📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 শক্তি ও নিরাপত্তা

📄 শক্তি ও নিরাপত্তা


Theme: The Illusion of Security

“In the end, peace can be achieved only by hegemony or by balance of power." - Henry A. Kissinger

বুর্কিনা ফাসো। আফ্রিকার এই দেশটির নাম শুনলে আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সারা জাগে না, মাথায় প্রথমে কাজ করে দেশটি মনে হয় দারিদ্র্যপীড়িত। বিশ্ব রাজনীতিতে যার তেমন কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু যখন আমরা 'ইসরায়েল' বা 'আমেরিকা' বা 'চীন' এই দেশগুলোর নাম শুনি তখন কেমন যেন একটি উত্তেজনা কাজ করে, আমেরিকা শব্দটি শুনলেই আমাদের মাথায় স্বাভাবিকভাবেই এটা কাজ করে যে, রাষ্ট্রটি অনেক শক্তিশালী ও উন্নত। বুর্কিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু থেকে যদি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না এবং বিষয়টি অতটা গুরুত্বসহকারে নেওয়া হবে না। কিন্তু ওয়াশিংটন ডিসি থেকে যখন মাত্র কয়েকজন বাংলাদেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তখন আমরা সবাই একটু নড়েচড়ে বসি। নিষেধাজ্ঞাটি শুধু কয়েকজনের উপর আরোপ করা হলেও এর তাৎপর্য কিন্তু আমাদের কাছে অনেক মনে হয়। বুর্কিনা ফাসো ও আমেরিকা দুটিই কিন্তু স্বাধীন দেশ। অথচ বুর্কিনা ফাসো আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সাড়া জাগাতে পারে না। এটাই National Power বা জাতীয় শক্তির বহিঃপ্রকাশ। বুর্কিনা ফাসোর থেকে আমেরিকার জাতীয় শক্তি অনেক। জাতীয় শক্তি বলতে বোঝায় আমার নিজ স্বার্থ ও উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য অন্য রাষ্ট্রকে আমি কতটুকু প্রভাবিত করতে পারি অথবা অন্য রাষ্ট্রকে আমার কথা শুনতে বাধ্য করানোর মতো কতটুকু সামর্থ্য আমার আছে। অর্থাৎ অন্য রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বা তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে আমার সামর্থ্য কতটুকু।

National Power (জাতীয় শক্তি)
ব্যক্তি তার স্বার্থ রক্ষার জন্য যেমন অন্যকে প্রভাবিত করে, তেমনি রাষ্ট্রেরও প্রয়োজন হয় তার স্বার্থকে সংরক্ষণের জন্য অন্য রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার। নিজের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী অন্য রাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জাতীয় শক্তি বা ন্যাশনাল পাওয়ার। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে National Power বা জাতীয় শক্তিকে চার ভাবে দেখা হয়। তথা এর চারটি দিক রয়েছে।

1. Military Power: অন্য রাষ্ট্র কর্তৃক যুদ্ধ এবং আক্রমণ আমার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে এমন সম্ভাবনা থেকে প্রতিটি রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনী গঠন করে। প্রতিটি জাতির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সামরিক শক্তিকে প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও গুরুত্ব নির্ভর করে তার সামরিক শক্তির উপর। বড় সামরিক শক্তি না হয়ে কোনো রাষ্ট্র সুপার পাওয়ার বা বড় শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সুপার পাওয়ার। কারণ এর রয়েছে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে জাপান এবং জার্মানি বড় অর্থনৈতিক শক্তি কিন্তু তারা সুপার পাওয়ার বা মহান শক্তি হিসেবে স্বীকৃত নয়। কারণ তারা সামরিক শক্তির দিক থেকে পরাশক্তির তুলনায় কিছুটা দুর্বল।

2. Economic Power: ন্যাশনাল পাওয়ার এর দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে অর্থনৈতিক শক্তি। বর্তমানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাশিয়াকে বর্তমানে একটি সুপার পাওয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে না। কারণ সামরিক দিক থেকে রাশিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিকভাবে সে বর্তমানে অনেকটাই দুর্বল। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে সামরিক শক্তি বেশিদিন টিকে থাকে না। সেনাবাহিনী গঠন, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়করণ, সেনাবাহিনীর বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক শক্তি না থাকলে কোনো রাষ্ট্রই সামরিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে আমি অন্য রাষ্ট্রকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে আমার বলয়ে নিয়ে আসতে পারি, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলে কোনো রাষ্ট্র আমার কথা না শুনলে তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারি।

3. Psychological Power: সাইকোলজিক্যাল পাওয়ার হচ্ছে, আমি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রকে সফট পাওয়ার ব্যবহার করে কতটা প্রভাবিত করতে পারি এবং অন্য রাষ্ট্রের কাছে আমার 'National Image' টা কেমন। কুশলী কূটনীতি, মিডিয়া প্রচার কৌশল বা প্রপাগান্ডা, আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্ক, ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও ভৌগোলিক বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি জাতীয় শক্তির অন্যতম নির্ধারক। মিলিটারি শক্তি না থাকা সত্ত্বেও আজকে কাতার কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এত প্রভাবশালী? উত্তর হচ্ছে, কাতারের আছে একটি শক্তিশালী মিডিয়া- আল জাজিরা। আল জাজিরার মাধ্যমে কাতার নিজেদের পক্ষে জনমত গঠন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তালেবানদের সাথে পশ্চিমাদের যত নেগোসিয়েশন, চুক্তি, মতবিনিময় হয়েছে সবই কাতারের রাজধানী দোহাতে বসে। অর্থাৎ কাতার তার মিডিয়ার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে তার একটি ইমেইজ তৈরি করতে পেরেছে। এই সাইকোলজিক্যাল পাওয়ারটাই কাতারের অন্যতম জাতীয় শক্তি।

4. Weapons of Mass Destruction (WMD): যার বাংলা হচ্ছে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। যে অস্ত্রের দ্বারা বৃহৎ সংখ্যক জনগোষ্ঠী নিহত হয় সেটাই ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। যেমন- পারমাণবিক অস্ত্র, হাইড্রোজেন বোমা, রাসায়নিক জীবাণু ইত্যাদি। একটি রাষ্ট্র সামরিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে অধিক শক্তিশালী হওয়ার পর যখন তার হাতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র চলে আসে তখন সে পরাশক্তিতে পরিণত হয়। জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচটি সদস্য রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন) হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যে রাষ্ট্রগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তাদের জাতীয় শক্তি সর্বোচ্চ।

জাতীয় শক্তি প্রয়োগের মাধ্যম
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় শক্তি প্রয়োগের ৪টি মেথড রয়েছে; (ক) Persuasion: প্ররোচনা বা যুক্তি-পরামর্শ দ্বারা কাউকে রাজি করানো। সাধারণত জাতীয় স্বার্থ বা National Interests রক্ষার্থে কূটনীতি প্রয়োগ করাকেই 'Persuasion' বলা হয়। (খ) Rewards: এখানে পুরস্কার বলতে একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অপর রাষ্ট্রকে সাহায্য করা বোঝাচ্ছি। শক্তি প্রয়োগের দ্বিতীয় জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো এই পুরস্কার প্রদান। এটা হতে পারে বস্তুগত বা অর্থনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সংকটের সময়ে অর্থনৈতিক সাহায্য, সহজ ঋণ, অনুদান ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে তার থেকে সমর্থন আদায় এবং তার আচরণে পরিবর্তন নিয়ে আসে। (গ) Punishment: একটি রাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাওয়ার যখন অধিক শক্তিশালী থাকবে তখন যে রাষ্ট্রটি আমার কথা শুনবে না কিংবা আমার অবাধ্য হবে তাকে বিভিন্ন শাস্তি প্রদান করা। শাস্তি প্রদান বলতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বোঝায়। (ঘ) Force: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় শক্তি প্রয়োগের শেষ পদ্ধতি হলো সামরিক শক্তি বা সহিংসতার প্রকৃত ব্যবহার। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে বাধ্য করাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও লিবিয়াতে যেটা করেছিল।

Balance of Power (শক্তি সাম্য)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিসাম্য তত্ত্বটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিক পরিচিতি পেলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কলাররা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করায় একটু জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাই চেষ্টা করব উদাহরণসহ সহজ করে বোঝানোর জন্য। বাস্তববাদীদের (Realists) মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিটা আসলে নৈরাজ্যময়। তাই কে-কখন আমাকে আক্রমণ করে বসবে সেটা আমরা জানি না। তাই তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। ভারসাম্যের স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। (১) কোনো শত্রু রাষ্ট্র যদি সামরিকভাবে আমার থেকেও অধিক শক্তিশালী হয়ে পড়ে তাহলে সে আমার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই শত্রু রাষ্ট্রটি যেন আমার থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়ে না উঠে সেজন্য তাকে বাধা দিতে হবে এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দিয়ে তাকে দমিয়ে রাখতে হবে। ইরানের কথাই বলা যাক। ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দমিয়ে রাখার জন্য নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। এটাই Balance of Power বা শক্তিসাম্য তত্ত্বের বর্তমান উদাহরণ। (২) মনে করি A ও B দুটি রাষ্ট্র সামরিক ও অস্ত্রের দিক থেকে বর্তমানে সমান অবস্থানে আছে। কিন্তু দেখা গেল কয়েকবছর পর B রাষ্ট্রটি A এর তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে গিয়েছে। তখন B এর সমপরিমাণ শক্তিশালী হতে যা যা করা প্রয়োজন A রাষ্ট্রটি তাই করবে। অর্থাৎ যেকরেই হোক আমারও সমপরিমাণ শক্তি লাগবে (Power Equilibrium)। কারণ শক্তির দিক থেকে আমি পিছিয়ে গেলে আমাকে আক্রমণ করে বসতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্র এই কাজটি করেছে। এটাও শক্তিসাম্যের উদাহরণ।

শক্তিসাম্য যেভাবে রক্ষা করা যায়:
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারসাম্য তৈরি করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:

1. Policy of Nuclear Deterrence: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। বর্তমানে যে-সকল রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তারা সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি নিয়ে একটি প্রতিযোগিত্তাও শুরু হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অন্য রাষ্ট্রকে পারমাণবিক আক্রমণ থেকে বিরত রাখাকে টার্ম হিসেবে 'Nuclear Deterrence' বলা হয়। যেমন- বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যুত্তরে উত্তর কোরিয়াও তার পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখাচ্ছে। এটাই হচ্ছে Balance Of Power বা শক্তিসাম্য। অর্থাৎ পেন্টাগন যদি উত্তর কোরিয়ায় দশটি রকেট হামলাও চালায়, উত্তর কোরিয়াও ন্যূনতম একটি হলেও ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। তাই উভয়েরই ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে যদিও কারো কম কারো আবার বেশি। Balance Of Power বলছে এজন্যই কেউ কাউকে হামলা চালাতে পারবে না। এখানে একটি ভারসাম্য রয়েছে। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো পরস্পরকে এতটাই সমীহ করে যে, তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে এমন পরিস্থিতির আশপাশে যেতেও ভয় পাচ্ছে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে নিয়ে এতটা চিন্তিত। ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।

2. Military Alliance (সামরিক জোট): রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিপক্ষের সমকক্ষ হতে জোট গঠন করার মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোতে সমাজতন্ত্রের বিকাশ লাভ করে। সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। ফলশ্রুতিতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সমাজতন্ত্রের বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রও বিচলিত হয়ে ওঠে। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো নিয়ে গঠিত হয় সামরিক জোট ন্যাটো (NATO)। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও ভারসাম্য রক্ষা করতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো নিয়ে ওয়ারশ প্যাক্ট (The Warsaw Pact) নামে আরেকটি সামরিক জোট গঠন করে। তথা সামরিক জোট গঠন করেও Balance of Power রক্ষা করা যায়।

3. Economic Alliance (অর্থনৈতিক জোট): ব্রেটনউডসের অন্যতম দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। বিশ্বর সবগুলো রাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কাজ করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ ও অনুদান প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। চীনের দাবি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র মূলত এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করছে। তাই চীন ২০১৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে প্রতিষ্ঠা করে ব্রিকস ব্যাংক (BRICS)। এভাবে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা জোট গঠন করেও শক্তিসাম্য বজায় রাখা যায়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল প্ল্যানও ছিল Balance of Power এর উদাহরণ। উল্লেখ্য, মার্শাল প্ল্যান হলো পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে নিয়ে আসা।

4. Local Balance (স্থানীয় ভারসাম্য): যেমন- ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভারসাম্য। পাকিস্তানের সাথে পরাশক্তি চীনের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একই ভাবে ভারতের সাথে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক। কিন্তু চীন ও পাকিস্তান যদি একত্রে শুধু ভারতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে তখন ভারতের কাছে সেটা হুমকি মনে হতে পারে। চীন ও পাকিস্তান একসাথে, অন্যদিকে ভারত একা। অর্থাৎ এখানে কোনো ভারসাম্য নেই। তখন ভারত ভারসাম্য তৈরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তার পক্ষে নিয়ে আসে। পাকিস্তান + চীন = ভারত + যুক্তরাষ্ট্র, এরকম হলে এখানে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। এভাবে রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা রক্ষায় ভারসাম্য তৈরি করে।

5. Regional Balance (আঞ্চলিক ভারসাম্য): অঞ্চল ভিত্তিক যে-সকল সংস্থা রয়েছে সেগুলোও শক্তিসাম্যের উদাহরণ। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন রয়েছে। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য মনে করুন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কোনো আঞ্চলিক সংস্থা নেই। তখন বিষয়টি কেমন হবে? দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো একটি শূন্যতা অনুভব করবে যে, ইউরোপের একটি আঞ্চলিক সংস্থা রয়েছে অথচ আমাদের নেই। এখন আমরা বলতে পারি আমাদেরও 'সার্ক' রয়েছে। আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলো বলতে পারে আমাদেরও 'আফ্রিকান ইউনিয়ন' রয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বলতে পারে আমাদেরও 'OIC' রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো বলতে পারে আমাদেরও 'ইউনিয়ন অব সাউথ আমেরিকান নেশন' রয়েছে। অর্থাৎ এভাবে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একটি শক্তিসাম্য তৈরি করা যায়। যদিও সার্ক বা OIC এর অনেক দুর্বলতা রয়েছে।

6. Armaments (অস্ত্রসজ্জা): অন্য রাষ্ট্রের সাথে পাল্লা দিয়ে অস্ত্র বৃদ্ধি, পুনঃপুন সামরিক মহড়া, মিলিটারির সংখ্যা বৃদ্ধি ও ক্ষেপণাস্ত্র বৃদ্ধি ইত্যাদির প্রতিযোগিতাকে 'Armament' বলা হয়। অতীতের মতো বর্তমানেও যুদ্ধের জন্য সামরিক বাহিনী বৃদ্ধি ও রণসজ্জার মাধ্যমে ভারসাম্য তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ চীন সাগরে নিজের উপস্থিতি জোরদার করছে বেইজিং। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে গতিরোধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান প্রায় সাবমেরিন নিয়ে মহড়া চালায়। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই সোভিয়েত ও মার্কিন উভয়েই পারমাণবিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়াতে থাকে। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম এটম বোমা বানাতে সক্ষম হলে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেটা তার নিরাপত্তার হুমকি মনে করে। তখন পাঁচ বছর পরেই ১৯৫০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও এটম বোমা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র হাইড্রোজেন বোমা বানায়, সোভিয়েতও হাইড্রোজেন বোমা বানায়। যুক্তরাষ্ট্র আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, একই পথে হাঁটে সোভিয়েত। এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল যেন আরেকটি পারমাণবিক যুদ্ধ হতে চলেছে। তখন বিশ্বের ধ্বংসসাধনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই ধ্বংস প্রক্রিয়া MAD (Mutually Assured Destruction) তত্ত্ব নামে পরিচিত। তৃতীয়ত, ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ঘোষণা করে, এই প্রথম ভারত একটি পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। মাত্র কয়েকদিন পরেই পাল্টা জবাব হিসেবে পাকিস্তানও তাদের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এই যে পারমাণবিক অস্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার প্রতিযোগিতা এটাকে টার্ম হিসেবে বলা হয় 'Balance of Terror' বা ত্রাসের সাম্য।

7. Disarmament (নিরস্ত্রীকরণ): নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমেও ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। নিরস্ত্রীকরণ বলতে মূলত অস্ত্রের পরিমাণ হ্রাস বা অস্ত্রের বিলুপ্তি বোঝানো হয়। যেহেতু রাষ্ট্রগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, তাই সবাই মিলে অস্ত্রের পরিমাণ সংকোচন করাই শ্রেয়। ভারসাম্যটা এরকম যে, একটি রাষ্ট্র একাই নিরস্ত্রীকরণ করবে না, তার সমতুল্য অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েতের মধ্যে SALT, START ইত্যাদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য উপরিউক্ত সাতটি পদ্ধতি ছাড়াও আরও অনেক পদ্ধতি রয়েছে। আশাকরি শক্তিসাম্য নিয়ে আমাদের বুঝতে আর সমস্যা হবে না। এবার নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে বিস্তারিত কিছু কথা বলি।

নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে গৃহীত পদক্ষেপ:
আণবিক শক্তি কমিশন গঠন: ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের সাধারণ সভার প্রস্তাব অনুসরণে একটি পরমাণু শক্তি কমিশন (United Nation Atomic Energy Commission) গঠন করা হয়। এই কমিশন আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনা রচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

জেনেভা নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন: জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন হয়।

জাতিসংঘের অসংখ্য উদ্যোগ: ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আণবিক অস্ত্র রোধের লক্ষ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক একাধিক পদক্ষেপ গৃহীত হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মহাকাশে ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি): ইংরেজিতে Non-Proliferation Treaty (NPT) বলা হয়। ১৯৬৮ সালে চুক্তি হলেও বাস্তবায়ন হয় ১৯৭০ সাল থেকে। কিন্তু পঁচিশ বছর পর ১৯৯৫ সালে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রথম মিলিত হয়। ২০০৩ সালে উত্তর কোরিয়া চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও দক্ষিণ সুদান চুক্তিতে এখনো স্বাক্ষর করেনি।

মার্কিন ও সোভিয়েতের যৌথ প্রচেষ্টা: ১৯৭২ সালের ২৬ মে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র সীমিতকরণের লক্ষ্যে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মস্কোতে সল্ট-১ (SALT-I) চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ জুন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় সল্ট-২ (SALT-II) চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের পর ১৯৯১ সালের ৩১ জুলাই তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ ও জর্জ বুশ START-১ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত করেন। তারপর ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে রুশ প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের সঙ্গে START-২ চুক্তি সম্পাদন করেন।

রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংস্থা: যার ইংরেজি হচ্ছে, Organisation for the Prohibition of Chemical Weapons নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে যার সদরদপ্তর অবস্থিত। আণবিক অস্ত্র ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্য ১৯৯৭ সালে গঠিত হয় 'রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংস্থাটি'। বিশ্বের প্রায় সকল দেশ এর সদস্যপদ গ্রহণ করলেও ইসরায়েল, মিশর, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ সুদান- এই চারটি দেশ এখনো এর সদস্য হয়নি।

শক্তির ভারসাম্য কিংবা বিশ্বের অস্তিত্বের কথা বিবেচনা করে অসংখ্য নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি হলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি এবং এখনো হচ্ছে না। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন। দক্ষিণ আফ্রিকাই একমাত্র দেশ, যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার পর ধ্বংসাত্মকের কথা বিবেচনা করে ১৯৯১ সালে নিজেরাই সেই পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলে। সেকারণে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ক এখনো বিশ্বে প্রশংসিত। ইরান, ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া হয়তোবা শীঘ্রই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও দক্ষিণ সুদান এই চারটি রাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও এরা কেউই এনপিটি চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ভারত ২০২১ সালে প্রথম দেশ হিসেবে জাপানের সঙ্গে 'সিভিল নিউক্লিয়ার ডিল' করার ঘোষণা দিয়েছে। ইসরায়েলও বলছে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি শান্ত না হলে তারা এনপিটি চুক্তিতে যোগ দেবে না। আসলে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এখন অনিশ্চয়তায়। কথা হচ্ছে, সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলো তো আর প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে না। আণবিক অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে রাষ্ট্রের গোপন গবেষণাগারে। তাই শতশত চুক্তি, সংস্থা, কমিটি ইত্যাদি গঠিত হলেও রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র বৃদ্ধি করছে। যা একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। বিশ্বের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে।

Security (নিরাপত্তা)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় শক্তি, শক্তিসাম্য, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি বিষয়গুলো সবসময়ই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, রাষ্ট্রের টিকে থাকা, বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এই বিষয়গুলো বারবার চলে আসে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- বিশ্ব রাজনীতিতে সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায়? সবচেয়ে প্রচলিত সংজ্ঞা হচ্ছে, সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে মুক্তি এবং বাহ্যিক ভয়ের বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা। সাধারণত নিরাপত্তার বিষয়টি দুইভাবে দেখা হয়। তাই নিরাপত্তাকে দুইভাবে ভাগ করা হয়েছে। এক. Traditional security বা প্রচলিত নিরাপত্তা। দুই. Non-Traditional Security বা অপ্রচলিত নিরাপত্তা।

Traditional Security (প্রচলিত নিরাপত্তা): প্রচলিত নিরাপত্তার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রের সিকিউরিটি। অর্থাৎ এই নিরাপত্তায় শুধু রাষ্ট্রকেই জোর দেওয়া হয়। এর বিষয়বস্তু ব্যাপক। মিলিটারির মাধ্যমে যে-সকল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয় সেটাই প্রচলিত নিরাপত্তা। যেমন- রাষ্ট্রের ভূখণ্ড রক্ষা করা, বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা, জঙ্গিবাদ দমন, গৃহযুদ্ধ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদগুলো রক্ষা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ইত্যাদি। অর্থাৎ এটা State based বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক যত নিরাপত্তা। প্রচলিত নিরাপত্তার উপাদান হচ্ছে- State, territory, Survival, Sovereignty, Military, War, Hard Power, Foreign Policy ইত্যাদি।

Non-Traditional Security (অপ্রচলিত নিরাপত্তা): অপ্রচলিত নিরাপত্তার মূল বিষয়বস্তু রাষ্ট্র নয় বরং রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের জনগণের নিরাপত্তা। এটাকে 'Human Security' বা মানব নিরাপত্তাও বলা হয়। যেমন- জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের নিশ্চয়তা, পরিবেশগত সুরক্ষা, ডমেস্টিক ভায়ালেন্স থেকে নারীর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, মাদক পাচার ও মানব পাচার থেকে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি। অর্থাৎ এটা Human based বা নাগরিকদের নিয়ে কাজ করে। দারিদ্র্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, সাইবার ক্রাইম, বাল্যবিবাহ, শরণার্থী, আত্মহত্যা, বেকারত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো অপ্রচলিত নিরাপত্তার অংশ। অপ্রচলিত নিরাপত্তার উপাদান হচ্ছে- (ক) স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা (মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য), (খ) খাদ্য নিরাপত্তা (পুষ্টিকর খাদ্য, ক্রয়সাধ্যতা), (গ) শিক্ষার নিরাপত্তা (সমান সুযোগ ও প্রবেশাধিকার), (ঘ) পরিবেশগত নিরাপত্তা (দূষণমুক্ত, সবুজায়ন, বনায়ন), (ঙ) রাজনৈতিক নিরাপত্তা (মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলন করার স্বাধীনতা, দল গঠনের স্বাধীনতা), (চ) অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (জব বা চাকরি, কর্মসংস্থান), (ছ) ডিজিটাল নিরাপত্তা (সাইবার ক্রাইম, সাইবার বুলিং, হ্যাকিং) ইত্যাদি。

প্রচলিত নিরাপত্তার (Traditional Security) সমস্যাগুলো কোথায়?
1. The Frankfurt School of Security: প্রচলিত নিরাপত্তা বা Traditional security এর সমালোচনা করে এমন স্কলার যারা রয়েছে তারা "The Frankfurt School" হিসেবে পরিচিত। ফ্রাঙ্কফোর্ট আইডিয়াটি ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস, হেগেল, ম্যাক্স ওয়েবার ইত্যাদি ব্যক্তিত্বের মতাদর্শে গঠিত। তারা নিরাপত্তার বিষয়গুলো একেবারে ভিতর থেকে খুব ক্রিটিক্যালি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। ফ্রাঙ্কফোর্ট স্কুল অব থট এটা মূলত নিউ মার্কসিস্ট ধারণা। যার মূল কথা হচ্ছে, একটি সোসাইটির নিরাপত্তা বুঝতে হলে ওই সোসাইটির ইতিহাস সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানা জরুরি। হিস্ট্রিক্যাল বিষয়গুলো অ্যানালাইসিস এর মাধ্যমে ওই সোসাইটির সিকিউরিটি সম্পর্কে যাবতীয় ধারণা পাওয়া যায়। সমাজব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যেখানে মানুষকে দাস বানানো হয়, মানুষকে পরাধীন করে রাখা হয়, পুঁজিবাদী সিস্টেমে শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে বিবেচিত না করে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে নারীদেরকে পুরুষদের অধীন মনে করা হয়। প্রচলিত নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্র নিয়ে পড়ে থাকে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়েই প্ল্যান পরিকল্পনা করে। কিন্তু সমাজের কাঠামো বা স্ট্রাকচার পরিবর্তন নিয়ে তেমন কোনো জোর দেওয়া হয় না। প্রচলিত নিরাপত্তা নিয়ে নারীবাদীরাও সন্তুষ্ট নয়। নারীবাদীরা দাবি করছে, যুদ্ধের সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত অথচ যুদ্ধ সৃষ্টিতে নারীদের কোনো অবদান নেই।

2. The Copenhagen School of Security: কোপেনহেগেন মতাদর্শের মূল বক্তব্য হচ্ছে সিকিউরিটির বিষয়গুলো সামাজিকভাবে নির্মিত। কোনটি নিরাপত্তা এবং কোনটি নিরাপত্তা না ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাজে তৈরিকৃত। রাজনৈতিক নেতারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে নিরাপত্তা সম্পর্কিত কিছু বিষয়কে অধিক পরিমাণে গুরুত্ব দিয়ে বা অতিরঞ্জিত করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ: সারাদিন টেরোরিস্ট, জঙ্গিবাদ, জঙ্গিদমন ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে, এগুলো নিয়ে পলিসি তৈরি করবে, সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করবে, মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করাবে, বুদ্ধিজীবীরা দিনরাত কলাম লিখবে। মনে হবে যেন একঘণ্টা পরপরই দেশে জঙ্গি হামলা হচ্ছে, মনে হবে জঙ্গি হামলায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে, আর দেখানো হবে রাষ্ট্র সেগুলো সফলতার সঙ্গে দমন করছে। এই যে নিরাপত্তা সম্পর্কিত কোনো একটি বিষয়কে অতিরঞ্জিত করে ফোকাস দেওয়া সেটাকে 'Securitization' বলা হয়। অথচ প্রতি এক বছরে জঙ্গি হামলায় যে পরিমাণ মানুষ মারা যাচ্ছে তার থেকে দশগুণ বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে অনাহারে, দরিদ্রতায়, আত্মহত্যায়, রোড এক্সিডেন্টে। কোপেনহেগেন স্কুলের দাবি জঙ্গি দমনকে রাষ্ট্র যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে রোড এক্সিডেন্ট বা সড়ক দুর্ঘটনাকে অতটা গুরুত্ব দিচ্ছে না, প্রতিবছর আত্মহত্যা করে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু রাষ্ট্র সেটাতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর বন্দুক হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, ফ্লোরিডায় বন্দুক হামলায় ৪০ জন নিহত, অ্যালাবামায় স্কুল শিক্ষার্থীর বন্দুক হামলায় ১৫ জন নিহত, নিউইয়র্কের রেস্টুরেন্টে বন্দুক হামলায় ২০০ জন নিহত। তিন-চার দিন পরপরই এরকম খবর আসে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী দমনে। যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়দা, আইএস ইত্যাদি গোষ্ঠীর উপর যতটা ফোকাস দেয় নিজ দেশের বন্দুক হামলায় ততটা গুরুত্ব দেয় না।

আরেকটি উদাহরণ দেই- রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা একরকম হাইপ তৈরি করে, মনে হবে যেন চীন এখনি ভারতকে আক্রমণ করে বসবে, উত্তর কোরিয়া মনে হয় এখনই পেন্টাগনে মিসাইল নিক্ষেপ করবে, রাশিয়া যে-কোনো সময় আক্রমণ চালাতে পারে ইত্যাদি। জনগণকে বোঝানো হয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় যুদ্ধ অনিবার্য। তাই প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বাড়াও, মডার্ন ওয়েপনস ক্রয় কর। অথচ প্রতিরক্ষা খাতে যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় সেই টাকা দিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের উন্নয়নে, অবকাঠামো নির্মাণে, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে, মানব সম্পদ বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যেত। ইরানে বর্তমানে বেকারত্ব প্রকট, অবকাঠামো খাতে ভঙ্গুরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। কিন্তু এসবের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ইরান প্রতিবছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে তার পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধিতে। অর্থাৎ কোপেনহেগেন এর মূল কথা হচ্ছে, রাষ্ট্র নিরাপত্তার যে বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন (যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান) সেগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে তৈরিকৃত কিছু বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশল কেমন হওয়া উচিত:
প্রতিটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কিছু ঝুঁকি থাকে। তন্মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি (Internal Threats) হচ্ছে সামরিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সেনা অভ্যুত্থানের প্রবণতা, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ইত্যাদি। আর বৈদেশিক ঝুঁকি (External Threats) হচ্ছে প্রতিবেশি বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সীমান্ত বিরোধ, শক্তিশালী রাষ্ট্রের উপর অধিক নির্ভরশীলতা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি। তাই একটি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা কীভাবে রক্ষা করবে সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্রটি মূলত কোন ধরনের। চীনের সাথে ১৪টি রাষ্ট্রের বর্ডার রয়েছে, তাই চীনের নিরাপত্তা কৌশল একরকম হবে। বাংলাদেশের তিনদিকে ভারত আর একদিকে সমুদ্র। তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজি আরেকরকম হবে। অস্ট্রেলিয়ার চারদিকে সমুদ্র, তাই অস্ট্রেলিয়াকে জোর দিতে হয় নৌবাহিনীর উপর। আফগানিস্তান একটি ল্যান্ডলকড বা স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। তাই আফগানিস্তানের নিরাপত্তা কৌশল অস্ট্রেলিয়ার থেকে ভিন্ন হবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলের সাথে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল মিলবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তার ধরন পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশ যেহেতু তুলনামূলকভাবে একটি ক্ষুদ্র বা ছোট রাষ্ট্র, তাই ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কীভাবে রক্ষা করা যায় সেটা নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করব।

1. Alliance (জোটে অংশগ্রহণ করে): ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিজ শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষা করা অনেক কঠিন। একটি বড় রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার সামর্থ্য ছোট রাষ্ট্রগুলোর নেই। তাই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক গঠিত জোটগুলোতে যোগ দিয়ে ছোট রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে। কারণ জোটগুলোর সনদে এটা বলা থাকে যে, জোটভুক্ত সদস্যের নিরাপত্তা রক্ষায় একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, আলবেনিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আয়তনের দিক থেকে অনেক ছোট কিন্তু এগুলো ন্যাটো জোটের সদস্য। সামরিক ন্যাটো জোটের সদস্য হওয়ার কারণে এই রাষ্ট্রগুলোকে কেউ আক্রমণ করার সাহস পায় না。

2. Balance of Power (শক্তিসাম্য বজায় রেখে): ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তার নিরাপত্তা রক্ষা করা যায়। যেমন- ওশেনিয়া মহাদেশের ছোট দেশ নাউরু। নাউরু অস্ট্রেলিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করেছে। তাই এখন নাউরু একা নয়, তার সাথে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। নাউরুকে কেউ আক্রমণ করলে অস্ট্রেলিয়া সেটাকে প্রতিহত করবে। অস্ট্রেলিয়ার সাথে যেহেতু নাউরুর সম্পর্ক রয়েছে তাই নাউরুকে আক্রমণ করার সামর্থ্য কেউ দেখাবে না। অনেক সময় এভাবে ছোট রাষ্ট্রগুলো বৃহৎ রাষ্ট্রকে আস্থায় নিয়ে টিকে থাকে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্থান করে নেয়।

3. Collective Security (যৌথ নিরাপত্তা): কোনো একটি রাষ্ট্র যদি যুদ্ধে লিপ্ত হয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, তাহলে ঐ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাধিক রাষ্ট্র মিলে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটাকেই বলা হয় যৌথ নিরাপত্তা। যৌথ নিরাপত্তার এই ধারণাটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন প্রথম সামনে নিয়ে আসেন। বর্তমানে যৌথ নিরাপত্তা রক্ষা করা হয় জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, সামরিক জোট ইত্যাদি মাধ্যমে। ছোট রাষ্ট্রগুলো যেহেতু নিজ সামর্থের উপর নির্ভর করে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তাই তাদের উচিত যৌথ নিরাপত্তার উপর গুরুত্বারোপ করা।

4. Pilot Fish Behaviour (পাইলট ফিসের মতো আচরণ করে): Pilot Fish মূলত এমন এক ধরনের ছোট সামুদ্রিক মাছ যা আমরা ক্যারিবিয়ান সাগরে দেখতে পাই। এই ছোট মাছগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা বড় বড় হাঙ্গরের গা ঘেঁষে চলে এবং সেই হাঙ্গরের গায়ে জমা শেওলা খেয়েই বেঁচে থাকে। এই মাছগুলোর চতুরতার জন্য হাঙ্গরের আশেপাশে থাকা সত্ত্বেও এই মাছগুলোকে হাঙ্গর খেতে পারে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে Pilot Fish Behaviour এর সম্পর্ক কী?

বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে কিছু ছোট রাষ্ট্র থাকে এবং একটি বা দুটো বড় বা শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকে। যেমন- আমাদের এই উপমহাদেশের কথা বললে এখানে চীন ও ভারত দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। অন্যদিকে ভুটান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও নেপাল ছোট রাষ্ট্র। তাই ছোট রাষ্ট্রগুলোকে এমনভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে যাতে করে এই রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রতিবেশি বৃহৎ শক্তির সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে টিকে থাকতে পারে। এই তত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন Erling Bij নামে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এক বিশেষজ্ঞ। এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে তুমি হাঙ্গরের পাশাপাশি থাকো কিন্তু এমনভাবে থাকো যাতে হাঙ্গর তোমাকে খেতে না পারে।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী নর্ডিকভুক্ত দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক কীভাবে রক্ষা করবে এটা বোঝাতে গিয়ে তিনি Pilot Fish Behaviour এর তত্ত্ব দিয়েছিলেন। অর্থাৎ পাইলট মাছ যেভাবে আচরণ করে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোরও সেভাবে আচরণ করা উচিত। যাতে করে বড়রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে গ্রাস করতে না পারে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি সাথে পার্শ্ববর্তী বড় দেশের সম্পর্কের প্রশ্নে এই তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এ্যান্ডোরা এই তত্ত্ব সফলভাবে প্রয়োগ করছে। পাইলট ফিসের মতো পুঁচকে দেশ এ্যান্ডোরা খুবই কূটনৈতিক দূরদর্শীসম্পন্ন রাষ্ট্র। প্রতিবেশি ফ্রান্স ও স্পেন দুটোই দখলদার রাষ্ট্র। নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এ্যান্ডোরা ফ্রান্স ও স্পেন থেকে একজন করে রাজা নিয়োগ দেয়। এ্যান্ডোরার রাজা দুইজন। একজন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, অন্যজন স্পেনের বিশপ। বলা হচ্ছে ইউক্রেন রাষ্ট্রটি Pilot Fish Behaviour থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিবেশি বড় রাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধাচারণ করেছে বলেই ইউক্রেন আজ পতনের দিকে।

বর্তমানে আমরা গ্লোবাল রাজনীতির যেই যুগটা পার করছি সেটাকে এনার্কি বা নৈরাজ্যের যুগ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। রাজনীতিতে সাধারণত নৈরাজ্য বলতে একটি রাষ্ট্রে শাসক বা সরকারের অনুপস্থিতিকে বোঝায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তেমনিভাবে বর্তমানে কোনো শাসক (কার্যকরী আন্তর্জাতিক সংস্থা) নেই। কেউ কারো কথা শুনছে না। বিশ্বের এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তার প্রতিবেশি ছোট রাষ্ট্রগুলোকে হাঙ্গর মাছের মতো গিলে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তাই ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় রাষ্ট্রগুলোর থাবা থেকে বাঁচতে পাইলট ফিসের মতো ধূর্ত হতে হবে।

Question to think about?
ধরুন আপনি বাংলাদেশের একজন সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক। একজন নীতিনির্ধারক হিসেবে আপনি প্রচলিত এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করবেন?

টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Buzan, B. and L. Hansen (2009), The Evolution of International Security Studies, Cambridge University Press
2. Collins, Alan, ed. (2016), Contemporary Security Studies (4th ed.), Oxford, United Kingdom: Oxford University Press
3. Morgan, P. (2007), Security in International Politics: Traditional Approaches, New York
4. Treverton, Gregory F. (2005), Measuring national power, RAND Corporation
5. Howard, Sir Esme (May 1925), British Policy and the Balance of Power, The American Political Science Review
6. Myrdal, Alva (1978), The Game of Disarmament: How the United States and Russia run the arms race, New York: Pantheon
7. Walt, Stephen M. (1987), The Origins of Alliances, New York: Cornell University Press
8. Wendt, Alexander (1992), Anarchy Is What States Make of It: The Social Construction of international Politics, International Organization
9. Buzan, Barry; Wæver, Ole (2003), Regions and Powers: The Structure of International Security, Cambridge University Press.

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 নয়া বিশ্বব্যবস্থা

📄 নয়া বিশ্বব্যবস্থা


সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা থিংকট্যাংকরা নড়েচড়ে বসল। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা বলল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন মানে সমাজতন্ত্রের পতন। তাঁর মতে সমাজতন্ত্র বিশ্বব্যবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি, তাই এর পতন হয়েছে। অন্যদিকে ক্যাপিটালিজম জয়ী হয়েছে। যেহেতু পুঁজিবাদের জয় হয়েছে তার মানে পুঁজিবাদ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার সাথে মানানসই। এতদিন সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল তার অবসান ঘটল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে। এখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো আর কোনো মতাদর্শ (Ideology) অবশিষ্ট নেই। তাই ইতিহাসের সমাপ্তি হলো। ফুকোয়ামা এটার নাম দিয়েছে "The End of History” বা ইতিহাসের সমাপ্তি। ইতিহাসের সমাপ্তি বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, পৃথিবীতে পুঁজিবাদের চেয়ে উত্তম কোনো মতাদর্শ আর আসবে না। পুঁজিবাদই সেরা। আর এখন থেকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ১৯৯১ সাল থেকে পুরো বিশ্বব্যবস্থার হর্তাকর্তা হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র। এভাবে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা নতুন এই বিশ্বব্যবস্থাকে নাম দেওয়া হলো New-World Order তথা নয়া বিশ্বব্যবস্থা।

কীভাবে চলবে নয়া এই বিশ্বব্যবস্থা

তারপর ইন্টেলেকচুয়াল অঙ্গনে প্রশ্ন উঠল কীভাবে চলবে নয়া বিশ্বব্যবস্থা? ফুকোয়ামা বলল বিশ্ব চলবে গণতন্ত্র ও ক্যাপিটালিজমের উপর ভিত্তি করে। জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস এর অনুসারীরা বলল ফুকোয়ামার সাথে আমরা একমত নই। তারা বলল কয়েকবছর পরপর পৃথিবীতে নতুন নতুন মতাদর্শ তৈরি হবে। এখন থেকে শুধু পুঁজিবাদ আজীবন একক নেতৃত্বে থাকবে বিষয়টি এরকম নয়। যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন আইডিওলজি তৈরি হবে, তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হবে, যে জয়ী হবে সে পৃথিবী শাসন করবে। একসময় কৃষি ছিল, তারপর সামন্তবাদ, তারপর কলোনিয়ালিজম, তারপর পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। এভাবে পর্যায়ক্রমে বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তন হবে। তাদের মতে পুঁজিবাদ নিয়েও সমস্যা দেখা দেবে। তখন পুঁজিবাদের সংস্করণ হবে। উদাহরণস্বরূপ: ১. Thesis: একদল বলবে পুঁজিবাদী সিস্টেম সর্বোত্তম। কেননা এর কারণে শিল্পায়ন হয়েছে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যদ্রব্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২. Antithesis: অন্যদল বলবে পুঁজিবাদী সিস্টেম সর্বোত্তম না। পুঁজিবাদের কারণে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে এবং গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে। তার মানে পুঁজিবাদী সিস্টেমেও সমস্যা আছে। ৩. Synthesis: এভাবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার পর তারা সমাধানে আসবে। যেহেতু আয় বৈষম্য কমাতে সরকার কর আরোপের মাধ্যমে ধনীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরিবদের মাঝে বণ্টন করবে (Redistribution), যেহেতু পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তাই সরকার কলকারখানাগুলোর উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করবে। এভাবে প্রতিনিয়ত পুজিবাদেরও সংস্করণ হবে। অর্থাৎ Thesis এবং Antithesis এর সমন্বয়ে Synthesis হয়। এই যে থিসিস এবং এন্টিথিসিসের মধ্যকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ সিনথেসিস গঠনের যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)।

আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমানে ঠিক তাই হচ্ছে। ১৯৯০ সালের যে পুঁজিবাদ আজকের দুনিয়ায় কিন্তু সেই পুঁজিবাদ নেই। তার অনেক সংস্করণ হয়েছে। আজকে উন্নত দেশগুলো Welfare Economy বা কল্যাণমূলক অর্থনীতিকে বেছে নিয়েছে। কল্যাণমূলক অর্থনীতির মানে হচ্ছে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র দুটোর মিশ্রণ। এই দুটোর ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বর্তমান বিশ্বে। ধনীদের থেকে টাকা নিয়ে সেটা গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতে ফ্রিতে যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়, শিক্ষাব্যবস্থায় যে ভর্তুকি দেওয়া হয় ইত্যাদি সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। বেকারভাতা ও বয়স্কভাতা ইত্যাদিও সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। পুঁজিবাদ কিন্তু এগুলো সমর্থন করে না। তাই বর্তমানে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মিশ্রণে নতুন যে অর্থব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সেটাকে “Mixed Economy" ও বলা হচ্ছে।

সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations)

মার্ক্স ও ফুকোয়ামার অনুসারীদের পর আলোচনায় যুক্ত হলেন মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেমুয়েল হান্টিংটন। সমাজতন্ত্র পতনের পর নয়া বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে সেটার উপর থিসিস নিয়ে হাজির হলেন। তিনি "Clash of Civilizations" বা "সভ্যতার সংঘাত” নামে নতুন একটি থিওরি নিয়ে আসলেন। পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়েছিল কলোনির দখল নিয়ে, যুদ্ধ হয়েছিল ভূখণ্ড দখলের জন্য, যুদ্ধ হয়েছিল কলোনি থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য। অর্থাৎ পূর্বে যুদ্ধ হয়েছিল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি রাষ্ট্রের। তারপর ১৯৪৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধ হয়েছিল পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের। কিন্তু নয়া বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধ হবে এক সভ্যতার সাথে অপর সভ্যতার। আগামী দিনে সভ্যতা বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সংঘাতের কারণ হবে। আর একেই নাম দেয়া হয়েছে "সভ্যতার সংঘাত" নামে। ১৯৯৬ সালে উপরিউক্ত বিশ্বব্যবস্থার অনুকল্প হিসেবে "The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order" নামে হান্টিংটনের একটি বিখ্যাত বই প্রকাশিত হয়।

এই বইয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে কীভাবে পুনর্গঠন করা যায় এবং কীভাবে সাজানো যায় এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করেন। হান্টিংটনের এই থিওরি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তার পরবর্তী দুই দশকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণয়ন করেছে। বইয়ে মোট ৮টি সভ্যতার কথা বলা হয়েছিল। বিশ্বের সকল রাষ্ট্র তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে এই আটটি সভ্যতার ছত্রছায়ায় একত্রিত হবে। এদের মধ্যকার দ্বন্দ্বই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে।

সভ্যতাগুলো হলো: ১. পশ্চিমা সভ্যতা: যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা, পশ্চিম এবং মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, ওশেনিয়া এবং ফিলিপাইন। সবগুলোই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র। ২. ল্যাটিন আমেরিকান সভ্যতা: মেক্সিকো, কিউবা, গায়ানা, সুরিনাম-সহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমূহ। ৩. স্লাভিক-অর্থোডক্স বিশ্ব: মুসলিম অধ্যুষিত আজারবাইজান এবং আলবেনিয়া বাদে সাবেক সোভিয়েত সংঘের দেশসমূহ। এছাড়া সাবেক যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, জর্জিয়া, গ্রীস এবং রোমানিয়া। ৪. মুসলিম সভ্যতা: বিশ্বের সকল মুসলিম দেশগুলো নিয়ে। বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক, বাংলাদেশ, বসনিয়া, হার্জেগোভেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সাউথ সুদান, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপ। মুসলিম বিশ্বের এই রাষ্ট্রগুলো ইসলামি সভ্যতার ছায়াতলে থাকবে। ৫. সিনিক বা চীনা সভ্যতা (Sinic Civilization): চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান। ৬. সাব-সাহারান আফ্রিকান সভ্যতা: আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো বাদে সাব- সাহারান আফ্রিকার খ্রিষ্টান দেশসমূহ। ৭. জাপানিজ সভ্যতা। ৮. হিন্দু সভ্যতা।

আটটি সভ্যতা উল্লেখ করলেও হান্টিংটন মনে করেন দ্বন্দ্ব হবে মূলত তিনটি সভ্যতাকে কেন্দ্র করে। এই তিনটি হলো: 'পশ্চিমা সভ্যতা, 'ইসলামি সভ্যতা' এবং 'চীনা সভ্যতা'। পশ্চিমা সভ্যতা বাকি দুইটি সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ইসলামি সভ্যতার এবং পশ্চিমা সভ্যতার সাথে চীনা সভ্যতার দ্বন্দ্ব। একটি সময় পর চীনা ও ইসলামি সভ্যতা একসাথে হয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়বে। চীনের সাথে শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়বে এটাকে তিনি "Sino-Islamic connection" হিসেবে দেখিয়েছেন।

হান্টিংটন বলেন, 'পশ্চিমের কাছে সমস্যা ইসলামি মৌলবাদ নয়, সমস্যা হলো ইসলামি ধর্ম যা আলাদা একটি সভ্যতার জন্ম দিয়েছে'। হান্টিংটন তার তত্ত্বে সম্ভাব্য ৩য় বিশ্বযুদ্ধের রূপরেখা দিয়েছেন, যেটি মুসলিম বিশ্বের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে সংঘটিত হবে, আর মুসলিম বিশ্বের সাথে থাকবে চীন অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে থাকবে ভারত। হান্টিংটনের উদ্বেগের জায়গা হলো, ক্রমান্বয়ে পশ্চিমা সভ্যতা কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে জনসংখ্যার দিক থেকে, মুসলিম এবং ল্যাটিন অভিবাসীদের কারণে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও।

তাঁর মতে মুসলমানদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার এবং চীনের সামরিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পশ্চিমা সভ্যতাকে হুমকির সম্মুখীন করছে। তবে এডওয়ার্ড সাঈদ এবং নোয়াম চমস্কি এই তত্ত্বের অন্যতম সমালোচক। হান্টিংটন সভ্যতাগুলোর মধ্যে যে বিভাজন টেনে দিয়েছেন সেটার সুনির্দিষ্টভাবে অ্যাকাডেমিক অঙ্গন থেকে প্রথম প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড সাঈদ। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, আমরা এখন বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি। তাই পৃথিবীর আকারও ছোট হয়েছে। এখন মানুষ সভ্যতাকেন্দ্রিক আলাদা আলাদা বসবাস করছে না। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে। যেমন- এক যুক্তরাষ্ট্রেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত লোকজন একসাথে বসবাস করছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা নাগরিক হতে শুরু করে মুসলিম আমেরিকান নাগরিক, আফ্রিকান আমেরিকান নাগরিক, হিস্প্যানিক আমেরিকান নাগরিক, তথা সবাই একসঙ্গে বসবাস করছে। সভ্যতার মধ্যে সংঘাত যদি হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রথম সংঘাত হওয়ার কথা ছিল। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, সংঘাত এড়ানোর যে অনেক উপাদান রয়েছে হান্টিংটন সেগুলোকে অবজ্ঞা করে গিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বায়ন, আন্তঃনির্ভরতা, সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো হান্টিংটনের নজরে পড়েনি। সেমুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের প্রত্যুত্তরে এডওয়ারড সাঈদও "Clash of Ignorance" (অবজ্ঞার সংঘাত) নামে আরেকটি বই লিখেন।

আমেরিকার সমালোচক নোয়াম চমস্কির মতে, সাম্রাজ্যবাদ শক্তির বিস্তার বা তেল সম্পদের লণ্ঠনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধকে যায়েজ করার জন্য মার্কিন প্রশাসন ইসলামি সভ্যতাকে সন্ত্রাসবাদের লেবাস পরিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। হান্টিংটনের থিওরি প্রচুর সমালোচিত হলেও কিছু কারণে একুশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসেও প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।

১. Two forms of conflict: হান্টিংটন দুই ধরনের সংঘাতের কথা বলেছেন। প্রথমটি হলো "Fault line conflicts"। এর মানে হচ্ছে দুটি রাষ্ট্র পাশাপাশি অবস্থিত কিন্তু তাদের সভ্যতা ভিন্ন। যেমন ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। ভারত হিন্দু সভ্যতার, আর পাকিস্তান মুসলিম সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত। ভারত-চীন দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও একই। এই সংঘাতটা হবে স্থানীয় পর্যায়ে। অর্থাৎ একই অঞ্চলের পাশাপাশি অবস্থিত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সংঘাত। হান্টিংটনের দ্বিতীয় সংঘাতটি হচ্ছে “Core state conflicts"। এর মানে হলো বৈশ্বিক পর্যায়ের সংঘাত। যেমন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। চীনের অবস্থান এশিয়াতে আর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আমেরিকা মহাদেশে। হান্টিংটনের বর্ণিত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই দুই ধরনের সংঘাতই বর্তমানে বেশি হচ্ছে।

২. Sino-Islamic connection: হান্টিংটন বলেছিল চীনা সভ্যতা ও মুসলিম সভ্যতা একসাথে হয়ে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এটা তো আজকের দুনিয়ায় অস্বীকার করা যাবে না। এটা বরং সত্যি হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, কাতার আজ চীনের বলয়ে। এখানে হান্টিংটনের থিওরি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও ধীরে ধীরে চীন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

৩. Theory of "band-wagoning": 'Band Wagoning' পরিভাষাটির মানে হলো, যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে লাভ ক্ষতি হিসেব-নিকেশ করা। যুদ্ধ শুরু করলে আমার লাভ হবে কতটুকু এবং ক্ষতি হবে কতটুকু (Cost Benefit Analysis)। যদি লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয় তাহলে যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়াটাই উত্তম। এটাই ব্যান্ডওয়াগনিং তত্ত্বের মূল কথা। হান্টিংটন বলেছিলেন সংঘাত এড়াতে অন্যান্য দেশগুলোর উচিত পশ্চিমা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে মেনে নেওয়া। তাঁর মতে যদি নিজেকে রক্ষা করার মতো শক্তি-সামর্থ্য না থাকে তাহলে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টক্কর দিয়ে পুরো দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজকের ইরাকের এই দুরবস্থার জন্য অর্ধেক দায়ী সাদ্দাম হোসেনের হটকারিতা আর অর্ধেক দায়ী যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বে সাদ্দাম হোসেনের নিজ শক্তি সামর্থের কথা আমলে নেওয়া উচিত ছিল।

৪. War against Terrorism: সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বে যেটা বলা হয়েছিল সেটা গত বিশ বছরে মুসলিম বিশ্বে প্রতিফলিত হয়েছে। আফগানিস্তান, বসনিয়া, কসোভো, চেচনিয়ার উদাহরণ তো এই তত্ত্বের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। টুইনটাওয়ার হামলার পর ওসামা বিন লাদেনকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট বুশের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা সেটা সভ্যতার সংঘাত তত্তেরই প্রতিফলন।

করোনা পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা (World Order After Covid-19)

১৯৯০ এ সোভিয়েত পতনের পর সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব দিয়ে যে নয়া বিশ্বব্যবস্থা শুরু হয়েছিল সেটা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। নয়া বিশ্বব্যবস্থার পর ২০১৯ সাল থেকে পৃথিবীতে নতুন আরেকটি বিশ্বব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে "World Order after Covid-19" নামে। বার্লিন দেয়াল পতনের পরবর্তী সময়ের মতো করোনাসংকট পরবর্তী বিশ্বের চিত্রপট আমাদের সামনে বেশ কিছুটা পরিবর্তিত রূপেই হাজির হয়। তার কিছু চিত্র তুলে ধরা যাক-

Multipolar System বা বহু-মেরু ব্যবস্থা: করোনা পরবর্তী বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের রাজনীতি কোনো একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্বের নেতা হিসেবে উত্থান হয়েছে আঞ্চলিক শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এবং অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যেমন- দক্ষিণ এশিয়াতে আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও পাকিস্তান। দূরপ্রাচ্যে চীন, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, কাতার ও ইসরায়েল। ইউরোপে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইতালি। উত্তর আমেরিকায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। ল্যাটিন আমেরিকায় ব্রাজিল, চিলি ও পেরু। আফ্রিকায় মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইথিওপিয়া ইত্যাদি। কূটনৈতিক অঙ্গনে উপরিউক্ত দেশগুলোর নামই বেশি শুনা যাচ্ছে। করোনা পরবর্তী বহু-মেরু ব্যবস্থা (Multipolar System) সবচেয়ে বেশি জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-সহ অতীতে যারা বিশ্বের মোড়ল ছিল তারা করোনাকালে বিশ্বকে মোটেই নেতৃত্ব দিতে পারেনি। তাঁদের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগও পাওয়া যায়নি, যা বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে কোভ্যাক্স গঠিত হলেও রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপাক্ষিকতার উপর বেশি প্রাধান্য পাওয়ায় সেটাও ব্যর্থ হয়েছে। যা বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদলের তাগিদ দিয়েছে ভবিষ্যৎকে। যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের জায়গায় চীন-কেন্দ্রিক বিশ্বায়নের দিকে ঝুঁকেছে অর্থনীতি।

Covid Nationalism (করোনা-জাতীয়তাবাদ): করোনার সংক্রমণে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে নিজ নিজ সীমান্ত নিয়ে সচেতন হয়ে গেল, তাতে মার্শাল ম্যাকলুহান 'বিশ্বগ্রাম' এর যে ধারণা দিয়েছিলেন তা একটু হলেও সর্বজনীনতা হারিয়েছে। করোনা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিটি দেশ কীভাবে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, বন্ধ করে দিয়েছে বিমান চলাচল। সীমানাবিহীন রাষ্ট্রের (Borderless State) যে ধারণা নিয়ে বিশ্ব আগাচ্ছিল তা অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা চলমান থাকার সম্ভাবনা প্রবল। খোদ 'ইউরোপীয় ইউনিয়ন'ও এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি; বরং ইউনিয়নভুক্তরা একে অপরের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার চেষ্টায় ছিল। এভাবে এক দেশ অন্য দেশের জন্য সীমানা বন্ধ করে দেওয়ার যে প্রবণতা চালু হয়েছে সেটাকে বলা হয়েছে 'Covid Nationalism' বা 'করোনা-জাতীয়তাবাদ'। করোনাকালে ইতালি ও সার্বিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলো অসহায় হয়ে পড়লে ইউরোপীয় অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। এটা মূলত ইউরোপীয় ঐক্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে আঞ্চলিক মেরুকরণ বেড়েছে ও কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।

The rise of surveillance state (গণ-নজরদারির রাষ্ট্র): মহামারি পরবর্তী এক গণ- নজরদারি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে সরকার প্রতিটি নাগরিকের প্রতিটি মুহূর্তের চলাফেরা শুধু নয়, তার আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দের খবরও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারির মতে, মহামারির সময় লকডাউন, নজরদারি, বিধিনিষেধ, ট্র্যাকিং ইত্যাদি যেসব স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ রাষ্ট্র নিয়েছিলো, সেগুলো এখন রাষ্ট্রের পাকাপাকি ব্যবস্থায় পরিগনিত হওয়ার প্রবণতা প্রবল। আর সেই পথ ধরে উত্থান হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার। বিংশ শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়নে ২৪ কোটি জনগণের উপর সার্বক্ষণিক নজরদারির কোনো সুযোগ রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির ছিল না। কারণ তখন প্রযুক্তিগত এত উন্নতি ছিল না। তাই কেজিবিকে নির্ভর করতে হতো তাদের এজেন্টদের উপর। কিন্তু এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এমন প্রযুক্তি এসে গেছে যা দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আজকে চীনে সব মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হচ্ছে। চেহারা চিনতে পারে এরকম লাং লাখ ক্যামেরা দিয়েও নজর রাখা হচ্ছে মানুষের উপর। একুশ শতকের বিশ্বে এভাবে গণ নজরদারিমূলক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটছে, যেটাকে "Nightmarish Surveillance State হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

তাছাড়া করোনাকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছিল অন্য আরেকটি রাষ্ট্রেকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম হাতিয়ার। উন্নত দেশগুলো ভ্যাকসিন সরবরাহের ক্ষেত্রে নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছে। এমনকি চীন তার ভ্যাকসিন সরবরাহ করার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছে যে রাষ্ট্রগুলো চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অংশ সে রাষ্ট্রগুলোকে। ভ্যাকসিন সরবরাহে উন্নত ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল সেটাকে 'Vaccine Apartheid' বা ভ্যাকসিন বর্ণবাদ বলা হয়। পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাসের বিস্তার তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে এক তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে উত্তর-দক্ষিণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে বৈষম্য তা প্রকট আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছিল কাউকে নিয়ন্ত্রণ, বশে রাখা, সম্পর্ক উন্নয়ন কিংবা শিক্ষা দেয়ার অন্যতম উপকরণ। এভাবে ভ্যাকসিন এর মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সেই রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসার প্রয়াসকে বলা হচ্ছিল 'Vaccine Imperialism' বা ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যবাদ। ভ্যাকসিন কূটনীতির আবরণে চলছিলে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ।

আগামী বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে এবং সেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে এসব নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের কাজ চিকিৎসা-স্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা নয়, বরং এই করোনাউত্তর সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যে পরিবর্তনটা আসবে, তা দেখিয়ে দেওয়া। আমরা সাধারণত জানি, রাষ্ট্র তার চরম সংকটময় মুহূর্তে 'জরুরি অবস্থা' জারি করার ক্ষমতা রাখে। যেমন- মহামারি ও যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার অধিকার সরকারের রয়েছে। কিন্তু ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেন দেখিয়েছেন, জরুরি অবস্থা এখন আর 'স্টেট অব এক্সসেপশন' তথা নিয়মের 'ব্যতিক্রম' নয়, সদা সর্বদা জরুরি অবস্থাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহামারি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে শাসকশ্রেণি যেভাবে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিজীবনে হস্তক্ষেপ ও সার্বক্ষণিক নজরদারি করেছে ঠিক তেমনি 'জরুরি অবস্থা' ঘোষণা ছাড়াই প্রতিনিয়ত শাসকরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে একই কাজ করে।

'State of Exception' শিরোনামে জর্জিও আগামবেন ২০০৭ সালের দিকে একটি বইও লিখেছেন। মোটাদাগে এই প্রত্যয়টি দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের কিছু অধিকার থাকে, যা রাষ্ট্র আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়েও খর্ব করতে পারে না। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে সরকার সাংবিধানিকভাবেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, যেখানে এসব অধিকার বাতিল করা হয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেখা যায়, সরকার সবসময়ই একধরনের অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রাখে এবং মানুষের অধিকার খর্ব করে এবং প্রচার করা হয় যে, মানুষের ভালোর জন্যই এ কাজ করা হচ্ছে।

আগামবেনের আরও একটি বিখ্যাত ধারণা রয়েছে যা 'Naked Life' বা 'নগ্ন জীবন' হিসেবে পরিচিত। এই ধারণাটি তার 'হোমো সাকের' বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এর মানে হচ্ছে মানুষের জীবন এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে শুধু বেঁচে থাকাটাই আসল। এখানে আগামবেন বলতে চাচ্ছেন, করোনা মহামারির কারণে মানুষ গৃহবন্দী হয়েছিলো, তাতে মানুষের জীবন এমন অবস্থাতেই রূপান্তরিত হয়েছিলো। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বজুড়ে কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন এবং সরকারি মনিটরিং- এই পলিসিগুলো বিদ্যমান, এবং এসবের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কতদিন পর্যন্ত থাকবে, আমরা কেউই বলতে পারছি না। দীর্ঘ সময় ধরে এসব বিদ্যমান থাকায় জনগণের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এসেছে, যা মানুষকে সরকার কর্তৃক প্রণীত যে-কোনো আইন বা পলিসিকে গ্রহণ করতে সহজলভ্য করে তুলেছে। মহামারির নামে, জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার বাহানা দিয়ে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ও কৌশলগুলো আরও নিখুঁত হয়েছে এখন। সেজন্যই আতঙ্ক বা প্যানিক তৈরি করা হয়। প্রতিটি ব্যক্তিকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলার মধ্য দিয়ে এমন একটি অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সেটা আর ব্যক্তির পর্যায়ে না থেকে সামষ্টিক বা সামাজিক আতঙ্কে পরিণত হয়। নৈরাশ্যবাদীরা মনে করছে আধুনিক কালের শাসনের ধরনই হচ্ছে মানুষকে Naked Life এ বা নগ্ন জীবনে পর্যবসিত করা।

সারা বিশ্ব যখন মিল্টন ফ্রিডম্যানের মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও জন মেইনার্ড কেইন্সের সংশোধনবাদী বা হস্তক্ষেপবাদী অর্থনীতির যোজন দ্যোতনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এবং প্রযুক্তিগত সফলতার ধারাবাহিকতায়, এমনকি বিজ্ঞান যখন মহাকাশে বসবাসের কথাও ভাবছে, তখনই এই নভেল করোনাভাইরাস এসে প্রশ্ন তুলেছে নয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে, নব্য উদারবাদ নিয়ে, রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে, স্বাস্থ্যখাতের সফলতা নিয়ে, বাজার ব্যবস্থায় অ্যাডাম স্মিথের অদৃশ্য হাত নিয়ে এবং দেখিয়ে দিয়েছে, নিউক্লিয়ার অস্ত্র নয়, বরং জীবাণুই হবে আগামী বিশ্বের অদৃশ্য শত্রু। করোনাউত্তর সময়ে সারা বিশ্ব যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে, তা সমসাময়িক অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করেই নিচ্ছেন। আগামীর বিশ্বে এই অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় বিভিন্ন দেশের শাসকশ্রেণিকে নিয়মিত বিরতিতে নৈরাজ্য, শ্রমিক আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণও তখন রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা (Contemporary World Order): করোনাউত্তর বিশ্বব্যবস্থায় নতুন আরেকটি মাত্রা যুক্ত করে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী মস্কোর কিয়েভ আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। নীতিগত ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের আধিপত্য সমুন্নত রাখার যুদ্ধ। ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর এখন যদি এই যুদ্ধ থেকেও পিছু হটতে হয়, তাহলে সেটা হেজিমনিক প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। অপরদিকে রাশিয়া এই যুদ্ধকে দেখছে একটি 'বৃহত্তর রাশিয়া' গঠনের অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে। নিজেদের অতীত ঐতিহ্যের (Great Power Status) পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে, রাশিয়া যে রুশ সাম্রাজ্য বা ইউরেশিয়া সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা ভাবছে সেটা এই যুদ্ধ থেকে মুটামুটি স্পষ্ট। ইউক্রেনকে ভাবা হচ্ছে 'New Russia' হিসেবে। কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনগুলোর দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এসব আগ্রাসনের পেছনে রাশিয়ার ভৌগোলিক দুরভিসন্ধি রয়েছে। ২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণ, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, ২০২০ সালে বেলারুশে সামরিক আগ্রাসন, ২০২২ সালে কাজাখস্তান আক্রমণ এবং সর্বশেষ ইউক্রেনে আক্রমণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, পুতিনের মস্তিষ্ক খ্যাত আলেকসান্দর দুগিন নয়া রুশ সাম্রাজ্যের যে ধারণা দিয়েছিলেন, সেই পথেই হাটছে আজকের রাশিয়া। একদিকে স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী নয়া বিশ্বব্যবস্থার মতো ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য ধরে রাখার প্রশ্ন, অন্যদিকে রাশিয়ার ইউরেশিয়া সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ধরে রাখার সংগ্রাম হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে পূজিঁবাদী মতাদর্শ নিয়ে, নাইন ইলাভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ডিসকোর্স নিয়ে, আর আজকের কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই নিয়ে। তৃতীয়ত, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উপজাত হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন মিটাতে কিংবা Kitchen Table Issues নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বিগ্নতা, বৈশ্বিক বিনিয়োগে Speculation বা Bad Expectations এর নেতিবাচক প্রভাব, উত্তরের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর Recessionary Path এর মধ্য দিয়ে যাওয়া, বিশ্বজুড়ে Inflation Rate ও Unemployment Rate বৃদ্ধি পাওয়া, ইকোনমিক পাওয়ার হাউজগুলোতে Industrial Production হ্রাস পাওয়া, Consumer Spendings কমে যাওয়া ইত্যাদি নিদর্শন আমাদেরকে বৈশ্বিক মহামন্দার মতো বড় একটি সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামসময়িক বিশ্বে ঘটে যাওয়া এই পরিবর্তনগুলোকেই আমরা 'Cosmic Play' বা 'বড় ধরনের বৈশ্বিক পরিবর্তন' হিসেবে দেখছি।

চতুর্থত, আমেরিকার পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট রবার্ট কিয়োহেন "After Hegemony" নামে যে বয়ান উপস্থাপন করেন, বর্তমান বিশ্ব সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে কিনা সেটাও এখন আলোচনায়। কিয়োহেন এর মতে, বিশ্বব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন গড়ে তুলছে একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক জোট। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একুশ শতকের চীনকে মোকাবেলায় গড়ে উঠেছে IPAC বা Inter-Parliamentary Alliance on China, অকাস, I2U2, Build Back Better World, ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক, কোয়াড, PBP বা Partners in the Blue Pacific এর মতো সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় চীনের নেতৃত্বে ব্রিকস ও সাংহাই জোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এশিয়া এবং আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে হাজির হয়েছে, যেটাকে "New Regionalism" বলা হচ্ছে। এই সংস্থার মাধ্যমে মধ্য এশিয়া হতে যাচ্ছে রাশিয়ার বিকল্প বাজার এবং মধ্য এশীয় দেশ কাজাখস্তানের মাধ্যমে চীনের জন্য বিনা বাধায় স্থলপথে ইউরোেপ পর্যন্ত বাণিজ্য রুট সম্প্রসারণের পথ সুগম হয়েছে।

ব্রাজিলে রেজিম পরিবর্তন হয়ে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী লুলা ডি সিলবার ক্ষমতায় ফিরে আসা, সৌদি-ইরানের ব্রিকস জোটে অংশগ্রহণ, গ্লোবাল সাউথকে কেন্দ্র করে ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ ইত্যাদি পশ্চিমা আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে। আগামী দিনে বিশ্বব্যবস্থায় ডলারের বিপরীতে যদি কোন শক্তিশালী মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, সেটা হয়তো এই ব্রিকস জোটের হাত ধরেই হবে। একইভাবে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্র 'Chain Ganging' প্রক্রিয়ায় সংঘাতে জড়ালেও বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের একক সুপারপাওয়ার বা হেজিমনি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু রাশিয়া নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনিক প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে চীন। Bipolar World Order বা স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বব্যবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে নানা ধরনের জোট গঠন করলেও আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে জোট গঠনের প্রতিযোগিতা চলছে উভয়ের মধ্যে একটি সুক্ষ পার্থক্য রয়েছে। সেটি হচ্ছে কনটেম্পোরারি বিশ্বে গঠিত হওয়া এই জোটগুলোতে পরস্পরবিরোধী রাষ্ট্রগুলোও একই জোটের সদস্য হতে দেখা যায়নি। ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র, আবার যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী ব্রিকস জোটেরও সদস্য। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত হওয়া কোয়াডের সদস্য রাষ্ট্র, আবার একইসাথে রাশিয়া ও চীনের জোট সাংহাই কোঅপারেশন সংস্থারও সদস্য। তুরস্ক ন্যাটো জোটের অন্যতম সদস্য হওয়া সত্ত্বেও চীন ও রাশিয়ায় সঙ্গেও উঞ্চ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তিন দশকের মিত্র রাষ্ট্র, আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অগ্রাহ্য করে ওপেক প্লাসের নেতৃত্বে তেল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান তিন ধরনের ছিলো; হয় পুজিঁবাদী যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে, না হয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে পক্ষে, না হয় নিরপেক্ষ বা Non Alignment Movement এর পক্ষে। অর্থাৎ, তখন রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান স্পষ্ট থাকলেও সামসময়িক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান অনেকটা অস্পষ্ট। ফলশ্রুতিতে বলা হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা আরো তীব্র হবে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই Strategic Ambiguity বা কৌশলগত অস্পষ্টতা বিশ্বের সংকটগুলোকে সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘায়িত করণে অনেক বেশি ভূমিকা রাখবে।

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহ

📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাসমূহ


ভূমিকা : কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা রয়েছে, যা নিয়ে আমরা প্রায়ই দ্বিধান্বিত থাকি। যেমন আমরা অনেকে State এবং Country এর মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারি না। বুঝতে পারি না যে Power এবং Authority এর মধ্যে মূল তফাত কী। Government এবং Governance এর মধ্যে পার্থক্যের জায়গাটি আসলে কোথায়। আমরা অনেকে এটিও জানি না যে Regionalism এবং Regionalization এর মধ্যে অনেক মিল থাকা সত্ত্বেও কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আমরা বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনেক পরিভাষা ব্যবহার করলেও ব্যবহৃত এই পরিভাষাগুলো সাধারণত একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু এদেরও বিভিন্ন আঙ্গিক বা দৃষ্টিকোণ রয়েছে তা আমরা সামগ্রিকভাবে চিন্তা করি না। এই অধ্যায়ের শেষে পাঠক সমাজ ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পরিভাষা সম্পর্কে জানতে পারবেন। তাছাড়াও পরবর্তী অধ্যায়গুলো বুঝতে এই পরিভাষাগুলো জানা আবশ্যক।

Country and State

বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা ভূখণ্ড থাকে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক যে সীমানাটি রয়েছে সেটিকে বলা হয় দেশ। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের যে ভূখণ্ডটি রয়েছে এটিকে বলা হয় দেশ। কিন্তু যখন এই ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী মানুষগুলো রাজনৈতিকভাবে আইনকানুন প্রণয়ন করা হয়, যখন ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাসকারী এই মানুষগুলোকে আইনকানুন বা নিয়মনীতি ইত্যাদি মানতে বাধ্য করাতে কিছু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তখন সেটিকে রাষ্ট্র বলে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলতে মূলত বোঝায় পলিটিক্যাল পার্টি, সরকার, পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইত্যাদি। এক কথায়, দেশ হলো শুধু একটি ভূখণ্ড, আর সেই ভূখণ্ডটি যখন আইনকানুন, সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সমন্বয়ে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত হয় তখন তাকে রাষ্ট্র বলে।

রাষ্ট্রের উপাদান হিসেবে ভূখণ্ডের গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশ কতটা শক্তিশালী সেটি অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একটি দেশের ভূখণ্ড (Territory)। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, চীন, ইরান, সৌদি আরব, ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। মানচিত্রে নজর দিলে দেখা যায় যে, এই সবগুলো রাষ্ট্রই ভৌগোলিকভাবে বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী। পুরো মানচিত্র যেন এরাই দখল করে রেখেছে। প্রশ্ন হতে পারে Large territory থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিশাল ভূখণ্ড থাকা চারটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
১. বিশাল ভূখণ্ড থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণও বেশি থাকে।
২. বিশাল ভূখণ্ডের কারণে অনেক বেশি কলকারখানা তৈরি করা যায়। খাদ্যশস্য উৎপাদন কিংবা চাষাবাদের জন্যও বিস্তর ভূমি পাওয়া যায়।
৩. সাধারণত দেশের সীমানা অনেক বড় হলে জনসংখ্যাও বেশি থাকে। যত বড় ভূখণ্ড ততবেশি জনগণ, আর যত বেশি জনগণ ততবেশি সেনাবাহিনী গঠন করা যায়।
৪. একটি দেশ যখন বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী হয় তখন সে দেশটি মিলিটারিদের বিভিন্ন গোপন প্রশিক্ষণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প তৈরি করতে পারে এবং বিভিন্ন পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে।

এই বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করি। যেমন- সিঙ্গাপুর, কাতার, দুবাই, মোনাকো, হাঙ্গেরি, লিচেনস্টাইন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বে অনেক শক্তিশালী। কিন্তু এসব রাষ্ট্রের সীমানা বা ভূখণ্ড অনেক ছোট। জনসংখ্যাও অনেক কম। যে কারণে তারা আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও সামরিকভাবে অতটা শক্তিশালী হতে পারছে না। আর সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে না পারলে ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে আপনার প্রভাব কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

Power and Authority

এবার আসি Power ও Authority এর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে। অন্য আরেকটি মানুষকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা কাউকে আমার কথামতো চলতে বাধ্য করার যে সক্ষমতা সেটিকে Power (ক্ষমতা) বলা হয়। অন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার কিংবা কথা শুনতে বাধ্য করার মাধ্যমটি যখন বৈধ হয় এবং আইন অনুযায়ী হয় তখন সেটিকে কর্তৃত্ব (Authority) বলে। যেমন- একজন পুলিশের কথাই ধরুন। সে আপনাকে ট্রাফিক আইন মান্য করতে বাধ্য করায়, ট্রাফিক আইন না মানলে পুলিশ আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, আপনার থেকে জরিমানা নিতে পারে। এই যে পুলিশের আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারা কিংবা আপনার থেকে জরিমানা নেওয়ার যে সক্ষমতা সেটি আমাদের আইনে আছে। তাই পুলিশের এই Power টিকে বলা হয় Authority (কর্তৃত্ব)। এক কথায়, আইনকানুন ও সংবিধান অনুযায়ী বৈধ ক্ষমতাকেই বলা হয় Authority বা কর্তৃত্ব। তথা ক্ষমতা বৈধ ও অবৈধ দুটোই হতে পারে কিন্তু কর্তৃত্ব অবশ্যই বৈধ হতে হবে।

Political Power and Politics

আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নিয়মনীতি, আইনকানুন তৈরি করার মাধ্যমে দেশের সকল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালিত করার ক্ষমতাকে বলা হয় Political Power বা রাজনৈতিক ক্ষমতা। তাই আপনি যদি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান, কিংবা আপনার মতো করে রাষ্ট্রের আইনকানুন তৈরি করতে চান, তাহলে আপনার Political Power বা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন। অর্থাৎ আপনি যদি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা নিজের মতো করে সাজাতে চান, যদি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়মনীতি তৈরি করতে চান কিংবা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে চান, তাহলে আপনার প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা (Political Power)।

এখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই রাজনৈতিক ক্ষমতাটি অর্জন করার জন্য এবং আপনার মতাদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য আপনার প্রয়োজন সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল (Political Party) গঠন করা। রাজনৈতিক দল গঠন করার পর আপনাকে মিছিল-মিটিং, সভা-সেমিনার, ক্যাম্পেইন, প্রচারণা ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের আপনার পক্ষে নিয়ে আসতে হবে। তারপর নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে আপনাকে রাজনৈতিক ক্ষমতাটি অর্জন করতে হবে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আপনি যখন প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন তখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতাটি সংবিধান অনুযায়ী আপনার হয়ে গেল।

এই ক্ষমতা বলে এবং সংবিধান মেনে আপনি এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন পলিসি, আইন, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি তৈরি করতে পারবেন। এই যে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইচ্ছে পোষণ করা, রাজনৈতিক দল গঠন করা, সভা-সেমিনার-মিছিল-মিটিং করে জনসমর্থন আদায় করা, সবশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতাটি দখল করা, এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে (Process) বলা হয় Politics বা রাজনীতি। আরও সহজ করে বললে Politics হলো রাষ্ট্রের নিয়মনীতি প্রণয়ন করার এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision Making) করার সক্ষমতা অর্জন। এজন্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড ল্যাসওয়েলের মতে, “Politics is the process of who gets what, when and how."

Government and Governance

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যে কাজটি করতে হয় সেটি হচ্ছে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা, মন্ত্রীদের নিয়ে আলাপআলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, সংসদে বিল উত্থাপন করে রাষ্ট্রের আইনকানুন প্রণয়ন করা ইত্যাদি। এই যে সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করার মাধ্যমে এবং সংসদে পক্ষে বিপক্ষে ডিবেট করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পলিসি তৈরি করার পুরো ব্যবস্থাটিকে বলা হয় Government (সরকার)। একটি রাষ্ট্রের পলিসি সাধারণত দুই ধরনের হয়। ০১. Domestic Policy: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি ও সামাজিক নিয়মনীতি ইত্যাদি। ০২. Foreign Policy: অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারণ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার নীতি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জোটে অংশগ্রহণ করার নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়গুলো পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভুক্ত। আর সরকারের তৈরিকৃত এসব অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক পলিসি বা নিয়মনীতি সরকারি আমলা ও সরকারি প্রতিনিধিদের (Representatives) মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাকে বলা হয় Governance বা শাসন।

Sovereign State and Vassal State

একটি রাষ্ট্র যখন তার পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে পারে তখন সেই রাষ্ট্রটিকে বলা হয় Sovereign State (সার্বভৌম রাষ্ট্র)। অর্থাৎ যে রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে সরকারি কার্যনীতি নির্ধারণ করতে পারবে, সেটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলা হয়। পৃথিবীর সবগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রই Sovereign State বা সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে সেটি বাংলাদেশই ঠিক করবে, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চায়নার কথামতো বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাবে না। এই সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল কথা হচ্ছে, সকল বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজ দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা।

উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ যেন কোয়াডে অংশগ্রহণ না করে সেজন্য হুমকি দিয়েছিল চীনা রাষ্ট্রদূত। জবাবে বাংলাদেশ বলেছিল আমরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত কোয়াডে যোগ দেবে নাকি চায়নার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে যোগ দেবে সেটি একান্ত নির্ভর করে বাংলাদেশ-এর উপর। এতে চীন আমাদের হুমকি দিতে পারে না বরং বাংলাদেশ তার স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে অপর কোনো শক্তি প্রভাবিত করতে পারে না। যেমন: পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে ফ্রান্সের কথামতো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সিরিয়া তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে রাশিয়ার কথামতো, ওশেনিয়া মহাদেশের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নাউরু তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে অস্ট্রেলিয়ার কথামতো। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে রাশিয়ার নির্দেশে। তাই গিনি, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও নাউরুকে আমরা Sovereign State বলতে পারি না। অন্যের কথানুযায়ী যেসব রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেগুলোকে কেউ কেউ মুখাপেক্ষী রাষ্ট্র (Vassal State) বলে। কেউ আবার সংজ্ঞায়িত করেছেন অধীন রাষ্ট্র (Tributary State) হিসেবে।

বিশ্বকে বিভক্তকরণ (Three World Model)

বিশ্বকে বিভক্তকরণ প্রক্রিয়াকে অনেকে আবার 'three-world theory'ও বলে থাকেন। সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে বিশ্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

1. First World (প্রথম বিশ্ব): স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পূর্ব ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে প্রথম বিশ্বের দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সকল উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়। একটি রাষ্ট্র প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কয়েকটি ক্রাইটেরিয়া রয়েছে; এমন সকল রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্র রয়েছে (Democracy), যেখানে আইনের শাসন রয়েছে (Rule of Law), প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তা থাকার কারণে যেখানে রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক কম (Little Political Risk), যে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী (Capitalist Economy), যেসব রাষ্ট্রের মোট জাতীয় উৎপাদন অনেক বেশি (GDP Growth), যাদের শিক্ষার হার অনেক বেশি (Literacy Rate) ইত্যাদি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রগুলোকেই প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়। প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে Big State বা বৃহৎ রাষ্ট্রও বলা হয়। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বের দেশ হতে হলে রাষ্ট্রের সীমানা ছোট না বড় এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। যেমন- সিঙ্গাপুর, কাতার, আরব আমিরাত, লিচেনস্টাইন, অস্ট্রিয়া এসব রাষ্ট্র আয়তনের দিক থেকে ছোট হলেও অন্যান্য দিক থেকে অনেক উন্নত। তাই তারাও প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।

2. Second World (দ্বিতীয় বিশ্ব): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে দ্বিতীয় বিশ্বের দেশ বলা হতো। চীন, লাওস, কিউবা, ভিয়েতনাম ইত্যাদি ১৯টি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখন দ্বিতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্ব বলতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। তথা যে রাষ্ট্রগুলো অধিক পরিমাণে উন্নতও না, আবার একেবারে গরিবও না। উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোকে বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন- ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি।

3. Third World (তৃতীয় বিশ্ব): প্রথম বিশ্ব বলতে “developed”, দ্বিতীয় বিশ্ব বলয়ে "developing”, আর তৃতীয় বিশ্ব বলতে "underdeveloped” রাষ্ট্রগুলোকে বোঝায়। তথা যে সব রাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল, যেখানে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষা-দীক্ষায় যে রাষ্ট্রগুলো এখনো পিছিয়ে আছে, সেগুলো মূলত তৃতীয় বিশ্বের কাতারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে আবার Small State বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রও বলা হয়। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত এই তিনটি বিশ্ব ছাড়াও বর্তমানে চতুর্থ বিশ্ব নামে আরেকটি বিশ্ব রয়েছে।

Fourth World (চতুর্থ বিশ্ব): চতুর্থ বিশ্বের ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অন্তত হলেও কিছুটা উন্নত। যেমন- বাংলাদেশ একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অনেক দিক থেকেই মোটামুটি উন্নত এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। শিক্ষার হার একসময় কম থাকলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তা এখন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চতুর্থ বিশ্বের দেশ বলা হয় এমন সব দেশকে যাদের শিক্ষার হার ক্রমহ্রাসমান বা স্থির, যাদের রয়েছে একেবারে নিম্ন গড় আয়ু, সম্পূর্ণ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ নির্ভর অর্থনীতি। যেমন- সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদান। তাছাড়াও চতুর্থ বিশ্ব বলতে এমন কিছু জাতিগোষ্ঠীকে বোঝায় যারা আধুনিকতার একেবারে বাহিরে এবং বিশ্বের সাথে যাদের কোন যোগাযোগ নেই। যেমন- আমাজন বনে যে-সকল নৃগোষ্ঠী জাতি বসবাস করে, বিভিন্ন দেশে যেসব যাযাবর শ্রেণি রয়েছে তারাও চতুর্থ বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।

Types of Relationships (সম্পর্কের ধরন)

যখন দুটি সার্বভৌম দেশ একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে তখন সেটিকে বলা হয় Bilateral Relationship বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। সম্পর্ক স্থাপন বলতে এক দেশ অপর দেশের সাথে বাণিজ্য, তথ্য আদান প্রদান, একে অপরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ইত্যাদিকে বোঝায়। যেমন- বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এই দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। পরস্পর তিনটি রাষ্ট্র একসাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হলে সেটিকে বলা হয় Trilateral Relationship বা ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক। যেমন তুরস্ক-পাকিস্তান-ইরান এই তিন দেশের সম্পর্ক হলো ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ক। কিন্তু যখন তিনের অধিক রাষ্ট্র একসাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হয় তখন সেটিকে Multilateral Relations বা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বলে। যেমন মনে করুন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এই চারটি রাষ্ট্র মিলে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, তখন এই চারটি রাষ্ট্রের যৌথ সম্পর্ককে বলা হয় বহুপাক্ষিক সম্পর্ক।

Regionalism (আঞ্চলিকতাবাদ)

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হচ্ছে Regionalism বা আঞ্চলিকতাবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৫০ এর দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তার অংশ হিসেবে আঞ্চলিকতাবাদ ধারণাটি ব্যাপক সাড়া পায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠতে থাকে ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি রাষ্ট্রের একে অপরের বিভিন্ন সাহায্য প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজনে একই অঞ্চলে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলো যখন একতাবদ্ধ হয়ে একটি আঞ্চলিক সংস্থা বা সংগঠন গড়ে তোলে তখন সেটিকে বলা হয় Regionalism বা আঞ্চলিকতাবাদ। অর্থাৎ আঞ্চলিকতাবাদের মূল কথা হচ্ছে একটি অঞ্চলের অনেকগুলো রাষ্ট্র এক ও অভিন্ন একটি প্লাটফর্মে এসে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন এগ্রিমেন্ট বা চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাবাদ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

আঞ্চলিকতাবাদ কেন গুরুত্বপূর্ণ তার কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রথমত, বোঝার সুবিধার্থে মনে করুন, ফ্রান্সের কিছু হ্যাকার স্পেন সরকারের ওয়েবসাইটে সাইবার হামলা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। এখন এই হ্যাকাররা তো ফ্রান্সের, তাই স্পেনে বসে তাদের বিরুদ্ধে স্পেন সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ঠিক এজন্যই স্পেনের প্রয়োজন ফ্রান্স সরকারের সাহায্য। দ্বিতীয়ত, একই ভাবে মনে করুন, ভারতের কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী ভারত থেকে পালিয়ে গিয়ে মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে। এখন এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের প্রয়োজন মিয়ানমার সরকারের সাহায্য। অথবা মনে করুন, বাংলাদেশের কিছু অপরাধী বর্ডার দিয়ে গোপনে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তখন সেই অপরাধীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজন ভারতের সাহায্য। তৃতীয়ত, ধরুন নেপাল ও ভুটানে কোনো ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠী নেই। কিন্তু ভুটান বা নেপালের সীমান্তবর্তী ভারতের যে অঙ্গরাজ্যটি রয়েছে সেখানের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো প্রচুর তৎপর। ধরুন সেখানে কয়েকদিন পরপরই জঙ্গি হামলা হয় এবং সেখান থেকে নেপালেও সহজে হামলা চালানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই নেপাল ও ভুটানে কোনো ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠী না থাকা সত্ত্বেও এই দুটি দেশ তার নিরাপত্তা নিয়ে সংকটে পড়তে হয় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের জঙ্গি গোষ্ঠীদের কারণে। তাই নেপাল ও ভুটানের প্রয়োজন ভারত সরকারের সাহায্য। চতুর্থত, পাশাপাশি অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাণিজ্যিক সুবিধা। যেমন- বাংলাদেশকে তার প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য আমদানি করতে হলে সেটি খুবই কম সময়ে ও কম খরচের মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করতে পারে। ভারতের পণ্য বর্ডার দিয়ে ঢাকা আসতে সর্বোচ্চ চার পাঁচ ঘণ্টা লাগে এবং Transaction Cost বা পরিবহন খরচও কম হয়। কিন্তু ভারতের পরিবর্তে ইউরোপ থেকে পণ্য আমদানি করতে বাংলাদেশের সময়ও লাগে অনেক এবং পরিবহন খরচও অনেক বেশি। একই ভাবে কম খরচে এবং অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য আমদানি রপ্তানি করতে ভারতের প্রয়োজন পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে। পঞ্চমত, আরেকটি বিষয় হচ্ছে মহামারি। দুই দেশের সীমান্তে কাঁটাতার কিংবা দেয়াল তৈরি করে মানুষের যাতায়াত বন্ধ করা যায়। কিন্তু মহামারি কিংবা ভাইরাসের প্রকোপ রোধ করা যায় না। পশুপাখি কিংবা প্রাণীদের মাধ্যমে এক দেশের ভাইরাস তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এসব ভাইরাস মোকাবিলায় একে অপরের সাহায্য প্রয়োজন। পাবলিক হেলথ (Public Health) কোনোভাবেই একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রের ব্যাপার না, এটি পুরো অঞ্চলের এমনকি পুরো বিশ্বের ব্যাপার। ষষ্ঠত, আমার প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আমরা কেউই নিরাপদে থাকব না। মনে করুন ভারত-পাকিস্তান হঠাৎ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। তখন পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান কেউই নিরাপদে থাকবে না। তাই দুটি দেশকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসতে হয়। সাইবার সিকিউরিটি, জঙ্গিবাদ দমন, কম খরচের বাণিজ্য, সংকটে খাদ্য সামগ্রীর সহযোগিতা ইত্যাদির প্রয়োজনেই দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশ মিলে গড়ে তুলেছে আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক (SAARC)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মিলে গড়ে তুলেছে তাদের আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ান (ASEAN)। ইউরোপীয় দেশগুলো গড়ে তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)। আফ্রিকার দেশগুলো তাদের আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন ইত্যাদি।

উপ আঞ্চলিকতাবাদ (Sub Regionalism)

এটির মানে হচ্ছে সংস্থার ভিতরে সংস্থা। একটি আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে অনেকগুলো সদস্য রাষ্ট্র থাকে। আঞ্চলিকতাবাদের নিয়ম হচ্ছে, যখনই কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তি করবে তখন সদস্যভুক্ত সবগুলো রাষ্ট্র একসাথে মিলে সেটি করবে। কিন্তু একটি সংস্থার সবাইকে অন্তর্ভুক্ত না করে যখন সেই সংস্থার তিন বা চারটি রাষ্ট্র মিলে আলাদাভাবে কোনো চুক্তি সম্পন্ন বা সম্পর্ক তৈরি করে তখন সেটিকে বলা হয় Sub Regionalism বা উপ আঞ্চলিকতাবাদ। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সার্ক হচ্ছে আঞ্চলিকতাবাদের একটি উদাহরণ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো রাষ্ট্র নিয়েই সার্ক গঠিত। এখন এই সার্কের মোট ০৮টি সদস্যের মধ্য থেকে যখন তিন বা চারটি সদস্য রাষ্ট্র মিলে আলাদা একটি কোরাম গঠন করবে তখন সেটিকে বলা হয় Sub Regionalism বা উপ আঞ্চলিকতাবাদ। 'BBIN' হলো উপ আঞ্চলিকতাবাদের একটি অন্যতম উদাহরণ। যার পূর্ণরূপ হচ্ছে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল সংযুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সার্কভুক্ত চারটি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সড়ক বা রাস্তা গড়ে তোলা। তথা সার্কের সদস্য রাষ্ট্র মোট আটটি হলেও এই BBIN প্রকল্পে মাত্র চারটি রাষ্ট্র রয়েছে। তাই এটি যেন একটি বড় সংস্থার মধ্যে আরেকটি ছোট সংস্থা।

Trans Regionalism

যখন দুইটি ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে কোনো এগ্রিমেন্ট বা চুক্তি বা সম্পর্ক স্থাপিত হয় তখন সেটিকে 'Trans Regionalism' বলা হয়। যেমন- সার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যদি সম্পর্ক গড়ে ওঠে বা এই দুটি আঞ্চলিক সংস্থার মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তখন সেটিকে Trans Regionalism বলা হবে। কারণ সার্ক হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংস্থা, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হচ্ছে ইউরোপের আঞ্চলিক সংস্থা। তথা দুটি ভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মধ্য যে চুক্তি বা সম্পর্ক সেটিই ট্রান্স রিজিওনালিজম।

Regionalization (আঞ্চলিকীকরণ)

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে যখন অর্থনৈতিক লেনদেন, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য (cross-border flow of capital), জন যাতায়াত (People Mobility), যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় (Cultural Exchange) ইত্যাদি ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায় তখন সেটিকে বলে Regionalization বা আঞ্চলিকীকরণ। উদাহরণস্বরূপ: যদি আমরা ইউরোপীয় অঞ্চলের কথা বিবেচনা করি তখন দেখা যায় যে, সেই অঞ্চলের অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া ইত্যাদি সকল রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে মানুষ যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে। এই যে একই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে জন যাতায়াত বা People Mobility বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটাই আঞ্চলিকীকরণ। আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিউজিক, নাচ, মুভি, পপ কালচার ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তথা আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো আত্মস্থ করছে। এটিও আঞ্চলিকীকরণ (Regionalization) এর উদাহরণ। উল্লেখ্য, আঞ্চলিকীকরণ (Regionalization) এবং আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism) এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যও রয়েছে।

পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো কোনো কমন প্লাটফর্মে এসে তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কোনো অফিশিয়াল চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন সেটিকে বলা হয় আঞ্চলিকতাবাদ (Regionalism)। তথা আঞ্চলিকীকরণে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অফিশিয়াল সম্পর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা না-ও থাকতে পারে। কিন্তু আঞ্চলিকতাবাদ হতে হলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অফিশিয়াল সম্পর্ক থাকাটি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- সার্ক এর গঠনতন্ত্র রয়েছে। সবগুলো রাষ্ট্র এই গঠনতন্ত্র মানতে বাধ্য।

ফাংশনালিজম তত্ত্ব (Functionalism Theory)

একটি জিনিস কার্যকর হতে হলে অন্য একটি জিনিসের উপর নির্ভর করতে হয়। এমনিভাবে একাধিক উপাদান যখন একে অপরের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে কার্যকর হয়ে ওঠে তখন সেটিকে বলে ফাংশনালিজম। আমাদের সমাজে বিভিন্ন সামাজিক উপাদান বিদ্যমান। যেমন- পরিবার (Family), সামাজিক প্রতিষ্ঠান (Social Institutions), আইন (Laws), প্রথা (Norms), মূল্যবোধ (Values) ইত্যাদি। এই উপাদানগুলোর সমন্বয়ে একটি সমাজ পরিচালিত হয় বা ফাংশন করে। আর এটাই ফাংশনালিজমের মূল কথা। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম এর মতে, একটি সমাজের মূল ভিত্তি পরিবার। আর এই পরিবার গঠনে পুরুষ ও নারী একে অপরের উপর নির্ভরশীল। শুধু একজন পুরুষ বা শুধু একজন নারীর মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয় না অথবা পরিবারটি ফাংশন করে না।

একই ভাবে আমরা যদি কোনো কারখানার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই শ্রমিক এবং মালিক একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একজন কারখানার মালিকের যতই অবকাঠামোগত সামর্থ্য থাকুক না কেন শ্রমিক ছাড়া তার কারখানাটি সে চালাতে পারে না। অর্থাৎ শ্রমিক ছাড়া তার কারখানাটি ফাংশন করে না। তেমনিভাবে শ্রমিকরাও নির্ভরশীল কারখানার মালিকের উপর। কারণ কারখানায় কাজ করার মাধ্যমেই তারা তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থাটি করতে পারে। এই যে একটি পরিবার ফাংশন করার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং একটি কারখানা ফাংশন করার ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা সেটিকেই এমিল ডুর্খেইম আখ্যায়িত করেছেন Organic Solidarity হিসেবে। এই Organic Solidarity ই হচ্ছে ফাংশনালিজম তত্ত্বের সারকথা।

ঠিক একই ভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ফাংশনালিজম তত্ত্বের প্রয়োগ দেখতে পাই। একটি অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ একে অপরের উপর নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ফাংশন বা পরিচালিত হতে পারে না। এখন আমরা অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতায় ফাংশনালিজম তত্ত্বের ব্যবহার দেখব।

প্রথমত, একটি রাষ্ট্র কখনোই অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। রাষ্ট্রটি তার জনগণের প্রয়োজনীয় যেসব পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করতে অক্ষম এবং যেসব পণ্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে, সেসব পণ্যের জন্য তাকে তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবার যে সকল পণ্যদ্রব্য নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত (Surplus) হিসেবে থাকে বা অতিরিক্ত থাকে সেগুলোকেও অন্য দেশে রপ্তানি করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ভারতের সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলোতে কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠী তৎপর। তাই সেভেন সিস্টার্সভুক্ত রাজ্যগুলো যেহেতু বাংলাদেশের পাশে, তাই সেখানকার জঙ্গি তৎপরতা রোধে ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশ-এর সাহায্য। তৃতীয়ত, মনে করুন সাইক্লোন বা বন্যার কবলে মালদ্বীপ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই মালদ্বীপে এখন প্রচুর খাদ্য সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মালদ্বীপের সাহায্য প্রয়োজন তার পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো থেকে। মালদ্বীপ থেকে ইউরোপ-আমেরিকার দূরত্ব অনেক। তাই ইউরোপ থেকে মালদ্বীপে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে অনেক সময়ের প্রয়োজন এবং ততক্ষণে খাদ্যের অভাবে অনেক মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু ভারত কিংবা বাংলাদেশ যেহেতু মালদ্বীপের একেবারে পাশেই অবস্থিত তাই খুবই দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে ত্রাণসামগ্রী মালদ্বীপে পাঠানো সম্ভব। তাই মালদ্বীপের প্রয়োজন ভারত ও বাংলাদেশকে। এভাবে একটি রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাহায্য ব্যতীত ফাংশন করে না।

উত্তর আধুনিকতাবাদ (Postmodernism)

পোস্টমডার্নিজম শব্দটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছ। অনেকে এটিকে বলে নয়া আধুনিকতাবাদ, আবার অনেকে বলে আধুনিকতার পরের আধুনিকতা। তবে পোস্টমডার্নিজম এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে উত্তর আধুনিকতাবাদ শব্দটি বেশি প্রচলিত। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে উত্তর আধুনিকতাবাদ মূলত একটি দার্শনিক চিন্তা, যা আধুনিকতাকে সামষ্টিকভাবে সমালোচনা করে। জাঁক লাকা, মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা এসব দার্শনিকরা আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমালোচক এবং উত্তর আধুনিকতাবাদের প্রবক্তা। এখন এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদেরকে সংক্ষেপে তিনটি পরিভাষা জানতে হবে; Traditional Society, Modern Society এবং Postmodern Society।

1. Traditional Society (অতীত সমাজব্যবস্থা): প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বৈশ্বিক সমাজব্যবস্থা ছিল কৃষিনির্ভর। মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল ছিল (agrarian society)। তাদের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল শুধু তাই উৎপাদন করত (subsistence economy)। মানুষ গ্রামীণ সমাজে সম্প্রদায়ভিত্তিক বসবাস করত (community based)। রাজা, সম্রাট বা ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা মানুষ শাসিত হতো (imperial state)। কোনো পদবি বা স্বীকৃতি অর্জনের বিষয় ছিল না। ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মর্যাদা বা সম্মান (ascriptive oriented)। মানুষ অনেক বেশি ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন করত (religion based)। মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক ছোঁয়া বলতে কিছুই ছিল না (unscientific)। মানুষ ছিল অনেক বেশি কুসংস্কারচ্ছন্ন (primordial sentiments)।

2. Modern Society (আধুনিক সমাজব্যবস্থা): ১৬ শতকে যখন ইউরোপীয় রেনেসাঁস শুরু হয় তখন আধুনিকতার ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে (enlightenment period) ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই আধুনিকতা ত্বরান্বিত হতে থাকে। তখন সমাজব্যবস্থাটি ট্র্যাডিশনাল সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিকতার দিকে রূপান্তরিত (transformation) হতে থাকে। তথা কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে মানুষ শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হয়। কলকারখানাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে (industry based)। নিজের প্রয়োজন বা বেঁচে থাকার জন্যই মানুষ পণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য পণ্য উৎপাদন করতে থাকে (market based economy)। মানুষ সমাজ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে থাকে (individualism)। সাম্রাজ্য বা রাজা-বাদশা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রগুলো রূপান্তরিত হয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় (nation state)। এই আধুনিকতার যুগে মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পদবি বা শ্রেষ্ঠত্ব থেকে নিজের অর্জন এবং স্বীকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেয় (achievement oriented)। মানুষ ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন বর্জন করে ধর্ম নিরপেক্ষতার দিকে ঝুঁকতে থাকে (secularization)। মানুষের চিন্তাভাবনায় বৈজ্ঞানিক ছোঁয়া আসে এবং মানুষ তখন যুক্তিনির্ভর হতে থাকে (rationality)। মানুষ কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক হতে থাকে (scientific)। অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হতে থাকে, যা ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে (technobased)। এক কথায় আধুনিকতাবাদ বলছে, উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, যুক্তিবাদী ও মানব কেন্দ্রিক চিন্তা। মানুষের মানবিক জীবন ব্যবস্থার যুক্তিশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযাত্রার মধ্যে দিয়েই শুধু আধুনিক চিন্তার বিকাশ ঘটে।

3. Postmodern Society (উত্তর আধুনিক সমাজ): উপরে দেখালাম যে, কীভাবে ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি থেকে আমরা রূপান্তরিত হয়ে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় পৌঁছেছি। ইউরোপে ষোল শতক থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই সময়টি আধুনিককালের ব্যাপ্তি। অর্থাৎ এই সময়টিতে মানুষ প্রবৃদ্ধি ভিত্তিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর থেকেই অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সে উত্তর আধুনিকতাবাদ ধারণাটি পরিচিত হতে থাকে। এই উত্তর আধুনিকতাবাদের কাজ হচ্ছে, আধুনিকতার যে বৈশিষ্ট্যগুলো উপরে আমরা উল্লেখ করেছিলাম সেগুলো সমালোচনা করা। অর্থাৎ আধুনিকতাবাদের উপজাত (by-product) হিসেবে মানব জীবনে যে সংকটগুলো দেখা দিয়েছে সেগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আধুনিকতার অসারতা প্রমাণ করা। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকরা বলছেন যে, আধুনিকতা আমাকে শিল্পায়নের ছোঁয়া দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিবেশ দূষণকে রোধ করতে পারেনি। আধুনিকতা আমাদের জিডিপি বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, কিন্তু আয়বৈষম্য কমাতে পারেনি। আধুনিকতা আমাকে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাকে সুখ দিতে পারেনি। ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি করছে মানব জীবনে হতাশা এবং বাধাগ্রস্ত করছে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। আধুনিকতা কলকারখানায় শ্রমিকদের জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ন্যায্য মজুরিটি নিশ্চিত করতে পারেনি। উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকরা আরও বলছেন যে, আধুনিকতা আমাদের স্বাধীনতার বয়ান দিলেও আমরা আজও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। আমরা আজ একেকজন প্রযুক্তিগত দাস (technological slave)।

আধুনিকতা প্রচার করে মানব চিন্তার শক্তি, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং যুক্তির সর্বজনীনতা ও প্রগতির জয়জয়কার। অন্যদিকে উত্তর আধুনিকতাবাদ বলে উন্নয়ন মানেই সুখ নয়, আধুনিকতা মানেই সীমাহীন প্রগতি নয়, যুক্তিও সবক্ষেত্রে সর্বজনীন নয়।

📘 দ্যা এনাটমি অব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স > 📄 পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি

📄 পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি


ভূমিকা: বিশ্ব দরবারে একটি রাষ্ট্রের অবস্থান কেমন হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ঐ রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে কতটা দক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী। আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার মতো পরাশক্তিরা কেন আজ বিশ্বের বুকে নিজেদের শক্তিমত্তা দাপটের সাথে প্রদর্শন করছে? এর কারণ খুঁজলে আমরা দেখতে পাব তাদের পররাষ্ট্রনীতি কতটা দক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী। আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক বোমার আঘাতে ঝলসে যাওয়া একটি রাষ্ট্র জাপান কীভাবে তার দক্ষ কূটনীতিকে কাজে লাগিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, সমসাময়িক বিশ্বে কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না। এই সাহায্য আদায়ের লক্ষ্যে রাষ্ট্র নানা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। আর এই কৌশলের বহিঃপ্রকাশ ঘটে কূটনীতির মাধ্যমে। তাই কূটনৈতিক রণকৌশল বা Diplomatic Manoeuvres সাজাতে রাষ্ট্রকে কতগুলো ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিতে হয়। এই অধ্যায়ে আমরা পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। সর্বশেষ সমসাময়িক কূটনৈতিক অঙ্গনে বহুল ব্যবহৃত কিছু কূটনৈতিক পরিভাষা নিয়ে থাকবে আলোচনা।

পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান

একটি দেশের সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক পলিসি হচ্ছে পররাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত হওয়ায় এগুলো টপ সিক্রেট। তাই একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কী সেগুলো আমরা জানি না। তবে রাষ্ট্রের আচরণ থেকে সেই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ধরনটি (Nature) আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিছু অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত বিষয় মাথায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হয়। যেগুলোকে আমরা Determinants of Foreign Policy বলে থাকি।

পররাষ্ট্রনীতির অভ্যন্তরীণ উপাদান:

1. Geographical Location (ভৌগোলিক অবস্থান): মানচিত্রে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অন্যতম নিয়ামক। বঙ্গোপসাগরের একটি কাছাকাছি রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার চারদিকে সমুদ্র থাকায় দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নৌবাহিনীর উপর গুরুত্বারোপ করতে হয়। ভূ-বেষ্টিত আফগানিস্তান সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্য ইরান ও পাকিস্তানের বন্দর ব্যবহার করতে হয়। তাই আফগান সরকারকে ইরান ও পাকিস্তানের কথা বিবেচনায় নিয়ে তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়।

2. Size of the state (রাষ্ট্রের আকার): আয়তনের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র কত বড়, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সেটি গুরুত্ব পায়। চীন আয়তনে এত বিশাল যে তার সাথে মোট ১৪টি রাষ্ট্রের সীমানা রয়েছে। তাই এই ১৪টি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কথা বিবেচনায় নিয়ে চীনকে তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হয়। ভৌগোলিক ভিন্নতার কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক স্ট্র্যাটেজিও ভিন্ন হয়। ভৌগোলিকভাবে রাশিয়ার রয়েছে বিশাল সীমানা কিন্তু ভুটান, টুভ্যালু, নাউরু, এস্তোনিয়া, বেনিন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আয়তনে অনেক ছোট। তাই রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সাথে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি মিলবে না।

3. Population (রাষ্ট্রের জনগণ): পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে একটি রাষ্ট্রের জনগণের চাহিদা ও জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী সৌদি আরব, ইরান, কাতার, কুয়েত-সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে; যেখান থেকে বাংলাদেশ প্রচুর রেমিট্যান্স পাচ্ছে। তাই যে সকল দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে সেসব দেশকে গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে। একই ভাবে ভারত প্রযুক্তিগত দিক থেকে তুলনামূলক অনেক উন্নত। টুইটার, গুগল, আইবিএম, মাইক্রোসফট-সহ বহু প্রতিষ্ঠানের সিইও এখন ভারতীয়। এছাড়াও বহু বায়োট্যাক, ফার্মা প্রতিষ্ঠানের সিইও আছে ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক ইন্ডাস্ট্রি এবং ডাক্তারি পেশায় রয়েছে ভারতীয়দের দাপট। কানাডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকরা এমপি-মন্ত্রী হচ্ছে। তাই বর্তমানে প্রতিবেশী দুর্বল ও ছোট রাষ্ট্র মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ইত্যাদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী কানাডা, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মরিয়া ভারত। অর্থাৎ রাষ্ট্রের জনগণ শিক্ষিত ও প্রভাবশালী হলে সেদেশে পররাষ্ট্রনীতিও শক্তিশালী হয়।

4. Economic Resources (অর্থনৈতিক সক্ষমতা): অর্থনৈতিক শক্তি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের আরেকটি অন্যতম উপাদান। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তার পররাষ্ট্রনীতিতে 'Economic Sanctions' শব্দটি রয়েছে। শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে বশে আনা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কৌশল। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইকোনমিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারছে না। তাই আমাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা মাথায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়। অন্যদিকে জাপান শক্তিশালী হওয়ায় তার Economic Aid Power ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারছে।

5. Military Might (সামরিক শক্তিমত্তা): আমি সামরিকভাবে কতটা শক্তিশালী সেটি প্রভাব পড়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে। আজকে কম্বোডিয়া কিংবা ফিলিপাইনকে আমরা অতটা গুরুত্ব দেই না কিন্তু রাশিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলেও রাশিয়া সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী। একটি রাষ্ট্রের জাতীয় শক্তি কতটুকু সেটি ফুটে ওঠে সামরিক শক্তির মাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য মিলিটারি ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইরান, সৌদি, তুরস্ক দিন দিন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে তাদের সামরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।

পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বহিঃউপাদান

1. History (অতীত ইতিহাস): রাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে প্রধান নিয়ামক। গঠনবাদ বা Constructivism আলোচনার সময় আমরা সেটি দেখেছিলাম। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে মুক্তিযুদ্ধকালীন ইতিহাস আমলে নিতে হয়। রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েতের সহযোগিতা একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ অন্য রাষ্ট্রের সাথে আমার অতীত ইতিহাস কেমন অথবা তার সাথে অতীতে আমার বোঝাপড়া কেমন ছিল সেটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ। আজকে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে দ্বন্দ্ব, ভারতের সাথে পাকিস্তানের যে দ্বন্দ্ব এগুলো ঐতিহাসিক। তাই ভবিষ্যতেও ভারত-পাকিস্তান কিংবা রুশ-মার্কিন দ্বন্দ্ব চলমান থাকা স্বাভাবিক। অতীত ইতিহাস পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ডিরেকশন বা পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। অতীতে যে রাষ্ট্রগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল সেসব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাচ্ছে। রাশিয়াও তার পূর্বের সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের অন্যতম বহিঃউপাদান হচ্ছে ইতিহাস।

2. Ideology (রাষ্ট্রের মতাদর্শ): আজকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এই রাষ্ট্রগুলো কেন একে অপরের বন্ধু? কারণ তাদের মধ্যে মতাদর্শগত মিল রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের ভাষাও এক। অন্যদিকে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, বলিভিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এই রাষ্ট্রগুলো কেন একই বলয়ে? কারণ তাদের মধ্যেও একটি ঐতিহাসিক মতাদর্শের মিল রয়েছে। সেটি হলো সমাজতন্ত্র। গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব ও ক্যাপিটালিস্ট পিস থিওরিতে আমরা এটি বিস্তারিত দেখেছিলাম। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ধর্মও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনিদের উপর বাংলাদেশের সমর্থন ধর্মগত ও নীতিগত।

3. Global Institutions (আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান): একটি রাষ্ট্রকে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করার সময় আন্তর্জাতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থাকে আমলে নিতে হয়। জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের সনদ মেনে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে হয়। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোকে ন্যাটোর চার্টার ফলো করতে হয়। মিশর আরব লীগের নীতিমালা ভঙ্গ করে ইসরায়েলের সাথে চুক্তিতে লিপ্ত হওয়ায় আরব লীগ থেকে তার সদস্য পদ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়েকে নীতি ভঙ্গ করায় কমনওয়েলথ থেকে তাদের সদস্যপদ স্থগিত করে দেওয়া হয়। তাই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হয়।

4. International Law (আন্তর্জাতিক আইন): আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা প্রতিটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে আন্তর্জাতিক ট্রিটি, চুক্তি, সনদ, আইন, কনভেনশন ইত্যাদি বিষয়গুলো।

5. Neighbourhood effect (প্রতিবেশি রাষ্ট্রের প্রভাব): আমার প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে কে বা কারা রয়েছে? পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর শক্তিমত্তা কেমন? প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো আমার সাথে কেমন ব্যবহার করছে? ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে দেয়। বাংলাদেশের প্রতিবেশি একটি রাষ্ট্র আঞ্চলিক হেজিমন (ভারত), আরেকটি রাষ্ট্র বিশ্বের পরাশক্তি (চীন)। তাই এই দুটি রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হচ্ছে।

পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়া (Decision Making Process)

একটি রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে থাকে। এই পররাষ্ট্রনীতির স্বরূপ কেমন হবে তা নির্ধারণে রাষ্ট্রকে কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এবার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

1. Rational Actor Model: পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত হবে যৌক্তিক। রাষ্ট্র এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যেটা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিসঙ্গত নয়। পররাষ্ট্রনীতিতে একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রকে চারটি বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়।
ক. লক্ষ্য নির্ধারণ (Agenda Setting): রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সর্বপ্রথম কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। পররাষ্ট্রনীতিতে রাষ্ট্রের লক্ষ্য এমন হওয়া উচিত নয়, যে লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নেই। জাতীয় শক্তির দিক থেকে চীন বাংলাদেশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। তাই সে চাইলেই তার লক্ষ্য নির্ধারণে যে-কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু চীনের মতো বাংলাদেশের সক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশ চাইলেও চীনের মতো শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে না। তাই বাংলাদেশের উচিত এমন এজেন্ডা সেট করা যা বাংলাদেশ তার অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অর্জনে সক্ষম।
খ. বিকল্প নীতি (Alternative Policy): রাষ্ট্রকে এটি নিয়ে আগে থেকেই চিন্তা করতে হয় যে, তার গৃহীত পররাষ্ট্রনীতিটি ফাংশন না করলে তার বিকল্প কী হবে। অথবা রাষ্ট্রের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই বিরূপ প্রভাব ফেলে তখন সেটিকে কীভাবে মোকাবিলা করবে তা আগে থেকেই বিবেচনায় রাখা। যেমন- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জিএসপি সুবিধা পুনরুদ্ধার করার জন্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জিএসপি সুবিধা যদি বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার বিকল্প কী হবে সেটি পূর্ব থেকেই চিন্তা করে রাখা।
গ. লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis): পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করা অনেক জরুরি। রাষ্ট্র যে পররাষ্ট্রনীতিটি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তার সম্ভাব্য লাভ এবং ক্ষতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।
ঘ. রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল (Maximization of State Interests): একটি রাষ্ট্র হিসেবে তার নীতিগত জায়গা থেকে ওই সিদ্ধান্তটিই গ্রহণ করতে হয় যার মাধ্যমে তার সর্বোচ্চ স্বার্থ হাসিল হওয়া সম্ভব।

2. SWOT Model: সাধারণত এই বিখ্যাত মডেলটি বিজনেস পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বহুল প্রচলিত। এর পূর্ণরূপ হচ্ছে, S= Strengths, W= Weaknesses, O= Opportunities, T= Threats। রাষ্ট্র যদি দেখে তার কোন একটি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে তার শক্তিমত্তা এবং সুযোগ সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে তার দুর্বলতা এবং হুমকিগুলো তুলনামূলক কম তাহলে রাষ্ট্র সেই পররাষ্ট্রনীতিটি গ্রহণ করবে।

3. Governmental Bargaining Model: রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিংবা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে যে বিষয়টি সবচেয়ে বিবেচনায় নেবে তা হচ্ছে তার দরকষাকষির মতো সক্ষমতা। যেমন- বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের কারণে। একই ভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রকল্পের একটি অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। দুটি পরাশক্তির কাছেই যখন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানই হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি (Bargaining Power)। এই গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে তার সর্বোচ্চ স্বার্থ উদ্ধার করতে পারবে তা বিবেচনায় নিতে হবে।

4. PEST Analysis: ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিনে এ মডেলটি ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এটিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর পূর্ণরূপ হচ্ছে, P= Political, E= Economic, S= Social, T= Technological। তথা রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে তার রাষ্ট্রের এই চারটি সেক্টরে কী কী উন্নয়ন হবে তা বিবেচনায় রাখবে।

পররাষ্ট্রনীতির ধরন: Wolf warrior diplomacy

সমসাময়িক কূটনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি ডিপ্লোমেসি হলো চীনের Wolf warrior diplomacy। চীনের বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে এই আগ্রাসী ডিপ্লোমেসি সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে। উ জিং হচ্ছেন একজন বিখ্যাত চীনা চলচ্চিত্র নির্মাতা। 'উলফ ওয়ারিয়র' (Wolf Warrior) নামে তার নির্মিত একটি চলচ্চিত্র ২০১৫ সালে মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মুভিটা চায়নাতে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খুব বেশি জনপ্রিয়তা পাওয়ার ফলে নির্মাতা উ জিং সিদ্ধান্ত নেন 'উলফ ওয়ারিয়র-২' (Wolf Warrior-2) নামে প্রথম মুভির সিকুয়েন্স হিসেবে আরেকটি মুভি নির্মাণ করতে। ফলস্বরূপ মাত্র দুই বছর পর ২০১৭ সালে মুক্তি পায় তার 'ওলফ ওয়ারিয়র-২' নামের চলচ্চিত্রটি।

উ জিং এর নির্মিত এই দুইটি মুভির বিষয়বস্তু ছিল Chinese Nationalism বা চীনা জাতীয়তাবাদ। Wolf বা নেকড়ে হলো খুবই চতুর এবং সাহসী একটি প্রাণী। এই নেকড়ে প্রাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা একে অপরের উপর খুবই বিশ্বস্ত, অন্য কোনো প্রাণী এদের উপর আক্রমণ করলে এরা কালবিলম্ব না করে সাথে সাথেই প্রতিহত করে। নেকড়েদের কানগুলো সবসময়ই খাড়া (upright ears), এদের দাঁত খুবই তীক্ষ্ণ ও ধারালো (sharp teeth), নাক ও মুখ খুবই তীব্র ও জোড়ালো (pointed muzzles), আর চোখগুলো হলো অনুসন্ধানী (inquiring eyes)। চলচ্চিত্র নির্মাতা উ জিং তার ওলফ ওয়ারিয়র দুইটি মুভিতে চায়নিজ সেনাবাহিনীদেরকে এই নেকড়ের সাথে তুলনা করেছেন। চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে কীভাবে চায়নার সেনাবাহিনীরা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকা শত্রুদের পতন ঘটিয়ে দেশকে রক্ষা করে।

এই দুটি চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চায়না তাদের বর্তমান ডিপ্লোমেসির নাম দিয়েছে “ওলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি”। এই Wolf warrior diplomacy'টি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে একটি buzzword বা অধিক ব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে চীনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমগুলো একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, চীনের বর্তমান যে-সকল কূটনীতিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে দায়িত্বরত আছেন কিংবা বর্তমান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির যারা মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর, বেশি আক্রমণাত্মক, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও অনেক বেশি সক্রিয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন করোনা ভাইরাসকে 'চীনা ভাইরাস' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, বাইডেন যখন চীনকে 'The Sick Man of Asia' হিসেবে উল্লেখ করেন, ব্রিটেন যখন চীনকে "মানবজাতির সিকিউরিটির জন্য থ্রেট' হিসেবে উল্লেখ করে তখন কিন্তু চীন চুপ করে বসে থাকেনি বরং সাথে সাথে চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর এসবের পাল্টা ও আক্রমণাত্মক জবাব দিয়েছে।

দুইটি উদাহরণ দিলে বুঝতে আরও সহজ হবে। "করোনা ভাইরাস হলো চীনা ভাইরাস" ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে চীন জবাব দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই ভাইরাস তৈরি করে চীনের উহানে এসে ছেড়ে দিয়েছে যেন চীনকে বিশ্বের সামনে ছোটো করানো যায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন বলছে, চীন উইঘুর মুসলিমদের উপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। চীনও প্রত্যুত্তরে জবাব দিচ্ছে এটা বলে যে, চীন নয় বরং আমেরিকা-ই ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া-সহ সারা বিশ্বে মুসলমানদের উপর ধ্বংসলীলা চালিয়েছে এবং বর্তমানেও চালাচ্ছে। এরকম আক্রমণাত্মক প্রত্যুত্তরের অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। ২০২১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির শতবছর উদযাপনে শি জিনপিং তার ভাষণে এমনও বলেছেন যে, চীনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করবে তার দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে। চীনের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের যে-কোনো তীর্যক মন্তব্যের বিপরীতে চীনও এখন পাল্টা আক্রমণ হিসেবে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছে, কোনোরকম ছাড় দিচ্ছে না কাউকে। ঠিক যেরকমভাবে একটি নেকড়ে তার শত্রুকে কখনো ছাড় দেয় না। চীনের এই পাল্টা জবান দেয়ার কূটনীতিকেই 'উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি' বলা হচ্ছে।

১৯২১ সালে কার্ল মার্ক্স ও লেলিনের মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Chinese Communist Party (CCP) নামের এই রাজনৈতিক দলটি। শি জিনপিং এর নেতৃত্বে এই দলটি এখনো চীনের ক্ষমতায়। ২০২১ সালে দলটির জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপন করা হয়েছে। এই কমিউনিস্ট পার্টির উপর ভিত্তি করেই চীন আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করে দিতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হলো চায়নার কমিউনিস্ট পার্টি। এই কমিউনিস্ট পার্টির মিলিটারি শাখা হচ্ছে- People's Liberation Army। এই লিবারেশন আর্মি কমিউনিস্ট পার্টির মিলিটারি শাখা হলেও এটিই মূলত চায়নার মূল আর্মড ফোর্স এবং গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিলিটারি ফোর্স। এর পাঁচটি শাখা রয়েছে- 1. Ground Force, 2. Air Force, 3. Rocket Force, 4. Strategic Support Force, 5. Navy। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মিকেও এখন নেকড়ের সাথে তুলনা করা হয়। সেনাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে বলা হচ্ছে চীনের একেকজন মিলিটারি যেন একেকটা নেকড়ে যোদ্ধা।

Economic Diplomacy- অর্থনৈতিক কূটনীতি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে যে দুটি কূটনীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জনকূটনীতি। একুশ শতকের কূটনীতি শুধু রাজনৈতিক কূটনীতি নয়, এটি বর্তমানে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কলাকৌশলই অর্থনৈতিক কূটনীতি হিসেবে পরিচিত। সাধারণত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল, আমদানি হ্রাস, রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রসার, পর্যটন খাত সমৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো অর্থনৈতিক কূটনীতির সাথে সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে পাঁচটি।

1. Manufacturing Hub: বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকর্ষণ করা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। বিনিয়োগের পরিধি বাড়িয়ে বাংলাদেশকে গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
2. Technological Adaptation: বিশ্বায়নের এই যুগে নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক এমন সকল প্রযুক্তির সাথে বাংলাদেশকে খাপ খাওয়ানো। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া যেন আমরাও পাই সেজন্য নতুন নতুন প্রযুক্তিতে সিদ্ধহস্ত হতে হবে।
3. Gainful Employment: জনশক্তির যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আমাদের তেমন কোনো খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ নেই তবে আমাদের আছে বিশাল জনগোষ্ঠী। তাই এই বিশাল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করা। বাংলাদেশের মতো জাপানেরও কোনো খনিজ সম্পদ নেই। জাপানিরা তাদের জনশক্তি কাজে লাগিয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে। আমাদের উৎপাদনের জন্য মানব সম্পদ আছে কিন্তু মিড লেভেল ম্যানেজমেন্টে মানব সম্পদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই বাংলাদেশকেও মানব সম্পদের উপর জোর দিতে হবে।
4. Export Diversification: রপ্তানির পরিধি ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রপ্তানি বাণিজ্য। তাই নতুন রপ্তানি খাতের সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাজার বৈচিত্র্যকরণ ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
5. Ensuring Quality to Expatriates: প্রবাসী বাংলাদেশিদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করা। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি প্রবাসী তাদের অর্জিত অর্থের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পৃথিবীর প্রায় ১২৬টি দেশে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক পাড়ি জমাচ্ছে। তাই প্রবাসীদের প্রতি আন্তরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

Public Diplomacy- জনকূটনীতি

গতানুগতিক কূটনীতিতে আমরা সাধারণত দেখি সম্পর্কগুলো তৈরি হয় সরকারের সাথে সরকারের (Governments to Government)। কিন্তু বর্তমানে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে অন্য দেশের সরকার ছাড়াও সে দেশের জনগণ, সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়ী কমিউনিটি, গণমাধ্যম ইত্যাদিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। আর এসব কলাকৌশলই জনকূটনীতি হিসেবে পরিচিত। যেমন- ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর বারাক ওবামা সরকার বাংলাদেশের GSP সুবিধা স্থগিত করে দেয় এবং পুনরায় জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে কিছু শর্তারোপ করে। কিন্তু বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকগুলো শর্ত পূরণ করলেও মার্কিন প্রশাসন এখনো জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিচ্ছে না। তাই বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী কমিউনিটি এর সাথে তৎপরতা চালাচ্ছে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার জন্য। এটাই জনকূটনীতির উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্জনগুলো বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও পাবলিকেশনসের মাধ্যমে তুলে ধরে বিশ্বে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করাটাও জনকূটনীতির অংশ। তৃতীয়ত, এটি সাংস্কৃতিক কূটনৈতিরও একটি অংশ। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মিউজিক, স্পোর্টস, ভিডিও গেইম, কালচারাল প্রোগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য দেশের জনমত নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা যায়। যুক্তরাষ্ট্র জনকূটনীতির উপর বেশি নজর দেয়। তুরস্ক সরকারও বর্তমানে তাদের উসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাস মুভি সিরিজ আকারে প্রচার করে তাদের পক্ষে জনমত গঠনের প্রয়াস চালাচ্ছে। এভাবে অন্যদেশের জনগণকে প্রভাব বিস্তার করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে জনকূটনীতি।

Dual Track Diplomacy- দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি

একুশ শতাব্দীর বহুল আলোচিত একটি কূটনৈতিক কৌশল। বাংলায় যাকে বলা হয় দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি। অনেকে আবার এটিকে 'Track II diplomacy' অথবা 'Backchannel diplomacy' হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকে। মূল কথা হচ্ছে, এই ডিপ্লোমেসির মধ্যে দুইটি পদ্ধতি একসাথে কাজ করে। নিচে উদয়ারণের মাধ্যমে সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করছি।

উদাহরণ (০১): এটি রাষ্ট্রের এমন কূটনৈতিক কৌশলকে বোঝায় যেখানে রাষ্ট্র একসাথে দুই ধরনের কূটনীতি ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ: উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা করে থাকে। এটি হলো ফার্স্ট ট্র্যাক বা প্রথম পদ্ধতি। আবার যুক্তরাষ্ট্র পাশাপাশি অন্য কোনো শক্তি যেমন জাতিসংঘের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। এটি হলো সেকেন্ড ট্র্যাক বা দ্বিতীয় পদ্ধতি। তাই উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে ডিপ্লোমেসি সেটি হলো ডুয়াল ট্র্যাক বা দ্বৈত ডিপ্লোমেসি। তেমনিভাবে JCPOA এর সময় যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে ৫ম নৌবহর স্থাপন করে ইরানকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আবার একইসাথে নেগোসিয়েশনও চালায়। এই যে একসাথে দুইটি ট্র্যাক তথা চাপ প্রয়োগ ও নেগোসিয়েশন একসাথে চালানো এটিই দ্বৈত ডিপ্লোমেসি। উল্লেখ্য, JCPOA হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বাতিলের উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভিয়েনায় স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি; যার পূর্ণরূপ হলো- Joint Comprehensive Plan of Action।

উদাহরণ (০২): অন্য দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে রাষ্ট্র যদি সরকারি (State Actors) ও বেসরকারি (Non state actors) উভয় মাধ্যম ব্যবহার করে তখন তাকে দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি বলা হয়। প্রথম মাধ্যমটি হলো ডিরেক্টলি সরকার টু সরকার। অর্থাৎ সম্পর্ক রক্ষায় দুইটি দেশের সরকারের মধ্যে অফিশিয়ালি যে আলোচনা বা ডায়ালগ হয় অথবা কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে প্রতিনিধি হিসেবে ঐ দেশে পাঠানো হয়। দ্বিতীয় মাধ্যমটি হলো ইনডিরেক্টলি। বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি, মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন বা সংস্থার মাধ্যমে দুইটি দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা হয় সেটিও দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতির উদাহরণ।

Culinary Diplomacy

বর্তমান দুনিয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে অনেক নতুন নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। নতুন নতুন পরিভাষা যুক্ত হচ্ছে। এই পরিভাষাটিও তন্মধ্যে একটি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কূটনীতিবিদরা নানা কৌশল গ্রহণ করে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম একটি কৌশল হলো "Culinary diplomacy”। একুশ শতাব্দীর শুরুতে এই পরিভাষাটি কূটনীতি বিশেষজ্ঞ পল রকওয়ার ও স্যাম চ্যাপল এই দুজন ব্যক্তির হাত ধরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটিকে আরও দুইটি নামে ডাকা হয়। কেউ কেউ এটিকে Ghastro-diplomacy, কেউ আবার এটিকে Food diplomacyও বলে থাকে।

অন্য দেশ থেকে যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধি আপনার দেশে ভ্রমণ, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন কিংবা সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে আসে তখন এই ডিপ্লোমেসিটি খুবই কাজে দেয়। Culinary এর সহজ বাংলা হলো রন্ধনসম্পর্কীয়। অর্থাৎ আপনার দেশের কালচারাল এবং জনপ্রিয় যে-সকল খাবার রয়েছে সেগুলো দিয়ে তাদেরকে ডিনার/ লাঞ্চ/ ব্রেকফাস্ট করিয়ে তাদের মন জয় করা। অথবা দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোনো একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আড্ডার ছলে খাওয়াদাওয়া করা। কথায় আছে- "The easiest way to win hearts and minds is through the stomach." এই ডিপ্লোমেসিটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে পেরু, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তান ইত্যাদি দেশগুলো।

Ad hoc Diplomacy

বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি কূটনীতি। এটি মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো একটি স্পেশাল মিশন পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে একটি রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কার্যক্রম, যারা পেশাদার কূটনীতিক আছেন তাদের দ্বারা সম্পাদন করার পরিবর্তে সাময়িকভাবে অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়। এই ধরনের স্পেশাল কূটনীতিকে বলা হয় Ad hoc diplomacy। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। বোঝার সুবিধার্থে মনে করুন যে, কোনো একটি ইস্যুর উপর ভিত্তি করে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ছোট একটি দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ সরকার চাইলে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে সেই সমস্যাটি সমাধান করতে পারে। কিন্তু সরকার যদি গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধান না করিয়ে বরং বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কিংবা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করে এবং ভারত সরকারের সাথে সেই ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে সমাধান করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তখন সেটিকে 'Ad hoc diplomacy' বলা হয়। Ad-hoc কূটনীতিকে নিত্যনৈমিত্তিক দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাছাড়াও কোনো রাষ্ট্রপ্রধান অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বিদেশ সফর করেন কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তখন সেটিকেও বলা হয় Ad hoc diplomacy।

Cheque-book Diplomacy - চেকবুক কূটনীতি

এই ধরনের কূটনীতি সাধারণত আর্থিকভাবে ধনী এমন রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত হয়। অর্থনৈতিক সাহায্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসার নামই চেকবুক ডিপ্লোমেসি। এটি আসলে Debt Trap Diplomacy কিংবা Debt Colonialism এর মতোই। তেমন কোনো পার্থক্য নেই। লোন কিংবা ঋণের ফাঁদে ফেলে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের ভূমি, বন্দর কিংবা বিমানবন্দর দখলে নিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে Debt Colonialism বা ঋণ উপনিবেশবাদ বলা হয়। চেকবুক কূটনীতির কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দেই; যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে প্রায়ই সামরিক মহড়া দেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান মিলে একটি সামরিক মহড়া দেওয়ার পূর্বে এই অঞ্চলের কম্বোডিয়াকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করেনি। দেশটির বিদেশি ঋণের ৬০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে বেইজিংয়ের কাছ থেকে। চীনের প্রতি এই নির্ভরতার ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের সঙ্গে সামরিক মহড়া বাতিল করেছে কম্বোডিয়া। এটি চেকবুক কূটনীতির উদাহরণ। ২০২১ সালের নভেম্বরে নিকারাগুয়া, ২০১৮ সালে ডোমিনিকা রিপাবলিককে বিশাল অর্থ সহায়তা করে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করায় চীন। একই ভাবে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে প্রায় সবগুলো দেশেই চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। চীনের ঋণ গ্রহণকারী সবগুলো দেশ তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাই আফ্রিকা মহাদেশের শুধু একটি রাষ্ট্র এসোয়াতিনি ছাড়া কারো সাথে বর্তমানে তাইওয়ানের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি চীনের চেকবুক কূটনীতির সফলতা।

Track Diplomacy

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে বিভিন্ন কলাকৌশল গ্রহণ করা হয়। এই কলাকৌশলের বিভিন্ন Track বা পদ্ধতি রয়েছে।

1. Track 1 Diplomacy: এটি মূলত অফিশিয়াল বা সরকারি কূটনীতিকে বোঝায়। এক দেশের সরকারের সাথে অন্য দেশের সরকারের যে অফিশিয়াল সম্পর্ক সেটিই ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসি। যেমন- জো বাইডেনের সাথে শি জিনপিং এর ফোনালাপ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার ইত্যাদি ট্র্যাক ওয়ান ডিপ্লোমেসির উদাহরণ।
2. Track II Diplomacy: রাষ্ট্রীয় কর্মক এবং অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকের সমন্বয়ে যে কূটনীতি সেটাই Track-II কূটনীতি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিএসপি সুবিধা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোও তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে চীনের আধিপত্য বিস্তারে চীনা সরকারের পাশাপাশি চীনের মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেশনগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উল্লেখ, এটিকে Backchannel diplomacyও বলা হয়।
3. Track III Diplomacy: দুটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যখন তৃতীয় আরেকটি পক্ষ চলে আসে তখন সেটি 'Track-III' কূটনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন- রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি যদি জাতিসংঘ কিংবা ওআইসির মতো তৃতীয় কোনো পক্ষ এগিয়ে আসে তখন সেটিকে বলা হয় Track III ডিপ্লোমেসি।
4. Multi Track Diplomacy: কূটনৈতিক অঙ্গনে নিজের স্বার্থ আদায়ে যদি উপরিউক্ত তিনটি Track একসাথে প্রয়োগ করা হয় তখন সেটিকে মাল্টি ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি বলা হয়।
5. Nine Track Diplomacy: ১. সরকার, ২. পেশাদারি ব্যক্তি, ৩. ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, ৪. প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, ৫. গবেষণা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান, ৬. বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী বা একটিভিস্ট, ৭. ধর্ম, ৮. ফান্ডিং, ৯. জনমত ও যোগাযোগ এই নয়টি পদ্ধতি ব্যবহার করে যে কূটনীতি গ্রহণ করা হয় সেটাই নাইন ট্র্যাক ডিপ্লোমেসি।

অ্যাম্বাসেডর ও হাইকমিশনার এর মধ্যে পার্থক্য

Ambassador (রাষ্ট্রদূত): রাষ্ট্রদূত বা অ্যাম্বাসেডর হলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সরকারের পক্ষ থেকে অন্য আরেকটি দেশের সাথে কূটনৈতিক কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হন। একজন অ্যাম্বাসেডর প্রেরিত দেশে নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করেন এবং চলমান বিভিন্ন সমস্যা সেই দেশের কাছে সমাধানের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন। দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বাস্তবায়নে তিনি সদা তৎপর থাকেন। রাষ্ট্রদূতকে বৈদেশিক রাষ্ট্রে অনির্দিষ্টভাবে কয়েক বছর অবস্থান করতে হয় এবং তাকে ঐ রাষ্ট্রের যাবতীয় আইনকানুন, রীতিনীতি, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত থাকতে হয়।

High Commissioner (হাই কমিশনার): বর্তমানে যে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো অতীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল সেই রাষ্ট্রগুলোকে বলা হয় কমনওয়েলথভুক্ত দেশ (মোট ৫৪টি রাষ্ট্র)। এই কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে ইংরেজিতে 'Commonwealth of Nations' বলা হয়। একটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ থেকে আরেকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে যে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করা হয় তাকে অ্যাম্বাসেডর বলার পরিবর্তে হাই কমিশনার বলা হয়। হাইকমিশনার ও এম্বাসেডরের কাজের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। রাষ্ট্রদূতকে তখনি হাইকমিশনার বলা হয় যখন দুটি দেশই কমনওয়েলথভুক্ত হবে। আর দুটি দেশ কমনওয়েলথভুক্ত না হলে রাষ্ট্রদূতকে অ্যাম্বাসেডর বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ভারতে নিয়োগ পেলে তাকে হাইকমিশনার বলা হবে। একই ভাবে ভারতের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে নিয়োজিত হলে তাকেও হাইকমিশনার বলা হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্র নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে অ্যাম্বাসেডর বলা হবে। একই ভাবে বাংলাদেশে প্রেরিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকেও অ্যাম্বাসেডর বলা হবে। কারণ বাংলাদেশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হলেও যুক্তরাষ্ট্র কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নয়।

কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি রাষ্ট্র: অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ, বাংলাদেশ, বার্বাডোস, বেলিজ, বতসোয়ানা, ব্রুনাই, ক্যামেরুন, কানাডা, সাইপ্রাস, ডোমিনিকা, ইসোয়াতিনি, ফিজি, গাম্বিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গায়ানা, ভারত, জ্যামাইকা, কেনিয়া, কিরিবাস, লেসোথো, মালাউই, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মাল্টা, মরিশাস, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, নাউরু, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিট্স ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইন দ্বীপপুঞ্জ, সামোয়া, সিশেলিস, সিয়েরা লিওন, সিঙ্গাপুর, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, টোঙ্গা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, টুভালু, উগান্ডা, যুক্তরাজ্য, ভানুয়াতু ও জাম্বিয়া।

যুক্তরাষ্ট্র যে কারণে কমনওয়েলথ এর সদস্য নয়

যুক্তরাষ্ট্রকেও একসময় ব্রিটিশরা শাসন করেছিল। তারপর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত নয়? ১৯৪৯ সালে লন্ডন ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল কমনওয়েলথ। বর্তমানে কমনওয়েলথভুক্ত দেশ ৫৪টি। আমেরিকা ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হলেও কমনওয়েলথভুক্ত দেশ নয়। কিন্তু কেন?

প্রথমত, অতীতে কোনো দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও সে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর সে কমনওয়েলথে যোগ দেবে কি না তা সম্পূর্ণ ঐ দেশের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে। আয়ারল্যান্ড ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও তারা কমনওয়েলথে যোগ দেয়নি। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্র একসময় ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও কমনওয়েলথে যোগ দেয়নি। তাই কমনওয়েলথ এর ৫৪টি দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেই। দ্বিতীয়ত, কমনওয়েলথ গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। আর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। ব্রিটেন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এত আগে স্বাধীনতা লাভ করে যে কমনওয়েলথ গঠনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আইনকানুনের দিক থেকে কোন প্রভাব বজায় ছিল না। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান-সহ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে দেখবেন যে এখনো ব্রিটিশদের প্রভাব রয়েছে। ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠা করা অনেক আইন এখনো আমরা মেনে চলি, কলোনিয়াল আমলে তৈরি ব্রিটিশদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেললাইন, সংস্কৃতি এখনো আমাদের ব্রিটিশ উপনিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে অনেকাংশে বেরিয়ে এসেছে। তৃতীয়ত, কমনওয়েলথ এর এমনও সদস্য আছে যারা ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হয়নি। কমনওয়েলথভুক্ত কিছু সদস্য দেশ কখনোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না। যেমন- ১৯৯৫ সালে মোজাম্বিক এবং ২০০৯ সালে রোয়ান্ডা কমনওয়েলথের সদস্য হয়। কিন্তু দেশ দুটি কখনোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল না। চতুর্থত, একবার কমনওয়েলথ এর সদস্য হওয়া মানেই আজীবন সদস্য থাকতে হবে বিষয়টি এরকম নয়। কয়েকবার কমনওয়েলথে তাদের সদস্যও হারিয়েছে। যেমন- নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করা হলে, ২০০০ সালে রবার্ট মুগাবে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যান। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের জেরে পাকিস্তানের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। তবে সাড়ে চার বছর পর তারা আবার সেই পদ ফেরত পায়। বর্ণবাদ নিয়ে সমালোচনার জেরে ১৯৬১ সালে কমনওয়েলথ থেকে সরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৪ সালে তারা আবার এর সদস্য হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ ২০১৬ সালে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। তাই সদস্য থাকা, সদস্য না থাকা, অথবা সদস্য পদ প্রত্যাহার করা নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর।

কমনওয়েলথ এর সফলতা কী?

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কমনওয়েলথের এসব সমস্যা সমাধান করার মতো সামর্থ্য এখন নেই। সফলতার মধ্যে একটি হলো প্রতি বছর যুক্তরাজ্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে “কমনওয়েলথ শিক্ষাবৃত্তি” নামে কিছু স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। আমি মনে করি কমনওয়েলথ যে একটি সংগঠন হিসেবে এখনো টিকে আছে, সেটিই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। প্রতি দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাবেক ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনের রানীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাষ্ট্রনেতারা। আসলে গোলামির ইতিহাস মনে করিয়ে দেবার জন্যই কমনওয়েলথের মতো সিস্টেম রাখা হয়েছে।

৩০টি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিভাষা

০১. Foreign Policy – পররাষ্ট্রনীতি : বিশ্বায়নের এই দুনিয়ায় একটি রাষ্ট্র অপর আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া চলতে পারে না। অর্থাৎ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল (Interdependent)। একে অপরের উপর এই নির্ভরশীলতার কারণেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে এই সম্পর্ক স্থাপন করাকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলা হয়। জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করা কিংবা বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে একটি রাষ্ট্রকে কিছু নীতি বা পলিসি গ্রহণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্বার্থসমূহের সংরক্ষণ কিংবা রক্ষার জন্য একটি রাষ্ট্র কর্তৃক অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তার আচরণ সংক্রান্ত এই নিয়মাবলিকেই বলা হয় Foreign Policy বা পররাষ্ট্রনীতি।

০২. Diplomacy – কূটনীতি: আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য চীনের কটন বা তুলা প্রয়োজন। চীন তো আর এমনি এমনিই বাংলাদেশকে তুলা দেবে না। সেই তুলা পাওয়ার জন্য চায়নার সাথে আমাদের আলোচনার টেবিলে বসতে হয়, আমাদের প্রতিনিধি চায়নাতে পাঠাতে হয়, দাম নিয়ে তাদের সাথে দরকষাকষি করতে হয়। এভাবে মাঠ পর্যায়ের উপরিউক্ত কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে চীন থেকে আমাদের প্রয়োজন আদায় করে নেওয়াকে বলা হয় Diplomacy বা কূটনীতি। আরেকটি উদাহরণ দেই। ২০২১ সালের জুনে সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির জন্য মোট ২,৬০০ কেজি হাঁড়িভাঙা আম উপহার পাঠিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইসলামাবাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ক নরমাল করার জন্য পাকিস্তানেও হাঁড়িভাঙা আম পাঠানো হয়েছিল। আসলে কূটনীতির ভাষা সাধারণ ভাষা থেকে ভিন্ন হয়। ধরুন আপনি কিছুই বললেন না, নীরব থাকলেন- তাতেও কিন্তু অনেক সময় আসল কথাটি বলা হয়ে যায়। আবার একটি বা দুটি শব্দ বললেন নিছক কৌতুকের ছলে, তাতেও কাজ হাসিল হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো ধরনের নেগোসিয়েশনে না গিয়েই উপহার দিয়ে একটি অন্তর্নিহিত মেসেজ পাঠানো যায়। আর এটাই কূটনীতি। অ্যাকাডেমিক ভাষায় বললে কূটনীতি হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম। ইংরেজি Diplomacy শব্দটি ১৭৯৬ সালে আইরিশ ফিলোসোফার এডমন্ড বার্ক প্রচলিত ফরাসি শব্দ 'diplomatie' থেকে প্রচলন হয়। বাংলা কূটনীতি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ "কূটানীতি” থেকে আগত। প্রথম মৌর্য্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা চাণক্য কৌটিল্য'র নাম থেকে কূটনীতি শব্দটির উদ্ভব ঘটেছিল।

০৩. Treaty- চুক্তি/ সন্ধিপত্র : বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অথবা একটি স্বাধীন দেশ ও একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থাপিত অফিশিয়াল (Legal) ও লিখিত (Written) কোনো চুক্তিকে বলা হয় "Treaty"। অনেক সময় নিচে উল্লিখিত বিষয়গুলোও Treaty হিসেবে বিবেচনা করা হয়- International agreement, Protocol, Covenant, Convention, Pact, Exchange of letters ইত্যাদি।

০৪. Accords- চুক্তি : আন্তর্জাতিক কোন চুক্তিতে যখন একসাথে অধিক বিষয় যুক্ত থাকে তখন সেটি Treaty হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর যদি চুক্তিতে কমসংখ্যক বিষয় যুক্ত থাকে তখন সেটিকে বলা হয় "Accords”। তবে বর্তমানে Treaty ও Accord দুটোকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়।

০৫. Convention- নিয়মপত্র : দুই বা ততোধিক বিরোধপূর্ণ দেশ একটি সাধারণ স্বার্থে (Common Good) একমত হওয়া। এখানে Treaty অপেক্ষা কম বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং যে-সকল বিষয় মেনে চললে উভয় দেশ উপকৃত হবে। যেমন- রামসার কনভেনশন, The Law of The Sea ইত্যাদি। কনভেনশন ও ট্রিটির মধ্যে আরেকটি পার্থক্য হলো- Convention is less formal than treaty।

০৬. Ramsar Convention- রামসার কনভেনশন: জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ইরানের রামসার শহরে একটি পরিবেশবাদী সম্মেলন হয়। যেখানে জলাভূমির (Wetlands) টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হয়। এটি রামসার কনভেনশন চুক্তি বলে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে রামসার কনভেনশন চুক্তি কার্যকর হয়। ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে বর্তমানে ১৭১টি দেশ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সই করে। বাংলাদেশের দুইটি স্থানকে রামসার চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়- সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর। হাকালুকি হাওরকেও রামসার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন বছর পর পর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রামসার কনভেনশনকে আবার “Convention on Wetlands" ও বলা হয়।

০৭. Modus Vivendi- অস্থায়ী চুক্তি: অস্থায়ী বা Temporary কোনো চুক্তি। সাধারণত যুদ্ধ বা দ্বন্দ্বরত দুইটি দেশ সাময়িকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে যে চুক্তি করে সেটিই 'Modus Vivendi' হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ এই চুক্তির মাধ্যমে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় না। এই Modus Vivendi কে আবার Cease Fire বা Armistice ও বলা হয়ে থাকে। Armistice, Cease fire, Modus Vivendi তিনটি একই অর্থ বহন করে।

০৮. Peace Treaty (শান্তি চুক্তি): এই পরিভাষাটি "Modus Vivendi" বা অস্থায়ী চুক্তির বিপরীত। পিস ট্রিটির মাধ্যমে চিরস্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হয়। পিস ট্রিটি বা শান্তি চুক্তি কখনো অস্থায়ী হয় না। শান্তি চুক্তি হয় চিরস্থায়ী। উদাহরণস্বরূপ- (ক) Paris Peace Accords: ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯৭৩ সালে সংগঠিত একটি শান্তি চুক্তি। উত্তর ভিয়েতনাম, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ হয়। (খ) Korean Armistice Agreement: ১৯৫৩ সালে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী স্থান পানমুজানে এই চুক্তিটি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য স্বাক্ষরিত হয়। যদিও প্রথমে এই চুক্তিটি Cease fire বা সাময়িক যুদ্ধ বিরতির উদ্দেশ্যে হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে এটাই দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পরিণত হয়। (গ) Peace of Westphalia: হলি রোমান এম্পায়ার বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৬৪৮ সালে দুইটি চুক্তি একসাথে স্বাক্ষরিত হয়। এই দুইটি চুক্তিকে একসাথে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি বলা হয়। প্রথম চুক্তির মাধ্যমে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ বা Thirty Years' War (1618-1648) বন্ধ করা হয়। দ্বিতীয় চুক্তির মাধ্যমে আশি বছরের যুদ্ধ বা Eighty Years' War (1568-1648) বন্ধ করা হয়। এই যুদ্ধে ইউরোপের প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। (ঘ) Treaty of Sevres: সেভ্রে চুক্তি হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মিত্র শক্তি ও বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহ্যবাহী চুক্তি। ১৯২০ সালে সংগঠিত হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন, ফ্রান্স, গ্রিস ও ইতালি ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দখল করে নেয়। (ঙ) Treaty of Versailles: ভার্সাই চুক্তি। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তকারী চুক্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯১৯ সালে জার্মানি ও মিত্র শক্তির মধ্যে এটি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে জার্মানিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

০৯. Letter of Intent : সংক্ষেপে যাকে “LOI” বলা হয়। লেটার অফ ইন্টেন্ট হলো এমন একটি সম্মতিপত্র যেখানে দুটি রাষ্ট্র বা দুটি পক্ষের মধ্যে পরবর্তীতে চুক্তি করার ইচ্ছা পোষণ করা হয়। অর্থাৎ এখনই নয় বরং পরবর্তী কোন এক সময়ে আমরা একটি চুক্তিতে লিপ্ত হব এমন ইচ্ছে প্রকাশ। যেমন- প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ২০২১ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের সাথে 'লেটার অফ ইন্টেন্ট' সই করেছে।

১০. Memorandum of Understanding (MOU): মউ হচ্ছে খসড়া চুক্তি বা চুক্তির আগে চুক্তি। এই চুক্তি মানার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই চুক্তির শর্ত না মানলেও শাস্তির বিধান নেই। যেমন- ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করলে বাংলাদেশের সাথে প্রায় ২৭টি খসড়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এখন বাংলাদেশ যদি ঐসব খসড়া চুক্তি মানতে অস্বীকার করে তাহলে চীন অফিশিয়ালি বাংলাদেশকে চুক্তি মানতে বাধ্য করতে পারবে না। একই ভাবে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ভারতের সাথে তিস্তা নিয়ে মউ সাইন করেছিল। কিন্তু ভারত তা মানতে বাধ্য নয় বলে তিস্তা সমস্যার সমাধান আজও হয়নি। উল্লেখ্য, Memorandum of Understanding এর সাথে Gentlemen agreement এর একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। Gentlemen agreement হলো একটি অনানুষ্ঠানিক মৌখিক বা অলিখিত চুক্তি যা কোনো রাষ্ট্র আইনগতভাবে মানতে বাধ্য নয়।

১১. Envoy (দূত): এমন ব্যক্তি যিনি কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন। যাকে অন্য কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলার জন্য প্রেরণ করা হয়। যেমন- জাতিসংঘের Envoy হিসেবে এঞ্জেলিনা জোলি রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। (Someone who is sent as a representative from one government or organization to another)

১২. Emissary (গূঢ়সংবাদবাহক) : এমন একজন ব্যক্তি যাকে বিশেষ কোনো কাজের দায়িত্ব দিয়ে বা বার্তা নিয়ে অন্য দেশে পাঠানো হয়। (A person sent as a diplomatic representative on a special mission)

১৩. Embassy (দূতাবাস) : একজন রাষ্ট্রদূত বা অ্যাম্বাসেডর যেখানে বাস করেন তা দূতাবাস নামে পরিচিত। সাধারণত দূতাবাস বৈদেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক বরাদ্দকৃত এবং তা দেশটির রাজধানী এলাকায় অবস্থিত। যেমন- ইরানের রাজধানী তেহরানে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে, ফ্রান্সের প্যারিসে, জার্মানির বার্লিনে, রাশিয়ার মস্কোতে, মিশরের কায়রোতে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে।

১৪. Consulate General- কনসুলেট জেনারেল: দূতাবাস থাকে রাজধানী শহরে। আর কনসুলেট জেনারেল হচ্ছে রাজধানী ব্যতীত অন্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে থাকে। কনসুলেট জেনারেল দূতাবাসের অধীনেই কাজ করে। যেমন- চীনের রাজধানী বেইজিং এ বাংলাদেশের দূতাবাস, আর হংকং এবং কুনমিং এ কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আমাদের দূতাবাস এবং জেদ্দাতে কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় বাংলাদেশের দূতাবাস, আর ইস্তাম্বুলে কনসুলেট জেনারেল রয়েছে। উল্লেখ্য, 'কনসুলেট' আর 'কনসুলেট জেনারেল' প্রায় একই। তবে কনসুলেট জেনারেলের তুলনায় কনসুলেট একটু ছোট পরিসরে কাজ করে।

১৫. Embassy Officials (দূতাবাসের কর্মকর্তা) : একজন রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার জন্য কিছু প্রশিক্ষিত ব্যক্তিকে দূতাবাসে নিয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রদূতকে সহোযোগিতাকারী এসব কর্মকর্তারাই 'দূতাবাসের কর্মকর্তা' নামে পরিচিত।

১৬. Ambassador-in-residence : সরকার কর্তৃক একজন রাষ্ট্রদূতকে যখন অন্য একটি দেশে পাঠানো হয়, তখন সেই রাষ্ট্রদূত প্রেরিত দেশে ৪/৫ বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে অবস্থান করেন। যে সকল রাষ্ট্রদূতকে অন্য আরেকটি দেশে নির্দিষ্ট সময় পরিমাণ অবস্থান করতে হয় তাদেরকে বলা হয় “Ambassador-in-residence”। অর্থাৎ তার কাজকর্ম একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

১৭. An ambassador-at-large : এরা হচ্ছে একটি দেশের অনেক উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রদূত, যাদের কার্যক্রম কোনো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। প্রথমত, এরা একটি বিশাল অঞ্চল বা রিজিওন নিয়ে কাজ করে। মনে করুন বাংলাদেশ সরকার একজন বিজ্ঞ কূটনীতিবিদকে দায়িত্ব দিল যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থকে দেখাশোনা করার জন্য। কিংবা একজন রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব দিল সম্পূর্ণ ইউরোপিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখাশোনা করার জন্য। বিশাল অঞ্চল নিয়ে কাজ করে এমন কূটনীতিবিদদের বলা হয় An ambassador-at-large। দ্বিতীয়ত, যে-সকল রাষ্ট্রদূত অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এমন আন্তর্জাতিক সংস্থায় একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করে তারার অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ। যেমন- বাংলাদেশের কোনো একজন রাষ্ট্রদূত যখন জাতিসংঘে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে তখন তাকে বলা হয় An ambassador-at-large। উল্লেখ্য, প্রশ্ন হতে পারে- অ্যাম্বাসেডর আর অ্যাম্বাসেডর ইন রেসিডেন্স এর মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? উত্তর হচ্ছে দুটোই প্রায় সেইম। অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ বোঝাতে অ্যাম্বাসেডর ইন রেসিডেন্স নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে।

১৮. Diplomatic Immunity (কূটনীতিক সুবিধা): একটি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং সে- দেশের দূতাবাসে অবস্থানরত কর্মীরা ব্যাপক কূটনৈতিক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। হোস্ট কান্ট্রি তাদেরকে বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এমনকি বিদেশে অবস্থানকালীন কোনো অপরাধের জন্য তাঁরা গ্রেপ্তার কিংবা বিচারের মুখোমুখি হন না। শাস্তি হিসেবে তাঁদেরকে কেবল নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়ে থাকে। এসকল সুযোগ সুবিধাকেই বলা হয় ডিপ্লোমেটিক ইমিউনিটি।

১৯. Persona Non Grata: কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যবহৃত এই টার্মটি একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে, তার দেশে অবস্থানরত অন্যান্য দেশের কূটনীতিবিদদের মধ্যে কোনো একজন কূটনীতিক তার দেশের জন্য মঙ্গল জনক নয় বরং তার দেশের জন্য সে ক্ষতিকর হতে পারে, তার দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য সে থ্রেট হতে পারে, কিংবা তার দেশের নিরাপত্তার জন্য সে হুমকি হতে পারে, তাহলে দেশটি ওই কূটনীতিককে তাঁর দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারবে এবং তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারবে। ১৯৬১ সালের "Vienna Convention On Diplomatic Relations" এর আর্টিকেল ০৯ অনুযায়ী স্বাগতিক দেশ প্রেরণকারী দেশের যে-কোনো কূটনীতিককে কারণ না দেখিয়েই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারে। তবে কূটনীতিক বহিষ্কারের আন্তর্জাতিক নিয়ম থাকলেও সাধারণত কোনো দেশ এটি বর্তমানে করতে চায় না। কারণ অন্য রাষ্ট্র এতে অপমান বোধ করে। তাই কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়।

২০. Ambassadress: মনে রাখা জরুরি Ambassadress হলো, ambassador এর স্ত্রী। অর্থাৎ এটি দ্বারা কোনো মিশনের স্ত্রীপ্রধানকে বোঝানো হয় না।

২১. Brand ambassador: একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বা সেলেব্রিটি, যিনি কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়োজিত হয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বা সেবার প্রমোশনে কাজ করেন।

২২. Charge d'Affaires/ ad interim: পদের দিক থেকে একজন Ambassador এর নিচের কোনো কর্মকর্তা যিনি Ambassador এর অনুপস্থিতিতে অ্যাম্বাসেডরের দায়িত্ব পালন করেন। Chargé d'Affaires কে বর্তমানে 'a.i.' বা 'ad interim'ও বলা হচ্ছে।

২৩. Minister Plenipotentiary: সাধারণত একজন রাষ্ট্রদূত কখনো একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। রাষ্ট্রদূতকে যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তার দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু Minister Plenipotentiary এটি হলো এমন এক ধরনের বিশেষ রাষ্ট্রদূত যাদেরকে সরকার পরিপূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দেয়। যে কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এদেরকে সরকারের সাথে আলোচনা করতে হয় না। এদেরকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। বিশেষ করে কূটনৈতিক অঙ্গনে যারা অনেক সিনিয়র, একইসাথে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ তাদেরকে সরকার এই মর্যাদা দিয়ে থাকে।

২৪. Rapporteur: যিনি কোনো আন্তর্জাতিক সভা বা সমিতির কার্যবিবরণী তৈরি করে তা উচ্চতর সংস্থা বা সাধারণ সভায় পেশ করেন তাকেই Rapporteur বলা হয়। অর্থাৎ কোনো কমিটি বা সাব কমিটির ঐসকল ব্যক্তি যাদের দায়িত্ব হলো আলোচনার সারমর্ম তৈরি করা।

২৫. Unilateralism- একলা চলো নীতি: অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাও প্রতিষ্ঠানকে তোয়াক্কা না করে নিজের মতো করে চলা। উদাহরণস্বরূপ উত্তর কোরিয়ার কথা বলা যায়। উত্তর কোরিয়া কারো কথাই তোয়াক্কা করছে না বরং নিজের ইচ্ছেমতো তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

২৬. Shanghai Five- সাংহাই ফাইভ: বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে মধ্য এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি চীনকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। তাই চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বারা সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ২ এপ্রিল চীনের সাংহাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে 'সাংহাই ফাইভ' গঠন করা হয়। আর এটাই ২০০১ সাল থেকে ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা' হিসেবে পরিচিত। ইংরেজিতে, Shanghai Cooperation Organisation- SCO। ২০০১ সালে উজবেকিস্তানকেও এর সদস্যপদ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান এর সদস্য হয়। তাই বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এই আটটি রাষ্ট্র এর সদস্য। বর্তমানে এটি ইউরেশিয়ান অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

২৭. Sin Fein- সিনফেইন : বর্তমানে আয়ারল্যান্ড দুভাগে বিভক্ত; উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র। আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অধীনে। দীর্ঘদিন ধরে তারাও স্বাধীনতা চাচ্ছে। তাই ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার জন্য উত্তর আয়ারল্যান্ডে যে আন্দোলন হচ্ছে সেটি মূলত পেছন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে 'সিনফেইন' নামের একটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল। এই দলটি মূলত স্বাধীন আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের গেরিলা সংগঠন 'আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি'র একটি রাজনৈতিক শাখা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি তাদেরকে অস্ত্রের সাপ্লাই দিচ্ছে, আর সিনফেইন যুদ্ধের প্রচারণা চালাচ্ছে।

২৮. মৈত্রী চুক্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির মধ্যে পার্থক্যসমূহ: রাষ্ট্রগুলো তাদের আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। সে চুক্তিগুলো হতে পারে মৈত্রী চুক্তি অথবা নিরাপত্তা চুক্তি। এই উভয় চুক্তির মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, দুটি রাষ্ট্র যখন তাদের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি স্বার্থ উদ্ধারে কোনো সহযোগিতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন তাকে মৈত্রী চুক্তি বলা হয়। মৈত্রী চুক্তিকে ইংরেজিতে Treaty of Friendship বা Friendship Treaty বলা হয়। নিচে কয়েকটি মৈত্রী চুক্তির উদাহরণ দেওয়া হলো। ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে Treaty of Amity and Commerce, বলিভিয়া ও চিলির মধ্যে Treaty of Peace and Friendship, জার্মানি ও তুরস্কের মধ্যে German-Turkish Treaty of Friendship ইত্যাদি। অপরদিকে একাধিক রাষ্ট্র যখন শুধু তাদের নিরাপত্তা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তখন তাকে নিরাপত্তা চুক্তি বলা হয়। নিরাপত্তা চুক্তির আওতাভুক্ত থাকা কোনো দেশ যদি তার নিরাপত্তা রক্ষায় হুমকির মুখে পড়ে অথবা অন্য আরেকটি দেশ কর্তৃক আক্রমণের শিকার হয় তখন চুক্তিতে থাকা অন্য সকল দেশ রাষ্ট্রটির নিরাপত্তা রক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য। নিরাপত্তা চুক্তির কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত আনজুস (ANZUS) চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য- অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত অকাস (AUKUS) চুক্তি ইত্যাদি।

২৯. Preventive Diplomacy (প্রতিরোধমূলক কূটনীতি) : কোনো রাষ্ট্রই সাধারণত সংঘাত বা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে চায় না। সংঘাতে জড়ানো একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ব্যাহত করে। তাই সংঘাত এড়িয়ে কোনো একটি দ্বন্দ্ব বা সংকট সমাধান করার লক্ষ্যে যে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হয় তাকেই প্রতিরোধমূলক কূটনীতি বলা হয়। অনেক সময় দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করতে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংস্থা ইত্যাদি এগিয়ে আসে এবং সংঘাত নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। আর সেটিও প্রতিরোধমূলক কূটনীতির উদাহরণ।

৩০. Gunboat Diplomacy (গানবোট কূটনীতি): "Speak softly and carry a big stick; you will go far"-বিখ্যাত এই উক্তিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিউডর রুজভেল্টের। গানবোট ডিপ্লোমেসির কথা বলতে গেলে এই উক্তিটি দিয়ে শুরু করতে হয়। তথা গানবোট কূটনীতির মূল কথা হলো, শত্রু রাষ্ট্রকে এমনভাবে ভীতি প্রদর্শন করা যাতে সে মনে করে আমি সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং যে-কোনো সময় তাকে আক্রমণ করে বসতে পারি। যদিও সরাসরি সামরিক আক্রমণ করার ইচ্ছে আমার নেই। এভাবে কূটনৈতিক কৌশলে সামরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পিছু হটাতে বাধ্য করাকেই গানবোট ডিপ্লোমেসি বলা হয়। উল্লেখ্য, গানবোট ডিপ্লোমেসিকে আবার 'Big Stick Diplomacy'ও বলা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00