📄 পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি
ভূমিকা: বিশ্ব দরবারে একটি রাষ্ট্রের অবস্থান কেমন হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ঐ রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে কতটা দক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী। আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার মতো পরাশক্তিরা কেন আজ বিশ্বের বুকে নিজেদের শক্তিমত্তা দাপটের সাথে প্রদর্শন করছে? এর কারণ খুঁজলে আমরা দেখতে পাব তাদের পররাষ্ট্রনীতি কতটা দক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী। আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক বোমার আঘাতে ঝলসে যাওয়া একটি রাষ্ট্র জাপান কীভাবে তার দক্ষ কূটনীতিকে কাজে লাগিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, সমসাময়িক বিশ্বে কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। এই সাহায্য আদায়ের লক্ষ্যে রাষ্ট্র নানা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। আর এই কৌশলের বহিঃপ্রকাশ ঘটে কূটনীতির মাধ্যমে। তাই কূটনৈতিক রণকৌশল বা Diplomatic Manoeuvres সাজাতে রাষ্ট্রকে কতগুলো ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিতে হয়। এই অধ্যায়ে আমরা পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। সর্বশেষ সমসাময়িক কূটনৈতিক অঙ্গনে বহুল ব্যবহৃত কিছু কূটনৈতিক পরিভাষা নিয়ে থাকবে আলোচনা।
পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান
একটি দেশের সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক পলিসি হচ্ছে পররাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত হওয়ায় এগুলো টপ সিক্রেট। তাই একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কী সেগুলো আমরা জানি না। তবে রাষ্ট্রের আচরণ থেকে সেই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ধরনটি (Nature) আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিছু অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত বিষয় মাথায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হয়। যেগুলোকে আমরা Determinants of Foreign Policy বলে থাকি।
পররাষ্ট্রনীতির অভ্যন্তরীণ উপাদান:
1. Geographical Location (ভৌগোলিক অবস্থান): মানচিত্রে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অন্যতম নিয়ামক। বঙ্গোপসাগরের একটি কাছাকাছি রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার চারদিকে সমুদ্র থাকায় দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নৌবাহিনীর উপর গুরুত্বারোপ করতে হয়। ভূ-বেষ্টিত আফগানিস্তান সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্য ইরান ও পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করতে হয়। তাই আফগান সরকারকে ইরান ও পাকিস্তানের কথা বিবেচনায় নিয়ে তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়।
2. Size of the state (রাষ্ট্রের আকার): আয়তনের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র কত বড়, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সেটি গুরুত্ব পায়। চীন আয়তনে এত বিশাল যে তার সাথে মোট ১৪টি রাষ্ট্রের সীমানা রয়েছে। তাই এই ১৪টি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কথা বিবেচনায় নিয়ে চীনকে তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হয়। ভৌগোলিক ভিন্নতার কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক স্ট্র্যাটেজিও ভিন্ন হয়। ভৌগোলিকভাবে রাশিয়ার রয়েছে বিশাল সীমানা কিন্তু ভুটান, টুভ্যালু, নাউরু, এস্তোনিয়া, বেনিন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আয়তনে অনেক ছোট। তাই রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সাথে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি মিলবে না।
3. Population (রাষ্ট্রের জনগণ): পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে একটি রাষ্ট্রের জনগণের চাহিদা ও জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী সৌদি আরব, ইরান, কাতার, কুয়েত-সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে; যেখান থেকে বাংলাদেশ প্রচুর রেমিট্যান্স পাচ্ছে। তাই যে সকল দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে সেসব দেশকে গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে। একই ভাবে ভারত প্রযুক্তিগত দিক থেকে তুলনামূলক অনেক উন্নত। টুইটার, গুগল, আইবিএম, মাইক্রোসফট-সহ বহু প্রতিষ্ঠানের সিইও এখন ভারতীয়। এছাড়াও বহু বায়োট্যাক, ফার্মা প্রতিষ্ঠানের সিইও আছে ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক ইন্ডাস্ট্রি এবং ডাক্তারি পেশায় রয়েছে ভারতীয়দের দাপট। কানাডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকরা এমপি-মন্ত্রী হচ্ছে। তাই বর্তমানে প্রতিবেশী দুর্বল ও ছোট রাষ্ট্র মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ইত্যাদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী কানাডা, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মরিয়া ভারত। অর্থাৎ রাষ্ট্রের জনগণ শিক্ষিত ও প্রভাবশালী হলে সেদেশে পররাষ্ট্রনীতিও শক্তিশালী হয়।
4. Economic Resources (অর্থনৈতিক সক্ষমতা): অর্থনৈতিক শক্তি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের আরেকটি অন্যতম উপাদান। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তার পররাষ্ট্রনীতিতে 'Economic Sanctions' শব্দটি রয়েছে। শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে বশে আনা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কৌশল। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইকোনমিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারছে না। তাই আমাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা মাথায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়। অন্যদিকে জাপান শক্তিশালী হওয়ায় তার Economic Aid Power ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারছে।
5. Military Might (সামরিক শক্তিমত্তা): আমি সামরিকভাবে কতটা শক্তিশালী সেটি প্রভাব পড়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে। আজকে কম্বোডিয়া কিংবা ফিলিপাইনকে আমরা অতটা গুরুত্ব দেই না কিন্তু রাশিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলেও রাশিয়া সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী। একটি রাষ্ট্রের জাতীয় শক্তি কতটুকু সেটি ফুটে ওঠে সামরিক শক্তির মাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য মিলিটারি ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইরান, সৌদি, তুরস্ক দিন দিন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে তাদের সামরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বহিঃউপাদান
1. History (অতীত ইতিহাস): রাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে প্রধান নিয়ামক। গঠনবাদ বা Constructivism আলোচনার সময় আমরা সেটি দেখেছিলাম। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস আমলে নিতে হয়। রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েতের সহযোগিতা একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ অন্য রাষ্ট্রের সাথে আমার অতীত ইতিহাস কেমন অথবা তার সাথে অতীতে আমার বোঝাপড়া কেমন ছিল সেটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ। আজকে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে দ্বন্দ্ব, ভারতের সাথে পাকিস্তানের যে দ্বন্দ্ব এগুলো ঐতিহাসিক। তাই ভবিষ্যতেও ভারত-পাকিস্তান কিংবা রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব চলমান থাকা স্বাভাবিক। অতীত ইতিহাস পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ডিরেকশন বা পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। অতীতে যে রাষ্ট্রগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল সেসব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাচ্ছে। রাশিয়াও তার পূর্বের সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অন্যতম বহিঃউপাদান হচ্ছে ইতিহাস।
2. Ideology (রাষ্ট্রের মতাদর্শ): আজকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এই রাষ্ট্রগুলো কেন একে অপরের বন্ধু? কারণ তাদের মধ্যে মতাদর্শগত মিল রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের ভাষাও এক। অন্যদিকে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, বলিভিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এই রাষ্ট্রগুলো কেন একই বলয়ে? কারণ তাদের মধ্যেও একটি ঐতিহাসিক মতাদর্শের মিল রয়েছে। সেটি হলো সমাজতন্ত্র। গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব ও ক্যাপিটালিস্ট পিস থিওরিতে আমরা এটি বিস্তারিত দেখেছিলাম। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ধর্মও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনিদের উপর বাংলাদেশের সমর্থন ধর্মগত ও নীতিগত।
3. Global Institutions (আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান): একটি রাষ্ট্রকে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করার সময় আন্তর্জাতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থাকে আমলে নিতে হয়। জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের সনদ মেনে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হয়। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোকে ন্যাটোর চার্টার ফলো করতে হয়। মিশর আরব লীগের নীতিমালা ভঙ্গ করে ইসরায়েলের সাথে চুক্তিতে লিপ্ত হওয়ায় আরব লীগ থেকে তার সদস্য পদ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়েকে নীতি ভঙ্গ করায় কমনওয়েলথ থেকে তাদের সদস্যপদ স্থগিত করে দেওয়া হয়। তাই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়।
4. International Law (আন্তর্জাতিক আইন): আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা প্রতিটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক ট্রিটি, চুক্তি, সনদ, আইন, কনভেনশন ইত্যাদি বিষয়গুলো।
5. Neighbourhood effect (প্রতিবেশি রাষ্ট্রের প্রভাব): আমার প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে কে বা কারা রয়েছে? পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর শক্তিমত্তা কেমন? প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো আমার সাথে কেমন ব্যবহার করছে? ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশের প্রতিবেশি একটি রাষ্ট্র আঞ্চলিক হেজিমন (ভারত), আরেকটি রাষ্ট্র বিশ্বের পরাশক্তি (চীন)। তাই এই দুটি রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়া (Decision Making Process)
একটি রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে থাকে। এই পররাষ্ট্রনীতির স্বরূপ কেমন হবে তা নির্ধারণে রাষ্ট্রকে কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এবার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
1. Rational Actor Model: পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত হবে যৌক্তিক। রাষ্ট্র এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যেটা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিসঙ্গত নয়। পররাষ্ট্রনীতিতে একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রকে চারটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়।
ক. লক্ষ্য নির্ধারণ (Agenda Setting): রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সর্বপ্রথম কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। পররাষ্ট্রনীতিতে রাষ্ট্রের লক্ষ্য এমন হওয়া উচিত নয়, যে লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নেই। জাতীয় শক্তির দিক থেকে চীন বাংলাদেশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। তাই সে চাইলেই তার লক্ষ্য নির্ধারণে যে-কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু চীনের মতো বাংলাদেশের সক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশ চাইলেও চীনের মতো শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে না। তাই বাংলাদেশের উচিত এমন এজেন্ডা সেট করা যা বাংলাদেশ তার অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অর্জনে সক্ষম।
খ. বিকল্প নীতি (Alternative Policy): রাষ্ট্রকে এটি নিয়ে আগে থেকেই চিন্তা করতে হয় যে, তার গৃহীত পররাষ্ট্রনীতিটি ফাংশন না করলে তার বিকল্প কী হবে। অথবা রাষ্ট্রের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই বিরূপ প্রভাব ফেলে তখন সেটিকে কীভাবে মোকাবিলা করবে তা আগে থেকেই বিবেচনায় রাখা। যেমন- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জিএসপি সুবিধা পুনরুদ্ধার করার জন্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জিএসপি সুবিধা যদি বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার বিকল্প কী হবে সেটি পূর্ব থেকেই চিন্তা করে রাখা।
গ. লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis): পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করা অনেক জরুরি। রাষ্ট্র যে পররাষ্ট্রনীতিটি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তার সম্ভাব্য লাভ এবং ক্ষতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।
ঘ. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল (Maximization of State Interests): একটি রাষ্ট্র হিসেবে তার নীতিগত জায়গা থেকে ওই সিদ্ধান্তটিই গ্রহণ করতে হয় যার মাধ্যমে তার সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল হওয়া সম্ভব।
2. SWOT Model: সাধারণত এই বিখ্যাত মডেলটি বিজনেস পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বহুল প্রচলিত। এর পূর্ণরূপ হচ্ছে, S= Strengths, W= Weaknesses, O= Opportunities, T= Threats। রাষ্ট্র যদি দেখে তার কোন একটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে তার শক্তিমত্তা এবং সুযোগ সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে তার দুর্বলতা এবং হুমকিগুলো তুলনামূলক কম তাহলে রাষ্ট্র সেই পররাষ্ট্রনীতিটি গ্রহণ করবে।
3. Governmental Bargaining Model: রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিংবা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে যে বিষয়টি সবচেয়ে বিবেচনায় নেবে তা হচ্ছে তার দরকষাকষির মতো সক্ষমতা। যেমন- বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের কারণে। একই ভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রকল্পের একটি অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুটি পরাশক্তির কাছেই যখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানই হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি (Bargaining Power)। এই গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে তার সর্বোচ্চ স্বার্থ উদ্ধার করতে পারবে তা বিবেচনায় নিতে হবে।
4. PEST Analysis: ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিনে এ মডেলটি ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এটিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর পূর্ণরূপ হচ্ছে, P= Political, E= Economic, S= Social, T= Technological। তথা রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে তার রাষ্ট্রের এই চারটি সেক্টরে কী কী উন্নয়ন হবে তা বিবেচনায় রাখবে।
পররাষ্ট্রনীতির ধরন: Wolf warrior diplomacy
সমসাময়িক কূটনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি ডিপ্লোমেসি হলো চীনের Wolf warrior diplomacy। চীনের বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে এই আগ্রাসী ডিপ্লোমেসি সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে। উ জিং হচ্ছেন একজন বিখ্যাত চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতা। 'উলফ ওয়ারিয়র' (Wolf Warrior) নামে তার নির্মিত একটি চলচ্চিত্র ২০১৫ সালে মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মুভিটা চায়নাতে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খুব বেশি জনপ্রিয়তা পাওয়ার ফলে নির্মাতা উ জিং সিদ্ধান্ত নেন 'উলফ ওয়ারিয়র-২' (Wolf Warrior-2) নামে প্রথম মুভির সিকুয়েন্স হিসেবে আরেকটি মুভি নির্মাণ করতে। ফলস্বরূপ মাত্র দুই বছর পর ২০১৭ সালে মুক্তি পায় তার 'ওলফ ওয়ারিয়র-২' নামের চলচ্চিত্রটি।
উ জিং এর নির্মিত এই দুইটি মুভির বিষয়বস্তু ছিল Chinese Nationalism বা চীনা জাতীয়তাবাদ। Wolf বা নেকড়ে হলো খুবই চতুর এবং সাহসী একটি প্রাণী। এই নেকড়ে প্রাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা একে অপরের উপর খুবই বিশ্বস্ত, অন্য কোনো প্রাণী এদের উপর আক্রমণ করলে এরা কালবিলম্ব না করে সাথে সাথেই প্রতিহত করে। নেকড়েদের কানগুলো সবসময়ই খাড়া (upright ears), এদের দাঁত খুবই তীক্ষ্ণ ও ধারালো (sharp teeth), নাক ও মুখ খুবই তীব্র ও জোড়ালো (pointed muzzles), আর চোখগুলো হলো অনুসন্ধানী (inquiring eyes)। চলচ্চিত্র নির্মাতা উ জিং তার ওলফ ওয়ারিয়র দুইটি মুভিতে চায়নিজ সেনাবাহিনীদেরকে এই নেকড়ের সাথে তুলনা করেছেন। চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে কীভাবে চায়নার সেনাবাহিনীরা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকা শত্রুদের পতন ঘটিয়ে দেশকে রক্ষা করে।
এই দুটি চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চায়না তাদের বর্তমান ডিপ্লোমেসির নাম দিয়েছে “ওলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি”। এই Wolf warrior diplomacy'টি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে একটি buzzword বা অধিক ব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে চীনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমগুলো একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, চীনের বর্তমান যে-সকল কূটনীতিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে দায়িত্বরত আছেন কিংবা বর্তমান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির যারা মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর, বেশি আক্রমণাত্মক, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও অনেক বেশি সক্রিয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন করোনা ভাইরাসকে 'চীনা ভাইরাস' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, বাইডেন যখন চীনকে 'The Sick Man of Asia' হিসেবে উল্লেখ করেন, ব্রিটেন যখন চীনকে "মানবজাতির সিকিউরিটির জন্য থ্রেট' হিসেবে উল্লেখ করে তখন কিন্তু চীন চুপ করে বসে থাকেনি বরং সাথে সাথে চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর এসবের পাল্টা ও আক্রমণাত্মক জবাব দিয়েছে।
দুইটি উদাহরণ দিলে বুঝতে আরও সহজ হবে। "করোনা ভাইরাস হলো চীনা ভাইরাস" ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে চীন জবাব দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই ভাইরাস তৈরি করে চীনের উহানে এসে ছেড়ে দিয়েছে যেন চীনকে বিশ্বের সামনে ছোটো করানো যায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন বলছে, চীন উইঘুর মুসলিমদের উপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। চীনও প্রত্যুত্তরে জবাব দিচ্ছে এটা বলে যে, চীন নয় বরং আমেরিকা-ই ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া-সহ সারা বিশ্বে মুসলমানদের উপর ধ্বংসলীলা চালিয়েছে এবং বর্তমানেও চালাচ্ছে। এরকম আক্রমণাত্মক প্রত্যুত্তরের অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। ২০২১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির শতবছর উদযাপনে শি জিনপিং তার ভাষণে এমনও বলেছেন যে, চীনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করবে তার দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। চীনের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের যে-কোনো তীর্যক মন্তব্যের বিপরীতে চীনও এখন পাল্টা আক্রমণ হিসেবে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছে, কোনোরকম ছাড় দিচ্ছে না কাউকে। ঠিক যেরকমভাবে একটি নেকড়ে তার শত্রুকে কখনো ছাড় দেয় না। চীনের এই পাল্টা জবান দেয়ার কূটনীতিকেই 'উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি' বলা হচ্ছে।
১৯২১ সালে কার্ল মার্ক্স ও লেলিনের মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Chinese Communist Party (CCP) নামের এই রাজনৈতিক দলটি। শি জিনপিং এর নেতৃত্বে এই দলটি এখনো চীনের ক্ষমতায়। ২০২১ সালে দলটির জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপন করা হয়েছে। এই কমিউনিস্ট পার্টির উপর ভিত্তি করেই চীন আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করে দিতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হলো চায়নার কমিউনিস্ট পার্টি। এই কমিউনিস্ট পার্টির মিলিটারি শাখা হচ্ছে- People's Liberation Army। এই লিবারেশন আর্মি কমিউনিস্ট পার্টির মিলিটারি শাখা হলেও এটিই মূলত চায়নার মূল আর্মড ফোর্স এবং গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিলিটারি ফোর্স। এর পাঁচটি শাখা রয়েছে- 1. Ground Force, 2. Air Force, 3. Rocket Force, 4. Strategic Support Force, 5. Navy। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মিকেও এখন নেকড়ের সাথে তুলনা করা হয়। সেনাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে বলা হচ্ছে চীনের একেকজন মিলিটারি যেন একেকটা নেকড়ে যোদ্ধা।
Economic Diplomacy- অর্থনৈতিক কূটনীতি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে যে দুটি কূটনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জনকূটনীতি। একুশ শতকের কূটনীতি শুধু রাজনৈতিক কূটনীতি নয়, এটি বর্তমানে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কলাকৌশলই অর্থনৈতিক কূটনীতি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল, আমদানি হ্রাস, রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রসার, পর্যটন খাত সমৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো অর্থনৈতিক কূটনীতির সাথে সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে পাঁচটি।
1. Manufacturing Hub: বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকর্ষণ করা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। বিনিয়োগের পরিধি বাড়িয়ে বাংলাদেশকে গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
2. Technological Adaptation: বিশ্বায়নের এই যুগে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক এমন সকল প্রযুক্তির সাথে বাংলাদেশকে খাপ খাওয়ানো। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া যেন আমরাও পাই সেজন্য নতুন নতুন প্রযুক্তিতে সিদ্ধহস্ত হতে হবে।
3. Gainful Employment: জনশক্তির যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আমাদের তেমন কোনো খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ নেই তবে আমাদের আছে বিশাল জনগোষ্ঠী। তাই এই বিশাল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করা। বাংলাদেশের মতো জাপানেরও কোনো খনিজ সম্পদ নেই। জাপানিরা তাদের জনশক্তি কাজে লাগিয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে। আমাদের উৎপাদনের জন্য মানব সম্পদ আছে কিন্তু মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টে মানব সম্পদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই বাংলাদেশকেও মানব সম্পদের উপর জোর দিতে হবে।
4. Export Diversification: রপ্তানির পরিধি ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রপ্তানি বাণিজ্য। তাই নতুন রপ্তানি খাতের সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাজার বৈচিত্র্যকরণ ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
5. Ensuring Quality to Expatriates: প্রবাসী বাংলাদেশিদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করা। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি প্রবাসী তাদের অর্জিত অর্থের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পৃথিবীর প্রায় ১২৬টি দেশে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক পাড়ি জমাচ্ছে। তাই প্রবাসীদের প্রতি আন্তরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
Public Diplomacy- জনকূটনীতি
গতানুগতিক কূটনীতিতে আমরা সাধারণত দেখি সম্পর্কগুলো তৈরি হয় সরকারের সাথে সরকারের (Governments to Government)। কিন্তু বর্তমানে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে অন্য দেশের সরকার ছাড়াও সে দেশের জনগণ, সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়ী কমিউনিটি, গণমাধ্যম ইত্যাদিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। আর এসব কলাকৌশলই জনকূটনীতি হিসেবে পরিচিত। যেমন- ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর বারাক ওবামা সরকার বাংলাদেশের GSP সুবিধা স্থগিত করে দেয় এবং পুনরায় জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে কিছু শর্তারোপ করে। কিন্তু বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকগুলো শর্ত পূরণ করলেও মার্কিন প্রশাসন এখনো জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিচ্ছে না। তাই বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী কমিউনিটি এর সাথে তৎপরতা চালাচ্ছে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য। এটাই জনকূটনীতির উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্জনগুলো বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও পাবলিকেশনসের মাধ্যমে তুলে ধরে বিশ্বে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করাটাও জনকূটনীতির অংশ। তৃতীয়ত, এটি সাংস্কৃতিক কূটনৈতিরও একটি অংশ। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মিউজিক, স্পোর্টস, ভিডিও গেইম, কালচারাল প্রোগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য দেশের জনমত নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা যায়। যুক্তরাষ্ট্র জনকূটনীতির উপর বেশি নজর দেয়। তুরস্ক সরকারও বর্তমানে তাদের উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস মুভি সিরিজ আকারে প্রচার করে তাদের পক্ষে জনমত গঠনের প্রয়াস চালাচ্ছে। এভাবে অন্যদেশের জনগণকে প্রভাব বিস্তার করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে জনকূটনীতি।
Dual Track Diplomacy- দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি
একুশ শতাব্দীর বহুল আলোচিত একটি কূটনৈতিক কৌশল। বাংলায় যাকে বলা হয় দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি। অনেকে আবার এটিকে 'Track II diplomacy' অথবা 'Backchannel diplomacy' হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকে। মূল কথা হচ্ছে, এই ডিপ্লোমেসির মধ্যে দুইটি পদ্ধতি একসাথে কাজ করে। নিচে উদয়ারণের মাধ্যমে সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করছি।
উদাহরণ (০১): এটি রাষ্ট্রের এমন কূটনৈতিক কৌশলকে বোঝায় যেখানে রাষ্ট্র একসাথে দুই ধরনের কূটনীতি ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ: উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা করে থাকে। এটি হলো ফার্স্ট ট্র্যাক বা প্রথম পদ্ধতি। আবার যুক্তরাষ্ট্র পাশাপাশি অন্য কোনো শক্তি যেমন জাতিসংঘের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। এটি হলো সেকেন্ড ট্র্যাক বা দ্বিতীয় পদ্ধতি। তাই উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে ডিপ্লোমেসি সেটি হলো ডুয়াল ট্র্যাক বা দ্বৈত ডিপ্লোমেসি। তেমনিভাবে JCPOA এর সময় যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে ৫ম নৌবহর স্থাপন করে ইরানকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আবার একইসাথে নেগোসিয়েশনও চালায়। এই যে একসাথে দুইটি ট্র্যাক তথা চাপ প্রয়োগ ও নেগোসিয়েশন একসাথে চালানো এটিই দ্বৈত ডিপ্লোমেসি। উল্লেখ্য, JCPOA হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বাতিলের উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভিয়েনায় স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি; যার পূর্ণরূপ হলো- Joint Comprehensive Plan of Action।
উদাহরণ (০২): অন্য দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে রাষ্ট্র যদি সরকারি (State Actors) ও বেসরকারি (Non state actors) উভয় মাধ্যম ব্যবহার করে তখন তাকে দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি বলা হয়। প্রথম মাধ্যমটি হলো ডিরেক্টলি সরকার টু সরকার। অর্থাৎ সম্পর্ক রক্ষায় দুইটি দেশের সরকারের মধ্যে অফিশিয়ালি যে আলোচনা বা ডায়ালগ হয় অথবা কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে প্রতিনিধি হিসেবে ঐ দেশে পাঠানো হয়। দ্বিতীয় মাধ্যমটি হলো ইনডিরেক্টলি। বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি, মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন বা সংস্থার মাধ্যমে দুইটি দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা হয় সেটিও দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতির উদাহরণ।
Culinary Diplomacy
বর্তমান দুনিয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে অনেক নতুন নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। নতুন নতুন পরিভাষা যুক্ত হচ্ছে। এই পরিভাষাটিও তন্মধ্যে একটি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কূটনীতিবিদরা নানা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম একটি কৌশল হলো "Culinary diplomacy”। একুশ শতাব্দীর শুরুতে এই পরিভাষাটি কূটনীতি বিশেষজ্ঞ পল রকওয়ার ও স্যাম চ্যাপল এই দুজন ব্যক্তির হাত ধরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটিকে আরও দুইটি নামে ডাকা হয়। কেউ কেউ এটিকে Ghastro-diplomacy, কেউ আবার এটিকে Food diplomacyও বলে থাকে।
অন্য দেশ থেকে যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধি আপনার দেশে ভ্রমণ, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন কিংবা সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে আসে তখন এই ডিপ্লোমেসিটি খুবই কাজে দেয়। Culinary এর সহজ বাংলা হলো রন্ধনসম্পর্কীয়। অর্থাৎ আপনার দেশের কালচারাল এবং জনপ্রিয় যে-সকল খাবার রয়েছে সেগুলো দিয়ে তাদেরকে ডিনার/ লাঞ্চ/ ব্রেকফাস্ট করিয়ে তাদের মন জয় করা। অথবা দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোনো একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আড্ডার ছলে খাওয়াদাওয়া করা। কথায় আছে- "The easiest way to win hearts and minds is through the stomach." এই ডিপ্লোমেসিটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে পেরু, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তান ইত্যাদি দেশগুলো।
Ad hoc Diplomacy
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি কূটনীতি। এটি মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো একটি স্পেশাল মিশন পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে একটি রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কার্যক্রম, যারা পেশাদার কূটনীতিক আছেন তাদের দ্বারা সম্পাদন করার পরিবর্তে সাময়িকভাবে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়। এই ধরনের স্পেশাল কূটনীতিকে বলা হয় Ad hoc diplomacy। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বোঝার সুবিধার্থে মনে করুন যে, কোনো একটি ইস্যুর উপর ভিত্তি করে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ছোট একটি দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ সরকার চাইলে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে সেই সমস্যাটি সমাধান করতে পারে। কিন্তু সরকার যদি গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধান না করিয়ে বরং বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কিংবা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করে এবং ভারত সরকারের সাথে সেই ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে সমাধান করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তখন সেটিকে 'Ad hoc diplomacy' বলা হয়। Ad-hoc কূটনীতিকে নিত্যনৈমিত্তিক দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাছাড়াও কোনো রাষ্ট্রপ্রধান অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বিদেশ সফর করেন কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তখন সেটিকেও বলা হয় Ad hoc diplomacy।
Cheque-book Diplomacy - চেকবুক কূটনীতি
এই ধরনের কূটনীতি সাধারণত আর্থিকভাবে ধনী এমন রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত হয়। অর্থনৈতিক সাহায্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসার নামই চেকবুক ডিপ্লোমেসি। এটি আসলে Debt Trap Diplomacy কিংবা Debt Colonialism এর মতোই। তেমন কোনো পার্থক্য নেই। লোন কিংবা ঋণের ফাঁদে ফেলে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের ভূমি, বন্দর কিংবা বিমানবন্দর দখলে নিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে Debt Colonialism বা ঋণ উপনিবেশবাদ বলা হয়। চেকবুক কূটনীতির কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দেই; যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে প্রায়ই সামরিক মহড়া দেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান মিলে একটি সামরিক মহড়া দেওয়ার পূর্বে এই অঞ্চলের কম্বোডিয়াকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেনি। দেশটির বিদেশি ঋণের ৬০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে বেইজিংয়ের কাছ থেকে। চীনের প্রতি এই নির্ভরতার ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের সঙ্গে সামরিক মহড়া বাতিল করেছে কম্বোডিয়া। এটি চেকবুক কূটনীতির উদাহরণ। ২০২১ সালের নভেম্বরে নিকারাগুয়া, ২০১৮ সালে ডোমিনিকা রিপাবলিককে বিশাল অর্থ সহায়তা করে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করায় চীন। একই ভাবে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে প্রায় সবগুলো দেশেই চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের ঋণ গ্রহণকারী সবগুলো দেশ তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাই আফ্রিকা মহাদেশের শুধু একটি রাষ্ট্র এসোয়াতিনি ছাড়া কারো সাথে বর্তমানে তাইওয়ানের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি চীনের চেকবুক কূটনীতির সফলতা।
Track Diplomacy
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে বিভিন্ন কলাকৌশল গ্রহণ করা হয়। এই কলাকৌশলের বিভিন্ন Track বা পদ্ধতি রয়েছে।
1. Track 1 Diplomacy: এটি মূলত অফিশিয়াল বা সরকারি কূটনীতিকে বোঝায়। এক দেশের সরকারের সাথে অন্য দেশের সরকারের যে অফিশিয়াল সম্পর্ক সেটিই ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসি। যেমন- জো বাইডেনের সাথে শি জিনপিং এর ফোনালাপ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার ইত্যাদি ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসির উদাহরণ।
2. Track II Diplomacy: রাষ্ট্রীয় কর্মক এবং অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকের সমন্বয়ে যে কূটনীতি সেটাই Track-II কূটনীতি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিএসপি সুবিধা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোও তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে চীনের আধিপত্য বিস্তারে চীনা সরকারের পাশাপাশি চীনের মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেশনগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উল্লেখ, এটিকে Backchannel diplomacyও বলা হয়।
3. Track III Diplomacy: দুটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যখন তৃতীয় আরেকটি পক্ষ চলে আসে তখন সেটি 'Track-III' কূটনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন- রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি যদি জাতিসংঘ কিংবা ওআইসির মতো তৃতীয় কোনো পক্ষ এগিয়ে আসে তখন সেটিকে বলা হয় Track III ডিপ্লোমেসি।
4. Multi Track Diplomacy: কূটনৈতিক অঙ্গনে নিজের স্বার্থ আদায়ে যদি উপরিউক্ত তিনটি Track একসাথে প্রয়োগ করা হয় তখন সেটিকে মাল্টি ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি বলা হয়।
5. Nine Track Diplomacy: ১. সরকার, ২. পেশাদারি ব্যক্তি, ৩. ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, ৪. প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, ৫. গবেষণা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান, ৬. বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী বা একটিভিস্ট, ৭. ধর্ম, ৮. ফান্ডিং, ৯. জনমত ও যোগাযোগ এই নয়টি পদ্ধতি ব্যবহার করে যে কূটনীতি গ্রহণ করা হয় সেটাই নাইন ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি।
অ্যাম্বাসেডর ও হাইকমিশনার এর মধ্যে পার্থক্য
Ambassador (রাষ্ট্রদূত): রাষ্ট্রদূত বা অ্যাম্বাসেডর হলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অন্য আরেকটি দেশের সাথে কূটনৈতিক কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হন। একজন অ্যাম্বাসেডর প্রেরিত দেশে নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করেন এবং চলমান বিভিন্ন সমস্যা সেই দেশের কাছে সমাধানের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন। দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বাস্তবায়নে তিনি সদা তৎপর থাকেন। রাষ্ট্রদূতকে বৈদেশিক রাষ্ট্রে অনির্দিষ্টভাবে কয়েক বছর অবস্থান করতে হয় এবং তাকে ঐ রাষ্ট্রের যাবতীয় আইনকানুন, রীতিনীতি, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত থাকতে হয়।
High Commissioner (হাই কমিশনার): বর্তমানে যে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো অতীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল সেই রাষ্ট্রগুলোকে বলা হয় কমনওয়েলথভুক্ত দেশ (মোট ৫৪টি রাষ্ট্র)। এই কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে ইংরেজিতে 'Commonwealth of Nations' বলা হয়। একটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ থেকে আরেকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে যে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করা হয় তাকে অ্যাম্বাসেডর বলার পরিবর্তে হাই কমিশনার বলা হয়। হাইকমিশনার ও এম্বাসেডরের কাজের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। রাষ্ট্রদূতকে তখনি হাইকমিশনার বলা হয় যখন দুটি দেশই কমনওয়েলথভুক্ত হবে। আর দুটি দেশ কমনওয়েলথভুক্ত না হলে রাষ্ট্রদূতকে অ্যাম্বাসেডর বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ভারতে নিয়োগ পেলে তাকে হাইকমিশনার বলা হবে। একই ভাবে ভারতের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে নিয়োজিত হলে তাকেও হাইকমিশনার বলা হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্র নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে অ্যাম্বাসেডর বলা হবে। একই ভাবে বাংলাদেশে প্রেরিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকেও অ্যাম্বাসেডর বলা হবে। কারণ বাংলাদেশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হলেও যুক্তরাষ্ট্র কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নয়।
কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি রাষ্ট্র: অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ, বাংলাদেশ, বার্বাডোস, বেলিজ, বতসোয়ানা, ব্রুনাই, ক্যামেরুন, কানাডা, সাইপ্রাস, ডোমিনিকা, ইসোয়াতিনি, ফিজি, গাম্বিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গায়ানা, ভারত, জ্যামাইকা, কেনিয়া, কিরিবাস, লেসোথো, মালাউই, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মাল্টা, মরিশাস, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, নাউরু, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিট্স ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইন দ্বীপপুঞ্জ, সামোয়া, সিশেলিস, সিয়েরা লিওন, সিঙ্গাপুর, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, টোঙ্গা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, টুভালু, উগান্ডা, যুক্তরাজ্য, ভানুয়াতু ও জাম্বিয়া।
যুক্তরাষ্ট্র যে কারণে কমনওয়েলথ এর সদস্য নয়
যুক্তরাষ্ট্রকেও একসময় ব্রিটিশরা শাসন করেছিল। তারপর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত নয়? ১৯৪৯ সালে লন্ডন ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল কমনওয়েলথ। বর্তমানে কমনওয়েলথভুক্ত দেশ ৫৪টি। আমেরিকা ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হলেও কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নয়। কিন্তু কেন?
প্রথমত, অতীতে কোনো দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও সে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর সে কমনওয়েলথে যোগ দেবে কি না তা সম্পূর্ণ ঐ দেশের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে। আয়ারল্যান্ড ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও তারা কমনওয়েলথে যোগ দেয়নি। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্র একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও কমনওয়েলথে যোগ দেয়নি। তাই কমনওয়েলথ এর ৫৪টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেই। দ্বিতীয়ত, কমনওয়েলথ গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। আর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এত আগে স্বাধীনতা লাভ করে যে কমনওয়েলথ গঠনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনকানুনের দিক থেকে কোন প্রভাব বজায় ছিল না। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান-সহ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে দেখবেন যে এখনো ব্রিটিশদের প্রভাব রয়েছে। ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠা করা অনেক আইন এখনো আমরা মেনে চলি, কলোনিয়াল আমলে তৈরি ব্রিটিশদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেললাইন, সংস্কৃতি এখনো আমাদের ব্রিটিশ উপনিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে অনেকাংশে বেরিয়ে এসেছে। তৃতীয়ত, কমনওয়েলথ এর এমনও সদস্য আছে যারা ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হয়নি। কমনওয়েলথভুক্ত কিছু সদস্য দেশ কখনোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না। যেমন- ১৯৯৫ সালে মোজাম্বিক এবং ২০০৯ সালে রোয়ান্ডা কমনওয়েলথের সদস্য হয়। কিন্তু দেশ দুটি কখনোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল না। চতুর্থত, একবার কমনওয়েলথ এর সদস্য হওয়া মানেই আজীবন সদস্য থাকতে হবে বিষয়টি এরকম নয়। কয়েকবার কমনওয়েলথে তাদের সদস্যও হারিয়েছে। যেমন- নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করা হলে, ২০০০ সালে রবার্ট মুগাবে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যান। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের জেরে পাকিস্তানের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। তবে সাড়ে চার বছর পর তারা আবার সেই পদ ফেরত পায়। বর্ণবাদ নিয়ে সমালোচনার জেরে ১৯৬১ সালে কমনওয়েলথ থেকে সরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৪ সালে তারা আবার এর সদস্য হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ ২০১৬ সালে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। তাই সদস্য থাকা, সদস্য না থাকা, অথবা সদস্য পদ প্রত্যাহার করা নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর।
কমনওয়েলথ এর সফলতা কী?
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কমনওয়েলথের এসব সমস্যা সমাধান করার মতো সামর্থ্য এখন নেই। সফলতার মধ্যে একটি হলো প্রতি বছর যুক্তরাজ্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে “কমনওয়েলথ শিক্ষাবৃত্তি” নামে কিছু স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। আমি মনে করি কমনওয়েলথ যে একটি সংগঠন হিসেবে এখনো টিকে আছে, সেটিই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। প্রতি দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাবেক ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনের রানীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাষ্ট্রনেতারা। আসলে গোলামির ইতিহাস মনে করিয়ে দেবার জন্যই কমনওয়েলথের মতো সিস্টেম রাখা হয়েছে।
৩০টি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিভাষা
০১. Foreign Policy – পররাষ্ট্রনীতি : বিশ্বায়নের এই দুনিয়ায় একটি রাষ্ট্র অপর আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া চলতে পারে না। অর্থাৎ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল (Interdependent)। একে অপরের উপর এই নির্ভরশীলতার কারণেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে এই সম্পর্ক স্থাপন করাকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলা হয়। জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করা কিংবা বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে একটি রাষ্ট্রকে কিছু নীতি বা পলিসি গ্রহণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্বার্থসমূহের সংরক্ষণ কিংবা রক্ষার জন্য একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তার আচরণ সংক্রান্ত এই নিয়মাবলিকেই বলা হয় Foreign Policy বা পররাষ্ট্রনীতি।
০২. Diplomacy – কূটনীতি: আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য চীনের কটন বা তুলা প্রয়োজন। চীন তো আর এমনি এমনিই বাংলাদেশকে তুলা দেবে না। সেই তুলা পাওয়ার জন্য চায়নার সাথে আমাদের আলোচনার টেবিলে বসতে হয়, আমাদের প্রতিনিধি চায়নাতে পাঠাতে হয়, দাম নিয়ে তাদের সাথে দরকষাকষি করতে হয়। এভাবে মাঠ পর্যায়ের উপরিউক্ত কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে চীন থেকে আমাদের প্রয়োজন আদায় করে নেওয়াকে বলা হয় Diplomacy বা কূটনীতি। আরেকটি উদাহরণ দেই। ২০২১ সালের জুনে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জন্য মোট ২,৬০০ কেজি হাঁড়িভাঙা আম উপহার পাঠিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইসলামাবাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ক নরমাল করার জন্য পাকিস্তানেও হাঁড়িভাঙা আম পাঠানো হয়েছিল। আসলে কূটনীতির ভাষা সাধারণ ভাষা থেকে ভিন্ন হয়। ধরুন আপনি কিছুই বললেন না, নীরব থাকলেন- তাতেও কিন্তু অনেক সময় আসল কথাটি বলা হয়ে যায়। আবার একটি বা দুটি শব্দ বললেন নিছক কৌতুকের ছলে, তাতেও কাজ হাসিল হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো ধরনের নেগোসিয়েশনে না গিয়েই উপহার দিয়ে একটি অন্তর্নিহিত মেসেজ পাঠানো যায়। আর এটাই কূটনীতি। অ্যাকাডেমিক ভাষায় বললে কূটনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম। ইংরেজি Diplomacy শব্দটি ১৭৯৬ সালে আইরিশ ফিলোসোফার এডমন্ড বার্ক প্রচলিত ফরাসি শব্দ 'diplomatie' থেকে প্রচলন হয়। বাংলা কূটনীতি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ "কূটানীতি” থেকে আগত। প্রথম মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা চাণক্য কৌটিল্য'র নাম থেকে কূটনীতি শব্দটির উদ্ভব ঘটেছিল।
০৩. Treaty- চুক্তি/ সন্ধিপত্র : বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অথবা একটি স্বাধীন দেশ ও একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থাপিত অফিশিয়াল (Legal) ও লিখিত (Written) কোনো চুক্তিকে বলা হয় "Treaty"। অনেক সময় নিচে উল্লিখিত বিষয়গুলোও Treaty হিসেবে বিবেচনা করা হয়- International agreement, Protocol, Covenant, Convention, Pact, Exchange of letters ইত্যাদি।
০৪. Accords- চুক্তি : আন্তর্জাতিক কোন চুক্তিতে যখন একসাথে অধিক বিষয় যুক্ত থাকে তখন সেটি Treaty হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর যদি চুক্তিতে কমসংখ্যক বিষয় যুক্ত থাকে তখন সেটিকে বলা হয় "Accords”। তবে বর্তমানে Treaty ও Accord দুটোকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়।
০৫. Convention- নিয়মপত্র : দুই বা ততোধিক বিরোধপূর্ণ দেশ একটি সাধারণ স্বার্থে (Common Good) একমত হওয়া। এখানে Treaty অপেক্ষা কম বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং যে-সকল বিষয় মেনে চললে উভয় দেশ উপকৃত হবে। যেমন- রামসার কনভেনশন, The Law of The Sea ইত্যাদি। কনভেনশন ও ট্রিটির মধ্যে আরেকটি পার্থক্য হলো- Convention is less formal than treaty।
০৬. Ramsar Convention- রামসার কনভেনশন: জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ইরানের রামসার শহরে একটি পরিবেশবাদী সম্মেলন হয়। যেখানে জলাভূমির (Wetlands) টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হয়। এটি রামসার কনভেনশন চুক্তি বলে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে রামসার কনভেনশন চুক্তি কার্যকর হয়। ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে বর্তমানে ১৭১টি দেশ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সই করে। বাংলাদেশের দুইটি স্থানকে রামসার চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়- সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর। হাকালুকি হাওরকেও রামসার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন বছর পর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রামসার কনভেনশনকে আবার “Convention on Wetlands" ও বলা হয়।
০৭. Modus Vivendi- অস্থায়ী চুক্তি: অস্থায়ী বা Temporary কোনো চুক্তি। সাধারণত যুদ্ধ বা দ্বন্দ্বরত দুইটি দেশ সাময়িকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে যে চুক্তি করে সেটিই 'Modus Vivendi' হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় না। এই Modus Vivendi কে আবার Cease Fire বা Armistice ও বলা হয়ে থাকে। Armistice, Cease fire, Modus Vivendi তিনটি একই অর্থ বহন করে।
০৮. Peace Treaty (শান্তি চুক্তি): এই পরিভাষাটি "Modus Vivendi" বা অস্থায়ী চুক্তির বিপরীত। পিস ট্রিটির মাধ্যমে চিরস্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হয়। পিস ট্রিটি বা শান্তি চুক্তি কখনো অস্থায়ী হয় না। শান্তি চুক্তি হয় চিরস্থায়ী। উদাহরণস্বরূপ- (ক) Paris Peace Accords: ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯৭৩ সালে সংগঠিত একটি শান্তি চুক্তি। উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ হয়। (খ) Korean Armistice Agreement: ১৯৫৩ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী স্থান পানমুজানে এই চুক্তিটি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য স্বাক্ষরিত হয়। যদিও প্রথমে এই চুক্তিটি Cease fire বা সাময়িক যুদ্ধ বিরতির উদ্দেশ্যে হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে এটাই দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পরিণত হয়। (গ) Peace of Westphalia: হলি রোমান এম্পায়ার বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৬৪৮ সালে দুইটি চুক্তি একসাথে স্বাক্ষরিত হয়। এই দুইটি চুক্তিকে একসাথে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি বলা হয়। প্রথম চুক্তির মাধ্যমে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ বা Thirty Years' War (1618-1648) বন্ধ করা হয়। দ্বিতীয় চুক্তির মাধ্যমে আশি বছরের যুদ্ধ বা Eighty Years' War (1568-1648) বন্ধ করা হয়। এই যুদ্ধে ইউরোপের প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। (ঘ) Treaty of Sevres: সেভ্রে চুক্তি হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্র শক্তি ও বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহ্যবাহী চুক্তি। ১৯২০ সালে সংগঠিত হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন, ফ্রান্স, গ্রিস ও ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দখল করে নেয়। (ঙ) Treaty of Versailles: ভার্সাই চুক্তি। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তকারী চুক্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯১৯ সালে জার্মানি ও মিত্র শক্তির মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে জার্মানিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
০৯. Letter of Intent : সংক্ষেপে যাকে “LOI” বলা হয়। লেটার অফ ইন্টেন্ট হলো এমন একটি সম্মতিপত্র যেখানে দুটি রাষ্ট্র বা দুটি পক্ষের মধ্যে পরবর্তীতে চুক্তি করার ইচ্ছা পোষণ করা হয়। অর্থাৎ এখনই নয় বরং পরবর্তী কোন এক সময়ে আমরা একটি চুক্তিতে লিপ্ত হব এমন ইচ্ছে প্রকাশ। যেমন- প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ২০২১ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের সাথে 'লেটার অফ ইন্টেন্ট' সই করেছে।
১০. Memorandum of Understanding (MOU): মউ হচ্ছে খসড়া চুক্তি বা চুক্তির আগে চুক্তি। এই চুক্তি মানার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই চুক্তির শর্ত না মানলেও শাস্তির বিধান নেই। যেমন- ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করলে বাংলাদেশের সাথে প্রায় ২৭টি খসড়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এখন বাংলাদেশ যদি ঐসব খসড়া চুক্তি মানতে অস্বীকার করে তাহলে চীন অফিশিয়ালি বাংলাদেশকে চুক্তি মানতে বাধ্য করতে পারবে না। একই ভাবে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ভারতের সাথে তিস্তা নিয়ে মউ সাইন করেছিল। কিন্তু ভারত তা মানতে বাধ্য নয় বলে তিস্তা সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। উল্লেখ্য, Memorandum of Understanding এর সাথে Gentlemen agreement এর একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। Gentlemen agreement হলো একটি অনানুষ্ঠানিক মৌখিক বা অলিখিত চুক্তি যা কোনো রাষ্ট্র আইনগতভাবে মানতে বাধ্য নয়।
১১. Envoy (দূত): এমন ব্যক্তি যিনি কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন। যাকে অন্য কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলার জন্য প্রেরণ করা হয়। যেমন- জাতিসংঘের Envoy হিসেবে এঞ্জেলিনা জোলি রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। (Someone who is sent as a representative from one government or organization to another)
১২. Emissary (গূঢ়সংবাদবাহক) : এমন একজন ব্যক্তি যাকে বিশেষ কোনো কাজের দায়িত্ব দিয়ে বা বার্তা নিয়ে অন্য দেশে পাঠানো হয়। (A person sent as a diplomatic representative on a special mission)
১৩. Embassy (দূতাবাস) : একজন রাষ্ট্রদূত বা অ্যাম্বাসেডর যেখানে বাস করেন তা দূতাবাস নামে পরিচিত। সাধারণত দূতাবাস বৈদেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক বরাদ্দকৃত এবং তা দেশটির রাজধানী এলাকায় অবস্থিত। যেমন- ইরানের রাজধানী তেহরানে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে, ফ্রান্সের প্যারিসে, জার্মানির বার্লিনে, রাশিয়ার মস্কোতে, মিশরের কায়রোতে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে।
১৪. Consulate General- কনসুলেট জেনারেল: দূতাবাস থাকে রাজধানী শহরে। আর কনসুলেট জেনারেল হচ্ছে রাজধানী ব্যতীত অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে থাকে। কনসুলেট জেনারেল দূতাবাসের অধীনেই কাজ করে। যেমন- চীনের রাজধানী বেইজিং এ বাংলাদেশের দূতাবাস, আর হংকং এবং কুনমিং এ কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আমাদের দূতাবাস এবং জেদ্দাতে কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় বাংলাদেশের দূতাবাস, আর ইস্তাম্বুলে কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। উল্লেখ্য, 'কনসুলেট' আর 'কনসুলেট জেনারেল' প্রায় একই। তবে কনসুলেট জেনারেলের তুলনায় কনসুলেট একটু ছোট পরিসরে কাজ করে।
১৫. Embassy Officials (দূতাবাসের কর্মকর্তা) : একজন রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার জন্য কিছু প্রশিক্ষিত ব্যক্তিকে দূতাবাসে নিয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রদূতকে সহোযোগিতাকারী এসব কর্মকর্তারাই 'দূতাবাসের কর্মকর্তা' নামে পরিচিত।
১৬. Ambassador-in-residence : সরকার কর্তৃক একজন রাষ্ট্রদূতকে যখন অন্য একটি দেশে পাঠানো হয়, তখন সেই রাষ্ট্রদূত প্রেরিত দেশে ৪/৫ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে অবস্থান করেন। যে সকল রাষ্ট্রদূতকে অন্য আরেকটি দেশে নির্দিষ্ট সময় পরিমাণ অবস্থান করতে হয় তাদেরকে বলা হয় “Ambassador-in-residence”। অর্থাৎ তার কাজকর্ম একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
১৭. An ambassador-at-large : এরা হচ্ছে একটি দেশের অনেক উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রদূত, যাদের কার্যক্রম কোনো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। প্রথমত, এরা একটি বিশাল অঞ্চল বা রিজিওন নিয়ে কাজ করে। মনে করুন বাংলাদেশ সরকার একজন বিজ্ঞ কূটনীতিবিদকে দায়িত্ব দিল যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থকে দেখাশোনা করার জন্য। কিংবা একজন রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব দিল সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখাশোনা করার জন্য। বিশাল অঞ্চল নিয়ে কাজ করে এমন কূটনীতিবিদদের বলা হয় An ambassador-at-large। দ্বিতীয়ত, যে-সকল রাষ্ট্রদূত অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এমন আন্তর্জাতিক সংস্থায় একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করে তারার অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ। যেমন- বাংলাদেশের কোনো একজন রাষ্ট্রদূত যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে তখন তাকে বলা হয় An ambassador-at-large। উল্লেখ্য, প্রশ্ন হতে পারে- অ্যাম্বাসেডর আর অ্যাম্বাসেডর ইন রেসিডেন্স এর মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? উত্তর হচ্ছে দুটোই প্রায় সেইম। অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ বোঝাতে অ্যাম্বাসেডর ইন রেসিডেন্স নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে।
১৮. Diplomatic Immunity (কূটনীতিক সুবিধা): একটি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং সে- দেশের দূতাবাসে অবস্থানরত কর্মীরা ব্যাপক কূটনৈতিক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। হোস্ট কান্ট্রি তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এমনকি বিদেশে অবস্থানকালীন কোনো অপরাধের জন্য তাঁরা গ্রেপ্তার কিংবা বিচারের মুখোমুখি হন না। শাস্তি হিসেবে তাঁদেরকে কেবল নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়ে থাকে। এসকল সুযোগ সুবিধাকেই বলা হয় ডিপ্লোমেটিক ইমিউনিটি।
১৯. Persona Non Grata: কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যবহৃত এই টার্মটি একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে, তার দেশে অবস্থানরত অন্যান্য দেশের কূটনীতিবিদদের মধ্যে কোনো একজন কূটনীতিক তার দেশের জন্য মঙ্গল জনক নয় বরং তার দেশের জন্য সে ক্ষতিকর হতে পারে, তার দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য সে থ্রেট হতে পারে, কিংবা তার দেশের নিরাপত্তার জন্য সে হুমকি হতে পারে, তাহলে দেশটি ওই কূটনীতিককে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারবে এবং তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারবে। ১৯৬১ সালের "Vienna Convention On Diplomatic Relations" এর আর্টিকেল ০৯ অনুযায়ী স্বাগতিক দেশ প্রেরণকারী দেশের যে-কোনো কূটনীতিককে কারণ না দেখিয়েই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারে। তবে কূটনীতিক বহিষ্কারের আন্তর্জাতিক নিয়ম থাকলেও সাধারণত কোনো দেশ এটি বর্তমানে করতে চায় না। কারণ অন্য রাষ্ট্র এতে অপমান বোধ করে। তাই কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়।
২০. Ambassadress: মনে রাখা জরুরি Ambassadress হলো, ambassador এর স্ত্রী। অর্থাৎ এটি দ্বারা কোনো মিশনের স্ত্রীপ্রধানকে বোঝানো হয় না।
২১. Brand ambassador: একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বা সেলেব্রিটি, যিনি কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বা সেবার প্রমোশনে কাজ করেন।
২২. Charge d'Affaires/ ad interim: পদের দিক থেকে একজন Ambassador এর নিচের কোনো কর্মকর্তা যিনি Ambassador এর অনুপস্থিতিতে অ্যাম্বাসেডরের দায়িত্ব পালন করেন। Chargé d'Affaires কে বর্তমানে 'a.i.' বা 'ad interim'ও বলা হচ্ছে।
২৩. Minister Plenipotentiary: সাধারণত একজন রাষ্ট্রদূত কখনো একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাষ্ট্রদূতকে যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তার দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু Minister Plenipotentiary এটি হলো এমন এক ধরনের বিশেষ রাষ্ট্রদূত যাদেরকে সরকার পরিপূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দেয়। যে কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এদেরকে সরকারের সাথে আলোচনা করতে হয় না। এদেরকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। বিশেষ করে কূটনৈতিক অঙ্গনে যারা অনেক সিনিয়র, একইসাথে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ তাদেরকে সরকার এই মর্যাদা দিয়ে থাকে।
২৪. Rapporteur: যিনি কোনো আন্তর্জাতিক সভা বা সমিতির কার্যবিবরণী তৈরি করে তা উচ্চতর সংস্থা বা সাধারণ সভায় পেশ করেন তাকেই Rapporteur বলা হয়। অর্থাৎ কোনো কমিটি বা সাব কমিটির ঐসকল ব্যক্তি যাদের দায়িত্ব হলো আলোচনার সারমর্ম তৈরি করা।
২৫. Unilateralism- একলা চলো নীতি: অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাও প্রতিষ্ঠানকে তোয়াক্কা না করে নিজের মতো করে চলা। উদাহরণস্বরূপ উত্তর কোরিয়ার কথা বলা যায়। উত্তর কোরিয়া কারো কথাই তোয়াক্কা করছে না বরং নিজের ইচ্ছেমতো তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
২৬. Shanghai Five- সাংহাই ফাইভ: বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে মধ্য এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি চীনকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। তাই চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বারা সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ২ এপ্রিল চীনের সাংহাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে 'সাংহাই ফাইভ' গঠন করা হয়। আর এটাই ২০০১ সাল থেকে ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা' হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে, Shanghai Cooperation Organisation- SCO। ২০০১ সালে উজবেকিস্তানকেও এর সদস্যপদ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান এর সদস্য হয়। তাই বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এই আটটি রাষ্ট্র এর সদস্য। বর্তমানে এটি ইউরেশিয়ান অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
২৭. Sin Fein- সিনফেইন : বর্তমানে আয়ারল্যান্ড দুভাগে বিভক্ত; উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র। আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অধীনে। দীর্ঘদিন ধরে তারাও স্বাধীনতা চাচ্ছে। তাই ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার জন্য উত্তর আয়ারল্যান্ডে যে আন্দোলন হচ্ছে সেটি মূলত পেছন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে 'সিনফেইন' নামের একটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল। এই দলটি মূলত স্বাধীন আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের গেরিলা সংগঠন 'আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি'র একটি রাজনৈতিক শাখা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি তাদেরকে অস্ত্রের সাপ্লাই দিচ্ছে, আর সিনফেইন যুদ্ধের প্রচারণা চালাচ্ছে।
২৮. মৈত্রী চুক্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির মধ্যে পার্থক্যসমূহ: রাষ্ট্রগুলো তাদের আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। সে চুক্তিগুলো হতে পারে মৈত্রী চুক্তি অথবা নিরাপত্তা চুক্তি। এই উভয় চুক্তির মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, দুটি রাষ্ট্র যখন তাদের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি স্বার্থ উদ্ধারে কোনো সহযোগিতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন তাকে মৈত্রী চুক্তি বলা হয়। মৈত্রী চুক্তিকে ইংরেজিতে Treaty of Friendship বা Friendship Treaty বলা হয়। নিচে কয়েকটি মৈত্রী চুক্তির উদাহরণ দেওয়া হলো। ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Treaty of Amity and Commerce, বলিভিয়া ও চিলির মধ্যে Treaty of Peace and Friendship, জার্মানি ও তুরস্কের মধ্যে German-Turkish Treaty of Friendship ইত্যাদি। অপরদিকে একাধিক রাষ্ট্র যখন শুধু তাদের নিরাপত্তা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন তাকে নিরাপত্তা চুক্তি বলা হয়। নিরাপত্তা চুক্তির আওতাভুক্ত থাকা কোনো দেশ যদি তার নিরাপত্তা রক্ষায় হুমকির মুখে পড়ে অথবা অন্য আরেকটি দেশ কর্তৃক আক্রমণের শিকার হয় তখন চুক্তিতে থাকা অন্য সকল দেশ রাষ্ট্রটির নিরাপত্তা রক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য। নিরাপত্তা চুক্তির কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত আনজুস (ANZUS) চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য- অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত অকাস (AUKUS) চুক্তি ইত্যাদি।
২৯. Preventive Diplomacy (প্রতিরোধমূলক কূটনীতি) : কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত সংঘাত বা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে চায় না। সংঘাতে জড়ানো একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ব্যাহত করে। তাই সংঘাত এড়িয়ে কোনো একটি দ্বন্দ্ব বা সংকট সমাধান করার লক্ষ্যে যে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হয় তাকেই প্রতিরোধমূলক কূটনীতি বলা হয়। অনেক সময় দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংস্থা ইত্যাদি এগিয়ে আসে এবং সংঘাত নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। আর সেটিও প্রতিরোধমূলক কূটনীতির উদাহরণ।
৩০. Gunboat Diplomacy (গানবোট কূটনীতি): "Speak softly and carry a big stick; you will go far"-বিখ্যাত এই উক্তিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিউডর রুজভেল্টের। গানবোট ডিপ্লোমেসির কথা বলতে গেলে এই উক্তিটি দিয়ে শুরু করতে হয়। তথা গানবোট কূটনীতির মূল কথা হলো, শত্রু রাষ্ট্রকে এমনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা যাতে সে মনে করে আমি সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং যে-কোনো সময় তাকে আক্রমণ করে বসতে পারি। যদিও সরাসরি সামরিক আক্রমণ করার ইচ্ছে আমার নেই। এভাবে কূটনৈতিক কৌশলে সামরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পিছু হটাতে বাধ্য করাকেই গানবোট ডিপ্লোমেসি বলা হয়। উল্লেখ্য, গানবোট ডিপ্লোমেসিকে আবার 'Big Stick Diplomacy'ও বলা হয়।
📄 অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি
অষ্টম অধ্যায়
Theme: The Great Transformation
অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি
"It's called political economy because it is has nothing to do with either politics or economy." - Stephen Leacock
ভূমিকা: নতুন এই বিশ্বব্যবস্থায় 'Creative Destruction' এর কারণে সৃষ্টি হতে পারে নতুন আরেকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট। সেই বৈশ্বিক সংকট থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যে অর্থনীতি তার 'Self-correction' এর দিকে হাঁটবে, নাকি সেখানে 'Government Intervention' এর প্রয়োজন হবে তা একটি মুখ্য প্রশ্ন। বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটগুলোকে বুঝতে হলে এর ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ সম্পর্কে জানা আবশ্যক। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজকের একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন কাঠামো কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তাই আলোচনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। মানব ইতিহাসের প্রতিটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে নতুন আরেকটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আবির্ভাব হয়েছে। এই আবির্ভাব পরিবর্তন করে দিয়েছে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে। তাই রাজনৈতিক অর্থনীতির (Political Economy) একটি বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনা করার চেষ্টা করব। আশাকরি বিষয়টি পাঠকের বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
Primitive Communism (আদিম সমাজতন্ত্র)
প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে থাকত। যাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক ছিল তারা একসঙ্গে থাকত। এই দলগুলোকে 'ট্রাইব' বলা হতো। তারা তীর, ধনুক, লাঠি ইত্যাদির মাধ্যমে একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, পশুপাখি শিকার করত, ফলমূল আহরণ করত এবং যা পেত তা সবাই একসঙ্গে বসে ভোগ করত। তাই তৎকালীন এই সমাজটিকে 'Hunting and Gathering Society' বলা হয়। আর মানুষের দলবদ্ধভাবে বসবাস এবং যা কিছু শিকার করত তা একসাথে বসে ভোগ করার এই সমাজব্যবস্থাকে বলা হয় Primitive Communism বা আদিম সমাজতন্ত্র। তথা তখন কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ছিল না।
Household Economy
প্রাগৈতিহাসিক সময়ের পর এনশিয়েন্ট পিরিয়ডে মানুষ যখন নানা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করল, পশুপাখি পোষ মানাতে শিখল এবং কৃষিকাজ শুরু করল তখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা দেখা দিল। আজকের আধুনিক পুঁজিবাদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি সেটির ধারণা দিয়েছিলেন এরিস্টটল। কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদ ও কমিউনিজম ব্যাখ্যায় এরিস্টটল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মনে করুন টাকা-পয়সা ইনকামের জন্য আপনার কোনো কাজকর্ম করা লাগে না, বাসায় রাখা কর্মচারী সকালে ঘুম থেকে উঠার পর নাস্তা তৈরি করে আপনার সামনে উপস্থাপন করে, লাঞ্চের সময় আপনার ডাইনিং টেবিলে খাবার রেডি থাকে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে মশারিটাও অন্য আরেকজন টানিয়ে দেয়। এই যে কাজকর্মবিহীন ও চিন্তামুক্ত আরাম-আয়েশের জীবন, এটিকে এরিস্টটল সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘Good Life' হিসেবে।
এরিস্টোটলিয়ান ইকোনমি হচ্ছে এই গুড লাইফের উপর ভিত্তি করে। এরিস্টটল রাজনীতি ও অর্থনীতিকে একসাথে দেখেছেন। একটি পরিবারে দুই ধরনের মেম্বার থাকে। প্রথম শ্রেণি হচ্ছে মুক্ত সদস্য (Free members)। অর্থাৎ পরিবারের মনিব, যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, আগামীকাল কী কী উৎপাদন করা হবে, আজকে কী কী রান্না করা হবে। ডিসিশন মেকিং বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটি পালন করেন পরিবারের ফ্রী মেম্বাররা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই কাজটিই পলিটিক্স বা রাজনীতি। আর পরিবারের দ্বিতীয় শ্রেণিটি হচ্ছে দাসদাসী (Servile Members), যারা মনিবের কথানুযায়ী প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা থেকে শুরু করে বাজার করা, রান্না করা ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজকর্ম সম্পাদন করবে। এরিস্টোটলিয়ান ধারণা অনুযায়ী পরিবারের ফ্রি মেম্বারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটিই হচ্ছে পলিটিক্স, আর সার্ভাইল মেম্বার বা দাসদাসীর কাজগুলো হচ্ছে ইকোনমি। যারা মনিব তাদের লাইফটি হতে হবে ওই উপরের Good Life এর মতো, তাদেরকে পর্যাপ্ত ফ্রি টাইম (Leisure) দিতে হবে। কারণ তারা অবসর সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি নিয়ে ভাববে, সমাজের মূল্যবোধ কী হবে সেগুলো ঠিক করবে। তাই রাজনীতিবিদদের জন্য গুড লাইফ নিশ্চিত করতে হবে। আর অর্থনৈতিক কাজকর্ম সব সারভাইল মেম্বার বা দাসদাসীরা দেখাশোনা করবে। এরিস্টটলের এই রাজনৈতিক অর্থনীতির আইডিয়াটি 'Household Economy' বা গৃহের ব্যবস্থাপনা নামে পরিচিত। এরিস্টটলের এই ধারণাটি হাজার বছরের পুরোনো হলেও আজকের দুনিয়ায় এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। রাজনীতিবিদরা তাদের গুড লাইফ নিশ্চিত করছে, আর এরিস্টটলের বর্ণিত সার্ভাইল মেম্বারদের সাথে আজকের কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিকদের খুব বেশি পার্থক্য করা যাবে কি?
মানুষ তখন পণ্যদ্রব্য (Commodity) উৎপাদন করত প্রয়োজন মিটানোর জন্য, জীবিকা নির্বাহের জন্য। একটি পরিবার যেসব পণ্য উৎপাদন করতে পারত না সেটি অন্য পরিবার থেকে নিয়ে আসত। তথা পণ্যের বিনিময়ে পণ্য অদলবদল (Exchange) হতো। সেখানে পণ্য উৎপাদন করে মুনাফা লাভের কোনো ধারণা ছিল না। পুরো অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সিস্টেমটি ছিল 'C-M-C' মডেলের মতো। তথা 'C' তে আমার প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন (Commodity)। 'M' তে যেটি আমি উৎপাদন করতে পারিনি সেটি অন্যজন থেকে এক্সচেঞ্জ করে নিয়ে আসা (Money)। উল্লেখ্য, এখানে Money বলতে বিনিময়ের মাধ্যম বোঝানো হয়েছে। 'C' তে অন্যজন যেটি উৎপাদন করতে অক্ষম আমি তাকে সেটি দিয়ে দিলাম (Commodity)। তথা হাউজহোল্ড ইকোনমি'র মধ্যে পণ্য উৎপাদন করে মুনাফা অর্জনের কোনো ধারণা ছিল না।
পুঁজিবাদের ভিত্তি (Foundation of Capitalism)
১৭৭৬ সালে পুঁজিবাদের নতুন এক রূপরেখা নিয়ে হাজির হন স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ। 'ফাদার অব ইকোনমিকস' হিসেবে পরিচিত স্মিথ ক্যাপিটালিজমের নতুন স্বরূপ উন্মোচন করেন তাঁর লিখিত- "An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations" নামক বইয়ে। স্মিথ দেখানোর চেষ্টা করলেন, এরিস্টোটলিয়ান ইকোনমিক মডেল সমাজের অগ্রগতির জন্য বাঁধা। কেননা দাসদাসীরা শুধু প্রয়োজনীয় কাজ করে এবং সেগুলো জোরপূর্বক হওয়ায় পণ্য উৎপাদনে তারা আগ্রহী হয় না। তাই তিনি Slavery বা দাস প্রথার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে অর্থনৈতিক কাজ-কর্মগুলো সব আলাদা হতে হবে। মার্কেটে রাষ্ট্রের উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। কারণ মার্কেট চলে Invisible Hand বা অদৃশ্য হাতের মাধ্যমে। এর মানে হচ্ছে মার্কেটে সবকিছুই অটো সেট করা, চাহিদা এবং যোগানের ভিত্তিতে মার্কেট নিজে নিজে কাজ করতে পারে। দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে জনগণের চাহিদা হ্রাস পাবে, আর মূল্য হ্রাস পেলে জনগণের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, এটি হচ্ছে মার্কেটের অঘোষিত নীতি। তাই এখানে রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই।
স্মিথ প্রথমে রাজনীতি থেকে অর্থনীতিকে পৃথক করেন। তাঁর মতে, রাজনীতি ও অর্থনীতি দুটি আলাদা জিনিস। রাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক কাজকর্ম করবে, আর অর্থনীতি হবে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন যা বিভিন্ন ফার্মের অধীনে থাকবে। রাজনীতির কাজ রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আর অর্থনীতির কাজ হচ্ছে মুনাফা বা রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি করা। যার কাছে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে মূলধন রয়েছে, সে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্য পণ্য উৎপাদন করবে। দাসদের মধ্যে পণ্য উৎপাদনের কোনো প্রণোদনা (Incentives) বা উদ্দীপনা ছিল না। কিন্তু পণ্য উৎপাদনে মুনাফা অর্জনের মতো প্রণোদনাগুলো ফার্মগুলোকে অনুপ্রেরণা দেবে বেশি বেশি পণ্য উৎপাদনের। এরিস্টোটলিয়ান সেই 'C-M-C' মডেলের বিপরীতে এডাম স্মিথের মডেল হচ্ছে 'M-C-M' মডেল। তথা 'M'-তে উৎপাদনের উপকরণ পুঁজি (Money), 'C'-তে মূলধন বিনিয়োগ করে প্রচুর পরিমাণে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা (Commodity), 'M'-তে উৎপাদিত সেসব পণ্য বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন (Money)। এডাম স্মিথ রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধিতে সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতেও জোর দিয়েছেন। প্রথমত, অন্য রাষ্ট্র আক্রমণ করলে কিংবা যুদ্ধ শুরু হলে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়, ফলশ্রুতিতে উৎপাদনও হ্রাস পায়। তাই সেনাবাহিনী যুদ্ধ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, মিলিটারি শক্তি থাকলে অন্য রাষ্ট্রের কলোনি বা বাজার দখল করা যায় এবং অন্য রাষ্ট্রের বাজারে নিজ দেশের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করা যায়।
Absolute Advantage Theory
তারপর আসলো Absolute Advantage Theory, যার মূল কথা হচ্ছে পৃথিবীতে এমন কিছু নির্দিষ্ট পণ্য যেটি আমি একাই উৎপাদন করতে পারি, কিন্তু অন্য রাষ্ট্র পারে না। যেমন তেলের কথা যদি আমরা বলি তাহলে দেখা যায় সৌদি আরব সেটি উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ তেল উৎপাদন করতে পারে না। কারণ সৌদির কাছে তেলের খনি রয়েছে যা অন্যদের নেই। তাই তেল হচ্ছে সৌদির জন্য Absolute Advantage বা বিশেষ সুবিধা। তাই তেলের জন্য অন্য রাষ্ট্রগুলোকে সৌদি আরবের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। একই ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা স্বর্ণ উৎপাদন করতে পারে। কারণ সেদেশে স্বর্ণের খনি রয়েছে। কিন্তু ভারত স্বর্ণ উৎপাদন করতে পারে না যেহেতু ভারতে স্বর্ণের খনি নেই। তাই স্বর্ণ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বিশেষ সুবিধা। তাই অন্য রাষ্ট্রগুলোকে স্বর্ণের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার উপর নির্ভরশীল হতে হয়। এই নির্ভরশীলতার কারণে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্যে লিপ্ত হতে হয়।
Comparative Advantage Theory
জাতিরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো 'Comparative Advantage Theory' নামে আরেকটি তত্ত্ব উপস্থাপন করলেন। এমন অনেক ধরনের পণ্য রয়েছে যেটি অনেকগুলো রাষ্ট্রই উৎপাদন করতে পারে। যেমন- বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়ই আলু ও ধান এই দুটি পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম। এখন মনে করি বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় কম খরচে আলু উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু ধান উৎপাদন করতে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের খরচ অনেক বেশি হয়। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় কম খরচে ধান উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের থেকে বেশি খরচ হয়। তাই বাংলাদেশ দুটি পণ্যের মধ্যে যেটি সবচেয়ে ভালো এবং কম খরচে উৎপাদন করতে পারে সেটিই উৎপাদন করবে। আর যেটি কম খরচে উৎপাদন করতে পারে না সেটি অন্য রাষ্ট্র থেকে নিয়ে আসবে। তাই তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশ শুধু আলু উৎপাদন করবে আর ভারত ধান উৎপাদন করবে। তারপর দুটি দেশ বাণিজ্যে লিপ্ত হবে। বাংলাদেশ ভারত থেকে ধান আমদানি করবে এবং বিনিময়ে ভারতের কাছে আলু রপ্তানি করবে। ভারতও বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানি করবে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের কাছে ধান রপ্তানি করবে। Comparative Advantage Theory অনুযায়ী দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য হলে সবাই সমানভাবে লাভবান হয়।
Competitive Advantage Theory
এবার আসি Competitive Advantage Theory নিয়ে। এই থিওরির মূল বক্তব্য হচ্ছে, মার্কেটে যখন তীব্র প্রতিযোগিতা হবে তখন জনগণ বেশি লাভবান হবে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স উভয়ই এরোপ্লেন উৎপাদন করতে পারে। এখন মনে করি দুটি দেশের তৈরিকৃত এই এরোপ্লেন কোয়ালিটি এবং ডিজাইনের দিক থেকে সমমানের। কিন্তু গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতা থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্স কিছুটা কম দামে এরোপ্লেন অফার করছে। তখন সাধারণত সবাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করার পরিবর্তে ফ্রান্স থেকে এরোপ্লেন ক্রয় করবে। কম্পেটিটিভ এডভান্টেজ এর সুবিধা হচ্ছে যে, মার্কেটে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেলে যারা সাধারণ জনগণ তারা উপকৃত হবে। এডাম স্মিথের মতে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং মার্কেটে টিকে থাকতে ফার্মগুলো পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাই পণ্যের মূল্য কমাতে মার্কেটে সরকারের হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই।
প্রথম শিল্পবিপ্লব (First Industrial Revolution)
এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডোর উপরিউক্ত তত্ত্ব ইউরোপ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে। আর তখনই পুঁজিবাদের প্রসার (Moments) হয়েছিল। ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ এই দীর্ঘ সময়টিতে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশদের কলোনি ও সাম্রাজ্য থাকায় ইংল্যান্ড ছিল তখন আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ। পুরো দুনিয়ার সম্পদ ইংল্যান্ডে পুঞ্জীভূত হতো। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, কয়লার খনি আর ইস্পাতের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে ইউরোপ জুড়ে প্রচুর কলকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৭৫০ সালে ইস্পাত গলানোর পদ্ধতি আবিষ্কার, ১৭৬৯ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, ১৮১৫ সালে খনিগর্ভে কাজ করার যন্ত্র আবিষ্কার, ১৮০৭ সালে স্টিমবোট আবিষ্কার, ১৮২৫ সালে রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার ইত্যাদি পাল্টে দেয় ইউরোপের চেহারা। ইংল্যান্ড হয়ে ওঠে বিশ্বের পণ্য তৈরির কারখানা। যে কারণে ইংল্যান্ডকে 'Workshop of the World' বা পৃথিবীর কর্মশালা বলা হতো। শিল্পবিপ্লবের পূর্বে মানুষ কৃষিকাজ করত কিন্তু বিপ্লবের পরে কৃষিকাজ ছেড়ে কলকারখানায় কাজ করতে শুরু করে। যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের কারণে পণ্যের উৎপাদনও বেড়ে যায়। গ্রামের কুটির শিল্প ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হতে থাকে।
Capitalism (পুঁজিবাদ)
পণ্যদ্রব্য উৎপাদনের জন্য যে জিনিসগুলো প্রয়োজন তথা পুঁজি, ভূমি, শ্রম, প্রযুক্তি, কলকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এগুলোকে বলা হয় উৎপাদনের উপকরণ (Means of Production)। পুঁজিবাদ এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে এই উৎপাদনের উপকরণ রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তিমালিকানাধীন। অর্থাৎ সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকা এবং লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন করাকেই সাধারণত পুঁজিবাদ বলা হয়। একজন শ্রমিকের পুঁজি হচ্ছে তার শ্রম, ইন্ডাস্ট্রি মালিকদের পুঁজি হচ্ছে তাদের কলকারখানা, একজন জমিদারের পুঁজি হচ্ছে তার জমি, একজন ধনী লোকের কাছে পুঁজি হচ্ছে তার গচ্ছিত টাকা পয়সা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের বিকাশকালীন সমাজব্যবস্থায় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল। একটু পরেই আমরা কার্ল মার্ক্সে ঢুকে যাব। তাই সমস্যাগুলো ছোট করে আলোচনা করা প্রয়োজন।
পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু মার্কেটে গিয়ে অন্য পুঁজিপতিদের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। কারণ একই পণ্য বিভিন্ন জন মার্কেটে নিয়ে আসছে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হবে, কম দামে পণ্য বিক্রি করার জন্য সেই পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে, কম খরচে উৎপাদনের জন্য যাদেরকে দিয়ে আমি কাজগুলো করাচ্ছি সেইসব শ্রমিকদেরও বেতন কম দিতে হবে। তাই শ্রমিকদের শোষণ করার ধারণাটি সেখান থেকেই আসে। ইউরোপে দেখা গিয়েছিল যে, অনেক কলকারখানার মালিক প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার কারণে তাদের কলকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরাও তাদের চাকরি হারিয়েছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে- কলকারখানাগুলোতে যেসব পণ্য উৎপাদিত হতো সেসবের ক্রেতা কারা ছিল? ইউরোপে তখনো অসংখ্য মানুষ দরিদ্র ছিল, যারা এই কলকারখানাগুলোতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। এখন এই শ্রমিক, কৃষক, গ্রামের মানুষ তারাই কিন্তু পণ্যগুলো ক্রয় করত। তাদের ইনকামও ছিল কম। তাই মার্কেটে গিয়ে এসব পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের সামর্থ্য অনেকের ছিল না। পণ্য বিক্রি না হওয়াতে কলকারখানার গুদাম পণ্য বোঝাই হয়ে যেত। তখন মালিকরা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিত এবং সেখানকার শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়ত। যন্ত্রপাতির সাহায্যে খুবই কম সময়ের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে অধিক পরিমাণে পণ্যদ্রব্য উৎপাদিত হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের মান কমে যায়, গ্রামে গড়ে উঠা কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠলে তারা জমিদারদের থেকে সুদসহ ঋণ নিত, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে জমিদারদের কাছে জমি বিক্রি করে দিত। তখন কাজের উদ্দেশ্যে হাজারো কৃষক শহরে পাড়ি জমাতো এবং ফলশ্রুতিতে শহুরে বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল।
Imperialism and Colonialism
শিল্পবিপ্লবের সূচনা তথা ১৭৬০ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই সময়টি সাম্রাজ্যবাদের যুগ (Age of Imperialism) হিসেবে পরিচিত। শিল্পায়নের প্রভাবে ইউরোপ সমৃদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির জন্য প্রয়োজন নতুন নতুন বাজারের। একদিকে কিছু কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, অন্যদিকে শ্রমিকদের শোচনীয় অবস্থা। এসব থেকে উত্তরণের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো আমেরিকা, এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। অন্য দেশকে নিজ দেশের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত করার লক্ষ্যে সেখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা চালায়। আর অন্য দেশে এই আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টাকেই বলা হয় সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism)। এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোতে শিল্পের জন্য সস্তায় কাঁচামাল পাওয়া যেত। যে কারণে পণ্য উৎপাদনের খরচ কমে যেত। তাই অনুন্নত দেশগুলো থেকে এসব কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। সেই প্রতিযোগিতা থেকেই শুরু হয় কলোনি দখলের নেশা। কোনো শক্তিশালী দেশ কর্তৃক অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল করে সেখানে নিজেদের একচ্ছত্র বা সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠা করে সেটিকে বলা হয় উপনিবেশবাদ (Colonialism)। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ নিয়ে বিস্তারিত অন্যত্র আলোচনা করেছি। কলোনি দখল নিয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছিল সেটিও অনেকটা ইন্ধন যুগিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের।
Fascism (ফ্যাসিবাদ)
বিশ্বজুড়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অসংখ্য কলোনি ছিল। যে-কারণে তাদের উদ্বৃত্ত পণ্যদ্রব্য ওইসব কলোনিগুলোতে বিক্রি করতে পারত। দ্বিতীয়ত, দখলকৃত কলোনি থেকে সস্তায় কাঁচামালের যোগান পাওয়ার কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কিছুটা কমিয়ে দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারত। তৃতীয়ত, কথায় আছে টাকায় টাকা আনে। উদ্বৃত্ত মূলধন দখলকৃত কলোনিগুলোতে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে পুনরায় মুনাফা অর্জন করতে পারত। ব্রিটিশরা এজন্যই তাদের দখলকৃত কলোনিগুলোতে অনেক উন্নয়ন সাধন করেছিল। কলোনিগুলোতে রেললাইন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সবই ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল। কারণ দখলকৃত কলোনিসমূহে যোগাযোগব্যবস্থা-সহ সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হলে সেখান থেকে পরবর্তীতে অধিক পরিমাণে মুনাফা অর্জন সম্ভব। সেই ব্রিটিশ আমলের রেললাইন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এখনো অক্ষত আছে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশদের সাথে ফ্রান্সের পার্থক্যের জায়গাটি এখানেই, ব্রিটিশরা তাদের কলোনিগুলো উন্নয়নের চেষ্টা করেছে এবং কলোনির জনগণকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ফ্রান্স এসব করেনি।
ইতালি ও জার্মানির কোনো কলোনি ছিল না, যেখানে তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করতে পারবে। ইতালিতে অসংখ্য কলকারখানা অচল হয়ে পড়েছিল। পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলন। শ্রমিক আন্দোলনের তোপে কলকারখানার মালিকরাও ঘাবড়ে যায়, তাদের সম্পত্তি রক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ১৯২২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইতালির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেনিত মুসোলিনি। শ্রমিক আন্দোলন থেকে পুঁজিপতিদের রক্ষা করার দায়িত্ব পান মুসোলিনি। তিনিও মূলত ছিলেন একজন শ্রমিক নেতা এবং শ্রমিকদের হয়ে ক্যাপিটালিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতেন। তখন শ্রমিকদের মধ্যে থেকেই শ্রমিকদের ঠান্ডা করতে মুসোলিনিকে ব্যবহার করে ক্যাপিটালিস্টরা। তিনি ক্যাপিটালিস্টদের অর্থায়নে গঠন করেছিলেন ফ্যাসিস্ট দল (National Fascist Party)। ধনীদের অর্থায়নে এই দলটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। শ্রমিকদের বিপ্লব মোকাবিলা করতে সকল পুঁজিপতি মিলে গঠন করল বিভিন্ন কাউন্সিল ও কর্পোরেশন।
এই কর্পোরেশনগুলোর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় শ্রমিক বিপ্লব থেকে ক্যাপিটালিস্টদের রক্ষা করা এবং বিপ্লব দূর করতে কলোনি দখল। কারণ নতুন কলোনি হলে সেখান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ ও সেখানে পণ্য বিক্রয় করা যাবে, কলকারখানা নতুন করে চালু করা যাবে, শ্রমিকরাও তাদের চাকরি পাবে। এতে আন্দোলন কিছুটা হ্রাস পাবে। কিন্তু ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই সকল কলোনি দখল হয়ে গিয়েছিল। স্পেন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের দখলে ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলো। তাই কলোনি দখল করতে কলোনিওয়াদের সাথে যুদ্ধ আবশ্যিক হয়ে পড়ে। তাই মুসোলিনির নেতৃত্বে যুদ্ধের জন্য নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। যুদ্ধ মানুষকে সভ্য করে, যুদ্ধই শান্তি আনে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে উগ্র জাতীয়তাবাদী আইডিয়া প্রমোট করা হতো। আর মুসোলিনির এই উগ্র জাতীয়তাবাদী আদর্শকেই বলা হয় ফ্যাসিবাদ।
Nazism (নাৎসিবাদ)
ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ এর মধ্যে আসলে তেমন পার্থক্য নেই। জার্মানির হিটলার ও তার রাজনৈতিক দলের মতাদর্শই মূলত নাৎসিবাদ হিসেবে পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে যে চুক্তির মাধ্যমে সেটি ইতিহাসে ভার্সাই চুক্তি হিসেবে পরিচিত। চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দায়ী করা হয়, জার্মানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়, জার্মানিকে সামরিক শক্তি কমিয়ে আনতে বাধ্য করা হয়, জার্মানির অন্য দেশ থেকে সমরাস্ত্র আমদানি-রপ্তানি করার উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় ইত্যাদি। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত নিরুপায় জার্মানির উপর ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলো অপমানজনক বলে মনে হয়েছিল। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে একদিকে জার্মানি দেউলিয়া হয়ে যায়, অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে হিটলার ক্যাপিটালিস্টদের সাহায্যে নাৎসি দল গঠন করেন। শ্রমিক আন্দোলন দমন করতে গঠিত হয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। যুদ্ধে পরাজয় এবং জার্মানির দুঃখ দুর্দশার কারণ হিসেবে ইহুদিদের দায়ী করে শুরু হয় ইহুদি নিধন। দেশের জনগণকে জার্মান জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়। হিটলার ও তার রাজনৈতিক দলের এই মতাদর্শই মূলত নাৎসিবাদ হিসেবে পরিচিত।
Feudalism (সামন্তবাদ)
ব্রিটিশ শাসনামলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে জামিনদারি সিস্টেম বা জমিদারি প্রথা বলে যেটি ছিল ইউরোপে সেটি সামন্তবাদ হিসেবে পরিচিত। শিল্পবিপ্লবের পর পুঁজিবাদের প্রসারে সামন্তপ্রথা হুমকির মধ্যে পড়ে যায়। বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। সামন্ত প্রভু বলতে এমন লোকজনকে বোঝাতো যাদের হাতে ছিল অসংখ্য কৃষি জমি। এসব জমি কৃষকদেরকে চাষাবাদের জন্য বিভিন্ন ইউনিটে ভাগ করে দেওয়া হতো। উৎপাদিত ফসলের বেশির ভাগ ফসল সামন্ত প্রভু নিয়ে নিত। সামন্ত প্রভুদের সাথে আবার রাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক ছিল। কারণ এসব প্রভুরা রাষ্ট্রকে কর দিত। কিন্তু শিল্পায়নের ফলে কলকারখানা বৃদ্ধি পেলে কৃষিকাজের চাহিদা কমে যায়, তাছাড়াও কৃষকদের উপর সামন্ত প্রভুরা নানা অত্যাচার করত। তাই কৃষকরা কৃষিকাজ ছেড়ে শহরের কলকারখানাগুলোতে কাজের উদ্দেশ্য চলে যায়। অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবেই পরবর্তীতে ইউরোপে সামন্ত প্রথাও বন্ধ হয়ে যায়। সামন্ত প্রভুদের কাছে চাষিরা ছিল কৃষক, আর কলকারখানায় যোগ দিলে কৃষকরা হয়ে যায় শ্রমিক।
Marxism (মার্ক্সবাদ)
পুঁজিবাদের ইতিবাচক দিকগুলোর দিকে এখনো আমরা প্রবেশ করিনি। আলোচনার এ পর্যন্ত পুঁজিবাদের কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য আমাদের মাঝে ফুটে উঠেছে। সমাজতন্ত্র বোঝার জন্য পুঁজিবাদের এমন আরও কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কার্ল মার্ক্স তার Communist Manifesto এবং Das Kapital পুস্তিকায় সমাজের কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে আলোকপাত করেন। মার্ক্স বিষয়গুলোকে একটু ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা করেন। তাই সমাজবিজ্ঞান, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যতগুলো ক্রিটিক্যাল থিওরি রয়েছে, সেখানে মার্ক্সের মতবাদ আলোচনা করা হয়েছে। কার্ল মার্ক্স ক্যাপিটালিজম থেকে উদ্ভুত কিছু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাই কিছু সমস্যা উল্লেখ করা যাক:
(ক) Private property: পুঁজিবাদের আগের দুনিয়ায় কৃষিজমিকে (land) মনে করা হতো এটি ঈশ্বরের দান, তাই প্রয়োজনমতো সমাজের সবাই সেখানে উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু পুঁজিবাদ আসার পর জমিগুলো হয়ে গিয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন।
(খ) Labour as a product: একজন শ্রমিক সেও একজন মানুষ, পুঁজিবাদে শ্রমিককে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তথা শ্রমিক তার শ্রম দেবে, যার বিনিময়ে সে টাকা পাবে। মানুষের সাথে মানুষের যে মানবীয় সম্পর্ক সেটি হয়ে যায় materialistic বা বস্তুগত।
(গ) Individualism: গ্রাম ছেড়ে কারখানায় কাজের উদ্দেশ্যে মানুষ যখন শহরে আসছে তখন পারিবারিক যে বন্ধন সেটি আর থাকছে না। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে উঠছে। তথা সবকিছু ব্যক্তিকেন্দ্রিক। পূর্বে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে বলা হতো তুমি তো অমুক বংশের ছেলে, অমুক পরিবারের হয়ে এমন কাজ কীভাবে করতে পারলে। অর্থাৎ ব্যক্তি অপরাধ করলেও তার পরিবার ও সমাজকে টেনে আনা হতো। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর বলা হচ্ছে ব্যক্তির অপরাধের জন্য ব্যক্তি দায়ী, তার সমাজ নয়।
(ঘ) Social Crimes: শহরে অবস্থান করা একক পরিবারের পিতামাতা উভয়ই কলকারখানায় কাজ করা বা চাকরি করায় বাসায় সন্তানদের সময় দিতে পারত না। পিতামাতার অনুপস্থিতিতে তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
(ঙ) Secularism: প্রতিটি ধর্মের কিছু রিচুয়াল বা অনুষ্ঠান থাকে যেখানে অসংখ্য মানুষ একসাথে জড়ো হয়। মুসলমানদের ঈদে, হিন্দুদের হোলি ও পূজা উৎসবে, খ্রিষ্টানদের বড়দিনে যখন অসংখ্য মানুষ জড়ো হয় তখন তাদের মধ্যে একটি সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয় (Binding Relationship)। কিন্তু রেনেসাঁস ও শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে মানুষ যখন ধর্মবিমুখ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায় তখন সম্পর্কগুলো নষ্ট হতে শুরু করে। এডাম স্মিথ, রিকার্ডো কিংবা মার্শাল তারা পুঁজিবাদ কীভাবে বিস্তার করা যায় সে-সম্পর্কে তত্ত্ব দিলেও পুঁজিবাদের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো পথ বাতলে দেননি।
(চ) Class struggle: পুঁজিবাদের প্রসারে রাষ্ট্রে শ্রেণিদ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। ক্যাপিটালিস্টদের বলা হতো বুর্জোয়া আর শ্রমিকদের বলা হয় প্রোলেতারিয়েত। মালিকরা মুনাফা বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের শোষণ করছে। শ্রমিকদের সাথে মালিকদের যে দ্বন্দ্ব সেটি আরও প্রকট হচ্ছে। এজন্য শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে।
মার্ক্স এরিস্টটলের কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন। সেই এরিস্টোটলিয়ান C-M-C মডেলের কথা মনে আছে? যেখানে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা ছিল না, যেখানে মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে শুধু পরিবারের (Household) প্রয়োজন মিটাতে পণ্য উৎপাদন হতো। কিন্তু আঠারো শতকে শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার পর এরিস্টোটলিয়ান C-M-C মডেল পরিবর্তন হয়ে আসল এডাম স্মিথের নতুন M-C-M মডেল। যেখানে প্রয়োজনের পরিবর্তে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন করা হয়, যেখানে পণ্যের উৎপাদন ব্যক্তিমালিকানাধীন। পুঁজিবাদের কাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে কার্ল মার্ক্স পুনরায় প্রাচীনকালের সেই এরিস্টোটলিয়ান C-M-C মডেলে চলে যেতে চেয়েছিলেন। তবে মার্ক্স এই মডেলের গঠনগত কিছু সংস্কার এনেছিলেন। মার্ক্সের মতে এরিস্টোটল আমলে এই C-M-C মডেলটি একটু স্বৈরতান্ত্রিক (Despotic) ছিল। কারণ সেখানে শুধু পরিবারের ফ্রি মেম্বার বা মনিব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত, দাসদাসীদের কথা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। মার্ক্স বললেন মডেল এটিই থাকবে তবে মালিক এবং শ্রমিক একসাথে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এডাম স্মিথ রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে আলাদা করে ফেলেছিলেন, কিন্তু কার্ল মার্ক্স আবার রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে একসাথে করার চেষ্টা করলেন। অর্থাৎ রাজনীতি থেকে অর্থনীতিকে আলাদা করা সম্ভব নয়।
মার্ক্সের 'Base and Superstructure' নামে যে থিওরি সেটির মূল কথা হলো রাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে সবকিছুর মূল (Base)। আর সমাজ থেকে শুরু করে রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ইত্যাদি বাকি যা আছে তা হলো Superstructure বা উপরিকাঠামো। এই Superstructure নির্ভর করে Base এর উপর। তথা আমার রাজনীতি কেমন হবে সেটি নির্ভর করে আমার অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু, আমার ছেলে মেয়ে বাংলা মিডিয়ামে পড়বে নাকি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়বে সেটি নির্ধারিত হয় আমার অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর। অর্থাৎ সবকিছুর মূলে যেহেতু অর্থনীতি, তাই রাষ্ট্র থেকে অর্থনীতিকে আলাদা করা যায় না। আর শ্রমিকরা যে শোষিত হচ্ছে সেটিও এই অর্থনৈতিক কারণেই। রাষ্ট্রে ধনী-গরিব যে শ্রেণি বৈষম্য সেটি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সিস্টেমের কারণেই। তাই রাষ্ট্র থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে এবং বুর্জোয়াদের শোষণ থেকে প্রলেতারিয়েতদের রক্ষা করতে শ্রমিকদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে হবে। কারণ পুরো পুঁজিবাদী সিস্টেম বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে না দিলে সমাজ থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর হবে না। তাই উৎপাদনের উপকরণগুলোর মালিকানাও শ্রমিকদের হাতে নিয়ে আসতে হবে। এই যে শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো উপড়ে ফেলে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার মতাদর্শ সেটাই 'সমাজতন্ত্র' নামে পরিচিত।
Fourth Industrial Revolution (চতুর্থ শিল্পবিপ্লব)
মার্ক্স অনেক দূরদর্শীও ছিলেন বটে। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে এবং সেসব প্রযুক্তির কারণে শ্রমিকরা চাকরি হারাবে এটা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন মার্ক্স। অস্ট্রিয়ান পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট জোসেফ শোপিটারের 'Creative Destruction' আইডিয়ার সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। আগে মানুষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল কৃষিনির্ভর। যেটি Agrarian Society নামে পরিচিত। পানি ও বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারের মাধ্যমে ১৭৮৪ সালে প্রথম শিল্পবিপ্লবটি হয়েছিল। তখন কৃষিব্যবস্থা থেকে মানুষকে কলকারখানামুখী হতে হয়েছে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে শ্রমিকদের শারীরিক শ্রমের প্রয়োজন অনেকটা কমে যায়। তার ১০০ বছর পর ১৯৬৯ সালে শুরু হয় তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। যেটির সূচনা হয়েছিল ইন্টারনেট আবিষ্কারের মাধ্যমে। ইন্টারনেটের প্রভাবে সারা বিশ্বের গতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তখন পণ্য উৎপাদনের জন্য শ্রমিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আবশ্যক হয়ে ওঠে।
বর্তমান একুশ শতকে শুরু হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। Artificial intelligence, Robotics, Automation, Internet of Things (IOT), Big data analyses, 3D printing, Cloud computing, Algorithm, Augmented Reality'র মতো নতুন নতুন সিস্টেম আবিষ্কৃত হওয়ায় পাল্টে গিয়েছে বর্তমান দুনিয়া। রোবোটিকস বা অটোমেশনের কারণে ভবিষ্যতে দেখা যাবে কলকারখানাগুলোতে শ্রমিকদেরই কোনো প্রয়োজন নেই। সামনের দিনগুলোতে ম্যানুফেকচারিং কাজগুলো সব রোবটের হাতে চলে যাবে। একশো জন শ্রমিক একদিনে যে কাজ করতে পারে দেখা যাবে মাত্র দুইটি রোবট সেই কাজ একঘণ্টায় করে ফেলবে। তখন শ্রমিকরা চাকরিচ্যুত (downsizing) হবে। অনেক কার ড্রাইভারের ভুলের কারণে অসংখ্য রোড এক্সিডেন্ট হয়ে মানুষ মারা যায়। সেপিয়েন্স এর লেখক ইউভাল নোয়া হারারির মতে, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে ভবিষ্যতে গাড়িও চালাবে রোবট, বিগ ডেটা এনালাইসিসের মাধ্যমে আমাদের চিকিৎসা সেবা গড়ে উঠবে। আমি পরিপূর্ণ অসুস্থ হওয়ার পূর্বেই মাইক্রো চিপ আমার অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিতে সক্ষম হবে। ক্লাউড কম্পিউটিং এর কারণে কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের উপর আর চাপ থাকবে না। স্টোরেজ, সফটওয়্যার এবং যাবতীয় অপারেটিং সিস্টেমের কাজ চলে যাচ্ছে হার্ড ডিস্কের বাইরে। আমাদের বাসার চারপাশের যত জড়বস্তু রয়েছে তারা নিজেদের মধ্যে ইন্টারনেটের সাহায্যে যোগাযোগ গড়ে তুলবে, আর সেটাই ইন্টারনেট অব থিংস (IOT) নামে পরিচিত। বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ব্যবহার করে একে অপরের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, যেটিকে আমরা এমবেডেড সিস্টেম (Embedded System) বলি। এ্যামাজনের আলেক্সা ও গুগল হোম এর কথা ইতোমধ্যে শুনা যাচ্ছে। যেগুলো আপনার বাসার লাইট, সাউন্ড সিস্টেম, দরজা-সহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ- কাপড় ধৌত করতে হবে? কাপড় ধোয়ার মেশিন কাপড়ের পরিমাণ এবং ওজন বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আপনার কাপড় ধোয়ার কাজটি অটোমেটিকভাবে সম্পাদন করে ফেলবে। মানুষ চাইলে নিজের সুবিধা অনুযায়ী ডাটা এন্ট্রি করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী এটি কাজ করবে। তাই এটিকে Internet of Everything (IOE)-ও বলা হয়।
বাজার করতে হবে? আপনার ফ্রিজ খোলার প্রয়োজন হবে না, ফ্রিজের ভিতরে কী আছে সেটি ফ্রিজ নিজেই জেনে আপনাকে মেসেজ দিয়ে জানাবে বা সেন্সর ব্যবহার করে নিজেই সরাসরি অনলাইনে অর্ডার দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফেলতে পারবেন। আপনার বাসার চুলায় আপনি একবার ডাটা এন্ট্রি করে দেবেন। সেই ডাটা অনুযায়ী চুলা প্রতিদিন রান্না করবে। এই যে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কারণে পুরাতন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে নতুন নতুন ব্যবস্থা শুরু হচ্ছে সেটিই জোসেফ শোপিটারের ভাষায় 'Creative Destruction' হিসেবে পরিচিত। এই ক্রিয়েটিভ ডেসট্রাকশনের কারণে আগামীর দিনগুলোতে অসংখ্য শ্রমিক চাকরি হারাবে। অর্থাৎ এভাবে ক্রমবর্ধমান নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাদ যখন তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে (Peak) পৌঁছাবে তখন দেখা যাবে শ্রমিকরা আরও বেশি নিষ্পেষিত হবে এবং কর্ম থেকে বিচ্যুত হবে। মার্ক্সের ভাষায় শ্রমিকদের এই কর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়াকে 'Annihilation' বলা হয়।
Socialism (সমাজতন্ত্র) and Communism (সাম্যবাদ)
সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের মধ্যে পার্থক্য কী? কার্ল মার্ক্স তাঁর মতাদর্শ দিয়ে গিয়েছেন; কিন্তু শ্রমিকরা কীভাবে সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে কিংবা পরবর্তী রাষ্ট্র কেমন হবে সে ব্যাপারে তেমন কিছু বলেননি। পরবর্তীতে মার্ক্সের অনুসারীরা সেটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। এ নিয়ে অসংখ্য মতবিরোধ থাকলেও আমি সহজ করে পুরো বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। (ক) মার্ক্সিস্ট মতাদর্শনুযায়ী সকল শ্রেণির শোষিত এবং নিষ্পেষিত শ্রমিক পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করবে। (খ) এখন শ্রমিকদেরকে একত্রিত ও সংগঠিত করার জন্য শ্রমিকদের মধ্য থেকেই যোগ্য কাউকে নেতৃত্ব দানে এগিয়ে আসতে হবে। (গ) শ্রমিক আন্দোলন দমাতে তাদের বিরুদ্ধে ক্যাপিটালিস্টরা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সেগুলোকে শ্রমিকরা মোকাবিলা করবে। (ঘ) আন্দোলনের মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠীকে পরাজিত করে শ্রমিকরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে। (ঙ) উৎপাদনের যে উপকরণ বা অর্থনীতি সেটি ক্যাপিটালিস্টদের থেকে শ্রমিকদের আয়ত্তে নিয়ে আসবে। (চ) শ্রমিকরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পর শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকে উপড়ে ফেলে দিয়ে সকলের সমন্বয়ে একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।
উপরিউক্ত 'ক' থেকে 'ঙ' নাম্বার ধাপ পর্যন্ত তথা শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু করা থেকে শুরু করে একত্রিত হওয়া, ক্যাপিটালিস্টদের মোকাবিলা করা এবং সর্বশেষ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা, এই পুরো প্রসেসটি সমাজতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। আর সমাজতন্ত্রের সর্বশেষ 'চ' নাম্বার যে ধাপটি রয়েছে তথা বুর্জোয়াদের আধিপত্য বিলীন করে দিয়ে একটি শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা সেটাই সাম্যবাদ হিসেবে পরিচিত। সাম্যবাদ হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সর্বশেষ রূপ। ১৯২২ সালে শ্রমিকরা আন্দোলন করে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেছিল, তার কয়েকবছর পরেই তথা ১৯২৮ সালে ক্যাপিটালিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে অর্থনৈতিক মহামন্দা (Economic Depression) দেখা দিয়েছিল। তাই তখন মার্কসীয় মতাদর্শ ও সমাজতন্ত্রের জয়জয়কার অবস্থা তৈরি হয়েছিল।
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য
পণ্য উৎপাদন করা থেকে শুরু করে কোন কোন পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা প্রয়োজন সেটার সিদ্ধান্ত নেওয়া, উৎপাদনের পর সেগুলো আবার কীভাবে বণ্টিত হবে ইত্যাদি বিষয়গুলোকে একসাথে বলা হয় Economic System বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই ইকোনমিক সিস্টেমকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রশ্ন রয়েছে; এক. আমরা কী কী উৎপাদন করব? দুই. কীভাবে উৎপাদন করব? তিন, উৎপাদিত পণ্য কারা ভোগ করবে? পুঁজিবাদী সিস্টেমে প্রাইভেট ফার্ম বা প্রতিষ্ঠানগুলো এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে। প্রয়োজনীয় পণ্য নাকি বিলাসবহুল পণ্য উৎপাদন করা হবে সেটি ব্যক্তি বা ফার্মের উপর নির্ভর করে। প্রযুক্তি দিয়ে নাকি শ্রমিক দিয়ে পণ্য উৎপাদন করবে সেটাও ফার্মগুলো নির্ধারণ করবে। শ্রমিকদের বেতন কত হবে সেটাও ফার্মগুলো নির্ধারণ করবে। ফার্মে উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি করবে নাকি বিদেশে রপ্তানি করবে সেটাও ওইসব ফার্মের মালিক নির্ধারণ করবে। পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থাকেই ইংরেজিতে 'Market Economy' বলা হয়। আর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সিস্টেমে উপরিউক্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়। কী কী পণ্য উৎপাদন করা হবে সেটি রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, কীভাবে উৎপাদন করবে সেটাও রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, রাষ্ট্রের জনগণের মাঝে উৎপাদিত পণ্য কীভাবে বণ্টন করে দেওয়া হবে সেটাও রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজতান্ত্রিক ইকোনমিক সিস্টেমকে ইংরেজিতে Planned Economy বা Command Economy বা Centralized Economy ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নেন উপরিউক্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর কী হবে। তাই উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে Command Economy বলা হয়।
পুঁজিবাদ কেন টিকে গিয়েছে?
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী Ralf Dahrendorf ছিলেন মার্ক্সের অন্যতম সমালোচক। প্রথমত, বিশ্বজুড়ে ক্যাপিটালিস্টদের মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিটি দেশের হাজার হাজার মানুষ পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থাতে বিনিয়োগ করছে। তার মানে মানুষজন পুজিবাদী সিস্টেমে আগ্রহী। তাই বিভক্ত হওয়া শ্রমিকদের পক্ষে এত সংখ্যক পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক সিস্টেমে কাঠামোগত সমস্যা থাকায় এটি একটি রাষ্ট্রে ফাংশন করে না। আজকে উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা দেখলেই সেটি ফুটে ওঠে। ভেনেজুয়েলায় আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি। তৃতীয়ত, সময় পরিবর্তন হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের সাথে একবিংশ শতাব্দীর তুলনা করলে চলবে না। শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তাদের শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।
চতুর্থত, শিল্পবিপ্লবের পূর্বে সমাজের যে অবস্থা ছিল এখন তা অনেক উন্নত হয়েছে। পুঁজিবাদের প্রসারে দরিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। পঞ্চমত, ম্যাক্স ওয়েবারও সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করেছিলেন। কারণ সোসাইটি থেকে শ্রেণিবৈষম্য হ্রাস করা আদৌ সম্ভব নয়। বোঝার সুবিধার্থে ধরে নিলাম সমাজতন্ত্রে কোনো শ্রেণি (Class) নেই এবং সবাই সমান। কিন্তু কথা হচ্ছে মানুষের Skill ভিন্ন হলে পেশাও ভিন্ন হয়। একজন ডাক্তার আর একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বেতন কখনো এক হবে না। ডাক্তারের যখন বেতন বেশি হবে তখন তার সাথে ওই তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বেতন বৈষম্য (Income Inequality) দেখা দেবে। এক পর্যায়ে ডাক্তারের সম্পদের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাবে। তখন এই ডাক্তারের সাথে ওই কর্মচারীর সম্পদ বৈষম্য (Wealth Inequality) দেখা দেবে। আর যার সম্পদ বেশি আছে তাকেই মানুষ বেশি প্রাধান্য দেবে। সম্পদ বেশি থাকায় ডাক্তারের রাজনৈতিক শক্তিমত্তাও বেশি থাকবে। একজন ডাক্তারের ছেলেকে যেখানে পড়াশোনা করাবে, একজন দিনমজুরের ছেলেকে সেখানে পড়াতে পারবে না। এটাই স্বাভাবিক। তথা এই Educational বা Occupational Attainment সমাজের সকল স্তরের জনগণের জন্য সমান হবে না। একজন ডাক্তার তার টি-শার্টটি ক্রয় করবে কোনো নামি-দামি ব্র্যান্ড থেকে। কিন্তু একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ব্র্যান্ড থেকে শার্ট ক্রয় করার সেই সক্ষমতা হয়তো হবে না। তাই সমাজের মানুষের মধ্যেও Status ভিন্ন ভিন্ন হবে। মার্ক্সিস্টরা সমাজ থেকে শ্রেণিবৈষম্য মূলোৎপাটনের যে কথা বলছে সেটা আজকের দুনিয়ায় আদৌ সম্ভব নয়। উপরিউক্ত কারণে রাষ্ট্রে Social Stratification বা সামজিক স্তরবিন্যাস থাকবেই। এজন্যই- “Capitalism is a must"। পুঁজিবাদ যেহেতু সকল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় ভালো তাই এই পুঁজিবাদের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোর সমাধানের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে আরও বেশি কার্যকরী করে তোলাটাই শ্রেয় মনে করেছেন পরবর্তী অর্থনীতিবিদরা।
Globalisation (বিশ্বায়ন)
বর্তমানে আমাদের পোশাক শিল্পে তৈরিকৃত একটি ফাইনাল প্রোডাক্ট হচ্ছে জিন্স প্যান্ট। এই জিন্স প্যান্ট তৈরি করতে আমাদেরকে চীন থেকে তুলা বা কটন ফাইবার আমদানি করতে হয়, সেই কটন আবার রঙিন বা বিভিন্ন কালারে শেইপ দেওয়ার জন্য ভারত থেকে ভিয়েতনাম থেকে ফ্যাশন ডিজাইনার হায়ার করে নিয়ে আসতে হয়। তারপর বাংলাদেশের রং আমদানি করতে হয়, জার্মানি থেকে অত্যাধুনিক সেলাই মেশিন ক্রয় করতে হয়, শ্রমিক দিয়ে তৈরিকৃত সেই পোশাক ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি করা হয়। এই যে একটি পণ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক (Interconnectedness) এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Interdependence) গড়ে উঠেছে এটাই বিশ্বায়ন। উচ্চতর অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সে বিশ্বায়ন বলতে প্রথম দিকে শুধু পণ্যের বিশ্বায়নকে গুরুত্বারোপ করলেও এখন বিশ্বায়ন হয়েছে রাজনীতির, বিশ্বায়ন হয়েছে সংস্কৃতির, বিশ্বায়ন হয়েছে প্রযুক্তির। আইফোন ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক একটি মোবাইল সেট, যার চিপস ও চ্যাসিস তাইওয়ানে, স্টোরেজ ডিভাইস চীনে, ক্যামেরা ও ডিসপ্লে জাপানে, র্যাম ও প্রসেসর দক্ষিণ কোরিয়ায়, বিশেষ মিনারেল আবার ক্যালিফোর্নিয়ায়, এসেম্বল উৎপাদিত হচ্ছে ভিয়েতনামে। তারপর সেই আইফোন বিক্রি হচ্ছে সারাবিশ্বে। এটাই পণ্যের বিশ্বায়ন (Economic Globalisation)।
Driving Forces of Globalization (বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি)
বিশ্বায়নের প্রভাবে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সাথে অপর প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ গড়ে উঠায় পৃথিবীটি ছোট হয়ে এসেছে। রাষ্ট্রের যে বর্ডার বা সীমানা সেটি আজকে গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে। সীমানার অপর প্রান্তের কোনো একটি ঘটনা সীমানার এপারেও প্রভাব ফেলছে। বর্ডারে দেয়াল তুলে সেই প্রভাব আটকানো যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি জনগণের উপর ইসরায়েলি হামলা হলে সেটির প্রভাব বাংলাদেশের মানুষের উপরেও পড়ে। চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হলে সেটির প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে। বিশ্বায়নের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যে শক্তিগুলো (Driving Forces) কাজ করেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চারটি শক্তি।
(১) Economic Shift: কৃষি ব্যবস্থা থেকে শিফট করে শিল্পায়ন হয়েছে। নগরায়ণের কারণে রাজধানীতে ক্যাপিটাল ফ্লো বা পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর ইন্ডাস্ট্রিগুলোর আধুনিকায়ন হয়েছে। তখন পুঁজির প্রবাহ রাজধানী থেকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়েছে。
(২) Technological Shift: নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। আমরা মানবচালিত পরিবহনের জায়গায় মেশিনচালিত পরিবহনে শিফট করেছি। সামনের দিনগুলোতে মেশিনচালিত পরিবহন থেকে রোবটচালিত পরিবহনে শিফট করব। 'স্বয়ং-চালিত গাড়ির প্রযুক্তি' বা Automated Car নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে। কলকারখানায় ব্যবহৃত পুরাতন প্রযুক্তির জায়গায় নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন হচ্ছে, যা উৎপাদনের মাত্রাকে বৃদ্ধি করেছে। উৎপাদনের মাত্রা যখন বৃদ্ধি পায় তখন সেসব উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে দিতে হয়। তখন বিশ্বায়ন আরও ত্বরান্বিত হয়।
(৩) Political Shift: একসময় রাষ্ট্র ছিল রাজা-সম্রাটদের অধীনে, তারপর সেখান থেকে শিফট করে কলোনিতে, কলোনি থেকে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র চলে যায় একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী শাসকদের হাতে। সেখান থেকে রাষ্ট্র শিফট করে গণতান্ত্রিক সরকারে। বিংশ শতাব্দী জুড়ে আমরা দেখেছি অধিকাংশ রাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্যে লিপ্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংস্কৃতির মিশ্রণ হচ্ছে। যা বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করছে।
(৪) Institutional Shift: আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বৃদ্ধির কারণে অসংখ্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। পুঁজির অবাধ প্রবাহে, বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রসারে, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিকরণে এসব প্রতিষ্ঠান অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে। যা বিশ্বায়নকে আরও গতিশীলতা দিয়েছে।
বিশ্বায়নের প্রভাব ও বাংলাদেশ
বিশ্বায়নের প্রভাবের উপর ভিত্তি করে তিনটি উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব রয়েছে।
(ক) Traditionalist School: যারা বামপন্থি তাদের দাবি বিশ্বায়ন হচ্ছে একটি Myth বা অতিকথা। একই ভাবে সমাজতন্ত্রীদের মতে বিশ্বায়নের কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর উত্তরের রাষ্ট্রগুলো ধনী হয়েছে কিন্তু দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলো এখনো গরিব অবস্থানেই আছে। মানচিত্রে উত্তরের রাষ্ট্র বলতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। আর দক্ষিণের রাষ্ট্র বলতে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ও এশিয়ার দেশগুলোকে বোঝায়। উত্তরের রাষ্ট্রগুলোর সাথে দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোর যে বৈসাদৃশ্যতা সেটিকে টারম হিসেবে 'North-South Gap' বলা হয়। ট্র্যাডিশনাল স্কুল মূলত বিশ্বায়নের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রমিক শোষণ, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব, বাজারে অসমতা ইত্যাদি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরে。
(খ) Liberal School: যারা উদারনীতিবাদে বিশ্বাসী তাদের মতে, বিশ্বায়ন শুধু উত্তরের দেশগুলোতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি বরং দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোতেও পরিবর্তন সাধন করেছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোও উপকৃত হচ্ছে। লিবারেল স্কুল চেষ্টা করে বিশ্বায়নের প্রভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি, বেসরকারিকরণ, মুক্ত বাণিজ্য, দারিদ্র্য হ্রাস, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার।
(গ) Transformationalist School: এই তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্বায়ন প্রতিটি রাষ্ট্রকেই প্রভাবিত করেছে। সেটি ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক থেকেই। তাদের মতে বৈশ্বিক উন্নয়নের ছোঁয়া সবাই পেয়েছে। শুধু ভারত ও ব্রাজিলের মতো রাষ্ট্রগুলোতেই নয় বরং বিশ্বের প্রতিটি দেশে দরিদ্রতা হ্রাস পেয়েছে। ট্রান্সফরমালিস্ট স্কুল চেষ্টা করে ট্র্যাডিশনাল স্কুল ও লিবারেল স্কুল এই দুটোর মধ্যে একটি সামঞ্জস্য তুলে ধরার। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব বিশ্লেষণেও উপরিউক্ত তিনটি স্কুল প্রযোজ্য। বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রভাব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়।
মুক্ত বাজার অর্থনীতি (Free Market Economy)
মুক্ত বাজার অর্থনীতি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে কোনো বাঁধা-বিপত্তি এবং সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের সুবিধা থাকে। অর্থাৎ বাণিজ্যে কোনো ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা থাকবে না।
শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (Tariffs and Non-Tariff Barriers)
মুক্ত বাজার অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো, একটি দেশের আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে সরকারের কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারবে না। একই ভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (Tariffs and Non-Tariff Barriers) থাকবে না। একটি দেশের সরকার যখন নিজ দেশের পণ্যের উপর কর আরোপ করে তখন সেটিকে বলা হয় ট্যাক্স (Tax)। আর সরকার যখন বিদেশি কোন পণ্যে অথবা আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর কর আরোপ করে তখন সেটিকে ট্যাক্স না বলে বলা হয় শুল্ক (Tariffs)। আর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্ক আরোপ করাকেই বলা হয় ট্যারিফ ব্যারিয়ার (Tariff Barriers)। মুক্ত বাজার অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একটি দেশের সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বা বিদেশি কোনো পণ্যের উপর ট্যারিফ বসাতে পারবে না।
এবার আসি "নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার" নিয়ে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর শুল্ক ছাড়াও সরকার আরও যে সকল বাধাবিপত্তি তৈরি করে সেগুলোকেই বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। এই নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের কয়েকটি উদাহরণ হলো:
১. Important Licences: অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে সরকার যখন আমদানি সনদে কঠিন নিয়মনীতি প্রণয়ন করে এবং আমদানি সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার।
২. Export control: একটি দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য রপ্তানি করার ক্ষেত্রে রপ্তানিকারী দেশের সরকার যখন বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করার মাধ্যমে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার。
৩. Quotas: একটি দেশের সরকার যখন তার দেশে আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং সময়ের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে দেয় তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কী পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে তা যদি যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নির্ধারণ করে দেয় তখন সেটিকে কোটা (Quota) বলে। ভারতের পেঁয়াজ বাংলাদেশের আমদানি করার ক্ষেত্রে সরকার যদি বলে আমরা শুধু আগামী তিন মাসের জন্যই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করব তখন সেটিকেও বলা হয় কোটা। আর এই কোটা যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করে তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বা অশুল্ক বাধা।
৪. Subsidies: প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি দেশীয় পণ্যকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে সরকার যখন সেই পণ্যের মান উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে তখন সেটিকে Subsidy বা ভর্তুকি বলা হয়। ভারত যেসব পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সয়াবিন তেল। এখন ধরুন বাংলাদেশে উৎপাদিত সয়াবিন তেল মানের দিক থেকে ভারতের তুলনায় নিম্নমানের এবং তার দামও তুলনামূলক বেশি। তাই মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী ভারতের সয়াবিন তেল বাংলাদেশের বাজারে বিনা শর্তে প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার যদি নিজের দেশে উৎপাদিত ঐ নিম্নমানের সয়াবিন তেলের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ভর্তুকি প্রদান করে এবং ভারতের সয়াবিন তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে বাণিজ্যে বাধাগ্রস্ত করে তখন সেটিও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের উদাহরণ।
৫. Embargo: একটি দেশ যখন অন্য দেশের কোন পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তখন সেটিকে Embargo বলা হয়। আর এটিও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের উদাহরণ। অর্থাৎ মুক্ত বাজার অর্থনীতি বা Free Market Economy হলো ট্যারিফ এবং নন-ট্যারিফ মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
সংরক্ষণবাদ (Protectionism): মুক্ত বাজার অর্থনীতির ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক দিকগুলো থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার যে প্রয়াস সেটিকেই বলা হয় সংরক্ষণবাদ। এই সংরক্ষণবাদ বিষয়টি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে খুবই জরুরি একটি বিষয়। তাই এটি বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
১. The Infant-Industry Argument: একটি দেশের উদীয়মান শিল্পগুলোকে “Infant-Industry” বলা হয়। ধরুন বাংলাদেশের একটি উদীয়মান শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান একই পণ্য উৎপাদন করে। বাংলাদেশের এই উদীয়মান শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্যের মান যুক্তরাষ্ট্রের অতি উন্নত এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের মানের তুলনায় একটু নিম্নমানের হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন আমি যদি মানের দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার দেই তখন বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশি পণ্য ক্রয় করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তখন আমার দেশের যে উদীয়মান শিল্পগুলো ছিল সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আর আমাদের দেশীয় শিল্পগুলো বিস্তার লাভ করতে পারবে না। একটি সময় পর দেশীয় শিল্পগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। যার ফলে বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক জনগণ তাদের কর্মসংস্থান থেকেও বঞ্চিত হবে। তাই বাংলাদেশ সরকার যদি নিজ দেশের এই উদীয়মান শিল্পগুলোকে রক্ষা করতে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে তখন সেটিকে বলা হয় Protectionism বা সংরক্ষণবাদ。
২. Dumping and Anti-dumping: সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে 'Dumping' একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই পেঁয়াজ উৎপাদন করতে সক্ষম। এখন মুক্ত বাজার অর্থনীতি অনুযায়ী ভারত তার পেঁয়াজ বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করতে পারবে এবং বাংলাদেশও তার পেঁয়াজ ভারতের বাজারে বিক্রি করতে পারবে। এখন মনে করুন বাংলাদেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩০ টাকা এবং বাজারে বিক্রি করা হয় ৪০ টাকা। অন্যদিকে ভারতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৪০ টাকা এবং ভারতের বাজারে সেই পেঁয়াজ বিক্রি করা হয় ৫০ টাকা করে। এখন যদি ভারত বাংলাদেশের বাজার দখল করার উদ্দেশ্য তার উৎপাদিত পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রতি কেজি ৩০ টাকা করে বিক্রি করা শুরু করে তখন বাংলাদেশের মানুষ দেখবে একই পণ্য ভারত কম টাকায় দিচ্ছে। যার ফলে মানুষ ভারতের পেঁয়াজ ক্রয় করা শুরু করবে। আর তখনই বাংলাদেশি পেঁয়াজ বাজার ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের পেঁয়াজের মার্কেটটি দখল করে নেবে। একটি সময় পর বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজার থেকে বের হয়ে গেলে মানুষ ভারতের পেঁয়াজের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এই নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে ভারত তার পেঁয়াজের দামটি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে তার পূর্বের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নেবে এবং বাংলাদেশের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জন করবে। এই যে ভারত তার দেশে ৪০ টাকা খরচে উৎপাদিত পণ্যটি ১০ টাকা লোকসান দিয়ে বাংলাদেশের বাজারে ৩০ টাকা করে বিক্রি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারটি দখল করল এটিকেই Dumping বলা হয়। এই Dumping কে আবার Below-Cost Pricingও বলা হয়। কেউ আবার এটিকে Unfair Competition বা Predatory Pricing বলে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার যদি ভারতের এই ডাম্পিং বা অসম প্রতিযোগিতাকে বন্ধ করতে কোনো পলিসি গ্রহণ করে তখন সেটিকে Anti-Dumping Policy বলা হয়। এভাবে Anti-Dumping Policy তৈরি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের পেঁয়াজ শিল্পকে রক্ষা করাই সংরক্ষণবাদ বা Protectionism এর উদাহরণ।
Balance of Payment (লেনদেন ভারসাম্য): একটি রাষ্ট্র তার দেশে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত পণ্য (Surplus) অন্য রাষ্ট্রে রপ্তানি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। একই ভাবে রাষ্ট্রে যেসব পণ্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে সেসব পণ্য অন্য রাষ্ট্র থেকে আমদানি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে। বৈদেশিক মুদ্রার অর্জন এবং বৈদেশিক মুদ্রার খরচের মধ্যে যে পার্থক্য সেটাই একটি দেশের লেনদেন ভারসাম্য। একটি রাষ্ট্র যখন বৈদেশিক মুদ্রা খরচের চেয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বেশি করে তখন সেটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। আর বৈদেশিক মুদ্রা খরচের চেয়ে অর্জন বেশি করাকেই অনুকূল লেনদেন ভারসাম্য (Favourable Balance of Payment) বলা হয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের চেয়ে যদি খরচ বেশি হয় তাহলে সেটিকে প্রতিকূল লেনদেন ভারসাম্য (Unfavourable Balance of Payment) বলা হয়।
Balance of Trade (বাণিজ্যিক ভারসাম্য): একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত মোট বাণিজ্যের মূল্যায়নে 'বাণিজ্যিক ভারসাম্য' পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের কথাই ধরা যাক। একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হয় এবং ভারত থেকে যে পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশে আমদানি করা হয় এই দুয়ের আর্থিক মূল্যের ব্যবধানকে বাণিজ্যিক ভারসাম্য বলে। এখন বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য ভারতে রপ্তানি করে তার চেয়ে বেশি যদি ভারতীয় পণ্য আমদানি করে তখন সেটিকে বলা হয় Trade Deficit বা বাণিজ্য ঘাটতি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তাই রাষ্ট্রের উচিত আমদানিকৃত পণ্যের বিকল্প পণ্য নিজ দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। অন্যদিকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য ভারত থেকে আমদানি করে তার চেয়ে বেশি যদি ভারতে রপ্তানি করতে পারে তখন সেটিকে বলা হয় Trade Surplus বা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। এই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত একটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর।
Most Favoured Nation (MFN)
'Most Favoured Nation' এরকম একটি ধারণা যেখানে মনে করা হয় দেশগুলোকে তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে সমানভাবে আচরণ করা উচিত এবং কোনো একটি দেশকে “অধিক পক্ষপাতী” করা উচিত নয়। মনে করুন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক পার্টনার হচ্ছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ভারত ও বাংলাদেশ এই পাঁচটি দেশ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই পাঁচটি দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমান আচরণ করা (equal treatment)। যুক্তরাষ্ট্র যদি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার অধিক মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াকে কিছু বাড়তি সুবিধা দেয় যেগুলো তার অন্য বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ বা ভারতকে দেওয়া হয় না তাহলে এটি Most Favoured Nation ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর সকল সদস্য রাষ্ট্র এই বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে যে তারা সবাই Most Favoured Nation এই নীতিটি মেনে চলবে। তথা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সকল সদস্য বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে সমান আচরণ করবে। Most Favoured Nation এই নীতিটির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা রয়েছে : ১. Trade enhancement: রাষ্ট্রগুলো যখন একে অপরের সাথে কোনোরকম বৈষম্য ব্যতিরেকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলে তখন বৈশ্বিকভাবে বাণিজ্য ত্বরান্বিত হয়। ২. Reducing trade diversion: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে Most Favoured Nation নীতিটি অন্য রাষ্ট্রকে তার প্রাপ্য বাণিজ্যিক সুবিধা থেকে পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ কমায়। ৩. Trade balance for small countries: ছোট রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় শক্তি কম হওয়ায় তারা বিভিন্ন সময় বড় রাষ্ট্রগুলোর সাথে নেগোসিয়েশনে যেতে ভয় পায়। কিন্তু Most Favoured Nation নীতিটির আওতায় ছোট রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব বাণিজ্যে নিরাপদ বোধ করে এবং তাদের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোও ভারসাম্যপূর্ণ হয়। এক কথায় Most Favoured Nation নীতি হচ্ছে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বৈষম্যহীন বাণিজ্যিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন।
Bail out Policy (বেইল আউট)
যখন কোনো কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেশন বা রাষ্ট্র চরম আর্থিক সংকটে পড়ে অথবা প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় থাকে তখন তাদেরকে এই সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য যদি আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় সেটিকে 'বেইল আউট' (Bail out) বলা হয়। বেইল আউটকে অনেকসময় 'Capital Injection'ও বলা হয়। বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। কার্গিল (Cargill) হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম একটি প্রাইভেট বা বেসরকারি কোম্পানি। এই কোম্পানিটি মূলত পশুদের খাদ্য, মানুষের খাদ্য, কৃষিজাত পণ্য, পাম ওয়েল ইত্যাদি তৈরি করে থাকে। এই কোম্পানিতে হাজার হাজার ইউএস নাগরিক কাজ করছে, যার ফলে বেকারত্বের হার কমছে। এই কোম্পানি প্রতি বছর তাদের আয়ের একটি অংশ 'কর্পোরেট ট্যাক্স' হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিচ্ছে। এই কোম্পানি থেকে আদায়কৃত ট্যাক্স দিয়ে সরকার দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারছে। এখন ধরুন হঠাৎ করে এই প্রাইভেট কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ল একনাগাড়ে দুই তিন বছর এই কোম্পানির কোনো লাভ বা প্রফিট আসছে না, প্রফিট না আসায় কোম্পানিটি ভালো মানের পণ্যও উৎপাদন করতে পারছে না, মূলধনের অভাবে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। এরকম কয়েকবছর চলতে থাকলে এই কোম্পানী একসময় অচল বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এখন এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি বেসরকারি এই কোম্পানিকে আর্থিক প্রণোদনা ও নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা কিংবা বিনা সুদে ঋণ দেয় তাহলে কোম্পানিটি হয়তোবা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এখন এই কোম্পানিকে পুনরায় সচল করতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা করা বা প্রণোদনা দেওয়া (Bail out) উচিত কি উচিত না?
Arguments: যারা বিশ্বাস করে, অর্থনীতিকে সচল রাখতে রাষ্ট্রের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত তাদেরকে বলা হয় 'Interventionist Economists' । তাদের মতে সরকারের উচিত যে-সকল প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আর্থিক সংকটে আছে তাদেরকে বেইল আউট বা আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা। তাদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উচিত কার্গিল কোম্পানিকেও তাদের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া। কারণ কার্গিল কোম্পানিকে আর্থিক প্রণোদনা দিলে তিনটি লাভ হবে :
এক. এই কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে না বরং সচল থাকবে। কোম্পানি সচল থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য নাগরিক এখানে কাজ করার সুযোগ পাবে। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বেকারত্ব হ্রাস পাবে।
দুই. এই কোম্পানি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রতি বছর আয়কর পাবে। কোম্পানি থেকে পাওয়া এই করের টাকা দিয়ে সরকার দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করতে পারবে। অর্থাৎ আর্থিক সংকটে কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে সরকারের রাজস্বও কমে যাবে। সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিন. কার্গিল কোম্পানি সচল থাকলে দেশের কৃষিজাত পণ্যের চাহিদা বা যোগান মিটবে। অর্থের সংকটে কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে এই কোম্পানির তৈরিকৃত কৃষিজাত পণ্যের জন্য তখন সরকারকে হয় অন্য কোনো বিদেশি কোম্পানির উপর নির্ভর করতে হবে, না-হয় অন্য কোনো রাষ্ট্র থেকে কৃষিজাত পণ্য আমদানি করে নিয়ে আসতে হবে। তখন দেশের টাকা বিদেশে চলে যাবে। উপরিউক্ত এই তিনটি কারণে অনেকে বেইল আউট পলিসিকে সমর্থন করে।
Counter Arguments: এবার আসি কেন 'বেইল আউট' পলিসিকে লিবার্টারিয়ান বা লিবারেল অর্থনীতিবিদরা সমর্থন করে না। যারা বিশ্বাস করে অর্থনীতি ও রাজনীতি দুইটি একসাথে চলতে পারে না, যারা মনে করে সরকারের উচিত অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ না করা, তাদেরকে বলা হয় 'Libertarian' বা 'Liberal Economist'। তাদের মতে, সরকারের হস্তক্ষেপ ইকোনমিতে ব্যাঘাত ঘটায়। এই লিবার্টারিয়ানদের মতে, সরকারের উচিত কার্গিল কোম্পানির মতো বিভিন্ন কর্পোরেশনকে তাদের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতা না করা। তার কারণ হলো:
এক. সরকার কার্গিল কোম্পানিকে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য টাকা কোথায় পাবে? যদি উত্তর হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে দেবে, তাহলে সেটি হবে অনৈতিক। কারণ সরকার যখন এভাবে বিভিন্ন কোম্পানিকে বেইল আউট দেবে তখন সরকার সে টাকা যোগাড় করতে জনগণের উপর ট্যাক্স বৃদ্ধি করবে। একটি প্রাইভেট কোম্পানির দায়িত্ব সাধারণ ও জনগণ কেন বহন করবে? লিবার্টারিয়ানদের মতে, এটি অনৈতিক। তাই বেইল আউট দেওয়া উচিত না।
দুই. যেহেতু প্রথমটি অনৈতিক, ধরুন সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিল কোম্পানিকে বেইল আউট দেওয়ার জন্য জনগণের থেকে টাকা নেবে না। সরকার বরং ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কার্গিল কোম্পানিকে সহযোগিতা করবে। লিবার্টারিয়ানদের মতে এখানেও সমস্যা। কারণ সরকার যখন বিভিন্ন কোম্পানিকে আর্থিক সাহায্য করার জন্য বিপুল পরিমাণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, তখন ব্যাংকে আর অবশিষ্ট কোনো টাকা থাকবে না। একজন সাধারণ নাগরিক বা উদ্যোক্তা যখন তার ব্যবসা শুরু করার জন্য ব্যাংক থেকে লোন আনতে যাবে তখন সে দেখবে ব্যাংক তাকে লোন দেওয়ার মতো অবশিষ্ট কোনো টাকা ব্যাংকে নেই। কারণ ব্যাংক যে পরিমাণ টাকা লোন দেয় সে টাকা সরকার অলরেডি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বেইল আউট হিসেবে দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে সরকার অধিক পরিমাণে লোন উত্তোলন করার ফলে সাধারণ নাগরিকরা আর লোন নিতে পারছে না।
তিন. ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করলে যেহেতু সাধারণ জনগণের জন্য ঋণ নেওয়ার মতো টাকা অবশিষ্ট থাকে না তাই ধরুন সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিল, সে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপাবে। সরকার ব্যাংক থেকে নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সেই টাকা বিভিন্ন কোম্পানিকে বেইল আউট হিসেবে দেবে। লিবার্টারিয়ানদের মতে, এতেও সমস্যা। কারণ সরকার যখন অধিক পরিমাণে টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেবে তখন হয় মুদ্রাস্ফীতি ঘটে, না-হয় টাকার ভ্যালু কমে যায়। একটি ছোট উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। রাষ্ট্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা এক অর্থবছরে যে পরিমাণ সম্পদ উৎপাদন হয় সে দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক শুধু সেই পরিমাণ টাকাই ছাপাতে পারে। ধরুন যুক্তরাষ্ট্রে শুধু আপেল পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট আপেল উৎপাদিত হলো ১০ কেজি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এই অর্থবছরে মোট টাকা ছাপালো ১,০০০। এখন ক্রয় করার মতো টাকা আছে ১০০০, আর পণ্য আছে ১০ কেজি আপেল। তাহলে প্রতি কেজি আপেল হবে ১০০ টাকা করে। কিন্তু সরকার যদি ১০০০ টাকা না ছাপিয়ে ১৫০০ টাকা ছাপাতো, তাহলে প্রতি কেজি আপেল মানুষকে কিনতে হতো ১৫০ টাকা করে। অর্থাৎ সম্পদের পরিমাণ একই রেখে টাকা যদি বেশি ছাপানো হয় তাহলে সেই টাকার মান কমে যায়। তাই লিবার্টারিয়ানদের মতে, সরকার যদি কার্গিল প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সংকট উত্তরণের লোন দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে টাকা ছাপায় তাহলে দেশে টাকার ভ্যালু কমে যায়।
চার, উদারপন্থি অর্থনীতিবিদদের মতে, কোম্পানিগুলো সাধারণত আর্থিক সংকটে পড়ে বা দেউলিয়া হয় তাদের নিজস্ব কারণেই। হয় তারা নিম্নমানের পণ্য সাপ্লাই দিয়েছে যেগুলো মানুষের পছন্দ হয়নি, তাই মানুষ ক্রয় করেনি। না-হয় কোম্পানি যথেষ্ট গবেষণা না করার ফলে বিরূপ কোন পলিসি গ্রহণ করেছিল। যে কারণে কোম্পানি এখন সংকটে পড়েছে। উদারপন্থিদের মতে, সরকার যদি এসব কোম্পানিকে আর্থিক সহযোগিতা বা বেইল আউট প্রদান করে তাহলে কোম্পানিগুলো সচেতন হবে না, তারা গবেষণা করবে না ঠিক কেন তারা সংকটে পড়েছিল। কোম্পানিগুলো মনে করবে আবার আর্থিক সংকটে পড়লে সরকার তো আছেই। সরকার আমাদের বেইল আউট দেবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায় একটি কোম্পানি সংকটে পড়ে তাদের অব্যবস্থাপনা বা কোম্পানির ভিতরকার দুর্নীতির জন্য। তাহলে সরকার যতই বেইল আউট বা সহযোগিতা করুক আদতে কোনো লাভ নেই। তার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ব্যাংক, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও বেইল আউট দিয়েছিল। কিন্তু দেখা গিয়েছে তারা দেউলিয়া থেকে উত্তরণ না হয়ে আরও বেশি দেউলিয়াত্ব হয়েছে। সরকারের উল্টো ক্ষতি হয়েছে।
পাঁচ. লিবার্টারিয়ানদের মতে মার্কেট হবে প্রতিযোগিতামূলক। যে কোম্পানি বাজারে ভালো ও মানসম্মত পণ্য সাপ্লাই দেবে সেই কোম্পানি এমনিতেই সচল থাকবে। কারণ ভালো পণ্য বলে মানুষ তার পণ্য ক্রয় করবে। যে কোম্পানি মর্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না, তাকে সহযোগিতা করে লাভ নেই। কার্গিল কোম্পানি যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে অন্য আরেকটি কোম্পানি সেখানে দাঁড়িয়ে যাবে। এটাই প্রতিযোগিতার নিয়ম। আর এটিকেই 'Self-correction' বলা হয়। তথা এর মূল কথা হচ্ছে এই প্রতিযোগিতায় কেউ ছিটকে পড়বে, কেউ ঘুরে দাঁড়াবে, কেউ নতুন করে বাজারে চলে আসবে। যেমন- একসময় বাজারে নোকিয়া মোবাইল প্রচুর চলত, প্রতিযোগিতায় নোকিয়া মোবাইলকে পেছনে ফেলে স্যামসাং চলে আসল, আবার স্যামসাংকে পেছনে ফেলে শাওমি চলে আসল। এভাবেই মার্কেট ইকোনমি চলতে থাকে। এক কার্গিল কোম্পানি বন্ধ হলে মার্কেটে বহু কার্গিল চলে আসবে।
ছয়. লিবার্টারিয়ানদের আরেকটি যুক্তি হলো বেইল আউট সিস্টেমে প্রচুর দুর্নীতি হয়। কারণ নির্বাচনের পূর্বে ক্যাম্পেইন এর সময় যে-সকল বড় বড় কর্পোরেশনগুলো রাজনীতিবিদদের আর্থিক সহযোগিতা করেছিল নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা তখন ঐসকল কর্পোরেশনগুলেকে বেইল আউটের নামে নানা সুবিধা দিয়ে থাকে। যে-সকল কোম্পানির সাথে রাজনৈতিক নেতাদের ভালো সম্পর্ক তাদেরকে বেইল আউটের নামে নানা অনৈতিক সহযোগিতা করা হয়। যখনই বেইল আউট ঘটে, তখনই তা ঘটছে মূলত আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদদের স্বার্থে। সাধারণ জনগণ অর্থনীতির এইসব খুঁটিনাটি ও জটিল বিষয়গুলো নিয়ে তেমন আগ্রহী ও সচেতন নয়। বেইল আউটের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমতের কোনো তোয়াক্কা না করে গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লিবার্টারিয়ানদের মতে, তাই বেইল আউট দেওয়া উচিত না।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন জোটের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। কোনো জোটের উচিত সদস্যভুক্ত কোনো দেশ খারাপ অবস্থায় থাকলে শর্ত সাপেক্ষে তাদের বেইল আউট প্যাকেজ দেওয়া। নতুবা গোটা জোট বিপদে পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিসকে বেইল আউট প্যাকেজ দিয়েছে এবং গ্রিস পরবর্তীতে তার ইকোনমিতে ভালো করেছে।
Question to think about? বর্তমানে বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি ডিবেট হচ্ছে এই নিয়ে যে, রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে কি করবে না (State Intervention) এটি নিয়ে। ইন্টারভেনশনিস্ট অর্থনীতিবিদরা বলছেন অর্থনীতিকে সচল রাখতে সেখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আবশ্যক। অন্যদিকে উদারপন্থি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে অর্থনীতিতে ব্যাঘাত ঘটে (Market Distortion)। এমন পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত কি উচিত না? যদি উচিত হয় তাহলে কেন এবং কোন কোন সেক্টরে হস্তক্ষেপ করা উচিত?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Boldizzoni, Francesco (2020), Foretelling the End of Capitalism: Intellectual Misadventures since Karl Marx, Harvard University Press
2. Cohen, Benjamin (2008), International Political Economy: An Intellectual History, Princeton University Press
3. Wright, Robert E. (2009), Bailouts: Public Money, Private Profit, New York: Columbia University Press
4. Wolf, Martin (2009), Fixing Global Finance, Yale University Press
5. Polanyi, Karl (2001), The Great Transformation: The Political and Economic Origins of Our Time, Beacon Press
6. Wu, Mark (2012), Antidumping in Asia's Emerging Giants, Harvard Journal of International Law
7. Frieden, J.; Lake, D. and Broz, J. L. (2017), International Political Economy: Perspectives on Global Power and Wealth, London: Routledge
8. Scheidel, Walter (2017), The Great Leveler: Violence and the History of Inequality from the Stone Age to the Twenty-First Century, Princeton University Press
9. Watson, Matthew (2005), Foundations of International Political Economy, Palgrave Macmillan
10. Brown, Archie (2009), The Rise and Fall of Communism, Bodley Head
11. Agar, Jolyon (2006), Rethinking Marxism: From Kant and Hegel to Marx and Engels, London and New York: Routledge
12. Case, Anne and Deaton, Angus (2020), Deaths of Despair and the Future of Capitalism, Princeton University Press
13. Booth, William J. (1991), The New Household Economy, American Political Science Association
📄 বৈশ্বিক পরিবেশ ও জলবায়ু কূটনীতি
নবম অধ্যায়
Theme: Tragedy of the Commons
বৈশ্বিক পরিবেশ ও জলবায়ু কূটনীতি
"If you really think that the environment is less important than the economy, try holding your breath while you count your money." - Guy McPherson
ভূমিকা: সামগ্রিক উন্নতির একটি অন্যতম মানদণ্ড হচ্ছে পারস্পরিক সহযোগিতা। আমরা যদি সবাই একে অপরের প্রতি সহযোগিতাপরায়ণ না হয়ে সবসময়ই শুধু নিজের চিন্তা করি তাহলে অন্যের ক্ষতি তো হবেই পরোক্ষভাবে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হব। যেহেতু আমরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল তাই পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা কষ্টকর। একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণে 'Game Theory'টি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই গেইম থিওরির মূল কথা হচ্ছে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবাই সমানভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। একটি রাষ্ট্র যদি মনে করে তার জাতীয় স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে সে প্রচুর পরিমাণে অপরিকল্পিত কলকারখানা গড়ে তুলবে এবং তাতে যদি কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি করতে হয় তা-ও করবে। তখন জলবায়ু একটি বৈশ্বিক সম্পদ হওয়ায় কার্বন নিঃসরণকারী রাষ্ট্রটির প্রাথমিক কোনো ক্ষতি না হলেও দীর্ঘ সময় পর বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে শুধু বিশ্ব নয় সেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর এটিই গেইম থিওরি এর মূল কথা। এই অধ্যায়ে আমরা একটু ভিন্ন উপায়ে এবং রাজনৈতিক পরিভাষাগুলো ব্যবহার করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক জলবায়ু সমস্যার সমাধান এবং এ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ইত্যাদি বিষয়গুলো ধারাবাহিক আলোচনা করার চেষ্টা করব।
Non-Excludable
কোনো একটি পণ্যদ্রব্য বা সেবা ব্যবহার করার জন্য ঐ নির্দিষ্ট পণ্যদ্রব্য বা সেবার বিনিময়ে কেউ যদি সাধারণত অর্থ পরিশোধ না-ও করে তখন তাকে আমরা ঐ সেবা গ্রহণ বা দ্রব্য ভোগ করা থেকে বিরত রাখতে পারি না। এমন সকল পণ্য, দ্রব্য বা সেবাকে Non-excludable বলা হয়। ধরুন কেউ একজন আপনার কাছে এসে বলল যে, ভাই আপনার মোবাইল ফোনটি আমাকে দুইদিন ব্যবহার করার জন্য দিন। যেহেতু মোবাইলটি আপনার টাকা দিয়ে ক্রয় করেছেন। তাই আপনি চাইলে মোবাইলটি তাকে ব্যবহারের জন্য দিতেও পারেন আবার না-ও দিতে পারেন। এই যে আপনি চাইলেই একজন মানুষকে আপনার ফোনটি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পারছেন তাই আপনার মোবাইলটিকে Excludable বলা হয়। অর্থাৎ আপনার ব্যক্তিগত মোবাইলটি ব্যবহার করা থেকে অন্যজনকে বিরত রাখতে বা Exclude করতে পারেন。
অন্যদিকে মনে করুন বাংলাদেশের একজন নাগরিক যে কি না সরকারকে কর প্রদান করে না। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে সরকারকে কর প্রদান করা তার একান্ত কর্তব্য। অথচ সরকার মানুষের থেকে আদায়কৃত এই সকল করের টাকা দিয়েই দেশের রাস্তাঘাট তৈরি করে, মানুষের এই করের টাকা দিয়েই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচালিত হয়। এখন যে লোকটি সরকারকে কর প্রদান করে না, সরকার তাকে কখনোই বলে না যে তুমি যেহেতু কর প্রদান করোনি তাই তুমি ঢাকা-টু-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি ব্যবহার করতে পারবে না। সরকার এরকমও কখনো বলে না যে, তুমি যেহেতু কর প্রদান করোনি তাই যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীরা তোমাকে রক্ষা করবে না। অর্থাৎ শুধু যে-সকল নাগরিকরা কর প্রদান করবে তাদেরকেই সরকার রক্ষা করবে বিষয়টি এরকম কখনোই নয় বরং যারা কর প্রদান করে না তাদেরকেও সেনাবাহিনীরা রক্ষা করে। এই যে নির্বিশেষে সবাইকে সেনাবাহিনীর সেবা এবং ঢাকা-টু-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা যায় না তাই মিলিটারি সেবা ও মহাসড়ককে Non-excludable বলা হয়। একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী কিংবা মাদক চোরাচালানকারী তারাও দেশের রাস্তাঘাট ব্যবহার করছে কোনো ধরনের কর প্রদান করা ছাড়াই। কারণ এগুলো Non-excludable হওয়ায় কাউকে আমি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পারি না। তথা কাউকে মহাসড়ক ব্যবহার করা থেকে বাদ দিতে বা Exclude করতে পারি না。
Non-Rivalrous
মনে করুন আমি দোকান থেকে ১৫ টাকা দিয়ে হাফ লিটারের একটি পানির বোতল ক্রয় করলাম। সেই বোতলের সম্পূর্ণ পানিটুকু পান করার পর অন্য আরেকজনের জন্য বোতলে আর পানি অবশিষ্ট থাকছে না। তথা এমন পণ্য বা দ্রব্য যা একজন ব্যবহার করলেই শেষ হয়ে যায় এবং অন্যজনের জন্য অবশিষ্ট থাকে না। এমন সকল পণ্যকে 'Rivalrous' বলা হয়। অন্যদিকে আমি যদি নদী থেকে এক কলসি পানি নিয়ে আসি তখন নদীর পানি শেষ হয়ে যায় না। বরং সবাই পানি নিলেও নদীর পানি কমে না। তথা এমন পণ্য যা একজন ব্যবহার করলে অন্যজনের জন্যও অবশিষ্ট থাকে। এমন পণ্যকে 'Non-Rivalrous' বলা হয়。
Public Good
এমন সকল পণ্য, দ্রব্য বা সেবা যার মধ্যে একসাথে Non-Excludable এবং Non-Rivalrous এই দুটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে তাকেই 'Public Good' বলা হয়। যেমন- নদী, সাগর, মহাসাগর, বায়ু, আকাশ, মহাসড়ক, মিলিটারি সেবা ইত্যাদি। এসবের মধ্যে Non-excludable এবং Non-rivalrous এই দুটি বৈশিষ্ট্য একসাথে বিদ্যমান থাকায় এদেরকে Public Good বলে। উদাহরণস্বরূপ: নদীর পানি সংরক্ষণে বা নদীকে পরিষ্কার রাখতে কেউ যদি ভূমিকা না-ও রাখে তবুও কেউ তাকে নদীর পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পারে না (Non-excludable)। একই ভাবে একজন নদীর পানি পান করলে অপরজনের জন্য নদীর পানি শেষ হয়ে যায় না (Non-rivalrous)। এই Public Good কে অনেকে আবার Social Good বা Collective Good বলে। আর এই Public Good তৈরিতে কারো ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও সে যদি এটি ব্যবহার করে তখন তাকে 'free-rider' বলা হয়।
Global Commons:
এই Public Good গুলো যখন নিজ দেশে সীমাবদ্ধ না থেকে বহির্বিশ্বেও বিস্তৃতি লাভ করে তখন সেটিকে Global Commons বা বৈশ্বিক সম্পদ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ জলবায়ুর কথা বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র বা চীন অধিক মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ করলে তার প্রভাব এসে পড়ে বাংলাদেশে। তার মানে জলবায়ু একটি বৈশ্বিক সম্পদ। তিস্তা নদী ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এটিও একটি বৈশ্বিক সম্পদ। মহাসাগরও একটি বৈশ্বিক সম্পদ।
Tragedy of the Commons
জলবায়ু কিংবা মহাসাগর একটি বৈশ্বিক সম্পদ হওয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্র একে গুরুত্ব সহকারে দেখছে না। যে যার মতো ব্যবহার করছে। তাই বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। চীন তার নিজ দেশের উন্নতির জন্য প্রচুর পরিমাণে কলকারখানা স্থাপন করেছে। আর সেই কলকারখানা থেকে নির্গত কার্বন ক্ষতিগ্রস্ত করছে বৈশ্বিক জলবায়ুকে। বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের নিজের লাভের কথা বিবেচনা করে কলকারখানা থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্য (Industry wastes) সমুদ্রে ফেলে সমুদ্রের পানি দূষণ করছে। এভাবে সবাই যখন নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে বৈশ্বিক সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তখন সেটি বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তথা জলবায়ু পরিবর্তনে যে রাষ্ট্রটির সামান্য ভূমিকাও নেই সেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনিভাবে যে রাষ্ট্রটি অধিক পরিমাণে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে সেই রাষ্ট্রটিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক কথায়, বৈশ্বিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রই ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আর এটিকেই 'Tragedy of The Commons' বলা হয়。
Externality
আমরা একটি পারিপার্শ্বিক কাঠামোতে (surrounding structure) বসবাস করি। আমরা যেমন আমাদের পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা প্রভাবিত হই ঠিক তেমনিভাবে আমাদের কাজকর্মও আমাদের চারপাশের পারিপার্শ্বিকতাকে প্রভাবিত করে। এই প্রভাবকেই 'Externality' বলা হয়। এই প্রভাব ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয়ই হতে পারে। মনে করুন দুটি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করে। তন্মধ্যে একটি পরিবার ফুল চাষ করে এবং অন্য পরিবারটি মৌমাছি চাষ করে। মৌমাছি ফুলের সুগন্ধযুক্ত পাপড়ি থেকে সংগৃহীত মধু মৌচাকে সঞ্চিত করে। একই ভাবে মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে ফুলের পরাগায়ন ঘটায়। এতে করে উভয় পরিবারের উপরই ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একটি পরিবার মধু পাচ্ছে আর আরেকটি পরিবার তাদের ফুল চাষকে আরও বৃদ্ধি করতে পাচ্ছে। ফুলের পরাগায়ন অথবা মৌমাছির মধু সংগ্রহ দুটি কর্মকাণ্ডই দুটো পরিবারের জন্য সহায়ক। এই সহায়তার জন্য কেউ কাউকে টাকা পরিশোধ করছে না। এই যে কোনো খরচ ছাড়াই একে অপরের দ্বারা উপকৃত হচ্ছে এটিকেই 'Positive Externality' বলা হয়।
এবার Negative Externality নিয়ে আলোচনা করা যাক। মনে করি একটি নদীর পাশে একটি কারখানা রয়েছে। এই কারখানায় যত বেশি পণ্য উৎপাদন হবে কারখানার মালিকও তত বেশি লাভবান হবে। তাই বেশি পণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে কারখানাটি অধিক পরিমাণে কালো ধোঁয়া নিঃসরণ করে। যার ফলে আশেপাশের পরিবেশ দূষণ হয়। এই পরিবেশ দূষণের কারণে কারখানার আশেপাশের মানুষ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগে। দ্বিতীয়ত, কম খরচে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে কারখানার মালিক যখন কারখানা থেকে তৈরিকৃত বর্জ্য নদীতে নিক্ষেপ করে তখন তা নদীর পানিকে দূষিত করে তোলে। তখন নদীর আশেপাশে বসবাসরত মানুষজন এই দূষিত পানি পান করার মাধ্যমে অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন চিকিৎসার জন্য তাদেরকে টাকা খরচ করতে হয়। কলকারখানার প্রভাবে তার আশেপাশের মানুষ অসুস্থ হওয়ার ফলে যে ক্ষতি বা খরচ হয় সেটিকে Social Cost বলা হয়。
তৃতীয়ত, কারখানার প্রভাবে নদী দূষণের কারণে নদীর মাছ মারা যায়। তখন নদীর পাশে বসবাসরত জেলেরা মাছের অভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই যে একজন কারখানার মালিকের প্রভাবে অনেকে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছে, জেলেরাও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, সমাজেও Social Cost বৃদ্ধি পাচ্ছে- এ ধরনের নেতিবাচক প্রভাবকেই Negative Externalities বলা হয়। একটি আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে তিস্তা নদীতে ভারত যখন বাঁধ নির্মাণ করে তখন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের অনেক কৃষক তাদের চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত পানি পায় না। এতে বাংলাদেশের কৃষকদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর এটিও Negative Externality এর উদাহরণ।
যেভাবে হতে পারে জলবায়ু সমস্যার সমাধান
জলবায়ু পরিবর্তন একটি Negative Externality এর উদাহরণ। আমরা জানি যে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে ১২টি মারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্য। এই রাসায়নিক দ্রব্যগুলো হচ্ছে- অলড্রিন (aldrin), ডায়েলড্রিন (dieldrin), ক্লোরডেন (chlordane), এনড্রিন (andrin), হেপ্টাক্লোর (heptachlor), ডিডিটি (DDT), মিরেক্স (mirex), টক্সাফেন (toxaphene), পিসিবি (PCBs), হেক্সাক্লোরোবেনজিন (hexachlorobenzene), ডাইঅক্সিন (dioxin), ফিউরান (furan)। পরিবেশ দূষণে এই ১২টি রাসায়নিক দ্রব্যকে একসাথে বলা হয় ডার্টি ডজন। এখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত তা নিয়ে আলোচনা করব। ১. Regulatory Policies: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সরকার কিছু পলিসি গ্রহণ করে। প্রথমত, যে সকল কলকারখানা সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণ করে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। তাদের অবাধ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করতে আইন তৈরি করা এবং এই আইনের বাস্তবায়ন করা। দ্বিতীয়ত, কলকারখানাগুলো কী পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করতে পারবে এবং একইসাথে কী পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে পারবে তা সরকারকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া (Quota)। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে গৃহীত সরকারের এই পলিসিগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা তদারকি করা এবং কেউ তা ভঙ্গ করলে তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। ২. Market-based Policies: যে সকল কলকারখানা অধিক পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে তাদের উপর অধিক পরিমাণে কর আরোপ করা। একই ভাবে যে সকল পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি পরিবেশে প্রভাব পড়ে সেসব পণ্যের উপরও কর আরোপ করা। এই কর আরোপ করার মাধ্যমে রাষ্ট্র একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে সক্ষম হয়, অন্যদিকে ধার্যকৃত করের আয় থেকে রাষ্ট্রের রেভিনিউ বৃদ্ধি পায়।
Rebound Effects
আমরা ইতোমধ্যে দেখলাম যে অনেক রাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কলকারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে উপরিউক্ত দুটি পলিসি গ্রহণ করে থাকে। এখন উপরিউক্ত এই দুটি গৃহীত নীতিমালা নতুন করে চারটি সমস্যা তৈরি করে। প্রথমত, সরকার যখন কলকারখানাগুলোতে অধিক পরিমাণে কর আরোপ করে তখন কলকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে কারখানার মালিক শ্রমিক ছাঁটাই করে, শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দেয়, এমনকি অনেক সময় দেখা যায় কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে বিশাল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, সরকার যখন কলকারখানার উপর কর আরোপ করছে তখন কারখানার মালিক সেই কর প্রদান করার জন্য পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। যার প্রভাব পড়ে জনগণের উপর। তৃতীয়ত, কলকারখানাগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণে সরকার যখন বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করে তখন সেগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের অনেক খরচ হয়। চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সরকার যখন পণ্য উৎপাদনের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয় তখন কারখানাগুলো ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারে না। যার ফলে বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দেয়। এই যে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাটি রোধ করতে গিয়ে সরকারের গৃহীত পলিসি নতুন আরও চারটি সমস্যা সৃষ্টি করছে সেটিকেই 'Rebound Effect' বলা হয়। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য আরও কিছু সমস্যা নতুন করে তৈরি করাকেই রিবাউন্ড ইফেক্ট বলে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে Rebound Effects এড়িয়ে কীভাবে একটি টেকসই সমাধান দেওয়া যায়? জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আমরা পাঁচটি পলিসি বা নীতি গ্রহণ করতে পারি।
১. Price Choice Policy: জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা এমন সকল পণ্য ক্রয় করতে যেগুলো উৎপাদন করতে পরিবেশ দূষণ হয় না অথবা যে সব পণ্য উৎপাদনে ফিউল কম প্রয়োজন হয়।
২. Permit Market Policy: সরকারের উচিত কলকারখানার মালিকদের সাথে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ করার একটি সীমা বেঁধে দেওয়া। অর্থাৎ তাদেরকে বলা “পূর্বের তুলনায় যতটা কম সম্ভব পরিবেশ দূষণ করা”।
৩. Cap and Trade Policy: সরকারের উচিত এমন কোনো কঠোর আইন বাস্তবায়ন না করা যা একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। বরং সরকারের উচিত হবে কলকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি (Eco-friendly Technology) ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা।
৪. Subsidies: যদি কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম না হয় তাহলে সরকারের উচিত এসব প্রযুক্তি ক্রয়ে কারখানাগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া。
৫. Green Economy: টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি, দূষণমুক্ত পরিবহন ব্যবস্থা, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, জল ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ ইত্যাদি বিষয়গুলোর যথাযথ বাস্তবায়নকে 'Green Economy' বলা হয়। তথা এই Green Economy বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব।
এতক্ষণ আমরা জলবায়ু পরিবর্তন রোধে একটি রাষ্ট্র কীভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে সেটি আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু জলবায়ু যেহেতু একটি Global Commons বা বৈশ্বিক সম্পদ তাই এই জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবিলা করা যায় তার দিকে নজর দেওয়া যাক।
১. Paris Climate Agreement: প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলা ও গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন কমাতে ২০১৫ সালে প্যারিসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের দেশগুলো একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। আর সেই চুক্তিটিই প্যারিস চুক্তি হিসেবে পরিচিত। চুক্তিতে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (Pre-Industrial Era) তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার কথা বলা হয়েছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন রোধে প্যারিস চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
২. Electric Car: বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রচলন বৃদ্ধি করতে হবে। কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। আগামী দশকের মধ্যে জ্বালানি তেলের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. Forestation: বৃক্ষনিধন কমানো ও বনায়ন বৃদ্ধি করা। দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল এলাকাজুড়ে আমাজন বনাঞ্চল বিস্তৃত। এই বনভূমির বিশাল অংশ ব্রাজিলের মধ্যে পড়েছে এবং সেখানে বনের গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বন উজাড় শূন্যে নামিয়ে আনার যে সিদ্ধান্ত কপ-২৬ সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিল সেটি বাস্তবায়ন করা। উল্লেখ্য, পৃথিবীর মোট বনভূমির প্রায় ৮৫ শতাংশই ব্রাজিল, কানাডা, রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই চারটি দেশে রয়েছে। তাই এই দেশগুলোর উপর বেশি নজর দিতে হবে।
৪. Net Zero Emissions: উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ আরও কমিয়ে আনতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি বিশ্বকে দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতে হবে। একই ভাবে চীন, রাশিয়া এবং সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলো ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার যে মত দিয়েছে সেটিও গুরুত্বের সহিত দেখতে হবে। সারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে চীন। তাই চীনের উপর বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
৫. Solar Energy: যেসব দেশ শক্তির উৎস হিসেবে কয়লার উপর নির্ভরশীল, তাদের আরও বেশি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে জ্বালানি তেলের পরিবর্তে যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার, সুইডেনের বহুজাতিক গাড়ি প্রস্তুতকারক ভলভো, যুক্তরাজ্যের স্পোর্টস কার কোম্পানি লোটাস, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জেনারেল মোটরস জিএম, জার্মানির গাড়ি প্রস্তুতকারক ভক্স ওয়াগন, জাপানের টয়োটা মোটর করপোরেশন ইত্যাদি ২০৩০ সাল নাগাদ ব্যাটারি তথা বিদ্যুৎচালিত গাড়ি বাজারে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক দেশেই বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই শতকের শুরুতে পৃথিবীব্যাপী কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোসের আমাজন কিংবা সার্চ ইঞ্জিন ইয়াহু ও গুগল-সহ অনলাইনভিত্তিক নানা ধরনের সেবার প্রচলন যেভাবে দ্রুতগতিতে বিকশিত হয়েছে, ঠিক সেভাবে আগামী দশকের মধ্যেই বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রচলন ত্বরান্বিত করতে হবে।
৬. Climate Financing: বিশ্ববাসীকে এটির উপর জোর দিতে হবে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। অর্থাৎ উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনুন্নত দেশগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
৭. Global Minimum Tax on Big Business: ২০২১ সালে ইতালির ভেনিসে "G-20" সামিটে বিশ্বজুড়ে Big Business গুলোর অর্জিত মুনাফার উপর অন্তত ১৫ শতাংশ কর আরোপের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিগ বিজনেস বলতে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনগুলোকে বোঝানো হয়। গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট এর মতো বৃহৎ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর কর আরোপ করতে হবে। আর বিগ বিজনেসগুলোর উপর কর আরোপ করার বিষয়টিকেই টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে- "Global Minimum Tax On Big Business"।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি
Cop-26 সম্মেলনে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব নেতাদের কাছে যে চার দফা দাবি পেশ করেছিলেন সেগুলো বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই চারটি দাবি হলো :
• প্রধান কার্বন নিঃসরণকারীদের অবশ্যই উচ্চাভিলাষী জাতীয় পরিকল্পনা (এনডিসি) বাতিল করতে হবে।
• উন্নত দেশগুলোকে অভিযোজন এবং প্রশমনে অর্ধেক অর্ধেক (৫০/৫০) ভিত্তিতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে。
• উন্নত দেশগুলোকে স্বল্প খরচে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সরবরাহ করতে হবে。
• সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের দায়িত্ব নেওয়া-সহ জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ক্ষতি ও ধ্বংস মোকাবিলা করতে হবে。
জলবায়ু মোকাবিলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপ
বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের দায় ০.৪৭ শতাংশের চেয়েও কম। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অসংখ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ- পরিবেশ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ১২ বিলিয়ন ডলারের ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বাতিল করেছে। তাছাড়াও পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে 'Climate Change Unit' প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জলবায়ু বিপদগ্রস্ত দেশ থেকে জলবায়ুসহিষ্ণু এবং সেখান থেকে জলবায়ু সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে বাংলাদেশ 'Mujib Climate Prosperity Plan (MCPP)' বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০০৯ সালে 'Bangladesh Climate Change Trust Fund- BCCTF' প্রতিষ্ঠা করেছে। জলবায়ুসংক্রান্ত 'National Adaptation Programme of Action (NAPA) এবং 'Nationality Appropriate Mitigation Action (NAMA)' ইত্যাদি কর্মসূচি বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে ইত্যাদি।
মূল্যায়ন: বিশ্ব দরবারে জলবায়ু নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় বলেই এই অধ্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। এই যে জলবায়ু নিয়ে এত আলোচনা, পরিকল্পনা, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি সবই ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসব চুক্তি, পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে কারা? আমরা তাকালেই দেখতে পাই যে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো যারা জলবায়ু নিয়ে সবচেয়ে বেশি বুলি আওড়াচ্ছে তারাই সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। কারণ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, কাতার, ব্রাজিল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে কেউই কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে রাষ্ট্রগুলো যে পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলোকে 'Baby Steps' বলে আখ্যায়িত করা যায়। তাই বাস্তবতার নিরিখে বলা যায় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা একটি অদরকারি বিষয়!
Question to think about? বর্তমান বিশ্বে যে রাষ্ট্রগুলো অধিক উন্নত তারা আসলে উন্নত হয়েছে কীভাবে? উত্তর হচ্ছে ব্যাপক শিল্পায়নের মাধ্যমে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে যে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল তার মাধ্যমেই উত্তরের দেশগুলো ধনী হয়েছে। আর সেই শিল্পবিপ্লবের পর থেকেই বৈশ্বিক উঞ্চতা বৃদ্ধি পায়। উন্নত দেশগুলো জলবায়ু দূষণের মাধ্যমে উন্নত হওয়ার পর এখন তারা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। আর অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে যে শিল্পবিপ্লবটি ঘটেছিল তা এখন ঘটতে যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো উন্নত হতে হলে তাদের প্রচুর পরিমাণ শিল্পায়ন প্রয়োজন। আর শিল্পায়ন হলে বৈশ্বিক উষ্ণতাও আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই ধনী রাষ্ট্রগুলো এখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিল্পায়নবিরোধী। তাই তারা নির্ধারণ করছে জলবায়ু সম্পর্কিত নানা বিধিনিষেধ। এমন পরিস্থিতিতে আপনি কী মনে করেন উন্নত দেশগুলোর কোনো অধিকার নেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর পরিবেশগত মান (Environmental Standards) আরোপ করার?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Pogue, David (2021), How to Prepare for Climate Change: A Practical Guide to Surviving the Chaos, Simon & Schuster
2. Johnson, Elizabeth and Wilkinson, Katharine (2020), All We Can Save: Truth, Courage, and Solutions for the Climate Crisis
3. Wallace-Wells, David (2019), The Uninhabitable Earth: Life After Warming, Tim Duggan Books
4. Hawken, Paul (2017), Drawdown: The Most Comprehensive Plan Ever Proposed to Reverse Global Warming, Penguin Books
5. Klein, Naomi (2015), This Changes Everything: Capitalism vs. The Climate, Simon & Schuster
📄 রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও মতাদর্শসমূহ
দশম অধ্যায়
Theme: Making Government Work
রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও মতাদর্শসমূহ
“War made the state, and the state made war" - Charles Tilly
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অন্যতম অ্যাক্টর হচ্ছে বিশ্বের ১৯৫টি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এই সবগুলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থায়। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ক্রমাগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রগুলোর ভিতরকার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ছোঁয়া। তাই সদা পরিবর্তনশীল এই বিশ্বব্যবস্থাকে বুঝতে হলে আমাদের রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি সম্পর্কিত ধারণা ও মতাদর্শগুলো সম্পর্কে একটি মৌলিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। একটি প্রশ্ন দিয়ে এই অধ্যায়টি শুরু করা যাক। বিশ্বের যে-সকল রাষ্ট্র নিজেদেরকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে তারা সবাই বলছে যে, তাদের দেশের গণতন্ত্রই সঠিক এবং সেরা। অঞ্চলভেদে গণতন্ত্র আমাদের কাছে একেক রূপে ধরা দেয়। তাহলে গণতন্ত্র বিষয়টি আসলে কী? এটি কি সংজ্ঞায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নাকি পরিমাপ করার বিষয়? তাহলে এই প্রশ্নটি মাথায় রেখেই আলোচনা শুরু করা যাক।
রাষ্ট্রের আদি উৎস (Origin of the State)
আজকের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো হঠাৎ করেই একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। যুগে যুগে বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রগুলো আধুনিকতায় প্রবেশ করেছে। অতীতে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ছিল ব্যক্তি। তারপর ব্যক্তি থেকে একটি পরিবার। পরিবার থেকে একটি ট্রাইব বা কমিউনিটি। তারপর অনেকগুলো কমিউনিটি মিলে একটি নগররাষ্ট্র। রাষ্ট্রের উৎপত্তি নিয়ে অনেক তত্ত্ব ও মতবাদ থাকলেও এরিস্টটলের এই মতবাদটি তুলনামূলকভাবে প্রায়োগিক।
জাতি (Nation) এবং জাতীয়তাবাদ (Nationalism)
সাধারণত ভাষা, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ ইত্যাদির কারণে মানুষ বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। আবার দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করার কারণে তাদের মধ্যে একটি সাদৃশ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেমন- বাংলা ভাষাভাষী সকল জনগণ তাদের ভাষাগত মিলের কারণে একসাথে বসবাস শুরু করে। ইংরেজি ভাষাভাষী জনগণ তাদের ভাষার সুবিধার্থে একসাথে বসবাস করা শুরু করে। কৃণাঙ্গ লোকেরা তাদের বর্ণের যে মিল তার উপর ভিত্তি করে একসাথে বসবাস শুরু করে। ধর্মের উপর ভিত্তি করেও মানুষ একসাথে বসবাস করা শুরু করে। অর্থাৎ সবার মধ্যে একটি Unity বা Common Identity রয়েছে। এভাবে মিল বা সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে একসাথে হওয়া সম্প্রদায়কে বলা হয় জাতি (Nation)। জাতি হচ্ছে একটি ধারণাগত বিষয়, যে আমরা সবাই এক এবং একতাবদ্ধ। আর এই জাতি যখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে গড়ে ওঠে তখন বলা হয় 'Nationalism' বা জাতীয়তাবাদ।
রাষ্ট্রের উপাদান (Elements of State)
১. Population: এই মিল বা সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে কিংবা জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে যে সম্প্রদায় গড়ে ওঠে সেটিকে বলে 'Population' বা জনসংখ্যা। এভাবে ভাষাগত সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল বাঙালি জনগোষ্ঠী, ইংরেজ জনগোষ্ঠী, বর্ণগত মিলের উপর ভিত্তি করে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী।
২. Territory: নির্দিষ্ট মিল বা সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই জনসমষ্টি যেখানে বা যে এলাকায় বসবাস করে সেই অঞ্চলটি হলো এই জনগোষ্ঠীর Territory বা ভূখণ্ড।
৩. Government: এভাবে সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই জনসমষ্টি তাদের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস শুরু করে। তাদের মধ্যে নানা সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন সংঘাত দেখা দেয়। এই বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তাই এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সবাই মিলে একজনকে নেতা বানালো এবং সিদ্ধান্ত নিল আমরা সবাই আমাদের নেতার আদেশ মেনে চলব। এই নেতাকেই বলা হলো সরকার (Government)। অর্থাৎ সবার ব্যক্তিগত ক্ষমতাকে একজনের হাতে ন্যস্ত করল। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ তাদের নিজ নিজ সরকার গঠন করল। সরকারবিহীন ঐ বিশৃঙ্খল অবস্থাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস হবস উল্লেখ করেছেন 'State of Nature' বা 'প্রকৃতির রাজ্য' হিসেবে। এই প্রকৃতির রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসতেই গঠন করা হলো সরকার এবং আইন।
৪. Sovereignty: একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগণ তাদের সরকার গঠন করল। এবার সরকার গঠনের পর আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। দেখা গেল একটি ভূখণ্ডের সরকার অন্য আরেকটি ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেই ভূখণ্ড নিজের দখলে নিতে চাচ্ছে। এক ভূখণ্ডের সরকার অন্য ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেখান থেকে সম্পদ লুটপাট করে নিজ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়ে আসছে। এভাবে বিভিন্ন ভূখণ্ডের মধ্যে যুদ্ধ দেখা দিল। এই যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেতে, এক ভূখণ্ডের সরকার যেন অন্য ভূখণ্ডে আক্রমণ করতে না পারে এবং এক ভূখণ্ডের জনগণ যেন আরেক ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেই ভূখণ্ডের সম্পদ লুটপাট করতে না পারে; সেজন্য প্রত্যেক ভূখণ্ডের সরকার মিলে একটি নিয়ম করল। নিয়মটি হলো প্রতিটি ভূখণ্ড হবে স্বাধীন, কেউ কারো ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না। অর্থাৎ প্রতিটি ভূখণ্ডের মালিক হবে নিজ নিজ ভূখণ্ডের জনগণ ও সরকার। আর এটিকেই বলা হলো 'Sovereignty' বা 'সার্বভৌমত্ব'। এভাবে অন্য ভূখণ্ডের আক্রমণ থেকে নিজ ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে সবাই নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করে। আর এই সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি রাষ্ট্র মিলিটারি তৈরি করে। উপরিউক্ত এসব কারণেই বলা হয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এই চারটি উপাদান থাকা আবশ্যক।
জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র (Nation-State)
একই ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, বর্ণ ও সাদৃশ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রথমে জাতি গঠিত হয়। সেই জাতিকে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত করে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধকরণ, রাষ্ট্র গঠনের চারটি উপাদান নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। উদাহরণস্বরূপ: বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে বাঙালি জাতি গঠন, তারপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন। হিন্দু ধর্মকে ভিত্তি করে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, তারপর এই জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম। ইসলাম ধর্মের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ, তারপর এই জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। এভাবে বিভিন্ন জাতি বা জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে যে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সেটিকে 'Nation State' বা 'জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র' বলে। অর্থাৎ এরকম জাতি রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণই একটি নির্দিষ্ট জাতির অন্তর্ভুক্ত। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণই শ্বেতাঙ্গ, চিলির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই খ্রিষ্টান, মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই বৌদ্ধ, ইরানের অধিকাংশ জনগণই শিয়া মুসলিম, সৌদিতে সুন্নি মুসলিম ইত্যাদি। বর্তমান একুশ শতকের সব রাষ্ট্রই জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র।
বহুজাতিক রাষ্ট্র (Multinational State)
আমরা দেখেছিলাম জাতি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বহুজাতিক রাষ্ট্র তার বিপরীত। বহুজাতিক রাষ্ট্রের জনগণ শুধু একটি জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তারা বরং অনেকগুলো জাতির সমন্বয়ে গঠিত। তাই যে রাষ্ট্রটি একের অধিক জাতি নিয়ে গঠিত হয়, সেই রাষ্ট্রকে বলা হয় বহুজাতিক রাষ্ট্র। যেমন- এশিয়া মহাদেশের ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন বহুজাতিক রাষ্ট্র। ইউরোপের রাশিয়া, ফ্রান্স, সার্বিয়া বহুজাতিক রাষ্ট্র। আফ্রিকার ঘানা, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদিও বহুজাতিক রাষ্ট্র। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক: ১. ভারত একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। সেখানে বহু বর্ণের, বহু ভাষার, বহু ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে। তামিল, হিন্দুস্থানি, তেলেগু, গুজরাটি, কেরালা, পাঞ্জাব, বেঙ্গল, মালয়, কাশ্মীরি, আসামি ইত্যাদি জাতি একসঙ্গে ভারতে বসবাস করছে। ২. আফ্রিকার দেশ ঘানা। সেখানে চাইনিজ, মালয়, ইউরোপিয়ান, লেবানিজ ইত্যাদি জাতির মানুষ বসবাস করে। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবের কারণে সেখানে এখন এত জাতির একসঙ্গে বসবাস। ৩. কেনিয়াতে পাঁচের অধিক জাতি রয়েছে। সেখানে কিকুইয়া, লৌ, লুহায়, কাম্বা, কেলেনজিন ইত্যাদি জাতির বসবাস। কেনিয়ায় ২০ শতাংশের বেশি কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নেই। ৪. দক্ষিণ আফ্রিকাও একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। সেখানে শুধু বর্ণের ভিত্তিতেই শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ইত্যাদি জাতি। আবার ভাষার ভিত্তিতে রয়েছে ইংরেজি, সোয়াজি, ভেন্ডা, সোয়ানা, পেডি, জুলু ইত্যাদি ভাষাভাষীর জাতি।
ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা (National Integrity)
একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বহু জাতির বসবাস থাকে। রাষ্ট্রে বসবাসরত শুধু একটি জাতির মধ্যেই আবার ভিন্ন ভিন্ন সাব গ্রুপ থাকে। যেমন বাংলাদেশের কথাই বলা যাক। বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা আমরা বাঙালি জাতি হলেও এবং আমাদের সবার ভাষা বাংলা হলেও আমাদের মধ্যে অনেকে আবার হিন্দু, অনেকে মুসলিম, অনেকে আবার খ্রিষ্টান। ভারতে হিন্দুদের মধ্যেই আবার অনেকগুলো শ্রেণি রয়েছে। একটি রাষ্ট্রে বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, শ্রেণি সবার মধ্যে যে একতাবোধ সেটিকেই বলে ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা। অর্থাৎ আমরা সবাই ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের ভূখণ্ডে বসবাস করছি এবং আমাদের মধ্যে শ্রেণিগত, ধর্মগত, ভাষাগত ভিন্নতা থাকলেও আমরা যে একতা অনুভব করি সেটাই National Integrity বা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা। তথা আমরা সবাই বাংলাদেশি এবং আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ন্যাশনাল ইন্টেগ্রিটি অপরিহার্য।
সংবিধান
জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ে পৃথিবীতে অনেক স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র ও বহুজাতিক রাষ্ট্রের জন্ম হলো। এখন এই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো সুশৃঙ্খলভাবে চলার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি প্রয়োজন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সরকার কে হবে, কীভাবে সরকার গঠিত হবে, রাষ্ট্রের আইন কী হবে, অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে, বিচার বিভাগ কীভাবে পরিচালিত হবে, প্রশাসন কীভাবে গঠিত হবে ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় সংবিধানে। ঠিক এজন্যই একটি রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর সেই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো যত দ্রুত সম্ভব একটি সংবিধান প্রণয়ন করা। যেমন- বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার একবছরের মধ্যেই (১৯৭২) একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে হয়েছে, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তিনবছরের মাথায় তাদের সংবিধান প্রণয়ন করে ফেলে (১৯৫০ সালে)। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন করতে দেরি হলে রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন- ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর একটি সংবিধান তৈরি করতে তাদের দীর্ঘ নয় বছর লেগেছিল। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান তার সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। তাই এই দীর্ঘ নয় বছর পাকিস্তানকে সামরিক শাসনের আওতায় থাকতে হয়েছে।
সরকার ব্যবস্থার প্রাথমিক ধারণা
সময়ের পরিবর্তনে যুগে যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা নানা রূপের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে। 'Aristotelian Forms of Government' এর ধারণা দিয়ে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
১. Monarchy বা রাজতন্ত্র: রাজতন্ত্র এর মানে হলো একজন রাজার শাসন (Rule by One)। প্রথম দিকে জনগণ তাদের সরকার হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ যোগ্য এমন একজন ব্যক্তিকে তাদের রাজা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। রাজার কথামতো রাষ্ট্র পরিচালিত হতো। মানুষ মনে করত একজন রাজার মাধ্যমে রাষ্ট্র শাসন হওয়াটাই ভালো। কেননা রাজা একজন হওয়ার কারণে যে-কোনো সিদ্ধান্ত খুবই দ্রুত গ্রহণ করা যায়। একজন রাজার পরিবর্তে কয়েকজন মিলে শাসন করলে সবাই ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আসবে। তখন কার সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করবে সেটি নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এসব দিক বিবেচনা করে পৃথিবীর অনেক দেশ রাজতন্ত্র গ্রহণ করে।
২. Tyranny বা স্বৈরতন্ত্র: রাজতন্ত্রের অধীনে কিছুদিন থাকার পর রাষ্ট্রের জনগণ লক্ষ্য করল যে, রাজা জনগণের মঙ্গলের জন্য আর কাজ করছে না, রাজা বরং ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছে, রাজা নিজের সখ-শান্তি-পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, রাজার কথামতো চলতে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে, কেউ রাজার কথা না শুনলে তাকে জেলে আটক করা হচ্ছে। রাজার এই নেতিবাচক অবস্থানটিকে বলা হলো স্বৈরতন্ত্র। এক কথায়, স্বৈরতন্ত্র হলো রাজতন্ত্রের বিকৃত (Perverted) রূপ। অর্থাৎ রাষ্ট্রে একজনের শাসন যদি ভালো হয় তাহলে রাজতন্ত্র, আর যদি খারাপ হয় তাহলে স্বৈরতন্ত্র।
৩. Aristocracy বা অভিজাততন্ত্র: রাষ্ট্রের নাগরিকরা যখন দেখল যে, রাজতন্ত্রের রাজ বেশিদিন ঠিক থাকেন না। রাজা যেহেতু একজন, তাই একটি সময় পর রাজা জনগণের কল্যাণের কথা ভুলে গিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে উঠেন। রাষ্ট্রে রাজার সমকক্ষ যেহেতু আর কেউ নেই, তাই রাজা কিছুদিন পর স্বভাবগতভাবেই স্বৈরাচারী হয়ে উঠেন। তখন রাষ্ট্রের নাগরিকরা সিদ্ধান্ত নিল পুরো রাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু একজনের হাতে ন্যাস্ত না করে বরং রাষ্ট্রের যারা সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত এবং জ্ঞানী তাদের কয়েকজনের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করি। তখন রাজার পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় শিক্ষিত ও অভিজাত কিছু মানুষের হাতে (A small group of people)। অল্প কিছু শিক্ষিত মানুষের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার এই সিস্টেমকে বলা হয় Aristocracy বা অভিজাততন্ত্র (Rule by Few)। যেহেতু সবাই শিক্ষিত তাই তারা সবাই মিলে ভালো ভালো পলিসি গ্রহণ করবে, তাদের যে-কোনো একজন কোনো ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে অন্য আরেকজন সেটা ধরিয়ে দেবে। রাজা একা ছিল যে-কারণে রাজার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। অভিজাততন্ত্রের যেহেতু সবাই জ্ঞানী তাই তারা রাষ্ট্রের জন্য কোনো ভুল পলিসি গ্রহণ করতে পারেন না।
৪. Oligarchy বা গোষ্ঠীতন্ত্র: অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রাষ্ট্রের মানুষ মনে করেছিল জ্ঞানী ও বিজ্ঞদের হাত ধরে রাষ্ট্র ভালোই চলবে। কিন্তু কয়েকদিন পরে দেখা গেল তার উল্টোটা। যে কয়েকজনের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তারাও জনগণ এবং রাষ্ট্রের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করা শুরু করে। এরাও রাষ্ট্রের সম্পদ নিজেদের পকেটে ঢোকাতে শুরু করে, ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের বসিয়ে রাষ্ট্রকে 'Nepotism' (স্বজনপ্রীতি) এর আখড়ায় পরিণত করে। অর্থাৎ যে কয়েকজন শিক্ষিত ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা সবাই কিছুদিন পর একটি সুযোগ-সন্ধানী (Self-seeking) গ্রুপে পরিণত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বরত এই শিক্ষিত গ্রুপটি যখন জনগণের কল্যাণের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের, নিজ পরিবারের, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের স্বার্থে (Self-interests) কাজ করা শুরু করে তখন তাদেরকে বলা হয় Oligarchy বা গোষ্ঠীতন্ত্র। এক কথায় অলিগার্কি হলো অভিজাততন্ত্রের বিকৃত (Perverted) রূপ।
৫. Polity বা বহুজনের শাসন: রাষ্ট্রের জনগণ যখন দেখল যে, একজন রাজা কিছুদিনের মধ্যে বিকৃত হয়ে স্বৈরশাসক হয়ে যায়। একই ভাবে অল্প কয়েকজন শিক্ষিত ও অভিজাত মানুষের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে তারাও কয়েকদিন ঠিক থেকে পরবর্তীতে স্বার্থান্বেষী গ্রুপে পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্রের নাগরিকরা ভাবতে শুরু করে কাদেরকে বা কতজনকে রাষ্ট্র শাসন করার দায়িত্ব দিলে ভালোভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে? নাগরিকরা ভেবে দেখল যদি গরিবদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসানো হয় তাহলে ক্ষমতা পেয়ে গরিবরা হয়ে উঠবে অর্থলোভী। আবার যদি ধনীদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসাই তাহলে ধনীরা হয়ে উঠবে অহংকারী এবং স্বেচ্ছাচারী। ধনীরা গরিবদের চাহিদা বুঝবে না এবং গরিবরাও ধনীদের চাহিদা বুঝবে না। তাই ধনী এবং গরিব এদেরকে ক্ষমতায় না বসিয়ে রাষ্ট্রের যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদেরকে ক্ষমতায় বসালে রাষ্ট্র ভালো চলবে। কারণ মধ্যবিত্তরা ধনীদের চাহিদাও বুঝতে পারবে এবং গরীবের চাহিদাও বুঝতে পারবে। একই ভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গরিবদের মতো অর্থলোভীও হয়ে উঠবে না এবং ধনীদের মতো স্বেচ্ছাচারীও হয়ে উঠবে না। তাই সবাই মিলে ঠিক করল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব শুধু একজন কিংবা একটি শিক্ষিত গ্রুপের হাতে নয় বরং রাষ্ট্রের যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের হাতে দেওয়া হবে। যেহেতু একমাত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণিই পারবে ধনী ও গরিবদের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে; তাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে। আর মধ্যবিত্তের রাষ্ট্র পরিচালনার এই সিস্টেমকেই বলা হয় Polity বা বহুজনের শাসন (Rule by Many)। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল ভারসাম্য রক্ষাকারী মধ্যবিত্তের এই শাসনকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলেছেন।
৬. Democracy বা গণতন্ত্র: একটি রাষ্ট্রে তিন শ্রেণির নাগরিক থাকে- গরিব, মধ্যবিত্ত ও ধনী। পলিটি শাসনব্যবস্থায় আমরা দেখেছি রাষ্ট্র শাসন করবে শুধু মধ্যবিত্তরা। পলিটি সিস্টেমে যেহেতু মধ্যবিত্তরা রাষ্ট্রের ধনী ও গরিবদের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারত তাই একে সর্বত্তোম শাসনব্যবস্থা মনে করা হতো। কিন্তু সমস্যাটি হলো যারা আজকে মধ্যবিত্ত তারা কিন্তু সবসময়ই মধ্যবিত্ত থাকে না। ধনী, গরিব ও মধ্যবিত্ত- আর্থিক এই বিষয়গুলো সবসময় এক (Constant) থাকে না। কেউ ধনী থেকে গরিব হয়, কেউ গরিব থেকে ধনী হয়, কেউ মধ্যবিত্ত থেকে ধনী হয়, কেউ আবার গরিব থেকে মধ্যবিত্ত হয়। অর্থাৎ পলিটি শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের শাসকদের অনবরত পরিবর্তন হতে থাকে। কেউ হঠাৎ বাদ পড়ে যায়, কেউ আবার নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে একটি অরাজকতা দেখা দেয়। তাছাড়া রাষ্ট্রের কে মধ্যবিত্ত, কে গরিব, কে ধনী এসব নির্ণয় করাও কষ্টসাধ্য। তাই রাষ্ট্রের নাগরিকরা ভাবল যে ধনী, গরিব ও মধ্যবিত্ত এভাবে রাষ্ট্রের সকল জনগণের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি না করে বরং রাষ্ট্রের শাসনকার্যে রাষ্ট্রের সকল জনগণকেই অন্তর্ভুক্ত করি। রাষ্ট্রের সকল জনগণ মিলে রাষ্ট্র শাসন করাকেই বলা হলো Democracy বা গণতন্ত্র। মানুষ Polity শাসনকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করল। গণতন্ত্র হয়ে গেল ধনী, গরিব, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, যুবক, বৃদ্ধ সকলের মিলিত শাসন। তবে এরিস্টটল গণতন্ত্র নিয়েও খুশি হতে পারেননি। কারণ এরিস্টটল লক্ষ্য করলেন রাষ্ট্রের সকল জনগণ যখন তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে তখন আরেকটি সমস্যা দেখা দেবে। সেটি হলো রাষ্ট্রের সকল জনগণ কিন্তু রাজনীতি সচেতন নয়, রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত। তাই এসকল অসচেতন ও অশিক্ষিত মানুষ রাষ্ট্রের জন্য কোনটি ভালো হবে কিংবা কোনটি মন্দ এসব বুঝবে না। রাষ্ট্রের ভালো মন্দ বিবেচনা না করে তারা রাষ্ট্রের জন্য বিভিন্ন বিরূপ পলিসি গ্রহণ করবে। তাই এরিস্টটল গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন Mob Rule বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন হিসেবে।
এভাবেই যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে রাজতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র থেকে অভিজাততন্ত্র, অভিজাততন্ত্র থেকে গোষ্ঠীতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসন থেকে উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসনে এসে পৌঁছেছে।
আধুনিক রাষ্ট্রের গঠন (Modern State Formation)
রাষ্ট্র গঠনের উপরিউক্ত প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বিমূর্ত (Abstract)। অনেকটা বিমূর্ত ধারণা হলেও রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে আমরা অন্তত একটি মৌলিক ধারণা পেয়েছি। তবে এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, প্রাচীনকালে বিভিন্ন সভ্যতা ও নগররাষ্ট্র এভাবেই গড়ে উঠেছিল। ১৯০০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল মাত্র ৭৮টি (মতান্তরে ৭৭টি)। কিন্তু বর্তমানে মোট স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৫টি। তথা ১১৭টি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আধুনিককালে এসে রাষ্ট্রগুলো কীভাবে সৃষ্টি হলো?
বর্তমান জাতিরাষ্ট্রগুলো কীভাবে গঠিত হলো সেটি নিয়ে চার্লস টিলির (Charles Tilly) একটি অসাধারণ মত রয়েছে, যেটা 'Bellicose Theory' নামে পরিচিত। টিলির মতে, বর্তমানের আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো বলপ্রয়োগ, যুদ্ধ, সংগ্রাম ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম দুটি আলাদা রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে, কোরীয় যুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, সুদান থেকে আন্দোলন করে দক্ষিণ সুদান সৃষ্টি হয়েছে, স্পেনের সাথে যুদ্ধ করে ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো সৃষ্টি হয়েছে, ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ করে আফ্রিকার অধিকাংশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে, ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ করে এশিয়ার অধিকাংশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। চার্লস টিলির মতে, বর্তমান জাতিরাষ্ট্রগুলো যেন যুদ্ধ, সংঘাত ও বলপ্রয়োগেরই ফল।
আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা
আধুনিক গণতন্ত্র: গণতন্ত্র কীভাবে পরিমাপ করব? যেহেতু গণতান্ত্রিক শাসনে ধনী-গরিব নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেহেতু বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশ তাদের রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক সিস্টেমে কিছু ত্রুটি থাকবেই। কিছু ত্রুটির জন্য পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে না দিয়ে বরং ত্রুটিগুলো সংশোধন করাই শ্রেয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে অসচেতন থাকলেও আজকের একুশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রের নাগরিকরা পূর্বের মতো অশিক্ষিত নয়। শিক্ষার হার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক সচেতন। তাই এরিস্টটল গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হিসেবে যে 'উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন' বলেছিলেন সেটা আর এখন নেই। কারণ বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন, রাজনৈতিক ডিবেট, জনসভা, মিছিল-মিটিং, প্রচারণা ইত্যাদির কল্যাণে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সকল ইস্যু নিয়ে জনগণের জানাশোনার পরিধি বাড়ছে। তাই বিশ্লেষকদের মতে একুশ শতকের গণতন্ত্র এবং এরিস্টটলের আমলের গণতন্ত্রের মধ্যে অনেক ফারাক। তাদের দাবি একুশ শতকের গণতন্ত্র হচ্ছে 'সচেতন জনতার শাসন'।
আলোচনার এই পর্যন্ত এসে 'গণতন্ত্র' শব্দটি আমাদের কাছে শুধু একটি ধারণা বা কনসেপ্ট মনে হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে একুশ শতাব্দীতে এসে গণতন্ত্রের বাস্তবতা বা প্রায়োগিক দিক কোনগুলো? পৃথিবীর যে দেশটিতে মোটেও গণতন্ত্র নেই অথচ সেই দেশের সরকার বলছে তার দেশে গণতন্ত্র আছে। একই ভাবে যে দেশটিতে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বিদ্যমান, সেই দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে তাদের দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রকে আমরা একেকজন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কারণে গণতন্ত্র মূলত কী সেটা নিয়ে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাই একটি দেশে গণতন্ত্র আছে নাকি নেই তা পরীক্ষা করার জন্য আমরা মোট পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করতে পারি। নিচে উল্লিখিত এই পাঁচটি মানদণ্ডের সবগুলো যদি সমানভাবে একটি রাষ্ট্রে বিদ্যমান থাকে শুধু তখনই আমরা বলব সে রাষ্ট্রে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র আছে। আর যদি কোনো একটি রাষ্ট্র নিচের পাঁচটি মানদণ্ডের সবগুলো পূরণ করতে না পারে তাহলে ধরে নেব সে রাষ্ট্রে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নেই।
১. Periodic Election (নিয়মিত নির্বাচন): গণতন্ত্র পরীক্ষা করার জন্য আমরা সর্বপ্রথম দেখব একটি রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট কয়েকবছর পরপর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কি না। যেহেতু প্রতিটি দেশের নির্বাচন কমিশন সে দেশের নির্বাচন আয়োজন করে তাই নির্বাচন কমিশনগুলোকে নিরপেক্ষ থাকা প্রধান শর্ত। নির্বাচন কমিশন কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বন করতে পারবে না।
২. Institutional Independence (প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা): প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ নামে তিনটি রাজনৈতিক অঙ্গ রয়েছে। আইন বিভাগের কাজ রাষ্ট্রের জন্য আইন তৈরি করা, শাসন বিভাগের কাজ সেই আইনগুলো বাস্তবায়ন করা এবং বিচার বিভাগের কাজ সেই আইনগুলো কেউ না মানলে কিংবা ভঙ্গ করলে তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। অর্থাৎ এই তিনটি বিভাগ স্বাধীনভাবে চলবে। বিচার বিভাগের উপর সরকারি দল, বিরোধী দল, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা কেউ প্রভাব খাটাতে পারবে না। সে প্রেসিডেন্ট হোক কিংবা বিরোধী দলের হোক রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করলে বিচার বিভাগ তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবে। তাই গণতন্ত্র পরীক্ষা করার জন্য দেখতে হবে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অঙ্গ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না।
৩. Secularism (ধর্মনিরপেক্ষতা): প্রথমেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। সেকুলারিজম আমাদের কাছে দুইভাবে উপস্থাপিত হয়। এক. একটি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে ধর্ম মানা এবং না মানার স্বাধীনতা। দুই. রাষ্ট্রের যে-কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য না দেওয়া। এবার আসি মূল কথায়। একটি রাষ্ট্রের সকল জনগণ শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী নয়। অর্থাৎ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান মোটামুটি সকল ধর্মের মানুষই একটি রাষ্ট্রে বসবাস করে। তাই ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের উপর কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না। ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান। যদি রাষ্ট্রে এরকম কোনো নিয়ম থাকে যে, কেউ হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলে সে প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না, কেউ ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলে সে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না, তাহলে বুঝতে হবে গণতন্ত্রের মানদণ্ডে সে দেশে গণতন্ত্র নেই।
৪. Pluralism (বহুত্ববাদ): গণতন্ত্রের মানদণ্ডে এই বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে এই 'Pluralism' ধারণাটি খুবই প্রভাবশালী। প্লুরালিজমের বাংলা হলো বহুত্ববাদ। সেকুলারিজম থেকে এই বহুত্ববাদের ধারণাটি একটু ব্যাপক। সেকুলারিজম হচ্ছে শুধু ধর্মকেন্দ্রিক। আর Pluralism এর মানে হলো ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই সমান। অর্থাৎ বহুত্ববাদ ধর্ম-সহ অন্যান্য সকল বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ধর্ম ছাড়াও পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ আমরা পাব না যেটি একক জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি দেশই গঠিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি জাতিসত্তা নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ- আজকের আধুনিক সিঙ্গাপুর গঠিত হয়েছে চাইনিজ, মালয়, ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান এই চারটি প্রধান জাতি নিয়ে। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে তিনটি ডমিনেন্ট জাতিসত্তা- মালয়, ইন্ডিয়ান ও চাইনিজ। যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, হিস্প্যানিক আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান ও এশিয়ান আমেরিকান। ভারত হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ইত্যাদি জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত।
একটি দেশের মোট জনসংখ্যার সবচেয়ে বেশি পপুলেশন যে জাতিসত্তাটি প্রতিনিধিত্ব করে সেই জাতিসত্তাটিই ঐদেশের সংখ্যাগুরু (Majority Group)। আর বাকিরা হলো সংখ্যালঘু (Minority Group)। যেমন- বাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি। তাই মুসলমানরা হলো বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু, আর হিন্দুরা যেহেতু মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম তাই বাংলাদেশের হিন্দুরা হলো সংখ্যালঘু। তেমনি ভারতে হিন্দুরা হলো সংখ্যাগুরু (Majority) কিন্তু মুসলিমরা সংখ্যালঘু (Minority)। যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট বা শ্বেতাঙ্গরা হলো সংখ্যাগুরু কিন্তু ব্ল্যাকরা সংখ্যালঘু। আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগুরু কিন্তু মুসলমানরা সংখ্যালঘু। এখন কথা হচ্ছে গণতন্ত্র পরিমাপ করতে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু এর হিসেবটা কী?
কারণ হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে একজনকে ক্ষমতার চূড়ায় আসতে হয়। আর নির্বাচনে জয়ী হতে সম্পূর্ণ ১০০% ভোটের প্রয়োজন নেই, মেজরিটি বা ৫০% এর একটু বেশি ভোট পেলেই হয়। তাই দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ যে জাতিসত্তায় রয়েছে সেটিকে লক্ষ্য করেই আপনি এই পঞ্চাশ শতাংশ ভোট সহজে পেতে পারেন। যেমন, CIA Factbook এর তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৭৬.৩%, ভারতে হিন্দু জনগোষ্ঠী ভারতের মোট জনসংখ্যার ৭৯.৮%, আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৫৬.১% রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অন্যসব মাইনোরিটি জনগোষ্ঠী বাদ দিয়ে শুধু শ্বেতাঙ্গদের লক্ষ্য করে রাজনীতি করেই আপনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন। কেননা শুধু শ্বেতাঙ্গরা ভোট দিলেই আপনার ভোট ৫০ পারসেন্ট এর উপরে হয়ে যাবে। একই ভাবে ভারতের বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান এসব জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে শুধু হিন্দুদের ভোট পেলেই আপনি ৫০ পারসেন্টের বেশি ভোট পেয়ে যাবেন।
তাই একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিবিদরা প্রথমে তাদের দেশের এই সংখ্যাগুরু জনসংখ্যাকে টার্গেট করে এবং তাদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে, যেটিকে আমরা "Populism" হিসেবে চিনি। এই পপুলিজমের মানে হলো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ৫০% ভোট পাওয়ার জন্য সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে বেশি প্রায়োরিটি দেয়। অর্থাৎ পপুলিজমের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মাইনোরিটি সম্প্রদায়গুলোকে উপেক্ষা করা হয়। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিবিদরা অনেকসময় ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করায়। কৌশল হিসেবে এসব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে সংখ্যাগুরু গোষ্ঠী থেকে সমর্থন আদায় করে নেয়। এসব রাজনীতিবিদরা সংখ্যাগুরু বা মেজরিটি জাতিসত্তার মানুষদের বোঝায়, দেখো আমরা সংখালঘুদের থেকে ভিন্ন ও শ্রেষ্ঠ। এভাবে তারা একটি দেশের সকল জনগণের মধ্যে 'আমরা বনাম তারা' অর্থাৎ 'We vs They' সৃষ্টি করে। যেটিকে আমরা রাজনীতির ভাষায় "বাইনারি অপজিশন” বলি। ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে এবং যুক্তরাজ্যের বরিস জনসন ব্রেক্সিট ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এভাবে একটি নির্দিষ্ট আইডেন্টিটির জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে (Solitarist Approach) রাজনীতি করাকে অমর্ত্য সেন "Identity Politics" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মোটকথা হলো একটি রাষ্ট্রে রাজনীতি ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে যদি Populism, Binary Opposition ও Identify Politics এর উত্থান হয় তাহলে বুঝতে হবে সে দেশে গণতন্ত্র নেই। পপুলিজম, বাইনারি অপজিশন এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্স এর কারণে পুরো রাষ্ট্রটি তখন সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নামে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। রাষ্ট্রের যে বহুত্ববাদ আইডিয়াটি অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই একসাথে মিলেমিশে এবং শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে সেটি আর সম্ভব হয় না। তখন একটি রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এজন্য গণতন্ত্রের জন্য Pluralism (বহুত্ববাদ) আবশ্যক।
৫. Constitutionalism (সংবিধানের প্রতি আনুগত্য): গণতন্ত্র পরিমাপ করার জন্য পঞ্চম ও সর্বশেষ মানদণ্ডটি হলো সংবিধান মেনে চলা। দেখতে হবে রাষ্ট্রের যে সংবিধানটি আছে সেই সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র চলছে কি না। এই 'Constitutionalism' এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মিছিল-মিটিং-জনসভা করার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ইত্যাদি।
উপরিউক্ত এই পাঁচটি মানদণ্ড দিয়েই আমরা বিশ্বের সকল দেশের গণতন্ত্র পরিমাপ করতে পারি। উল্লেখ্য, একটি দেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই সেটি বোঝার জন্য অন্য অনেক পদ্ধতি থাকলেও উপরিউক্ত পাঁচটি মানদণ্ড দিয়েই আমরা সহজে অনুধাবন করতে পারি। কয়েকটি বৈশ্বিক উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও প্রায়োগিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
উদাহরণ (০১): ইসরায়েল
১. Periodic Election: ইসরায়েলে প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয় (√)।
২. Institutional Independence: ইসরায়েলের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ-সহ সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করে (√)।
৩. Secularism: ইসরায়েল সেকুলারিজমে বিশ্বাসী নয়। ইসরায়েল একটি জাতিরাষ্ট্র যাদের আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ইহুদি ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে (X)।
৪. Pluralism: ইসরায়েলে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তেমন দ্বন্দ্ব দেখা যায় না (√)।
৫. Constitutionalism: ইসরায়েলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা কিংবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সবই আছে (√)।
মূল্যায়ন: ইসরায়েল রাষ্ট্রটি গণতন্ত্র পরিমাপের পাঁচটি মানদণ্ডের মধ্যে চারটিই পূরণ করতে পেরেছে। কিন্তু তিন নাম্বার মানদণ্ডটি (Secularism) পূরণ করতে পারেনি। তাই ইসরায়েল একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ নয়। আবার ইসরায়েল একেবারেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় সেটাও বলা যাবে না। যেহেতু তারা পাঁচটির মধ্যে চারটি মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে।
উদাহরণ (২): ইরান
১. Periodic Election: ইরানে প্রতি পাঁচ বছর পরপর প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন হয় (√)।
২. Independent Institutions: ইরানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন নয়। কারণ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কারা হবে সেটি বাছাই করেন সুপ্রিম লিডার নিজে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সেই প্রেসিডেন্ট কাজ করেন সুপ্রিম লিডারের অধীনে। ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অর্ধেক সদস্যকে নির্বাচিত করেন সুপ্রিম লিডার আর অর্ধেক নির্বাচন করেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতিকে আবার নির্বাচিত করেন সুপ্রিম লিডার। এক কথায়, ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন নয় (X)।
৩. Secularism: ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে হলে অবশ্যই তাকে মুসলমান হতে হবে। কোনো অমুসলিম ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ইরান সেকুলার রাষ্ট্র নয় (X)।
৪. Pluralism: ইরানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি সম্পর্কিত তেমন কোনো দ্বন্দ্ব নেই। নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে বসবাস করার চেষ্টা করে (√)।
৫. Constitutionalism: ইরান অনেকাংশে সংবিধান মেনে চলে (√)।
মূল্যায়ন: ইরান গণতন্ত্র পরিমাপের পাঁচটি মানদণ্ডের মোট তিনটি পূরণ করতে পেরেছে, আর দুইটি পারেনি। তাই ইরানের গণতন্ত্রও পূর্ণাঙ্গ নয়।
ইরানের মতো উত্তর আফ্রিকার একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ তিউনিসিয়ার সংবিধানেও বলা আছে যে, তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে হলে তাকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। আশাকরি গণতন্ত্র পরীক্ষা করার বিষয়টি এখন সবার কাছে পরিষ্কার। এভাবে উপরিউক্ত পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করে একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে মূল্যায়ন করা যাবে। যে-সকল দেশে শুধু নির্বাচন হয় (Periodic Election) কিন্তু বাকি চারটি মানদণ্ড পূরণ করে না, সেসমস্ত দেশের গণতন্ত্রকে বলা হয় Electoral Democracy বা নির্বাচনি গণতন্ত্র (সিরিয়ার গণতন্ত্র)। আর যে-সকল দেশ গণতন্ত্র পরিমাপের উপরিউক্ত পাঁচটি মানদণ্ডের সবগুলোই রক্ষিত হয় সেসমস্ত দেশের গণতন্ত্রকে বলা হয় Liberal Democracy বা উদার গণতন্ত্র (কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের গণতন্ত্র)।
State Mechanism বা রাষ্ট্রযন্ত্র
বিভিন্ন দেশের জাতীয় রাজনীতির সমন্বয়ে মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি গড়ে ওঠে। জাতীয় রাজনীতিতে (National Politics) পরিবর্তন আসলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। উদাহরণস্বরূপ- যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে যখন ডেমোক্রেটিক দল ক্ষমতায় আসে তখন বিশ্ব রাজনীতিটি হয় কূটনীতিময় (যেমন- ওবামা, বাইডেন শাসন)। আর যখন রিপাবলিকান দল ক্ষমতায় আসে তখন বিশ্ব রাজনীতিটি হয়ে ওঠে মিলিটারিস্টিক ও আক্রমণাত্মক (যেমন-রোনাল্ড রিগ্যান, জর্জ ডব্লিউ বুশের শাসন)। একই ভাবে ব্রিটেনে যখন কনজার্ভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় আসে তারা এক ধরনের ফরেইন পলিসি গ্রহণ করে, আর লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলে আরেক ধরনের ফরেইন পলিসি গ্রহণ করে থাকে। অর্থাৎ বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন ঘটলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পরিবর্তন আসে।
যেমন- বাংলাদেশে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন তারা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করেছে। আর আওয়ামী লীগ সবসময় চেষ্টা করে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে। এবার সংক্ষেপে বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করব কীভাবে একটি দেশের সরকারি দল ও বিরোধী দল তৈরি হয়, কাদের নিয়ে একটি দেশের সংসদ গঠিত হয়, বিভিন্ন দেশগুলোতে কারা আইন তৈরি করে এবং কারা আইনগুলো বাস্তবায়ন করে। নিচে দেওয়া বাংলাদেশের উদাহরণটি বুঝতে পারলেই আপনি পৃথিবীর যে-কোনো দেশের জাতীয় রাজনীতি (National Politics) কিছুটা বুঝতে পারবেন।
Representative Democracy (প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র)
গণতন্ত্রকে বলা হয় জনগণের শাসন। গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের। রাষ্ট্রের আইন তৈরি করবে জনগণ। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। রাষ্ট্র চলবে জনগণের ইচ্ছায়। এখন ধরুন বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা সতেরো কোটি। এই সতেরো কোটি জনগণ তো আর একসাথে একটি জায়গায় মিলিত হয়ে আইন তৈরি করতে পারবে না, কিংবা একসাথে বসে আলোচনাও করতে পারবে না এবং সিদ্ধান্তও নিতে পারবে না। ঠিক এই কারণে পুরো বাংলাদেশকে ৩০০টি নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেক নির্বাচনি অঞ্চল থেকে ঐ অঞ্চলের জনগণ ভোটের মাধ্যমে একজন করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। সবগুলো অঞ্চলের নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরা যে জায়গাটিতে মিলিত হয় সেই জায়গাটির নাম হলো পার্লামেন্ট বা সংসদ। নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরাই সংসদে গিয়ে নিজ অঞ্চলের সকল জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণের নির্বাচিত এই প্রতিনিধি তার নিজ অঞ্চলের সকল মানুষের কথাগুলো সংসদে গিয়ে উত্থাপন করে। নিজ অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজনীয়তা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে গিয়ে ব্যাখ্যা করে। প্রতিনিধি নির্বাচনের এই সিস্টেমকে বলা হয় 'Representative Democracy'। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, বাংলাদেশ, জাপান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি প্রায় সকল দেশেই এই 'Representative Democracy' সিস্টেমটি রয়েছে।
সরকারি দল ও বিরোধী দল
এখন এই ৩০০টি নির্বাচনি এলাকার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে ৩০০ জন প্রতিনিধি নির্বাচনে দাঁড়ায় এবং একই ভাবে বিএনপি থেকেও ৩০০ জন প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বোঝার স্বার্থে মনে করুন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোট ৩০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২০০ জন জয়ী হলো এবং বিএনপির মোট ৩০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০০ জন জয়ী হলো। আওয়ামী লীগের বিজয়ী এই দুইশো জন এবং বিএনপির বিজয়ী এই একশো জন হলো বাংলাদেশের পার্লামেন্টের সদস্য। যেহেতু আওয়ামী লীগ মেজোরিটি আসন (২০০টি) পেয়েছে, তাই আওয়ামী লীগ হলো বিজয়ী বা সরকারি দল, আর বিএনপি হলো বিরোধী দল।
পার্লামেন্ট বা সংসদ
আওয়ামী লীগ থেকে বিজয়ী ঐ ২০০ জন প্রতিনিধি এবং বিএনপি থেকে বিজয়ী ঐ ১০০ জন তথা মোট ৩০০ জন নিয়ে সংসদ গঠিত হয়। এই ৩০০ জনকে বলা হয় এমপি (Member of Parliament-MP)। তিনশো জনের এই সংসদটিকেই বলা হয় রাষ্ট্রের আইন বিভাগ (Legislative Branch)। কারণ সংসদ সদস্যরা এই সংসদে বসেই রাষ্ট্রের যাবতীয় আইন তৈরি করে। যেহেতু সংসদের তিনশো জনের মধ্যে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরাই আছেন, তাই সংসদের এই সরকারি ও বিরোধী দলের সকল সদস্যরাই হলেন এই আইন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই ৩০০ জন ভোটাভুটির মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে একজনকে সংসদের স্পিকার নির্বাচন করে। যেহেতু সংসদের দুইশো জনই সরকারি দলের তাই স্পিকার সাধারণত সরকারি দল থেকেই বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ যেহেতু বিজয়ী দল তাই আওয়ামী লীগের যিনি দলনেতা তিনি হন প্রধানমন্ত্রী। তারপর প্রধানমন্ত্রী তার নিজ দলের ঐ দুইশো জন প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে যারা খুবই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তাদের মধ্য থেকে ৪০ বা ৪৫ জনকে মন্ত্রী বানান। প্রধানমন্ত্রী ও তার সকল মন্ত্রীরা হলেন রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ (Executive Branch)। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে শাসন বিভাগ বলা হয়; তাই মূলত সরকারি দলই শাসন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
বিল ও আইন
বিল হচ্ছে কোনো একটি আইনের প্রাথমিক খসড়া। মনে করুন বাংলাদেশে এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণরা ক্রমাগত মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই এখন আপনি এরকম একটি আইন করতে চাচ্ছেন যে, "যে-সকল তরুণরা মাদকাসক্ত হবে তারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না"। তখন এটি আপনাকে সংসদে উত্থাপন করতে হয়। তারপর সংসদের তিনশো জন সদস্য এটি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে ডিবেট করে, আলোচনা করে। দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর সবার মধ্যে একটি ভোটাভুটি হয়। যদি তিনশো জন সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই এটির পক্ষে মত দেয় তাহলে এই বিলটি সংসদে পাশ হয়। সংসদে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি বিলটিতে একটি স্বাক্ষর দিয়ে দেয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর বিলটি চূড়ান্ত আইনে পরিণত হয়। অর্থাৎ কোনো একটি প্রস্তাবকে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিল বলা হয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর সেটি আইনে পরিণত হয়।
সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা (আইন বিভাগ) আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি আইন তৈরি করে। সেই আইন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা (শাসন বিভাগ) আমলাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করে। ধরুন "মাদকাসক্ত তরুণরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না" এটি আইন হিসেবে বাস্তবায়ন হয়ে গিয়েছে। এখন একজন মাদকাসক্ত তরুণ যদি বিভিন্ন তদবির, উৎকোচ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে তাহলে সেটি হবে আইনের লঙ্ঘন। মাদকাসক্ত তরুণের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের মাধ্যমে আইন ভঙ্গ করায় আদালত তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসবে। আদালত তাকে জেল-জরিমানা যা করার দরকার তাই করবে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রিম কোর্ট। এই সুপ্রিম কোর্ট বা আদালতকেই বলা হয় বিচার বিভাগ (Judiciary Branch)।
উপরিউক্ত এই সিস্টেমের আলোকেই প্রায় সকল দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ফাংশন করে। বাংলাদেশকে ৩০০টি নির্বাচনি অঞ্চলে ভাগ করায় বাংলাদেশের সংসদের নির্বাচিত আসন সংখ্যাও যেমন ৩০০টি। তেমনি ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪৩৫টি নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করায় যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যাও ৪৩৫টি (House of Representatives)। একই ভাবে যুক্তরাজ্যকে ৬৫০টি নির্বাচনি অঞ্চলে ভাগ করায় যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যা ৬৫০টি (House of Commons)।
Power Division বা ক্ষমতার বিভাজন
ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, জাপান, যুক্তরাজ্যের মতো পৃথিবীর অনেক দেশ প্রধানমন্ত্রীর অধীনে চলে। আবার যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, তুরস্ক, পেরুর মতো অনেক দেশ প্রেসিডেন্টের অধীনে চলে। তাই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর এই বিষয়টি বুঝতে আমাদের আরও কয়েকটি টার্ম জানতে হবে।
১. Presidential Form of Government (প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার): সাধারণত প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রেসিডেন্ট নিজে। কখনো কখনো প্রেসিডেন্টের সহকারী হিসেবে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট অথবা একজন প্রধানমন্ত্রী থাকলেও তাদের তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। ভাইস প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় প্রেসিডেন্টের কথামতোই চলতে হয়। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকলেও তাকে প্রেসিডেন্ট এর কথামতো চলতে হয়। এই প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশগুলোতে মিলিটারিদের কমান্ডার-ইন-চিফ হলেন প্রেসিডেন্ট নিজে। মিলিটারিরা রানিং প্রেসিডেন্ট এর নির্দেশানুসারে পরিচালিত হয়।
২. Parliamentary Form of Government (প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার): একই ভাবে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রেসিডেন্ট থাকলেও প্রেসিডেন্ট এর তেমন কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। যেমন- বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে। পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রেসিডেন্ট থাকলেও তার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর কথামতো প্রেসিডেন্টকে চলতে হয়। এই প্রধানমন্ত্রী শাসিত দেশগুলোর মিলিটারিদের কমান্ডার ইন চিফ হলেন প্রধানমন্ত্রী। মিলিটারিরা রানিং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশানুসারে পরিচালিত হয়। এক কথায়, উপরের এই দুইটি পদ্ধতির প্রথমটিতে প্রেসিডেন্ট এবং দ্বিতীয়টিতে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থাকেন।
৩. Dual Executive System (অর্ধেক প্রেসিডেন্ট ও অর্ধেক প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার): প্রেসিডেন্ট শাসিত এবং প্রধানমন্ত্রী শাসিত উপরিউক্ত এই দুইটি সিস্টেমের বাহিরে গিয়ে বিশ্বের কিছু কিছু দেশ তাদের সংবিধানে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যেখানে শুধু একজন নয় বরং প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট উভয়েই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অর্ধেক প্রেসিডেন্ট নিয়ন্ত্রণ করবে, আর বাকি অর্ধেক প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে। এখানে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের মাঝে একটি ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা হয়। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রায় সমান ক্ষমতার এই সিস্টেমকে বলা হয় Dual Executive System বা Semi Presidential System বা হাইব্রিড সিস্টেম। ফ্রান্স ও তিউনিসিয়ায় এই হাইব্রিড সিস্টেম রয়েছে। তাই তিউনিসিয়া ও ফ্রান্স এই দুটি দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ই অনেক ক্ষমতাবান।
“Semi Presidential” এই ফ্রেইজটা দেখেই মনে রাখা যায় যে, অর্ধেক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে, আর বাকি অর্ধেক প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সেমি প্রেসিডেনশিয়াল এই সিস্টেমে মিলিটারিদের কমান্ডার-ইন-চিফ শুধু প্রেসিডেন্ট। যে-কারণে তুলনামূলক ভাবে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা একটু বেশি। Semi Presidential System এর এই ধারণাটি ১৯৭৮ সালে সর্বপ্রথম পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট মাউরিস দোভার্জার এর মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করে। দোভার্জারের মতে প্রেসিডেন্ট যেহেতু একটি রাষ্ট্রের প্রধান তাই তাকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসা উচিত এবং প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সরকার প্রধান তাই তিনিও পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে আসাটাই বাঞ্ছনীয়।
Islamic Republic (ইসলামি প্রজাতন্ত্র)
ইসলামি নিয়ম বা শরিয়া আইনে পরিচালিত হয় এমন গণতান্ত্রিক দেশকে বলা হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এই ইসলামি প্রজাতন্ত্র রয়েছে সারা বিশ্বে মাত্র তিনটি। ১. বিশ্বের প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২. দ্বিতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৫৮ সালে মৌরিতানিয়া নিজেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। ৩. ইরান তৃতীয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ১৯৭৯ সালে পাহলভী রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইরানিয়ান রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপ নেয়। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর আফগানিস্তান নতুন এক সংবিধান প্রণয়ন করে। সেখানে আফগানিস্তানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান ইসলামি রিপাবলিকের অধীনে ছিল। তালেবানরা নতুন করে ক্ষমতা দখল করায় আফগানিস্তান এখন ইসলামি আমিরাত হিসেবে পরিচিত। গাম্বিয়া, কমেরুস, ইস্ট তার্কিস্তান এরাও অতীতে ইসলামি রিপাবলিক ছিল কিন্তু বর্তমানে নেই।
ইসলামিক রাজতন্ত্র (Islamic Monarchy)
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সাথে ইসলামি রাজতন্ত্রের কিছু পার্থক্য রয়েছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে নামে মাত্র হলেও গণতন্ত্র আছে। এখানে গণতন্ত্র বলতে লিবারেল ডেমোক্রেসিকে বোঝাচ্ছি না। এসব ইসলামি প্রজাতন্ত্রগুলোতে রয়েছে নির্বাচনি গণতন্ত্র (Electoral Democracy)। গণতন্ত্রের সকল বৈশিষ্ট্য না থাকলেও দেশগুলোতে নিয়মিত নির্বাচন হয়। ইরান, পাকিস্তান ও মৌরিতানিয়াতে নিয়মিত নির্বাচন হয়। অন্যদিকে ইসলামিক রাজতন্ত্রকে ইংরেজিতে 'Islamic Monarchy' বলা হয়। ইসলামিক মোনার্কি বা রাজতন্ত্র এমন একধরনের সরকার সেখানে ইসলামিক বা শরিয়া আইন আছে বটে কিন্তু দেশ পরিচালিত হয় রাজার মাধ্যমে। ইসলামি রাজতন্ত্রে কোনো নির্বাচন নেই। বংশপরম্পরায় শাসকরা ক্ষমতায় আসে। বিশ্বে "Islamic Monarchy" এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, মরক্কো, জর্ডান ইত্যাদি দেশগুলো।
রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠিত হয়?
আমরা এটিকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। সোসাইটিতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিভাজন থাকে। গ্রামীণ সম্প্রদায়, শহুরে সম্প্রদায়, ধনিক সমাজ, বাঙালি, চাকমা, হিন্দু-মুসলিম, কৃষক সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ইত্যাদি বিভাজনে সমাজ বিভক্ত। এই সম্প্রদায়গুলোকে টার্ম হিসেবে 'Social Cleavage' বলা হয়। এখন কোনো একটি সোশ্যাল ক্লিভেজ যদি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব (Representative) থেকে বাদ পড়ে যায়, তখন তারা একত্রিত হয়ে দল গঠন করে। এটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল গঠনের 'Behavioral' বা ইউরোপিয়ান থিওরি। একটি উদাহরণ দেই- ধরুন চাকমা সম্প্রদায় দেখল যে, সংসদে তাদের হয়ে কেউ কথা বলে না, সেখানে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, তাদের অধিকার নিয়ে কেউ আওয়াজ তুলে না। তখন তারা নিজেদের অধিকার রক্ষার্থে সবাই একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। এটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে 'European Theory' এর মূল বক্তব্য।
রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে American Theory আবার ভিন্ন কথা বলছে। তারা বলছে, সোশ্যাল ক্লিভেজের উপর রাজনৈতিক দল নির্ভর করে না। এটি গড়ে ওঠে 'Leadership' এর উপর ভিত্তি করে। একজন মানুষ একা বা নিজের নামে সোসাইটির সকল মানুষকে একত্রিত করতে পারে না, তাই সে দল গঠন করে 'Self Interest' পূরণ করতে। দলের নাম ঠিক থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে সে তার 'Interests' পরিবর্তন করার মাধ্যমে জনগণকে তার প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। দল গঠনের সময় তার প্রাথমিক যে মতাদর্শ ছিল সেটি থেকে সে সরে আসে। তাই কখনো বামপন্থিদের সাথে, কখনো ডানপন্থিদের সাথে দলটি জোট গঠন করে। রাজনৈতিক দল জনগণের 'Needs' নিয়ে কাজ করে না বরং পার্টি জনগণের 'Needs' গুলো দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জনগণেকে তাদের দিকে Mobilize করায়। একটি উদাহরণ দেই- Climate Change কী এটি অনেকে জানেই না। আমি জনগণকে এটি ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছি যে, এটিও তোমার 'Interest'। কুড়িগ্রামের মাঝবয়সি একজন সম্মানিত কৃষক জানে না জলবায়ু পরিবর্তন আসলে কী। আমি গিয়ে তাকে বললাম, “চাচা, এই যে পানির অভাব এবং খরার কারণে ফসল ফলছে না, এটাই জলবায়ু পরিবর্তন। আমাকে ভোট দিলে আমি পানির ব্যবস্থা করে দিব।” তখন চাচা বলবে, "আসলেই তো তাই! হ্যাঁ, আমি এখন থেকে আপনার দলে।” রাজনৈতিক দল গঠনে আমেরিকান থিওরিটা Rational বা যৌক্তিক। দল তাদের ইন্টারেস্ট জনগণকে এমনভাবে বলে জনগণ মনে করে সেটা তো তাদেরই Interest বা স্বার্থ।
রাজনৈতিক দল গঠনে American Theory'টি অনেকটা বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি রান্না করার মতো। ধরুন মেসে আজকে আমার রান্না করার পালা। আমার ব্যক্তিগতভাবে খিচুড়ি পছন্দ এবং এটি রান্না করাও সহজ। আজকে বৃষ্টি। আমি কাউকে না বলে অথবা সবাইকে জিজ্ঞেস না করে খিচুড়ি রান্না করে বললাম- "বন্ধুরা, আজকে তো বৃষ্টি তাই খিচুড়ি রান্না করে ফেললাম।” তখন সবাই মনে করবে- “ও আচ্ছা যেহেতু বৃষ্টি তাই খিচুড়ি রান্না করে ভালোই করেছিস।” কিন্তু রান্না করার শুরুতে সবাইকে জিজ্ঞেস করলে অনেকে হয়তোবা রাজি হতো না। অর্থাৎ নিজের পছন্দকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যেন ওটাই সবার পছন্দ। আর এটাই লিডারশিপ। আমেরিকান থিওরির মতে, দল লিডারশীপের উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। একই 'Social Cleavage' কে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে তখন আরেকজন 'Rival' বা প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়ে ঐ জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণও তার দিকে শিফট করে। এজন্য দেখা যায় দল বারবার ভেঙে যাচ্ছে, দলের কিছু সদস্য বের হয়ে নতুন আরেকটি দল গঠন করছে, অন্য মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু মানুষ আবার আমার দলে এসে যোগ দিচ্ছে।
Question to think about? রাজনৈতিক দল গঠনে Behavioural Theory (ইউরোপিয়ান) এবং Rational Theory (আমেরিকান) এই দুটি তত্ত্ব আমরা জানার চেষ্টা করেছি। এখন প্রশ্নটি হচ্ছে, সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দল গঠনের ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান থিওরিটি নাকি আমেরিকান থিওরিটি বেশি প্রাসঙ্গিক? এবং কেন?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Diamond, Larry and Plattner, Marc F. (2015), Democracy in Decline? (A Journal of Democracy Book), Johns Hopkins University Press
2. Zakaria, Fareed (2007), The Future of Freedom: Illiberal Democracy at Home and Abroad, W. W. Norton & Company
3. Dobson, William J. (2013), The Dictator's Learning Curve: Inside the Global Battle for Democracy, Anchor
4. Caputo, Nicholas (2005), America's Bible of Democracy: Returning to the Constitution, Sterling House Publisher
5. Emerson, Peter (2012), Defining Democracy, Springer
6. Fuller, Roslyn (2015), Beasts and Gods: How Democracy Changed Its Meaning and Lost its Purpose, London: Zed Books
দশম অধ্যায়
Theme: Making Government Work
রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও মতাদর্শসমূহ
“War made the state, and the state made war" - Charles Tilly
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অন্যতম অ্যাক্টর হচ্ছে বিশ্বের ১৯৫টি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এই সবগুলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থায়। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ক্রমাগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রগুলোর ভিতরকার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ছোঁয়া। তাই সদা পরিবর্তনশীল এই বিশ্বব্যবস্থাকে বুঝতে হলে আমাদের রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি সম্পর্কিত ধারণা ও মতাদর্শগুলো সম্পর্কে একটি মৌলিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। একটি প্রশ্ন দিয়ে এই অধ্যায়টি শুরু করা যাক। বিশ্বের যে-সকল রাষ্ট্র নিজেদেরকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে তারা সবাই বলছে যে, তাদের দেশের গণতন্ত্রই সঠিক এবং সেরা। অঞ্চলভেদে গণতন্ত্র আমাদের কাছে একেক রূপে ধরা দেয়। তাহলে গণতন্ত্র বিষয়টি আসলে কী? এটি কি সংজ্ঞায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নাকি পরিমাপ করার বিষয়? তাহলে এই প্রশ্নটি মাথায় রেখেই আলোচনা শুরু করা যাক।
রাষ্ট্রের আদি উৎস (Origin of the State)
আজকের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো হঠাৎ করেই একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। যুগে যুগে বিভিন্ন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রগুলো আধুনিকতায় প্রবেশ করেছে। অতীতে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ছিল ব্যক্তি। তারপর ব্যক্তি থেকে একটি পরিবার। পরিবার থেকে একটি ট্রাইব বা কমিউনিটি। তারপর অনেকগুলো কমিউনিটি মিলে একটি নগররাষ্ট্র। রাষ্ট্রের উৎপত্তি নিয়ে অনেক তত্ত্ব ও মতবাদ থাকলেও এরিস্টটলের এই মতবাদটি তুলনামূলকভাবে প্রায়োগিক।
জাতি (Nation) এবং জাতীয়তাবাদ (Nationalism)
সাধারণত ভাষা, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ ইত্যাদির কারণে মানুষ বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। আবার দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করার কারণে তাদের মধ্যে একটি সাদৃশ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেমন- বাংলা ভাষাভাষী সকল জনগণ তাদের ভাষাগত মিলের কারণে একসাথে বসবাস শুরু করে। ইংরেজি ভাষাভাষী জনগণ তাদের ভাষার সুবিধার্থে একসাথে বসবাস করা শুরু করে। কৃণাঙ্গ লোকেরা তাদের বর্ণের যে মিল তার উপর ভিত্তি করে একসাথে বসবাস শুরু করে। ধর্মের উপর ভিত্তি করেও মানুষ একসাথে বসবাস করা শুরু করে। অর্থাৎ সবার মধ্যে একটি Unity বা Common Identity রয়েছে। এভাবে মিল বা সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে একসাথে হওয়া সম্প্রদায়কে বলা হয় জাতি (Nation)। জাতি হচ্ছে একটি ধারণাগত বিষয়, যে আমরা সবাই এক এবং একতাবদ্ধ। আর এই জাতি যখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে গড়ে ওঠে তখন বলা হয় 'Nationalism' বা জাতীয়তাবাদ।
রাষ্ট্রের উপাদান (Elements of State)
১. Population: এই মিল বা সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে কিংবা জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে যে সম্প্রদায় গড়ে ওঠে সেটিকে বলে 'Population' বা জনসংখ্যা। এভাবে ভাষাগত সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল বাঙালি জনগোষ্ঠী, ইংরেজ জনগোষ্ঠী, বর্ণগত মিলের উপর ভিত্তি করে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী।
২. Territory: নির্দিষ্ট মিল বা সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই জনসমষ্টি যেখানে বা যে এলাকায় বসবাস করে সেই অঞ্চলটি হলো এই জনগোষ্ঠীর Territory বা ভূখণ্ড।
৩. Government: এভাবে সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই জনসমষ্টি তাদের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস শুরু করে। তাদের মধ্যে নানা সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন সংঘাত দেখা দেয়। এই বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তাই এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সবাই মিলে একজনকে নেতা বানালো এবং সিদ্ধান্ত নিল আমরা সবাই আমাদের নেতার আদেশ মেনে চলব। এই নেতাকেই বলা হলো সরকার (Government)। অর্থাৎ সবার ব্যক্তিগত ক্ষমতাকে একজনের হাতে ন্যস্ত করল। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ তাদের নিজ নিজ সরকার গঠন করল। সরকারবিহীন ঐ বিশৃঙ্খল অবস্থাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস হবস উল্লেখ করেছেন 'State of Nature' বা 'প্রকৃতির রাজ্য' হিসেবে। এই প্রকৃতির রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসতেই গঠন করা হলো সরকার এবং আইন।
৪. Sovereignty: একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগণ তাদের সরকার গঠন করল। এবার সরকার গঠনের পর আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। দেখা গেল একটি ভূখণ্ডের সরকার অন্য আরেকটি ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেই ভূখণ্ড নিজের দখলে নিতে চাচ্ছে। এক ভূখণ্ডের সরকার অন্য ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেখান থেকে সম্পদ লুটপাট করে নিজ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়ে আসছে। এভাবে বিভিন্ন ভূখণ্ডের মধ্যে যুদ্ধ দেখা দিল। এই যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেতে, এক ভূখণ্ডের সরকার যেন অন্য ভূখণ্ডে আক্রমণ করতে না পারে এবং এক ভূখণ্ডের জনগণ যেন আরেক ভূখণ্ডে আক্রমণ করে সেই ভূখণ্ডের সম্পদ লুটপাট করতে না পারে; সেজন্য প্রত্যেক ভূখণ্ডের সরকার মিলে একটি নিয়ম করল। নিয়মটি হলো প্রতিটি ভূখণ্ড হবে স্বাধীন, কেউ কারো ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না। অর্থাৎ প্রতিটি ভূখণ্ডের মালিক হবে নিজ নিজ ভূখণ্ডের জনগণ ও সরকার। আর এটিকেই বলা হলো 'Sovereignty' বা 'সার্বভৌমত্ব'। এভাবে অন্য ভূখণ্ডের আক্রমণ থেকে নিজ ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে সবাই নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করে। আর এই সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি রাষ্ট্র মিলিটারি তৈরি করে। উপরিউক্ত এসব কারণেই বলা হয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এই চারটি উপাদান থাকা আবশ্যক।
জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র (Nation-State)
একই ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, বর্ণ ও সাদৃশ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রথমে জাতি গঠিত হয়। সেই জাতিকে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত করে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধকরণ, রাষ্ট্র গঠনের চারটি উপাদান নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। উদাহরণস্বরূপ: বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করে বাঙালি জাতি গঠন, তারপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন। হিন্দু ধর্মকে ভিত্তি করে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, তারপর এই জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম। ইসলাম ধর্মের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ, তারপর এই জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। এভাবে বিভিন্ন জাতি বা জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে যে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সেটিকে 'Nation State' বা 'জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র' বলে। অর্থাৎ এরকম জাতি রাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণই একটি নির্দিষ্ট জাতির অন্তর্ভুক্ত। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণই শ্বেতাঙ্গ, চিলির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই খ্রিষ্টান, মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই বৌদ্ধ, ইরানের অধিকাংশ জনগণই শিয়া মুসলিম, সৌদিতে সুন্নি মুসলিম ইত্যাদি। বর্তমান একুশ শতকের সব রাষ্ট্রই জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র।
বহুজাতিক রাষ্ট্র (Multinational State)
আমরা দেখেছিলাম জাতি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বহুজাতিক রাষ্ট্র তার বিপরীত। বহুজাতিক রাষ্ট্রের জনগণ শুধু একটি জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তারা বরং অনেকগুলো জাতির সমন্বয়ে গঠিত। তাই যে রাষ্ট্রটি একের অধিক জাতি নিয়ে গঠিত হয়, সেই রাষ্ট্রকে বলা হয় বহুজাতিক রাষ্ট্র। যেমন- এশিয়া মহাদেশের ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন বহুজাতিক রাষ্ট্র। ইউরোপের রাশিয়া, ফ্রান্স, সার্বিয়া বহুজাতিক রাষ্ট্র। আফ্রিকার ঘানা, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদিও বহুজাতিক রাষ্ট্র। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক: ১. ভারত একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। সেখানে বহু বর্ণের, বহু ভাষার, বহু ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করে। তামিল, হিন্দুস্থানি, তেলেগু, গুজরাটি, কেরালা, পাঞ্জাব, বেঙ্গল, মালয়, কাশ্মীরি, আসামি ইত্যাদি জাতি একসঙ্গে ভারতে বসবাস করছে। ২. আফ্রিকার দেশ ঘানা। সেখানে চাইনিজ, মালয়, ইউরোপিয়ান, লেবানিজ ইত্যাদি জাতির মানুষ বসবাস করে। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবের কারণে সেখানে এখন এত জাতির একসঙ্গে বসবাস। ৩. কেনিয়াতে পাঁচের অধিক জাতি রয়েছে। সেখানে কিকুইয়া, লৌ, লুহায়, কাম্বা, কেলেনজিন ইত্যাদি জাতির বসবাস। কেনিয়ায় ২০ শতাংশের বেশি কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নেই। ৪. দক্ষিণ আফ্রিকাও একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। সেখানে শুধু বর্ণের ভিত্তিতেই শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ইত্যাদি জাতি। আবার ভাষার ভিত্তিতে রয়েছে ইংরেজি, সোয়াজি, ভেন্ডা, সোয়ানা, পেডি, জুলু ইত্যাদি ভাষাভাষীর জাতি।
ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা (National Integrity)
একটি রাষ্ট্রের মধ্যে বহু জাতির বসবাস থাকে। রাষ্ট্রে বসবাসরত শুধু একটি জাতির মধ্যেই আবার ভিন্ন ভিন্ন সাব গ্রুপ থাকে। যেমন বাংলাদেশের কথাই বলা যাক। বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা আমরা বাঙালি জাতি হলেও এবং আমাদের সবার ভাষা বাংলা হলেও আমাদের মধ্যে অনেকে আবার হিন্দু, অনেকে মুসলিম, অনেকে আবার খ্রিষ্টান। ভারতে হিন্দুদের মধ্যেই আবার অনেকগুলো শ্রেণি রয়েছে। একটি রাষ্ট্রে বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, শ্রেণি সবার মধ্যে যে একতাবোধ সেটিকেই বলে ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা। অর্থাৎ আমরা সবাই ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের ভূখণ্ডে বসবাস করছি এবং আমাদের মধ্যে শ্রেণিগত, ধর্মগত, ভাষাগত ভিন্নতা থাকলেও আমরা যে একতা অনুভব করি সেটাই National Integrity বা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা। তথা আমরা সবাই বাংলাদেশি এবং আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ন্যাশনাল ইন্টেগ্রিটি অপরিহার্য।
সংবিধান
জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ে পৃথিবীতে অনেক স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র ও বহুজাতিক রাষ্ট্রের জন্ম হলো। এখন এই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো সুশৃঙ্খলভাবে চলার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি প্রয়োজন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সরকার কে হবে, কীভাবে সরকার গঠিত হবে, রাষ্ট্রের আইন কী হবে, অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে, বিচার বিভাগ কীভাবে পরিচালিত হবে, প্রশাসন কীভাবে গঠিত হবে ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় সংবিধানে। ঠিক এজন্যই একটি রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর সেই রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো যত দ্রুত সম্ভব একটি সংবিধান প্রণয়ন করা। যেমন- বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার একবছরের মধ্যেই (১৯৭২) একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে হয়েছে, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তিনবছরের মাথায় তাদের সংবিধান প্রণয়ন করে ফেলে (১৯৫০ সালে)। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন করতে দেরি হলে রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন- ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর একটি সংবিধান তৈরি করতে তাদের দীর্ঘ নয় বছর লেগেছিল। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান তার সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। তাই এই দীর্ঘ নয় বছর পাকিস্তানকে সামরিক শাসনের আওতায় থাকতে হয়েছে।
সরকার ব্যবস্থার প্রাথমিক ধারণা
সময়ের পরিবর্তনে যুগে যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা নানা রূপের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে। 'Aristotelian Forms of Government' এর ধারণা দিয়ে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
১. Monarchy বা রাজতন্ত্র: রাজতন্ত্র এর মানে হলো একজন রাজার শাসন (Rule by One)। প্রথম দিকে জনগণ তাদের সরকার হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ যোগ্য এমন একজন ব্যক্তিকে তাদের রাজা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। রাজার কথামতো রাষ্ট্র পরিচালিত হতো। মানুষ মনে করত একজন রাজার মাধ্যমে রাষ্ট্র শাসন হওয়াটাই ভালো। কেননা রাজা একজন হওয়ার কারণে যে-কোনো সিদ্ধান্ত খুবই দ্রুত গ্রহণ করা যায়। একজন রাজার পরিবর্তে কয়েকজন মিলে শাসন করলে সবাই ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আসবে। তখন কার সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করবে সেটি নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এসব দিক বিবেচনা করে পৃথিবীর অনেক দেশ রাজতন্ত্র গ্রহণ করে।
২. Tyranny বা স্বৈরতন্ত্র: রাজতন্ত্রের অধীনে কিছুদিন থাকার পর রাষ্ট্রের জনগণ লক্ষ্য করল যে, রাজা জনগণের মঙ্গলের জন্য আর কাজ করছে না, রাজা বরং ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছে, রাজা নিজের সখ-শান্তি-পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, রাজার কথামতো চলতে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে, কেউ রাজার কথা না শুনলে তাকে জেলে আটক করা হচ্ছে। রাজার এই নেতিবাচক অবস্থানটিকে বলা হলো স্বৈরতন্ত্র। এক কথায়, স্বৈরতন্ত্র হলো রাজতন্ত্রের বিকৃত (Perverted) রূপ। অর্থাৎ রাষ্ট্রে একজনের শাসন যদি ভালো হয় তাহলে রাজতন্ত্র, আর যদি খারাপ হয় তাহলে স্বৈরতন্ত্র।
৩. Aristocracy বা অভিজাততন্ত্র: রাষ্ট্রের নাগরিকরা যখন দেখল যে, রাজতন্ত্রের রাজ বেশিদিন ঠিক থাকেন না। রাজা যেহেতু একজন, তাই একটি সময় পর রাজা জনগণের কল্যাণের কথা ভুলে গিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে উঠেন। রাষ্ট্রে রাজার সমকক্ষ যেহেতু আর কেউ নেই, তাই রাজা কিছুদিন পর স্বভাবগতভাবেই স্বৈরাচারী হয়ে উঠেন। তখন রাষ্ট্রের নাগরিকরা সিদ্ধান্ত নিল পুরো রাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু একজনের হাতে ন্যাস্ত না করে বরং রাষ্ট্রের যারা সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত এবং জ্ঞানী তাদের কয়েকজনের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করি। তখন রাজার পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় শিক্ষিত ও অভিজাত কিছু মানুষের হাতে (A small group of people)। অল্প কিছু শিক্ষিত মানুষের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার এই সিস্টেমকে বলা হয় Aristocracy বা অভিজাততন্ত্র (Rule by Few)। যেহেতু সবাই শিক্ষিত তাই তারা সবাই মিলে ভালো ভালো পলিসি গ্রহণ করবে, তাদের যে-কোনো একজন কোনো ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে অন্য আরেকজন সেটা ধরিয়ে দেবে। রাজা একা ছিল যে-কারণে রাজার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। অভিজাততন্ত্রের যেহেতু সবাই জ্ঞানী তাই তারা রাষ্ট্রের জন্য কোনো ভুল পলিসি গ্রহণ করতে পারেন না।
৪. Oligarchy বা গোষ্ঠীতন্ত্র: অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রাষ্ট্রের মানুষ মনে করেছিল জ্ঞানী ও বিজ্ঞদের হাত ধরে রাষ্ট্র ভালোই চলবে। কিন্তু কয়েকদিন পরে দেখা গেল তার উল্টোটা। যে কয়েকজনের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তারাও জনগণ এবং রাষ্ট্রের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করা শুরু করে। এরাও রাষ্ট্রের সম্পদ নিজেদের পকেটে ঢোকাতে শুরু করে, ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের বসিয়ে রাষ্ট্রকে 'Nepotism' (স্বজনপ্রীতি) এর আখড়ায় পরিণত করে। অর্থাৎ যে কয়েকজন শিক্ষিত ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা সবাই কিছুদিন পর একটি সুযোগ-সন্ধানী (Self-seeking) গ্রুপে পরিণত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বরত এই শিক্ষিত গ্রুপটি যখন জনগণের কল্যাণের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের, নিজ পরিবারের, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের স্বার্থে (Self-interests) কাজ করা শুরু করে তখন তাদেরকে বলা হয় Oligarchy বা গোষ্ঠীতন্ত্র। এক কথায় অলিগার্কি হলো অভিজাততন্ত্রের বিকৃত (Perverted) রূপ।
৫. Polity বা বহুজনের শাসন: রাষ্ট্রের জনগণ যখন দেখল যে, একজন রাজা কিছুদিনের মধ্যে বিকৃত হয়ে স্বৈরশাসক হয়ে যায়। একই ভাবে অল্প কয়েকজন শিক্ষিত ও অভিজাত মানুষের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে তারাও কয়েকদিন ঠিক থেকে পরবর্তীতে স্বার্থান্বেষী গ্রুপে পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্রের নাগরিকরা ভাবতে শুরু করে কাদেরকে বা কতজনকে রাষ্ট্র শাসন করার দায়িত্ব দিলে ভালোভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে? নাগরিকরা ভেবে দেখল যদি গরিবদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসানো হয় তাহলে ক্ষমতা পেয়ে গরিবরা হয়ে উঠবে অর্থলোভী। আবার যদি ধনীদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসাই তাহলে ধনীরা হয়ে উঠবে অহংকারী এবং স্বেচ্ছাচারী। ধনীরা গরিবদের চাহিদা বুঝবে না এবং গরিবরাও ধনীদের চাহিদা বুঝবে না। তাই ধনী এবং গরিব এদেরকে ক্ষমতায় না বসিয়ে রাষ্ট্রের যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদেরকে ক্ষমতায় বসালে রাষ্ট্র ভালো চলবে। কারণ মধ্যবিত্তরা ধনীদের চাহিদাও বুঝতে পারবে এবং গরীবের চাহিদাও বুঝতে পারবে। একই ভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গরিবদের মতো অর্থলোভীও হয়ে উঠবে না এবং ধনীদের মতো স্বেচ্ছাচারীও হয়ে উঠবে না। তাই সবাই মিলে ঠিক করল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব শুধু একজন কিংবা একটি শিক্ষিত গ্রুপের হাতে নয় বরং রাষ্ট্রের যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের হাতে দেওয়া হবে। যেহেতু একমাত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণিই পারবে ধনী ও গরিবদের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে; তাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে। আর মধ্যবিত্তের রাষ্ট্র পরিচালনার এই সিস্টেমকেই বলা হয় Polity বা বহুজনের শাসন (Rule by Many)। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটল ভারসাম্য রক্ষাকারী মধ্যবিত্তের এই শাসনকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলেছেন।
৬. Democracy বা গণতন্ত্র: একটি রাষ্ট্রে তিন শ্রেণির নাগরিক থাকে- গরিব, মধ্যবিত্ত ও ধনী। পলিটি শাসনব্যবস্থায় আমরা দেখেছি রাষ্ট্র শাসন করবে শুধু মধ্যবিত্তরা। পলিটি সিস্টেমে যেহেতু মধ্যবিত্তরা রাষ্ট্রের ধনী ও গরিবদের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারত তাই একে সর্বত্তোম শাসনব্যবস্থা মনে করা হতো। কিন্তু সমস্যাটি হলো যারা আজকে মধ্যবিত্ত তারা কিন্তু সবসময়ই মধ্যবিত্ত থাকে না। ধনী, গরিব ও মধ্যবিত্ত- আর্থিক এই বিষয়গুলো সবসময় এক (Constant) থাকে না। কেউ ধনী থেকে গরিব হয়, কেউ গরিব থেকে ধনী হয়, কেউ মধ্যবিত্ত থেকে ধনী হয়, কেউ আবার গরিব থেকে মধ্যবিত্ত হয়। অর্থাৎ পলিটি শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের শাসকদের অনবরত পরিবর্তন হতে থাকে। কেউ হঠাৎ বাদ পড়ে যায়, কেউ আবার নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে একটি অরাজকতা দেখা দেয়। তাছাড়া রাষ্ট্রের কে মধ্যবিত্ত, কে গরিব, কে ধনী এসব নির্ণয় করাও কষ্টসাধ্য। তাই রাষ্ট্রের নাগরিকরা ভাবল যে ধনী, গরিব ও মধ্যবিত্ত এভাবে রাষ্ট্রের সকল জনগণের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি না করে বরং রাষ্ট্রের শাসনকার্যে রাষ্ট্রের সকল জনগণকেই অন্তর্ভুক্ত করি। রাষ্ট্রের সকল জনগণ মিলে রাষ্ট্র শাসন করাকেই বলা হলো Democracy বা গণতন্ত্র। মানুষ Polity শাসনকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করল। গণতন্ত্র হয়ে গেল ধনী, গরিব, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, যুবক, বৃদ্ধ সকলের মিলিত শাসন। তবে এরিস্টটল গণতন্ত্র নিয়েও খুশি হতে পারেননি। কারণ এরিস্টটল লক্ষ্য করলেন রাষ্ট্রের সকল জনগণ যখন তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে তখন আরেকটি সমস্যা দেখা দেবে। সেটি হলো রাষ্ট্রের সকল জনগণ কিন্তু রাজনীতি সচেতন নয়, রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত। তাই এসকল অসচেতন ও অশিক্ষিত মানুষ রাষ্ট্রের জন্য কোনটি ভালো হবে কিংবা কোনটি মন্দ এসব বুঝবে না। রাষ্ট্রের ভালো মন্দ বিবেচনা না করে তারা রাষ্ট্রের জন্য বিভিন্ন বিরূপ পলিসি গ্রহণ করবে। তাই এরিস্টটল গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন Mob Rule বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন হিসেবে।
এভাবেই যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে রাজতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র থেকে অভিজাততন্ত্র, অভিজাততন্ত্র থেকে গোষ্ঠীতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসন থেকে উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসনে এসে পৌঁছেছে।
আধুনিক রাষ্ট্রের গঠন (Modern State Formation)
রাষ্ট্র গঠনের উপরিউক্ত প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বিমূর্ত (Abstract)। অনেকটা বিমূর্ত ধারণা হলেও রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে আমরা অন্তত একটি মৌলিক ধারণা পেয়েছি। তবে এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, প্রাচীনকালে বিভিন্ন সভ্যতা ও নগররাষ্ট্র এভাবেই গড়ে উঠেছিল। ১৯০০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল মাত্র ৭৮টি (মতান্তরে ৭৭টি)। কিন্তু বর্তমানে মোট স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৫টি। তথা ১১৭টি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আধুনিককালে এসে রাষ্ট্রগুলো কীভাবে সৃষ্টি হলো?
বর্তমান জাতিরাষ্ট্রগুলো কীভাবে গঠিত হলো সেটি নিয়ে চার্লস টিলির (Charles Tilly) একটি অসাধারণ মত রয়েছে, যেটা 'Bellicose Theory' নামে পরিচিত। টিলির মতে, বর্তমানের আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো বলপ্রয়োগ, যুদ্ধ, সংগ্রাম ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম দুটি আলাদা রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে, কোরীয় যুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, সুদান থেকে আন্দোলন করে দক্ষিণ সুদান সৃষ্টি হয়েছে, স্পেনের সাথে যুদ্ধ করে ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো সৃষ্টি হয়েছে, ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ করে আফ্রিকার অধিকাংশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে, ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ করে এশিয়ার অধিকাংশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। চার্লস টিলির মতে, বর্তমান জাতিরাষ্ট্রগুলো যেন যুদ্ধ, সংঘাত ও বলপ্রয়োগেরই ফল।
আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা
আধুনিক গণতন্ত্র: গণতন্ত্র কীভাবে পরিমাপ করব? যেহেতু গণতান্ত্রিক শাসনে ধনী-গরিব নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেহেতু বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশ তাদের রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক সিস্টেমে কিছু ত্রুটি থাকবেই। কিছু ত্রুটির জন্য পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে না দিয়ে বরং ত্রুটিগুলো সংশোধন করাই শ্রেয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে অসচেতন থাকলেও আজকের একুশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রের নাগরিকরা পূর্বের মতো অশিক্ষিত নয়। শিক্ষার হার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক সচেতন। তাই এরিস্টটল গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ত্রুটি হিসেবে যে 'উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন' বলেছিলেন সেটা আর এখন নেই। কারণ বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন, রাজনৈতিক ডিবেট, জনসভা, মিছিল-মিটিং, প্রচারণা ইত্যাদির কল্যাণে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সকল ইস্যু নিয়ে জনগণের জানাশোনার পরিধি বাড়ছে। তাই বিশ্লেষকদের মতে একুশ শতকের গণতন্ত্র এবং এরিস্টটলের আমলের গণতন্ত্রের মধ্যে অনেক ফারাক। তাদের দাবি একুশ শতকের গণতন্ত্র হচ্ছে 'সচেতন জনতার শাসন'।
আলোচনার এই পর্যন্ত এসে 'গণতন্ত্র' শব্দটি আমাদের কাছে শুধু একটি ধারণা বা কনসেপ্ট মনে হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে একুশ শতাব্দীতে এসে গণতন্ত্রের বাস্তবতা বা প্রায়োগিক দিক কোনগুলো? পৃথিবীর যে দেশটিতে মোটেও গণতন্ত্র নেই অথচ সেই দেশের সরকার বলছে তার দেশে গণতন্ত্র আছে। একই ভাবে যে দেশটিতে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বিদ্যমান, সেই দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে তাদের দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্রকে আমরা একেকজন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কারণে গণতন্ত্র মূলত কী সেটা নিয়ে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাই একটি দেশে গণতন্ত্র আছে নাকি নেই তা পরীক্ষা করার জন্য আমরা মোট পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করতে পারি। নিচে উল্লিখিত এই পাঁচটি মানদণ্ডের সবগুলো যদি সমানভাবে একটি রাষ্ট্রে বিদ্যমান থাকে শুধু তখনই আমরা বলব সে রাষ্ট্রে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র আছে। আর যদি কোনো একটি রাষ্ট্র নিচের পাঁচটি মানদণ্ডের সবগুলো পূরণ করতে না পারে তাহলে ধরে নেব সে রাষ্ট্রে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নেই।
১. Periodic Election (নিয়মিত নির্বাচন): গণতন্ত্র পরীক্ষা করার জন্য আমরা সর্বপ্রথম দেখব একটি রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট কয়েকবছর পরপর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কি না। যেহেতু প্রতিটি দেশের নির্বাচন কমিশন সে দেশের নির্বাচন আয়োজন করে তাই নির্বাচন কমিশনগুলোকে নিরপেক্ষ থাকা প্রধান শর্ত। নির্বাচন কমিশন কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বন করতে পারবে না।
২. Institutional Independence (প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা): প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ নামে তিনটি রাজনৈতিক অঙ্গ রয়েছে। আইন বিভাগের কাজ রাষ্ট্রের জন্য আইন তৈরি করা, শাসন বিভাগের কাজ সেই আইনগুলো বাস্তবায়ন করা এবং বিচার বিভাগের কাজ সেই আইনগুলো কেউ না মানলে কিংবা ভঙ্গ করলে তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। অর্থাৎ এই তিনটি বিভাগ স্বাধীনভাবে চলবে। বিচার বিভাগের উপর সরকারি দল, বিরোধী দল, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা কেউ প্রভাব খাটাতে পারবে না। সে প্রেসিডেন্ট হোক কিংবা বিরোধী দলের হোক রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করলে বিচার বিভাগ তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবে। তাই গণতন্ত্র পরীক্ষা করার জন্য দেখতে হবে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অঙ্গ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না।
৩. Secularism (ধর্মনিরপেক্ষতা): প্রথমেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। সেকুলারিজম আমাদের কাছে দুইভাবে উপস্থাপিত হয়। এক. একটি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে ধর্ম মানা এবং না মানার স্বাধীনতা। দুই. রাষ্ট্রের যে-কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য না দেওয়া। এবার আসি মূল কথায়। একটি রাষ্ট্রের সকল জনগণ শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী নয়। অর্থাৎ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান মোটামুটি সকল ধর্মের মানুষই একটি রাষ্ট্রে বসবাস করে। তাই ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের উপর কোনো বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না। ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান। যদি রাষ্ট্রে এরকম কোনো নিয়ম থাকে যে, কেউ হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলে সে প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না, কেউ ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলে সে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না, তাহলে বুঝতে হবে গণতন্ত্রের মানদণ্ডে সে দেশে গণতন্ত্র নেই।
৪. Pluralism (বহুত্ববাদ): গণতন্ত্রের মানদণ্ডে এই বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে এই 'Pluralism' ধারণাটি খুবই প্রভাবশালী। প্লুরালিজমের বাংলা হলো বহুত্ববাদ। সেকুলারিজম থেকে এই বহুত্ববাদের ধারণাটি একটু ব্যাপক। সেকুলারিজম হচ্ছে শুধু ধর্মকেন্দ্রিক। আর Pluralism এর মানে হলো ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই সমান। অর্থাৎ বহুত্ববাদ ধর্ম-সহ অন্যান্য সকল বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ধর্ম ছাড়াও পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ আমরা পাব না যেটি একক জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি দেশই গঠিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি জাতিসত্তা নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ- আজকের আধুনিক সিঙ্গাপুর গঠিত হয়েছে চাইনিজ, মালয়, ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান এই চারটি প্রধান জাতি নিয়ে। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে তিনটি ডমিনেন্ট জাতিসত্তা- মালয়, ইন্ডিয়ান ও চাইনিজ। যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, হিস্প্যানিক আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান ও এশিয়ান আমেরিকান। ভারত হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ইত্যাদি জাতিসত্তা নিয়ে গঠিত।
একটি দেশের মোট জনসংখ্যার সবচেয়ে বেশি পপুলেশন যে জাতিসত্তাটি প্রতিনিধিত্ব করে সেই জাতিসত্তাটিই ঐদেশের সংখ্যাগুরু (Majority Group)। আর বাকিরা হলো সংখ্যালঘু (Minority Group)। যেমন- বাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি। তাই মুসলমানরা হলো বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু, আর হিন্দুরা যেহেতু মুসলমানদের তুলনায় অনেক কম তাই বাংলাদেশের হিন্দুরা হলো সংখ্যালঘু। তেমনি ভারতে হিন্দুরা হলো সংখ্যাগুরু (Majority) কিন্তু মুসলিমরা সংখ্যালঘু (Minority)। যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট বা শ্বেতাঙ্গরা হলো সংখ্যাগুরু কিন্তু ব্ল্যাকরা সংখ্যালঘু। আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগুরু কিন্তু মুসলমানরা সংখ্যালঘু। এখন কথা হচ্ছে গণতন্ত্র পরিমাপ করতে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু এর হিসেবটা কী?
কারণ হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচনে জয়ী হয়ে একজনকে ক্ষমতার চূড়ায় আসতে হয়। আর নির্বাচনে জয়ী হতে সম্পূর্ণ ১০০% ভোটের প্রয়োজন নেই, মেজরিটি বা ৫০% এর একটু বেশি ভোট পেলেই হয়। তাই দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ যে জাতিসত্তায় রয়েছে সেটিকে লক্ষ্য করেই আপনি এই পঞ্চাশ শতাংশ ভোট সহজে পেতে পারেন। যেমন, CIA Factbook এর তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৭৬.৩%, ভারতে হিন্দু জনগোষ্ঠী ভারতের মোট জনসংখ্যার ৭৯.৮%, আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার ৫৬.১% রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অন্যসব মাইনোরিটি জনগোষ্ঠী বাদ দিয়ে শুধু শ্বেতাঙ্গদের লক্ষ্য করে রাজনীতি করেই আপনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন। কেননা শুধু শ্বেতাঙ্গরা ভোট দিলেই আপনার ভোট ৫০ পারসেন্ট এর উপরে হয়ে যাবে। একই ভাবে ভারতের বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান এসব জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে শুধু হিন্দুদের ভোট পেলেই আপনি ৫০ পারসেন্টের বেশি ভোট পেয়ে যাবেন।
তাই একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিবিদরা প্রথমে তাদের দেশের এই সংখ্যাগুরু জনসংখ্যাকে টার্গেট করে এবং তাদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে, যেটিকে আমরা "Populism" হিসেবে চিনি। এই পপুলিজমের মানে হলো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ৫০% ভোট পাওয়ার জন্য সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে বেশি প্রায়োরিটি দেয়। অর্থাৎ পপুলিজমের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মাইনোরিটি সম্প্রদায়গুলোকে উপেক্ষা করা হয়। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিবিদরা অনেকসময় ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করায়। কৌশল হিসেবে এসব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে সংখ্যাগুরু গোষ্ঠী থেকে সমর্থন আদায় করে নেয়। এসব রাজনীতিবিদরা সংখ্যাগুরু বা মেজরিটি জাতিসত্তার মানুষদের বোঝায়, দেখো আমরা সংখালঘুদের থেকে ভিন্ন ও শ্রেষ্ঠ। এভাবে তারা একটি দেশের সকল জনগণের মধ্যে 'আমরা বনাম তারা' অর্থাৎ 'We vs They' সৃষ্টি করে। যেটিকে আমরা রাজনীতির ভাষায় "বাইনারি অপজিশন” বলি। ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে এবং যুক্তরাজ্যের বরিস জনসন ব্রেক্সিট ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এভাবে একটি নির্দিষ্ট আইডেন্টিটির জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে (Solitarist Approach) রাজনীতি করাকে অমর্ত্য সেন "Identity Politics" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মোটকথা হলো একটি রাষ্ট্রে রাজনীতি ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে যদি Populism, Binary Opposition ও Identify Politics এর উত্থান হয় তাহলে বুঝতে হবে সে দেশে গণতন্ত্র নেই। পপুলিজম, বাইনারি অপজিশন এবং আইডেন্টিটি পলিটিক্স এর কারণে পুরো রাষ্ট্রটি তখন সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু নামে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। রাষ্ট্রের যে বহুত্ববাদ আইডিয়াটি অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই একসাথে মিলেমিশে এবং শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে সেটি আর সম্ভব হয় না। তখন একটি রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এজন্য গণতন্ত্রের জন্য Pluralism (বহুত্ববাদ) আবশ্যক।
৫. Constitutionalism (সংবিধানের প্রতি আনুগত্য): গণতন্ত্র পরিমাপ করার জন্য পঞ্চম ও সর্বশেষ মানদণ্ডটি হলো সংবিধান মেনে চলা। দেখতে হবে রাষ্ট্রের যে সংবিধানটি আছে সেই সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র চলছে কি না। এই 'Constitutionalism' এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মিছিল-মিটিং-জনসভা করার স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ইত্যাদি।
উপরিউক্ত এই পাঁচটি মানদণ্ড দিয়েই আমরা বিশ্বের সকল দেশের গণতন্ত্র পরিমাপ করতে পারি। উল্লেখ্য, একটি দেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই সেটি বোঝার জন্য অন্য অনেক পদ্ধতি থাকলেও উপরিউক্ত পাঁচটি মানদণ্ড দিয়েই আমরা সহজে অনুধাবন করতে পারি। কয়েকটি বৈশ্বিক উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও প্রায়োগিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
উদাহরণ (০১): ইসরায়েল
১. Periodic Election: ইসরায়েলে প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয় (√)।
২. Institutional Independence: ইসরায়েলের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ-সহ সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করে (√)।
৩. Secularism: ইসরায়েল সেকুলারিজমে বিশ্বাসী নয়। ইসরায়েল একটি জাতিরাষ্ট্র যাদের আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ইহুদি ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে (X)।
৪. Pluralism: ইসরায়েলে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তেমন দ্বন্দ্ব দেখা যায় না (√)।
৫. Constitutionalism: ইসরায়েলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা কিংবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সবই আছে (√)।
মূল্যায়ন: ইসরায়েল রাষ্ট্রটি গণতন্ত্র পরিমাপের পাঁচটি মানদণ্ডের মধ্যে চারটিই পূরণ করতে পেরেছে। কিন্তু তিন নাম্বার মানদণ্ডটি (Secularism) পূরণ করতে পারেনি। তাই ইসরায়েল একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ নয়। আবার ইসরায়েল একেবারেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় সেটাও বলা যাবে না। যেহেতু তারা পাঁচটির মধ্যে চারটি মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে।
উদাহরণ (২): ইরান
১. Periodic Election: ইরানে প্রতি পাঁচ বছর পরপর প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন হয় (√)।
২. Independent Institutions: ইরানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন নয়। কারণ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কারা হবে সেটি বাছাই করেন সুপ্রিম লিডার নিজে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সেই প্রেসিডেন্ট কাজ করেন সুপ্রিম লিডারের অধীনে। ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অর্ধেক সদস্যকে নির্বাচিত করেন সুপ্রিম লিডার আর অর্ধেক নির্বাচন করেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতিকে আবার নির্বাচিত করেন সুপ্রিম লিডার। এক কথায়, ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন নয় (X)।
৩. Secularism: ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে হলে অবশ্যই তাকে মুসলমান হতে হবে। কোনো অমুসলিম ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ইরান সেকুলার রাষ্ট্র নয় (X)।
৪. Pluralism: ইরানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি সম্পর্কিত তেমন কোনো দ্বন্দ্ব নেই। নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে বসবাস করার চেষ্টা করে (√)।
৫. Constitutionalism: ইরান অনেকাংশে সংবিধান মেনে চলে (√)।
মূল্যায়ন: ইরান গণতন্ত্র পরিমাপের পাঁচটি মানদণ্ডের মোট তিনটি পূরণ করতে পেরেছে, আর দুইটি পারেনি। তাই ইরানের গণতন্ত্রও পূর্ণাঙ্গ নয়।
ইরানের মতো উত্তর আফ্রিকার একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ তিউনিসিয়ার সংবিধানেও বলা আছে যে, তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে হলে তাকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। আশাকরি গণতন্ত্র পরীক্ষা করার বিষয়টি এখন সবার কাছে পরিষ্কার। এভাবে উপরিউক্ত পাঁচটি মানদণ্ড ব্যবহার করে একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে মূল্যায়ন করা যাবে। যে-সকল দেশে শুধু নির্বাচন হয় (Periodic Election) কিন্তু বাকি চারটি মানদণ্ড পূরণ করে না, সেসমস্ত দেশের গণতন্ত্রকে বলা হয় Electoral Democracy বা নির্বাচনি গণতন্ত্র (সিরিয়ার গণতন্ত্র)। আর যে-সকল দেশ গণতন্ত্র পরিমাপের উপরিউক্ত পাঁচটি মানদণ্ডের সবগুলোই রক্ষিত হয় সেসমস্ত দেশের গণতন্ত্রকে বলা হয় Liberal Democracy বা উদার গণতন্ত্র (কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের গণতন্ত্র)।
State Mechanism বা রাষ্ট্রযন্ত্র
বিভিন্ন দেশের জাতীয় রাজনীতির সমন্বয়ে মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি গড়ে ওঠে। জাতীয় রাজনীতিতে (National Politics) পরিবর্তন আসলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। উদাহরণস্বরূপ- যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে যখন ডেমোক্রেটিক দল ক্ষমতায় আসে তখন বিশ্ব রাজনীতিটি হয় কূটনীতিময় (যেমন- ওবামা, বাইডেন শাসন)। আর যখন রিপাবলিকান দল ক্ষমতায় আসে তখন বিশ্ব রাজনীতিটি হয়ে ওঠে মিলিটারিস্টিক ও আক্রমণাত্মক (যেমন-রোনাল্ড রিগ্যান, জর্জ ডব্লিউ বুশের শাসন)। একই ভাবে ব্রিটেনে যখন কনজার্ভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় আসে তারা এক ধরনের ফরেইন পলিসি গ্রহণ করে, আর লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলে আরেক ধরনের ফরেইন পলিসি গ্রহণ করে থাকে। অর্থাৎ বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন ঘটলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পরিবর্তন আসে।
যেমন- বাংলাদেশে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন তারা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করেছে। আর আওয়ামী লীগ সবসময় চেষ্টা করে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে। এবার সংক্ষেপে বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করব কীভাবে একটি দেশের সরকারি দল ও বিরোধী দল তৈরি হয়, কাদের নিয়ে একটি দেশের সংসদ গঠিত হয়, বিভিন্ন দেশগুলোতে কারা আইন তৈরি করে এবং কারা আইনগুলো বাস্তবায়ন করে। নিচে দেওয়া বাংলাদেশের উদাহরণটি বুঝতে পারলেই আপনি পৃথিবীর যে-কোনো দেশের জাতীয় রাজনীতি (National Politics) কিছুটা বুঝতে পারবেন।
Representative Democracy (প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র)
গণতন্ত্রকে বলা হয় জনগণের শাসন। গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের। রাষ্ট্রের আইন তৈরি করবে জনগণ। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। রাষ্ট্র চলবে জনগণের ইচ্ছায়। এখন ধরুন বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা সতেরো কোটি। এই সতেরো কোটি জনগণ তো আর একসাথে একটি জায়গায় মিলিত হয়ে আইন তৈরি করতে পারবে না, কিংবা একসাথে বসে আলোচনাও করতে পারবে না এবং সিদ্ধান্তও নিতে পারবে না। ঠিক এই কারণে পুরো বাংলাদেশকে ৩০০টি নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেক নির্বাচনি অঞ্চল থেকে ঐ অঞ্চলের জনগণ ভোটের মাধ্যমে একজন করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। সবগুলো অঞ্চলের নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরা যে জায়গাটিতে মিলিত হয় সেই জায়গাটির নাম হলো পার্লামেন্ট বা সংসদ। নির্বাচিত এই প্রতিনিধিরাই সংসদে গিয়ে নিজ অঞ্চলের সকল জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণের নির্বাচিত এই প্রতিনিধি তার নিজ অঞ্চলের সকল মানুষের কথাগুলো সংসদে গিয়ে উত্থাপন করে। নিজ অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজনীয়তা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে গিয়ে ব্যাখ্যা করে। প্রতিনিধি নির্বাচনের এই সিস্টেমকে বলা হয় 'Representative Democracy'। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, বাংলাদেশ, জাপান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি প্রায় সকল দেশেই এই 'Representative Democracy' সিস্টেমটি রয়েছে।
সরকারি দল ও বিরোধী দল
এখন এই ৩০০টি নির্বাচনি এলাকার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে ৩০০ জন প্রতিনিধি নির্বাচনে দাঁড়ায় এবং একই ভাবে বিএনপি থেকেও ৩০০ জন প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বোঝার স্বার্থে মনে করুন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোট ৩০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২০০ জন জয়ী হলো এবং বিএনপির মোট ৩০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০০ জন জয়ী হলো। আওয়ামী লীগের বিজয়ী এই দুইশো জন এবং বিএনপির বিজয়ী এই একশো জন হলো বাংলাদেশের পার্লামেন্টের সদস্য। যেহেতু আওয়ামী লীগ মেজোরিটি আসন (২০০টি) পেয়েছে, তাই আওয়ামী লীগ হলো বিজয়ী বা সরকারি দল, আর বিএনপি হলো বিরোধী দল।
পার্লামেন্ট বা সংসদ
আওয়ামী লীগ থেকে বিজয়ী ঐ ২০০ জন প্রতিনিধি এবং বিএনপি থেকে বিজয়ী ঐ ১০০ জন তথা মোট ৩০০ জন নিয়ে সংসদ গঠিত হয়। এই ৩০০ জনকে বলা হয় এমপি (Member of Parliament-MP)। তিনশো জনের এই সংসদটিকেই বলা হয় রাষ্ট্রের আইন বিভাগ (Legislative Branch)। কারণ সংসদ সদস্যরা এই সংসদে বসেই রাষ্ট্রের যাবতীয় আইন তৈরি করে। যেহেতু সংসদের তিনশো জনের মধ্যে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরাই আছেন, তাই সংসদের এই সরকারি ও বিরোধী দলের সকল সদস্যরাই হলেন এই আইন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই ৩০০ জন ভোটাভুটির মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে একজনকে সংসদের স্পিকার নির্বাচন করে। যেহেতু সংসদের দুইশো জনই সরকারি দলের তাই স্পিকার সাধারণত সরকারি দল থেকেই বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ যেহেতু বিজয়ী দল তাই আওয়ামী লীগের যিনি দলনেতা তিনি হন প্রধানমন্ত্রী। তারপর প্রধানমন্ত্রী তার নিজ দলের ঐ দুইশো জন প্রতিনিধিদের মধ্যে থেকে যারা খুবই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তাদের মধ্য থেকে ৪০ বা ৪৫ জনকে মন্ত্রী বানান। প্রধানমন্ত্রী ও তার সকল মন্ত্রীরা হলেন রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ (Executive Branch)। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে শাসন বিভাগ বলা হয়; তাই মূলত সরকারি দলই শাসন বিভাগের অন্তর্ভুক্ত।
বিল ও আইন
বিল হচ্ছে কোনো একটি আইনের প্রাথমিক খসড়া। মনে করুন বাংলাদেশে এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণরা ক্রমাগত মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই এখন আপনি এরকম একটি আইন করতে চাচ্ছেন যে, "যে-সকল তরুণরা মাদকাসক্ত হবে তারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না"। তখন এটি আপনাকে সংসদে উত্থাপন করতে হয়। তারপর সংসদের তিনশো জন সদস্য এটি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে ডিবেট করে, আলোচনা করে। দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর সবার মধ্যে একটি ভোটাভুটি হয়। যদি তিনশো জন সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই এটির পক্ষে মত দেয় তাহলে এই বিলটি সংসদে পাশ হয়। সংসদে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি বিলটিতে একটি স্বাক্ষর দিয়ে দেয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর বিলটি চূড়ান্ত আইনে পরিণত হয়। অর্থাৎ কোনো একটি প্রস্তাবকে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিল বলা হয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর সেটি আইনে পরিণত হয়।
সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা (আইন বিভাগ) আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি আইন তৈরি করে। সেই আইন প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা (শাসন বিভাগ) আমলাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করে। ধরুন "মাদকাসক্ত তরুণরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না" এটি আইন হিসেবে বাস্তবায়ন হয়ে গিয়েছে। এখন একজন মাদকাসক্ত তরুণ যদি বিভিন্ন তদবির, উৎকোচ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে তাহলে সেটি হবে আইনের লঙ্ঘন। মাদকাসক্ত তরুণের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের মাধ্যমে আইন ভঙ্গ করায় আদালত তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসবে। আদালত তাকে জেল-জরিমানা যা করার দরকার তাই করবে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রিম কোর্ট। এই সুপ্রিম কোর্ট বা আদালতকেই বলা হয় বিচার বিভাগ (Judiciary Branch)।
উপরিউক্ত এই সিস্টেমের আলোকেই প্রায় সকল দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ফাংশন করে। বাংলাদেশকে ৩০০টি নির্বাচনি অঞ্চলে ভাগ করায় বাংলাদেশের সংসদের নির্বাচিত আসন সংখ্যাও যেমন ৩০০টি। তেমনি ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪৩৫টি নির্বাচনি এলাকায় ভাগ করায় যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যাও ৪৩৫টি (House of Representatives)। একই ভাবে যুক্তরাজ্যকে ৬৫০টি নির্বাচনি অঞ্চলে ভাগ করায় যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যা ৬৫০টি (House of Commons)।
Power Division বা ক্ষমতার বিভাজন
ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, জাপান, যুক্তরাজ্যের মতো পৃথিবীর অনেক দেশ প্রধানমন্ত্রীর অধীনে চলে। আবার যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, তুরস্ক, পেরুর মতো অনেক দেশ প্রেসিডেন্টের অধীনে চলে। তাই প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর এই বিষয়টি বুঝতে আমাদের আরও কয়েকটি টার্ম জানতে হবে।
১. Presidential Form of Government (প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার): সাধারণত প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রেসিডেন্ট নিজে। কখনো কখনো প্রেসিডেন্টের সহকারী হিসেবে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট অথবা একজন প্রধানমন্ত্রী থাকলেও তাদের তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। ভাইস প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় প্রেসিডেন্টের কথামতোই চলতে হয়। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকলেও তাকে প্রেসিডেন্ট এর কথামতো চলতে হয়। এই প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশগুলোতে মিলিটারিদের কমান্ডার-ইন-চিফ হলেন প্রেসিডেন্ট নিজে। মিলিটারিরা রানিং প্রেসিডেন্ট এর নির্দেশানুসারে পরিচালিত হয়।
২. Parliamentary Form of Government (প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার): একই ভাবে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রেসিডেন্ট থাকলেও প্রেসিডেন্ট এর তেমন কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। যেমন- বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে। পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রেসিডেন্ট থাকলেও তার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর কথামতো প্রেসিডেন্টকে চলতে হয়। এই প্রধানমন্ত্রী শাসিত দেশগুলোর মিলিটারিদের কমান্ডার ইন চিফ হলেন প্রধানমন্ত্রী। মিলিটারিরা রানিং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশানুসারে পরিচালিত হয়। এক কথায়, উপরের এই দুইটি পদ্ধতির প্রথমটিতে প্রেসিডেন্ট এবং দ্বিতীয়টিতে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থাকেন।
৩. Dual Executive System (অর্ধেক প্রেসিডেন্ট ও অর্ধেক প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার): প্রেসিডেন্ট শাসিত এবং প্রধানমন্ত্রী শাসিত উপরিউক্ত এই দুইটি সিস্টেমের বাহিরে গিয়ে বিশ্বের কিছু কিছু দেশ তাদের সংবিধানে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে যেখানে শুধু একজন নয় বরং প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট উভয়েই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অর্ধেক প্রেসিডেন্ট নিয়ন্ত্রণ করবে, আর বাকি অর্ধেক প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে। এখানে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের মাঝে একটি ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা হয়। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রায় সমান ক্ষমতার এই সিস্টেমকে বলা হয় Dual Executive System বা Semi Presidential System বা হাইব্রিড সিস্টেম। ফ্রান্স ও তিউনিসিয়ায় এই হাইব্রিড সিস্টেম রয়েছে। তাই তিউনিসিয়া ও ফ্রান্স এই দুটি দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ই অনেক ক্ষমতাবান।
“Semi Presidential” এই ফ্রেইজটা দেখেই মনে রাখা যায় যে, অর্ধেক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে, আর বাকি অর্ধেক প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সেমি প্রেসিডেনশিয়াল এই সিস্টেমে মিলিটারিদের কমান্ডার-ইন-চিফ শুধু প্রেসিডেন্ট। যে-কারণে তুলনামূলক ভাবে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা একটু বেশি। Semi Presidential System এর এই ধারণাটি ১৯৭৮ সালে সর্বপ্রথম পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট মাউরিস দোভার্জার এর মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করে। দোভার্জারের মতে প্রেসিডেন্ট যেহেতু একটি রাষ্ট্রের প্রধান তাই তাকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসা উচিত এবং প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সরকার প্রধান তাই তিনিও পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে আসাটাই বাঞ্ছনীয়।
Islamic Republic (ইসলামি প্রজাতন্ত্র)
ইসলামি নিয়ম বা শরিয়া আইনে পরিচালিত হয় এমন গণতান্ত্রিক দেশকে বলা হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এই ইসলামি প্রজাতন্ত্র রয়েছে সারা বিশ্বে মাত্র তিনটি। ১. বিশ্বের প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২. দ্বিতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৫৮ সালে মৌরিতানিয়া নিজেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। ৩. ইরান তৃতীয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ১৯৭৯ সালে পাহলভী রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইরানিয়ান রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপ নেয়। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে তালেবান সরকারের পতনের পর আফগানিস্তান নতুন এক সংবিধান প্রণয়ন করে। সেখানে আফগানিস্তানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান ইসলামি রিপাবলিকের অধীনে ছিল। তালেবানরা নতুন করে ক্ষমতা দখল করায় আফগানিস্তান এখন ইসলামি আমিরাত হিসেবে পরিচিত। গাম্বিয়া, কমেরুস, ইস্ট তার্কিস্তান এরাও অতীতে ইসলামি রিপাবলিক ছিল কিন্তু বর্তমানে নেই।
ইসলামিক রাজতন্ত্র (Islamic Monarchy)
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সাথে ইসলামি রাজতন্ত্রের কিছু পার্থক্য রয়েছে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে নামে মাত্র হলেও গণতন্ত্র আছে। এখানে গণতন্ত্র বলতে লিবারেল ডেমোক্রেসিকে বোঝাচ্ছি না। এসব ইসলামি প্রজাতন্ত্রগুলোতে রয়েছে নির্বাচনি গণতন্ত্র (Electoral Democracy)। গণতন্ত্রের সকল বৈশিষ্ট্য না থাকলেও দেশগুলোতে নিয়মিত নির্বাচন হয়। ইরান, পাকিস্তান ও মৌরিতানিয়াতে নিয়মিত নির্বাচন হয়। অন্যদিকে ইসলামিক রাজতন্ত্রকে ইংরেজিতে 'Islamic Monarchy' বলা হয়। ইসলামিক মোনার্কি বা রাজতন্ত্র এমন একধরনের সরকার সেখানে ইসলামিক বা শরিয়া আইন আছে বটে কিন্তু দেশ পরিচালিত হয় রাজার মাধ্যমে। ইসলামি রাজতন্ত্রে কোনো নির্বাচন নেই। বংশপরম্পরায় শাসকরা ক্ষমতায় আসে। বিশ্বে "Islamic Monarchy" এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, মরক্কো, জর্ডান ইত্যাদি দেশগুলো।
রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠিত হয়?
আমরা এটিকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। সোসাইটিতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিভাজন থাকে। গ্রামীণ সম্প্রদায়, শহুরে সম্প্রদায়, ধনিক সমাজ, বাঙালি, চাকমা, হিন্দু-মুসলিম, কৃষক সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ইত্যাদি বিভাজনে সমাজ বিভক্ত। এই সম্প্রদায়গুলোকে টার্ম হিসেবে 'Social Cleavage' বলা হয়। এখন কোনো একটি সোশ্যাল ক্লিভেজ যদি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব (Representative) থেকে বাদ পড়ে যায়, তখন তারা একত্রিত হয়ে দল গঠন করে। এটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল গঠনের 'Behavioral' বা ইউরোপিয়ান থিওরি। একটি উদাহরণ দেই- ধরুন চাকমা সম্প্রদায় দেখল যে, সংসদে তাদের হয়ে কেউ কথা বলে না, সেখানে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই, তাদের অধিকার নিয়ে কেউ আওয়াজ তুলে না। তখন তারা নিজেদের অধিকার রক্ষার্থে সবাই একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। এটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে 'European Theory' এর মূল বক্তব্য।
রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে American Theory আবার ভিন্ন কথা বলছে। তারা বলছে, সোশ্যাল ক্লিভেজের উপর রাজনৈতিক দল নির্ভর করে না। এটি গড়ে ওঠে 'Leadership' এর উপর ভিত্তি করে। একজন মানুষ একা বা নিজের নামে সোসাইটির সকল মানুষকে একত্রিত করতে পারে না, তাই সে দল গঠন করে 'Self Interest' পূরণ করতে। দলের নাম ঠিক থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে সে তার 'Interests' পরিবর্তন করার মাধ্যমে জনগণকে তার প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। দল গঠনের সময় তার প্রাথমিক যে মতাদর্শ ছিল সেটি থেকে সে সরে আসে। তাই কখনো বামপন্থিদের সাথে, কখনো ডানপন্থিদের সাথে দলটি জোট গঠন করে। রাজনৈতিক দল জনগণের 'Needs' নিয়ে কাজ করে না বরং পার্টি জনগণের 'Needs' গুলো দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জনগণেকে তাদের দিকে Mobilize করায়। একটি উদাহরণ দেই- Climate Change কী এটি অনেকে জানেই না। আমি জনগণকে এটি ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছি যে, এটিও তোমার 'Interest'। কুড়িগ্রামের মাঝবয়সি একজন সম্মানিত কৃষক জানে না জলবায়ু পরিবর্তন আসলে কী। আমি গিয়ে তাকে বললাম, “চাচা, এই যে পানির অভাব এবং খরার কারণে ফসল ফলছে না, এটাই জলবায়ু পরিবর্তন। আমাকে ভোট দিলে আমি পানির ব্যবস্থা করে দিব।” তখন চাচা বলবে, "আসলেই তো তাই! হ্যাঁ, আমি এখন থেকে আপনার দলে।” রাজনৈতিক দল গঠনে আমেরিকান থিওরিটা Rational বা যৌক্তিক। দল তাদের ইন্টারেস্ট জনগণকে এমনভাবে বলে জনগণ মনে করে সেটা তো তাদেরই Interest বা স্বার্থ।
রাজনৈতিক দল গঠনে American Theory'টি অনেকটা বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি রান্না করার মতো। ধরুন মেসে আজকে আমার রান্না করার পালা। আমার ব্যক্তিগতভাবে খিচুড়ি পছন্দ এবং এটি রান্না করাও সহজ। আজকে বৃষ্টি। আমি কাউকে না বলে অথবা সবাইকে জিজ্ঞেস না করে খিচুড়ি রান্না করে বললাম- "বন্ধুরা, আজকে তো বৃষ্টি তাই খিচুড়ি রান্না করে ফেললাম।” তখন সবাই মনে করবে- “ও আচ্ছা যেহেতু বৃষ্টি তাই খিচুড়ি রান্না করে ভালোই করেছিস।” কিন্তু রান্না করার শুরুতে সবাইকে জিজ্ঞেস করলে অনেকে হয়তোবা রাজি হতো না। অর্থাৎ নিজের পছন্দকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যেন ওটাই সবার পছন্দ। আর এটাই লিডারশিপ। আমেরিকান থিওরির মতে, দল লিডারশীপের উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। একই 'Social Cleavage' কে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে তখন আরেকজন 'Rival' বা প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়ে ঐ জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণও তার দিকে শিফট করে। এজন্য দেখা যায় দল বারবার ভেঙে যাচ্ছে, দলের কিছু সদস্য বের হয়ে নতুন আরেকটি দল গঠন করছে, অন্য মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু মানুষ আবার আমার দলে এসে যোগ দিচ্ছে।
Question to think about? রাজনৈতিক দল গঠনে Behavioural Theory (ইউরোপিয়ান) এবং Rational Theory (আমেরিকান) এই দুটি তত্ত্ব আমরা জানার চেষ্টা করেছি। এখন প্রশ্নটি হচ্ছে, সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দল গঠনের ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান থিওরিটি নাকি আমেরিকান থিওরিটি বেশি প্রাসঙ্গিক? এবং কেন?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Diamond, Larry and Plattner, Marc F. (2015), Democracy in Decline? (A Journal of Democracy Book), Johns Hopkins University Press
2. Zakaria, Fareed (2007), The Future of Freedom: Illiberal Democracy at Home and Abroad, W. W. Norton & Company
3. Dobson, William J. (2013), The Dictator's Learning Curve: Inside the Global Battle for Democracy, Anchor
4. Caputo, Nicholas (2005), America's Bible of Democracy: Returning to the Constitution, Sterling House Publisher
5. Emerson, Peter (2012), Defining Democracy, Springer
6. Fuller, Roslyn (2015), Beasts and Gods: How Democracy Changed Its Meaning and Lost its Purpose, London: Zed Books