📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 নয়া বিশ্বব্যবস্থা

📄 নয়া বিশ্বব্যবস্থা


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা থিংকট্যাংকরা নড়েচড়ে বসল। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা বলল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন মানে সমাজতন্ত্রের পতন। তাঁর মতে সমাজতন্ত্র বিশ্বব্যবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি, তাই এর পতন হয়েছে। অন্যদিকে ক্যাপিটালিজম জয়ী হয়েছে। যেহেতু পুঁজিবাদের জয় হয়েছে তার মানে পুঁজিবাদ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার সাথে মানানসই। এতদিন সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল তার অবসান ঘটল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে। এখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো আর কোনো মতাদর্শ (Ideology) অবশিষ্ট নেই। তাই ইতিহাসের সমাপ্তি হলো। ফুকোয়ামা এটার নাম দিয়েছে "The End of History” বা ইতিহাসের সমাপ্তি। ইতিহাসের সমাপ্তি বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, পৃথিবীতে পুঁজিবাদের চেয়ে উত্তম কোনো মতাদর্শ আর আসবে না। পুঁজিবাদই সেরা। আর এখন থেকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ১৯৯১ সাল থেকে পুরো বিশ্বব্যবস্থার হর্তাকর্তা হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র। এভাবে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা নতুন এই বিশ্বব্যবস্থাকে নাম দেওয়া হলো New-World Order তথা নয়া বিশ্বব্যবস্থা।

কীভাবে চলবে নয়া এই বিশ্বব্যবস্থা

তারপর ইন্টেলেকচুয়াল অঙ্গনে প্রশ্ন উঠল কীভাবে চলবে নয়া বিশ্বব্যবস্থা? ফুকোয়ামা বলল বিশ্ব চলবে গণতন্ত্র ও ক্যাপিটালিজমের উপর ভিত্তি করে। জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস এর অনুসারীরা বলল ফুকোয়ামার সাথে আমরা একমত নই। তারা বলল কয়েকবছর পরপর পৃথিবীতে নতুন নতুন মতাদর্শ তৈরি হবে। এখন থেকে শুধু পুঁজিবাদ আজীবন একক নেতৃত্বে থাকবে বিষয়টি এরকম নয়। যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন আইডিওলজি তৈরি হবে, তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হবে, যে জয়ী হবে সে পৃথিবী শাসন করবে। একসময় কৃষি ছিল, তারপর সামন্তবাদ, তারপর কলোনিয়ালিজম, তারপর পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। এভাবে পর্যায়ক্রমে বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তন হবে। তাদের মতে পুঁজিবাদ নিয়েও সমস্যা দেখা দেবে। তখন পুঁজিবাদের সংস্করণ হবে। উদাহরণস্বরূপ: ১. Thesis: একদল বলবে পুঁজিবাদী সিস্টেম সর্বোত্তম। কেননা এর কারণে শিল্পায়ন হয়েছে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যদ্রব্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২. Antithesis: অন্যদল বলবে পুঁজিবাদী সিস্টেম সর্বোত্তম না। পুঁজিবাদের কারণে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে এবং গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। তার মানে পুঁজিবাদী সিস্টেমেও সমস্যা আছে। ৩. Synthesis: এভাবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার পর তারা সমাধানে আসবে। যেহেতু আয় বৈষম্য কমাতে সরকার কর আরোপের মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরিবদের মাঝে বণ্টন করবে (Redistribution), যেহেতু পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তাই সরকার কলকারখানাগুলোর উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করবে। এভাবে প্রতিনিয়ত পুজিবাদেরও সংস্করণ হবে। অর্থাৎ Thesis এবং Antithesis এর সমন্বয়ে Synthesis হয়। এই যে থিসিস এবং এন্টিথিসিসের মধ্যকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ সিনথেসিস গঠনের যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)।

আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমানে ঠিক তাই হচ্ছে। ১৯৯০ সালের যে পুঁজিবাদ আজকের দুনিয়ায় কিন্তু সেই পুঁজিবাদ নেই। তার অনেক সংস্করণ হয়েছে। আজকে উন্নত দেশগুলো Welfare Economy বা কল্যাণমূলক অর্থনীতিকে বেছে নিয়েছে। কল্যাণমূলক অর্থনীতির মানে হচ্ছে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র দুটোর মিশ্রণ। এই দুটোর ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বর্তমান বিশ্বে। ধনীদের থেকে টাকা নিয়ে সেটা গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতে ফ্রিতে যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়, শিক্ষাব্যবস্থায় যে ভর্তুকি দেওয়া হয় ইত্যাদি সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। বেকারভাতা ও বয়স্কভাতা ইত্যাদিও সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদ কিন্তু এগুলো সমর্থন করে না। তাই বর্তমানে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রণে নতুন যে অর্থব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সেটাকে “Mixed Economy" ও বলা হচ্ছে।

সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations)

মার্ক্স ও ফুকোয়ামার অনুসারীদের পর আলোচনায় যুক্ত হলেন মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেমুয়েল হান্টিংটন। সমাজতন্ত্র পতনের পর নয়া বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে সেটার উপর থিসিস নিয়ে হাজির হলেন। তিনি "Clash of Civilizations" বা "সভ্যতার সংঘাত” নামে নতুন একটি থিওরি নিয়ে আসলেন। পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়েছিল কলোনির দখল নিয়ে, যুদ্ধ হয়েছিল ভূখণ্ড দখলের জন্য, যুদ্ধ হয়েছিল কলোনি থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য। অর্থাৎ পূর্বে যুদ্ধ হয়েছিল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি রাষ্ট্রের। তারপর ১৯৪৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধ হয়েছিল পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের। কিন্তু নয়া বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধ হবে এক সভ্যতার সাথে অপর সভ্যতার। আগামী দিনে সভ্যতা বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সংঘাতের কারণ হবে। আর একেই নাম দেয়া হয়েছে "সভ্যতার সংঘাত" নামে। ১৯৯৬ সালে উপরিউক্ত বিশ্বব্যবস্থার অনুকল্প হিসেবে "The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order" নামে হান্টিংটনের একটি বিখ্যাত বই প্রকাশিত হয়।

এই বইয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে কীভাবে পুনর্গঠন করা যায় এবং কীভাবে সাজানো যায় এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করেন। হান্টিংটনের এই থিওরি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তার পরবর্তী দুই দশকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণয়ন করেছে। বইয়ে মোট ৮টি সভ্যতার কথা বলা হয়েছিল। বিশ্বের সকল রাষ্ট্র তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে এই আটটি সভ্যতার ছত্রছায়ায় একত্রিত হবে। এদের মধ্যকার দ্বন্দ্বই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে।

সভ্যতাগুলো হলো: ১. পশ্চিমা সভ্যতা: যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা, পশ্চিম এবং মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ওশেনিয়া এবং ফিলিপাইন। সবগুলোই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র। ২. ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতা: মেক্সিকো, কিউবা, গায়ানা, সুরিনাম-সহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমূহ। ৩. স্লাভিক-অর্থোডক্স বিশ্ব: মুসলিম অধ্যুষিত আজারবাইজান এবং আলবেনিয়া বাদে সাবেক সোভিয়েত সংঘের দেশসমূহ। এছাড়া সাবেক যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, জর্জিয়া, গ্রীস এবং রোমানিয়া। ৪. মুসলিম সভ্যতা: বিশ্বের সকল মুসলিম দেশগুলো নিয়ে। বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক, বাংলাদেশ, বসনিয়া, হার্জেগোভেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সাউথ সুদান, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপ। মুসলিম বিশ্বের এই রাষ্ট্রগুলো ইসলামি সভ্যতার ছায়াতলে থাকবে। ৫. সিনিক বা চীনা সভ্যতা (Sinic Civilization): চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান। ৬. সাব-সাহারান আফ্রিকান সভ্যতা: আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো বাদে সাব- সাহারান আফ্রিকার খ্রিষ্টান দেশসমূহ। ৭. জাপানিজ সভ্যতা। ৮. হিন্দু সভ্যতা।

আটটি সভ্যতা উল্লেখ করলেও হান্টিংটন মনে করেন দ্বন্দ্ব হবে মূলত তিনটি সভ্যতাকে কেন্দ্র করে। এই তিনটি হলো: 'পশ্চিমা সভ্যতা, 'ইসলামি সভ্যতা' এবং 'চীনা সভ্যতা'। পশ্চিমা সভ্যতা বাকি দুইটি সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ইসলামি সভ্যতার এবং পশ্চিমা সভ্যতার সাথে চীনা সভ্যতার দ্বন্দ্ব। একটি সময় পর চীনা ও ইসলামি সভ্যতা একসাথে হয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়বে। চীনের সাথে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়বে এটাকে তিনি "Sino-Islamic connection" হিসেবে দেখিয়েছেন।

হান্টিংটন বলেন, 'পশ্চিমের কাছে সমস্যা ইসলামি মৌলবাদ নয়, সমস্যা হলো ইসলামি ধর্ম যা আলাদা একটি সভ্যতার জন্ম দিয়েছে'। হান্টিংটন তার তত্ত্বে সম্ভাব্য ৩য় বিশ্বযুদ্ধের রূপরেখা দিয়েছেন, যেটি মুসলিম বিশ্বের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সংঘটিত হবে, আর মুসলিম বিশ্বের সাথে থাকবে চীন অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে থাকবে ভারত। হান্টিংটনের উদ্বেগের জায়গা হলো, ক্রমান্বয়ে পশ্চিমা সভ্যতা কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে জনসংখ্যার দিক থেকে, মুসলিম এবং ল্যাটিন অভিবাসীদের কারণে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও।

তাঁর মতে মুসলমানদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার এবং চীনের সামরিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পশ্চিমা সভ্যতাকে হুমকির সম্মুখীন করছে। তবে এডওয়ার্ড সাঈদ এবং নোয়াম চমস্কি এই তত্ত্বের অন্যতম সমালোচক। হান্টিংটন সভ্যতাগুলোর মধ্যে যে বিভাজন টেনে দিয়েছেন সেটার সুনির্দিষ্টভাবে অ্যাকাডেমিক অঙ্গন থেকে প্রথম প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড সাঈদ। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, আমরা এখন বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি। তাই পৃথিবীর আকারও ছোট হয়েছে। এখন মানুষ সভ্যতাকেন্দ্রিক আলাদা আলাদা বসবাস করছে না। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে। যেমন- এক যুক্তরাষ্ট্রেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত লোকজন একসাথে বসবাস করছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা নাগরিক হতে শুরু করে মুসলিম আমেরিকান নাগরিক, আফ্রিকান আমেরিকান নাগরিক, হিস্প্যানিক আমেরিকান নাগরিক, তথা সবাই একসঙ্গে বসবাস করছে। সভ্যতার মধ্যে সংঘাত যদি হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রথম সংঘাত হওয়ার কথা ছিল। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, সংঘাত এড়ানোর যে অনেক উপাদান রয়েছে হান্টিংটন সেগুলোকে অবজ্ঞা করে গিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বায়ন, আন্তঃনির্ভরতা, সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো হান্টিংটনের নজরে পড়েনি। সেমুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের প্রত্যুত্তরে এডওয়ারড সাঈদও "Clash of Ignorance" (অবজ্ঞার সংঘাত) নামে আরেকটি বই লিখেন।

আমেরিকার সমালোচক নোয়াম চমস্কির মতে, সাম্রাজ্যবাদ শক্তির বিস্তার বা তেল সম্পদের লণ্ঠনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে যায়েজ করার জন্য মার্কিন প্রশাসন ইসলামি সভ্যতাকে সন্ত্রাসবাদের লেবাস পরিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। হান্টিংটনের থিওরি প্রচুর সমালোচিত হলেও কিছু কারণে একুশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসেও প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।

১. Two forms of conflict: হান্টিংটন দুই ধরনের সংঘাতের কথা বলেছেন। প্রথমটি হলো "Fault line conflicts"। এর মানে হচ্ছে দুটি রাষ্ট্র পাশাপাশি অবস্থিত কিন্তু তাদের সভ্যতা ভিন্ন। যেমন ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। ভারত হিন্দু সভ্যতার, আর পাকিস্তান মুসলিম সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত। ভারত-চীন দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও একই। এই সংঘাতটা হবে স্থানীয় পর্যায়ে। অর্থাৎ একই অঞ্চলের পাশাপাশি অবস্থিত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সংঘাত। হান্টিংটনের দ্বিতীয় সংঘাতটি হচ্ছে “Core state conflicts"। এর মানে হলো বৈশ্বিক পর্যায়ের সংঘাত। যেমন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। চীনের অবস্থান এশিয়াতে আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমেরিকা মহাদেশে। হান্টিংটনের বর্ণিত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই দুই ধরনের সংঘাতই বর্তমানে বেশি হচ্ছে।

২. Sino-Islamic connection: হান্টিংটন বলেছিল চীনা সভ্যতা ও মুসলিম সভ্যতা একসাথে হয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এটা তো আজকের দুনিয়ায় অস্বীকার করা যাবে না। এটা বরং সত্যি হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, কাতার আজ চীনের বলয়ে। এখানে হান্টিংটনের থিওরি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও ধীরে ধীরে চীন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

৩. Theory of "band-wagoning": 'Band Wagoning' পরিভাষাটির মানে হলো, যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে লাভ ক্ষতি হিসেব-নিকেশ করা। যুদ্ধ শুরু করলে আমার লাভ হবে কতটুকু এবং ক্ষতি হবে কতটুকু (Cost Benefit Analysis)। যদি লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয় তাহলে যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়াটাই উত্তম। এটাই ব্যান্ডওয়াগনিং তত্ত্বের মূল কথা। হান্টিংটন বলেছিলেন সংঘাত এড়াতে অন্যান্য দেশগুলোর উচিত পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে মেনে নেওয়া। তাঁর মতে যদি নিজেকে রক্ষা করার মতো শক্তি-সামর্থ্য না থাকে তাহলে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টক্কর দিয়ে পুরো দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজকের ইরাকের এই দুরবস্থার জন্য অর্ধেক দায়ী সাদ্দাম হোসেনের হটকারিতা আর অর্ধেক দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে সাদ্দাম হোসেনের নিজ শক্তি সামর্থের কথা আমলে নেওয়া উচিত ছিল।

৪. War against Terrorism: সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বে যেটা বলা হয়েছিল সেটা গত বিশ বছরে মুসলিম বিশ্বে প্রতিফলিত হয়েছে। আফগানিস্তান, বসনিয়া, কসোভো, চেচনিয়ার উদাহরণ তো এই তত্ত্বের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। টুইনটাওয়ার হামলার পর ওসামা বিন লাদেনকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট বুশের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা সেটা সভ্যতার সংঘাত তত্তেরই প্রতিফলন।

করোনা পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা (World Order After Covid-19)

১৯৯০ এ সোভিয়েত পতনের পর সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব দিয়ে যে নয়া বিশ্বব্যবস্থা শুরু হয়েছিল সেটা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। নয়া বিশ্বব্যবস্থার পর ২০১৯ সাল থেকে পৃথিবীতে নতুন আরেকটি বিশ্বব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে "World Order after Covid-19" নামে। বার্লিন দেয়াল পতনের পরবর্তী সময়ের মতো করোনাসংকট পরবর্তী বিশ্বের চিত্রপট আমাদের সামনে বেশ কিছুটা পরিবর্তিত রূপেই হাজির হয়। তার কিছু চিত্র তুলে ধরা যাক-

Multipolar System বা বহু-মেরু ব্যবস্থা: করোনা পরবর্তী বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের রাজনীতি কোনো একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্বের নেতা হিসেবে উত্থান হয়েছে আঞ্চলিক শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যেমন- দক্ষিণ এশিয়াতে আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও পাকিস্তান। দূরপ্রাচ্যে চীন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, কাতার ও ইসরায়েল। ইউরোপে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইতালি। উত্তর আমেরিকায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। ল্যাটিন আমেরিকায় ব্রাজিল, চিলি ও পেরু। আফ্রিকায় মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইথিওপিয়া ইত্যাদি। কূটনৈতিক অঙ্গনে উপরিউক্ত দেশগুলোর নামই বেশি শুনা যাচ্ছে। করোনা পরবর্তী বহু-মেরু ব্যবস্থা (Multipolar System) সবচেয়ে বেশি জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-সহ অতীতে যারা বিশ্বের মোড়ল ছিল তারা করোনাকালে বিশ্বকে মোটেই নেতৃত্ব দিতে পারেনি। তাঁদের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগও পাওয়া যায়নি, যা বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে কোভ্যাক্স গঠিত হলেও রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপাক্ষিকতার উপর বেশি প্রাধান্য পাওয়ায় সেটাও ব্যর্থ হয়েছে। যা বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদলের তাগিদ দিয়েছে ভবিষ্যৎকে। যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের জায়গায় চীন-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের দিকে ঝুঁকেছে অর্থনীতি।

Covid Nationalism (করোনা-জাতীয়তাবাদ): করোনার সংক্রমণে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে নিজ নিজ সীমান্ত নিয়ে সচেতন হয়ে গেল, তাতে মার্শাল ম্যাকলুহান 'বিশ্বগ্রাম' এর যে ধারণা দিয়েছিলেন তা একটু হলেও সর্বজনীনতা হারিয়েছে। করোনা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিটি দেশ কীভাবে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, বন্ধ করে দিয়েছে বিমান চলাচল। সীমানাবিহীন রাষ্ট্রের (Borderless State) যে ধারণা নিয়ে বিশ্ব আগাচ্ছিল তা অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা চলমান থাকার সম্ভাবনা প্রবল। খোদ 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন'ও এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি; বরং ইউনিয়নভুক্তরা একে অপরের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার চেষ্টায় ছিল। এভাবে এক দেশ অন্য দেশের জন্য সীমানা বন্ধ করে দেওয়ার যে প্রবণতা চালু হয়েছে সেটাকে বলা হয়েছে 'Covid Nationalism' বা 'করোনা-জাতীয়তাবাদ'। করোনাকালে ইতালি ও সার্বিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলো অসহায় হয়ে পড়লে ইউরোপীয় অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। এটা মূলত ইউরোপীয় ঐক্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে আঞ্চলিক মেরুকরণ বেড়েছে ও কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।

The rise of surveillance state (গণ-নজরদারির রাষ্ট্র): মহামারি পরবর্তী এক গণ- নজরদারি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে সরকার প্রতিটি নাগরিকের প্রতিটি মুহূর্তের চলাফেরা শুধু নয়, তার আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দের খবরও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারির মতে, মহামারির সময় লকডাউন, নজরদারি, বিধিনিষেধ, ট্র্যাকিং ইত্যাদি যেসব স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ রাষ্ট্র নিয়েছিলো, সেগুলো এখন রাষ্ট্রের পাকাপাকি ব্যবস্থায় পরিগনিত হওয়ার প্রবণতা প্রবল। আর সেই পথ ধরে উত্থান হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়নে ২৪ কোটি জনগণের উপর সার্বক্ষণিক নজরদারির কোনো সুযোগ রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির ছিল না। কারণ তখন প্রযুক্তিগত এত উন্নতি ছিল না। তাই কেজিবিকে নির্ভর করতে হতো তাদের এজেন্টদের উপর। কিন্তু এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এমন প্রযুক্তি এসে গেছে যা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আজকে চীনে সব মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হচ্ছে। চেহারা চিনতে পারে এরকম লাং লাখ ক্যামেরা দিয়েও নজর রাখা হচ্ছে মানুষের উপর। একুশ শতকের বিশ্বে এভাবে গণ নজরদারিমূলক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটছে, যেটাকে "Nightmarish Surveillance State হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

তাছাড়া করোনাকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছিল অন্য আরেকটি রাষ্ট্রেকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম হাতিয়ার। উন্নত দেশগুলো ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছে। এমনকি চীন তার ভ্যাকসিন সরবরাহ করার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছে যে রাষ্ট্রগুলো চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অংশ সে রাষ্ট্রগুলোকে। ভ্যাকসিন সরবরাহে উন্নত ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল সেটাকে 'Vaccine Apartheid' বা ভ্যাকসিন বর্ণবাদ বলা হয়। পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাসের বিস্তার তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে এক তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে উত্তর-দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বৈষম্য তা প্রকট আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছিল কাউকে নিয়ন্ত্রণ, বশে রাখা, সম্পর্ক উন্নয়ন কিংবা শিক্ষা দেয়ার অন্যতম উপকরণ। এভাবে ভ্যাকসিন এর মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সেই রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসার প্রয়াসকে বলা হচ্ছিল 'Vaccine Imperialism' বা ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যবাদ। ভ্যাকসিন কূটনীতির আবরণে চলছিলে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ।

আগামী বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে এবং সেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে এসব নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের কাজ চিকিৎসা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা নয়, বরং এই করোনাউত্তর সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যে পরিবর্তনটা আসবে, তা দেখিয়ে দেওয়া। আমরা সাধারণত জানি, রাষ্ট্র তার চরম সংকটময় মুহূর্তে 'জরুরি অবস্থা' জারি করার ক্ষমতা রাখে। যেমন- মহামারি ও যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার অধিকার সরকারের রয়েছে। কিন্তু ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেন দেখিয়েছেন, জরুরি অবস্থা এখন আর 'স্টেট অব এক্সসেপশন' তথা নিয়মের 'ব্যতিক্রম' নয়, সদা সর্বদা জরুরি অবস্থাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহামারি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে শাসকশ্রেণি যেভাবে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিজীবনে হস্তক্ষেপ ও সার্বক্ষণিক নজরদারি করেছে ঠিক তেমনি 'জরুরি অবস্থা' ঘোষণা ছাড়াই প্রতিনিয়ত শাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে একই কাজ করে।

'State of Exception' শিরোনামে জর্জিও আগামবেন ২০০৭ সালের দিকে একটি বইও লিখেছেন। মোটাদাগে এই প্রত্যয়টি দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের কিছু অধিকার থাকে, যা রাষ্ট্র আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়েও খর্ব করতে পারে না। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে সরকার সাংবিধানিকভাবেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, যেখানে এসব অধিকার বাতিল করা হয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেখা যায়, সরকার সবসময়ই একধরনের অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রাখে এবং মানুষের অধিকার খর্ব করে এবং প্রচার করা হয় যে, মানুষের ভালোর জন্যই এ কাজ করা হচ্ছে।

আগামবেনের আরও একটি বিখ্যাত ধারণা রয়েছে যা 'Naked Life' বা 'নগ্ন জীবন' হিসেবে পরিচিত। এই ধারণাটি তার 'হোমো সাকের' বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এর মানে হচ্ছে মানুষের জীবন এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে শুধু বেঁচে থাকাটাই আসল। এখানে আগামবেন বলতে চাচ্ছেন, করোনা মহামারির কারণে মানুষ গৃহবন্দী হয়েছিলো, তাতে মানুষের জীবন এমন অবস্থাতেই রূপান্তরিত হয়েছিলো। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বজুড়ে কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন এবং সরকারি মনিটরিং- এই পলিসিগুলো বিদ্যমান, এবং এসবের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কতদিন পর্যন্ত থাকবে, আমরা কেউই বলতে পারছি না। দীর্ঘ সময় ধরে এসব বিদ্যমান থাকায় জনগণের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এসেছে, যা মানুষকে সরকার কর্তৃক প্রণীত যে-কোনো আইন বা পলিসিকে গ্রহণ করতে সহজলভ্য করে তুলেছে। মহামারির নামে, জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার বাহানা দিয়ে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ও কৌশলগুলো আরও নিখুঁত হয়েছে এখন। সেজন্যই আতঙ্ক বা প্যানিক তৈরি করা হয়। প্রতিটি ব্যক্তিকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলার মধ্য দিয়ে এমন একটি অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সেটা আর ব্যক্তির পর্যায়ে না থেকে সামষ্টিক বা সামাজিক আতঙ্কে পরিণত হয়। নৈরাশ্যবাদীরা মনে করছে আধুনিক কালের শাসনের ধরনই হচ্ছে মানুষকে Naked Life এ বা নগ্ন জীবনে পর্যবসিত করা।

সারা বিশ্ব যখন মিল্টন ফ্রিডম্যানের মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও জন মেইনার্ড কেইন্সের সংশোধনবাদী বা হস্তক্ষেপবাদী অর্থনীতির যোজন দ্যোতনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এবং প্রযুক্তিগত সফলতার ধারাবাহিকতায়, এমনকি বিজ্ঞান যখন মহাকাশে বসবাসের কথাও ভাবছে, তখনই এই নভেল করোনাভাইরাস এসে প্রশ্ন তুলেছে নয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে, নব্য উদারবাদ নিয়ে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে, স্বাস্থ্যখাতের সফলতা নিয়ে, বাজার ব্যবস্থায় অ্যাডাম স্মিথের অদৃশ্য হাত নিয়ে এবং দেখিয়ে দিয়েছে, নিউক্লিয়ার অস্ত্র নয়, বরং জীবাণুই হবে আগামী বিশ্বের অদৃশ্য শত্রু। করোনাউত্তর সময়ে সারা বিশ্ব যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে, তা সমসাময়িক অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করেই নিচ্ছেন। আগামীর বিশ্বে এই অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় বিভিন্ন দেশের শাসকশ্রেণিকে নিয়মিত বিরতিতে নৈরাজ্য, শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণও তখন রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা (Contemporary World Order): করোনাউত্তর বিশ্বব্যবস্থায় নতুন আরেকটি মাত্রা যুক্ত করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী মস্কোর কিয়েভ আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। নীতিগত ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের আধিপত্য সমুন্নত রাখার যুদ্ধ। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর এখন যদি এই যুদ্ধ থেকেও পিছু হটতে হয়, তাহলে সেটা হেজিমনিক প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। অপরদিকে রাশিয়া এই যুদ্ধকে দেখছে একটি 'বৃহত্তর রাশিয়া' গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে। নিজেদের অতীত ঐতিহ্যের (Great Power Status) পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে, রাশিয়া যে রুশ সাম্রাজ্য বা ইউরেশিয়া সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা ভাবছে সেটা এই যুদ্ধ থেকে মুটামুটি স্পষ্ট। ইউক্রেনকে ভাবা হচ্ছে 'New Russia' হিসেবে। কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনগুলোর দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এসব আগ্রাসনের পেছনে রাশিয়ার ভৌগোলিক দুরভিসন্ধি রয়েছে। ২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণ, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, ২০২০ সালে বেলারুশে সামরিক আগ্রাসন, ২০২২ সালে কাজাখস্তান আক্রমণ এবং সর্বশেষ ইউক্রেনে আক্রমণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, পুতিনের মস্তিষ্ক খ্যাত আলেকসান্দর দুগিন নয়া রুশ সাম্রাজ্যের যে ধারণা দিয়েছিলেন, সেই পথেই হাটছে আজকের রাশিয়া। একদিকে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী নয়া বিশ্বব্যবস্থার মতো ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য ধরে রাখার প্রশ্ন, অন্যদিকে রাশিয়ার ইউরেশিয়া সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ধরে রাখার সংগ্রাম হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে পূজিঁবাদী মতাদর্শ নিয়ে, নাইন ইলাভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ডিসকোর্স নিয়ে, আর আজকের কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই নিয়ে। তৃতীয়ত, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উপজাত হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মিটাতে কিংবা Kitchen Table Issues নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বিগ্নতা, বৈশ্বিক বিনিয়োগে Speculation বা Bad Expectations এর নেতিবাচক প্রভাব, উত্তরের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর Recessionary Path এর মধ্য দিয়ে যাওয়া, বিশ্বজুড়ে Inflation Rate ও Unemployment Rate বৃদ্ধি পাওয়া, ইকোনমিক পাওয়ার হাউজগুলোতে Industrial Production হ্রাস পাওয়া, Consumer Spendings কমে যাওয়া ইত্যাদি নিদর্শন আমাদেরকে বৈশ্বিক মহামন্দার মতো বড় একটি সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামসময়িক বিশ্বে ঘটে যাওয়া এই পরিবর্তনগুলোকেই আমরা 'Cosmic Play' বা 'বড় ধরনের বৈশ্বিক পরিবর্তন' হিসেবে দেখছি।

চতুর্থত, আমেরিকার পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট রবার্ট কিয়োহেন "After Hegemony" নামে যে বয়ান উপস্থাপন করেন, বর্তমান বিশ্ব সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে কিনা সেটাও এখন আলোচনায়। কিয়োহেন এর মতে, বিশ্বব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন গড়ে তুলছে একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক জোট। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একুশ শতকের চীনকে মোকাবেলায় গড়ে উঠেছে IPAC বা Inter-Parliamentary Alliance on China, অকাস, I2U2, Build Back Better World, ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক, কোয়াড, PBP বা Partners in the Blue Pacific এর মতো সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় চীনের নেতৃত্বে ব্রিকস ও সাংহাই জোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এশিয়া এবং আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে হাজির হয়েছে, যেটাকে "New Regionalism" বলা হচ্ছে। এই সংস্থার মাধ্যমে মধ্য এশিয়া হতে যাচ্ছে রাশিয়ার বিকল্প বাজার এবং মধ্য এশীয় দেশ কাজাখস্তানের মাধ্যমে চীনের জন্য বিনা বাধায় স্থলপথে ইউরোেপ পর্যন্ত বাণিজ্য রুট সম্প্রসারণের পথ সুগম হয়েছে।

ব্রাজিলে রেজিম পরিবর্তন হয়ে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী লুলা ডি সিলবার ক্ষমতায় ফিরে আসা, সৌদি-ইরানের ব্রিকস জোটে অংশগ্রহণ, গ্লোবাল সাউথকে কেন্দ্র করে ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ ইত্যাদি পশ্চিমা আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে। আগামী দিনে বিশ্বব্যবস্থায় ডলারের বিপরীতে যদি কোন শক্তিশালী মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, সেটা হয়তো এই ব্রিকস জোটের হাত ধরেই হবে। একইভাবে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র 'Chain Ganging' প্রক্রিয়ায় সংঘাতে জড়ালেও বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের একক সুপারপাওয়ার বা হেজিমনি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু রাশিয়া নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনিক প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন। Bipolar World Order বা স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বব্যবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের জোট গঠন করলেও আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে জোট গঠনের প্রতিযোগিতা চলছে উভয়ের মধ্যে একটি সুক্ষ পার্থক্য রয়েছে। সেটি হচ্ছে কনটেম্পোরারি বিশ্বে গঠিত হওয়া এই জোটগুলোতে পরস্পরবিরোধী রাষ্ট্রগুলোও একই জোটের সদস্য হতে দেখা যায়নি। ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র, আবার যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ব্রিকস জোটেরও সদস্য। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হওয়া কোয়াডের সদস্য রাষ্ট্র, আবার একইসাথে রাশিয়া ও চীনের জোট সাংহাই কোঅপারেশন সংস্থারও সদস্য। তুরস্ক ন্যাটো জোটের অন্যতম সদস্য হওয়া সত্ত্বেও চীন ও রাশিয়ায় সঙ্গেও উঞ্চ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তিন দশকের মিত্র রাষ্ট্র, আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অগ্রাহ্য করে ওপেক প্লাসের নেতৃত্বে তেল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান তিন ধরনের ছিলো; হয় পুজিঁবাদী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে, না হয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে পক্ষে, না হয় নিরপেক্ষ বা Non Alignment Movement এর পক্ষে। অর্থাৎ, তখন রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান স্পষ্ট থাকলেও সামসময়িক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান অনেকটা অস্পষ্ট। ফলশ্রুতিতে বলা হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা আরো তীব্র হবে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই Strategic Ambiguity বা কৌশলগত অস্পষ্টতা বিশ্বের সংকটগুলোকে সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘায়িত করণে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে।

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহ

📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহ


ভূমিকা : কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা রয়েছে, যা নিয়ে আমরা প্রায়ই দ্বিধান্বিত থাকি। যেমন আমরা অনেকে State এবং Country এর মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারি না। বুঝতে পারি না যে Power এবং Authority এর মধ্যে মূল তফাত কী। Government এবং Governance এর মধ্যে পার্থক্যের জায়গাটি আসলে কোথায়। আমরা অনেকে এটিও জানি না যে Regionalism এবং Regionalization এর মধ্যে অনেক মিল থাকা সত্ত্বেও কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আমরা বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেক পরিভাষা ব্যবহার করলেও ব্যবহৃত এই পরিভাষাগুলো সাধারণত একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু এদেরও বিভিন্ন আঙ্গিক বা দৃষ্টিকোণ রয়েছে তা আমরা সামগ্রিকভাবে চিন্তা করি না। এই অধ্যায়ের শেষে পাঠক সমাজ ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পরিভাষা সম্পর্কে জানতে পারবেন। তাছাড়াও পরবর্তী অধ্যায়গুলো বুঝতে এই পরিভাষাগুলো জানা আবশ্যক।

Country and State

বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা ভূখণ্ড থাকে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক যে সীমানাটি রয়েছে সেটিকে বলা হয় দেশ। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের যে ভূখণ্ডটি রয়েছে এটিকে বলা হয় দেশ। কিন্তু যখন এই ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী মানুষগুলো রাজনৈতিকভাবে আইনকানুন প্রণয়ন করা হয়, যখন ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী এই মানুষগুলোকে আইনকানুন বা নিয়মনীতি ইত্যাদি মানতে বাধ্য করাতে কিছু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তখন সেটিকে রাষ্ট্র বলে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলতে মূলত বোঝায় পলিটিক্যাল পার্টি, সরকার, পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইত্যাদি। এক কথায়, দেশ হলো শুধু একটি ভূখণ্ড, আর সেই ভূখণ্ডটি যখন আইনকানুন, সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সমন্বয়ে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত হয় তখন তাকে রাষ্ট্র বলে।

রাষ্ট্রের উপাদান হিসেবে ভূখণ্ডের গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশ কতটা শক্তিশালী সেটি অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একটি দেশের ভূখণ্ড (Territory)। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, চীন, ইরান, সৌদি আরব, ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। মানচিত্রে নজর দিলে দেখা যায় যে, এই সবগুলো রাষ্ট্রই ভৌগোলিকভাবে বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী। পুরো মানচিত্র যেন এরাই দখল করে রেখেছে। প্রশ্ন হতে পারে Large territory থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিশাল ভূখণ্ড থাকা চারটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
১. বিশাল ভূখণ্ড থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণও বেশি থাকে।
২. বিশাল ভূখণ্ডের কারণে অনেক বেশি কলকারখানা তৈরি করা যায়। খাদ্যশস্য উৎপাদন কিংবা চাষাবাদের জন্যও বিস্তর ভূমি পাওয়া যায়।
৩. সাধারণত দেশের সীমানা অনেক বড় হলে জনসংখ্যাও বেশি থাকে। যত বড় ভূখণ্ড ততবেশি জনগণ, আর যত বেশি জনগণ ততবেশি সেনাবাহিনী গঠন করা যায়।
৪. একটি দেশ যখন বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী হয় তখন সে দেশটি মিলিটারিদের বিভিন্ন গোপন প্রশিক্ষণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প তৈরি করতে পারে এবং বিভিন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে।

এই বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করি। যেমন- সিঙ্গাপুর, কাতার, দুবাই, মোনাকো, হাঙ্গেরি, লিচেনস্টাইন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বে অনেক শক্তিশালী। কিন্তু এসব রাষ্ট্রের সীমানা বা ভূখণ্ড অনেক ছোট। জনসংখ্যাও অনেক কম। যে কারণে তারা আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও সামরিকভাবে অতটা শক্তিশালী হতে পারছে না। আর সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে না পারলে ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে আপনার প্রভাব কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

Power and Authority

এবার আসি Power ও Authority এর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে। অন্য আরেকটি মানুষকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা কাউকে আমার কথামতো চলতে বাধ্য করার যে সক্ষমতা সেটিকে Power (ক্ষমতা) বলা হয়। অন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার কিংবা কথা শুনতে বাধ্য করার মাধ্যমটি যখন বৈধ হয় এবং আইন অনুযায়ী হয় তখন সেটিকে কর্তৃত্ব (Authority) বলে। যেমন- একজন পুলিশের কথাই ধরুন। সে আপনাকে ট্রাফিক আইন মান্য করতে বাধ্য করায়, ট্রাফিক আইন না মানলে পুলিশ আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, আপনার থেকে জরিমানা নিতে পারে। এই যে পুলিশের আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারা কিংবা আপনার থেকে জরিমানা নেওয়ার যে সক্ষমতা সেটি আমাদের আইনে আছে। তাই পুলিশের এই Power টিকে বলা হয় Authority (কর্তৃত্ব)। এক কথায়, আইনকানুন ও সংবিধান অনুযায়ী বৈধ ক্ষমতাকেই বলা হয় Authority বা কর্তৃত্ব। তথা ক্ষমতা বৈধ ও অবৈধ দুটোই হতে পারে কিন্তু কর্তৃত্ব অবশ্যই বৈধ হতে হবে।

Political Power and Politics

আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নিয়মনীতি, আইনকানুন তৈরি করার মাধ্যমে দেশের সকল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালিত করার ক্ষমতাকে বলা হয় Political Power বা রাজনৈতিক ক্ষমতা। তাই আপনি যদি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান, কিংবা আপনার মতো করে রাষ্ট্রের আইনকানুন তৈরি করতে চান, তাহলে আপনার Political Power বা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন। অর্থাৎ আপনি যদি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা নিজের মতো করে সাজাতে চান, যদি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়মনীতি তৈরি করতে চান কিংবা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে চান, তাহলে আপনার প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা (Political Power)।

এখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই রাজনৈতিক ক্ষমতাটি অর্জন করার জন্য এবং আপনার মতাদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য আপনার প্রয়োজন সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল (Political Party) গঠন করা। রাজনৈতিক দল গঠন করার পর আপনাকে মিছিল-মিটিং, সভা-সেমিনার, ক্যাম্পেইন, প্রচারণা ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের আপনার পক্ষে নিয়ে আসতে হবে। তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে আপনাকে রাজনৈতিক ক্ষমতাটি অর্জন করতে হবে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আপনি যখন প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন তখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতাটি সংবিধান অনুযায়ী আপনার হয়ে গেল।

এই ক্ষমতা বলে এবং সংবিধান মেনে আপনি এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি, আইন, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি তৈরি করতে পারবেন। এই যে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইচ্ছে পোষণ করা, রাজনৈতিক দল গঠন করা, সভা-সেমিনার-মিছিল-মিটিং করে জনসমর্থন আদায় করা, সবশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতাটি দখল করা, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে (Process) বলা হয় Politics বা রাজনীতি। আরও সহজ করে বললে Politics হলো রাষ্ট্রের নিয়মনীতি প্রণয়ন করার এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision Making) করার সক্ষমতা অর্জন। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড ল্যাসওয়েলের মতে, “Politics is the process of who gets what, when and how."

Government and Governance

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যে কাজটি করতে হয় সেটি হচ্ছে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা, মন্ত্রীদের নিয়ে আলাপআলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, সংসদে বিল উত্থাপন করে রাষ্ট্রের আইনকানুন প্রণয়ন করা ইত্যাদি। এই যে সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করার মাধ্যমে এবং সংসদে পক্ষে বিপক্ষে ডিবেট করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পলিসি তৈরি করার পুরো ব্যবস্থাটিকে বলা হয় Government (সরকার)। একটি রাষ্ট্রের পলিসি সাধারণত দুই ধরনের হয়। ০১. Domestic Policy: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও সামাজিক নিয়মনীতি ইত্যাদি। ০২. Foreign Policy: অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারণ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার নীতি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জোটে অংশগ্রহণ করার নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়গুলো পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্ত। আর সরকারের তৈরিকৃত এসব অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক পলিসি বা নিয়মনীতি সরকারি আমলা ও সরকারি প্রতিনিধিদের (Representatives) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাকে বলা হয় Governance বা শাসন।

Sovereign State and Vassal State

একটি রাষ্ট্র যখন তার পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে পারে তখন সেই রাষ্ট্রটিকে বলা হয় Sovereign State (সার্বভৌম রাষ্ট্র)। অর্থাৎ যে রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে সরকারি কার্যনীতি নির্ধারণ করতে পারবে, সেটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলা হয়। পৃথিবীর সবগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রই Sovereign State বা সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে সেটি বাংলাদেশই ঠিক করবে, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চায়নার কথামতো বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাবে না। এই সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল কথা হচ্ছে, সকল বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজ দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা।

উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ যেন কোয়াডে অংশগ্রহণ না করে সেজন্য হুমকি দিয়েছিল চীনা রাষ্ট্রদূত। জবাবে বাংলাদেশ বলেছিল আমরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত কোয়াডে যোগ দেবে নাকি চায়নার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে যোগ দেবে সেটি একান্ত নির্ভর করে বাংলাদেশ-এর উপর। এতে চীন আমাদের হুমকি দিতে পারে না বরং বাংলাদেশ তার স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে অপর কোনো শক্তি প্রভাবিত করতে পারে না। যেমন: পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে ফ্রান্সের কথামতো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে রাশিয়ার কথামতো, ওশেনিয়া মহাদেশের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নাউরু তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে অস্ট্রেলিয়ার কথামতো। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে রাশিয়ার নির্দেশে। তাই গিনি, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও নাউরুকে আমরা Sovereign State বলতে পারি না। অন্যের কথানুযায়ী যেসব রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেগুলোকে কেউ কেউ মুখাপেক্ষী রাষ্ট্র (Vassal State) বলে। কেউ আবার সংজ্ঞায়িত করেছেন অধীন রাষ্ট্র (Tributary State) হিসেবে।

বিশ্বকে বিভক্তকরণ (Three World Model)

বিশ্বকে বিভক্তকরণ প্রক্রিয়াকে অনেকে আবার 'three-world theory'ও বলে থাকেন। সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে বিশ্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

1. First World (প্রথম বিশ্ব): স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পূর্ব ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে প্রথম বিশ্বের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সকল উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়। একটি রাষ্ট্র প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কয়েকটি ক্রাইটেরিয়া রয়েছে; এমন সকল রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্র রয়েছে (Democracy), যেখানে আইনের শাসন রয়েছে (Rule of Law), প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা থাকার কারণে যেখানে রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক কম (Little Political Risk), যে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী (Capitalist Economy), যেসব রাষ্ট্রের মোট জাতীয় উৎপাদন অনেক বেশি (GDP Growth), যাদের শিক্ষার হার অনেক বেশি (Literacy Rate) ইত্যাদি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রগুলোকেই প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়। প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে Big State বা বৃহৎ রাষ্ট্রও বলা হয়। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বের দেশ হতে হলে রাষ্ট্রের সীমানা ছোট না বড় এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। যেমন- সিঙ্গাপুর, কাতার, আরব আমিরাত, লিচেনস্টাইন, অস্ট্রিয়া এসব রাষ্ট্র আয়তনের দিক থেকে ছোট হলেও অন্যান্য দিক থেকে অনেক উন্নত। তাই তারাও প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।

2. Second World (দ্বিতীয় বিশ্ব): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে দ্বিতীয় বিশ্বের দেশ বলা হতো। চীন, লাওস, কিউবা, ভিয়েতনাম ইত্যাদি ১৯টি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখন দ্বিতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্ব বলতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। তথা যে রাষ্ট্রগুলো অধিক পরিমাণে উন্নতও না, আবার একেবারে গরিবও না। উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোকে বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন- ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি।

3. Third World (তৃতীয় বিশ্ব): প্রথম বিশ্ব বলতে “developed”, দ্বিতীয় বিশ্ব বলয়ে "developing”, আর তৃতীয় বিশ্ব বলতে "underdeveloped” রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। তথা যে সব রাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল, যেখানে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষা-দীক্ষায় যে রাষ্ট্রগুলো এখনো পিছিয়ে আছে, সেগুলো মূলত তৃতীয় বিশ্বের কাতারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে আবার Small State বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও বলা হয়। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত এই তিনটি বিশ্ব ছাড়াও বর্তমানে চতুর্থ বিশ্ব নামে আরেকটি বিশ্ব রয়েছে।

Fourth World (চতুর্থ বিশ্ব): চতুর্থ বিশ্বের ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অন্তত হলেও কিছুটা উন্নত। যেমন- বাংলাদেশ একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অনেক দিক থেকেই মোটামুটি উন্নত এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। শিক্ষার হার একসময় কম থাকলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তা এখন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চতুর্থ বিশ্বের দেশ বলা হয় এমন সব দেশকে যাদের শিক্ষার হার ক্রমহ্রাসমান বা স্থির, যাদের রয়েছে একেবারে নিম্ন গড় আয়ু, সম্পূর্ণ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ নির্ভর অর্থনীতি। যেমন- সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদান। তাছাড়াও চতুর্থ বিশ্ব বলতে এমন কিছু জাতিগোষ্ঠীকে বোঝায় যারা আধুনিকতার একেবারে বাহিরে এবং বিশ্বের সাথে যাদের কোন যোগাযোগ নেই। যেমন- আমাজন বনে যে-সকল নৃগোষ্ঠী জাতি বসবাস করে, বিভিন্ন দেশে যেসব যাযাবর শ্রেণি রয়েছে তারাও চতুর্থ বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।

Types of Relationships (সম্পর্কের ধরন)

যখন দুটি সার্বভৌম দেশ একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তখন সেটিকে বলা হয় Bilateral Relationship বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। সম্পর্ক স্থাপন বলতে এক দেশ অপর দেশের সাথে বাণিজ্য, তথ্য আদান প্রদান, একে অপরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ইত্যাদিকে বোঝায়। যেমন- বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এই দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। পরস্পর তিনটি রাষ্ট্র একসাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হলে সেটিকে বলা হয় Trilateral Relationship বা ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক। যেমন তুরস্ক-পাকিস্তান-ইরান এই তিন দেশের সম্পর্ক হলো ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক। কিন্তু যখন তিনের অধিক রাষ্ট্র একসাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হয় তখন সেটিকে Multilateral Relations বা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বলে। যেমন মনে করুন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এই চারটি রাষ্ট্র মিলে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, তখন এই চারটি রাষ্ট্রের যৌথ সম্পর্ককে বলা হয় বহুপাক্ষিক সম্পর্ক।

Regionalism (আঞ্চলিকতাবাদ)

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হচ্ছে Regionalism বা আঞ্চলিকতাবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৫০ এর দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তার অংশ হিসেবে আঞ্চলিকতাবাদ ধারণাটি ব্যাপক সাড়া পায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠতে থাকে ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি রাষ্ট্রের একে অপরের বিভিন্ন সাহায্য প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজনে একই অঞ্চলে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলো যখন একতাবদ্ধ হয়ে একটি আঞ্চলিক সংস্থা বা সংগঠন গড়ে তোলে তখন সেটিকে বলা হয় Regionalism বা আঞ্চলিকতাবাদ। অর্থাৎ আঞ্চলিকতাবাদের মূল কথা হচ্ছে একটি অঞ্চলের অনেকগুলো রাষ্ট্র এক ও অভিন্ন একটি প্লাটফর্মে এসে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন এগ্রিমেন্ট বা চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাবাদ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

আঞ্চলিকতাবাদ কেন গুরুত্বপূর্ণ তার কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রথমত, বোঝার সুবিধার্থে মনে করুন, ফ্রান্সের কিছু হ্যাকার স্পেন সরকারের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। এখন এই হ্যাকাররা তো ফ্রান্সের, তাই স্পেনে বসে তাদের বিরুদ্ধে স্পেন সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ঠিক এজন্যই স্পেনের প্রয়োজন ফ্রান্স সরকারের সাহায্য। দ্বিতীয়ত, একই ভাবে মনে করুন, ভারতের কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী ভারত থেকে পালিয়ে গিয়ে মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। এখন এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের প্রয়োজন মিয়ানমার সরকারের সাহায্য। অথবা মনে করুন, বাংলাদেশের কিছু অপরাধী বর্ডার দিয়ে গোপনে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তখন সেই অপরাধীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজন ভারতের সাহায্য। তৃতীয়ত, ধরুন নেপাল ও ভুটানে কোনো ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠী নেই। কিন্তু ভুটান বা নেপালের সীমান্তবর্তী ভারতের যে অঙ্গরাজ্যটি রয়েছে সেখানের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো প্রচুর তৎপর। ধরুন সেখানে কয়েকদিন পরপরই জঙ্গি হামলা হয় এবং সেখান থেকে নেপালেও সহজে হামলা চালানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই নেপাল ও ভুটানে কোনো ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠী না থাকা সত্ত্বেও এই দুটি দেশ তার নিরাপত্তা নিয়ে সংকটে পড়তে হয় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের জঙ্গি গোষ্ঠীদের কারণে। তাই নেপাল ও ভুটানের প্রয়োজন ভারত সরকারের সাহায্য। চতুর্থত, পাশাপাশি অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাণিজ্যিক সুবিধা। যেমন- বাংলাদেশকে তার প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য আমদানি করতে হলে সেটি খুবই কম সময়ে ও কম খরচের মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করতে পারে। ভারতের পণ্য বর্ডার দিয়ে ঢাকা আসতে সর্বোচ্চ চার পাঁচ ঘণ্টা লাগে এবং Transaction Cost বা পরিবহন খরচও কম হয়। কিন্তু ভারতের পরিবর্তে ইউরোপ থেকে পণ্য আমদানি করতে বাংলাদেশের সময়ও লাগে অনেক এবং পরিবহন খরচও অনেক বেশি। একই ভাবে কম খরচে এবং অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য আমদানি রপ্তানি করতে ভারতের প্রয়োজন পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে। পঞ্চমত, আরেকটি বিষয় হচ্ছে মহামারি। দুই দেশের সীমান্তে কাঁটাতার কিংবা দেয়াল তৈরি করে মানুষের যাতায়াত বন্ধ করা যায়। কিন্তু মহামারি কিংবা ভাইরাসের প্রকোপ রোধ করা যায় না। পশুপাখি কিংবা প্রাণীদের মাধ্যমে এক দেশের ভাইরাস তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এসব ভাইরাস মোকাবিলায় একে অপরের সাহায্য প্রয়োজন। পাবলিক হেলথ (Public Health) কোনোভাবেই একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রের ব্যাপার না, এটি পুরো অঞ্চলের এমনকি পুরো বিশ্বের ব্যাপার। ষষ্ঠত, আমার প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আমরা কেউই নিরাপদে থাকব না। মনে করুন ভারত-পাকিস্তান হঠাৎ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। তখন পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান কেউই নিরাপদে থাকবে না। তাই দুটি দেশকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসতে হয়। সাইবার সিকিউরিটি, জঙ্গিবাদ দমন, কম খরচের বাণিজ্য, সংকটে খাদ্য সামগ্রীর সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজনেই দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশ মিলে গড়ে তুলেছে আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক (SAARC)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মিলে গড়ে তুলেছে তাদের আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ান (ASEAN)। ইউরোপীয় দেশগুলো গড়ে তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)। আফ্রিকার দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন ইত্যাদি।

উপ আঞ্চলিকতাবাদ (Sub Regionalism)

এটির মানে হচ্ছে সংস্থার ভিতরে সংস্থা। একটি আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে অনেকগুলো সদস্য রাষ্ট্র থাকে। আঞ্চলিকতাবাদের নিয়ম হচ্ছে, যখনই কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি করবে তখন সদস্যভুক্ত সবগুলো রাষ্ট্র একসাথে মিলে সেটি করবে। কিন্তু একটি সংস্থার সবাইকে অন্তর্ভুক্ত না করে যখন সেই সংস্থার তিন বা চারটি রাষ্ট্র মিলে আলাদাভাবে কোনো চুক্তি সম্পন্ন বা সম্পর্ক তৈরি করে তখন সেটিকে বলা হয় Sub Regionalism বা উপ আঞ্চলিকতাবাদ। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সার্ক হচ্ছে আঞ্চলিকতাবাদের একটি উদাহরণ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো রাষ্ট্র নিয়েই সার্ক গঠিত। এখন এই সার্কের মোট ০৮টি সদস্যের মধ্য থেকে যখন তিন বা চারটি সদস্য রাষ্ট্র মিলে আলাদা একটি কোরাম গঠন করবে তখন সেটিকে বলা হয় Sub Regionalism বা উপ আঞ্চলিকতাবাদ। 'BBIN' হলো উপ আঞ্চলিকতাবাদের একটি অন্যতম উদাহরণ। যার পূর্ণরূপ হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল সংযুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সার্কভুক্ত চারটি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সড়ক বা রাস্তা গড়ে তোলা। তথা সার্কের সদস্য রাষ্ট্র মোট আটটি হলেও এই BBIN প্রকল্পে মাত্র চারটি রাষ্ট্র রয়েছে। তাই এটি যেন একটি বড় সংস্থার মধ্যে আরেকটি ছোট সংস্থা।

Trans Regionalism

যখন দুইটি ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে কোনো এগ্রিমেন্ট বা চুক্তি বা সম্পর্ক স্থাপিত হয় তখন সেটিকে 'Trans Regionalism' বলা হয়। যেমন- সার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যদি সম্পর্ক গড়ে ওঠে বা এই দুটি আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তখন সেটিকে Trans Regionalism বলা হবে। কারণ সার্ক হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হচ্ছে ইউরোপের আঞ্চলিক সংস্থা। তথা দুটি ভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মধ্য যে চুক্তি বা সম্পর্ক সেটিই ট্রান্স রিজিওনালিজম।

Regionalization (আঞ্চলিকীকরণ)

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে যখন অর্থনৈতিক লেনদেন, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য (cross-border flow of capital), জন যাতায়াত (People Mobility), যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় (Cultural Exchange) ইত্যাদি ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায় তখন সেটিকে বলে Regionalization বা আঞ্চলিকীকরণ। উদাহরণস্বরূপ: যদি আমরা ইউরোপীয় অঞ্চলের কথা বিবেচনা করি তখন দেখা যায় যে, সেই অঞ্চলের অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া ইত্যাদি সকল রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে মানুষ যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে। এই যে একই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে জন যাতায়াত বা People Mobility বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটাই আঞ্চলিকীকরণ। আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিউজিক, নাচ, মুভি, পপ কালচার ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তথা আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো আত্মস্থ করছে। এটিও আঞ্চলিকীকরণ (Regionalization) এর উদাহরণ। উল্লেখ্য, আঞ্চলিকীকরণ (Regionalization) এবং আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism) এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যও রয়েছে।

পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো কোনো কমন প্লাটফর্মে এসে তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কোনো অফিশিয়াল চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন সেটিকে বলা হয় আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism)। তথা আঞ্চলিকীকরণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অফিশিয়াল সম্পর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আঞ্চলিকতাবাদ হতে হলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অফিশিয়াল সম্পর্ক থাকাটি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- সার্ক এর গঠনতন্ত্র রয়েছে। সবগুলো রাষ্ট্র এই গঠনতন্ত্র মানতে বাধ্য।

ফাংশনালিজম তত্ত্ব (Functionalism Theory)

একটি জিনিস কার্যকর হতে হলে অন্য একটি জিনিসের উপর নির্ভর করতে হয়। এমনিভাবে একাধিক উপাদান যখন একে অপরের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে কার্যকর হয়ে ওঠে তখন সেটিকে বলে ফাংশনালিজম। আমাদের সমাজে বিভিন্ন সামাজিক উপাদান বিদ্যমান। যেমন- পরিবার (Family), সামাজিক প্রতিষ্ঠান (Social Institutions), আইন (Laws), প্রথা (Norms), মূল্যবোধ (Values) ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোর সমন্বয়ে একটি সমাজ পরিচালিত হয় বা ফাংশন করে। আর এটাই ফাংশনালিজমের মূল কথা। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম এর মতে, একটি সমাজের মূল ভিত্তি পরিবার। আর এই পরিবার গঠনে পুরুষ ও নারী একে অপরের উপর নির্ভরশীল। শুধু একজন পুরুষ বা শুধু একজন নারীর মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয় না অথবা পরিবারটি ফাংশন করে না।

একই ভাবে আমরা যদি কোনো কারখানার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই শ্রমিক এবং মালিক একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একজন কারখানার মালিকের যতই অবকাঠামোগত সামর্থ্য থাকুক না কেন শ্রমিক ছাড়া তার কারখানাটি সে চালাতে পারে না। অর্থাৎ শ্রমিক ছাড়া তার কারখানাটি ফাংশন করে না। তেমনিভাবে শ্রমিকরাও নির্ভরশীল কারখানার মালিকের উপর। কারণ কারখানায় কাজ করার মাধ্যমেই তারা তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থাটি করতে পারে। এই যে একটি পরিবার ফাংশন করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং একটি কারখানা ফাংশন করার ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সেটিকেই এমিল ডুর্খেইম আখ্যায়িত করেছেন Organic Solidarity হিসেবে। এই Organic Solidarity ই হচ্ছে ফাংশনালিজম তত্ত্বের সারকথা।

ঠিক একই ভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ফাংশনালিজম তত্ত্বের প্রয়োগ দেখতে পাই। একটি অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ফাংশন বা পরিচালিত হতে পারে না। এখন আমরা অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতায় ফাংশনালিজম তত্ত্বের ব্যবহার দেখব।

প্রথমত, একটি রাষ্ট্র কখনোই অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। রাষ্ট্রটি তার জনগণের প্রয়োজনীয় যেসব পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করতে অক্ষম এবং যেসব পণ্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে, সেসব পণ্যের জন্য তাকে তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবার যে সকল পণ্যদ্রব্য নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত (Surplus) হিসেবে থাকে বা অতিরিক্ত থাকে সেগুলোকেও অন্য দেশে রপ্তানি করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ভারতের সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলোতে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠী তৎপর। তাই সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলো যেহেতু বাংলাদেশের পাশে, তাই সেখানকার জঙ্গি তৎপরতা রোধে ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশ-এর সাহায্য। তৃতীয়ত, মনে করুন সাইক্লোন বা বন্যার কবলে মালদ্বীপ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই মালদ্বীপে এখন প্রচুর খাদ্য সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মালদ্বীপের সাহায্য প্রয়োজন তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো থেকে। মালদ্বীপ থেকে ইউরোপ-আমেরিকার দূরত্ব অনেক। তাই ইউরোপ থেকে মালদ্বীপে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে অনেক সময়ের প্রয়োজন এবং ততক্ষণে খাদ্যের অভাবে অনেক মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু ভারত কিংবা বাংলাদেশ যেহেতু মালদ্বীপের একেবারে পাশেই অবস্থিত তাই খুবই দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ত্রাণসামগ্রী মালদ্বীপে পাঠানো সম্ভব। তাই মালদ্বীপের প্রয়োজন ভারত ও বাংলাদেশকে। এভাবে একটি রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাহায্য ব্যতীত ফাংশন করে না।

উত্তর আধুনিকতাবাদ (Postmodernism)

পোস্টমডার্নিজম শব্দটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছ। অনেকে এটিকে বলে নয়া আধুনিকতাবাদ, আবার অনেকে বলে আধুনিকতার পরের আধুনিকতা। তবে পোস্টমডার্নিজম এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে উত্তর আধুনিকতাবাদ শব্দটি বেশি প্রচলিত। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে উত্তর আধুনিকতাবাদ মূলত একটি দার্শনিক চিন্তা, যা আধুনিকতাকে সামষ্টিকভাবে সমালোচনা করে। জাঁক লাকা, মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা এসব দার্শনিকরা আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমালোচক এবং উত্তর আধুনিকতাবাদের প্রবক্তা। এখন এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদেরকে সংক্ষেপে তিনটি পরিভাষা জানতে হবে; Traditional Society, Modern Society এবং Postmodern Society।

1. Traditional Society (অতীত সমাজব্যবস্থা): প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বৈশ্বিক সমাজব্যবস্থা ছিল কৃষিনির্ভর। মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল ছিল (agrarian society)। তাদের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল শুধু তাই উৎপাদন করত (subsistence economy)। মানুষ গ্রামীণ সমাজে সম্প্রদায়ভিত্তিক বসবাস করত (community based)। রাজা, সম্রাট বা ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা মানুষ শাসিত হতো (imperial state)। কোনো পদবি বা স্বীকৃতি অর্জনের বিষয় ছিল না। ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মর্যাদা বা সম্মান (ascriptive oriented)। মানুষ অনেক বেশি ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন করত (religion based)। মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক ছোঁয়া বলতে কিছুই ছিল না (unscientific)। মানুষ ছিল অনেক বেশি কুসংস্কারচ্ছন্ন (primordial sentiments)।

2. Modern Society (আধুনিক সমাজব্যবস্থা): ১৬ শতকে যখন ইউরোপীয় রেনেসাঁস শুরু হয় তখন আধুনিকতার ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে (enlightenment period) ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই আধুনিকতা ত্বরান্বিত হতে থাকে। তখন সমাজব্যবস্থাটি ট্র্যাডিশনাল সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিকতার দিকে রূপান্তরিত (transformation) হতে থাকে। তথা কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে মানুষ শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হয়। কলকারখানাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে (industry based)। নিজের প্রয়োজন বা বেঁচে থাকার জন্যই মানুষ পণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য পণ্য উৎপাদন করতে থাকে (market based economy)। মানুষ সমাজ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে থাকে (individualism)। সাম্রাজ্য বা রাজা-বাদশা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রগুলো রূপান্তরিত হয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় (nation state)। এই আধুনিকতার যুগে মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পদবি বা শ্রেষ্ঠত্ব থেকে নিজের অর্জন এবং স্বীকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেয় (achievement oriented)। মানুষ ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন বর্জন করে ধর্ম নিরপেক্ষতার দিকে ঝুঁকতে থাকে (secularization)। মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক ছোঁয়া আসে এবং মানুষ তখন যুক্তিনির্ভর হতে থাকে (rationality)। মানুষ কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হতে থাকে (scientific)। অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হতে থাকে, যা ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে (technobased)। এক কথায় আধুনিকতাবাদ বলছে, উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, যুক্তিবাদী ও মানব কেন্দ্রিক চিন্তা। মানুষের মানবিক জীবন ব্যবস্থার যুক্তিশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযাত্রার মধ্যে দিয়েই শুধু আধুনিক চিন্তার বিকাশ ঘটে।

3. Postmodern Society (উত্তর আধুনিক সমাজ): উপরে দেখালাম যে, কীভাবে ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি থেকে আমরা রূপান্তরিত হয়ে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় পৌঁছেছি। ইউরোপে ষোল শতক থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই সময়টি আধুনিককালের ব্যাপ্তি। অর্থাৎ এই সময়টিতে মানুষ প্রবৃদ্ধি ভিত্তিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর থেকেই অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সে উত্তর আধুনিকতাবাদ ধারণাটি পরিচিত হতে থাকে। এই উত্তর আধুনিকতাবাদের কাজ হচ্ছে, আধুনিকতার যে বৈশিষ্ট্যগুলো উপরে আমরা উল্লেখ করেছিলাম সেগুলো সমালোচনা করা। অর্থাৎ আধুনিকতাবাদের উপজাত (by-product) হিসেবে মানব জীবনে যে সংকটগুলো দেখা দিয়েছে সেগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আধুনিকতার অসারতা প্রমাণ করা। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকরা বলছেন যে, আধুনিকতা আমাকে শিল্পায়নের ছোঁয়া দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিবেশ দূষণকে রোধ করতে পারেনি। আধুনিকতা আমাদের জিডিপি বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, কিন্তু আয়বৈষম্য কমাতে পারেনি। আধুনিকতা আমাকে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাকে সুখ দিতে পারেনি। ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি করছে মানব জীবনে হতাশা এবং বাধাগ্রস্ত করছে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। আধুনিকতা কলকারখানায় শ্রমিকদের জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ন্যায্য মজুরিটি নিশ্চিত করতে পারেনি। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকরা আরও বলছেন যে, আধুনিকতা আমাদের স্বাধীনতার বয়ান দিলেও আমরা আজও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। আমরা আজ একেকজন প্রযুক্তিগত দাস (technological slave)।

আধুনিকতা প্রচার করে মানব চিন্তার শক্তি, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং যুক্তির সর্বজনীনতা ও প্রগতির জয়জয়কার। অন্যদিকে উত্তর আধুনিকতাবাদ বলে উন্নয়ন মানেই সুখ নয়, আধুনিকতা মানেই সীমাহীন প্রগতি নয়, যুক্তিও সবক্ষেত্রে সর্বজনীন নয়।

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি

📄 পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি


ভূমিকা: বিশ্ব দরবারে একটি রাষ্ট্রের অবস্থান কেমন হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ঐ রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে কতটা দক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী। আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার মতো পরাশক্তিরা কেন আজ বিশ্বের বুকে নিজেদের শক্তিমত্তা দাপটের সাথে প্রদর্শন করছে? এর কারণ খুঁজলে আমরা দেখতে পাব তাদের পররাষ্ট্রনীতি কতটা দক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী। আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক বোমার আঘাতে ঝলসে যাওয়া একটি রাষ্ট্র জাপান কীভাবে তার দক্ষ কূটনীতিকে কাজে লাগিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, সমসাময়িক বিশ্বে কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। এই সাহায্য আদায়ের লক্ষ্যে রাষ্ট্র নানা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। আর এই কৌশলের বহিঃপ্রকাশ ঘটে কূটনীতির মাধ্যমে। তাই কূটনৈতিক রণকৌশল বা Diplomatic Manoeuvres সাজাতে রাষ্ট্রকে কতগুলো ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিতে হয়। এই অধ্যায়ে আমরা পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। সর্বশেষ সমসাময়িক কূটনৈতিক অঙ্গনে বহুল ব্যবহৃত কিছু কূটনৈতিক পরিভাষা নিয়ে থাকবে আলোচনা।

পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান

একটি দেশের সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক পলিসি হচ্ছে পররাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত হওয়ায় এগুলো টপ সিক্রেট। তাই একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কী সেগুলো আমরা জানি না। তবে রাষ্ট্রের আচরণ থেকে সেই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ধরনটি (Nature) আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিছু অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত বিষয় মাথায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হয়। যেগুলোকে আমরা Determinants of Foreign Policy বলে থাকি।

পররাষ্ট্রনীতির অভ্যন্তরীণ উপাদান:

1. Geographical Location (ভৌগোলিক অবস্থান): মানচিত্রে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অন্যতম নিয়ামক। বঙ্গোপসাগরের একটি কাছাকাছি রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার চারদিকে সমুদ্র থাকায় দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নৌবাহিনীর উপর গুরুত্বারোপ করতে হয়। ভূ-বেষ্টিত আফগানিস্তান সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্য ইরান ও পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করতে হয়। তাই আফগান সরকারকে ইরান ও পাকিস্তানের কথা বিবেচনায় নিয়ে তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়।

2. Size of the state (রাষ্ট্রের আকার): আয়তনের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র কত বড়, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সেটি গুরুত্ব পায়। চীন আয়তনে এত বিশাল যে তার সাথে মোট ১৪টি রাষ্ট্রের সীমানা রয়েছে। তাই এই ১৪টি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কথা বিবেচনায় নিয়ে চীনকে তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হয়। ভৌগোলিক ভিন্নতার কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক স্ট্র্যাটেজিও ভিন্ন হয়। ভৌগোলিকভাবে রাশিয়ার রয়েছে বিশাল সীমানা কিন্তু ভুটান, টুভ্যালু, নাউরু, এস্তোনিয়া, বেনিন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আয়তনে অনেক ছোট। তাই রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সাথে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি মিলবে না।

3. Population (রাষ্ট্রের জনগণ): পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে একটি রাষ্ট্রের জনগণের চাহিদা ও জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী সৌদি আরব, ইরান, কাতার, কুয়েত-সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে; যেখান থেকে বাংলাদেশ প্রচুর রেমিট্যান্স পাচ্ছে। তাই যে সকল দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে সেসব দেশকে গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে। একই ভাবে ভারত প্রযুক্তিগত দিক থেকে তুলনামূলক অনেক উন্নত। টুইটার, গুগল, আইবিএম, মাইক্রোসফট-সহ বহু প্রতিষ্ঠানের সিইও এখন ভারতীয়। এছাড়াও বহু বায়োট্যাক, ফার্মা প্রতিষ্ঠানের সিইও আছে ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক ইন্ডাস্ট্রি এবং ডাক্তারি পেশায় রয়েছে ভারতীয়দের দাপট। কানাডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকরা এমপি-মন্ত্রী হচ্ছে। তাই বর্তমানে প্রতিবেশী দুর্বল ও ছোট রাষ্ট্র মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ইত্যাদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী কানাডা, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মরিয়া ভারত। অর্থাৎ রাষ্ট্রের জনগণ শিক্ষিত ও প্রভাবশালী হলে সেদেশে পররাষ্ট্রনীতিও শক্তিশালী হয়।

4. Economic Resources (অর্থনৈতিক সক্ষমতা): অর্থনৈতিক শক্তি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের আরেকটি অন্যতম উপাদান। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তার পররাষ্ট্রনীতিতে 'Economic Sanctions' শব্দটি রয়েছে। শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে বশে আনা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কৌশল। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইকোনমিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারছে না। তাই আমাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা মাথায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়। অন্যদিকে জাপান শক্তিশালী হওয়ায় তার Economic Aid Power ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারছে।

5. Military Might (সামরিক শক্তিমত্তা): আমি সামরিকভাবে কতটা শক্তিশালী সেটি প্রভাব পড়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে। আজকে কম্বোডিয়া কিংবা ফিলিপাইনকে আমরা অতটা গুরুত্ব দেই না কিন্তু রাশিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলেও রাশিয়া সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী। একটি রাষ্ট্রের জাতীয় শক্তি কতটুকু সেটি ফুটে ওঠে সামরিক শক্তির মাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য মিলিটারি ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইরান, সৌদি, তুরস্ক দিন দিন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে তাদের সামরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।

পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বহিঃউপাদান

1. History (অতীত ইতিহাস): রাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে প্রধান নিয়ামক। গঠনবাদ বা Constructivism আলোচনার সময় আমরা সেটি দেখেছিলাম। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস আমলে নিতে হয়। রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েতের সহযোগিতা একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ অন্য রাষ্ট্রের সাথে আমার অতীত ইতিহাস কেমন অথবা তার সাথে অতীতে আমার বোঝাপড়া কেমন ছিল সেটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ। আজকে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে দ্বন্দ্ব, ভারতের সাথে পাকিস্তানের যে দ্বন্দ্ব এগুলো ঐতিহাসিক। তাই ভবিষ্যতেও ভারত-পাকিস্তান কিংবা রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব চলমান থাকা স্বাভাবিক। অতীত ইতিহাস পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ডিরেকশন বা পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। অতীতে যে রাষ্ট্রগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল সেসব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাচ্ছে। রাশিয়াও তার পূর্বের সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অন্যতম বহিঃউপাদান হচ্ছে ইতিহাস।

2. Ideology (রাষ্ট্রের মতাদর্শ): আজকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এই রাষ্ট্রগুলো কেন একে অপরের বন্ধু? কারণ তাদের মধ্যে মতাদর্শগত মিল রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের ভাষাও এক। অন্যদিকে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, বলিভিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এই রাষ্ট্রগুলো কেন একই বলয়ে? কারণ তাদের মধ্যেও একটি ঐতিহাসিক মতাদর্শের মিল রয়েছে। সেটি হলো সমাজতন্ত্র। গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব ও ক্যাপিটালিস্ট পিস থিওরিতে আমরা এটি বিস্তারিত দেখেছিলাম। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ধর্মও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনিদের উপর বাংলাদেশের সমর্থন ধর্মগত ও নীতিগত।

3. Global Institutions (আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান): একটি রাষ্ট্রকে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করার সময় আন্তর্জাতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থাকে আমলে নিতে হয়। জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের সনদ মেনে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হয়। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোকে ন্যাটোর চার্টার ফলো করতে হয়। মিশর আরব লীগের নীতিমালা ভঙ্গ করে ইসরায়েলের সাথে চুক্তিতে লিপ্ত হওয়ায় আরব লীগ থেকে তার সদস্য পদ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়েকে নীতি ভঙ্গ করায় কমনওয়েলথ থেকে তাদের সদস্যপদ স্থগিত করে দেওয়া হয়। তাই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়।

4. International Law (আন্তর্জাতিক আইন): আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা প্রতিটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক ট্রিটি, চুক্তি, সনদ, আইন, কনভেনশন ইত্যাদি বিষয়গুলো।

5. Neighbourhood effect (প্রতিবেশি রাষ্ট্রের প্রভাব): আমার প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে কে বা কারা রয়েছে? পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর শক্তিমত্তা কেমন? প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো আমার সাথে কেমন ব্যবহার করছে? ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশের প্রতিবেশি একটি রাষ্ট্র আঞ্চলিক হেজিমন (ভারত), আরেকটি রাষ্ট্র বিশ্বের পরাশক্তি (চীন)। তাই এই দুটি রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হচ্ছে।

পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়া (Decision Making Process)

একটি রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে থাকে। এই পররাষ্ট্রনীতির স্বরূপ কেমন হবে তা নির্ধারণে রাষ্ট্রকে কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এবার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

1. Rational Actor Model: পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত হবে যৌক্তিক। রাষ্ট্র এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যেটা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিসঙ্গত নয়। পররাষ্ট্রনীতিতে একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রকে চারটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়।
ক. লক্ষ্য নির্ধারণ (Agenda Setting): রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সর্বপ্রথম কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। পররাষ্ট্রনীতিতে রাষ্ট্রের লক্ষ্য এমন হওয়া উচিত নয়, যে লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নেই। জাতীয় শক্তির দিক থেকে চীন বাংলাদেশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। তাই সে চাইলেই তার লক্ষ্য নির্ধারণে যে-কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু চীনের মতো বাংলাদেশের সক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশ চাইলেও চীনের মতো শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে না। তাই বাংলাদেশের উচিত এমন এজেন্ডা সেট করা যা বাংলাদেশ তার অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অর্জনে সক্ষম।
খ. বিকল্প নীতি (Alternative Policy): রাষ্ট্রকে এটি নিয়ে আগে থেকেই চিন্তা করতে হয় যে, তার গৃহীত পররাষ্ট্রনীতিটি ফাংশন না করলে তার বিকল্প কী হবে। অথবা রাষ্ট্রের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই বিরূপ প্রভাব ফেলে তখন সেটিকে কীভাবে মোকাবিলা করবে তা আগে থেকেই বিবেচনায় রাখা। যেমন- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জিএসপি সুবিধা পুনরুদ্ধার করার জন্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জিএসপি সুবিধা যদি বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার বিকল্প কী হবে সেটি পূর্ব থেকেই চিন্তা করে রাখা।
গ. লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis): পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করা অনেক জরুরি। রাষ্ট্র যে পররাষ্ট্রনীতিটি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তার সম্ভাব্য লাভ এবং ক্ষতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।
ঘ. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল (Maximization of State Interests): একটি রাষ্ট্র হিসেবে তার নীতিগত জায়গা থেকে ওই সিদ্ধান্তটিই গ্রহণ করতে হয় যার মাধ্যমে তার সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল হওয়া সম্ভব।

2. SWOT Model: সাধারণত এই বিখ্যাত মডেলটি বিজনেস পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বহুল প্রচলিত। এর পূর্ণরূপ হচ্ছে, S= Strengths, W= Weaknesses, O= Opportunities, T= Threats। রাষ্ট্র যদি দেখে তার কোন একটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে তার শক্তিমত্তা এবং সুযোগ সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে তার দুর্বলতা এবং হুমকিগুলো তুলনামূলক কম তাহলে রাষ্ট্র সেই পররাষ্ট্রনীতিটি গ্রহণ করবে।

3. Governmental Bargaining Model: রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিংবা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে যে বিষয়টি সবচেয়ে বিবেচনায় নেবে তা হচ্ছে তার দরকষাকষির মতো সক্ষমতা। যেমন- বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের কারণে। একই ভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রকল্পের একটি অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুটি পরাশক্তির কাছেই যখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানই হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি (Bargaining Power)। এই গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে তার সর্বোচ্চ স্বার্থ উদ্ধার করতে পারবে তা বিবেচনায় নিতে হবে।

4. PEST Analysis: ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিনে এ মডেলটি ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এটিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর পূর্ণরূপ হচ্ছে, P= Political, E= Economic, S= Social, T= Technological। তথা রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে তার রাষ্ট্রের এই চারটি সেক্টরে কী কী উন্নয়ন হবে তা বিবেচনায় রাখবে।

পররাষ্ট্রনীতির ধরন: Wolf warrior diplomacy

সমসাময়িক কূটনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি ডিপ্লোমেসি হলো চীনের Wolf warrior diplomacy। চীনের বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে এই আগ্রাসী ডিপ্লোমেসি সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে। উ জিং হচ্ছেন একজন বিখ্যাত চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতা। 'উলফ ওয়ারিয়র' (Wolf Warrior) নামে তার নির্মিত একটি চলচ্চিত্র ২০১৫ সালে মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মুভিটা চায়নাতে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খুব বেশি জনপ্রিয়তা পাওয়ার ফলে নির্মাতা উ জিং সিদ্ধান্ত নেন 'উলফ ওয়ারিয়র-২' (Wolf Warrior-2) নামে প্রথম মুভির সিকুয়েন্স হিসেবে আরেকটি মুভি নির্মাণ করতে। ফলস্বরূপ মাত্র দুই বছর পর ২০১৭ সালে মুক্তি পায় তার 'ওলফ ওয়ারিয়র-২' নামের চলচ্চিত্রটি।

উ জিং এর নির্মিত এই দুইটি মুভির বিষয়বস্তু ছিল Chinese Nationalism বা চীনা জাতীয়তাবাদ। Wolf বা নেকড়ে হলো খুবই চতুর এবং সাহসী একটি প্রাণী। এই নেকড়ে প্রাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা একে অপরের উপর খুবই বিশ্বস্ত, অন্য কোনো প্রাণী এদের উপর আক্রমণ করলে এরা কালবিলম্ব না করে সাথে সাথেই প্রতিহত করে। নেকড়েদের কানগুলো সবসময়ই খাড়া (upright ears), এদের দাঁত খুবই তীক্ষ্ণ ও ধারালো (sharp teeth), নাক ও মুখ খুবই তীব্র ও জোড়ালো (pointed muzzles), আর চোখগুলো হলো অনুসন্ধানী (inquiring eyes)। চলচ্চিত্র নির্মাতা উ জিং তার ওলফ ওয়ারিয়র দুইটি মুভিতে চায়নিজ সেনাবাহিনীদেরকে এই নেকড়ের সাথে তুলনা করেছেন। চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে কীভাবে চায়নার সেনাবাহিনীরা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকা শত্রুদের পতন ঘটিয়ে দেশকে রক্ষা করে।

এই দুটি চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চায়না তাদের বর্তমান ডিপ্লোমেসির নাম দিয়েছে “ওলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি”। এই Wolf warrior diplomacy'টি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে একটি buzzword বা অধিক ব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে চীনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমগুলো একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, চীনের বর্তমান যে-সকল কূটনীতিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে দায়িত্বরত আছেন কিংবা বর্তমান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির যারা মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর, বেশি আক্রমণাত্মক, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও অনেক বেশি সক্রিয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন করোনা ভাইরাসকে 'চীনা ভাইরাস' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, বাইডেন যখন চীনকে 'The Sick Man of Asia' হিসেবে উল্লেখ করেন, ব্রিটেন যখন চীনকে "মানবজাতির সিকিউরিটির জন্য থ্রেট' হিসেবে উল্লেখ করে তখন কিন্তু চীন চুপ করে বসে থাকেনি বরং সাথে সাথে চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর এসবের পাল্টা ও আক্রমণাত্মক জবাব দিয়েছে।

দুইটি উদাহরণ দিলে বুঝতে আরও সহজ হবে। "করোনা ভাইরাস হলো চীনা ভাইরাস" ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে চীন জবাব দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই ভাইরাস তৈরি করে চীনের উহানে এসে ছেড়ে দিয়েছে যেন চীনকে বিশ্বের সামনে ছোটো করানো যায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন বলছে, চীন উইঘুর মুসলিমদের উপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। চীনও প্রত্যুত্তরে জবাব দিচ্ছে এটা বলে যে, চীন নয় বরং আমেরিকা-ই ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া-সহ সারা বিশ্বে মুসলমানদের উপর ধ্বংসলীলা চালিয়েছে এবং বর্তমানেও চালাচ্ছে। এরকম আক্রমণাত্মক প্রত্যুত্তরের অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। ২০২১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির শতবছর উদযাপনে শি জিনপিং তার ভাষণে এমনও বলেছেন যে, চীনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করবে তার দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। চীনের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের যে-কোনো তীর্যক মন্তব্যের বিপরীতে চীনও এখন পাল্টা আক্রমণ হিসেবে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছে, কোনোরকম ছাড় দিচ্ছে না কাউকে। ঠিক যেরকমভাবে একটি নেকড়ে তার শত্রুকে কখনো ছাড় দেয় না। চীনের এই পাল্টা জবান দেয়ার কূটনীতিকেই 'উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি' বলা হচ্ছে।

১৯২১ সালে কার্ল মার্ক্স ও লেলিনের মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Chinese Communist Party (CCP) নামের এই রাজনৈতিক দলটি। শি জিনপিং এর নেতৃত্বে এই দলটি এখনো চীনের ক্ষমতায়। ২০২১ সালে দলটির জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপন করা হয়েছে। এই কমিউনিস্ট পার্টির উপর ভিত্তি করেই চীন আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করে দিতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হলো চায়নার কমিউনিস্ট পার্টি। এই কমিউনিস্ট পার্টির মিলিটারি শাখা হচ্ছে- People's Liberation Army। এই লিবারেশন আর্মি কমিউনিস্ট পার্টির মিলিটারি শাখা হলেও এটিই মূলত চায়নার মূল আর্মড ফোর্স এবং গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিলিটারি ফোর্স। এর পাঁচটি শাখা রয়েছে- 1. Ground Force, 2. Air Force, 3. Rocket Force, 4. Strategic Support Force, 5. Navy। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মিকেও এখন নেকড়ের সাথে তুলনা করা হয়। সেনাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে বলা হচ্ছে চীনের একেকজন মিলিটারি যেন একেকটা নেকড়ে যোদ্ধা।

Economic Diplomacy- অর্থনৈতিক কূটনীতি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে যে দুটি কূটনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জনকূটনীতি। একুশ শতকের কূটনীতি শুধু রাজনৈতিক কূটনীতি নয়, এটি বর্তমানে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কলাকৌশলই অর্থনৈতিক কূটনীতি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল, আমদানি হ্রাস, রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রসার, পর্যটন খাত সমৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো অর্থনৈতিক কূটনীতির সাথে সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে পাঁচটি।

1. Manufacturing Hub: বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকর্ষণ করা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। বিনিয়োগের পরিধি বাড়িয়ে বাংলাদেশকে গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
2. Technological Adaptation: বিশ্বায়নের এই যুগে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক এমন সকল প্রযুক্তির সাথে বাংলাদেশকে খাপ খাওয়ানো। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া যেন আমরাও পাই সেজন্য নতুন নতুন প্রযুক্তিতে সিদ্ধহস্ত হতে হবে।
3. Gainful Employment: জনশক্তির যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আমাদের তেমন কোনো খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ নেই তবে আমাদের আছে বিশাল জনগোষ্ঠী। তাই এই বিশাল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করা। বাংলাদেশের মতো জাপানেরও কোনো খনিজ সম্পদ নেই। জাপানিরা তাদের জনশক্তি কাজে লাগিয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে। আমাদের উৎপাদনের জন্য মানব সম্পদ আছে কিন্তু মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টে মানব সম্পদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই বাংলাদেশকেও মানব সম্পদের উপর জোর দিতে হবে।
4. Export Diversification: রপ্তানির পরিধি ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রপ্তানি বাণিজ্য। তাই নতুন রপ্তানি খাতের সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাজার বৈচিত্র্যকরণ ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
5. Ensuring Quality to Expatriates: প্রবাসী বাংলাদেশিদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করা। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি প্রবাসী তাদের অর্জিত অর্থের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পৃথিবীর প্রায় ১২৬টি দেশে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক পাড়ি জমাচ্ছে। তাই প্রবাসীদের প্রতি আন্তরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

Public Diplomacy- জনকূটনীতি

গতানুগতিক কূটনীতিতে আমরা সাধারণত দেখি সম্পর্কগুলো তৈরি হয় সরকারের সাথে সরকারের (Governments to Government)। কিন্তু বর্তমানে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে অন্য দেশের সরকার ছাড়াও সে দেশের জনগণ, সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়ী কমিউনিটি, গণমাধ্যম ইত্যাদিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। আর এসব কলাকৌশলই জনকূটনীতি হিসেবে পরিচিত। যেমন- ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর বারাক ওবামা সরকার বাংলাদেশের GSP সুবিধা স্থগিত করে দেয় এবং পুনরায় জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে কিছু শর্তারোপ করে। কিন্তু বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকগুলো শর্ত পূরণ করলেও মার্কিন প্রশাসন এখনো জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিচ্ছে না। তাই বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী কমিউনিটি এর সাথে তৎপরতা চালাচ্ছে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য। এটাই জনকূটনীতির উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্জনগুলো বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও পাবলিকেশনসের মাধ্যমে তুলে ধরে বিশ্বে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করাটাও জনকূটনীতির অংশ। তৃতীয়ত, এটি সাংস্কৃতিক কূটনৈতিরও একটি অংশ। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মিউজিক, স্পোর্টস, ভিডিও গেইম, কালচারাল প্রোগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য দেশের জনমত নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা যায়। যুক্তরাষ্ট্র জনকূটনীতির উপর বেশি নজর দেয়। তুরস্ক সরকারও বর্তমানে তাদের উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস মুভি সিরিজ আকারে প্রচার করে তাদের পক্ষে জনমত গঠনের প্রয়াস চালাচ্ছে। এভাবে অন্যদেশের জনগণকে প্রভাব বিস্তার করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে জনকূটনীতি।

Dual Track Diplomacy- দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি

একুশ শতাব্দীর বহুল আলোচিত একটি কূটনৈতিক কৌশল। বাংলায় যাকে বলা হয় দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি। অনেকে আবার এটিকে 'Track II diplomacy' অথবা 'Backchannel diplomacy' হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকে। মূল কথা হচ্ছে, এই ডিপ্লোমেসির মধ্যে দুইটি পদ্ধতি একসাথে কাজ করে। নিচে উদয়ারণের মাধ্যমে সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করছি।

উদাহরণ (০১): এটি রাষ্ট্রের এমন কূটনৈতিক কৌশলকে বোঝায় যেখানে রাষ্ট্র একসাথে দুই ধরনের কূটনীতি ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ: উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা করে থাকে। এটি হলো ফার্স্ট ট্র্যাক বা প্রথম পদ্ধতি। আবার যুক্তরাষ্ট্র পাশাপাশি অন্য কোনো শক্তি যেমন জাতিসংঘের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। এটি হলো সেকেন্ড ট্র্যাক বা দ্বিতীয় পদ্ধতি। তাই উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে ডিপ্লোমেসি সেটি হলো ডুয়াল ট্র্যাক বা দ্বৈত ডিপ্লোমেসি। তেমনিভাবে JCPOA এর সময় যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে ৫ম নৌবহর স্থাপন করে ইরানকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আবার একইসাথে নেগোসিয়েশনও চালায়। এই যে একসাথে দুইটি ট্র্যাক তথা চাপ প্রয়োগ ও নেগোসিয়েশন একসাথে চালানো এটিই দ্বৈত ডিপ্লোমেসি। উল্লেখ্য, JCPOA হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বাতিলের উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভিয়েনায় স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি; যার পূর্ণরূপ হলো- Joint Comprehensive Plan of Action।

উদাহরণ (০২): অন্য দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে রাষ্ট্র যদি সরকারি (State Actors) ও বেসরকারি (Non state actors) উভয় মাধ্যম ব্যবহার করে তখন তাকে দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি বলা হয়। প্রথম মাধ্যমটি হলো ডিরেক্টলি সরকার টু সরকার। অর্থাৎ সম্পর্ক রক্ষায় দুইটি দেশের সরকারের মধ্যে অফিশিয়ালি যে আলোচনা বা ডায়ালগ হয় অথবা কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে প্রতিনিধি হিসেবে ঐ দেশে পাঠানো হয়। দ্বিতীয় মাধ্যমটি হলো ইনডিরেক্টলি। বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি, মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন বা সংস্থার মাধ্যমে দুইটি দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা হয় সেটিও দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতির উদাহরণ।

Culinary Diplomacy

বর্তমান দুনিয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে অনেক নতুন নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। নতুন নতুন পরিভাষা যুক্ত হচ্ছে। এই পরিভাষাটিও তন্মধ্যে একটি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কূটনীতিবিদরা নানা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম একটি কৌশল হলো "Culinary diplomacy”। একুশ শতাব্দীর শুরুতে এই পরিভাষাটি কূটনীতি বিশেষজ্ঞ পল রকওয়ার ও স্যাম চ্যাপল এই দুজন ব্যক্তির হাত ধরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটিকে আরও দুইটি নামে ডাকা হয়। কেউ কেউ এটিকে Ghastro-diplomacy, কেউ আবার এটিকে Food diplomacyও বলে থাকে।

অন্য দেশ থেকে যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধি আপনার দেশে ভ্রমণ, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন কিংবা সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে আসে তখন এই ডিপ্লোমেসিটি খুবই কাজে দেয়। Culinary এর সহজ বাংলা হলো রন্ধনসম্পর্কীয়। অর্থাৎ আপনার দেশের কালচারাল এবং জনপ্রিয় যে-সকল খাবার রয়েছে সেগুলো দিয়ে তাদেরকে ডিনার/ লাঞ্চ/ ব্রেকফাস্ট করিয়ে তাদের মন জয় করা। অথবা দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোনো একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আড্ডার ছলে খাওয়াদাওয়া করা। কথায় আছে- "The easiest way to win hearts and minds is through the stomach." এই ডিপ্লোমেসিটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে পেরু, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তান ইত্যাদি দেশগুলো।

Ad hoc Diplomacy

বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি কূটনীতি। এটি মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো একটি স্পেশাল মিশন পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে একটি রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কার্যক্রম, যারা পেশাদার কূটনীতিক আছেন তাদের দ্বারা সম্পাদন করার পরিবর্তে সাময়িকভাবে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়। এই ধরনের স্পেশাল কূটনীতিকে বলা হয় Ad hoc diplomacy। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বোঝার সুবিধার্থে মনে করুন যে, কোনো একটি ইস্যুর উপর ভিত্তি করে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ছোট একটি দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ সরকার চাইলে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে সেই সমস্যাটি সমাধান করতে পারে। কিন্তু সরকার যদি গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধান না করিয়ে বরং বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কিংবা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করে এবং ভারত সরকারের সাথে সেই ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে সমাধান করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তখন সেটিকে 'Ad hoc diplomacy' বলা হয়। Ad-hoc কূটনীতিকে নিত্যনৈমিত্তিক দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাছাড়াও কোনো রাষ্ট্রপ্রধান অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বিদেশ সফর করেন কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তখন সেটিকেও বলা হয় Ad hoc diplomacy।

Cheque-book Diplomacy - চেকবুক কূটনীতি

এই ধরনের কূটনীতি সাধারণত আর্থিকভাবে ধনী এমন রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত হয়। অর্থনৈতিক সাহায্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসার নামই চেকবুক ডিপ্লোমেসি। এটি আসলে Debt Trap Diplomacy কিংবা Debt Colonialism এর মতোই। তেমন কোনো পার্থক্য নেই। লোন কিংবা ঋণের ফাঁদে ফেলে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের ভূমি, বন্দর কিংবা বিমানবন্দর দখলে নিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে Debt Colonialism বা ঋণ উপনিবেশবাদ বলা হয়। চেকবুক কূটনীতির কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দেই; যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে প্রায়ই সামরিক মহড়া দেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান মিলে একটি সামরিক মহড়া দেওয়ার পূর্বে এই অঞ্চলের কম্বোডিয়াকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেনি। দেশটির বিদেশি ঋণের ৬০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে বেইজিংয়ের কাছ থেকে। চীনের প্রতি এই নির্ভরতার ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের সঙ্গে সামরিক মহড়া বাতিল করেছে কম্বোডিয়া। এটি চেকবুক কূটনীতির উদাহরণ। ২০২১ সালের নভেম্বরে নিকারাগুয়া, ২০১৮ সালে ডোমিনিকা রিপাবলিককে বিশাল অর্থ সহায়তা করে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করায় চীন। একই ভাবে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে প্রায় সবগুলো দেশেই চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের ঋণ গ্রহণকারী সবগুলো দেশ তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাই আফ্রিকা মহাদেশের শুধু একটি রাষ্ট্র এসোয়াতিনি ছাড়া কারো সাথে বর্তমানে তাইওয়ানের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি চীনের চেকবুক কূটনীতির সফলতা।

Track Diplomacy

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে বিভিন্ন কলাকৌশল গ্রহণ করা হয়। এই কলাকৌশলের বিভিন্ন Track বা পদ্ধতি রয়েছে।

1. Track 1 Diplomacy: এটি মূলত অফিশিয়াল বা সরকারি কূটনীতিকে বোঝায়। এক দেশের সরকারের সাথে অন্য দেশের সরকারের যে অফিশিয়াল সম্পর্ক সেটিই ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসি। যেমন- জো বাইডেনের সাথে শি জিনপিং এর ফোনালাপ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার ইত্যাদি ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসির উদাহরণ।
2. Track II Diplomacy: রাষ্ট্রীয় কর্মক এবং অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকের সমন্বয়ে যে কূটনীতি সেটাই Track-II কূটনীতি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিএসপি সুবিধা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোও তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে চীনের আধিপত্য বিস্তারে চীনা সরকারের পাশাপাশি চীনের মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেশনগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উল্লেখ, এটিকে Backchannel diplomacyও বলা হয়।
3. Track III Diplomacy: দুটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যখন তৃতীয় আরেকটি পক্ষ চলে আসে তখন সেটি 'Track-III' কূটনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন- রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি যদি জাতিসংঘ কিংবা ওআইসির মতো তৃতীয় কোনো পক্ষ এগিয়ে আসে তখন সেটিকে বলা হয় Track III ডিপ্লোমেসি।
4. Multi Track Diplomacy: কূটনৈতিক অঙ্গনে নিজের স্বার্থ আদায়ে যদি উপরিউক্ত তিনটি Track একসাথে প্রয়োগ করা হয় তখন সেটিকে মাল্টি ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি বলা হয়।
5. Nine Track Diplomacy: ১. সরকার, ২. পেশাদারি ব্যক্তি, ৩. ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, ৪. প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, ৫. গবেষণা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান, ৬. বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী বা একটিভিস্ট, ৭. ধর্ম, ৮. ফান্ডিং, ৯. জনমত ও যোগাযোগ এই নয়টি পদ্ধতি ব্যবহার করে যে কূটনীতি গ্রহণ করা হয় সেটাই নাইন ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি।

অ্যাম্বাসেডর ও হাইকমিশনার এর মধ্যে পার্থক্য

Ambassador (রাষ্ট্রদূত): রাষ্ট্রদূত বা অ্যাম্বাসেডর হলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অন্য আরেকটি দেশের সাথে কূটনৈতিক কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হন। একজন অ্যাম্বাসেডর প্রেরিত দেশে নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করেন এবং চলমান বিভিন্ন সমস্যা সেই দেশের কাছে সমাধানের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন। দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বাস্তবায়নে তিনি সদা তৎপর থাকেন। রাষ্ট্রদূতকে বৈদেশিক রাষ্ট্রে অনির্দিষ্টভাবে কয়েক বছর অবস্থান করতে হয় এবং তাকে ঐ রাষ্ট্রের যাবতীয় আইনকানুন, রীতিনীতি, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত থাকতে হয়।

High Commissioner (হাই কমিশনার): বর্তমানে যে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো অতীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল সেই রাষ্ট্রগুলোকে বলা হয় কমনওয়েলথভুক্ত দেশ (মোট ৫৪টি রাষ্ট্র)। এই কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে ইংরেজিতে 'Commonwealth of Nations' বলা হয়। একটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ থেকে আরেকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে যে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করা হয় তাকে অ্যাম্বাসেডর বলার পরিবর্তে হাই কমিশনার বলা হয়। হাইকমিশনার ও এম্বাসেডরের কাজের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। রাষ্ট্রদূতকে তখনি হাইকমিশনার বলা হয় যখন দুটি দেশই কমনওয়েলথভুক্ত হবে। আর দুটি দেশ কমনওয়েলথভুক্ত না হলে রাষ্ট্রদূতকে অ্যাম্বাসেডর বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ভারতে নিয়োগ পেলে তাকে হাইকমিশনার বলা হবে। একই ভাবে ভারতের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে নিয়োজিত হলে তাকেও হাইকমিশনার বলা হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্র নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে অ্যাম্বাসেডর বলা হবে। একই ভাবে বাংলাদেশে প্রেরিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকেও অ্যাম্বাসেডর বলা হবে। কারণ বাংলাদেশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হলেও যুক্তরাষ্ট্র কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নয়।

কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি রাষ্ট্র: অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ, বাংলাদেশ, বার্বাডোস, বেলিজ, বতসোয়ানা, ব্রুনাই, ক্যামেরুন, কানাডা, সাইপ্রাস, ডোমিনিকা, ইসোয়াতিনি, ফিজি, গাম্বিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গায়ানা, ভারত, জ্যামাইকা, কেনিয়া, কিরিবাস, লেসোথো, মালাউই, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মাল্টা, মরিশাস, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, নাউরু, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিট্স ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইন দ্বীপপুঞ্জ, সামোয়া, সিশেলিস, সিয়েরা লিওন, সিঙ্গাপুর, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, টোঙ্গা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, টুভালু, উগান্ডা, যুক্তরাজ্য, ভানুয়াতু ও জাম্বিয়া।

যুক্তরাষ্ট্র যে কারণে কমনওয়েলথ এর সদস্য নয়

যুক্তরাষ্ট্রকেও একসময় ব্রিটিশরা শাসন করেছিল। তারপর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত নয়? ১৯৪৯ সালে লন্ডন ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল কমনওয়েলথ। বর্তমানে কমনওয়েলথভুক্ত দেশ ৫৪টি। আমেরিকা ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হলেও কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নয়। কিন্তু কেন?

প্রথমত, অতীতে কোনো দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও সে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর সে কমনওয়েলথে যোগ দেবে কি না তা সম্পূর্ণ ঐ দেশের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে। আয়ারল্যান্ড ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও তারা কমনওয়েলথে যোগ দেয়নি। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্র একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও কমনওয়েলথে যোগ দেয়নি। তাই কমনওয়েলথ এর ৫৪টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেই। দ্বিতীয়ত, কমনওয়েলথ গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। আর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এত আগে স্বাধীনতা লাভ করে যে কমনওয়েলথ গঠনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনকানুনের দিক থেকে কোন প্রভাব বজায় ছিল না। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান-সহ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে দেখবেন যে এখনো ব্রিটিশদের প্রভাব রয়েছে। ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠা করা অনেক আইন এখনো আমরা মেনে চলি, কলোনিয়াল আমলে তৈরি ব্রিটিশদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেললাইন, সংস্কৃতি এখনো আমাদের ব্রিটিশ উপনিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে অনেকাংশে বেরিয়ে এসেছে। তৃতীয়ত, কমনওয়েলথ এর এমনও সদস্য আছে যারা ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হয়নি। কমনওয়েলথভুক্ত কিছু সদস্য দেশ কখনোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না। যেমন- ১৯৯৫ সালে মোজাম্বিক এবং ২০০৯ সালে রোয়ান্ডা কমনওয়েলথের সদস্য হয়। কিন্তু দেশ দুটি কখনোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল না। চতুর্থত, একবার কমনওয়েলথ এর সদস্য হওয়া মানেই আজীবন সদস্য থাকতে হবে বিষয়টি এরকম নয়। কয়েকবার কমনওয়েলথে তাদের সদস্যও হারিয়েছে। যেমন- নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করা হলে, ২০০০ সালে রবার্ট মুগাবে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যান। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের জেরে পাকিস্তানের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। তবে সাড়ে চার বছর পর তারা আবার সেই পদ ফেরত পায়। বর্ণবাদ নিয়ে সমালোচনার জেরে ১৯৬১ সালে কমনওয়েলথ থেকে সরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৪ সালে তারা আবার এর সদস্য হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ ২০১৬ সালে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। তাই সদস্য থাকা, সদস্য না থাকা, অথবা সদস্য পদ প্রত্যাহার করা নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর।

কমনওয়েলথ এর সফলতা কী?

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কমনওয়েলথের এসব সমস্যা সমাধান করার মতো সামর্থ্য এখন নেই। সফলতার মধ্যে একটি হলো প্রতি বছর যুক্তরাজ্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে “কমনওয়েলথ শিক্ষাবৃত্তি” নামে কিছু স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। আমি মনে করি কমনওয়েলথ যে একটি সংগঠন হিসেবে এখনো টিকে আছে, সেটিই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। প্রতি দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাবেক ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনের রানীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাষ্ট্রনেতারা। আসলে গোলামির ইতিহাস মনে করিয়ে দেবার জন্যই কমনওয়েলথের মতো সিস্টেম রাখা হয়েছে।

৩০টি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিভাষা

০১. Foreign Policy – পররাষ্ট্রনীতি : বিশ্বায়নের এই দুনিয়ায় একটি রাষ্ট্র অপর আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া চলতে পারে না। অর্থাৎ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল (Interdependent)। একে অপরের উপর এই নির্ভরশীলতার কারণেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে এই সম্পর্ক স্থাপন করাকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলা হয়। জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করা কিংবা বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে একটি রাষ্ট্রকে কিছু নীতি বা পলিসি গ্রহণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্বার্থসমূহের সংরক্ষণ কিংবা রক্ষার জন্য একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তার আচরণ সংক্রান্ত এই নিয়মাবলিকেই বলা হয় Foreign Policy বা পররাষ্ট্রনীতি।

০২. Diplomacy – কূটনীতি: আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য চীনের কটন বা তুলা প্রয়োজন। চীন তো আর এমনি এমনিই বাংলাদেশকে তুলা দেবে না। সেই তুলা পাওয়ার জন্য চায়নার সাথে আমাদের আলোচনার টেবিলে বসতে হয়, আমাদের প্রতিনিধি চায়নাতে পাঠাতে হয়, দাম নিয়ে তাদের সাথে দরকষাকষি করতে হয়। এভাবে মাঠ পর্যায়ের উপরিউক্ত কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে চীন থেকে আমাদের প্রয়োজন আদায় করে নেওয়াকে বলা হয় Diplomacy বা কূটনীতি। আরেকটি উদাহরণ দেই। ২০২১ সালের জুনে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জন্য মোট ২,৬০০ কেজি হাঁড়িভাঙা আম উপহার পাঠিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইসলামাবাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ক নরমাল করার জন্য পাকিস্তানেও হাঁড়িভাঙা আম পাঠানো হয়েছিল। আসলে কূটনীতির ভাষা সাধারণ ভাষা থেকে ভিন্ন হয়। ধরুন আপনি কিছুই বললেন না, নীরব থাকলেন- তাতেও কিন্তু অনেক সময় আসল কথাটি বলা হয়ে যায়। আবার একটি বা দুটি শব্দ বললেন নিছক কৌতুকের ছলে, তাতেও কাজ হাসিল হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো ধরনের নেগোসিয়েশনে না গিয়েই উপহার দিয়ে একটি অন্তর্নিহিত মেসেজ পাঠানো যায়। আর এটাই কূটনীতি। অ্যাকাডেমিক ভাষায় বললে কূটনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম। ইংরেজি Diplomacy শব্দটি ১৭৯৬ সালে আইরিশ ফিলোসোফার এডমন্ড বার্ক প্রচলিত ফরাসি শব্দ 'diplomatie' থেকে প্রচলন হয়। বাংলা কূটনীতি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ "কূটানীতি” থেকে আগত। প্রথম মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা চাণক্য কৌটিল্য'র নাম থেকে কূটনীতি শব্দটির উদ্ভব ঘটেছিল।

০৩. Treaty- চুক্তি/ সন্ধিপত্র : বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অথবা একটি স্বাধীন দেশ ও একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থাপিত অফিশিয়াল (Legal) ও লিখিত (Written) কোনো চুক্তিকে বলা হয় "Treaty"। অনেক সময় নিচে উল্লিখিত বিষয়গুলোও Treaty হিসেবে বিবেচনা করা হয়- International agreement, Protocol, Covenant, Convention, Pact, Exchange of letters ইত্যাদি।

০৪. Accords- চুক্তি : আন্তর্জাতিক কোন চুক্তিতে যখন একসাথে অধিক বিষয় যুক্ত থাকে তখন সেটি Treaty হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর যদি চুক্তিতে কমসংখ্যক বিষয় যুক্ত থাকে তখন সেটিকে বলা হয় "Accords”। তবে বর্তমানে Treaty ও Accord দুটোকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়।

০৫. Convention- নিয়মপত্র : দুই বা ততোধিক বিরোধপূর্ণ দেশ একটি সাধারণ স্বার্থে (Common Good) একমত হওয়া। এখানে Treaty অপেক্ষা কম বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং যে-সকল বিষয় মেনে চললে উভয় দেশ উপকৃত হবে। যেমন- রামসার কনভেনশন, The Law of The Sea ইত্যাদি। কনভেনশন ও ট্রিটির মধ্যে আরেকটি পার্থক্য হলো- Convention is less formal than treaty।

০৬. Ramsar Convention- রামসার কনভেনশন: জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ইরানের রামসার শহরে একটি পরিবেশবাদী সম্মেলন হয়। যেখানে জলাভূমির (Wetlands) টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হয়। এটি রামসার কনভেনশন চুক্তি বলে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে রামসার কনভেনশন চুক্তি কার্যকর হয়। ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে বর্তমানে ১৭১টি দেশ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সই করে। বাংলাদেশের দুইটি স্থানকে রামসার চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়- সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর। হাকালুকি হাওরকেও রামসার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন বছর পর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রামসার কনভেনশনকে আবার “Convention on Wetlands" ও বলা হয়।

০৭. Modus Vivendi- অস্থায়ী চুক্তি: অস্থায়ী বা Temporary কোনো চুক্তি। সাধারণত যুদ্ধ বা দ্বন্দ্বরত দুইটি দেশ সাময়িকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে যে চুক্তি করে সেটিই 'Modus Vivendi' হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় না। এই Modus Vivendi কে আবার Cease Fire বা Armistice ও বলা হয়ে থাকে। Armistice, Cease fire, Modus Vivendi তিনটি একই অর্থ বহন করে।

০৮. Peace Treaty (শান্তি চুক্তি): এই পরিভাষাটি "Modus Vivendi" বা অস্থায়ী চুক্তির বিপরীত। পিস ট্রিটির মাধ্যমে চিরস্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হয়। পিস ট্রিটি বা শান্তি চুক্তি কখনো অস্থায়ী হয় না। শান্তি চুক্তি হয় চিরস্থায়ী। উদাহরণস্বরূপ- (ক) Paris Peace Accords: ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯৭৩ সালে সংগঠিত একটি শান্তি চুক্তি। উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ হয়। (খ) Korean Armistice Agreement: ১৯৫৩ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী স্থান পানমুজানে এই চুক্তিটি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য স্বাক্ষরিত হয়। যদিও প্রথমে এই চুক্তিটি Cease fire বা সাময়িক যুদ্ধ বিরতির উদ্দেশ্যে হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে এটাই দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পরিণত হয়। (গ) Peace of Westphalia: হলি রোমান এম্পায়ার বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৬৪৮ সালে দুইটি চুক্তি একসাথে স্বাক্ষরিত হয়। এই দুইটি চুক্তিকে একসাথে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি বলা হয়। প্রথম চুক্তির মাধ্যমে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ বা Thirty Years' War (1618-1648) বন্ধ করা হয়। দ্বিতীয় চুক্তির মাধ্যমে আশি বছরের যুদ্ধ বা Eighty Years' War (1568-1648) বন্ধ করা হয়। এই যুদ্ধে ইউরোপের প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। (ঘ) Treaty of Sevres: সেভ্রে চুক্তি হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্র শক্তি ও বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহ্যবাহী চুক্তি। ১৯২০ সালে সংগঠিত হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন, ফ্রান্স, গ্রিস ও ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দখল করে নেয়। (ঙ) Treaty of Versailles: ভার্সাই চুক্তি। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তকারী চুক্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯১৯ সালে জার্মানি ও মিত্র শক্তির মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে জার্মানিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

০৯. Letter of Intent : সংক্ষেপে যাকে “LOI” বলা হয়। লেটার অফ ইন্টেন্ট হলো এমন একটি সম্মতিপত্র যেখানে দুটি রাষ্ট্র বা দুটি পক্ষের মধ্যে পরবর্তীতে চুক্তি করার ইচ্ছা পোষণ করা হয়। অর্থাৎ এখনই নয় বরং পরবর্তী কোন এক সময়ে আমরা একটি চুক্তিতে লিপ্ত হব এমন ইচ্ছে প্রকাশ। যেমন- প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ২০২১ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের সাথে 'লেটার অফ ইন্টেন্ট' সই করেছে।

১০. Memorandum of Understanding (MOU): মউ হচ্ছে খসড়া চুক্তি বা চুক্তির আগে চুক্তি। এই চুক্তি মানার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই চুক্তির শর্ত না মানলেও শাস্তির বিধান নেই। যেমন- ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করলে বাংলাদেশের সাথে প্রায় ২৭টি খসড়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এখন বাংলাদেশ যদি ঐসব খসড়া চুক্তি মানতে অস্বীকার করে তাহলে চীন অফিশিয়ালি বাংলাদেশকে চুক্তি মানতে বাধ্য করতে পারবে না। একই ভাবে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ভারতের সাথে তিস্তা নিয়ে মউ সাইন করেছিল। কিন্তু ভারত তা মানতে বাধ্য নয় বলে তিস্তা সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। উল্লেখ্য, Memorandum of Understanding এর সাথে Gentlemen agreement এর একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। Gentlemen agreement হলো একটি অনানুষ্ঠানিক মৌখিক বা অলিখিত চুক্তি যা কোনো রাষ্ট্র আইনগতভাবে মানতে বাধ্য নয়।

১১. Envoy (দূত): এমন ব্যক্তি যিনি কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন। যাকে অন্য কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলার জন্য প্রেরণ করা হয়। যেমন- জাতিসংঘের Envoy হিসেবে এঞ্জেলিনা জোলি রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। (Someone who is sent as a representative from one government or organization to another)

১২. Emissary (গূঢ়সংবাদবাহক) : এমন একজন ব্যক্তি যাকে বিশেষ কোনো কাজের দায়িত্ব দিয়ে বা বার্তা নিয়ে অন্য দেশে পাঠানো হয়। (A person sent as a diplomatic representative on a special mission)

১৩. Embassy (দূতাবাস) : একজন রাষ্ট্রদূত বা অ্যাম্বাসেডর যেখানে বাস করেন তা দূতাবাস নামে পরিচিত। সাধারণত দূতাবাস বৈদেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক বরাদ্দকৃত এবং তা দেশটির রাজধানী এলাকায় অবস্থিত। যেমন- ইরানের রাজধানী তেহরানে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে, ফ্রান্সের প্যারিসে, জার্মানির বার্লিনে, রাশিয়ার মস্কোতে, মিশরের কায়রোতে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে।

১৪. Consulate General- কনসুলেট জেনারেল: দূতাবাস থাকে রাজধানী শহরে। আর কনসুলেট জেনারেল হচ্ছে রাজধানী ব্যতীত অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে থাকে। কনসুলেট জেনারেল দূতাবাসের অধীনেই কাজ করে। যেমন- চীনের রাজধানী বেইজিং এ বাংলাদেশের দূতাবাস, আর হংকং এবং কুনমিং এ কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আমাদের দূতাবাস এবং জেদ্দাতে কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় বাংলাদেশের দূতাবাস, আর ইস্তাম্বুলে কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। উল্লেখ্য, 'কনসুলেট' আর 'কনসুলেট জেনারেল' প্রায় একই। তবে কনসুলেট জেনারেলের তুলনায় কনসুলেট একটু ছোট পরিসরে কাজ করে।

১৫. Embassy Officials (দূতাবাসের কর্মকর্তা) : একজন রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার জন্য কিছু প্রশিক্ষিত ব্যক্তিকে দূতাবাসে নিয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রদূতকে সহোযোগিতাকারী এসব কর্মকর্তারাই 'দূতাবাসের কর্মকর্তা' নামে পরিচিত।

১৬. Ambassador-in-residence : সরকার কর্তৃক একজন রাষ্ট্রদূতকে যখন অন্য একটি দেশে পাঠানো হয়, তখন সেই রাষ্ট্রদূত প্রেরিত দেশে ৪/৫ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে অবস্থান করেন। যে সকল রাষ্ট্রদূতকে অন্য আরেকটি দেশে নির্দিষ্ট সময় পরিমাণ অবস্থান করতে হয় তাদেরকে বলা হয় “Ambassador-in-residence”। অর্থাৎ তার কাজকর্ম একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

১৭. An ambassador-at-large : এরা হচ্ছে একটি দেশের অনেক উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রদূত, যাদের কার্যক্রম কোনো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। প্রথমত, এরা একটি বিশাল অঞ্চল বা রিজিওন নিয়ে কাজ করে। মনে করুন বাংলাদেশ সরকার একজন বিজ্ঞ কূটনীতিবিদকে দায়িত্ব দিল যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থকে দেখাশোনা করার জন্য। কিংবা একজন রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব দিল সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখাশোনা করার জন্য। বিশাল অঞ্চল নিয়ে কাজ করে এমন কূটনীতিবিদদের বলা হয় An ambassador-at-large। দ্বিতীয়ত, যে-সকল রাষ্ট্রদূত অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এমন আন্তর্জাতিক সংস্থায় একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করে তারার অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ। যেমন- বাংলাদেশের কোনো একজন রাষ্ট্রদূত যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে তখন তাকে বলা হয় An ambassador-at-large। উল্লেখ্য, প্রশ্ন হতে পারে- অ্যাম্বাসেডর আর অ্যাম্বাসেডর ইন রেসিডেন্স এর মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? উত্তর হচ্ছে দুটোই প্রায় সেইম। অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ বোঝাতে অ্যাম্বাসেডর ইন রেসিডেন্স নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে।

১৮. Diplomatic Immunity (কূটনীতিক সুবিধা): একটি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং সে- দেশের দূতাবাসে অবস্থানরত কর্মীরা ব্যাপক কূটনৈতিক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। হোস্ট কান্ট্রি তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এমনকি বিদেশে অবস্থানকালীন কোনো অপরাধের জন্য তাঁরা গ্রেপ্তার কিংবা বিচারের মুখোমুখি হন না। শাস্তি হিসেবে তাঁদেরকে কেবল নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়ে থাকে। এসকল সুযোগ সুবিধাকেই বলা হয় ডিপ্লোমেটিক ইমিউনিটি।

১৯. Persona Non Grata: কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যবহৃত এই টার্মটি একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে, তার দেশে অবস্থানরত অন্যান্য দেশের কূটনীতিবিদদের মধ্যে কোনো একজন কূটনীতিক তার দেশের জন্য মঙ্গল জনক নয় বরং তার দেশের জন্য সে ক্ষতিকর হতে পারে, তার দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য সে থ্রেট হতে পারে, কিংবা তার দেশের নিরাপত্তার জন্য সে হুমকি হতে পারে, তাহলে দেশটি ওই কূটনীতিককে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারবে এবং তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারবে। ১৯৬১ সালের "Vienna Convention On Diplomatic Relations" এর আর্টিকেল ০৯ অনুযায়ী স্বাগতিক দেশ প্রেরণকারী দেশের যে-কোনো কূটনীতিককে কারণ না দেখিয়েই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারে। তবে কূটনীতিক বহিষ্কারের আন্তর্জাতিক নিয়ম থাকলেও সাধারণত কোনো দেশ এটি বর্তমানে করতে চায় না। কারণ অন্য রাষ্ট্র এতে অপমান বোধ করে। তাই কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়।

২০. Ambassadress: মনে রাখা জরুরি Ambassadress হলো, ambassador এর স্ত্রী। অর্থাৎ এটি দ্বারা কোনো মিশনের স্ত্রীপ্রধানকে বোঝানো হয় না।

২১. Brand ambassador: একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বা সেলেব্রিটি, যিনি কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বা সেবার প্রমোশনে কাজ করেন।

২২. Charge d'Affaires/ ad interim: পদের দিক থেকে একজন Ambassador এর নিচের কোনো কর্মকর্তা যিনি Ambassador এর অনুপস্থিতিতে অ্যাম্বাসেডরের দায়িত্ব পালন করেন। Chargé d'Affaires কে বর্তমানে 'a.i.' বা 'ad interim'ও বলা হচ্ছে।

২৩. Minister Plenipotentiary: সাধারণত একজন রাষ্ট্রদূত কখনো একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাষ্ট্রদূতকে যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তার দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু Minister Plenipotentiary এটি হলো এমন এক ধরনের বিশেষ রাষ্ট্রদূত যাদেরকে সরকার পরিপূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দেয়। যে কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এদেরকে সরকারের সাথে আলোচনা করতে হয় না। এদেরকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। বিশেষ করে কূটনৈতিক অঙ্গনে যারা অনেক সিনিয়র, একইসাথে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ তাদেরকে সরকার এই মর্যাদা দিয়ে থাকে।

২৪. Rapporteur: যিনি কোনো আন্তর্জাতিক সভা বা সমিতির কার্যবিবরণী তৈরি করে তা উচ্চতর সংস্থা বা সাধারণ সভায় পেশ করেন তাকেই Rapporteur বলা হয়। অর্থাৎ কোনো কমিটি বা সাব কমিটির ঐসকল ব্যক্তি যাদের দায়িত্ব হলো আলোচনার সারমর্ম তৈরি করা।

২৫. Unilateralism- একলা চলো নীতি: অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাও প্রতিষ্ঠানকে তোয়াক্কা না করে নিজের মতো করে চলা। উদাহরণস্বরূপ উত্তর কোরিয়ার কথা বলা যায়। উত্তর কোরিয়া কারো কথাই তোয়াক্কা করছে না বরং নিজের ইচ্ছেমতো তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

২৬. Shanghai Five- সাংহাই ফাইভ: বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে মধ্য এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি চীনকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। তাই চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বারা সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ২ এপ্রিল চীনের সাংহাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে 'সাংহাই ফাইভ' গঠন করা হয়। আর এটাই ২০০১ সাল থেকে ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা' হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে, Shanghai Cooperation Organisation- SCO। ২০০১ সালে উজবেকিস্তানকেও এর সদস্যপদ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান এর সদস্য হয়। তাই বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এই আটটি রাষ্ট্র এর সদস্য। বর্তমানে এটি ইউরেশিয়ান অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

২৭. Sin Fein- সিনফেইন : বর্তমানে আয়ারল্যান্ড দুভাগে বিভক্ত; উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র। আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অধীনে। দীর্ঘদিন ধরে তারাও স্বাধীনতা চাচ্ছে। তাই ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার জন্য উত্তর আয়ারল্যান্ডে যে আন্দোলন হচ্ছে সেটি মূলত পেছন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে 'সিনফেইন' নামের একটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল। এই দলটি মূলত স্বাধীন আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের গেরিলা সংগঠন 'আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি'র একটি রাজনৈতিক শাখা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি তাদেরকে অস্ত্রের সাপ্লাই দিচ্ছে, আর সিনফেইন যুদ্ধের প্রচারণা চালাচ্ছে।

২৮. মৈত্রী চুক্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির মধ্যে পার্থক্যসমূহ: রাষ্ট্রগুলো তাদের আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। সে চুক্তিগুলো হতে পারে মৈত্রী চুক্তি অথবা নিরাপত্তা চুক্তি। এই উভয় চুক্তির মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, দুটি রাষ্ট্র যখন তাদের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি স্বার্থ উদ্ধারে কোনো সহযোগিতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন তাকে মৈত্রী চুক্তি বলা হয়। মৈত্রী চুক্তিকে ইংরেজিতে Treaty of Friendship বা Friendship Treaty বলা হয়। নিচে কয়েকটি মৈত্রী চুক্তির উদাহরণ দেওয়া হলো। ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Treaty of Amity and Commerce, বলিভিয়া ও চিলির মধ্যে Treaty of Peace and Friendship, জার্মানি ও তুরস্কের মধ্যে German-Turkish Treaty of Friendship ইত্যাদি। অপরদিকে একাধিক রাষ্ট্র যখন শুধু তাদের নিরাপত্তা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন তাকে নিরাপত্তা চুক্তি বলা হয়। নিরাপত্তা চুক্তির আওতাভুক্ত থাকা কোনো দেশ যদি তার নিরাপত্তা রক্ষায় হুমকির মুখে পড়ে অথবা অন্য আরেকটি দেশ কর্তৃক আক্রমণের শিকার হয় তখন চুক্তিতে থাকা অন্য সকল দেশ রাষ্ট্রটির নিরাপত্তা রক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য। নিরাপত্তা চুক্তির কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত আনজুস (ANZUS) চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য- অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত অকাস (AUKUS) চুক্তি ইত্যাদি।

২৯. Preventive Diplomacy (প্রতিরোধমূলক কূটনীতি) : কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত সংঘাত বা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে চায় না। সংঘাতে জড়ানো একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ব্যাহত করে। তাই সংঘাত এড়িয়ে কোনো একটি দ্বন্দ্ব বা সংকট সমাধান করার লক্ষ্যে যে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হয় তাকেই প্রতিরোধমূলক কূটনীতি বলা হয়। অনেক সময় দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংস্থা ইত্যাদি এগিয়ে আসে এবং সংঘাত নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। আর সেটিও প্রতিরোধমূলক কূটনীতির উদাহরণ।

৩০. Gunboat Diplomacy (গানবোট কূটনীতি): "Speak softly and carry a big stick; you will go far"-বিখ্যাত এই উক্তিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিউডর রুজভেল্টের। গানবোট ডিপ্লোমেসির কথা বলতে গেলে এই উক্তিটি দিয়ে শুরু করতে হয়। তথা গানবোট কূটনীতির মূল কথা হলো, শত্রু রাষ্ট্রকে এমনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা যাতে সে মনে করে আমি সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং যে-কোনো সময় তাকে আক্রমণ করে বসতে পারি। যদিও সরাসরি সামরিক আক্রমণ করার ইচ্ছে আমার নেই। এভাবে কূটনৈতিক কৌশলে সামরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পিছু হটাতে বাধ্য করাকেই গানবোট ডিপ্লোমেসি বলা হয়। উল্লেখ্য, গানবোট ডিপ্লোমেসিকে আবার 'Big Stick Diplomacy'ও বলা হয়।

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি

📄 অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি


অষ্টম অধ্যায়
Theme: The Great Transformation
অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি

"It's called political economy because it is has nothing to do with either politics or economy." - Stephen Leacock

ভূমিকা: নতুন এই বিশ্বব্যবস্থায় 'Creative Destruction' এর কারণে সৃষ্টি হতে পারে নতুন আরেকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট। সেই বৈশ্বিক সংকট থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যে অর্থনীতি তার 'Self-correction' এর দিকে হাঁটবে, নাকি সেখানে 'Government Intervention' এর প্রয়োজন হবে তা একটি মুখ্য প্রশ্ন। বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটগুলোকে বুঝতে হলে এর ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ সম্পর্কে জানা আবশ্যক। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজকের একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবন কাঠামো কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তাই আলোচনা করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। মানব ইতিহাসের প্রতিটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রান্তিলগ্নে নতুন আরেকটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আবির্ভাব হয়েছে। এই আবির্ভাব পরিবর্তন করে দিয়েছে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে। তাই রাজনৈতিক অর্থনীতির (Political Economy) একটি বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনা করার চেষ্টা করব। আশাকরি বিষয়টি পাঠকের বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

Primitive Communism (আদিম সমাজতন্ত্র)
প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে থাকত। যাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক ছিল তারা একসঙ্গে থাকত। এই দলগুলোকে 'ট্রাইব' বলা হতো। তারা তীর, ধনুক, লাঠি ইত্যাদির মাধ্যমে একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত, পশুপাখি শিকার করত, ফলমূল আহরণ করত এবং যা পেত তা সবাই একসঙ্গে বসে ভোগ করত। তাই তৎকালীন এই সমাজটিকে 'Hunting and Gathering Society' বলা হয়। আর মানুষের দলবদ্ধভাবে বসবাস এবং যা কিছু শিকার করত তা একসাথে বসে ভোগ করার এই সমাজব্যবস্থাকে বলা হয় Primitive Communism বা আদিম সমাজতন্ত্র। তথা তখন কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ছিল না।

Household Economy
প্রাগৈতিহাসিক সময়ের পর এনশিয়েন্ট পিরিয়ডে মানুষ যখন নানা যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করল, পশুপাখি পোষ মানাতে শিখল এবং কৃষিকাজ শুরু করল তখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা দেখা দিল। আজকের আধুনিক পুঁজিবাদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি সেটির ধারণা দিয়েছিলেন এরিস্টটল। কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদ ও কমিউনিজম ব্যাখ্যায় এরিস্টটল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মনে করুন টাকা-পয়সা ইনকামের জন্য আপনার কোনো কাজকর্ম করা লাগে না, বাসায় রাখা কর্মচারী সকালে ঘুম থেকে উঠার পর নাস্তা তৈরি করে আপনার সামনে উপস্থাপন করে, লাঞ্চের সময় আপনার ডাইনিং টেবিলে খাবার রেডি থাকে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে মশারিটাও অন্য আরেকজন টানিয়ে দেয়। এই যে কাজকর্মবিহীন ও চিন্তামুক্ত আরাম-আয়েশের জীবন, এটিকে এরিস্টটল সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘Good Life' হিসেবে।

এরিস্টোটলিয়ান ইকোনমি হচ্ছে এই গুড লাইফের উপর ভিত্তি করে। এরিস্টটল রাজনীতি ও অর্থনীতিকে একসাথে দেখেছেন। একটি পরিবারে দুই ধরনের মেম্বার থাকে। প্রথম শ্রেণি হচ্ছে মুক্ত সদস্য (Free members)। অর্থাৎ পরিবারের মনিব, যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন, আগামীকাল কী কী উৎপাদন করা হবে, আজকে কী কী রান্না করা হবে। ডিসিশন মেকিং বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটি পালন করেন পরিবারের ফ্রী মেম্বাররা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই কাজটিই পলিটিক্স বা রাজনীতি। আর পরিবারের দ্বিতীয় শ্রেণিটি হচ্ছে দাসদাসী (Servile Members), যারা মনিবের কথানুযায়ী প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা থেকে শুরু করে বাজার করা, রান্না করা ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজকর্ম সম্পাদন করবে। এরিস্টোটলিয়ান ধারণা অনুযায়ী পরিবারের ফ্রি মেম্বারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজটিই হচ্ছে পলিটিক্স, আর সার্ভাইল মেম্বার বা দাসদাসীর কাজগুলো হচ্ছে ইকোনমি। যারা মনিব তাদের লাইফটি হতে হবে ওই উপরের Good Life এর মতো, তাদেরকে পর্যাপ্ত ফ্রি টাইম (Leisure) দিতে হবে। কারণ তারা অবসর সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি নিয়ে ভাববে, সমাজের মূল্যবোধ কী হবে সেগুলো ঠিক করবে। তাই রাজনীতিবিদদের জন্য গুড লাইফ নিশ্চিত করতে হবে। আর অর্থনৈতিক কাজকর্ম সব সারভাইল মেম্বার বা দাসদাসীরা দেখাশোনা করবে। এরিস্টটলের এই রাজনৈতিক অর্থনীতির আইডিয়াটি 'Household Economy' বা গৃহের ব্যবস্থাপনা নামে পরিচিত। এরিস্টটলের এই ধারণাটি হাজার বছরের পুরোনো হলেও আজকের দুনিয়ায় এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। রাজনীতিবিদরা তাদের গুড লাইফ নিশ্চিত করছে, আর এরিস্টটলের বর্ণিত সার্ভাইল মেম্বারদের সাথে আজকের কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিকদের খুব বেশি পার্থক্য করা যাবে কি?

মানুষ তখন পণ্যদ্রব্য (Commodity) উৎপাদন করত প্রয়োজন মিটানোর জন্য, জীবিকা নির্বাহের জন্য। একটি পরিবার যেসব পণ্য উৎপাদন করতে পারত না সেটি অন্য পরিবার থেকে নিয়ে আসত। তথা পণ্যের বিনিময়ে পণ্য অদলবদল (Exchange) হতো। সেখানে পণ্য উৎপাদন করে মুনাফা লাভের কোনো ধারণা ছিল না। পুরো অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সিস্টেমটি ছিল 'C-M-C' মডেলের মতো। তথা 'C' তে আমার প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন (Commodity)। 'M' তে যেটি আমি উৎপাদন করতে পারিনি সেটি অন্যজন থেকে এক্সচেঞ্জ করে নিয়ে আসা (Money)। উল্লেখ্য, এখানে Money বলতে বিনিময়ের মাধ্যম বোঝানো হয়েছে। 'C' তে অন্যজন যেটি উৎপাদন করতে অক্ষম আমি তাকে সেটি দিয়ে দিলাম (Commodity)। তথা হাউজহোল্ড ইকোনমি'র মধ্যে পণ্য উৎপাদন করে মুনাফা অর্জনের কোনো ধারণা ছিল না।

পুঁজিবাদের ভিত্তি (Foundation of Capitalism)
১৭৭৬ সালে পুঁজিবাদের নতুন এক রূপরেখা নিয়ে হাজির হন স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ। 'ফাদার অব ইকোনমিকস' হিসেবে পরিচিত স্মিথ ক্যাপিটালিজমের নতুন স্বরূপ উন্মোচন করেন তাঁর লিখিত- "An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations" নামক বইয়ে। স্মিথ দেখানোর চেষ্টা করলেন, এরিস্টোটলিয়ান ইকোনমিক মডেল সমাজের অগ্রগতির জন্য বাঁধা। কেননা দাসদাসীরা শুধু প্রয়োজনীয় কাজ করে এবং সেগুলো জোরপূর্বক হওয়ায় পণ্য উৎপাদনে তারা আগ্রহী হয় না। তাই তিনি Slavery বা দাস প্রথার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে অর্থনৈতিক কাজ-কর্মগুলো সব আলাদা হতে হবে। মার্কেটে রাষ্ট্রের উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। কারণ মার্কেট চলে Invisible Hand বা অদৃশ্য হাতের মাধ্যমে। এর মানে হচ্ছে মার্কেটে সবকিছুই অটো সেট করা, চাহিদা এবং যোগানের ভিত্তিতে মার্কেট নিজে নিজে কাজ করতে পারে। দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে জনগণের চাহিদা হ্রাস পাবে, আর মূল্য হ্রাস পেলে জনগণের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, এটি হচ্ছে মার্কেটের অঘোষিত নীতি। তাই এখানে রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই।

স্মিথ প্রথমে রাজনীতি থেকে অর্থনীতিকে পৃথক করেন। তাঁর মতে, রাজনীতি ও অর্থনীতি দুটি আলাদা জিনিস। রাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক কাজকর্ম করবে, আর অর্থনীতি হবে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন যা বিভিন্ন ফার্মের অধীনে থাকবে। রাজনীতির কাজ রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আর অর্থনীতির কাজ হচ্ছে মুনাফা বা রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি করা। যার কাছে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে মূলধন রয়েছে, সে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্য পণ্য উৎপাদন করবে। দাসদের মধ্যে পণ্য উৎপাদনের কোনো প্রণোদনা (Incentives) বা উদ্দীপনা ছিল না। কিন্তু পণ্য উৎপাদনে মুনাফা অর্জনের মতো প্রণোদনাগুলো ফার্মগুলোকে অনুপ্রেরণা দেবে বেশি বেশি পণ্য উৎপাদনের। এরিস্টোটলিয়ান সেই 'C-M-C' মডেলের বিপরীতে এডাম স্মিথের মডেল হচ্ছে 'M-C-M' মডেল। তথা 'M'-তে উৎপাদনের উপকরণ পুঁজি (Money), 'C'-তে মূলধন বিনিয়োগ করে প্রচুর পরিমাণে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা (Commodity), 'M'-তে উৎপাদিত সেসব পণ্য বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন (Money)। এডাম স্মিথ রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধিতে সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতেও জোর দিয়েছেন। প্রথমত, অন্য রাষ্ট্র আক্রমণ করলে কিংবা যুদ্ধ শুরু হলে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়, ফলশ্রুতিতে উৎপাদনও হ্রাস পায়। তাই সেনাবাহিনী যুদ্ধ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, মিলিটারি শক্তি থাকলে অন্য রাষ্ট্রের কলোনি বা বাজার দখল করা যায় এবং অন্য রাষ্ট্রের বাজারে নিজ দেশের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করা যায়।

Absolute Advantage Theory
তারপর আসলো Absolute Advantage Theory, যার মূল কথা হচ্ছে পৃথিবীতে এমন কিছু নির্দিষ্ট পণ্য যেটি আমি একাই উৎপাদন করতে পারি, কিন্তু অন্য রাষ্ট্র পারে না। যেমন তেলের কথা যদি আমরা বলি তাহলে দেখা যায় সৌদি আরব সেটি উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ তেল উৎপাদন করতে পারে না। কারণ সৌদির কাছে তেলের খনি রয়েছে যা অন্যদের নেই। তাই তেল হচ্ছে সৌদির জন্য Absolute Advantage বা বিশেষ সুবিধা। তাই তেলের জন্য অন্য রাষ্ট্রগুলোকে সৌদি আরবের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। একই ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা স্বর্ণ উৎপাদন করতে পারে। কারণ সেদেশে স্বর্ণের খনি রয়েছে। কিন্তু ভারত স্বর্ণ উৎপাদন করতে পারে না যেহেতু ভারতে স্বর্ণের খনি নেই। তাই স্বর্ণ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বিশেষ সুবিধা। তাই অন্য রাষ্ট্রগুলোকে স্বর্ণের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার উপর নির্ভরশীল হতে হয়। এই নির্ভরশীলতার কারণে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্যে লিপ্ত হতে হয়।

Comparative Advantage Theory
জাতিরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো 'Comparative Advantage Theory' নামে আরেকটি তত্ত্ব উপস্থাপন করলেন। এমন অনেক ধরনের পণ্য রয়েছে যেটি অনেকগুলো রাষ্ট্রই উৎপাদন করতে পারে। যেমন- বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়ই আলু ও ধান এই দুটি পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম। এখন মনে করি বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় কম খরচে আলু উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু ধান উৎপাদন করতে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের খরচ অনেক বেশি হয়। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় কম খরচে ধান উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের থেকে বেশি খরচ হয়। তাই বাংলাদেশ দুটি পণ্যের মধ্যে যেটি সবচেয়ে ভালো এবং কম খরচে উৎপাদন করতে পারে সেটিই উৎপাদন করবে। আর যেটি কম খরচে উৎপাদন করতে পারে না সেটি অন্য রাষ্ট্র থেকে নিয়ে আসবে। তাই তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশ শুধু আলু উৎপাদন করবে আর ভারত ধান উৎপাদন করবে। তারপর দুটি দেশ বাণিজ্যে লিপ্ত হবে। বাংলাদেশ ভারত থেকে ধান আমদানি করবে এবং বিনিময়ে ভারতের কাছে আলু রপ্তানি করবে। ভারতও বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানি করবে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের কাছে ধান রপ্তানি করবে। Comparative Advantage Theory অনুযায়ী দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য হলে সবাই সমানভাবে লাভবান হয়।

Competitive Advantage Theory
এবার আসি Competitive Advantage Theory নিয়ে। এই থিওরির মূল বক্তব্য হচ্ছে, মার্কেটে যখন তীব্র প্রতিযোগিতা হবে তখন জনগণ বেশি লাভবান হবে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স উভয়ই এরোপ্লেন উৎপাদন করতে পারে। এখন মনে করি দুটি দেশের তৈরিকৃত এই এরোপ্লেন কোয়ালিটি এবং ডিজাইনের দিক থেকে সমমানের। কিন্তু গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতা থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্স কিছুটা কম দামে এরোপ্লেন অফার করছে। তখন সাধারণত সবাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করার পরিবর্তে ফ্রান্স থেকে এরোপ্লেন ক্রয় করবে। কম্পেটিটিভ এডভান্টেজ এর সুবিধা হচ্ছে যে, মার্কেটে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেলে যারা সাধারণ জনগণ তারা উপকৃত হবে। এডাম স্মিথের মতে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং মার্কেটে টিকে থাকতে ফার্মগুলো পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাই পণ্যের মূল্য কমাতে মার্কেটে সরকারের হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই।

প্রথম শিল্পবিপ্লব (First Industrial Revolution)
এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডোর উপরিউক্ত তত্ত্ব ইউরোপ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে। আর তখনই পুঁজিবাদের প্রসার (Moments) হয়েছিল। ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ এই দীর্ঘ সময়টিতে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশদের কলোনি ও সাম্রাজ্য থাকায় ইংল্যান্ড ছিল তখন আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ। পুরো দুনিয়ার সম্পদ ইংল্যান্ডে পুঞ্জীভূত হতো। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, কয়লার খনি আর ইস্পাতের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে ইউরোপ জুড়ে প্রচুর কলকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৭৫০ সালে ইস্পাত গলানোর পদ্ধতি আবিষ্কার, ১৭৬৯ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, ১৮১৫ সালে খনিগর্ভে কাজ করার যন্ত্র আবিষ্কার, ১৮০৭ সালে স্টিমবোট আবিষ্কার, ১৮২৫ সালে রেল ইঞ্জিন আবিষ্কার ইত্যাদি পাল্টে দেয় ইউরোপের চেহারা। ইংল্যান্ড হয়ে ওঠে বিশ্বের পণ্য তৈরির কারখানা। যে কারণে ইংল্যান্ডকে 'Workshop of the World' বা পৃথিবীর কর্মশালা বলা হতো। শিল্পবিপ্লবের পূর্বে মানুষ কৃষিকাজ করত কিন্তু বিপ্লবের পরে কৃষিকাজ ছেড়ে কলকারখানায় কাজ করতে শুরু করে। যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের কারণে পণ্যের উৎপাদনও বেড়ে যায়। গ্রামের কুটির শিল্প ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হতে থাকে।

Capitalism (পুঁজিবাদ)
পণ্যদ্রব্য উৎপাদনের জন্য যে জিনিসগুলো প্রয়োজন তথা পুঁজি, ভূমি, শ্রম, প্রযুক্তি, কলকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এগুলোকে বলা হয় উৎপাদনের উপকরণ (Means of Production)। পুঁজিবাদ এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে এই উৎপাদনের উপকরণ রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তিমালিকানাধীন। অর্থাৎ সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকা এবং লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন করাকেই সাধারণত পুঁজিবাদ বলা হয়। একজন শ্রমিকের পুঁজি হচ্ছে তার শ্রম, ইন্ডাস্ট্রি মালিকদের পুঁজি হচ্ছে তাদের কলকারখানা, একজন জমিদারের পুঁজি হচ্ছে তার জমি, একজন ধনী লোকের কাছে পুঁজি হচ্ছে তার গচ্ছিত টাকা পয়সা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের বিকাশকালীন সমাজব্যবস্থায় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল। একটু পরেই আমরা কার্ল মার্ক্সে ঢুকে যাব। তাই সমস্যাগুলো ছোট করে আলোচনা করা প্রয়োজন।

পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু মার্কেটে গিয়ে অন্য পুঁজিপতিদের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। কারণ একই পণ্য বিভিন্ন জন মার্কেটে নিয়ে আসছে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হবে, কম দামে পণ্য বিক্রি করার জন্য সেই পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে, কম খরচে উৎপাদনের জন্য যাদেরকে দিয়ে আমি কাজগুলো করাচ্ছি সেইসব শ্রমিকদেরও বেতন কম দিতে হবে। তাই শ্রমিকদের শোষণ করার ধারণাটি সেখান থেকেই আসে। ইউরোপে দেখা গিয়েছিল যে, অনেক কলকারখানার মালিক প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার কারণে তাদের কলকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরাও তাদের চাকরি হারিয়েছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে- কলকারখানাগুলোতে যেসব পণ্য উৎপাদিত হতো সেসবের ক্রেতা কারা ছিল? ইউরোপে তখনো অসংখ্য মানুষ দরিদ্র ছিল, যারা এই কলকারখানাগুলোতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। এখন এই শ্রমিক, কৃষক, গ্রামের মানুষ তারাই কিন্তু পণ্যগুলো ক্রয় করত। তাদের ইনকামও ছিল কম। তাই মার্কেটে গিয়ে এসব পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের সামর্থ্য অনেকের ছিল না। পণ্য বিক্রি না হওয়াতে কলকারখানার গুদাম পণ্য বোঝাই হয়ে যেত। তখন মালিকরা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিত এবং সেখানকার শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়ত। যন্ত্রপাতির সাহায্যে খুবই কম সময়ের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে অধিক পরিমাণে পণ্যদ্রব্য উৎপাদিত হওয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের মান কমে যায়, গ্রামে গড়ে উঠা কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠলে তারা জমিদারদের থেকে সুদসহ ঋণ নিত, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে জমিদারদের কাছে জমি বিক্রি করে দিত। তখন কাজের উদ্দেশ্যে হাজারো কৃষক শহরে পাড়ি জমাতো এবং ফলশ্রুতিতে শহুরে বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল।

Imperialism and Colonialism
শিল্পবিপ্লবের সূচনা তথা ১৭৬০ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই সময়টি সাম্রাজ্যবাদের যুগ (Age of Imperialism) হিসেবে পরিচিত। শিল্পায়নের প্রভাবে ইউরোপ সমৃদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির জন্য প্রয়োজন নতুন নতুন বাজারের। একদিকে কিছু কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, অন্যদিকে শ্রমিকদের শোচনীয় অবস্থা। এসব থেকে উত্তরণের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো আমেরিকা, এশিয়া আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। অন্য দেশকে নিজ দেশের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত করার লক্ষ্যে সেখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা চালায়। আর অন্য দেশে এই আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টাকেই বলা হয় সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism)। এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোতে শিল্পের জন্য সস্তায় কাঁচামাল পাওয়া যেত। যে কারণে পণ্য উৎপাদনের খরচ কমে যেত। তাই অনুন্নত দেশগুলো থেকে এসব কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। সেই প্রতিযোগিতা থেকেই শুরু হয় কলোনি দখলের নেশা। কোনো শক্তিশালী দেশ কর্তৃক অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল করে সেখানে নিজেদের একচ্ছত্র বা সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠা করে সেটিকে বলা হয় উপনিবেশবাদ (Colonialism)। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ নিয়ে বিস্তারিত অন্যত্র আলোচনা করেছি। কলোনি দখল নিয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছিল সেটিও অনেকটা ইন্ধন যুগিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের।

Fascism (ফ্যাসিবাদ)
বিশ্বজুড়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অসংখ্য কলোনি ছিল। যে-কারণে তাদের উদ্বৃত্ত পণ্যদ্রব্য ওইসব কলোনিগুলোতে বিক্রি করতে পারত। দ্বিতীয়ত, দখলকৃত কলোনি থেকে সস্তায় কাঁচামালের যোগান পাওয়ার কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কিছুটা কমিয়ে দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারত। তৃতীয়ত, কথায় আছে টাকায় টাকা আনে। উদ্বৃত্ত মূলধন দখলকৃত কলোনিগুলোতে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে পুনরায় মুনাফা অর্জন করতে পারত। ব্রিটিশরা এজন্যই তাদের দখলকৃত কলোনিগুলোতে অনেক উন্নয়ন সাধন করেছিল। কলোনিগুলোতে রেললাইন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সবই ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল। কারণ দখলকৃত কলোনিসমূহে যোগাযোগব্যবস্থা-সহ সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হলে সেখান থেকে পরবর্তীতে অধিক পরিমাণে মুনাফা অর্জন সম্ভব। সেই ব্রিটিশ আমলের রেললাইন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এখনো অক্ষত আছে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশদের সাথে ফ্রান্সের পার্থক্যের জায়গাটি এখানেই, ব্রিটিশরা তাদের কলোনিগুলো উন্নয়নের চেষ্টা করেছে এবং কলোনির জনগণকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ফ্রান্স এসব করেনি।

ইতালি ও জার্মানির কোনো কলোনি ছিল না, যেখানে তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করতে পারবে। ইতালিতে অসংখ্য কলকারখানা অচল হয়ে পড়েছিল। পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল শ্রমিক আন্দোলন। শ্রমিক আন্দোলনের তোপে কলকারখানার মালিকরাও ঘাবড়ে যায়, তাদের সম্পত্তি রক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ১৯২২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইতালির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেনিত মুসোলিনি। শ্রমিক আন্দোলন থেকে পুঁজিপতিদের রক্ষা করার দায়িত্ব পান মুসোলিনি। তিনিও মূলত ছিলেন একজন শ্রমিক নেতা এবং শ্রমিকদের হয়ে ক্যাপিটালিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতেন। তখন শ্রমিকদের মধ্যে থেকেই শ্রমিকদের ঠান্ডা করতে মুসোলিনিকে ব্যবহার করে ক্যাপিটালিস্টরা। তিনি ক্যাপিটালিস্টদের অর্থায়নে গঠন করেছিলেন ফ্যাসিস্ট দল (National Fascist Party)। ধনীদের অর্থায়নে এই দলটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। শ্রমিকদের বিপ্লব মোকাবিলা করতে সকল পুঁজিপতি মিলে গঠন করল বিভিন্ন কাউন্সিল ও কর্পোরেশন।

এই কর্পোরেশনগুলোর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় শ্রমিক বিপ্লব থেকে ক্যাপিটালিস্টদের রক্ষা করা এবং বিপ্লব দূর করতে কলোনি দখল। কারণ নতুন কলোনি হলে সেখান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ ও সেখানে পণ্য বিক্রয় করা যাবে, কলকারখানা নতুন করে চালু করা যাবে, শ্রমিকরাও তাদের চাকরি পাবে। এতে আন্দোলন কিছুটা হ্রাস পাবে। কিন্তু ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেই সকল কলোনি দখল হয়ে গিয়েছিল। স্পেন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের দখলে ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলো। তাই কলোনি দখল করতে কলোনিওয়াদের সাথে যুদ্ধ আবশ্যিক হয়ে পড়ে। তাই মুসোলিনির নেতৃত্বে যুদ্ধের জন্য নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। যুদ্ধ মানুষকে সভ্য করে, যুদ্ধই শান্তি আনে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে উগ্র জাতীয়তাবাদী আইডিয়া প্রমোট করা হতো। আর মুসোলিনির এই উগ্র জাতীয়তাবাদী আদর্শকেই বলা হয় ফ্যাসিবাদ।

Nazism (নাৎসিবাদ)
ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ এর মধ্যে আসলে তেমন পার্থক্য নেই। জার্মানির হিটলার ও তার রাজনৈতিক দলের মতাদর্শই মূলত নাৎসিবাদ হিসেবে পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে যে চুক্তির মাধ্যমে সেটি ইতিহাসে ভার্সাই চুক্তি হিসেবে পরিচিত। চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দায়ী করা হয়, জার্মানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়, জার্মানিকে সামরিক শক্তি কমিয়ে আনতে বাধ্য করা হয়, জার্মানির অন্য দেশ থেকে সমরাস্ত্র আমদানি-রপ্তানি করার উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় ইত্যাদি। তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত নিরুপায় জার্মানির উপর ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলো অপমানজনক বলে মনে হয়েছিল। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে একদিকে জার্মানি দেউলিয়া হয়ে যায়, অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে হিটলার ক্যাপিটালিস্টদের সাহায্যে নাৎসি দল গঠন করেন। শ্রমিক আন্দোলন দমন করতে গঠিত হয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। যুদ্ধে পরাজয় এবং জার্মানির দুঃখ দুর্দশার কারণ হিসেবে ইহুদিদের দায়ী করে শুরু হয় ইহুদি নিধন। দেশের জনগণকে জার্মান জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়। হিটলার ও তার রাজনৈতিক দলের এই মতাদর্শই মূলত নাৎসিবাদ হিসেবে পরিচিত।

Feudalism (সামন্তবাদ)
ব্রিটিশ শাসনামলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে জামিনদারি সিস্টেম বা জমিদারি প্রথা বলে যেটি ছিল ইউরোপে সেটি সামন্তবাদ হিসেবে পরিচিত। শিল্পবিপ্লবের পর পুঁজিবাদের প্রসারে সামন্তপ্রথা হুমকির মধ্যে পড়ে যায়। বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। সামন্ত প্রভু বলতে এমন লোকজনকে বোঝাতো যাদের হাতে ছিল অসংখ্য কৃষি জমি। এসব জমি কৃষকদেরকে চাষাবাদের জন্য বিভিন্ন ইউনিটে ভাগ করে দেওয়া হতো। উৎপাদিত ফসলের বেশির ভাগ ফসল সামন্ত প্রভু নিয়ে নিত। সামন্ত প্রভুদের সাথে আবার রাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক ছিল। কারণ এসব প্রভুরা রাষ্ট্রকে কর দিত। কিন্তু শিল্পায়নের ফলে কলকারখানা বৃদ্ধি পেলে কৃষিকাজের চাহিদা কমে যায়, তাছাড়াও কৃষকদের উপর সামন্ত প্রভুরা নানা অত্যাচার করত। তাই কৃষকরা কৃষিকাজ ছেড়ে শহরের কলকারখানাগুলোতে কাজের উদ্দেশ্য চলে যায়। অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবের প্রভাবেই পরবর্তীতে ইউরোপে সামন্ত প্রথাও বন্ধ হয়ে যায়। সামন্ত প্রভুদের কাছে চাষিরা ছিল কৃষক, আর কলকারখানায় যোগ দিলে কৃষকরা হয়ে যায় শ্রমিক।

Marxism (মার্ক্সবাদ)
পুঁজিবাদের ইতিবাচক দিকগুলোর দিকে এখনো আমরা প্রবেশ করিনি। আলোচনার এ পর্যন্ত পুঁজিবাদের কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য আমাদের মাঝে ফুটে উঠেছে। সমাজতন্ত্র বোঝার জন্য পুঁজিবাদের এমন আরও কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কার্ল মার্ক্স তার Communist Manifesto এবং Das Kapital পুস্তিকায় সমাজের কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে আলোকপাত করেন। মার্ক্স বিষয়গুলোকে একটু ক্রিটিক্যালি দেখার চেষ্টা করেন। তাই সমাজবিজ্ঞান, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যতগুলো ক্রিটিক্যাল থিওরি রয়েছে, সেখানে মার্ক্সের মতবাদ আলোচনা করা হয়েছে। কার্ল মার্ক্স ক্যাপিটালিজম থেকে উদ্ভুত কিছু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাই কিছু সমস্যা উল্লেখ করা যাক:

(ক) Private property: পুঁজিবাদের আগের দুনিয়ায় কৃষিজমিকে (land) মনে করা হতো এটি ঈশ্বরের দান, তাই প্রয়োজনমতো সমাজের সবাই সেখানে উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু পুঁজিবাদ আসার পর জমিগুলো হয়ে গিয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন।
(খ) Labour as a product: একজন শ্রমিক সেও একজন মানুষ, পুঁজিবাদে শ্রমিককে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তথা শ্রমিক তার শ্রম দেবে, যার বিনিময়ে সে টাকা পাবে। মানুষের সাথে মানুষের যে মানবীয় সম্পর্ক সেটি হয়ে যায় materialistic বা বস্তুগত।
(গ) Individualism: গ্রাম ছেড়ে কারখানায় কাজের উদ্দেশ্যে মানুষ যখন শহরে আসছে তখন পারিবারিক যে বন্ধন সেটি আর থাকছে না। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গড়ে উঠছে। তথা সবকিছু ব্যক্তিকেন্দ্রিক। পূর্বে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে বলা হতো তুমি তো অমুক বংশের ছেলে, অমুক পরিবারের হয়ে এমন কাজ কীভাবে করতে পারলে। অর্থাৎ ব্যক্তি অপরাধ করলেও তার পরিবার ও সমাজকে টেনে আনা হতো। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর বলা হচ্ছে ব্যক্তির অপরাধের জন্য ব্যক্তি দায়ী, তার সমাজ নয়।
(ঘ) Social Crimes: শহরে অবস্থান করা একক পরিবারের পিতামাতা উভয়ই কলকারখানায় কাজ করা বা চাকরি করায় বাসায় সন্তানদের সময় দিতে পারত না। পিতামাতার অনুপস্থিতিতে তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
(ঙ) Secularism: প্রতিটি ধর্মের কিছু রিচুয়াল বা অনুষ্ঠান থাকে যেখানে অসংখ্য মানুষ একসাথে জড়ো হয়। মুসলমানদের ঈদে, হিন্দুদের হোলি ও পূজা উৎসবে, খ্রিষ্টানদের বড়দিনে যখন অসংখ্য মানুষ জড়ো হয় তখন তাদের মধ্যে একটি সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয় (Binding Relationship)। কিন্তু রেনেসাঁস ও শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে মানুষ যখন ধর্মবিমুখ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায় তখন সম্পর্কগুলো নষ্ট হতে শুরু করে। এডাম স্মিথ, রিকার্ডো কিংবা মার্শাল তারা পুঁজিবাদ কীভাবে বিস্তার করা যায় সে-সম্পর্কে তত্ত্ব দিলেও পুঁজিবাদের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো পথ বাতলে দেননি।
(চ) Class struggle: পুঁজিবাদের প্রসারে রাষ্ট্রে শ্রেণিদ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। ক্যাপিটালিস্টদের বলা হতো বুর্জোয়া আর শ্রমিকদের বলা হয় প্রোলেতারিয়েত। মালিকরা মুনাফা বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের শোষণ করছে। শ্রমিকদের সাথে মালিকদের যে দ্বন্দ্ব সেটি আরও প্রকট হচ্ছে। এজন্য শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে।

মার্ক্স এরিস্টটলের কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন। সেই এরিস্টোটলিয়ান C-M-C মডেলের কথা মনে আছে? যেখানে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা ছিল না, যেখানে মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে শুধু পরিবারের (Household) প্রয়োজন মিটাতে পণ্য উৎপাদন হতো। কিন্তু আঠারো শতকে শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার পর এরিস্টোটলিয়ান C-M-C মডেল পরিবর্তন হয়ে আসল এডাম স্মিথের নতুন M-C-M মডেল। যেখানে প্রয়োজনের পরিবর্তে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে পণ্য উৎপাদন করা হয়, যেখানে পণ্যের উৎপাদন ব্যক্তিমালিকানাধীন। পুঁজিবাদের কাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে কার্ল মার্ক্স পুনরায় প্রাচীনকালের সেই এরিস্টোটলিয়ান C-M-C মডেলে চলে যেতে চেয়েছিলেন। তবে মার্ক্স এই মডেলের গঠনগত কিছু সংস্কার এনেছিলেন। মার্ক্সের মতে এরিস্টোটল আমলে এই C-M-C মডেলটি একটু স্বৈরতান্ত্রিক (Despotic) ছিল। কারণ সেখানে শুধু পরিবারের ফ্রি মেম্বার বা মনিব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত, দাসদাসীদের কথা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। মার্ক্স বললেন মডেল এটিই থাকবে তবে মালিক এবং শ্রমিক একসাথে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এডাম স্মিথ রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে আলাদা করে ফেলেছিলেন, কিন্তু কার্ল মার্ক্স আবার রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে একসাথে করার চেষ্টা করলেন। অর্থাৎ রাজনীতি থেকে অর্থনীতিকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

মার্ক্সের 'Base and Superstructure' নামে যে থিওরি সেটির মূল কথা হলো রাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে সবকিছুর মূল (Base)। আর সমাজ থেকে শুরু করে রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ইত্যাদি বাকি যা আছে তা হলো Superstructure বা উপরিকাঠামো। এই Superstructure নির্ভর করে Base এর উপর। তথা আমার রাজনীতি কেমন হবে সেটি নির্ভর করে আমার অর্থনৈতিক শক্তি কতটুকু, আমার ছেলে মেয়ে বাংলা মিডিয়ামে পড়বে নাকি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়বে সেটি নির্ধারিত হয় আমার অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর। অর্থাৎ সবকিছুর মূলে যেহেতু অর্থনীতি, তাই রাষ্ট্র থেকে অর্থনীতিকে আলাদা করা যায় না। আর শ্রমিকরা যে শোষিত হচ্ছে সেটিও এই অর্থনৈতিক কারণেই। রাষ্ট্রে ধনী-গরিব যে শ্রেণি বৈষম্য সেটি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সিস্টেমের কারণেই। তাই রাষ্ট্র থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে এবং বুর্জোয়াদের শোষণ থেকে প্রলেতারিয়েতদের রক্ষা করতে শ্রমিকদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে হবে। কারণ পুরো পুঁজিবাদী সিস্টেম বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে না দিলে সমাজ থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর হবে না। তাই উৎপাদনের উপকরণগুলোর মালিকানাও শ্রমিকদের হাতে নিয়ে আসতে হবে। এই যে শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো উপড়ে ফেলে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার মতাদর্শ সেটাই 'সমাজতন্ত্র' নামে পরিচিত।

Fourth Industrial Revolution (চতুর্থ শিল্পবিপ্লব)
মার্ক্স অনেক দূরদর্শীও ছিলেন বটে। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে এবং সেসব প্রযুক্তির কারণে শ্রমিকরা চাকরি হারাবে এটা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন মার্ক্স। অস্ট্রিয়ান পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট জোসেফ শোপিটারের 'Creative Destruction' আইডিয়ার সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। আগে মানুষের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল কৃষিনির্ভর। যেটি Agrarian Society নামে পরিচিত। পানি ও বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারের মাধ্যমে ১৭৮৪ সালে প্রথম শিল্পবিপ্লবটি হয়েছিল। তখন কৃষিব্যবস্থা থেকে মানুষকে কলকারখানামুখী হতে হয়েছে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে শ্রমিকদের শারীরিক শ্রমের প্রয়োজন অনেকটা কমে যায়। তার ১০০ বছর পর ১৯৬৯ সালে শুরু হয় তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। যেটির সূচনা হয়েছিল ইন্টারনেট আবিষ্কারের মাধ্যমে। ইন্টারনেটের প্রভাবে সারা বিশ্বের গতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তখন পণ্য উৎপাদনের জন্য শ্রমিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা আবশ্যক হয়ে ওঠে।

বর্তমান একুশ শতকে শুরু হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। Artificial intelligence, Robotics, Automation, Internet of Things (IOT), Big data analyses, 3D printing, Cloud computing, Algorithm, Augmented Reality'র মতো নতুন নতুন সিস্টেম আবিষ্কৃত হওয়ায় পাল্টে গিয়েছে বর্তমান দুনিয়া। রোবোটিকস বা অটোমেশনের কারণে ভবিষ্যতে দেখা যাবে কলকারখানাগুলোতে শ্রমিকদেরই কোনো প্রয়োজন নেই। সামনের দিনগুলোতে ম্যানুফেকচারিং কাজগুলো সব রোবটের হাতে চলে যাবে। একশো জন শ্রমিক একদিনে যে কাজ করতে পারে দেখা যাবে মাত্র দুইটি রোবট সেই কাজ একঘণ্টায় করে ফেলবে। তখন শ্রমিকরা চাকরিচ্যুত (downsizing) হবে। অনেক কার ড্রাইভারের ভুলের কারণে অসংখ্য রোড এক্সিডেন্ট হয়ে মানুষ মারা যায়। সেপিয়েন্স এর লেখক ইউভাল নোয়া হারারির মতে, আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে ভবিষ্যতে গাড়িও চালাবে রোবট, বিগ ডেটা এনালাইসিসের মাধ্যমে আমাদের চিকিৎসা সেবা গড়ে উঠবে। আমি পরিপূর্ণ অসুস্থ হওয়ার পূর্বেই মাইক্রো চিপ আমার অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিতে সক্ষম হবে। ক্লাউড কম্পিউটিং এর কারণে কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের উপর আর চাপ থাকবে না। স্টোরেজ, সফটওয়্যার এবং যাবতীয় অপারেটিং সিস্টেমের কাজ চলে যাচ্ছে হার্ড ডিস্কের বাইরে। আমাদের বাসার চারপাশের যত জড়বস্তু রয়েছে তারা নিজেদের মধ্যে ইন্টারনেটের সাহায্যে যোগাযোগ গড়ে তুলবে, আর সেটাই ইন্টারনেট অব থিংস (IOT) নামে পরিচিত। বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ব্যবহার করে একে অপরের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, যেটিকে আমরা এমবেডেড সিস্টেম (Embedded System) বলি। এ্যামাজনের আলেক্সা ও গুগল হোম এর কথা ইতোমধ্যে শুনা যাচ্ছে। যেগুলো আপনার বাসার লাইট, সাউন্ড সিস্টেম, দরজা-সহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ- কাপড় ধৌত করতে হবে? কাপড় ধোয়ার মেশিন কাপড়ের পরিমাণ এবং ওজন বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আপনার কাপড় ধোয়ার কাজটি অটোমেটিকভাবে সম্পাদন করে ফেলবে। মানুষ চাইলে নিজের সুবিধা অনুযায়ী ডাটা এন্ট্রি করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী এটি কাজ করবে। তাই এটিকে Internet of Everything (IOE)-ও বলা হয়।

বাজার করতে হবে? আপনার ফ্রিজ খোলার প্রয়োজন হবে না, ফ্রিজের ভিতরে কী আছে সেটি ফ্রিজ নিজেই জেনে আপনাকে মেসেজ দিয়ে জানাবে বা সেন্সর ব্যবহার করে নিজেই সরাসরি অনলাইনে অর্ডার দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফেলতে পারবেন। আপনার বাসার চুলায় আপনি একবার ডাটা এন্ট্রি করে দেবেন। সেই ডাটা অনুযায়ী চুলা প্রতিদিন রান্না করবে। এই যে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কারণে পুরাতন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে নতুন নতুন ব্যবস্থা শুরু হচ্ছে সেটিই জোসেফ শোপিটারের ভাষায় 'Creative Destruction' হিসেবে পরিচিত। এই ক্রিয়েটিভ ডেসট্রাকশনের কারণে আগামীর দিনগুলোতে অসংখ্য শ্রমিক চাকরি হারাবে। অর্থাৎ এভাবে ক্রমবর্ধমান নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাদ যখন তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে (Peak) পৌঁছাবে তখন দেখা যাবে শ্রমিকরা আরও বেশি নিষ্পেষিত হবে এবং কর্ম থেকে বিচ্যুত হবে। মার্ক্সের ভাষায় শ্রমিকদের এই কর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়াকে 'Annihilation' বলা হয়।

Socialism (সমাজতন্ত্র) and Communism (সাম্যবাদ)
সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের মধ্যে পার্থক্য কী? কার্ল মার্ক্স তাঁর মতাদর্শ দিয়ে গিয়েছেন; কিন্তু শ্রমিকরা কীভাবে সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে কিংবা পরবর্তী রাষ্ট্র কেমন হবে সে ব্যাপারে তেমন কিছু বলেননি। পরবর্তীতে মার্ক্সের অনুসারীরা সেটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। এ নিয়ে অসংখ্য মতবিরোধ থাকলেও আমি সহজ করে পুরো বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। (ক) মার্ক্সিস্ট মতাদর্শনুযায়ী সকল শ্রেণির শোষিত এবং নিষ্পেষিত শ্রমিক পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করবে। (খ) এখন শ্রমিকদেরকে একত্রিত ও সংগঠিত করার জন্য শ্রমিকদের মধ্য থেকেই যোগ্য কাউকে নেতৃত্ব দানে এগিয়ে আসতে হবে। (গ) শ্রমিক আন্দোলন দমাতে তাদের বিরুদ্ধে ক্যাপিটালিস্টরা যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সেগুলোকে শ্রমিকরা মোকাবিলা করবে। (ঘ) আন্দোলনের মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠীকে পরাজিত করে শ্রমিকরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে। (ঙ) উৎপাদনের যে উপকরণ বা অর্থনীতি সেটি ক্যাপিটালিস্টদের থেকে শ্রমিকদের আয়ত্তে নিয়ে আসবে। (চ) শ্রমিকরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পর শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকে উপড়ে ফেলে দিয়ে সকলের সমন্বয়ে একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।

উপরিউক্ত 'ক' থেকে 'ঙ' নাম্বার ধাপ পর্যন্ত তথা শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু করা থেকে শুরু করে একত্রিত হওয়া, ক্যাপিটালিস্টদের মোকাবিলা করা এবং সর্বশেষ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা, এই পুরো প্রসেসটি সমাজতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। আর সমাজতন্ত্রের সর্বশেষ 'চ' নাম্বার যে ধাপটি রয়েছে তথা বুর্জোয়াদের আধিপত্য বিলীন করে দিয়ে একটি শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা সেটাই সাম্যবাদ হিসেবে পরিচিত। সাম্যবাদ হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সর্বশেষ রূপ। ১৯২২ সালে শ্রমিকরা আন্দোলন করে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেছিল, তার কয়েকবছর পরেই তথা ১৯২৮ সালে ক্যাপিটালিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে অর্থনৈতিক মহামন্দা (Economic Depression) দেখা দিয়েছিল। তাই তখন মার্কসীয় মতাদর্শ ও সমাজতন্ত্রের জয়জয়কার অবস্থা তৈরি হয়েছিল।

পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য
পণ্য উৎপাদন করা থেকে শুরু করে কোন কোন পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করা প্রয়োজন সেটার সিদ্ধান্ত নেওয়া, উৎপাদনের পর সেগুলো আবার কীভাবে বণ্টিত হবে ইত্যাদি বিষয়গুলোকে একসাথে বলা হয় Economic System বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই ইকোনমিক সিস্টেমকে কেন্দ্র করে তিনটি প্রশ্ন রয়েছে; এক. আমরা কী কী উৎপাদন করব? দুই. কীভাবে উৎপাদন করব? তিন, উৎপাদিত পণ্য কারা ভোগ করবে? পুঁজিবাদী সিস্টেমে প্রাইভেট ফার্ম বা প্রতিষ্ঠানগুলো এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে। প্রয়োজনীয় পণ্য নাকি বিলাসবহুল পণ্য উৎপাদন করা হবে সেটি ব্যক্তি বা ফার্মের উপর নির্ভর করে। প্রযুক্তি দিয়ে নাকি শ্রমিক দিয়ে পণ্য উৎপাদন করবে সেটাও ফার্মগুলো নির্ধারণ করবে। শ্রমিকদের বেতন কত হবে সেটাও ফার্মগুলো নির্ধারণ করবে। ফার্মে উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি করবে নাকি বিদেশে রপ্তানি করবে সেটাও ওইসব ফার্মের মালিক নির্ধারণ করবে। পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থাকেই ইংরেজিতে 'Market Economy' বলা হয়। আর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সিস্টেমে উপরিউক্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়। কী কী পণ্য উৎপাদন করা হবে সেটি রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, কীভাবে উৎপাদন করবে সেটাও রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, রাষ্ট্রের জনগণের মাঝে উৎপাদিত পণ্য কীভাবে বণ্টন করে দেওয়া হবে সেটাও রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়। সমাজতান্ত্রিক ইকোনমিক সিস্টেমকে ইংরেজিতে Planned Economy বা Command Economy বা Centralized Economy ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নেন উপরিউক্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর কী হবে। তাই উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে Command Economy বলা হয়।

পুঁজিবাদ কেন টিকে গিয়েছে?
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী Ralf Dahrendorf ছিলেন মার্ক্সের অন্যতম সমালোচক। প্রথমত, বিশ্বজুড়ে ক্যাপিটালিস্টদের মধ্যে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিটি দেশের হাজার হাজার মানুষ পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থাতে বিনিয়োগ করছে। তার মানে মানুষজন পুজিবাদী সিস্টেমে আগ্রহী। তাই বিভক্ত হওয়া শ্রমিকদের পক্ষে এত সংখ্যক পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক সিস্টেমে কাঠামোগত সমস্যা থাকায় এটি একটি রাষ্ট্রে ফাংশন করে না। আজকে উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা দেখলেই সেটি ফুটে ওঠে। ভেনেজুয়েলায় আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি। তৃতীয়ত, সময় পরিবর্তন হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের সাথে একবিংশ শতাব্দীর তুলনা করলে চলবে না। শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তাদের শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।

চতুর্থত, শিল্পবিপ্লবের পূর্বে সমাজের যে অবস্থা ছিল এখন তা অনেক উন্নত হয়েছে। পুঁজিবাদের প্রসারে দরিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। পঞ্চমত, ম্যাক্স ওয়েবারও সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করেছিলেন। কারণ সোসাইটি থেকে শ্রেণিবৈষম্য হ্রাস করা আদৌ সম্ভব নয়। বোঝার সুবিধার্থে ধরে নিলাম সমাজতন্ত্রে কোনো শ্রেণি (Class) নেই এবং সবাই সমান। কিন্তু কথা হচ্ছে মানুষের Skill ভিন্ন হলে পেশাও ভিন্ন হয়। একজন ডাক্তার আর একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বেতন কখনো এক হবে না। ডাক্তারের যখন বেতন বেশি হবে তখন তার সাথে ওই তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বেতন বৈষম্য (Income Inequality) দেখা দেবে। এক পর্যায়ে ডাক্তারের সম্পদের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাবে। তখন এই ডাক্তারের সাথে ওই কর্মচারীর সম্পদ বৈষম্য (Wealth Inequality) দেখা দেবে। আর যার সম্পদ বেশি আছে তাকেই মানুষ বেশি প্রাধান্য দেবে। সম্পদ বেশি থাকায় ডাক্তারের রাজনৈতিক শক্তিমত্তাও বেশি থাকবে। একজন ডাক্তারের ছেলেকে যেখানে পড়াশোনা করাবে, একজন দিনমজুরের ছেলেকে সেখানে পড়াতে পারবে না। এটাই স্বাভাবিক। তথা এই Educational বা Occupational Attainment সমাজের সকল স্তরের জনগণের জন্য সমান হবে না। একজন ডাক্তার তার টি-শার্টটি ক্রয় করবে কোনো নামি-দামি ব্র্যান্ড থেকে। কিন্তু একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ব্র্যান্ড থেকে শার্ট ক্রয় করার সেই সক্ষমতা হয়তো হবে না। তাই সমাজের মানুষের মধ্যেও Status ভিন্ন ভিন্ন হবে। মার্ক্সিস্টরা সমাজ থেকে শ্রেণিবৈষম্য মূলোৎপাটনের যে কথা বলছে সেটা আজকের দুনিয়ায় আদৌ সম্ভব নয়। উপরিউক্ত কারণে রাষ্ট্রে Social Stratification বা সামজিক স্তরবিন্যাস থাকবেই। এজন্যই- “Capitalism is a must"। পুঁজিবাদ যেহেতু সকল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় ভালো তাই এই পুঁজিবাদের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোর সমাধানের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে আরও বেশি কার্যকরী করে তোলাটাই শ্রেয় মনে করেছেন পরবর্তী অর্থনীতিবিদরা।

Globalisation (বিশ্বায়ন)
বর্তমানে আমাদের পোশাক শিল্পে তৈরিকৃত একটি ফাইনাল প্রোডাক্ট হচ্ছে জিন্স প্যান্ট। এই জিন্স প্যান্ট তৈরি করতে আমাদেরকে চীন থেকে তুলা বা কটন ফাইবার আমদানি করতে হয়, সেই কটন আবার রঙিন বা বিভিন্ন কালারে শেইপ দেওয়ার জন্য ভারত থেকে ভিয়েতনাম থেকে ফ্যাশন ডিজাইনার হায়ার করে নিয়ে আসতে হয়। তারপর বাংলাদেশের রং আমদানি করতে হয়, জার্মানি থেকে অত্যাধুনিক সেলাই মেশিন ক্রয় করতে হয়, শ্রমিক দিয়ে তৈরিকৃত সেই পোশাক ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি করা হয়। এই যে একটি পণ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক (Interconnectedness) এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Interdependence) গড়ে উঠেছে এটাই বিশ্বায়ন। উচ্চতর অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সে বিশ্বায়ন বলতে প্রথম দিকে শুধু পণ্যের বিশ্বায়নকে গুরুত্বারোপ করলেও এখন বিশ্বায়ন হয়েছে রাজনীতির, বিশ্বায়ন হয়েছে সংস্কৃতির, বিশ্বায়ন হয়েছে প্রযুক্তির। আইফোন ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক একটি মোবাইল সেট, যার চিপস ও চ্যাসিস তাইওয়ানে, স্টোরেজ ডিভাইস চীনে, ক্যামেরা ও ডিসপ্লে জাপানে, র‍্যাম ও প্রসেসর দক্ষিণ কোরিয়ায়, বিশেষ মিনারেল আবার ক্যালিফোর্নিয়ায়, এসেম্বল উৎপাদিত হচ্ছে ভিয়েতনামে। তারপর সেই আইফোন বিক্রি হচ্ছে সারাবিশ্বে। এটাই পণ্যের বিশ্বায়ন (Economic Globalisation)।

Driving Forces of Globalization (বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি)
বিশ্বায়নের প্রভাবে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সাথে অপর প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ গড়ে উঠায় পৃথিবীটি ছোট হয়ে এসেছে। রাষ্ট্রের যে বর্ডার বা সীমানা সেটি আজকে গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে। সীমানার অপর প্রান্তের কোনো একটি ঘটনা সীমানার এপারেও প্রভাব ফেলছে। বর্ডারে দেয়াল তুলে সেই প্রভাব আটকানো যাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি জনগণের উপর ইসরায়েলি হামলা হলে সেটির প্রভাব বাংলাদেশের মানুষের উপরেও পড়ে। চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হলে সেটির প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে। বিশ্বায়নের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যে শক্তিগুলো (Driving Forces) কাজ করেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চারটি শক্তি।

(১) Economic Shift: কৃষি ব্যবস্থা থেকে শিফট করে শিল্পায়ন হয়েছে। নগরায়ণের কারণে রাজধানীতে ক্যাপিটাল ফ্লো বা পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর ইন্ডাস্ট্রিগুলোর আধুনিকায়ন হয়েছে। তখন পুঁজির প্রবাহ রাজধানী থেকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়েছে。
(২) Technological Shift: নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। আমরা মানবচালিত পরিবহনের জায়গায় মেশিনচালিত পরিবহনে শিফট করেছি। সামনের দিনগুলোতে মেশিনচালিত পরিবহন থেকে রোবটচালিত পরিবহনে শিফট করব। 'স্বয়ং-চালিত গাড়ির প্রযুক্তি' বা Automated Car নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে। কলকারখানায় ব্যবহৃত পুরাতন প্রযুক্তির জায়গায় নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন হচ্ছে, যা উৎপাদনের মাত্রাকে বৃদ্ধি করেছে। উৎপাদনের মাত্রা যখন বৃদ্ধি পায় তখন সেসব উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে দিতে হয়। তখন বিশ্বায়ন আরও ত্বরান্বিত হয়।
(৩) Political Shift: একসময় রাষ্ট্র ছিল রাজা-সম্রাটদের অধীনে, তারপর সেখান থেকে শিফট করে কলোনিতে, কলোনি থেকে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র চলে যায় একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী শাসকদের হাতে। সেখান থেকে রাষ্ট্র শিফট করে গণতান্ত্রিক সরকারে। বিংশ শতাব্দী জুড়ে আমরা দেখেছি অধিকাংশ রাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্যে লিপ্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংস্কৃতির মিশ্রণ হচ্ছে। যা বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করছে।
(৪) Institutional Shift: আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বৃদ্ধির কারণে অসংখ্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। পুঁজির অবাধ প্রবাহে, বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রসারে, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিকরণে এসব প্রতিষ্ঠান অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে। যা বিশ্বায়নকে আরও গতিশীলতা দিয়েছে।

বিশ্বায়নের প্রভাব ও বাংলাদেশ
বিশ্বায়নের প্রভাবের উপর ভিত্তি করে তিনটি উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব রয়েছে।
(ক) Traditionalist School: যারা বামপন্থি তাদের দাবি বিশ্বায়ন হচ্ছে একটি Myth বা অতিকথা। একই ভাবে সমাজতন্ত্রীদের মতে বিশ্বায়নের কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর উত্তরের রাষ্ট্রগুলো ধনী হয়েছে কিন্তু দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলো এখনো গরিব অবস্থানেই আছে। মানচিত্রে উত্তরের রাষ্ট্র বলতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। আর দক্ষিণের রাষ্ট্র বলতে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ও এশিয়ার দেশগুলোকে বোঝায়। উত্তরের রাষ্ট্রগুলোর সাথে দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোর যে বৈসাদৃশ্যতা সেটিকে টারম হিসেবে 'North-South Gap' বলা হয়। ট্র্যাডিশনাল স্কুল মূলত বিশ্বায়নের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রমিক শোষণ, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব, বাজারে অসমতা ইত্যাদি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরে。
(খ) Liberal School: যারা উদারনীতিবাদে বিশ্বাসী তাদের মতে, বিশ্বায়ন শুধু উত্তরের দেশগুলোতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি বরং দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোতেও পরিবর্তন সাধন করেছে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোও উপকৃত হচ্ছে। লিবারেল স্কুল চেষ্টা করে বিশ্বায়নের প্রভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি, বেসরকারিকরণ, মুক্ত বাণিজ্য, দারিদ্র্য হ্রাস, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার।
(গ) Transformationalist School: এই তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্বায়ন প্রতিটি রাষ্ট্রকেই প্রভাবিত করেছে। সেটি ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক থেকেই। তাদের মতে বৈশ্বিক উন্নয়নের ছোঁয়া সবাই পেয়েছে। শুধু ভারত ও ব্রাজিলের মতো রাষ্ট্রগুলোতেই নয় বরং বিশ্বের প্রতিটি দেশে দরিদ্রতা হ্রাস পেয়েছে। ট্রান্সফরমালিস্ট স্কুল চেষ্টা করে ট্র্যাডিশনাল স্কুল ও লিবারেল স্কুল এই দুটোর মধ্যে একটি সামঞ্জস্য তুলে ধরার। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উপর বিশ্বায়নের প্রভাব বিশ্লেষণেও উপরিউক্ত তিনটি স্কুল প্রযোজ্য। বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রভাব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়।

মুক্ত বাজার অর্থনীতি (Free Market Economy)
মুক্ত বাজার অর্থনীতি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে কোনো বাঁধা-বিপত্তি এবং সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের সুবিধা থাকে। অর্থাৎ বাণিজ্যে কোনো ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা থাকবে না।

শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (Tariffs and Non-Tariff Barriers)
মুক্ত বাজার অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো, একটি দেশের আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে সরকারের কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারবে না। একই ভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (Tariffs and Non-Tariff Barriers) থাকবে না। একটি দেশের সরকার যখন নিজ দেশের পণ্যের উপর কর আরোপ করে তখন সেটিকে বলা হয় ট্যাক্স (Tax)। আর সরকার যখন বিদেশি কোন পণ্যে অথবা আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর কর আরোপ করে তখন সেটিকে ট্যাক্স না বলে বলা হয় শুল্ক (Tariffs)। আর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্ক আরোপ করাকেই বলা হয় ট্যারিফ ব্যারিয়ার (Tariff Barriers)। মুক্ত বাজার অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একটি দেশের সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বা বিদেশি কোনো পণ্যের উপর ট্যারিফ বসাতে পারবে না।

এবার আসি "নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার" নিয়ে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর শুল্ক ছাড়াও সরকার আরও যে সকল বাধাবিপত্তি তৈরি করে সেগুলোকেই বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। এই নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের কয়েকটি উদাহরণ হলো:
১. Important Licences: অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে সরকার যখন আমদানি সনদে কঠিন নিয়মনীতি প্রণয়ন করে এবং আমদানি সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার।
২. Export control: একটি দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য রপ্তানি করার ক্ষেত্রে রপ্তানিকারী দেশের সরকার যখন বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করার মাধ্যমে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার。
৩. Quotas: একটি দেশের সরকার যখন তার দেশে আমদানি ও রপ্তানিকৃত পণ্যের উপর কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ এবং সময়ের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে দেয় তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কী পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে তা যদি যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নির্ধারণ করে দেয় তখন সেটিকে কোটা (Quota) বলে। ভারতের পেঁয়াজ বাংলাদেশের আমদানি করার ক্ষেত্রে সরকার যদি বলে আমরা শুধু আগামী তিন মাসের জন্যই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করব তখন সেটিকেও বলা হয় কোটা। আর এই কোটা যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করে তখন সেটিকে বলা হয় নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বা অশুল্ক বাধা।
৪. Subsidies: প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি দেশীয় পণ্যকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে সরকার যখন সেই পণ্যের মান উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে তখন সেটিকে Subsidy বা ভর্তুকি বলা হয়। ভারত যেসব পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি করে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সয়াবিন তেল। এখন ধরুন বাংলাদেশে উৎপাদিত সয়াবিন তেল মানের দিক থেকে ভারতের তুলনায় নিম্নমানের এবং তার দামও তুলনামূলক বেশি। তাই মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী ভারতের সয়াবিন তেল বাংলাদেশের বাজারে বিনা শর্তে প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার যদি নিজের দেশে উৎপাদিত ঐ নিম্নমানের সয়াবিন তেলের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ভর্তুকি প্রদান করে এবং ভারতের সয়াবিন তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে বাণিজ্যে বাধাগ্রস্ত করে তখন সেটিও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের উদাহরণ।
৫. Embargo: একটি দেশ যখন অন্য দেশের কোন পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তখন সেটিকে Embargo বলা হয়। আর এটিও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের উদাহরণ। অর্থাৎ মুক্ত বাজার অর্থনীতি বা Free Market Economy হলো ট্যারিফ এবং নন-ট্যারিফ মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

সংরক্ষণবাদ (Protectionism): মুক্ত বাজার অর্থনীতির ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক দিকগুলো থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার যে প্রয়াস সেটিকেই বলা হয় সংরক্ষণবাদ। এই সংরক্ষণবাদ বিষয়টি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে খুবই জরুরি একটি বিষয়। তাই এটি বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

১. The Infant-Industry Argument: একটি দেশের উদীয়মান শিল্পগুলোকে “Infant-Industry” বলা হয়। ধরুন বাংলাদেশের একটি উদীয়মান শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান একই পণ্য উৎপাদন করে। বাংলাদেশের এই উদীয়মান শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্যের মান যুক্তরাষ্ট্রের অতি উন্নত এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের মানের তুলনায় একটু নিম্নমানের হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন আমি যদি মানের দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার দেই তখন বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশি পণ্য ক্রয় করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তখন আমার দেশের যে উদীয়মান শিল্পগুলো ছিল সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আর আমাদের দেশীয় শিল্পগুলো বিস্তার লাভ করতে পারবে না। একটি সময় পর দেশীয় শিল্পগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। যার ফলে বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক জনগণ তাদের কর্মসংস্থান থেকেও বঞ্চিত হবে। তাই বাংলাদেশ সরকার যদি নিজ দেশের এই উদীয়মান শিল্পগুলোকে রক্ষা করতে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে তখন সেটিকে বলা হয় Protectionism বা সংরক্ষণবাদ。

২. Dumping and Anti-dumping: সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে 'Dumping' একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই পেঁয়াজ উৎপাদন করতে সক্ষম। এখন মুক্ত বাজার অর্থনীতি অনুযায়ী ভারত তার পেঁয়াজ বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করতে পারবে এবং বাংলাদেশও তার পেঁয়াজ ভারতের বাজারে বিক্রি করতে পারবে। এখন মনে করুন বাংলাদেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩০ টাকা এবং বাজারে বিক্রি করা হয় ৪০ টাকা। অন্যদিকে ভারতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৪০ টাকা এবং ভারতের বাজারে সেই পেঁয়াজ বিক্রি করা হয় ৫০ টাকা করে। এখন যদি ভারত বাংলাদেশের বাজার দখল করার উদ্দেশ্য তার উৎপাদিত পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রতি কেজি ৩০ টাকা করে বিক্রি করা শুরু করে তখন বাংলাদেশের মানুষ দেখবে একই পণ্য ভারত কম টাকায় দিচ্ছে। যার ফলে মানুষ ভারতের পেঁয়াজ ক্রয় করা শুরু করবে। আর তখনই বাংলাদেশি পেঁয়াজ বাজার ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। এর মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের পেঁয়াজের মার্কেটটি দখল করে নেবে। একটি সময় পর বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজার থেকে বের হয়ে গেলে মানুষ ভারতের পেঁয়াজের উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এই নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে ভারত তার পেঁয়াজের দামটি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে তার পূর্বের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নেবে এবং বাংলাদেশের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জন করবে। এই যে ভারত তার দেশে ৪০ টাকা খরচে উৎপাদিত পণ্যটি ১০ টাকা লোকসান দিয়ে বাংলাদেশের বাজারে ৩০ টাকা করে বিক্রি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারটি দখল করল এটিকেই Dumping বলা হয়। এই Dumping কে আবার Below-Cost Pricingও বলা হয়। কেউ আবার এটিকে Unfair Competition বা Predatory Pricing বলে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার যদি ভারতের এই ডাম্পিং বা অসম প্রতিযোগিতাকে বন্ধ করতে কোনো পলিসি গ্রহণ করে তখন সেটিকে Anti-Dumping Policy বলা হয়। এভাবে Anti-Dumping Policy তৈরি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের পেঁয়াজ শিল্পকে রক্ষা করাই সংরক্ষণবাদ বা Protectionism এর উদাহরণ।

Balance of Payment (লেনদেন ভারসাম্য): একটি রাষ্ট্র তার দেশে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত পণ্য (Surplus) অন্য রাষ্ট্রে রপ্তানি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। একই ভাবে রাষ্ট্রে যেসব পণ্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে সেসব পণ্য অন্য রাষ্ট্র থেকে আমদানি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে। বৈদেশিক মুদ্রার অর্জন এবং বৈদেশিক মুদ্রার খরচের মধ্যে যে পার্থক্য সেটাই একটি দেশের লেনদেন ভারসাম্য। একটি রাষ্ট্র যখন বৈদেশিক মুদ্রা খরচের চেয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বেশি করে তখন সেটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। আর বৈদেশিক মুদ্রা খরচের চেয়ে অর্জন বেশি করাকেই অনুকূল লেনদেন ভারসাম্য (Favourable Balance of Payment) বলা হয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের চেয়ে যদি খরচ বেশি হয় তাহলে সেটিকে প্রতিকূল লেনদেন ভারসাম্য (Unfavourable Balance of Payment) বলা হয়।

Balance of Trade (বাণিজ্যিক ভারসাম্য): একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত মোট বাণিজ্যের মূল্যায়নে 'বাণিজ্যিক ভারসাম্য' পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের কথাই ধরা যাক। একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হয় এবং ভারত থেকে যে পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশে আমদানি করা হয় এই দুয়ের আর্থিক মূল্যের ব্যবধানকে বাণিজ্যিক ভারসাম্য বলে। এখন বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য ভারতে রপ্তানি করে তার চেয়ে বেশি যদি ভারতীয় পণ্য আমদানি করে তখন সেটিকে বলা হয় Trade Deficit বা বাণিজ্য ঘাটতি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তাই রাষ্ট্রের উচিত আমদানিকৃত পণ্যের বিকল্প পণ্য নিজ দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। অন্যদিকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য ভারত থেকে আমদানি করে তার চেয়ে বেশি যদি ভারতে রপ্তানি করতে পারে তখন সেটিকে বলা হয় Trade Surplus বা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। এই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত একটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর।

Most Favoured Nation (MFN)
'Most Favoured Nation' এরকম একটি ধারণা যেখানে মনে করা হয় দেশগুলোকে তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে সমানভাবে আচরণ করা উচিত এবং কোনো একটি দেশকে “অধিক পক্ষপাতী” করা উচিত নয়। মনে করুন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক পার্টনার হচ্ছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ভারত ও বাংলাদেশ এই পাঁচটি দেশ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই পাঁচটি দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমান আচরণ করা (equal treatment)। যুক্তরাষ্ট্র যদি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার অধিক মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াকে কিছু বাড়তি সুবিধা দেয় যেগুলো তার অন্য বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ বা ভারতকে দেওয়া হয় না তাহলে এটি Most Favoured Nation ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর সকল সদস্য রাষ্ট্র এই বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে যে তারা সবাই Most Favoured Nation এই নীতিটি মেনে চলবে। তথা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সকল সদস্য বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে সমান আচরণ করবে। Most Favoured Nation এই নীতিটির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা রয়েছে : ১. Trade enhancement: রাষ্ট্রগুলো যখন একে অপরের সাথে কোনোরকম বৈষম্য ব্যতিরেকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলে তখন বৈশ্বিকভাবে বাণিজ্য ত্বরান্বিত হয়। ২. Reducing trade diversion: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে Most Favoured Nation নীতিটি অন্য রাষ্ট্রকে তার প্রাপ্য বাণিজ্যিক সুবিধা থেকে পদ্ধতিগতভাবে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ কমায়। ৩. Trade balance for small countries: ছোট রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় শক্তি কম হওয়ায় তারা বিভিন্ন সময় বড় রাষ্ট্রগুলোর সাথে নেগোসিয়েশনে যেতে ভয় পায়। কিন্তু Most Favoured Nation নীতিটির আওতায় ছোট রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব বাণিজ্যে নিরাপদ বোধ করে এবং তাদের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোও ভারসাম্যপূর্ণ হয়। এক কথায় Most Favoured Nation নীতি হচ্ছে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বৈষম্যহীন বাণিজ্যিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন।

Bail out Policy (বেইল আউট)
যখন কোনো কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেশন বা রাষ্ট্র চরম আর্থিক সংকটে পড়ে অথবা প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় থাকে তখন তাদেরকে এই সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য যদি আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় সেটিকে 'বেইল আউট' (Bail out) বলা হয়। বেইল আউটকে অনেকসময় 'Capital Injection'ও বলা হয়। বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। কার্গিল (Cargill) হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম একটি প্রাইভেট বা বেসরকারি কোম্পানি। এই কোম্পানিটি মূলত পশুদের খাদ্য, মানুষের খাদ্য, কৃষিজাত পণ্য, পাম ওয়েল ইত্যাদি তৈরি করে থাকে। এই কোম্পানিতে হাজার হাজার ইউএস নাগরিক কাজ করছে, যার ফলে বেকারত্বের হার কমছে। এই কোম্পানি প্রতি বছর তাদের আয়ের একটি অংশ 'কর্পোরেট ট্যাক্স' হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিচ্ছে। এই কোম্পানি থেকে আদায়কৃত ট্যাক্স দিয়ে সরকার দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারছে। এখন ধরুন হঠাৎ করে এই প্রাইভেট কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ল একনাগাড়ে দুই তিন বছর এই কোম্পানির কোনো লাভ বা প্রফিট আসছে না, প্রফিট না আসায় কোম্পানিটি ভালো মানের পণ্যও উৎপাদন করতে পারছে না, মূলধনের অভাবে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না। এরকম কয়েকবছর চলতে থাকলে এই কোম্পানী একসময় অচল বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এখন এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি বেসরকারি এই কোম্পানিকে আর্থিক প্রণোদনা ও নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা কিংবা বিনা সুদে ঋণ দেয় তাহলে কোম্পানিটি হয়তোবা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এখন এই কোম্পানিকে পুনরায় সচল করতে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা করা বা প্রণোদনা দেওয়া (Bail out) উচিত কি উচিত না?

Arguments: যারা বিশ্বাস করে, অর্থনীতিকে সচল রাখতে রাষ্ট্রের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত তাদেরকে বলা হয় 'Interventionist Economists' । তাদের মতে সরকারের উচিত যে-সকল প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আর্থিক সংকটে আছে তাদেরকে বেইল আউট বা আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা। তাদের মতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উচিত কার্গিল কোম্পানিকেও তাদের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া। কারণ কার্গিল কোম্পানিকে আর্থিক প্রণোদনা দিলে তিনটি লাভ হবে :
এক. এই কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে না বরং সচল থাকবে। কোম্পানি সচল থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য নাগরিক এখানে কাজ করার সুযোগ পাবে। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বেকারত্ব হ্রাস পাবে।
দুই. এই কোম্পানি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রতি বছর আয়কর পাবে। কোম্পানি থেকে পাওয়া এই করের টাকা দিয়ে সরকার দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করতে পারবে। অর্থাৎ আর্থিক সংকটে কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে সরকারের রাজস্বও কমে যাবে। সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিন. কার্গিল কোম্পানি সচল থাকলে দেশের কৃষিজাত পণ্যের চাহিদা বা যোগান মিটবে। অর্থের সংকটে কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে এই কোম্পানির তৈরিকৃত কৃষিজাত পণ্যের জন্য তখন সরকারকে হয় অন্য কোনো বিদেশি কোম্পানির উপর নির্ভর করতে হবে, না-হয় অন্য কোনো রাষ্ট্র থেকে কৃষিজাত পণ্য আমদানি করে নিয়ে আসতে হবে। তখন দেশের টাকা বিদেশে চলে যাবে। উপরিউক্ত এই তিনটি কারণে অনেকে বেইল আউট পলিসিকে সমর্থন করে।

Counter Arguments: এবার আসি কেন 'বেইল আউট' পলিসিকে লিবার্টারিয়ান বা লিবারেল অর্থনীতিবিদরা সমর্থন করে না। যারা বিশ্বাস করে অর্থনীতি ও রাজনীতি দুইটি একসাথে চলতে পারে না, যারা মনে করে সরকারের উচিত অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ না করা, তাদেরকে বলা হয় 'Libertarian' বা 'Liberal Economist'। তাদের মতে, সরকারের হস্তক্ষেপ ইকোনমিতে ব্যাঘাত ঘটায়। এই লিবার্টারিয়ানদের মতে, সরকারের উচিত কার্গিল কোম্পানির মতো বিভিন্ন কর্পোরেশনকে তাদের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতা না করা। তার কারণ হলো:
এক. সরকার কার্গিল কোম্পানিকে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য টাকা কোথায় পাবে? যদি উত্তর হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে দেবে, তাহলে সেটি হবে অনৈতিক। কারণ সরকার যখন এভাবে বিভিন্ন কোম্পানিকে বেইল আউট দেবে তখন সরকার সে টাকা যোগাড় করতে জনগণের উপর ট্যাক্স বৃদ্ধি করবে। একটি প্রাইভেট কোম্পানির দায়িত্ব সাধারণ ও জনগণ কেন বহন করবে? লিবার্টারিয়ানদের মতে, এটি অনৈতিক। তাই বেইল আউট দেওয়া উচিত না।
দুই. যেহেতু প্রথমটি অনৈতিক, ধরুন সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিল কোম্পানিকে বেইল আউট দেওয়ার জন্য জনগণের থেকে টাকা নেবে না। সরকার বরং ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কার্গিল কোম্পানিকে সহযোগিতা করবে। লিবার্টারিয়ানদের মতে এখানেও সমস্যা। কারণ সরকার যখন বিভিন্ন কোম্পানিকে আর্থিক সাহায্য করার জন্য বিপুল পরিমাণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, তখন ব্যাংকে আর অবশিষ্ট কোনো টাকা থাকবে না। একজন সাধারণ নাগরিক বা উদ্যোক্তা যখন তার ব্যবসা শুরু করার জন্য ব্যাংক থেকে লোন আনতে যাবে তখন সে দেখবে ব্যাংক তাকে লোন দেওয়ার মতো অবশিষ্ট কোনো টাকা ব্যাংকে নেই। কারণ ব্যাংক যে পরিমাণ টাকা লোন দেয় সে টাকা সরকার অলরেডি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বেইল আউট হিসেবে দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে সরকার অধিক পরিমাণে লোন উত্তোলন করার ফলে সাধারণ নাগরিকরা আর লোন নিতে পারছে না।
তিন. ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করলে যেহেতু সাধারণ জনগণের জন্য ঋণ নেওয়ার মতো টাকা অবশিষ্ট থাকে না তাই ধরুন সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিল, সে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপাবে। সরকার ব্যাংক থেকে নতুন করে টাকা ছাপিয়ে সেই টাকা বিভিন্ন কোম্পানিকে বেইল আউট হিসেবে দেবে। লিবার্টারিয়ানদের মতে, এতেও সমস্যা। কারণ সরকার যখন অধিক পরিমাণে টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেবে তখন হয় মুদ্রাস্ফীতি ঘটে, না-হয় টাকার ভ্যালু কমে যায়। একটি ছোট উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। রাষ্ট্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা এক অর্থবছরে যে পরিমাণ সম্পদ উৎপাদন হয় সে দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক শুধু সেই পরিমাণ টাকাই ছাপাতে পারে। ধরুন যুক্তরাষ্ট্রে শুধু আপেল পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট আপেল উৎপাদিত হলো ১০ কেজি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এই অর্থবছরে মোট টাকা ছাপালো ১,০০০। এখন ক্রয় করার মতো টাকা আছে ১০০০, আর পণ্য আছে ১০ কেজি আপেল। তাহলে প্রতি কেজি আপেল হবে ১০০ টাকা করে। কিন্তু সরকার যদি ১০০০ টাকা না ছাপিয়ে ১৫০০ টাকা ছাপাতো, তাহলে প্রতি কেজি আপেল মানুষকে কিনতে হতো ১৫০ টাকা করে। অর্থাৎ সম্পদের পরিমাণ একই রেখে টাকা যদি বেশি ছাপানো হয় তাহলে সেই টাকার মান কমে যায়। তাই লিবার্টারিয়ানদের মতে, সরকার যদি কার্গিল প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সংকট উত্তরণের লোন দেওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে টাকা ছাপায় তাহলে দেশে টাকার ভ্যালু কমে যায়।
চার, উদারপন্থি অর্থনীতিবিদদের মতে, কোম্পানিগুলো সাধারণত আর্থিক সংকটে পড়ে বা দেউলিয়া হয় তাদের নিজস্ব কারণেই। হয় তারা নিম্নমানের পণ্য সাপ্লাই দিয়েছে যেগুলো মানুষের পছন্দ হয়নি, তাই মানুষ ক্রয় করেনি। না-হয় কোম্পানি যথেষ্ট গবেষণা না করার ফলে বিরূপ কোন পলিসি গ্রহণ করেছিল। যে কারণে কোম্পানি এখন সংকটে পড়েছে। উদারপন্থিদের মতে, সরকার যদি এসব কোম্পানিকে আর্থিক সহযোগিতা বা বেইল আউট প্রদান করে তাহলে কোম্পানিগুলো সচেতন হবে না, তারা গবেষণা করবে না ঠিক কেন তারা সংকটে পড়েছিল। কোম্পানিগুলো মনে করবে আবার আর্থিক সংকটে পড়লে সরকার তো আছেই। সরকার আমাদের বেইল আউট দেবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায় একটি কোম্পানি সংকটে পড়ে তাদের অব্যবস্থাপনা বা কোম্পানির ভিতরকার দুর্নীতির জন্য। তাহলে সরকার যতই বেইল আউট বা সহযোগিতা করুক আদতে কোনো লাভ নেই। তার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ব্যাংক, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও বেইল আউট দিয়েছিল। কিন্তু দেখা গিয়েছে তারা দেউলিয়া থেকে উত্তরণ না হয়ে আরও বেশি দেউলিয়াত্ব হয়েছে। সরকারের উল্টো ক্ষতি হয়েছে।
পাঁচ. লিবার্টারিয়ানদের মতে মার্কেট হবে প্রতিযোগিতামূলক। যে কোম্পানি বাজারে ভালো ও মানসম্মত পণ্য সাপ্লাই দেবে সেই কোম্পানি এমনিতেই সচল থাকবে। কারণ ভালো পণ্য বলে মানুষ তার পণ্য ক্রয় করবে। যে কোম্পানি মর্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না, তাকে সহযোগিতা করে লাভ নেই। কার্গিল কোম্পানি যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে অন্য আরেকটি কোম্পানি সেখানে দাঁড়িয়ে যাবে। এটাই প্রতিযোগিতার নিয়ম। আর এটিকেই 'Self-correction' বলা হয়। তথা এর মূল কথা হচ্ছে এই প্রতিযোগিতায় কেউ ছিটকে পড়বে, কেউ ঘুরে দাঁড়াবে, কেউ নতুন করে বাজারে চলে আসবে। যেমন- একসময় বাজারে নোকিয়া মোবাইল প্রচুর চলত, প্রতিযোগিতায় নোকিয়া মোবাইলকে পেছনে ফেলে স্যামসাং চলে আসল, আবার স্যামসাংকে পেছনে ফেলে শাওমি চলে আসল। এভাবেই মার্কেট ইকোনমি চলতে থাকে। এক কার্গিল কোম্পানি বন্ধ হলে মার্কেটে বহু কার্গিল চলে আসবে।
ছয়. লিবার্টারিয়ানদের আরেকটি যুক্তি হলো বেইল আউট সিস্টেমে প্রচুর দুর্নীতি হয়। কারণ নির্বাচনের পূর্বে ক্যাম্পেইন এর সময় যে-সকল বড় বড় কর্পোরেশনগুলো রাজনীতিবিদদের আর্থিক সহযোগিতা করেছিল নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা তখন ঐসকল কর্পোরেশনগুলেকে বেইল আউটের নামে নানা সুবিধা দিয়ে থাকে। যে-সকল কোম্পানির সাথে রাজনৈতিক নেতাদের ভালো সম্পর্ক তাদেরকে বেইল আউটের নামে নানা অনৈতিক সহযোগিতা করা হয়। যখনই বেইল আউট ঘটে, তখনই তা ঘটছে মূলত আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদদের স্বার্থে। সাধারণ জনগণ অর্থনীতির এইসব খুঁটিনাটি ও জটিল বিষয়গুলো নিয়ে তেমন আগ্রহী ও সচেতন নয়। বেইল আউটের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমতের কোনো তোয়াক্কা না করে গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লিবার্টারিয়ানদের মতে, তাই বেইল আউট দেওয়া উচিত না।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন জোটের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। কোনো জোটের উচিত সদস্যভুক্ত কোনো দেশ খারাপ অবস্থায় থাকলে শর্ত সাপেক্ষে তাদের বেইল আউট প্যাকেজ দেওয়া। নতুবা গোটা জোট বিপদে পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিসকে বেইল আউট প্যাকেজ দিয়েছে এবং গ্রিস পরবর্তীতে তার ইকোনমিতে ভালো করেছে।

Question to think about? বর্তমানে বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি ডিবেট হচ্ছে এই নিয়ে যে, রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে কি করবে না (State Intervention) এটি নিয়ে। ইন্টারভেনশনিস্ট অর্থনীতিবিদরা বলছেন অর্থনীতিকে সচল রাখতে সেখানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আবশ্যক। অন্যদিকে উদারপন্থি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে অর্থনীতিতে ব্যাঘাত ঘটে (Market Distortion)। এমন পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত কি উচিত না? যদি উচিত হয় তাহলে কেন এবং কোন কোন সেক্টরে হস্তক্ষেপ করা উচিত?

টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Boldizzoni, Francesco (2020), Foretelling the End of Capitalism: Intellectual Misadventures since Karl Marx, Harvard University Press
2. Cohen, Benjamin (2008), International Political Economy: An Intellectual History, Princeton University Press
3. Wright, Robert E. (2009), Bailouts: Public Money, Private Profit, New York: Columbia University Press
4. Wolf, Martin (2009), Fixing Global Finance, Yale University Press
5. Polanyi, Karl (2001), The Great Transformation: The Political and Economic Origins of Our Time, Beacon Press
6. Wu, Mark (2012), Antidumping in Asia's Emerging Giants, Harvard Journal of International Law
7. Frieden, J.; Lake, D. and Broz, J. L. (2017), International Political Economy: Perspectives on Global Power and Wealth, London: Routledge
8. Scheidel, Walter (2017), The Great Leveler: Violence and the History of Inequality from the Stone Age to the Twenty-First Century, Princeton University Press
9. Watson, Matthew (2005), Foundations of International Political Economy, Palgrave Macmillan
10. Brown, Archie (2009), The Rise and Fall of Communism, Bodley Head
11. Agar, Jolyon (2006), Rethinking Marxism: From Kant and Hegel to Marx and Engels, London and New York: Routledge
12. Case, Anne and Deaton, Angus (2020), Deaths of Despair and the Future of Capitalism, Princeton University Press
13. Booth, William J. (1991), The New Household Economy, American Political Science Association

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00