📄 উপনিবেশবাদের একাল সেকাল
নামে যে দলটি ক্রিকেট খেলায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেটি কোনো একক দেশ নয়। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মোট ১৩টি ছোট ছোট রাষ্ট্র নিয়ে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি গঠিত।
অবশেষে ভারতবর্ষে আসার জলপথ আবিষ্কার ও মশলা যুদ্ধ পর্তুগিজরা দেখল কলম্বাস যেটা আবিষ্কার করেছে সেটা তো ভারতীয় উপমহাদেশ নয়। সেটাতো নতুন একটি দুনিয়া এবং সেখানে তো কোনো মশলা নেই। কিন্তু মসলার জন্য ভারতবর্ষে যাওয়ার পথ আমাদের আবিষ্কার করতেই হবে। কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কারের পাঁচ বছর পরেই ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ভারতবর্ষে আসার জলপথ আবিষ্কার করে ফেলেন। একবছর পর তথা ১৪৯৯ সালে ভাস্কো-দা-গামা কর্তৃক ভারতবর্ষে যাওয়ার জলপথ আবিষ্কারের কথা পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
তখন থেকেই ইউরোপিয়ানরা আমেরিকা ভূখণ্ডে যাওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশেও আসা শুরু করে। এভাবে উপনিবেশবাদ দুনিয়াব্যাপী বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। উল্লেখ্য, আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের এই মসলাকে কেন্দ্র করেই ওলন্দাজ ও পুর্তগিজদের মধ্যে একটি যুদ্ধও হয়েছিল। ইতিহাসে যেটা "মসলার যুদ্ধ” (Spice War) নামে পরিচিত। তারা শুধু মসলার জন্যই ভারতবর্ষে আসার তৎপরতা চালিয়েছে বিষয়টি শুধু এরকম নয়। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা ইউরোপীয়দের আকৃষ্ট করেছিল।
স্পেন-পর্তুগালের মধ্যে ট্রিটি অব টরডেসিলাস চুক্তি আজকের ২১ শতাব্দীতে এসে বিশ্ব মঞ্চে একটি দেশ কতটা শক্তিশালী সেটা পরিমাপ করা হয় মোটাদাগে তিনটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে; ইকোনমি, মিলিটারি ও নিউক্লিয়ার ওয়েপনস। কিন্তু মধ্যযুগের পনেরো শতকে যে দেশটি নৌবিদ্যায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী ছিল, সে-ই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ (Hegemon)। তখন বিশ্বে নৌবিদ্যায় সবচেয়ে বেশি পারদর্শী ছিল দুটি দেশ- স্পেন ও পর্তুগাল। যদিও পরবর্তীতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো নৌবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। স্পেন নৌশক্তির দিক থেকে এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, স্পেনের নৌশক্তিকে বলা হতো, "The Invincible Armada"। বর্তমান সময়ে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র যেমন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, উপনিবেশবাদের প্রাথমিক সময়ে স্পেন-পর্তুগালও ছিল ঠিক সেরকমই। পর্তুগাল সিদ্ধান্ত নিল আমরাও যেহেতু নৌবিদ্যায় পারদর্শী এবং আমাদেরও যেহেতু বিশাল নৌশক্তি রয়েছে তাই আমরাও কলম্বাসের আবিষ্কৃত আমেরিকার বিভিন্ন ভূখণ্ড দখল করার জন্য আমেরিকা অভিযানে বের হব। পর্তুগাল মনে করল কলম্বাসের আবিষ্কৃত বিশাল আমেরিকা ভূখণ্ড শুধু স্পেনের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাই আটলান্টিকের ওপারের বিশাল ভূখণ্ডের দখল নিয়ে ইউরোপের দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র স্পেন ও পর্তুগাল এর মধ্যে একটি সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো। তাই সেই সংঘর্ষ এড়াতে দুটি দেশ একটি চুক্তি করল। সেই চুক্তিটি ইতিহাসে "Treaty of Tordesillas" (ট্রিটি অব টরডেসিলাস) নামে পরিচিত。
চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ ও ভূখণ্ড স্পেনের দখলে আসে, আর বিশাল দেশ ব্রাজিল পর্তুগালের ভাগে পড়ে। এজন্যই ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সব দেশের ভাষাই স্প্যানিশ, আর শুধু ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগিজ। আর সুরিনামের ভাষা হলো ডাচ। ডাচ বলতে বর্তমানে নেদারল্যান্ডের অধিবাসীদেরকে বোঝায়। স্পেন এবং পর্তুগাল যখন দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের কলোনি স্থাপন করে তখন নেদারল্যান্ড ছিল স্পেনের অধীনে একটি পরাধীন রাষ্ট্র। তাই স্পেন তার অধীনে থাকা নেদারল্যান্ডকে দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশ সুরিনামের মালিকানা দিয়েছিল। আর এজন্যই সুরিনামের ভাষা ডাচ।
অ্যাজটেক, মায়া ও ইনকা সভ্যতা কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বে মেক্সিকোতে গড়ে উঠেছিল অ্যাজটেক সভ্যতা, আমেরিকার গুয়াতেমালা উপকূলজুড়ে গড়ে উঠেছিল মায়া সভ্যতা, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে গড়ে উঠেছিল ইনকা সভ্যতা। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপ থেকে হাজার হাজার মানুষ দলবেঁধে আমেরিকায় পাড়ি জমায়। ইউরোপিয়ানরা শুরু করে লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ। ফলে ধ্বংস হয় অ্যাজটেক, মায়া, ইনকা সভ্যতার মতো আমেরিকার সমৃদ্ধ সভ্যতাগুলো। মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং ল্যাটিন আমেরিকা স্পেন ও পর্তুগালের দখলে চলে যায়। কিন্তু উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাদের অত বেশি নজর ছিল না। কারণ বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাংশ এবং কানাডার বিশাল ভূখণ্ড তখন ভয়ংকর শীতপ্রধান অঞ্চল ছিল।
সাম্রাজ্যবাদের পথে যাত্রা শুরু করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স পর্তুগাল ও স্পেনের পর এবার আসি বিশ্বের দুই ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিয়ে। ফ্রান্স ও ব্রিটেন ভূরাজনীতিতে তখনো নীরব। কারণ ১৩৩৭ সাল থেকে শুরু করে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রান্স এবং ব্রিটেন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। যুদ্ধটির সূচনা হয়েছিল মূলত ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড অবৈধ ভাবে ফ্রান্সের সিংহাসন দাবি করার কারণে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে ১১৬ বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধটি ইউরোপের ইতিহাসে 'শতবর্ষ ব্যাপী যুদ্ধ' বা 'The Hundred Years War' হিসেবে পরিচিত। ১৪৫৩ সালে শতবর্ষব্যাপী এই যুদ্ধ বন্ধ হলে ফ্রান্সেরও নজর পড়ে আমেরিকা মহাদেশের উপর। ব্রিটেন ও ফ্রান্স তারাও ভাবতে থাকে কলোনি দখল করতে না পারলে তারা পিছিয়ে পড়বে। অবশেষে ১৫৪২ সালে ফরাসি অভিযাত্রীরা বর্তমান কানাডায় বসতি স্থাপন করে। উত্তর আমেরিকায় ফরাসিদের বসতি স্থাপনকে অতটা গুরুত্ব সহকারে দেখেনি স্পেন ও পর্তুগাল। এমনকি স্পেন আর পর্তুগাল এসবে বাধা দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, উত্তর আমেরিকার (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা) ওই অঞ্চলগুলো ছিল শীতপ্রধান। দ্বিতীয়ত, মধ্য আমেরিকা থেকে শুরু করে পুরো দক্ষিণ আমেরিকাই স্পেন ও পর্তুগাল এর দখলে ছিল। তাই তারা উত্তর আমেরিকার প্রতি অতটা গুরুত্ব আরোপ করেনি। উল্লেখ্য, মধ্য আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত স্পেন ও পর্তুগাল। আর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ইতিহাসের সাথে জড়িত ব্রিটেন ও ফ্রান্স। সতেরো শতাব্দীর শুরুর দিকে ফ্রান্স বর্তমান কানাডার কুইবেক-সহ আশেপাশের অঞ্চল নিয়ে ব্যাপকহারে বসতি বিস্তার করতে থাকে। ঠিক এই কারণেই বর্তমান কানাডার কুইবেক প্রদেশটি ফরাসি ভাষা অধ্যুষিত।
তারপর উত্থান ঘটে পরাশক্তি ব্রিটেনের। ব্রিটিশরাও নজর দেয় আমেরিকা মহাদেশের উপর। ব্রিটিশ নাবিকরাও সমুদ্র অভিযান শুরু করে দেয়। ব্রিটেন লক্ষ্য করল মোটামুটি সবকিছুই স্পেন দখল করে নিয়েছে। নিজেদের শক্তিমত্তা দেখিয়ে কোনো রকমের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ব্রিটিশরা স্পেনের কাছ থেকে শুধু কিউবা ব্যতীত সমগ্র ক্যারিবিয়ান অঞ্চলটি দখল করে নেয়। ঠিক এ কারণেই বর্তমান ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ভাষা ইংরেজি। আর কিউবার ভাষা স্প্যানিশ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করি। সেটা হচ্ছে সাধারণত যে সকল দেশগুলো অতীতে ব্রিটেনের কলোনি ছিল কিংবা বর্তমানে যে সকল দেশের ভাষা ইংরেজি তারাই ক্রিকেট খেলার সাথে সংযুক্ত। গোটা আমেরিকা মহাদেশ থেকে একটি মাত্র দেশ ক্রিকেট খেলে, সেটা হচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্যারিবিয় অঞ্চলের যে দেশগুলো নিয়ে “ওয়েস্ট ইন্ডিজ” গঠিত সেই দেশগুলোকে ব্রিটেন স্পেনের কাছ থেকে দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটেন স্পেনের কাছ থেকে কিউবা দখল করতে পারেনি। কিউবা রাষ্ট্রটি স্পেনের হাতেই থেকে যায়। যে কারণে কিউবা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশ হলেও ক্রিকেট খেলে না। এবার আসি উত্তর আমেরিকা নিয়ে। উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ হচ্ছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।
মেক্সিকো: অ্যাজটেক সাম্রাজ্য
কলম্বাস কর্তৃক ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার হওয়ার পর স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা মেক্সিকোতেও অভিযান চালায়। মেক্সিকোতে তখন ছিল অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের শাসন। তখন অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের শাসক ছিল মন্টেজুমা। ১৫২১ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী হার্নান কার্টেজ আজটেক সাম্রাজ্যের রাজধানী টেনোচতিতলান দখল করেন এবং স্থানীয় অধিবাসীদের হত্যা করেন। তারপর পুরো মেক্সিকো স্পেনের কলোনিতে পরিণত হয়। মেক্সিকো স্পেনের একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হতে থাকে। তিনশো বছর স্পেনের অধীনে থাকে মেক্সিকো। ১৮০০ সালে মেক্সিকোতে স্পেনবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। ফলস্বরূপ ১৮২১ সালের ২৪ আগস্ট মেক্সিকো স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের পর ঘটে আরেক কাহিনি। মেক্সিকো দখল করে নেয় বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল। সেটা নিয়ে বিস্তারিত একটু পরেই বলছি। মেক্সিকো যেহেতু স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে সেজন্যই মেক্সিকোর ভাষা স্প্যানিশ, আর মুদ্রা পেসো। এমনকি স্পানিশ ভাষায় কথা বলে এমন শহরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর হচ্ছে মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটি।
যুক্তরাষ্ট্র: ফ্রান্স, স্পেন ও ব্রিটেন মিলে যেভাবে খণ্ড বিখণ্ড করেছিল বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রকে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র- আয়তনে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। এর বর্তমান আয়তন প্রায় সম্পূর্ণ ইউরোপ মহাদেশের সমান। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী হওয়া কিংবা আধুনিক বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়াটা মনে হতে পারে কোনো এক দৈব ঘটনা। মনে হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রকৃতিই যেন সবকিছু নির্ধারণ করে রেখেছে। ৫০টি স্টেট এর সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশাল এক রাষ্ট্র। সবগুলো স্টেট এর রয়েছে আলাদা আলাদা ইতিহাস। একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নিচের এই ছোট আলাপটি খুবই জরুরি। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র মোটাদাগে তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল।
১. যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল (ব্রিটিশ কলোনি): ইংল্যান্ডের ক্ষমতায় তখন রাজা জেমস। ব্রিটেনের বাণিজ্যিক "ভার্জিনিয়া কোম্পানি" আমেরিকাতে পা রাখে ১৬০৭ সালে। ব্রিটিশরা সে জায়গাটিতে প্রথম বসতি গড়ে তোলে তাদের রাজার নামানুসারে সেই জায়গাটির নাম রাখে জেমসটাউন। এই জেমসটাউন হচ্ছে আমেরিকাতে ব্রিটিশদের প্রথম কলোনি। জেমসটাউন শহরটি বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া (Virginia) অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। তারপর থেকেই লাখ লাখ ব্রিটিশ অধিবাসী জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে আসে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে পূর্ব প্রান্তে আটলান্টিকের সমুদ্র উপকূল জুড়ে ব্রিটিশরা মোট ১৩টি ছোট ছোট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে সেই রাজ্যগুলো হলো; নিউ হ্যাম্পশায়ার, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইউইয়র্ক, রোড আইল্যান্ড, কানেকটিকাট, পেনসিলভেনিয়া, নিউ জার্সি, ডেলওয়্যার, মেরিল্যান্ড, ভার্জেনিয়া, নর্থ কেরোলাইনা, সাউথ কেরোলাইনা ও জর্জিয়া। অর্থাৎ আটলান্টিকের কিনারা ঘেঁষে অল্প কিছু জায়গা নিয়েই ব্রিটিশ কলোনিগুলো গড়ে উঠেছিল। ব্রিটেনের অধিকৃত এই রাজ্যগুলোকে টার্ম হিসেবে বলা হলো 'New Britain' বা নতুন ব্রিটেন।
২. যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চল (ফ্রেঞ্চ কলোনি): ফ্রান্সের দখলে ছিল বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যভাগে অবস্থিত বিশাল লুইজিয়ানা প্রদেশ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা প্রদেশটি খুব ছোট হলেও তখন সেটা বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলের পাশাপাশি কানাডার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ফ্রান্সের দখলে ছিল। ফ্রান্সের অধিকৃত এলাকাকে টার্ম হিসেবে বলা হলো 'New France' বা নতুন ফ্রান্স।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল (স্প্যানিশ কলোনি): মেক্সিকো রাষ্ট্রটি স্পেনের কলোনি ছিল। তাই মেক্সিকোর উত্তর সীমান্ত বরাবর যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশও স্পেন দখল করে রেখেছিল। স্পেনের অধিকৃত ভূখণ্ডকে টার্ম হিসেবে বলা হলো 'New Spain' বা নতুন স্পেন।
সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ ও ব্রিটেনের পরাশক্তি হয়ে উঠা
এবার দেখানোর চেষ্টা করব কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলো এবং সবগুলো অঞ্চল একত্রিত হলো। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের অধিকৃত ১৩টি কলোনি নিয়েই শুরু করি। ইউরোপে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একটি যুদ্ধ হয়। যুদ্ধটি ১৭৫৬ সালে শুরু হয়ে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলতে থাকায় এই যুদ্ধের নাম দেওয়া হয়েছে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (Seven Years War)। এই যুদ্ধকে 'First Global Conflict' হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। আঠারো শতকের মধ্যভাগে এই দুই দেশের মধ্যে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তখন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে চলছিল বাণিজ্যিক ও উপনিবেশিক প্রতিযোগিতা। সেই সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা থেকেই যুদ্ধ, কলোনি দখল, বেদখল ও পুনর্দখল চলছিল। যা ইউরোপের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৭৬৩ সালে দুটি সন্ধির মাধ্যমে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটে। যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে এবং ফ্রান্স দুর্বল হয়ে পড়ে। ফ্রান্স দুর্বল হয়ে পড়ায় ইংল্যান্ড পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপনিবেশিক শক্তিতে পরিণত হয়। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ডে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ হলেও এর প্রভাব গিয়ে পড়ে উভয় দেশের অধিকৃত কলোনিগুলোর উপর। ফ্রান্সকে কানাডা থেকে সরিয়ে ব্রিটেন কানাডা দখল করে নেয়। আমাদের ভারতবর্ষেও এর প্রভাব পড়ে। ফ্রান্সকে সরিয়ে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখল করে নেয়। বলা হয়ে থাকে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ব্রিটিশদের পরিবর্তে তখন যদি ফ্রান্স জয়ী হতো তাহলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ ব্রিটিশদের পরিবর্তে হয়তোবা ফরাসিরাই শাসন করত।
যাইহোক, আলোচনায় আসি। সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়ী হলেও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কারণে ব্রিটিশরা ঋণগ্রস্ত হয়ে যায়। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নিল আমেরিকাতে ব্রিটিশ কলোনিগুলোর উপর উচ্চ কর আরোপ করবে। কর আরোপ নিয়ে পার্লামেন্টে পাশ হতে লাগল নতুন নতুন আইন। ১৭৬৪ সালে পাশ হয় the Sugar Act, ১৭৬৫ সালে পাশ হলো The Stamp Act, ১৭৬৭ সালে পাশ হলো The Townshend Acts ইত্যাদি। ব্রিটিশ রাজের এসব কর আইন দেখে ক্ষেপে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি কলোনির জনগোষ্ঠী। ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কলোনিগুলোতে। মূলত এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বীজ বপন।
দ্য বোস্টন টি পার্টি
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যে শহরকে নিয়ে পৃথিবীব্যাপী হৈচৈ, সেটা নিউইয়র্ক। একে বলা হয় পৃথিবীর রাজধানী। বিশাল এই শহর কখনো ঘুমায় না। তাই এর আরেক নাম নির্ঘুম শহর (The City that Never Sleeps)। ঔপনিবেশিক কালে এই নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যটি ওলন্দাজদের দখলে ছিল। নেদারল্যান্ডসের হল্যান্ডের অধিবাসীদের বলা হয় ওলন্দাজ। ওলন্দাজদেরকে অনেকে আবার ডাচ (Dutch) বলে। ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশ-ওলন্দাজ যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা ওলন্দাজদের থেকে নিউইয়র্ক দখল করে নেয়। ফলস্বরূপ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এই ওলন্দাজরা যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমেরিকার কলোনিগুলোতে চা রপ্তানি করত এবং সেখান থেকে প্রচুর টাকা আয় করত। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে আমেরিকানরা ব্রিটিশদের চা বর্জন করল। ঠিক গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের মতো। ওলন্দাজরা চোরাইপথে আমেরিকায় চা পাঠাতে লাগল। ব্রিটিশ কোম্পানির চা ব্যবসায় ধস নামল। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো ব্রিটেন। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের বোস্টন শহরে একটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে, যার নাম বোস্টন পোর্ট। ১৭৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি জাহাজ চা বোঝাই করে বোস্টন বন্দরে পৌঁছালে আমেরিকানরা সব চা সমুদ্রের পানিতে ফেলে দেয়। শুরু হলো ব্রিটিশবিরোধী প্রতিবাদ। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এটাই ছিল আমেরিকার সরাসরি প্রতিবাদ। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সাথেও। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হচ্ছে সিপাহী বিদ্রোহ। আর আমেরিকাতে প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন হলো বোস্টন বন্দরে চা ফেলে দেওয়া। বোস্টন বন্দরের এই ঘটনাটি ইতিহাসে "The Boston Tea Party-1773" নামে পরিচিত。
বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মিল যেখানে
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই। আমেরিকার ১৩টি ব্রিটিশ কলোনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ল। আমেরিকার স্বাধীনতার সাথে বাংলাদেশের মিল ঠিক এখানেই। আমেরিকা প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তারপর যুদ্ধে নামে। বাংলাদেশও প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তারপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। এজন্যই পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু বাংলাদেশ ও আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস বলে আলাদা একটি দিবস আছে। ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত এই সাত বছর ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। আর ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিশ।
প্যারিস শান্তি চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভ
মনে আছে সেই ফ্রান্সের কথা? যে কি না সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ব্রিটেনের কাছে চরমভাবে হেরেছিল। সেই প্রতিশোধ হিসেবে ফ্রান্স আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে আমেরিকার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৭৭৮ সালে ফ্রান্স আমেরিকার হয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়ল। ফ্রান্সের সহযোগিতায় আমেরিকানরা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। অবশেষে যুদ্ধে হেরে যায় ব্রিটিশরা। যুদ্ধ শেষে ১৭৮৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে স্বাধীনতা চুক্তিতে আবদ্ধ হয় আমেরিকা ও গ্রেট ব্রিটেন। এটাই ইতিহাসে প্যারিস শান্তি চুক্তি বা The Treaty of Paris নামে পরিচিত। এজন্যই ফ্রান্স বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার হিসেবে 'স্ট্যাচু অব লিবার্টি' ভাস্কর্যটি দিয়েছিল। ভাস্কর্যটি এখন দাঁড়িয়ে আছে নিউয়র্কের লিবার্টি আইল্যান্ডে। এভাবে ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হলো আমেরিকার ছোট ছোট ১৩টি রাজ্য। জর্জ ওয়াশিংটন পরিণত হলেন আমেরিকার জাতির পিতা হিসেবে। ওয়াশিংটন জনগণকে বললেন তোমরা অনুমতি দিলে এই ১৩টি রাজ্যকে একসাথে করে একটি একক রাষ্ট্র (যুক্তরাষ্ট্র) গঠন করতে চাই। রোড আইল্যান্ড রাজ্যটি ছাড়া বাকি ১২টি রাজ্য ওয়াশিংটনের প্রস্তাবে রাজি হলো। এই ১২টি রাজ্যকে নিয়েই ওয়াশিংটন গঠন করলেন The United States of America। মাত্র দুই বছর পরেই রোড আইল্যান্ড রাজ্যটিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৭৮৯ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকানরা জর্জ ওয়াশিংটনকে ক্ষমতায় বসাল। পরপর দুইবার প্রেসিডেন্ট থাকার পর আমেরিকাবাসী জর্জ ওয়াশিংটনকে তৃতীয় বারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুরোধ করলেন। ওয়াশিংটন রাজি হলেন না। নতুনদের সুযোগ করে দিতে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। ওয়াশিংটন এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে পরবর্তীতে মার্কিন সংবিধানে নিয়ম করা হয়েছিল কেউ দুই বারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না।
Territorial evolution: যেভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা
আটলান্টিকের কিনারার ছোট ছোট ১৩টি স্টেট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হলেও আজকে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে মোট ৫০টি স্টেট। তাহলে বাকি স্টেটগুলো কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এলো?
ফ্রান্স থেকে লুইজিয়ানা ক্রয়
তখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল লুইজিয়ানা প্রদেশটি ফ্রান্সের দখলে। ১৮০০ সালের দিকে ফ্রান্সের ক্ষমতায় আসলেন সম্রাট নেপোলিয়ন। নেপোলিয়ন দেখল যে, আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে এবং ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থিত বিশাল লুইজিয়ানা ভূমিটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ফ্রান্সের যথেষ্ট শক্তিশালী নৌবাহিনী নেই। নেপোলিয়ন চিন্তা করলেন যে, সময়টি এখন চিরশত্রু ব্রিটেনকে শায়েস্তা করার। তাই ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন এবং ফ্রান্সকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করাটাই বেশি জরুরি। তাই টাকার বিনিময়ে বরং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে লুইজিয়ানা প্রদেশটা বিক্রি করে দেই। থমাস জেফারসনের সাথে চুক্তি হলো নেপোলিয়নের। আমেরিকা ১৮০৩ সালে ফ্রান্সের কাছে থেকে প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ক্রয় করে নিল বিশাল লুইজিয়ানা। এটিই আমেরিকার প্রথম ক্রয়কৃত অঞ্চল। এটি প্রায় আয়তনে প্রারম্ভিক যুক্তরাষ্ট্রের সমান ছিল। বর্তমান সৌদি আরবের সমান ছিল সেই লুইজিয়ানা। পরবর্তীতে এক লুইজিয়ানা ভেঙেই অনেকগুলো স্টেট তৈরি হয়। যেমন- উইসকনসিন, কলোরাডো, আইওয়া, ক্যানসাস, মিনেসোটা, মিসৌরি, নেব্রাস্কা, নিউ মেক্সিকো, ওকলাহোমা, ওয়াইওমিং ইত্যাদি স্টেটগুলো লুইজিয়ানা ভেঙে তৈরি হয়।
মেক্সিকো থেকে পশ্চিমাঞ্চল উদ্ধার
লুইজিয়ানা ক্রয়ের পর দেশের পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আসলো, এবার বাকি আছে শুধু পশ্চিমাঞ্চল। আগেই বলেছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকো স্পেনের দখলে ছিল। ১৮০০ সালের দিকে পরাশক্তি হিসেবে স্পেন অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন স্পেনের অধিকৃত ল্যাটিন আমেরিকার কলোনিগুলো একেক করে স্বাধীন হতে লাগল। এমনকি স্পেন আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল এবং মেক্সিকো থেকেও চলে যায়। স্পেন চলে যাওয়ার পর মেক্সিকো সুযোগ বুঝে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল দখল করে নেয়। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিবিদরা দেখল যে এশিয়ার সাথে বাণিজ্য করতে হলে প্রশান্ত মহাসাগর দরকার। আমেরিকা তার রাষ্ট্রের সীমানা পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। যার মাধ্যমে এশিয়ার সাথে সুষ্ঠু বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমেরিকার ভূখণ্ড সম্প্রসারণের এই নীতি 'Manifest Destiny' নামে পরিচিত। ১৮৪৫ সাল। ক্ষমতায় আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট জেমস কে. পোক (James K. PolK)। মেক্সিকোর সাথে যুদ্ধ শুরু করলেন। ১৮৪৬-১৮৪৮ দুই বছর যুদ্ধ চলল এবং মেক্সিকো পরাজিত হলো। মেক্সিকোর সাথে ১৮৪৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি "গুয়াদালুপে হিদালগো" (Guadalupe Hidalgo) চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। চুক্তিতে মেক্সিকো ১.৩৬ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এলাকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করে। আজকের টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, ইউটাহ এবং কলোরাডো স্টেটগুলো যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো থেকেই পেয়েছিল।
স্পেন থেকে ফ্লোরিডা ক্রয়
স্পেন ধীরে ধীরে তার সব কলোনি হারাল। শুধু ফ্লোরিডা রাজ্যটি স্পেনের অধীনে রইল। সময় ১৮১৮। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সেনাপতি অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ফ্লোরিডা আক্রমণ করলেন। স্পেনের তৎকালীন মন্ত্রী ডো লুই দিউস বলল আক্রমণ করার দরকার নেই, আমরা এমনিতেই ফ্লোরিডা ছেড়ে চলে যাব এবং বিনিময়ে আমাদের কিছু টাকা চাই। পঞ্চাশ লক্ষ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে আমেরিকা স্পেনের কাছে থেকে ফ্লোরিডা ক্রয় করে নিল। এর আয়তন ৭২,১০১ বর্গমাইল। ফ্লোরিডা রাজ্যটি প্রায় বাংলাদেশের অর্ধেক।
রাশিয়া থেকে আলাস্কা ক্রয়
বরফাবৃত আলাস্কা আমেরিকা মহাদেশে রাশিয়ার একমাত্র কলোনি ছিল। তুষার পথে সাইবেরিয়া হয়ে বোরিং প্রণালি পাড়ি দিয়ে সেই আলাস্কাতে পৌঁছানো রাশিয়ার জন্য কষ্টকর ছিল। তাছাড়াও তৎকালীন সময়ে রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বড় শত্রু ছিল গ্রেট ব্রিটেন। ব্রিটেন যেন সবারই শত্রু। ব্রিটেনকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমেরিকার কাছে অঞ্চল বিক্রি করে জোট বাঁধতে চেয়েছিল রাশিয়া। ফলস্বরূপ, ১৮৬৭ সালে রাশিয়া তার আলাস্কা প্রদেশটি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসনের কাছে ৭২ লক্ষ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।
মজার ব্যাপার হলো, আজকের একুশ শতকে এসেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে ভূখণ্ড ক্রয় করতে চায়। আধুনিক যুগে এসেও যুক্তরাষ্ট্র তার সেই অতীতের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের 'Manifest Destiny' নীতি প্রয়োগ করতে চায়। ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্কের থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন কিন্তু ডেনমার্ক সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তবে আমেরিকা এর আগেও ডেনমার্কের কাছ থেকে একটি সামুদ্রিক অঞ্চল ক্রয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ কিন্তু ডেনমার্কের কাছ থেকেই ক্রয় করা। ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করি। মার্কিন ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ (Virgin Islands) হলো ক্যারিবিয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকৃত একটি সামুদ্রিক অঞ্চল। এই ধরনের অঞ্চলকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানে "Constitutional Dependency" বা নির্ভরশীল অঞ্চল বলে থাকি। নির্ভরশীল অঞ্চল দ্বারা মূলত এমন কোনো অঞ্চলকে বোঝায় যার পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নেই এবং যা অন্য একটি রাষ্ট্রের অধীন। যেমন- অলান্দ (ফিনল্যান্ডের অংশ), ম্যাকাও (চীনের অংশ), আরুবা (নেদারল্যান্ডের অংশ)। উল্লেখ্য, আরুবা দ্বীপটি "ABC Island" হিসেবেও পরিচিত।
১৯৫৯ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ সর্বশেষ স্টেট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০তম স্টেট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে জাপান এই হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে আক্রমণ করেছিল। এভাবে আয়তন বৃদ্ধি পেতে পেতে পঞ্চাশটি স্টেট এর সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে গেল পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পতাকার এক কোণায় ৫০টি তারা রয়েছে এবং একইসাথে পতাকায় ১৩টি লম্বা লাল-সাদা দাগ রয়েছে। ৫০টি তারা যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটকে প্রতিনিধিত্ব করে। আর পতাকার ১৩টি লম্বা দাগ ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়া ১৩টি রাজ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে।
দাস ব্যবসা (Slave Trade)
এই বিষয়টি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিশাল ভূখণ্ডে মোট তিন ধরনের জনগোষ্ঠী ছিল। ১. স্থানীয় আদিবাসী, ২. ইউরোপ থেকে আগত শ্বেতাঙ্গরা, ৩. পশ্চিম আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা কালো মানুষ (দাস)।
এক. কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বে গোটা আমেরিকা ভূখণ্ডে শুধু সেখানকার স্থানীয় আদিবাসীদের বসবাস ছিল। সংখ্যায় বললে প্রায় ছয় কোটির মতো আদিবাসী ছিল। যারা রেড ইন্ডিয়ান হিসেবে পরিচিত। এরা ছিল সহজ-সরল প্রকৃতির। এদের কাছে কোনো অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। প্রতিরক্ষার জন্য শুধু ছিল তীর, ধনুক ও কাঠের তৈরি লাঠি। ছিল না উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা। আমেরিকার প্রকৃত অধিবাসী ছিল এই রেড ইন্ডিয়ানরাই। তাদের গায়ের রং কিছুটা লালচে। তাদের নেটিভ আমেরিকানও বলা হয়। তাদেরকে এখনো আমেরিকায় কেবল চেহারা দেখে আলাদা করা যায় এবং এরাই আমেরিকার আসল উত্তরাধিকারী।
দুই. ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপ থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে প্রায় তিন কোটি শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ান আমেরিকায় এসেছিল। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের সময় ইউরোপে গুটিবসন্ত, কলেরা, প্লেগ ইত্যাদি মহামারি রূপ ধারণ করেছিল। ইউরোপীয়রা যখন জাহাজে করে আমেরিকাতে আসে তখন তাদের মধ্যে অনেকেই মহামারিতে আক্রান্ত ছিল। তাদের বহন করা ভাইরাস দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় আদিবাসীদের উপর। মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় লক্ষ লক্ষ রেড ইন্ডিয়ান। উত্তর আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় ইউরোপীয়রা হয়ে ওঠে হর্তাকর্তা। তাছাড়াও তাদের কাছে ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- বিশাল সংখ্যক ইউরোপিয়ানরা কেন আমেরিকায় এসেছিল? উত্তর হচ্ছে তিনটি। প্রথমত, ইউরোপে তখন যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তারা দেখল যে, আটলান্টিকের ওপারে কলম্বাস যে নতুন দুনিয়া আবিষ্কার করেছে, সেখানে কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ নেই। দ্বিতীয়ত, ইউরোপে তখনো শিল্পবিপ্লব হয়নি। শিল্পবিপ্লব হয়েছে অনেক পরে আঠারো শতকে গিয়ে। মানুষ কৃষি কাজের উপর জীবিকা নির্বাহ করত। তার উপর ইউরোপে তখন ছিল সামন্তপ্রথা। সামন্ত প্রভুদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে মানুষ আমেরিকায় পাড়ি জমাল। তৃতীয়ত, ১৬ শতকের দিকে ইউরোপে জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কৃষি কাজের জন্য জমি তো আর বাড়েনি। তখন মানুষ দেখল আটলান্টিকের ওপারে কলম্বাসের আবিষ্কৃত নতুন দুনিয়ায় কৃষি জমির অভাব নেই।
তিন. ইউরোপীয়ানদের বহন করা ভাইরাসে লাখ লাখ স্থানীয় আদিবাসী মারা যায়। ইউরোপীয়রা ভাবল আটলান্টিকের ওপার থেকে এপারে আসলাম একটু আরাম-আয়েশে বসবাস করার জন্য, ভাবছিলাম স্থানীয় আদিবাসীদেরকে দিয়ে জোরপূর্বক কৃষি কাজ করাব, আর আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করব। কিন্তু আমাদের নিয়ে আসা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তারা তো সবাই মারা গেল। এখন এত বিশাল জমি চাষাবাদ করাবো কাদেরকে দিয়ে? তখন তাদের মাথায় আসল পশ্চিম আফ্রিকা থেকে কালো মানুষগুলোকে ধরে জাহাজে করে এখানে নিয়ে আসলেই তো হয়। ঐসব কালো মানুষগুলো চাষাবাদ করবে, আর আমরা বসে বসে আরাম-আয়েশ করব। শুরু হলো ইতিহাসের কালো অধ্যায় অর্থাৎ দাস ব্যবসা। যেটা টার্ম হিসেবে "The Atlantic Slave Trade" হিসেবে পরিচিত। আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে হাজার হাজার দাস নিয়ে আসা হলো আমেরিকা মহাদেশে।
বর্তমানে একটি জিনিস লক্ষ্য করবেন যে, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বিশেষ করে আইভরিকোস্ট, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন, গিনি, গাম্বিয়া, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ইত্যাদি দেশে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা ঘুরতে আসে। কেন জানেন? সেই অতীত ইতিহাস দাস ব্যবসাকে স্মরণ করতে, পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মান জানাতে। এজন্যই বলা হয় ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকা এই পাঁচটি মহাদেশের অতীত ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা। আজকের আমেরিকা মহাদেশে যত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী আছে তাদের পূর্বপুরুষরা মূলত ইউরোপ থেকেই আগত। আর কৃষ্ণাঙ্গরা আফ্রিকা থেকে আগত।
আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় পরিষ্কার করি। সেটি হলো আমরা জানি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে। এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোও ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে লোকগুলো ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে তারা আসলে কারা? ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে যে লোকগুলো ইউরোপীয় কলোনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে তারা আসলে কারা? আমেরিকাতে বসবাসরত উপরিউক্ত তিন ধরনের জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থানীয় আদিবাসীরা ছিল সংখ্যায় খুবই কম এবং দুর্বল, আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা কালো মানুষগুলো ছিল দাস। তাহলে যুদ্ধ করল কারা? উত্তর হচ্ছে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর যেসব ইউরোপীয়রা জাহাজে করে দল বেঁধে এখানে এসেছিল তারাই তাদের পিতৃপুরুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে। তাদের দাবি ছিল বিশাল আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমরা এখানে এসেছি বসবাস করার জন্য। কিন্তু তারা সুদূর ইউরোপে বসে এখানেও আমাদেরকে শাসন ও শোষণ করবে এটা মানা যায় না। ব্রিটিশরা মূলত আমেরিকাতে মাইগ্রেট করা ব্রিটিশদেরই শাসন করেছে। আমেরিকার ১৩টি রাজ্যে ব্রিটিশরা যাদেরকে শাসন করেছিল তারা তো মূলত ইউরোপ থেকেই এসেছিল। এর মধ্য দিয়ে আমাদের উত্তর আমেরিকার ইতিহাস জানা হয়ে গিয়েছে। এবার ছোট করে ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতিটা বোঝার চেষ্টা করব।
ল্যাটিন আমেরিকায় স্পেন এবং তাদের কৃতকর্ম
পশ্চিমাদের সমৃদ্ধিশালী হওয়ার ইতিহাস হচ্ছে মূলত লুট করার ইতিহাস। ১৬ শতক থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত ইউরোপ সারা বিশ্বে লুটপাট করে বেরিয়েছে। ফ্রান্স অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয় আফ্রিকাকে শোষণ করে। বর্তমান একুশ শতকে এসে আফ্রিকাতে যত মিলিটারি অভ্যুত্থান ঘটছে সবগুলোর পেছনেই ফ্রান্সের হাত রয়েছে। স্পেন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয় গোটা ল্যাটিন আমেরিকাকে শোষণ করার মাধ্যমে। স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লসের সময় ল্যাটিন আমেরিকায় সমৃদ্ধিশালী ইনকা সাম্রাজ্যের শাসন ছিল। তৎকালীন ইনকা সাম্রাজ্যের সম্রাট গিজারোকে বন্দি করার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ কোষাগার লুট করে স্প্যানিয়ার্ডরা। প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলারের স্বর্ণমুদ্রা তারা লুট করে। একই ভাবে আজকের ব্রিটেন আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয় ভারতীয় উপমহাদেশকে শোষণ করে। সে ইতিহাস আমরা সবাই-ই জানি। আমেরিকা আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয় বিশ্বের বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল লুট করে。
ল্যাটিন আমেরিকা বলতে কাদেরকে বোঝায়?
উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকা এই চারটি অঞ্চলকে একসাথে 'আমেরিকা অঞ্চল' বলা হয়। এই চারটি অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত যে দেশগুলোর ভাষা স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও ফ্রেঞ্চ শুধু তাদেরকেই 'ল্যাটিন আমেরিকার দেশ' বলা হয়। আমেরিকা মহাদেশের মোট ২০টি দেশ উপরিউক্ত তিন ভাষায় কথা বলে। তাই এই বিশটি দেশ ল্যাটিন আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত। যেমন- মেক্সিকো উত্তর আমেরিকার একটি দেশ হলেও স্প্যানিশ ভাষার কারণে সে ল্যাটিন আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা এই দুইটি এক জিনিস নয়।
ল্যাটিন আমেরিকার ২০টি দেশের তালিকা :
উত্তর আমেরিকা মহাদেশ
১. মেক্সিকো (স্পেনীয়)
মধ্য আমেরিকা
২. পানামা (স্পেনীয়) ৩. এল সালভাদর (স্পেনীয়) ৪. গুয়েতেমালা (স্পেনীয়) ৫. হুন্ডুরাস (স্পেনীয়) ৬. নিকারাগুয়া (স্পেনীয়) ৭. কোস্টারিকা (স্পেনীয়)
ক্যারিবিয়ান অঞ্চল
৮. কিউবা (কিউবান-স্পেনীয়) ৯. হাইতি (ফরাসি) ১০. ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র (স্পেনীয়)
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ
১১. আর্জেন্টিনা (স্পেনীয়) ১২. বলিভিয়া (স্পেনীয়) ১৩. ব্রাজিল (পর্তুগিজ) ১৪. চিলি (স্পেনীয়) ১৫. কলম্বিয়া (স্পেনীয়) ১৬. ইকুয়েডর (স্পেনীয়) ১৭. প্যারাগুয়ে (স্পেনীয়) ১৮. পেরু (স্পেনীয়) ১৯. উরুগুয়ে (স্পেনীয়) ২০. ভেনেজুয়েলা (স্পেনীয়)
উল্লেখ্য, এই অধ্যায়টি আমরা চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম। তার মধ্যে তিনটির উত্তর ইতোমধ্যে পেয়ে গিয়েছি। চতুর্থ প্রশ্নটি ছিল, কেন বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত আধিপত্য এবং কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এত শক্তিশালী হয়ে উঠল? এই প্রশ্নের উত্তরের সাথে জড়িয়ে আছে ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি, ল্যাটিন আমেরিকাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের "মনরো ডকট্রিন" এবং "স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধ"। তাই এই দুইটি বিষয় আলোচনার প্রয়োজন। কিন্তু জটিলতা এড়াতে এবং ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এই অধ্যায়ে শুধু ঔপনিবেশিক পর্বটি আলোচনা করব। ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে পরবর্তীতে স্বতন্ত্র যে অধ্যায়টি আসবে সেখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাবেন।
কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর আমেরিকা মহাদেশে স্পেন তার দখলকৃত কলোনিগুলোকে মোট চার ভাগে ভাগ করে। এগুলোকে ভাইসরয়ালটি (Viceroyalty) বলা হতো। এই চারটি ভাইসরয়ালটিতে স্পেনের রাজা একজন করে গভর্নর নিয়োগ দিতেন। রাজা স্পেনে বসে গভর্নরদের মাধ্যমে এসব কলোনি পরিচালনা করতেন। দখলকৃত কলোনিগুলো স্পেনের একটি প্রদেশ হিসেবে শাসন করা হতো। এই ৪টি ভাইসরয়ালটির মধ্যে প্রথমটি উত্তর আমেরিকায়, আর বাকি তিনটি ল্যাটিন আমেরিকায়।
1. Viceroyalty of New Spain: সংক্ষেপে “নিউ স্পেন” বলা হয়। উত্তর আমেরিকায় স্পেনের যেসব কলোনি ছিল সেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশ ও মেক্সিকো নিয়ে স্পেন গঠন করেছিল নিউ স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, মনটানা, ওরেগন, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা ইত্যাদি অঙ্গরাজ্যগুলো স্পেনের দখলে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব দিকের ফ্লোরিডা রাজ্যটিও স্পেনের দখলে ছিল। স্পেনের শাসনাধীন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকোকে একসাথে বলা হতো New Spain (নিউ স্পেন)। ১৫২১ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত এখানে স্পেনের শাসন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পর্বে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম।
2. Viceroyalty of Peru: সংক্ষেপে "পেরু"। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল ভাইসরয়ালটি অব পেরু। ১৫২৪ থেকে ১৮২৪ পর্যন্ত এখানে স্পেনের শাসন ছিল।
3. Viceroyalty of the River Plate: সংক্ষেপে লা প্লাটা বা রিভার প্লেইট। আর্জেন্টিনা, চিলি, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে নিয়ে এই ভাইসরয়ালটি গঠিত হয়েছিল। স্পেনের কলোনিভুক্ত এই পাঁচটি দেশকে Rio de la Plata বা River Plateও বলা হতো। ১৭৭৬ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত স্পেন এখানে শাসন করে।
4. Viceroyalty of New Granada: সংক্ষেপে নিউ গ্রানাডা হিসেবে পরিচিত। ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পানামা, ভেনেজুয়েলা এই চারটি দেশকে স্পেন একত্রে নাম দেয় "New Granada"। ১৭১৭ থেকে ১৮২১ পর্যন্ত স্পেন এখানে শাসন করে।
১৯ শতকের প্রারম্ভে (১৮০৪) ফ্রান্সে উত্থান হয় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের। নেপোলিয়নের উত্থানে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে স্পেন ও ইংল্যান্ড। নেপোলিয়ন ফ্রান্সের ক্ষমতায় আসার পর ইউরোপের চরিত্রই পাল্টে যায়। পুরো ইউরোপ নেপোলিয়নের আয়ত্তে চলে আসে। ১৮০৮ সালে স্পেন আক্রমণ করে বসলেন নেপোলিয়ন। নেপোলিয়ন তার ছোট ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে স্পেনের সিংহাসনে বসালেন। স্পেনের এই বেহাল অবস্থা দেখে স্পেনের অধিকৃত ল্যাটিন আমেরিকার কলোনিগুলো দেখল যে, স্বাধীন হওয়ার এটাই মোক্ষম সময়। ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে পচকে দেশ হাইতি প্রথম স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। হাইতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ল্যাটিন আমেরিকা অন্যান্য দেশগুলো স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ল্যাটিন আমেরিকায় স্পেনবিরোধী আন্দোলন সবে মাত্র শুরু হলো। আগমন ঘটল জাতীয়তাবাদী নেতা সিমন বলিভারের। বলিভারের জন্ম বর্তমান ভেনেজুয়েলায়। তার বাবা স্পেনের ভাইসরয়ালটি নিউ গ্রানাডায় মিলিটারিতে চাকরি করতেন। পারিবারিক সচ্ছলতা থাকায় বলিভারকে স্পেনে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। স্পেনে বসেই বলিভার তার মাতৃভূমিকে স্পেনের হাত থেকে স্বাধীন করার সুযোগ খুঁজছিলেন। বলিভার যখন দেখলেন নেপোলিয়ন স্পেন আক্রমণ করেছেন, তখন তিনি ভাবলেন মাতৃভূমিকে রক্ষা করার এটাই সুযোগ। বলিভার ১৮০৭ সালে ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসেন এবং যোগ দেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। বলিভারের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু ও বলিভিয়া এই পাঁচটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়। তাই সিমন বলিভারকে বলা হয় Liberator বা মুক্তিদাতা। বলিভারের ইচ্ছে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ল্যাটিন আমেরিকার সবগুলো দেশ নিয়ে মাত্র একটি দেশ (Confederation) গঠন করার। যাইহোক পরবর্তীতে সেটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
সিমন বলিভারকে উত্তর আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটনও বলা হয়। তার সম্মানার্থে দুটি দেশের নামকরণ করা হয়; একটি হচ্ছে বলিভিয়া, অন্যটি হচ্ছে ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার অফিশিয়াল নাম “বলিভিয়ান রিপাবলিক অফ ভেনেজুয়েলা”। স্বাধীনতার পর বলিভিয়ার জনগণ সিমন বলিভারকে তাদের দেশের সংবিধান প্রণয়ন করে দিতে অনুরোধ করে। জনগণের অনুরোধে রচনা করলেন নতুন সংবিধান। সেই সংবিধানে বলিভার দাস প্রথাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন। সংবিধানে লিখলেন- "Everyone born in New Republic was born free."
পানামা খাল বনাম দি গ্রান্ড ক্যানেল অব নিকারাগুয়া
যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা তখনো অতটা উন্নত হয়নি। বলছি ঊনবিংশ শতাব্দীর কথা। যুক্তরাষ্ট্রের দুইপাশে দুইটি মহাসাগর। পূর্বদিকে আটলান্টিক মহাসাগর, পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগর। ভৌগোলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা এত বিশাল যে, স্থলপথে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাওয়া কষ্টসাধ্য। নিউইয়র্ক, ডেলওয়্যার, নিউ জার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি এই অঙ্গরাজ্যগুলো আমেরিকার পূর্ব দিকে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত। অপরদিকে ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা, অরেগন, নেভাদা এসব অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত। নিউইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার দূরত্ব সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার। পাহাড়, পর্বত, জঙ্গল, মরুভূমি ভেদ করে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য।
তখন আমেরিকার শাসক গোষ্ঠী দেখল যে, কোনো জলপথ আবিষ্কার করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। তখন তারা আবিষ্কার করল যে, পানামা এলাকায় প্রশান্ত মহাসাগর আর আটলান্টিক মহাসাগরের দূরত্ব সবচেয়ে নিকটে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখানে একটি খাল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিল। ১৮৮১ সালে ফ্রান্স সর্বপ্রথম এই খাল খনন করার উদ্যোগ নিয়েছিল: কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ফ্রান্স পরবর্তীতে খনন করার কাজটি ত্যাগ করে। যুক্তরাষ্ট্র দেখল যে পানামা অঞ্চলটি কলম্বিয়ার অধীনে। তাই যুক্তরাষ্ট্র পানামাকে স্বাধীন করার উদ্যোগ নেয়। ১৯০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পানামা কলম্বিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র খাল খননের কাজ শুরু করে। দীর্ঘ দশ বছর পর ১৯১৪ সালে এই খাল উদ্বোধন করা হয়। পানামার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী পানামা খালের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নেয়। সবশেষে ১৯৯৯ সালে পানামা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই খালের পূর্ণ মালিকানা পায়।
একুশ শতক মূলত চীনের। তাই চীন সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে চায়। পানামা খালের বিকল্প একটি খাল তৈরি করতে চীন সম্প্রতি মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ার সাথে চুক্তি করেছে। নিকারাগুয়ার মধ্য দিয়ে চীন এমন একটি খাল তৈরি করবে- যেটা পানামা খালের মতোই আটলান্টিক মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করবে। খাল খননের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে নিকারাগুয়া সরকার। ২৭৮ কিলোমিটার খালটির খনন সম্পন্ন হলে এটি পানামা খালের পর দ্বিতীয় খাল হবে, যা দুইটি মহাসাগরকে যুক্ত করবে। খনন কাজে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। চীনের নির্মাণ কোম্পানি এইচ.কে.এন.ডি খালটি খননের কাজ পেয়েছে। "দি গ্র্যান্ড ক্যানাল অফ নিকারাগুয়া" নামের এই খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা সব দিক থেকেই পানামা খালকে ছাড়িয়ে যাবে। নিকারাগুয়া সরকার দাবি করছে, প্রকল্পটি সফল হলে, সমুদ্রপথে বিশ্ব বাণিজ্যের পাঁচ শতাংশ এই খাল দিয়ে পরিবহন করা হবে, যা দেশটির জিডিপি দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করবে।
মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়া অর্থনৈতিকভাবে খুব শক্তিশালী না হলেও নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কখনো আপস করেনি। আদর্শগত মিলের কারণে কমিউনিস্ট ভাবধারার নিকারাগুয়ার সাথে রাশিয়া ও চীনের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। কোল্ড ওয়ার পিরিয়ডে (১৯৪৫-১৯৯০) গোটা বিশ্ব যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের করতলে, তখন সোভিয়েতের সহায়তায় নিকারাগুয়াতে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে সোভিয়েত ভাবধারার সরকার ক্ষমতায় আসবে এটা যুক্তরাষ্ট্র সহ্য করতে পারেনি। সোভিয়েতপন্থি সেই সরকারকে উৎখাতের জন্য সেই দেশের কন্ট্রা বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন তৎকালীন রিপাবলিকান মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নিকারাগুয়াতে তৎপর ছিল কন্ট্রা বিদ্রোহীরা। ডানপন্থি গেরিলা দল কন্ট্রা মধ্য আমেরিকার কোকেন ও হিরোইন বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ছিল।
ক্যারিবিয় উপকূলীয় অঞ্চলের দেশ হিসেবে নিকারাগুয়াতে প্রতি বছর প্রবল সামুদ্রিক ঝড়, হ্যারিকেন, বন্যার প্রকোপে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। বর্তমানে চীন দেশটির অবকাঠামো খাতে ব্যয় করছে। চীনের অর্থায়নেই নির্মিত হচ্ছে পানামা খালের বিকল্প এই খাল। যার নাম "দি গ্র্যান্ড ক্যানাল অফ নিকারাগুয়া"। চীনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করে নিকারাগুয়া। নিকারাগুয়াতে চীনের প্রভাব হ্রাস করতে সিআইএ পুনরায় কন্ট্রাদের মতো নতুন কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী তৈরি করবে কি না সেটা সামনের দিনগুলোই বলে দেবে।
Question to think about?
বর্তমান বিশ্বে যে রাষ্ট্রগুলো আধুনিক ও উন্নত তাদের অধিকাংশই অতীতে কোনো না কোনো ভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি ছিল। যেমন- ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেন, আমেরিকা। কিন্তু চীন কখনো অতীতে ঔপনিবেশিক শক্তি ছিল না। তবে বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে চীনের আধিপত্যবাদী মনোভাব চোখে পড়ার মতো। যেটাকে বলা হচ্ছে The Last Stage of Imperialism তথা সাম্রাজ্যবাদের সর্বশেষ পর্যায়। তাহলে কি চীন থেকেও আমরা ব্যতিক্রম কিছু পাচ্ছি না? চীনও কি নিজেকে একটি ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত করতে চাচ্ছে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Frymer, Paul (2017) Building an American Empire: The Era of Territorial and Political Expansion, Princeton: Princeton University Press
2. Dalrymple, William (2019), The Anarchy: The East India Company, Corporate Violence, and the Pillage of an Empire, Bloomsbury Publishing
3. Frantz, Fanen (2005), The Wretched of the Earth, Grove Press
4. Lovejoy, Paul E. (2000), Transformations in Slavery: a history of slavery in Africa, Cambridge University Press
5. Bailey, Anne (2006), African Voices of the Atlantic Slave Trade: Beyond the Silence and the Shame, Boston: Beacon Press
6. Watts, Jonathan (2013), Nicaragua Fast-Tracks Chinese Plan to Build Canal to Rival Panama
7. Bailyn, Bernard (2005), Atlantic History: Concept and Contours, Harvard University Press
8. Hoffman, Ronald (1981), Diplomacy and Revolution: The Franco-American Alliance of 1778, University of Virginia Press
9. Lockhart, James, and Stuart B. Schwartz (1983), Early Latin America: A History of Colonial Spanish America and Brazil
10. Merriman, Roger Bigelow (1934), The Rise of The Spanish Empire in the Old World and in the New
11. Conrad, Joseph (1902), Heart of Darkness, Blackwood's Magazine
12. Pakenham, Thomas (1991), The Scramble for Africa: White Man's Conquest of the Dark Continent from 1876 to 1912, Random House
📄 যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা ও রাজনীতি
"People shouldn't be afraid of their government. Governments should be afraid of their people." -Alan Moore
কিছু সমসাময়িক প্রশ্ন দিয়েই সূচনা করা যাক। বেসামরিক ইয়েমেনিরা মারা যাবে এটা জেনেও কেন ওয়াশিংটনকে রিয়াদের সাথে অস্ত্র চুক্তি করতে হয়? কেন মস্কোতে বসে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে সিরিয়ায় ড্রোন হামলা চালাতে হয়? কেন তেহরানে প্রতিবছর ইরানি সাইনটিস্টদের মৃত লাশ পাওয়া যায়? সফট পাওয়ারের এই যুগে কেন বেইজিং বহুল আক্রমণাত্মক "Wolf Warrior Diplomacy” বেছে নিয়েছে? প্যারিসের মদদে কেন অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশে কয়েকদিন পরপরই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে? কেনই বা ল্যাটিন আমেরিকার সান্তিয়াগোয়, কারাকাসে, কিংবা হাভানায় 'The Chicago Boys' দের উদ্ভব ঘটে? কেন মুসলিম বিশ্ব প্যান ইসলামিজমের কথা ভুলে গিয়ে তেল আবিবের সাথে সম্পর্ক 'Normalization' এর কথা ভাবছে? ঢাকা কেন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ভাবছে? সম্প্রতি কোয়াড ইস্যুতে সিডনি কেন দিল্লির শরণাপন্ন হয়েছে? কেন দিনদিন আঙ্কারার সাথে কায়রোর দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে?
এসব ফরেইন পলিসি সম্পর্কিত প্রশ্ন বাদ দিয়ে এবার না হয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পলিসি নিয়ে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা যাক। শুধু কেন ১৮ বছর হলেই ভোট দেওয়া বৈধ? কেন যে- কোনো পণ্য ক্রয় করতে হলে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়? আমি আয়কর দিতে ইচ্ছুক নই; তারপরেও কেন আমাকে ট্যাক্স প্রদান করতে বাধ্য করা হয়? কেন পুলিশ বিনা নোটিশে ও প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে যে-কারো বাসায় তল্লাশি চালাতে পারে? কেন একটি রাষ্ট্রে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো যায় না? কেন ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হয়? কেন সরকারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে 'অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক' আরোপ করতে হয়? ইকোনমিক ডাউনটার্ন এর সময়ে কেন সরকার প্রাইভেট ফার্মগুলোকে 'bail-out' দেয়? একুশ শতকে এসে, এমনকি বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন সরকারগুলোকে 'Affirmative Action' এর মতো পলিসি গ্রহণ করতে হয়?
জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক এসব অগণিত প্রশ্ন আমাদের মাথায় প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খায়। আর এসবের উত্তরের জন্যই আমাদেরকে 'Government and Politics' নিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। যে-কোনো দেশের সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলে ঐ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ফরেইন পলিসি খুব সহজে অনুধাবন করা যায়। একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা জানা থাকলে ঐ দেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতিও খুব সহজে বিশ্লেষণ করা যায়। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করে তাদের লেখার মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকারব্যবস্থা কিংবা Government System প্রায় অনুপস্থিত।
এই অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক স্ট্রাকচার ও গুরুত্বপূর্ণ পলিসি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রের পলিসি মেকার হতে চান কিংবা রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন হবেন তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা এবং পলিসিগুলো ভালোভাবে জানা দরকার। উল্লেখ্য, সরকারব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা অধ্যয়নের দুইটি বড় Risk বা ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ফিলোসফির প্রফেসর মাইকেল স্যান্ডেল রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা নিয়ে পড়াশোনা করার দুইটি ঝুঁকি উল্লেখ করেছেন। প্রফেসর স্যান্ডেলের মতে, প্রথম ঝুঁকিটি হচ্ছে ব্যক্তিগত। সরকার, রাজনীতি, রাষ্ট্র ইত্যাদি নিয়ে পড়াশোনার কারণে আপনি হয়ে উঠবেন অন্যদের থেকে অনেক বেশি সচেতন। আর দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো রাজনৈতিক। স্যান্ডেলের মতে, এসব অধ্যয়নের কারণে, রাষ্ট্রের অকার্যকর পলিসির বিরুদ্ধে আপনি হয়ে উঠবেন প্রতিবাদী। যে-কারণে স্বয়ং রাষ্ট্র তখন আপনাকে হুমকি মনে করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা
1. Principle of Checks and Balances
তৃতীয় বিশ্বের কোনো প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট চাইলেই নিজের মতো করে আইন তৈরি করতে পারে, নিজের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে পারে, যে-কোনো সময় স্বৈরাচারী বনে যেতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেটা সম্ভব হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিস্টেমটা এমনভাবে সাজানো যে, সেখানে যদি কোনো খারাপ প্রকৃতির মানুষও যায়, সে সিস্টেমের কারণে ভালো হতে বাধ্য। সিস্টেমটা এমন যে, একজন প্রেসিডেন্ট চাইলেও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে না। একজন সরকারি আমলার দুর্নীতি করার ইচ্ছে থাকলেও সে দুর্নীতি করতে পারে না। সেখানে সিস্টেমটাই এমনভাবে সাজানো। যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে সঠিক পথে রাখে।
যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সিনেটের অনুমোদন ছাড়া এককভাবে কোনো বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদন করতে পারে না। একই ভাবে কংগ্রেসে পাশ হওয়া কোনো বিল প্রেসিডেন্টের অনুমতি ছাড়া আইনে পরিণত হয় না। আবার প্রেসিডেন্টের অনুমোদিত কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে সুপ্রিম কোর্ট সেটা বাতিল করে দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট নিজে স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে কিংবা সংবিধান পরিপন্থি কোনো কাজ করলে নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন (Impeachment) করতে পারে। এভাবেই মার্কিন শাসনব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। আর এটাকেই বলা হয় 'Principle of Checks and Balances' (নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের নীতি)। এমন শাসনব্যবস্থার কারণেই কোনো অসৎ কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত লোক ভুলক্রমে ক্ষমতায় চলে আসলেও সে খারাপ কাজ করতে পারে না।
2. Cabinet System
সাধারণত বিশ্বের যে-কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই মন্ত্রীরা হয়ে থাকেন পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্য। যেখানে মন্ত্রীরা আইন তৈরি করেন এবং মন্ত্রীদের হাতে থাকে ব্যাপক ক্ষমতা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাবিনেট সিস্টেম সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রীরা নির্বাচিতও নন, এমনকি পার্লামেন্টের সদস্যও নন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার পছন্দ অনুযায়ী কয়েকজনকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এসব মন্ত্রীরা প্রেসিডেন্টের অধস্তন কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। প্রেসিডেন্ট চাইলে তাদেরকে যে-কোনো সময় বরখাস্ত করতে পারেন।
3. The Spoil System (সরকারি চাকরির সিস্টেম)
সরকারি চাকরিগুলো সাধারণত স্থায়ী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি আমলাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন বাংলাদেশে BCS পরীক্ষা, ভারতে ICS পরীক্ষা। একবার বিসিএস পাশ করে ক্যাডার হয়ে যাওয়ার পর রিটায়ার্ড না করা পর্যন্ত চাকরি থাকে। পাঁচ বছর পরপর সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি আমলারা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে প্রেসিডেন্টের নিজ দলের সমর্থকগণকেই নিযুক্ত করা হয়। পূর্বের প্রেসিডেন্টের আমলের ঐসমস্ত পদাধিকারীদের পদত্যাগ করতে হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট নতুন করে নিয়োগ দেন। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধার এই ভাগবাঁটোয়ারার ব্যবস্থাকে "Spoil System" বলে। তবে 'Pendleton Act' নামে নতুন একটি আইন প্রণয়নের পর নির্বাচনমূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নীতি স্বীকৃতি হয়েছে। তাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি চাকরির ২০ ভাগ স্পয়েল সিস্টেমে নিয়োগ, আর ৮০ ভাগ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়।
4. Judiciary (বিচার বিভাগ বা আদালত)
সরকারের যে বিভাগ আইন অনুসারে বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকে তাকে বলা হয় বিচার বিভাগ (সুপ্রিম কোর্ট)। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কর্তৃক গৃহীত যে-কোনো পলিসি এবং কংগ্রেসের পাশকৃত সিদ্ধান্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আদালত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। পুনঃনিরীক্ষণের পর আদালত যদি দেখে তাদের গৃহীত আইন বা পলিসিগুলো জনগণের স্বার্থবিরোধী, সংবিধান পরিপন্থি তখন আদালত সেগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। আর এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Judicial Review' বা 'বিচার-বিভাগীয় পুনঃনিরীক্ষণ'। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে সংবিধানের কোনো বিষয় সম্পর্কে মতপার্থক্য দেখা দিলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা সেটার ব্যাখ্যা (Clarification) দান করেন এবং সেই ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে রক্ষা করা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের। এসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ 'The Third House' (পার্লামেন্টের তৃতীয় কক্ষ) হিসেবে পরিচিত।
5. Three Branches of Government
A. Legislative: যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নাম কংগ্রেস। এই কংগ্রেসই হলো আইন বিভাগ। কংগ্রেসের কাজ হলো রাষ্ট্রের আইন তৈরি করা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নাম House of Representatives, যার নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা ৪৩৫। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এই ৪৩৫ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। আর কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম Senate, যার মোট সদস্য সংখ্যা ১০০ জন। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্য থেকে সমান হারে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সিনেট গঠিত হয়।
B. Executive: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন মন্ত্রী এবং স্পয়েল সিস্টেমে নিয়োগ পাওয়া সরকারি আমলাদেরকে একসাথে শাসন বিভাগ বলা হয়। এই শাসন বিভাগের কাজ হলো কংগ্রেসের তৈরিকৃত আইন বাস্তবায়ন করা।
C. Judicial: যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগ হিসেবে পরিচিত। বিচার বিভাগের কাজ হলো আইনের ব্যত্যয় ঘটলে সেটার বিচার করা।
6. Separation of Power (ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি)
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। এর মানে হচ্ছে, সরকারের উপরিউক্ত তিনটি ব্রাঞ্চকে স্বাতন্ত্র্য প্রদান করা। যেমন- আইন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে শুধু আইন বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। শাসনকার্য পরিচালনার সকল বিষয়ে শুধু শাসন বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। বিচার সংক্রান্ত সকল বিষয়ে শুধু বিচার বিভাগকেই কাজ করতে দেওয়া। অর্থাৎ এক বিভাগ অন্য বিভাগের উপর হস্তক্ষেপ করবে না, এক বিভাগ অন্য বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। তিনটি বিভাগ পরস্পরের থেকে স্বতন্ত্র থাকবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই রাষ্ট্রের সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বিচার বিভাগ স্বাধীন না। সেখানে সরকারি বা রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব থাকে। কিন্তু 'Separation of Power' নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো বিভাগ স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট অপরাধ করলেও বিচার বিভাগ তাকে ছাড় দেয় না। ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই হ্যামিল্টন, ম্যাডিসনের মতো নেতারা এটাকে মার্কিন শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। [সূত্র- মার্কিন সংবিধানের Article I, Article II, Article III]
7. A Rigid Constitution
১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান চালু হবার পর থেকে ২০২০ সাল অবধি এই সত্তর বছরে মোট ১০৪ বার সংশোধিত হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৭ বার। আরও কিছু উদাহরণ দেই। তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সংবিধানের ধারায় পরিবর্তন এনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। ২০১৮ সালের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সংবিধান সংশোধন করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত করেন। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২০ সালের জুলাইয়ে পুনরায় সংবিধান পরিবর্তন করছেন। আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া, উগান্ডা-সহ পুরো রিজিওনে সংবিধান সংশোধন করা যেন নিয়মিত ব্যাপার। একুশ শতকে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ-সহ বিশ্বজুড়েই সংবিধান সংশোধনের হিড়িক পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট নিজ স্বার্থে কিংবা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সংবিধান সংশোধন করার মতো সাহস দেখাতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, সেখানে সংবিধান পরিবর্তন করা এক কথায় দুরূহ এবং অসাধ্য (Cumbrous & Unwieldy)। এই কারণে ১৭৮৯ সাল থেকে এখন অবধি এই দীর্ঘ ২৩০ বছরে মাত্র ২৭ বার মার্কিন সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। প্রথমত, সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি শুধু উত্থাপনের জন্যই কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সর্মথন থাকা লাগবে। দ্বিতীয়ত, মোট ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৩৮টি অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় সংবিধান সংশোধনের সেই প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে হবে। ৩৮টি অঙ্গরাজ্য থেকে অনুমোদন পাওয়া কতটা দুরূহ (Rigid) আশা করি বুঝতে পেরেছেন। এমনকি সময়ের পরিবর্তনে এবং অনেক নতুন নতুন বিষয়ের আবির্ভাবের কারণে কখনো সাংবিধানিক জটিলতা কিংবা আইনের অস্পষ্টতা দেখা দিলে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেটা ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তাই মার্কিন সংবিধানকে একটি জীবন্ত সংবিধান (A Living Constitution) বলা হয়। [US Constitution, Article-V]
8. Dual Government (দ্বৈত সরকার)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুই স্তরে দুই ধরনের সরকার রয়েছে। এক. সমগ্র দেশের জন্য একটি জাতীয় বা কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। দুই. ৫০টি স্টেট এর আবার রয়েছে আলাদা আলাদা সরকার। অঙ্গরাজ্যগুলোতে একজন গভর্নর প্রধান হিসেবে কাজ করে। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক এই দুই স্তরে আলাদা আলাদা সরকার থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থাকে বলা হয় 'Dual Government' বা দ্বৈত সরকার। কেন্দ্রীয় ও প্রদেশে ক্ষমতা নিয়ে যেন দ্বন্দ্ব না বাঁধে সেজন্য সংবিধানে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। [Article 1, Section 8]
9. Peaceful Power Distribution
এরকম ফেডারেল সিস্টেমে ক্ষমতা আসলে কীভাবে ভাগ করা হয় সেটার কোনো নির্দিষ্ট থিওরি নেই। তবে সাধারণত ফেডারেল সিস্টেমের দেশগুলোতে দুটি নীতি লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষমতা কেন্দ্রকে দিয়ে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা রাজ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া। অপরটি হলো নির্দিষ্ট কতগুলো ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যকে দিয়ে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের ক্ষেত্রে মূলত প্রথম নীতিটি অনুসরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের তিন ধরনের ক্ষমতা (Power) রয়েছে। এই ক্ষমতাগুলো হলো:
A. Delegated Powers (হস্তান্তরিত ক্ষমতা): যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা লেখা রয়েছে। যেমন- মিলিটারি গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা, কর আরোপ করা, ঋণ গ্রহণ করা, দেশের মুদ্রা প্রচলন করা ইত্যাদি নির্দিষ্ট বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। সংবিধান অনুযায়ী এসকল বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন তিনি সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এসব নিয়ন্ত্রণ করবেন। আর এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকেই 'Delegated Powers' বলা হয়।
B. Implied Powers (অনুমিত ক্ষমতা): এমন কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে লেখা নেই। কিন্তু ক্ষমতাবলে একজন প্রেসিডেন্ট সে কাজগুলো করতে পারে। যেমন- শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও মজুরি বৃদ্ধির আইন করা (Minimum Wage), তামাক বা এলকোহল রেগুলেট করা (Regulating Tobacco), নাগরিকদের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈষম্য দূর করতে আইন করা (Banning Discrimination), যারা ট্যাক্স আদায় করে না তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা (Punishing tax evaders), সরকারি পোস্ট অফিসে বিভ্রান্তিকর মেইল পাঠানো রোধে পদক্ষেপ নেওয়া (Prohibition of mail fraud), যুদ্ধ বা ক্রান্তিলগ্নে মিলিটারি ড্রাফট তৈরা করা (Creation of the draft) ইত্যাদির ক্ষমতা সংবিধানে না থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার চর্চা করে। এগুলো সংবিধানে লিখিত আকারে নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতাবলে এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। আর এগুলোকেই Implied Powers বলা হয়।
C. Inherent Powers (অন্তনির্হিত ক্ষমতা): একটি রাষ্ট্রের সিকিউরিটি এর সাথে জড়িত পররাষ্ট্রনীতি। তাই জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়ে কিংবা সবাইকে জানিয়ে ভোটাভুটির ভিত্তিতে সকল ফরেইন পলিসি গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে যাচ্ছে, সেই রাষ্ট্র যদি আগেই জেনে যায় তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে তাহলে সেটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রেসিডেন্ট বা কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের সাথে গোপন আলোচনার মাধ্যমে কিছু কিছু পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে পারে। আর এই ধরনের ক্ষমতাকেই Inherent Powers বা অন্তনির্হিত ক্ষমতা বলা হয়।
এবার আসি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে। উপরিউক্ত তিন ধরনের ক্ষমতা ছাড়া বাকিসব বিষয় রাজ্য সরকারের অধীনে। পুলিশ, শিক্ষা, আইন, দেওয়ানি আইন, ফৌজদারি আইন, স্থানীয় শাসন, রাজ্যের ঋণ ইত্যাদি সকল কিছুর দায়িত্ব রাজ্যগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
10. Dual Citizenship (দ্বৈত নাগরিকতা)
দ্বৈত সরকারব্যবস্থার মতো নাগরিকত্বের ব্যাপারেও দ্বৈত নীতি অনুসৃত হয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং একইসাথে ব্যক্তি যে অঙ্গরাজ্যের অধিবাসী সেই অঙ্গরাজ্যের নাগরিক।
11. Dual Constitution
যুক্তরাষ্ট্রের একটি কেন্দ্রীয় সংবিধান রয়েছে। কিন্তু ৫০টি স্টেটের আবার পৃথক পৃথক সংবিধান রয়েছে। সবগুলো রাজ্যের সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংবিধানের [Art. 4(4)]। এমনকি অঙ্গরাজ্যগুলোর নাম ও তাদের সীমানা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কেন্দ্রের নেই। ভোটের হিসেব নিকেশ মিলাতে অনেকে রাজ্যের সীমানা পরিবর্তন করতে চায়, যেটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে টার্ম হিসেবে 'Gerrymandering' বলা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটগুলোতে এই টার্মটি অনেক বেশি শোনা যায়। নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় সরকার যেন কোনো অঙ্গরাজ্যের নাম কিংবা সীমানা পরিবর্তন করতে না পারে সেটারও আইন রয়েছে। মার্কিন সংবিধান অনুসারে রাজ্যগুলোর মতামত ছাড়া এর এলাকা বা সীমানা পরিবর্তন করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা
১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে 'Philadelphia Constitutional Convention' নামে একটি সাংবিধানিক সম্মেলন হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একদিকে সমগ্র জাতির প্রধান; অন্যদিকে শাসনবিভাগের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি (Double Position)। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এত ব্যাপক যে, এ উপাধিকে অনেকে 'রাজকীয় প্রেসিডেন্ট' (Royal Presidency) বলে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা শুধু জটিলই নয় বরং অনেক দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্টের নির্বাচন পদ্ধতিটি এই পর্বে সহজে তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রতি চার বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন হয়। তাই প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। একজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারেন। জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, কমপক্ষে ১৪ বছর আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস এবং সর্বনিম্ন ৩৫ বছর বয়সি; এই তিনটি শর্ত একসাথে পূরণ করে এমন ব্যক্তি নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারেন [Article 2]। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়; রিপাবলিকান পার্টি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি। একজন চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য অনেকগুলো জটিল স্টেপ পার করতে হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই আরেকটি জটিল পদ্ধতির মধ্য দিয়ে প্রার্থীদের মনোনয়ন নিতে হয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে বা কারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবে সেটাও নির্ধারিত হয় গণতান্ত্রিক উপায়ে। চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সাংবিধানিক পদ্ধতি রয়েছে।
Step-1: Caucus (ককাস)
মনে করুন আপনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। এখন আপনি যেই রাজনৈতিক দল থেকে প্রার্থী হতে চাচ্ছেন সেই দলের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে এই লিখে যে, 'আমি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে ইচ্ছুক”। মনে করুন ডেমোক্রেটিক দল থেকে মোট ৩০ জন প্রার্থী মনোনয়নের জন্য আবেদন করল। তখন দলের নির্ধারিত বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ নেতারা নানা বৈঠক ও আলোচনা করার পর সিক্রেট ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়ে সেখান থেকে কিছু যোগ্য প্রার্থী বাছাই করেন। দলের যে সকল সিনিয়র মেম্বাররা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজটি করেন তাদেরকে 'ডেলিগেট' বলা হয়। রাজনৈতিক দল কর্তৃক আয়োজিত নির্ধারিত ডেলিগেটদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ এই নির্বাচন পদ্ধতিটি ককাস হিসেবে পরিচিত।
Step-2: Primary (প্রাইমারি)
ককাসের আরেকটি রূপ হচ্ছে প্রাইমারি। ককাসে সাধারণত প্রার্থী বাছাই করে রাজনৈতিক দলের ডেলিগেটরা। কিন্তু প্রাইমারিতে প্রার্থী বাছাই করা হয় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত ভোটারদের মাধ্যমে। প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাইমারি পদ্ধতিটি আয়োজিত হয় অঙ্গরাজ্য সরকার কর্তৃক। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সরাসরি ভোটে প্রার্থী বাছাই করা হয়। আর এই প্রক্রিয়াকেই প্রাইমারি বলে। উল্লেখ্য, কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে শুধু ককাস হয়, কোনো অঙ্গরাজ্যে শুধু প্রাইমারি হয়, কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে আবার দুটোই হয়। কারণ অঙ্গরাজ্যগুলোর আইন ভিন্ন ভিন্ন।
Step-3: Super Tuesday (সুপার টিউসডে)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাশীদের দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ের আরেক নাম 'সুপার টিউসডে'। কিছু অঙ্গরাজ্য ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ককাস ও প্রাইমারি আয়োজন করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দিনে সবাই একসাথে ককাসের আয়োজন করে। বেশির ভাগ সময়ই সেই দিনটি হয়ে থাকে মার্চ কিংবা এপ্রিলের কোনো এক মঙ্গলবার। এদিন প্রায় ১২/১৫টি অঙ্গরাজ্যে একযোগে ভোটাভুটি হয়। মূলত 'সুপার টিউসডে'তে ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি থেকে কোন কোন প্রার্থী নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন তার একটি সম্ভাব্য ধারণা পাওয়া যায়। সে কারণেই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৮ সাল থেকে এ প্রথা চালু হয়।
Step-4: Party Presidential Debate (নির্বাচনি বিতর্ক)
নির্বাচন নিয়ে অনেক ধরনের ডিবেট রয়েছে। মূলত প্রার্থীদের বিচক্ষণতা, যোগ্যতা ও জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা হয় এসব ডিবেটে। যে ১০/১৫ জন প্রার্থী রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন পায় তাদেরকে নিয়ে "Republican Presidential Debate" অনুষ্ঠিত হয়। আর যারা ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মনোনয়ন পায় তাদেরকে নিয়ে "Democratic Presidential Debate" অনুষ্ঠিত হয়। এসব ডিবেট টেলিভিশনে প্রচার করা হয় এবং শ্রোতাদের থেকে রেটিং নেওয়া হয়। রেটিং থেকে বোঝা যায় জনগণ আসলে কাকে চাচ্ছে। এভাবে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ককাস, প্রাইমারি, সুপার টিউসডে, পার্টি নির্বাচনি বিতর্ক ইত্যাদি চলতে থাকে। এসবের মধ্যে যে ক্যান্ডিডেট সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকে তাকেই চূড়ান্ত হিসেবে মনোনীত করা হয়। তারপর দুই দল আলাদা আলাদা জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে। সেই সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি পার্টি থেকে একজন করে মাত্র দুইজনকে চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পুরোদমে শুরু হয় নির্বাচনি আমেজ। এই দুই ক্যান্ডিডেট নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। তারপর প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা তাদের রানিং মেট হিসেবে একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্ধারণ করেন। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা তাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে দুইটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। প্রথমত, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে তার পার্টি থেকে তার সাথে আরও যে ২০/২৫ জন প্রতিযোগিতা করেছিল তাদের মধ্যে যার সাপোর্টার বেশি ছিল তাকে প্রায়োরিটি দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এমন অঙ্গরাজ্যের একজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় যে অঙ্গরাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন- নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কামালা হ্যারিসকে। অথচ ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটে বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জো বাইডেনের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছিলেন এই কামালা হ্যারিস। জো বাইডেন চাইলে কামালা হ্যারিসের পরিবর্তে তার রানিং মেট হিসেবে বার্নি স্যান্ডার্স, এ্যামি ক্লোবোচার কিংবা তুলসি গ্যাভার্ড এদের মধ্যে থেকে যে কাউকে সিলেক্ট করতে পারতেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো তারপরেও কেন জো বাইডেন তার রানিং মেট হিসেবে কামালা হ্যারিসকে বেছে নিয়েছিলেন? উত্তর হচ্ছে Electoral College এর হিসেব নিকেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি (মোট ৫৫টি) ইলেক্টোরাল কলেজ হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের। আর কামালা হ্যারিস ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট একই অঙ্গরাজ্য থেকে হতে পারেন না।
Step-5: Presidential and Vice Presidential Debate
তারপর শুরু হয় ডিবেট। ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করা হয়ে গেলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে ৩টি, আর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ১টি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বলা হয়ে থাকে এই চারটি বিতর্কের উপরেই নির্ভর করে কে হবেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিতর্ক, প্রচারণা, সম্মেলন ইত্যাদি শেষে শুরু হয় সাধারণ নির্বাচন। নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরদিন মঙ্গলবার ভোট শুরু হয়। দুশো বছরের পুরোনো সিস্টেমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন হয়। বিশ্বের অন্য সব দেশের নির্বাচন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন অনেক জটিল এবং ভিন্ন।
অন্যান্য দেশে ভোটাররা সরাসরি প্রার্থী কিংবা দলকে ভোট দিয়ে থাকে। যে সবচেয়ে বেশি ভোট পায় তাকেই বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা কোন দল বা প্রার্থীকে ভোট দেন না। তারা মূলত তাদের রাজ্যের একদল মানুষকে (Electoral College) ভোট দিয়ে থাকেন। ওই মানুষগুলো হলো ইলেক্টর বা নির্বাচক। যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেস। এই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নাম হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদ। এই প্রতিনিধি পরিষদের মোট সদস্য ৪৩৫ জন। যুক্তরাষ্ট্রের যে ৫০টি অঙ্গরাজ্য রয়েছে সেগুলোকে জনসংখ্যার অনুপাতে ছোট ছোট ডিস্ট্রিক্ট এ ভাগ করা হয়েছে। যে অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যা বেশি সেই রাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য সংখ্যাও বেশি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বসবাস করে ক্যালিফোর্নিয়াতে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট থেকে মোট ৫৩ জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। অন্যদিকে আলাস্কা, ডেলওয়্যার, ভারমন্ট ইত্যাদি স্টেটে জনসংখ্যা অনেক কম। তাই এসব রাজ্যগুলোর প্রতিনিধি সংখ্যা মাত্র একজন করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের নাম সিনেট। সিনেটর হওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোর জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আয়তনের দিক থেকে স্টেট ছোট হোক কিংবা বড়, জনসংখ্যা বেশি থাকুক কিংবা কম এসব হিসেব করা হয় না। সমান অনুপাতে ৫০টি রাজ্য থেকে দুই জন করে মোট ১০০ জন সিনেটর কংগ্রেসে আসে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে কোন দুজন সিনেটর হবেন সেটা প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্যরা ভোটাভুটি করে ঠিক করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি ভারতের রাজধানী দিল্লির মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ১৯৬৪ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সেখান থেকেও তিনজন সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে মোট সদস্য কত জন হলো?
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ৪৩৫ জন (Representatives)
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ (Senate) ১০০ জন
ওয়াশিংটন ডিসি বা ডিস্ট্রিক্ট অব ৩ জন কলম্বিয়া
মোট: ৫৩৮ জন
তাই দুটি দল কংগ্রেসের সমসংখ্যক এই ৫৩৮ জনকে নিয়ে প্যানেল গঠন করে। এদেরকে একসাথে বলা হয় ইলেক্টোরাল কলেজ (Electoral College)। স্বচ্ছতা রক্ষার্থে মার্কিন কংগ্রেসের যে-কোনো কক্ষের সদস্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর্মচারী ইলেক্টোরাল কলেজের ইলেক্টর হতে পারবে না। সবগুলো অঙ্গরাজ্য মিলিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টর থাকে এবং রিপাবলিকান পার্টি থেকেও মোট ৫৩৮ জন ইলেক্টর থাকে। সুতরাং সাধারণ ভোটাররা তাদের অঞ্চলের এই ইলেক্টরদের ভোট দেন। আর এটাকে বলা হয় 'Popular Vote'। অর্থাৎ জনগণ ভোট দেবেন ইলেক্টরদেরকে। জনগণের ভোটে যে-সকল ইলেক্টররা বিজয়ী হন তারা একমাস পর তথা ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় বুধবারের পর প্রথম যে সোমবার আসে সেদিন নিজ নিজ রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেন। আর এটাকে বলে 'Electoral Vote'। অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় ইলেক্টররা, তারপর এসব বিজয়ী ইলেক্টরদের ভোটে নির্বাচিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাই যে দল থেকে মোট ২৭০ জন ইলেক্টর বা তারও বেশি ইলেক্টর জয়ী হবে তারাই পরবর্তী সরকার গঠন করবে। এভাবে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তারপর ২০ জানুয়ারি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে নিয়ে এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উল্লেখ্য, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ইলেক্টররা তাদের দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকেই ভোট দেয়। কিন্তু সে তার দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে বিরোধী দলের প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারে। ধরুন আপনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন ইলেক্টর হিসেবে জয়ী হয়েছেন, এখন আপনার এই ইলেক্টোরাল ভোটটি আপনি ডেমোক্রেটিক দলকে না দিয়ে রিপাবলিকান দলকেও দিতে পারেবেন। কিন্তু এটা বিশ্বাসঘাতকতা হয় বলে এমনটি কখনোই হয়নি। এমনকি কিছু অঙ্গরাজ্যে আইনও রয়েছে যে, কেউ যদি এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।
নির্বাচন নিয়ে খুঁটিনাটি
Contingent Election (সাপেক্ষ নির্বাচন)
যদি কোনো প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান তাহলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিষয়টি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের কাছে চলে যায়। তখন হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন এবং কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ভাইস প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করবেন। এটাকেই বলা হয় Contingent Election বা সাপেক্ষ নির্বাচন। এরকম যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মাত্র একবারই ঘটেছিল; ১৮২৪ সালে। সেবছর কোনো প্রার্থীই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভদের ভোটে জন কুইন্সি এ্যাডামস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অনেক আগে এরকম নিয়মও ছিল যে, সর্বোচ্চ ইলেক্টোরাল ভোট যিনি পাবেন তিনি হবেন প্রেসিডেন্ট। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট যে পাবেন তিনি হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৮০০ সালে জেফারসন ও বারের মধ্যে এরকম হয়েছিল। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে দুই পক্ষের দুইজন হওয়ায় এই নিয়ম বাতিল করা হয়।
Line of Succession (শূন্য পদ পূরণ)
প্রেসিডেন্টের স্বাভাবিক কার্যকাল ৪ বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হলে কিংবা প্রেসিডেন্ট মারা গেলে তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। যেমন- ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হয়েছিলেন। ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগ করলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্টের পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। যদি ভাইস প্রেসিডেন্টও মারা যায় কিংবা প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ই একসাথে অক্ষম হয়ে পড়ে তাহলে সেক্রেটারি অব স্টেট, তারপর প্রতিরক্ষা সচিব, তারপর অ্যাটর্নি জেনারেল পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে এরকম কখনো হয়নি যে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়ই একসাথে মারা গিয়েছেন বা একসাথে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
Temporarily Transferring Power (সাময়িক ক্ষমতা হস্তান্তর)
প্রেসিডেন্ট অসুস্থতার কারণে কংগ্রেসকে লিখিতভাবে জানিয়ে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিতে পারেন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর প্রেসিডেন্ট সুস্থ হয়ে উঠলে পুনরায় প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব পালন করেন [সোর্স- Section 3 of 25th Amendment)। যেমন- সম্প্রতি জো বাইডেন কোলন পরীক্ষার অংশ হিসেবে এক ঘণ্টা ২৫ মিনিট অ্যানেস্থেসিয়ার (অবেদন বা অচেতন) অধীনে ছিলেন। বাইডেনের এই পরীক্ষার সময় কামালা হ্যারিস ৮৫ মিনিটের জন্য দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন।
Why Tuesday & November? (কেন নভেম্বরের মঙ্গলবারেই ভোট হয়?)
মনে হতে পারে পপুলার ভোট কেন নভেম্বর মাসে এবং মঙ্গলবারে হয়? শুরুর দিকে ভোটের প্রতি মানুষের এত আগ্রহ ছিল না। দেখা যেত মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ কেবল ভোেট দিতে আসত। তাই ভোট প্রদানের হার বৃদ্ধির জন্য তৎকালীন নেতারা ছুটির দিনকে বাছাই করেছিল। এভাবে ১৮৪৫ সাল থেকেই নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়ম চলে আসছে। কারণ তখন আমেরিকা ছিল কৃষিপ্রধান দেশ। ভোট কেন্দ্র ছিল অনেক দূরে। ঘোড়াগাড়িতে করেও ভোটকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় লেগে যেত কৃষকদের। তার মধ্যে শনিবার ছিল কাজের দিন। রবিবারে আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান নাগরিকদের ধর্মকর্মের দিন এবং বুধবার ছিল বাজারের দিন। ফলে সোমবারকে যাতায়াতের সুবিধার্থে রেখে মঙ্গলবারকেই ভোট দেওয়ার দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। আর মাস হিসেবে নভেম্বরকে বেছে নেওয়ার কারণ সে সময় নভেম্বর মাস পড়তে পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে ফসল কাটা শেষ হয়ে যেত। নভেম্বর শেষ হতেই শীত নামত। তখন সবাই অবসর থাকত।
Symbol for Election (নির্বাচনের প্রতীক)
রিপাবলিকান দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন থমাস জেফারসন, আর ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু জ্যাকশন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক হচ্ছে গাধা। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক কার্টুন প্রচুর জনপ্রিয়। কথিত আছে ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী অ্যান্ড্রু জ্যাকশনকে প্রতিপক্ষরা 'জ্যাকঅ্যাস' বা গাধা নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে একজন কার্টুনিস্ট জ্যাকের চেহারা সম্বলিত এক গাধার ছবি আঁকেন। যা অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের পছন্দ হয়ে যায়। তাই তিনি গাধাকে নিজের দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন। তখন থেকেই ডেমোক্র্যাটদের প্রতীক হয় গাধা। তাদের মতে গাধা হচ্ছে কষ্টসহিষ্ণুতার প্রতীক। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হলো হাতি। ১৮৭৪ সালে এক রিপাবলিকান কার্টুনিস্ট একটি কার্টুন আঁকেন। সেখানে দেখানো হয় একটি গাধা বনের অন্যান্য প্রাণীদের ভয় দেখাচ্ছে। তখন সকল প্রাণীরা ভয় পেলেও শুধু একটি হাতি ভয় পায়নি। হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই হাতিকে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে রিপাবলিকানরা গ্রহণ করে。
Winner Takes All (সবকিছুই বিজয়ীদের)
সাধারণত কোনো রাজ্যে যে প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান সব ভোট তার পক্ষে চলে যায়। যেমন ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মোট ইলেক্টোরাল ভোট ২৯টি। ধরুন রিপাবলিকানরা পেল ১৩টি, আর ডেমোক্র্যাটরা পেল ১৬টি। যেহেতু ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছে তাই এই রাজ্যের ২৯টি ইলেক্টোরাল ভোটই ডেমোক্র্যাটদের হয়ে যাবে। এটাকেই টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Winner Takes All' বা বিজয়ীরা সব নিয়ে নেবে। এটার কারণেই অনেকে পপুলার ভোেট বেশি পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিন্টন ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে ত্রিশ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েছিলেন। কিন্তু ইলেক্টোরাল ভোেট ট্রাম্প বেশি পাওয়ায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। শুধু নেব্রাস্কা ও মাইন এই দুইটি অঙ্গরাজ্য ছাড়া সকল রাজ্যেই Winner takes all এই নিয়ম। অর্থাৎ নেব্রাস্কা ও মাইনে যে যত ভোট পাবে ততই হিসেব করা হবে।
Impeachment (অভিশংসন)
নির্বাচিত হওয়ার পর যদি কোনো প্রেসিডেন্ট দুর্নীতিমূলক বা বেআইনি কাজ করেন (misdemeanors), যদি তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার অভিযোগ ওঠে (treason), যদি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে (bribery), তাহলে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর এটাকেই 'Impeachment' বা অভিশংসন বলা হয়। তবে অভিশংসনের প্রক্রিয়াটি জটিল। এই প্রক্রিয়াটি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভে শুরু হয়, নিম্নকক্ষে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রেসিডেন্ট অভিশংসনের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় তাহলে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে পাশ হতে আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটে যায়। সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেলে একজন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়। তবে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখনো হয়নি। কেননা এতে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। তাই প্রেসিডেন্ট অপসারণের প্রস্তাব কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে পাশ হলেও উচ্চকক্ষ সিনেটে কখনো পাশ হয় না। ১৯৭৪ সালে রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে বেআইনি কাজের অভিযোগ উঠলে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হবার পূর্বেই নিক্সন পদত্যাগ করেন। আবার অ্যান্ড্রু জ্যাকশনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেটা আর পাশ হয়নি। "Former Presidents Act of 1958" এই এক্টের অধীনে সকল প্রেসিডেন্ট তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পেশাল সিকিউরিটি, পেনশন ফি, বার্ষিক ট্রাভেল ভাতা এসব পেয়ে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় আসতে সম্পূর্ণ জনগণের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। তারা জনগণকে অনেক গুরুত্ব দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- নাগরিকরা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে Issues, Characteristics এবং Loyalty এই তিনটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয় সে কাকে ভোট দেবে।
1. Issues (গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু) : চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এর উপর ভিত্তি করে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমটি হলো Retrospective Issue। এর মানে হলো যারা ক্যান্ডিডেট বা প্রার্থী তাদের অতীতের রাজনৈতিক পারফরম্যান্স কেমন ছিল। দ্বিতীয়টি হলো Prospective Issuel তথা যারা ক্যান্ডিডেট তাদের ভবিষ্যতের পারফরম্যান্স কেমন হতে পারে এটা অনুমান করে নিয়ে। প্রার্থীরা ভবিষ্যতে কেমন হবে এটা অনুষ্ঠিত তিনটি প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেট ও রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন দেখে ভোটাররা সহজেই অনুমান করতে পারে। তৃতীয় ইস্যুটি হচ্ছে Special issues। অর্থাৎ প্রতিটি রাষ্ট্রেরই কিছু স্পেশাল ইস্যু থাকে যেগুলো নিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিক দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রে Abortion (গর্ভপাত), Minimum Wage (শ্রমিকদের বেতন), Immigration (অভিবাসন), Gun laws (বন্দুক আইন) এগুলো হচ্ছে স্পেশাল ইস্য। আপনি যদি গর্ভপাতকে সমর্থন করেন তাহলে যে প্রার্থী গর্ভপাতকে সমর্থন করে আপনি তাকেই ভোট দেবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা Abortion এর বিপক্ষে কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা পক্ষে। একই ভাবে রিপাবলিকানরা চায় শ্রমিকদের মজুরি কমাতে কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা চায় মজুরি বাড়াতে। ডেমোক্র্যাটরা চায় বন্দুক আইন কঠোর করতে, রিপাবলিকানরা চায় শিথিল করতে। তবে ব্যক্তিভেদে এটা পরিবর্তনও হতে পারে। আর চতুর্থটি হলো Valence Issues। ভ্যালিয়েন্স হচ্ছে ক্যান্ডিডেট নিজে এবং তার রানিং মেট-সহ (ভাইস প্রেসিডেন্ট) যাদেরকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কেমন হবে অথবা তারা সৎ কি না ইত্যাদি বিবেচনা করে ভোটাররা তাদের প্রার্থী পছন্দ করে।
2. Candidate characteristics (প্রার্থীর বৈশিষ্ট্য): ভোটাররা প্রার্থীদের ধর্ম, বর্ণ, সততা, দৃঢ়সংকল্প, অঞ্চল ইত্যাদি দেখে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কাকে ভোট দেবে।
3. Party Loyalty (দলীয় আনুগত্য): কিছু ভোটার রয়েছে যারা ছোটবেলা থেকে যে দলকে সমর্থন করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই দলকেই ভোট দেয়। এটা হতে পারে নিজেদের মতাদর্শের সাথে দলের মতাদর্শের মিল থাকার কারণেও। আবার মেরিল্যান্ড, মিশিগানের মতো কিছু অঙ্গরাজ্য আছে যেখানে ডেমোক্র্যাটরা সবসময় বিজয়ী হয়, তাই সেগুলোকে ব্লু স্টেট (Blue state) বলে। একই ভাবে মিসিসিপি, এলাবামার মতো কিছু রাজ্যে রিপাবলিকানরা সবসময়ই বিজয়ী হয়। তাই সেগুলোকে রেড স্টেট (Red state) বলে। আবার টেক্সাস, ফ্লোরিডা, জর্জিয়ার মতো রাজ্যগুলো দোদুল্যমান, কেউ জানে না এসব স্টেটে কে জিততে পারে। তাই এগুলোকে 'Battle Ground' বা 'Swing states' বলে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
বিশ্বের যে-সকল দেশে Two Party System বা দ্বিদলীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল মোট দুইটি; ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টি। রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক পার্টি মূলত উদারতাবাদে বিশ্বাসী। আর রিপাবলিকান পার্টি কিছুটা রক্ষণশীল ধ্যানধারণা লালন করে। রিপাবলিকান পার্টি Grand Old Party (GOP) হিসেবেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে প্রেসিডেন্টশিয়াল ডিবেটগুলো দেখা আবশ্যকীয়। প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটগুলোতে মূলত কী নিয়ে আলোচনা হয়? আপনি যদি কোনো একটি ডিবেট দেখে থাকেন তাহলে লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ডিবেটের যিনি মডারেটর থাকেন তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে প্রশ্ন করে। উদাহরণস্বরূপ: সরাসরি এরকম প্রশ্ন করা হয় যে, আপনি যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন তাহলে ইকোনমি নিয়ে আপনার পলিসি কী হবে? ইমিগ্রেশন নিয়ে আপনার পলিসি কী হবে? চীনের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন হবে? বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধরে রাখতে আপনার পলিসি কী হবে? রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কূটনৈতিক এসবের পলিসি কেমন হবে এসব নিয়ে ডিবেট হয়।
আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে Ideology বা মতাদর্শ নিয়ে তেমন বিতর্ক হয় না বললেই চলে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান এই দুইটি দলের মধ্যে বিতর্ক হয় মূলত রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি ও আইন নিয়ে। পলিসি ভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিদের নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো ধোঁয়াশা বা অস্পষ্টতা থাকে না। কারণ আপনি ক্ষমতায় গেলে সোশ্যাল, ইকোনমি, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে আপনার পলিসি বা নীতি কী হবে তা আপনাকে আগেই স্পষ্ট করে বলে দিতে হয়। পলিসি নির্ভর এধরনের রাজনীতিকে টার্ম হিসেবে 'Programmatic Politics' বলা হয়। তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে জনগণকে একটি পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। অনেকে আবার এটাকে 'Politics Meets Policies' হিসেবেও আখ্যায়িত করে।
বিভিন্ন ন্যাশনাল পলিসি
যে-কোনো রাষ্ট্রের পলিটিক্স সাধারণত দুইভাগে বিভক্ত- জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। একটি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে যে রাজনীতি হয় সেটাকে সাধারণত জাতীয় রাজনীতি বা Domestic Politics বলা হয়। অন্যদিকে একটি রাষ্ট্রের সাথে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপন, কূটনৈতিক আলোচনা, ফরেইন পলিসি ইত্যাদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা International Politics বলা হয়। তাই প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতির কয়েকটি পলিসি নিয়ে আলোচনা করব।
First Policy - অভিবাসন নীতি
এই নীতিটি খুবই চমকপ্রদ। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বা ইমিগ্রেশনের তিনটি পলিসি রয়েছে। ১ম পলিসি, দেশের অধিকাংশ জনগণ জাতীয়তাবাদের কারণে সমর্থন করে না, ২য় পলিসি- অল্পবয়সি শিশুদের জেলে আটক করে, ৩য় পলিসি- শিশুদেরকে পিতামাতার থেকে আলাদা করে। এই সিচুয়েশনে ধরুন আপনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তাহলে এই তিনটি পলিসির কোনটি গ্রহণ করতেন? আপনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবেন তখন আপনাকে স্পষ্টভাবে জনগণকে বলে দিতে হবে আপনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইমিগ্রেশনের এই তিনটি পলিসির কোনটি গ্রহণ করবেন।
ক. Catch and Release policy: যারা সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে চায় অথবা লিগ্যাল উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চায় তাদেরকে প্রথমে একটি সেন্টারে নিয়ে সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। অভিবাসন প্রার্থীরা কোনো ক্রিমিনাল কি না, চোরাচালান বা মাদক ব্যবসায়ী কি না এসব যাচাই করা হয়। যদি এসব না হয় তাহলে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হতো। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীল এই পলিসি নিয়েছিলেন। বর্তমানে জো বাইডেন আরও কিছু নিয়ম যোগ করা সাপেক্ষে এটাকেই সমর্থন করছেন। বিরোধী দল রিপাবলিকানরা জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে এই পলিসির প্রচণ্ড বিরোধিতা করে থাকে। রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করতেন এই পলিসিটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর। কারণ অন্য দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইউএস নাগরিকদের চাকরিগুলো দখল করে নিচ্ছে।
খ. Family Detention: অভিবাসনের দুই নম্বর এই নীতিটি হলো মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যারাই যুক্তরাষ্ট্রে আসবে তাদেরকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যারা যুক্তরাষ্ট্রে আসত তারা অধিকাংশই সপরিবারে, ছোট বাচ্চা বা সন্তানাদি নিয়ে আসত। ছোট ছোট বাচ্চা-সহ সপরিবারে সবাইকেই আটক করা হতো। এখন কথা হলো শিশুরা বা ছোট বাচ্চারা তো নিরপরাধ। পিতামাতার সাথে তারা এসেছে। তারা তো কিছুই বুঝে না, পিতামাতা না আসলে তারা তো আসত না। এখন বিনা অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্ক এই শিশুদের জেলে আটক রাখা কতটা যৌক্তিক? ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার দেড় বছর পর্যন্ত এই পলিসিটি ছিল। পরবর্তীতে ডেমোক্র্যাট ও সিভিল সোসাইটির কঠোর সমালোচনায় এই পলিসি থেকে সরে গিয়ে তৃতীয় পলিসিটি গ্রহণ করেন।
গ. Family Separation: এই তৃতীয় পলিসিটি হলো যারা পরিবার-সহ সীমান্তে আটক হবে তাদের মধ্যে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদেরই আটক রাখা হবে, সাথে যে-সকল ছোট বাচ্চা বা শিশু থাকবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। মনে করুন পিতামাতা ও তাদের পাঁচ বছরের দুইটি সন্তান সীমান্তে আটক হলো। এখন পিতামাতাকে ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রেখে সন্তান দুজনকে ছেড়ে দিলেন। এখন ডেমোক্র্যাটদের প্রশ্ন হলো পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানদের সেপারেট বা আলাদা করার অধিকার কারো নেই। এখানে সন্তানদের পিতামাতার সাথে বসবাসের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
আসলে ইমিগ্রেশন বা অভিবাসনের উপরিউক্ত তিনটি পলিসির মধ্যেই ঝামেলা রয়েছে। যে- কারণে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীদের ইমিগ্রেশন পলিসি নির্ধারণ করতে হিমশিম খেতে হয়। ইমিগ্রেশন নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন একটি পরিভাষা যুক্ত করেছেন। ট্রাম্প সেই পরিভাষাটির নাম দিয়েছেন "Chain Migration" হিসেবে। এই চেইন মাইগ্রেশনের মানে হলো, প্রথমে আপনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন, কয়েকবছর সেখানে বসবাস করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করবেন। তারপর আপনার ছোট ভাইকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসবেন। আপনার ছোট ভাই আবার কয়েকবছর পর আপনার পিতামাতাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসল। এভাবে আপনার পুরো পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল। তাই ট্রাম্প এই পুরো প্রসেসটার নাম দিয়েছেন Chain Migration। তাই ট্রাম্প তার ক্যাম্পেইনে বলতেন- They should go back to their first country!
Second Policy- ট্যাক্স বা শুল্ক নীতি
এই পলিসিটি বুঝতে হলে আমাদের ট্যাক্সের প্রকারভেদ আগে জানা আবশ্যক। ট্যাক্স সাধারণত তিন প্রকার:
ক. Progressive tax: ইনকাম বা আয়ের অনুপাতে ট্যাক্স। আমার ইনকাম বাড়লে ট্যাক্স বাড়বে। ইনকাম কমে গেলে ট্যাক্সের পরিমাণও কমে যাবে।
খ Regressive tax: এটা মূলত ইন্ডাস্ট্রি ট্যাক্স। আমার ইনকাম যত বাড়বে আমার ট্যাক্স তত কমবে। ধরুন আপনার ইনকাম দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন আপনার ট্যাক্সের পরিমাণও কমতে থাকবে।
গ Proportionate tax: এটা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধার্যকৃত ট্যাক্স। অনেক সময় সরকার কিছু স্পেসিফিক কারখানা বা কর্পোরেশনের উপর এটা ধার্য করে থাকে। আপনার ইনকাম হোক বা না হোক, ব্যবসায় লাভ লোকসান যাই হোক না কেন; আপনাকে বছর শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স সরকারকে দিতেই হবে।
ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান: জো বাইডেন ও ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত Progressive tax এর পক্ষে। তাদের মতে যে কর্পোরেট যত বেশি ইনকাম করবে সে কর্পোরেট তত বেশি ট্যাক্স দেবে। তা না হলে দেশে Income inequality বা আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।
রিপাবলিকানদের অবস্থান: রিপাবলিকানরা মনে করে একটি কোম্পানি বা কর্পোরেশনের যত বেশি ইনকাম হবে তত বেশি তাদের ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, আর যত ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে তত জব সৃষ্টি হবে। তাই এসব জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর উপর ট্যাক্স কমিয়ে দিলে অনেক জব সৃষ্টি হবে, সাথে বেকারত্বের হারও কমবে। আর Proportionate tax নিয়ে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলের অবস্থান একই।
Third Policy- ইকোনমি বা অর্থনীতি
অর্থনীতি নিয়ে দুইটি পলিসি রয়েছে।
ক. Supply Side Economy: এই নীতিটি রিপাবলিকানরা সাপোর্ট করেন। সাপ্লাই সাইড ইকোনমি হলো- যে-সকল কর্পোরেশন আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য তৈরি করে বা যোগান দিয়ে থাকে, সেইসব কলকারখানার উপর অধিক পরিমাণে ট্যাক্স ধার্য না করা। রিপাবলিকানরা সবসময় মনে করেন একটি দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে ঐ দেশের বড় বড় কর্পোরেশন বা কলকারখানাগুলোর উপর। কারণ এধরনের কর্পোরেশনগুলো অসংখ্য জব সৃষ্টি করে। তাই রিপাবলিকানরা সবসময় "কর্পোরেট Tax" কমানোর পক্ষে। তারা মনে করে যদি এসব কর্পোরেশনের উপর অধিক পরিমাণে ট্যাক্স আরোপ করা হয় তাহলে ট্যাক্সের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে জব বা চাকরি কমে যায়। ফলস্বরূপ দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। তাই রিপাবলিকান প্রার্থীদের দেখবেন যে ডিবেট বা ক্যাম্পেইনে তারা অসংখ্য বার এই "Job" শব্দটি উচ্চারণ করে। ঠিক একই ভাবে এসব কলকারখানাগুলোর কারণে পরিবেশ দূষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন হয়, তাই রিপাবলিকানরা "Climate change" নিয়ে তেমন কোনো পলিসি নেয় না। তারা মনে করে জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষের হাত নেই। এটা প্রাকৃতিক। ট্রাম্পের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। (রিপাবলিকানরা অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান ও হাইকের লিবারেল ইকোনমি দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত)
✔ Demand Side Economy: ডেমোক্রেটরা এই পলিসিটি সমর্থন করে। ডিমান্ড সাইড ইকোনমি সাধারণত কর্পোরেট ট্যাক্সকে সমর্থন করে। ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন দেশে কর্পোরেট জায়ান্ট বা ধনিকশ্রেণি হলো মুষ্টিমেয়। আর যারা ভোক্তা বা কনজিউমার তারা অধিকাংশই মধ্যম আয়ের পরিবার। তাই অধিকাংশ ভোক্তারা টাকার অভাবে প্রোডাক্ট ক্রয় করতে পারে মিলিটারি অভ্যুত্থান। তাই আমাদের উচিত কর্পোরেট সেক্টর থেকে অধিক পরিমাণে ট্যাক্স নিয়ে এসকল মধ্যবিত্ত পরিবারদের মধ্যে বণ্টন (Redistribution) করে দেওয়া। তাই জো বাইডেন-সহ ডেমোক্র্যাটরা সবসময় Middle Class Family নিয়ে কথা বলে। একই ভাবে একটি কারখানায় যতবেশি পণ্য উৎপাদন হয় ততবেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। আর কার্বন নিঃসরণ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত সে-কারণে ডেমোক্র্যাটরা সবসময় Climate change নিয়ে কথা বলে। (ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত জন মেইনার্ড কেইনসের 'Interventionist economy" দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত)
Fourth Policy- সামাজিক নীতি/Social policy
সামাজিক পলিসিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে "Kitchen Table Issues" বলা হয়। অর্থাৎ রান্না বা খাবার ঘরে বসে আমরা প্রতিদিন যে সকল বিষয় আলোচনা করে থাকি সেগুলো সামাজিক পলিসির অন্তর্ভুক্ত। যেমন- খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি।
ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানঃ জো বাইডেন বা ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত স্বাস্থ্য বিমা বা কম খরচে চিকিৎসা সেবা, বয়স্ক বা বেকার ভাতা, শিক্ষা ক্ষেত্রে খরচ কমানো বা Free School Bussing এসবের পক্ষে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে "Welfare State" বলে।
রিপাবলিকানদের অবস্থানঃ রিপাবলিকানরা সাধারণত স্বাস্থ্য বিমার বিপক্ষে, মিডল ক্লাস ফ্যামিলির চেয়ে তারা বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে পুঁজিপতিদের।
5th policy- Foreign policy/বৈদেশিক নীতি
বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকানদের মধ্যে পলিসিগত তেমন কোনো অমিল নেই। যেমন- রাশিয়া, চায়না, ইরান এসকল দেশ ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই শত্রু। একই ভাবে ইসরায়েল, সৌদি আরব, ভারত উভয় দলেরই মিত্র রাষ্ট্র। কিন্তু এসব রাষ্ট্রগুলোর সাথে উভয় দলের কিছু আচরণগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন- ডোনাল্ড ট্রাম্প যা করতেন তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন, Hard Power বা Economic Sanctions এসবের ভয় দেখিয়ে সরাসরি কাজ আদায় করে নেন। কিন্তু ডেমোক্রেটিকরা বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সরাসরি বা প্রকাশ্যে কিছু না বলে কূটনীতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। বারাক ওবামা ও জো বাইডেন এর পররাষ্ট্রনীতি তাই বলে।
Question to think about?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরো দুনিয়া থেকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের এই অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সেখানে স্বৈরাচারবিরোধী বা গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে বিশালাকারের গণ আন্দোলন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে-কারণে ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু চীনে একদলীয় শাসনব্যবস্থা হওয়ায় ভবিষ্যতে সেখানে বড় ধরনের গণ আন্দোলন দেখা দিতে পারে। তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের এই অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থাই চীনের একক পরাশক্তি হওয়ার পেছনে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Raskin, Jamie (2022), Unthinkable: Trauma, Truth, and the Trials of American Democracy, Harper
2. Marche, Stephen (2022), The Next Civil War: Dispatches from the American Future, Avid Reader Press
3. Maddow, Rachel and Yarvitz, Michael (2020), Bag Man: The Wild Crimes, Audacious Cover-Up, and Spectacular Downfall of a Brazen Crook in the White House, Crown
4. Schweizer, Peter (2022), Red-Handed: How American Elites Get Rich Helping China Win, Harper
5. Maisel, Sandy and Brewer, Mark D. (9th ed. 2020), Parties and Elections in America: The Electoral Process, Rowman & Littlefield Publishers
6. Hetherington, Marc J. and Keefe, William J. (11th ed. 2009), Parties, Politics, and Public Policy in America, CQ Press
7. Edwards III, George C.; Wattenberg, Martin, and Lineberry Robert L. (16th ed. 2013), Government in America: People, Politics, and Policy, Pearson Custom Publishing
8. Chamberlain, Lawrence H (1996), The President, Congress and legislation
9. Agar, Herbert (1950), The United States: The Presidents, the Parties & the Constitution
10. Axinn, June and Stern, Mark J. (2007), Social Welfare: A History of the American Response to Need, Boston: Allyn & Bacon
11. Cramer, Richard Ben (1993), What It Takes: The Way to the White House, Vintage