📄 সাদাকাহ ও দিন্দ্র জীবন যাপন (যুহ্দ)
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য হলো- সরল, সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ পার্থিব জীবন হলো আল্লাহ প্রদত্ত একটি বড় নি'মাত এবং একে ন্যায়ানুগভাবে ভোগ করতে কোনো অসুবিধা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা প্রশংসনীয়ও। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلٌ، عَلَيْهِ نِعْمَةً، فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ.
আল্লাহ তা'আলা যাকে কোনো নি'মাত দান করেন, নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন যে, যেন তাঁর দেওয়া সে নি'মাতের নিদর্শন তাঁর বান্দাহর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।৬০ ১
তবে এ জীবন ভোগ করার ক্ষেত্রে সরলতা ও অনাড়ম্বরতাই ইসলামে একান্ত কাম্য। কৃত্রিম আচরণ ও জীবন যাপন এবং বড় মানুষী ও অহঙ্কার প্রদর্শন ইসলাম মোটেও সমর্থন করে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إن .الْبَذَادَةَ مِنَ الإِيمَانِ "সরলতা ও সাদাসিধে জীবন যাপন হলো ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।”৬০২ সাইয়িদুনা 'উমার (রা.) বলেন, تهينًا عَنْ التَّكَلُّفِ - "আমাদেরকে কৃত্রিম আচরণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।”৬০৩
উল্লেখ্য যে, যার অন্তরে আল্লাহর ভয় স্থায়ী ও সুদৃঢ় হয়, তার নিকট পার্থিব জগত একটি মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হয় এবং এ দুনিয়া ও তার সুখ-সম্ভোগের প্রতি তার আগ্রহ লোপ পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর খালীফা ও সাহাবীগণ (রা.) অত্যন্ত সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। এ দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব, ভোগ-বিলাস, মান-মর্যাদা ও আসবাবপত্রের প্রতি তাঁদের না ছিল কোনো লোভ, না ছিল কোনো আগ্রহ। অনাড়ম্বর পোশাক-পরিচ্ছদ, সাধারণ খাদ্য, জাঁকজমকহীন মামুলি বাড়ি-ঘর, সাদাসিধে ও গরীবানা জীবন যাপন ছিল তাঁদের জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এ দুনিয়াটা তাঁদের আসল আবাসস্থল নয়; এটা একটা সরাইখানা অর্থাৎ একজন মুসাফিরের ক্ষণকালের বিশ্রামস্থল মাত্র। কাজেই একজন মুসাফির সফরের জন্য যে সাদামাটা ও একান্ত প্রয়োজনীয় রসদপত্র সংগ্রহ করে, ঠিক সে ধরনের রসদপত্রই দুনিয়ায় বসবাসের জন্য যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ- “দুনিয়ায় তুমি বসবাস করো এমন নিরাসক্তভাবে, যেন তুমি একজন প্রবাসী কিংবা পথিক।”৬০৪ দুজাহানের সর্দার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নিকট এ বলে দু'আ করতেন,
اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مِسْكِينًا، وَأَمِتْنِي مِسْكِينًا، وَاحْشُرْنِي فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- “হে আল্লাহ! আমাকে মিসকীনরূপে জীবিত রাখুন! মিসকীনরূপে মৃত্যু দান করুন এবং কিয়ামাতের দিনে মিসকীনদের দলেই আমার হাশর করুন!”৬০৫
তাঁর বিছানা ছিল খেজুর পাতার চাটাই। একদিন ঘুম থেকে জাগলেন। কাছেই ছিলেন প্রিয় সাহাবী 'উমার (রা.)। চেয়ে দেখলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসারা পিঠে খেজুর পাতার দাগ পড়ে আছে। রোম পারস্যের বেদীন বাদশাহরা কতো আড়ম্বরের জীবন কাটায় আর আখিরী নবী সাইয়িদুল মুরসালীন এতো কষ্টে জীবন যাপন করবেন- এসব ভেবেই হয়তো প্রিয়নবীর জন্য একটু কোমল বিছানা তৈরির অনুমতি চাইলেন 'উমার (রা.)। কিন্তু সাইয়িদুল মুরসালীন এই বলে বারণ করলেন যে,
مَا لِي وَلِلدُّنْيَا مَا مَثَلِي وَمَثَلُ الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِب سَارَ فِي يَوْمٍ صَائِفِ فَاسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ سَاعَةً مِنْ نَهَارِ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا.
দুনিয়ার প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। দুনিয়ায় আমার একমাত্র উদাহরণ হলো ঐ উষ্ট্রারোহী, যে গ্রীষ্মের দিনে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, অতঃপর তা ছেড়ে চলে যায়। ৬০৬
আরেক দিনের ঘটনা। দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে আদুরের দুলালী ফাতিমা (রা.)-এর গৃহপ্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হঠাৎ দেখতে পেলেন ফাতিমা (রা.)-এর গৃহদ্বারে একটি রঙিন পর্দা ঝুলছে। নবী- নন্দিনী ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে ইতঃপূর্বে কখনো আড়ম্বরের কিছু দেখা যায়নি।
মূলত আজ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরআগমন উপলক্ষেই এমনটি করা হয়েছিল। এ মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো ভাবলেন, এই আরবে এখনো কতো দুঃখী-দরিদ্র মানুষের রোনাজারি। কতো বুভুক্ষের ক্রন্দন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চিন্তায় অধীর সারাক্ষণ, আর তাঁর দুলালীর দ্বারে রঙিন পর্দা ঝুলবে! চোখেমুখে ক্রোধের ছাপ নিয়ে এবার সেখান থেকেই ফিরে এলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ওদিকে খাতুনে জান্নাত সাইয়িদা ফাতিমা (রা.)-এর মনে সীমাহীন উৎকণ্ঠা। অতঃপর আলী (রা.) খবর নিয়ে এসে জানালো, নবী-নন্দিনীর এ সামান্য বিলাসিতাটুকুও নবীজীর পছন্দ নয়। তৎক্ষণাৎ তিনি ক্ষমা চেয়ে সংবাদ পাঠিয়ে দিলেন যে, আব্বাজানকে বলো, তিনি যেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দুঃখী-দরিদ্রদেরকে দান করে দেন। ৬০৭
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসাহাবীগণের মধ্যেও কেউ কেউ অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও ধনৈশ্বর্যের মালিক হওয়া সত্ত্বেও চলাফেরা করতেন একজন মামুলি লোকের মতো। আবূ বাকর (রা.) ছিলেন এরূপ একজন মহান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কিন্তু তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরহীন, অত্যন্ত সহজ-সরল। তিনি প্রায় এ বলে দু'আ করতেন, اللَّهُمَّ ابْسُطُ لِي الدُّنْيَا وَزَهُدْنِى فَيْهَا - “হে আল্লাহ, দুনিয়া আমার জন্য প্রশস্ত করে দাও। কিন্তু এর ঘূর্ণাবর্তে নিমগ্ন ও আসক্ত হওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করো। ”৬০৮ তাঁর খিলাফাত কালেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মুসলিমরা জয় লাভ করে। এতদসত্ত্বেও তাঁর অনাড়ম্বর জীবন যাপনের প্রতি আগ্রহের অবস্থা এই ছিলো যে, তিনি নিজে পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করা পছন্দ করতেন। খালীফা হওয়ার পরও তিনি কিছু দিন সংসারের খরচের জন্য বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। রাজকোষ থেকে সামান্য ভাতা নিতেন। মুসলিম বিশ্বের খালীফা হয়েও তিনি জাতীয় সম্পদ ভোগ করার ব্যাপারে যে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তা সর্বকালের মানুষের আদর্শ হয়ে থাকবে।
একবার তাঁর স্ত্রীর হালুয়া খাওয়ার সাধ জাগলো। তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা স্বামীকে জানালে তিনি উত্তরে বলেন, "তা কেনার মতো সামর্থ্য আমার নেই।" স্ত্রী বললেন, "আচ্ছা! আপনি প্রতি দিনের খরচের জন্য আমাকে যা কিছু দিয়ে থাকেন, তা থেকে আমি কিছু কিছু সঞ্চয় করে হালুয়ার মূল্য সংগ্রহ করবো।"
আবূ বাক্স (রা.) বললেন, আচ্ছা, তা করো। কয়েকদিনের মধ্যে হালুয়ার অর্থ সংগৃহীত হয়ে গেলো। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আবূ বাক্স (রা.) বললেন, "এটা তো আমাদের খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশ।" অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে, কিছু অর্থ হ্রাস করলেও আমাদের প্রতিদিনের ব্যয় নির্বাহ হতে পারে। তাই প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ তাঁর স্ত্রী জমা করেছিল, সে পরিমাণ অর্থ তিনি ভাতা থেকে হ্রাস করে দেন। আর ইতোমধ্যে তাঁর স্ত্রী হালুয়ার জন্য যে অর্থ জমা করেছিল, তাও তিনি রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। "৬০৯
আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) লোকদেরকে এক সাথে নানা সুস্বাদু খাবার গ্রহণ করা থেকে বারণ করতেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, এভাবে লোকেরা নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে লেগে যাবে, ভালো ভালো খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং এর জন্য বাড়াবাড়ি ও কৃত্রিম আচরণ শুরু করে দেবে।৬১০
সাইয়িদুনা 'আলী (রা.) জাঁকজমক পছন্দ করতেন না। নিজে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মুসলিম জাহানের খালীফা হয়েও তিনি সংসারের কাজ নিজেই করতেন। তাঁর সহধর্মিণী ফাতিমাতুয যাহরা (রা.) নিজের হাতে যাঁতা পিষে গম গুঁড়ো করতেন। তাঁর কোনো দাসদাসী ছিল না।
এ হলো প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার ও খালীফাগণের সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবন যাপনের কয়েকটি সাধারণ দৃষ্টান্ত। আজকের পৃথিবীতে আমাদের নিকট এসব কথা গল্পের মতোই মনে হবে। কারণ এ যুগের ক্ষমতাশীল ও তাদের পরিবারবর্গের পক্ষে এসব বিষয়ের কল্পনাও যেন কষ্টকর।
টিকাঃ
৬০ ১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ১৯৯৩৪
৬০২. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আত-তাজ্জল), হা. নং: ৪১৬৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১১৮
৬০৩. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-ই'তিসাম), হা. নং: ৬৮৬৩
৬০৪. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আর-রিকাক), হা. নং: ৬০৫৩; তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩৩৩
৬০৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ২৩৫২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪১২৬
৬০৬. আহমাদ, আল-মুসনাদ, হা. নং: ২৭৪৪
৬০৭. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-হিবাহ), হা. নং: ২৪৭১। পূর্ণ হাদীসটি হলো- عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْتَ فَاطِمَةً فَلَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهَا وَجَاءَ عَلِيٌّ فَذَكَرَتْ لَهُ ذَلِكَ فَذَكَرَهُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنِّي رَأَيْتُ عَلَى بَابِهَا سِتْرًا مَوْشِيًّا فَقَالَ مَا لِي وَلِلدُّنْيَا فَأَتَاهَا عَلِيٌّ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهَا فَقَالَتْ لِيَأْمُرْنِي فِيهِ بِمَا شَاءَ قَالَ تَرْسِيلُ بِهِ إِلَى فُلَانٍ أَهْلِ بَيْتٍ بِهِمْ حَاجَةٌ.
৬০৮. দাতা গঞ্জে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ৭০; হাক্কী, রূহুল বায়ান, খ. ৫, পৃ. ৩৩০ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও প্রায় অনুরূপ দু'আ বর্ণিত রয়েছে। (দ্র. তাবারানী, আদ-দু'আ, হা. নং: ১৪৪৯)
৬০৯. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, খ. ১,পৃ. ৩৯৭
৬১০. 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সাইয়িদুনা 'উমার (রা.)-এর নিকট খবর পৌছে যে, ইয়াযীদ ইবুন আবী সুষ্ঠুয়ান (রা.) নানা আইটেমের খাবার খান। এ খবর জানার পর 'উমার (রা.) তাঁর গোলাম ইয়ারফা' (রা.) কে বললেন, যখন তুমি জানতে পারবে যে, রাতে তাঁর খাবার পৌঁছে গেছে, তখন তুমি আমাকে অবহিত করবে। অতএব, যখন রাতে ইয়াযীদ (রা.)-এর নিকট তাঁর খাবার পৌঁছলো, তখন ইয়ারফা' 'উমার (রা.)কে অবহিত করলো। এরপর 'উমার (রা.) তাঁর বাড়িতে এসে প্রথমে সালাম করলেন, তারপর বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ইয়াযীদ (রা.) তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং তিনি বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। এ অবস্থায় প্রথম খাবার আসলো রুটি-গোস্ত। 'উমার (রা.) তাঁর সাথে বসে খেলেন। এরপর ভুনা গোশত আনা হলো। ইয়াযীদ (রা.) খাবার জন্য হাত বাড়ালেন। এমতাবস্থায় 'উমার (রা.) তাঁকে বারণ করলেন এবং বললেন,
والله يا يزيد بن أبي سفيان أطعام بعد طعام والذي نفس عمر بيده لأن خالفتم عن سنتهم ليخالفن بكم عن طريقتهم. "ইয়াযীদ! এক খাবারের সাথে দ্বিতীয় খাবার! আল্লাহর কসম, যদি তোমরা লোকদের সাধারণ রীতির অনুসরণ না করো, তবে লোকেরাও তোমাদের রীতি অনুসরণ করে একপর্যায়ে নিজেদের রীতি ছেড়ে দেবে।” (ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ, হা.নং:৫৭৮; 'আলী আল-হিন্দী, কানযুল 'উম্মাল, হা.নং: ৩৫৯২১)
📄 আত্মসমালেচনা করা (মুহাসাবাহ)
আত্মশুদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য একটি কার্যকর ও উপকারী ব্যবস্থা হলো আত্মসমালোচনা। মানুষ যখন সদিচ্ছা নিয়ে নিজের নাফসের অবস্থা ও কার্যকলাপ নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে, তখন তার পক্ষে আর মন্দ পথে বা অন্যায় কাজে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ থাকে না। কেননা, যখন সে নিজের নাফসকে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ভৎর্সনা ও শাসন করবে, তখন সে নাফস বাজে পথে ও অন্যায় কাজে জড়িত হওয়ার জন্য আর প্রেরণা যোগাবে না। এ কারণে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে নিজের নাফসের হিসাব-নিকাশ নেয়ার জন্য তাগাদা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ﴿ - "প্রত্যেক ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা করা উচিত যে, কাল কিয়ামাতের দিনের জন্য সে কি পাথেয় সংগ্রহ করছে।”৬১১ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللهِ.
বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি, যে নিজের নাফসের সমালোচনা করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সাফল্যের জন্য 'আমাল করে। আর নির্বোধ বা অক্ষম ঐ ব্যক্তি যে নিজের নাফসের কামনা-বাসনার অনুকরণ করে চলে এবং আল্লাহর নিকট বড় বড় আশা পোষণ করে। ৬১২
আমীরুল মু'মিনীন উমার (রা.) বলেন,
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا، وَزِنُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوزَنُوا ، وَتَزَيَّنُوا لِلْعَرْضِ الْأَكْبَرِ وَإِنَّمَا يَخِفُ الْحِسَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى مَنْ حَاسَبَ نَفْسَهُ فِي الدُّنْيَا.
(কিয়ামতের দিন) তোমাদের 'আমালের হিসাব নেয়ার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের নাফসের হিসাব-নিকাশ করো ৬১৩ এবং তোমাদের 'আমালগুলো পরিমাপ করার আগে তোমরা নিজেরা নিজেদের নাফসকে মাপো। অধিকন্তু, (সে দিনে) 'আমালের বড় হিসাবের জন্য সুন্দররূপে প্রস্তুত হও। কেননা, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিজেই নিজের নাফসের হিসাব-নিকাশ করবে, কিয়ামাতের দিন তার হিসাব-নিকাশ সহজ হবে। ৬১৪
মাইমূন ইবনু মিহরান [৩৭-১১৭] (রা.) বলেন, لَا يَكُونُ الْعَبْدُ تَقِيًّا حَتَّى يُحَاسِبَ نَفْسَهُ كَمَا يُحَاسِبُ شَرِيكَهُ مِنْ أَيْنَ مَطْعَمُهُ وَمَلْبَسُهُ.
না, যে যাবত না সে নিজের নাফসের হিসাব নেয়, যেমন সে নিজের অংশীদারের হিসাব নিয়ে থাকে যে, তার খাবার কোথেকে এলো, তার পোশাক কিভাবে সংগৃহীত হলো।”৬১৫
উল্লেখ্য, মানুষ আত্মসমালোচনার এ প্রেরণা আল্লাহর ভয় থেকে লাভ করে থাকে। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহকে যতো বেশি ভয় করে, তার মধ্যে আত্মসমালোচনার মনোবৃত্তিও ততো বেশি পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। তারীকাতের শাইখগণ মানুষের নাফস ও কর্মজীবনকে পরিশুদ্ধ করতে মুহাসাবা ও মু'আতাবাহ অর্থাৎ আত্মসমালোচনা ও আত্মভৎর্সনার তালীম দেন। বলাই বাহুল্য, এ আত্মসমালোচনা দিনে-রাতে যতো বেশি করা যায়, ততোই ভালো। অন্তত প্রতি দিন শেষে শোয়ার সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে কাজগুলো করা হয়েছে তার পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এ সময় চিন্তা করা উচিত, দিনে যে কাজগুলো করা হয়েছে এবং করা হয়নি- তা যথার্থ ও সঠিক হয়েছে কি-না, যদি যথার্থ ও সঠিক হয়, তা হলে তার জন্য আল্লাহর শুকর আদায় করা উচিত। যদি তা যথার্থ ও সঠিক না হয়, তা হলে কি কারণে এমন হলো- তা খোঁজে বের করা দরকার এবং এর জন্য নাফসকে ভৎর্সনা করা উচিত।
মুহাসাবাহর অন্য একটি প্রকরণ হলো- মনের মধ্যে কোনো কাজ করার ইচ্ছা জাগ্রত হবার সময় চিন্তা-ভাবনা করে দেখা যে, কাজটি ভালো না-কি মন্দ? যদি ভালো হয়, তাহলে তা কি আজই সম্পাদন করা উত্তম হবে, না-কি আজ তা থেকে বিরত থাকা উত্তম হবে? যদি তা আজ সম্পাদন করা উত্তম হয়, তা হলে চিন্তা করতে হবে, তা করার পেছনে উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, না-কি কেবল পার্থিব স্বার্থ লাভই উদ্দেশ্য? যদি চিন্তা-ভাবনার পর মন সাক্ষ্য দেয় যে, তা ভালো ও তার জন্য উপকারী এবং তা আজই সম্পন্ন করা প্রয়োজন, অধিকন্তু এর পেছনে উদ্দেশ্যও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, তবেই কাজটি সম্পাদন করতে তৎপর হতে হবে। অন্যথায় কাজটি করা থেকে বিরত থাকতে হকে। বলাই বাহুল্য, এরূপ চিন্তা-ভাবনা প্রতিটি কাজের আগেই কাজের চিন্তা জাগ্রত হবার শুরুতেই করতে পারলে ভালো। বিশিষ্ট তাবি'ঈ আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.) বলেন,
رَحِمَ اللهُ عَبْدًا وقف عِنْدَ هَمِّهِ ، فَإِنَّهُ لَيْسَ مِنْ عَبْدٍ يَعْمَلُ حَتَّى يَهُمْ ، فَإِنْ كَانَ خَيْرًا أَمْضَاهُ ، وَإِنْ كَانَ شَرًّا كَفَّ عَنْهُ.
আল্লাহ তা'আলা সে বান্দাহর প্রতি রাহমাত করুন, যে তার ইচ্ছার কাছে থেমে যায়! (অর্থাৎ ইচ্ছা জাগ্রত হবার পর সে তা দ্রুত বাস্তবায়নে নেমে পড়ে না; বরং চিন্তা-ভাবনা করে দেখে।) কেননা, প্রত্যেক বান্দাহই কাজের শুরুতে ইচ্ছা করে, তারপর কাজে অবতীর্ণ হয়। যদি চিন্তাভাবনা করে জানতে পারে যে, কাজটি ভালো, তবেই সে তা কার্যকর করে, আর যদি জানতে পারে যে, তা খারাপ, তবে সে বিরত থাকে। ৬১৬
যদি প্রতিটি কাজের শুরুতে এরূপ চিন্তা-ভাবনা করা না যায়, তা হলে অন্তত প্রত্যেক দিন সকালে ওঠে ফাজরের নামায শেষ করে কিছুক্ষণ বসে এভাবে চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে যে, তার আজ কি কি কাজ করার দরকার আছে এবং এ কাজ ও দায়িত্বগুলোর গুরুত্ব কতোটুকু? তন্মধ্যে কোনটি ভালো ও উপকারী এবং কোনটি অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক? কোনটি আল্লাহর জন্য এবং কোনটি কেবল পার্থিব উদ্দেশ্যে? এ সব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে নিজের নাফসকে এভাবে উপদেশ দেয়া যেতে পারে যে, তুমি আজ অমুক অমুক কাজ করবে, অমুক অমুক কাজ থেকে বিরত থাকবে। সারা দিন এ উপদেশসমূহ মেনে চলবে। সূফীগণের পরিভাষায় নাফসকে প্রত্যহ দৈনন্দিন কার্যকলাপ সম্পর্কে পরামর্শ দান করাকে (المشارطة )মুশারাতাহ) বলা হয়। ৬১৭
টিকাঃ
৬১১. আল-কোরআন, সূরা আল-হাশর, ৫৯: ১৮
৬১২. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান, (কিতাব: আয-যুহদ), হা. নং: ৪২৬০
৬১৩. আবূ বাকর আস-সিদ্দীক (রা.) থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত রয়েছে। (দীনাউরী, আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল 'উলূম, হা. নং: ১২৯০)
৬১৪. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯; ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, হা. নং: ৩৫৬০০
৬১৫. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: সিফাতুল কিয়ামাহ), হা. নং: ২৪৫৯
৬১৬. ইবনু আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ, (কালামুল হাসান আল-বাসরী রাহ.) হা. নং: ৩৬৩৩৫ কোনো কোনো রিওয়ায়াতে আল-হাসান আল-বাসরী (রাহ.)-এর বক্তব্যের শেষাংশটি এভাবে এসেছে .فَإِنْ كَانَ لِلَّهِ عَزَّ وَحَلْ مَضَى، وَإِنْ كَانَ لِغَيْرِ اللَّهُ أَمْسَكَ ........ যদি জানতে পারে যে, কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হবে, তবেই সে তা কার্যকর করে, আর যদি জানতে পারে যে, তা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো উদ্দেশ্যে হবে, তবে সে তা থেকে বিরত থাকে।" (বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৪৭: মু'আলাজাতু কুল্লি যানবিন বিত-তাওবাহ, হা. নং: ৬৮৯৪)
৬১৭. গাযালী, ইহয়া.., খ. ৪, পৃ. ৩৯৪
📄 নাফসকে শাস্তি দান (বিশেষ মুজাহাদাহ)
যদি কখনো কোনো গুনাহ বা অন্যায় কাজ সংঘটিত হয় অথবা কোনো ভালো কাজ ছুটে যায় এবং তাওবাহ ও ভৎর্সনা দ্বারা কাজ না হয়; বরং তা পুনঃ পুনঃ সংঘটিত হতে থাকে, তা হলে নাফসের জন্য কিছু শিক্ষামূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেমন- প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও সুস্থতার প্রতি খেয়াল রেখে অতিরিক্ত বিশ্রাম ও পানাহার ত্যাগ করা, অতিরিক্ত সাজসজ্জা ত্যাগ করা, মানুষের সাথে একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত মেলামেশা পরিহার করা, নিজের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক বা আর্থিক কোনো দায়িত্ব (যেমন- নাফল নামায, নাফল রোযা, নাফল সাদাকাহ) আরোপ করা বা নিজের ওপর শারীরিক কোনো হালকা দণ্ড চাপানো, শারীরিকভাবে গরীব-মিসকীনদের খিদমাত ও সেবা করা এবং নিজের অতীতের অসহায়ত্ব ও দুর্দশার কথা বর্ণনা করা প্রভৃতি। নাফসের দোষ-ত্রুটি সংশোধনের জন্য চিকিৎসাস্বরূপ এ প্রকৃতির যে সব 'আমাল করা হয়, সূফীদের পরিভাষায় এগুলোকে 'মুজাহাদাহ' বলা হয়। কেননা, এতেও নাফস দলিত হয় এবং প্রকৃত মুজাহাদাহর প্রশিক্ষণ ও তাকে অভ্যাসে পরিণত করার ক্ষেত্রে এ কাজের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সালাফে সালিহীনের 'আমালের মধ্যেও এভাবে নাফসকে শাস্তি দেওয়ার ও দলিত করার নজীর খোঁজে পাওয়া যায়। নিম্নে এরূপ কাজের কয়েকটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করা হলো-
উম্মুল মু'মিনীন হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে বিছানায় আরাম করতেন, সেটি ছিলো চটের। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেটিকে দ্বিগুণ করে দিতাম। তিনি তার ওপর বিশ্রাম করতেন। এক রাতে আমি সেটিকে আরো দ্বিগুণ করে মোট চারপাট করে বিছিয়ে দিলাম, যাতে তিনি আরো বেশি প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। সকাল বেলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, مَا فَرَشْتُمْ لِيَ اللَّيْلَةَ؟ -"আজ রাতে তুমি আমার জন্য কী বিছিয়েছিলে?" আমি আরয করলাম, هُوَ فِرَاشُكَ إِلَّا أَنَّا .ثَنَيْنَاهُ بأربع ثَنْيَاتٍ ، قُلْنَا : هُوَ أَوْطَأَ لَكَ "সে পুরাতন বিছানাটিই। আমি শুধু তাকে চার ভাঁজ করে দিয়েছিলাম। মনে করলাম, এটা আপনার জন্য অধিক আরামপ্রদ হবে।" তিনি বলেন, رُدُّوهُ لِحَالَتِهِ الْأُولَى ، فَإِنَّهُ مَنَعَتْنِي وَطَاءَتُهُ صَلَاتِي : اللَّيْلَ-"ওটিকে পূর্বেকার মতো করে দাও। কেননা, সে বিছানার কোমলতা আজ রাতে আমাকে নামায থেকে বিরত রেখেছে। "৬১৮
আসলাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার 'উমার আল-ফারুক (রা.) খালীফা আবূ বাক্স আস-সিদ্দীক (রা.)-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে দেখেন, তিনি স্বীয় জিহ্বা ধরে টানছেন। তা দেখে 'উমার (রা.) আরয করলেন, مَهْ ، يَغْفِرُ الله لَكَ-" আপনি এ কি করছেন? ছেড়ে দিন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন!" উত্তরে খালীফা আবু বাক্স (রা.) বললেন, .إِنْ هَذَا أَوْرَدَنِي الْمَوَارِدَ “এ জিহ্বা আমাকে অনেক বিপদে ফেলেছে। "৬১৯
'উমার আল-মাখযূমী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমীরুল মু'মিনীন 'উমার (রা.) তাঁর এক বক্তব্যে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরওপর সালাত ও সালাম পাঠ করে সমবেত লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, أَيُّهَا النَّاسُ : لَقَدْ رَأَيْتُنِي أَرْعَى عَلَى خَالاتٍ لِي مِنْ بَنِي مَحْزُومٍ ، فَيَقْبِضْنَ لِي الْقَبْضَةَ مِنَ التَّمْرِ أَو الرَّبِيبِ ، فَأَظَلَّ يَوْمِي وَأَيُّ يَوْمٍ . হে জনমণ্ডলী, আমি সে যুগও দেখেছি যে, যখন আমি বানু মাখযূমে আমার খালাদের বকরী চরাতাম। তারা এর বিনিময়ে আমাকে এক মুষ্টি খেজুর আর কিসমিস দিতো। আমি তা দিয়ে সারা দিন কাটিয়ে দিতাম। সে এক করুণ সময় ছিলো।
বক্তব্য শেষে 'আবদুর রাহমান ইবনু 'আউফ (রা.) তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ ! ما زدت على أن قئمت نَفْسَكَ - يَعْنِي : عِبْتَ -
হে আমীরুল মু'মিনীন, আজ তো আপনি নিজের দুর্বলতা ছাড়া আর কিছুই বললেন না। তিনি উত্তর দিলেন,
وَيْحَكَ يَا ابْنَ عَوْفٍ ! إِنِّي خَلَوْتُ ؛ فَحَدَّثَتْنِي نفسي ؛ قال : أَنْتَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ ؛ فَمَنْ ذَا أَفْضَلُ مِنْكَ ؟ فَأَرَدْتُ أَنْ أُعَرِّفَهَا نَفْسَهَا.
হে ইবনু 'আউফ, ধিক তোমাকে! আমি একাকী ছিলাম। এ সময় আমার মন আমাকে বলে, তুমি তো আজ আমীরুল মু'মিনীন! মুসলিমদের মধ্যে তোমার চাইতে শ্রেষ্ঠ কে হবে? তাই আমি ইচ্ছা করেছি, স্বীয় নাফসকে দলিত করবো এবং তাকে আমার পূর্বের অবস্থা জানাবো। ৬২০
উপর্যুক্ত রিওয়ায়াতসমূহ থেকে নাফসের নিয়ন্ত্রণ ও শারী'আতের বিধি-নিষেধ পালনে নাফসকে অভ্যস্ত করার উদ্দেশ্যে নাফসের জন্য কিছু শিক্ষামূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা যায়। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, যাতে এ কাজে কোনোরূপ সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করা না হয়। যেমন- হালালকে হারামে পরিণত করা, বিয়ে-শাদী ত্যাগ করা, প্রয়োজনীয় পানাহার, বিশ্রাম ও সাজসজ্জা পরিহার করা, পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরাফেরা করা, নিভৃতে 'ইবাদাতের উদ্দেশ্যে লোকালয় ছেড়ে চলে যাওয়া এবং অরুচিকর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করা প্রভৃতি। সনাতন হিন্দু ও খ্রিস্ট প্রভৃতি ধর্মে সাধনার নামে এ সব কাজ প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ইসলামী শারী'আতে এ সব কাজ সমর্থনযোগ্য নয়।
টিকাঃ
৬১৮. তিরমিযী, আশ-শামা'য়িল, হা. নং:৩২৯; বাগাভী, আল-আনওয়ারু ফী শামা'য়িলিন নাবী, হা. নং: ৮৩৫
৬১৯. মালিক, আল-মুওয়াত্তা, হা. নং: ৩৬২১; বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৩৪: হিফযুল লিসান), হা. নং:৪৫৯৬, ৪৬৩৬
৬২০. দীনাউরী, আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল 'ইলম, হা. নং: ১৬৮২; 'আলাউদ্দীন আল-মুত্তাকী, কানযুল 'উম্মাল, হা. নং: ৩৫৯৯২
📄 সৎ ও মুত্তাক্বী লোকদের সুহবাত
নিঃসন্দেহে মানুষের চিন্তা-চেতনা, চরিত্র ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে সৎ ও মুত্তাকী লোকদের সুহবাত এবং সংশ্রবের গভীর প্রভাব রয়েছে। সাধারণত যে ব্যক্তির সাথে যার নিরন্তর ওঠাবসা হয়, তার চিন্তা, আচার-আচরণের প্রভাবও ঐ ব্যক্তির ওপর পড়ে থাকে। কেননা বন্ধুত্ব, সাহচর্য ও সংশ্রব প্রভৃতি ক্রিয়াশীল। এর দ্বারা মানুষ স্বভাবতই দ্রুত প্রভাবিত হয়। কথায় বলা হয়, 'সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।' সৎ ও দীনদার লোকদের সুহবাত নাফসকে পরিশুদ্ধ করে, ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করে, অন্তর জীবিত করে এবং সত্য পথে চলতে প্রেরণা যোগায়। পক্ষান্তরে অসৎ ও দূরাচারী লোকদের সুহবাত মানুষকে বিপথগামী করে দেয়, অন্তরকে দুনিয়ার বিভিন্ন ধান্দায় মাশগুল করে রাখে ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে দেয়। বিশিষ্ট সূফী মাওলানা জালালুদ্দীন আর-রূমী (৬০৪-৬৭২হি.) (রাহ.) বলেন,
صُحْبَتْ صَالِحْ تُرَا صَالِحْ كُنَدْ صُحْبَتْ طَالِحْ تُرَا طَالِحْ كُنَدْ সৎ লোকের সংশ্রব তোমাকেও সৎ লোকে পরিণত করবে এবং অসৎ লোকের সংশ্রব তোমাকেও মন্দ লোকে পরিণত করবে।
এ কারনেই ইসলামে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের সুহবাত ও সংসর্গ অবলম্বনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে অসৎ সঙ্গ বর্জনের জন্যও কঠোরভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيرِ فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً وَنَافِخُ الْكِيرِ
إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةٌ 'সৎসঙ্গী হলো মেস্ক বহনকারী আর অসৎ সঙ্গী হলো হাপরে ফুঁকদানকারী সদৃশ। মেস্ক বহনকারীর সান্নিধ্যে গেলে হয়তো সে তোমাকে আতর হাদিয়া দেবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে আতর খরিদ করবে অথবা অন্ততপক্ষে তুমি সুগন্ধি পাবে। কিন্তু হাপরে ফুঁকদানকারীর সান্নিধ্যে গেলে হয়তো সে তোমার কাপড় জ্বালিয়ে ফেলবে অথবা তুমি দুর্গন্ধ পাবে। ৬২১
অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَمَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِنْ لَمْ يُصِبْكَ مِنْهُ شَيْءٌ أَصَابَكَ مِنْ رِيحِهِ وَمَثَلُ جَلِيسِ السُّوءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْكِيرِ إِنْ لَمْ يُصِبْكَ مِنْ سَوَادِهِ أَصَابَكَ مِنْ دُخَانِهِ সৎসঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো মেস্ক বহনকারীর মতোই। যদি তুমি তার থেকে মেস্ক নাও পাও, ঘ্রাণ তো অবশ্যই পাবে। পক্ষান্তরে অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো হাপরধারীর মতো। তার হাপরের স্ফুলিঙ্গ তোমার গায়ে না লাগলেও ধোঁয়া তো অবশ্যই লাগবে। ৬২২
এ হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, নাফসের সংশোধন ও চরিত্রের উন্নতির ক্ষেত্রে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের সুহবাত একটি অতি কার্যকর ও উপকারী ব্যবস্থা। ইমাম আল-বাইহাকী [৩৮৪-৪৫৮হি.] (রাহ.) বলেন,
وَمَعْلُومٌ فِي الْعَادَاتِ أَنْ ذَا الرَّأْيِ بِمُحَالَسَتِهِ أُولِي الْأَحْلَامِ وَالنُّهَى يَزْدَادُ رَأَيَّا، وَأَنْ الْعَالِمَ يَزْدَادُ بِمُخَالَطَةِ الْعُلَمَاءِ عِلْمًا، وَكَذَلِكَ الصَّالِحُ وَالْعَاقِلُ بِمُجَالَسَةِ الصَّلَحَاءِ والْعُقَلَاءِ، فَلَا يُنْكَرُ أَنْ يَكُونَ ذُو الْخُلُقِ الْحَمِيلِ يَزْدَادُ حُسْنَ خُلُقٍ بِمُحَالَسَةِ أُولِي الْأَخْلَاقِ الْحَسَنَةِ.
স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন জ্ঞানীদের সাথে ওঠাবসা করে, তখন তার বুদ্ধিমত্তা আরো বৃদ্ধি পায়। একজন 'আলিম যখন অন্য আলিমগণের সংস্পর্শে আসে, তখন তার 'ইলম আরো বৃদ্ধি পায়। অনুরূপভাবে একজন সৎ, ন্যায়বান ও জ্ঞানী লোক অন্য সৎ, ন্যায়বান ও জ্ঞানী লোকদের সুহবাতে এলেও তা-ই হয়। কাজেই সৎ গুণাবলি সম্পন্ন ব্যক্তিদের সুহবাতে একজন সচ্চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির নৈতিকতার উৎকর্ষ সাধন হবে- এটাও অনস্বীকার্য। ৬২৩
সাহাবা কিরাম (রা.) জাহিলিয়্যাতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকার পর একমাত্র নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সুহবাত ও সংশ্রবের মাধ্যমে লাভ করেছিলেন পরিশুদ্ধ আত্মা, উন্নত চরিত্র, পবিত্র জীবন ও উচ্চ মর্যাদা। হানযালাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আবূ বাক্ (রা.) আমার সাথে সাক্ষাত করলেন এবং বললেন, হানযালাহ! কেমন আছো? আমি বললাম, হানযালাহ মুনাফিক হয়ে গেছে। আবূ বাক্ (রা.) এটা শোনে আশ্চর্যান্তি হয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! তুমি এ-ই কী কথা বলছো! আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সান্নিধ্যে অবস্থান করি এবং তিনি আমাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তখন আমাদের মনে হয় যেন, আমরা এগুলো নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসান্নিধ্য থেকে চলে আসি, তখন আমরা পরিবার-পরিজন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জাগতিক ধন-সম্পদের মোহে অধিকতর লিপ্ত হয়ে পড়ি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরসান্নিধ্যের সব কিছু ভুলে যাই। এটা শোনে আবু বাক্ (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম! আমার অবস্থা তো অনুরূপ। অতঃপর আমি এবং আবূ বাক্ (রা.) গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামেরখিদমাতে উপস্থিত হলাম। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হানযালাহ তো মুনাফিক হয়ে গেছে। এটা শোনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এটা কিভাবে?
আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যখন আপনার সান্নিধ্যে অবস্থান করি এবং আপনি আমাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তখন আমাদের মনে হয় যেন, আমরা এগুলো নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমরা যখন আপনার সান্নিধ্য থেকে চলে আসি, তখন আমরা পরিবার-পরিজন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জাগতিক ধন-সম্পদের মোহে লিপ্ত হয়ে পড়ি এবং দীনের সব কিছু ভুলে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي وَفِي الذِّكْرِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً.
ঐ আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ নিবদ্ধ! তোমরা আমার সামনে অবস্থানকালীন সময়ে যেরূপ থাকো, সর্বদা যদি ঐ রূপ থাকতে পারতে এবং সর্বক্ষণ আল্লাহকে স্মরণ রাখতে পারতে, তা হলে ফেরেশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও চলার পথে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করতো। কিন্তু হে হানযালাহ! এক এক সময় এক অবস্থার সৃষ্টি হয়। (অর্থাৎ আল্লাহর রাসূলের সান্নিধ্যে আসলে এক মনোভাব সৃষ্টি হয় এবং এখান থেকে চলে যেয়ে জাগতিক জীবনে লিপ্ত হয়ে গেলে মনোভাবের পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। কেননা প্রত্যেকটি বস্তুর একটা নিজস্ব প্রতিক্রিয়া আছে।) এ কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বলেছেন। ৬২৪
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সুহবাতের সুবাদে সাহাবীগণের অন্তরে ঈমানের এমন জ্যোতি উদয় হয়, যাতে তাঁদের অন্তরসমূহ দুনিয়ার আবিলতা থেকে পরিশুদ্ধি লাভ করে, তাঁদের রূহানী শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাঁরা এক একজন আদর্শ ও আলোকিত মানবরূপে গড়ে ওঠে। অনুরূপভাবে তাবি'ঈগণও সাহাবা কিরাম (রা.)-এর সুহবাত ও সংশ্রবের মাধ্যমে পবিত্র অন্তরসম্পন্ন উচ্চ মর্যাদাশীল মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। কাজেই নাফসের সংশোধন, অন্তরকে জীবিতকরণ, চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন ও সত্য পথে অটল থাকার ক্ষেত্রে সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও মুত্তাকী লোকদের সুহবাত ও সংশ্রব যে অতিশয় প্রয়োজন ও ভীষণ ফলদায়ক, সে কথা বলাই বাহুল্য। কারণ, নাফসের এমন অনেক সূক্ষ্ম ও গোপনীয় ব্যাধি রয়েছে, যেগুলো কেবল নিজের 'ইলম ও বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে অনুভব করা সম্ভব নয়। আর কেউ কেউ এ ব্যাধিগুলো অনুভব করতে পারলেও তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া সব কিছু জানার পরও সর্বপরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার! এরূপ ঘটনাও ঘটে থাকে যে, কোনো কোনো 'আলিম মনে করেন যে, তাঁরা চরিত্রের দিক দিয়ে উচ্চ মানসম্পন্ন ও আল্লাহভীরু এবং তাঁরা সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল রয়েছেন। অথচ কার্যত দেখা যায় যে, তাঁদের চরিত্রের মধ্যে নানা মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে এবং তাঁরা সত্য ও ন্যায় থেকেও অনেক দূরে। এ জাতীয় আত্মপ্রবঞ্চিত লোকদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴾فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ ﴿-"তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে ত্রুটিমুক্ত মনে করো না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে বেশি জানেন যে, কে (সত্যিকার অর্থে) পরহেয করে চলে।”৬২৫ অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ﴾أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنْفُسَهُمْ بَلِ اللَّهُ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ ﴿-"আপনি কি দেখেননি সেসব লোককে, যারা নিজেদেরকে পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত বলে দাবি করে। বস্তুতপক্ষে আল্লাহ তা'আলাই যাকে চান তাকে পরিশুদ্ধ করেন।”৬২৬ অন্য একটি আয়াতে অন্তরের পরিশুদ্ধিকে আল্লাহ তা'আলা মানুষের ওপর তাঁর বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহরূপে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ﴾وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴿ যদি তোমাদের ওপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ না হতো, তবে তোমাদের মধ্যে কেউ পরিশুদ্ধ হতে পারতো না। বস্তুতপক্ষে আল্লাহ তা'আলাই যাকে চান তাকে পরিশুদ্ধ করেন। আর আল্লাহ হলেন সম্যক শ্রবণকারী ও মহাবিজ্ঞ। ৬২৭
কাজেই জানা যায় যে, কেবল 'ইলম অর্জনই নৈতিক সংশোধন লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। এর জন্য সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের সংসর্গে অবস্থান করে 'আমালী তারবিয়াত (প্রশিক্ষণ) হাসিল করারও প্রয়োজন রয়েছে। 'ইলম কেবল সঠিক- সহজ-সরল পথ প্রদর্শন করে মাত্র। আর শুধু পথ জেনে নেওয়াই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ সাহস করে পদক্ষেপ না নেওয়া হবে, পথ অতিক্রম করা না হবে। সুতরাং প্রত্যেক মু'মিনকে তার অভীষ্ট, লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য প্রয়োজন- সৎ, ন্যায়-নিষ্ঠ ও মুত্তাকী লোকদের সুহবাত ও সংশ্রব, যাঁরা তাকে তার দোষ-ত্রুটিগুলো দেখিয়ে দিতে পারবেন এবং সংশোধন করতে পারবেন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, الْمُؤْمِنُ .مراةُ الْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنُ أَخُوِ الْمُؤْمِنِ- "এক মু'মিন অপর মু'মিনের জন্য আয়নাস্বরূপ এবং এক মু'মিন হচ্ছে অপর মু'মিনের ভাই।”৬২৮ এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, প্রত্যেক মু'মিনের কর্তব্য হলো, সে যখনই তার মু'মিন ভাইয়ের মধ্যে কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি দেখতে পাবে, তখন সে তাকে একান্ত ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোবৃত্তি থেকে পরামর্শ ও উপদেশ দিয়ে শোধরানোর চেষ্টা করবে। এ কারণেই কোনো মু'মিনের জন্য সত্যনিষ্ঠ মু'মিন সমাজ ও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী বসবাস করা সমীচীন নয়। এ অবস্থায় বিপথগামী হওয়ার ও শাইতানের ফাঁদে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের সাথে বসবাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ ﴾أمنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ- "হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করো এবং সত্যনিষ্ঠ লোকদের সাথে থাকো।”৬২৯ অন্য আয়াতে তিনি বলেন, - وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ সকাল-বিকাল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁকে ডাকে, আপনি তাঁদের সান্নিধ্যে ধৈর্যের সাথে অবস্থান করুন। "৬৩০ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন হাদীসে উম্মাতকে একাকী, নিঃসঙ্গ এবং জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবস্থান করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, إِنَّ الشَّيْطَانَ ذِئْبُ الإِنْسَانِ كَذِئْبِ الْغَنَمِ يَأْخُذُ الشَّاةَ الشَّاذَّةَ وَالْقَاصِيَةَ وَالنَّاحِيَةَ وَإِيَّاكُمْ وَالشَّعَابَ وَعَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَالْعَامَّةِ মেষপালের জন্য যেমন নেকড়ে বাঘ রয়েছে, তেমনি শাইতান হলো মানুষের নেকড়ে বাঘ। নেকড়ে বাঘ দল থেকে বিচ্ছিন, দূরে অবস্থানকারী ও একপাশে অবস্থানকারী মেষকে পাকড়াও করে। কাজেই তোমরা (লোকালয় থেকে দূরে গিয়ে) পাহাড়ে-পবর্তে অবস্থান করা থেকে বেঁচে থাকো। তোমরা দল ও সাধারণ জনগণের সাথে বসবাস করো। ৬৩১
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন,
فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَنَالَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَلْيَلْزَمُ الْجَمَاعَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنْ الاثْنَيْنِ أَبْعَدُ
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করতে চাইবে, সে যেন দলকে আঁকড়ে ধরে। কেননা শাইতান একজনের সাথে বিদ্যমান থাকে। সে দুজন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। ৬৩২
তিনি আরো বলেন, يَدُ اللَّهُ مَعَ الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَذْ شُذْ إِلَى النَّارِ -"আল্লাহর হাত (অর্থাৎ সর্মথন বা সহযোগিতা) থাকে দলের সাথে। আর যে ব্যক্তি দল থেকে বিচ্ছিন্ন, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”৬৩৩ আল্লাহ তা'আলা সকল মু'মিনকেই সম্মিলিতভাবে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا -“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু (কোরআন বা ইসলাম) কে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”৬৩৪ বলাই বাহুল্য, আল্লাহর এ রজ্জু ছিঁড়ে যেতে পারে না। তবে অবশ্য হাত থেকে ফসকে যেতে পারে। তাই এ রজ্জুজুটি হাত থেকে ফসকে যাবার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরো। যদি কদাচিৎ কারো হাত ফসকে যায়, তা হলে অন্যরা মিলে তার হাত ধরে ফেলবে এবং রজ্জুর সাথে পুনরায় সংযুক্ত করে দেবে। এ কারণে ইসলামে কেবল নিজে সৎ কর্ম করা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাকেই যথেষ্ট মনে করা হয় না; বরং অপরকেও সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অন্যায় থেকে বারণ করাকে একটি অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্যরূপে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
টিকাঃ
৬২১. বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাব: আল-বুয়ূ'), হা. নং: ১৯৯৫, (কিতাব: আয-যাবা'য়িহ ওয়াস সাইদ), হা. নং: ৫২১৪; মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আর-বির ওয়াস সিলাতু...), হা. নং: ৬৮৬০
৬২২. আবু দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৮৩১
৬২৩. বাইহাকী, শু'আবুল ঈমান, (৫৭: হুসনুল খুলুক), খ. ১০, পৃ. ৩৫১
৬২৪. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাব: আত-তাওবাহ), হা. নং: ৭১৪২
৬২৫. আল-কোরআন, সূরা আন-নাজম, ৫৩: ৩২
৬২৬. আল-কোরআন, সূরা আন-নিসা', ৪: ৪৯
৬২৭. আল-কোরআন, সূরা আন-নূর, ২৪: ২১
৬২৮. আবূ দাউদ, আস-সুনান, (কিতাব: আল-আদাব), হা. নং: ৪৯২০
৬২৯. আল-কোরআন, সূরা আত-তাওবাহ, ৯: ১১৯
৬৩০. আল-কোরআন, সূরা আল-কাহফ, ১৮: ২৮
৬৩১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, (হাদীসু মু'আয রা.), হা. নং: ২২১০৭; তাবারানী, আল-মু'জামুল কাবীর, হা. নং: ৩৪৪
৬৩২. আহমাদ, আল-মুসনাদ, (মুসনাদু 'উমার রা.), হা. নং: ১৭৭
৬৩৩. তিরমিযী, আস-সুনান, (কিতাব: আল-ফিতান), হা. নং: ২১৬৭
৬৩৪. আল-কোরআন, সূরা আলু-'ইমরান, ৩: ১০৩