতায় আসুক। তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। আমেরিকা মূলত চাচ্ছে তাদেরই মদদপুষ্ট কেউ একজন ক্ষমতায় আসুক। রাশিয়া কোনোভাবেই চাচ্ছে না আসাদ ছাড়া নতুন কেউ ক্ষমতায় আসুক। কেননা আসাদ না থাকলে রাশিয়ার আরব বিশ্বে পা রাখার মতো আর জায়গা থাকবে না।
০৩. রাশিয়া: সমাধানের জন্য রাশিয়ার মত হলো বাশার আল আসাদই ক্ষমতায় থাকবে কিন্তু সিরিয়ার বড় বড় অঞ্চলগুলো কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, অঞ্চলগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত। সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান ও নৌঘাঁটি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক শক্তি অটুট রাখতে রাশিয়া আসাদকেই চায়। কিন্তু রাশিয়ার এই সমাধানে তুরস্ক সন্তুষ্ট নয়।
০৪. তুরস্ক: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্ক ও রাশিয়া পরস্পরের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এই দুটি দেশ অধিকাংশ সময়ে এক বলয়ে থাকলেও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের শুরুতে তুরস্ক বাশার আল আসাদের বিপক্ষে এবং রাশিয়া আসাদের পক্ষে দাঁড়ায়। সিরিয়া ইস্যুতে এখন আবার তুরস্ক কিছুটা রাশিয়ার সাথে। তবে একটি বিষয়ে তুরস্ক রাশিয়ার সাথে অমিল। সমাধানের ব্যাপারে তুরস্কের মত হলো বড় বড় অঞ্চলগুলোতে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া যাবে না। সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্কের মূল লক্ষ্য কুর্দিদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা। তুরস্ক চায় না কুর্দিরা নতুন এলাকার নিয়ন্ত্রণ পাক। তাছাড়া যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা যেন কোনোরকম স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ না পায়। কেননা কুর্দি অঞ্চল যদি স্বায়ত্তশাসনের অধীনে চলে যায় তাহলে এই কুর্দিরা আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং তাদের কার্যক্রম আরও তৎপর হবে যা তুরস্কের জন্য বড় থ্রেট। সেজন্যই কুর্দি অধ্যুষিত ছিটমহল আফরিনে আক্রমণ করেছে তুরস্ক। তুর্কিদের দাবি, তারা সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে আফরিন আক্রমণ করেছে।
০৫. ইরান: ইরানও চাচ্ছে আসাদকে ক্ষমতায় রেখেই সমাধান হোক। সেই ২০১২ সাল থেকে তেহরান আসাদ সরকারকে বিশাল পরিমাণে সামরিক সাহায্য ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে আসছে। ইরান সিরিয়াতে তার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি শিয়া মিলিশিয়াদেরও মোতায়েন করেছে। তাছাড়া ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহও আসাদ সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক। ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সিরিয়া সবসময় ইরানের পাশে থেকেছে। তাছাড়া লেবাননে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র পাঠাতে সিরিয়া দিয়ে যেতে হয় ইরানকে। তাই আসাদকেই ক্ষমতায় রাখতে চায় ইরান। ঠিক এই কারণেই সিরিয়া ইস্যুতে পরাশক্তিগুলো একক সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধও বন্ধ হচ্ছে না。

তুরস্কের ভয়টা আসলে কোথায়?
ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ঘরে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে যুক্তরাষ্ট্র দেখল যে ইসরায়েলের অস্তিত্ব নিয়ে তাদের আর কোনো টেনশন নেই। অর্থনৈতিক, মিলিটারি ও প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে ইসরায়েল এখন মাথা উঁচু করে নিজের শক্তিবলে পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে। ঠিক এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরেকটা বিরাট সুযোগ আসলো। যুক্তরাষ্ট্র দেখল যে "সিরিয়ার সীমানা ঘেঁষে তুরস্কের কুর্দিরা (PKK) তুরস্ক থেকে আলাদা হতে চাচ্ছে এবং একই ভাবে "তুরস্কের সীমানা ঘেঁষে সিরিয়ার কুর্দিরা" সিরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠন করতে চাচ্ছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র মনে করল এই কুর্দিদের যদি আমরা সহায়তা করি এবং তাদের দিয়ে যদি সিরিয়া ও তুরস্কের মাঝখানে একটি কুর্দি রাষ্ট্র গঠন করাতে পারি তাহলে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় ইসরায়েল। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড় হচ্ছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কুর্দি রাষ্ট্র তৈরি করার ধারণটি এরদোয়ান শুরুতেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। যে-কারণে তিনিও কুর্দিদের প্রতি শুরু থেকে সচেতন। যুক্তরাষ্ট্র ও কুর্দিরা যেখানে কুর্দি রাষ্ট্র তৈরি করতে চাচ্ছে সেখানে তুরস্ক "Safe Zone" তৈরি করে রেখেছে। এরদোয়ানের বিচক্ষণতার কারণে ওবামা ও ট্রাম্প প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। ট্রাম্প পিরিয়ডে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী সিরিয়ায় এসেছিল কুর্দিদের সাথে এক হয়ে আইএস দমন করতে। তুরস্কও কিন্তু ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র। কুর্দিদের সাহায্য করতে আসা সেই ন্যাটো বাহিনীকে তুরস্ক কৌশলে ব্যবহার করেছিল কুর্দিদেরই দমন করতে।
অনেকে মনে করছেন, এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমাতে ও তুরস্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এরদোয়ান যা করছে সেটা প্রশংসনীয়। আবার অনেকে মনে করছেন কুর্দিরাও তো মুসলমান এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র থাকা তাদের অধিকার। তাই এরদোয়ানের সশস্ত্র হামলাকে তারা ভালো চোখে দেখছে না। আসলে এই কুর্দি রাষ্ট্র ও কুর্দিদের উপর এরদোয়ানের সশস্ত্র হামলা নিয়ে ওয়ার্ল্ড পলিটিক্সে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কটি নিয়ে একটু অধ্যায়ে আলোচনা করব। এখন প্রশ্ন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি কুর্দি রাষ্ট্র গঠন হলে যুক্তরাষ্ট্রের কী লাভ? প্রথমত, তুরস্কের ঘাড়ে বসে এই অঞ্চল থেকে খুবই সহজে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়ত, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি ঘাঁটি বসিয়ে ইরানকে কাছ থেকে নজরদারি করতে পারবে। তৃতীয়ত, কুর্দি মিলিশিয়াদের কাছে অস্ত্র রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ ফরেইন রিজার্ভ অর্জন করা।

আসাদ ও বিদ্রোহীদের কারোই সক্ষমতা নেই এককভাবে কর্তৃত্ব করার
বিদ্রোহীদের মধ্যে বর্তমানে সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক নেতা নেই। তাছাড়া ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিগুলো সিরিয়া ইস্যু থেকে নিজেদেরকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে। বিদ্রোহীদের আধিপত্যও আস্তে আস্তে সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বিদ্রোহীদের পক্ষে সিরিয়ার ক্ষমতায় বসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ সিরিয়া দখল করে ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আসাদ সরকারকে ইরান, রাশিয়া ও হিজবুল্লাহ সহায়তা করলেও আসাদের পক্ষে পুরো দেশে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো লোকবলের সংকট দেখা দিয়েছে। সিরিয়াতে বর্তমানে এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে যেখানে আসাদের ক্ষমতা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা। সেসব এলাকায় আসাদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী রাশিয়া ও ইরানের মতো বিদেশি শক্তিগুলো। তাই এখন বিশ্লেষকরা বলছেন মন্দের ভালো হিসেবে সিরিয়ার এই যুদ্ধের সমাধান দুইটি উপায়েই হতে পারে। এক. আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো সিরিয়া থেকে তাদের সকল সেনা সরিয়ে নেবে। দুই. বাসার আল আসাদকে ক্ষমতায় রেখে অন্য সব অঞ্চলগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া। কেননা বিদ্রোহীদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং তারা কয়েকটি ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত। এখন তাদের থেকে একজন প্রেসিডেন্ট হলে অন্যরা আবার বিদ্রোহ করবে।

কোন দিকে মোড় নিচ্ছে কুর্দি সংকট
বলা হয়ে থাকে শুধু পাহাড় পর্বত ছাড়া কুর্দিদের কোনো মিত্র নেই। ভূরাজনৈতিক সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর মধ্যে কুর্দি সংকট একটি। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার পাঁচটি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে বিশাল কুর্দি জনগোষ্ঠী। এই পাঁচটি দেশ হচ্ছে তুরস্ক, ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও আজারবাইজান। তবে তুরস্কে সবচেয়ে বেশি কুর্দি বসবাস করে। আধুনিক তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বে (তুর্কি কুর্দিস্তান), সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে (সিরীয় কুর্দিস্তান), ইরাকের উত্তরে (ইরাকি কুর্দিস্তান), ইরানের উত্তর-পশ্চিমে (ইরানি কুর্দিস্তান) এবং আর্মেনিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু অঞ্চলেও কুর্দিরা বসবাস করছে। পাঁচটি দেশ জুড়ে কুর্দি বসবাসকারী এই অঞ্চলটিকে বলা হয় “কুর্দিস্তান”। প্রায় দুই কোটি চল্লিশ লক্ষ কুর্দি এই দেশগুলোতে বসবাস করছে। তাছাড়া ইউরোপের জার্মানিতে অভিবাসী হয়ে পনেরো লক্ষ কুর্দি বসবাস করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস হলেও এরা জাতিতে আরব নয়। তারা বরং জাতিতে কুর্দি, তাদের ভাষাও কুর্দি, ধর্মের দিক থেকে সুন্নি মুসলিম। মধ্যপ্রাচ্যে আরব, তুর্কি এবং ফারসিদের পরেই কুর্দিরা চতুর্থ বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী। অথচ তাদের কোনো রাষ্ট্র নেই। তারাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রবিহীন জাতি। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে কুর্দিরা বহু বছর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে দুর্ভাগ্যের শিকার। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এবং ইসলামের জন্য কুর্দিদের অবদান অনস্বীকার্য। ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের প্রথম দিকে জেরুজালেমের উপর অধিকার নিয়ে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের যে যুদ্ধ হয় সেটি ইতিহাসে 'ক্রুসেড' নামে পরিচিত। সেখানে কুর্দি যোদ্ধাগণ অত্যন্ত বীরোচিত ভূমিকা পালন করে। কুর্দি বীর গাজী সালাউদ্দিন আল আইয়ুবীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ে জয়লাভ করে এবং তাতে করে জেরুজালেমের উপর মুসলমানদের অধিকার পুনরুদ্ধার হয়। ইংল্যান্ডের রাজার নেতৃত্বে পরিচালিত ক্রুসেড যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে ইউরোপের দেশগুলোর পরাজয় আজও স্মরণীয়। আর এই অবদান কুর্দি বীর গাজী সালাউদ্দিনের।
মধ্য এশিয়া থেকে তুর্কিরা আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) আসার আগ পর্যন্ত এই অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এই কুর্দিরাই। তুর্কিদের সঙ্গে কুর্দিরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেলজুক সাম্রাজ্য ও অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। ১৬৩৯-১৯১৮ পর্যন্ত ইরান ছাড়া বাকি সব কুর্দিরা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। তুরস্ক কর্তৃক কুর্দিরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে। কুর্দিদের স্বাধীনতা দূরে থাকুক স্বায়ত্তশাসনের দাবিও মানতে রাজি নয় বর্তমান তুরস্ক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুর্দিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। তারা তখন একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানরা জার্মানির পক্ষে ছিল। তাই জার্মানির পরাজয় মানে অটোমানদের পরাজয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর, যুদ্ধে জয়ী পশ্চিমা জোট ১৯২০ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া "সেভর চুক্তি” অনুযায়ী গণভোটের মাধ্যমে কুর্দিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের ব্যবস্থা নেয়।
তিন বছর পর তথা ১৯২৩ সালে তুরস্কের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে তুরস্কের সাথে "লুজান চুক্তি" স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে নবগঠিত তুরস্কের নেতারা আলাদা কুর্দি রাষ্ট্র গঠনের বিপক্ষে ছিলেন। নানা হিসেব-নিকেশ মিলে গেলে সেদিনই হয়তোবা কুর্দিরা একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়ে যেত কিন্তু তুরস্কের বিরোধিতার কারণে আর সম্ভব হয়নি। আধুনিক তুরস্ক গঠনের পর জাতীয়তাবাদী নেতা কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতায় আসলেন। আতাতুর্ক সরকার তুর্কি জাতীয়তাবাদকে গুরুত্ব দেন। এই সময়ে কুর্দি ভাষায় কথা বলা নিষিদ্ধ করা হয়। কুর্দিদের উপর চালানো হয় নানা নিপীড়ন। কুর্দিদের মাতৃভাষাও তুরস্কে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। ইসলাম ধর্মে চারটি মাজহাব রয়েছে। কুর্দিরা মূলত শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী; অন্যদিকে তুর্কিরা হানাফি মাজহাবের। কিন্তু কুর্দিদের হানাফি মাজহাব মানতে বাধ্য করত তুর্কিরা। বাধ্য হয়ে স্বাধীনতার জন্য ১৯৮০ সালে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টি (পিকেকে)। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। প্রাণ হারায় হাজার হাজার কুর্দি ও তুর্কি। তারপর ২০১৩ সালে পিকেকে ও তুরস্ক সরকারের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হয়।

সিরিয়া
সিরিয়ায় কুর্দিদের ভোটাধিকার পর্যন্ত নেই। অতীতে সিরিয়ান কুর্দিদের এলাকাগুলো আরবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে অনেকে গৃহহীন হয়ে যায়। বর্তমানে তুরস্কের সীমানা ঘেঁষে উত্তর দিকে তারা বসবাস করছে। উত্তর সিরিয়ায় বসবাসরত কুর্দিদের দুটি জোট রয়েছে। একটি সামরিক জোট অন্যটি রাজনৈতিক জেটে। ওয়াইপিজি (YPG) হচ্ছে সামরিক জোট, যাদের সাথে আবার তুরস্কের পিকেকে এর সম্পর্ক রয়েছে। উত্তর সিরিয়ার বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কুর্দিদের সামরিক জোট ওয়াইপিজির হাতেই। এই ওয়াইপিজির হাতেই উত্তর সিরিয়া থেকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এর উৎখাত হয়েছে। আইএস উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক অস্ত্র দিয়ে ওয়াইপিজিকে সহায়তা করেছিল। তাদের রাজনৈতিক জোট ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টির দাবি তারা উত্তর সিরিয়ার স্বায়ত্তশাসন চায়।
২০১৯ সালের অক্টোবরে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারের পর সৃষ্ট শূন্যতায় তুরস্ক যে ভয়াবহ সামরিক হামলা পরিচালনা করেছিল তার প্রধান লক্ষ্য ছিল কুর্দিরা। বিশেষ করে সিরীয় কুর্দিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তিই তুরস্কের এখন মাথাব্যথার কারণ। তুরস্ক মনে করে যে, তার সীমান্তের নিকটবর্তী সিরিয়ার কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এরূপ তুরস্কবিরোধী শক্তির সমাবেশ তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই তুরস্ক উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় বিমান হামলা চালিয়ে প্রায় ৩২ কিলোমিটার সীমান্তকে দখল করে সেখানে 'ফ্রি জোন' বা 'নিরাপদ অঞ্চল' তৈরি করেছে। তুরস্কের দাবি এই নিরাপদ অঞ্চলে তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া ৩০ লক্ষ সিরিয়ান শরণার্থীকে পুনর্বাসন করতে চায় তুরস্ক। ফলশ্রুতিতে সিরিয়ার কুর্দিদের এখন নিজ দেশে লড়াইয়ের পাশাপাশি লড়াই করতে হচ্ছে তুরস্কের বিরুদ্ধেও।

ইরান
উপরে আমরা দেখেছিলাম ১৯৭৯ সালে ইরানে সফল ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে শিয়াদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে কুর্দিরাই হলো একমাত্র সুন্নি। সংখ্যালঘু হিসেবে ইরানেও সুন্নি কুর্দিদের উপর নিপীড়নমূলক আচরণ শুরু হয়। শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ ইরানকে কুর্দিদের উপর নিপীড়ন করতে উৎসাহী করেছে বলে বিবেচনা করা হয়। ইরানে বসবাসরত কুর্দিদের জন্য আলাদা করে কোনো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নেই। ২০১৭ সালে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হলে তুরস্ক, ইরান, ইরাকের সেনারা কুর্দিদের ঘেরাও করে ফেললে গণভোট প্রত্যাহার করে কুর্দিরা।

ইরাক
ইরাকও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। ইরাকি জনগণের ভাষা আরবি। অন্যদিকে ইরাকে বসবাসরত কুর্দিরা সুন্নি এবং তাদের ভাষাও কুর্দি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে কুর্দিদের উপর ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যা পরিচালিত হয়। এতে বিপুল সংখ্যক কুর্দি নিহত হয়। ইরাকের উত্তর দিকে যে অঞ্চলে ইরাকি কুর্দিরা বসবাস করছে ১৯৪৬ সালে তারা সেখানে স্বায়ত্তশাসন আদায়ের উদ্দেশ্যে "কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (KDP)" প্রতিষ্ঠা করে। যাকে সংক্ষেপে কেডিপি বলে। কেডিপি থেকে আন্দোলন হলে ইরাকের নতুন সংবিধানে কুর্দিদেরকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০০৩ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুর্দিরা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকায় সাদ্দাম হোসেন কুর্দিদের উপর নিপীড়ন চালান। বর্তমানে ইরাকের কুর্দিশ রিজিওনাল গভর্নমেন্টের (কেআরজি) সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে তুরস্ক। তাদের তেল-গ্যাসের অন্যতম বড় গ্রাহক তুরস্ক। তেল গ্যাস কেনার বিনিময়ে তুরস্ক চায় কেআরজি যাতে সিরিয়া ও তুরস্কের কুর্দিদের আন্দোলনে সমর্থন না দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের সুযোগ মতো ব্যবহার করে এখন আর সমর্থন দিচ্ছে না। আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী দমনের নামে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াতে তার প্রবেশ নিশ্চিত করেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের আইএস বিরোধী প্রক্সি যুদ্ধে ব্যবহার করে। আইএস উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সিরিয়ান কুর্দিদের না জানিয়ে হঠাৎ করে সিরিয়া থেকে ২০১৯ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তখন সিরিয়ান কুর্দিরা একা হয়ে পড়ে। তারপরেই সেখানে শুরু হয় তুরস্কের বিমান হামলা। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিকে চেয়েছিল কুর্দিরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করুক, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল হিসেব মিলছে না। কারণ ১৯৪৮ সাল আর ২০১৮ সাল এক ছিল না। এক ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করেই অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তুরস্কের লাগাতার বিমান হামলায় সিরিয়ান কুর্দিরা বাধ্য হয় বাশার আল আসাদের সাথে চুক্তি করতে। চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে তুরস্ক ও সিরিয়ার সামরিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সংঘাতপূর্ণ আফরিনে প্রায়ই চলছে তুর্কি বিমান হামলা।

ইসরায়েল
ইসরায়েলের সাথে কুর্দিদের যোগসূত্র নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক টেবিলে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। ইসরায়েলের স্বার্থটি এখানে মিলে গিয়েছে। ইসরায়েল চাচ্ছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে আরেকবার দ্বিখণ্ডিত করতে, অন্যদিকে কুর্দিরাও চাচ্ছে স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করতে। তাই বলা হচ্ছে ইসরায়েল অস্ত্র দিয়ে কুর্দিদের সহযোগিতা করছে।

সম্ভব্য কুর্দি রাষ্ট্র হলে মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকি কী কী?
তুরস্ক সরকার, ইরানের ধর্মীয় নেতা, ইরাকের শিয়াগোষ্ঠী ও সিরিয়ার আসাদ সরকার সবাই কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন বিরোধী। প্রত্যেকের আশঙ্কা এর ফলে তাদের দেশ ভেঙে বৃহত্তর কুর্দিস্তানের জন্ম হতে পারে। অন্যান্য আঞ্চলিক বিষয়ে নিজেদের মতভিন্নতা থাকলেও কুর্দিস্তান প্রসঙ্গে তুরস্ক, ইরান, ইরাক, সিরিয়া ঐক্যবদ্ধ। ১. তুরস্ক মনে করছে কুর্দিরা স্বাধীন হয়ে গেলে প্রথমত তুরষ্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, বহির্বিশ্বে তুরস্কের সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। ২. প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝামেলার বিষয়। কেননা সীমানায় সর্বদা সেনা মোতায়েন রাখতে হবে, অস্ত্রের মজুদ বাড়াতে হবে। বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-চীন এই সমস্যায় ভুগছে। তাই কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে কুর্দি রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের সীমান্ত সংঘাত তৈরি হবে। ৩. পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভূ-কৌশলগত অস্ত্র প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে, যা ঐ অঞ্চলে একটি নতুন বলয় তৈরি করতে পারে। তাদের দাবি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। ৪. ইরান, তুরস্ক, ইরাক ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হতে পারে। কুর্দিস্থানের মতো অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও স্বাধীনতার দাবি করতে পারে, যা ঐ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী সংঘাতকে উস্কে দেবে।
উপরিউক্ত ঝুঁকিসমূহ মাথায় রেখে তুরস্ক, ইরান, ইরাক, সিরিয়া সবাই কুর্দিদের উপর প্রয়োজনমতো নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে একরৈখিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঁচটি দেশের সীমান্তে বসবাসরত কুর্দিদের একটি অভিন্ন জাতি হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করলেও বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কারণ একই জাতি হলেও, দীর্ঘদিন ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের অধীনে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আন্দোলন করতে গিয়ে কুর্দিদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিকশিত হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে অনেক বিষয়ে ভিন্নতাও সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বর্তমানে কিছু কুর্দি নেতা স্বাধীনতার পরিবর্তে অধিকতর অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী。

মূল্যায়ন: সকল সমস্যার একটি সমাধান থাকে। কোন একটি সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটি সমাধান দিয়ে থাকি। মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার সমাধান আদৌ কি হবে এটি নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারে না। এই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের উপসংহার যদি আপনি টানতে চান তাহলে আপনাকে স্বীকার করতেই হবে এই সংকটের কোনো উপসংহার নেই। কারণ মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে ঘিরে এই সংকটের অংশীজনদের মধ্যে কোনো "Common Ground" নেই। একেকজনের চাওয়া পাওয়া একেকরকম।

Question to think about?
প্রথমত, সৌদি আরব ও ইরান কি পারবে তাদের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সংঘাতকে মীমাংসা করে একটি সমাধানে পৌঁছাতে? দ্বিতীয়ত, তুরস্ক কি কখনো কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসন মেনে নেবে? আবার তুরস্ক যদি মেনেও নেয় তাহলে কি এটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব যে কুর্দিরা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে পারবে? তৃতীয়ত, সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা আনতে বাশার আল আসাদ কি কখনো নিজের ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবে?

সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Indyk, Martin (2021), Master of the Game: Henry Kissinger and the Art of Middle East Diplomacy, Knopf
2. Phillips, Christopher (2018), The Battle for Syria: International Rivalry in the New Middle East, Yale University Press
3. Marechal, Brigitte (2014), The Dynamics of Sunni-Shia Relationships: Doctrine, Transnationalism, Intellectuals and the Media, Hurst
4. Smith, Tim Mackintosh (2007), Yemen: Travels in Dictionary Land, John Murray
5. Knights, Michael (2005), Cradle of Conflict: Iraq and the Birth of Modern U.S. Military Power, United States Naval Institute
6. E. Ricks, Thomas (2006), Fiasco: The American Military Adventure in Iraq, Penguin
7. Robben, Antonius C.G.M. (ed. 2010), Iraq at a Distance: What Anthropologists Can Teach Us About the War, Philadelphia: University of Pennsylvania Press
8. Darwish, Nonie (2012), The demon We Don't Know: The Dark Side of Revolutions in the Middle East, John Wiley & Sons
9. Hazleton, Lesley (2009), After the Prophet: The Epic Story of the Shia-Sunni Split in Islam, Doubleday
10. Landis, Joshua (2012), The Syrian Uprising of 2011: Why the Assad Regime Is Likely to Survive to 2013, Middle East Policy
11. Wright, Robin (2008), Dreams and Shadows: The Future of the Middle East, New York: Penguin Press
12. Natali, Denise (2005), The Kurds and the State: Evolving National Identity in Iraq, Turkey, And Iran, NY: Syracuse University Press
13. Gunter, Michael M. (2014), Out of Nowhere: The Kurds of Syria in Peace and War, Hurst

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00