📄 ভূমিকা
"The method of political science is the interpretation of life; its instrument is insight, a nice understanding of subtle, unformulated conditions." -Woodrow Wilson
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে অনেক বই রয়েছে। কিছু বই ইতিহাস ভিত্তিক, কিছু বই তত্ত্ব ভিত্তিক, আবার কিছু বই শুধু সমসাময়িক ঘটনাবলির বিশ্লেষণ সম্বলিত। একজন পাঠক হিসেবে আমি লক্ষ্য করেছি যে, একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য ইতিহাস, তত্ত্ব এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই তিনটি বিষয় ছাড়াও নয়া বিশ্বব্যবস্থা, কূটনীতি, ভূরাজনীতি, দর্শন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরকারব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয় কর্ম, জলবায়ু, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি, সন্ত্রাসবাদ, মতাদর্শ, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যবহৃত পরিভাষাসমূহ, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের করণীয় ইত্যাদি সবগুলো বিষয়েরই একটি মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন। তবে বাস্তবতা এই যে, উপরিউক্ত সবগুলো বিষয়ের মিথস্ক্রিয়া বিদ্যমান এমন কোনো বই আমাদের হাতের কাছে নেই। সেই শূন্যতাবোধ থেকেই আমার এই বইটি লেখার প্রয়াস। বিভিন্ন এডিটোরিয়াল বা সম্পাদকীয়তে আমার কিছু লেখা সৌজন্যমূলকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়া এবং নিজস্ব ওয়েবসাইটে অনেক লেখা আর্টিকেল আকারেও প্রকাশ করেছি। সেখান থেকেই পাঠক শ্রেণির একটি উৎসাহ পাওয়ার ফলে আমি একটি দায়বদ্ধতা অনুভব করি, যা আমাকে এই বইটি লেখার পেছনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
পদ্ধতিগতভাবে এই বইটির প্রতিটি বিষয় এবং প্রতিটি অধ্যায় একটি অপরটির সাথে নিখুঁতভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই এই বইটির প্রতিটি বিষয়বস্তুকে যদি ভালোভাবে বোধগম্য করতে চান তাহলে বইটির সূচিপত্র অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে পড়ে যাওয়া অত্যাবশ্যকীয়। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা সর্বদাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে সচেতন থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা যদি বৈশ্বিক রাজনীতির মৌলিক বিষয় থেকে শুরু করে গভীরে প্রবেশ করতে পারি তাহলে বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের চিন্তা ভাবনা আরও বেশি পরিপক্ক হবে। তাই চেষ্টা করেছি একটি বিষয়ের শুরু থেকে ধীরে ধীরে গভীরে প্রবেশ করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিষয়টি বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করার। পাঠকের অনুধাবনের সুবিধার্থে একেকটি বিষয় বোঝানোর জন্য প্রাসঙ্গিক উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ঘটনা বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ঐ ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপটগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
এই বইয়ের ব্যতিক্রমী দিকটি হলো এই যে, আমরা যে বিষয়টি আলোচনা করি না কেন সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কেন সেখানে প্রাসঙ্গিক তা তুলে ধরা এবং সেখানে বাংলাদেশের করণীয় কী হতে পারে তাও বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে ঐ অধ্যায়ের বিষয়বস্তুকে ভিত্তি করে একটি 'Theme' রয়েছে, যা অধ্যায়টি সম্পর্কে শুরুতেই পাঠককে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করবে। একইভাবে প্রতিটি অধ্যায় শেষে "Question to think about?" নামে আরেকটি অংশ রয়েছে যা পাঠকের চিন্তার খোরাক যোগাবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি অধ্যায় শেষে কিছু সমৃদ্ধ সহায়ক গ্রন্থের তালিকা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাতে করে পাঠক পরবর্তীতে ঐ অধ্যায়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আরও বিশদ জ্ঞান লাভ করতে পারে। চতুর্থত, এই বইয়ে একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত এমন কিছু পরিভাষার (Terminologies) সাথে আপনাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেব, যে টার্মগুলো সাধারণত বাংলা ভাষায় আলোচনা কম হয়েছে। একটি পরিভাষা, তত্ত্ব বা থিওরি কীভাবে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক সেটিও উদাহরণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। পঞ্চমত, এই বইটির প্রথম থেকে দশম অধ্যায় পর্যন্ত সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত মৌলিক বিষয়াবলি (Conceptual Issues) এবং পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে বিশ্লেষণমূলক বিষয়াবলি (Empirical Issues) আলোচনা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেমে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ রাখা যায় না। যেমন- আমরা যদি শুধু বর্তমান আফগানিস্তান নিয়ে আলোচনা করতে যাই তখন আমরা আফগানিস্তান ও বর্তমান সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারি না। বর্তমান সময়ের আফগানিস্তানকে বুঝতে আমাদের চলে যেতে হয় অতীতের সেই সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে, ফিরে যেতে হয় দুই দশক পূর্বের ন্যাটো জোটের হামলায়। শুধু বর্তমান আফগানিস্তানকে বুঝতেই আমাদের নিয়ে আসতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে, নিয়ে আসতে হচ্ছে পাকিস্তান, চীন, ভারত ও রাশিয়াকে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকা যায় না। একটি নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন প্রভাব ফেলে গোটা রিজিওনে। এই দিকটি লক্ষ্য রেখে কিছু অতীত ইতিহাস আসলেও সেই ইতিহাসটি সংক্ষেপে এমনভাবে লেখার চেষ্টা করেছি যে, সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটি পড়ে মনে হবে আমি যেন সম্পূর্ণ ইতিহাসটিই পড়ে ফেলেছি। একইভাবে সেই অতীত ইতিহাস কীভাবে আজকের একুশ শতকে এসে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করে দিচ্ছে সেটাও দেখানোর চেষ্টা করেছি। তবে এই বইটি পড়াকালীন আপনার মাথায় হঠাৎ কিছু প্রশ্ন জাগবে, যেগুলোর উত্তর আপনি তাৎক্ষণিক পাবেন না, তবে পুরো বইটি পড়ার পর আশা করি আপনার কাছে প্রতিটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে।
বইয়ে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচুর ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেছি। কেননা কিছু ইংরেজি শব্দের বাংলা করলে সেটির তাৎপর্য ঠিক থাকে না। যেমন- 'Populism' এর বাংলা করলে দাঁড়ায় 'লোকরঞ্জনবাদ'। এখন পপুলিজমের দ্বারা আসলে যেটি বোঝায় লোকরঞ্জনবাদ দিয়ে কিন্তু সেটির অন্তর্নিহিত ভাব ফুটে ওঠে না। একই ভাবে 'Constructivism' পরিভাষাটি দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যা বোঝায় এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে 'গঠনবাদ' দ্বারা সেই বিষয় ফুটে ওঠে না। তাছাড়াও ইংরেজি পরিভাষা ব্যবহার করে একটি বিষয়ের বাস্তব চিত্রটি সহজে তুলে ধরা যায়। কোনো একটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা গেলেও আমি চেষ্টা করেছি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়গুলো দেখার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ শুধু অতীতের ইতিহাস চর্চা করা নয় বরং সমসাময়িক বিশ্বে কী ঘটছে তা ব্যাখ্যা করতে শিখে। আফ্রিকা-সহ পৃথিবীর অনেক দেশেই দীর্ঘদিন ধরে একই সরকার ক্ষমতায় থাকলেও থাইল্যান্ডে কেন দুই বছর পরপর রেজিম পরিবর্তন হচ্ছে সেটি ব্যাখ্যা করা শিখতে হবে। নতুন এই বিশ্বব্যবস্থায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে- সমসাময়িক এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা শিখতে হবে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ব্যাখ্যায় আমাদেরকে যদি থুসিডাইডিসের কাছেও যেতে হয় তখন আমরা প্রয়োজনে থুসিডাইডিসের কাছেও যাব। তাই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি সহজে বুঝতে এবং ব্যাখ্যা করা শিখতে যে পদ্ধতিগুলো রয়েছে এই বইয়ে সেগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
শুধু একটি বইয়ে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির আদ্যোপান্ত সবকিছু বর্ণনা করা কোনো লেখকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই আমি সবকিছু বিস্তারিত আলোচনা করতে না পারলেও গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয় আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই বইয়ে যে-সকল বিষয়বস্তু (Contents) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তন্মধ্যে কিছু বিষয় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তাই পাঠকদের সুবিধার্থে এই বিষয়গুলোর সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা সাপ্লিমেন্ট আকারে প্রকাশ করার চেষ্টা করব। এই বইটি পড়াকালীন পাঠকের মনে আরেকটি প্রশ্ন উদয় হতে পারে যে, প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র কেন বারবার উঠে এসেছে। উত্তরটি হচ্ছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নয়া বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের একক হেজিমন। তাই প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে আজকের একুশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত বৈশ্বিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি বিষয়ের সাথেই যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গাঅঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি বোঝা সম্ভব নয়।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নকালে সম্মানিত শিক্ষকদের থেকে যা শিখেছি তারই কিছুটা প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে এই বইয়ে। তাই তাদের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ। আমার ছাত্র জীবনে যে-সকল শিক্ষকদের প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি ও পাঠদান আমাকে সমৃদ্ধ করেছে তাদের প্রতিও অনেক বেশি কৃতজ্ঞতা। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ছোট ভাই তামিম মুনতাসিরের প্রতি, যার অক্লান্ত পরিশ্রম এই বইটিকে আরও সমৃদ্ধ ও সহজবোধ্য করেছে। আমার যে-সকল কাছের বন্ধুরা বইটি লিখতে সবসময় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল তাদের প্রতি রইল নিরন্তর ভালোবাসা। আমাদের সকলের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। একই ভাবে আমাদের জ্ঞান অর্জনের উৎসসমূহ ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় আমাদের চিন্তার ধরনও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই এই বইয়ে উল্লেখিত সকল মতামত এবং মূল্যায়নের সাথে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি নাও মিলতে পারে। তবে আমার জায়গা থেকে লিখিত প্রতিটি বিষয়কে পর্যাপ্ত তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তবে আমিও ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নই। যদি এই বইতে কোনো ধরনের টি আপনাদের চোখে পড়ে তা অবগত করলে কৃতজ্ঞ থাকব।
📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যত কথা
Theme: The Means to Success in Global Politics
“The matter of international relations is very subtle and exquisite.” - Vladimir Zhirinovsky
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কী? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর আচরণ (Behaviour) ব্যাখ্যা করা। দূরপ্রাচ্যের একটি দেশ উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছে এই বলে যে, পিয়ংইয়ং থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করে সরাসরি ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলা চালাতে আমি সক্ষম। এখন প্রশ্ন হলো কেন উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এরকম আচরণ করছে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাজ হচ্ছে উত্তর কোরিয়া কেন এরকম আচরণ করছে সেটার ব্যাখ্যা করা। প্রথম আরব দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ইরাক। অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা প্রত্যক্ষভাবে বিরোধিতা করে। কিন্তু প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশ সেই আমেরিকার হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন বাংলাদেশ আমেরিকার হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল? একই ভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পর যে দেশটি বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করে সেটি হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক দশক পার না হতেই বাংলাদেশ থেকে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। বাংলাদেশের এরকম আচরণ করার পেছনে কারণ কি? বাংলাদেশের এই আচরণটি বিশ্লেষণ করাই হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাজ। ফ্রান্সকে বাদ দিয়ে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র এই তিনটি দেশ একত্রিত হয়ে 'AUKUS' নামে একটি জোট গঠন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রগুলো তাদের কোন স্বার্থকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়েছে? তাই রাষ্ট্রগুলোর সামষ্টিক আচরণ ব্যাখ্যা করাই হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাজ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলতে মূলত রাষ্ট্রগুলোর আচরণ, দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক ও সংস্থাগুলোর সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করাকে বোঝায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি সাব-ডিসিপ্লিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যয়ন শুরু হয়। কিন্তু তার আগেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছিলেন 'ফাদার অব সাইন্টিফিক হিস্ট্রি' হিসেবে পরিচিত থুসিডাইডিস। এনশিয়েন্ট পিরিয়ডে নগররাষ্ট্র স্পার্টা ও এথেন্সের মধ্যে পেলোপনেনসিয়ান যুদ্ধ হয়। কেন দুটি রাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল সেটির ব্যাখ্যা করেছিলেন থুসিডাইডিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশ্বব্যবস্থা, রাষ্ট্রের আচরণ, ফরেইন পলিসি ইত্যাদি ব্যাখ্যা করার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন থিওরি ও টার্ম নিয়ে আসেন। ফলশ্রুতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বহুমাত্রিকতা পায়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি (International Politics)
'International Politics' পরিভাষাটির মধ্যে ‘Politics' শব্দটি রয়েছে। তার মানে বিষয়টি একটু জটিল। Politics শব্দটি যেখানে বসবাস করে তার প্রতিবেশি হিসেবে Ability, Power, Security, Interests, Dominance ইত্যাদি শব্দগুলোও বসবাস করে। বিষয়টি একটু জটিল হওয়ায় ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তত্ত্বগতভাবে একটি রাষ্ট্রকে কখন আমরা শক্তিশালী বলব? একটি রাষ্ট্রের নিম্নোক্ত চারটি সক্ষমতা থাকলে আমরা তাকে Powerful State বা শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
1. Extractive Capability: এটি দ্বারা মূলত একটি রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য যে পরিমাণ সম্পদ (Resources) প্রয়োজন সেটা সংগ্রহ করার মতো সক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে কি না সেটি বোঝায়। তথা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেই 'Extractive Capability' বলা হয়।
2. Regulative Capability: একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গোষ্ঠী থাকে, দল-উপদল থাকে, স্বার্থান্বেষী গ্রুপ থাকে ও টেরোরিস্ট থাকে। এসব গোষ্ঠীগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতাই Regulative Capability। অভ্যন্তরীণ সহিংসতা (Violence) থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে সক্ষমতা। তথা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সামরিক সক্ষমতাকে বোঝাচ্ছি।
3. Distributive Capability: একটি রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য তার সম্পদের সুষম বণ্টন প্রয়োজন। রাষ্ট্র হিসেবে নাগরিকদের মাঝে সম্পদের সুষম বণ্টনের যে সক্ষমতা সেই সক্ষমতাকেই Distributive Capability বলে। যেমন- ধনীদের থেকে কর আরোপ করে সেগুলো সমাজে পুনর্বণ্টন (Redistribution) করা, রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। রাষ্ট্রের সক্ষমতা তখনই বৃদ্ধি পাবে যখন রাষ্ট্রের সম্পদ কোনোরকম দুর্নীতি ও আত্মসাৎ ছাড়াই বণ্টন করা সম্ভব হবে। তথা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।
4. Symbolic Capability: একটি রাষ্ট্রকে তখনই শক্তিশালী বলা যায় যখন সে রাষ্ট্রটি তার প্রতি জনগণের ভালোবাসা, একাত্মতা, ভক্তি ও দেশপ্রেম জাগ্রত করতে পারে। জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের এই আস্থা অর্জনের সক্ষমতাই হচ্ছে Symbolic capability। এটা আসলে কিছুটা 'National Integrity' এর মতোই। রাষ্ট্র যদি তার জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে না পারে তাহলে সেটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়।
উপরিউক্ত চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে আপনি পরীক্ষা করতে পারবেন একটি রাষ্ট্র আসলেই শক্তিশালী কি না। এই চারটি সক্ষমতা যদি কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে একসাথে বিরাজ করে তাহলে আমরা বলতে পারি সেই রাষ্ট্রটি অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী। এই অভ্যন্তরীণ শক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজে লাগিয়ে জাতীয় স্বার্থ উদ্ধার করাই আন্তর্জাতিক রাজনীতি। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের শক্তিমত্তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রয়োগ করার নামই আন্তর্জাতিক রাজনীতি (International Politics)। তথা এই অভ্যন্তরীণ শক্তিমত্তাকে ব্যবহার করে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করা, অন্য রাষ্ট্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা, বৈশ্বিক সম্পদের উপর নিজের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী আইন তৈরি করা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা ইত্যাদি বিষয়গুলোকেই বলা হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আশাকরি International Relations ও International Politics এই দুইটি বিষয় এখন পরিষ্কার।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি (Power)
'Power' বা 'শক্তি' একটি বহুমাত্রিক ধারণা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এটিকে দুইভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রথমত, শক্তি কেন্দ্রীভূত করার দৃষ্টিকোণ থেকে। শক্তির কেন্দ্রীভূতকরণকে অন্যভাবে Power Block বা Polarity বা ক্ষমতার মেরুকরণও বলা যায়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে শক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগের দিক থেকে। যেমন- বিশ্বব্যবস্থায় Soft Power, Hard Power ও Smart Power এর ব্যবহার। শক্তি কেন্দ্রীভূত করা এবং শক্তির ব্যবহার উপরিউক্ত এই দুটি বিষয় এখন আমরা উদাহরণ-সহ আলোচনা করার চেষ্টা করব।
1. Polarity / Power Blocks (মেরুকরণ)
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শক্তি বলতে ক্ষমতার মেরুকরণকে (Polarity) বোঝায়। ক্ষমতার মেরুকরণকে আমরা তিনটি ব্লকে ভাগ করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ:
* Unipolarity (একমেরু বিশ্ব): এমন বিশ্বব্যবস্থা যেখানে একটি মাত্র রাষ্ট্র রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ এমন বিশ্বব্যবস্থা যেখানে শুধু একটি রাষ্ট্রই শক্তিশালী আর তার প্রতিযোগী কেউ নেই। যেমন- স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তি ছিল। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত Unipolar বা একমেরু থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন আরেকটি পরাশক্তির উদ্ভব না হয়। তাই ১৯৯০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের একক পরাশক্তি (Hegemon)। তার প্রতিযোগী কেউ ছিল না। তাই ওই একমেরু বিশ্বব্যবস্থাটিকে পরিভাষা হিসেবে 'American Primacy'ও বলা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উইলিয়াম ওলফর্থের মতে, বিশ্বে শুধু একটি পরাশক্তি থাকলে বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকে। কারণ তার কোনো প্রতিযোগী না থাকায় যুদ্ধ বাঁধে না। আর এই প্রেক্ষাপট থেকেই পরবর্তীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Robert Gilpin ও Stephen Krasner হাজির হন 'Hegemonic Stability Theory' নিয়ে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো বিশ্বে যখন শুধু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকবে তখন বিশ্বব্যবস্থাটি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের একক পরাশক্তি নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। উইলিয়াম ওলফর্থের অন্যতম সমালোচক মন্টেরিও এর মতে, পুরো বিশ্বব্যবস্থা যখন একটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে তখন পরাশক্তি ঐ রাষ্ট্রটি নিজ স্বার্থের জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কারণ তাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। যেমন- স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৯০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ত্রিশ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছরই বিশ্বের নানা জায়গায় যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তাই বৈশ্বিক Power বা ক্ষমতা শুধু একটি রাষ্ট্রের হাতে থাকা বিশ্বব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
* Bipolarity (দ্বিমেরু বিশ্ব): এমন বিশ্বব্যবস্থা যেখানে শুধু দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরো বিশ্বের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাছাড়া অষ্টাদশ শতাব্দীতেও দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থা ছিল। ১৭৫৪ থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেন এবং ফ্রান্স গোটা বিশ্বের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছিল。
* Multipolarity (বহুমেরু বিশ্ব): বিশ্বব্যবস্থাটি যখন দুয়ের অধিক রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে তখন সেটিকে বহুমেরু বিশ্ব বলা হয়। যেমন- বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বের রাজনীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকেন্দ্রিক নয়। বর্তমানে চীন, ভারত, সৌদি, তুরস্ক, ব্রাজিল-সহ অনেকগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। হ্যান্স জে মরগেনথাউ এর মতে, বিশ্বব্যবস্থা যখন দয়ের অধিক রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে তখন সেটা বেশি স্থিতিশীল (Stable) হবে।
এবার শক্তির দ্বিতীয় বিশ্লেষণটি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
2. The degree of uses (শক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগের মাত্রা)
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন রকমের শক্তি (Power) বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করে থাকে। সময়ের প্রয়োজনে এবং পরিস্থিতি বুঝে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্র তার শক্তি প্রয়োগ করে। নিচে ব্যবহারের দিক থেকে তিন ধরনের শক্তি উল্লেখ করা হলো।
* Hard Power: বর্তমানের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে 'Game of Power Politics' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মানে হলো, কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, কে কাকে নিজের দখলে নেবে এবং কীভাবে অন্যকে কথা শুনতে বাধ্য করাবে এসবের খেলা। তাই পৃথিবীতে যে রাষ্ট্রগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অধিক শক্তিশালী, তারা তুলনামূলক কম শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। শক্তিশালী দেশগুলো কর্তৃক দুর্বল দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এবং তাদের উপর নানা প্রকার বাণিজ্যিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করা, যুদ্ধের হুমকি দেওয়া অথবা সামরিকভাবে প্রভাব বিস্তার করাকেই 'Hard power' বলা হয়। এভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে কিংবা মিলিটারি আক্রমণ করে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টাকে বলা হয় 'Hard Power Diplomacy'। এই হার্ড পাওয়ার ডিপ্লোমেসির দুইটি কার্যকরী পদ্ধতি রয়েছে:
✓ পদ্ধতি-০১: মিলিটারি আক্রমণ, যুদ্ধের ঘোষণা ও ড্রোন হামলা। উদাহরণস্বরূপ: এক. ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ইউক্রেনের 'ক্রিমিয়া অঞ্চলটি' রাশিয়ার জন্য খুবই প্রয়োজন। তাই রাশিয়া তার মিলিটারি শক্তি ব্যবহার করে ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছে। আর এটাই Hard power এর উদাহরণ। দুই. ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি কেউই যুক্তরাষ্ট্রের কথা মতো চলত না। তাই তাদেরকে উৎখাত করতে যুক্তরাষ্ট্রের একযোগে ড্রোন ও মিলিটারি হামলাই হচ্ছে Hard Power এর উদাহরণ।
✓ পদ্ধতি-০২: হার্ড পাওয়ারের দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে আমদানিকৃত পণ্যের উপর ট্যারিফ বা ব্যাবসাবাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ। উদাহরণস্বরূপ: বর্তমান সময়ে ইরান, কিউবা, উত্তর কোরিয়া ও ভেনেজুয়েলা এসব রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য হওয়ার কারণে এই রাষ্ট্রগুলোকে 'Rogue State' বা 'অবাধ্য রাষ্ট্র' বলা হয়। তাই অবাধ্য রাষ্ট্রগুলোকে নিজের বশে আনতে এই রাষ্ট্রগুলোর উপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ হলো Hard Power এর উদাহরণ。
* Soft Power: এবার আসি Soft Power নিয়ে। এই সফট পাওয়ারের মানে হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের বলয়ে নিয়ে আসতে কূটনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করা। ছোট রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে তাদেরকে নিজের বলয়ে নিয়ে আসা, ছোট রাষ্ট্রগুলোর চলমান সমস্যা সমাধান করা ইত্যাদির মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করাকেই 'Soft Power Diplomacy' বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই সর্বপ্রথম এই Soft power এর ধারণাটি দিয়েছিলেন। জোসেফ নাই এর মতে, একটি রাষ্ট্রকে নিজের বলয়ে ও পক্ষে নিয়ে আসতে Hard Power বা মিলিটারি ক্ষমতা প্রদর্শন করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। যেমন- লিবিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে হার্ড পাওয়ার ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রগুলোকে বেশিদিন নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। তাই একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘসময়ের জন্য নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে প্রয়োজন কূটনীতি। তাই একটি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে অথবা সেই রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলে এবং সেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসলে, সেই রাষ্ট্রটি এমনিতেই শক্তিশালী রাষ্ট্রটির অনুগত থাকবে। যেমন- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ও জার্মানি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য। কিন্তু যুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানকে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে ও জাপানের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নিজের হাতে নেয়। ফলস্বরূপ জাপান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ভালো বন্ধু। একই ভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানিকেও যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছিল। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো 'Soft Power Diplomacy' ব্যবহার করা। হুমকি দিয়ে, অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে এবং ড্রোন হামলা করে একটি রাষ্ট্রকে বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। তাই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো সফট পাওয়ার ব্যবহার করা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিগত কয়েকবছরের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে সফট পাওয়ার এর নতুন আরেকটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। সেটি হলো আমেরিকা এখন বিভিন্ন দেশের সরকার পরিবর্তনের জন্য নতুন নীতি অবলম্বন করছে। যেসব দেশে আমেরিকাপন্থি সরকার নেই সেসব দেশে এখন আর আগের মতো সরাসরি সামরিক শক্তি (Military Interventions) ব্যবহার করে না যুক্তরাষ্ট্র। বরং ওখানকার সরকার পরিবর্তনের জন্য ঐসব দেশের সরকার বিরোধীদেরকে বিভিন্ন সহযোগিতার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে। উদাহরণস্বরূপ: ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার নিকোলাস মাদুরো রাশিয়াপন্থি। তাই রাশিয়াপন্থি এই সরকারকে হটানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী দলের নেতা হুয়ান গুয়াইদুকে সহযোগিতা করছে। হংকং এর যারা Pro Democrats, তথা যারা শি জিনপিং এর বিরোধী তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্র কিউবাতে কখনো সরকার বিরোধী আন্দোলন হলে সেখানে আমেরিকা আন্দোলনকারীদেরকে নানা ভাবে উসকানি দিচ্ছে। একই ভাবে ইরানে যখন সরকার বিরোধী আন্দোলন হয় তখন মার্কিন রাজনীতিবিদরা ফেসবুক কিংবা টুইটারে সরাসরি বিরোধীদের সমর্থন করে পোস্ট দেয়। সাম্প্রতিক কালে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী নানা বক্তব্যের কারণে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকেও ক্ষমতা হারাতে হয়েছে。
* Smart Power: Hard Power এবং Soft Power উভয়ের মিশ্রণ হলো Smart Power। একটি রাষ্ট্রকে নিজের বশে আনতে সেই রাষ্ট্রকে একসাথে অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়া, মিলিটারি হুমকি দেওয়া, কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা, ড্রোন হামলা করা ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়া, এই সবগুলোর সমন্বয়কে বলা হয় 'Smart Power Diplomacy'। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার উপর এই Smart Power ব্যবহার করছে। অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে Soft Power এবং Hard Power এই দুটিকে একসাথে ব্যবহার করার নামই Smart Power।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি: কেন বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি 'Soft Power'?
বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি নিয়ে আলোচনার সময় অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্সে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠে সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশের কূটনীতির বড় শক্তি কী? উত্তর হিসেবে সবার প্রথমে আসে এই কথাটি, “Diplomatic strength of Bangladesh lies in its promotion of soft power"। প্রশ্ন হতে পারে- কেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য Soft Power কে প্রমোট করার পরামর্শ দিচ্ছেন? উত্তরটা স্বাভাবিক। প্রথমত, একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অতটা শক্তিশালী নয়। তাই যে রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের কথা শুনে না, সেই রাষ্ট্রকে শাস্তি হিসেবে অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হওয়ার কারণেই আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারছি না। একই ভাবে প্রযুক্তি এবং মিলিটারি দিক থেকেও আমরা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারের উপর সামরিকভাবে আক্রমণ করাটাও আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এককথায়, শুরুর দিকের আলোচনায় Hard power এর যে দুইটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছিলাম (অর্থনৈতিক অবরোধ ও মিলিটারি হামলা) তার কোনোটাই বাংলাদেশের পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
একই ভাবে আমরা দেখেছি 'Smart Power' হলো Hard Power এবং Soft Power উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত। স্মার্ট পাওয়ার এর অন্যতম শর্ত হলো একটি দেশকে সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে শক্তিশালী হতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ উভয় দিক থেকে শক্তিশালী না হওয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে Smart Power এর ব্যবহারও করতে পারছে না। তাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তির প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে 'Soft Power' এর ব্যবহার। এই সফট পাওয়ার ব্যবহার করেই বাংলাদেশকে বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নতি করতে হয়। আর সফট পাওয়ার এর মূল শক্তি হচ্ছে কূটনৈতিকভাবে দক্ষ হওয়া। Hard Power এবং Smart Power না থাকা সত্ত্বেও একটি রাষ্ট্র যদি তার কূটনীতিতে অনেক চতুর বা দক্ষ হয় তাহলে পরোক্ষভাবে Hard power এবং Smart Power উভয়কেই ব্যবহার করা যায়। যেমন- সফট পাওয়ার ব্যবহার করে এবং কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোকে বুঝিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাতিসংঘের মাধ্যমে মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়া। কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে রাশিয়া ও চায়নার সাথে একটি সমঝোতায় গিয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করা। কূটনৈতিক শক্তিমত্তা দিয়ে রাশিয়াকে বোঝাতে হবে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার জন্য মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশ কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চায়নাকেও বোঝাতে হবে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেন বাংলাদেশকেও চীনের প্রয়োজন। চীন, রাশিয়াসহ ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে বাংলাদেশ কনভিন্স করতে পারবে কিনা সেটা নির্ভর করছে বাংলাদেশ সফট পাওয়ারের ব্যবহারে কতটা দক্ষ এবং কূটনৈতিকভাবে কতটা প্রফেশনাল। তাই এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশ কীভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে পারে? তখন উত্তর হচ্ছে একটিই, 'Soft Power' ব্যবহার করে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ঢাকা মূলত সফট পাওয়ারের দিকেই বিশেষ জোর দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ (National Interest)
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং মৌলিক ধারণা। জাতীয় স্বার্থ বলতে অনেক সময় রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বোঝানো হয়ে থাকে। অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরিতে এবং রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে জাতীয় স্বার্থ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এটা ফরেইন পলিসির অন্যতম নির্ধারকও বটে। আজকের দুনিয়ায় যত কিছু ঘটছে যেমন- দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ, চুক্তি, জোট গঠন, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ, প্রতিটি ধারণার পেছনে জাতীয় স্বার্থ সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করে। তাই প্রতিটি রাষ্ট্র তার ফরেইন পলিসি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে প্রথমে বিবেচনা করে। তত্ত্বগতভাবে জাতীয় স্বার্থকে দুভাবে বিশ্লেষণ করা যায়।
১. প্রধান স্বার্থ (Core interests): এমন সব স্বার্থ যা রক্ষার্থে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনে সংঘাতে লিপ্ত হতে হয়। তথা যে-সকল স্বার্থ সম্পর্কে রাষ্ট্র বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেও রাজি নয়। যেমন- রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে রক্ষা করা, সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করা ইত্যাদি। প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট সীমানাকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে যুদ্ধেও লিপ্ত হয়। প্রথমত, এই ধরনের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা বলতে বোঝায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কোনো একটি ভূখণ্ড নিয়ে যাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ডাক না আসে। এজন্য রাষ্ট্রকে সবসময় কঠোরতার সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ: ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ 'মিন্দানাও দ্বীপটি' স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করলে ফিলিপাইন সেটা দমন করে। মিয়ানমারের কারেন বিদ্রোহীরা 'কারেন প্রদেশটি' স্বাধীন করার জন্য আন্দোলন শুরু করলে মিয়ানমার সরকার সেটা দমন করে। তামিলরা শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাংশ নিয়ে একটি স্বাধীন 'তামিল রাষ্ট্র' গঠনের আন্দোলন করলে শ্রীলঙ্কা সরকার সেটা দমন করে। তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে কুর্দিরা একটি 'স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র' বা 'কুর্দিস্থান' গঠনের আন্দোলন চালাচ্ছে। তুরস্ক-সহ বাকি রাষ্ট্রগুলো তাদেরকে কঠোরহস্তে দমন করছে। স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় 'কাতালোনিয়া' রাজ্যটি স্বাধীনতার জন্য গণভোট আয়োজন করলে স্পেন সেটাকে অবৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছে। ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের শিখ জনগোষ্ঠী সেখানে "স্বাধীন খালিস্তান" রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন চালাচ্ছে, দিল্লি সেটিকে কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা জাতীয় স্বার্থের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। দ্বিতীয়ত, আরেকটি অন্যতম জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে অন্য কোনো রাষ্ট্র যেন আমার ভূখণ্ড দখল করে না নেয়। উদাহরণস্বরূপ কাশ্মীরের কথাও বলা যায়। কাশ্মীর ভূখণ্ডটি ভারত ও পাকিস্তান নিজের বলে দাবি করছে। কাশ্মীরকে উভয়ের জাতীয় স্বার্থ মনে করা হচ্ছে। তাই কাশ্মীরের দখল রাখা নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছে। ফকল্যান্ড দ্বীপ দখল নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। একই ভাবে হংকং ও তাইওয়ান প্রশ্নে চীন অটুট। সংঘাতে লিপ্ত হয়ে হলেও চীন তার তাইওয়ান ভূখণ্ড মেইনল্যান্ডের অধীনে রাখতে চায়। ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো দক্ষিণ চীন সাগর দখল নিয়ে চীনের সাথে সংঘাতে লিপ্ত। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে রক্ষা করাই হচ্ছে অন্যতম জাতীয় স্বার্থ।
২. গৌণ স্বার্থ (Peripheral interests): কিছু জাতীয় স্বার্থ রয়েছে যেখানে রাষ্ট্র সংঘাত এড়াতে প্রয়োজনে ছাড় দিতেও রাজি থাকে। 'Core interests' এর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম রাষ্ট্র কিছুতেই ছাড় দিতে রাজি নয়; কিন্তু 'Peripheral Interests' এর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কিছু কিছু বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করে। যেমন- অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামরিক স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ ইত্যাদি। কূটনৈতিক অঙ্গনে এসব স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্র সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। ধরা যাক বাংলাদেশ যখন জাতিসংঘের কোনো সাধারণ পরিষদে যোগ দেয় তখন বাংলাদেশের উদ্দেশ্য থাকে কীভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করা যায় সেটার তৎপরতা চালানো। অর্থাৎ জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করা হলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ। এখন জাতিসংঘ যদি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী না হয় বাংলাদেশ কিন্তু জাতিসংঘের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। বাংলাদেশ যেটা করতে পারে সেটা হলো চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। একই ভাবে চীনের প্রেসিডেন্ট যখন বাংলাদেশে সফরে আসে তখন তার জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে বাংলাদেশে কীভাবে আরও বেশি চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায় এবং কীভাবে বাংলাদেশকে ভারতের বলয় থেকে বের করে চীনমুখী করা যায় সেটার প্রচেষ্টা চালানো। এখন চীনকে যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে না দেওয়া হয়, চীন কিন্তু বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না। চীন যেটা করতে পারে সেটা হলো তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে বাংলাদেশকে কনভিন্স করা। Core Interest এর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যেমন সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হতেও রাজি থাকে Peripheral Interest এর ক্ষেত্রে তেমনটি নয়।
জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি:
"We pay a price when special interests win out over the collective national interest". -Chris Christie
প্রশ্ন হচ্ছে- একটি রাষ্ট্রের ফরেইন পলিসি কারা প্রণয়ন করে? সাধারণত যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে। এখন সেই পররাষ্ট্রনীতি যদি রাষ্ট্রের বা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি হয় তখন জনগণ সরকারের গৃহীত পররাষ্ট্রনীতিটি সংশোধন বা পরিবর্তন করার জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে এবং অনেকক্ষেত্রে সরকারকে জন আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়। সুতরাং জাতীয় স্বার্থ বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভাববাদীদের (Idealist theorists) মতে, রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নকালে নিজ দেশের জাতীয় ঐতিহ্য, মতাদর্শ ও মূল্যবোধকে সবসময় অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু বাস্তববাদী তাত্ত্বিকদের (Realist theorists) মতে, ঐতিহ্য, মতাদর্শ ও মূল্যবোধকে বিবেচনা না করে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা উচিত। কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এসব মতাদর্শ ওইভাবে কাজ করে না। বাস্তববাদীদের মতে, পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করা হয় শুধু নিজের লাভ ও স্বার্থকে কেন্দ্র করে। তাই এখানে মতাদর্শের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। উদাহরণস্বরূপ: আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো জাতীয় মূল্যবোধ ও নিজেদের আদর্শকে ভুলে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে এবং তারা ইসরায়েলেকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সৌদির সাথে ইসরায়েলের বর্তমানে ভালো সম্পর্ক এবং আগামী কয়েকবছরের মধ্যে হয়তোবা সৌদি আরবও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। অথচ ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সৌদি আরবের ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়া ইসলামি মতাদর্শের সাথে যায় না। সৌদি আরব-সহ অনেক আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে বর্তমানে সম্পর্ক নরমালাইজেশনের পথে হাঁটছে। 'The Arab-Israeli Normalization' এই পরিভাষাটি দ্বারা মূলত আরব দেশগুলো কর্তৃক ঐতিহাসিকভাবে অবৈধ রাষ্ট্র মনে করা ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াকে বোঝায়। অনেক বিশ্লেষকদের মতে, যে ইসরায়েল প্রতিনিয়ত প্যালেস্টাইনে বোমা হামলা চালায়, ফিলিস্তিনিদের বসতি উচ্ছেদ করে, সেই ইসরায়েলের সাথে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক স্থাপন করা তাদের ঐতিহ্য, আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থি। তাই বাস্তববাদীদের মতে, আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের আদর্শের চেয়ে বর্তমান প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই ভাবে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পাকিস্তান ও তুরস্ক উইঘুরদের উপর চীনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে বরাবরই চুপ থাকার চেষ্টা করে। কারণ রাষ্ট্রগুলো এমন কোনো পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে চাচ্ছে না যাতে করে চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়। তাই বাস্তববাদীদের মতে, বর্তমান বিশ্বে আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তে রাষ্ট্রের স্বার্থকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, অতীতে ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে খুব বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল তা নয়, এখনো মাঝে মাঝে কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক জটিল ও তিক্ত হয়ে ওঠে। যেমন- মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একসময় তার নির্বাচনি প্রচারণা ওয়েবসাইটে ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার পুনর্বহাল, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিসও ভারতের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু ভারত তার জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেমন কোনো আওয়াজ তুলেনি। প্রশ্ন হতে পারে, ভারত কেন এসব ইস্যুতে চুপ থেকেছে? কারণ এর পেছনে রয়েছে জাতীয় স্বার্থ। চীনকে মোকাবিলা করতে এবং আর্থিক কারণে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন। যেমন- World Bank অথবা IMF থেকে ভারত যদি প্রয়োজনমতো ঋণ না পায় তাহলে ভারতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হতে চায় না ভারত। তারা চায় যতকিছুই হোক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার। আমেরিকার ভারতের প্রতি সমালোচনা অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভারতকে হজম করতে হয়। মাঝে মাঝে হালকা প্রতিবাদ করলেও জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় সেটা কখনো তীব্রতর আকার ধারণ করে না। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ব্যাপারে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
মূল্যায়ন:
১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় চীন জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যপদ তথা নিরাপত্তা পরিষদে 'veto power' লাভ করেছিল। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় চীন সেই ভেটো পাওয়ারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে। চীন সর্বপ্রথম যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করেছিল সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ (১৯৭২)। কিছু জাতীয় স্বার্থ থাকে যেগুলো স্বতন্ত্র হলেও অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু যে রাষ্ট্রটির উপর নির্ভর করতে হয় সে রাষ্ট্রটি হয়তোবা আমার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী নয়। তা সত্ত্বেও তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। 'The People's Republic of China' হিসেবে চীনের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৯ সালের পহেলা অক্টোবর। মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনে তখন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। পুঁজিবাদের ধারক যুক্তরাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক চীনকে স্বীকৃতি দেয়নি। দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের এতটাই অবনতি ঘটেছিল যে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি চীনের মাটিতে পা রাখেনি। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও কানাডার কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুধাবন করল যে, চীনের সাথে বাণিজ্য করে অন্য রাষ্ট্রগুলো উপকৃত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রসর হন জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে। চীনের জাতীয় স্বার্থ হলো মার্কিন পুঁজি গ্রহণ করে দ্রুত উন্নতি সাধন করা, অপরদিকে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ হলো চীনের বিশাল বাজার দখল করা। তাই উভয়ের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং সম্পর্ক উন্নয়নে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি টেবিল টেনিস (পিংপং) খেলার আয়োজন করে। খেলার মধ্য দিয়ে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেটাকে “পিংপং ডিপ্লোমেসি” (Ping-Pong Diplomacy) বলা হয়। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে স্বীকৃতি দেয় এবং চীনের উপর বিশ বছর ধরে চলমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। চীন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্য পদের মর্যাদা পায়। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্র অনেক সময় যুগান্তকারী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে।
Question to think about?
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কারণে ইসরায়েলকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কি তার আদর্শের কথা বিবেচনা করে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে নিজেকে বিরত রাখবে নাকি বাস্তবতা মেনে নিয়ে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দেবে? অর্থাৎ আদর্শভিত্তিক (Ideological) পররাষ্ট্রনীতি হবে নাকি প্রয়োজনভিত্তিক (Realistic)?
সহায়ক গ্রন্থাবলি
1. Barnett, Michael and Duvall, Raymond (2005), Power in International Politics, Cambridge University
2. Wilson, Ernest J (2008), Hard Power, Soft Power, Smart Power, The Annals of the American Academy of Political and Social Science
3. Nye, Joseph S. (2003), Propaganda Isn't the Way: Soft Power, International Herald Tribune
4. Wohlforth, William (2009), World Out of Balance: International Relations and the Challenge of American Primacy, Cambridge University Press
5. Finnemore, Martha (1996), National Interests in International Society, Cornell University Press
6. Almond, Gabriel and Powell, Bingham G. (1996), Comparative Politics: A Developmental Approach, Boston
7. Krasner, Stephen D. (1978), Defending the National Interest: Raw Materials Investments and U.S. Foreign Policy, Princeton University Press
📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্র এবং অ-রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড
Theme: Rethinking and Redesigning the Idea of State
"A state is a polity that maintains a monopoly on the legitimate use of violence." - Max Weber
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবক কারা? কাদের কথায় বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়? বিশ্ব জনমত গঠনে কারা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে? আমরা যদি বিশ্ব রাজনীতির অংশীজন (Stakeholders) বিশ্লেষণ করি তাহলে প্রথমে আসে ১৯৫টি স্বাধীন রাষ্ট্র। যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল নির্ধারক। তাই বিশ্ব রাজনীতিতে এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোকে বলা হয় State Actor বা রাষ্ট্রীয় কর্মক। বিশ্ব রাজনীতিতে শুধু রাষ্ট্রগুলোই প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এমনটি কখনোই নয়। আজকের একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে মঙ্গোলিয়া, চাদ, বতসোয়ানা, নামিবিয়া এগুলো বিশাল ভূখণ্ডের রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও এরা বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছে না। জীবনে কোনদিন মঙ্গোলিয়াকে পত্রিকার হেড লাইনে দেখবেন না। কিন্তু স্পেসএক্স-এর (SpaceX) সিইও এলন মাস্ক প্রতিদিন নিউজফিডের হেডিং পয়েন্টে থাকে। তার মানে রাষ্ট্র ছাড়াও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশ্ব রাজনীতিতে ম্যাটার করে। মার্ক জাকারবার্গ মাত্র কয়েকঘণ্টা ফেসবুকের সার্ভার ডাউন করে রাখলে বিশ্বের অনলাইন বাণিজ্যে বিশাল প্রভাব পড়ে। প্রেস ব্রিফিংয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যখন কোকাকোলার বোতল সরিয়ে পানির বোতল হাতে নেয়, তখন শেয়ার বাজারে ধ্বস নামে। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে যে পরিমাণ রিজার্ভ আছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সম্পদ রয়েছে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সিইও ওয়ারেন বাফেটের হাতে। আজকে আমরা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর নাম না জানলেও সুইডিস এক্টিভিস্ট ও জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গকে ঠিকই চিনি। একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে অনেক বিদেশি নাগরিকদের কাছে বাংলাদেশের অতটা জনপ্রিয়তা না থাকলেও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ফজলে হাসান আবেদ এবং একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে ঠিকই অনেকে চিনে। তার মানে বিশ্ব রাজনীতিতে শুধু রাষ্ট্রই নয় ব্যক্তিরাও ম্যাটার করে। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবাধীন এসব ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ইত্যাদিকে বলা হয় Non-State Actor বা অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক। এই অধ্যায়ে রাষ্ট্রীয় কর্মক হিসেবে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, প্রকারভেদ ও অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা করার চেষ্টা করব।
State (রাষ্ট্র)
অনেকে রাষ্ট্রকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করে যে, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটা তো রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নয় বরং এগুলো রাষ্ট্র গঠনের উপাদান হিসেবে বিবেচিত। তাহলে রাষ্ট্র বলতে আসলে কী বোঝায়? রাষ্ট্র শব্দটি একবচন হলেও এর ভিতরে রয়েছে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক, সিভিল সোসাইটি ও প্রেশার গ্রুপ ইত্যাদি। এজন্য রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমদিকে রাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত রাষ্ট্রকে একেকজন একেকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে থাকে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে যে, তারা বলেছে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত জনসমাজকে রাষ্ট্র বলে। অর্থনীতিবিদরা আবার তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করে। তাদের মতে সোসাইটিতে যে সম্পদ বা Resources রয়েছে সেগুলো সুষমভাবে বণ্টন করা এবং সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের কাজ। তখন বিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনস্থির করলেন, রাষ্ট্রকে তো এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না, একেক জন এসে একেকভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। তাই রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ডেফিনিশন নিরূপণ করা প্রয়োজন। তখন মরটন ক্যাপলান, হার্বাট স্পিরো, গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড, রবার্ট ডাল, ডেভিড ইস্টন, হেরল্ড ল্যাসওয়েল প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এগিয়ে আসেন এবং রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেন。
গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড ও রবার্ট ডাল 'State' শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে 'Political System' শব্দটি ব্যবহার করেন। মানবদেহ হচ্ছে একটি সিস্টেম, যেখানে মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গ পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উপর ভিত্তি করে কাজ করে। সৌরমণ্ডল হচ্ছে একটি সিস্টেম, যেখানে বিভিন্ন উপাদান পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ। একই ভাবে রাষ্ট্রও হচ্ছে একটি সিস্টেম। নতুন কোনো ইনপুট (Input) যখন কোনো সিস্টেমের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন সেই সিস্টেম প্রভাবিত হয়। ফলশ্রুতিতে তখন সিস্টেম থেকে একটি আউটপুট (Output) বের হয়, যা সমাজ ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। ধরুন রাষ্ট্র হচ্ছে একটি সিস্টেম। এখন জনগণের দাবিগুলো (Demands) সিস্টেমের ভিতরে ইনপুট হিসেবে দিলাম। আমাদের দাবি হচ্ছে চাকরির পরীক্ষায় কোনো কোটা থাকবে না। আমাদের এই দাবিগুলো সিস্টেমের ভিতরে গিয়ে সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। প্রভাবিত হয়ে সিস্টেম সিদ্ধান্ত নিল আগামী বছর থেকে সরকারি চাকরিতে কোনো কোটা থাকবে না। আমাদের ইনপুট ছিল কোটা বাতিল হওয়ার দাবি, আমাদের দেওয়া ইনপুটে প্রভাবিত হয়ে সিস্টেম আমাদেরকে আউটপুট হিসেবে দিল আগামী বছর থেকে কোটা বাতিল। এখন সিস্টেমের দেওয়া এই আউটপুট পরিবেশ ও সমাজকে প্রভাবিত করবে। সিস্টেম থেকে বের হওয়া আউটপুট দেখে একদল খুশি হবে, আরেকদল আবার কোটা বহাল রাখার জন্য আন্দোলন শুরু করবে। আন্দোলনরত মানুষগুলো কোটা বহাল রাখার দাবিটা পুনরায় ইনপুট হিসেবে সিস্টেমে দেবে, তখন সিস্টেম প্রভাবিত হয়ে নতুন আরেকটি আউটপুট দেবে। অর্থাৎ এভাবে প্রতিটি বিষয় ইনপুট হয়ে সিস্টেমে প্রবেশ করে, সিস্টেম তাতে প্রভাবিত হয়ে আউটপুট দেয়, আউটপুট থেকে সোসাইটি আবার প্রভাবিত হয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও রাষ্ট্র একটি সিস্টেম। সংঘাতপূর্ণ ও বহুমেরু বিশ্বায়ন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা, চীন-রাশিয়ার আগ্রহ, ভারতের স্বার্থ এগুলো ইনপুট হিসেবে সিস্টেমে প্রবেশ করলে সিস্টেম প্রভাবিত হয়। আউটপুট হিসেবে সিস্টেম ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের কোয়াডে নয় আমি বরং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ দেব। তখন সিস্টেমের দেওয়া এই আউটপুট বিশ্ব রাজনীতির পরিবেশকে প্রভাবিত করে। চীন খুশি হয়, আমেরিকা বিরাগভাজন হয়। আমেরিকার বিরাগভাজনে সিস্টেম পুনরায় প্রভাবিত হয়, নতুন করে আবার আউটপুট দেয়। এভাবে সিস্টেম চলতে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র হচ্ছে একটি সিস্টেম। ডেভিড ইস্টনের System Theory এর মূল কথা এটাই।
এটা ছাড়াও রাষ্ট্রের আরেকটি সুন্দর এবং প্রায়োগিক সংজ্ঞা রয়েছে জার্মান দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েবারের। তার মতে রাষ্ট্র হচ্ছে এমন একটি শাসনব্যবস্থা (Polity), যা সহিংসতার বৈধ ব্যবহারের উপর একচেটিয়া অধিকার রাখে (Monopoly on Violence)। রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে যে-কোনো ধরনের সহিংসতাকে দমন করার একচেটিয়া ও বৈধ অধিকার রাখে। ওয়েবারের মতে, রাষ্ট্র নিজে যে সহিংসতা সৃষ্টি করে সেটা বৈধ (legitimate)। পুলিশ যখন সন্ত্রাসবাদ দমনে বন্দুক যুদ্ধে লিপ্ত হয়, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সেটা বৈধ। মাদক দমনে র্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) যখন ক্রসফায়ারে লিপ্ত হয়, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সেটা বৈধ মনে করা হয়। দেশের সীমানা রক্ষার্থে মিলিটারিরা যখন যুদ্ধে লিপ্ত হয়, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সেটা বৈধ। একজন খুনের আসামিকে বিচারক যখন ফাঁসিতে ঝুলান, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সেটাও বৈধ। কিন্তু আমি-আপনি একজনকে ফায়ার করে মেরে ফেললে, কারো উপর গুলি চালালে, কাউকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলে সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ভিন্ন। র্যাবের ক্রসফায়ারে দশজন মাদক ব্যবসায়ী মারা গেলেও রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে র্যাব খুনি নয়, বরং র্যাব যা করেছে সেটা বৈধ। তাই ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, রাষ্ট্র হচ্ছে এমন একটি সিস্টেম বা পদ্ধতি যা সহিংসতার বৈধ ব্যবহারের উপর একচেটিয়া অধিকার রাখে।
রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য
রাষ্ট্র ও সরকার এই দুটো শব্দ অনেক ক্ষেত্রে সমার্থক হলেও উভয়ের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। একসময় এই দুটো শব্দ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যেমন ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই বলেছিলেন, "আমিই রাষ্ট্র” ('I am the state')। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবস তার লেভিয়াথান (Leviathan) গ্রন্থেও রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখাননি। আজকের একুশ শতকে এসেও যে রাষ্ট্রগুলোতে একনায়কতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী, কর্তৃত্ববাদী অথবা টোটালিটারিয়ান সরকার ক্ষমতায় রয়েছে সে রাষ্ট্রগুলোতে সরকার ও রাষ্ট্র এই দুইটি শব্দের পার্থক্য করা যায় না। কেননা স্বৈরাচারী শাসকরা নিজেকে রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেন, শাসকের বিরোধিতা করলে তারা সেটাকে রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সহজেই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করা যায়। কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য উল্লেখ করা হলো:
1. Natural: রাষ্ট্র একটি তত্ত্বগত ও বিমূর্ত ধারণা (Abstract)। রাষ্ট্রকে আমরা চোখে দেখি না। কিন্তু যে মানুষগুলো নিয়ে সরকার গঠিত সেই মানুষগুলোকে আমরা দেখতে পারি (Concrete)। প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, আমলা এদেরকে আমরা দেখি। কিন্তু রাষ্ট্রকে মানচিত্রে ও পতাকাতে আমরা কল্পনা করতে পারি। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, নীতিমালা ও কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ সরকার রাষ্ট্রের এজেন্ট হয়ে কাজ করে এবং সরকার রাষ্ট্রকে বিদেশে প্রতিনিধিত্ব করে。
2. Ideological: যেমন প্রতিটি রাষ্ট্রের কিছু স্বতন্ত্র মতাদর্শ থাকে। সংবিধানের যে মূলনীতি সেগুলো হলো রাষ্ট্রের আদর্শ। কিন্তু সরকারের আদর্শ ভিন্ন হতে পারে। সরকারের কাজ General Will বা রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করা। সরকার সঠিকভাবে কাজ না করলে তার বিরোধিতা করা যায় কিন্তু রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা যায় না। আর রাষ্ট্রের বিরোধিতার মানে হচ্ছে রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে নতুন রাষ্ট্র তৈরি করার চেষ্টা অথবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা। তাই সরকারবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী শব্দ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে।
3. Numerical: প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড রয়েছে। সেই ভূখণ্ডের সকল অধিবাসী রাষ্ট্রের সদস্য। অন্যদিকে সরকার হলো সমগ্র রাষ্ট্রের জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে গঠিত প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান। সরকারবিহীন রাষ্ট্র নৈরাজ্যময় (Anarchy), সরকার আইনকানুন তৈরি করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
4. Lasting: প্রতি নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তন হয় কিন্তু রাষ্ট্র পরিবর্তন হয় না। আজ যে সরকার ক্ষমতায় আছে কাল সেই সরকার নাও থাকতে পারে। সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের নয়। সরকার চিরস্থায়ী নয় কিন্তু রাষ্ট্র চিরস্থায়ী। আগে রাষ্ট্র তারপর সরকার। কারণ রাষ্ট্র ছাড়া সরকার কোথা থেকে আসবে?
5. Structural: ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব এই চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। ছোট-বড়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল রাষ্ট্রের এই চারটি উপাদান থাকে। কিন্তু একেক রাষ্ট্রের সরকার একেকরকম। কোথাও গণতান্ত্রিক, কোথা সমাজতান্ত্রিক, কোথাও প্রধানমন্ত্রী শাসিত, কোথাও প্রেসিডেন্ট শাসিত। সরকার হলো রাষ্ট্রের চারটি উপাদানের একটি উপাদান মাত্র। অর্থাৎ, "A state is like a ship, and a government is like the crew who runs the ship."
রাষ্ট্রের প্রকারভেদ (Types of State)
একটি রাষ্ট্রকে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে বিভিন্নভাবে চরিত্রায়ন করা যায়। রাষ্ট্র একইসাথে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে। নিচে কিছু রাষ্ট্রের প্রকারভেদ বর্ণনা করা হলো।
Status Quo States: "Status quo” একটি ল্যাটিন শব্দ, অর্থ স্থিতিশীলতা বা বর্তমানে আমার যা আছে সেটি ধরে রাখা। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হচ্ছে প্রথম। প্রযুক্তির দিক থেকে সে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, মিলিটারির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র সবার উপরে, বিশ্বের সর্বাধিক মিলিটারি ঘাঁটি তার, পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যাও সবার তুলনায় বেশি, কূটনৈতিক অঙ্গনেও তার দাপুটে বিচরণ, এমনকি বিশ্ববাণিজ্যের চালিকাশক্তি মার্কিন ডলার। তাই বর্তমানে পুরো বিশ্ব জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য রয়েছে তা ধরে রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যুক্তরাষ্ট্রের এই হেজেমনিক অবস্থানটা ধরে রাখার ইচ্ছেকেই "maintenance of the status quo" বলা হয়। বর্তমান একুশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক দাপট, তা ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে পারবে কিনা সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের বড় চিন্তা। তাই কূটনৈতিক ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয় "Status Quo State" বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোও তাদের Status quo বজায় রাখার ব্যাপারে অনেক সোচ্চার।
Revisionist State: অপরদিকে দেখুন চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান, ভারত ও ব্রাজিল এরা নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট না। এই রাষ্ট্রগুলোর সাম্প্রতিক সময়ের কার্যকলাপের দিকে খেয়াল করলে দেখবেন যে, এরা নিজেদের আধিপত্য জানান দেওয়ার জন্য অনেক বেশি উচ্চাবিলাসী হয়ে উঠেছে। উত্তর কোরিয়া ব্যতীত এরা সবাই কিন্তু ব্রিকস জোটের অংশ। বর্তমান সময়ে পশ্চিমা বা ন্যাটো জোটের তুলনায় এই রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্যবাদের মনোভাব বা Quest for Geopolitical Dominance অনেক বেশি। তাই এদেরকে Revisionist State বলা হয়। উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাপারটি আরও বেশি পরিষ্কার করার চেষ্টা করছি। যেমন-চীন একটি উচ্চাবিলাসী রাষ্ট্র। বর্তমানে কূটনৈতিক অঙ্গনে আপন শক্তিমত্তা নিয়ে চীন সন্তুষ্ট না। কূটনৈতিক অঙ্গনে সে বর্তমানের তুলনায় আরোও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এজন্য সে "উলফ ওয়ারিয়র" ডিপ্লোমেসির মতো আগ্রাসী কূটনীতি গ্রহণ করেছে। ভ্যাকসিন ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বের করে চীনের অধীনে নিয়ে আসার চেষ্টাও করেছে। চীন তার বর্তমান অর্থনৈতিক শক্তি নিয়েও সন্তুষ্ট না। তার লক্ষ্য বিশ্বের সর্বপ্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হওয়া। এজন্য সে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার নামে ছোট ছোট দেশগুলোকে “Debt Trap” এ ফেলে দিচ্ছে। এমনকি চীন তার বর্তমান টেরিটোরি বা ভৌগোলিক আয়তন নিয়েও সন্তুষ্ট না। তার আরও বেশি জায়গা চাই, আরও বেশি ভূমি চাই। তাই যেকোনো উপায়ে তাইওয়ানের দখলে নিতে হবে, হংকংকে বশে রাখতে হবে, পুরো দক্ষিণ চীন সাগরজুড়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আপন কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ। সামরিক শক্তিতে চীন তুষ্ট নয়, বরং এতটাই উচ্চাবিলাসী যে, যুক্তরাষ্ট্রকেও টেক্কা দিতে চায়। তাই তার নতুন চমক- 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প', যা এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার নির্ভুল ছক। এককথায় চীনের চাওয়া হলো, বর্তমান দুনিয়ার মোড়ল আমেরিকাকে পেছনে ফেলা এবং আগামীর পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্যের মালিক হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের জায়গাটি চীন দখল করে নিতে চাচ্ছে। চীনের লক্ষ্য, একবিংশ শতাব্দীর নতুন পরাশক্তি হওয়া, ঠিক বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র যেমন ছিলো। তাই চীনকে বলা হয় Revisionist State। অর্থাৎ 'রিভিশনিস্ট স্টেট' এর মানে হচ্ছে, বর্তমান অবস্থানকে ছাপিয়ে পরাশক্তি হওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা। বর্তমানে আমার যা আছে তা দিয়ে চলবে না বরং আমার আরও বেশি নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স চাই, আরও সুপারসনিক মিসাইল চাই। আর Status Quo States এর মানে হচ্ছে, আমার বর্তমানে যা আছে সেটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা এবং সেটাকেই ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা।
De Jure State (আইনি বা বৈধ রাষ্ট্র):
মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে আমাদেরকে বুঝতে হবে De Jure এবং De facto আইন কী জিনিস। ল্যাটিন শব্দ 'De Jure' এর মানে হলো আইনের দৃষ্টিতে বৈধতা এবং সেটা মেনে চলা আবশ্যক। অন্যদিকে 'De Facto' এর অর্থ হচ্ছে এমন কিছু বিষয় যেটা আইনে উল্লেখ নেই কিন্তু বাস্তব জীবনে সবাইকে মেনে চলতে হয়। যেমন: চুরি করা যাবে না, ঘুষ খাওয়া যাবে না ও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো মেনে চলা সবার জন্য আবশ্যক। কারণ এগুলো আইনে বলা আছে এবং তা প্রতিটি দেশের সংবিধানে অথবা লিখিত আকারে উল্লেখ থাকে। তাই আইন হিসেবে মানুষ এগুলো মানতে বাধ্য। যে-কারণে এসব আইনকে বলা হয় De jure Law বা প্রকৃত আইন। অপরদিকে পিতামাতাকে শ্রদ্ধা করতে হবে, ছোটদের স্নেহ করতে হবে, ক্লাসে শিক্ষক প্রবেশ করলে ছাত্রদের দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হবে ইত্যাদি নিয়ম পৃথিবীর কোনো দেশের সংবিধানে বা লিখিত আকারে লেখা থাকে না। পিতামাতাকে সম্মান করা, বড়দের শ্রদ্ধা করা এসব বিষয় কোনো দেশের সংবিধানে লেখা না থাকলেও কিংবা কোনো দেশের আইনে উল্লেখ না থাকলেও মানুষ সাধারণত এসব মেনে চলে। এই যে আইনে নাই, সংবিধানেও নাই কিন্তু সমাজের প্রথা হিসেবে ও ঐতিহ্যগত কারণে আমাদেরকে এসব মেনে চলতে হচ্ছে। তাই এসবকে বলা হয় De Facto law বা কার্যত আইন। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি De Facto আইন রয়েছে যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাজ্যে অসংখ্য আইন রয়েছে, অসংখ্য বিধিমালা রয়েছে যেগুলো যুক্তরাজ্যের সংবিধানে অথবা লিখিত আকারে কোথাও লেখা নেই। কিন্তু মানুষকে সেই আইন মান্য করতে বাধ্য করা হয় তাদের প্রথা, ট্র্যাডিশন, ঐতিহ্য, ভ্যালুজ এর কারণে।
এবার আসি এই পরিভাষাগুলো রাষ্ট্রকে চরিত্রায়ন করতে কীভাবে ব্যবহৃত হয় তা নিয়ে। স্বাধীন হওয়ার পূর্বে সকল দেশকে De facto state বলা হয় এবং স্বাধীন হওয়ার পরে দেশগুলোকে De jure state বলা হয়। রাষ্ট্রের দিক থেকে বললে যেমন ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র ও বৈধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাই বর্তমানে বাংলাদেশ হচ্ছে একটি De Jure State। স্বাধীনতার পূর্বে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের আগে বাংলাদেশ ছিল একটি De Facto State। এখন প্রশ্ন হতে পারে আইনের দৃষ্টিতে একটি রাষ্ট্র বৈধ নাকি অবৈধ সেটা কীভাবে পরিমাপ করব? সেটা পরিমাপের অন্যতম মাধ্যম হলো পৃথিবীর অন্যসব স্বাধীন রাষ্ট্র এই রাষ্ট্রটিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি (Recognition) দিচ্ছে কি না। যদি অন্যরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে সেটা অফিশিয়ালি বৈধ রাষ্ট্র। তাই পৃথিবীতে যে ১৯৫টা স্বাধীন রাষ্ট্র রয়েছে সবগুলো De jure state বা বৈধ রাষ্ট্র। এখন মনে করুন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট, কেএনএফসহ কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোকে ঘোষণা করল এগুলো বাংলাদেশের অংশ না বরং তারা একটি স্বাধীন ও আলাদা রাষ্ট্র। এখন চট্টগ্রাম কি তাহলে De Jure বা বৈধ রাষ্ট্র? উত্তর হলো না, কারণ চট্টগ্রামকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর কোনো দেশ স্বীকৃতি দেবে না, যেহেতু চট্টগ্রাম বাংলাদেশেরই একটি অংশ। একই ভাবে মনে করুন ভারতের অঙ্গরাজ্য আসামের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ঘোষণা করল আসাম আর ভারতের সাথে থাকবে না, তারা ভারত থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। তাই বলে কি আসাম এখন একটি বৈধ ও স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেল? উত্তর কখনোই না। কারণ আসাম ভারতের একটি অংশ তাই পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র আসামকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। কিন্তু যদি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কিংবা ভারতের আসাম সত্যিকার ভাবে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করতে সক্ষম হয় এবং বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে চট্টগ্রাম ও আসামও De Jure State বা বৈধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে যাবে। যেমন বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের পূর্বে বৈধ রাষ্ট্র ছিল না, কারণ তখন পাকিস্তানের অংশ ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের অংশ নয়। কারণ বাংলাদেশ চূড়ান্ত ভাবে স্বাধীন হয়ে গিয়েছে।
De Facto States (কার্যত রাষ্ট্র):
De facto রাষ্ট্র হচ্ছে সেসকল রাষ্ট্র যারা আইনগতভাবে বৈধ না হলেও তাদের অস্তিত্বও অস্বীকার করা যায় না। যেমন- ফিলিস্তিন, তাইওয়ান ও সোমালিল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন না হলেও এগুলোকে আপনি রাষ্ট্র হিসেবে একেবারে অস্বীকার করতে পারবেন না। কারণ শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া একটি বৈধ রাষ্ট্র হওয়ার জন্য যে-সকল উপাদান প্রয়োজন সবগুলোই তাদের মধ্যে বিরাজমান। তাই ফিলিস্তিন, তাইওয়ান ও সোমালিল্যান্ড De Facto রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। (উল্লেখ্য, সোমালিল্যান্ড হলো একটি স্বঘোষিত রাষ্ট্র, যা কি না পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার একটি অংশ)। সোমালিল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই স্বতন্ত্র ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ঠিক যেমটি বর্তমানে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে হচ্ছে। তাইওয়ান চীনের অংশ হলেও এর রয়েছে আলাদা শাসনব্যবস্থা। তবে তাইওয়ান যদি ভবিষ্যতে কখনো যুদ্ধ করার মাধ্যমে চীন থেকে স্বাধীন হতে পারে এবং অন্য রাষ্ট্রগুলো তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তখন তাইওয়ান পরিণত হবে De Jure State বা বৈধ রাষ্ট্রে।
De Facto Leader এবং De Jure Leader:
একটি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আইনগত শাসক (De Jure Leader)। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্যতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে হটিয়ে সেখানে তাদের তাঁবেদারি সরকার বসায় তখন সেই তাঁবেদারি সরকারকে বলা হয় De Facto Leader। অর্থাৎ এমন শাসক যার আইনগত বৈধতা নেই তবে তার একটি অবস্থান রয়েছে। যেমন- ভেনেজুয়েলার মূল সরকার হচ্ছে নিকোলাস মাদুরো কিন্তু সেখানে বিরোধী দলের নেতা হোয়ান গুয়াইদু নিজেকে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট দাবি করেছে। তাই নিকোলাস মাদুরো হচ্ছে Du Jure Leader, আর হুয়ান গুয়াইদু হচ্ছে De Facto Leader। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে কেউ যদি নিজেকে স্বঘোষিত সরকার দাবি করে তখন তাকে De facto leader বলা হয়।
ব্যর্থ রাষ্ট্র ও ভঙ্গুর রাষ্ট্র এর মধ্যে পার্থক্য:
ব্যর্থ রাষ্ট্রকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Failed State'। ব্যর্থ রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে দেশের সম্পূর্ণ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে নেই। রাষ্ট্রের কিছু অংশ যদি বিদ্রোহী বা বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে সেটাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে। যেমন- সিরিয়াকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলা হয়। সিরিয়ার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে বাশার আল আসাদ সরকার, কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে বিদ্রোহীরা, কিছু অঞ্চল আবার তুরস্ক ও রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত। তাই সিরিয়া একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র (Failed State)। অন্যদিকে ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Fragile State'। যে দেশের সরকার তার দেশের জনগণের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা ও অধিকারগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, যে দেশের জনগণ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে, যে দেশ অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত, যে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক দুর্বল, যে দেশে বিদ্রোহী ও জঙ্গি গোষ্ঠীরা সক্রিয়; এই সকল দেশকে বলা হয় ভঙ্গুর রাষ্ট্র। কেননা দরিদ্রতা, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের কারণে দেশগুলো যে- কোনো সময় ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
Fragile State Index: সাধারণত পৃথিবীতে যে সকল ভঙ্গুর রাষ্ট্র রয়েছে সেগুলোকে নিয়ে 'Fragile State Index' গঠিত হয়। সেই ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র হলো- (ক) ভঙ্গুর রাষ্ট্রের তালিকায় প্রথম অবস্থানে আছে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দেশ ইয়েমেন। (খ) দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আল শাবাব সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এবং হর্ন অব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া। (গ) চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে আরব বসন্তের কারণে পতন না হওয়া একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের সিরিয়া। (ঘ) পঞ্চম অবস্থানে আছে আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত দেশ ডি আর কঙ্গো। আসলে 'Fragile State' ও 'Failed State' এর কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। একেকজন একেকভাবে এটাকে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ আবার মনে করেন, ব্যর্থ ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
Satellite State- পোষ্য রাষ্ট্র:
রাজনীতি বিজ্ঞানে বহুল আলোচিত একটি পরিভাষা। বর্তমান পৃথিবীতে এমন অসংখ্য রাষ্ট্র রয়েছে যে রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ছোট। ছোট ও দুর্বল হওয়ার কারণে এই রাষ্ট্রগুলো তার প্রতিবেশি বৃহৎ রাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্র দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই এই রাষ্ট্রগুলোকে বলা হয় পোষ্য রাষ্ট্র বা স্যাটেলাইট স্টেট। আরেকটু সহজ করে বললে কোনো বৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবাধীন অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রই হলো স্যাটেলাইট স্টেট। নিচে স্যাটেলাইট স্টেট এর কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি:
1. এশিয়া: অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভুটান ও মালদ্বীপ হলো ভারতের স্যাটেলাইট স্টেট। তাদের মতে, ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি দ্বারা এই দুইটি দেশ অনেক প্রভাবিত।
2. আফ্রিকা: এসওয়াতিনি ও লেসেথো এই দুইটি রাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতি ও অর্থনীতির দ্বারা অনেক প্রভাবিত। তাই এরা দক্ষিণ আফ্রিকার পোষ্য রাষ্ট্র।
3. ইউরোপ: যথাক্রমে ভ্যাটিক্যান সিটি ইতালির এবং এ্যান্ডোরা ফ্রান্সের স্যাটেলাইট স্টেট।
4. ল্যাটিন আমেরিকা: দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানা রাষ্ট্রটি ভেনেজুয়েলার এবং সুরিনাম রাষ্ট্রটি ব্রাজিলের পোষ্য রাষ্ট্র।
5. ওশেনিয়া: পাপুয়া নিউগিনি ও নাউরু এই দুইটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ অস্ট্রেলিয়ার উপর নির্ভরশীল। তাই নাউরু ও পাপুয়া নিউগিনি হলো অস্ট্রেলিয়ার স্যাটেলাইট স্টেট।
Nanny state (গায়ে পড়া রাষ্ট্র):
জনগণ কীভাবে চলবে এবং তাদের আচরণ কী হওয়া উচিত নাগরিকদের এসব ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও যদি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে তাহলে সেই রাষ্ট্রকে 'ন্যানি স্টেট' বা 'গায়ে পড়া রাষ্ট্র' বলা হয়। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। যেমন ধরুন প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পর সিগারেট খাওয়া, এলকোহলে আসক্ত হওয়া, অ্যাডাল্ট ম্যাগাজিন প্রকাশ করা ইত্যাদি আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো অপরাধ (Crimes) নয়। কেউ যদি ইন্টারনেটে অ্যাডাল্ট ভিডিও দেখে রাষ্ট্র কিন্তু তাকে শাস্তি দিতে পারে না। কিন্তু জনকল্যাণ বিবেচনা করে রাষ্ট্র যদি নাগরিকদেরকে এসব ক্ষতিকর বস্তু থেকে বিরত রাখতে কোনো পলিসি গ্রহণ করে অথবা রাষ্ট্র যদি এসব বিষয়ে নাগরিকদেরকে নানা উপদেশ দিয়ে থাকে তাহলে সেই ধরনের রাষ্ট্র 'ন্যানি স্টেট' এর আওতায় পড়ে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক:
প্রথমত, বাংলাদেশ তার প্রতি অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি করছে। সিগারেট এর উপর মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কও হচ্ছে। মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে মূলত সিগারেট খাওয়াকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমনকি পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেইমও নিষিদ্ধ হয়েছে। তাই অনেকে মনে করছে, বাংলাদেশও আস্তে আস্তে ন্যানি স্টেটে পরিণত হচ্ছে।
চতুর্থত, ফিনল্যান্ডের কথাই বলা যাক। ফিনল্যান্ডে একটি শিশুর জন্মগ্রহণের আগ থেকেই তার দায়িত্ব নিয়ে নেয় সে দেশের সরকার। তাই ফিনল্যান্ডকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় ন্যানি স্টেট বলা হয়।
পঞ্চমত, এই ন্যানি স্টেট এর আইডিয়াটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে ইদানীং প্রচুর বিতর্ক হচ্ছে। সেদেশে এটিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। অস্ট্রেলিয়ার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে সরকারের উচিত হবে না নাগরিকদের ব্যক্তিগত পছন্দে হস্তক্ষেপ করা। তাদের মতে সিগারেট ও এলকোহল নাগরিকদের জন্য ভালো নাকি মন্দ এটা তো নাগরিকরাই ভালো জানে। যার ইচ্ছে সে ড্রিংক করবে, আর যার জন্য ক্ষতিকর মনে হবে সে নিজ থেকেই তা পরিহার করবে। তাই তাদের মতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের এসব ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা কাম্য নয়।
Deep State (রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র):
১. অননুমোদিত ব্যক্তিতের দ্বারা গঠিত 'ডিপ স্টেট': প্রশ্ন হলো একটি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে? কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা পলিসি কারা প্রণয়ন করবে? সরল উত্তর হচ্ছে রাষ্ট্রের সরকার। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তাদের মাধ্যমেই দেশ পরিচালিত হবে এবং তারাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করবে। কিন্তু দেখা যায় সরকার আসলে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না। অনেক সময় কিছু গোপন শক্তিশালী গোষ্ঠী সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সরকারকে তাদের কথা মেনে চলতে বাধ্য করে। সরকারের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকার এই বাহ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না। এরা রাষ্ট্র কাঠামোর অভ্যন্তরীণ অংশীজন না হলেও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। ওই সিক্রেট গোষ্ঠীগুলোকে বলা হয় 'ডিপ স্টেট'。
২. অনুমোদিত ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত 'ডিপ স্টেট': অনেক সময় জাতীয় প্রতিরক্ষা, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ এবং অর্থ বিভাগের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে 'ডিপ স্টেট' গঠিত হয়। তারা কোনো একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে। রাষ্ট্রে সরকার থাকলেও এরাই মূলত সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্র কীভাবে চলবে। সরকারকেও তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই গ্রুপের কথামতো চলতে হয়। সরকার এদের কাছে অসহায়। এই ডিপ স্টেট এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের রাজনীতি মূলত নির্ভর করে সেনাবাহিনীর উপর। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে টিকে থাকতে হয় এই সেনাবাহিনীদের কৃপায়। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, আমলা, বিচারক-সহ যারাই মিলিটারিদের বিরাগভাজন হয়েছে তাদেরকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দেই। ২০২২ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যে অনাস্থা ভোটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন, সেটি মূলত উত্থাপন করা হয়েছিল সাবেক সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়ার নির্দেশনায়। কারণ ইমরান খানের পিটিআই সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত একটি প্রশাসন এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ফলে পর্দার আড়ালের আদালত এবং সেনাবাহিনীর চাপে অবসান হলো ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রিত্ব। মিয়ানমারও এই ডিপ স্টেট এর অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য, এখানে রাষ্ট্রে আগে থেকেই একটি 'ডিপ স্টেট' থাকে। সরকার আসার পর এদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
আবার অনেক সময় দেখা যায় স্বৈরাচারী শাসক নিজেই নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য নতুন করে একটি সিক্রেট ডিপ স্টেট তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তার অনুসারীদের বসায়। গণ আন্দোলন ও বিক্ষোভ দমনেও ডিপ স্টেটকে ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকাতে কেনিয়া, উগান্ডা, মোজাম্বিক, তানজানিয়া ইত্যাদি দেশের স্বৈরশাসকরা একটি সিক্রেট ডিপ স্টেট তৈরি করে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সেনাবাহিনীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। সেনাবাহিনীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ এবং লাভজনক পদে বসান। পরবর্তীতে তাদের সমর্থন নিয়ে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করেন। মিশরেও আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসিকে ক্ষমতায় বসানোও এই ডিপ স্টেটের ফসল।
Narco State (নিকৃষ্ট রাষ্ট্র):
নারকো স্টেট হলো এমন একটি রাষ্ট্র যে দেশের সরকার দুর্নীতিপরায়ণ এবং সেই দেশের সরকার বা শাসক শ্রেণি ড্রাগ কার্টেল বা মাদক পাচারকারীদের সহযোগিতায় অবৈধ মাদক বাণিজ্যের সাথে সরাসরি জড়িত। অর্থাৎ মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় যে সরকার টিকে থাকে তাকে নারকো স্টেট বলা হয়। যেমন- ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া। কলম্বিয়ার অনেক প্রভাবশালী নেতাদের ড্রাগ কার্টেলদের সাথে গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে মেক্সিকো ও হন্ডুরাসকেও এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
Banana Republic (ব্যানানা রিপাবলিক):
ব্যানানা রিপাবলিক বলতে এমন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে বোঝায় যেটি রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল এবং যার অর্থনীতি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এই রাষ্ট্রগুলো সাধারণত বড় বড় বিদেশি কর্পোরেশনগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রথমত, ব্যানানা রিপাবলিক রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি কোনো একটি নির্দিষ্ট ফলের উপরেও হতে পারে। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে হন্ডুরাস, গুয়েতেমালা, কোস্টারিকা ও পানামা এই দেশগুলো কলা রপ্তানির উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। তখন আমেরিকার United Fruit Company নামের বড় একটি কর্পোরেশন এই দেশগুলোর রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। তারা এই দেশগুলোতে রেলপথ নির্মাণ ও কৃষিকাজের জন্য করমুক্ত সুবিধাসহ নানা অনৈতিক সুবিধা আদায় করত। যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসলে তারা বেশি সুবিধা পাবে সেই রাজনৈতিক দলকে তারা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করত। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের রাষ্ট্রগুলোর সমাজব্যবস্থা দুই স্তরে বিভক্ত। একদল ধনিক শ্রেণি (Plutocracy) যারা মূলত সেনাবাহিনী, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠিত। অন্যদল হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। সমাজতন্ত্রীদের দাবি বর্তমানে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশই ব্যানানা রিপাবলিকের অন্তর্ভুক্ত।
Rump State:
Rump State একটি রাষ্ট্র যেটি একসময় ভৌগোলিকভাবে অনেক বৃহৎ ছিল। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, অন্য রাষ্ট্র কর্তৃক বেদখল, হেজিমনিক রাষ্ট্র কর্তৃক দখলদারিত্ব, বি-ঔপনিবেশিকায়ন, বিপ্লবের কারণে এখন অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। এমন রাষ্ট্রকে রাজনীতি বিজ্ঞানে Rump State হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন- একসময় অটোমান সাম্রাজ্য অনেক ভূখণ্ডের অধিকারী ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিলে অটোমান সাম্রাজ্যকে ভাগ করে দেয়। ফলশ্রুতিতে ১৯২৩ সালে শুধু তুরস্ক রাষ্ট্রটি অবশিষ্ট থাকে। তাই তুরস্ককে অটোমান সাম্রাজ্যের Rump state বলা হয়। একইভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় আজকের পাকিস্তান হচ্ছে মূল পাকিস্তানের Rump state। চেকোস্লোভাকিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। সোভিয়েত পতনের পর আজকের রাশিয়াও সোভিয়েত ইউনিয়নের Rump state।
Neo patrimonial State:
সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। বিংশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লব এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো আমলাতন্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতেও যখন অতীতের ঐতিহ্যগত শাসন ব্যবস্থার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তখন তাকে Neo patrimonial state বলা হয়। এই ব্যবস্থায় দেখা যায়, একজন সরকারি কর্মকর্তার পজিশন বা পদ যাই হোক না কেন, সে মূলত তার ওপরস্থ কর্মকর্তার বা রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত অনুগত হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং স্বজনপ্রীতিকে (Nepotism) বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। যেমন- বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এই প্রবণতাটি দৃশ্যমান, যেখানে তারা নিজেদেরকে জনগণের সেবকের পরিবর্তে রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে।
Intermediate State (মধ্যবর্তী রাষ্ট্র):
এমন পর্যায়ের রাষ্ট্র যেটি গরিবও না আবার একেবারে উন্নত রাষ্ট্রও না। যে রাষ্ট্রগুলো উদীয়মান এবং মাঝামাঝি পর্যায়ের। যেমন- ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো। এই রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, অনেক শিল্পায়ন হয়েছে, প্রযুক্তিগত উন্নতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ক্রমশ উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি রচিত হয়েছে এমন রাষ্ট্রকে ইন্টারমিডিয়েট স্টেট বলে।
Sovereignty (সার্বভৌমত্ব)
বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রকেই সার্বভৌম রাষ্ট্র (Sovereign State) বলা হয়। একটি রাষ্ট্র আয়তনে ছোট-বড়, আর্থিকভাবে ধনী-গরিব ইত্যাদি যাই হোক না কেন প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্যই সার্বভৌমত্ব সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর এটাকেই বলা হয় "সার্বভৌম সমতা"। সার্বভৌম সমতার মানে হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার সার্বভৌমত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনিভাবে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর কাছে তাদের সার্বভৌমত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ। সার্বভৌমত্বের দুর্বলতার কারণেই আজকের একবিংশ শতাব্দীতে কিছু রাষ্ট্রর ব্যর্থ রাষ্ট্রে, কিছু ভঙ্গুর রাষ্ট্রে, কিছু ডিপ স্টেটে, কিছু ব্যানানা রিপাবলিকে, কিছু আবার স্যাটেলাইট রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাই সার্বভৌমত্ব বলতে আসলে কী বোঝায় সেটা আমরা তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Internal Sovereignty (অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব): সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রকে পরিচালনা করার জন্য যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন তাদেরকে হতে হয় পরম ক্ষমতাবান। তাদের রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। মনে করুন একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী সক্রিয় কিন্তু রাষ্ট্র সেই জঙ্গিগোষ্ঠীকে দমন করতে পারছে না। তার মানে রাষ্ট্র জঙ্গিগোষ্ঠীর থেকে কম শক্তিশালী। এই ধরনের রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে সার্বভৌম না। আরেকটি উদাহরণ দেই। মেক্সিকোর 'সিনালোয়া মাদক কার্টেল' হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় মাদক পাচারকারী চক্র। এই কার্টেলের মাদক সম্রাট ওভিদিও গুজম্যান লোপেজকে ২০১৯ সালে মেক্সিকোর পুলিশ আটক করে। গুজম্যান আটক হয়েছে এই খবর শুনে তার দলের গ্যাং রাস্তায় নেমে নিরাপত্তা বাহিনীকে আক্রমণ করে। মেক্সিকোর নানা জায়গায় প্রকাশ্যে এই গ্যাং সদস্যদের মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র সজ্জিত পিকআপ ও ট্রাক নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। তখন মেক্সিকো সরকার বাধ্য হয় মাদক সম্রাট গুজম্যানকে ছেড়ে দিতে। তার মানে রাষ্ট্রের চেয়েও মাদক ব্যবসায়ীরা বেশি শক্তিশালী। তাই এই রাষ্ট্রটি অভ্যন্তরীণভাবে Sovereign বা সার্বভৌম নয়। তাই একটি রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে সার্বভৌম তখনি বিবেচিত হবে যখন সে সম্পূর্ণ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে, যখন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর থেকে রাষ্ট্র অধিক বেশি শক্তিশালী হবে। রাষ্ট্র সার্বভৌম হিসেবে তখনই বিবেচিত হবে যখন সে মাদক কার্টেল, বিচ্ছিন্নতাবাদী, জঙ্গিগোষ্ঠী, অপরাধ চক্র ইত্যাদির চেয়ে অধিক শক্তিশালী হবে।
2. External Sovereignty (বিদেশিয় সার্বভৌমত্ব): প্রথমত, অন্য রাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রকে হতে হবে অধিক শক্তিশালী। যেমন- সিরিয়ার উত্তর দিকের একটি বিশাল অংশ তুরস্ক নিয়ন্ত্রণ করছে, সিরিয়ার কিছু অঞ্চল আবার রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। তাই সিরিয়া সার্বভৌম রাষ্ট্র না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রকে স্বাধীনভাবে তার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করার সক্ষমতা থাকতে হবে। যদি একটি রাষ্ট্র অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের প্রভাবে তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে তখন রাষ্ট্রটি বাহ্যিকভাবে সার্বভৌম না। ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করার দায়িত্ব এক সময় ভারতের হাতে ছিল। তখন ভুটান সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হতো না। নিজের পররাষ্ট্রনীতি নিজে প্রণয়ন করতে না পারলে তাহলে আমি কীসের সার্বভৌম রাষ্ট্র? বর্তমানে ওশেনিয়া মহাদেশের দেশ নাউরুর পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে অস্ট্রেলিয়া। তাই নাউরুও সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়। সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং ঢাকায় আয়োজিত এক সম্মেলনে বাংলাদেশকে হুমকি দিয়েছেন, বাংলাদেশ যেন কোয়াডে অংশগ্রহণ না করে। তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রত্যুত্তরে বলেছেন, আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশ কার সাথে যোগ দেবে, কোন জোটে অংশগ্রহণ করবে সেটা বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর অন্য রাষ্ট্রের চাপে বা প্রভাবে প্রভাবিত না হয়ে নিজ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এবং স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করার সামর্থ্য থাকতে হবে।
3. Westphalian Sovereignty (ওয়েস্টফেলিয়ান সার্বভৌমত্ব): ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ রোধকল্পে ১৬৪৮ সালে 'Peace of Westphalia' নামে একটি চুক্তি হয়। সেখানে বলা হয় প্রতিটি রাষ্ট্রই সার্বভৌম, একটি রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রে আক্রমণ করতে পারবে না, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভূমি, সম্পদ ও জনগণের উপর সেই রাষ্ট্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকবে। আর এটাই 'Westphalian Sovereignty' হিসেবে পরিচিত। এটা মূলত অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
রাষ্ট্র গঠনের উপাদান হিসেবে সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব:
1. Permanence (চিরস্থায়ী): একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব যতদিন, সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ততদিন। রাজার মৃত্যু হবে, নতুন রাজা আসবে, সরকারের উৎখাত হবে, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হবে কিন্তু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব চিরস্থায়ী। যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পুরো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা এবং স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করার সামর্থ্য রাষ্ট্রের থাকতে হবে। রাজার মৃত্যু কিংবা সরকারের পরিবর্তন সার্বভৌমত্বে কোনো প্রভাব ফেলবে না。
2. Exclusiveness (বিশেষত্ব): একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারে না, রাষ্ট্র হবে একটি। কিছুক্ষণের জন্য মনে করুন, বাংলাদেশের চট্টগ্রামের জেলাগুলো নিজেদেরকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করল, নোয়াখালী বলল আমরাও এখন থেকে একটি আলাদা রাষ্ট্র, সিলেটের জেলাগুলো 'কিংডম অব সিলেট' নামে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের ঘোষণা দিল। তখন বাংলাদেশ আর সার্বভৌম রাষ্ট্র থাকবে না। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র হবে মাত্র একটি, সেটা বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের ভিতরে আবার অনেকগুলো আলাদা আলাদা রাষ্ট্র থাকতে পারে না। আর এটাই সার্বভৌমত্বের বিশেষত্ব।
3. Inalienability (অবিচ্ছেদ্যতা): সার্বভৌমত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রাণ ও আত্মা। মানবদেহ থেকে প্রাণকে আলাদা করলে আমরা যেমন মৃত, তেমনিভাবে রাষ্ট্র থেকে সার্বভৌমত্বকে আলাদা করলে রাষ্ট্রও অস্তিত্বহীন। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব ছাড়া একটি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না।
4. Imprescriptibility (অখণ্ডতা): সার্বভৌমত্ব এটা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, রাষ্ট্রে যতদিন সার্বভৌমত্ব থাকবে ততদিন সে রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হবে。
5. Absoluteness (পরমতা): রাষ্ট্র হবে পরম ক্ষমতাবান। রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখার জন্য ঠিক যতটুকু শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজন ততটুকু শক্তিশালী হওয়া। একটি রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী হলে তাকে শক্তিশালী বলা যায় সেটা আমরা পরিমাপ করতে পারি না। তাই রাষ্ট্রকে এতটাই শক্তিশালী হতে হবে যেন সে অন্তত নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানবিক হস্তক্ষেপ ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন:
কোনো একটি দেশে যখন ব্যাপকহারে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে থাকে, গণহত্যা কিংবা জাতিগত নিধন চলতে থাকে এবং একটি দেশ যদি যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলো এসব বন্ধ করতে এগিয়ে আসে। আর সেটাকেই বলে 'Humanitarian Intervention' বা 'মানবিক হস্তক্ষেপ'। বিশ্ব রাজনীতিতে মানবিক হস্তক্ষেপ এর দুইটি দিক রয়েছে। প্রথমত, একটি রাষ্ট্র তার মিলিটারি শক্তি নিয়ে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর হস্তক্ষেপ করবে এই উদ্দেশ্য মাথায় রেখে যে, হস্তক্ষেপকৃত রাষ্ট্রের মানবাধিকার নিশ্চিত করবে। মনে করুন একটি রাষ্ট্রে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখন সেখানে মানবাধিকার রক্ষার্থে অপর আরেকটি রাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপই মানবিক হস্তক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার রক্ষায় মিলিটারি শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অথবা মানবিক সাহায্য দিয়ে এগিয়ে আসাটাও মানবিক হস্তক্ষেপ হিসেবে পরিচিত। এককথায় মানবিক কারণ বিবেচনায় এবং মানবাধিকার রক্ষায় অন্য রাষ্ট্রের উপর যে হস্তক্ষেপ সেটাই 'মানবিক হস্তক্ষেপ' হিসেবে পরিচিত। কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি:
(ক) Humanitarian Aid: রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে ২০১৭ সালে তুরস্ক বাংলাদেশকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতে মিশর ও তুরস্ক প্যালেস্টাইনে খাবার ও অর্থ পাঠাচ্ছে।
(খ) Military sanctions: মানবাধিকার রক্ষায় একটি রাষ্ট্র যখন অন্য রাষ্ট্রের উপর সামরিক হস্তক্ষেপ চালায় তখন সেটিও মানবিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। যেমন- লিবিয়াতে কথিত মানবাধিকার রক্ষায় ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ চালায়।
(গ) Sport Sanctions: যখন একটি রাষ্ট্র অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তখন তাদের সঙ্গে আয়োজিত খেলাধুলা বর্জন করা। যেমন- ফিলিস্তিনি জনগণের উপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনা ফুটবল টিম ইসরায়েলের সাথে তাদের শিডিউলড খেলা বর্জন করেছিল।
(ঘ) Diplomatic Sanctions: কোনো একটি রাষ্ট্র তার জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে তার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করাটাও মানবিক হস্তক্ষেপ হিসেবে পরিচিত। রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
(ঙ) Economic Sanctions: মানবাধিকার লঙ্ঘিত রাষ্ট্রের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাও মানবিক হস্তক্ষেপ। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের কিউবা ও ভেনেজুয়েলার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
(চ) Smart Sanctions: কোনো রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন মানবাধিকার লঙ্ঘিত করে তখন তার উপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় সেটাও মানবিক হস্তক্ষেপ। মিয়ানমারে ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থান হলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানকার উচ্চপদস্থ সেনাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
উল্লেখ্য, মানবিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বিতর্ক হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। Westphalian Sovereignty অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপ চালাতে পারে না। সেজন্য বলা হচ্ছে এসব হস্তক্ষেপ হতে হবে জাতিসংঘের অধীনে। এসব হস্তক্ষেপ তখনই বৈধতা পাবে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সেটার অনুমতি দেবে। মানবিক হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে "Responsibility to protect" নামে নতুন আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে।
Responsibility to Protect (R2P or RtoP):
অন্য রাষ্ট্রের উপর 'মানবিক হস্তক্ষেপ' করা সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরোধী বলে একটি বিতর্ক শুরু হয়। ২০০১ সালে জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনান এই প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। "if humanitarian intervention is, indeed, an unacceptable assault on sovereignty, how should we respond to a Rwanda, to a Srebrenica - to gross and systematic violations of human rights that affect every precept of our common humanity?” - by Kofi Annan
তখন মানবিক হস্তক্ষেপ নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের নাম ছিল, The International Commission on Intervention and State Sovereignty (ICISS)। কমিশনের সদস্যরা 'Humanitarian Intervention' শব্দটিকে 'Responsibility to protect' দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালান। তারপর ২০০৫ সালে বিশ্ব সামিট হয়। সেখানে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র মানবাধিকার রক্ষায় মানবিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে 'Responsibility to protect' কে স্বীকৃতি দেয়। সেখানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়- গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধন ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। বলা হয় অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, শান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইন মাথায় রেখেই হস্তক্ষেপ করতে হবে। 'Responsibility to protect' এর তিনটি স্তম্ভ রয়েছে।
Pillar I: The protection responsibilities of the state
গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ থেকে নিজ জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের।
Pillar II: International assistance and capacity-building
গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ইত্যাদি থেকে রাষ্ট্র যখন জনগণকে রক্ষা করতে সমস্যায় পড়ে তখন অন্য সকল রাষ্ট্রের উচিত তাকে সহযোগিতা করা।
Pillar III: Timely and decisive collective response
যদি রাষ্ট্র তার নিজ জনগণকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং সেখানে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন চলমান থাকে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে এই রাষ্ট্রের মানবাধিকার রক্ষার্থে মানবিক হস্তক্ষেপ করবে।
Non- State Actors বা অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক
একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এমন কিছু অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক উদাহরণ-সহ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. People's Movement: এমন গণ আন্দোলন যেটা প্রথমদিকে শুধু একটি দেশে শুরু হলেও পরবর্তীতে অনেকগুলো দেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ: ২০১১ সালের আরব বিপ্লব (Arab Spring) তিউনিসিয়াতে শুরু হলেও সেটা গোটা আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। নারীদের উপর যৌন নির্যাতন ও ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর বিরুদ্ধে হ্যাশট্যাগ '#Me Too' আন্দোলন এবং গ্রেটা থুনবার্গের "Fridays for Future (FFF)" আন্দোলন বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
2. Business magnates: যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী তাদেরকে বিজনেস মেগনেট বলা হয়। যেমন- ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস, এলন মাস্ক ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গ। টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইন্টারনেট অফ থিংস, ব্লকচেইন, স্পেসএক্স) আজকের দুনিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
3. Multinational Corporations (MNCs): মাল্টিন্যাশনাল বা বহুজাতিক কোম্পানি হলো এমন একটি কর্পোরেট সংগঠন যেটি তাদের নিজের দেশের বাইরেও এক বা একাধিক দেশে পণ্য ও সেবা উৎপাদন পরিচালনা করে। যেমন- কোকাকোলা, ম্যাকডোনাল্ডস, হুয়াওয়ে, স্যামসাং, নেসলে ইত্যাদি। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
4. Smart contracts: ক্রিপ্টো-কারেন্সি বিটকয়েন। ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ধরনের সাংকেতিক মুদ্রা, যার কোনো বাস্তব রূপ নেই। এর অস্তিত্ব শুধু ইন্টারনেট জগতেই আছে। এর কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান নেই। এটাকে সরাসরি ক্রেতা-বিক্রেতার (পিয়ার-টু-পিয়ার) নেটওয়ার্ক বলে। অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিটকয়েনের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
5. International Media Agencies: আল জাজিরা, সিএনএন, বিবিসি, এএফপি, এপি, রয়টার্স, দি ইকোনমিস্ট, ওয়াশিংটন পোস্ট ইত্যাদি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মিডিয়া এজেন্সি। নিমিষেই সংবাদ বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যাচ্ছে যা পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়।
6. Non-governmental organizations (NGOs): বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও হচ্ছে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যারা অলাভজনকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে। তবে এনজিওগুলো অনেক সময় রাষ্ট্রের সমান্তরাল (Parallel) হয়ে কাজ করে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস স্কটের ভাষায় "A State Without Its Citizens" পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
7. Violent Non-State Actors (VNSA): আইএসএস, আল কায়েদা, বোকো হারাম, আল শাবাব ইত্যাদি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ড্রাগ কার্টেলস, জলদস্যু, আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল গ্যাং এরা সবাই সহিংস অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক।
মূল্যায়ন:
তাছাড়াও চার্চ, পোপ, ধর্মীয় গ্রুপ বৈশ্বিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। গ্রীনপিস, রেড ক্রস, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ম্যাকডোনাল্ডসের বিশ্বব্যাপী উপস্থিতিকে- "McDonaldization", ইন্টারনেটের বিস্তারকে- “Googlization”, হলিউডের দাপটকে- "Hollywoodization", ফেসবুকের একক কর্তৃত্বকে- "Facebookization" ইত্যাদি বলা হচ্ছে। পরাশক্তি দেশগুলো সফট পাওয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো বিশ্বে।
Question to think about?
বলা হচ্ছে, মার্ক জাকারবার্গের মেটাভার্সই হবে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে অনেক দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে আগামীর বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় কর্মকের চেয়ে কি অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে? যদি করে তখন সেই পৃথিবীটি দেখতে কেমন হবে?
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Jessop, Bob (2009), Redesigning the state, reorienting state power, and rethinking state theory.
2. Paris, R. (2020), The Right to Dominate: How Old Ideas About Sovereignty Pose New Challenges for World Order.
3. Pattison, James (2010), Humanitarian Intervention and the Responsibility to Protect: Who Should Intervene?
4. San-Akca, Belgin (2016), States in Disguise: Causes of State Support for Rebel Groups.
5. Warkentin, Craig (2001), Reshaping World Politics: NGOs, the Internet, and Global Civil Society.
6. M. Welsh, Jennifer (2004), Humanitarian Intervention and International Relations.
7. Kaplan, Morton (1957), System and Process in International Politics.
8. Sørensen G. (2001), Types of State in the Present International System.
9. Easton, Devid (1965), A Framework for Political Analysis.
10. Ataman, Muhittin (2003), "The Impact of Non-State Actors on World Politics".
📄 আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তত্ত্বসমূহ
Theme: Magnificent Delusion
"Experience without theory is blind, but theory without experience is mere intellectual play." - Immanuel Kant
ভূমিকা: Theory বা তত্ত্ব। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে থিওরি ব্যবহার করা হয় দুটো উদ্দেশ্যে। প্রথমটি হলো Explanation, আর দ্বিতীয়টি হলো Extrapolation। রাষ্ট্রগুলো কেন যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কেন সারা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, চীন কেন তাইওয়ানকে মেইনল্যান্ডের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, নিরপেক্ষ রাষ্ট্র সুইডেন কেন সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দিতে চায় ইত্যাদি চলমান বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা (explain) করতে থিওরি ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, তালেবানদের পুনরুত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, পোস্ট কোভিড বিশ্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি কোন দিকে যাবে, দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত হবে কি না ইত্যাদি ভবিষ্যৎ বিষয়গুলোর পূর্বানুমান ও দূরদর্শন (extrapolate) করতেই বিভিন্ন থিওরি ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন মতবাদের ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাঁধন দৃঢ়তর হয়েছে। তাই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির ব্যাখ্যা করা যায় এবং দূরদর্শনও করা যায় এমন কিছু থিওরি নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা করব। উল্লেখ্য, একটি থিওরি একেক ডিসিপ্লিনে একেক রকম ব্যাখ্যা করা হয়। তবে আমি এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে থিওরিগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
A Symbiotic Realism Theory (বাস্তববাদ তত্ত্ব)
রাজনৈতিক বাস্তববাদের উপর ভর করে চলছে একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি। তাই একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে 'Political Realism' বা 'রাজনৈতিক বাস্তববাদ' বোঝাটা অনেক বেশি জরুরি। কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পারের সময়ে সৌদি আরবের সাথে কানাডার এক হাজার দুশো কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জাস্টিন ট্রুডো প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের স্বাক্ষর করা সেই অস্ত্র বিক্রির চুক্তিটি বাতিল করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে দেশটির অর্থনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে বিগত বছরগুলোতে কানাডার ফরেইন রিজার্ভের একটি বড় অংশ আসে এই অস্ত্র রপ্তানি থেকে। তাই পুনরায় অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে চুক্তিটি বাতিল করার পরিবর্তে চুক্তিটি নবায়ন করে ট্রুডো সরকার। কানাডার অস্ত্র বিক্রির এই বিষয়টি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা বোঝানোর জন্য উল্লেখ করেছি, সেটি হচ্ছে Realism বা বাস্তববাদ।
পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের দেশ সৌদি আরবের কাছে শুধু কানাডা সরকারই নয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোও প্রতিনিয়ত অস্ত্র বিক্রি করছে। যুক্তরাষ্ট্রও তার সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে অন্য রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি করার মাধ্যমে। তাই এখন প্রশ্ন হতে পারে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইতালি থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ক্রয় করে সৌদি আরব সেই অস্ত্র কোথায় ব্যবহার করছে? উত্তর হলো, সৌদি তার এসব ক্রয়কৃত অস্ত্রের অধিকাংশ ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উপর ব্যবহার করছে। বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক সংকটে থাকা দেশ ইয়েমেনে সৌদি আরবের অস্ত্র নিক্ষেপের ফলে শুধু হুতি বিদ্রোহীরাই মারা যাচ্ছে বিষয়টি এরকম নয় বরং হাজার হাজার ইয়েমেনি সাধারণ জনগণ, শিশু ও বেসামরিক লোকজনও মারা যাচ্ছে। সেজন্য ইয়েমেনি সাধারণ জনগণের জীবনের কথা চিন্তা করে এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে ২০২০ সালে সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব। পশ্চিমা দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা স্থগিত করবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে Normative Goal (আদর্শগত উদ্দেশ্য) নামে একটি বিষয় আছে। এই Normative Goal এর মানে হচ্ছে, নিজের অনৈতিক স্বার্থকে বিবেচনা না করে আমার ঠিক যেটা করা উচিত সেটাই করা। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডা যদি সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে তাহলে তারা বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে কিন্তু সৌদি আরব তাদের থেকে অস্ত্র ক্রয় করার পর সেই অস্ত্র ব্যবহার করেই হুতি বিদ্রোহী দমনের নামে হাজার হাজার নিরীহ ইয়েমেনিকে হত্যা করছে। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই Normative Approach অনুযায়ী কানাডা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজেদের স্বার্থের কথা ভুলে ইয়েমেনের মানবিক অবস্থা বিবেচনা করে সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা। কিন্তু এসব নরমেটিভ এপ্রোচ বা মানবিক দিক বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডার কোনো মেটেরিয়াল লাভ হচ্ছে না। তাই তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে পুনরায় রিয়াদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ইয়েমেনে যা হবার হোক, অথবা সৌদি সরকার আমাদের থেকে অস্ত্র নিয়ে যা করার করুক বরং আমরা তো অস্ত্র বিক্রি করে লাভবান হচ্ছি।
দারিদ্রপীড়িত দেশ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব যখন বর্বর সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে রিয়াদ সরকারকে তখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এসব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সৌদি আরব। ইয়েমেনের মানবিক দিক বিবেচনা না করে এবং সাধারণ ইয়েমেনিদের জীবনের নিরাপত্তার কথা না ভেবে শুধু নিজেদের আর্থিক লাভের জন্য সৌদি আরবের কাছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় অস্ত্র বিক্রি করার যে সিদ্ধান্ত সেটাই Realism বা বাস্তববাদ। এই বাস্তববাদের মূল কথা হচ্ছে অন্য একটি রাষ্ট্র ধ্বংস হোক কিংবা ক্ষতির মুখে পড়ুক তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই যদি আমি সেখান থেকে লাভবান হই। এখন আমরা Realism এর ছয়টি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি জানার চেষ্টা করব।
1. Relative Gain (নিজের স্বার্থ): যে করেই হোক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের মেটেরিয়ালিস্টিক লাভ। যে কাজটি করলে একটি রাষ্ট্র নিজে লাভবান হতে পারবে ঠিক সেই কাজটিই করবে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব দেখা হয় না। ধরুন একটি পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লাভ; কিন্তু সেই নীতিটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের জন্য বিশাল ক্ষতি বয়ে আনবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে না। অর্থাৎ নিজের লাভ হলেই হলো। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটিকে বলা "Relative Gain" বা নিজের স্বার্থ। এটি বাস্তববাদ এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
2. Zero-Sum Game: দুই টাকার মধ্যে আপনি যদি এক টাকা নিয়ে নেন তাহলে আমি মাত্র এক টাকা পাচ্ছি আর এক টাকা হারাচ্ছি। তাই সম্পূর্ণ টাকাটি আমার প্রয়োজন। মূল কথা হচ্ছে একজন নিয়ে নিলে আরেকজন পাবে না। একুশ শতাব্দীতে এসে রাষ্ট্রগুলো এই "Zero-Sum Game" এ বিশ্বাস করে। এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র জানতো ইরাক বা লিবিয়ায় যুদ্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হবে কিন্তু ইরাক ও লিবিয়া দুটি দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র নিজের লাভের কথা বিবেচনা করে যুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিল। রিয়ালিস্টরা মনে করে অন্যের কী ক্ষতি হবে সেটি বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই। নিজের স্বার্থ আগে। স্বার্থের কথা ভেবে রাষ্ট্রগুলো কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে চায় না। সহযোগিতা না করার এই মনোভাবকে টার্ম হিসেবে 'Symbiotic Relation' বলে।
3. Anarchy (নৈরাজ্য): এটি বাস্তববাদ এর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যখন একটি রাষ্ট্রে কোনো সরকার না থাকে তখন দেখা যায় রাষ্ট্রে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। সরকার না থাকলে রাষ্ট্রের আইনকানুন থাকে না। কেউ কারো কথা শুনে না। সবাই সবার মতো চলে। সরকারবিহীন একটি রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। আর এটাকেই বলা হয় Anarchism বা নৈরাজ্যবাদ। যখন একটি দেশে সরকার থাকে তখন সেই সরকার আইন তৈরি করে, সরকার সেই আইন মানতে জনগণকে বাধ্য করে, কেউ আইন অমান্য করলে সরকার তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটি সরকার বা কেন্দ্রীয় শক্তি থাকা প্রয়োজন। ঠিক সেভাবে আমরা যদি বিশ্বের ১৯৫টি দেশকে একসাথে নিয়ে শুধু একটি দেশ হিসেবে কল্পনা করি তখন দেখা যায় এই ১৯৫টি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো একটি কেন্দ্রীয় শক্তি নেই। বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে জাতিসংঘ নিজেই একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের কথা এখন আর কোনো রাষ্ট্র তেমন মেনে চলে না। সেখানে পরাশক্তিগুলোর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই অভিভাবকহীন বর্তমান বিশ্বটিকে আমরা রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় নৈরাজ্যবাদ বা Anarchism হিসেবে চিহ্নিত করি।
4. The Anarchical Society: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর হেডলি বুল এর 'The Anarchical Society' নামে একটি বিখ্যাত বই আছে। সেখানে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় দ্বন্দ্ব ভুলে একত্রিত হওয়ার "কমন গ্রাউন্ড" খুঁজে পাচ্ছে না। ফলস্বরূপ বিশ্ব একটি নৈরাজ্যকর সমাজে পরিণত হয়েছে। এককথায়, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে এই Anarchism বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, কোনো একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে সেই রাষ্ট্রকে তার অপরাধের জন্য শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জন্য কিংবা সেই অপরাধ থেকে রাষ্ট্রটিকে বিরত রাখার জন্য কোনো কার্যকরী আন্তর্জাতিক সংস্থা বা অভিভাবক নেই। রিয়ালিজমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই Anarchism এর কারণেই চীন জাতিসংঘের কথা অবাধ্য করে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অংশগ্রহণই করেনি, এই Anarchism এর কারণেই যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানে আক্রমণ করতে সফল হয়েছে। কেউ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রশ্ন তুলতে পারেনি যে, কেন আপনি শুধু শুধু ইরাকে আক্রমণ করলেন? এই Anarchism এর কারণেই চীনের সহায়তায় মিয়ানমারের সেনারা রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার থেকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এই Anarchism এর কারণেই ইয়েমেনে সৌদি তার বোমা হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
5. State-centrism: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে, রাষ্ট্রের আর্থিক উন্নতির স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থে একটি রাষ্ট্রকে যা যা করা প্রয়োজন সে সব করতে প্রস্তুত। এটি হোক নৈতিক কিংবা অনৈতিক। তাই বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্র সব সময় তার নিজের স্বার্থের (rational self-interest) কথা বিবেচনা করবে এবং রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেবে। হ্যান্স জে মরগেনথাউ-এর ভাষায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি হলো ক্ষমতার লড়াইয়ের রাজনীতি ("International politics, like all politics is a struggle for power")。
6. Self-help system: রিয়ালিজম এর প্রবক্তারা বলছেন, নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব (Survival) টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য কোনো রাষ্ট্র আমাকে সাহায্য করবে তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তাই নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য রিয়ালিস্টরা তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করে। প্রথমত, Coercion: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় যদি অন্য রাষ্ট্রের সাথে জোরজবরদস্তি এবং সামরিক আগ্রাসন কিংবা মিলিটারিও মোতায়েন করতে হয় সেটি করতে রাষ্ট্র সদা প্রস্তুত থাকবে। এজন্যই সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি মিলিটারি ঘাঁটি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, Hard Power: এমনকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নিজের স্বার্থ রক্ষায় যদি অন্য রাষ্ট্রে পারমাণবিক বোমা হামলা, ড্রোন হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করতে হয় তাহলে রাষ্ট্র সেটিই করবে। তৃতীয়ত, Cost Benefit Calculations: কোনো একটি বিবদমান ইস্যুতে জড়িত হওয়ার পূর্বে রাষ্ট্রকে এটিও মাথায় রাখতে হবে যে, সেখানে তার কতটুকু লাভ হবে এবং কতটুকু ক্ষতি হবে। আশাকরি বাস্তববাদ কী সেটি এখন পরিষ্কার।
Classical Realism
এটি বাস্তববাদের আদি ধারণা। মূলত থুসিডাইডিস, ম্যাকিয়াভেলি, হবসের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বাস্তববাদকে প্রথম সামনে নিয়ে আসেন। তাদের মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই স্বার্থপর (Selfish)। এমনকি যে মানুষগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকে তারাও আক্রমণাত্মক (Aggressive)। মানুষের এই স্বার্থপরতা ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পৃথিবী এত অস্থিতিশীল। রাষ্ট্রনেতারা তাদের রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি করতে এবং অন্য রাষ্ট্রকে দখল করতে সদা তৎপর থাকে। তাই তাদের মতে, মানুষের এই স্বভাবের কারণেই রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ হয় (inter-state conflict)। দ্বিতীয়ত, ক্লাসিক্যাল রিয়ালিস্টদের মতে, সম্পূর্ণ বিশ্বকে আমরা যদি একটি খেলার মাঠ হিসেবে কল্পনা করি, তাহলে এখানে মূল খেলোয়াড় হচ্ছে রাষ্ট্রগুলো (States)। তাদের দাবি বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংস্থা ও মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন ইত্যাদি অ-রাষ্ট্রীয় কর্মক মুখ্য ভূমিকা পালন করে না বরং রাষ্ট্রই এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
Neo-realism (নব্য বাস্তববাদ)
এটি মূলত ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজমের বিপরীত। নব্য বাস্তববাদকে অনেকে 'Structural Realism' ও বলে থাকে। পররাষ্ট্রনীতি তৈরিতে ১৯৭০ এর দিকে নব্য বাস্তববাদের ধারণাটি অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটির মূল কথা হচ্ছে, মানুষ স্বার্থপর এবং আক্রমণাত্মক হবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষ স্বার্থপর এবং আক্রমণাত্মক হলেই যে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ হবে এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নব্য বাস্তববাদীদের মতে, মূল সমস্যাটি রাষ্ট্রে নয় বরং সমস্যাটি হচ্ছে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সিস্টেমে বা স্ট্রাকচারে। কারণ বৈশ্বিক রাজনৈতিক সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো একক শক্তি নেই। বিশ্বব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে বিশ্বব্যবস্থা তার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রগুলো তার আগ্রাসী মনোভাবকে কাজে লাগাতে পারছে। তথা সমস্যাটি রাষ্ট্রের নয় বরং সমস্যাটি হচ্ছে বিশ্বব্যবস্থায়। যদি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকত তাহলে রাষ্ট্রগুলো তাদের আগ্রাসী মনোভাব চলমান রাখতে পারত না। "Politics Among Nations” বইয়ের লেখক হ্যান্স মর্গেনথাউ-এর মতে, রাষ্ট্রগুলোর মনোভাব স্বভাবগত ভাবেই স্বার্থপর ও আক্রমণাত্মক। তাই রাষ্ট্রগুলোর এই মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় শক্তি থাকা প্রয়োজন।
Offensive realism (আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ)
যুক্তরাষ্ট্র এই মতবাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই মতবাদের মূল কথা হচ্ছে, যেহেতু বিশ্বের সবগুলো দেশের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো অভিভাবক নেই তাই রাষ্ট্রগুলো দিন দিন আগ্রাসী হয়ে উঠছে। বিশ্বে একটি নৈরাজ্যময় (anarchical) পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই নৈরাজ্যময় পরিস্থিতিতে একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ চালায়। এতে করে নতুন আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এখানে একটি ‘Security Dilemma' তৈরি হয়। নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে যখন অন্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করা হয় তখন আক্রমণের শিকার রাষ্ট্রটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। উদাহরণস্বরূপ: মার্কিন নীতিনির্ধারকরা মনে করল তালেবানদের কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপদ নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে আফগানিস্তানে আক্রমণ চালানো হলো। এখন আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষিত হলো ঠিকই; কিন্তু আফগান জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো। আক্রমণাত্মক বাস্তববাদ হচ্ছে এমন একটি ধারণা যেখানে একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে আরেকটি রাষ্ট্র নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
Defensive realism (প্রতিরোধমূলক বাস্তববাদ)
বর্তমান বিশ্বের ইরান ও উত্তর কোরিয়া এই মতবাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি অফেন্সিভ রিয়ালিজমের বিপরীত। প্রতিরোধমূলক বাস্তববাদীরাও মনে করে বিশ্ব আসলে নৈরাজ্যময়। তাই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যে-কোনো সময় আমাকে আক্রমণ করতে পারে। তাই সেই আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য আমার সর্বদা প্রস্তুত থাকা উচিত। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে একটি রাষ্ট্র যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেসকল পদক্ষেপের সমষ্টিই প্রতিরোধমূলক বাস্তববাদ বা ডিফেন্সিভ রিয়ালিজমের উদাহরণ। ডিফেন্সিভ রিয়ালিজমে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলোর মানসিকতা এমন যে, "কেউ যদি আমাকে আক্রমণ করে তাহলে তাকে জবাব দেওয়ার জন্য আমাকে পূর্ব থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে”। উদাহরণস্বরূপ- ইরান ও উত্তর কোরিয়া মনে করছে যে, পারমাণবিক অস্ত্রের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে-কোনো সময় তাদের উপর আক্রমণ চালাতে পারে। তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রগুলো তাদের মিলিটারির সংখ্যা বৃদ্ধি করছে, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং নিউক্লিয়ার অস্ত্রে সমৃদ্ধ হচ্ছে। ডিফেন্সিভ রিয়ালিজমের সমস্যাটি হচ্ছে, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঠিক কতটুকু শক্তিমত্তা অর্জন করতে হবে তার কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। অর্থাৎ ইরান মোট কত সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে ইরানের নিরাপত্তা রক্ষিত হবে সেটি ইরানও জানে না।
Liberalism (উদারতাবাদ)
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে যে সকল থিওরি ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে Liberalism বা উদারতাবাদ অন্যতম। লিবারেলিজমকে 'Liberal Internationalism'ও বলা হয়। Liberalism হচ্ছে Realism এর সম্পূর্ণ বিপরীত। পাঁচটি মূল বৈশিষ্ট্যের আলোকে সম্পূর্ণ লিবারেলিজমের বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। প্রথমেই বলে নেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই লিবারেলিজমকে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এখানে আমরা আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে লিবারেলিজমকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Rejection of Power Politics: যারা লিবারালিজম এ বিশ্বাসী তারা মনে করে, আন্তর্জাতিক কোনো একটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করার লক্ষ্যে একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে বা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সবার জন্যই ক্ষতিকর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু নিজের স্বার্থ অর্জনের জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে রাষ্ট্রগুলোর উচিত একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
2. Absolute Gains: রিয়েলিজমে আমরা দেখেছিলাম, রাষ্ট্র শুধু তার নিজের লাভের কথা চিন্তা করে এবং যে কাজটি করলে একটি রাষ্ট্র নিজে লাভবান হতে পারবে ঠিক সেই কাজটিই করে। এতে অন্য কারো ক্ষতি হলো নাকি লাভ হলো এসব দেখা হয় না। যেটিকে রিয়ালিজমের ভাষায় 'Relative Gain' বলা হয়। কিন্তু লিবারেলিজম বলছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি রাষ্ট্র শুধু তার নিজের লাভের কথা বিবেচনা করবে না বরং অন্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের কথাও বিবেচনা করবে। দুটি রাষ্ট্র যেন সমানভাবে উপকৃত হয় এবং সবার স্বার্থই (Mutual benefits) যেন রক্ষিত হয় সেটার উপরেই লিবারেলিজম গুরুত্বারোপ করে। একটি রাষ্ট্র লাভবান হবে, আর একটি রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটি লিবারেলিজম চায় না। লিবারেলিজমের ভাষায় এটাকে বলা হচ্ছে Absolute Gains বা সবার সমপরিমাণ লাভ।
3. Win-Win Game/Non-Zero-Sum Game: রিয়েলিজম Zero-Sum Game এ বিশ্বাসী কিন্তু অপরদিকে লিবারেলিজম Win-Win Game এ বিশ্বাসী। রিয়েলিজমের বৈশিষ্ট্য এই জিরো সাম গেইম এর মানে হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি ইস্যুর উপর জড়িত দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। কিন্তু লিবারেলিজম বলছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুইটি দেশ একসাথে লাভবান হতে পারে না কিংবা একটি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়া মানেই অন্য আরেকটি রাষ্ট্র নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়। যেমন- ইরাক যুদ্ধে আমেরিকা জয়ী হলেও আমেরিকার অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রথমত, আমেরিকা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক আমেরিকান সেনা ইরাক যুদ্ধে মারা গিয়েছে, অনেকে আবার যুদ্ধে আহত হয়েছে। তৃতীয়ত, আমেরিকার যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বিঘ্নিত হয়েছে। তাই উদারতাবাদে বিশ্বাসীরা বলছেন দুটি রাষ্ট্র যখন দ্বন্দ্বে বা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিবর্তে একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে (Cooperation), একে অপরের সাথে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে (Free Trade), একে অপরের সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য আদান প্রদান করবে তখন উভয় রাষ্ট্রই সমানভাবে লাভবান হবে। আর সমানভাবে এই লাভবান হওয়ার ধারণাটিকেই বলা হয় "Win Win Game"。
4. International Cooperation: বর্তমান পৃথিবীতে যতগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং রিজিওনাল অর্গানাইজেশন রয়েছে সবগুলোই লিবারেলিজমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো একে অপরের স্বার্থকে বিবেচনা করে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মুক্তবাণিজ্য হয়, নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য একে অপরের সাথে আদান-প্রদান করে। শুধু নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করে ইউনিয়নভুক্ত সবগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ 'Collective Security' কে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
5. Regime Theory: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে যারা রিয়ালিস্ট বা বাস্তববাদী তাদের মতে বিশ্বব্যবস্থা হচ্ছে নৈরাজ্যময়। বাস্তববাদীদের মতে, যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল বিষয়বস্তু। কিন্তু Regime Theory এর বিপরীত। এটি মূলত লিবারেলিজমের একটি অংশ। 'Regimes' দ্বারা মূলত বোঝায় Principles বা নিয়মনীতি। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে সবাই সমানভাবে লাভবান হওয়া যায়। একটি রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রেখে পারস্পরিক উন্নয়ন সম্ভব। এই থিওরি মতে বিশ্বব্যবস্থা নৈরাজ্যকর হলেও নিয়মনীতির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। রেজিম থিওরিস্টদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোও রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। তাই লিবারেলিজম আঞ্চলিক সংস্থা (যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নাফটা, সার্ক) এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (যেমন- জাতিসংঘ, বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ) ইত্যাদির উপরও জোর দেয়।
Neoliberalism (নব্য উদারতাবাদ)
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নব্য উদারতাবাদ ধারণাটি বিস্তার লাভ করে ১৯৯০ এর দশকে। রবার্ট কিয়োহেন এবং জোসেফ নাই এটিকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। নব্য উদারতাবাদ মূলত উদারতাবাদের একটি সংশোধিত রূপ। ইকোনমিতে 'autarky system' নামে একটি টার্ম রয়েছে। এর মানে হচ্ছে, নিজ দেশের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যদ্রব্য অন্য রাষ্ট্রের কোনোরূপ সহযোগিতা ছাড়াই নিজেই উৎপাদন করতে সক্ষম হওয়া। যেহেতু প্রয়োজনীয় সকল কিছুই নিজ রাষ্ট্রে উৎপাদন করা সম্ভব তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ (self-sufficient) রাষ্ট্রকে বলা হয় আটার্কি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আজকের একুশ শতকে এসেরকম কি কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র আছে? এমন কোনো রাষ্ট্র কি আছে যার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নেই? নব্য উদারতাবাদীদের মতে, বর্তমান দুনিয়ায় এরকম স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো দেশের সাথে বাণিজ্য করতে হয়। মূল কথা হচ্ছে একটি রাষ্ট্র কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। যেহেতু রাষ্ট্রগুলো একটি আরেকটির উপর নির্ভরশীল তাই রাষ্ট্রগুলোর উচিত পরস্পরেকে সহযোগিতা করা এবং বাণিজ্যিক বাঁধাগুলো দূর করা। রাষ্ট্রগুলো যখন একে অপরের সাথে বাণিজ্যে লিপ্ত হবে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। আর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব হ্রাস পাবে এবং দ্বন্দ্ব নিরসন হবে। এভাবে নব্য উদারতাবাদ সর্বদা নব্য বাস্তববাদকে চ্যালেঞ্জ করে।
নব্য উদারতাবাদের দ্বিতীয় আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আরোপ থেকে বিরত থাকা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মনীতি শিথিল করা। বাণিজ্য উদারীকরণের জন্য রাষ্ট্রের উচিত আঞ্চলিক সংস্থা (সার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নাফটা ইত্যাদি) এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি) এর উপরে গুরুত্বারোপ করা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শুধু রাষ্ট্রই নয় বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশন, সংস্থা ইত্যাদিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে নানাভাবে সহযোগিতা করে। যেমন- বিশ্বব্যাংক দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা রাষ্ট্রগুলোর বাণিজ্য মনিটরিং করে এবং বিভিন্ন রুলস রেগুলেশন তৈরির মাধ্যমে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসা করে। এজন্য অনেক স্কলার নব্য উদারতাবাদকে 'liberal institutionalism' হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন।
Constructivism (গঠনবাদ)
"International politics is shaped by persuasive ideas, collective values, culture, and social identities" - Emanuel Adler
Constructivism হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত এমন একটি তত্ত্ব যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯০) পর অ্যাকাডেমিক অঙ্গনে একটি ডিসকোর্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই থিওরি মতে, একটি রাষ্ট্র অপর আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে। একই সাথে এই চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই দুটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান সম্পর্কটি কেমন সেটিও বিশ্লেষণ করা যায় এবং দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হতে পারে সেটিও অনুমান করা যায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে সেই চারটি বিষয় আসলে কী?
১. Historical Relationship: যে রাষ্ট্রটির সাথে আমি কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলব ওই রাষ্ট্রটির সাথে অতীতে আমার কীরকম সম্পর্ক ছিল সেটি বিবেচনা করা।
২. Identities: যে রাষ্ট্রটির সাথে আমি কূটনৈতিক সম্পর্ক গঠন করতে যাচ্ছি তার সাথে আমার মতাদর্শগত মিল অথবা একরূপতা আছে কি না।
৩. Interests: রাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে সেই রাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থের মিল আছে কি না।
৪. State's behaviour: একটি দেশের আচরণের উপর নির্ভর করে অন্য দেশের সাথে তার সম্পর্ক কেমন হবে।
এখন আমরা কিছু প্রায়োগিক উদাহরণের মাধ্যমে এই চারটি বিষয়ের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Historical Relationship: ঐতিহাসিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে দুটি রাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কটি খুবই সহজে বিশ্লেষণ করা যায় এবং একই সাথে দুটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে সেটিরও একটি ভবিষ্যৎ বাণী দেওয়া যায়। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এই দুটি দেশ ইরাক যুদ্ধে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে, লিবিয়া যুদ্ধে এবং আফগানিস্তানেও একসাথে লড়াই করেছে। অতীতের বিভিন্ন যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার সেনারা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া তার অনেক সৈন্যকে হারিয়েছে। তাই অতীতে যেহেতু এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল সেজন্য বর্তমানেও এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ভালো। পাশাপাশি সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতেও অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আরেকটি উদাহরণ দেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজকের একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রাশিয়ার খারাপ সম্পর্ক যাচ্ছে। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৫ বছর এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। Constructivism থিওরি মতে, যেহেতু দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে অতীতকালে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক ছিল তাই বর্তমানেও রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি শত্রুভাবাপন্ন এবং ভবিষ্যতেও দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক বিরাজ করাই স্বাভাবিক। Constructivism এর আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ ও শত্রুভাবাপন্ন। তাই এই থিওরি মতে, ভবিষ্যতেও ভারত-পাকিস্তান উভয়ের মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করবে। মূল বিষয়বস্তু এক লাইনে বললে এরকম দাঁড়ায়- 'History defines international structure'l
2. Identities: দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে Identities বা একরূপতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন সাদৃশ্যতা পারস্পরিক সম্পর্ক গঠনের একটি অন্যতম নিয়ামক। এই সাদৃশ্যতা হতে পারে ধর্মগত, ভাষাগত, কিংবা মতাদর্শগত। যারা Constructivism এ বিশ্বাসী তারা মনে করছেন, যদি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে উপরিউক্ত বিষয়গুলোর মিল থাকে তাহলে সেই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবেই একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেমন- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো একে অপরের বন্ধু। কারণ এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাষাগত মিল। সবগুলো দেশেরই ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। দ্বিতীয়ত, সবগুলো রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে আদর্শগত মিল। এই রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক মতাদর্শ হচ্ছে গণতন্ত্র। তাই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বভাবগতভাবেই একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকবে। বর্তমান বিশ্বে পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান, কাতার, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন এসব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ধর্মগত মিল থাকার কারণে একটি ভালো সম্পর্ক বিরাজ করছে। অর্থাৎ- 'Identity defines international structure'l
3. Ideas and Interests: রিয়ালিজম ও লিবারেলিজম এ আমরা দেখেছি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেমন হবে সেটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর এবং সেখানে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়। কিন্তু যারা কনস্ট্রাকটিভিস্ট তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে 'Key factor' রাষ্ট্র নয় বরং রাষ্ট্রের জনগণই হচ্ছে মূল বিষয়। একটি দেশের জনগণের আর্থসামাজিক কাঠামো এবং জনগণের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কটি মূলত Socially constructed বা সামাজিকভাবে নির্মিত। কয়েকটি উদাহরণ দিলে আশাকরি বিষয়টি আরও সহজ মনে হবে। প্রথমত, বর্তমানে সমাজে বসবাসকারী মানুষ কখনোই চায় না তার রাষ্ট্রটি অপর আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হোক। আর সেজন্যেই বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিরোধী মনোভাব দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। এটিকেই বলা হচ্ছে “Norms against war"। তাই কনস্ট্রাকটিভিস্টরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব রাষ্ট্র থেকে নয় বরং রাষ্ট্রের জনগণ থেকে আসছে। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্ট্রাকচার বা প্যাটার্ন গঠিত হচ্ছে জনগণের আইডিয়া কিংবা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে। দ্বিতীয়ত, সমাজের মানুষ বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতি বিরোধী মনোভাব পোষণ করে, সেজন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রকে ট্যাবু হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জনগণের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিরোধী এই মনোভাবটি "Nuclear Taboo" হিসেবে পরিচিত। তৃতীয়ত, সমাজের মানুষ চায় না তার রাষ্ট্রটি অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর সামরিকভাবে আগ্রাসন চালিয়ে ঐ রাষ্ট্রটির সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করুক। তাই এখন বিশ্বজুড়ে "সার্বভৌমত্ব রক্ষা” একটি Norm বা আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেটিকে টার্ম হিসেবে বলা হচ্ছে "Norms of sovereignty"। কনস্ট্রাকটিভিজমের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি এক লাইনে বললে- 'People defines international structure'l
4. State's behaviour: একটি রাষ্ট্রের সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হবে নাকি শত্রুভাবাপন্ন হবে সেটি নির্ভর করে ওই রাষ্ট্রের আচরণের উপর। ধরুন একটি রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে এবং সামরিক দিক থেকেও শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই রাষ্ট্রটি আমাকে কখনো হুমকি দিচ্ছে না। এমনকি সেই রাষ্ট্রটি আমার সাথে ভালো আচরণ করছে। তাই রাষ্ট্রটি পারমাণবিক শক্তিধর হলেও আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন উত্তর কোরিয়া। চীন এবং ইরানের সাথে উত্তর কোরিয়া কৌশলগত স্বার্থে সবসময় ভালো ব্যবহার করে। তাই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া ইরান ও চীনের নিরাপত্তার জন্য থ্রেট না। কিন্তু উত্তর কোরিয়া সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছে। রকেট ম্যান হিসেবে পরিচিত কিম জং উন বলছে যে, পিয়ংইয়ং থেকে ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলা করার মতো সক্ষমতা উত্তর কোরিয়ার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোরিয়া কখনো ভালো আচরণ করে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উত্তর কোরিয়া হুমকিস্বরূপ। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে সেটি রাষ্ট্রের আচরণের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
Democratic Peace Theory (গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব)
সবার মনেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেন সারা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়? এটির আদর্শিক ভিত্তিটা আসলে কোথা থেকে আসলো? আমি মনে করি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি বুঝতে হলে সবার মনেই এই প্রশ্নটি জাগা উচিত। কেন যুক্তরাষ্ট্র গোটা বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, এটার আদর্শিক (Normative) ভিত্তি মূলত এসেছে জার্মান ফিলোসোফার ইমানুয়েল কান্ট থেকে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট তার "Perpetual Peace" নামক গ্রন্থে Democratic Peace Theory নামে একটি আইডিয়া দেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কান্টের এই থিওরিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অন্যতম ডিসকোর্সে পরিণত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন থেকে শুরু করে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা এবং বাইডেন-সহ অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই থিওরির উপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার পর্যন্ত এই থিওরির সমর্থক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই তত্ত্বের মূল কথা আসলে কী এবং কেন এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এত প্রভাবশালী?
Democratic Peace Theory এর মূল বক্তব্য হলো সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা যত বেশি বৃদ্ধি পাবে বিশ্বে ততই শান্তি বিরাজ করবে। এই থিওরি অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অন্য আরেকটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়ায় না। তবে এই থিওরি অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অন্য একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে খুব সহজে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাই এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা তেমন নেই। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিন্তু উত্তর কোরিয়া বা চীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কিংবা উত্তর কোরিয়ার দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, সংঘাত আবশ্যক। সহজে বুঝতে কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দিচ্ছি।
উদাহরণ (০১): War
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতি চার বছর কিংবা প্রতি পাঁচ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচন হয়। রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হতে হলে অধিকাংশ জনগণের ভোট পেয়ে জয়ী হতে হয়। তাই নির্বাচনে জয়ী হতে তাদের প্রয়োজন জনগণের সমর্থন। একটি রাষ্ট্রের প্রায় সকল জনগণই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াকে সমর্থন করে না। যেহেতু জনগণ যুদ্ধ চায় না সেহেতু রাষ্ট্রনেতারাও জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কেননা যুদ্ধে জড়িয়ে রাষ্ট্রনেতারা জনগণের সমর্থন হারাতে চায় না। একারণে Democracy Peace Theory বলছে যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যুদ্ধে কম জড়ায়। আর যুদ্ধে না জড়ানোর কারণে দেশে শান্তি বিরাজ করে। অপরপক্ষে একটি অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতারা কখনো জনগণের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেয় না। কেননা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে কোনো নির্বাচন হয় না, তাই তাদের জনগণের সমর্থন প্রয়োজন হয় না।
উদাহরণ (০২): War Cost
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। গণতান্ত্রিক সরকার দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ইত্যাদির উন্নয়ন ঘটাতে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেননা নির্বাচনি প্রচারণায় তাদেরকে ম্যান্ডেট দিতে হয় যে, আমাকে নির্বাচিত করলে আমি ক্ষমতায় গিয়ে সবার চাকরির ব্যবস্থা করব, রাস্তাঘাট তৈরি করে দিব, উন্নত চিকিৎসা দিব, দারিদ্র্যের অবসান ঘটাব ইত্যাদি। কিন্তু সরকার যখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তখন সেই যুদ্ধের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। যুদ্ধের পেছনে অধিক টাকা ব্যয় করার ফলে সরকার দেশের শিক্ষা কিংবা অবকাঠামো খাতে বেশি ব্যয় করতে পারে না। তাই Democratic Peace Theory অনুযায়ী সরকার এই দায়বদ্ধতা থেকেই যুদ্ধের পেছনে টাকা খরচ করার পরিবর্তে দেশের উন্নয়নের পেছনে ব্যয় করে। যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি ইউরোপের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে। সেখানকার পার্লামেন্ট গুলোতে সামরিক বাজেট হ্রাস করার উপর নানা পলিসি গৃহীত হচ্ছে। সেখানে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উপর জোর দিতে সরকারের উপর সিভিল সোসাইটির প্রেশার ত্বরান্বিত হচ্ছে। তাই Democratic Peace Theory বলছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে আর যুদ্ধে জড়ায় না।
উদাহরণ (০৩): Economic Interdependence
একটি রাষ্ট্রকে তার প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য অন্য আরেকটি রাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয় এবং নিজ দেশের অতিরিক্ত সম্পদ অন্য রাষ্ট্রের কাছে রপ্তানি করতে হয়। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই Democratic Peace Theory বলছে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়ায় না। কেননা যুদ্ধে জড়ালে সেই রাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিও করতে পারবে না এবং নিজ দেশের অতিরিক্ত সম্পদ ঐদেশে রপ্তানিও করতে পারবে না। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একে অপরের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
Economic Peace Theory/ Commercial Liberalism Theory
অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব হলো "International Political Economy" বিশ্লেষণ করতে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি তত্ত্ব। অর্থনৈতিকভাবে যখন দুটি রাষ্ট্র একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয় তখন ঐ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কটি ভালো হয়, দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যায়। যেমন- স্পেন রাষ্ট্রটি ফ্রান্সের কয়লার উপর নির্ভরশীল। একই ভাবে ফ্রান্সও স্পেনের স্টিলের উপর নির্ভরশীল। ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে এই অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। দুটি রাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কথা বিবেচনা করে কখনো যুদ্ধে জড়াতে পারে না। এটিই হচ্ছে Economic Peace Theory এর মূল কথা। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলো একে অপরের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে তাদের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা রাষ্ট্রগুলোকে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান (Peaceful Coexistence) বিরাজ করে। এই ইকোনমিক পিস থিওরিকে আবার অনেকে Capitalist Peace Theory হিসেবেও আখ্যায়িত করে। অনেক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এটিকে আবার The Capitalist Peace কিংবা Commercial Peace কিংবা Economic Peace ইত্যাদি নামেও আখ্যায়িত করেছেন।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদরা এই ইকোনমিক পিস থিওরির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন; এক. Promoting peace, দুই. Preventing conflict। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে এই “ইকোনমিক পিস থিওরি" কিংবা "অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব' কিভাবে সম্পর্কিত সেটি তিনটি প্রায়োগিক উদাহরণ এর মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
1. Export: পৃথিবীর কোনো দেশই অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। একটি দেশ তার জনগণের প্রয়োজনীয় যেসব পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করতে অক্ষম এবং যেসব দ্রব্যের ঘাটতি (Shortage) রয়েছে, সেসব পণ্যের জন্য তাকে অন্য আরেকটি রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবার যে সকল পণ্যদ্রব্য নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত (Surplus) হিসেবে থাকে বা অতিরিক্ত থাকে সেগুলোকে অন্য দেশে রপ্তানি করতে হয়। অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব অনুসারে এই আমদানি ও রপ্তানির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলে। অর্থনৈতিক এই আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণেই রাষ্ট্রগুলো দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধকে এড়িয়ে চলে। যেমন- বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নিজ দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানি করা হয়। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যদি বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো কারণে তিক্ত হয়ে উঠে তাহলে বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাজার সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। ইকোনমিক পিস থিওরি বলছে, তাই বাংলাদেশ সরকার সবসময়ই চেষ্টা করবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে।
2. Import: বাংলাদেশ তার আমদানির সবচেয়ে বড় অংশটি করে চীন ও ভারত থেকে। চীন থেকে আমদানি করে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, গম, মিলিটারি প্রযুক্তি ইত্যাদি। অন্যদিকে পেঁয়াজ, দুগ্ধজাত খাবার, চিনি, তেল, কোমল পানীয় ইত্যাদি আমদানি করে ভারত থেকে। তাই বাংলাদেশ চীন ও ভারত উভয়ের সাথেই ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সুগন্ধি চাল এবং মসলা আমদানি করে ইন্দোনেশিয়া থেকে। গম, চিনি, মাংস এবং নানা ধরনের শুকনো ফল আমদানি করে ব্রাজিল থেকে। তাই ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার সাথেও আমাদের সম্পর্ক ভালো। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কয়লা রপ্তানি করে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার এই কয়লার সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ভারত। তাই অস্ট্রেলিয়া সমসময় চেষ্টা করে ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে।
3. Remittance: ইকোনমিক পিস থিওরির অন্যতম আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে রেমিট্যান্স। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের কথাই বলা যায়। অসংখ্য বাংলাদেশি প্রবাসী প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্য-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আসে এই প্রবাসীদের আয়কৃত রেমিট্যান্স থেকে। অপ্রিয় হলেও এটি সত্যি যে, বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলে গড়ে উঠা নব্য মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী অনেকটাই রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল। পুরো রেমিট্যান্সের অধিকাংশই মোটাদাগে আসছে ১০টি দেশ থেকে। দেশগুলো হলো- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও সিঙ্গাপুর। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা রেমিট্যান্স নির্ভর তাই "Economic Peace Theory" এর মতে বাংলাদেশ উপরিউক্ত দেশগুলোর সাথে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য।
বাংলাদেশ ও অর্থনৈতিক শান্তি তত্ত্ব
বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। এই দূতাবাসগুলোরও আবার বিভিন্ন শাখা থাকে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কমার্শিয়াল উইং। এই কমার্শিয়াল উইং এর কাজ হলো বিদেশি রাষ্ট্রগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় যে-সকল পণ্যদ্রব্য বেশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর একটি প্রাথমিক তালিকা করা এবং ওইসব দেশে ব্যবহৃত এই পণ্যগুলোর মধ্যে কোনগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে সেগুলোর একটি লিস্ট করা। যখন দেখা যায় যে, অন্য দেশের যেসব পণ্য তারা ব্যবহার করছে সেগুলো বাংলাদেশেও উৎপাদিত হয়। তখন ঐ দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনীতিকরা কতিপয় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে এবং তাদেরকে এটি বোঝানোর চেষ্টা করে যে, আপনারা যেসব পণ্য অন্য দেশ থেকে নিয়ে আসছেন সেগুলো বাংলাদেশ থেকে আরও কম মূল্যে নিয়ে আসতে পারবেন। গত এক দশক ধরে ভারত এই কাজটি সুকৌশলে করছে। বহির্বিশ্বে ভারতের উৎপাদিত পণ্যগুলোর ব্যাপক বিস্তার লাভের পেছনে ঐসব দেশে অবস্থানরত ভারতের দূতাবাসের এই কমার্শিয়াল উইংগুলোর অবদান অনেক। অর্থাৎ ভারত তাদের বাজার সম্প্রসারণে ঐসব দেশের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করছে।
যে পণ্যগুলোর বহির্বিশ্বে চাহিদা রয়েছে এবং একইসাথে বাংলাদেশও ভালো উৎপাদন করতে পারে সেগুলো হচ্ছে- তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, ফুটওয়্যার, হিমায়িত মাছ, পাটের তৈরি ব্যাগ, হাতমোজা, প্লাস্টিক, এন্টিবায়োটিক, মেডিকেল ইকুইপেন্ট, ইলেকট্রনিক্স, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ফার্নিচার, সিরামিক, পেপার অ্যান্ড কার্ডবোর্ড, স্পোর্টসওয়্যার ইত্যাদি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের যেগুলোতে কমার্শিয়াল উইং রয়েছে, বর্তমানে সেই দেশগুলোতে উপরিউক্ত পণ্যগুলোর রপ্তানি সম্প্রসারণে টার্গেট রাখা উচিত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, রাশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি। তাই Economic Peace Theory আমাদেরকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের উচিত তার সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোকে উপরিউক্ত দেশগুলোর বাজারে রপ্তানি করার জন্য উল্লিখিত দেশগুলোর সাথে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলা এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা।
Dependency theory
অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। হঠাৎ করেই কোনো রাষ্ট্র আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। যেমন প্রথম স্টেজে রাষ্ট্রগুলো গরিব বা অনুন্নত থাকে। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রই একটি সময় দরিদ্র থাকে। তখন রাষ্ট্রের অর্থনীতি সম্পূর্ণ কৃষির উপর নির্ভর করে। তারপর দ্বিতীয় ধাপে রাষ্ট্রগুলো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে শিল্পায়নের যুগে প্রবেশ করে। শিল্পায়নের কারণে রাষ্ট্রগুলোতে নগরায়ণ হয়। তখন উৎপাদনের বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়। তারপর তৃতীয় ধাপে গিয়ে রাষ্ট্রগুলো আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তখন ব্যাপক মানব সম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আবিষ্কার ইত্যাদির কারণে রাষ্ট্রগুলো আধুনিকতার যুগে প্রবেশ করে।
এখন বিশ্বের মোট দেশ হচ্ছে ১৯৫টি। প্রথমত, বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার কিছু দেশ এখনো অনুন্নত ও কৃষিনির্ভর। যারা এখনো প্রথম ধাপেই আছে। দ্বিতীয়ত ভারত, ব্রাজিল, তুরস্কের মতো কিছু রাষ্ট্র উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের। যারা এখন দ্বিতীয় স্টেজে রয়েছে। তৃতীয়ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, কানাডা ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো আধুনিক ও উন্নত। যারা বর্তমানে তৃতীয় স্টেজে আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপরিউক্ত যে তিনটি স্টেজ রয়েছে সেটি আমরা সবাই মোটামুটি জানি। তবে এখানে ডিপেন্ডেন্সি থিওরি দুইটি প্রশ্ন উত্থাপন করে। প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে যেসব রাষ্ট্র এখনো দারিদ্র্য তথা উন্নয়নের প্রথম স্টেজে রয়েছে তারা কেন পরবর্তী দুইটি স্টেজ পাড়ি দিতে পারছে না? এবং কেন তারা আজও অনুন্নত? দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো যারা আজ উন্নত রাষ্ট্র তারা কীভাবে সফলভাবে উন্নয়নের তিনটি স্টেজ পাড়ি দিতে সক্ষম হলো? ডিপেন্ডেন্সি থিওরির মতে, যারা আজ আধুনিক রাষ্ট্রের কাতারে তারা মূলত সমৃদ্ধিশালী হয়েছে অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর উপর নির্ভর করেই।
বর্তমান উন্নত দেশগুলোর অধিকাংশই ছিল দখলদার ও সাম্রাজ্যবাদী। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজেদের কলোনি বানিয়ে সেখান থেকে সম্পদ লুট করে তারা উন্নত হয়েছে। যারা আজ উন্নত তারা দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করার মাধ্যমে সম্পদশালী হয়েছে। কলোনিয়াল পিরিয়ডে এসব দেশ থেকে কাঁচামাল নিয়ে নিজ দেশকে উন্নত করেছে। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান ধনী রাষ্ট্রগুলো উন্নত হয়েছে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর উপর নির্ভর করেই। আর গরিব রাষ্ট্রগুলো একুশ শতকে এসেও গরিব রয়ে গিয়েছে ধনী রাষ্ট্রগুলোর উপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণেই। এখনো দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো সস্তা শ্রম রপ্তানি করছে ধনী রাষ্ট্রগুলোতে। এসব অনুন্নত দেশের শ্রমিক দিয়েই উন্নত দেশগুলোর কলকারখানা চলছে।
এই Dependency theory এর মূল বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ধনী রাষ্ট্রগুলো কৌশলে অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের উপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। এর একটি বাস্তব উদাহরণ দেই। যেমন- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে ঠিকই। কিন্তু বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি বোয়িং বিমান ক্রয় করে সব টাকা আবার যুক্তরাষ্ট্রকেই দিয়ে আসছে। কারণ একটি বিমানের দাম বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণকে মাঠে নামিয়ে দিলেও একটি বিমান তৈরি করতে পারবে না। দশ বছর সময় দিলেও পারবে না। কারণ বিমান তৈরি করার মতো দক্ষ জনশক্তি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশের কাছে নেই। তাই সারা বছরে রাষ্ট্রের কোষাগারে যা জমা হয় শুধু একটি বোয়িং বিমান ক্রয় করলেই তা শেষ হয়ে যায়। একই ভাবে চীনের সাথে সারাবছর বাণিজ্য করে বাংলাদেশ যে টাকা পাচ্ছে, শুধু একটি সাবমেরিন ক্রয় করে সেই টাকা চীনকেই দিয়ে আসতে হচ্ছে। আমি এখানে বাংলাদেশকে ছোট করে দেখছি না। আমি মূলত এটি বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো নির্ভরশীলতার কারণে সম্পদ ধরে রাখতে পারছে না। অর্থাৎ core-peripheral model এর মতো দিনশেষে টাকাগুলো ধনী রাষ্ট্রগুলোর কাছেই পুঞ্জীভূত হচ্ছে। আর এটিকেই বলা হয় Dependency trap বা নির্ভরশীলতার ফাঁদ। এই ফাঁদ থেকে রক্ষার জন্য অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর উচিত নিজেদের শক্তিমত্তার উপর জোর দেওয়া এবং যেসব পণ্য অন্য রাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয় সেই পণ্যগুলোর বিকল্প পণ্য নিজ দেশেই উৎপাদন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। পুঁজির প্রবাহ (Capital flow) যেন Peripheral থেকে Central এ চলে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় Central বা Core বলা হয় উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে, আর Peripheral বলা হয় অনুন্নত ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে।
Feminism (আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নারীবাদী তত্ত্ব)
নারীবাদ বা নারী সমানাধিকার আন্দোলন একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় সূচনা করেছে। এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে Gender বা লিঙ্গ একটি গুরুত্ব বহন করে। নারীবাদ মনে করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি দ্বারা শুধু পুরুষরাই নয় বরং নারী-পুরুষ উভয়েই সমানভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। অথচ চলমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক এবং বৈদেশিক নীতি প্রণয়নেও নারীদের কম গুরুত্বারোপ করা হয়। নারীবাদীদের কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে।
1. Liberal feminism (উদার নারীবাদ): লিবারেল ফেমিনিস্টদের মতে, বিশ্বে নারী-পুরুষের সমানাধিকার থাকতে হবে। নারীদেরকে আলাদাভাবে না দেখে মানুষ হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন- চাকরিজীবী পুরুষরা কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করার পরপর বাসায় এসে বিশ্রাম করে। কিন্তু চাকরিজীবী নারীদের একসাথে দুইটি দায়িত্ব পালন করতে হয়। কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করার পর বাসায় এসে আবার সকল ঘরোয়া কাজ করতে হয় এবং সন্তান লালন-পালনের কাজও করতে হয়। নারীবাদীরা এটিকে টার্ম হিসেবে The second shift বা Double burden হিসেবে আখ্যায়িত করে। লিবারেল ফেমিনিস্টরা এই সেকেন্ড শিফট এর ঘোর বিরোধী। তাদের মতে ঘরোয়া কাজ এবং সন্তান লালন-পালন শুধু নারীরা নয় পুরুষদেরও করতে হবে। একই ভাবে লিবারেল ফেমিনিস্টরা নারীর ভোটাধিকার (suffrage), শিক্ষার অধিকার, সমান বেতন পাওয়ার অধিকার (equal pay), গর্ভপাত অধিকার (abortion rights) ইত্যাদির প্রতি বেশি সচেতন।
2. Radical feminism: রেডিক্যাল ফেমিনিস্টদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাটি অনেক পুরুষতান্ত্রিক (male dominated hierarchy)। তাদের কনসার্ন হচ্ছে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকে মিলিটারিরা। কিন্তু সেনাবাহিনীতে নারীদের প্রতিনিধি অনেক কম। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। রেডিক্যাল ফেমিনিস্টরা মূলত পুরুষতান্ত্রিকতা বা patriarchal society নিয়ে বেশি সরব।
3. Socialist and Marxist feminism: মার্কসবাদীদের মতে সমাজে নারীদের সকল সমস্যার মূলে রয়েছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সিস্টেমে নারীরা সবচেয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারীদের ঘরোয়া কাজ (domestic work) করতে বাধ্য করার কারণে তারা চাকরি করতে পারছে না। যে-কারণে নারীরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে পারছে না। কর্মক্ষেত্রে নারীদের কম মজুরি প্রদানের কারণে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজিবাদী এই বিশ্বে পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীদেরকে বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
4. Cultural feminism: এটি মূলত রেডিক্যাল ফেমিনিজমের একটি শাখা। রেডিক্যাল ফেমিনিজম মনে করে, নারীদের উপর পুরুষদের কর্তৃত্ব করার যে মনোভাব সেটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক। নারীদের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন জরুরি। তারা বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে এভাবে চরিত্রায়ন করে যে, সমাজ মনে করে নারীরা প্রকৃতিগতভাবে অধীনস্থ। তাই নারীদের উপর পুরুষদের কর্তৃত্ব করার অধিকার রয়েছে। যা নারীদেরকে একটি লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার দিকে ধাবিত করে। তারা মনে করে এই সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু শারীরিক পার্থক্যের কারণে নারীদের প্রতি ভিন্ন মনোভাব পোষণ করার পরিবর্তে সমাজে নারীকে সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তাদের মতে- 'Society needs a female essence'l
5. Eco feminism: পুরুষের ধ্বংসাত্মক কার্যাবলীর কারণে নারীদের উপর পরিবেশগত যে প্রভাব পড়ে সেটিই ইকো ফেমিনিজম। ইকো ফেমিনিস্টদের মতে, পুরুষরা বৃক্ষ নিধন করছে, বন কেটে কলকারখানা তৈরি করছে, কলকারখানা তৈরির মাধ্যমে জলবায়ুর উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। ফলশ্রুতিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বিপুল পরিমাণে জলবায়ু শরণার্থী (Climate migrants) তৈরি হচ্ছে। তাই ইকো ফেমিনিস্টদের দাবি নারীদের উচিত পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসা। এভাবে নারীবাদ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায় সূচনা করেছে।
Feminist peace theory (নারীবাদী শান্তি তত্ত্ব)
একুশ শতকের সবচেয়ে আলোচিত একটি থিওরি। তাই এটি বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। নারীবাদী শান্তি তত্ত্বের মূল বক্তব্য হচ্ছে নারীরা দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, কনফ্লিক্ট, সহিংসতা ইত্যাদি চায় না। নারীরা শান্তি চায়। তিনটি উদহারণের মাধ্যমে এই থিওরিটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
1. Wartime sexual violence (যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা): যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত এবং সামরিক দখলদারিত্বের সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত ও ভালনারেবল পজিশনে থাকে। যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে শত্রুকে অপমানিত করার উদ্দেশ্যে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:
* ২০১৬ সালে রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকারি বাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হন।
* ১৭৪২ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত মারাঠা নেতা রঘুজীর সৈন্যরা ক্রমাগত বাংলা আক্রমণ করে। এসময় বাংলার অসংখ্য নারী মারাঠাদের দ্বারা ধর্ষিত হন। মারাঠারা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণ করে। বাঙালি কবি গঙ্গারামের বইয়ে এটির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
* ১৯০৪ সালে রুশ-জাপান যুদ্ধে রুশ সৈন্যরা মাঞ্চুরিয়ায় বহু চীনা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, অসংখ্য চীনা নারীকে ধর্ষণ করে।
* ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ ও দখল করে এবং ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত দেশটি জার্মান সামরিক দখলদারিত্বের অধীনে থাকে। এই সময়ে জার্মান সৈন্যরা অসংখ্য পোলিশ ইহুদি নারীকে ধর্ষণ করে।
* ১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুর আক্রমণ ও দখল করে এবং ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সেখানে ইন্দোনেশীয় দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকে। এসময় হাজার হাজার পূর্ব তিমুরীয় নারী ইন্দোনেশীয় সৈন্য ও পুলিশদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন।
যুদ্ধে সবসময় নারীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই নারীরা কখনো যুদ্ধ চায় না এবং রাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে নারীরা উদ্বুদ্ধ করে। এটি ফেমিনিস্ট পিস থিওরির মৌলিক ধারণা।
2. Shadow Pandemic (ছায়া মহামারি): এটি বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত যে, যে কোন মহামারি বা দুর্যোগে নারীর প্রতি সহিংসতা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। তাই ফেমিনিস্ট পিস থিওরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারির সময়ে নারীদেরকে গৃহ নির্যাতন থেকে নিরাপদ রাখার উপর জোর দেয়। জাতিসংঘের মতে, করোনা মহামারিতে নারীদের উপর সহিংসতার মাত্রা পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি করোনা মহামারিতে প্রতি তিনজনে দুই জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছে। পারিবারিক অত্যাচার ও যৌন সহিংসতার কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। লকডাউনে রাষ্ট্র কর্তৃক চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপের কারণে অনেক নারী থানায় গিয়ে তাদের উপর পারিবারিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে পারেনি। আবার নারীদের মধ্যে 'মানিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি' তাদেরকে বিরত রেখেছে সহিংসতার ঘটনা প্রকাশে। পরিবারের পুরুষ সদস্যের উপর নির্ভরশীলতা এবং আরও বহুবিধ কারণে নারীরা এসব সহিংসতা থেকে প্রতিকার পাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে কভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর গৃহে নারী নির্যাতন (domestic violence) অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই জাতিসংঘ করোনাকালীন নারীদের উপর সহিংসতা বৃদ্ধিকে 'Shadow Pandemic' বা 'ছায়া মহামারি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
3. Environmental Security (পরিবেশগত নিরাপত্তা): জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী ভাঙন হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে সমুদ্রের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলস্বরূপ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ শরণার্থী হয়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, অপর্যাপ্ত কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানির অভাবসহ বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ২১৬ মিলিয়ন মানুষ ঘরছাড়া হবে। তাই যে মানুষগুলো জলবায়ু শরণার্থী হবে তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয় থাকলেও নারীরা সবচেয়ে অনিরাপদ থাকবে। তাই নারীবাদীরা চায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করুক।
Hegemonic stability theory (HST)
আচ্ছা আমাদের ঈশ্বর যদি দুজন হতো তাহলে কেমন হতো? একজন ঈশ্বর বলত আজকে সূর্য পূর্ব দিকে উঠবে। অন্যজন বলত- না! আজ সূর্য পূর্ব দিকে নয় বরং পশ্চিম দিকে উঠবে। তাই দুইজন ঈশ্বর থাকলে পৃথিবীতে একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হতো। এটাই Hegemony stability theory এর মূল কথা। বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষায় হেজিমন রাষ্ট্র থাকবে মাত্র একটি। বিশ্বে যখন শুধু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র থাকবে তখন বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ তখন তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না। কিন্তু বিশ্বে যখন দুই তিনটি রাষ্ট্র একসাথে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠবে তখন বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা ভিন্ন ভিন্ন মত নিয়ে আসবে। তখন বিশ্ব অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
নব্য বাস্তববাদ পড়ার সময় আমরা নৈরাজ্যবাদ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম বিশ্বের সকল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোনো একক নেতৃত্ব নেই। তাই কেউ কারো কথা শুনছে না। তাই হেজিমনিক তত্ত্ব অনুসারে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিশ্বের সব থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি দায়িত্ব নেবে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণ বিশ্বের সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে শুধু একটি রাষ্ট্র হেজিমন হলে কেন বিশ্বব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বিরাজ করবে? তত্ত্বগত জটিলতায় না গিয়ে সরাসরি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব। শুরুতেই বলতে চাই একটি রাষ্ট্র হেজিমন হতে হলে তাকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
1. Capability (সক্ষমতা): বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখতে যে-সকল রুলস-রেগুলেশনের প্রয়োজন সেগুলোকে বাস্তবায়ন করার মতো ঐ রাষ্ট্রের সক্ষমতা থাকা। সক্ষমতা বলতে অর্থনৈতিকভাবে অধিক সমৃদ্ধিশালী হতে হবে, সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক উন্নত হতে হবে।
2. Willingness (ইচ্ছা): হেজিমন হতে চাওয়া রাষ্ট্রের শুধু সক্ষমতা থাকলেই হবে না বরং তার ইচ্ছে থাকতে হবে। মনে করি একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে, সামরিকভাবে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালী। কিন্তু সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের হেজিমন হওয়ার ইচ্ছা তার নেই। তাহলে হবে না। তাই হেজিমন হতে হলে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করতে হবে।
3. Commitments (অঙ্গীকার): ধরি হেজিমন হতে চাওয়া রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও ইচ্ছা দুটোই আছে। তবে তাকে একটি কমিটমেন্ট দিতে হবে যে, সে কারো প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না এবং সকল রাষ্ট্রের স্বার্থকে সমানভাবে দেখবে। কমিটমেন্ট দিতে হবে যে, নিজ স্বার্থের চেয়ে বৈশ্বিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেবে。
Preponderance of Power
উপরিউক্ত তিনটি শর্ত মেনেই একটি রাষ্ট্রকে হেজিমন হতে হবে। বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার উপরিউক্ত তিনটি শর্ত পূরণ করার পর বিশ্বব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে হেজিমন রাষ্ট্রটি "Preponderance of Power" বাস্তবায়ন করবে। তথা হেজিমন রাষ্ট্রটি তার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তিনভাবে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে :
1. Diplomacy: ধরা যাক বিশ্বের দুটি রাষ্ট্র একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। তখন হেজিমন রাষ্ট্রটি বিশ্বের লিডার হিসেবে দুটি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নিরসনে এগিয়ে আসবে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বিরোধ সে মীমাংসা করে দেবে। এভাবে হেজিমন রাষ্ট্রটি বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখবে।
2. Persuasion: ধরা যাক একটি অঞ্চলের কয়েকটি রাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তখন হেজিমন রাষ্ট্রটি বিশ্বের নেতা হিসেবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলোকে সমাধানে আসার জন্য প্ররোচনা দেবে, যুক্তি পরামর্শ প্রভৃতি দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করবে। তখন ওই অঞ্চলে পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
3. Coercion: যদি দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলোকে উপরের দুইটি পদ্ধতি ব্যবহার করে সমাধানে নিয়ে আসা না যায় তাহলে হেজেমনিক রাষ্ট্রটি বিশ্বের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে মিলিটারি শক্তি ব্যবহার করবে।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে, বর্তমান সরকার নির্বাচনে পরাজিত হলে যিনি জয়ী হয়েছে তার হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেয়। ঠিক একই ভাবে পুরো বিশ্বকে একটি Global State হিসেবে কল্পনা করতে হবে। কয়েকবছর পর নতুন কোনো হেজিমনিক রাষ্ট্রের উত্থান হলে বর্তমানে যে রাষ্ট্রটি হেজিমন হিসেবে আছে সে নতুন হেজিমন রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। যেমন- ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের হেজিমন হিসেবে ব্রিটেনের পতন ঘটে। নতুন হেজিমন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। তখন ব্রিটেন মেনে নেয়। এভাবেই Hegemonic stability theory এর মাধ্যমে বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখা যায়। এই থিওরি মূলত আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Robert Gilpin এবং Stephen Krasner বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। যদিও এটি নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে।
After Hegemony
আমেরিকার পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট রবার্ট কিয়োহেন (Robert Keohane) বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য 'After hegemony' এই টার্মটি প্রথম নিয়ে আসেন। এটি মূলত Hegemonic stability theory এর বিপরীত। বিশ্বে যখন শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্র থাকে তখন আসলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। কারণ রাষ্ট্রগুলো স্বার্থপর। হেজিমন হওয়ার পর নিজ স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। ব্রিটেন দীর্ঘ একশো বছর বিশ্বের হেজিমন ছিল কিন্তু বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেনের অবদান নেই। ব্রিটেন নিজেই শতাধিক যুদ্ধে জড়িত হয়েছে। ব্রিটেনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের হেজিমন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বিশ্বকে স্থিতিশীল (Stable) করার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ল্যাটিন আমেরিকা-সহ গোটা বিশ্বেই সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে বিশ্ব আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়েছে। তাই রবার্ট কোহেনের মতে, বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখতে ১৯৪টি রাষ্ট্রের উচিত নয় শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্রের উপর নির্ভর করা। রাষ্ট্রগুলোর উচিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর উপর বেশি জোর দেওয়া।
অর্থাৎ Hegemonic stability theory এর মূল কথা হচ্ছে বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া। অন্যদিকে After hegemony এর মূল বক্তব্য হচ্ছে একটি একক রাষ্ট্রের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার উপর গুরুত্বারোপ করা। কেননা বিশ্বব্যবস্থায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে সক্ষম এবং সমস্যাগুলো অঞ্চল ভিত্তিক সমাধান করা বেশি কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ: ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সমস্যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমাধান করবে, দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা সার্ক সমাধান করবে, আফ্রিকার সমস্যাগুলো আফ্রিকান ইউনিয়ন সমাধান করবে ইত্যাদি।
উপসংহার
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ক্ষেত্রে, পঠনপাঠন ও গবেষণায়, রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে জ্ঞান আহরণে এবং প্রয়োগযোগ্য নীতিনির্ধারণে উপরিউক্ত তত্ত্বগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশ্ব রাজনীতি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া আজকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আগামীকাল ইতিহাসে পরিণত হবে। নতুন আরেকটি ইস্যু সামনে আসবে। কখনো আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিছু বৈশ্বিক ঘটনা ভবিষ্যতে নতুন খামে পুরোনো চিঠি নিয়ে হাজির হবে। তাই অতীতের কোনো ঘটনা বিশ্লেষণে, বর্তমানে চলমান কোনো ক্রাইসিসের ব্যাখ্যায় কিংবা ভবিষ্যতের গতিপ্রকৃতি বুঝতে এই অধ্যায়ে বর্ণিত তত্ত্বগুলো আমাদের পাথেয় হিসেবে কাজ করবে। একুশ শতকের জাতিরাষ্ট্রগুলোর আচরণ বিশ্লেষণে দারুণ কাজে দেবে।
Question to think about?
এই অধ্যায় জুড়ে আমরা দেখেছি পুরো বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কিংবা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো একক কার্যকরী সংস্থা বর্তমানে নেই। একই ভাবে গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার এবং স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব যদি শুধু একটি হেজিমন রাষ্ট্রের উপর থাকে তাহলে বিশ্ব আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে, একুশ শতকের বিশ্বকে স্থিতিশীল (Stable) রাখতে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
টিকাঃ
সহায়ক গ্রন্থাবলি:
1. Jacobsen, Kurt (2017), International Politics and Inner Worlds: Masks of Reason Under Scrutiny, Palgrave Macmillan
2. Dunne, Tim; Kurki, Milja and Smith, Steve (2017), International Relations Theories, Oxford University Press
3. Schuett, Robert (2010), Political Realism, Freud, and Human Nature in International Relations, New York: Palgrave
4. Braumoeller, Bear. (2013), The Great Powers and the International System: Systemic Theory in Empirical Perspective, Cambridge University Press
5. Hayes, Jarrod (2012), The democratic peace and the new evolution of an old idea, European Journal of International Relations
6. Hook, Steven W. (2010), Democratic Peace in Theory and Practice, Kent State University Press
7. Oatley, Thomas (2019), International Political Economy, Routledge
8. Shepherd, Laura J. (2nd ed. 2014). Gender matters in global politics: a feminist introduction to international relations, Routledge
9. Baylis, John (2011), The Globalization of World Politics, Oxford University Press
10. Mearsheimer, John J. (2011), Why Leaders Lie: The Truth About Lying in International Politics, Oxford University Press.
11. Finnemore, Martha (2003), The Purpose of Intervention: Changing Beliefs About the Use of Force, Cornell University Press